Category Archives: পবিত্র হাজ্জ

জিলহজ মাসের প্রথম দশদিনের ফযীলত এবং ঈদ ও কুরবানীর বিধান

আব্দুল মালেক আল-কাসেম

অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

জিলহজ মাসের দশদিনের ফযীলত :

আল্লাহ তা‌’আলার অশেষ মেহেরবানী যে, তিনি নেককার বান্দাদের জন্য এমন কিছু মৌসুম করে দিয়েছেন, যেখানে তারা প্রচুর নেক আমল করার সুযোগ পায়, যা তাদের দীর্ঘ জীবনে বারবার আসে আর যায়। এসব মৌসুমের সব চেয়ে বড় ও মহত্বপূর্ণ হচ্ছে জিলহজ মাসের প্রথম দশদিন।

হজ্জের পর হাজী সাহেবের কী করনীয়?

হজ্জের পর কী?

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যাঁর নেয়ামতেই সকল সৎকাজসমূহ সম্পন্ন হয়ে থাকে, আর তাঁর দয়াতেই সকল ইবাদাত কবুল হয়ে থাকে। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি, আর এ সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা‌‘বুদ নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ্ তার উপর, তার পরিবার ও সঙ্গী সাথীদের উপর দুরুদ প্রেরণ করুন এবং বহু পরিমানে সালাম পেশ করুন। তারপর,

হজ্ গত হল, তার কার্যাদি পূর্ণ হলো, আর হজের মাসসমূহ তার কল্যাণ ও বরকত নিয়ে চলে গেল। এ দিনগুলো অতিবাহিত হলো, আর মুসলিমগণ তাতে তাদের হজ সম্পাদন করল, তাদের কেউ আদায় করল ফরয হজ্, অপর কেউ আদায় করল নফল হজ্, তাদের মধ্যে যাদের হজ কবুল হয়েছে তারা তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে নিয়ে এমন দিনের মত প্রত্যাবর্তন করল যেমন তাদের মাতাগণ তাদেরকে জন্ম দিয়েছিল। সুতরাং সফলকামদের জন্য রয়েছে মুবারকবাদ। যাদের থেকে তা গ্রহণযোগ্য হয়েছে তাদের সৌভাগ্যই সৌভাগ্য! “আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই কবুল করে থাকেন”।[সূরা আল-মায়েদাহ্: ২৭]

প্রত্যেক মুসলিমের জানা উচিত যে, নেক আমল কবুল হওয়ার কিছু চিহ্ন ও কিছু নিদর্শন রয়েছে। নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম চিহ্ন হচ্ছে সে আমলের পরে আবার আমল করতে সমর্থ হওয়া, পক্ষান্তরে সে আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার চিহ্ন হচ্ছে, সে আমল করার পর খারাপ কাজ করা।

সুতরাং যখন হাজী সাহেব হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন এবং তাঁর নিজকে দেখতে পাবেন যে তিনি আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যের প্রতি অগ্রণী, কল্যাণের প্রতি অনুরাগী, দ্বীনের প্রতি দৃঢ়, অপরাধ ও গোনাহ থেকে দূরে অবস্থানকারী, তখন সে যেন বুঝে নেয় যে আল্লাহ চাহেত এটি আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার আমল কবুল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

আর যদি নিজকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে পিছপা দেখতে পায়, কল্যাণের কাজ থেকে বিমুখ, অপরাধের প্রতি প্রত্যাবর্তনকারী ও গোনাহের কাজে অগ্রণী, তবে সে যেন বুঝে নেয় যে, এসব কিছু সঠিকভাবে নিজেকে নিয়ে ভাবার অবকাশ দিচ্ছে।

হে বাইতুল্লাহর হজকারী, আপনি সে সব সম্মানিত দিনগুলো অতিবাহিত করেছেন, আর পবিত্র স্থানগুলোতে অবস্থান করেছেন, সুতরাং আপনার এ কাজ যেন হিদায়াতের পথ ও হকের রাস্তায় চলার নতুন মোড় হয়ে দেখা দেয়।

হে আল্লাহর আহ্বানে সাড়াদানকারী, আপনি হজে সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে তালবিয়া পাঠ করেছেন এবং ডেকেছেন, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ সুতরাং সর্বদা প্রতিটি কাজে আল্লাহর জন্য হাজির থাকতে সচেষ্ট থাকুন। তাঁর আনুগত্যে সর্বদা রত থাকুন; কেননা, যিনি হজের মাসের রব, তিনি অন্য মাসেরও রব, আর আমরা আমৃত্যু আল্লাহর কাছে সাহায্য ও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে নির্দেশিত হয়েছি। “আর আপনার রবের ইবাদত করুন, যতক্ষণ না আপনার কাছে মৃত্যু আসবে।” [সূরা আল-হিজর: ৯৯]

কল্যাণের মওসুম হে মুসলিম ভাই, মানব জীবনের সাময়িক পরিবর্তন নয়; বরং তা খেল-তামাশা অন্যায়-অবিচার ও ত্রুটি-বিচ্যুতির জীবন থেকে আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণ আনুগত্য ও তাঁর দাসত্বের দিকে প্রত্যাবর্তন।

কল্যাণের মওসুম এরকম কোন স্টেশনের নাম নয় –যেমনটি কোন কোন মানুষ মনে করে থাকে- যেখানে কোন মানুষ তার ভার লাঘব করবে, তার গোনাহ থেকে পরিত্রাণ নিবে, তারপর সেখান থেকে ফিরে গিয়ে পুণরায় অন্য কোন বোঝা নতুন করে বহন করবে। এটি নিঃসন্দেহে ভুল বুঝা। যারা এ ধরনের কিছু বোঝে তারা অবশ্যই এ মওসুমগুলোর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ভুল করেছে। বরং এ মওসুমগুলো গাফেলদের সাবধান করার সুযোগ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকারীদের জন্য উপদেশ; যাতে তারা তাদের গুনাহসমূহ থেকে বিরত হয়ে, তাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হয়ে, ভবিষ্যতে সেগুলো পরিত্যাগ করার উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়;

“আর নিশ্চয় যারা তাওবাহ করে, ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তারপর হিদায়াত গ্রহণ করে আমি তাদের জন্য অধিক ক্ষমাশীল।” [ সূরা ত্বা-হা: ৮২]

অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ তাদের নফসের প্রবঞ্চনা ও শয়তানের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পড়ে থাকে; এমনকি শেষ পর্যন্ত এ অবস্থাতে তাদের মৃত্যু হয়।

সুতরাং হে আল্লাহর ঘরের হজকারী! আপনি তার মত হবেন না যে মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করে সেটার ভিত্তিমুলে আঘাত করে।

“তার মত যে তার সূতা মজবুত করে পাকাবার পর সেটার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়।” [সূরা আন-নাহল: ৯২]

কিছু মারাত্মক বিষয় রয়েছে যার জন্য প্রতিটি মুসলিমের সাবধান হওয়া জরুরী, যেমন কিছু মুসলিম আল্লাহর সম্মানিত ঘরের হজ করে থাকে, অথচ সে তার চেয়েও বড় বস্তু পরিত্যাগ করে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ ফরয সালাতই আদায় করে না, নিঃসন্দেহে তার হজ হয় না। কারণ সে সালাত পরিত্যাগকারী। আর সালাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে কঠোর সাবধানাবাণী ও ধমকি এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ مَا سَلَكَكُمۡ فِي سَقَرَ ٤٢ قَالُواْ لَمۡ نَكُ مِنَ ٱلۡمُصَلِّينَ ٤٣ ﴾ [المدثر: ٤٢، ٤٣]

“ ‘তোমাদেরকে কিসে ‘সাকার’-এ নিক্ষেপ করেছে?’ তারা বলবে, ‘আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না”। [সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৪২-৪৩]

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿ فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ فَإِخۡوَٰنُكُمۡ فِي ٱلدِّينِۗ وَنُفَصِّلُ ٱلۡأٓيَٰتِ لِقَوۡمٖ يَعۡلَمُونَ ١١ ﴾ [التوبة: ١١]

“অতএব তারা যদি তাওবাহ্ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে দ্বীনের মধ্যে তারা তোমাদের ভাই”।[সূরা আত-তাওবাহ: ১১]

আরও বলেন,

﴿ فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ فَخَلُّواْ سَبِيلَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٥ ﴾ [التوبة: ٥]

“কিন্তু যদি তারা তাওবাহ্ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়[ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত কায়েম করবে আর যাকাত প্রদান করবে। অতঃপর যদি তারা তা করে, তবে তাদের জান ও মাল আমার হাত থেকে নিরাপদ হবে, কিন্তু যদি ইসলামের অধিকার আদায় করতে হয়, তবে তা ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব নেয়ার ভার তো আল্লাহ্‌র উপর।’’ [বুখারী: ২৫; মুসলিম: ২২]] তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও” [সূরা আত-তাওবাহ: ৫]

তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« إن بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة»

“নিশ্চয় একজন লোক এবং শির্ক ও কুফরীর মধ্যে সালাত পরিত্যাগ করাই মাপকাঠি।” ইমাম মুসলিম জাবের রা. থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। [মুসলিম ১/৮৮, হাদীস নং ৮৮; ঈমান; সালাত পরিত্যাগকারীর উপর কুফর নামকরণ করা হয়েছে অধ্যায়; অনুরূপভাবে হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ তাঁর সুনান গ্রন্থে সংকলন করেছেন, (২/৬৩১; হাদীস নং ৪৬৭৮) কিতাবুল ঈমান, ইরজা তথা আমল না করে আশাবাদী হওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত হওয়া অধ্যায়।]

আর ইমাম তিরমিযী বুরাইদাহ রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر»

“আমাদের মধ্যে ও কাফের-মুশরিকদের মধ্যে অঙ্গীকার হচ্ছে সালাতের; সুতরাং যে তা ত্যাগ করবে সে অবশ্যই কাফের হয়ে গেল”।[তিরমিযী; তুহফাতুল আহওয়াযী সহ (৭/৩০৮, নং ২৭৫৬); কিতাবুল ঈমান এর ‘সালাত পরিত্যাগ করার ব্যাপারে যা এসেছে অধ্যায়ে।] তাছাড়া তিরমিযী তার গ্রন্থের কিতাবুল ঈমানে সহীহ সনদে প্রখ্যাত তাবে‘য়ী শাকীক ইবন আবদিল্লাহ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ অন্যান্য আমলের মধ্যে কেবলমাত্র সালাত ত্যাগকরাকেই কুফরি হিসেবে গন্য করতেন’। [তিরমিযী; তুহফাতুল আহওয়াযী সহ (৭/৩০৯, নং ২৭৫৭); কিতাবুল ঈমান এর ‘সালাত পরিত্যাগ করার ব্যাপারে যা এসেছে অধ্যায়ে]

তাছাড়া এমন কিছু মানুষও রয়েছে যারা আল্লাহর সম্মানিত ঘরের হজ করে কিন্তু তারা যাকাত দেয় না; অথচ মহান আল্লাহর কিতাবে যাকাতকে সালাতের সাথে একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে, “আর তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর”। [সূরা আল-বাকারাহ: ৪৩] আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله وأن محمداً رسول الله ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دمائهم وأموالهم إلا بحق الإسلام وحسابهم على الله»

“আমি তো মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে নির্দেশিত হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত হক কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, অতঃপর যখন তারা তা করবে, তখন তারা তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার হাত থেকে নিরাপদ পাবে, তবে ইসলামের অধিকার ব্যাপার ভিন্ন, আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর”। ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইবন উমর থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন [বুখারী, ফাতহুল বারীসহ (১/৭৫, হাদীস নং ২৫), কিতাবুল ঈমান, ‘যদি তারা তাওবাহ করে এবং সালাত কায়েম করে অধ্যায়; মুসলিম (১/৫১; হাদীস নং ২২) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ না বলা পর্যন্ত মানুষের সাথে যুদ্ধ করা অধ্যায়]

আর আবু বকর রা. যাকাত প্রদান করতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তার সে বিখ্যাত বক্তব্যটি প্রদান করেছিলেন, “আল্লাহর শপথ, অবশ্যই আমি সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্যকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, আল্লাহর শপথ, যদি তারা আমাকে একটি উটের রশি অথবা উটের বাচ্ছা দিতেও অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিত, তবে অবশ্যই সেটা উদ্ধার করতে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” [বুখারী, ফাতহুল বারীসহ (১৩/২৫০, হাদীস নং ৭২৮৪), কিতাবুল ই‘তিছাম; ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে অনুসরণ অধ্যায়; মুসলিম (১/৫১; হাদীস নং ৩২) মানুষের সাথে যুদ্ধ করা অধ্যায়।]

অনুরূপভাবে কিছু মানুষ আছে যারা হজ্ করে কিন্তু রমযানের রোযা রাখেন না, অথচ রোযা হজের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ; রোযা হজের আগে ফরয হয়েছে। এ সমস্ত লোক যারা হজ আদায় করে ইসলামের অন্যান্য রুকন নিয়ে অবহেলা করে তারা যেন এমন শরীরের অঙ্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকে যার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন।

একজন মুসলিমের উপর অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, সে তার দ্বীনের হেফাযত করবে, পূর্ণতার দিকে লক্ষ্য রাখবে, দ্বীনের কোন অংশ ছুটে যাওয়া কিংবা বাদ পড়ে যাওয়ার ব্যাপার যত্নবান হবে। সুতরাং সে যাবতীয় ওয়াজিব আদায় করবে, নিষেধকৃত বিষয়াদি পরিত্যাগ করবে, আমৃত্যু আল্লাহর দ্বীনের উপর অবিচল ও দৃঢ় থাকবে। আল্লাহ বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ قَالُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُ ثُمَّ ٱسۡتَقَٰمُواْ تَتَنَزَّلُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ أَلَّا تَخَافُواْ وَلَا تَحۡزَنُواْ وَأَبۡشِرُواْ بِٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي كُنتُمۡ تُوعَدُونَ ٣٠ ﴾ [فصلت: ٣٠]

“নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ্’, তারপর অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে নাযিল হয় ফেরেশ্তা (এ বলে) যে, ‘তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও।” [সূরা ফুসসিলাত: ৩০]

আর হজের পর যে বিষয়টি বেশী গুরুত্বের দাবীদার, তা হচ্ছে একজন মুসলিম তার নিজের বিষয়টি বারবার দেখবে, আত্মসমালোচনা করবে, পূর্বের কৃত আমলের ব্যাপারে নিজের হিসাব নিজে গ্রহণ করবে, তারপর নিজের জন্য এমন এক প্রোগ্রাম স্থাপন করবে যা সে প্রতিপালন করতে পারে, যাতে করে সে হজের মাধ্যমে যে ঘরটি বানিয়েছে তা পূর্ণ রূপ দিতে পারে।

এসব কিছু এ জন্যই যে বান্দা হজের ফরয আদায় করার পর এবং এর জন্য আল্লাহর তাওফীক লাভের পর গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহের যথাযথ হেফাযত করবে।

আমি মহান আল্লাহর কাছে কায়োমনোবাক্যে চাই তিনি যেন সবার হজ কবুল করেন এবং তাদের হজ মাবরুর (মাকবুল) করেন, তাদের প্রচেষ্টা সফল করেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন। আর আমি কথা, কাজে মহান আল্লাহর ইখলাস বা নিষ্ঠা কামনা করি এবং সৃষ্টিকুলের সর্দার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথের উপর চলার তৌফিক কামনা করি। আরও চাই তিনি যেন এ কাজটি দুনিয়ার জীবন ও মৃত্যুর পরে জীবনের জন্য গচ্ছিত আমল হিসেবে গ্রহণ করেন, নিশ্চয় তিনি এর অভিভাবক এবং তা করতে সক্ষম।

নবী (সঃ)যেভাবে হজ করেছেন (জাবের রা. এর বর্ননানুযায়ী)- (৩)

নবী (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন

(জাবের রা. যেমন বর্ণনা করেছেন)

শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী – রাহেমাহুল্লাহ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

দুই ওয়াক্ত সালাত একসাথে আদায় ও আরাফায় অবস্থান

৫৬- ‘এরপর বিলাল রা. একবার আযান দিলেন।’[দারেমী]

৫৭- অতপর ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (সবাইকে নিয়ে) যোহরের সালাত আদায় করলেন। বিলাল রা. পুনরায় ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসরের সালাতও আদায় করলেন।

৫৮- তিনি উভয় সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি।

৫৯- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ‘কাসওয়া নামক উটনীর’[ইবন মাজা] পিঠে আরোহন করলেন। এভাবে তিনি উকূফের স্থানে এলেন। তাঁর উটনী কসওয়ার পেট পাথরের[এ পাথরটি জাবালে রহমতের নিচে বিছানো। জাবালে রহমত অবস্থিত আরাফার মাঝামাঝি স্থানে। ইমাম নাববী রহ. বলেন, এটিই উকূফের মুস্তাহাব স্থান। অনেকে মনে করেন জাবালে রহমতে না ওঠলে উকূফ পূর্ণ হবে না- এটি সঠিক নয়] দিকে ফিরিয়ে রাখলেন। যারা পায়ে হেঁটে তাঁর সাথে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের সকলকে তাঁর সামনে রাখলেন এবং কিবলামুখী হলেন।[অন্য হাদীসে এসেছে, তিনি উকূফ করেছেন, উভয় হাত তুলে দু‘আ করেছেন। হাজ্জাতুন-নবী : ৭৩ পৃষ্ঠা]

৬০- সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই উকূফ করলেন। এমনিভাবে (পশ্চিম আকাশের) হলুদ আভা ফিকে হয়ে গেল এমনকি লালিমাও দূর হয়ে গেল[সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর প্রস্থান মুশরিকদের আচারের সাথে ভিন্নতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ছিল। কেননা মুশরিকরা সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমাদের আদর্শ তাদের থেকে ভিন্ন]

৬১- আর তিনি বললেন,

قَدْ وَقَفْتُ هَهُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ

‘আমি এখানে উকূফ করলাম; কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকূফের স্থান।’[আবূ দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ]

৬২- এরপর তিনি উসামা ইব্‌ন যায়েদ রা. কে তাঁর উটনীর পেছনে বসালেন।

আরাফা থেকে প্রস্থান

৬৮- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হলেন। ‘আর তিনি ছিলেন শান্ত-সুস্থির।’[আবূ দাউদ, নাসাঈ] তিনি কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরলেন, এমনকি উষ্ট্রীর মাথা তাঁর হাওদার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আর তিনি তাঁর ডান হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন,

أَيُّهَا النَّاسُ السَّكِينَةَ السَّكِينَةَ

‘হে লোকসকল! শান্ত হও শান্ত হও, ধীর-স্থিরভাবে এগিয়ে চল’।

৬৭- যখনই তিনি কোন বালুর টিলায় পৌঁছছিলেন, তখনই তা অতিক্রম করার সুবিধার্থে উষ্ট্রীর রশি ঢিলা করে দিচ্ছিলেন। এমনিভাবে তাতে উঠে তা অতিক্রম করছিলেন।

মুযদালিফায় একসাথে দুই সালাত আদায় এবং সেখানে রাত্রি যাপন

৬৮- এভাবে তিনি মুযদালিফায় এলেন। অতপর এক আযান ও দুই ইকামতসহ মাগরিব ও ইশার সালাত একসাথে আদায় করলেন এবং এ দুই সালাতের মাঝখানে তিনি কোন তাসবীহ বা নফল সালাত আদায় করলেন না।

৬৯- এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুয়ে পড়লেন। এভাবেই সুবহে সাদেক উদিত হল। ফজরের সময় সুস্পষ্ট হওয়ার পর (আওয়াল ওয়াক্তে) আযান ও ইকামতের পর ফজরের সালাত আদায় করলেন।

মাশআরে হারাম তথা মুযদালিফায় অবস্থান

৭০- অতপর তিনি কাসওয়ায় আরোহন করে মাশ‘আরে হারামে এলেন।[মাশআরে হারাম দ্বারা উদ্দেশ্য ‘কুযাহ’ নামক স্থান। এটি মুযদালিফার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়। সকল সীরাতবিদ ও মুফাসসিরের মতে, সমগ্র মুযদালিফাকেই মাশআরে হারাম বলে। ইমাম নাববী রহ.] অতপর তিনি তাতে আরোহন করলেন।’[আবূ দাউদ]

৭১- এরপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেন। ‘অতপর আল্লাহর প্রশংসা করলেন।’[আবূ দাউদ] তাঁর মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন। পূর্ব আকাশ পূর্ণ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে উকূফ করলেন।

৭২- ‘তিনি বললেন,

قَدْ وَقَفْتُ هَهُنَا وَالْمُزْدَلِفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ

‘আমি এখানে উকূফ করেছি; তবে মুযদালিফার পুরোটাই উকূফের স্থান।’[ নাসাঈ]

জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা

৭৩- অতপর তিনি সূর্য উঠার পূর্বেই ‘মুযদালিফা’[বাইহাকী] থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হলেন।[সূর্যোদয়ের পূর্বে মুযদালিফা থেকে প্রস্থান মুশরিকদের নিয়মের বিপরীত করার লক্ষ্যেই ছিল, কেননা মুশরিকরা মুযদালিফা ত্যাগ করতো সূর্যোদয়ের পর। রাসূল (সঃ) বলেছেন, ‘আমাদের আদর্শ ওদের থেকে ভিন্ন।’] ‘আর তিনি ছিলেন শান্ত ও সুস্থির।’[আবূ দাউদ]

৭৪- তিনি ফযল ইবন আববাস রা কে নিজের উটনীর পেছনে বসালেন।[এ হাদীস এবং পূর্বে বর্ণিত ৫৬ নং হাদীস থেকে বুঝা যায় বাহনের পেছনে কাউকে নিতে কোনো অসুবিধা নেই] আর তিনি ছিলেন সুন্দর চুল ও উজ্জ্বল ফর্সা চেহারার অধিকারী।

৭৫- রাসুলূল্লাহ (সঃ) যখন মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। তখন তাঁর কাছ দিয়ে কতিপয় মহিলা চলতে লাগল, আর ফযল তাদের দিকে তাকাতেন লাগলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ফযলের চেহারায় রাখলেন। তখন ফযল তার চেহারা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত অন্য দিক থেকে সরিয়ে ফযলের চেহারার ওপর আবার রেখে যেদিকে তিনি তাকাচ্ছিলেন সেদিক থেকে তার চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন।

৭৬- অবশেষে তিনি মুহাস্সার উপত্যকার মধ্যস্থলে[এই স্থানে আবরাহার হস্তি বাহিনীকে আল্লাহ তা‘আলা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ইবনুল-কায়্যিম রহ. বলেন, মুহাস্সার মিনা ও মুযদালিফার মাঝখানে অবস্থিত। এটা মিনা বা মুযদালিফার অন্তর্ভুক্ত নয়] পৌঁছলে উটের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন,

[দারেমী] عَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ ‘তোমরা শান্ত ও সুস্থিরভাবে চল।’

বড় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ

৭৭- ‘তারপর তিনি মাঝপথ ধরে চলতে লাগলেন[ ইমাম নাববী রহ. বলেন, এ থেকে জানা গেল, আরাফা থেকে ফেরার সময় এ পথে আসা অর্থাৎ এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং আরেক পথ দিয়ে ফেরা সুন্নত], যা বড় জামরার কাছ দিয়ে বের হয়ে গেছে।’[নাসাঈ, আবূ দাউদ] অবশেষে তিনি গাছের সন্নিকটে অবস্থিত জামরায় এসে পৌঁছলেন।

৭৮- অতপর ‘সূর্য পূর্ণ আলোকিত হওয়ার পর’[মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, আবূ দাউদ] তিনি বড় জামরাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন।

৭৯- প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। প্রত্যেকটি কঙ্কর ছিল বুটের ন্যায়।[ইমাম নাববী রহ. বলেন, পাথরগুলো ছিল শিমের বিচির মতো। সুতরাং এরচেয়ে বড় বা ছোট না হওয়া সুন্নত। তবে এরচেয়ে ছোট বা বড় হলেও তা জায়িজ হবে]

৮০- তিনি তাঁর বাহনে আরোহন অবস্থায় উপত্যকার মধ্যভাগ থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন ‘আর তিনি’[নাসাঈ] বলছিলেন,’

لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ فَإِنِّى لاَ أَدْرِى لَعَلِّى لاَ أَحُجُّ بَعْدَ حَجَّتِى هَذِهِ

‘তোমরা তোমাদের হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। কারণ আমি জানি না, হয়ত আমি এই হজের পরে আর হজ করতে পারব না।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ]

৮১- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ‘তাশরীকের সব দিনেই’[মুসনাদে আহমদ] ‘সূর্য হেলে যাওয়ার পরে’[মুসলিম] কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন[যিলহজ মাসের ১১-১২-১৩ তারিখের দিনগুলোকে আইয়্যামে তাশরীক বলা হয়]

৮২- ‘তিনি আকাবা তথা বড় জামরাতে কঙ্কর নিক্ষেপকালে সুরাকা তাঁর সাথে সাক্ষাত করলেন। অতপর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা কি খাস করে আমাদের জন্য ? তিনি বললেন,

[বুখারী , মুসলিম] لاََ بَلْ لأَبَدٍ ‘বরং সবসময়ের জন্য।

পশু যবেহ ও মাথা মুন্ডন

৮৩- অতপর তিনি পশু যবেহের স্থানে গেলেন। তারপর নিজ হাতে তেষট্টিটি ‘উট’[ইবন মাজা] যবেহ করলেন।

৮৪- অতপর আলী রা. কে অবশিষ্টগুলো যবেহ করার দায়িত্ব দিলেন তিনি তাকে নিজের হাদীতে শরীক রাখলেন।

৮৫- এরপর প্রত্যেক যবেহকৃত উট থেকে এক টুকরো করে নিয়ে রান্না করতে নির্দেশ দিলেন। তখন টুকরোগুলো এক পাতিলে রেখে রান্না করা হল। অতপর দুজনে তার শুরবা পান করলেন।[এ থেকে জানা গেল, নফল বা ওয়াজিব কুরবানীর গোশত কুরবানীকারী নিজে খেতে করতে পারবেন]

৮৬- এক বর্ণনায় রয়েছে, ‘জাবের রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) নিজের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে একটি গাভি যবেহ করেন।’[মুসলিম]

৮৭- অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তিনি সাত জনের পক্ষ থেকে একটি উট যবেহ করেন। আর সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গাভি যবেহ করেন।’[মুসলিম] ‘অতপর আমরা সাতজন উটে শরীক হলাম। এক লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলল, আপনি কি মনে করেন, গাভিতেও শরীক হওয়া যাবে? তখন তিনি বললেন,

مَا هِىَ إِلاَّ مِنَ الْبُدْنِ

গাভিতো উটের (বিধানের) অন্তর্ভুক্ত।’[বুখারী ফিত-তারীখ]

৮৮- ‘জাবের রা. বলেন, আমরা মিনায় তিনদিন উটের গোশত খেয়ে তারপর খাওয়া থেকে বিরত রইলাম। অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে অনুমতি দিয়ে বললেন,

كُلُوا وَتَزَوَّدُوا

‘তোমরা খাও এবং পাথেয় হিসেবে রেখে দাও[মুশরিকরা তাদের যবেহকৃত হাদীর গোশত ভক্ষণ করত না। তারা নিজদের জন্য তা হারাম মনে করত। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা খাওয়ার নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে জাহেলী যুগের কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটান]।’[মুসনাদে আহমদ] ‘জাবের রা. বলেন, অতপর আমরা খেলাম এবং জমা করে রাখলাম।’[বুখারী, মুসনাদে আহমদ] ‘এভাবে সেগুলো নিয়ে আমরা মদীনায় পৌঁছলাম।’[মুসনাদে আহমদ]

১০ যিলহজের আমলে ধারাবাহিকতা রক্ষা না হলে কোন অসুবিধা নেই

৮৯- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পশু যবেহ করলেন, ‘অতপর মাথা মুন্ডন করলেন।’[মুসনাদে আহমদ]

৯০- ‘কুরবানীর দিন মিনায়’[ইব্ন মাজা] মানুষের (প্রশ্নোত্তরের) জন্য বসলেন। ‘সে দিনের’আমলগুলোতে ‘আগে পরে হয়েছে’[ইব্ন মাজা]এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,

لاََ حَرَجَ لاَ حَرَجَ

‘কোন সমস্যা নেই, কোন সমস্যা নেই’।[অর্থাৎ তোমার যে আমলগুলো বাকি আছে তা আদায় করে নাও। আর যেগুলো করেছো- তাতে যা আগে-পিছে হয়েছে তাতে কোনো অসুবিধে নেই]

৯১- এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯২- অন্য একজন এসে বলল, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি, তিনি বললেন,

وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯৩- তারপর ‘আরেক জন এসে বলল, আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তাওয়াফ করেছি, তিনি বললেন,

[দারেমী, ইব্ন মাজা] وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯৪- ‘অন্য এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি পশু যবেহের আগে তাওয়াফ করেছি। তিনি বললেন,

[তাহাবী] ِاذْبَحْ وَلاَ حَرَج ‘যবেহ কর, কোনো সমস্যা নেই।

৯৫- তারপর অন্য আরেক ব্যক্তি এসে বলল, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি বললেন,

ارْمِ ، وَلاَ حَرَجَ

‘নিক্ষেপ কর। কোন সমস্যা নেই।’ [মুসনাদে আহমদ]

৯৬- ‘অতপর আল্লাহর নবী (সঃ) বললেন,

قَدْ نَحَرْتُ هَهُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ

‘আমি এখানে যবেহ করলাম, আরা মিনা পুরোটাই যবেহের স্থান।’[মুসনাদে আহমদ]

৯৭- ‘মক্কার প্রতিটি অলিগলি চলার পথ এবং যবেহের স্থান।’[আবূ দাউদ]

৯৮- ‘অতএব, তোমরা তোমাদের অবস্থানস্থলে থেকে পশু যবেহ কর।’[মুসলিম]

ইয়াউমুন-নহর তথা ১০ তারিখের ভাষণ

৯৯ – জাবের রা. বলেন, ‘কুরবানীর দিন আমাদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন,

  • أَيُّ يَوْمٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : يَوْمُنَا هَذَا

‘সম্মানের দিক থেকে কোন্ দিনটি সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই দিনটি।

  • قَالَ : أَيُّ شَهْرٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : شَهْرُنَا هَذَا

‘তিনি বললেন, কোন্ মাসটি সম্মানের দিক থেকে সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই মাসটি।

  • قَالَ : أَيُّ بَلَدٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : بَلَدُنَا هَذَا

‘তিনি বললেন, কোন্ শহরটি সম্মানের দিক থেকে সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই শহরটি।’

  • قَالَ : فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَاٌم كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا

‘তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ আজকের এই দিন, এই শহর, এই মাসের ন্যায় সম্মানিত।’

  • هَلْ بَلَّغْتُ ؟ قَالُوْا : نَعَمْ . قَالَ : اَللَّهُمَّ اشْهَدْ .

‘আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’[মুসনাদে আহমদ]

তাওয়াফে ইফাযা তথা বায়তুল্লাহ্‌র ফরয তাওয়াফ আদায়

১০০- ‘অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাহনে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ গেলেন এবং (বায়তুল্লাহ্র ফরয) তাওয়াফ করলেন। সাহাবীগণও তাওয়াফ করলেন।’

১০১- ‘রাসূলের সাথে যারা কিরান হজ করেছিলেন তাঁরা সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করেননি।’[আবূ দাউদ, তাহাবী]

১০২- অতপর তিনি মক্কায় যোহরের সালাত আদায় করলেন।

১০৩- তারপর আবদুল মুত্তালিব বংশের কাছে এলেন, ‘তারা’[দারমী] যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেন,

انْزِعُوا بَنِى عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَوْلاَ أَنْ يَغْلِبَكُمُ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ

‘হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! বালতি ভর্তি করে পানি তুলে তা (হাজীদেরকে) পান করাও। তোমাদের কাছ থেকে পানি পান করানোর দায়িত্ব কেড়ে নেয়ার ভয় না থাকলে আমিও নিজ হাতে তোমাদের সাথে বালতি ভরে পানি তুলে তা পান করাতাম।’

১০৪- অতপর তারা তাঁকে বালতি ভরে পানি দিলেন, আর তিনি তা পান করলেন।

হজের পর আয়েশা রা. এর উমরা পালন

১০৫- জাবের রা. বলেন, ‘আয়েশা রা. ঋতুবতী হলেন। তখন বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ ছাড়া তিনি হজের আর সব আমল সম্পন্ন করলেন।’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ]

১০৬- তিনি বলেন, ‘যখন তিনি পবিত্র হলেন, তখন কা‘বার তাওয়াফ করলেন এবং সাফা-মারওয়ায় সা‘ঈ করলেন।’

১০৭- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

قَدْ حَلَلْتِ مِنْ حَجِّكِ وَعُمْرَتِكِ جَمِيعًا

‘তুমি তোমার হজ ও উমরা উভয়টি থেকে হালাল হয়ে গিয়েছ।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ]

১০৮- আয়েশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ‘আপনারা সবাই হজ ও উমরা করে যাবেন আর আমি কি শুধু হজ করে যাব?’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ। অন্য হাদীসে রয়েছে, লোকেরা দুই ইবাদাতের নেকী নিয়ে ফিরবে আর আমি কি এক কাজের নেকী নিয়ে ফিরবো?] তিনি বললেন,

إِنَّ لَكِ مِثْلَ مَا لَهُمْ

‘তোমারও তাদের মতই হজ ও উমরা হয়ে গিয়েছে।’[মুসনাদে আহমদ]

১০৯- আয়েশা রা. বললেন, ‘আমি মনে কষ্ট পাচ্ছি, কেননা, আমি তো শুধু হজের পরে বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করেছি।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ]

১১০- জাবের রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) নরম স্বভাবের লোক ছিলেন। যখন আয়েশা. কিছু কামনা করতেন, তিনি সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন।’[মুসলিম]

১১১- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

فَاذْهَبْ بِهَا يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ فَأَعْمِرْهَا مِنَ التَّنْعِيمِ

‘হে আবদুর রহমান! তুমি তাকে নিয়ে যাও এবং তাকে তানঈম থেকে উমরা করাও।[ইবন আববাস রা. বলেন ‘আল্লাহর শপথ! মুশরিকদের প্রথা বাতিল করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়েশা রা. কে যিলহজ মাসে উমরা করিয়েছেন। কুরাইশ গোত্র ও তাদের অনুসারীরা বলতো, ‘যখন উটের লোম গজিয়ে বেশি হবে, পৃষ্ঠদেশ সুস্থ হবে এবং সফর মাস প্রবেশ করবে তখনই উমরাকারির উমরা সহীহ হবে’। তারা যিলহজ ও মুহররম শেষ হওয়ার পূর্বে উমরা হারাম মনে করত’ (আবূ দাউদ : ১৯৮৭)।]

১১২- অতপর, ‘আয়েশা রা. হজের পরে উমরা করলেন।’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ] ‘তারপর ফিরে এলেন।’[মুসনাদে আহমদ] ‘আর এটা ছিল হাসবার রাতে[ সেটি হচ্ছে আইয়ামে তাশরীকের পরের রাত্রি। অর্থাৎ ১৪ তারিখের রাত। এটাকে মুহাস্সাবের রাতও বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণ ১৪ তারিখের রাত এ স্থানে যাপন করেছিলেন। যেসব জায়গায় পূর্বে শিরক বা কুফরী কর্ম অথবা আল্লাহর শত্রুতা প্রকাশ করা হত সেসব জায়গায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেছেন। এই মর্মে তিনি মিনায় বলেন, ‘আমরা আগামীকাল বনূ কিনানার খায়ফে (অর্থাৎ মুহাস্সাব তথা হাসবা নামক স্থানে) যেতে চাচ্ছি, যেখানে তারা কুফরীকর্মের ওপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল, আর তা ছিল এই যে, কুরাইশ ও বনূ কিনানা, বনূ হাশিম ও বনূ আবদুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে এই মর্মে শপথ করেছিল যে, তাদের সাথে তারা বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করবে না, বেচাকেনা করবে না, যতক্ষণ না তারা নবীকে তাদের কাছে সোপর্দ করে (বুখারী : ১৫৯০)। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, ‘এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর অভ্যাস যে, তিনি কুফরের নিদর্শনের স্থানসমূহে তাওহীদের নিদর্শন প্রকাশ করতেন (যাদুল মা‘আদ)।]।’[মুসলিম]

১১৩- জাবের রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজে নিজের বাহনে আরোহন করে বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করলেন এবং নিজের বাঁকা লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন, যাতে লোকজন তাঁকে দেখতে পায় এবং তিনি ওপরে থেকে তাদের তত্ত্বাবধান করতে পারেন। আর যাতে তারা তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করতে পারে। কেননা লোকজন তাঁকে ঘিরে রেখেছিল।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ]

১১৪- জাবের রা. বলেন, ‘এক মহিলা তার একটি বাচ্চা তাঁর সামনে উঁচু করে ধরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এর কি হজ হবে? তিনি বললেন,

نَعَمْ وَلَكِ أَجْرٌ

‘হ্যাঁ, আর তোমার জন্য রয়েছে পুরস্কার।’[তিরমিযী, ইবন মাজা। বাচ্চাটিকে বহন করা এবং তাকে মুহরিমরা যেসব কাজ থেকে বিরত থাকে সেসব কাজ থেকে বিরত রাখার বিনিময়ে এই নেকী (নাববী রহ.)।]

নবী (সঃ)যেভাবে হজ করেছেন (জাবের রা. এর বর্ননানুযায়ী)- (২)

নবী (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন

(জাবের রা. যেমন বর্ণনা করেছেন)

শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী – রাহেমাহুল্লাহ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

হজকে উমরায় পরিণত করার আদেশ

৩৩- মারওয়া পাহাড়ে শেষ চক্করকালে তিনি বললেন, হে লোকসকল!

لَوْ أَنِّى اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِى مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْىَ وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ لَيْسَ مَعَهُ هَدْىٌ فَلْيَحِلَّ وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً.

‘আমি পরে যা বুঝেছি তা যদি আগে বুঝতে পারতাম, তাহলে হাদী বা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং হজকে উমরায় পরিণত করতাম। তোমাদের মধ্যে যার সাথে হাদী বা পশু নেই সে যেন হালাল হয়ে যায় এবং এটাকে উমরায় পরিণত করে।’[সাহাবীদের মধ্যে যারা হাদী সঙ্গে নিয়ে আসেননি রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে উমরা করে হালাল হতে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তাদের হজ মুশরিকদের বিপরীত হয়। কেননা মুশরিকরা মনে করতো, হজের মাসসমূহে উমরা পালন জঘন্যতম অপরাধ (বুখারী : ৭২৩০)।] অন্য বর্ণনায় এসেছে,

أَحِلُّوا مِنْ إِحْرَامِكُمْ فَطُوفُوا بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَقَصِّرُوا ثُمَّ أَقِيمُوا حَلاَلاً حَتَّى إِذَا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ فَأَهِلُّوا بِالْحَجِّ وَاجْعَلُوا الَّتِي قَدِمْتُمْ بِهَا مُتْعَةًً.

‘বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করে তোমরা তোমাদের ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট করে ফেল। অতপর হালাল হয়ে অবস্থান কর। এমনিভাবে যখন তারবিয়া দিবস*[ ৮ যিলহজকে ইয়াওমুত তারবিয়া বলা হয়। ইয়াওমুত-তারবিয়া অর্থ পানি পান করানোর দিন। মিনায় পানি ছিল না বলে এদিন হাজীরা পানি পান করে নিতেন, সাথেও নিয়ে নিতেন এবং তাদের বাহন জন্তুগুলোকেও পানি পান করাতেন। তাই এই দিনকে পান করানোর দিন বলা হয়। ইব্ন কুদামা, আল-মুগনী : ৩১৪।] (যিলহজের আট তারিখ) হবে, তখন তোমরা হজের ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ কর। আর তোমরা যে হজের ইহরাম করে এসেছ, সেটাকে তামাত্তুতে পরিণত কর।[বুখারী ও মুসলিম।]

৩৪- তখন সুরাকা ইব্‌ন মালিক ইব্‌ন জু‘শুম রা. মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে ছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের এই উমরায় রূপান্তর করে তামাত্তু করা কি শুধু এ বছরের জন্য নাকি সব সময়ের জন্য? তখন নবী (সঃ) দু’হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে বললেন,

دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِى الْحَجِّ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ، لاَ بَلْ لأَبَدٍ أَبَدٍ، لاَ بَلْ لأَبَدٍ أَبَدٍ،

‘হজের ভেতরে উমরা কিয়ামত দিন পর্যন্ত প্রবিষ্ট হয়েছে। না, বরং তা সবসময়ের জন্য, না, বরং তা সবসময়ের জন্য’ এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন।’[ইব্ন জারূদ, আল-মুনতাকা।]

৩৫- সুরাকা ইব্‌ন মালিক রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে দীনের ব্যাখ্যা দিন, আমাদেরকে যেন এখনই সৃষ্টি করা হয়েছে (অর্থাৎ আমাদেরকে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় দীনের তালীম দিন)। আজকের আমল কিসের ওপর ভিত্তি করে? কলম যা লিখে শুকিয়ে গিয়েছে এবং তাকদীর যে বিষয়ে অবধারিত হয়ে গিয়েছে, তার ভিত্তিতে? না কি ভবিষ্যতে রচিতব্য নতুন কোন বিষয়ের ভিত্তিতে?[অর্থাৎ, আমাদের কর্মকান্ড কি আগেই নির্ধারিত নাকি আমরা সামনে যা করব সেটাই চূড়ান্ত?] তিনি বললেন,

لَا، بَل فِيْ مَا جَفَّتْ بِه الْأَقْلاَمُ وَجَرَتْ بِه اْلمَقَادِيْرُ.

‘না, বরং যা লিখে কলম শুকিয়ে গিয়েছে এবং যে ব্যাপারে তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে, তা-ই তোমরা আমল করবে। তিনি বললেন, ‘তাহলে’[মুসনাদে আহমদ।] আর আমলের দরকার কী? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ ]لِمَا خُلِقَ لَهُ[[অর্থাৎ তাকদীরে যদি ভালো লিখা হয়ে থাকে, তাহলে ভাল কাজ করা তার জন্য সহজ হবে। আর যদি তাকদীরে খারাপ লিখা থাকে, তবে খারাপ কাজ করা তার জন্য সহজ করে দেয়া হবে।]

‘তোমরা আমল করে যাও, তোমাদের কেউ যে জন্য সৃষ্ট হয়েছ তার জন্য সে কাজ করা সহজ করে দেয়া হয়েছে।’[মুসনাদে আহমদ।]

৩৬- জাবের রা. বলেন, ‘তিনি আমাদেরকে আদেশ দিলেন, আমরা হালাল হয়ে গেলে যেন হাদীর ব্যবস্থা করি।’[মুসলিম, মুসনাদে আহমদ।] ‘আমাদের মধ্য থেকে এক উটে সাতজন অংশ নিতে পারে।’[মুসনাদে আহমদ।] ‘যার সাথে হাদী নেই সে যেন হজের সময়ে তিনদিন রোযা রাখে আর যখন নিজ পরিবারের নিকট অর্থাৎ দেশে ফিরে যাবে তখন যেন সাতদিন রোযা রাখে।’[মুয়াত্তা, বায়হাকী।]

৩৭- ‘অতপর আমরা বললাম, কী হালাল হবে? তিনি বললেন,

মুসনাদে আহমদ, তাহাবী।الْحِلُّ كُلُّهُ. সব কিছু হালাল হয়ে যাবে।

৩৮- ‘বিষয়টি আমাদের কাছে কঠিন মনে হল এবং আমাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে গেল।’[মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ।]

বাতহা নামক জায়গায় অবস্থান

৩৯- ‘জাবের রা. বলেন, আমরা বের হয়ে বাতহা[বায়তুল্লাহর পূর্বদিকে অবস্থিত।] নামক স্থানে গেলাম। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় এক লোক বলতে লাগল,

عَهْدِي بِأَهْلِي الْيَوْمَ

‘আজকে আমার পরিবারের সাথে আমার সাক্ষাতের পালা।’[মুসনাদে আহমদ।]

৪০- ‘জাবের রা. বলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করতে লাগলাম। অতপর আমরা বললাম, আমরা হাজী হিসেবে বের হয়েছিলাম। হজ ছাড়া আমরা অন্য কিছুর নিয়ত করিনি। এমতাবস্থায় আমাদের কাছে আরাফা দিবস আসতে যখন আর মাত্র চার দিন বাকী।’[মুসনাদে আহমদ।] ‘এক বর্ণনায় এসেছে, পাঁচ রাত্রি, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হই। অতপর আমরা আরাফার উদ্দেশ্যে (মিনা) গমন করি, অথচ আমাদের পুরুষাঙ্গগুলি সবে মাত্র বীর্যস্খলন করেছে। জাবের রা. এটি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখাচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি যেন জাবের রা. এর কথার সাথে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখানোর ব্যাপারটি দেখতে পাচ্ছি। মোট কথা, তাঁরা বললেন, আমরা কিভাবে তামাত্তু করব অথচ আমরা শুধু হজের নাম উল্লেখ করেছি।’[বুখারী, মুসলিম।]

৪১- জাবের রা. বলেন, ‘বিষয়টি নবী (সঃ)এর কাছে পৌঁছল। আমরা জানি না এটা কি আসমান থেকে তাঁর নিকট পৌঁছল নাকি মানুষের নিকট থেকে পৌঁছল।’[মুসলিম।]

হজকে উমরায় পরিণত করার জোর তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ভাষণ এবং সাহাবীগণের তাঁর আনুগত্য

৪২- ‘অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে’[মুসলিম, তাহাবী, ইবন মাজা।] ‘মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করে বললেন,’[মুসনাদে আহমদ, তাহাবী,]

أَبَاللَّهِ تُعَلِّمُونِي أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ عَلِمْتُمْ أَنِّي أَتْقَاكُمْ لِلَّهِ وَأَصْدَقُكُمْ وَأَبَرُّكُمْ

‘হে মানুষ, তোমরা কি আমাকে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছ?[বুখারী।] তোমরা জানো, নিশ্চয় আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তোমাদের চেয়ে অধিক সত্যবাদী, তোমাদের চেয়ে অধিক সৎকর্মশীল।

افْعَلُوا مَا آمُرُكُمْ بِهِ فَإِنِّى لَوْلاَ هَدْيِي لَحَلَلْتُ كَمَا تَحِلُّون وَلَكِنْ لاَ يَحِلُّ مِنِّي حَرَامٌ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ. وَلَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِى مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْىَ فَحِلُّوا

‘আমি তোমাদেরকে যা নির্দেশ করছি তা পালন কর।’[বুখারী, মুসলিম।] আমার সাথে যদি হাদী (যবেহের পশু) না থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই হালাল হয়ে যেতাম যেরূপ তোমরা হালাল হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু যতক্ষণ না হাদী তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছবে, [অর্থাৎ দশ তারিখ হাদী যবেহ না হবে] ততক্ষণ আমার পক্ষে হারামকৃত বিষয়াদি হালাল হবে না।’[বুখারী।] ‘যদি আমি পরে যা জেনেছি পূর্বেই তা জানতাম, তাহলে হাদী সাথে নিয়ে আসতাম না। অতএব, তোমরা হালাল হয়ে যাও।’[মুসলিম, ইব্ন মাজা, তাহাবী।]

৪৩- ‘জাবের রা. বলেন, আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলাম এবং সুগন্ধি ব্যবহার করলাম। আমরা আমাদের স্বাভাবিক পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করলাম।’[মুসলিম, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ।] ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)এর কথা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।’[মুসলিম, তাহাবী।] ‘অতপর নবী (সঃ) নিজে এবং যাদের সাথে হাদী ছিল[যাদের সাথে হাদী ছিল তাঁরা হলেন, রাসূল (সঃ)., তালহা রা., আবু বকর রা., উমর রা., যুল-ইয়াসারা রা. ও যুবাইর রা.। সুতরাং তাঁরা কিরান হজ করেছেন। এরা ছাড়া সবাই তামাত্তু হজ করেছেন (বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদ)।] তারা ছাড়া সবাই হালাল হয়ে গেল এবং চুল ছোট করল।’[ইবন মাজা, তাহাবী।]

রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর মত ইহরাম বেঁধে ইয়ামান থেকে আলী রা.-এর আগমন

৪৪- ‘এদিকে আলী রা. তাঁর কর্মস্থল ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের উটগুলো নিয়ে আগমন করলেন।’[মুসলিম, নাসাঈ।]

৪৫- তিনি ফাতিমা রা. কে তাদের মধ্যে পেলেন যারা হালাল হয়েছেন। তিনি মাথা আঁচড়িয়েছেন,[ ইবনুল-জারূদ।] রঙ্গীন পোশাক পরেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। তিনি ফাতিমা রা. কে এই অবস্থায় দেখে তা অপছন্দ করলেন। ‘তিনি বললেন, তোমাকে এ রকম করার জন্য কে নির্দেশ দিয়েছে?[আবূ দাউদ, বায়হাকী।] ফাতেমা রা. বললেন, আমার পিতা আমাকে এ রকম করার নির্দেশ দিয়েছেন।

৪৬- জাবের রা. বলেন, আলী রা. ইরাকে থাকা অবস্থায় বলতেন, ‘ফাতেমার কৃতকর্মের ওপর উত্তেজিত অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে গেলাম, ফাতেমা যা রাসূলের বরাত দিয়ে বলেছেন সে সম্পর্কে তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলাম। আমি রাসূলকে জানালাম যে, আমি ফাতেমার এ কাজ অপছন্দ করেছি; কিন্তু সে আমাকে বলেছে, আমার পিতা আমাকে এরকম করতে নির্দেশ দিয়েছেন।’[ আবূ দাউদ, বায়হাকী।] তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

صَدَقَتْ صَدَقَتْ صَدَقَتْ أَنَا أَمَرْتُهَا بِهِ

‘সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে’। ‘আমিই তাকে এরকম করতে নির্দেশ দিয়েছি।’[নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ।]

৪৬- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ আলী রা. কে বললেন, হজের নিয়ত করার সময় তুমি কী বলেছিলে? তিনি বললেন, আমি বলেছি,

اللَّهُمَّ إِنِّي أُهِلَّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُ اللهِ (সঃ)،

‘হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি এভাবে ইহরাম বাঁধছি যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইহরাম বেঁধেছেন’।

৪৭- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

فَإِنَّ مَعِىَ الْهَدْىَ فَلاَ تَحِلُّ، وَامْكُثْ حَرَامًا كَمَا أَنْتَ

‘আমার সাথে হাদী রয়েছে। সুতরাং তুমি হালাল হয়ো না। তুমি হারাম অবস্থায়ই থাকো যেমন আছ।’[নাসাঈ।]

৪৭- জাবের রা. বলেন, ইয়ামান থেকে আলী রা. কর্তৃক আনিত হাদী এবং ‘মদীনা থেকে’[নাসাঈ, ইবন মাজা।] রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক আনিত হাদীর ‘মোট সংখ্যা ছিল একশত উট।’[দারমী।]

৪৮- জাবের রা. বলেন, নবী (সঃ) ও যাদের সাথে হাদী ছিল, তাঁরা ছাড়া সব মানুষ হালাল হয়ে গেল এবং চুল ছোট করল।

৮ যিলহজ ইহরাম বেঁধে মিনা যাত্রা

৪৯- অতপর যখন তারবিয়া দিবস (যিলহজের আট তারিখ) হল, তখন তাঁরা ‘তাদের আবাসস্থল বাতহা থেকে’[বুখারী, মুসলিম।] হজের ইহরাম বেঁধে মিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন।

৫০- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়েশার কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে ক্রন্দনরত অবস্থায় পেলেন। তখন তিনি বললেন,

مَا شَانُكِ ؟ قَالَتْ : شَانِى أَنِّى قَدْ حِضْتُ وَقَدْ حَلَّ النَّاسُ وَلَمْ أَحْلِلْ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَالنَّاسُ يَذْهَبُونَ إِلَى الْحَجِّ الآنَ. فَقَال্َর إِنَّ هَذَا أَمْرٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ فَاغْتَسِلِى ثُمَّ أَهِلِّى بِالْحَجِّ ثُمَّ حُجِّى وَاصْنَعِى مَا يَصْنَعُ الْحَاجُّ غَيْرَ أَنْ لاَ تَطُوفِى بِالْبَيْتِ وَلاَ تُصَلِّى

‘তোমার কী হয়েছে? আয়েশা রা. বললেন, আমার হায়েয এসে গেছে। লোকজন হালাল হয়ে গিয়েছে; কিন্তু আমি হালাল হতে পারিনি। বায়তুল্লাহর তাওয়াফও করিনি। অথচ সব মানুষ এখন হজে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, এটা এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহ আদমের কন্যা সন্তানদের ওপর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং তুমি গোসল করে নাও। অতপর হজের তালবিয়া পাঠ কর। ‘তারপর তুমি হজ কর এবং হজকারী যা করে তুমিও তা কর; কিন্তু বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করো না এবং সালাত আদায় করো না’।[মুসনাদে আহমদ, আবূ দাউদ।] ‘অতপর তিনি তাই করলেন, কিন্তু বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করলেন না।’[মুসনাদে আহমদ।]

৫১- আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উটের পিঠে আরোহন করলেন।[এ থেকে বুঝা যায় এসব স্থানে হাঁটার চেয়ে আরোহনই উত্তম; যেমন পুরো রাস্তায় হেঁটে আসার চেয়ে বাহনে আসা উত্তম। দেখুন : আত-তা‘লীক : ১৬।] তিনি ‘আমাদেরকে নিয়ে মিনায়’[আবূ দাউদ।] যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের সালাত আদায় করলেন।

৫২- অতপর তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। এভাবেই সূর্য উদিত হলো।[এ থেকে জানা গেল, মিনায় রাত্রিযাপন করা এবং সকালের আগে এস্থান ত্যাগ না করা সুন্নত।]

৫৩- তিনি নামিরা নামক স্থানে ‘তাঁর জন্য’[আবূ দাউদ, ইবন মাজা।] একটি পশমের তাবু স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।

আরাফায় যাত্রা ও নামিরাতে অবস্থান

৫৪- এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) রওয়ানা হলেন। কুরাইশদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, তিনি মাশ‘আরে হারাম (অর্থাৎ) ‘মুযদালিফাতেই’[আবূ দাউদ, ইবন মাজা।] অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা কুরাইশরা জাহেলী যুগে এরকম করত।[হজ পালনকারী সাহাবীগণকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফার ময়দানে অবস্থান করলেন এবং এ-ক্ষেত্রেও মুশরিকদের বিপরীত করলেন, কেননা মুশরিকরা মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং বলতো আমরা হারাম এলাকা ছাড়া অন্য জায়গায় যাব না এবং সেখান থেকে প্রস্থান করব না। উল্লেখ্য, আরাফা হারাম এলাকার বাইরে অবস্থিত।] কিন্তু রাসুলূল্লাহ (সঃ) মাশ‘আরে হারাম অতিক্রম করে আরাফায় উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাঁবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।

৫৫- অতপর যখন সূর্য হেলে পড়ল, তখন তিনি কসওয়া নামক উটনীটি আনতে বললেন এবং তাতে সওয়ার হয়ে উপত্যকার মধ্যে এসে থামলেন[এ উপত্যকার নাম হচ্ছে ‘উরনা’। এটা আরাফা এলাকার বাইরে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই উরনা উপত্যকা থেকে আরাফার ভাষণ দিয়েছেন।]

♥ আরাফার ভাষণ ♥

৫৬- অতপর তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন,

  • إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِى شَهْرِكُمْ هَذَا فِى بَلَدِكُمْ هَذَا.

‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য সম্মানিত। যেমন তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে, তোমাদের এই দিন সম্মানিত’।

  • أَلاَ إِنَّ كُلَّ شَىْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَىَّ هَاتَيْنِ مَوْضُوعٌ.

‘জেনে রাখো! নিশ্চয় জাহিলিয়াতের প্রত্যেকটি বিষয় আমার এই দুই পায়ের তলে রাখা হল’।

  • وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ وَ ِإنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُهُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ إبْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ. كَانَ مُسْتَرْضَعًا فِى بَنِى سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ.

‘জাহিলী যুগের যাবতীয় রক্তের দাবী রহিত করা হল। আমাদের রক্তের দাবীসমূহের মধ্যে প্রথম রক্তের দাবী যা রহিত করা হল, তা ইবন রবী‘আ ইবনুল-হারিসের রক্তের দাবী। সে সা‘দ গোত্রে দুধ পানরত অবস্থায় ছিল। হুযাইল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল’।

  • وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ

‘জাহেলী যুগের সুদ রহিত করা হল। সর্বপ্রথম যে সুদের দাবী রহিত করছি তা হল আববাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তার পুরোটাই রহিত করা হল’।

  • اتَّقُوا اللَّهَ فِى النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوْجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللَّهِ

‘আর তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহ্র আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে আল্লাহর বাণী[আল্লাহর বাণীটি হচ্ছে, ﴿فَٱنكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ﴾ ‘তাহলে তোমরা বিয়ে কর মহিলাদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে’ (নিসা : ৩ )।] দ্বারা হালাল করে নিয়েছ’।

  • وَإِنَّ لَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لاَ يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ فَإِنْ فَعَلْنَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ

‘নিশ্চয় তোমাদের ব্যাপারে তাদের ওপর দায়িত্ব হচ্ছে, তারা যেন তোমাদের বিছানাসমূহকে এমন কোন ব্যক্তি দ্বারা পদদলিত না করে যাকে তোমরা অপছন্দ কর (অর্থাৎ তারা যেন পরপুরুষদেরকে তাদের কাছে আসার অনুমতি না দেয়)। যদি তারা তা করে, তবে তোমরা তাদেরকে মৃদুভাবে প্রহার কর।’

  • وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

‘আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের উপর দায়িত্ব হচ্ছে, উত্তম পন্থায় তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা’।

  • وَإِنِّى قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللَّهِ

‘আমি তোমাদের মধ্যে এমন এক বিষয় রেখে যাচ্ছি, যা তোমরা আকড়ে ধরলে আর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো, আললাহ্র কিতাব’।

  • وَأَنْتُمْ مَسْئُولُونَ عَنِّىْ فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ. قَالُوا نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ رِسَالَاتِ رَبِّكَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ لِأُمَّتِكَ.

‘আমার ব্যাপারে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে ? তারা বলল, আমরা সাক্ষী দিচ্ছি, নিশ্চয় আপনি আপনার রবের বাণীসমূহ পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, অর্পিত দায়িত্ব আদায় করেছেন, উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন’।

  • ثُمَّ قَالَ بِأُصْبُعِهِ السَّبَّابَةِ يَرْفَعُهَا إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكِبُهَا إِلَى النَّاس্ِর اللَّهُمَّ اشْهَدْ اللَّهُمَّ اشْهَدْ اللَّهُمَّ اشْهَدْ.

‘অতপর তিনি তাঁর শাহাদাত অঙ্গুলী আকাশের দিকে তুলে মানুষের দিকে ইশারা করে বললেন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন’।

চলবে………………

নবী (সঃ)যেভাবে হজ করেছেন (জাবের রা. এর বর্ননানুযায়ী)- (১)

নবী (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন

(জাবের রা. যেমন বর্ণনা করেছেন)

শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী – রাহেমাহুল্লাহ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন* [ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করার পর মোট চার বার উমরা করেছেন। ১ম বার : ৬ষ্ঠ হিজরীতে যা হুদায়বিয়া নামক স্থানে কুরাইশ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হবার ফলে তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি। এবার তিনি শুধু মাথা মুন্ডন করে হালাল হয়ে যান এবং সেখান থেকেই মদীনায় ফেরত আসেন। ২য় বার : উমরাতুল কাযা ৭ম হিজরীতে। ৩য় বার : জি‘ইররানা থেকে ৮ম হিজরীতে। ৪র্থ বার : বিদায় হজের সময় ১০ম হিজরীতে। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমরার উদ্দেশ্যে হারাম এলাকার বাইরে বের হয়ে উমরা করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই (বিস্তারিত দেখুন : যাদুল মা‘আদ : ২/৯২-৯৫)।]

১- জাবের রা.* [জাবের রা. উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন একজন সাহাবী। হজ সম্পর্কিত সবচে’ বড় হাদীসটির বর্ণনাকারী।] বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় বসবাসকালে দীর্ঘ নয় বছর পর্যন্ত হজ করেননি।*[নাসাঈ, বিশুদ্ধ মতানুযায়ী হিজরী ৯ম অথবা ১০ম সালে হজ ফরয হয়। হজ ফরয হওয়ার পর বিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ করেন। দ্র. ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা‘আদ।]

২- হিজরী দশম বছরে চারিদিকে ঘোষণা দেয়া হল, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ বছর হজ করবেন। [নাসাঈ।]

৩- অসংখ্য লোক মদীনায় এসে জমায়েত হল। ‘বাহনে চড়া অথবা পায়ে হাঁটার সামর্থ রাখে এরকম কোন ব্যক্তি অবশিষ্ট রইল না ‘সবাই এসেছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হওয়ার জন্য। সবার উদ্দেশ্য, রাসূলুল্লাহ (সঃ)এর অনুসরণ করে তাঁর মতই হজের আমল সম্পন্ন করা। [নাসাঈ।]

৪- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন*[বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুসারে রাসূল সা. এ ভাষণ দিয়েছিলেন মসজিদে নববীতে। সময়টা ছিল মদীনা থেকে হজের সফরে বের হওয়ার পূর্বে।] এবং বললেন,

مُهَلُّ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مِنْ ذِى الْحُلَيْفَةِ وَ [مُهَلُّ أَهْلِ] الطَّرِيقُ الآخَرُ الْجُحْفَةُ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْعِرَاقِ مِنْ ذَاتِ عِرْقٍ وَمُهَلُّ أَهْلِ نَجْدٍ مِنْ قَرْنٍ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْيَمَنِ مِنْ يَلَمْلَمَ.

‘মদীনাবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে, যুল-হুলাইফা।[মদীনা থেকে ৬ মাইল দূরে অবস্থিত (কামূস); হাফিজ ইব্ন কাছীর রহ.-এর মতে, ‘৩ মাইল দূরে অবস্থিত’ (হিদায়া : ৫/১১৪); ইবনুল কায়্যিম রহ.-এর মতে, এক মাইল বা তার কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত (যাদুল মা‘আদ : ২/১৭৮)।] অন্যপথের (লোকদের ইহরাম বাঁধার স্থান) আল-জুহফা[মক্কা থেকে ৩ মারহালার দূরত্বে অবস্থিত। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, এটি একটি প্রাচীন শহর। এর নাম ছিল মুহাইমা। এটি বর্তমানে পরিত্যক্ত স্থান। যারা পশ্চিম থেকে হজ করতে আসেন এটি তাদের মীকাত। যেমন মিশর ও শামবাসী। আর পশ্চিমের লোকেরা যখন মদীনা হয়ে মক্কা গমন করেন যেমন তারা বর্তমানে করে থাকেন, তখন তারা মদীনাবাসীর মীকাত থেকেই ইহরাম বাঁধবেন। কারণ, তাদের জন্য সবার ঐক্যমতে এটিই মুস্তাহাব (মাজমু‘ রাসাইল কুবরা’ মানাসিকুল হাজ্জ : ২/৩৫৬)।], ইরাকবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান যাতু ইরক[ যাতু ইরক ও মক্কার মধ্যে ৪২ মাইলের দূরত্ব (ফাত্হ)।]। নজদবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান করন এবং ইয়ামানবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান, ইয়ালামলাম[মক্কা থেকে ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত।]।’[মুসলিম]

৫- ‘তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যিলকদ মাসের পাঁচ দিন অথবা চার দিন অবশিষ্ট থাকতে বের হলেন’।[নাসাঈ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)ও তাঁর সাহাবীরা মাথায় তেল ব্যবহার করে চুল আচড়িয়ে জামা-কাপড় পরে বের হন। তিনি এক্ষেত্রে জাফরান ব্যবহৃত কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড় যেমন পাজামা বা চাদর ইত্যাদি পরতে নিষেধ করেননি। বুখারীতে যেমন ইব্ন আববাস রা. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবন আববাস রা. সূত্রে বর্ণিত হাদীস থেকে মীকাতের আগেই ইহরামের কাপড় পরার অনুমতি বুঝা যায়। অথচ অনেকেই এটাকে অনুমোদিত বলে মনে করেন না। তবে নিয়ত এর ব্যতিক্রম। কারণ, গ্রহণযোগ্য মতানুসারে নিয়ত করতে হবে মীকাত থেকে আর বিমানে ভ্রমণ করলে ইহরামের নিয়ত ছুটে যাবার সম্ভাবনায় মীকাতের কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে।

মনে রাখবেন, নিয়ত কখনো মুখে উচ্চারণ করার বিধান নেই; ইহরামেও না সালাত, সিয়াম প্রভৃতি ইবাদাতেও না। নিয়ত সব সময়ই করবেন কলব বা অন্তরে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা মূলত বিদআত। তবে ইহরামে لبيك اللهم عمرة وحجا পড়েছেন বলে যা সহীহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, তার উত্তরে বলা হয় তিনি শুধু এতটুকুই বলেছেন, এর অতিরিক্ত কিছু বলেননি (শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. ‘আন-নিয়্যাহ’ মজমু‘ রাসাইল কুবরা : ১/২৪৪-২৪৫)]

৬- ‘এবং হাদী তথা কুরবানীর পশু পাঠিয়ে দিলেন’।[ইরওয়াউল গালীল।]

৭- ‘আমরা তাঁর সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে ছিল মহিলা ও শিশু’।[মুসলিম]

৮- যখন আমরা যুল-হুলাইফাতে[যুল-হুলাইফা মসজিদে নববী থেকে ৬ মাইল দূরে অবস্থিত।]পৌঁছলাম। তখন আসমা বিন্ত উমায়েস রা. মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর নামক এক সন্তান প্রসব করলেন।

৯- অতপর তিনি রাসূলুল্লাল্লাহ (সঃ) এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন যে, আমি কী করব?

১০- তিনি বললেন,

اغْتَسِلِى وَاسْتَثْفِرِى بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِى

‘তুমি গোসল কর, রক্তক্ষরণের স্থানে একটি কাপড় বেঁধে নাও এবং ইহরাম বাঁধ।’

১১- এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে সালাত আদায় করলেন ‘এবং চুপচাপ রইলেন’।[নাসাঈ। অর্থাৎ এখানে আর তালবিয়া পড়লেন না। এরপর তালবিয়া পড়া শুরু করেন তাঁর উটনীটি বাইদা নামক স্থানে পৌঁছার পর, যেমনটি সামনে আসছে।]

ইহরাম

১২- ‘অতপর কাসওয়া[এটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উটনীর নাম। এর আরও নাম রয়েছে যেমন : ‘আযবা’ এবং ‘জাদ‘আ’। কারো কারো মতে কাসওয়া তাঁর উটের নাম (নাববী, শারহ)।] নামক উটনীতে সওয়ার হলেন। উটনীটি তাঁকে নিয়ে বাইদা নামক জায়গায় গেলে তিনি ও তাঁর সাথিগণ হজের তালবিয়া পাঠ করলেন’।[ইবন মাজা।]

১৩- জাবের রা. বলেন, আমি আমার দৃষ্টি যতদূর যায় তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর সামনে কেবল আরোহী ও পায়ে হেঁটে[ইমাম নাববী রহ. বলেন, এ থেকে সবাই একমত যে আরোহন করে এবং পায়ে হেঁটে- উভয়ভাবে হজ করা বৈধ। তবে উভয়টির মধ্যে উত্তম কোনটি সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ আলিমের মতে বাহনে করে হজই উত্তম। কারণ, (ক) নবী (সঃ) এমনটি করেছেন (খ) বাহনে করে হজ করা হজের কার্যাদি আদায়ে সহায়ক এবং (গ) এতে খরচও বেশি হয়। তবে দাউদ জাহেরী প্রমুখ হেঁটে হজ করাকে উত্তম বলেছেন। তার মতে এতে বেশি কষ্ট হয় বলে তা উত্তম। তার এ মত সঠিক নয়। এ থেকে বুঝা যায় বিমানে সফর করে হজে যাওয়া জায়িয বরং মুস্তাহাব। তবে কেউ কেউ যে হাদীস বর্ণনা করেন, ‘বাহনে হজকারির প্রতিটি কদমে সত্তরটি নেকি লেখা হয় আর হেঁটে হজকারির প্রতি কদমে সাতশ নেকি লেখা হয়’ এটি সম্পূর্ণ জাল ও বানোয়াট হাদীস। (দেখুন : সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দাঈফা : ৪৯৬-৪৯৭)। ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, এ ব্যাপারটি নির্ভর করবে হজকারির ওপর। কারো কারো জন্য বাহনে হজ উত্তম আবার কারো কারো জন্যে হেঁটে হজ উত্তম। এটিই সঠিক মত।] যাত্রারত মানুষ আর মানুষ। তাঁর ডানে অনুরূপ, তাঁর বামেও অনুরূপ তাঁর পেছনেও অনুরূপ মানুষ আর মানুষ। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মাঝে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ওপর পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। তিনিই তো তার ব্যাখ্যা জানেন। তাই তিনি যে আমল করছিলেন আমরা হুবহু তাই আমল করছিলাম।[জাবির রা.-এর কথার মধ্যে এ কথার প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সাহাবীদের সামনে পবিত্র কুরআন তুলে ধরতেন। একমাত্র তিনিই কুরআনের যথার্থ তাফসির ও ব্যাখ্যা জানতেন। তিনি ছাড়া অন্যরা এমনকি খোদ তাঁর সাহাবীরাও তাঁর ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী ছিলেন।]

১৪- তিনি তাওহীদ সম্বলিত [তাওহীদ ও শিরক বিপরীতমুখী দু’টি বিষয় যা কোনদিন একত্রিত হতে পারে না। এ-দুয়ের একটির উপস্থিতির অর্থ অন্যটির বিদায়। ঠিক রাত-দিন অথবা আগুন-পানির বৈপরিত্বের মতই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَأَتِمُّواْ ٱلۡحَجَّ وَٱلۡعُمۡرَةَ لِلَّهِۚ

‘তোমরা হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করো।’ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে তাওহীদ সবচে’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি তাওহীদকে তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়েছেন। হজে নিম্নবর্ণিত আমলসমূহ সম্পাদনে তাওহীদের প্রতি তাঁর গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, ১. তালবিয়া পাঠ। ২. লোক-দেখানো ও রিয়া থেকে মুক্ত হজ পালনের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ। ৩. তাওয়াফ শেষে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার সময় তাওহীদ সম্বলিত ‘সূরা আল-কাফিরূন’ ও সূরা ইখলাস’ পাঠ। ৪. সাফা ও মারওয়ায় তাওহীদনির্ভর দু‘আ পাঠ। ৫. আরাফার দু‘আ ও যিকরসমূহেও তাওহীদ সম্বলিত বাণী উচ্চারণ ৬. হাদী বা কুরবানীর পশু যবেহের সময় তাকবীর পাঠ। ৬. জামরায় পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবীর পাঠ ইত্যাদি। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য, তাওহীদের হাকীকত সম্পর্কে সচেতন হওয়া। শিরক ও বিদ‘আত থেকে সতর্ক থাকা।

]তালবিয়া পাঠ করেন,

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ، لاَشَرِيكَ لَكَ.

(লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক, লাববাইকা লা শারীকা লাকা লাববাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক)।

‘আমি হাযির, হে আল্লাহ, আমি হাযির। তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাযির। নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা ও নিয়ামত তোমার এবং রাজত্বও, তোমার কোন শরীক নেই।’বুখারী : ৫৯১৫, মুসলিম : ১১৮৪।

১৫- আর মানুষেরাও যেভাবে পারছিল এই তালবিয়া পাঠ করছিল। তারা কিছু বাড়তি বলছিল। যেমন,

لَبَّيْكَ ذَا الْمَعَارِجِ, لَبَّيْكَ ذَا الْفَوَاضِلِ.

(লাববাইকা যাল মাআরিজি, লাববাইকা যাল ফাওয়াযিলি) কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে তা রদ করতে বলেননি।[ইবরাহীম আ. এর তালবিয়া ছিল তাওহীদ সম্বলিত। সর্বপ্রথম আমর ইবন লুহাই খুযাঈ জাহেলী যুগে তালবিয়াতে শিরক যুক্ত করে বলে,

إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ.

‘কিন্তু একজন শরীক যার তুমিই মালিক এবং তার যা কিছু রয়েছে তারও’ (উমদাতুল কারী : ২৪/ ৬৫; আযরাকী, আখবারে মক্কা : ১/২৩২)।

তার অনুসরণে মুশরিকগণ হজ ও উমরার তালবিয়া পাঠে উক্ত শিরক সম্বলিত বাক্য যুক্ত করত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তালবিয়ায় তাওহীদের স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন এবং তা থেকে শিরকযুক্ত বাক্য দূর করে দিলেন (মুসলিম : ১১৮৫)।]

১৬- তবে তিনি বারবার তালবিয়া পাঠ করছিলেন।

১৭- জাবের রা. বলেন, আমরা বলছিলাম, لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ (লাববাইক আল্লাহুম্মা) لَبَّيْكَ ِبالحَجِ (লাববাইকা বিল-হাজ্জ)। আমরা খুব চিৎকার করে তা বলছিলাম। আর আমরা কেবল হজেরই নিয়ত করছিলাম। তখনো আমরা হজের সাথে উমরার কথা জানতাম না।[ইবন মাজা।]

১৮- আর আয়েশা রা. উমরার নিয়ত করে এলেন। ‘সারিফ’[এই জায়গাটি তান‘ঈমের কাছাকাছি বায়তুললাহ থেকে ১০ মাইল দূরে উত্তর দিকে অবস্থিত।] নামক স্থানে এসে তিনি ঋতুবতী হয়ে গেলেন।[মুসলিম]

মক্কায় প্রবেশ ও বায়তুল্লাহর তাওয়াফ

১৯- এমনিভাবে আমরা তাঁর সাথে বায়তুল্লাহ্ এসে পৌঁছলাম। সময়টা ছিল যিলহজের চার তারিখ ভোরবেলা।

২০- নবী (সঃ) মসজিদের দরজার সামনে এলেন। অতপর তিনি তাঁর উট বসালেন। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলেন।

২১- তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন।

২২- এরপর তিনি তাঁর ডান দিকে চললেন।[মুসলিম]

২৩- অতপর তিনি তিন চক্করে রমল[রমল হচ্ছে, ঘন পদক্ষেপে বীরের মত দ্রুত হাঁটা।] করতে করতে হাজরে আসওয়াদের কাছে আসলেন। আর চতুর্থ চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন।

২৪- এরপর মাকামে ইবরাহীম আ.-এ পৌঁছে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন : وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى (ওয়াত্তাখিযূ মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা)। তিনি উচ্চস্বরে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন যাতে লোকেরা শুনতে পায়।[নাসাঈ।]

২৫- এরপর মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও বায়তুল্লাহ্র মাঝখানে রেখে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করলেন।[বায়হাকী, মুসনাদে আহমদ।]

২৬- ‘তিনি এ দু’রাক‘আত সালাতে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাস পড়েছিলেন।’[নাসাঈ, তিরমিযী।]

২৭- এরপর তিনি যমযমের কাছে গিয়ে যমযমের পানি পান করলেন এবং তাঁর নিজের মাথায় ঢাললেন।[আহমদ।]

২৮- এরপর তিনি হাজরে আসওয়াদের নিকট গিয়ে তা স্পর্শ করলেন।

সাফা ও মারওয়ায় অবস্থান

২৯- তারপর সাফা দরজা দিয়ে বের হয়ে সাফা পাহাড়ে গেলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পাঠ করলেন :

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ

‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি’।

অতপর তিনি সাফা দিয়ে শুরু করলেন এবং কাবাঘর দেখা যায় এমন উঁচুতে উঠলেন।

৩০- অতপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ববাদ, বড়ত্ব ও প্রশংসার ঘোষণা দিয়ে বললেন,

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْد يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كَلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.

(লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল্ মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু ইউহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু আনজাযা ওয়াদাহু, ওয়া নাছারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ্)।

‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন। আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন।[নাসাঈ, মুসলিম। (খন্দকের যুদ্ধে)] অতপর এর মাঝে তিনি দু‘আ করলেন এবং এরূপ তিনবার পাঠ করলেন।

৩১- এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে অগ্রসর হলেন। যখন তিনি বাতনুল-ওয়াদীতে পদার্পন করলেন, তখন তিনি দৌড়াতে লাগলেন। যখন তিনি ‘উপত্যকার অপর প্রান্তে’[মুসনাদে আহমদ।] এসে গেলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন। মারওয়ায় এসে তিনি তাতে আরোহন করলেন এবং বায়তুল্লাহ্র দিকে তাকালেন।[নাসাঈ।]

৩২- অতপর সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন মারওয়া পাহাড়েও তাই করলেন।

চলবে … … …