বিপদে ধৈর্যধারণ : দশটি উপদেশ(২)

বিপদে ধৈর্যধারণ : দশটি উপদেশ

সানাউল্লাহ বিন নজির আহমদ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

. মুসিবত পুণ্যবাণ হওয়ার আলামত

মুসিবত পুণ্যবাণ হওয়ার আলামত, মহত্বের প্রমাণ। এটাই বাস্তবতা। একদা সাহাবী সাদ বিন ওয়াক্কাস রা. রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রসূল, দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত কে? উত্তরে তিনি বলেন :

الأنبياء ثم الأمثل، فالأمثل، فيبتلى الرجل على حسب دينه، فإن كان دينه صلبا اشتد بلاؤه، وإن كان في دينه رقة ابتلي على حسب دينه، فما يبرح البلاء بالعبد حتى يتركه يمشي على الأرض ما عليه خطيئة. (الترمذي : 2322)

“নবীগণ, অতঃপর যারা তাদের সাথে কাজ-কর্ম-বিশ্বাসে সামঞ্জস্যতা রাখে, অতঃপর যারা তাদের অনুসারীদের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে। মানুষকে তার দ্বীন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। দ্বীনি অবস্থান পাকাপোক্ত হলে পরীক্ষা কঠিন হয়। দ্বীনি অবস্থান দুর্বল হলে পরীক্ষাও শিথিল হয়। মুসিবত মুমিন ব্যক্তিকে পাপশূন্য করে দেয়, এক সময়ে দুনিয়াতে সে নিষ্পাপ বিচরণ করতে থাকে।” [তিরমীজিঃ ২৩২২]

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

من يرد الله به خيرا يصب منه. (البخاري : 5213، ومسلم : 778)

“আল্লাহ যার সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তার থেকে বাহ্যিক সুখ ছিনিয়ে নেন।” [বুখারী ও মুসলিম]

তিনি আরো বলেন :

وإن الله إذا أحب قوما ابتلاهم. ( الترمذي : 2320، ابن ماجه : 4021)

“আল্লাহ তাআলা যখন কোন সমপ্রদায়কে পছন্দ করেন, তখন তাদেরকে বিপদ দেন ও পরীক্ষা করেন।” [তিরমীজী, ইবনে মাজাহ]


. মুসিবতের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদানের কথা স্মরণ

মোমিনের কর্তব্য বিপদের মুহূর্তে প্রতিদানের কথা স্মরণ করা। এতে মুসিবত সহনীয় হয়। কারণ কষ্টের পরিমাণ অনুযায়ী সওয়াব অর্জিত হয়। সুখের বিনিময়ে সুখ অর্জন করা যায় না- সাধনার ব্রিজ পার হতে হয়। প্রত্যেককেই পরবর্তী ফলের জন্য নগদ শ্রম দিতে হয়। ইহকালের কষ্টের সিঁড়ি পার হয়ে পরকালের স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। এরশাদ হচ্ছে :

إن عظم الجزاء مع عظم البلاء. (الترمذي : 2320)

“কষ্টের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিদান প্রদান করা হয়।” [তিরমীজীঃ ২৩২০]

একদা আবু বকর রা. ভীত-ত্রস্ত হালতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর কীভাবে অন্তরে স্বস্তি আসে?

لَيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَا أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا ﴿النساء:123﴾

“না তোমাদের আশায় এবং না কিতাবীদের আশায় (কাজ হবে)। যে মন্দকাজ করবে তাকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আর সে তার জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।”[সুরা নিসাঃ ১২৩]

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

غفرالله لك يا أبا بكر! ألست تمرض؟ ألست تنصب؟ ألست تحزن؟ ألست تصيبك اللأواء؟

“হে আবু বকর, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন, তুমি কি অসুস্থ হও না? তুমি কি বিষণ্ন্ন হও না? মুসিবত তোমাকে কি পিষ্ট করে না? উত্তর দিলেন, অবশ্যই। বললেন :

فهو ما تجزون به. (المسند : من حديث أبي بكر : 68)

“এগুলোই তোমাদের অপরাধের কাফফারা-প্রায়শ্চিত্ত।” [আল মুসনাদ মিন হাদিসে আবি-বকরঃ ৬৮]

আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীল বিপদগ্রস্তদের জন্য উত্তম প্রতিদান তৈরী করেছেন, বালা-মুসিবতগুলো গুনাহের কাফফারা ও উচ্চ মর্যাদার সোপান বানিয়েছেন। আরো রেখেছেন যথার্থ বিনিময় ও সন্তোষজনক ক্ষতিপূরণ।

জান্নাতের চেয়ে বড় প্রতিদান আর কি হতে পারে! এ জান্নাতেরই ওয়াদা করা হয়েছে ধৈর্য্যশীলদের জন্য। যেমন মৃগী রোগী মহিলার জন্য জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে- ধৈর্য্যধারণের শর্তে। আতা বিন আবি রাবাহ বর্ণনা করেন, একদা ইবনে আব্বাস রা. আমাকে বলেন, আমি কি তোমাকে জান্নাতি মহিলা দেখাবো? আমি বললাম অবশ্যই। তিনি বললেন, এই কালো মহিলাটি জান্নাতি। ঘটনাটি এরূপ- একবার সে রসূল সা.-এর নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রসূল আমি মৃগী রোগী, রোগের দরুন ভূপাতিত হয়ে যাই, বিবস্ত্র হয়ে পরি। আমার জন্য দোয়া করুন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

إن شئت صبرت ولك الجنة، وإن شئت دعوت الله أن يعافيك. (البخاري : 5220، ومسلم : 4673)

“ইচ্ছে করলে ধৈর্যধারণ করতে পার, বিনিময়ে জান্নাত পাবে, আর বললে সুস্থ্যতার জন্য দোয়া করে দেই।” সে বলল, আমি ধৈর্যধারণ করব। তবে আমি বিবস্ত্র হয়ে যাই, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যাতে বিবস্ত্র না হই। অতঃপর তিনি তার জন্য দোয়া করে দেন।” [বুখারীঃ ৫২২০, মুসলিমঃ ৪৬৭৩]

অনুরূপ জান্নাতের নিশ্চয়তা আছে দৃষ্টিহীন ব্যক্তির জন্য। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

إن الله قال : إذا ابتليت عبدي بحبيبتيه فصبر عوضته منهما الجنة. (البخاري : 5221)

“আল্লাহ তাআলা বলেছেন : আমি যখন আমার বান্দাকে দুটি প্রিয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করি, আর সে ধৈর্যধারণ করে, বিনিময়ে আমি তাকে জান্নাত দান করি।”[বুখারীঃ ৫২২১]

আরো জান্নাতের ওয়াদা আছে, প্রিয় ব্যক্তির মৃত্যুতে ধৈর্য্যধারণকারীর জন্য। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :

ما لعبدي المؤمن عندي جزاء إذا قبضت صفيه من أهل الدنيا ثم احتسبه إلا الجنة. (البخاري : 5944)

“আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি যখন আমার মুমিন বান্দার অকৃত্রিম ভালোবাসার পাত্রকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই। এবং তাতে সে ধৈর্য্যধারণ করে, ছওয়াবের আশা রাখে, আমার কাছে তার বিনিময় জান্নাত বৈ কি হতে পারে?”[বুখারীঃ ৫৯৯৪]

অর্থাৎ নিশ্চিত জান্নাত।

সন্তান হারাদেরও আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। কারণ তিনি বান্দার প্রতি দয়ালু, তার শোক-দুঃখ জানেন। যেমন: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তিন সন্তান দাফনকারী মহিলাকে। তিনি তাকে বলেন- “তুমি জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধকারী মজবুত ঢাল বেষ্টিত হয়ে গেছ।” ঘটনাটি নিম্নরূপ : সে একটি অসুস্থ বাচ্চা সাথে করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসে, এবং বলে হে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। ইতিপূর্বে আমি তিন জন সন্তান দাফন করেছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে নির্বাক : دفنت ثلاثة؟! “তিন জন দাফন করেছ!” সে বলল- হ্যাঁ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :

لقد احتظرت بحظار شديد من النار. (مسلم : 4770)

“তুমি জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধকারী মজবুত প্রাচীর ঘেরা সংরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করেছ।” [মুসলিমঃ ৪৭৭০]

অন্য হাদীসে আছে :

أيما مسلمين مضى لهما ثلاثة من أولادهما، لم يبلغوا حنثا كانوا لهما حصنا حصينا من النار.

“সাবালকত্ব পাওয়ার আগে মৃত তিন সন্তান- তাদের মুসলিম পিতা-মাতার জন্য জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধকারী মজবুত ঢালে পরিনত হবে।”

আবুযর রা. বলেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দু’জন মারা গেছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :واثنان، “দুজন মারা গেলেও।” উস্তাদুল কুররা আবুল মুনজির উবাই রা. বলেন : হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার একজন মারা গেছে, তিনি বললেন :

وواحد، وذلك في الصدمة الأولى. (المسند من حديث عبد الله مسعود : 4314)

“একজন মারা গেলেও। তবে মুসিবতের শুরুতেই ধৈর্য্যধারণ করতে হবে।” [মুসনাদে আহমাদঃ ৪৩১৪]

মাহমুদ বিন লাবিদ জাবির রা. থেকে বর্ণনা করেন : আমি রসূল সা.-কে বলতে শুনেছি :

من مات له ثلاثة من الولد فاحتسبهم دخل الجنة،

“সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, যার তিনজন সন্তান মারা যায় এবং সে তাদের পূণ্য জ্ঞান করে।”

তিনি বলেন : আমরা জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার দু’জন মারা যায়? বললেন :

واثنان. (المسند من حديث جابر بن عبد الله : 14285)

“দু’জন মারা গেলেও।” মাহমুদ বলেন : আমি জাবের রা.- কে বললাম, আমার মনে হয় আপনারা যদি একজনের কথা বলতেন, তাহলে তিনি একজনের ব্যাপারেও হাঁ বলতেন। তিনি সায় দিয়ে বলেন : আমিও তাই মনে করি।” [মুসনাদে আহমাদঃ ১৪২৮৫]

শোক সন্তপ্ত পিতা-মাতার জন্য আরেকটি হাদিস। আশা করি এর দ্বারা সান্ত্বনা লাভ হবে, দুঃখ ঘুচে যাবে। এরশাদ হচ্ছে :

إذا مات ولد العبد قال الله لملائكته: قبضتم ولد عبدي؟ فيقولون: نعم، فيقول: قبضتم ثمرة فؤاده؟ فيقولون : نعم، فيقول : ماذا قال عبدي؟ فيقولون : حمدك واسترجع، فيقول الله : ابنوا لعبدي بيتا في الجنة، وسموه بيت الحمد. (الترمذي : 942)

“যখন বান্দার কোন সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তাআলা ফেরেস্তাদের বলেন : তোমরা আমার বান্দার সন্তান কেড়ে নিয়ে এসেছো? তারা বলে হ্যাঁ। তোমরা আমার বান্দার কলিজার টুকরো ছিনিয়ে এনেছো? তারা বলে হ্যাঁ। অতঃপর জিজ্ঞাসা করেন, আমার বান্দা কি বলেছে? তারা বলে, আপনার প্রসংশা করেছে এবং বলেছে আমরা আল্লাহ তাআলার জন্য এবং তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করব। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দার জন্য একটি ঘর তৈরী কর এবং তার নাম দাও বায়তুল হামদ্‌ বা প্রশংসার ঘর বলে।” [তিরমীজীঃ ৯৪২]

উপরন্তু ওই অসম্পূর্ণ বাচ্চা, যা সৃষ্টির পূর্ণতা পাওয়ার আগেই মায়ের পেট থেকে ঝড়ে যায়, সেও তার মায়ের জান্নাতে যাওয়ার উসিলা হবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

والذي نفسي بيده إن السقط ليجر أمه بسرره إلى الجنة، إذا احتسبته. (ابن ماجه :1598)

“ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, অসম্পূর্ণ বাচ্চাও তার মাকে আচঁল ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। যদি সে তাকে পূণ্য জ্ঞান করে থাকে।” [ইবনে মাজাহঃ ১৫৯৮]

বিশুদ্ধ হাদীসে এ ধরনের বিপদাপদকে গুনাহের কাফফার বলা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে :

ما من مسلم يصيبه أذى، شوكة فما فوقها إلا كفر الله بها سيئاته، كما تحط الشجرة ورقها. (البخاري : 5215، ومسلم : 4663)

“যে কোন মুসলমান কাঁটা বা তারচে’ সামান্য বস্তুর দ্বারা কষ্ট পায়, আল্লাহ তার বিনিময়ে প্রচুর গুনাহ ঝড়ান- যেমন বৃক্ষ বিশেষ মৌসুমে স্বীয় পত্র-পল্লব ঝড়িয়ে থাকে।” [বুখারী, মুসলিম]

আরেকটি বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে :

ما يصيب المسلم من نصب، ولا وصب، ولا هم، ولاحزن، ولا أذى، ولاغم, حتى الشوكة يشاكها إلا كفر الله بها من خطاياه. (البخاري : 5210)

“মুসলমানদের কষ্ট-ক্লেশ, চিন্তা-হতাশা আর দুঃখ-বিষাদ দ্বারা আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন। এমনকি শরীরে যে কাঁটা বিঁধে তার বিনিময়েও আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন।” [বুখারী]

আরো এরশাদ হচ্ছে :

ما يزال البلاء بالمؤمن والمؤمنة في نفسه وولده وماله، حتى يلقى الله وما عليه خطيئة. (الترمذي : 2323)

“মুমিন নর-নারীরা নিজের, সন্তানের বা সম্পদের মাধ্যমে সর্বদা বিপদগ্রস্ত থাকে। যতক্ষণ না সে আল্লাহর সাথে নিষ্পাপ সাক্ষাৎ করে।” [তিরমীজীঃ ৯৪২]

মুসিবত মর্যাদার সোপান। কারণ ধৈর্য্যের মাধ্যমে অতটুকু সফলতা অর্জন করা যায়। যা আমল বা কাজের দ্বারা করা যায় না। মুসনাদে ইমাম আমহদে বর্ণিত আছে :

إذا سبقت للعبد من الله منزلة لم يبلغها بعمله ابتلاه الله في جسده أو في ماله أو في ولده، ثم صبره، حتى يبلغه المنزلة التي سبقت له منه. (مسند : 22338)

“আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দার মর্যাদার স্থান পূর্বে নির্ধারণ করে দেন, আর সে আমল দ্বারা ওই স্থান লাভে ব্যর্থ হয়, তখন আল্লাহ তার শরীর, সম্পদ বা সন্তানের ওপর মুসিবত দেন এবং ধৈর্যের তওফিক দেন। এর দ্বারা সে নির্ধারিত মর্যাদার উপযুক্ত হয়ে।” [মুসনাদে আহমাদঃ ২২৩৩৮]

একদা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করেন :

ما تعدون الرقوب فيكم؟

“তোমরা কাকে নিঃসন্তান মনে কর? তারা বলল : যার কোন সন্তান হয় না। তিনি বললেন :

ليس ذاك بالرقوب، ولكنه الرجل الذي لم يقدم من ولده شيئا. (مسلم : 4722)

“সে নয়। বরং সে, যার মৃত্যুর পূর্বে তার কোন সন্তানের মৃত্যু হল না।” [মুসলিমঃ ৪৭২২]

অর্থাৎ পার্থিব জগতে সন্তানাদি আমাদের বার্ধক্যের সম্বল যার সন্তান নেই সে যেন নিঃসন্তান। তদ্রুপ পর জগতের সম্বল মৃত সন্তান। যার সন্তান মারা যায়নি সে প্রকৃত- পরজগতের- নিঃসন্তান। এতে আমরা সন্তানহারা পিতা-মাতার প্রতিদান অনুমান করতে পারি। সন্তান বিয়োগের মুসিবত কল্যাণকর, এর বিনিময়ে অর্জিত হয় জান্নাত।

মুসিবতের পশ্চাতে আছে কল্যাণ, উত্তম বিনিময়। যার কোন প্রিয় বস্তু হারায়, সে এর পরিবর্তে অধিক প্রিয় বস্তু প্রাপ্ত হয়। অনেক সময় এক সন্তান মারা গেলে, তারচে’ ভাল দ্বিতীয় সন্তান প্রদান করা হয়। দুঃখের আড়ালে সুখ বিদ্যমান। উম্মে ছালামা বর্ণনা করেন, আমি রসূল সা.কে বলতে শুনেছি :

ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله : إنا لله وإنا إليه راجعون، اللهم أجرني في مصيبتي، وأخلف لي خيرا منها، إلا أخلف الله له خيرا منها. (مسلم : 1525)

“যে কোন মুসলমান মুসিবত আক্রান্ত হয় এবং বলে- আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, তুমি আমার এ মুসিবতের প্রতিদান দাও এবং এর চে’ উত্তম জিনিস দান কর। আল্লাহ তাকে উত্তম জিনিস দান করেন।” তিনি বলেন : যখন আবু ছালামা মারা যায়, আমি ভাবলাম মুসলমানের ভেতর কে আছে যে, আবু ছালামা থেকে উত্তম? সর্বপ্রথম তার পরিবার রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হিজরত করে আসে। তবুও বলার জন্য বললাম, আল্লাহ তাআলা আমাকে আবু সালামার পরিবর্তে রসূল সা.-কে প্রদান করেন। যিনি আবু সালামা থেকে উত্তম। [মুসলিমঃ ১৫২৫

কতক সন্তানের মৃত্যুতে পিতা-মাতার নানাবিধ কল্যাণ নিহিত থাকে। হতে পারে তাকদির অনুযায়ী এ ছেলেটি বেঁচে থাকলে পিতা-মাতার কষ্টের কারণ হত। যেমন খিজির আলাইহিস সালাম এর ঘটনায় বর্ণিত বাচ্চার অবস্থা। অনেক সময় পিতা-মাতার ধৈর্যধারণ, মৃত সন্তানকে পূণ্য জ্ঞান করণ উত্তম প্রতিদানের কারণ হয়। যেমন উম্মে ছালামার ঘটনা। কখনো আগন্তুক শুভানুধ্যায়ীদের দোয়া লাভ হয়। যেমন তারা বলেন, “হে আল্লাহ! তুমি তাদের উত্তম বিনিময় দান কর। তাদের ক্ষতস্থান পূর্ণ কর। তার পরিবর্তে উত্তম বস্তু দান কর।” যার ফলে তার জীবিত অন্যান্য ভাইরা সংশোধন ও অধিক তওফিক প্রাপ্ত হয়। পিতা-মাতা অধিক আনুগত্যশীল সুসন্তান প্রাপ্ত হয় ।

. বালামুসিবতের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকা

যার ওপর দিয়ে কোন মুসিবত বয়ে যায়, তার উচিত এর স্মৃতিচারণ বা পুনরাবৃত্তি না করা। যখন মনে বা স্মৃতি পটে চলে আসে, সাধ্যমত এড়িয়ে যাওয়া। পুনঃপুন বৃদ্ধি বা লালন না করা। কারণ এর ভেতর বিন্দু পরিমাণ লাভ নেই। উপরন্তু ধৈর্য্য ছাড়া কোন উপায়ও নেই। বরং এ নিয়ে কল্পনা-জল্পনা করা দৈন্যদের কাজ, তাদের মূলপুঁজি। দ্বিতীয়ত যে চলে গেছে, সে কখনো ফিরে আসবে না। যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে তা পাল্টাবে না।

উমর রা. এর একটি উপদেশ :

لا تستفزوا الدموع بالتذكر.

“তোমরা স্মৃতিচারণ করে চোখের পানি উছলে তুলো না।”

অধিকাংশ প্রিয়জনহারা শোকাতুর লোক মৃত ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতি মুহূর্ত মৃত ব্যক্তির স্মরণে সে ব্যস্ত থাকে। শোক-দুঃখ মোচনের পথে যা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

. একাকীত্ব নিঃসঙ্গতা বর্জন

শোকাতুর ব্যক্তির একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা পরিহার করা উচিত। কেননা সংশয় প্রবঞ্চনা নিঃসঙ্গ-অবসর ব্যক্তির পিছু নেয়। নিঃসঙ্গদের ওপর শয়তান অধিক কূটকৌশল ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

কল্যাণকর ও অর্থবহ কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। অটল থাকতে হবে পূর্ব নির্ধারিত নিজ সিদ্ধান্তে। নিয়মিত তেলাওয়াত, দু’আ-দরুদ, নামায ইত্যাদিতে মশগুল থাকতে হবে। এসবকেই অন্তরঙ্গ বন্ধু ও নিত্যসঙ্গি বানিয়ে নিতে হবে। কারণ আল্লাহর যিকিরের মালেঝই নিহিত রয়েছে আত্মিক প্রশান্তি।

১০. আপত্তি অভিযোগ অস্থিরতা ত্যাগ করা

যে কোন বিপদাপদের সময় অসহিষ্ণুতা ও আপত্তি-অভিযোগ পরিহার করা। এটাই সান্ত্বনার শ্রেয়পথ। শান্তির উপায়-উপলক্ষ। যে এর থেকে বিরত থাকবে না, তার কষ্ট ও অশান্তি দ্বিগুন হবে। বরং সে নিজেই নিজ শান্তি বিনাশকারী-নিঃশেষকারী। কোন অর্থেই তার জন্য ধৈর্য্য প্রযোজ্য হবে না, মুসিবত থেকে নাজাতও পাবে না। কারণ ধৈর্য যদি হয় বিপদাপদ মূলোৎপাটনকারী, অধৈর্য্যতা তার পৃষ্ঠপোষকতা-দানকারী। যার বিশ্বাস আছে, নির্ধারিত বস্তু নিশ্চিত হস্তগত হবে, নির্দিষ্ট বস্তু নিশ্চিত অর্জিত হবে, তার ধৈর্য্য পরিহার করা নিরেট বিড়ম্বনা আরেকটি মুসিবত। আল্লাহ তাআলা বলেন :

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ. لِكَيْ لَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آَتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ﴿الحديد:22-23﴾

“যমীনে এবং তোমাদের নিজদের মধ্যে এমন কোন মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ। যাতে তোমরা আফসোস না কর তার উপর যা তোমাদের থেকে হারিয়ে গেছে এবং তোমরা উৎফুল্ল না হও তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তার কারণে। আর আল্লাহ কোন উদ্ধত ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।” [সুরা হাদিদঃ ২২-২৩]

বর্ণিত আছে, জনৈক যাযাবর শহরে প্রবেশ করে একটি বাড়িতে চিৎকারের আওয়াজ শোনে জিজ্ঞাসা করল, এটা কিসে আওয়াজ? তাকে বলা হল, তাদের একজন লোক মারা গেছে। সে বলল, আমার মনে হচ্ছে : তারা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছে, তার সিদ্ধান্তে বিরক্তি প্রকাশ করছে এবং সওয়াব বিনষ্ট করছে।

মনে রাখা প্রয়োজন! অস্থিরতা হারানো বস্তু ফিরিয়ে আনতে পারে না, বরং তা হিতকামনাকারীকে দুঃখিত ও অশুভ কামনাকারীকে আনন্দিত করে। সাবধান! মুসিবতের দুঃখের সাথে হতাশার নৈরাশ্য সংযোজন করো না। কারণ উভয়ের সঙ্গে ধৈর্যের সহাবস্থান হয় না। এমন বিপরীতধর্মী জিনিস অন্তরও গ্রহণ করে না। এ জন্য বলা হয়, “ধৈর্য্যের মুসিবত, সবচে’ বড় মুসিবত।” কথিত আছে, জনৈক দম্পতির খুব আদরের এক সন্তান মারা যায়, স্বামী স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আল্লাহকে ভয় কর, ছওয়াবের আশা রাখ, ধৈর্য্যধারণ কর। সে উত্তরে বলে, আমি যদি ধৈর্য্যকে হতাশার মাধ্যমে নষ্ট করে দেই। তাহলে এটাই হবে সবচে’ বড় মুসিবত।

কথায় আছেঃ “জ্ঞানী ব্যক্তি মুসিবতের সময় সে কাজ করে, যা আহমক একমাস পরে করে। অবশেষে যখন ধৈর্য ধরতেই হয় আর এতে মানুষ ভালও জানে না। তাহলে শুরুতেই তো ধৈর্য্যধারণ করা কত ভাল- যা নির্বোধেরা একমাস পর করে থাকে।”

সম্ভব ও সাধ্যের নাগালের জিনিস গ্রহণ করেই ধৈর্য্যধারণকারীদের মর্যাদা লাভ করা যায়। যেমন হাতাশা না করা, কাপড় না ছিড়া, গাল না চাপড়ানো, অভিযোগ না করা, মুসিবত প্রকাশ না করা, খাওয়া-দাওয়া ও পরিধানের অভ্যাস স্বাভাবিক রাখা, আল্লাহ তাআলার ফায়সালাতে সন্তুষ্ট থাকা- এ বিশ্বাস করে, যা ফেরত নেয়া হয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে আমানত ছিল। এবং সে পদ্ধতি গ্রহণ করা, যা উম্মে সুলাইম রা. গ্রহণ করেছিলেন।

বর্ণিত আছে : তাদের একটি ছেলে মারা গেলে, আপন স্বামী আবু তালহাকে তিনি এ বলে সান্ত্ব্তনা দেন যে, কোন সমপ্রদায় যদি কোন দম্পতির নিকট একটি আমানত রাখে, অতঃপর তারা তাদের আমানত ফেরৎ নিয়ে নেয়, তাহলে আপনি সেটা কোন দৃষ্টিতে দেখবেন? তাদের নিষেধ করার কোন অধিকার আছে কি? উত্তর দিলেন, না। বললেন, আপনার ছেলেকে সে আমানত গণ্য করুন। তাকে হারানো পূণ্য জ্ঞান করুন।

এ ঘটনা অবহিত হয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

بارك الله لكما في غابر ليلتكما. ( مسلم : 4496)

“আল্লাহ তাআলা তোমাদের গত রাতে বরকত দান করুন।” [মুসলিমঃ ৪৯৯৬]

সর্বশেষ বলি, ধৈর্য্য ধৈর্য্যধারণকারীকে প্রশান্তি এনে দেয়, মুসিবতের পরিবর্তে পূণ্য এনে দেয়। অতএব স্বাচ্ছায়ধৈর্যধারণ করাই ভাল। অন্যথায় অযথা পেরেশান হয়ে, ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য হবে। তাই বলা হয় “যে জ্ঞানীর মত ধৈর্যধারণ না করে, সে চতুষ্পদ জন্তুর মত যন্ত্রণা সহ্য করে।” আলী রা. বলেন :

إنك إن صبرت جرى عليك القلم وأنت مأجور، وإن جزعت جرى عليك القلم وأنت مأزور.

“যদি তুমি ধৈর্যধারণ করো, তাহলে তোমার ওপর তকদির বর্তাবে, তবে তুমি নেকি লাভ করবে। পক্ষান্তরে যদি ধৈর্যহারা হও, তাহলেও তোমার উপর তকদির বর্তাবে, তবে তুমি গুনাহ্‌গার হবে।” [আদাবু দুনিয়া ওয়া দ্বীন]

ওমর রা. বলেন :

إنا وجدنا خير عيشنا الصبر.

“আমরা উত্তম জীবনের বাহন হিসেবে ধৈর্যকেই পেয়েছি।”

আলী রা. থেকে বর্ণিত:

اعلموا أن الصبر من الإيمان بمنزلة الرأس من الجسد. ألا إنه لا إيمان لمن لا صبر له.

“স্মরণ রেখ মাথা যেমন শরীরের অংশ, তদ্রূপ ধৈর্যও ইমানের অংশ। আরো স্মরণ রাখ, যার ধৈর্য নেই, তার ইমানও নেই।”

হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

ما تجرع عبد جرعة أعظم من جرعة حلم عند الغضب، وجرعة صبر عند المصيبة.

“ক্রোধের সময় সহনশীলতার ঢোক এবং মুসিবতের সময় ধৈর্যের ঢোকের চেয়ে বড় ঢোক কেহ গলধকরণ করেনি।”

উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন :

ما أنعم الله على عبد نعمة فانتزعها منه، فعاضه مكانها الصبر إلا كان ما عوضه خيرا مما انتزعه.

“আল্লাহ তাআলা যদি কাউকে নেয়ামত দিয়ে পুনরায় নিয়ে নেন এবং বিনিময়ে ধৈর্য দান করেন, তাহলে বলতে হবে, দানকৃত বস্তুই উত্তম, নিয়ে নেয়া বস্তু থেকে।”

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রকৃত ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদের জন্য তিনিই যথেষ্ট, তিনিই আমাদের অভিভাবক।