আল্লাহর (দ্বীনকে) রক্ষা কর, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন

আল্লাহর (দ্বীনকে) রক্ষা কর, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا- أنَّهُ قَالَ: كُنْتُ خَلْفَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهَ وَسَلَّمَ يَوْمًا، فَقَالَ : يَا غُلاَمُ، إنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ: اِحْفَظِ اللهَ يَحْفَظُكَ، اِحْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إذَا سَألْتَ فَاسْألِ اللهَ، وَإذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِا للهِ، وَاعْلَمْ أنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَّنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوْكَ إلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ الله لَكَ، وَلَوِ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَّضُرُّوُكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوْكَ إلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأقْلَامُ وَجُفَّتِ الصُحُفُ. (رواه الترمذي وقال حديث حسن صحيح)

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আমি একদা রাসূলুল্লাহ স.-এর পশ্চাতে বসা ছিলাম। তিনি বললেন : হে বালক ! আমি তোমাকে কিছু কথা শিখাচ্ছি-শোন! তুমি আল্লাহ (আল্লাহর বিধি-বিধান)-কে সংরক্ষণ কর, তাহলে তিনি তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আল্লাহর বিধি-বিধানের সুরক্ষায় সচেষ্ট হও, তাহলে তুমি তাকে তোমার কাছে পাবে। যদি তুমি কিছু প্রার্থনা কর, তাহলে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা কর। আর তুমি সাহায্য প্রার্থনা করলে আল্লাহর নিকটই প্রার্থনা কর এবং জেনে রেখো, কোন বিষয়ে তোমার উপকারার্থে যদি সমগ্র মানব জাতি একত্রিত হয়, তবে তারা তোমার কোন-রূপ উপকার করতে সক্ষম হবে না। কেবল তাই হবে, যা আল্লাহ তাআলা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এবং যদি তারা সবাই কোন বিষয়ে তোমার অপকারকল্পে সমবেত হয়, তাহলেও তারা তোমার অপকার করতে পারবে না। তবে তা অবশ্যই ঘটবে, যা আল্লাহ তোমার বিপক্ষে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, শুকিয়ে গেছে লিপিকা (সুতরাং, কিছুই পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই)। [ইমাম তিরমিজি হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন হাদিসটি হাসান ও সহিহ।]
হাদিস বর্ণনাকারী-হাদিসটি বর্ণনা করেছেন মহান সাহাবি, উম্মাহর জ্ঞান তাপস ও তাফসির শাস্ত্রের অন্যতম পুরোধা রাসূল সা.-এর চাচা আব্বাস বিন আ. মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহ, তিনি ছিলেন কোরাইশী গোত্রের হাশেমী শাখার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। হিজরতের তিন বছর পূর্বে জন্মলাভ করেন। হিজরতের বছর পিতা -মাতার সাথে হিজরতের পুণ্যভূমি মদিনায় গমন করেন। দ্বীনের জ্ঞানের প্রশস্ততা ও গভীরতার জন্য রাসূল তাকে দোয়া করেন। ইমাম বোখারি রহ. তার থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করিম স. একবার ইস্তেঞ্জায় প্রবেশ করেন। আমি তাঁর জন্য ওজুর পানি রেখে দিলাম। তিনি তা দেখে বললেন : কে রেখে দিল এটা ? তাকে অবহিত করা হলে তিনি এ বলে দোয়া করেন যে-

হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের জ্ঞান-প্রজ্ঞা দান করুন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হে আল্লাহ ! তাকে কোরআন কারীমের জ্ঞান দান করুন। অপর রেওয়ায়েতে আছে, হে আল্লাহ ! তাকে ইসলাম ধর্মের জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং কোরআন ব্যাখ্যা করার মতো ব্যুৎপত্তি দান করুন।বোখারি- ১৪৩ মুসলিম -২৪৭৭

মাসরুক র. বলেন :-

ইবনে আব্বাসকে দেখামাত্র আমার মনে যে ভাবনার উদয় হত, তা এই যে, মানুষের মাঝে তিনি অবয়বে-গঠনে সুন্দরতম ব্যক্তি। আর যখন তিনি কথোপকথন ও খুতবায় ব্যাপৃত হতেন, মনে হত, তিনি মানুষের মাঝে বিশুদ্ধতম বচন ও বর্ণনা-ভঙ্গির অধিকারী, অসাধারণ বাগ্মী। যখন দ্বীনের আলোচনায় মগ্ন হতেন, আমার মনে হত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তিনিই শীর্ষস্থানীয় । [যাদুদ দায়িয়াহ : ১১]
হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের অন্যতম। তাফসীর শাস্ত্র ও দ্বীনের অন্যান্য শাখায় সূক্ষ্ম জ্ঞানের অবতারণায় তার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনি ইনে-কাল করেন ৬৮ হিজরিতে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

শাব্দিক আলোচনা :-
* * غلام- يَا غُلاَمُ শব্দের অর্থ নিতান- বালক, ছোট ছেলে, ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে যৌবন অবধি যে কোন বয়সী ব্যক্তির জন্য তা সমানভাবে ব্যবহৃত।
*: اِحْفَظِ اللهَ আল্লাহকে রক্ষা কর, অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক সুনির্ধারিত শরয়ি সীমাসমূহ লঙ্ঘন না করা, এবং তার প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার যথাযথভাবে আদায়ে অব্যাহতভাবে প্রয়াসী ও সক্রিয় হওয়া। যাবতীয় আদেশ-নিষেধের কোন ব্যত্যয় বা অন্যথা যাতে না ঘটে, বরং যথাযথভাবে তা পালিত হয়-সে ব্যাপারে সদা সতর্ক ও সচেষ্ট থাকা।
* يَحْفَظُكَ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তার হেফাজতকারী বান্দাদের শারীরিক, পারিবারিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা শুধু নয়, বরং তার সকল স্বার্থ পূরণের সু-ব্যবস্থা করেন এবং তাদের দ্বীন-ধর্ম ও ঈমান-আকিদা এমনরূপে সংরক্ষণ করেন যে, যে সমস- বিষয়ে সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারামের মিশ্রণ রয়েছে এরূপ বিভ্রানি-কর সকল কিছু থেকে তাদের বিরত রাখেন। এমনিভাবে প্রবৃত্তির যে সমস- অবৈধ ও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কামনা-বাসনা রয়েছে তা থেকে তাদেরকে অনুগ্রহপূর্বক নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখেন। উপরন্তু, তারা আল্লাহ তাআলার অপার কৃপায় মৃত্যু-ক্ষণের মতো ভয়ংকর সময়ে সত্য-বিচ্যুতি ও বিপথগামিতা থেকে সুরক্ষা পায় এবং পর-জীবনে ভয়াবহতম জাহান্নামের শাসি- থেকে অনায়াসে বেঁচে যায়।
* تَجِدْهُ تُجَاهَكَ তাকে তোমার কাছে পাবে, এর গূঢ় অর্থ : সর্বাবস্থায় তুমি তাকে সহায় এবং যাবতীয় বিষয়ের তওফিকদাতা হিসেবে তোমার সামনে পাবে।
* إذَا سَألْتَ فَاسْألِ اللهَ، وَإذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِا للهِ অর্থ : যদি কিছু প্রার্থনা কর, আল্লাহর কাছে কর। সাহায্য প্রার্থনা করলে তাঁরই নিকট প্রার্থনা কর। আমরা প্রতিদিন সালাতে নিত্য যে প্রার্থনা করি, এ দোয়াটি অবিকল তারই মত-দোয়াটি এই- إياك نعبد وإياك نستعين (الفاتحة: ৪) ‘আমরা একমাত্র তোমারই এবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’

  • বিধি-মালা ও উপকারিতা :

(১) উক্ত হাদিসটি, নি:সন্দেহে বলা যায় একটি আকর হাদিস ; উম্মাহর জন্য তাতে একই সাথে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও দ্বীনের ক্ষেত্রে খুবই প্রণিধানযোগ্য মৌলিক সার্বিক নীতিমালা। জনৈক আলেম হাদিসটি প্রসঙ্গে বলেন :
আমি যখনই হাদিসটি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি, আমাকে তা বাকশূন্য করে দিয়েছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি ভেবেছি-হাদিসটির ব্যাপারে অজ্ঞতা ও তার মর্ম উপলব্ধি করতে না পারা আমাদের জন্য খুবই আফসোসের কারণ হবে।
(২) হাদিসটি প্রমাণ করে, নবী সা. উম্মাহর প্রতি ছিলেন সদা নিবেদিত ; তার চিন্তার সবটুকু জুড়ে ছিল উম্মার সাফল্য-পরিণতি, তিনি সচেষ্ট ছিলেন তাদের মাঝে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সঞ্চারে, চারত্রিক গুণাবলির বিস্তার ও সত্য-সঠিক পথের অনুসরণের উদ্যম গড়ে তোলায়। তাই, নিতান- বালক ইবনে আব্বাস যখন একই উটের পিঠে তার পশ্চাতে আরোহণ করলেন,-আমরা দেখতে পাই, তিনি তাকে শিক্ষা দিচ্ছেন সংক্ষিপ্ত শব্দ অথচ ব্যাপক অর্থময় কিছু বচন, যা তার ঐহিক ও পারত্রিক জীবনে খুবই প্রভাব বিস্তার করবে।
(৩) পিতা, দায়ী, শিক্ষক-যে-ই মুরব্বি-অভিভাবক হন, সে তাঁর গুরু-দায়িত্ব আদায়ে উপযুক্ত সময়-সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করবে। অধিকন’, দিক-নির্দেশনামূলক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে শ্রোতৃমণ্ডলীর দৃষ্টি তথা মনোযোগ আকর্ষণের যে বিবিধ প্রারম্ভিক পদ্ধতি রয়েছে, তা অবশ্যই প্রয়োগ করবে। হাদিসটি এ ব্যাপারে আমাদের জন্য উত্তম দিক-নির্দেশক।
(৪) প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির উপর বিরাট দায়িত্ব রয়েছে, যা তাকে অবশ্যই পালন করতে হবে এই ঐহিক জীবনে। তা এই যে, সে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ পালন করবে। বর্জন করবে নিষিদ্ধ সমস- বিষয়। তাঁর নির্ধারিত শরয়ি সীমাসমূহ রক্ষা করবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সা. নির্দেশিত পন’াকে আমৃত্যু অনুসরণ করে চলবে।
(৫) ইসলামি শরিয়ায় কিছু সুনির্দিষ্ট কর্ম রয়েছে যেগুলোর প্রতি যত্নবান হতে আল্লাহ কখনো নির্দেশ প্রদান করেছেন, কখনো দিয়েছেন উৎসাহ, সঞ্চার করেছেন উদ্দীপনা। যথা :-

  • (ক) নামাজ সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন :-

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ (البقرة: 238)
‘সমস্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হও বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের (আসর) ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান- আদবের সঙ্গে দাঁড়াও। [সুরা বাকরাঃ ২৩৮]

 

  • (খ) পাক-পবিত্রতা ও ওজু। এ বিষয়ে সাওবান রা. থেকে বর্ণিত-

তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : তোমরা দ্বীনের উপর অবিচল থাক, এবং তা গণনা কর না। (আমল যতই অব্যাহত থাকুক, এবং সংখ্যায় বিপুল হোক, তা গণনার আশ্রয় নিও না) আর জেনে রেখো ! তোমাদের আমল সমূহের মাঝে সর্বোত্তম আমল হলো সালাত। মোমিন মাত্রই ওজুর প্রতি যত্নবান।

  • (গ) শপথ : যথা আল্লাহ তাআলা বলেন : وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ‘তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর’ অর্থাৎ, শপথ ভঙ্গ করো না।
  • (ঘ) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত। যথা : জিহ্বা ও গুপ্তাঙ্গের হেফাজত।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন-

যে ব্যক্তি জিহ্বা ও গুপ্তাঙ্গের হেফাজত করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হয়ে যাব।
(৬) হাদিসটি প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের প্রতি যত্নশীল হবে, পালন করবে তার বিধি-বিধান জীবনের যাবতীয় অনুসঙ্গে, আল্লাহ তাআলা তার পার্থিব যাবতীয় বিষয়ের রক্ষা করবেন-দৈহিক, পারিবারিক ও বিষয়-সম্পত্তি-সর্বক্ষেত্রে তার রক্ষাণাবেক্ষণ বিস্তৃত থাকবে। এমননিভাবে, যে তার শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের দুর্দান- সময়গুলোতে আল্লাহর দ্বীন ও হুকুম-আহকামের প্রতি যত্ন নিবে, বার্ধক্যের বিষণ্ন-ভঙ্গুর দিনগুলোতে আল্লাহ তার পাশে থাকবেন, সতেজ রাখবেন তাকে শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে। এমনিভাবে, তাকে রক্ষা করবেন দ্বীনের ক্ষেত্রে বিভ্রানি-কর সংশয় থেকে-যা বান্দাকে সঠিক-শুদ্ধ পথ থেকে হটিয়ে নিপতিত করে বিভ্রান- পথের ঘোর অমানিশায়। শয়তান নিষিদ্ধ প্রবৃত্তির যে সৌন্দর্য বিস্তার ঘটায়, প্রতিমুহূর্তে তৎপর থাকে বান্দাকে তাতে আপতিত করতে-সে ব্যাপারেও আল্লাহ হবেন তার উত্তম রক্ষাকারী।
(৭) দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বান্দার হেফাজতের অন্যতম ফলশ্রুতি এই যে, মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাকে মৃত্যুকালে সত্য-ভ্রষ্টতার ধ্বংসাত্মক থাবা থেকে সুরক্ষা করেন। ফলে তার মৃত্যু-ক্ষণে এই শাশ্বত মহা-সত্যের সাক্ষ্য দানের পরম ও চরম সৌভাগ্য নসিব হয় যে-

‘আল্লাহ ছাড়া এবাদতের উপযুক্ত আর কোন ইলাহ নেই ; মোহাম্মদ সা. আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।’

এ মহান সৌভাগ্য যে অর্জন করে, তার সর্বশেষ আবাস ও পরিণতি জান্নাত। যেমন রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন :-

‘যে কোন বান্দা এই কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন মাবুদ নেই, অত:পর এই প্রদত্ত সাক্ষ্যের উপর মৃত্যুবরণ করবে, নি:সন্দেহে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
অনুরূপভাবে, দ্বীনের হেফাজতকারী বান্দা কবর, হাশরসহ পর জীবনের সর্বত্র ভয়ানক মুহূর্তে মহান আল্লাহর হেফাজতে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করবে। অতএব, আল্লাহর দ্বীনকে হেফাজতকারী হও, তবে তিনি তোমার হেফাজত করবেন। তুমি তার দ্বীন ও বিধানের যথাযোগ্য সংরক্ষণ কর, তাহলে তাঁকে কঠিন মুহূর্তে সামনে পাবে সহায় হিসেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ . هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ حَفِيظٍ. (ق: 31-32)
‘জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে আল্লাহভীরুদের অদূরে। তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারীকে এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।’ [সুরা ক্বফঃ ৩১-৩২]

(৮) আল্লাহর হেফাজতের আরেক সুফল হলো : দুনিয়া-আখেরাতের সব ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা লাভ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :-

الَّذِينَ آَمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ. (الأنعام :82)
‘যারা ঈমান-বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শানি- এবং তাঁরাই সুপথগামী।’
আল্লাহ তাআলা মূসা ও হারুন আ.-কে লক্ষ করে বলেছেন :-
لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى (طه: 46)
‘তোমরা ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি দেখি ও শুনি।’

এমনিভাবে নবী করিম সা. আবু বকর রা.-কে বললেন : যখন উভয়ে মদিনা অভিমুখে হিজরতকালে সাওর গুহায় অবস্থান করছিলেন :-

দু ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কি যাদের তৃতীয় জন হলেন আল্লাহ ? তুমি ভয় করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।
(৯) পার্থিব জীবনে মানুষ সর্বদা একই অবস্থায় যাপন করে না ; নানা পরিসি’তি ও অবস’ায় তার আবর্তন ঘটে প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে। কখনো সে সুখী, কখনো দু:খী ; কখনো আর্থিক প্রাচুর্য ঘিরে থাকে তাকে, সীমাহীন ভোগ-বিলাসের সামর্থ্য যেন লুটিয়ে পড়ে তার পদতলে। কখনো সে আক্রান- হয় দারিদ্র্যের বিপুল যন্ত্রণায়, বিদ্ধ হয় নানাবিধ সংকটের তীরে। কখনো সতেজ সু-স্বাস্থ্যবান, কখনো দুর্বল-রুগ্ন। দীর্ঘ একটা সময় যৌবনের দৃপ্ততায় কাটানোর পর সে ম্রিয়মান হয় বার্ধক্যের কষাঘাতে। তুমি তোমার প্রাচুর্যে, সুস্বাস্থের, যৌবনের দুর্দান- শক্তিময়তায় আল্লাহর সাথে থাক,-দারিদ্র্য, অসুস’তা ও বার্ধক্যের দৌর্বল্যে তিনি তোমার পাশে থাকবেন।
(১০) আল্লাহ তাআলার হেফাজত লাভের কতিপয় উপকরণ :-

(ক) বাধ্যতামূলক বিধি-নিষেধগুলোকে পরিপূর্ণ রূপে মেনে চলা। যথা: মসজিদে এসে জামাতসহ সঠিক ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা।
(খ) নফল বা ঐচ্ছিক এবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভে এগিয়ে আসা। যেমন : সুন্নতে মুয়াক্কাদা, বিতর, এবং শরিয়ত-সিদ্ধ মাসিক ও বার্ষিক রোজা পালনে যত্নবান হওয়া।
(গ) দ্বীন ও দুনিয়া সংশ্লিষ্ট সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দিন-রাত দোয়া ও প্রার্থনা করা।
(ঘ) এরূপ নেককারগণের সংস্পর্শ বা সংশ্রব লাভ করা যারা তোমাকে তোমার মাওলা আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। তোমাকে বন্দেগীময় জীবন যাপনে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে এবং তোমার দ্বীন- ইসলামের হেফাজতের গুরু দায়িত্ব-ভার গ্রহণ করবে।
(ঙ) এমন উপকারী জ্ঞান অন্বেষণে আত্মনিমগ্ন হওয়া যা তোমাকে প্রভু, স্রষ্টা, সম্বন্ধে জ্ঞান দানের পাশাপাশি তার আদেশ-নিষেধাবলীর পরিচয় তুলে ধরবে।

(১১) উপরোক্ত হাদিসের অন্যতম শিক্ষা এই যে, দোয়া একটি প্রণিধানযোগ্য মৌলিক এবাদত। আল্লাহ তাআলা নিুাকে্ত আয়াতে দ্ব্যর্থহীন ভাবে আহ্বান জানিয়েছেন-

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ .(غافر: 60)
‘এবং তোমার প্রভু বলেন : তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। তিনি আরো বলেন :-
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ. (البقرة: 86)
‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, বস’ত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। আমি প্রার্থীর প্রার্থনা কবুল করি, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনার কতিপয় শুভ ফলাফল :
(ক) স্বীয় লাঞ্ছনা, অবমাননা, ও চরম মুখাপেক্ষিতার বহি:প্রকাশ।
(খ) উপকার সাধন ও অপকার অপসারণের মতো পরম চাওয়া-পাওয়া।
(গ) এতে রয়েছে বিপুল প্রতিদান ও পুরস্কার। এর মাধ্যমে মার্জিত হয় পাপাচার ও অনাচার।
(ঘ) নিরাপত্তা ও অনুকম্পাসহ আল্লাহ তার সাথেই আছেন-এরূপ একটি সঙ্গবোধ অন্তরের গভীরে জাগ্রত হয় এর মাধ্যমে।
(ঙ) আল্লাহ তাআলার নিু উদ্ধৃত আয়াতকে বাস-বে রূপ দান করা হয়। তিনি বলেন :-
إياك نعبد وإياك نستعين (الفاتحة: 4)
‘শুধু তোমারই এবাদত করি এবং তোমারই নিকট প্রার্থনা জানাই।’
(চ) আল্লাহ তাআলার ক্রোধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার এটিও অন্যতম উত্তম পথ ও পন্থা। যেমন : নবী করিম সা. বলেছেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দোয়া করে না তার উপর তাঁর ক্রোধ নিপতিত হয়।

(১২) এ মহান হাদিস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টিও পরিস্ফুটিত হয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে এমন বিষয়ে-যা তিনি ব্যতীত আর কেউ পারে না-সাহায্য, আশ্রয়সহ কিছুই চাওয়া যাবে না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য যেই হোক না কেন কারোরই জন্যে কোন প্রকার এবাদত করা যাবে না। এই ঐকান্তিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদতের পথ ব্যতীত এবাদতের গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বীন-দুনিয়ার সফলতা বা মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন আদৌ সম্ভব নয়।
(১৩) অত্র অধ্যায়ে আলোচ্য হাদিস থেকে এ বিষয়টিও সাব্যস- হয় যে, বান্দা এই জড় জগতে ভাল-মন্দ, লাভ-লোকসান যাই প্রাপ্ত হোক না কেন তা সবই তার পূর্ব লিখিত ও নিরূপিত ভাগ্য অনুযায়ীই হয়ে থাকে। সৃষ্টিকুলের সমগ্র সৃষ্টিই যদি একযোগে কোন বিষয়ে প্রভূত চেষ্টা তদবির চালিয়ে যায়, তবে পরিণাম তাই হয় যা পূর্বে লিখিত ও নির্ধারিত। বিন্দু বা অনু পরিমাণও তার বিপরীত ঘটে না এবং ঘটতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :-

قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا. (التوبة:51)
‘আপনি বলুন আমাদের কিছুই পৌঁছোবে না কিন’ যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন।’ তিনি আরো বলেন :-
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا. (الحديد: 22
‘পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর কোন বিপদ আসে না কিন’ (যা আসে) তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।’

(১৪) আল্লাহ তাআলার ফয়সালা ও নির্ধারিত ভাগ্য-লিপির প্রতি বিশ্বাস, এর শেকড় দৃঢ়ভাবে আত্মস’ করাও ঈমানের অন্যতম স-ম্ভ। এর উদ্দেশ্য আদৌ এ নয় যে, কেউ আমল ছেড়ে দিয়ে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে। কেননা, যিনি তার চূড়ান- সিদ্ধান- ও ভাগ্যলিপির প্রতি ঈমান আনয়নের নির্দেশ প্রদান করেছেন, তিনিই তো আবার সুফল বয়ে আনে এমন কর্মতৎপরতার প্রয়াস-প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকারও আদেশ করেছেন। যেমন : ইমাম মুসলিম রহ. তার কিতাব মুসলিম শরীফে বর্ণনা করেন-

‘তোমরা কর্ম করে যাও। কারণ, প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা সহজ করে দেয়া হয়েছে।’