বিদ্আত পরিচিতির মূলনীতি-১

বিদ্আত পরিচিতির মূলনীতি

ডঃ মঞ্জুরে ইলাহী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা যিনি আমাদেরকে সত্যপথের দিকে হিদায়াত দিয়েছেন। সালাত ও সালাম পেশ করছি মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম এর উপর যিনি সুন্নাত ও বিদ‘আত সম্পর্কে উম্মতকে সম্যক দিক নির্দেশনা দান করেছেন এবং সালাম পেশ করছি তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কিরামের উপরও।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুসরণের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মুসলিম মাত্রই অবহিত। সুন্নাতের বিপরীত মেরুতে অবস্থান হচ্ছে বিদ‘আতের। সে কারণেই বিদ‘আত থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব এবং বিদ‘আতে লিপ্ত হওয়া হারাম। বর্তমান সমাজের চালচিত্রে বিদ‘আতের প্রচলন আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্নাত ও বিদ‘আত উভয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে পর্যাপ্ত জ্ঞানের যথেষ্ট অভাবই মূলত এর কারণ। সুন্নাত মনে করেই বহু মানুষ বিদ‘আতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ ভুল ধারণার কারণে বিদ‘আত থেকে মুক্তিলাভ হয়ে পড়ে আরো দুরূহ। বিদ‘আতকে সহজে চিহ্নিত করার জন্য তাই প্রয়োজন এ সম্পর্কিত মৌলিক ও সাধারণ নীতিমালা সম্পর্কে অবগত হওয়া। আল্লাহ আমাদের সকলের ভাল কথা ও কাজ কবুল করুন। আমীন!!

আল্লাহ্‌র নিকট ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। আল-কুরআনে তিনি বলেন,

﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ ﴾ [ال عمران: ٨٥]

‘‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অনুসন্ধান করে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না’’।[1]

এ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার ঘোষণাও আল্লাহ্ আল-কুরআনে দিয়েছেন,

﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٣]

‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’’[2]

এ ঘোষণার পর আল-কুরআন ও সুন্নাহ্‌র বাইরে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন বিষয় সংযোজিত হওয়ার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেল এবং বিদ‘আত তথা নতুন যে কোনো বিষয় দ্বীনী আমল ও আকীদা হিসেবে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়াও হারাম হয়ে গেল। এ আলোচনায় বিদ‘আতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি কিভাবে আমাদের সমাজে প্রচলিত বিদ‘আতগুলোকে সনাক্ত করা যায় সে সম্পর্কিত মূলনীতি তুলে ধরা হবে।

  • বিদআতের সংজ্ঞা :

বিদ‘আত শব্দের আভিধানিক অর্থ হল:

اَلشَّيْءُ الْمُخْتَرَعُ عَلٰى غَيْرِ مِثَالٍ سَابِقٍ

অর্থাৎ পূর্ববর্তী কোন নমুনা ছাড়াই নতুন আবিষ্কৃত বিষয়।[3]

আর শরীয়তের পরিভাষায়-

مَا أُحْدِثَ فِى دِيْنِ اللهِ وَلَيْسَ لَهُ أَصْلٌ عَامٌ وَلاَخَاصٌّ يَدُلُّ عَلَيْهِ

অর্থাৎ আল্লাহ্‌র দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই।[4]

এ সংজ্ঞাটিতে তিনটি বিষয় লক্ষণীয় :

  • ১. নতুনভাবে প্রচলন অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না।
  • ২. এ নব প্রচলিত বিষয়টিকে দ্বীনের মধ্যে সংযোজন করা এবং ধারণা করা যে, এটি দ্বীনের অংশ।
  • ৩. নব প্রচলিত এ বিষয়টি শরীয়তের কোন ‘আম বা খাস দলীল ছাড়াই চালু ও উদ্ভাবন করা।

সংজ্ঞার এ তিনটি বিষয়ের একত্রিত রূপ হল বিদ‘আত, যা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ শরীয়তে এসেছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞার এ বিষয়টি হাদীসে বারবার উচ্চারিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বলেছেন,

«وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُوْرِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ» رواه أبو داود والترمذى وقال حديث حسن صحيح.

‘‘তোমরা (দ্বীনের) নব প্রচলিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয় বিদআ‘ত এবং প্রত্যেক বিদ‘আত ভ্রষ্টতা’’।[5]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম তাঁর এক খুতবায় বলেছেন:

إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُوْرِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلُّ ضَلاَلَةٍ فِي النَّارِ. رواه مسلم والنسائى واللفظ للنسائى.

‘‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আত হল ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।[6]

  • বিদআতের বৈশিষ্ট্য :

বিদ‘আতের চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে :

  • ১. বিদ‘আতকে বিদ‘আত হিসেবে চেনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোন দলীল পাওয়া যায় না; তবে তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মূলনীতিগত ‘আম ও সাধারণ দলীল পাওয়া যায়।
  • ২. বিদ‘আত সবসময়ই শরীয়তের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও মাকাসিদ এর বিপরীত ও বিরোধী অবস্থানে থাকে। আর এ বিষয়টিই বিদ‘আত নিকৃষ্ট ও বাতিল হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ জন্যই হাদীসে বিদ‘আতকে ভ্রষ্টতা বলে অভিহিত করা হয়েছে।
  • ৩. অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ‘আত এমন সব কার্যাবলী সম্পাদনের মাধ্যমে হয়ে থাকে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবাদের যুগে প্রচলিত ছিল না। ইমাম ইবনুল জাওযী রহ: বলেন,

البِدْعَةُ عِبارةٌ عَنْ فِعلٍ لَمْ يَكُنْ فابتُدِعَ

‘বিদ‘আত বলতে বুঝায় এমন কাজকে যা ছিল না, অতঃপর তা উদ্ভাবন করা হয়েছে’।[7]

  • ৪. বিদ‘আতের সাথে শরীয়তের কোনো কোনো ইবাদাতের কিছু মিল থাকে। দু’টো ব্যাপারে এ মিলগুলো লক্ষ্য করা যায়:
  • প্রথমত : দলীলের দিক থেকে এভাবে মিল রয়েছে যে, কোনো একটি ‘আম দলীল কিংবা সংশয় অথবা ধারণার ভিত্তিতে বিদ‘আতটি প্রচলিত হয় এবং খাস ও নির্দিষ্ট দলীলকে পাশ কাটিয়ে এ ‘আম দলীল কিংবা সংশয় অথবা ধারণাটিকে বিদ‘আতের সহীহ ও সঠিক দলীল বলে মনে করা হয়।
  • দ্বিতীয়ত : শরীয়ত প্রণীত ইবাদাতের রূপরেখা ও পদ্ধতির সাথে বিদ‘আতের মিল তৈরী করা হয় সংখ্যা, আকার-আকৃতি, সময় বা স্থানের দিক থেকে কিংবা হুকুমের দিক থেকে। এ মিলগুলোর কারণে অনেকে একে বিদ‘আত মনে না করে ইবাদাত বলে গণ্য করে থাকেন।
  • বিদআত নির্ধারণে মানুষের মতপার্থক্য :

বিদ‘আত নির্ধারণে মানুষ সাধারণতঃ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত :

  • এক : দলীল পাওয়া যায় না এমন প্রতিটি বিষয়কে এক শ্রেণীর মানুষ বিদ‘আত হিসেবে চিহ্নিত করছে এবং এক্ষেত্রে তারা বিশেষ বাছ-বিচার না করেই সব কিছুকে (এমন কি মু‘আমালার বিষয়কেও) বিদ‘আত বলে অভিহিত করছে। এদের কাছে বিদ‘আতের সীমানা বহুদূর বিস্তৃত।
  • দুই : যারা দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত সকল বিষয়কে বিদ‘আত বলতে রাজী নয়; বরং বড় বড় নতুন কয়েকটিকে বিদ‘আত বলে বাকী সবকিছু শরীয়তভুক্ত বলে তারা মনে করে। এদের কাছে বিদ‘আতের সীমানা খুবই ক্ষুদ্র।
  • তিন : যারা যাচাই-বাছাই করে শুধুমাত্র প্রকৃত বিদ‘আতকেই বিদ‘আত বলে অভিহিত করে থাকেন। এরা মধ্যম পন্থাবলম্বী এবং হকপন্থী।
  • বিদআতের মৌলিক নীতিমালা :

বিদ‘আতের তিনটি মৌলিক নীতিমালা রয়েছে। সেগুলো হল :

  • ১. এমন ‘আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নিকট সাওয়াবের আশা করা যা শরীয়ত সিদ্ধ নয়। কেননা শরীয়তের স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হল- এমন আমল দ্বারা আল্লাহ্‌র নিকট সাওয়াবের আশা করতে হবে যা কুরআনে আল্লাহ নিজে কিংবা সহীহ হাদীসে তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম অনুমোদন করেছেন। তাহলেই কাজটি ইবাদাত বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যে আমল অনুমোদন করেন নি সে আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ইবাদাত করা হবে বিদ‘আত।
  • ২. দ্বীনের অনুমোদিত ব্যবস্থা ও পদ্ধতির বাইরে অন্য ব্যবস্থার অনুসরণ ও স্বীকৃতি প্রদান। ইসলামে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, শরীয়তের বেঁধে দেয়া পদ্ধতি ও বিধানের মধ্যে থাকা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি ইসলামী শরীয়ত ব্যতীত অন্য বিধান ও পদ্ধতি অনুসরণ করল ও তার প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতি প্রদান করল সে বিদ‘আতে লিপ্ত হল।
  • ৩. যে সকল কর্মকান্ড সরাসরি বিদ‘আত না হলেও বিদ‘আতের দিকে পরিচালিত করে এবং পরিশেষে মানুষকে বিদ‘আতে লিপ্ত করে, সেগুলোর হুকুম বিদ‘আতেরই অনুরূপ।

জেনে রাখা ভাল যে, ‘সুন্নাত’-এর অর্থ বুঝতে ভুল হলে বিদ‘আত চিহ্নিত করতেও ভুল হবে। এদিকে ইঙ্গিত করে ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন,

‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সুন্নাতকে বিদ‘আত থেকে পৃথক করা; কেননা সুন্নাত হচ্ছে ঐ বিষয়, শরীয়ত প্রণেতা যার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর বিদ‘আত হচ্ছে ঐ বিষয় যা শরীয়ত প্রণেতা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বলে অনুমোদন করেন নি। এ বিষয়ে মানুষ মৌলিক ও অমৌলিক অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর বিভ্রান্তির বেড়াজালে নিমজ্জিত হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক দলই ধারণা করে যে, তাদের অনুসৃত পন্থাই হ’ল সুন্নাত এবং তাদের বিরোধীদের পথ হল বিদ‘আত।’’[8]

বিদ‘আতের উপরোল্লিখিত তিনটি প্রধান মৌলিক নীতিমালার আলোকে বিদ‘আতকে চিহ্নিত করার জন্য আরো বেশ কিছু সাধারণ নীতিমালা শরীয়ত বিশেষজ্ঞ আলেমগণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যদ্দ্বারা একজন সাধারণ মানুষ সহজেই কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতে বিদ‘আতের পরিচয় লাভ করতে পারে ও সমাজে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহকে চিহ্নিত করতে পারে। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হল শরীয়তের দৃষ্টিতে যা বিদ‘আত তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জেনে নেয়া ও তা থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকা। নীচে উদাহরণ স্বরূপ কিছু দৃষ্টান্তসহ আমরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় নীতিমালা উল্লেখ করছি।

প্রথম নীতি

অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদীসের ভিত্তিতে যে সকল ইবাদাত করা হয়, তা শরীয়তে বিদ‘আত বলে বিবেচিত।

এটি বিদ‘আত চিহ্নিত করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। কেননা ইবাদাত হচ্ছে পুরোপুরি অহী নির্ভর। শরীয়তের কোন বিধান কিংবা কোন ইবাদাত শরীয়তের গ্রহণযোগ্য সহীহ দলীল ছাড়া সাব্যস্ত হয় না। জাল বা মিথ্যা হাদীস মূলতঃ হাদীস নয়। অতএব এ ধরনের হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হওয়া কোন বিধান বা ইবাদাত শরীয়তের অংশ হওয়া সম্ভব নয় বিধায় সে অনুযায়ী আমল বিদ‘আত হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। অত্যধিক দুর্বল হাদীসের ব্যাপারে জমহুর মুহাদ্দিসগণের মত হল এর দ্বারাও শরীয়তের কোন বিধান সাব্যস্ত হবে না।

উদাহরণ :

রজব মাসের প্রথম জুমু‘আর রাতে অথবা ২৭শে রজব যে বিশেষ শবে মি‘রাজের সালাত আদায় করা হয় তা বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। অনুরূপভাবে নিসফে শা‘বান বা শবেবরাতের রাতে যে ১০০ রাকাত সালাত বিশেষ পদ্ধতিতে আদায় করা হয় যাকে সালাতুর রাগায়েব বলেও অভিহিত করা হয়, তাও বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। কেননা এর ফযীলত সম্পর্কিত হাদীসটি জাল।[9]

দ্বিতীয় নীতি

যে সকল ইবাদাত শুধুমাত্র মনগড়া মতামত ও খেয়াল-খুশীর উপর ভিত্তি করে প্রণীত হয় সে সকল ইবাদাত বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। যেমন কোন এক ‘আলিম বা আবেদ ব্যক্তির কথা কিংবা কোন দেশের প্রথা অথবা স্বপ্ন কিংবা কাহিনী যদি হয় কোন ‘আমল বা ইবাদাতের দলীল তাহলে তা হবে বিদ‘আত।

দ্বীনের প্রকৃত নীতি হল- আল কুরআন ও সুন্নাহ্‌র মাধ্যমেই শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে জ্ঞান আসে। সুতরাং শরীয়তের হালাল-হারাম এবং ইবাদাত ও ‘আমল নির্ধারিত হবে এ দু’টি দলীলের ভিত্তিতে। এ দু’টি দলীল ছাড়া অন্য পন্থায় স্থিরীকৃত ‘আমল ও ইবাদাত তাই বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। এ জন্যই বিদ‘আতপন্থীগণ তাদের বিদ‘আতগুলোর ক্ষেত্রে শরয়ী দলীলের অপব্যাখ্যা করে সংশয় সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, “সুন্নাতী তরীকার মধ্যে আছে এবং সুন্নাতের অনুসারী বলে দাবীদার যে সকল ব্যক্তি সুন্নাতের বাইরে অবস্থান করছে, তারা নিজ নিজ মাসআলাগুলোতে সুন্নাহ্ দ্বারা দলীল পেশের ভান করেন।’’[10]

উদাহরণ :

  • ১। কাশ্‌ফ, অন্তর্দৃষ্টি তথা মুরাকাবা-মুশাহাদা, স্বপ্ন ও কারামাতের উপর ভিত্তি করে শরীয়াতের হালাল হারাম নির্ধারণ করা কিংবা কোন বিশেষ ‘আমল বা ইবাদাতের প্রচলন করা।[11]
  • ২। শুধুমাত্র ‘আল্লাহ’ কিংবা হু-হু’ অথবা ‘ইল্লাল্লাহ’ এর যিকর উপরোক্ত নীতির আলোকে ইবাদাত বলে গণ্য হবে না। কেননা কুরআন কিংবা হাদীসের কোথাও এরকম যিকর অনুমোদিত হয় নি।[12]
  • ৩। মৃত অথবা অনুপস্থিত সৎব্যক্তিবর্গকে আহবান করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা ও সাহায্য চাওয়া, অনুরূপভাবে ফেরেশতা ও নবী-রসূলগণের কাছে দু‘আ করাও এ নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে সাব্যস্ত হবে। শেষোক্ত এ বিদ‘আতটি মূলতঃ শেষ পর্যন্ত বড় শির্কে পরিণত হয়।

তৃতীয় নীতি

কোন বাধা-বিপত্তির কারণে নয় বরং এমনিতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যে সকল ‘আমল ও ইবাদাত থেকে বিরত থেকেছিলেন, পরবর্তীতে তার উম্মাতের কেউ যদি সে ‘আমল করে, তবে তা শরীয়তে বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে।

কেননা তা যদি শরীয়তসম্মত হত তাহলে তা করার প্রয়োজন বিদ্যমান ছিল। অথচ কোন বাধাবিপত্তি ছাড়াই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম সে ‘আমল বা ইবাদাত ত্যাগ করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ‘আমলটি শরীয়তসম্মত নয়। অতএব সে ‘আমল করা যেহেতু আর কারো জন্য জায়েয নেই, তাই তা করা হবে বিদ‘আত।

উদাহরণঃ

  • ১। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমা‘ ছাড়া অন্যান্য সালাতের জন্য ‘আযান দেয়া। উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।
  • ২। সালাত শুরু করার সময় মুখে নিয়তের বাক্য পড়া। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবীগণ এরূপ করা থেকে বিরত থেকেছিলেন এবং নিয়ত করেছিলেন শুধু অন্তর দিয়ে, তাই নিয়তের সময় মুখে বাক্য পড়া বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।
  • ৩। বিপদ-আপদ ও ঝড়-তুফান আসলে ঘরে আযান দেয়াও উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। কেননা বিপদ-আপদে কী পাঠ করা উচিত বা কী ‘আমল করা উচিত তা হাদীসে সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে।
  • ৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম এর জন্মোৎসব পালনের জন্য কিংবা আল্লাহর কাছে সাওয়াব ও বরকত লাভের প্রত্যাশায় অথবা যে কোন কাজে আল্লাহর সাহায্য লাভের উদ্দেশে মিলাদ পড়া উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।

 


[1] সূরা আলে-ইমরান : ৮৫

[2] সূরা আল মায়িদা : ৩

[3] আন-নিহায়াহ, পৃঃ ৬৯, কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদআ’হ, পৃঃ ১৭

[4] কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদআ’হ, পৃঃ ২৪

[5] সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৯১ ও সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৬। তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান ও সহীহ বলেছেন।

[6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৩৫ ও সুনান আন-নাসায়ী, হাদীস নং ১৫৬০, হাদীসের শব্দ চয়ন নাসায়ী থেকে।

[7] তালবীসু ইবলীস, পৃ: ১৬

[8] আল-ইস্তিকামাহ : ১/১৩

[9] তানযীহুশ শারীয়াহ আল মরফু‘আহ ২/৮৯-৯৪, আল-ইবদা‘ পৃঃ ৫৮

[10] আল ই‘তেসাম ১/২২০

[11] আল-ই‘তিসাম ১/২১২, ২/১৮১

[12] মাজমু‘ আল ফাতাওয়া ১০/৩৬৯

চলবে……………