মহান আল্লাহ তাআলার দশ অসিয়ত পর্বঃ ২

আল্লাহ তাআলার দশ অসিয়ত

পর্বঃ ২

  • পঞ্চম অসিয়তঃ মানুষ হত্যা না করা

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
“আল্লাহ যা হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তোমরা তা হত্যা করবে না।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের প্রাণ দান করেছেন, তিনি তা রক্ষা করবেন। এ প্রাণ হরণ করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। তার স্পষ্ট নির্দেশ ব্যতীত কোন মানুষকে হত্যা করা বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। যে সকল ব্যাপারে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছেন শুধু সে সকল ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তা বাস-বায়ন করবেন। যেখানে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান শিথিল করে নিহত ব্যক্তির আত্নীয়-স্বজনের সাথে বোঝা পড়া করে বা রক্ত পণ দিয়ে অব্যাহতি লাভের ব্যবস্থা দিয়েছেন সেখানে সে ব্ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাও হত্যার মত অপরাধ।
একটু বিস্তারিত না বললে বিষয়টি হয়তো স্পষ্ট হবে না। মনে করুন কাবীল নামের এক ব্যক্তি হাবীল নামক ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল। আদালত স্বাক্ষ্য প্রমাণে রায় দিল যে, কাবীল, হাবীলের হত্যাকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই কাবীল-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো। এখানে ইসলামী বিধান হল হাবীলের পরিবার যদি কাবীল-কে ক্ষমা করে দেয় কিংবা কাবীলের কাছ থেকে রক্তপণ গ্রহণ করে, তাহলে কাবীলের প্রাণটা বেঁচে যায়। এতে কাবীলের পরিবারের যেমন কাবীলকে হারানোর বেদনা বহন করতে হবে না। তেমনি হাবীলের অসহায় পরিবারটি অর্থ পেয়ে নিজেদের অবস’ার উন্নতিতে কাজে লাগাতে পারবে। আর যদি হাবীলের পরিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবীতে অটল থাকে, তাহলে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। অন্য কোন শক্তির ক্ষমতা নেই তা রোধ করার। এটা হলো ইসলামের বিধান। কিন’ দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা মুসলমান হয়েও ইসলামের এ কল্যাণকর বিধান থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশের আইনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা রয়েছে কোন মৃত্যুদণ্ড রহিত করার। এটি সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী। রাষ্ট্রপতি যদি কাবীলের মৃত্যুদণ্ড রহিত করেন তাহলে হাবীলের পরিবারের লাভ কি হলো? অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে কাবীল জেল থেকে বের হয়ে নিহত হাবীলের পরিবারের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। হাবীলের পরিবার হাবীলকে হারানোর বেদনা বহন করে এখন কাবীলের ভয়ে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বৃটিশের গড়া মানুষগুলো এটতা ইসলাম বিদ্বেষী যে, তারা মনে করে ইসলামী আইন-কানুন যতই কল্যাণকর হোক তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। এ দেশে বৃটিশর রাজত্ব শেষ হয়েছে, কিন’ তাদের গোলামী ও দাসত্বের অবসান হয়নি।
অন্যায়ভাবে শুধু মুসলমানদের হত্যা করা অপরাধ নয়। যে কোন মানুষকে হত্যা করাই অপরাধ। এ আয়াতে তাই মানুষকে হত্যা হারাম করা হয়েছে। হোক সে মুসলিম বা হিন্দু কিংবা অন্য ধর্মালম্বী।
মানুষ হত্যা কত জঘন্য অপরাধ তা আল্লাহ তাআলার এ বানী থেকেও অনুধাবন করা যায়ঃ

أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
“যে ব্যক্তি প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।” সূরা আল- মায়েদা, আয়াত ৩২

আল্লাহর এ অসিয়তের ভাষায় ‘যথাযথ কারণ ব্যতীত হত্যা করা’ হারাম বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন তাহলে যথাযথ কারণ কী, যা পাওয়া গেলে হত্যা করা যায় বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন সে কারণগুলো। তিনি বলেছেনঃ

لا يحل دم إمرىء مسلم إلا بإحدى ثلاث- الثيب الزاني والنفس بالنفس والتارك لدينه المفارق للجماعة . متفق عليه
“তিনটি কারণের কোন একটি কারণ ব্যতীত মুসলমানের রক্ত প্রবাহ বৈধ নয় – বিবাহিত ব্যভিচারকারী, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ ও ইসলাম ধর্ম ত্যাগকারী মুসলিম সমাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী।” বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম

অর্থাত এ তিন কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করা বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ নয়। যদি বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় ও তার ব্যভিচার প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। যদি কেহ কাউকে হত্যা করে, তাহলে এর শাস্তি হিসাবে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। যদি কোন মুসলামান ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায় এবং মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে বিভেদ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়।
এ সকল অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া ও তা কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের। কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দল মৃত্যুদণ্ড দিতেও পারবে না। কার্যকর করতেও পারবে না। এটা ইসলামের বিধান।
মানুষ হত্যা কত বড় অন্যায়, আল্লাহ তাআলার আরেকটি বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারি। তিনি ইরশাদ করেনঃ

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
“কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাসি- জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাসি- প্রস’ত রাখবেন।”সূরা আন-নিসা, আয়াত ৯৩

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অনেক দল নিরীহ নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে থাকেন। তাদের আক্রমনে যারা নিহত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই নিরাপরাধ। এ সকল নির্বিচার আক্রমণ দ্বারা তারা শত্রুকে আতংকিত করতে চান কিংবা নিজেদের প্রচার প্রসারের লক্ষ্য সি’র করেন। বাস-বে দেখা যায় এ ধরনের নির্বিচার আক্রমণ দিয়ে শত্রুকে আতংকিত করা যাচ্ছেনা বরং এতে তাদের হিংস্রতা, পাশবিকতা ও বর্বরতা আরো বেড়ে যায়। সবেচেয়ে বড় কথা হলো এ ধরনের আক্রমণ যাতে নিরাপরাধ মানুষ নিহত হয়, ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। এ রকম কার্যকলাপ সম্পর্কে আল-কুরআনে যেমন নিষেধ আছে, আছে হাদীসেও। এ ছাড়া ইসলামে জিহাদের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের সামনে। সে ইতিহাসে এ ধরনের কোন দৃষ্টান- চোখে পড়ে না। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুধুমাত্র শত্রুদের আঘাত করতে হবে অন্যকে নয়। এ ধরনের কার্যকলাপ দ্বারা তারা যেমন মানুষ হত্যার অপরাধে অপরাধী, তেমনি ইসলামের নামে এ অপকর্ম করে ইসলামের নকল চেহারা প্রদর্শনের অপরাধেও তারা অপরাধী।
হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে নির্বোধ ব্যক্তিরা যা করছে সে কারণে আমাদের পাকড়াও করো না। তাদের কারণে আমাদের শাস্তি দিও না।
এ পাঁচটি অসিয়ত করার পরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
“তোমাদেরকে তিনি এ অসিয়ত করলেন যেন তোমরা অনুধাবন কর।”

এ পাঁচটি অসিয়ত দুর্বোধ্য নয়। একেবারে সহজ সরল ভাবে, সহজ ভাষায় বলা হলো। যাতে তোমরা বুঝতে পারো। ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারো। আর এটা কোন হালকা বিষয় নয়। তোমাদের প্রতিপালক মহান আল্লাহর চুরান্ত অসিয়ত।

  • ষষ্ঠ অসিয়তঃ ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস না করা

وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ.
ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত তোমরা তার সম্পত্তির কাছে যাবে না
ইয়াতীমের সম্পদ ও তার স্বার্থ রক্ষা সম্পর্কে এ হল এক ঐশী অসিয়ত। ইয়াতীম হল, এমন শিশু যার পিতা মারা গেছে আর সে এখনো বয়ো:প্রাপ্ত হয়নি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুধু ইয়াতীমের মাল আত্মসাত বা ভক্ষণ করতে নিষেধ করেননি বরং তার ধারে কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন। তবে ইয়াতীম সম্পদ সংরক্ষণ, তার বৃদ্ধি ও তার জন্য খরচ করার লক্ষে ব্যবস’া নিতে তার কাছে যাওয়া যাবে। যেমন এ আয়াতেই বলা হয়েছে ‘উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত’ ইয়াতীমের সম্পদের কাছে যেও না। উত্তম ব্যবস’া বলতে ইয়াতীমের সম্পদ তারই জন্য খরচ, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করা-কে বুঝায়।
ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাত বা ভোগ দখল করা কত বড় মারাত্মক অন্যায় তা এ আয়াত দিয়েও অনুধাবন করা যায়ঃ

إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
“যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে আগুন ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্যিই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে।” সূরা আন- নিসা, আয়াত ১০

ইয়াতীম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন- তার সম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর অর্থ এ নয় যে, সে প্রাপ্ত বয়স্ক হলে তার সম্পদ ভোগ করা যাবে। বরং এ কথার অর্থ হল: ইয়াতীম প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে তার সম্পদ তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

فَإِنْ آَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
“অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেকবুদ্ধি পরিদৃষ্ট হওয়া লক্ষ কর, তবে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ কর।” সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬

যে কোন মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাত করা বড় পাপ, তা সত্বেও বিশেষভাবে ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতের বিষয়ে ভিন্ন করে সাবধানবাণী এসেছে। বিষয়টি গুরুতর বিধায় এ অসিয়ত করা হয়েছে।
এ অসিয়তে আমরা ইয়াতীমের লালন-পালন ও তার কল্যাণে কাজ করার জন্য নির্দেশ লাভ করতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا وأشار بالسبابة والوسطي وفرج بينهما. رواه البخاري .

“আমি এবং ইয়াতীমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে এক সাথে থাকব।” এ কথা বলে তিনি তার হাতের মধ্যমা ও তর্জনী অঙ্গুলিদ্বয় একত্র করে ও পৃথক করে দেখিয়েছেন। বর্ণনায়ঃ বুখারী

 

  • সপ্তম অসিয়তঃ ওযন ও পরিমাপে কম না দেয়া

وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“এবং পরিমাণ ও মাপে ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দিবে।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারা যে লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়ে মাপে ও ওযনে পুরোপুরি দেয়, কম না দেয়। কেহ যেন তার অধিকারের চেয়ে বেশী ভোগ না করে। এমনিভাবে কেহ যেন তার অধিকারের চেয়ে কম না পায়।
মাপে কম দেয়ার এ খাছলতের কঠোর নিন্দা করেছেন, শাসি-র কথা ঘোষণা করেছেন আল্লাহ পবিত্র কুরআনেঃ

وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ ﴿১﴾ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ ﴿২﴾ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ ﴿৩﴾ أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ ﴿৪﴾ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ ﴿৫﴾ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿৬﴾
“দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের নিকট হতে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওযন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে? যে দিন দাড়াবে সকল মানুষ জগতসমূহের প্রতিপালকের সম্মুখে।” সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১-৬

নবী শুয়াইব আ. এর যুগে মানুষেরা মাপে ও ওযনে কম দিত। তাদের এ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ শুয়াইব আ. কে প্রেরণ করেন তাদের কাছে। তিনি মাপে কম দেয়া থেকে তাদের বারণ করতে থাকলেন। কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করেনি। ফলে আল্লাহ তাদের উপর গযব নাযিল করে ধ্বংস করে দেন। যেমন আল্লাহ তার বিবরণ দিয়েছেন আল-কুরআনেঃ

وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ وَلَا تَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِنِّي أَرَاكُمْ بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُحِيطٍ ﴿৮৪﴾ وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ ﴿৮৫﴾
“মাদইয়ানবাসীদের নিকট তাদের ভাই শুয়াইবকে আমি পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। আর মাপে ও ওযনে কম দিও না; আমিতো তোমাদের সমৃদ্ধশালী দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের জন্য ভয় করছি এক সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তি।হে আমার জাতি! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ঠিকমত মেপে দিবে ও ওযন করবে, লোকদের তাদের সামগ্রীতে কম দিবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াবে না।” সূরা হুদ, আয়াত ৮৪-৮৫

কিন্তু তারা নবীর আহবানে সাড়া দিল না। তারা মনে করল, তাদের অর্থনৈতিক ব্যাপারে নবীর কথা বলার কী প্রয়োজন আছে? নবী নামাজ পড়বেন। আল্লাহর গুনগান করবেন। লোকের তাদের অর্থনীতি ও সম্পদের আদান-প্রদানে যা ইচ্ছা তা করবে। এখানে ধর্মের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কী? আল্লাহ তাদের বক্তব্য উল্লেখ করে বলেনঃ

قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَنْ نَتْرُكَ مَا يَعْبُدُ آَبَاؤُنَا أَوْ أَنْ نَفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ إِنَّكَ لَأَنْتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ
“তারা বলল, হে শুয়াইব! তোমার নামায কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা যার ইবাদত করত আমাদের তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও বর্জন করতে? তুমি তো অবশ্যই ধৈর্যশীল, ভাল মানুষ।” সূরা হুদ, আয়াত ৮৭

পরে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিলেন।
وَأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دِيَارِهِمْ جَاثِمِينَ
“আর যারা সীমালংঘন করেছিল মহানাদ তাদের আঘাত করল, ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে নতজানু অবস্থায় পড়ে রইল।” সূরা হুদ, আয়াত ৯৪
এ অসিয়তটি করার পর আল্লাহ বলেনঃ
لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত ভার অর্পন করি না।” সঠিক মাপ ও ওযনে ক্রয়-বিক্রয় করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মানুষকে না ঠকানোর যে নির্দেশ আমি দিলাম তা পালন করা কঠিন কোন কাজ নয়। বরং মানুষ্য প্রকৃতি ও বিবেক এটাকে সমর্থন করে। এর বিপরীত আচরণকে সমর্থন করে না।

 

  • অষ্টম অসিয়তঃ কথা ও কাজে ন্যায় ও সততা রক্ষা করা

وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى
যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায় পরায়ণতা অবলম্বন করবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও।
যখন কারো সম্পর্কে কোন কথা বলা হয়, হোক তা সমালোচনামুলক বা কারো পক্ষে-বিপক্ষে স্বাক্ষ্য অথবা করো সম্পর্কে মুল্যায়ন কিংবা বিচার-ফয়সালা করা হয়, তখন অবশ্যই সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করতে হবে। ন্যায়পরায়ণতার সাথে কথা বললে তা যদিও শত্রুর পক্ষে যায় কিংবা আপনজনের বিপক্ষে যায় তবুও কোন ছাড় নেই। সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক কথাই বলতে হবে। এমনিভাবে যখন বিচার- ফয়সালা, শালিসি করা হবে তখন ন্যায় ভিত্তিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজ দলীয় – ভিন দলীয়, আত্নীয়-পর, উচ্চ বংশীয়-নিম্ন বংশীয়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে কারো সাথে বৈষম্য করা যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় থাকবে আল্লাহর স্বাক্ষী স্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্নীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে ধনী হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায় বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে যাও তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন।” সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫

তিনি আরো বলেনঃ

وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآَنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“কোন সমপ্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো ন্যায় বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। ন্যায় বিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করবে, তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক খবর রাখেন।” সূরা মায়িদা, আয়াত ৮

আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশ বাস্তবায়নে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখেছেন তাঁরই প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিচারের ক্ষেত্রে কোন পক্ষপাতিত্ব করতেন না। কেহ করতে শুপারিশ করলে তিনি তা সহ্য করতেন না। তিনি আরো বলেছেন, বিচারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও জুলুম করার কারণে দেশ, জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মাত্র একটি হাদীস পেশ করা হল:

َعَنْ عَائِشَةَ رضِيَ اللَّهُ عَنْهَا ، أَنَّ قُرَيْشاً أَهَمَّهُمْ شَأْنُ المرْأَةِ المخْزُومِيَّةِ الَّتي سَرَقَتْ فَقَالُوا : منْ يُكَلِّمُ فيها رَسُولَ اللَّه صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم ، فَقَالُوا : وَمَنْ يَجْتَريءُ عَلَيْهِ إِلاَّ أُسَامَةُ بْنُ زَيدٍ، حِبُّ رسولِ اللَّهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم ،فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم:্রأَتَشْفَعُ في حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ تَعَالى ؟গ্ধ ثم قام فاحتطب ثُمَّ قَالَ : ্র إِنَّمَا أَهلَكَ الَّذينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهمْ كَانُوا إِذا سَرَقَ فِيهم الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ ، أَقامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فاطِمَةَ بِنْبتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتَ لَقَطَعْتُ يَدَهَا গ্ধمتفقٌ عليه .
“আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, কুরাইশ বংশের লোকেরা তাদের বংশীয় মাখযুম গোত্রের এক মহিলার ব্যাপারে চিনি-ত হয়ে পড়ল। যে মহিলা চুরি করছিল। কুরাইশরা বলল, কোন ব্যক্তি এ মহিলার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলতে পারে? তারাই বলল, যে উসামা বিন যায়েদ রাসূলের কাছে প্রিয়। সে এ ব্যাপারে তার সাথে কথা বলবে। উসামা মহিলাকে শানি- না দেয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আবেদন করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে তুমি আমার কাছে শুপারিশ করছ?” অথঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ালেন, বক্তব্যে বললেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের মধ্যে যখন প্রভাবশালী, বংশীয় লোক চুরি করত তাকে ছেড়ে দিত (বিচার না করে)। আর যখন দুর্বল ব্যক্তি চুির করত তখন তার উপর শাসি- প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমা চুরি করত, তাহলে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।” বর্ণনায়ঃ বুখারী ও মুসলিম।

লোকদের ধারনা ছিল, কুরাইশ হল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিজ বংশ। তার বংশের এক মহিলা চুরি করেছে। তাঁর কাছে শুপারিশ করলে হয়ত তিনি নিজের বংশ ও মহিলার সম্মানের দিক বিবেচনা করে শাসি- থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। কিন’ আল্লাহর রাসূল সাফ জানিয়ে দিলেন, বিচারে কোন পক্ষপাতিত্ব চলতে পারে না। বংশ তো পরের কথা, আমার কলিজার টুকরা ফাতেমা যদি চুরি করে তাহলে তার উপরও শাসি- প্রয়োগ করা হবে যথাযথভাবে। আর এ ধরনের অন্যায়-অবিচার ও আইন প্রয়োগ ও বিচারে বৈষম্য করা দেশ, জাতি ধ্বংশের একটি বড় কারণ।
আমাদের সমাজে আইন-প্রয়োগ, বিচার ও শাসি- প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য মুলক আচরণ ব্যাপক ভাবে দেখা যায়। যাদের টাকা-পয়সা, প্রভাব-প্রতিপত্তি বা দাপট আছে, তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ ও শাসি- এক ধরনের। এমনকি তাদের জন্য আদালত ও জেল ভি আই পি গোছের। আর যাদের তেমন কিছু নেই তাদের ক্ষেত্রে আইন ও শাসি-র প্রয়োগ হয় কঠোরের চেয়েও কঠোর। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যেন আগেকার যুগের রাজা-বাদশাদের রাজপুত্র আর রাজ-কন্যার মত। তারা সাতটি খুন করলেও তা খুন বলে ধরা হতো না। এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল অবরোধের নামে যত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, যত মানুষ পিটিয়ে মেরেছে, তার কি কোন একটিরও বিচার হয়েছে? কেহ কি এর বিচারের দাবী তুলেছে? এটাইতো জুলুম। এ জুলুমের জন্যইতো দেশ, জাতি ধ্বংস হয়ে যায় বলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন। ইতিহাসও তাই বলে।
যারা সংবাদ-পত্র বা বিভিন্ন মিডিয়াতে কাজ করেন, তাদের জন্য রয়েছে এ আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অনেক সময় দেখা যায় তারা সংবাদ পরিবেশনে ন্যায়নীতির ধার ধারে না। সত্য ও মিথ্যা বলতে যেন তাদের অভিধানে কিছু নেই। যা ইচ্ছা তা প্রচার করে অপরকে অপমানিত করতে তাদের বিবেক কোন বাধা দেয় না।
এমনকি অনেক আলেম-উলামাকে দেখা যায় যে, কোন তুচ্ছ বিষয়ে কারো সাথে মতভেদ হলে তারা তাদের বিরোধী পক্ষকে গালিগালাজ করেন। গোমরাহ, বিভ্রান-, মুর্খ, ইসলামের শত্রু ইত্যাদি বাক্য প্রয়োগ করতে দ্বিধা করে না। এটা আল্লাহর এ অসিয়তের চরম লংঘন। মানুষ যা বলে তার সব কিছুর ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জওয়াবদিহি করা হবে।

  • নবম অসিয়তঃ আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পুরণ করা

وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا
আল্লাহর সাথে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে
রব হিসাবে ও উপাস্য বা ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সাথে সকল ওয়াদা পুরণ করতে হবে। যে সকল বিষয় এ দশ অসিয়তের মধ্যে উল্লেখ করা হয়নি তার সকল এ নবম অসিয়তে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। যা কিছু আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা করা এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা বর্জন করা হল আল্লাহর সাথে ওয়াদা পুরণ। যেমন সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, চুরি করা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা হল আল্লাহর সাথে ওয়াদা।
এ আয়াতের চারটি অসিয়ত শেষে আল্লাহ তাআলা বললেন,
ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
“তোমাদেরকে তিনি অসিয়ত করলেন, তোমরা যেন মনে রেখ ও উপদেশ গ্রহণ কর।”

 

  • দশম অসিয়তঃ কাফেরদের পথ অনুসরণ না করা ও বেদআত বর্জন করা

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ.
আর এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রদর্শিত এ সরল পথ হল আস-সিরাতুল মুস্তাকীম। একমাত্র পথ, দ্বিতীয় কোন পথ নেই। নেই কোন বক্রতা, দ্বিমুখীতা বা পরস্পর বিরোধীতা। সত্য এ পথ একটাই। তাহলে আল-কুরআন ও সুন্নাহর পথ। যে পথ অনুসরণ করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম। আর বাতিল পথ ও মত হল অনেক। তাইতো আল্লাহ এ আয়াতে বললেন, “ভিন্ন পথগুলো অনুসরণ করবে না।”
হাদীসে এসেছে

عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال : إن رسول الله صلى الله عليه وسلم خط خطوطا بيده ثم قال هذا سبيل الله مستقيما وخطا عن يمينه وعن شماله ثم قال هذه السبل ليس منها إلا عليه شيطان يدعو إليه ثم قرأ وأن هذا صراطي مستقيما . . .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নিজ হাত দিয়ে একটি রেখা টানলেন, অতঃপর বললেন, “এটা হল আল্লাহর সরল পথ।” এরপর ডানে বামে অনেকগুলো রেখা টানলেন, অতঃপর বললেন, “এ গুলো হল বিভিন্ন পথ। এর প্রত্যেকটি পথে শয়তান আছে। সে এ পথের দিকে মানুষকে আহবান করতে থাকে। এরপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ.
আরই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।” বর্ণনায় : নাসায়ী, আহমাদ, দারামী

যেভাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুসরণ করেছেন, ঠিক সেভাবে যদি অনুসরণ না করা হয় তাহলেই সেটা হবে শয়তানের পথ। সেটা কখনো আস-সিরাতুল মুস্তাকীম বলে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আস-সিরাতুল মুস্তাকীম ব্যতীত যত পথ ও মত আছে সব বাতিল। এগুলো সাধারণত দু ধরনের : (ক) কাফের বা অমুসলিমদের পথ। (খ) ইসলামের নামে এমন আচার-আচরণ, অনুষ্ঠান, ইবাদত যা কুরআন বা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটা হল বেদআত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এ দশম অসিয়তে উভয় প্রকার বাতিল পথসমূহ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। যদি কাফেরদের অনুসরণ করা হয় তাহলেও আস-সিরাতুল মুস-াকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আবার যদি ইসলামের মধ্যে অবস’ান করে কেহ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কাজ বা আচার-অনুষ্ঠান ধর্মীয় আচার হিসাবে পালন করে তাহলে আস-সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। উভয় পথই শয়তানের পথ।
এ বেদআত সম্পর্কে আল্লার রাসূল বহু হাদীসে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। বেদআতের শাস্তি উল্লেখ করেছেন।
ঈমান ও ইসলাম অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটো নেআমাত মুসলমানদের। এ দশটি অসিয়তের প্রথমটিতে আল্লাহ তাআলা শিরক বর্জন করতে বলেছেন। শিরক বর্জন করলে ঈমানের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। আর সর্বশেষ অসিয়তে বেদআত বর্জন করতে বলেছেন। বেদআত বর্জন করলে ইসলামের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। ধর্মে বেদআত প্রবেশ করার কারণে ধর্ম, অধর্মে পরিণত হয়ে যায়। খৃষ্ট ধর্ম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তেমনি ইসলামে যদি বেদআত প্রচলন করা হয় তাহলে ইসলামের মূল রূপ চলে যায়।
বেদআত কাকে বলে ?
যে বিশ্বাস বা কাজ আল্লাহ বা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীনে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করেননি কিংবা পালন করতে নির্দেশ দেননি সে ধরনের বিশ্বাস ও কাজকে ধর্মের অন্তর্ভুক্ত মনে করা, তা করলে সওয়াব হবে বলে বিশ্বাস করা ও পালন করার নাম হল বেদআত। আলোচ্য এ তিনটি আয়াত বর্ণনা কালে প্রথম আয়াত শেষে আল্লাহ বললেন, ‘যাতে তোমরা অনুধাবন কর।’
দ্বিতীয় আয়াত শেষে বললেন, ‘যাতে তোমরা মনে রাখ ও উপদেশ গ্রহণ কর।’ তৃতীয় আয়াত শেষে বললেন, ‘যাতে তোমরা মুত্তাকী বা আল্লাহর ব্যাপারে সাবধানী হও।’
তাই বলা যায় প্রথমে বুঝতে ও শিখতে হবে। তারপরে মনে রাখার জন্য ও বাস-বায়ন করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। তারপর ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে।
এ আয়াতসমূহে বর্ণিত দশ অসিয়ত সম্পর্কে হাদীসে আরো এসেছেঃ
عن عبادة بن الصامت قال: قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم: (أيكم يبايعني على هؤلاء الآيات الثلاث، ثم تلا: (قل تعالوا أتل ما حرم ربكم) إلى ثلاث آيات، ثم قال: (من وفى بهن فأجره على الله، ومن انتقص منهن شيئاً فأدركه الله في الدنيا كانت عقوبته، ومن أخره إلى الآخرة كان أمره إلى الله إن شاء آخذه وإن شاء عفا عنه).
উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে আছে এ তিন আয়াতের বিষয়ে আমার হাতে বাইয়াত (শপথ) নেবে। এরপর তিনি এ আয়াত তিনটি পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন, যে ব্যক্তি এ অসিয়তগুলো পালন করবে তার পুরস্কার আছে আল্লাহর কাছে। আর যে এর কোনটিতে শিথিলতা করবে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতেই শাসি- দিতে পারেন। আর যদি তিনি আখেরাত পর্যন- শাসি-কে বিলম্বিত করেন, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছা তিনি শাসি- দেবেন বা ক্ষমা করবেন।” (তাফসীর ইবনে কাসীর)
এ তিনটি আয়াতে যে দশটি হারাম বর্ণনা করা হলো তা মনে রাখার সুবিধার্থে সংক্ষেপে এ রকম বলা যায়ঃ

এক. আল্লাহর সাথে শিরক করা
দুই. মাতা পিতার অবাধ্য আচরণ করা
তিন. দারিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা করা
চার. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা
পাঁচ. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা
ছয়. ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস করা
সাত. মাপে ওযনো কম দেয়া
আট. অন্যায় বিচার-ফয়সালা ও অন্যায় কথা বলা
নয়. আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদাসমূহ পূরণ না করা
দশ. কাফেরদের অনুসরণ ও বিদআতে লিপ্ত হওয়া
এ দশটি হারাম কাজ,কবীরা গুনাহ সন্দেহ নেই। এর সমমানের আরো যে সকল কবীরা গুনাহ বা মারাত্নক পাপ আছে তা হলো : সূদ খাওয়া, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, যাদু করা, সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। এগুলোকে হাদীসে মুহলিকাত বা ধ্বংসাত্নক পাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে।