Category Archives: ঈমান

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

কিয়ামাত এর আলামতঃ বই

তাফহীসসুন্নাহ সিরিজের ১৮ তম বইঃ

কিয়ামাতের আলামত

লেখকঃ ইকবাল কীলানী

সহীহ আক্বীদা এর মাস’আলার বই

কুর’আন ও সহীহ সুন্নাহভিত্তিক (ঈমান) আক্বীদা

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি জ্বীন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদাতের জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় রসূল (সঃ) এর উপর যাকে পাঠানো হয়েছে সমস্ত দুনিয়ার উপর রহমত স্বরুপ। সুরা আলাক্বে আল্লাহ বলেন “পড় তোমার রবের নামে” তাই প্রত্যেক মুসলিমের উপর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ফরজ। আর সর্বপ্রথম জানতে হবে আল্লাহ সম্পর্কে, স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে।কেননা মহান আল্লাহ বলেনঃ

কিছু মানুষ জ্ঞান-প্রমাণ ও স্পষ্ট কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে [সুরা হাজ্জঃ ৮]

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম – (৩)

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাতজাহান্নাম

আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ.

তাহকীক: ড. সাআদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

জান্নাতের পথ ও জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ

  • প্রথম আলোচনা: জান্নাতের প্রবেশের কারণ
  1. ১- আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣﴾ [النساء: ١٣]

“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা” সূরা আন- নিসা, আয়াত: ১৩

  1. ২-উপকারী ইলমের অনুসন্ধান করা।[কুরআন ও সুন্নাহের ইলম]
  1. ৩- ঈমান ও আমলে সালেহ [নেক আমলসমূহ]
  • নেক আমলসমূহ:

ক- ইসলাম ও ঈমানের রুকন সমূহকে পরিপূর্ণরূপে আদায় করা।

খ- সুন্দর চরিত্র, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, ফকীর মিছকীনদের জন্য ব্যয় করা, মেহমানের মেহমানদারি করা ইত্যাদি।

  • জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমসমূহ:

মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা

– আল্লাহর যিকির করা

-দয়া করা

-সালামের প্রসার

-দুর্বল অসহায় ও গরীব লোকদের প্রতি দয়া করা, দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে সহযোগিতা করা। [জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ নিম্নরূপ: আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা, কথা ও কাজে সত্যবাদী হওয়া. আমানতের হেফাযত করা, ওয়াদ পূর্ণ করা, প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করা, ইয়াতীমের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, একজন মুসলিম ভাইয়ের বিপদে সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্ত লোকের সাহায্য করা, একজন মুসলিমের দোষ গোপন করা, তাকে সাহায্য করা, একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদাত করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য মহব্বত রাখা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর রহমতের আশা করা, আল্লাহর নিকট তাওবা করা, আল্লাহর আদেশের উপর ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, আল্লাহর কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহকে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা, কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তাকে তুমি দেবে আর যে তোমার প্রতি অবিচার করে তুমি তাকে ক্ষমা করবে, যাবতীয় কর্মে ইনসাফ করা, আল্লাহর মাখলুকের প্রতি ইনসাফ করা, মানুষকে খানা খাওয়ানো, সালামের প্রসার করা, গভীর রাতে সালাত আদায় করা আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কিতাব, মুসলিমদের ইমাম ও সাধারণ মুসলিমদের হিতাকাংখী হওয়া ইত্যাদি। এ সব আমল ও এ ধরনের যে সব আমল আছে যে গুলো দ্বারা একজন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। আর এটিই হল, মহান সফলতা ও বড় পাওনা। দেখুন মাজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ। [৪২২-৪২৩/১০]]

জান্নাতে প্রবেশ করা আল্লাহর দয়ায় হয়ে থাকে আমলের মাধ্যমে নয়।

প্রমাণ: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«قاربوا وسدِّدوا، واعلموا أنه لن ينجو أحد منكم بعمله » قالوا: يا رسول الله، ولا أنت؟ قال: « ولا أنا إلاّ أن يتغمّدني الله برحمة منه وفضل »

“তোমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর এবং আমলসমূহকে সুন্দর কর, আর মনে রাখবে তোমাদের কেউ তার আমল দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে না। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, আপনিও কি নাজাত পাবেন না হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল বললেন, না আমিও না, তবে যদি আল্লাহ তাঁর রহমত ও দয়া দ্বারা আমাবে ঢেকে ফেলে তাহলে আমি নাজাত পাব [মুসলিম মুনাফেকদের গুণাগুণ বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ : কেউ তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং আল্লাহর রহমতের দ্বারা প্রবেশ করবে। হাদিস নং ২৮১৬।]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« سدِّدوا، وقاربوا، وأبشروا؛ فإنه لا يُدخِل أحداً الجنة عملُهُ » قالوا: ولا أنت يا رسول الله؟ قال: « ولا أنا، إلاّ أن يتغمدني الله بمغفرة ورحمة » وفي لفظ: « واعلموا أن أحبّ العمل إلى الله أدومه وإن قلّ »

“তোমরা তোমাদের আমলসমূহকে সংশোধন কর, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর এবং তোমরা সু-সংবাদ গ্রহণ কর। কারণ, কাউকে তার আমল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর আপনিও কি আপনার আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন না। উত্তরে তিনি বলেন, আমিও না, তবে যদি আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা আমার অনুকুলে থাকে। অপর শব্দে বর্ণিত, তোমরা মনে রাখবে, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হল যা স্থায়ী হয়, যদিও তা কম” মুত্তাফাকুন আলাইহ : বুখারি রিকাক অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: আমলে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা ও আমল সবসময় করা, হাদিস নং ৬৪৬৪, ৪৬৬৭ এবং মুসলিম মুনাফেকদের গুণাগুণ বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ কেউ তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং আল্লাহর রহমতের দ্বারা প্রবেশ করবে, হাদিস নং ২৮১৮।

ইমাম নববী রহ. বলেন, উল্লেখিত হাদিস সমূহের বাহ্যিক অর্থ হক পন্থীদের জন্য প্রমাণ। কারণ তারা বলেন, কোন ব্যক্তি সাওয়াব বা জান্নাত তার আমল দ্বারা লাভ করতে পারবে না। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর বাণী:

﴿ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٣٢﴾ [النحل: ٣٢]

“তোমরা তোমাদের আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ কর” সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩২।

﴿وَتِلۡكَ ٱلۡجَنَّةُ ٱلَّتِيٓ أُورِثۡتُمُوهَا بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٧٢﴾ [الزخرف: ٧٢]

“আর এটিই জান্নাত, তোমাদের নিজেদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে” সূরা যুখরফ, আয়াত: ৭২

এবং এ ধরনের আরও যত আয়াত আছে, যাতে প্রমাণিত হয়, মানুষ তাদের আমলের মাধ্যমেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, এগুলো উল্লেখিত হাদিসসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং আয়াতের অর্থ হল, জান্নাতে প্রবেশ করা আমলের দ্বারা হবে, কিন্তু আমল করার তাওফিক, হিদায়েত, আমলে এখলাস ও আমল কবুল করা আল্লাহর রহমত ও দয়ার কারণেই হয়ে থাকে। সুতরাং এ কথা বলা বাহুল্য যে শুধু আমল দ্বারা কোন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর এটিই হল, হাদিসের মর্মার্থ। মোট কথা, একজন লোক জান্নাতে আমলের করার মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তা হল, আল্লাহর রহমত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম ১৬৬/১৭

জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জাহান্নামের প্রবেশের কারণ

  • জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণগুলো:

জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণ অসংখ্য ও অগণিত। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন। সামগ্রিক কারণ হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَٰلِدٗا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٞ مُّهِينٞ ١٤﴾ [النساء: ١٤]

“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আযাব” সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪

জাহান্নামে প্রবেশের আরও কারণ:

  • ১- আল্লাহর সাথে শরিক করা।
  • ২- নবী ও রাসূলদের অস্বীকার করা।
  • ৩- কুফরী করা।
  • ৪- হিংসা করা।
  • ৫- যুলম ও অত্যাচার করা।
  • ৬- আমানতের খিয়ানত করা
  • ৭- আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা।
  • ৮- কার্পণ্য করা।
  • ৯- মুনাফেকি করা।
  • ১০- আল্লাহর আযাব হতে নির্ভীক হওয়া।
  • ১১- আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া।
  • ১২- কুরআন ও হাদিসে যে সব কবীরাগুনাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে সব কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া

[এ ছাড়াও জাহান্নামে প্রবেশের আরও অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন, অশ্লীল কাজ ও অপকর্ম করা, প্রকাশ্যে বা গোপনে অশ্লীল ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া, খিয়ানত করা, জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা, অহংকার করা, নেয়ামতের নাশুকরী করা, আল্লাহর সীমালংঘন করা, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা অমান্য করা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে মাখলুককে ভয় করা, খালেককে বাদ দিয়ে মাখলুক থেকে আশা করা, খালেকের উপর ভরসা না করে মাখলুকের উপর ভরসা করা, কুরআন ও সুন্নাহের বিরোধিতা করা, আল্লাহর নাফরমানি করে মাখলুকের আনুগত্য করা, সাতটি ধ্বংসাত্বক বিষয় থেকে বিরত না থাকা, ঘুষ দেয়া, গীবত করা, চোগলখোরি করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মদ্যপান করা, বড়াই করা, অহংকার করা, চুরি করা, মিথ্যা কসম খাওয়া, নারীরা পুরুষের সাথে এবং পুরুষরা নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা, দান করে খোটা দেয়া, মিথ্যা কসম দ্বারা মাল বিক্রি করা, গণক ও জ্যোতিষকে বিশ্বাস করা, প্রাণীর ছবি বানানো, কবরে সেজদা করা, মৃত ব্যক্তির উপর আওয়াজ করে কান্না করা, পুরুষদের জন্য কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করা, পুরুষদের রেশমি কাপড় ও অলংকার পরিধান করা, প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া, ওয়াদা খেলাফ করা, এছাড়াও আরও অন্যন্য আমলসমূহ। দেখুন: মাজমুয়ায়ে ফতওয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এর। ৪২৩-৪২৪/১০, ইমাম যাহবী রহ. এর কবীরা গুনাহ এবং ইবনে নুহাসের তাম্বীহুল গাফেলীন। ]

কিভাবে আমরা আমাদের নিজেদের ও আমাদের পরিবার-পরিজনদের জাহান্নাম থেকে বাঁচাবো?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦﴾ [التحريم: ٦]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর; যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকুল, যারা আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়” সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬

আল্লামা সা’দী রহ. বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈমানের মত নেয়ামত দিয়ে অনুগ্রহ করেছে, তোমরা ঈমানের আবশ্যকীয় বিষয় ও শর্তসমূহ পূরণ কর। আর তোমরা তোমাদের নিজেদের এবং পরিবার-পরিজনদের ভয়াবহ জাহান্নাম যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার আগুন থেকে বাঁচাও। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا] “তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচা”। আর তোমাদের আত্মরক্ষার উপায় হল, আল্লাহর আদেশকে নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক করা, তার আদেশ পালনে দায়িত্বশীল হওয়া এবং তার নিষিদ্ধ বিষয় হতে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব কর্মে অসন্তুষ্ট হন বা আযাব দেন, সে সব কর্ম থেকে তাওবা করা। আর পরিবার পরিজন, সন্তান সন্ততিকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর উপায় হল, তাদের উত্তম শিক্ষা দেয়া, শাসন করা, তাদেরকে আল্লাহর আদেশ নিষেধ মানার উপর বাধ্য করা। একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছে তা না করবে। আর স্ত্রী সন্তান একজন মানুষের অভিভাবকত্বে ও পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামকে এত ভয়াবহ করে মানুষের নিকট তুলে ধরেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর আদেশের প্রতি উদাসীন না হয় [তাফসীরে সা’দী পৃ: ৮৭৪]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ هَلۡ أَدُلُّكُمۡ عَلَىٰ تِجَٰرَةٖ تُنجِيكُم مِّنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ ١٠ ﴾ [الصف: ١٠]

“হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে” [সূরা আস-সফ, আয়াত: ১০]

তারপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উল্লেখ করেন:

1 –تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ

“তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে”

2 – وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ

“এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে”।

সুতরাং, মনে রাখতে হবে, এ দুটি হল, আল্লাহর অনুমতিক্রমে জান্নাতে প্রবেশের এবং জাহান্নাম হতে মুক্তির কারণ। আমরা আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর নিকট জান্নাত চাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি লেখকের দু’আটি কবুল কর এবং তাকে তুমি জান্নাত দান কর এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি দাও।

আল্লামা সা’দী রহ. আয়াত দু’টির তাফসীরে বলেন, এটি পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য মহৎ ব্যবসা, মহান উদ্দেশ্য ও উন্নত চাহিদা লাভের প্রতি অসিয়ত, পথ দেখানো এবং দিক নির্দেশনা, যার দ্বারা কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং মহা নেয়ামতের সফলতা অর্জন করা যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে বুঝা যায় বিষয়টি এমন যার প্রতি প্রতিটি বিচক্ষণ লোক বলতেই আগ্রহ করবে এবং প্রতিটি জ্ঞানী লোক তার দিক মাথা উঁচু করে দেখবে। সুতরাং, বিষয়টি এমন- যেমন বলা হল, এ ব্যবসাটি কি যার এত মূল্য? তখন বলল, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আর এ কথা আমরা সবাই জানি পরিপূর্ণ ঈমান হল আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব বিষয়ে অটল বিশ্বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার প্রতি অটল বিশ্বাস করা। এ বিশ্বাসের অপরিহার্য দাবী হল শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলসমূহের অন্যতম মূল্যবান আমল হল, আল্লাহর রাহে জিহাদ করা, এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ] অর্থাৎ তোমরা তোমাদের জান মাল দিয়ে ইসলামের দুশমনদের প্রতিহত করা, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয় করা এবং আল্লাহর কালিমাকে আল্লাহর যমীনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তোমরা তোমাদের সম্পদ হতে যা তোমাদের জন্য সহজ হয় তা ব্যয় করবে। কিন্তু এ কাজটি যদিও তোমার জন্য অপছন্দনীয় হয় এবং তোমার জন্য কষ্টকর হয় কিন্তু মনে রাখবে এটি তোমার জন্য উত্তম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ] এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে [তাফসীরে সা’দী পৃ: ৮৬০]

জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণসমূহ:

আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী আমল করা এবং আল্লাহ যে সব কর্মে নারাজ হন তা হতে দূরে থাকা: যখন কোন ব্যক্তি তার প্রভুর আনুগত্য করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা করতে নিষেধ করেছেন, তা হতে বিরত থাকে তাহলে সে আসবাব সমূহের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করল। তাওফিক ও কবুল আল্লাহর হাতে। আল্লাহর নিকট আমরা তার ফযল ও অনুগ্রহ কামনা করি। জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণগুলো আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে আহলে ইলমরা এ বিষয়ে যে সব কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন তা দেখুন। সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর উপর এবং তার সমগ্র সাহাবীদের উপর [জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় কারণ, জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ দ্বারা আমল করা এবং জাহান্নামে প্রবেশের কারণসমূহ হতে দূরে থাকা। জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণগুলোর আলোচনা আল-ইবন আব্দুর রহমান করছেন যা পূর্বের দুটি পরিচ্ছেদ অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহর নিকট কামনা করি আল্লাহ যেন আমাদের এ গবেষণাটিকে কবুল করেন এবং গবেষণা দ্বারা আল্লাহ গবেষকের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস ও শহীদদের উচ্চ মর্যাদা দান করেন। কারণ, আল্লাহ তা’আলা সম্মানী, তিনি দয়ালু করুণাময়। তিনি তার ইহসান, করম, ফযল ও দয়া দ্বারা আমাদের দয়া করেন। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদের উপর তার পরিবার পরিজন ও সমগ্র সাহাবীদের উপর । ]


পরিশিষ্ট

সমস্ত প্রশংসা কেবলই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই জন্য পূর্বের ও পরবর্তীর যাবতীয় প্রশংসা। আল্লাহর অপার অনুগ্রহে জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ে গবেষণাটি শেষ করছি। এ গবেষণায় রয়েছে জান্নাত ও জাহান্নামের সংজ্ঞা, নামসমূহ, জান্নাতের নেয়ামতসমূহ ও জাহান্নামের আযাব এবং যে সব উপকরণগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে মানুষকে নিয়ে যায় তার বর্ণনা।

এ গবেষণামুলক রিসালাটির উল্লেখযোগ্য দিক হল, এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে জান্নাত ও জাহান্নামের সংজ্ঞা জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনার উপর কিছু প্রমাণাদি একত্র করা হয়েছে, যাতে একজন পাঠক খুব দ্রুত তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে এবং জান্নাতের লাভ করতে আগ্রহী হয় এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে।

আর অসিয়ত ও উপদেশ হল:

প্রথমত: আল্লাহকে ভয় করার প্রতি অসিয়ত যাতে একজন বান্দা জান্নাত লাভে সক্ষম হয় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায়।

দ্বিতীয়ত: জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ে আরো বিস্তারিত লেখার জন্য উপদেশ দেই। যাতে যারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায় তাদের জন্য সহজ হয় এবং যারা সত্যিকার ইলমকে বাড়াতে চায় তাদের জন্য পাথেয় হয়।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين، والصلاة [والسلام] على نبينا محمد [وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين.

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম – (২)

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাতজাহান্নাম

আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ.

তাহকীক: ড. সাআদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

জান্নাতীদের নেয়ামতসমূহ

  • প্রথম প্রকার নেয়ামত: মনস্তাত্বিক নেয়ামত

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«إن الله تبارك وتعالى يقول لأهل الجنة: يا أهل الجنة! فيقولون: لبيك ربنا وسعديك، والخير في يديك، فيقول: هل رضيتم؟! فيقولون: وما لنا لا نرضى يا ربِّ، وقد أعطيتنا ما لم تُعطِ أحداً من خلقك، فيقول: ألا أعطيكم أفضل من ذلك؟! فيقولون: وأي شيء أفضل من ذلك؟ فيقول: أُحلُّ عليكم رضواني، فلا أسخط عليكم بعده أبداً»

 

“আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতীদের ডেকে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! উত্তরে তারা বলবেন: হে রব, ‘আমরা তোমার দরবারে উপস্থিত, আমরা তোমার নিকট সফলতা কামনা করছি, যাবতীয় কল্যাণ তোমারই হাতে’ তখন আল্লাহ তাদের বলবেন, তোমরা কি আমার প্রতি রাজি-খুশি? তারা বলবে, হে আমাদের রব রাজি-খুশি না হওয়ার কি আছে? তুমি আমাদের এমন সবকিছু দিয়েছ, যা তুমি তোমার আর কোন মাখলুককে দাওনি। তারপর আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদের এর চেয়েও উত্তম কিছু দান করব? তখন তারা বলবে, কোন জিনিস এর চেয়ে উত্তম? তখন আল্লাহ ঘোষণা দেবেন, “তোমাদের প্রতি আমার সন্তুষ্টি অবধারিত, আমি আর কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না” [ মুত্তাফাকুন আলাইহ : বুখারি, কিতাবুর রিকাক, জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা, হাদীস নং: ৬৫৪৯। মুসলিম, জান্নাত ও জান্নাতের নেয়ামতসমূহের আলোচনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: জান্নাতীদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সন্তুষ্টি তাদের প্রতি তিনি আর কোন দিন অসন্তুষ্ট হবেন না, হাদিস নং: ২৮২৯। ]
[মনস্তাত্বিক নেয়ামত বিষয়ে আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে আরো বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এরশাদ করেন,

«يجاء بالموت يوم القيامة كأنه كبش أملح، فيوقف بين الجنة والنار، فيقال: يا أهل الجنة، هل تعرفون هذا؟ فيشرئبّون وينظرون ويقولون: نعم هذا الموت، ويقال: يا أهل النار، هل تعرفون هذا؟ فيشرئبّون وينظرون ويقولون: نعم هذا الموت، فيُؤمَر به فيُذبح، ثم يقال: يا أهل الجنة خلود فلا موت، ويا أهل النار خلود فلا موت»

 

“মৃত্যুকে কিয়ামতের দিন একটি মেষের আকৃতিতে উপস্থিত করা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে রাখা হবে। তারপর বলা হবে, হে জান্নাতবাসী তোমরা একে চেন? তখন তারা মাথা উঁচু করবে এবং দেখে বলবে, হ্যাঁ আমরা চিনি, এ হল মৃত্যু। তারপর জাহান্নামীদের বলা হবে, হে জাহান্নামবাসী, তোমরা একে চেন? তখন তারা মাথা উঁচু করবে এবং দেখে বলবে, হ্যাঁ আমরা চিনি, এ হল মৃত্যু। তারপর আদেশ দেয়া হবে যবেহ করার জন্য। তখন তাকে যবেহ করা হবে। তারপর জান্নাতীদের বলা হবে, হে জান্নাতীগণ, তোমরা জান্নাতে চিরদিন থাকবে আর কোন দিন তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না। এবং জাহান্নামীদের বলা হবে, হে জাহান্নামীরা, তোমরা জাহান্নামে চিরদিন থাকবে, আর কোন দিন তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৪৯। আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. হতেও অনুরূপ বর্ণিত। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

 

« فيزداد أهل الجنة فرحاً إلى فرحهم، ويزداد أهل النار حزناً إلى حزنهم »

 

“তখন জান্নাতীদের আনন্দ আরো বৃদ্ধি পাবে। আর জাহান্নামীদের অশান্তি আরও বৃদ্ধি পাবে”। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৫০। আর মনস্তাত্বিক নেয়ামতের মধ্যে সবচেয়ে বড় নেয়ামত হল, আল্লাহর চেহারার দিকে তাকানো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ﴿۞لِّلَّذِينَ أَحۡسَنُواْ ٱلۡحُسۡنَىٰ وَزِيَادَةٞۖ ٢٦﴾ [يونس: ٢٦] . “যারা ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম (জান্নাত) এবং আরও বেশি কিছু”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৬] আয়াতে ‘আল-হুসনা’ অর্থ জান্নাত আর ‘যিয়াদা’ বা আরো বেশী কিছু অর্থ আল্লাহর দিকে তাকানো। আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, ﴿لَهُم مَّا يَشَآءُونَ فِيهَا وَلَدَيۡنَا مَزِيدٞ ٣٥﴾ [ق: ٣٥] “তারা যা চাইবে, সেখানে তাদের জন্য তাই থাকবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক”। সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৫] এখানে ‘মাযিদ’ বা অধিক দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর চেহারার দিকে তাকানো। আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, ﴿وُجُوهٞ يَوۡمَئِذٖ نَّاضِرَةٌ ٢٢ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٞ ٢٣ ﴾ [القيامة: ٢٢، ٢٣]- “সেদিন কতক মুখমণ্ডল হবে হাস্যোজ্জ্বল। তাদের রবের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপকারী”। সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২২, ২৩] হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

 

«فيكشف الحجاب، فما أُعطوا شيئاً أحبّ إليهم من النظر إلى ربهم » [مسلم، برقم 181].

“তারপর পর্দা খোলা হবে, [তখন তারা আল্লাহর দিকে তাকাবে।] জান্নাতীদেরকে তাদের প্রভূর দিকে তাকানোর চেয়ে বড় প্রিয় আর কোন কিছু দেয়া হয়নি”। সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮১]

  • জান্নাতীদের দ্বিতীয় প্রকার নেয়ামত: মনস্তাত্বিক নেয়ামত ও শান্তি
  • এক- জান্নাতের নহরসমূহ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿مَّثَلُ ٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي وُعِدَ ٱلۡمُتَّقُونَۖ فِيهَآ أَنۡهَٰرٞ مِّن مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِنٖ وَأَنۡهَٰرٞ مِّن لَّبَنٖ لَّمۡ يَتَغَيَّرۡ طَعۡمُهُۥ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ خَمۡرٖ لَّذَّةٖ لِّلشَّٰرِبِينَ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ عَسَلٖ مُّصَفّٗىۖ وَلَهُمۡ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَمَغۡفِرَةٞ مِّن رَّبِّهِمۡۖ كَمَنۡ هُوَ خَٰلِدٞ فِي ٱلنَّارِ وَسُقُواْ مَآءً حَمِيمٗا فَقَطَّعَ أَمۡعَآءَهُمۡ ١٥﴾ [محمد: ١٥]

“মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্ণাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্ণাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নÑবিচ্ছিন্ন করে দেবে” সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫

আয়াতের তাফসীর: মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত অর্থাৎ গুণাগুণ হল- তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্ণাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি। এ কথার অর্থ, পঁচে গলে যার স্বাদ পরিবর্তন হয়নি এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়নি।

‘এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্ণাধারা’ তাকে পা পৃষ্ট করেনি এবং ইতঃপূর্বে হাত বদল হয়নি। ‘তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে’ অর্থাৎ যারা এ ধরনের নেয়ামতসমূহের মধ্যে থাকবে তারা কি ওদের মত হবে, যারা চিরদিন জাহান্নামে থাকবে? [তাফসীরে বগবী: ১৮১/৪, তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১৭৭/৪।

জান্নাতের নহরসমূহের মধ্যে রয়েছে, হাউজে কাউছার যা একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’কে দেয়া হয়েছে। এর দু’প্রান্ত মর্মর পাথরে শোভিত। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এর দু’ প্রান্ত কারুকার্যপূর্ণ মর্মর পাথরে সুশোভিত’। সহীহ বুখারী, ৪৯৬৪ ও ৬৫৮১।

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর হাউজ কিয়ামতের মূহুর্তে তার প্রস্থ একমাসের রাস্তা আর দৈর্ঘ্য আসমান ও যমীনের দূরত্বের সমান দূরত্ব। যে ব্যক্তি সে হাউজ থেকে একবার পানি পান করবে সে আর কখনো পিপাসিত হবে না। সহীহ বুখারি, হাদীস নং ৬৫৭৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৯২। অচীরেই এমন একটি দিবস আসবে, সেদিন এ হাউজ হতে প্রতিহত করা হবে, কতক লোকদের। আমরা আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা চাই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«ليردن عليّ أناس من أصحابي » وفي رواية: « أقوام أعرفهم ويعرفوني، ثم يُحال بيني وبينهم، فأقول: إنهم من أمتي، فيقال: إنك لا تدري ما أحدثوا بعدك، فأقول: سُحقاً سُحقاً لمن غيَّر بعدي » وقال ابن عباس: سُحقاً: بُعداً [البخاري، برقم 6583، ومسلم، برقم 2292].

“অবশ্যই আমার সাহাবাদের কতক লোক কিয়ামতের দিন (আমার হাউজের নিকট) আমার উদ্দেশ্যে আগমন করবে’। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, “এমন এক সম্প্রদায়ের লোকেরা আগমন করবে, যাদের আমি চিনি এবং তারাও আমাকে চিনে। তারপর তাদের মাঝে ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে। তখন আমি বলব, তারা আমার উম্মত তাদের কেন বাধা দাও? তখন বলা হবে, তুমি জাননা, তারা তোমার পর কি কি আবিষ্কার করেছিল! এ কথা শোনে আমি যারা আমার পর [আমার দ্বীনের মধ্যে] পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছিল তাদের জন্য বলব, দুর হও, দুর হও”। আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রা. বলেন, سُحقاً শব্দের অর্থ بُعداً দূর হও। সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬৫৮৩, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৯২।]

  • দুই, তিন- ‘হুর’ তথা সুন্দরী নারী ও জান্নাতীদের বাসস্থান:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿فِيهِنَّ قَٰصِرَٰتُ ٱلطَّرۡفِ لَمۡ يَطۡمِثۡهُنَّ إِنسٞ قَبۡلَهُمۡ وَلَا جَآنّٞ ٥٦ ﴾ [الرحمن: ٥٦]

“সেখানে থাকবে এমন নারীগণ যাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকবে স্বামীর প্রতি, যাদেরকে ইতঃপূর্বে স্পর্শ করেনি কোন মানুষ আর না কোন জিন”। [সুরা রহমানঃ ৫৭]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَحُورٌ عِينٞ ٢٢ كَأَمۡثَٰلِ ٱللُّؤۡلُوِٕ ٱلۡمَكۡنُونِ ٢٣ جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٢٤ ﴾ [الواقعة: ٢٢، ٢٤]

“আর থাকবে ডাগর-চোখা হুর, যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা, তারা যে আমল করত তার প্রতিদানস্বরূপ”। [সুরা ওয়াক্বিয়াঃ ২২-২৩]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿مُتَّكِ‍ِٔينَ عَلَىٰ سُرُرٖ مَّصۡفُوفَةٖۖ وَزَوَّجۡنَٰهُم بِحُورٍ عِينٖ ٢٠ ﴾ [الطور: ٢٠]

“সারিবদ্ধ পালঙ্কে তারা হেলান দিয়ে বসবে; আর আমি তাদেরকে মিলায়ে দেব ডাগর-চোখা হুর-এর সাথে”। [সুরা তুরঃ২০]

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«في الجنة خيمة من لؤلؤة مجوفة عرضها ستون ميلاً، في كل زاوية منها أهل ما يرون الآخرين، يطوف عليهم المؤمن »

“জান্নাতের মধ্যে মর্মর পাথরে সুশোভিত গোলাকার তাঁবু রয়েছে যার প্রস্থ ষাট মাইল। তাঁবুগুলোর প্রতিটি কোণে কিছু লোক রয়েছে, তার এক কোণে যারা থাকবে তারা অপর কোণের লোকদের দেখতে পাবে না। মুমিনরা তাদের উপর ঘুরে বেড়াবে [মুত্তাফাকুন আলাইহ : সহীহ বুখারি, তাফসীর অধ্যায়, সূরা আর-রহমান এর তাফসীর: হাদীস নং: ৪৮৭৯। সহীহ মুসলিম, জান্নাত ও তার নেয়ামতসমূহের বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: জান্নাতের তাঁবু সমূহের আলোচনা, হাদীস নং: ২৮৩৮। সহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إن للمؤمن في الجنة لخيمةً من لؤلؤة واحدةٍ مجوفة طولها في السماء ستون ميلاً »

“জান্নাতে মুমিনদের জন্য মণি মুক্ত দ্বারা একটি তাঁবু থাকবে, যার দৈর্ঘ্য আসমানে ষাট মাইল। উভয় বর্ণনায় বর্ণিত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের বর্ণনার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। জান্নাতের প্রশস্ততা সমতল হওয়ার দিক বিবেচনায় ষাট মাইল। আর জান্নাতের দৈর্ঘ্য আসমানে ষাট মাইল। সুতরাং জান্নাতের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়টি বরাবর। ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম, দেখুন: ১৭৫/১৭। ]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতীতের বাসস্থান ও জান্নাতের রুম সমূহের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

﴿لَٰكِنِ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ رَبَّهُمۡ لَهُمۡ غُرَفٞ مِّن فَوۡقِهَا غُرَفٞ مَّبۡنِيَّةٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ وَعۡدَ ٱللَّهِ لَا يُخۡلِفُ ٱللَّهُ ٱلۡمِيعَادَ ٢٠﴾ [الزمر: ٢٠]

“কিন্তু যারা নিজদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে কক্ষসমূহ যার উপর নির্মিত আছে আরও কক্ষ। তার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর ওয়াদা; আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২০]

আল্লামা ইব্ন কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার নেককার বান্দাদের বিষয়ে বর্ণনা দিয়ে বলেন, তাদের জন্য রয়েছে, জান্নাতে কামরাসমূহ। অর্থাৎ উঁচু উঁচু প্রাসাদ। مِّن فَوْقِهَا غُرَفٌ مَّبْنِيَّةٌ، ‘যার উপর নির্মিত আছে আরও কক্ষ’ অর্থাৎ, এক তলার উপর আরেক তলা, অত্যন্ত মজবুত, সু-সজ্জিত ও সু-উচ্চ কামরা সমূহ

[দেখুন- আল্লামা ইবনে কাসীরের তাফসীরুল কুরআন আল আযীম, পৃ: ৬৭২/৪]

আবু মালেক আশয়ারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«إن في الجنة غرفاً يُرى ظاهرُها من باطنها، وباطنُها من ظاهرها، أعدّها الله تعالى لمن أطعم الطعام، وألان الكلام، وتابع الصيام، وأفشى السلام، وصلّى بالليل والناس نيام »

জান্নাতে এমন কতক কামরা আছে, যার বাহির থেকে ভিতর এবং ভিতর থেকে বাহির সবকিছু দেখা যায়। এ কামরাগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তৈরি করেছেন, তাদের জন্য যারা মানুষকে খানা খাওয়ায়, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, নিয়মিত সাওমের পাবন্দি করে, সালামের প্রসার করে এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমায়, তখন সালাত আদায় করে [ আহমদ, মুসনাদ ৩৪৩/৫, ইবনে হিব্বান ৬৪১, তিরমিযি আলী রা. হতে, অধ্যায়: জান্নাতের বর্ণনা, পরিচ্ছেদ: জান্নাতের রুমসমূহের বর্ণনা। হাদিস নং ২৫২৭। আল্লামা আলবানী সহীহ সুনান আত-তিরমিযিতে হাদিসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেন। জামে তিরমিযি: ২২০/২ হাদিস নং ২১১৯।]

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’কে জান্নাতের ঘরসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বলেন,

«لَبِنةٌ من فضة، ولَبِنةٌ من ذهب، ومِلاطهاالمسك الأذفرُ، وحصباؤها اللؤلؤُ والياقوتُ، وتُربَتُها الزعفران، من يدخلها: ينعم ولا يبأس، ويخلدُ ولا يموت، لا تبلى ثيابهم، ولا يفنى شبابهم »

“জান্নাতের একটি ইট রুপার অপরটি স্বর্ণের আর তার আস্তর হল, মিসক। আর তার সূরকী হল, মুণি মুক্তার পাথর। জান্নাতের মাটি [ মাটি: যা দেয়ালের সাথে আস্তর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেখুন, আন-নিহায়া হাদীসের শব্দের অর্থ সমূহের বর্ণনায়, পৃ: ৩৫৭/৪। ]হল, যাফরান। যে ব্যক্তি জান্নাতে একবার প্রবেশ করবে, সে জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করতে থাকবে কখনো সে হতাশ হবে না, জান্নাতে চির কাল থাকবে তাতে সে কখনো মরবে না, তাদের কাপড় কখনো পুরাতন হবে না এবং তাদের যৌবন কখনো শেষ হবে না” [তিরমিযি, জান্নাতের বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: জান্নাতের গুণাগুণ ও নেয়ামত সমূহের বর্ণনা, হাদিস নং ২৫২৬, আহমদ ৩০৫/২। আল্লামা আলবানী রহ. বিশুদ্ধ তিরমিযিতে হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন, পৃ: ৩১১/২।]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তার ‘আন-নুনিয়া’ নামক বিশিষ্ট কাব্যগ্রন্থে জান্নাতের আসনসমূহ ও তার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সুসংহত ও মজবুত কাবা যাকে পাথর ও খুঁটির দ্বারা আবৃত করা হয়েছে তার তাওয়াফ করে, সে সর্বদা সাফা মারওয়া ওয়াদিয়ে মুহাস্সার ও দুটি সবুজ রেখার মাঝে দৌড়তে থাকে। সে মিনার নিকটে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু খাইফ তাকে নিকটে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করছে”।

তিনি আরও বলেন, “যারা তাদের চক্ষুকে বিরত রাখে, তারা তাদের প্রিয়া ছাড়া অন্য কোন মাহবুবকে তালাশ করে না। তাদের চোখ তাদের প্রিয় মানুষটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্য কোন যুবকের প্রতি তার দৃষ্টি যায় না”।

তিনি আরও বলেন, “ঐ লোক তার চোখ বিরত রাখার নয়, যে দূর্বল। সুতরাং তারা দুই প্রকার। হে চক্ষু উন্মুক্তকারী ব্যক্তি, অবশ্যই পরবর্তীতে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সে অবশ্যই সৌন্দর্য ও অনুগ্রহ উভয়টি থেকে খালি হবে।

তিনি আরও বলেন, “হে জ্ঞানীজন! তুমি জান্নাতের আসনসমূহের বর্ণনা শোন! তারপর তুমি তোমার জন্য ডাগর চোখ বিশিষ্ট নারী যারা সৌন্দর্য ও সৃষ্টির দিক বিবেচনায় পরিপূর্ণ এবং সর্বাধিক সুন্দর নারী হিসেবে পরিগণিত”।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুমের কাসিদার ব্যাখ্যা আহমদ বিন ঈসার ৫৪২/২ -৫৪৮

ব্যাখ্যা দানকারী বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ﴿وَزَوَّجۡنَٰهُم بِحُورٍ عِينٖ ٢٠﴾ [الطور: ٢٠] “আর আমি তাদেরকে মিলায়ে দেব ডাগর-চোখা হউর-এর সাথে[সূরা আত-তূর. আয়াত: ২০]

আল্লামা মুজাহিদ বলেন, الحور শব্দটি حوراء শব্দের বহুবচন। ‘হুর’ বলা হয়-কুমারী নারী, ধবধবে সাদা, কালো চোখ বিশিষ্ট সুন্দরী নারী যাদের দিকে তাকালে তাদের দেহের আকৃতি ও দৈহিক সৌন্দর্য দেখে চক্ষুদ্বয় অভিভূত হয়।

কিন্তু বিশুদ্ধ হল, الحور শব্দটি নির্গত হল, الحور في العين، হতে। অর্থাৎ, কঠিন ধবধবে সাদা যার মধ্যে রয়েছে, কঠিন কালো। মোট কথা তার মধ্যে দুটি অর্থই বিদ্যমান [আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুমের কাসিদার ব্যাখ্যা আহমদ বিন ঈসার ৫৪২/২ -৫৪৮।

হুরদের গুণাগুণ সম্পর্কিত হাদিস অনেক। অনুরুপভাবে জান্নাতীদের আবাস স্থানের গুণাগুণ সম্পর্কিত হাদিসও অনেক। নিম্নে সংক্ষেপে কয়েকটি হাদিসের কথা আলোচনা করা হল। হুরের বর্ননা সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত। যেমন আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إن أول زمرة يدخلون الجنة على صورة القمر ليلة البدر، والذين يلونهم على أشد كوكب دُرِّيّ في السماء إضاءة، لكل امرئٍ منهم زوجتان اثنتان يُرى مُخُّ سُوقهما من وراء اللحم، وما في الجنة أعزب »

“প্রথম গ্রুপ যেটি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের আকৃতিতে প্রবেশ করবে, তারপর যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা আকাশে প্রজ্জলিত নক্ষত্রের মত হবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য দুইজন স্থী থাকবে। তাদের স্ত্রীদের সৌন্দর্য এত বেশি হবে, চামড়ার উপর দিয়ে তাদের পায়ের নলার মগজ দেখা যাবে। আর জান্নাতে আশ্চর্য্য বলতে কিছু নাই”। সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৩২৪৫, ৩২৫৪, ৩৩২৭ আর সহীহ মুসলিমে এ শব্দে হাদীস নং ২৮৩৪। আনাস রা. হতে হাদিস বর্ণিত,

« ولو أن امرأة من نساء أهل الجنة اطّلعت على أهل الأرض لأضاءت ما بينهما، ولملأت ما بينهما ريحاً، ولَـنَصِيفُها على رأسها – يعني خمارَها – خير من الدنيا وما فيها »

“জান্নাতের কোন নারী যদি যমীনবাসীর উপর উঁকি মারত, তাহলে সমগ্র দুনিয়া আলোকিত হয়ে যেত, আসমান ও মধ্যবর্তী স্থান সুঘ্রাণে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। তাদের মাথার উপর যে ওড়না ব্যবহার করা হয়, দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে তা হতে অধিক উত্তম”। বুখারি হাদিস নং ৬৫৬৮, ২৭৯৬। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«أول زمرة يدخلون الجنة كأنّ وجوههم ضوء القمر ليلةَ البدر، والزمرة الثانية على لون أحسن كوكب دُرّيّ في السماء، لكل رجل منهم زوجتان من الحور العين، على كل زوجة سبعون حُلّة، يُرى مُخُّ سُوقهما من وراء لحومِهِما، وحُللهما، كما يُرى الشَّرابُ الأحمرُ في الزجاجة البيضاء »

“প্রথম দল যেটি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত উজ্জল হবে। আর দ্বিতীয় জামাত যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা আসমানে প্রজ্জলিত নক্ষত্র হতেও অধিক সুন্দর হবে। তাদের প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ‘হুরে ঈন’ থেকে দুটি করে স্ত্রী থাকবে। আর প্রতিটি স্ত্রীর জন্য সত্তুরটি চাদর থাকবে। তাদের পায়ের গোড়ালীর মগজ তাদের চামড়ার উপর থেকে দেখা যাবে। আর তাদের চাদরের সৌন্দর্য হল, সাদা কাঁচের গ্লাসে লাল মদের মত”। তাবরানী, আল-মু‘জাম আল-কাবীর ১৬০/১ হাদিস নং ১০৩২১, আল্লামা ইবুল কাইয়ুম রহ. হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ৩৪৬ কিতাবে লিখেন, এ হাদিসটির সনদ বুখারির শর্তানুযায় সহীহ। আর আল্লামা হাইসামী মাজমায়ুয যাওয়ায়েদ ৪১১/১০ কিতাবে লিখেন, ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত হাদিসটির সনদ বিশুদ্ধ।

জান্নাতীদের ঘর-বাড়ী, প্রাসাদ ও বাসস্থান সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত, যেমন আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

« أن النبي صلى الله عليه وسلم رأى امرأة وقصراً من ذهب لعمر في الجنة، »

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ ওমর রা. এর জান্নাতে একজন রমণী ও একটি স্বর্ণের প্রাসাদ দেখতে পান। বুখারি হাদিস নং: ৩২৪২, ৭০২৪ এবং মুসলিম: ২৩৪৯, ২৩৪৫ অপর একটি হাদিসে বর্ণিত-

«وجاء جبريل عليه السلام ، إلى النبي صلى الله عليه وسلم وأمره أن يبشّر خديجة ببيت في الجنة من قصبٍ، لا صَخَبَ فيه ولا نَصَبَ »

একবার জিবরীল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর নিকট এসে তাকে নির্দেশ দেন তিনি যেন খাদিজা রা. এ সু-সংবাদ দেন, জান্নাতে তার জন্য মণিমুক্তা দ্বারা একটি বাড়ী রয়েছে, যাতে কোন প্রকার ছিদ্র নাই এবং কোন ফাটল নাই। বুখারি হাদিস নং ৩৮২০ এবং মুসলিম ২৪৩২। এখানে قصب শব্দের অর্থ গোলাকার মণি মুক্তা। আবার কেউ কেউ বলেন, মণিমুক্তা ও ইয়াকুত পাথর খচিত ঘর। ফতহুল বারী ১৩৮/৭। ওসমান রা. হতে বর্ণিত রাসূল. বলেন,

« من بنى مسجداً لله بنى الله له بيتاً في الجنة »

“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তা’আলা জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করবে”। মুসলিম: ৫৩৩ বুখারি: ৪৫০ শব্দগুলো মুসলিমের। উম্মে হাবীবা রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«ما من مسلم يصلي لله كل يوم ثنتي عشرة ركعة تطوعاً غير فريضة إلا بنى الله له بيتاً في الجنة، أو إلا بُنِيَ له بيت في الجنة »

“যদি কোন ব্যক্তি প্রতিদিন ফরয সালাত ছাড়া বার রাকাত নফল সালাত আদায় করে, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ী বানাবে। অথবা তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ী বানানো হবে। সহীহ মুসলিম-৭২৮। ইমাম তিরমিযি ব্যখ্যা করে বলেন যে, এখানে সালাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সুন্নাতে রাওয়াতেব সমূহ।

আর কামরাবাসীদের জান্নাতে অধিক সম্মান ও উচ্চাসন থাকবে। এ কারণে আবু সাঈদ খুদরী রা. এর হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إن أهل الجنة ليتراءون أهل الغرف من فوقهم كما تتراءون الكوكب الدرّي الغابر من الأفق من المشرق أو المغرب، لتفاضل ما بينهم » ، قالوا: يا رسول الله: تلك منازل الأنبياء، لا يبلغها غيرهم، قال: «بلى، والذي نفسي بيده، رجال آمنوا بالله، وصدّقوا المرسلين »

“নিশ্চয় জান্নাতীরা জান্নাতে তাদের মাথার উপর থেকে কামরাবাসীদের দেখতে পাবে যেমনটি দেখতে পাবে প্রজ্জলিত নক্ষত্র আসমানের পশ্চিম বা পূর্ব প্রান্তে উদীয়মান। জান্নাতীদের মধ্যে তাদের মর্যাদা ও সম্মান অধিক হওয়ার কারণে। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল, এতো নবীদের স্তর। এ স্তরে নবীরা ছাড়া অন্য কেউ পৌছতে পারবে না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বললেন, হ্যাঁ, আমি সে সত্ত্বার কসম করে বলছি যার হাতে আমার জীবন, তারা হল, ঐ সব লোক যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নবীদের বিশ্বাস করেছেন। সহীহ মুসলিম-২৮৩১। ]

  • চার, পাঁচ: জান্নাতীদের খাদ্য ও পানীয়:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَبَشِّرِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ كُلَّمَا رُزِقُواْ مِنۡهَا مِن ثَمَرَةٖ رِّزۡقٗا قَالُواْ هَٰذَا ٱلَّذِي رُزِقۡنَا مِن قَبۡلُۖ وَأُتُواْ بِهِۦ مُتَشَٰبِهٗاۖ وَلَهُمۡ فِيهَآ أَزۡوَٰجٞ مُّطَهَّرَةٞۖ وَهُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٢٥﴾ [البقرة: ٢٥]

“আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। যখনই তাদেরকে জান্নাত থেকে কোন ফল খেতে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘এটা তো পূর্বে আমাদেরকে খেতে দেয়া হয়েছিল’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করে এবং তাদের জন্য তাতে থাকবে পূতঃপবিত্র স্ত্রীগণ এবং তারা সেখানে হবে স্থায়ী”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي ظِلَٰلٖ وَعُيُونٖ ٤١ وَفَوَٰكِهَ مِمَّا يَشۡتَهُونَ ٤٢ كُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ هَنِيٓ‍َٔۢا بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٤٣ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٤٤ ﴾ [المرسلات: ٤١، ٤٤]

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া ও ঝর্ণা-বহুল স্থানে, আর ফলমূল-এর মধ্যে, যা তারা চাইবে। (তাদেরকে বলা হবে) ‘তোমরা যে আমল করতে তার প্রতিদানস্বরূপ তৃপ্তির সাথে পানাহার কর; সৎকর্ম-শীলদের আমরা এমন-ই প্রতিদান দিয়ে থাকি” [সূরা আল-মুরসালাত, আয়াত: ৪১-৪৪]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَفَٰكِهَةٖ مِّمَّا يَتَخَيَّرُونَ ٢٠ وَلَحۡمِ طَيۡرٖ مِّمَّا يَشۡتَهُونَ ٢١﴾ [الواقعة: ٢٠، ٢١]

“আর (ঘোরাফেরা করবে) তাদের পছন্দমত ফল নিয়ে। আর পাখির গোস্ত নিয়ে, যা তারা কামনা করবে” [সূরা আল-ওয়াকেয়া, আয়াত: ২০, ২১]

জাবের ইব্ন আব্দুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«يأكل أهل الجنة فيها ويشربون، ولا يتغوّطون، ولا يمتخّطون، ولا يبولون، ولكن طعامهم ذاك جشاء كرشح المسك، يُلهَمون التسبيح والتحميد كما يُلهَمون النَّفَس »

“জান্নাতীরা জান্নাতে খাবে এবং পান করবে, কিন্তু তারা জান্নাতে পেশাব পায়খানা করবে না এবং তাদের নাক দিয়ে কোন সর্দি বের হবে না। তাদের খাদ্যগুলো হবে মিসকের ফোটার মত একটি ঢেকুর মাত্র। তাদের মুখ থেকে তাসবীহ ও তাহমীদ নিশ্বাসের মত বের হতে থাকবে। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ ও নেয়ামতসমূহের বর্ণনা। পরিচ্ছেদ: জান্নাত ও জান্নাতীদের গুনাগুণের বর্ণনা এবং তাদের তাসবীহ- হাদিস নং ২৮৩৫।

জান্নাতীদের আল্লাহ তা’আলা কত নেয়ামত দান করবেন তা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যেমন আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« يقول الله تعالى: أعددت لعبادي الصالحين ما لا عين رأت، ولا أذن سمعت، ولا خطر على قلب بشر، فاقرأوا إن شئتم: ﴿فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٞ مَّآ أُخۡفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعۡيُنٖ جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٧﴾ [السجدة: ١٧]

“অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ”।[সূরা আস-সাজদা, আয়াত: ১৭] আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস তৈরি করেছি যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কখনো তা চিন্তা করেনি। তোমরা যদি চাও এ কথার সমর্থনে এ আয়াত-﴿ فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٞ مَّآ أُخۡفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعۡيُنٖ جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٧ ﴾ [السجدة: ١٧] “অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ”। [সূরা সেজদা, আয়াত: ১৭] – তিলাওয়াত করতে পার। বুখারি-৩২৪৪, মুসলিম-২৮২৪। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«أول زمرة تدخل الجنة على صورة القمر ليلة البدر، ثم الذين يلونهم على أشدّ كوكب دُرّيٍّ في السماء إضاءة: لا يبولون، ولا يتغوّطون، ولا يتفلون، ولا يمتخّطون، أمشاطهم الذهب، ورشحهم المسك، ومجامرهم الألوّة الأنجوم عود الطيب، وأزواجهم الحور العين، على خلق رجل واحد، على صورة أبيهم آدم ستون ذراعاً في السماء»

“সর্ব প্রথম যে দলটি জান্নাতের প্রবেশ করবে তার আকৃতি হবে চৌদ্দ তারিখের চাঁদের আকৃতি। তারপর যারা তাদের কাছাকাছি জান্নাতের প্রবেশ করবেন, তাদের আকৃতি হবে আকাশে প্রজ্জলিত নক্ষত্রের মত, তারা সেখানে পেশাব করবে না, পায়খানা করবে না, তাদের কোন থুথু হবে না, তাদের চিরনি হবে স্বর্ণের, তাদের ঘাম হবে মিশকের, তাদের স্ত্রীরা হবে ডাগর চোখ বিশিষ্ট হুর। তাদেরকে একই ব্যক্তির আকৃতিতে সৃষ্টি করা হবে। অর্থাৎ, তাদের পিতা আদম আ. এর আকৃতি। তাদের দৈর্ঘ্য হবে ষাট গজ। অপর এক বর্ণনায় বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«… ولكل واحد منهم زوجتان، كل واحدة منهما يُرى مخُّ ساقها من وراء اللحم من الحسن، لا اختلاف بينهم ولا تباغض، قلوبهم على قلب رجل واحد »، [البخاري، 3245، 3246، 3254، 3327، ومسلم، برقم 2834]

“প্রতিটি জান্নাতীর জন্য দু’জন করে স্ত্রী থাকবে, তারা এত সুন্দর হবে, তাদের চামড়ার উপর দিয়ে তাদের পায়ের গোড়ালীর মগজ পর্যন্ত দেখা যাবে। জান্নাতীদের মধ্যে কোন ধরনের বিভেদ ও মতবিরোধ থাকবে না, কোন ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। তাদের অন্তর এক ব্যক্তির অন্তরের মত হবে। বুখারি: ৩২৪৫, ৩২৪৬, ৩৩২৭ এবং মুসলিম, ২৮৩৪।

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আরও বলেন,

« وأبواب الجنة ثمانية، ما بين مصراعين من مصاريع الجنة مسيرة أربعين سنة، وليأتين عليها يوم وهو كظيظ من الزحام » [مسلم، برقم 234، ورقم 2967].

“জান্নাতের দরজাসমূহ আটটি। জান্নাতের দরজাসমূহের দুটি চৌকাটের দূরত্ব চল্লিশ বছরের দূরত্বের সমান। অচীরেই তার উপর এমন একটি দিন আসবে সেদিন মানুষের ভিড়ের কারণে জান্নাতের দরজাগুলো লোকারণ্য থাকবে। মুসলিম: হাদিস নং ২৩৪, ২৯৬৭।

« وأول من يدخل الجنة فيستفتح فتفتح له أبوابها محمد صلى الله عليه وسلم،» [مسلم، برقم 196، 197] .

 

‘সর্ব প্রথম যিনি জান্নাতে প্রবেশ করবে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’। তিনি দরজা খুলে দেয়ার জন্য অনুমতি চাইলে তার জন্য দরজা খুলে দেয়া হবে। [মুসলিম: ১৯৬, ১৯৭] জান্নাতের স্তরসমূহ: সবোর্চ্চ স্তর হল, ‘ওয়াসিলা’ – এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর জন্য খাস। এটি আল্লাহর আরশের অতি কাছের একটি স্তর এবং আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। মুসলিম: ৩৮৪, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেমের হাদীয়ূল আরওয়াহ পৃ: ৯৯।

জান্নাতুল ফিরদাউস: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«إن في الجنة مائة درجة أعدّها الله للمجاهدين في سبيله، كل درجتين ما بينهما كما بين السماء والأرض، فإذا سألتم الله فاسألوه الفردوس، فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن» [البخاري، 2790، 7423]،

“জান্নাতে একশটি স্তর আছে এ সব স্তরসমূহকে আল্লাহ তা’আলা আল্লাহর রাহের মুজাহিদদের জন্য তৈরি করেছেন, দুটি দরজার মধ্যবর্তী স্থানের দূরত্ব আসমান ও যমীনের দূরত্বের সমান। আর যখন তোমরা জান্নাত কামনা কর, তখন তোমরা জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা কর। কারণ এটি জান্নাতের মধ্যমণি এবং উন্নত জান্নাত। তার উপর রয়েছে আল্লাহর আরশ। বুখারি ২৭৯০,৭৪২৩। আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এরশাদ করেন-

«أنه يقال لصاحب القرآن يوم القيامة إذا دخل الجنة: اقرأ واصعد، فيقرأ ويصعد بكل آية درجة، حتى يقرأ آخر شيء معه » [أحمد في المسند، 3/40]،

“কিয়ামতের দিন কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, যখন সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তুমি তিলাওয়াত কর এবং উপরের দিক উঠতে থাক তখন সে প্রতি আয়াত তিলাওয়াতের অনুকুলে জান্নাতের একটি স্তর অতিক্রম করতে থাকবে। এভাবে চলতে চলতে শেষ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করবে”। আহমদ রহ. মুসনাদ [৪০/৩]।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«يُقال لصاحب القرآن: اقرأ، وارقَ، ورتِّل كما كنت تُرتّل في الدنيا، فإن منزلتك عند آخر آية تقرؤها» [الترمذي، برقم 3003، وأحمد، 2/192، وحسنه الألباني في صحيح الترمذي، 3/10].

কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, তুমি কুরআন পড় এবং উপরের দিক উঠতে থাক। দুনিয়াতে তুমি যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে, সেভাবে তিলাওয়াত কর। কারণ, তোমার অবস্থান শেষ আয়াত যা তুমি দুনিয়াতে তিলাওয়াত করতে”। [তিরমিযি ৩০০৩, আহমদ: ১৯২/২, আল্লামা আলবানী সহীহ তিরমিযি ১০/৩ তে হাদীসটিকে সহীহ আখ্যায়িত করেন] মোট কথা জান্নাতীদের জন্য জান্নাতে রয়েছে তাদের মন যা চায়। চোখে যা দেখতে পায়। সাধারণ একজন জান্নাতীকে বলা হবে,

«ولك ما اشتهت نفسك، ولذّت عينك» [انظر: سورة الزخرف، الآيات: 70-73، ومسلم، برقم 189].

“তোমার জন্য রয়েছে, তোমার মন যা চায়, তা এবং তোমার চোখ যাতে খুশি হয় তা। দেখুন- [সূরা যুখরফ, আয়াত: ৭০-৭৩, মুসলিম হাদীস নং: ১৮৯]

আর মুমিনদের জন্য জান্নাতে সব চেয়ে বড় নেয়ামত হল, আল্লাহর চেহারার দিকে তাকানো। সুহাইব রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«إذا دخل أهل الجنة الجنة يقول الله تعالى: تريدون شيئاً أزيدكم؟ فيقولون: ألم تُبيِّض وجوهنا، وتدخلنا الجنة وتنجِّنا من النار؟ فيكشف الحجاب، فما أُعطوا شيئاً أحبّ إليهم من النظر إلى ربهم » [مسلم، برقم 181].

“যখন জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা’আলা জান্নাতীদের বলবে, তোমরা আর কিছু চাও? আমি তোমাদের বাড়িয়ে দেব। তখন তারা বলবে, তুমি কি আমাদের চেহারাকে উজ্জল করনি? আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? এবং জাহান্নাম হতে নাজাত দাওনি? তারপর আল্লাহ তা’আলা তার আবরণ খুলে দেবে। জান্নাতীদের জন্য আল্লাহর দিকে তাকানোর চেয়ে অধিক উত্তম কোন নেয়ামত তাদের দেয়া হয়নি”। [মুসলিম: হাদিস নং: ১৮১] ]


জাহান্নামীদের শাস্তি :

  • প্রথম বিষয়: মনস্তাত্বিক শাস্তি বা মানসিক আযাব: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَقَالَ ٱلشَّيۡطَٰنُ لَمَّا قُضِيَ ٱلۡأَمۡرُ إِنَّ ٱللَّهَ وَعَدَكُمۡ وَعۡدَ ٱلۡحَقِّ وَوَعَدتُّكُمۡ فَأَخۡلَفۡتُكُمۡۖ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيۡكُم مِّن سُلۡطَٰنٍ إِلَّآ أَن دَعَوۡتُكُمۡ فَٱسۡتَجَبۡتُمۡ لِيۖ فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوٓاْ أَنفُسَكُمۖ مَّآ أَنَا۠ بِمُصۡرِخِكُمۡ وَمَآ أَنتُم بِمُصۡرِخِيَّ إِنِّي كَفَرۡتُ بِمَآ أَشۡرَكۡتُمُونِ مِن قَبۡلُۗ إِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ ٢٢﴾ [ابراهيم: ٢٢]

“আর যখন যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তবে আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, এখন আমি তা ভঙ্গ করলাম। তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, আর তোমরা আমার দাওয়াতে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করো না, বরং নিজদেরকেই ভর্ৎসনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, আর তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা আমাকে যার সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয় আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব’ [এ বিষয়টির উপর আল-ইবন আব্দুর রহমান রহ. স্বীয় কিতাব ‘ফাওযুল আযীম’-এ পাঠকের উপকারার্থে অনেক গুলো আয়াত উল্লেখ করেন। যেমন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

 

 

﴿أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥ قَالُواْ رَبَّنَا غَلَبَتۡ عَلَيۡنَا شِقۡوَتُنَا وَكُنَّا قَوۡمٗا ضَآلِّينَ ١٠٦ رَبَّنَآ أَخۡرِجۡنَا مِنۡهَا فَإِنۡ عُدۡنَا فَإِنَّا ظَٰلِمُونَ ١٠٧ قَالَ ٱخۡسَ‍ُٔواْ فِيهَا وَلَا تُكَلِّمُونِ ١٠٨ إِنَّهُۥ كَانَ فَرِيقٞ مِّنۡ عِبَادِي يَقُولُونَ رَبَّنَآ ءَامَنَّا فَٱغۡفِرۡ لَنَا وَٱرۡحَمۡنَا وَأَنتَ خَيۡرُ ٱلرَّٰحِمِينَ ١٠٩ فَٱتَّخَذۡتُمُوهُمۡ سِخۡرِيًّا حَتَّىٰٓ أَنسَوۡكُمۡ ذِكۡرِي وَكُنتُم مِّنۡهُمۡ تَضۡحَكُونَ ١١٠ إِنِّي جَزَيۡتُهُمُ ٱلۡيَوۡمَ بِمَا صَبَرُوٓاْ أَنَّهُمۡ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ١١١﴾ [المؤمنون: ١٠٥، ١١١]

 

‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না?’ তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে’। তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব, দুর্ভাগ্য আমাদেরকে পেয়ে বসেছিল, আর আমরা ছিলাম পথভ্রষ্ট’। ‘হে আমাদের রব, এ থেকে আমাদেরকে বের করে দিন, তারপর যদি আমরা আবার তা করি তবে অবশ্যই আমরা হব যালিম। ’আল্লাহ বলবেন, ‘তোমরা ধিকৃত অবস্থায় এখানেই থাক, আর আমার সাথে কথা বলো না।’ আমার বান্দাদের একদল ছিল যারা বলত, ‘হে আমাদের রব, আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদেরকে ক্ষমা ও দয়া করুন,আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। তারপর তাদেরকে নিয়ে তোমরা ঠাট্টা করতে। অবশেষে তা তোমাদেরকে আমার স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছিল। আর তোমরা তাদের নিয়ে হাসি-তামাশা করতে।’ নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। [সূরা আল-মুমিন, আয়াত: ১০৫-১১১] আল্লাহ বলেন,

 

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ يُنَادَوۡنَ لَمَقۡتُ ٱللَّهِ أَكۡبَرُ مِن مَّقۡتِكُمۡ أَنفُسَكُمۡ إِذۡ تُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلۡإِيمَٰنِ فَتَكۡفُرُونَ ١٠ قَالُواْ رَبَّنَآ أَمَتَّنَا ٱثۡنَتَيۡنِ وَأَحۡيَيۡتَنَا ٱثۡنَتَيۡنِ فَٱعۡتَرَفۡنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلۡ إِلَىٰ خُرُوجٖ مِّن سَبِيلٖ ١١ ذَٰلِكُم بِأَنَّهُۥٓ إِذَا دُعِيَ ٱللَّهُ وَحۡدَهُۥ كَفَرۡتُمۡ وَإِن يُشۡرَكۡ بِهِۦ تُؤۡمِنُواْۚ فَٱلۡحُكۡمُ لِلَّهِ ٱلۡعَلِيِّ ٱلۡكَبِيرِ ١٢ ﴾ [غافر: ١٠، ١٢]

 

“নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে তাদেরকে উচ্চকণ্ঠে বলা হবে; ‘তোমাদের নিজদের প্রতি তোমাদের (আজকের) এ অসন্তোষ অপেক্ষা অবশ্যই আল্লাহর অসন্তোষ অধিকতর ছিল, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল তারপর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে’। তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে দু’বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু’বার জীবন দিয়েছেন। অতঃপর আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি। অতএব (জাহান্নাম থেকে) বের হবার কোন পথ আছে কি’? [তাদেরকে বলা হবে] ‘এটা তো এজন্য যে, যখন আল্লাহকে এককভাবে ডাকা হত তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে আর যখন তাঁর সাথে শরীক করা হত তখন তোমরা বিশ্বাস করতে। সুতরাং যাবতীয় কর্তৃত্ব সমুচ্চ, মহান আল্লাহর’। [সূরা গাফের, আয়াত: ১০, ১২] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

 

﴿ وَقَالَ ٱلَّذِينَ فِي ٱلنَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ٱدۡعُواْ رَبَّكُمۡ يُخَفِّفۡ عَنَّا يَوۡمٗا مِّنَ ٱلۡعَذَابِ ٤٩ قَالُوٓاْ أَوَ لَمۡ تَكُ تَأۡتِيكُمۡ رُسُلُكُم بِٱلۡبَيِّنَٰتِۖ قَالُواْ بَلَىٰۚ قَالُواْ فَٱدۡعُواْۗ وَمَا دُعَٰٓؤُاْ ٱلۡكَٰفِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَٰلٍ ٥٠ ﴾ [غافر: ٤٩، ٥٠]

 

“আর যারা আগুনে থাকবে তারা আগুনের দারোয়ানদেরকে বলবে, ‘তোমাদের রবকে একটু ডাকো না! তিনি যেন একটি দিন আমাদের আযাব লাঘব করে দেন।’ তারা বলবে, ‘তোমাদের কাছে কি সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তোমাদের রাসূলগণ আসেনি’? জাহান্নামীরা বলবে, ‘হ্যাঁ অবশ্যই’। দারোয়ানরা বলবে, ‘তবে তোমরাই দো‘আ কর। আর কাফিরদের দো‘আ কেবল নিষ্ফলই হয়”। [সূরা গাফের, আয়াত: ৪৯, ৫০] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

 

﴿ وَنَادَوۡاْ يَٰمَٰلِكُ لِيَقۡضِ عَلَيۡنَا رَبُّكَۖ قَالَ إِنَّكُم مَّٰكِثُونَ ٧٧ لَقَدۡ جِئۡنَٰكُم بِٱلۡحَقِّ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَكُمۡ لِلۡحَقِّ كَٰرِهُونَ ٧٨ ﴾ [الزخرف: ٧٧، ٧٨]

 

“তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালিক, তোমার রব যেন আমাদেরকে শেষ করে দেন’। সে বলবে, ‘নিশ্চয় তোমরা অবস্থানকারী’।‘অবশ্যই তোমাদের কাছে আমি সত্য নিয়ে এসেছিলাম; কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই ছিলে সত্য অপছন্দকারী”[সূরা যুখরফ, আয়াত: ৭৭, ৭৮]

 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

 

﴿ وَنَادَىٰٓ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَنَّةِ أَصۡحَٰبَ ٱلنَّارِ أَن قَدۡ وَجَدۡنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقّٗا فَهَلۡ وَجَدتُّم مَّا وَعَدَ رَبُّكُمۡ حَقّٗاۖ قَالُواْ نَعَمۡۚ فَأَذَّنَ مُؤَذِّنُۢ بَيۡنَهُمۡ أَن لَّعۡنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ ٤٤ ﴾ [الاعراف: ٤٤]

 

“আর জান্নাতের অধিবাসীগণ আগুনের অধিবাসীদেরকে ডাকবে যে, ‘আমাদের রব আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছেন তা আমরা সত্য পেয়েছি। সুতরাং তোমাদের রব তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছেন, তা কি তোমরা সত্যই পেয়েছ’? তারা বলবে, ‘হ্যাঁ’। অতঃপর এক ঘোষক তাদের মধ্যে ঘোষণা দেবে যে, আল্লাহর লা’নত যালিমদের উপর”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৪৪] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

 

﴿ وَنَادَىٰٓ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِ أَصۡحَٰبَ ٱلۡجَنَّةِ أَنۡ أَفِيضُواْ عَلَيۡنَا مِنَ ٱلۡمَآءِ أَوۡ مِمَّا رَزَقَكُمُ ٱللَّهُۚ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ حَرَّمَهُمَا عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ ٥٠ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ دِينَهُمۡ لَهۡوٗا وَلَعِبٗا وَغَرَّتۡهُمُ ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَاۚ فَٱلۡيَوۡمَ نَنسَىٰهُمۡ كَمَا نَسُواْ لِقَآءَ يَوۡمِهِمۡ هَٰذَا وَمَا كَانُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا يَجۡحَدُونَ ٥١ ﴾ [الاعراف: ٥٠، ٥١]

 

“আর আগুনের অধিবাসীরা জান্নাতের অধিবাসীদেরকে ডেকে বলবে, ‘আমাদের উপর কিছু পানি অথবা তোমাদেরকে আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তা ঢেলে দাও’। তারা বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা কাফিরদের উপর হারাম করেছেন’। ‘যারা তাদের ধর্মকে গ্রহণ করেছে খেলা ও তামাশারূপে এবং তাদেরকে দুনিয়ার জীবন প্রতারিত করেছে’। সুতরাং আজ আমি তাদেরকে ভুলে যাব, যেমন তারা তাদের এই দিনের সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিল। আর (যেভাবে) তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫০, ৫১]]

জাহান্নামীদের জন্য সবচেয়ে বড় আযাব হল, আল্লাহর দর্শন থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়া। জাহান্নামীদের মাঝে আর আল্লাহর মাঝে একটি পর্দা থাকবে। ফলে তারা আল্লাহকে দেখতে পাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿كَلَّآ إِنَّهُمۡ عَن رَّبِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ لَّمَحۡجُوبُونَ ١٥ ثُمَّ إِنَّهُمۡ لَصَالُواْ ٱلۡجَحِيمِ ١٦ ثُمَّ يُقَالُ هَٰذَا ٱلَّذِي كُنتُم بِهِۦ تُكَذِّبُونَ ١٧﴾ [المطففين: ١٥، ١٧]

“কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে। তারপর নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। তারপর বলা হবে, এটাই তা যা তোমরা অস্বীকার করতে” [সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৫, ১৭]

  • দ্বিতীয় বিষয় : জাহান্নামীদের দৈহিক শাস্তি

জাহান্নামীদের সবচেয়ে বড় শাস্তি হল, তাদের মধ্যে যারা কাফের ও মুনাফেক তারা চিরকাল জাহান্নামের অবস্থান করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ বিষয়ে এরশাদ করে বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُجۡرِمِينَ فِي عَذَابِ جَهَنَّمَ خَٰلِدُونَ ٧٤ لَا يُفَتَّرُ عَنۡهُمۡ وَهُمۡ فِيهِ مُبۡلِسُونَ ٧٥ ﴾ [الزخرف: ٧٤، ٧٥]

“নিশ্চয় অপরাধীরা জাহান্নামের আযাবে স্থায়ী হবে; তাদের থেকে আযাব কমানো হবে না এবং তাতে তারা হতাশ হয়ে পড়বে” [সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭৪,৭৫]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করে বলেন,

﴿فَذُوقُواْ فَلَن نَّزِيدَكُمۡ إِلَّا عَذَابًا ٣٠﴾ [النبا: ٣٠]

“সুতরাং তোমরা স্বাদ গ্রহণ কর। আর আমি তো কেবল তোমাদের আযাবই বৃদ্ধি করব” সূরা আন-নাবা, আয়াত: ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿ وَسُقُواْ مَآءً حَمِيمٗا فَقَطَّعَ أَمۡعَآءَهُمۡ ١٥ ﴾ [محمد: ١٥]

“এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নÑবিচ্ছিন্ন করে দেবে [সূরা মুহাম্মদ: আয়াত: ১৫]

আল্লামা সা’দী রহ. বলেন, তাদেরকে জাহান্নামে অত্যন্ত গরম পানি পান করানো হবে [আব্দুর রহমান নাসের আসসা’দী, তাফসীরুল করিম আররহমান পৃ: ৭৮৬]

জাহান্নামীদের আরেকটি শাস্তি হল, জাহীম ও যাক্কুম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ِإنَّ شَجَرَتَ ٱلزَّقُّومِ ٤٣ طَعَامُ ٱلۡأَثِيمِ ٤٤ كَٱلۡمُهۡلِ يَغۡلِي فِي ٱلۡبُطُونِ ٤٥ كَغَلۡيِ ٱلۡحَمِيمِ ٤٦ خُذُوهُ فَٱعۡتِلُوهُ إِلَىٰ سَوَآءِ ٱلۡجَحِيمِ ٤٧ ثُمَّ صُبُّواْ فَوۡقَ رَأۡسِهِۦ مِنۡ عَذَابِ ٱلۡحَمِيمِ ٤٨ ذُقۡ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡكَرِيمُ ٤٩﴾ [الدخان: ٤٣، ٤٩]

“নিশ্চয় যাক্কূম বৃক্ষ, পাপীর খাদ্য ; গলিত তামার মত, উদরসমূহে ফুটতে থাকবে। ফুটন্ত পানির মত, (বলা হবে) ‘ওকে ধর, অতঃপর তাকে জাহান্নামের মধ্যস্থলে টেনে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে দাও। (বলা হবে) ‘তুমি আস্বাদন কর, নিশ্চয় তুমিই সম্মানিত, অভিজাত” [সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ৪৩-৪৯]

আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা সা’দী রহ. বলেন[আল্লামা সা’দী, তাইসীরুল কারিম আররহমান পৃ: ৭৭৪] [মানুষকে ভয় দেখানো এবং সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা তার স্বীয় কিতাব কুরআন কারীমে জাহান্নামের শাস্তির কথা অনেকবার উল্লেখ করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ হাদীসে অসংখ্যবার জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱلنَّارَ ٱلَّتِي وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَٰفِرِينَ ٢٤ ﴾ [البقرة: ٢٤]

 

“তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৪] আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

 

﴿فَأَنذَرۡتُكُمۡ نَارٗا تَلَظَّىٰ ١٤ لَا يَصۡلَىٰهَآ إِلَّا ٱلۡأَشۡقَى ١٥ ٱلَّذِي كَذَّبَ وَتَوَلَّىٰ ١٦ ﴾ [الليل: ١٤، ١٦]

 

অতএব আমি তোমাদের সতর্ক করে দিয়েছি লেলিহান আগুন সম্পর্কে, তাতে নিতান্ত হতভাগা ছাড়া কেউ প্রবেশ করবে না; যে অস্বীকার করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। [সূরা আল-লাইল, আয়াত: ১৪, ১৬]

 

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ নিজেও মানুষকে জাহান্নামের আগুন ও শাস্তি হতে ভয় দেখান ও সতর্ক করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

 

« أنا آخذ بحُجَزكم عن النار، هلمَّ عن النار هلمَّ عن النار، فتغلبوني تقحمون فيها » [مسلم، 2284].

“আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য তোমাদের কোমর পেঁচিয়ে ধরব। আর তোমাদের বলতে থাকব, জাহান্নাম থেকে দূর হও, জাহান্নাম থেকে দূর হও। কিন্তু তোমরা আমাকে পরাহত করবে, তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [মুসলিম, হাদিস নং: ২২৮৪]কিয়ামত দিবসের কথা আলোচনা করার পর, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জানিয়ে দেন যে, মানুষকে সেদিন দুটি ভাগে ভাগ করা হবে। একদল জান্নাতে যাবে এবং একদল জাহান্নামে যাবে। যারা জাহান্নামে যাবে তারা অপরাধী যারা আল্লাহর নাফরমানি ও আল্লাহর সাথে কুফরী করেছিল। আর তাদের খাদ্য হবে, জাক্কুম বৃক্ষ। এটি একটি অতীব খারাপ ও ভয়ানক বৃক্ষ। আর তাদের খাদ্য হবে দুর্গন্ধযুক্ত, পঁচা গলা পিতের মত। যার গন্ধ ও স্বাদ হবে খুব তীক্ত ও অসহনীয়। আর তাদের দেয়া হবে, গরম খাওয়ার, তা তাদের উদরসমূহে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত গরম পানির মত। আযাবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বলা হবে, তুমি বেদনাদায়ক শাস্তি ও ভয়াবহ আযাব উপভোগ করতে থাক। [إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡكَرِيمُ] অর্থাৎ তোমার বিশ্বাস অনুযায়ী তুমি শক্তিশালী তুমি নিজেকে আল্লাহর আযাব হতে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। আর তুমি আল্লাহর নিকট সম্মানী। তোমাকে কোন শাস্তি স্পর্শ করবে না। কিন্তু মনে রাখবে, আজকের দিন তুমি বুঝতে পারবে তুমি কি সম্মানী নাকি নিকৃষ্ট, অপমানিত ও লাঞ্ছিত

[আল্লাহ তা’আলা যে ভয় দেখান তার একটি প্রমাণ হল, আল্লাহ জাহান্নামের দরজাসমূহের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

﴿وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوۡعِدُهُمۡ أَجۡمَعِينَ ٤٣ لَهَا سَبۡعَةُ أَبۡوَٰبٖ لِّكُلِّ بَابٖ مِّنۡهُمۡ جُزۡءٞ مَّقۡسُومٌ ٤٤ ﴾ [الحجر: ٤٣، ٤٤]

‘আর নিশ্চয় জাহান্নাম তাদের সকলের প্রতিশ্রুত স্থান’। ‘তার সাতটি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দরজার জন্য রয়েছে তাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী’। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৪৩, ৪৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বর্ণনা দেন- «أن أهل النار يلعن بعضهم بعضاً، وكلما دخلت أمة لعنت أختها، জাহান্নামীরা একে অপরের উপর অভিশাপ করবে, যখনই একটি জামাত জাহান্নামে প্রবেশ করবে, অপর জামাত তাদের অভিশাপ দেবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

أن عمق النار في دركاتها سبعون عاماً يقول: « هذا حجر رُمي به في النار منذ سبعين خريفاً، فهو يهوي في النار الآن حتى انتهى إلى قعرها» [مسلم، برقم 2844].

“জাহান্নামের গভীরতা সত্তুর বছরের রাস্তা। তিনি বলেন, এটি একটি পাথর যাকে সত্তুর বছর থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আর সেটি এখন পর্যন্ত নীচের দিকে যাচ্ছে। পাথরটি ততদিন পর্যন্ত জাহান্নামে যেতে থাকবে যতদিন সে তার একেবারে গভীরে না পৌঁছবে। [মুসলিম, হাদিস নং: ২৮৪৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আরও বলেন,

«أن أهون أهل النار عذاباً يوم القيامة رجل على أخمص قدميه جمرتان يغلي منهما دماغه كما يغلي المرجل، ما يرى أن أحداً أشدّ منه عذاباً» [مسلم، برقم 213].

“কিয়ামতের দিন সর্বাধিক হালকা আযাব যাকে দেয়া হবে, সে হল, ঐ ব্যক্তি যাকে আগুনের কয়লার দুটি জুতো পরানো হবে। তার মগজ এরকম টগবগ করতে থাকবে যেমনটি টগবগ করতে থাকে পাতিলের গরম পানি। অথচ সে তার মত এত কষ্ট বা শাস্তি আর কাউকে দিচ্ছে বলে বিশ্বাস করতে পারবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’বলেন,

« يُؤتى بجهنم يوم القيامة لها سبعون ألف زمام، مع كل زمام سبعون ألف مَلَك يجرّونها » [مسلم، برقم 2842].

“কিয়ামতের জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, তখন তার জন্য সত্তরটি লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে সত্তুর হাজার ফেরেশতা থাকবে তারা জাহান্নাম টেনে নিয়ে আসবে। মুসলিম, হাদিস নং ২৮৪২। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿ ٖ يُصَبُّ مِن فَوۡقِ رُءُوسِهِمُ ٱلۡحَمِيمُ ١٩ يُصۡهَرُ بِهِۦ مَا فِي بُطُونِهِمۡ وَٱلۡجُلُودُ ٢٠ ﴾ [الحج: ١٩، ٢٠]

“তাদের মাথার উপর থেকে ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি। যার দ্বারা তাদের পেটের অভ্যন্তরে যা কিছু রয়েছে তা ও তাদের চামড়াসমূহ বিগলিত করা হবে”। [ সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ১৯, ২০] আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

﴿ وَتَرَى ٱلۡمُجۡرِمِينَ يَوۡمَئِذٖ مُّقَرَّنِينَ فِي ٱلۡأَصۡفَادِ ٤٩ سَرَابِيلُهُم مِّن قَطِرَانٖ وَتَغۡشَىٰ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ ٥٠ ﴾ [ابراهيم: ٤٩، ٥٠]

“আর সে দিন তুমি অপরাধীদের দেখবে তারা শিকলে বাঁধা। তাদের পোশাক হবে আলকাতরার এবং আগুন তাদের চেহারাসমূহকে ঢেকে ফেলবে”। [সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪৯, ৫০]

আল্লাহ তা’আলা জাহান্নামীদের দেহকে জাহান্নামে বড় করে দেবেন যাতে তাদের কষ্ট বেশি হয়। যেমন আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« ما بين منكبي الكافر مسيرة ثلاثة أيام للراكب المسرع » [البخاري، برقم 6552، ومسلم، برقم 2852]

“একজন কাফেরের কাঁধ একজন দ্রূতগামী আরোহীর তিন দিনের রাস্তার সমান চওড়া। [বুখারি হাদিস নং: ৬৫৫২, মুসলিম হাদিস নং: ২৮৫২] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আরও বলেন,

« ضرس الكافر أو ناب الكافر مثل أحد، وغِلَظُ جلده مسيرة ثلاث » [مسلم، برقم 2851].

“একজন কাফেরের দাঁত ওহুদ পাহাড়েরর সমান। আর তার চামড়া মোটা হওয়ার দূরত্ব তিন দিনের পথ। [মুসলিম, হাদিস নং: ২৮৫১]

জাহান্নামীরা কিয়ামত দিবসে তারা নিজেরাও ক্ষতির সম্মূখীন হবে এবং তাদের পরিবার পরিজনদেরও ক্ষতির সম্মূখীন করবে। আর এটি তাদের জন্য সু-স্পষ্ট ক্ষতি, আল্লাহর নিকট আমরা জাহান্নাম হতে আশ্রয় চাই। জাহান্নামীদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا سَوۡفَ نُصۡلِيهِمۡ نَارٗا كُلَّمَا نَضِجَتۡ جُلُودُهُم بَدَّلۡنَٰهُمۡ جُلُودًا غَيۡرَهَا لِيَذُوقُواْ ٱلۡعَذَابَۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمٗا ٥٦ ﴾ [النساء: ٥٦]

“নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব আগুনে। যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে তখনই আমি তাদেরকে পালটে দেব অন্য চামড়া দিয়ে যাতে তারা আস্বাদন করে আযাব। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿ يَوۡمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمۡ فِي ٱلنَّارِ يَقُولُونَ يَٰلَيۡتَنَآ أَطَعۡنَا ٱللَّهَ وَأَطَعۡنَا ٱلرَّسُولَا۠ ٦٦ ﴾ [الاحزاب: ٦٦]

“যেদিন তাদের চেহারাগুলো আগুনে উপুড় করে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসূলের আনুগত্য করতাম”! [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৬] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করে বলেন,

﴿ يَوۡمَ يُسۡحَبُونَ فِي ٱلنَّارِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمۡ ذُوقُواْ مَسَّ سَقَرَ ٤٨ ﴾ [القمر: ٤٨]

“সেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নেয়া হবে। (বলা হবে) জাহান্নামের ছোঁয়া আস্বাদন কর”। [সূরা আল-কামার, আয়াত: ৪৮] হাদিসে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«يحشر المتكبرون يوم القيامة أمثال الذر في صور الرجال، يغشاهم الذل من كل مكان، يُساقون إلى سجن في جهنم، يُسمَّى بولس، تعلوهم نارُ الأنيار، يسقون من عصارة أهل النار طينة الخَبَال » [الترمذي، برقم 2623، وأحمد، 2/189، وحسنه الألباني في صحيح الترمذي، 2/304].

“কিয়ামতের দিন অহংকারীদের একজন মানুষের আকৃতিতে অণুকণার মত করে একত্র করা হবে। তাদের চতুর্দিক থেকে অপমান ও লাঞ্ছনা গ্রাস করে ফেলবে। তাদেরকে জাহান্নামের মধ্যে বুলস নামক জেল খানায় টেনে নেয়া হবে। তাদের মাথার উপর থাকবে জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুন। তাদের পান করানো হবে, জাহান্নামীদের দেহের পঁচা-গন্ধ পুজ ইত্যাদি”। তিরমিযি, হাদিস নং: ২৬২৩ আহমাদ হাদিস নং: ১৮৯/২ আর আল্লামা আলবানী সহীহ তিরমিযিতে হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন ৩০৪/২। আব্দুল্ল্লাহ ইবন্ কাইস রা. এর হাদিসে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إن أهل النار ليبكون حتى لو أجريت السفن في دموعهم لجرت، وإنهم ليبكون الدم » يعني مكان الدمع، [الحاكم، 4/605، وصححه ووافقه الذهبي، وحسنه الألباني في الأحاديث الصحيحة، 4/245، برقم 1679].

জাহান্নামীরা কিয়ামতের দিন এ রকম কাঁদতে থাকবে যদি তাদের চোখের পানিতে কেউ নৌকা চালাতে চায় তবে সে নৌকা চালাতে পারবে। আর সেদিন তাদের চোখের পানি হবে রক্ত। অর্থাৎ চোখের পানির পরিবর্তে তাদের চোখ থেকে রক্ত বের হবে। [হাকিম ৬০৪/৪ এবং হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন। আর ইমাম যাহবী তার সাথে ঐকমত পোষণ করেন। আর আল্লামা আলবানী আহাদিসে সহীহা কিতাবে হাদিসটি হাসান বলে আখ্যায়িত করেন। দেখুন: ২৪৫/৪, হাদিস নং: ১৬৭৯]

আল্লাহ তা’আলা তার কিতাবে জাহান্নামীদের শাস্তি অনেক বর্ণনা করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ হাদিসে অনেক সতর্ক করেছেন। আমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।

চলবে ……………………………

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম – (১)

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাতজাহান্নাম

আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ.

তাহকীক: ড. সাআদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

আলহামদুলিল্লাহ হির রব্বিল আ’লামীন ওয়াস্ব স্বলাতু ওয়াস স্বলামু আ’লা রসুলীহিল আমীন।

জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সংক্ষিপ্ত গবেষণা। এ গবেষণাটি একাধিক কিতাব ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে এখানে একত্র করা হয়েছে এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে। জান্নাত ও জাহান্নাম কাকে বলে, প্রতিটির সংজ্ঞা, গুণাগুণ এবং কিভাবে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে? তার উপায় ও উপকরণগুলো এখানে আলোচনায় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ আমাদের কারোই অজানা নয়। কারণ, প্রতিটি মানুষের গন্তব্য হয় জান্নাত অথবা জাহান্নাম। এ কারণেই জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া অতীব জরুরি। আমরা আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।

এ বিষয়টি আলোচনা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ হল, যে আমলগুলো জান্নাতে নিয়ে যায়, সে সব আমলসমূহের প্রতি মানুষকে উৎসাহ দেয়া এবং যে আমলগুলো জাহান্নাম থেকে বাঁচায় ও মুক্তি দেয়, সে সব আমলসমূহের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্ক করা।

জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচিতি এবং নামসমূহের আলোচনা

  • জান্নাতের পরিচিতি ও জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাত: জান্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ বাগান। এ শব্দ থেকেই জিনান বলা হয়ে থাকে। আর আরবরা খেজুর গাছকেও জান্নাত বলে আখ্যায়িত করত।

[মুহাম্মদ বিন আবু বকর আর রাযি, মুখতারুস সিহাহ পৃ: ৪৮ [দেখুন: আল্লামা ইবন মানজুর, লিসানুল আরব, পৃ: ১৩/৯৯ এবং আল্লামা আছফাহানী, মুফরাদাতুল কুরআন, পৃ: ২০৪।]

মুখতার আল-কামুসে জান্নাত শব্দের অর্থ: জান্নাত অর্থ- খেজুর গাছ, বিভিন্ন ধরনের গাছ বিশিষ্ট বাগান। এর বহুবচন জিনানুন।

[আহমদ তাহের আযযাবী, মুখতারুল কামুস, পৃ: ১১৭।]

পরিভাষায় জান্নাতের সংজ্ঞা: এটি সেই ঘরের একটি ব্যাপক নাম [যে ঘরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার অনুসারীদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন] যাতে রয়েছে অফুরন্ত ও অসংখ্য নেয়ামত, অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি, অন্তহীন খুশি, আনন্দ ও চিরস্থায়ী শান্তি ।

[এ শব্দটি মূলত: নির্গত হয়েছে ‘সতর’ ও ‘তাগতিয়া’ শব্দদ্বয় হতে। এ কারণেই গর্বজাত সন্তানকে জানিন বলা হয়ে থাকে। কারণ, সে মায়ের পেটে অদৃশ্য ও গোপন থাকে। এবং এ কারণেই বাগানকে জান্নাত বলা হয়ে থাকে, কারণ, তার অভ্যন্তর গাছ গাছালী দ্বারা আবৃত বা গোপন থাকে। আর এ শব্দটি শুধু মাত্র যেখানে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের গাছ থাকে সে বাগানের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. এর ‘হাদিয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ’ পৃ: ১১১।]

জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাতের নাম, অর্থ ও শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাতের সিফাতসমূহের বিবেচনায় জান্নাতের নাম একাধিক, কিন্তু জান্নাত একাধিক নয় জান্নাত একটিই। সুতরাং, এ দিকটির বিবেচনায় একাধিক নামের অর্থ অভিন্ন আর জান্নাতের সিফাতসমূহের দিক বিবেচনায় প্রতিটি নামের অর্থ ভিন্ন। অনুরূপভাবে আল্লাহর নাম, আল্লাহর কিতাবের নাম, আল্লাহর রাসূলদের নাম, আখিরাতের নাম ও জাহান্নামের নাম ইত্যাদি। [এগুলো সবই এক, কিন্তু সিফাত একাধিক হওয়ার কারণে এগুলোর নাম একাধিক]

[আল্লামা ইবনুল কাইয়েম, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১১]

  • ১- জান্নাত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٣٢﴾ [النحل: ٣٢]

“জান্নাতে প্রবেশ কর, যে আমল তোমরা করতে তার কারণে”। সূরা আন-নাহাল আয়াত: ৩২

  • ২- দারুস-সালাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَٱللَّهُ يَدۡعُوٓاْ إِلَىٰ دَارِ ٱلسَّلَٰمِ وَيَهۡدِي مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٢٥﴾ [يونس: ٢٥]

“আর আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন সরল পথের দিকে”

সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও এরশাদ করেন,

﴿۞لَهُمۡ دَارُ ٱلسَّلَٰمِ عِندَ رَبِّهِمۡۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ١٢٧ ﴾ [الانعام: ١٢٧]

“তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে শান্তির আবাস এবং তারা যে আমল করত, তার কারণে তিনি তাদের অভিভাবক”।সূরা আন-নাহাল আয়াত: ৩২

[যাবতীয় সকল বিপদ আপদ হতে এটি একটি শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর।] হাদিয়ুল আরহওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ পৃ: ১১৩

  • ৩- দারুল খুলুদ এ বলে নামকরণ করার কারণ হল, জান্নাতীরা কখনোই তা হতে বের হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿عَطَآءً غَيۡرَ مَجۡذُوذٖ ١٠٨﴾ [هود: ١٠٨] ‘অব্যাহত প্রতিদানস্বরুপ’। সূরা হুদ, আয়াত: ১০৮। আল্লাহ আরও বলেন, ﴿ إِنَّ هَٰذَا لَرِزۡقُنَا مَا لَهُۥ مِن نَّفَادٍ ٥٤﴾ [ص: ٥٤] ‘নিশ্চয় এটি আমার দেয়া রিযিক, যা নি:শেষ হওয়ার নয়’। সূরা সাদ, আয়াত: ৫৪। আল্লাহ আরও বলেন,﴿وَمَا هُم مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِينَ ٤٨ ﴾ [الحجر: ٤٨] ‘তবে তারা তা হতে বের হবে না’। সূরা আল-হিজর আয়াত: ৪৮। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَٰمٖۖ ذَٰلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ ٣٤ ﴾ [ق: ٣٤]

“তোমরা তাতে শান্তির সাথে প্রবেশ কর। এটাই স্থায়িত্বের দিন” সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৪

  • ৪- দারুল মুকামাহ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱلَّذِيٓ أَحَلَّنَا دَارَ ٱلۡمُقَامَةِ مِن فَضۡلِهِۦ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٞ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٞ ٣٥ ﴾ [فاطر: ٣٥]

‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোন কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং যেখানে কোন ক্লান্তিও আমাদেরকে স্পর্শ করে না [সূরা ফাতের, আয়াত: ৩৫]

  • ৫- জান্নাতুল মাওয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿عِندَهَا جَنَّةُ ٱلۡمَأۡوَىٰٓ ١٥﴾ [النجم: ١٥]

“যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত” সূরা আন-নজম, আয়াত: ১৫

  • ৬- জান্নাতু আদন। জান্নাতে আদন: অর্থাৎ স্থায়ী ও চিরঞ্জীব জান্নাত। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে, عَدَن المكان যখন তা নিয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এ হল, জান্নাত যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হল, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৪।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿جَنَّٰتِ عَدۡنٍ ٱلَّتِي وَعَدَ ٱلرَّحۡمَٰنُ عِبَادَهُۥ بِٱلۡغَيۡبِۚ إِنَّهُۥ كَانَ وَعۡدُهُۥ مَأۡتِيّٗا ٦١﴾ [مريم: ٦١] .

“তা চিরস্থায়ী জান্নাত, যার ওয়াদা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন গায়েবের সাথে। নিশ্চয় তাঁর ওয়াদা-কৃত বিষয় অবশ্যম্ভাবী” সূরা মারয়াম, আয়াত: ৬১

  • ৭- আল ফিরদাউস: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ كَانَتۡ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ١٠٧﴾ [الكهف: ١٠٧]

“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস” সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৭। [ফিরদাউস: এমন বাগান যাতে রয়েছে সব ধরনের গাছ গাছালি এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তা সবই এক জায়গায় অর্থাৎ ঐ বাগানে পাওয়া যায়, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনে হাজরের ফতহুল বারী ১৩/৬, কামুসুল মুহিত পৃ: ৭২৫। ফিরদাউস: এমন জান্নাত যা সব জান্নাতের বিষয়ে ব্যবহার করা যায় অথবা সর্বত্তোম ও সর্ব উৎকৃষ্ট জান্নাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, এ জান্নাতটি অন্যান্য জান্নাতের তুলনায় এ নামে নাম করণ করা বিষয়ে অধিক উপযুক্ত। [হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ১১৬] আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাত হল, গোলাকার গম্বুজের মত। সর্বোৎকৃষ্ট, প্রশস্ত ও সর্বোত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস। আর এ জান্নাতের ছাদ হল, আল্লাহর আরশ। যেমন, সহীহ হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, « إذا سألتم الله فاسألوه الفردوس؛ فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن، ومنه تفجَّر أنهار الجنة » “তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ। তা হতে জান্নাতের নহর সমূহ প্রবাহিত হয়”। [বুখারি ২৭৯০, ৭৪২৩] হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ৮৪।]

  • ৮- জান্নাতুন নাঈম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلنَّعِيمِ ٨﴾ [لقمان: ٨]

“নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিআমতপূর্ণ জান্নাত;”

  • ৯- আল মাকামুল আমীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١﴾ [الدخان: ٥١] “নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে”, সূরা দুখান, আয়াত: ৫১ [মাকাম শব্দের অর্থ: অবস্থানের জায়গা। আর আল আমীন অর্থ সব ধরনের খারাবী ও বিপদ-আপদ হতে নিরাপদ হওয়া। এটি ঐ জান্নাতকে বলা হয়, যে জান্নাত সব ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৬]]
  • ১০- মাকয়াদু সিদকীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿فِي مَقۡعَدِ صِدۡقٍ عِندَ مَلِيكٖ مُّقۡتَدِرِۢ ٥٥﴾ [القمر: ٥٥]

“যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহা অধিপতির নিকটে” [ সুরা কমারঃ৫৫, মাকয়াদে সিদক: এটি একটি জান্নাতের নাম। এ জান্নাতকে এ নামে নাম করণ করার, এ জান্নাতে যত সুন্দর সুন্দর আসন ও বসার স্থান চাওয়া হয়, সবই পাওয়া যায়। যেমন বলা হয় ‘সত্যিকার মহব্বত’ যখন তার মধ্যে সত্যিকার ও পরিপূর্ণরূপে মহব্বত পাওয়া যায়। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৭]

জাহান্নামের সংজ্ঞা ও নামসমূহ:

অভিধানে نار (নার) শব্দের অর্থ: আগুন যা মানুষ দেখতে পায়, প্রচণ্ড আগুনের তাপ অথবা এমন তাপ যা জ্বালিয়ে দেয়। আল্লাহর বাণীতে উল্লেখিত আগুনকেও نار বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ٱلنَّارُ وَعَدَهَا ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْۖ ٧٢﴾ [الحج: ٧٢]

“সেটা আগুন। যারা কুফরী করে, আল্লাহ তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন”([20]) সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭২

আর نار শব্দের বহু বচন أنْوُرٌ – نيران – أنيار [কামুসুল মুহিত, পৃ: ৬২৮,৬৩০ মু’জামুল ওসিত, ২৯২/২, আল্লামা ইসফাহানী, মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন পৃ: ৮২৮।

আর পরিভাষায় نار শব্দের অর্থ: যারা আল্লাহর নাফরমানি করে তাদের জন্য যে আগুন তৈরি করে রাখা হয়েছে, তাকে نار বা জাহান্নাম বলা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ وَكَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَآ أُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٣٩﴾ [البقرة: ٣٩]

“আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে” সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৩৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ لَعَنَ ٱلۡكَٰفِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمۡ سَعِيرًا ٦٤ ﴾ [الاحزاب: ٦٤] .

“নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে লা‘নত করেছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছেন” সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৪

জাহান্নামের নামসমূহ: [আল্লাহর নিকট আমরা জাহান্নাম হতে আশ্রয় চাই]

  • ১- নার: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ٱلنَّارُ وَعَدَهَا ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْۖ ٧٢﴾ [الحج: ٧٢]

“সেটা আগুন। যারা কুফরী করে, আল্লাহ তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন” সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ৭২

  • ২- জাহান্নাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتۡ مِرۡصَادٗا ٢١ ﴾ [النبا: ٢١]

“নিশ্চয় জাহান্নাম গোপন ফাঁদ” সূরা নাবা আয়াত: ২১, ২২

  • ৩- জাহীম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ وَبُرِّزَتِ ٱلۡجَحِيمُ لِمَن يَرَىٰ ٣٦ ﴾ [النازعات: ٣٦]

“আর জাহান্নামকে প্রকাশ করা হবে তার জন্য যে দেখতে পায়” সূরা আন-নাজেয়াত, আয়াত: ৩৬

  • ৪-সায়ীর: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿فَرِيقٞ فِي ٱلۡجَنَّةِ وَفَرِيقٞ فِي ٱلسَّعِيرِ ٧ ﴾ [الشورى: ٧] “একদল থাকবে জান্নাতে আরেক দল জ্বলন্ত আগুনে” সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৭

  • ৫-সাকার: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سَقَرُ ٢٧ لَا تُبۡقِي وَلَا تَذَرُ ٢٨ ﴾ [المدثر: ٢٧، ٢٨]

“কিসে তোমাকে জানাবে জাহান্নামের আগুন কী? এটা অবশিষ্টও রাখবে না এবং ছেড়েও দেবে না” সূরা আল-মুদ্দাচ্ছের, আয়াত: ২৭, ২৮

  • ৬- হুতামা: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, ﴿
    كَلَّاۖ لَيُنۢبَذَنَّ فِي ٱلۡحُطَمَةِ ٤ ﴾ [الهمزة:
    ٤] “কখনো নয়, অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামা’য়” সূরা আল-হুমাজাহ, আয়াত: ৪
  • ৭- হাবিয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَأَمَّا مَنۡ خَفَّتۡ مَوَٰزِينُهُۥ ٨ فَأُمُّهُۥ هَاوِيَةٞ ٩ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا هِيَهۡ ١٠ نَارٌ حَامِيَةُۢ ١١﴾ [القارعة: ٨، ١١]

“আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আবাস হবে হাবিয়া। আর তোমাকে কিসে জানাবে হাবিয়া কি? প্রজ্বলিত অগ্নি” সূরা আল-কারিয়াহ, আয়াত: ৮-১১
[ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿ ۞أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ بَدَّلُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ كُفۡرٗا وَأَحَلُّواْ قَوۡمَهُمۡ دَارَ ٱلۡبَوَارِ ٢٨ جَهَنَّمَ يَصۡلَوۡنَهَاۖ وَبِئۡسَ ٱلۡقَرَارُ ٢٩ ﴾ [ابراهيم: ٢٨، ٢٩] তুমি কি তাদেরকে দেখ না, যারা আল্লাহর নিআমতকে কুফরী দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং তাদের কওমকে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে দিয়েছে? জাহান্নামে, যাতে তারা দগ্ধ হবে, আর তা কতইনা নিকৃষ্ট অবস্থান! [সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ২৮, ২৯] আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. কুরআনে আজীমের তাফসীরে লিখেন, দারুল বাওয়ার হল জাহান্নাম ৫৩৯/২। ইমাম বগবী রহ. ও স্বীয় তাফসীরে এ কথার দিকে ইশারা করেছেন। ৫৩/৩।]


জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমান আছে কিনা? এবং কোথায় আছে?

  • জান্নাত জাহান্নাম বিদ্যমান থাকার প্রমাণ

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, মিরাজের ঘটনায় তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ হতে বর্ণনা করেন।

«ثم انطلق بي جبريل حتى انتهى بي إلى سدرة المنتهى، فغشيها ألوانٌ لا أدري ما هي، قال: ثم دخلت الجنة، فإذا فيها جنابذ اللؤلؤ، وإذا ترابها المسك »

“তারপর জিবরীল আ. আমাকে নিয়ে চলতে থাকে। সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছলে তাকে কতক রঙ এসে ডেকে ফেলে। আমি বুঝতে পারিনি এটি কি? তিনি বলেন, ‘তারপর আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম’। জান্নাতকে আমি দেখতে পেলাম, মণি-মুক্তার গম্বুজ। আরও দেখতে পেলাম, জান্নাতের মাটি হল, মিসক”।
[এ শব্দটির অর্থ গব্মুজ এটি বহু বচন, এর এক বচন جنبذة। বুখারি নবীদের আলোচনা অধ্যায়ে শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। এ হাদীসটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পক্ষে প্রমাণস্বরূপ। তারা বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে মাখলুক এবং জান্নাত আসমানে। দেখুন: ইমাম মুসলিম, শরহে নববী, পৃ: ৫৭৯/৩]
[মুত্তাফাকুন আলাইহ : বুখারি সালাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: মেরাজের সময় সালাত ফরয হওয়ার পদ্ধতি: হাদিস নং: ৩৪৯ ও নবীদের আলোচনা অধ্যায়, হাদীস নং: ৩৩৪২। মুসলিম কিতাবুল ঈমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসমানের দিকে রাতে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে আলোচনা: হাদীস নং: ১৬২]

وعن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لـَمّا خلق الله الجنة والنار أرسل جبرائيل إلى الجنة، فقال: انظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فجاء فنظر إليها، وإلى ما أعد الله لأهلها فيها… ثم قال: اذهب إلى النار فانظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فنظر إليها فإذا هي يركب بعضها بعضاً.. »

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল আলাইহিস সালামকে জান্নাতে পাঠান এবং বলেন, তুমি জান্নাতের দিকে তাকাও এবং দেখ আমি জান্নাতে জান্নাতিদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছি। তারপর সে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতিদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছেন তা দেখেন। তারপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, তুমি এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর, তারপর সে জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ বললেন, দেখ আমি জাহান্নামীদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছি। তারপর সে জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখে জাহান্নামের এক অংশ অপর অংশের উপর দাপাদাপি করছে” [তিরমিযি, জান্নাতের বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ‘জান্নাতকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে পরিশ্রম দ্বারা আর জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে প্রবৃত্তি দ্বারা’ হাদীস নং ২৫৬০। নাসায়ী কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, আল্লাহর ইজ্জতের কসম খাওয়া বিষয়ে আলোচনা: হাদিস নং: ৩৭৭২। আল্লামা আলবানী বিশুদ্ধ তিরমিযিতে হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দেখুন- ২০/৩ সহীহ নাসায়ী ৫/৩]

ইমাম তাহাবী রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর মাখলুক, কখনো তা ধ্বংস হবে না এবং ক্ষয় হবে না। কারণ, আল্লাহ মাখলুককে সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেন। আর জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টির জন্য তিনি মাখলুক হতে অধিবাসী সৃষ্টি করেন। যাদের তিনি জান্নাত দেবেন তা হবে তার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অনুগ্রহ। আর যাদের তিনি জাহান্নামে দেবেন তা হবে তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে ইনসাফ। প্রত্যেকেই তার সুবিধা অনুযায়ী আমল করবে এবং তাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে দিকে ধাবিত হবে। আর ভালো ও মন্দ বান্দার উপর নির্ধারিত [আবু জাফর আত-ত্বাহাবী, আকীদাতু-তহাবী [শুধু ইবারত], পৃ: ১২]

বর্তমানের জান্নাত বিদ্যমান থাকার উপর হাদিস দ্বারা প্রমাণ:

কা’ব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إنما نسمة المؤمن طائرٌ يعْلُقُ في شجر الجنة، حتى يرجعه الله تبارك وتعالى إلى جسده يوم يبعثه »

“মুমিনের আত্মা জান্নাতে পাখির মত, জান্নাতের গাছের সাথে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত ঝুলতে থাকবে। তারপর যখন কিয়ামতের দিন সমগ্র মানুষকে পুনরায় জীবন দান করা হবে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের রুহকে তাদের দেহে আবার ফেরত দেবেন”

[ইমাম আহমদ স্বীয় মুসনাদে পৃ: ৪৫৫/৩, তাহকীক কৃত সংস্ককরণে পৃ: ৫৭/২৫। আর নাসায়ী জানায়েয অধ্যায়ে, পরিচ্ছেদ: মুমিনদের রুহ বিষয়ে আলোচনা; হাদীস নং ২০৭৩-

« إنما نسمة المؤمن طائر في شجر الجنة حتى يبعثه الله إلى جسده يوم القيامة »

অর্থ, মুমিনের আত্মা জান্নাতের গাছের মধ্যে উড়ন্ত পাখির মত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের রুহকে তাদের দেহে ফেরত দেবেন। ইবনে মাযা, যুহদ অধ্যায়, কবরের আলোচনায় হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে, হাদীস নং: ৪২৭১। বিশুদ্ধ নাসায়ীতে আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন, পৃ: ৪৪৫/২। সিলসিলাতুল আহাদীস-সহীহাহ গ্রন্থে ৭২০/২, ৯৯৫। ইমাম ইবনে কাসীর স্বীয় তাফসীরে أحمد عن الشافعي عن مالك عن ابن شهاب، عن عبد الرحمن بن كعب بن مالك عن أبيه: এ সনদটি উল্লেখ করার পর লিখেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ এবং শক্তিশালী মতন’। ]
[আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. এর হাদিসে শহীদদের আলোচনায় রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« أرواحهم في جوف طير خضر لها قناديل معلقة بالعرش تسرح من الجنة حيث شاءت، ثم تأوي إلى تلك القناديل »

 

“শহীদদের রুহসমূহ হুলুদ পাখির পেটের মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে, আরশের সাথে ঝুলানো প্রজ্জলিত বাতি, তারা তাদের ইচ্ছা মত যেখানে ইচ্ছা সেখানে ভ্রমণ করতে থাকে তারপর তারা আবার ঐ সব বাতির নিকট চলে আসে”। মুসলিম, হাদীস নং: ১৮৮৭। আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. এর হাদীস রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এরশাদ করেন,

 

« إن أحدكم إذا مات عرض عليه مقعده بالغداة والعشي، إن كان من أهل الجنة فمن أهل الجنة، وإن كان من أهل النار فمن أهل النار، يقال: هذا مقعدك حتى يبعثك الله إليه يوم القيامة »

অর্থ, যখন তোমাদের কেউ মারা যায় তখন সকাল বিকাল তার অবস্থান কোথায় হবে তা তুলে ধরা হয়। যদি লোকটি জান্নাতী হয়, তার জান্নাতের অবস্থান তাকে দেখানো হয়, আর যদি লোকটি জাহান্নামী হয়, তবে তাকে জাহান্নামের অবস্থান দেখানো হয়। তাকে বলা হয়, এ তোমার অবস্থান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিন তোমাকে এখানে প্রেরণ করবেন। বুখারি, ১৩৭৯, মুসলিম: ২৮৬৬। আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রহ. বলেন, রুহকে পেশ করা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় না রুহগুলো কবরে বা কবরের আশপাশে। বরং এ কথা প্রমাণিত হয়, কবরের সাথে রুহের সম্পৃক্ততা রয়েছে; তার আসনে রুহকে পেশ করা হয়ে থাকে। কারণ, রুহের অবস্থা ভিন্ন একটি অবস্থা রয়েছে। রূহ কখনো সময় রফিকে আ’লাতে অবস্থান করে, কিন্তু দেহের সাথে সম্পৃক্ত। ফলে যখন কোন ব্যক্তি তাকে সালাম দেয়, সে তার স্বীয় অবস্থান থেকে সালামের উত্তর দেয়। দেখুন- আল্লামা সুয়ুতীর ব্যাখ্যা সুনানে নাসায়ীতে পৃ: ১০৯/৪। ]

জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থান:

  • জান্নাতের অবস্থান: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡأَبۡرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ ١٨ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ ١٩﴾ [المطففين: ١٨، ١٩]

“কখনো নয়, নিশ্চয় নেককার লোকদের আমলনামা থাকবে ইল্লিয়্যীনে । কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী”? সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৮-১৯

আব্দুল্লাহ ইবন‌্ আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ বলেন, ‘ইল্লিয়্যীন’ অর্থ জান্নাত, অথবা সপ্তম আকাশে আরশের নিচে অবস্থিত একটি স্থান তাফসীরে বগবী, ৪৬০/৪, তাফসীরে ইবন কাসীর ৪৮৭/৪

ইমাম ইবন্ কাসীর রহ. আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইল্লিয়্যিন শব্দটি ‘উলু শব্দ হতে নির্গত। যখন কোন বস্তু উপরে অবস্থান করে, তখন তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার মহত্ব বাড়তে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বড়ত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ﴿وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ ١٩﴾ [المطففين: ١٩] “কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী”?[আল্লামা ইবন্ কাসীর, তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ৪৮৭/৪]

ইমাম ইবন্ কাসির রহ. আল্লাহর বাণী- ﴿وَفِي ٱلسَّمَآءِ رِزۡقُكُمۡ وَمَا تُوعَدُونَ ٢٢﴾ [الذاريات: ٢٢] “আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সব কিছু” আয-যারিয়াত, আয়াত: ২এর তাফসীরে বলেন, এখানে তোমাদের রিযিক অর্থ বৃষ্টি আর তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার অর্থ হল, জান্নাত। আল্লামা ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ২৩৬/৪

[ইমাম বুখারির বর্ণিত হাদিসে অতিবাহিত হয়েছে। হাদীস নং ২৭৯০, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, « إذا سألتم الله فاسألوه الفردوس، فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن…»“তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উত্তম জান্নাত উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ…”]

  • জাহান্নামের স্থান:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٖ ٧ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سِجِّينٞ ٨ كِتَٰبٞ مَّرۡقُومٞ ٩ ﴾ [المطففين: ٧، ٩]

“কখনো নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের ‘আমলনামা সিজ্জীনে। কিসে তোমাকে জানাবে ‘সিজ্জীন’ কী? লিখিত কিতাব”। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে কাসীর রহ., ইমাম বগবী রহ. ও ইমাম ইবনে রজব রহ. একাধিক হাদিস উল্লেখ করেন, তাতে তিনি বলেন, সিজ্জীন হল, সপ্ত যমীনের নিচে। অর্থাৎ, যেমনি-ভাবে জান্নাত সাত আসমানের উপরে অনুরূপভাবে জাহান্নাম সপ্ত যমীনের নীচে একটি স্থান দেখুন তাফসীরে বগবী, ৫৪৮/৪, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪৮৬, ৪৮৭/৪। জাহান্নাম থেকে ভয় পদর্শন ইবনে রজবের পৃ: ১-৬২ অনুরূপভাবে ইমাম ইবনুল কাইয়ুমের হাদীয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, পৃ:৮২-৮৪

» « اللهم إنا نسألك الجنة، ونعوذ بك من النار. [“হে আল্লাহ আমরা তোমার নিকট জান্নাত চাই এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাই” [আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থণা আল্লাহ যেন লেখকের দু’আ কবুল করেন। তাকে এবং তার সহকর্মী যিনি তার সাথে মারা যান উভয়কে শহীদদের উচ্চ আসনে আরোহণ করান। কারণ, তিনি সম্মানী তিনি রহমান। আর মহান স্থানে তাদের উভয়কে তাদের মাতা-পিতার সাথে একত্র করেন।

চলবে ……………………

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [৩]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের অন্তুর্ভুক্ত কয়েকটি বিষয়

আল্লাহর পথে প্রীতি-ভালবাসা, বিদ্বেষ, বন্ধুত্ব এবং শক্রতা পোষণ করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্ন্তগত। সূতরাং মু‘মিন ব্যক্তি অপর মু’মিনদের ভালবাসবে এবং তাদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবে। পক্ষান্তরে, সে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে এবং তাদের সাথে বৈরীতা বজায় রাখবে। মুসলিম উম্মাহর মু’মিনদের শীর্ষস্থানে রয়েছেন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। তাই, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তাদের প্রতি সম্প্রীতি ও গভীর ভালবাসা পোষণ করে।। আর একথাও বিশ্বাস করে যে, এরাই নবীকুলের পর সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«خَيْرُ النّاس قَرْنِي ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ»

“সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী আমরা যুগের লোকেরা, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তারপর এদের পরবর্তীগণ’। (অত্র হাদীসের বিশুদ্ধতার উপর বুখারী ও মুসলিম একমত)

তারা আরো বিশ্বাস করেন যে, এই সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আবু বকর সিদ্দীক হলেন সর্বোত্তম, তারপর উমর ফারুক, তারপর উসমান জুন্‌নুরাইন, তারপর আলী মুরতাজা (তাদরে সবার উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক)। তাঁদের পর হলেন বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত অপর সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তারপর আরো বাকী সব সাহাবীগণের স্থান (আল্লহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন)। আহলেসুন্নাত ওয়াল জামায়াত সাহাবীদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ-বিসংবাদ সম্পর্কে কোনরূপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা মনে করেন যে, সাহাবীগণ ঐ সব ব্যাপারে মুজতাহিদ ছিলেন। যাদের ইজতেহাদ সঠিক ছিল তাঁরা এক গুণ সাওয়াবের অধিকারী। তাঁরা রাসূলুল্লার প্রতি, বিশ্বাসী তাঁর বংশধরদের ভারবাসেন এবং তাঁদের প্রতি ভক্তি প্রদর্শণ করেন। তাঁরা মুমিনগণের মাতৃকুল রাসূলুল্লাহর সহধর্মিনীদের ভক্তি করেন এবং তাঁদের সকলের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন।

এভাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা নিজেদেরকে রাফেজীদের নীতি থেকে মুক্ত রাখেন। রাফেজীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগনের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে এবং তাঁদের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শণ করে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত স্থানের আরো উপরে মর্যাদা প্রাদন করে।

আহলে সুন্নাত ওয়ার জামা‘আত ঐ সব ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের নীতি থেকেও নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন, যারা কোন কোন কোথাও কাজের দ্বারা আহলে বাইতকে যন্ত্রণা প্রদান করে। আমি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা উল্লেখ করেছি,সেসব সেই বিশুদ্ধ আকীদা বা ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত যা দিয়ে আল্লাহ ত‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। এটিই নাজাত প্রাপ্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ধর্মবিশ্বাস, যাদের সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:

«لاَ تَزَالْ طَائِفَةُ مِنْ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ مَنْصُوْرةَ لاَ يَضُرُّهُمْ مِنْ خَذَلَّهُمْ حَتَّى يَأتِيْ أَمْرُ اللهِ سُبْحَانَهُ»

“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকবে। কারো অপমান, অত্যাচার তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা, যতক্ষণ না আল্লাহ পাকের নির্দেশ (কিয়ামত) সমুপস্থিত হবে’।

তিনি আরো বলেন:

«إفْتَرَتِ الْيَهُوْدَُ عَلَى إحْدِى وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً وَ افْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى إِثْنَتَيْنَ فِرْقَةً, وَسَتَفْرِقُ هَذِهِ لأُمَّةُ عَلَى ثَلاَثَ وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً , كُلُّهَا فِيْ النَّارِ إلاَّ وَاحِدَةً »

‘ইয়াহুদী সম্প্রদায় একাত্তর দলে বিভক্ত হলো এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বাহাত্তর দলে বিভক্ত হলো, আর আমার এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। তম্মধ্যে একটি বাদে সবক’টি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন সাহাবীগন বলে উঠলেন: হে আল্লাহর রাসূল, সে দলটি কেমন হবে? উত্তরে তিনি বললেন:

« منْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَ أَصْحَابِيْ »

‘যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের অনুসৃত নীতির উপর চলবে’।

এই নীতিই সেই আকীদা বা ধর্ম বিশ্বাসের নামন্তর যার উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা এবং তারা পরিপন্থী বিষয় হতে সতর্ক থাকা সকলের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য। আর যারা এই আকীদা হতে পথভ্রষ্ট এবং এর বিপরীত পথে পরিচালিত, তারা কয়েক প্রকারে বিভক্ত। যথা; মূর্তিপুজক, প্রতিমাপুজক, ফেরেশতা, আউলিয়া, জ্বিন, বৃক্ষ, প্রস্তর ইত্যাদির ইবাদতকারীগণ। এসব লোক আল্লাহর রাসূলদের আহ্‌বানে সাড়া না দিয়ে তাঁদের বিরোধিতা ও শক্রতা করেছে। যেমনটা করেছে কুরাইশ ও বিভিন্ন আরব গোত্র আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে। তারা তাদের মা‘বুদদের কাছে স্বীয় অভাব পূরণের, রোগমুক্তি ও শক্রর উপর বিজয় লাভের জন্য প্রার্থণা জানাতো এবং এই মা‘বুদদেরই উদ্দেশ্যে জবাই ও মানত নিবেদন করতো। ফলে, যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তাদেরকে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে খলেছভাবে ইবাদত করার আহ্‌বান জানালেন, তখনই তারা এই আহ্‌বানকে অস্বাভাবিক মনে করে এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগলো এবং বলতে লাগলো:

﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ﴾ [ص: 5]

“সে কি বহু মা‘বুদদের পরিবর্তে মাত্র এক মা‘বুদ বানিয়ে নিল? এতো এক নিশ্চিত অদ্ভূত ব্যাপার”। (সূরা ছাদ: ৫)

অনন্তর, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ডাকতে থাকেন এবং শিরক থেকে ভীতি প্রদর্শণ ও তাদের কাছে স্বীয় আহবানের হাকীকত বিশ্লেষণে আত্ননিয়োগ করেন। যার ফলে আল্লাহপাক প্রথম দিকে তাদের কিছুসংখ্যক লোককে হেদায়াত দান করেন এবং পরে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে পবেশ করে। এইভাবে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবাণ অনুসারী তাবেইনদের ধারাবহিক প্রচার ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর আল্লাহুর দ্বীন অন্যান্য সমুদয় ভ্রান্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী বেশে আত্মপ্রকাশ করলো।

  • পরবর্তী কালের মুশরিক সম্প্রদায়

সময়ের ব্যবধানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং অধিকাংশ লোক অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হলো। সংখ্যাগুরু জনগণ আম্বিয়া-আওলিয়াগণের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং বিপদ-আপদে তাদের নিকট প্রার্থণাসহ অন্যান্য শিরকের মাধ্যমে ইসলাম পূর্ব অন্ধকার যুগে ফিরে গেল। তারা কালেমা ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু’র প্রকৃত অর্থ এতটুকু অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল, যতটুকু আরবের কাফেররা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আল্লাহ সকলকে সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। অজ্ঞতার সয়লাবে তথা নবুওয়াতের যুগ হতে দুরত্বের ফলে বর্তমান কাল পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে উক্ত শিরক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান কালে মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা হুবহু পূর্ববর্তী মুশরিকদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। তারা বলতো:

﴿هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ﴾ [يونس: 18]

“তারা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশকারী”। (সূরা ইউনুস-১৮)

তাদের একথাও ছিল;

﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ﴾ [الزمر:3]

“আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহ তা‘আলা এ ভ্রান্তির অপনোদন করে স্পষ্ট বলে দিলেন যে, আল্লাহ ভিন্ন কারো ইবাদত করা সে যে কেউ হোক না কেন আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফরী করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ …﴾

“তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপরকারও করতে পারে না। তদুপরি তারা বলে যে, এগুলি আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী”।

আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন:

﴿… قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾ [يونس: 18]

“(হে রাসূল) তাদেরকে বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? তিনি পুত-পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি বহু উর্ধ্বে”। (সূরা ইউনুস: ১৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি ভিন্ন কোন ওলী, পয়গাম্বর বা অন্য কারো ইবাদত করা মহাশিরক, যদিওবা শিরককারীরা এর অন্য নাম দিয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ …﴾

“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে: “আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহপাক তাদের উত্তরে বলেন:

﴿… إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾ [الزمر: 3]

“তারা যে বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে এর ফায়সালা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না যে জঘন্য মিথ্যুক, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী”। (সূরা যুমার : ৩)

উপরোক্তবাণীর মাধ্যমে আল্লাহপাক একথাটি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন যে, দু‘আ, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ আল্লাহপাকের সাথে কুফরী করা এবং তাদের মা‘বুদগণ তাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে, এ কথাটি তাদের একটি জঘন্যতম মিথ্যা বৈ কছিুই নয়।

  • সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের পরিপন্থী কতিপয় মতবাদ

বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী ও আল্লাহর রাসূলগণ (তাঁদের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক) কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী একটি মতবাদ হলো বর্তমান কালে নাস্তিকতা ও কুফরীর ধ্বজ্জাবাহী মার্কস-লেলিন প্রমুখ পন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ। তারা একে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম বা অন্য যে, নাস্তিকদের মূলমন্ত্র হলো, ‘মা‘বুদ বা উপাস্য বলতে কেউ নেই এবং এই পার্থিব জীবন এবটি বস্তুগত ব্যাপার মাত্র’। পরকাল, বেহেশ্‌ত, দোযখ এবং সমস্ত ধর্মের প্রতি অস্বীকৃতি তাদের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বই-পুস্তক পর্যালোচনা করলে একথা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করা যায়। নিঃসন্দেহে এটা সমস্ত ঐশী ধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এক মতবাদ, যা দুনিয়া ও আখেরাতে এর অনুসারীদের এক চরম অশুভ পরিণতির দিকে পরিচালিত করছে।

  • সত্যের পরিপন্থী আরেকটি মতবাদ হলো:

কোন কোন বাতেনী ও সূফী সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, তথাকথিত আওলীয়ারা এ সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহর সাথে শরীক থাকে। তারা তাদেরকে কুতুব (পীর-দরবেশ), আওতাদ (নির্ভরযোগ্য খুঁটিস্বরূপ), গাওস (ফরিয়াদ শ্রবণকারী) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। তারাই স্বীয় মা‘বুদদের জন্যে এসব নাম উদ্ভাবন করেছে। আল্লাহর প্রভূত্বে এটি একটি জঘণ্যতম শিরক। ইহা ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের শিরক থেকেও জঘণ্য। কেননা, আরবের কাফেরগণ আল্লাহর প্রভূত্বে শিরক করেনি, তাদের শিরক ছিল ইবাদতে এবং তাও ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দের অবস্থায়। দুর্যোগ অবস্থায় তারা ইবাদত আল্লাহর জন্যেই খালেছ করে নিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ﴾ [العنكبوت:65]

“যখন তারা জলযানে আরোহন করে তখন বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ কে ডাকে। তারপর যখন আল্লাহ তাদেরকে স্থলে ভিড়ায়ে উদ্ধার করেন, তখন তারা শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়”। (সূরা আনকাবুত ৬৫)

প্রভূত্বের প্রশ্নে তারা স্বীকার করতো যে, ইহা একমাত্র আল্লাহরই অধিকার। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ﴾ [الزخرف:87]

“আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ”। (সূরা যুখ্‌রুখ: ৮৭)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ [يونس:31]

“বল, আকাশ ও পৃথিবী হতে কে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কার কর্তৃত্বাধীন এবং কে জীবিতকে মৃত হতে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত হতে নির্গত করে? আর কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, ‘ আল্লাহ’। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবেনা”? (সূরা ইউনুস: ৩১)

  • পরবতীর্কালের মুশরিকরা আরো দুটি বিষয়ে অগ্রগামী রয়েছে:
  • [এক] তাদের কেউ কেউ আল্লাহ্‌র প্রভূত্বে শিরক করে।
  • [দুই] সুর্দিনে উভয় অবস্থায়ও তারা শিরক করে। একথা কেবল ঐসব লোকেরাই ভাল করে জানতে পারবে যারা তাদের সাথে মিশে স্বচক্ষে তাদের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ লাভ করবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঐসব ক্রিয়া কলাপ অবলোকন করবে যা মিশরস্থ হুসাইন, বাদাভী গংদের কবরে, ইডেনস্থ ইঁদরূসের কবরে, ইয়েমেনে আল হাদীর কবরে, সিরিয়ায় ইবনে আরাবীর কবরে, ইরাকে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর কবরসহ বিভিন্ন প্রসিদ্ধ সমাধি ক্ষেত্রের আশেপাশে দৈনন্দিন ঘটে চলছে।

সাধারণ লোকেরা মৃতের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করছে এবং সেখানে আল্লাহ পাকের বহু অধিকার খর্ব করছে। কিন্তু অতি অল্প লোকই তাদের এসব অপকীর্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রকৃত তাওহীদের বাণী তাদের কাছে উপস্থাপিত করার সাহাস করছে। অথচ এই তাওহীদের বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যেই আল্লাহপাক তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে (তাদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) প্রেরণ করেছেন। আর আমাদেরকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে:

﴿إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ﴾ [البقرة:156]

“আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই পানে আমরা প্রত্যাবর্তনকারী”। (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৬)

আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ঐসব লোককে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদের মধ্যে সৎপথে আহবানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। আর, মুসলিম শাসকবৃন্দ ও উলাময়ে কেরামকে শিরকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এর যাবতীয় উপকরণ নির্মুল সাধনের তৌফিক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, অতি সন্নিকটে।

আল্লাহপাকের নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী আরও কয়েকটি আকীদা হলো জাহ্‌মিয়্যাহ, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুসারী বিদআ‘তপন্থীদের মতবাদসমূহ। এরা মহামহিম আল্লাহপাকের প্রকৃত গুনাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁকে সম্পূর্ণ ও নিখুত গুনাবলী থেকে বিমুক্ত বলে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে, তারা আল্লাহকে অস্তিত্বহীনতা, জড়তা ও অসম্ভাব্য গুণে বিশেষিত করার প্রয়াস পায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাক তাদের এসব অপবাদ হতে বহু উর্ধ্বে।

এতদ্ব্যতীত, যারা আল্লাহপাকের কেন কোন গুণ প্রতিষ্ঠিত করে এবং অপর কোন কোন গুণ অস্বীকার করে তারাও উপরোক্ত ভ্রান্ত মতবাদিদের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ স্বরূপ আশাআ’রী পন্থীদের নাম উল্লেখ করা য়ায়। কেননা, কিছুসংখ্যক গুণের স্বীকৃতির মধ্যেই তাদরে পক্ষে ঐসব গুণাবলীর অনুরূপ অর্থ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে. যেগুলো তারা সরাসরি উপেক্ষা করত: তারা প্রমানাদির অপব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে তারা শ্রুত ও প্রমাণ্য উভয় প্রকার দলীলগুলোর বিরোধিতা এবং পরস্পর বিরোধী বিশ্বাসাসের ঘুর্ণিপাকে নিপতিত হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত আল্লাহ্‌র ঐসব পবিত্র নাম ও নিখুঁত গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত করে যেগুলি নিজের জন্য তিনি স্বয়ং বা তাঁর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁরা আল্লাহপাককে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে এমনভাবে পুত পবিত্র রাখেন যাতে তা‘তীল বা গুণ বিমুক্তির কোন লেশ থাকে না। এভাবে তারা এ সম্পর্কে সমুদয় প্রমাণাদির উপর আমল করতে সক্ষম হয় এবং কোনরূপ বিকৃতি বা তা‘লীল না করে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাস থেকে নিরাপদ থাকে। এই বিশ্বাসই দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের একমাত্র পূর্ববর্তী মুসলিম উম্মত ও তাদের ইমামবর্গ।

একথা অতীব সত্য যে, পরবর্তী লোকগণ কেবল সে পথেই পরিশুদ্ধ হতে পারে, যে পথে তাদের পুর্ববর্তীরা পরিশুদ্ধ হয়ে গেছেন। আর সে পথটি হলো: ‘কুরআন ও সুন্নাতের সঠিক অনুসরণ এবং এতদুভয়ের পরিপন্থী বিষয়সমূহ বর্জন করে চলা।’

আল্লাহই আমাদের তৌফিকদাতা, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং পরমোত্তম প্রভূ। তিনি ব্যতীত কারো কোন শক্তি সামর্থ নেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাহ ও রাসূল মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীদের উপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [২]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

[দ্বিতীয় নীতি]

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান

ফেরেশতাগণের প্রতি ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। একজন মুসলিম ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা রয়েছেন। তাদেরকে তিনি নিজ আনুগত্যের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাদের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন যে, তারা আল্লাহর আগেভাগে কোন কথা বলে না, বরং তারা সবর্দা তাঁর আদেশানুসারে নিজ নিজ পালন করে থাকে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿عِبَادٞ مُّكۡرَمُونَ ٢٦ لَا يَسۡبِقُونَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ ٢٧ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ﴾ [الأنبياء: 26-28]

“তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দাহ। তাঁর (আল্লাহর) আগেভাগে তারা কথা বলে না বরং তারা সর্বদা তাঁকেই আদেশানুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। তাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর জানা রয়েছে। যাদের পক্ষে সুপারিশ করবে। আর তারা (ফেরেশতারা) আল্লাহর ভয়ে সদা সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে”। (সূরা আম্বিয়া-২৬-২৮)

আল্লাহর ফেরেশতাগণ অনেক প্রকার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তম্মধ্যে একদল তাঁর আরশ উত্তোলন কাজে, অপর একদল বেহেশ্‌ত-দোযখের তত্বাবধানে এবং আরেক দল মানুষের আমলনামা সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

আর আমরা বিশদভাবে ঐসব ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, যাদের নাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উল্লেখ করেছেন। যেমন-জীবরিল, মিকাঈল, মালিক-তিনি দোযখের তত্বাবধায়ক এভং ইসরাফীল-তিনি মহাপ্রলয়ের দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। একাধিক সহীহ হাদীসে তাঁর কথা উল্লেখ আছে।

আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা) হতে বর্ণিত এক সহীহ হাদীসে আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতাগণ নুরের সৃষ্টি, জ্বিনকুল খাঁটি আগুন থেকে সৃষ্টি এবং আদমকে যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা আল্লাহ তা‘আলা (কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে) তোমাদেরকে বলে দিয়েছেন”। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি সহীহ সনদে স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

[তৃতীয় নীতি]

আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

এভবে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের প্রতি ইমান আনয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আল্লাহ পাক আপন সত্যের ঘোষণা এবং এর প্রতি আহ্‌বান জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর নবী ও রাসূলগণের উপর অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন:

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ﴾ [الحديد: 25]

“আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও মানদন্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে”। (সূরা হাদীদ : ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِۚ﴾ [البقرة:213]

“প্রথমদিকে মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। অনন্তর আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করেন সঠিক পথের অুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং বিভ্রান্তদের জন্য ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে। আর, তাদের সাথে নাজিল করেন সত্যের প্রতীকসমূহ, এ উদ্দেশ্যে যে, লোকদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তিনি তার চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেন”। (সূরা আল-বাকারা:২১৩)

আর বিশদভাবে আমরা ঐসব কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবো যেগুলির নাম আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন, তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর ও কুরআন। এগুলির মধ্যে কুরআনই সর্বোত্তম ও সর্বশেষ কিতাব যা পূর্ববর্তী অপর কিতাবসমূহের সংরক্ষক ও সত্যয়নকারী। সমগ্র উম্মতকে ইহারই অনুসরণ করতে হবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ সুন্নাতসহ ইহারই ফায়সালা মেনে নিতে হবে। কেননা, আল্লাহপাক তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র জ্বিন ও ইনসানের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর প্রতি এই মহান কিতাব ‘কুরআন শরীফ’ নাযিল করেছেন, যাতে তিনি ইহা দ্বারা লোকদের মধ্যে ফায়সালা করেন। উপরন্তু, আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনকে তাদের অন্তরস্থ যাবতীয় ব্যাধির প্রতিকার, তাদের প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট প্রতিপাদক এবং মু’মিনদের জন্য হেদায়াত ও রহমতস্বরূপ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ مُبَارَكٞ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُواْ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ﴾ [الأنعام:155]

“আর, ইহা এক মাহকল্যাণময় গ্রন্থ যা আমি অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তোমরা ইহারই অনুসরন কর এবং তাকওয়াপূর্ণ আচরণ-বিধি গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের প্রতি রহমত নাজিল হবে”। (সূরা আল-আনআম: ১৫৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ﴾ [النحل:89]

“আমি মুসলিমদের জন্য প্রত্যেকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ এই কিতাব অবতীর্ণ করলাম”। (সূরা আন-নাহল: ৮৯)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ فَ‍َٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ﴾ [الأعراف: 158]

“(হে রাসূল) বল, ওহে মানবমন্ডলী ! নিশ্চয়ই আমি তোমদের সকলের প্রতি প্রেরিত সেই আল্লাহর রাসূল যিনি জমীন ও আকাশ সমূহের একচ্ছত্র মালিক। তিনি ব্যাতীত আর কোন মা‘বুদ নেই, তিনিই জীবন মৃত্যু দান করেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আন, যে আল্লাহ ও তাঁর সকল বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান লাভ করতে পার”। (সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৮)

[চতুর্থ নীতি]

রাসূলুগণের প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের প্রতিও ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহপাক আপন বান্দাদের প্রতি তাদের মধ্য হতে বহু সংখ্যক রাসূল-শুভসংবাদবাহী, ভীতি প্রদর্শণকারী ও সত্যের পানে আহবায়ক রূপে প্রেরণ করেছেন। যে ব্যক্তি তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছে সে সৌভাগ্যের পরশ লাভ করেছে, আর যে তাদের বিরোধিতা করেছে সে হত্যাশা ও অনুশোচনার শিকারে নিপতিত হয়েছে।

রাসূলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ,তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে,তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতের (শয়তান বা শয়তানী শক্তির) ইবাদত থেকে দূরে থাক”। (সূরা আন-নাহল: ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ﴾ [النساء: 165]

“আমি তাদর সবাইকে শুভসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রাসূল হিসেবে প্রেবণ করেছি যাতে এ রাসূলগণের আগমণের পর মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকে”। (সূরা নিসা-১৬৫)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَۗ﴾ [الأحزاب:40]

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন বরং তিনি তো আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী”। (সূরা আল-আহ্‌যাব: ৪০)

ঐ সমস্ত নবী –রাসূলগণেরে মধ্যে আল্লাহ যাদের নাম উল্লেখ করেছেন বা যাদের নাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে তাদের প্রতি আমরা বিশদভাবে ও নির্দিষ্ট করে বিশ্বাস স্থাপন করি। যেমন: -হযরত নূহ, হযরত হুদ, হযরত সালেহ, হযরত ইবরাহীম ও অন্যান্য রাসূলগণ। আল্লাহ তাঁদের সকলের উপর, তাদের পরিবারবর্গ ও অনুসারীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

[পঞ্চম নীতি]

আখেরাত দিবসের উপর ঈমান

পরকাল সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে যেমন: কবরের পরীক্ষা, সেখানকার আযাব ও নেয়ামত, রোজা কেয়ামতের ভয়াবহতা ও প্রচন্ডতা, পুলসিরাত, দাঁড়িপাল্লাহ, হিসাব-নিকাশ, প্রতিফল প্রদান, মানুষের মধ্যে তাদের আমলনামা বিতরণ: তখন কেউবা তা ডান হাতে গ্রহণ করবে আবার কেউবা তা বাম হাতে বা পিছনের দিক হতে গ্রহন করবে ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন উক্ত ঈমানের আওতাভূক্ত। এতদ্ব্যতীত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবতরনের জন্য নির্ধারিত হাউজে কাউসার, বেহেশত-দোযখ, মুমিন বান্দাগণ কর্তৃক তাদের প্রভু পাকের দর্শন লাভে এবং তাদের সাথে আল্লাহর কথোপকথনসহ অন্যান্য যা কিছু কুরআনে কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং উপরোক্ত সব কয়টি বিষয়ের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় বিশ্বাস করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

[যষ্ঠ নীতি]

ভাগ্যের প্রতি ঈমান

ভাগ্যের প্রতি ঈমান বলতে নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপনকে বুঝায়:

  • প্রথমত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, অতীতে যা কিছু ছিল এবং বর্তমান বা ভবিষ্যতে যা কিছু হবে তার সবকিছুই আল্লাহ পাকের জানা আছে। তিনি আপন বান্দাদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। তাদের রিজিক, তাদের মৃত্যুক্ষণ, তাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীসহ অন্যান্য সব বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত, কোন কিছুই তাঁর অগোচরে নেই। তিনি পুত-পবিত্র মহান। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ﴾ [العنكبوت:62]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকটি বস্তু সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত”। (সূরা আল আনকাবুত: ৬২)

মহামহিম আল্লাহ আরো বলেন:

﴿لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ وَأَنَّ ٱللَّهَ قَدۡ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عِلۡمَۢا﴾ [الطلاق: 12]

“যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান এবং একথাও জানতে পার যে, আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুতেই পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে”।(সূরা তালাক-১২)

  • দ্বিতীয়ত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ পাক যা কিছু নির্দ্ধারণ ও সম্পাদন করেছেন সব কিছুই তাঁর লিখা রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

﴿قَدۡ عَلِمۡنَا مَا تَنقُصُ ٱلۡأَرۡضُ مِنۡهُمۡۖ وَعِندَنَا كِتَٰبٌ حَفِيظُۢ﴾ [ق: 4]

“পৃথিবী তাদের দেহ থেকে যা কিছু ক্ষয় করে তা আমার জানা আছে এবং আমার নিকট একটি সংরক্ষক কিতাব রয়েছে”। (সূরা ক্বাফ:৪)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَكُلَّ شَيۡءٍ أَحۡصَيۡنَٰهُ فِيٓ إِمَامٖ مُّبِينٖ﴾ [يس: 12]

“এবং আমি প্রতিটি বস্তু একটি স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি”। (সূরা ইয়াসিন-১২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ﴾ [الحج:70]

“তোমার কি জানা নেই, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা অবগত আছেন? নিশ্চয়ই ইহা একটি কিতাবে সংরক্ষিত আছে। ইহা আল্লাহর নিকট অতি সহজ”। (সূরা হজ্জ-৭০)

  • তৃতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলার কার্যকরী ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ﴾ [الحج:18]

“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন” (সূরা হজ্জ-১৮)

মহামহীম আল্লাহ আরো বলেন:

﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡ‍ًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ﴾ [يس: 82]

“বস্তুত: তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তার কাজ শুধু এই হয় যে, তিনি তাকে বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়” । (সূরা ইয়াসিন-৮২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [التكوير:29]

“আর, আসলে তোমদের চাওয়ায় কিছু হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাহেন”। (সূরা তাকভীর: ২৯)

  • চতুর্থত: এই বিশ্বাস রাখা যে, সমগ্র বস্তুজগত আল্লাহ পাকের সৃষ্টি। তিনি ব্যতীত না আেকান স্রষ্টা, না আছে কোন প্রভু-প্রতিপালক।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر: 62]

“আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর কর্মবিধায়ক”। (যুমার: ৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡۚ هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ﴾ [فاطر:3]

“হে মানব মন্ডলী, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্বরূপ কর। আল্লাহ ব্যতীত কি তোমাদের কোন স্রষ্টা আছে ! যে তোমাদিগকে আকাশ ও পৃথিবী হতে রিজিক দান করে? তিনি ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তোমরা কোন পথে পরিচালিত হচ্ছো”? (সূরা ফাতির: ৩)

অতএব, ভাগ্যের উপর ঈমান বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকেই বুঝায়। পক্ষান্তরে, বিদ্‌আ‘ত পন্থীরা ইহার কোন কোনটি অস্বীকার করে থাকে। উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহর উপর ঈমানের মধ্যে এ বিশ্বাসও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে যে, ঈমান মানে কথা ও কাজ যা পূণ্যে বৃদ্ধি এবং পাপে হ্রাস পায়। একথাও ইমানের অন্তর্ভুক্ত যে, কুফরী ও শিরক ব্যতীত কোন কবীরা গুনাহ-যেমন, ব্যভিচার, চুরি, সুদ গ্রহণ, মদ্যপান, পিতামাতার অবাধ্যতা ইত্যাদির জন্য কোন মুসলিমকে কাফের বলা যাবেনা, যতক্ষণ না সে তা হালাল বলে গণ্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء:116]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সবকিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন”। (সূরা নিসা-১১৬)

দ্বিতীয় প্রমাণ হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একাধিক মুতাওয়াতির হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরকালে এমন লোককেও মুক্ত করবেন যার অন্তরে (এ জগতে) শষ্যদানা পরিমাণ ঈমান বিদ্যমান ছিল।

চলবে……………

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [১]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

[প্রথম নীতি]

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের প্রথম কথা হলো এই বিশ্বাসই স্থাপন করা যে, তিনিই ইবাদতের একমাত্র যোগ্য, সত্যিকার মা‘বুদ, অন্য কেউ নয়। কেননা, একমাত্র তিনিই বান্দাহদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী এবং তাদের জীবিকার ব্যবস্থাপক। তিনি তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে প্রতিফলদানে ও অবাধ্যজনকে শাস্তি প্রদানে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর এই ইবাদতের জন্যেই আল্লাহ্‌ তা‘আলা জ্বিন ও ইন্‌সানকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ ٥٧ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ﴾ [الذاريات:56-57]

“আমি জ্বিন ও ইনসানকে কেবল আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন রিজিক চাইনা, এটাও চাইনা যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিজেইতো রিজিকদাতা, মহান শক্তিধর ও প্রবল পরাক্রান্ত”। (সূরা যারিয়াত: ৫৬,৫৭)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ٢٢﴾ [البقرة: 21-22]

“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রভূ প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকলকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। তিনিই সেই প্রভূ যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ, আকাশকে ছাদ স্বরূপ তৈরী করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে এর সাহায্যে নানা প্রকার ফল-শষ্য উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অতএব, তোমরা এসব কথা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করোনা”। (সূরা বাকার : ২১,২২)

এ সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এবং এর প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে এর পরিপন্থী বিষয় থেকে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) এর ইবাদত থেকে দুরে থাক”। (সূরা নাহল-৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ﴾ [الأنبياء:25]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) আর কোন মা‘বুদ নেই। অতএব, তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর”। (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿كِتَٰبٌ أُحۡكِمَتۡ ءَايَٰتُهُۥ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِن لَّدُنۡ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ١ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ وَبَشِيرٞ﴾ [هود:1-2]

“ইহা এমন একটি কিতাব যার আয়াতসমূহ এক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্তার নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না কর। অনন্তর, আমি তাঁরই পক্ষ হতে তোমদের প্রতি একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা”। (সূরা হূদ : ১.২)

উল্লেখিত ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো: যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের তরেই নিবেদিত করা। প্রার্থনা, ভয়, আশা, নামায, রোজা, জবেহ, মানত ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবদত তাঁরই প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় ও পূর্ণ বশ্যতা সহকারে সম্পাদন করা। কুরআন শরীফের অধিকাংশ আয়াত এই মহান মৌলিক নীতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

﴿ِ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ﴾ [الزمر:2-3]

“অতএব তুমি এক আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর, দ্বীনকে একমাত্র তাঁরই জন্যে খালেছ কর। সাবধান, খালেছ দ্বীনতো একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য”। (সূরা যুমার: ২, ৩)

আল্লাহ্‌ পাক বলেন:

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ﴾ [الإسراء:23]

“তোমার প্রতিপালক এই বিধান করে দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কারো নয়”। (সূরা ইসরা: ২৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

﴿فَٱدۡعُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ﴾ [غافر:14]

“অতএব, তোমরা আল্লাহকেই ডাক, নিজেদের দ্বীনকে কেবল তাঁরই জন্যে খালেছ ভাবে নির্দিষ্ট কর, কাফেরদের কাছে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন”। (সূরা গাফের: ১৪)

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘বান্দার উপর আল্লাহ্‌র অধিকার হলো তারা যেন কেবল তাঁরই ইবাদত করে এবং এতে অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার না করে’।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো-ঐ সমস্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থপন করা, যা আল্লাহ্‌ পাক তাঁর বান্দাগণের উপর ওয়াজিব ও ফরজ করেছেন। যথা: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ:

  • (১) সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র রাসূল ।
  • (২) নামাজ প্রতিষ্ঠা করা
  • (৩) যাকাত দেয়া
  • (৪) রমজানের রোজা পালন
  • (৫) বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছার সামর্থ থাকলে হজ্জব্রত পালন করা ইত্যাদি সহ অন্যান্য ফরজগুলি, যা নিয়ে পবিত্র শরীয়তের আগমন ঘটেছে।

উপরোক্ত স্তম্ভ বা রুকনগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান করুন হলো এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহুর রাসূল। এটিই হলো কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’এর প্রকৃত মর্মার্থ। কেননা, এর যথার্থ অর্থ হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তাঁকে ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয়, সে মানব সন্তান হোক আর ফেরেশতা, জ্বিন বা অন্য এই যাই হোক সবই বাতেল। সত্যিকার মা‘বুদ হলেন কেবল সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহপাক বলেন:

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ﴾ [الحج:62]

“তা এই জন্যে যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য এবং তাঁকে বাদ দিয়ে ওরা যারা ইবাদত করছে তা নিঃসন্দেহে বাতেল”। (সূরা হজ্জ: ৬২)

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এই যথার্থ মৌলিক বিষয়ের উদ্দেশ্যেই জ্বিন ও ইন্‌সান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে পাঠক; বিষয়টি ভাল করে ভেবে দেখুন এবং এ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠবে, অধিকাংশ মুসলিম উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার মধ্যে নিপতিত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্যেরও ইবাদত করছে এবং তাঁর প্রাপ্য ও খালেছ অধিকার অন্যের তরে নিবেদিত করে চলছে।

এ বিশ্বাসও আল্লাহ্‌ পাকের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনিই সর্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা, তাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক এবং আল্লাহ্‌ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্বীয় জ্ঞান ও কুদরতের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দুনিয়া-আখেরাতের মালিক ও সমগ্র জগৎবাসীর প্রতিপালক। তিনিই আপন বান্দাহগণের যাবতীয় সংশোধন, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যানের প্রতি আহবান জানানোর উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। ঐ সমস্ত ব্যাপারে পবিত্র আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই। তিনি আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر:62]

“ আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সর্ব বিষয়ের যিম্মাদার”। (সূরা যুমার-৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [الأعراف:54]

“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভূ হলেন আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠলেন হলেন। তিনি রাতকে দিনের অনুসরণ করে চলে। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সবই তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি আর হুকুম প্রদানের মালিক তিনিই। চির মঙ্গলময় মহান আল্লাহ তিনিই সর্বজগতের প্রভূ”। (সূরা আল-আ’রাফ-৫৪)

আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো, কুরআন শরীফে উদ্ধৃত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত আল্লাহর সর্ব সৃন্দর নামসমূহ ও তাঁর সর্বোন্নত গুণরাজির উপর কোন প্রকার বিকৃতি, অস্বীকৃতি, ধরন, গঠন বা সাদৃশ্য আরোপ না করে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [الشورى:11]

“কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। (সূরা শূরা-১১)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿فَلَا تَضۡرِبُواْ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡثَالَۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾ [النحل:74]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র কোন সদৃশ্য স্থির করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ই জানেন, তোমরা জান না”। (সূরা নাহল : ৭৪)

এই হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা বা বিশ্বাস। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী রহিমাহুল্লাহ্‌ তাঁর ‘আল-মাকালাত আন আসহাবিল হাদীস অ আহলিস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই আকীদার কথাই উদ্ধৃত করেছেন। এভাবে ইল্‌ম ও ঈমানের বিজ্ঞজনেরাও বর্ণনা করে গেছেন। ঈমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন: ইমাম যুহরী ও মাকহুলকে আল্লাহ্‌র গুণরাজি সম্পর্কিত আয়াতগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা বলেন: এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবেই মেনে নাও। ওয়ালীদ বিন মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন ইমাম মালেক, আওযায়ী, লাইছ বিন সা‘দ ও সুফইয়ান ছাওরীকে আল্লাহর গুণরাজি সম্বন্ধে বর্ণিত হাদিসসমূহ জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা সকলেই উত্তরে বলেন: ‘এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবে মেনে নাও’। ইমাম আওযায়ী বলেন: বহুল সংখ্যায় তাবেয়ীগণের জীবদ্দশায় আমরা বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ পাক তাঁর আরশের উপর বিরাজমান রয়েছেন এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত তাঁর সব গুণাবলীর উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি।

ইমাম মালেকের উস্তাদ রাবীআ বিন আবু আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহকে (আল্লাহ তাঁরই আরশের উপর উঠা) সম্পর্কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর আরশের উপর উঠা অজানা ব্যাপার নয়; তবে এর বাস্তব ধরণ আমাদের বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে রিসালাত, আর রাসূলের দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে এর ঘোষণা করা এবং আমাদের কর্তব্য হলো এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ কে [الاستواء] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন: উপরে উঠা আমাদের জ্ঞাত আছে তবে এর বাস্তবধরণ অজ্ঞাত, এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা বিদ‘আত। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে ঐ একই অর্থে হাদীস বর্ণিত আছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ‘ত আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ঐসব গুণাবলী সাদৃশ্যহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তিনি স্বীয় কোরআন শরীফে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহীহ হাদীসসমূহে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ হওয়া থেকে এমনভাবে পবিত্র রাখেন যার মধ্যে তা‘তীল বা গুণমুক্ত হওয়ার কোন লেশ থাকেনা। ফলে তারা পরস্পর বিরোধী আস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকেন।

বস্তুত: আল্লাহ পাকের বিধানই হলো, যেন মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরিত সত্যকে আঁকড়ে তাঁর সমুদয় সামর্থ সে পথে ব্যয় করে এবং নিষ্ঠার সাথে এর অম্বেষায় থাকে, তবেই তাকে আল্লাহ সত্যের পথে চলার তৌফিক দান করেন এবং তার বক্তব্যকে বিজয়ী করে দেন। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿بَلۡ نَقۡذِفُ بِٱلۡحَقِّ عَلَى ٱلۡبَٰطِلِ فَيَدۡمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٞۚ وَلَكُمُ ٱلۡوَيۡلُ مِمَّا تَصِفُونَ﴾ [الأنبياء:18]

“বরং আমিতো বাতেলের উপর সত্যের আঘাত হেনে থাকি, ফলে তা অসত্যকে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষনাৎই বাতেল বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া : ১৮)

আল্লাহ তা‘আলা আরেকটি আয়াতে বলেন:

﴿وَلَا يَأۡتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ وَأَحۡسَنَ تَفۡسِيرًا﴾ [الفرقان: 33]

“আর যখনই তারা তোমার সম্মুখে কোন নুতন কথা নিয়ে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি এর জবাব তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি এবং অতি উত্তমভাবে মূল কথা ব্যক্ত করে দিয়েছি”। (সূরা ফুরকান: ৩৩)

হাফেয ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ পাকের বাণী:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ﴾ [الأعراف:54]

“বস্তুত তোমাদের প্রভু সেই আল্লাহ যিনি আকাশ মন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনের মধ্যে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠেন”। (সূরা আরাফ: ৫৪)

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অতি সুন্দর কথা বলেছেন যা অত্যন্ত উপকারী বিধায় এখানে প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেন, এ প্র্রসঙ্গে লোকদের বক্তব্য অনেক, এর বিস্তারিত বর্ণনার স্থান এখানে নয়। আমরা এ ব্যাপারে ঐ পথই গ্রহণ করবো, যে পথে চলেছেন পূর্বেকার সুযোগ্য মনীষী ইমাম মালেক, আওযায়ী, ছাওরী, লাইছ বিন সা‘দ, শাফেয়ী, আহমদ বিন রাহওয়া সহ তৎকালীন ও পরবর্তী মুসলিমদের ইমামগণ। আর তা হলো: আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেয়া, এর কোন ধরণ, সাদৃশ্য বা গুণ বিমুক্তি নির্ণয় ব্যতিরেকেই। সাদৃশ্য পন্থিদের মস্তিষ্কে প্রথম লগ্নেই আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে যে কল্পনার উদয় ঘটে তা আল্লাহপাক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদুরিত। কেননা কোন ব্যাপারেই কোন সৃষ্টি আল্লাহর সদৃশ হতে পারে না। তাঁর সমতুল্য কোন বস্তু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তদ্রুপই, যেরূপ শ্রদ্ধেয় ইমামগণ বলে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারীর উস্তাদ নায়ীম বিন হাম্মাদ আল খুজায়ী অন্যতম। তিনি বলেছেন: যে লোক আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কোন ব্যাপারে সদৃশ মনে করে সে কাফের এবং যে আল্লাহুর সব গুণরাজি অস্বীকার করে যা দ্বারা তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন, সেও কাফের। কেননা আল্লাহকে স্বয়ং তিনি বা তাঁর রাসূল যেসব গুণরাজির দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোন সাদৃশ্য নেই।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে কুরআন শরীফের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত গুণরাজি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যা, আল্লাহর মহত্বের সাথে মানানসই হয় এবং তাঁকে যাবতীয় অপূর্ণতা, খুঁত বা ক্রটি-বিচ্যুতি থেকে পাক-পবিত্র রাখে সে ব্যক্তিই হেদায়াতের পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলে।

চলবে……

পরকাল ভাবনা -২

পরকাল ভাবনা

মুলঃ মুহাম্মাদ শামছুল হাক ছিদ্দিক
পর্বঃ ১ || পর্বঃ

গড়পড়তায় দশ বছর সময়ে সম্পূর্ণ শরীরেই পরিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপনার যে শরীর দশ বছর আগে ছিল তা আজ আর আপনার সাথে নেই, আপনার বর্তমান শরীর সম্পূর্ণ এক নতুন শরীর। বিগত দশ বছরে আপনার শরীরের যে অংশগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে সেগুলো যদি পুরোপুরিভাবে একত্রিত করা হয় তাহলে হুবহু আপনার আকৃতির আরেকটা মানুষ দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এমনকি আপনার বয়স যদি একশ বছর হয়ে থাকে তাহলে আপনার মতো দশজন মানুষের কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এ-মানুষগুলো প্রকাশ্যে আপনার মতো হবে, তবে তাতে কোনো প্রাণ থাকবে না। যার সবকিছুই থাকবে তবে আপনিই থাকবেন অনুপস্থিত। কেননা আপনি পেছনের সকল শরীর ত্যাগ করে নতুন এক শরীরকে বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এভাবে আপনার শরীর ভাঙ্গা-গড়ার এক দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এগোতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে প্রতিনিয়ত। শুধু আপনিই থাকেন পুরাতন, অপরিবর্তিত। যে জিনিসটাকে আপনি ‘আমি’ বলছেন তা কিন্তু থেকে যাচ্ছে আগেরটাই। আপনি যদি দশ বছর আগে কোন চুক্তি করে থাকেন তাহলে দশ বছর পরও আপনি স্বীকার করেন যে এ-চুক্তি আপনিই করেছেন। অথচ আপনার অতীতের শারীরিক অস্তিত্বের কিছুই আজ অবশিষ্ট নেই। ওই হাত এখন আর আপনার সাথে নেই যা দিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সে জিহ্বাও নেই যা ব্যবহার করে চুক্তি সম্পর্কে আলাপ করেছিলেন। তবে আপনি এখনো ‘আপনি’ই থেকে গেছেন, এবং নির্দ্বিধায় স্বীকার করে যাচ্ছেন যে দশ বছর পূর্বে যে চুক্তি আপনি করেছেন তা আপনিই করেছেন, এবং আপনি তা পূর্ণ করতে একশতভাগ প্রস্তুত।

মানুষ কোনো বিশেষ শরীরের নাম নয় যা ধ্বংস হলে মানুষও ধ্বংস হয়। মানুষ এমন একটি অভ্যন্তর অস্তিত্ব বা আত্মা, যা শরীরী অস্তিত্বের বাইরেও থাকে সজীব, প্রাণবন্ত। শরীরের পরিবর্তনশীলতা এবং আত্মার অজর অবস্থা মানুষের অবিনাশী প্রকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করছে যা কখনো ক্ষয় অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না।

কিছু নির্বোধ লোকের বক্তব্য হলো, নির্দিষ্ট কিছু জড়-পদার্থের একীভূত হওয়ার নামই জীবন এবং সেগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়াই মৃত্যু। এ-বক্তব্য কোনো অর্থেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। জীবন যদি কেবল কিছু পর্দাথের বিশেষ বিন্যাসে একত্রিত হওয়ার নাম হয় তাহলে ওই সময় পর্যন্ত জীবনস্পন্দন অবশিষ্ট থাকার কথা যতক্ষণ পদার্থের এ-বিন্যাস বজায় থাকে। সাথে সাথে এটাও সম্ভব হওয়া উচিত যে, কোন দক্ষ বিজ্ঞানী পদার্থের বিশেষ কিছু অংশকে একত্রিত করে জীবন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আমাদের জানা মতে এদু’টোর মধ্যে একটিও সম্ভব নয়।

আমাদের অজানা নয় মৃত্যুবরণকারী কেবল সেই নয় যার শরীরের বিভিন্ন অংশ কোনো দুর্ঘটনার কারণে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যায়। বরং বিচিত্রভাবে ও সকল বয়সের মানুষেরই মৃত্যু হয়ে থাকে। এমনও হয় যে একজন সুস্থ সবল মানুষ হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা গেলো। কেন এমনটি হলো? কোন অভিজ্ঞ ডাক্তারও এর কারণ খুঁজে পায় না। মৃত ব্যক্তির শরীর তার পূর্বের বিন্যাসেই রয়ে গেছে, তাহলে হলোটা কী যার জন্য আমরা তাকে মৃত বলছি? অন্য কথায় বলতে গেলে, বিভিন্ন পদার্থের সুবিন্যস্ত কাঠামো পূর্বের ন্যায় এখনো আছে, নেই শুধু হৃদস্পন্দন। সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আগের বিন্যাসেই বিরাজমান কিন্তু তাতে যা নেই তাহলো জীবনীশক্তি। এ-বিষয়টি প্রমাণ করছে যে, কিছু জড়পদার্থের বিশেষ বিন্যাসে একত্রিত হয়ার নাম জীবন নয়, জীবন হলো তার বাইরের একটি জিনিস যার রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ।

কোনো ল্যাবরেটরিতে প্রাণবিশিষ্ট মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। যদিও যান্ত্রিকভাবে শরীরের অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। একটি প্রাণসম্পন্ন মানুষের মধ্যে সর্বশেষ বিশ্লেষণে যে রাসায়নিক পরমাণুর ভিত রয়েছে তার মধ্যে কার্বনের ধরন ঠিক তাই যা রয়েছে কয়লার মধ্যে। হাইড্রোজেন এবং অক্রিজেন একই ধরনের যা রয়েছে পানির উৎসে। বায়ুমন্ডলের অধিকাংশ যে নাইট্রোজেন দ্বারা গঠিত তা রয়েছে মানুষের মধ্যেও। তদ্রূপভাবে অন্যান্য জিনিসও। কিন্তু একটি প্রাণসম্পন্ন মানুষ কী শুধুই কিছু পরমাণুর সমন্ব্য় অজানা এক পদ্ধতিতে এক জায়গায় একসাথে জমায়েত হয়েছে? নাকি জীবন এর বাইরের অন্য কিছু?

বিজ্ঞানীরা বলেন : ‘মানুষের শরীর কি কি পদার্থ দিয়ে গঠিত এ বিষয়টি যদিও আমাদের জানা, কিন্তু ঐসব পদার্থ একত্রিত করে জীবন সৃষ্টি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য কথায় বলতে গেলে একজন সপ্রাণ মানুষের শরীর কেবল নির্জীব কিছু পরমাণুর সমষ্টির নাম নয়, বরং তা হলো প্রাণ ও পরমাণু উভয়টার সমন্ব্য় মৃত্যুর পর পরমাণুর অংশটা তো আমাদের সামনেই পড়ে থাকে, কিন্তু প্রাণ তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায় দূরে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

জীবন অক্ষয় অবিনশ্বর, এ আলোচনা থেকে এ কথাটাই উঠে আসছে স্পষ্টাকারে। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ধারণার গুরুত্ব ও যক্তিসর্বস্ব এ আলোচনা থেকে বুঝা যাচ্ছে। এ-বিষয়টি আমাদের চোখে আঙ্গুল রেখে বলছে যে মৃত্যুপূর্ব জীবনই কেবল জীবন নয়, বরং মৃত্যুর পরও আমাদের বেঁচে থাকতে হবে অনন্তকালের গভীরে। এ-পৃথিবী ধ্বংসশীল, তা আমাদের মেধা ও বুদ্ধি খুব সহজভাবেই মেনে নেয়। কিন্তু মানুষ এমনই এক অস্তিত্ব যার কোন ধ্বংস নেই। আমরা যখন মৃত্যুবরণ করি তখন মূলতঃ আমাদের জীবনাবসান ঘটেনা, এক ভিন্নমাত্রার জীবন-স্রোতে আবারও যাত্রা শুরু করতে অন্য কোথাও চলে যাই যেখানে নেই কোনো ক্ষয়, মৃত্যু, নাশ। মূলতঃ আমাদের এই পৃথিবীর জীবন আমাদের মূল ও অনন্তজীবনের তুলনায় অতি তুচ্ছ, নগণ্য, এমন কি হিসেবে আসার মতোই নয়।

  • দ্বিতীয় জগৎ

এবার আসুন ভেবে দেখা যাক দ্বিতীয়-জীবনটা কেমন হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন- সেখানে স্বর্গ ও নরক রয়েছে, মৃত্যুর পর, বিচার ফয়সালা সম্পন্ন হলে মানুষমাত্রই এ-দুটির মধ্যে যেকোনো একটিতে ঢুকে যাবে। আজকের পৃথিবীতে যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগত হবে, সৎকাজ করবে সে বেহেশতের আনন্দঘন পরিবেশে জায়গা পাবে। আর যে ব্যক্তি অসৎ, খোদাদ্রোহী হবে সে নরকরে মমন্তুদ যন্ত্রণায় নিক্ষিপ্ত হবে।

একটু ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। এ-পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি কৃত্যের দুটি দিক রয়েছে।

  • এক. অন্যসব ঘটনার মতোই এ-এক ঘটনা।
  • দুই. উক্ত ঘটনার পিছনে একটা ইচ্ছা কার্যকর থাকে।

প্রথম দিকটিকে ঘটনাগত এবং দ্বিতীয়টিকে চরিত্রগত দিক বলা যেতে পারে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো উজ্জ্বল হতে পারে। ধরে নিন কোন গাছের ডালে একটি পাথর আটকা পড়ে ছিল। আর ওই গাছটির নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসের ঝাপটায় পাথরটি আপনার মাথায় পড়ে যায়। এমতাবস্থায় আপনি অবশ্যই গাছটির বিরুদ্ধে ক্রদ্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মাথায় হাত রেখে বাড়ি চলে যান । অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি যদি একটি পাথর নিয়ে সজ্ঞানে আপনার মাথায় আঘাত করে তার বিরুদ্ধে আপনি উৎক্ষিপ্ত না হয়ে পারেন না, এমনকী উত্তেজিত হয়ে দ্বিখন্ডিত করে দিতে পারেন ওই ব্যক্তির মাথা।

বৃক্ষ ও মানুষ এ-দুয়ের আচরণের এ-পার্থক্য কেন? আপনি কেন গাছের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হন না, মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যান প্রচন্ডভাবে। এর কারণ শুধু একটিই : বৃক্ষ অনুভূতিশূন্য আর মানুষ তার বিপরীত। বৃক্ষের কাজটি নিছক ঘটনাজাত, পক্ষান্তরে মানুষেরটা ঘটনাজাত হয়ার সাথে সাথে একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যবহ।

এর মানে, মানবকৃত্যের দুটি দিক রয়েছে।

  • এক. এর দ্বারা একটি ঘটনা সংঘটিত হয়।
  • দুই. কাজটি বৈধ না অবৈধ, পবিত্র মানসিকতা নিয়ে করা হচ্ছে না অপবিত্র মানসিকতা নিয়ে ইত্যাদির বিবেচনা।

মানবকৃত্যের প্রথম দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতেই প্রকাশ পায়, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতে প্রকাশ পায় না। যদি কখনো পায় তাহলে অসম্পূর্ণরূপে।

যে ব্যক্তি আপনাকে পাথর মেরেছে তার কর্মের ফলাফল তো সাথে সাথেই প্রকাশ পেয়েছে : আপনার মাথায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তার কর্মের দ্বিতীয় দিকটির- অথাৎ ভুল জায়গায় শক্তি প্রয়োগের ফলাফল এ-পৃথিবীতে প্রকাশ পাওয়া জরুরি নয়। সে ব্যক্তির ইচ্ছা ছিলো আপনার মাথায় আঘাত করতে অতঃপর আপনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি সে ইচ্ছা করেছিলো একটি অবৈধ কাজ করবে, কিন্তু তার এই ইচ্ছাটার ফলাফল এ-পৃথিবীতে আসেনি। মানুষের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশকেই ফলাফল বলে , আর আমরা দেখি যে, মানুষের ইচ্ছার ঘটনাগত ফলাফল হরহামেশাই সামনে আসছে। তাহলে মানুষের ইচ্ছার দ্বিতীয় দিকটির ফলাফলের প্রকাশ, অর্থাৎ চারিত্রিক ফলাফলও অবশ্যই প্রকাশ পাওয়া উচিত।

পরকাল মানবকৃত্যের এই দ্বিতীয় দিকটির পরিপূর্ণরূপে প্রকাশের জায়গা। মানবকৃত্যের একটি দিক যেমন কিছু ঘটনাপুঞ্জের সৃষ্টি করে, তদ্রূপভাবে মানবকৃত্যের অন্যদিকটিও নিশ্চয়ই কিছু ফলাফল সৃষ্টি করে; পার্থক্য শুধু এতটুকু যে প্রথম প্রকার ফলাফল এ-পৃথিবীতেই প্রকাশ পায়, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার ঘটনার ফলাফল আমরা দেখতে পাবো পরজগতে।

এ-পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি মানুষই তার কর্মের মাধ্যমে কোনো না কোনো ফলাফল সৃষ্টিতে ব্যস্ত রয়েছে। হোক সে কর্মব্যস্ত অথবা বেকার, সর্বাবস্থায় তার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সৃষ্টি হচ্ছে একটি জগৎ। ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, অভ্যস-প্রকৃতি আচার-ব্যবহার ইত্যাদির নিরিখে মানুষেরা মন্তব্য করে থাকে তার পক্ষে বা বিপক্ষে। শক্তির যথার্থ অথবা অযথার্থ প্রয়োগের ফলে তার কার্যাদি হয়তো সুচারুভাবে সম্পাদিত হয় অথবা বিগড়ে যায়। যে ধরনের বিষয়কে লক্ষ্য করে তার চেষ্টা সাধনা পরিচালিত হয় সে ধরনের বিষয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় তার অধিকার ।

অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই তার চারপাশে গড়ে যাচ্ছে একটি নিজস্ব জগৎ যা তার কৃতকর্মেরই সরাসরি ফলাফল। মানুষের সৃষ্ট এ জগৎটির একাংশ পৃথিবীর আলোতে দৃশ্যমান করছে নিজেকে। পক্ষান্তরে অপর অংশটি, অর্থাৎ বৈধ-অবৈধ হয়ার দিকটিও একটা ফলাফল অবশ্যই সৃষ্টি করছে যা আড়াল করে রেখেছে নিজেকে পরজগতে প্রকাশের অপেক্ষায়। আমাদের কর্মের দ্বিতীয় অংশটি মূলত কর্মের চারিত্রিক দিক যা স্বতন্ত্র রকমের একটা ফলাফল সৃষ্টি করে যাচ্ছে, ধর্মীয় পরিভাষায় যাকে স্বর্গ ও নরক বা বেহেশত ও দোযখ বলা হয়। আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই প্রতি মুহূর্তে এ বেহেশত অথবা দোজখ নির্মাণ করে যাচ্ছে। আর যেহেতু মানুষকে এ-পৃথিবীতে পরীক্ষার উদ্দেশে রাখা হয়েছে , তাই এ-বেহেশত ও দোযখ মানুষের চোখের অন্তরালে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য বেঁধে দেয়া সময় যখন শেষ হয়ে যাবে, এবং পূনরুত্থান দিবস চলে আসবে প্রত্যেককেই, তখন, তার নির্মিত জগতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এখানে একটি প্রশ্ন জাগে : আমাদের কর্মের যখন একটি চারিত্রিক দিক আছে, তবে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য না হয়ে দৃষ্টির অন্তরালে থাকছে কেন। ধরা যাক আমাদের পাশেই একটি বিল্ডিং এর নির্মাণ কাজ চলছে, এ কাজের একটি ফলাফল তো এই যে নির্মিত হয়ে বিল্ডিংটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এ-কাজটির অন্য আর-একটি দিক অর্থাৎ বিল্ডিংটি কি বৈধভাবে নির্মিত হচ্ছে না অবৈধভাবে. এ-দিকটির যদি কোনো ফলাফল বা পরিণতি সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে তা কোথায়? এমন কি-ইবা পরিণতি থাকতে পারে যা ধরাছোঁয়ার বাইরে, দৃষ্টির অন্তরালে।

এ-প্রশ্নের উত্তর মানবকৃত্যের উল্লেখিত দুটি দিকের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। কোনো কর্মের ঘটনাগত দিক প্রতিটি মানুষই দেখতে পায়। এমনকী ক্যামেরার চোখও তা ধরতে পারে। কিন্তু সে কর্মের চাত্রিক দিক দৃষ্টির আওতায় আসার মতো জিনিশ নয়, বরং এ-দিকটি কেবলই আঁচ করার, অনুভব করার। কর্মের এ-দুটি দিকের মধ্যখানে যে পার্থক্য তা অত্যন্ত স্পষ্ট করে ইঙ্গিত দিচ্ছে, উভয় প্রকার ফলাফল কীভাবে প্রকাশ পাওয়া উচিত। অর্থাৎ মানবকৃত্যের প্রথম দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতেই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়া উচিত যা আমরা স্পর্শ করে দেখতে পাবো, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দিকটির ফলাফল ওই জগতে প্রকাশ পাওয়া উচিত যা এখনো দৃষ্টির অন্তরালে। ঘটনা অনেকটা এ-রকম যে যেটা যেভাবে হয়া উচিত সেটা ঠিক সেভাবেই হচ্ছে ।

এখানে কেবল বিচার বুদ্ধির নিরেখে সম্ভাবনাময় একটি ঘটনার কথাই বলা হচ্ছে না, বরং এ-মহাবিশ্ব সম্পর্কে চিন্তাভাবনা মানুষকে এ-সিদ্ধান্তে উপনীত করছে যে এখানে প্রতিটি কর্মেরই দু’প্রকার ফলাফল রয়েছে। এখানে এমন কর্মফলও রয়েছে যা কর্ম সম্পাদনের পর তৎক্ষণাৎ দেখা যায়। আবার এমন কর্মফলও রয়েছে যা দৃষ্টির নাগালের বাইরে থাকা সত্ত্বেও অস্তিত্ববান। এ-মহাবিশ্বে এ ধরনের অদৃশ্য ফলাফলের উপস্থিতির বিষয়টি আজ দুর্বোধ্য কোনো বিষয় নয়। উদাহরনস্বরুপ আওয়াজের কথা ধরুন: আওয়াজ, সবাই জানে, কিছু তরঙ্গমালা যা চর্মচোখে দেখা যায় না। আমরা যখন কথা বলার জন্য জিহ্বা নাড়াই তখন আবহাওয়ায় একপ্রকার তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। আমাদের জিহ্বা নাড়ানোর ফলে এ তরঙ্গমালা আবহাওয়ার গায়ে এঁটে যায়। যখনই কেউ কথা বলে ডেউয়ের আকৃতিতে তা বাতাসে অঙ্কিত হয়ে যায় এবং তা বিরাজমান থাকে স্বতন্ত্রভাবে এমনকী বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের কথা-শব্দ-বক্তব্য সবই বাতাসে ঢেউ-এর আকৃতিতে বিদ্যমান রয়েছে। যদি আমাদের কাছে এসব আওয়াজ ধরার কোন যন্ত্র থাকে তাহলে যেকোনো সময় অতীতের কথাসমূহ শোনার সূযোগ পাবো।

আমাদের চারপাশে বাতাসের একটি আবরণ রয়েছে যাতে আমাদের প্রতিটি আওয়াজ মুখ থেকে বের হয়ার সাথে সাথে অঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে- যদিও আমরা আওয়াজ, অথবা আওয়াজটির বাতাসে অঙ্কিত হয়ে যাওয়া, কোনোটাই দেখতে পাই না ঠিক একইরূপে পরজগতও আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঢেকে রেখেছে এবং আমাদের নিয়ত ও ইচ্ছাসমূহকে প্রতিনিয়ত রেকর্ড করে যাচ্ছে। পরজগতের পর্দায় আমাদের কৃত্যের নকশা অঙ্কিত হচ্ছে যা মৃত্যুর পর দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে।

গ্রামোফোন যদি চালু থাকে এবং ডিস্ক তার উপর ঘুরতে থাকে তাহলে সুঁইয়ের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই নিশ্চুপ বস্তুটি বাজতে শুরু করে। মনে হয় যেন সে এ-অপেক্ষাতেই ছিলো যে, কেউ যখন তার উপর সুঁই রেখে দেবে অবলীলায় সে বাজতে শুরু করবে। ঠিক একইরূপে আমাদের সমস্ত কর্মের রেকর্ড রাখা হচ্ছে, যখন সময় হবে তখন বিশ্বপ্রতিপালক তা চালু করে দিবেন, নিশ্চুপ রেকর্ড চলতে শুরু করবে। অবস্থা দেখে মানুষ বলতে থাকবে:

ما لهذا الكتاب لا يغادر صغيرة ولا كبيرة إلا أحصاها. (سورة الكهف : 49)

“এ কেমন রেকর্ড, আমার ছোট বড়ো কোনো কিছুই তো এর হিসেব থেকে বাদ পড়েনি। (সূরা কাহ্‌ফ : ৪৯)

 

  • শেষ কথা

উপরে আমি যা বললাম তা আরো একবার ভেবে দেখুন। আপনার জীবন এক অন্তহীন জীবন, মৃত্যু এ জবীনের শেষ প্রান্ত নয় বরং দ্বিতীয় পর্বের প্রারম্ভ বিন্দু। মৃত্যু আমাদের দুই পর্বের মধ্যবর্তী সীমানা। বিষয়টিকে এভাবে বুঝুন যে কৃষক জমিনে ফসল বুনে, নিয়ম মাফিক চেষ্টা সাধনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, এক পর্যায়ে ফসল প্রস্তুত হয়। কৃষক তা কাটে, গোলায় তুলে, সারাবছরের খাদ্যের ব্যবস্থা করে। ফসল কাটার অর্থ ফসলের এক পর্ব শেষ হয়ে অন্য পর্বের শুরু হয়া। ইতোপূর্বে তার কাজ ছিলো ফসল বোনা ও যত্ন নেয়া এখন তার কাজ হবে ফসল গোলায় তুলা ও নিজের প্রয়োজন মিটানো। ফসল কাটার পূর্বে ছিলো চেষ্টাসাধনা ও পয়সা ব্যয়ের পালা আর ফসল কাটার পর শুরু হয় মেহনতের ফলভোগ ও তা থেকে উপকৃত হয়ার পালা।

মানুষের জীবনের অবস্থাও ঠিক একই রকম। মানুষ এ-পৃথিবীতে পরজগতের ফসল বুনছে, যত্ন নিচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকেরই পরজগতে একটি খামার রয়েছে যা হয়তো সে চাষ করছে, অথবা ফেলে রাখছে পতিত বিনা কর্ষণে। যারা কর্ষণ করছে তারা হয়তো এতে উত্তম অথবা অনুত্তম বীজ ফেলছে। বীজ ফেলে হয়তো রেখে দিচ্ছে অবহেলায় অথবা পরিচর্যা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেখানে হয়তো তিক্ত ফলের গাছ লাগাচ্ছে অথবা রূপন করছে সুস্বাদু ফলের বৃক্ষ। জমিনকে উর্বর করতে ব্যয় করছে সমগ্রশক্তি অথবা অপ্রাসঙ্গিক ব্যস্ততায় কাটাচ্ছে সময়। এ-ফসল তৈরির সময়সীমা মৃত্যুর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত। মৃত্যু পরকালের ফসল কাটার দিন। যখন এ-পৃথিবীতে

আমাদের চোখ বন্ধ হয় তখন দ্বিতীয় জগতে গিয়ে তা খোলে। সেখানে যার যার খামার দৃষ্টিতে আসে। জীবনভর কর্ষিত অথবা ফেলে রাখা জমিন নজরে আসে আমাদের সবার। শুরু হয় ফসল কাটা, গোলায় তুলা ও তাত্থেকে উপকৃত হয়ার পালা। এ-সময় কেবল সে ব্যক্তিই ফসল কাটে যে ইতোপূর্বে ফসল বুনেছে এবং সে ফসলই কাটে যা সে বুনেছে। প্রত্যেক কৃষকই জানে যে তার গোলায় ঠিক ততটুকু ফসলই আসবে যতটুকু সে মেহনতমজদুরি করেছে। তদ্রূপভাবে পরকালেও মানুষ ঠিক ততটুকুই পাবে যতটুকু সে চেষ্টা সাধনা করেছে। মৃত্যু, চেষ্টা সাধনার সময় শেষ হয়ার সর্বশেষ ঘোষণা , আর পরকাল নিজের চেষ্টাসমূহের ফলাফল লাভের শেষ জায়গা। মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার চেষ্টা-সাধনার না কোনো সুযোগ রয়েছে, না রয়েছে পরকালীন জীবন শেষ হয়ার কোনো সম্ভাবনা। কতইনা কঠিন এ-বাস্তবতা। যদি মানুষ মৃত্যুর পূর্বে এব্যাপারে সজাগ হতো! কারণ , মৃত্যুর পরে এব্যাপারটি বুঝে আসলে তখন আর কিছুই করার থাকবে না। মৃত্যুর পর সতর্ক হয়ার অর্থ তো শুধু এই যে, মানুষ কেবল এই বলে আফসোস করে করে সময় কাটাবে যে, সে অতীতে কত বড় ভুলই-না করেছে। এমন এক ভুল যা শুধরানোর সামন্যতম সুযোগ তার সামনে নেই।

মানুষ তার পরিণাম সম্পর্কে গাফেল। পক্ষান্তরে কালস্রোত তাকে অতি দ্রুত ওই সময়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যখন ফসল কাটার লগ্ন চলে আসবে। মানুষ এ-পৃথিবীর তুচ্ছ ফায়দাসমূহ অর্জনের জন্য ব্যস্ত রয়েছে এবং মনে করছে, সে কাজ করছে প্রচুর। পক্ষান্তরে সে কেবল তার মূল্যবান সময়ই নষ্ট করে যাচ্ছে। মানুষের সামনে বিরাট সুযোগ রয়েছে যা ব্যবহার করে সে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। কিন্তু মানুষ কাঁদামাটি নিয়ে খেলছে। তার প্রভু তাকে স্বর্গের দিকে ডাকছেন যা কল্পনাতীত নেয়ামত সামগ্রীতে ভরপুর , কিন্তু মানুষ কয়দিনের মিথ্যা আয়েশে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছে। মানুষ মনে করছে যে সে লাভ করছে, কিন্তু মূলত সে কেবলই হারাচ্ছে। দুনিয়াতে বাড়ি বানিয়ে সে মনে করছে সে জীবন গড়ছে কিন্তু আসলে সে বালির দেয়াল দাঁড় করাচ্ছে যা কেবল কিছুক্ষণ পর ধ্বসে পড়ার জন্যই দাঁড়াচ্ছে। হে মানুষ ! তুমি নিজেকে জানো, নিজেকে আবিষ্কার করো। গভীর মনোনিবেশের সাথে খুঁটিয়ে দেখ তুমি কি করছো, তোমার কী করা উচিত। মানুষকে সফলকাম হয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু মানুষ অসতর্ক হয়ে নিজের ব্যর্থতা নিজেই ডেকে আনছে।