Category Archives: ইসলাম ও বিজ্ঞান

কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর কিছু সৃষ্টি নিদর্শন

কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর কিছু সৃষ্টি নিদর্শন

আলী হাসান তৈয়ব

আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আর তা হলো মহাবৈশ্বয়িক কিছু নিদর্শন, যা আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব ও একত্ববাদের জাজ্জ্বল্য প্রমাণ বহন করে। আকাশ ও পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, লতাগুল্মসহ মহাবিশ্বের সব কিছুই আল্লাহ তা`আলার একত্ববাদের ঘোষক এবং একমাত্র তিনিই যে ইবাদত-বন্দেগী, দু‘আ-প্রার্থনা, চূড়ান্ত ভক্তি, ভয় ও ভালোবাসার পাত্র তার অকপট সাক্ষী। মহাবিশ্বের নানা বিষয়, ঘটনা ও অনুঘটনা অনুসান্ধানী দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখলে বিষয়টি অত্যুজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠে। এবার আসুন তাহলে, এ বিষয়ক কয়েকটি আয়াত অধ্যয়নে মনোনিবেশ করি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

أَوَلَمْ يَنْظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْ عَسَى أَنْ يَكُونَ قَدِ اقْتَرَبَ أَجَلُهُمْ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ.

তারা কি দৃষ্টিপাত করেনি আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্বে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি? আর (এর প্রতি যে) হয়তো তাদের নির্দিষ্ট সময় নিকটে এসে গিয়েছে? সুতরাং তারা এরপর আর কোন্ কথার প্রতি ঈমান আনবে?’।[1]

আল্লাহ তা‘আলা আরও ইরশাদ করেন:

أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوجٍ. وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ

‘তারা কি তাদের উপরে আসমানের দিকে তাকায় না, কিভাবে আমি তা বানিয়েছি এবং তা সুশোভিত করেছি? আর তাতে কোনো ফাটল নেই। আর আমি যমীনকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক প্রকারের সুদৃশ্য উদ্ভিদ উদ্গত করেছি আল্লাহ অভিমুখী প্রতিটি বান্দার জন্য জ্ঞান ও উপদেশ হিসেবে’।[2]আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন :

أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ. وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ. وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ. وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ.

‘তবে কি তারা উটের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কীভাবে তা ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়েছে? আর পর্বতমালার দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর যমীনের দিকে, কীভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে?’।[3]

আল্লাহ তা‘আলার কতিপয় নিদর্শন

আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আসমান ও যমীনের সৃষ্টি। সুতরাং যে ব্যক্তি আসমানের দিকে তাকাবে, আসমানের নিপুণ সৃষ্টি, আসমানের অপার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য এবং এর অনুমেয় উচ্চতা ও বিশালতার প্রতি লক্ষ্য করবে, সে তার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার অসীম শক্তি ও ক্ষমতাই দেখতে পাবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا. رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا

‘তোমাদেরকে সৃষ্টি করা অধিক কঠিন, না আসমান সৃষ্টি? তিনি তা বানিয়েছেন। তিনি তার ছাদকে উচ্চ করেছেন এবং তাকে সুসম্পন্ন করেছেন’।[4]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন :

وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ

‘আর আমি হাতসমূহ দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি সম্প্রসারণকারী’।[5]

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَكَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ

‘অতঃপর তুমি দৃষ্টি ফিরাও একের পর এক, সেই দৃষ্টি অবনমিত ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে’।[6]

আর যে যমীন তথা ভূপৃষ্ঠের দিকে তাকাবে, সে দেখতে পাবে কীভাবে আল্লাহ তা`আলা একে সুগম করেছেন, এর মধ্যে আমাদের জন্য রাস্তা বানিয়েছেন, এর উপরিভাগে দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এতে বরকত দিয়েছেন, এতে সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন এবং বান্দাদের জন্য এসব আহরণ করা সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ

‘আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন’।[7]

বান্দারা যাতে রিযক অন্বেষণ করতে পারে তাই আল্লাহ তা‘আলা যমীনকে সমতল বানিয়েছেন। বান্দারা যমীনে চাষাবাদ করে, যমীন থেকে পানি বের করে তা পান করে তৃপ্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা যমীনকে স্থির করেছেন, তাঁর নির্দেশ ছাড়া তা নড়ে না বা কম্পিত হয় না। আল্লাহ তা‘আলা, তাই ইরশাদ করেন :

وَفِي الْأَرْضِ آَيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ

‘সুনিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য যমীনে অনেক নিদর্শন রয়েছে’।[8]

আল্লাহ তা‘আলার আরেক নিদর্শন তাঁর গড়া আসমান-যমীনের অসংখ্য জীব। আসমানে অসংখ্য অগণিত ফেরেশতা রয়েছেন, যার সঠিক সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলাই জানেন। যমীনে আল্লাহ তা‘আলা যে কত জাতের ও কত প্রজাতির জীব সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া তা কেউ জানে না। আর এগুলোর সংখ্যা যে কত তাও কল্পনার অতীত। এসব জীব আবার নানা প্রজাতির, নানা রঙের এবং নানা ধরনের। এর মধ্যে কিছু আছে যা আমাদের জন্য উপকারী। এর দ্বারা আল্লাহর নিয়ামতের পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায়। আবার কিছু আছে মানুষের জন্য ক্ষতিকর, এর দ্বারা মানুষের নিজের জীবনের মূল্য এবং আল্লাহর সৃষ্টির সামনে তার দুর্বলতার অনুভূতি হাসিল হয়। এসব সৃষ্টির প্রত্যেকেই কিন্তু আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন :

تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا.

‘সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রসংশায় তাসবীহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবীহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ’[9]

পৃথিবীতে আমাদের দেখা না-দেখা এবং জানা –নাজানা যত প্রাণী আছে সকল প্রাণীর রিযকও আল্লাহ তা‘আলা দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

‘আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল। সব কিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে’[10]

আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনের মধ্যে আরও আছে দিন-রাতের সৃষ্টি। রাতকে আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত সৃষ্টি করেছেন আমাদের প্রশান্তি লাভের জন্য। আমরা এতে নিদ্রা যাই এবং সারাদিনের ক্লান্তি দূর করি। আর দিনকে সৃষ্টি করেছেন জীবিকা অর্জনের জন্য। এ সময় মানুষ আপন জীবিকা অর্জনে ব্যস্ত থাকে। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

فَالِقُ الْإِصْبَاحِ وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ

‘(তিনি) প্রভাত উদ্ভাসিতকারী। তিনি বানিয়েছেন রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক। এটা সর্বজ্ঞ পরাক্রমশালীর নির্ধারণ’।[11]

আমাদের ভেবে দেখা উচিত আল্লাহ তা‘আলা যদি রাতের পর দিন না আনেন, তাহলে আমরা কি জীবিকা সংগ্রহ করতে পারব? যদি এমন হয় তাহলে পৃথিবীর কোনো সরকার, কোনো পরাশক্তি, আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের মহাক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট কিংবা জাতি সংঘের মহাসচিবও কি পারবে আমাদের জন্য দিন এনে দিতে? দেখুন আল্লাহ তা`আলা কত সুন্দর করে আমাদের কে সেকথা বুঝিয়ে দিচ্ছেন :

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ.

‘বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ রাতকে তোমাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোনো ইলাহ আছে কি যে তোমাদের আলো এনে দেবে? তবুও কি তোমরা শুনবে না?’।[12]

এই মহাবিশ্ব, এই মহা বিশ্বের সব কিছু একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সৃষ্টি করেছেন। তার কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। তাই একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত।

কোনো কিছুই নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি

প্রিয় পাঠক, চিন্তা করে দেখুন, এসব সৃষ্টির কোনোটাই কিন্তু নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি। একমাত্র আল্লাহ তা`আলাই সব সৃষ্টির স্রষ্টা। ইরশাদ হয়েছে :

أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ . أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَل لَا يُوقِنُونَ.

‘তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারাই স্রষ্টা? তারা কি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না’। [13]

আমাদের যদি বলা হয়, একটি বিশাল অট্টালিকা বা একটি রাজপ্রাসাদ নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে আমরা নিশ্চয় এটা বিশ্বাস করব না। যদি কেউ বলে, দেখ, এই দালানটি হঠাৎ নিজের থেকে তৈরি হয়ে গেল। তবে আমরা তাকে পাগল বলবেন। তাহলে বলুন, এ বিশ্ব চরাচর, এই যে সুউচ্চ আকাশ আর সুবিস্তৃত যমীন, এই ঊর্ধ্বজগত আর নিম্নজগত কীভাবে একজন স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হতে পারে? কোনো বানানেওয়ালা ছাড়া আকস্মিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে? নিশ্চয় এসবের একজন স্রষ্টা আছেন। একজন অসীম ক্ষমতাবান নিয়ন্ত্রক আছেন। হ্যা, তিনিই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলা।

ডারউইনের থিওরি একটি ভ্রান্ত মতবাদ

বর্তমান যুগে তথাকথিত কিছু শিক্ষিত লোক ডারউইনের বিবর্তনবাদ থিওরিতে বিশ্বাস করে। মানুষ নাকি প্রথমে বানর ছিল। তারপর ক্রমবিবর্তনের ধারায় সেখান থেকে তারা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি চরম মিথ্যাচার ও বাস্তবতার ওপর মিথ্যার প্রলেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিবর্তনবাদ এমন একটি মতবাদ, যা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ কিছুই এ চিন্তার সত্যায়ন করে না। এমন বাতুলতাপূর্ণ চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে কেউ ঈমানহারা হবেন না। এ মতবাদকে খণ্ডন করে বিজ্ঞানী ও আলেমগণ অনেক বই লিখেছেন। সেগুলো পড়লেই আমরা বুঝতে পারব বিষয়টি কতটা অসার ও হাস্যকর। আল্লাহর যেসব নিয়ামতের জন্য আমাদের শুকরিয়া করা উচিত, তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো, এসব সৃষ্টিকে আমাদের অনুগত করে দেয়া। তিনি হাজার হাজার মাখলূকাত আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলোকে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন। তাই আমাদের অবশ্যই আল্লাহ তা`আলার শুকরিয়া জানানো উচিত। অতএব আমাদের উচিত আল্লাহ তা`আলাকে ভয় করা। তিনি আমাদের হিদায়েত দিয়েছেন, আমরা যা জানতাম না তা শিখিয়েছেন, আমাদের দুনিয়া-আখিরাতে যা কল্যাণকর তার জ্ঞান ও শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন। আর যা আমরা অনুধাবন করতে সক্ষম নই, যাতে আমাদের মঙ্গল নেই, তা আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন। তাই আমাদের উচিত আল্লাহ তা`আলার শুকরিয়া আদায় করা। তাঁর নির্দশ মতো জীবন যাপন করা। তিনি আমাদের জানিয়েছেন কীভাবে এই বিশ্বজাহান সৃষ্টি হয়েছে। এ জ্ঞান তিনি দিয়েছেন তাঁর নবী-রাসূলদের মাধ্যমে। সুতরাং আসমান-যমীনের সৃষ্টি সংক্রান্ত যে কথাই আমরা শুনি না কেন, যাচাই করে দেখতে হবে তা নবী-রাসূলদের কথার সঙ্গে মেলে কি না। যদি মেলে, তাহলে তা গ্রহণ করা যাবে; যদি না মেলে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর যদি এ সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের বক্তব্য না জানা যায়, তাহলে যতদিন বিষয়টি সত্য না মিথ্যা তা নিশ্চিত হব, ততদিন এ ব্যাপারে নীরব থাকাই হবে প্রজ্ঞা ও সুবুদ্ধির পরিচায়ক। আল্লাহ তা`আলা আমাদের জানিয়েছে যে, তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মাঝখানের সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির কাজ শুরু করে দুই দিনে তিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন, তার ওপর পেরেক স্বরূপ পাহাড়-পর্বত স্থাপন করেছেন। এরপর আর দুই দিনে তাতে খাদ্য সন্নিবেশিত করেছেন। এই হলো চারদিন। অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন। এটি তখন ছিল ধোঁয়ার মত। তারপর তিনি দুই দিনে সাত আসমান সৃষ্টি করেন। এই মোট ছয় দিনে আল্লাহ তা`আলা আসমান-যমীন সৃষ্টি করেন। আল্লাহ তা`আলা বলেন :

إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ.

‘নিশ্চয় তোমাদের রব আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে উঠেছেন। তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। আর (সৃষ্টি করেছেন) সূর্য, চাঁদ ও তারকারাজি, যা তাঁর নির্দেশে নিয়োজিত। জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব’[14]

অন্যত্র আল্লাহ তা`আলা বলেন :

إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ.

‘নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’[15]

আসমান-যমীনের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এ দুয়ের মধ্যস্থিত সবকিছুই আল্লাহ তা`আলা সৃষ্টি করেছেন। যমীন থেকে পানি ও চারণভূমি বের করেছেন এবং তাতে এমনভাবে খাদ্য লুকিয়ে রেখেছেন, যা সব যুগের এবং সব স্থানের উপযোগী। যাতে খাদ্যগুলো প্রত্যেক যুগে নানা রকমের হয়, সব সময় খাদ্য কোথাও না কোথাও থাকে এবং এই খাদ্যের প্রয়োজনে মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে। একইভাবে তিনি আসমানে চাঁদ, সূর্য ও তারকারাজি স্থাপন করে তাকে সুসজ্জিত করেছেন। এর দ্বারা মানুষ সমুদ্রে ও স্থলে পথ খুঁজে পায়। আল্লাহ তা`আলা বলেন :

أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا . وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا. وَاللَّهُ أَنْبَتَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ نَبَاتًا.

‘তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, কীভাবে আল্লাহ স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন? আর এগুলোর মধ্যে চাঁদ সৃষ্টি করেছেন আলো এবং সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন প্রদীপরূপে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে উদগত করেছেন মাটি থেকে’[16]

শেষ কথা

আমরা যেন কিছুতেই এ কথা ভুলে না যাই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলা এসব সৃষ্টিকে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে আমরা একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করি; অন্য কাউকে তাঁর ইবাদতে শরীক না করি। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে’[17]

তাই আমাদের সবার কর্তব্য, আল্লাহ তা`আলার নির্দেশ মতো তাঁর ইবাদত করা এবং এসব নিয়ামতের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

‘হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত কর’[18]

তিনি আরও ইরশাদ করেন :

فَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا وَاشْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

‘অতএব আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল উত্তম রিযক দিয়েছেন, তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করে থাক’।[19]

অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন :

إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقًا فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ.

‘তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর পূজা করছ এবং মিথ্যা বানাচ্ছ। নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা কর তারা তোমাদের জন্য রিযক-এর মালিক নয়। তাই আল্লাহর কাছে রিযক তালাশ কর, তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’।[20]

আল্লাহ তা`আলা আমাদের সবাইকে তাঁর নিয়ামত সম্পর্কে জানার এবং বেশি বেশি তাঁর শুকরিয়া আদায় করার এবং ইবাদত করবার তাওফীক দান করুন। আমীন।


[1]. সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত : ১৮৫।
[2]. সূরা কাফ, আয়াত : ৬-৮।
[3]. সূরা আল গাশিয়া, আয়াত : ১৭-২০।
[4]. সূরা আন-নাযিয়াত, আয়াত : ২৭-২৮।
[5]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ৪৭।
[6]. সূরা মুলক, আয়াত : ৪।
[7]. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত : ১০।
[8]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ২০।
[9]. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪।
[10]. সূরা হূদ, আয়াত : ৬।
[11]. সূরা আনআম, আয়াত : ৯৬।
[12]. সূরা আল-কাসাস, আয়াত : ৭১।
[13]. সূরা আত-তূর, আয়াত : ৩৫-৩৬।
[14]. সূরা আ‘রাফ, আয়াত : ৫৪।
[15]. সূরা ইউনুস, আয়াত : ৩।
[16]. সূরা নূহ, আয়াত : ১৫-১৭।
[17]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ৫৬।
[18]. সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৭২।
[19]. সূরা আন-নাহাল, আয়াত : ১১৪।
[20]. সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ১৭।

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান (পর্বঃ ১ – ৭)

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান

মুহাম্মদ উসমান গনি

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

কুরআন মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে মানুষের জন্য হিদায়েত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার একমাত্র সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ। এটি এমন একটি কিতাব যাতে আছে জীবনকে সুন্দর সহজ ভাবে সৎ পথে পরিচলার দিক-নির্দেশনাসহ জাতিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও পরকালীন জীবনের বিস্তারিত নর্ণনা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করার উপায়। যেহেতু এটি একটি হিদায়েতের কিতাব কাজেই শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্বরুপ বলা যায় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, পর্দাথ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিজ্ঞান যে ষিয়েই পারদর্শী হোন না কেন উক্ত সর্ব বিষয়েই পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত রয়েছে বলে মানুষ হিদায়েত পেতে পারে। এব্যাপারে ২/১টি উদাহরণ তুলে ধরছি যাতে সবার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়। সূরা কাহাফে আসহাবে কাহাফদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ . سورة الكهف : 18ِ

“তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে। [সুরা কাহফঃ ১৮]

এই সূরা, এমনকি কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অধ্যায়ন করলে দীর্ঘ দিন ঘুমন্ত লোককে ডান দিকে ও বাম দিকে পরিবর্তন করানোর কথাটি বলার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হবে না। এতে না আছে পূর্বের বা পরের আয়াতের মিল, না আছে কোন প্রশ্নের উত্তর, আর না আছে কোন হিদায়েতের কথা। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হবে এই কথাটি বলাই ছিল নিসপ্রয়োজন। কিন্তু না, তা কখনোই না। মহাজ্ঞানী আল্লাহ কি বিনা কারণে কুরআনের মত অহী গ্রন্থে এসব উল্লেখ করেছেন? আমি ডাক্তার হিসাবে এই আয়াতের অর্থ প্রথম পড়ার পর মনে হয়েছে সারা জীবন ও যদি সিজদায় পড়ে থাকি তাহলেও মানর জাতির জন্য এই শিক্ষার বিনিময় আদায় করা অসম্ভব। আমি নিজের অজান্তেই আল হামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ পড়ে কতক্ষণ যে নিশ্চুপ হয়েছিলাম তা মনে নেই। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। মানুষের দীর্ঘ দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা আবস্থায় যদি পার্শ্ব পরিবর্তন করানো না হয় তাহলে শরীরের নীচের অংশে ঘা হয়ে পচন ধরে। এক ভালো করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এমনকি রোগী রোগমুক্ত হয়েও এ মারা যায়। কাজেই ডাক্তারের কাছে অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তন করানোটা কত যে মূল্যবান তা বুঝতেই পারেন। সে ই কারণে আমরা অজ্ঞান রোগীর জন্য নেই ঘন ঘন পার্শ্ব পরিবর্তন করার. ভাবতে কেমন লাগে যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিস্কারের অনেক আগেই অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তনের নির্দেশ দিচ্ছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা । এই ব্যাপারটি আপনারা কিভাবে নিবেন তা আপনাদের বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম। আর একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-কাসাসে ঘোষণা দেনঃ

إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فيه. سورة القصص: 72

অর্থ: আল্লাহ যদি দিবসকে কেয়ামত পর্যনত স্থায়ী রাখেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্য আছে কি যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম? [সুরা কাসসঃ ৭২]

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে লাটিমের মত (লাটিম যেমন নিজের অক্ষের উপর ঘুরে, আবার দৌড়ায়ও) ঘুরে বলেই দিন, রাত্রি ও ঋতুর পরিবর্তন হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সূর্যের দিকে আজীবন একই দিকে মুখ করে ঘুরত তাহলে একদিক হতো চিরদিনের জন্য শুধু গরম আর গরম , আর অন্যদিক হতো অন্ধকার (রাত্রি) এবং ঠান্ডা আর ঠান্ডা। অথবা পৃথিবীর যে দিকে সূর্য আছে তার অপর দিকে যদি আরও একটি সূর্য থাকত তাহলে পৃথিবী যেভাবেই ঘুরত না কেন, সব সময়েই পৃথিবীর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ থাকত আলোকিত এবং গরম আর গরম। এই উভয় অবস্থাতেই পৃথিবীতে কোন জীব জন্তুর বসবাস করা সম্ভব হত না , যেমন চাঁদে কোন দিনই মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব হবে না । কারণ একেতো ওখানে বাতাস নেই, অধিকন্তু সব সময়েই একদিক পৃথিবীর দিকে মুখ করে ঘুরে বলে চাঁদের এক পৃষ্টের তাপমাত্রা ১১৭’, আর অন্য পৃষ্ঠের তাপমাত্রা (-) ১৩৬’। অতএব এক পৃষ্ঠে অতি গরম, আর অন্য পৃষ্ঠে অতি ঠান্ডা বিধায় মানুষের বসবানের অনুপযোগী। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, নভোচারীরা কি করে চাঁদে ঘুরে এলো? নভোচারীরা যে পোশাক পরিধান করে চাঁদে ভ্রমন করেছিলেন তা চাঁদের আবহাওয়ায় ক্ষতি করতে পারে না। এই ধরণের পোশাক পরে মানুষ কিছু দিন থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ দিন থাকতে পারবে না। এরই মধ্যে অক্সিজেন, খাওয়া দাওয়া, টয়লেট, সব কিছুর সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। আর বর্তমানে এর মূল্য ১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫৭ কোটি টাকা)। চাঁদে বসে এই পোশাক পরিবর্তন ও করতে পারবে না। পরিবর্তন করতে গেলেই সে মারা যাবে।

আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ। এই গ্রহের মত অরেক গ্রহ আছে যেখানে কোন রাত্রি নেই। এমনি একটি উদাহরণ হলো যার দুটি সূর্য এবং অষঢ়যধ মবহরঃরপ যার সূর্যের সংখ্যা ৩টি। অতএব পৃথিবী যদি উপরোক্ত অবস্থায় পতিত হতো তাহলে আমাদের অবস্থা কি হতো, একটু ভেবে দেখবেন কি?

 

এই আলোচ্য বইটিতে বিভিন্ন অধ্যায় এ সৃষ্টির বিভিন্ন দিক ও তার মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদের উদাহরনগুলো সুন্দর ভাবে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়কে নিচে LINK করে দেয়া হলঃ

  • আল্লাহর সাথে শরীক করা,
  • মানুষ সৃষ্টির কারণ এবং
  • ইবাদাতের অর্থ কি?

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

মহান শিল্পীর সৃষ্টি কত সুন্দর! কোথাও কোনো খুঁত নেই। তার চেয়েও সুন্দর মহান স্রষ্টা যা চোখের দৃষ্টি ও মনের দৃষ্টি উভয় দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে।

এরশাদ হচ্ছে :

الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴿3﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ ﴿4﴾ )سورة الملك : 3-4)

দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না, তোমার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখ কি? আবার দেখ, আবারো। তোমার দৃষ্টি তোমারই দিকে ফিরে আসবে ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে। (সূরা মুলক : ৩,৪)

স্রষ্টার এত সুন্দর নিখুঁত সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। তাই পৃথিবীর সব কিছুর ওপর মানুষকেই কর্তৃত্ব করতে দিয়েছেন তিনি। কত সৌভাগ্য মানুষের । মানুষ এ সত্যকে আনন্দ ও ভোগের মোহে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে না।

মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে চোখ অন্যতম। অন্তঃকরণকে ভেতরে ও বাইরে সঠিক পথ দেখায় চোখের দৃষ্টি। চোখের দৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব যা-ই থাক না কেন এর আধ্যাতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

সাদা-কালো টিভির পর্দায় সব কিছু সাদা-কালো দেখায়। রঙিন টিভির পর্দায় সাদাকে সাদা, কালোকে কালো, লালকে লাল, সবুজকে সবুজই দেখায়। তার চেয়েও মূল্যবান সম্পদ মানুষের দু’টি রঙিন চোখের দৃষ্টি। চোখের রঙিন দৃষ্টিতে দুনিয়ার সব কিছুর প্রকৃত রূপ-রঙ ধরা পড়ে।

এমন মূল্যবান চোখ রাব্বুল আলামীনের শ্রেষ্ঠ উপহার। এ চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমরা কত কী দেখি। সুন্দর-কুৎসিত, ভালো-মন্দ, উত্থান-পতন, নগ্নতা-বর্বরতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নয়ন জুড়ানো দৃশ্যাবলি। আবার এ চোখের দৃষ্টি দিয়েই কুরআন ও কিতাব পড়ি। এ চোখের দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে রাজা-প্রজা এক কাতারে দাঁড়িয়ে স্রষ্টাকে সেজদা করছে, একসাথে কাবা তাওয়াফ করছে, এক সাথে ধর্ম-কর্ম পালন করছে। এ চোখের দৃষ্টিই প্রমাণ করছে শিশুকালে ও বাধ্যক্যে মানুষ কত অসহায়, আবার যৌবনে কত শক্তিমান ও আমিত্বের অহঙ্কারে বেপরোয়া।

মানব সৃষ্টির রহস্যই মানুষকে অবাক করে দেয়। কোটি কোটি মানুষ, অথচ ভিন্ন ভিন্ন দেহের গঠন, কন্ঠস্বর, চেহারা, অন্তঃকরণ, মানুষের চোখ, জিহ্বা, নাক, কান, ত্বক, লিভার, কিডনি, সর্বোপরি মস্তিস্ক ও হার্টের নৈপুণ্য ও কার্যকারিতা সত্যিই কি চিন্তার বিষয় নয় ? আল্লাহ তাআলা বলছেন :

‍إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا ﴿2﴾ (سورة الدهر : 2)

আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্র-বিন্দু হতে তাকে পরীক্ষা করার জন্য। এ জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। (সূরা দাহর : ২)

যখন দেখি সব কিছু বেষ্টন করেও সূর্য ও রশ্মি ভিন্ন, আলাদা সূর্যের অস্তিত্ব। তখন কি চিন্তা না করে পারা যায় আল্লাহর কুরসী সবকিছু বেষ্টন করেও আলাদা রয়েছে তাঁর অস্তিত্ব। একটি ফুলের বাইরের সৌন্দর্য চোখ জুড়ায় বটে, কিন্তু ভিতরের কারুকার্য অবশ্যই জ্ঞানীদের চিন্তাকে অস্থির করে তোলে, মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চোখের দৃষ্টি বিবেক বোধকে নাড়া দেয় যখন দেখি পানি বাস্প হয়ে মেঘে পরিণত হয়, মেঘ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ধরায় নামে এবং নদী হয়ে সাগরে মিলায়। মাটি কত চমৎকারভাবে স্তরে স্তরে পানি ধরে রাখছে। দুর্বা ও গাছপালা গজাচ্ছে। মাটির আঁধারে শস্য কণা অঙ্কুরিত হচ্ছে। বাতাস অক্সিজেন -সমৃদ্ধ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আকাশে সুশোভিত গ্রহ-নক্ষত্র বিরাজ করছে, সূর্য ও চন্দ্র কত সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালন করছে, পৃথিবী নামক দোলনায় পাহাড় ও পর্বতগুলো পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করছে। খুটিঁ ছাড়াই গ্রহ-নক্ষত্র ঝুলছে। ফ্রান্সিস বেকন যথার্থই বলেছেন, যারা মাটি থেকে দুর্বা গজানো কিংবা আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরার মতো স্রষ্টার অলৌকিকত্ব অনুধাবন করতে পারেনা, স্রষ্টা তাদের সৎপথে আনার জন্য অন্য কোনো অলৌকিকত্ব প্রদর্শন করেননা।

মানুষের প্রাণের কি কোনো রূপ আছে? বাতাসের কি কোনো নির্দিষ্ট আকার আছে? মানুষের এত সুন্দর দেহশিল্পে মরণ হানা দেয় কেন? আগুন নিভে কোথায় যায়? পাখিরা বহুদূর পথ অতিক্রম করেও আবার আবাসস্থলে ফিরে আসে কার দিক-নির্দেশনায়? দিবস মিলাচ্ছে রাতে, রাত্রি মিলাচ্ছে দিবসের মধ্যে কার ইঙ্গিতে? এসব বিষয় অবশই চিন্তাশীলদের ভাবিয়ে তোলে। কুরআনে কারীমে আছে :

وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ﴿12﴾ ) سورة النحل :12)

তোমাদের জন্য আল্লাহ অধীনস্থ করেছেন রাত্রি ও দিবসকে, সূর্য ও চন্দ্রকে। নক্ষত্ররাজি তাঁর হুকুমের অধীন, নিশ্চয়ই এতে বহু নিদর্শন রয়েছে যারা জ্ঞানী তাদের জন্য। (সূরা নহল : ১২)

এই পৃথিবীর গাছপালা, জীবজন্তু, পাহাড়-পর্বত সব কিছু স্রষ্টাকে সেজদা করছে। মহান রাহমানুর রাহীমরে তসবি পড়ছে। কোকিল মধুর স্বরে ‍‍‌‌‌আল্লাহু” আল্লাহু” বলে ডাকছে, মৌমাছি গুনগুন করে আল্লাহ পাকের তসবি পড়ছে। কেউ বসে নেই, সবাই ইবাদতে মশগুল, আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত। শুধু আমরা মানুষ অযথা সময় নষ্ট করছি। আল্লাহকে চিনতে ভুল করছি। এরশাদ হচ্ছে :

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ۩﴿18﴾

তুমি কি দেখনা আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা হজ : ১৮)

আসমান ও জমিনের এতসব সৌন্দর্য, অলৌকিকত্ব, মানুষের অন্তঃকরণের রঙিন চোখের পর্দায় অবশ্যই ধরা পড়ার কথা। যদি সে অন্ধ না হয়। মানুষ তার বোধশক্তি, মেধাকে কাজে না লাগালে, এ নিয়ে চিন্তা বা গবেষণা না করলে, মহান শিল্পীর সৃষ্টিকে বাইরের চোখ ও মনের চোখ কোনো চোখেই বড় করে দেখবে না। স্রষ্টার অস্তিত্বের কোটি কোটি প্রমাণ তার কাছে শূন্য বলে বিবেচিত হবে।

চোখের দৃষ্টিকে সঠিকভাবে পরিচালিত না করলে মানুষের কলব ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষ পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে পৌঁছে যায়। অসভ্য, বর্বর, নীতিহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থপর ও বিবেকহীন হয়। বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মানসিক অশান্তিতে ভোগে। বিপদে আপদে পতিত হয়।

মূলতঃ দ্বীন-দুনিয়ার সব কাজের উৎস হলো অন্তঃকরণ। আর চোখের দৃষ্টি হলো অন্তঃকরণের মুখ্য সৈনিক। এ বিষয়ে হজরত আলী রা. বলেছেন : যে ব্যক্তি তার চোখের ওপর জয়ী হতে পারে না তার অন্তঃকরণের কোনো মূল্য নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴿19﴾ (سورة المؤمن : 19)

চোখের অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। (সূরা মুমিন : ১৯)

মানুষের দুনিয়াবি জিন্দেগি স্বপ্নের মত ফুরিয়ে যাবে। তাই দুনিয়ায় থেকেই পরকালের প্রকৃত জীবনের ভাবনা করতে হবে। এরশাদ হচ্ছে :

وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآَخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴿64﴾ (سورة العنكبوت : 64)

এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়, পারলৌকিক জীবন তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। (সূরা আনকাবুত : ৬৪)

যে দয়াময় আলো, বাতাস, আগুন, পানি ও হরেক রকম খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তার সাথে নিমকহারামি না করি। চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখি, মনের দৃষ্টি দিয়ে স্রষ্টাক দেখি। প্রাণ ভরে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আল্লাহ বলেন :

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴿78﴾

আর আল্লাহ তোমাদের বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদিগকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তঃকরণ, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (সূরা নহল : ৭৮)।

দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর পরম নিয়ামত। আসুন দৃষ্টিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্রষ্টার অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্যে প্রবেশ করে স্রষ্টার সৃষ্টিকে মর্মে মর্মে অনুধাবন করি। বাইরের চোখের দৃষ্টিতে আর মনের চোখের দৃষ্টিতে একাকার হয়ে ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি করি এবং আমলে সালেহের হাত প্রসারিত করি। তবেই আল্লাহর খাটিঁ প্রেমিকের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সৎ কাজ হবে ইবাদত।

পরকাল ভাবনা- ১

পরকাল ভাবনা

মুলঃ মুহাম্মাদ শামছুল হাক ছিদ্দিক
পর্বঃ ১ || পর্বঃ

সংকট

আধুনিক বিশ্বে মানুষের সবচেয়ে বড় গুরুত্বের বিষয় কোনটি ? কোন বৈঠকে এ-প্রশ্ন করা হলে একেক জন একেক উত্তর দিবেন; কেউ বলবেন, ব্যাপকবিধ্বংসী অস্ত্রের উৎপাদন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মজুদ কীভাবে ঠেকানো যায় এটাই আধুনিক বিশ্বের সমধিক গুরুত্বের বিষয়। কেউ বলবেন, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ প্রতিহত করাই বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আবার কেউ বলবেন, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন নিশ্চিত করণই আজকের বড় সমস্যা। এর অর্থ, মানুষ এখনো অন্ধকারে রয়েছে তার পরিচয় বিষয়ে; আবিষ্কার করতে পারেনি নিজের অস্তিত্বের ধরন-ধারণ; পারলে ভিন্নরকম হত সবারই উত্তর। সবাই বলতো, সবচেয়ে বড় সমস্যা আধুনিক মানুষের পরিচয় বিস্মৃতি। মানুষ তার মূল পরিচয় ভুলে গেছে বেমালুম; নশ্বর ইহজগৎ ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে অবিনশ্বর পরজগতে, যেখানে তাকে দাঁড়াতে হবে প্রতিপালকের সামনে যাপিত জীবনের হিসেব দিতে, এ-বিষয়টি বিদায় নিয়েছে তার মস্তিষ্কের সচেতন অংশ থেকে; অন্যথায় এ-খন্ডকালিক অস্তিত্বের জগতকে নয়, অনন্ত পরকালকে, স্রষ্টার মুখোমুখী হওয়াকে, স্বর্গ-নরকের সম্মুখীনতাকে সবচেয়ে বড় বিষয় বলে মনে করতো সে। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

بل تؤثرون الحياة الدنيا والآخرة خير وأبقى. سورة الأعلى : 16-17

কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে পছন্দ করে থাকো। অথচ আখেরাতের জীবনই উত্তম ও চিরস্থায়ী। (সূরা আ’লা ১৬-১৭)

আল্লাহ ও পরকালে মানুষের বিশ্বাস সম্পূর্ণ উঠে গেছে, একথা বলছি না। এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাসীদের দলভুক্ত। কিন্তু এ-বিশ্বাসের শিহরণ ঝিমিয়ে পড়েছে বর্ণনাতীতভাবে মানুষের অন্তর ও বহির্জগতে। মানুষের সচেতন মেধার অংশ হিসেবে মোটেই মন্থিত নয় এ-অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসটি। এ-পৃথিবীর জীবনে, অর্থবিত্ত যশ-জৌলুসের পাহাড় গড়ে কীভাবে উন্নতির চরমে পৌঁছানো সম্ভব সে স্বপ্নেই বিভোর থাকে মানুষ দিবস-রজনী। ইরশাদ হচ্ছে :

ألهاكم التكاثرحتى زرتم المقابر- سورة التكاثر : 1-2

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকেমোহচ্ছন্ন রাখে। যতক্ষণ না তোমরা সমাধিসমূহে উপস্থিত হচ্ছ। (সূরা তাকাছুর :১-২)

বিশ্বের মধ্যাকর্ষণ শক্তি বিলুপ্তপ্রায় এবং ঘন্টায় ছ’হাজার মাইল বেগে আমাদের পৃথিবী ধেঁয়ে চলেছে সূর্যের দিকে, কোন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এধরনের নিশ্চিত কোনো সংবাদ পরিবেশিত হলে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়বে একে অপরের ওপর, শুরু হবে স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার অভাবিতপূর্ব প্রতিযোগিতা, প্রচন্ড দৌড়ঝাঁপ; কেননা এ ধরনের সংবাদের অর্থ-কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিপর্যস্ত হবে পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, সমস্ত জনপদ জৈব ও জড় সব কিছুই। অবসান ঘটবে জীবন বৈচিত্রের, এ-নিসর্গলোকের।

এ ধরেনের কোনো সংবাদ আমাদের কানের পাতায় আঘাত হানছে না বলে নিজেদেরকে মনে করছি অনেক নিরাপদ, কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে কষ্ট হবে না, এর থেকে ভয়ংকরতম এক পরিণতির দিকে নিরন্তর ছুটে চলেছে আমাদের এ পৃথিবী। কিন্তু এ-ব্যাপারে উদ্বেগ উৎকন্ঠার স্পর্শ কাউকে পেয়েছে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হতে পারে- কী সেই সঙ্গিন পরিণতি যার ভয়াবহতায় কাতর হতে হবে আমাদের ? তা হলো মহা-প্রলয়দিবসের ভয়াবহতা যা সুনির্ধারিত হয়ে আছে মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকেই। যার কঠিন থাবা থেকে রেহাই পাবে না কেউ; পাওয়ার আদৌ কোনো সুযোগও নেই। তিক্ত সত্য হলো, মানুষ এ-দুর্লঙ্ঘ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত। বিশ্বাসের জগতে অধিকাংশ মানুষ এ-বিষয়টিকে মানে, কিন্তু বাস্তবে এমন লোকের উপস্থিতি খুব কমই যারা প্রদীপ্ত চেতনা নিয়ে এ-বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। যদি গোধূলিলগ্নে আপনি কোন জনাকীর্ণ বাজারের ধারে দাঁড়িয়ে যান, জানতে চেষ্টা করেন কী জন্য মানুষের এই ভিড়, তাহলে সহযেই বুঝতে পারবেন কিসের পেছনে মানুষের এই অনন্ত দৌড়ঝাঁপ, আনাগোনা। একটু ভেবে দেখুন কী জন্য বাজারে যানবাহনের চলাচল, দোকানদার কী উদ্দেশে বিচিত্র পণ্যে সাজিয়েছে তার দোকান। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখুন, ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ কোথায় যাচ্ছে? তাদের কথাবার্তার বিষয়বস্তু কী? কী জন্য একে অন্যের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করছে? কোন জিনিস মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে? মানুষের উত্তম-যোগ্যতাসমূহ কোথায় ব্যয় হচ্ছে? তাদের অর্থবিত্ত কোথায় খরচ হচ্ছে? কোন জিনিসের অভাব তাদের নিদ্রা হারাম করে দিচ্ছে? মানুষ কী নিয়ে বেরুচ্ছে ? কি নিয়ে ফিরে আসছে? মানুষের এই অচ্ছেদ ব্যস্ততা, তাদের মুখ-নিঃসৃত কথামালা, তাদের প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া নিরীক্ষা করে যদি উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তর ঘেঁটে বের করতে চান তাহলে সহযেই বুঝে যাবেন কিসের পেছনে মানুষের এই উন্মত্ততা, কোন বিষয়কে মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয় হিসেবে করে রেখেছে সাব্যস্ত।

স্বীকার করতেই হয়, শহরে-বন্দরে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনা, ব্যস্ততম পথে অনবরত যাতায়াত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছে— মানুষ তার বসু্তনির্ভর খায়েশ ও রক্তমাংশের প্রয়োজন মেটানোকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। পরজগৎ নয় বরং ইহজগতের বিচিত্র চাহিদা পূরণকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে ধরে নিয়েছে। মানুষকে উৎফুল্ল দেখালে বুঝে নিতে হবে তার কোনো পার্থিব প্রয়োজন পূরণ হয়েছে। আজকের প্রয়োজন, আজকের সুযোগ-সুবিধা, আজকের ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশ ইত্যাদি একটি বিশেষ মাত্রায় অর্জন করতে পারাটাই যেন জীবনের সফলতা। এটাই সে বিষয় যার পেছনে ব্যয় হচ্ছে মানুষের সর্বোত্তম যোগ্যতা, ক্ষরিত হচ্ছে প্রদত্ত শক্তি, সাহস। আসছে কিয়ামত দিবসের ভাবনা কারও নেই। প্রতিটি ব্যক্তির ম্যারাথন দৌড়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য বর্তমান নিসর্গ। আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনে কারীমে কাফেরদের বক্তব্য নকল করে বলেন :

إن هي إلا حياتنا الدنيا نموت و نحيا وما نحن بمبعوثين – المؤمنون : 37

একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা যদি বাঁচি এখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হবনা। (সূরা মুমিনূন : ৩৭)

বড় শহরগুলোর অবস্থাই যে কেবল এরকম, কথা ঠিক নয়। বরং যেখানেই রয়েছে মানুষের বসতি সেখানেই এ-অবস্থা অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃষ্টিগ্রহ্য। আপনি যাকেই টোকা দিবেন, পরখ করতে চাইবেন, তাকেই এ-বিষয়টির বন্দনায় নিষ্ঠাবান পাবেন। কি পুরুষ কি নারী, কি আমীর কি গরীব, কি যুবক কি বৃদ্ধ, কি শহুরে কি গেঁয়ো, কি ধার্মিক কি অধার্মিক সকলেই অভিন্ন পথের তীর্থযাত্রী। আজকের মানুষের সবচাইতে বড় আকুতি, এই নিসর্গে যা কিছু লভ্য সবই লুফে নিতে হবে দুহাত ভরে। ‘ব্যয় করো এর পিছনেই তোমার সর্ব শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা, মশগুল রাখো এ চিন্তাতেই তোমার দিবস-রজনী ’ এ-শ্লোগানের পদধ্বনি যেন নিরন্তর ভেসে আসছে চতুর্দিক থেকে। অবস্থা দেখে মনে হয়, ইহকালীন ভোগ-সম্ভোগই একমাত্র দেবতা যার নজরানায় ঈমান ও আত্মোপলদ্ধি কুরবানী করতেও মানুষ প্রস্তুত রয়েছে। মানুষ এখানেই সবকিছু পেয়ে যেতে চায়, তা যেভাবেই হোক, যেকোনো মূল্যেই হোক। কিন্তু এ-ধরনের সমস্ত সফলতা, নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইহকালীন সফলতা। পরকালে এসমস্ত সফলতার থোরাই মূল্য রয়েছে। যে ব্যক্তি তার সমকালের নিসর্গকে সাজাতে ব্যস্ত সে পরকাল বিষয়ে নিঃসন্দেহে উদাসীন। যে ব্যক্তি তার যৌবনে বার্ধক্যের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেনা, এ ব্যক্তির উদাহরণ ঠিক তারই মতো। ফলে বয়সের ভার বহনে সে যখন অক্ষম হয়ে পড়ে, শ্লথ হয়ে আসে গতিময়তা, হারিয়ে বসে কর্মক্ষমতা, তখন সে আঁচ করতে পারে : তার দাঁড়াবার মতো কোন জায়গা নেই, নেই মাথা গোঁজার কোন ঠাঁই, গা ঢাকার কোন কাপড়, শোবার কোন বিছানা। কিন্তু বয়স তখন দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এসে শ্রান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি, গাত্র ঢাকার কাপড়, শোবার বিছানা, দু’মুঠো অন্নের ব্যবস্থা ইত্যাদির পেছনে শ্রম দেয়ার কোন শক্তি সাহসই তার পতিত ছন্দের শরীরে আর থাকে না। সে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মহাবিশ্বের তাবৎ বিষাদ বুকে ধারণ করে হয়তো কোনো বৃক্ষের শিকড়ে মাথা রেখে আকাশের বিশালতা মাপতে শুরু করে। কোন দেয়ালের গা ঘেষে উদাস দাঁড়িয়ে থাকে, অথবা মুখ থুবরে পড়ে থাকে; উদভ্রান্ত কুকুরের দল তাকে ঘিরে ঘেউ ঘেউ করে, শিশুরা ছুড়ে মারে অজস্র পাথর। আমরা নিজ চোখে এমন বহু ঘটনা দেখে যাচ্ছি, যা থেকে কিঞ্চিৎ হলেও আঁচ করা যায়, পরকালের জন্য যে ব্যক্তি কিছু উপার্জন করছে না তার পরিণতি কত ভয়াবহ হবে। তবে এ বিষয়টি আমাদের মধ্যে কোন চাঞ্চল্যই সৃষ্টি করেনা। আমাদের অনন্ত স্থবিরতায় সৃষ্টি হয় না কোন আন্দোলন। আমারা প্রত্যেকেই বরং আমাদের ‘আজ’কে নির্মাণে বড় ব্যস্ত। আগামীকালের জন্য উদ্বিগ্ন হচ্ছি না মোটেই। যুদ্ধের সময় যদি উৎকট আওয়াজে ঘোষিত হয়, শত্রু পক্ষের বিধ্বংসী বিমানসমূহ ধেঁয়ে আসছে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে, তাহলে সবাই কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে দৌড়ে পালাবে। জনাকীর্ণ রাজপথ নিমিষেই ঢাকা পড়বে শুনশান নিরবতার পুড়ো চাদরে। যদি কেউ এ অবস্থায় নিথর নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, যদি এমন পরিস্থিতিতেও কোনো চঞ্চলতা ছন্দ খুঁজে না পায় কারও শরীরে, অন্তরে, তাহলে সবাই তাকে নির্ঘাৎ পাগল বলবে, একথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। এ-ধরনের উৎকন্ঠা ও চঞ্চলতা এ-পৃথিবীর একটি ছোট বিপদকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। তবে এ-বিপদের থেকেও হাজারগুণে ভয়ংকর ,বীভৎসতম আর এক নিশ্চিত বিপদ আসছে, যার ঘোষণা স্রষ্টা নিজেই দিয়েছেন। বিশ্বপ্রতিপালক তাঁর প্রেরিত পুরুষদের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন – মানুষ যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে, অন্যের অধিকার যথার্থভাবে আদায় করে দেয়, একমাত্র তাঁরই মর্জি মোতাবেক জীবনযাপন করে; না করলে মুখোমুখি হতে হবে কঠিন শাস্তির। ইরশাদ হয়েছে :

ومن أعرض عن ذكري فإن له معيشة ضنكا ونحشره يوم القيامة أعمى. سورة طه :124

যে আমার স্মরণ হতে বিমুখ তার জীবনযাপন সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ হিসেবে। [ সূরা তাহা: ১২৪]

এমন শাস্তি যা অভাবিত, মর্মন্তুত, যা কখনো রহিত হবার নয়, এবং যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার থাকবে না কোনো সুযোগ। বিশ্ব-প্রতিপালকের এ-ঘোষণা প্রায় সবার কর্ণকুহরেই অনুরিত হয়েছে। মানুষও কোন-না-কোন ভঙ্গিতে এ-বিষয়ে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। কিন্তু মানুষের অভ্যন্তর জগতে নজর দিলে, তাদের অবস্থা একটু মনোযোগসহ পর্যবেক্ষণ করে দেখলে বুঝা যাবে যে, বিষয়টি আদৌ কোনো গুরুত্ব পায়নি তাদের অন্তরে, বাহিরে। তারা বরং এর উল্টো ইহকালীন কল্যাণ লাভের উদ্দেশে এমনসব কাজ করে যাচ্ছে যা কখনো করা উচিত ছিলনা। জীবনের বিচিত্র স্রোতধারা নিষিদ্ধ অঞ্চলের দিকে কেবলই ধাবমান অত্যন্ত নির্বোধভাবে। অন্যকিছু নিয়ে ভেবে দেখার ফুরসত যেন কারো নেই। সামরিক বাহিনীর বিপদ সংকেতের অংশত শুনতে পেলেও দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকে সবাই অজানা গন্তব্যের দিকে, পক্ষান্তরে বিশ্ব-প্রতিপালক যে বিপদের ঘোষণা দিলেন সে ব্যাপারে কাউকে সামান্যতম উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। ঐশী বিপদঘন্টা শুনে নিরাপদ-আশ্রয়ের খুঁজে ছুটে যাওয়ার আগ্রহ যেন কারুরই নেই।

এর কারণ কী? সামান্য মনোযোগ দিলেই আমরা তা আঁচ করতে পারি। এর কারণ, সামরিক বাহিনীর হেড-কোয়ারটার থেকে ভেসে-আসা সতর্কসংকেত মানুষ আমলে আনছে, কেননা তা এই মাটির পৃথিবীর সাথে সম্পৃক্ত, যেখানকার ঘটনাসমূহের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ পায়, দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়। এর বিপরীতে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যে সতর্কসংকেত এসেছে তা মৃত্যু-পরবর্তী-জগতের বিষয়। আমাদের ও সে বিপদের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুর দেয়াল। এ-দেয়ালে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে আমাদের দৃষ্টি, দেখা যাচ্ছে না ওপারের বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বহর, দেখা যাচ্ছে না বোমা, গ্রেনেড, আগুনের কুন্ডলী। এইজন্যে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে উঠলে সাথে সাথে মানুষ তা বুঝে নেয়, সতর্ক হয়, তা বিশ্বাস করে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় পানে ছুটে চলে অভাবিত চঞ্চলতায়। কিন্তু আল্লাহ যে বিপদের সংকেত দিয়েছেন, তা মানুষের মধ্যে দানা পরিমাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে না। আল্লাহ আমাদেরকে কেবল দু’টো চর্মচোখই দান করেন নি যা স্থাপিত আমাদের চেহারার অগ্র-ভাগে। বরং তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন আরেকটি চক্ষু যার দৃষ্টিক্ষমতা আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারে বহু দূরের বিষয়। এমনকি মোটা চাদরে ঢাকা পদার্থকেও এ-চোখ দেখে নিতে পারে। এ-চোখ হলো বুদ্ধির চোখ। এ-তৃতীয় চোখটির অব্যবহারই মানুষের বিশ্বাসহীনতার মূল কারণ। মানুষ তার চর্ম চোখে যা কিছু দেখে সেটাকেই বাস্তব মনে করে। পক্ষান্তরে বুদ্ধির চোখকে কাজে লাগালে আমরা দেখতে পাবো, যা আমাদের চর্ম-চোখের সামনে নেই তা বহুমাত্রায় বেশি বিশ্বাসযোগ্য যা আমাদের চোখের সামনে রয়েছে তার তুলনায়। যদি প্রশ্ন করা হয়, এমন একটি বাস্তব বিষয়ের নাম বলুন যা সকলেই সমানভাবে বিশ্বাস করে, তাহলে সবাই এক কন্ঠে বলবে : মৃত্যু। মৃত্যু এমন একটি বাস্তবতা যা অস্বীকার করার ক্ষমতা এখনো কারো হয় নি; কখনো হবে বলে মনে হয় না। মানুষ সমানভাবে এ-ও বিশ্বাস করে যে, যে কোনো মূহুর্তে মৃত্যু কড়া নাড়তে পাড়ে তার অস্তিত্বের দরজায়। তবে অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, মৃত্যু যখন আসে তখন মৃত্যুমুখী ব্যক্তি সাধারনত যা করে তাহলো ছেলে-সন্তানের ভাবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠিত হওয়া। অর্থাৎ আমার মৃত্যুর পর ছেলে-মেয়েদের কী হবে? কীভাবে চলবে লেখাপড়া অথবা ঘরসংসার? ইত্যাদি। অতীত জীবনের যে কয়টি বছর মাড়িয়ে এসেছে সেগুলোয় যদি মানুষ ব্যস্ত থেকে থাকে নিজেকে নিয়ে, তাহলে মৃত্যুর সময় ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ছেলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তো সে সারাটা জীবনই করেছে উৎসর্গ। মৃত্যুর সময়ও তার হৃদয়ের প্রতিটি ভাঁজে বিরাজ করছে ছেলেসন্তানের পার্থিব ভবিষ্যতের ভাবনা। মত্যু-পরবর্তী সময়ে তার নিজের কী হবে না হবে সে বিষয়ে তাকে এখনো মনে হচ্ছে সমানভাবে উদাসীন। মনে হয় যেন মৃত্যুর পর কেবল তার ছেলে সন্তানেরই অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে; তার নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন মাত্র থাকবে না কোথাও। অবস্থা দেখে মনে হয় – মৃত্যুর পর আরো-একটি জীবন রয়েছে এ বিষয়টি মানুষের অনুভূতির জগতে জাগ্রত নেই আদৌ।

আসলে মৃত্যুর পর মানুষ যখন সমাহিত হয় তখন মূলতঃ সে সমাহিত হয় না, চলে যায় আর-এক জগতে, এ-সত্যটি অনুধাবন করলে ছেলেপুলের নৈসর্গিক ভবিষ্যৎ নয়, নিজের পরকালীন ভবিষ্যৎ নিয়েই উৎকন্ঠিত হতো সবচেয়ে বেশি, মৃত্যুর পর আমার কী হবে? এভাবনায় অস্থির হতো সবাই।
মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ব অবলুপ্ত হয়ে যায় না, এর সাথে সংযোজন ঘটে ভিন্নতর এক মাত্রার। মানুষের প্রবেশ ঘটে অন্যএক জীবনে যা বর্তমান জীবনের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ-সত্যটি, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ-সে হোক ধার্মিক বা অধার্মিক-ভুলে গেছে বেমালুম।

মৃত্যু-পরবর্তী-জীবন সম্পর্কে দু’ভাবে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

  • এক. প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর পর মাটির সাথে মিশে যায়, আর তাই বুঝে আসে না কীভাবে সে জীবনপ্রাপ্ত হবে দ্বিতীয়বার।
  • দুই. মৃত্যু-পরবর্তী-জীবন আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে। আজকের পৃথিবীকে তো সবাই স্পর্শ করছে, চোখে দেখছে। কিন্তু পরবর্তী জগতকে কেউ কখনো দেখেনি। এজন্য আমাদের বিশ্বাস হতে চায় না, এ জীবনের পর অন্য আরো-একটি জীবন রয়েছে, যে জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা সবারই কর্তব্য।

তাহলে আসুন পরকালীন জীবন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করে দেখা যাক। আমার যখন মৃত্যু হবে, নিশ্চিহ্ন হবে আমার শরীর মৃত্তিকাগর্ভে অথবা অন্য কোথাও এরপর আবারও কী ফিরে আসবে আমাতে জীবন স্পন্ধন? এ-প্রশ্নটি এভাবে নির্দিষ্ট করে হয়তো খুব কম মানুষই নিজেকে করে থাকে। মৃত্যুর পর এক নতুন জীবনের মুখোমুখী হতে হবে এ কথায় যারা বিশ্বাস করে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় এ-বিশ্বাসটি অবচেতন অবস্থায় পড়ে থাকে। যে-ব্যক্তি পরবর্তী জীবন সম্পর্কে উদাসীন, উৎকন্ঠিত নয়, সে তার আচরণে এ-কথাই প্রমাণ করে যাচ্ছে যে সে পরকাল বিষয়ে সন্দিহান। তবে ঐকান্তিকভাবে ভেবে দেখলে অত্যন্ত সহজেই এ-বষয়টির নিগূঢ় বাস্তবতা আবিষ্কার সম্ভব হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যদিও পরজগতকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন, কিন্তু তিনি সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এমনসব নিদর্শন ছড়িয়ে দিয়েছেন যাতে ভেবে দেখলে পরকালীন সকল বাস্তবতা আমাদের বুঝতে সহজ হয়। উন্মুক্ত হয়ে যায় অনেক কিছুই। আসলে এ-মহাবিশ্ব একটি বিশাল দর্পণ যাতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে পরবর্তী জগতের আকৃতি-প্রকৃতি। জন্মের দিন আমার শরীরের যে অবস্থা-আয়তন ছিল, বর্তমানে তা বহু পরিবর্তিত হয়ে শক্ত সুঠাম হয়েছে, দৈর্ঘে-প্রস্থে বেড়েছে। আসলে মানুষের শুরু অতি-সামান্য এক পদার্থ থেকে যা মাতৃগর্ভে বড় হয়ে মানুষের আকৃতি ধারণ করে। মাতৃগর্ভের বাইরে এসে পরিপক্কতা অর্জন করে শক্ত সবল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খালি চোখে দেখা যায় না এমন একটি সামান্য পদার্থ থেকে বেড়ে ছ’ফুট লম্বা মানুষে পরিণত হওয়া এমন একটি ঘটনা যা প্রতিদিনই এ-পৃথিবীতে ঘটছে। আমাদের শরীরের অংশসমূহ যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরমাণুর আকারে ভূ-গর্ভে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে তা পুনর্বার মানুষের আকৃতি ধারণ করতে-পারাটা বুঝে না আসার মতো কোনো বিষয় নয়। এ-পৃথিবীতে চলমান প্রতিটি মানুষই মূলতঃ অসংখ্য পরমাণুর সমন্বয় যা একিভূত হয়ে মানুষের রূপ পরিগ্র করার পূর্বে জমিন ও বায়ুমন্ডলের বিশালতায় ছড়িয়ে থাকে বিক্ষিপ্ত আকারে, যা ঐশী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয় মানুষের শরীরের অংশে। আমাদের মৃত্যুর পর শরীরের পরমাণুসমূহ বাতাসে-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে। আবার যখন স্রষ্টার ইচ্ছা হবে একিভূত হবে যেমনটি হয়েছিল প্রথমবার। প্রথমে একবার যে ঘটনা ঘটেছে তার পুনরবৃত্তি ঘটায় আশ্চর্যের কিছু নেই ; থাকার কোনো অর্থও হয় না। জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটা অত্যন্ত সহজ ব্যাপার। এর উদাহরণ জড়জগতে বহু রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে আমরা দেখি, লতাগুল্ম, গাছপালা যৌবনপ্রাপ্ত হয়, পৃথিবীর রূপলাবন্যে বিচিত্র মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আবার শুকনো মৌসুম আসে। যেখানে ছিলো সবুজের মাতামাতি সেখানে দেখা দেয় ধূসরতা। নেতিয়ে পড়ে সবকিছু। শুকিয়ে ঝড়ে যায় বহু লতাগুল্ম। এভাবে একটি জীবন শ্যামলতায় অবগাহন করে আবার ঝরে যায়, মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু পরবর্তী বছর যখন আবার বর্ষা শুরু হয়, বৃষ্টি নেমে আসে, তখন আবার জমিনে প্রাণ ফিরে আসে, জীবিত হয় এতদিন যা ছিল মৃত। শুকনো জমিনে আবারও হিন্দোলিত হয় দ্বিগন্ত-জোড়া সবুজ। মানুষকেও মৃত্যুর পর অনেকটা এভাবেই জীবিত করা হবে পুনর্বার। মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে সন্দেহ এজন্যও জাগে যে, আমরা আমাদের অস্তিত্বটাকে শরীরী অবকাঠামোর আলোকে ভাবি। মনে করি বাইরে চলমান যে শরীর, সেটাই মানুষের মূল বাস্তবতা বা অস্তিত্ব। তাই যখন এই শরীরী খাঁচা ভেঙ্গে পড়ে, পঁচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায় তখন ভাবি সবকিছুর বুঝি অবসান ঘটলো। আমরা দেখি একটা জলজ্যান্ত মানুষ মূহুর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, চিরকালের জন্য চুপ হয়ে যাচ্ছে। চলমান শরীর নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার সমস্ত যোগ্যতা, শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তাকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখে দেয়া হচ্ছে, অথবা কোনো কোনো সমপ্রদায়ের প্রথা অনুযায়ী জ্বালিয়ে ভস্ম করে দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাকে মাটির নিচে সমাহিত করা হচ্ছে, ক’দিন যেতে না যেতেই তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে জমিনের সাথে মিশে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তার শরীরী অস্তিত্ব। একটি জলজ্যান্ত মানুষের এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে। যে মানুষটি এভাবে শেষ হয়ে গেলো সে কীভাবে আবার জীবনে ফিরে যাবে? এ যেন এক কঠিন ধাঁধাঁ। তবে একটু ভেবে দেখলে বুঝতে পারবো যে আমাদের আসল অস্তিত্ব এই শরীরী অস্তিত্ব নয়। আমাদের আসল অস্তিত্ব অভ্যন্তর মানস যা ভাবে, চিন্তা করে, শরীরকে চালায়। যার উপস্থিতি শরীরকে রাখে সজীব-সতেজ-চলমান এবং অনুপস্থিতি তাকে করে মৃত, নিশ্চল। প্রকৃত অর্থে মানুষ বিশেষ কোন শরীরের নাম নয়। মানুষ ওই আত্মার নাম যা শরীরের মধ্যে বিরাজমান থাকে। আর আমরা জানি, শরীর অতি-ক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে গঠিত যাকে জীবকোষ (Living Cell) বলে। মানুষের শরীরে কোষের একই অবস্থান যা একটি বিল্ডিং- এ ইটের। আমাদের শরীরী বিল্ডিং এর এই ইটগুলো, অথবা যাকে পারিভাষিক অর্থে কোষ বলে থাকি আমাদের কাজের সময়, নড়াচড়ার সময়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। খাদ্যের মাধ্যমে আমরা এর ক্ষতিপূরণ করে থাকি। খাদ্য হজম হয়ে বিভিন্ন প্রকার কোষের জন্ম দেয় যা ক্ষয়প্রাপ্ত কোষের জায়গা দখল করে। মানুষের শরীর এভাবে সার্বক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। এ-কাজ প্রতিদিনই ঘটে, এবং কিছুদিন পর সমগ্র শরীর সম্পূর্ণ নতুন শরীরে রূপান্তরিত হয়।

চলবে ……………

সময়: সে তো জীবন

সময়: সে তো জীবন

Time and tide wait for none. সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। বাক্যটি ক্ষুদ্র হলেও ব্যাপক অর্থবোধক। এটি একটি বাস্তব সত্য। মানুষ এতে খুঁজে পায় তার জীবনের মূল্য। এ বাক্যটি মানব জীবনে কেবল আগ্রহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণা জাগায় শুধু তা-ই নয়, বরং এটি একজন মানুষকে দান করে নতুন জীবন। সময়ই তার জীবন। এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ জান্নাতের সুউচ্চ আসনে পৌঁছতে পারে। অপরদিকে এর প্রতি অবহেলা করে সে নিক্ষিপ্ত হয় জাহান্নামের অতল দেশে।

সময় কী ?

বড় বড় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা সময়ের মূলতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা-পর্যলোচনা করেছেন। বিখ্যাত দার্শনিক আবুল আলা বলেন: কাল বলতে আমরা মাত্র তিনটি দিনই বুঝি। গতকাল, আজ ও আগামীকাল। কিন্তু আজ বলতে আমাদের নিকট কিছু আছে কী? এ তো অতীত ও ভবিষ্যতের সংযোগস্থল, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। এর গতি এত দ্রুত যে, একে মোটেও আয়ত্বে রাখা যায় না। অতীতকাল তো পূর্ব থেকেই হাত ছাড়া, আর ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তা নেই। অতএব, মানুষ কিভাবে কাজ করবে? তাকে যে জীবনে অনেক বড় হতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে শত সহস্র বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য পানে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কাজে লাগানো অত্যাবশ্যক।

সময়ের নিজস্ব বক্তব্য :

আল্লামা সুয়ূতী রহ. “জামউল জাওয়ামে” নামক গ্রন্থে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

প্রতিনিয়ত সূর্যোদয়ের সাথে সাথে “দিন” এই বলে ঘোষণা করতে থাকে যে, যদি কেউ কোন ভাল কাজ করতে চায়, তাহলে যেন সে তা করে নেয়। কেননা আমি কিন্তু আর ফিরে আসবো না। আমি ধনী-দরিদ্র, ফকির-মিসকীন, রাজা-প্রজা সকলের জন্য সমান। আমি বড় নিষ্ঠুর। আমি কারো প্রতি সদয় ব্যবহার করতে শিখিনি। তবে আমার সাথে যে সদ্ব্যবহার করবে সে কখনও বঞ্চিত হবে না।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সময় :

পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালনা করে আসছেন। সূর্য প্রতিনিয়ত একটি নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হয়। আবার নির্দিষ্ট সময়ে অস্ত যায়। সময়ের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে একাধিক স্থানে দিবা-রাত্রির কসম করেছেন। কোথাও সকালের, কোথাও চাশতের সময়ের, আরার কোথাও আসরের সময়ের। শরীয়তের প্রতিটি হুকুম আহকামের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেও দেখতে পাই, ইসলাম প্রতিটি কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। নামাজ, রোজা, হজ ,যাকাত ইত্যাদি বড় বড় আহকাম ছাড়াও অধিকাংশ বিষয়সমূহ সময়ের মালায় গাঁথা। এরশাদ হচ্ছে :

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا ﴿103﴾

নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফরজ করা হয়েছে। (সূরা নিসা : ১০৩)

হাদীসের আলোকে সময় :

সময়ের মর্যাদা, জীবনের গুরুত্ব, উহার অনুভূতি ও গঠনমূলক জীবন গড়ার প্রতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় বিচিত্র ভঙ্গিমায় ইঙ্গিত করেছেন। প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার আবু দাউদ রহ. স্বীয় কিতাবে ৪৮০০ (চার হাজার আটশত) হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন। তা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রমাণস্বরূপ চারটি হাদিস নির্বাচন করেছেন। তার মধ্যে একটি এই,

من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه

কোন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করা।

অন্য এক হাদীসে এরশাদ হচ্ছে –

اغتنم خمساً قبل خمس، حياتك قبل موتك، وشبابك قبل هرمك، وصحتك قبل مرضك، وغناك قبل فقرك، فراغك قبل شغلك.

পাঁচটি বস্তু আসার পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করো। মৃত্যুতর পূর্বে জীবনকে, বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে, অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে, দরিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে এবং ব্যস্ততার পূর্বে অবসরতাকে।

ইমাম বুখারী রহ. রেকাক অধ্যায়ে ও ইমাম তিরমিজি রহ. যুহদ অধ্যায়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ উল্লেখ করেছেন :

দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোকাপ্রাপ্ত। একটি হলো সুস্থতা আর অপরটি অবসরতা। সুস্থার মর্যাদা তখনই বুঝা যায়, যখন অসুস্থতার পাহাড় মাথায় চেপে বসে। দ্বিতীয় প্রকার নেয়ামতের কথা ঐ সকল লোকের নিকট জিজ্ঞেস কর, যারা সামান্য সময় অবসর পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল।

আবু বকর রা. এই দুআ করতেন: হে আল্লাহ আমাদেরকে কঠিন বিপদে ঠেলে দিও না, আর পাকড়াও করো না অসতর্ক অবস্থায়, আর আমাদেরকে অমনোযোগীদের অন্তর্ভূক্ত করবেন না।

ওমর রা. দুআ করতেন : হে মাবুদ, আমরা সময়ের বরকত ও কল্যাণময় অংশটুকু লাভের আবেদন করছি। আলী রা. বলতেন : চলমান দিনগুলো তোমাদের জন্য পুস্তিকা বা আমলনামা স্বরূপ। তাই উত্তম আমল দ্বারা উহাকে স্থায়ী করে রাখো। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতেন, আমি ঐ দিনটির চেয়ে অন্য কোন বস্তুর উপর অধিক অনুতপ্ত হই না, যে দিনটি আমার জীবন থেকে হ্রাস পেল অথচ তাতে কোন নেক আমল যোগ হলো না।

সময়ই জীবন :

আরবীতে একটি প্রবাদ আছে –

الوقت هو الحياة فلا تقتلوه

সময় সে তো জীবন, সুতরাং তাকে হত্যা করো না।

মানুষের চিন্তা করা উচিৎ যে, এই দুনিয়ার জীবন কি? এ তো জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে অনিশ্চিত সামান্য বিরতি। স্বর্ণ-রৌপ্য একবার হাতছাড়া হলে আবার তা ফিরে পাওয়া সম্ভব। এমনকি পূর্বের তুলনায় অধিক পাওয়াও সম্ভব। কিস্তু যে মুহূর্তটুকু একবার অতিবাহিত হয়ে যায়, তা কি কোন অবস্থায় কোন মূল্যে ফিরে আসে? অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে চিন্তা করুন সময় কি স্বর্ণ থেকে অধিক মূল্যবান নয়? নয় কি হীরকের চেয়ে অধিক দামী? ইহা কি দুনিয়ার সকল বস্তু থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়?

আগামীকাল শব্দটি মস্তবর ধোকা!

মানুষ সময় নষ্ট করে অনুতপ্ত হতো। কিন্তু এখানে তাকে একটি বিষয় অনুতপ্ত হতে দেয় না। তা হলো “আগামীকাল”। এ শব্দটি উচ্চারণ করার চেয়ে বড় অপরাধ, নির্ভীকতা, অসতর্কতা ও বোকামী আর কিছুই নেই। একটি লোকের জীবন অকার্যকর ও নষ্ট হওয়ার জন্য এই একটি শব্দই যথেষ্ট। সময় একবার মরে গেলে পরবর্তীতে তার কবরের উপর অশ্রুবর্ষণ ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। দুনিয়ার সকল মানুষ মিলে আর্তনাদ করলেও সে সময় আর ফিরে আসবে না। তাই মানুষকে “আজ” শব্দের দিকে ফিরে আসতে হবে। আজই করছি বলে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। জ্ঞানীদের রেজিষ্ট্রিতে আগামীকাল বলতে কোন শব্দ নেই।

মুসলিম মহামনীষীদের সময়ের মূল্যায়ন:

ইতিহাসের পাতাকে যারা অলংকৃত করেছেন, হয়ে আছেন যারা স্বরণীয় ও বরণীয়, তারা সকলেই সময়ের মূল্য হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। প্রবন্ধের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাদের সকলের কথা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এখানে মাত্র কয়েকজন মনীষীর আলোচনা করাই যথেষ্ট মনে করছি, বুদ্ধিমানদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।

  • ১. মারুফ কারখী রহ. :

একবার তার দরবারে কিছু লোকজন এসে দীর্ঘক্ষণ বিলম্ব করল। বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, সূর্য চালনাকারী ফেরেশতা কখনও ক্লান্ত হন না। অতএব, বল দেখি তোমরা কখন উঠবে?

  • ২. দাউদ তায়ী রহ. :

তিনি রুটির পরিবর্তে ছাতু খেতেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রুটি চিবানো ও ছাতু খাওয়ার মধ্যে এই পরিমাণ সময়ের ব্যবধান, যাতে ৫০ টি আয়াত তেলাওয়াত করা যায়।

  • ৩. মুহাম্মদ ইবনে ইসাঈল বুখারী রহ. :

হাদীস শাস্ত্রের ইমাম বুখারী রহ. ধরাপৃষ্ঠে আগমন করে যখন চোখ খুললেন, তখন সর্বত্র ইসলামী জ্ঞানের চর্চা চলছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জমানা এই মাত্র শেষ হল, সাহাবায়ে কেরামের সংশ্রবে লালিত মহাপুরুষগণ তখনও জীবিত ছিলেন। জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে সফরের লাঠি হস্তে ধারণ করে রওয়ানা হলেন তৎকালীন মুহাদ্দিসগণের নিকট বিভিন্ন শহরে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাব করে করে কাজে লাগিয়েছেন। কখনো কারো গীবত করেননি। তিনি বলেন : স্মৃতিশক্তি বর্ধনের একমাত্র মাধ্যম হলো -অটল, অবিচল ও একাগ্রতার সাথে পড়াশুনায় নমোনিবেশ করা। তিনি এক লক্ষ সহীহ হাদীস ও দুই লক্ষ গাইরে সহীহ হাদীস মুখস্ত করেছেন।

  • ৪. নাহুবিদ খলীল রহ.

তিনি ছিলেন ইলমে আরুযের প্রবর্তক। তিনি বলতেন, আমার নিকট সর্বাপেক্ষা অসহ্যকর ঐ সময়টুকু, যে সময় আমি খাওয়া দাওয়া করি।

  • ৫. ইমাম মুহাম্মদ রহ. :

তিনি তার ইলমী একাগ্রতার কারণে নিজের পোশাকের কোন খবর থাকত না। পরিবারের লোকজন ময়লা কাপড় ধৌত করে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন খবর থাকত না। একাগ্রতার কারণে কখনো কখনো সালামের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে দোয়া করে দিতেন। তার সাথে দুনিয়াবি কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। ঘরে একটি মোরগ ছিল, সেটির ডাকে পড়ালেখায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে তিনি সেটিকে ধরে জবাই করে দিলেন।

একই দিন নাহুবিদ কাসায়ী ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর ইন্তেকাল হলে বাদশা হারুনুর রশীদ বললেন : “আজ ভাষা ও ফিকাহ শাস্ত্র দাফন করে ফেললাম”।

শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. দীর্ঘদিন ধরে মাত্র এক বেলা খানা খেতেন।

মাওলানা এজাজ আলী রহ. ক্লাশ শুরু হওয়ার ৫/১০ মিনিট পূর্বে কামরা থেকে বের হয়ে যেতেন। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরি রহ. মুমূর্ষ অবস্থায়ও কিতাব অধ্যায়ন করতেন। এ সকল মনীষীগণ সময় সংরক্ষণের উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

অমুসলিম মনীষীদের সময়ের মূল্যায়ন:

পৃথিবীর বুকে যারা বড় হয়েছেন, তারা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানতেন। বিদ্যাসাগর, আশুতোশ, রবীন্দ্রনাথ, আব্রাহাম লিংকন প্রমূখ মনীষীগণ সময়ের প্রতি একটুও অবহেলা করতেন না বলেই জীবনে অফুরন্ত কর্ম-কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন।

ষ্টিফেনসন ইঞ্জিনে কয়লা দিতেন আর অংক কষতেন।

ওয়াট দোকানে বসে বেচাকেনা করতেন আর রসায়ন শাস্র ও জার্মানী ভাষা শিক্ষা করতেন। সময়ের অপব্যবহার করতেন না বলেই তিনি উভয় বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ওয়াশিংটনের সেক্রেটারী একবার কিছু সময় দেরি করে এসে এই বলে ওজর পেশ করলেন যে, আমার ঘড়ি স্লো ছিল। ওয়াশিংটন বললেন: হয়ত তুমি ঘড়ি পরিবর্তন করবে, নতুবা আমি সেক্রেটারী পরিবর্তন করব।

ফিসাগোরিসের নিকট জিজ্ঞেস করা হলো সময় কি? উত্তরে তিনি বললেন: সময়ই এ দুনিয়ার আত্মা।

সময়ের আচলেই সুপ্ত আছে জাতীয় উন্নতির গূঢ় রহস্য:

সময় ব্যক্তি ও জাতির প্রধান পুজি, সময়ের সদ্ব্যবহার করেই একটি জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে পারে। অধুনা পাশ্চাত্য জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চুঁড়ায় আরোহন করেছে বলে সারা দুনিয়ার মানুষ স্বীকৃতি দেয়। এ স্বীকৃতি তারা এমনিতেই ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি। এর জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে –

وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (سورة النجم)

আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। (সূরা নজম : ৩৯)

অমুসলিমরা সময়ের যেভাবে মূল্যায়ন করেছে এর চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করা উচিৎ ছিল মুসলমানদের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলানরা তাদের বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, গান-বাদ্য, মিউজিক ইত্যাদি গর্হিত কার্যকলাপ মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছে। আর সময়ের মূল্যায়নের মত যে সম্পদ তাদের কাছে রয়েছে তা কাজে লাগাচ্ছে না।

সময় আল্লাহর দেয়া আমানত। যে জাতি সময়ের মূল্য বুঝে না, মূল্যবান সময়কে হেলায় উড়িয়ে দেয় সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। সময়ের মূল্যয়ান মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানদের শান, মর্যাদা ও বড়ত্ব সাড়া দুনিয়াকে ছেয়ে রেখেছিল। উন্নতির চরম শিখরে আরোহিত ছিল মুসলমান জাতি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত সর্বজন স্বীকৃত একটি মত এই ছিল, যে কাজটি অনর্থক, চাই সেটি যতই বিস্ময়কর হোক না কেন সেটি জীবনের পূর্ণতা বয়ে আনতে পারে না। বরং তা ঠেলে দেয় ধ্বংসের মুখে।

সময়ের অপচয় আত্মহত্যার নামান্তর :

সময় নষ্ট করা এক প্রকার আত্মহত্যা। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, আত্মহত্যা মানুষকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত করে দেয়। আর সময়ের অপব্যবহার একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বানিয়ে রাখে। যে মিনিট, ঘন্টা ও দিনটি অনর্থক নষ্ট হয়ে যায়, যদি মানুষ তার হিসাব করত, তাহলে উহার সমষ্টি হয়ে দাড়াত – মাস, বছর ও যুগ ।

যদি কাউকে বলা হয় যে, তোমার জীবনের ৫/১০ বছর হ্রাস করা হলো, তাহলে নিশ্চিত সে ব্যাবুল ও মর্মাহত হবে, কিন্তু তার জীবনের একটি বিরাট অংশ যে অকারণে নষ্ট করছে, তার প্রতি সে একটুও ভ্রুক্ষেপ করছে না।

মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি হওয়ার কারণে নেপালিয়নের মত অজেয় সেনাপতিকেও পরাজিত হতে হয়েছে। যথা সময়ে কর্তব্য আদায় না করায় ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে হয়েছিল।

তুমি খুশি থাক আর চিন্তিত থাক, কষ্ট ও পেরেশিন থেকে বাঁচার একমাত্র মাধ্যম হলো ব্যস্ত থাকা। সামান্য সময়ের জন্যেও অবসর না থাকা। অলসতা মানুষকে এমনিভাবে খেয়ে ফেলে যেমনিভাবে খেয়ে ফেলে মরিচিকা লৌহ দন্ডকে।

অতএব, সময়কে কাজে লাগিয়ে মানুষ হয়ত জ্ঞান বিজ্ঞানের উচু শিখরে আরোহন করবে, নতুবা অজ্ঞতা ও বর্বরতার অন্ধকার তাকে কোথা হতে কোথায় নিয়ে যাবে তা টের পাওয়াও যাবে না।

সময় সংরক্ষণের কতিপয় মূলনীতি:

সময় মানব জীবনের মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো মানুষ উহা যে পরিমাণ নির্ভীকতা, নিষ্ঠুরতা ও অবহেলা করে নষ্ট করে দেয়, তার আয়ত্বাধীন অন্য কোন জিনিষ এমনিভাবে নষ্ট করে না। এদিকে লক্ষ্য করে সময়ের সঠিক ব্যবহারের তিনটি মূলনীতি রচনা করা হল।

  • ১. রুটিন :

দিবারাত্রির প্রতিটি কাজের জন্য একটি নিদিষ্ট সময় নির্ধারণ করার নাম রুটিন। ক্ষণিকের জীবনে মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় তাকে জীবন নৌকার প্রতিটি ঘাটি। সকল কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করা তখনই সম্ভব ও সহজ হবে, যখন সে পূর্ব থেকেই একটি রুটিন তৈরি করে নেবে।

তবে রুটিন করতে গিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। যে কাজ যে সময় সম্পাদন করা অধিক উপযোগী সে কাজ তখনই করতে হবে। উদাহরণত : যে সকল কাজে উদ্যমতা ও সুস্থ মস্তিস্ক প্রয়োজন সে সকল কাজের সময়সূচী এমন সময় রাখতে হবে, যখন মস্তিস্ক সুস্থ, সবল ও ঠান্ডা থাকে, এবং মানব প্রকৃতিতে যৌবনতা অটুট থাকে। আর সে সময়টি হলো সকাল। প্রভাতে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও যোগ্যতা সজীবতায় আচ্ছন্ন থাকে। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন –

اللهم بارك لأمتي في بكورها. (رواه الترمذي)

হে আল্লাহ তুমি আমার উম্মতের জন্য প্রভাতে বরকত দান কর। (তিরমিজি)

সময়সূচী নির্ধারিত থাকলে কোন সময় কি দায়িত্ব সে সম্পর্কে চিন্তা করে সময় নষ্ট করতে হয় না। এমনিতেই তার স্মরণে এসে যায়।

  • ২. সুস্থতা:

সুস্থতা মানব জীবনের একটা বড় নেয়ামত। মন মস্তিস্কের সুস্থতা দেহের সুস্থতার উপর নির্ভরশীল। দেহ ও মন আমাদের কাছে খোদাপ্রদত্ত আমানত। তাই এ আমানতের হক আদায় করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

إن لربك عليك حقا ، ولنفسك عليك حقا ، ولأهلك عليك حقا ، فأعط كل ذي حق حقه، (رواه البخاري)

যেমনি তোমার উপর তোমার প্রভূর হক রয়েছে, তেমনি তোমার দেহ ও পরিবার-পরিজনের হকও তোমার উপর রয়েছে। অতএব, প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য আদায় করে দাও।

খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. একবার আরাম করছিলেন। এ সময় তার এক পুত্র এসে বলল, আব্বা আপনি শুয়ে আছেন; অথচ লোকজন আপনার অপেক্ষায় (দরজায়) দাড়িয়ে আছে? তিনি বললেন: হে বৎস! দেহ আমার বাহনস্বরূপ, আমার ভয় হচ্ছে যদি মাত্রাতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেই তাহলে তা (অপারগ হয়ে) বসে পড়বে।

যথা সময়ে সুষ্ঠু সুন্দর কার্য সম্পাদন করতে হলে শারীরিক সুস্থতা সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি রাখা একটি প্রকৃতিগত বিষয়। কাজ অল্প হোক, কিন্তু তা নিয়মিত হওয়া চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

وإن أحب الأعمال إلى الله ما دام وإن قل، (رواه البخاري)

আল্লাহর কাছে ঐ আমল সবচেয়ে প্রিয় যা অল্প হলেও নিয়মিত করা হয়।

  • ৩. আত্মসমালোচনা:

কি ব্যয় হলো আর কি পাওয়া গেল? কতটুকু উপার্জিত হল, আর কতটুকু লোকসান হলো? এটা নির্ণয় করার কষ্টিপাথরের অপর নাম ইহতেসাব বা আত্মসমালোচনা। এভাবে কড়ায় গন্ডায় হিসেব লাগালে অন্তরে অনুশোচনার সৃষ্টি হয়। এবং ভবিষ্যতে সময় নষ্ট না করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:

ঘড়ি টিক টিক করে অবিরাম গতিতে চলছে আর বলছে তোমরা তোমাদের কর্তব্য-কর্ম সম্পন্ন কর, উপকার তেমাদেরই হবে। তাই সময়ের নিকট থেকে আমাদের পাওনা কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নিতে হবে। এক মুহূর্ত সময়ও যেন বৃথা ক্ষয় না হয় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। কবি গুরু বলেছেন :

“কাল স্রোতে ভেসে যায় জীবন-যৌবন, ধন-মান। কিন্তু যা ভেসে যায় না তা হলো কীর্তি”।

যে সকল সনামধন্য পুরুষগণের কীর্তি ও প্রতিভা দেখে আমরা মুগ্ধ ও অবিভূত, তাদের কীর্তি প্রতিষ্ঠার মূলে আছে সময়ানুবর্তিতা। সময়ানুবর্তিতাই জীবনে সাফল্য লাভের চাবিকাঠি।

বিজ্ঞান ও কুরআনে মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর

বিজ্ঞান ও কুরআনে মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর
অনুবাদ : মুহাম্মদ ইসমাইল জাবীহুল্লাহ

কুরআন মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর নিয়ে আলোচনা করেছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:

অর্থাৎ, আর আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির সারাংশ থেকে। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরুপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপিন্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে একটি নতুনরুপে দাড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টি কর্তা কতই না কল্যাণময়। (সূরা মু’মিনুন: ১২-১৪)

আরবী “ الْعَلَقَةَ ” (আলাকা) শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে।

  • ১. জোক
  • ২. সংযুক্ত জিনিস
  • ৩. রক্তপিন্ড

আমরা যদি জোককে গর্ভস্থ সন্তানের সাথে মেলাতে যাই তাহলে,আমরা দু’টির মধ্যে সামঞ্জস্য দেখতে পাই। নিচের ১ নং ছবিতে সেটা স্পষ্ট। (মানবদেহের প্রবৃদ্ধি-মুর ও পারসাউড, ৫ম সংস্করণ, পৃষ্ঠা-৮) এ অবস্থায় জোক যেমন অন্যের রক্ত খায় তেমনি উক্ত ভ্রুন তার মায়ের রক্ত খেয়ে বেচে থাকে। (কুরআন-হাদীসের আলোকে মানব দেহের প্রবৃদ্ধি –মুর ও অন্যান্য পৃষ্ঠা-৩৬)

দ্বিতীয় অর্থের আলোকে আমরা যদি তাকে “সংযুক্ত জিনিস” অর্থে নিই তাহলে দেখতে পাই যে,গর্ভস্থ ভ্রুন মায়ের গর্ভের সাথে লেপ্টে আছে। (২নং ও ৩ নং চিত্র দ্রষ্টব্য)

তৃতীয় অর্থের আলোকে আমরা উক্ত শব্দের “রক্তপিন্ড” অর্থ গ্রহণ করলে দেখতে পাব যে, তার বাহ্যিক অবস্থা ও তার সংরক্ষিত খাচা (আবরণ) রক্ত পিন্ডের মতই দেখায়। উক্ত অবস্থায় এখানে প্রচুর পরিমাণ রক্ত বর্তমান থাকে।(কুরআন-হাদীসের আলোকে মানব দেহের প্রবৃদ্ধি –মুর ও অন্যান্য পৃষ্ঠা-৩৭ ও ৩৮) (৪র্থ চিত্র দ্রষ্টব্য)

এতদসত্বেও তিন সপ্তাহ পর্যন্ত এই রক্ত সঞ্চালিত হয় না। (মানবদেহের প্রবৃদ্ধি-মুর ও পারসাউড, ৫ম সংস্করণ,পৃষ্ঠা-৬৫) সুতরাং, বলা যায়- এ অবস্থা রক্তপিন্ডের মতই।

চিত্র-১

চিত্রে জোক ও মানব ভ্রুনকে একই রকম দেখা যাচ্ছে।

(জোকের ছবিটি কুরআন-হাদীসের আলোকে মানব দেহের প্রবৃদ্ধি –মুর ও অন্যান্য, গ্রন্থের ৩৭ নং পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে যা হিলমান ও অন্যান্যদের প্রণিত “পুর্ণাংগ মৌলিক জীব” গ্রন্থ থেকে সংশোধিত হয়েছে এবং মানব দেহের চিত্রটি “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৫ম সংস্করণ, ৭৩ পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে)

চিত্র-২

 


এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে উক্ত ভ্রুনটি মায়ের গর্ভের সাথে লেপ্টে রয়েছে। (চিত্রটি “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৫ম সংস্করণ, ৬৬ পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে)

চিত্র-৩


এ চিত্রে দেখা যাচ্ছে B চিহ্নিত ভ্রুনটি মাতৃগর্ভে লেপ্টে আছে। এর বয়স মাত্র ১৫ দিন। আয়তন-০.৬ মি.মি. (চিত্রটি “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৩য় সংস্করণ, ৬৬ পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে যা সংকলিত হয়েছে লেসন এন্ড লেসনের হিস্টোলজী গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে)

চিত্র-৪


এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভ্রুন ও তার আবরণকে প্রচুর রক্ত থাকার কারণে রক্ত পিন্ডের মতই দেখাচ্ছে। (চিত্রটি “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৫ম সংস্করণ, ৬৫ পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে)

উক্ত “আলাকা” শব্দের তিনটি অর্থের সাথেই ভ্রুনের বিভিন্ন স্তরের গুণাবলী হুবহু মিলে যাচ্ছে।

কুরআন মাজীদের আয়াতে উল্লেখিত ভ্রুনের ২য় স্তর হল-“ مُضْغَةً” (মুদগাহ)। مُضْغَةً হল চর্বিত দ্রব্য। যদি কেউ ১ টুকরা লোবান নিয়ে দাতে চর্বন করার পর তাকে ভ্রুনের সাথে তুলনা করতে যায় তাহলে, দেখতে পাবে দাতে চর্বন করার পর উক্ত দ্রব্য যেমন দেখায় সেটার সাথে ভ্রুনের হুবহু মিল রয়েছে। (মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৫ম সংস্করণ, পৃষ্ঠা-৮) (৫ ও ৬ নং চিত্র দ্রষ্টব্য)

আজ বিজ্ঞানীরা মাইক্রোস্কোপসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে এগুলো আবিস্কার করেছে কুরআন নাযিল হওয়ার দেড় হাজার বছর পর। তাহলে, এত কিছু জানা মুহাম্মদ(সাঃ)এর জন্য কেমন করে সম্ভব ঐ সময়ে যখন এ সবের কিছুই আবিস্কৃত হয়নি?

চিত্র-৫


এই চিত্রটি ২৮ দিন বয়সের (মুদগাহ স্তরের) ভ্রুনের চিত্র। উক্ত চিত্রটি দাত দ্বারা চর্বিত লোবানের মতই দেখাচ্ছে।(চিত্রটি “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি, ৫ম সংস্করণ, ৭২ পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে)

চিত্র-৬


চিত্রে চর্বিত লোবান ও ভ্রুনের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। আমরা উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখতে পাই।উপরের চিত্র A তে আমরা ভ্রুনের গায়ে দাতের মত চিহ্ন এবং চিত্র B তে চর্বিত লোবান দেখতে পাচ্ছি।

১৬৭৭ খৃষ্টাব্দে হাম ও লিউয়েনহোক নামক দুই বিজ্ঞানী মাইক্রোস্কোপ দিয়ে মানুষের বীর্যের মধ্যে জীবনের অস্তিত্ব (Spermatozoma) খুজে পান রাসুল(সাঃ) এর যুগের এক সহস্রাধিক বছর পর। এ দুইজন বিজ্ঞানীই আগে ভূলক্রমে বিশ্বাস করেছিলেন যে, মানুষের বীর্যের মধ্যে উক্ত কোষের রয়েছে অতি সামান্য প্রক্রিয়া। নারীর ডিম্বানুতে আসার পর তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। (মানবদেহের প্রবৃদ্ধি-মুর ও পারসাউড, ৫ম সংস্করণ, পৃষ্ঠা-৯)

আর প্রফেসর কেইথ এল. মুর বিশ্বের একজন প্রসিদ্ধ ভ্রুন বিজ্ঞানী এবং “মানবদেহের প্রবৃদ্ধি” গ্রন্থের লেখক;যা বিশ্বের আটটি ভাষায় ছাপা হয়েছে।এটা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বই।এ বইটি আমেরিকার বিশিষ্ট্য একটি গবেষণা বোর্ড কর্তৃক কোন একক লেখকের শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কেইথ এল.মুর হচ্ছেন কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরবিদ্যা ও কোষ বিভাগের প্রফসর।তিনি ওখানে মেডিক্যাল ডিপার্টমেন্টের অধীনে মৌলিক বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী ডীন হিসেবে এবং আট বছর শরীরবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি কানাডায় শরীরবিদ্যা বিভাগের উপর কৃতিত্বপূর্ণ স্বাক্ষর রাখার জন্য কানাডার শরীরবিদ্যা বোর্ডের পক্ষ থেকে J.C.B পুরস্কার পেয়েছিলেন।এছাড়া তিনি “কানাডিয়ান এন্ড এমেরিকান এসোসিয়শন এবং দি কাউন্সিল অফ দি ইউনিয়ন অফ বাইয়োলজিকাল সাইন্স” সহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৮১ সালে সউদীর দাম্মামে অনুষ্ঠিত এক মেডিক্যাল সেমিনারে তিনি বলেন:আমার জন্য এটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল যে, আমি মানব শরীরের প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে ভালোভাবে জানতে কুরআন শরীফের সহায়তা নিতাম।আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে,এ বিষয়গুলো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মুহাম্মদ (সাঃ)এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।কেননা,এ সকল বিষয়ের প্রায় সব কিছুই তার ইন্তেকালের কয়েকশত বছর পর আবিষ্কৃত হয়েছে।এ ব্যাপারটি প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ (সাঃ)আল্লাহ তায়ালার সত্য নবী।(“হাজিহী হিয়াল হাকিকাহ তথা এটাই সত্য” নামক ভিডিও ডকুমেন্টারী থেকে সংগৃহীত)

এ সময় তাকে প্রশ্ন করা হল- তাহলে কি এর অর্থ দাঁড়ায়-কুরআন আল্লাহ তায়ালার বাণী? তিনি জবাব দিলেন:”আমি এ কথা মেনে নিতে কুন্ঠাবোধ করি না।

প্রফেসর মুর একটি কনফারেন্সে বলেছিলেন:”কুরআন ও হাদীসে মানবভ্রুনের বৃদ্ধি প্রক্রিয়ার সময়কার বিভিন্ন স্তরকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিভিন্ন নামে ভাগ করেছে।“এর পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত চমৎকার ও বিস্তৃত অর্থ নির্দেশ করে থাকে।যা আধুনিক শরীর বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কারের সাথে সংগতিপূর্ণ।বিগত চার বছরে সপ্তম শতাব্দীতে নাযিলকৃত কুরআন ও হাদীসের আলোকে মানবভ্রুন নিয়ে গবেষণা করে বিস্ময়কর ফলাফল পাওয়া গেছে।

এরিস্টোটল ভ্রুন বিদ্যার জনক হওয়া সত্বেও খৃষ্টপুর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে মুরগীর ডিমের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন যে,মুরগীর বাচ্চার সৃষ্টি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় কয়েকটি স্তরে।তবে, তিনি স্তরগুলো সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছুই জানাতে পারেন নি।ধরে নেয়া যায় যে,কুরআন নাযিলের সময় খুব কমই জানা ছিল ভ্রুনের স্তরগুলো সম্বন্ধে;যা সপ্তম শতাব্দীতে বিজ্ঞানের কোন কিছুর উপর নির্ভর করে তা জানার সুযোগ ছিল না।

এখানে এসে শুধু একটি মাত্র নির্ভরযোগ্য ফলাফলে আসা যায় যে, এসমস্ত জ্ঞান মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে এসেছে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। কারণ, তিনি ছিলেন নিরক্ষর তার এগুলো জানার কথা ছিল না। এছাড়া অন্য কোথাও থেকে তার মত নিরক্ষর লোককে যে ট্রেনিং দেয়া হবে তাও ছিল অসম্ভব।

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


মুরগি ও ডিমের বিস্ময়কর রহস্য

সৃষ্টির অগণিত রহস্যের মধ্যে আমাদের গৃহপালিত পক্ষীকুলের একটি হল মোরগ মুরগি। তাকিয়ে দেখুন তাদের জন্ম রহস্য এবং চলাফেরার মধ্যে কত আশ্চর্যজনক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিষয় রয়েছে। মোরগ-মুরগি ভোর বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই তারা তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের সন্ধানে আবর্জনার স্তূপের দিকে এগিয়ে যায় এবং সেখান থেকে তারা পছন্দ ও রুচি-মত খাদ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তাদের বিচিত্র পছন্দ থেকে পোকামাকড়, সাপের বাচ্চা, বিচ্ছু, কীটপতঙ্গ,ঘাস, ফল-ফুল, কাচ পাথর বালি সোনা-চাঁদি-কিছুই বাদ পড়ে না। তাদের পাকস্থলী আল্লাহ তা‘আলার নির্মিত এমনই এক অভিনব কারখানা যেখানে পড়ার সাথে সাথে সকল কিছু হজম বা আত্মস্থ হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় উপাদান তাদের শরীরে পৌঁছে যাওয়ার পর বর্জ্য-পদার্থ মল আকারে বেরিয়ে যায়। এমন পাকস্থলী বাঘ-ভল্লুক হাতি-ঘোড়া, এমনকি মানুষেরও নেই, যেখানে লোহা-কাচ পাথর, শাক-সবজি, ঘাস-পাতা, তরিতরকারি, গোশত, মাছ-সবকিছুই হজম হয়ে যায়। যা তার শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রকৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, রাব্বুল আলামিন তার মধ্যে এমন বীজ রেখে দিয়েছেন, যার ফলে এমনি আরো মুরগি পয়দা হবে এবং দুনিয়ায় তাদের বংশ বিস্তার হতে থাকবে। এইভাবে, প্রতিনিয়তই আমরা দেখতে পাব যে প্রকৃতির মধ্যে অবস্থিত জীব-জন্তু ও পক্ষীকুলকে আল্লাহ তা‘আলা ভিন্ন ধরনের ওহি বা ইলহাম দ্বারা তাদের কার্যক্রম ও খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। রাব্বুল আলামিনের ইলহামী ইশারাতে মুরগি জমিনের অভ্যন্তরে ও উপরিভাগের অসংখ্য জিনিস থেকে ডিম দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মালমসলা সংগ্রহ করে নেয়। কিন্তু যখন ডিম দেয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তখন আল্লাহপাক তাকে গোপন ওহির মাধ্যমে নির্দেশ দেন : এখন তার এতসব খাদ্য দরকার নেই, এতদিন ডিমের খোলস শক্ত বানানোর জন্য নানাবিধ খাদ্যসহ ওইসব ধাতব দ্রব্য প্রয়োজন ছিল। এখন ডিম দেয়া বন্ধ, কাজেই ঐগুলি আর খেয়ো না এবং প্রজননের জন্য এখন নর ও মাদির মিলনের দরকার নেই। এবার একুশ দিনের জন্য বসে যাও, ডিমগুলি তা দিতে থাক। এ জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে যতটুকু প্রয়োজন আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে ততটুকু খাদ্য গ্রহণের জন্য দিনে একবার বের হবে। কতটুকু তাপ কত সময় ধরে দিতে হবে সে বিষয়েও তাকে ইলহামের মাধ্যমে জানানো হয়। তাই সে প্রথম সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বেরিয়ে কিছু খাবার খেয়ে আবার গিয়ে বসে। দ্বিতীয় সপ্তাহে তার বের হওয়ার সময় আরও কমিয়ে দেওয়া হয় এবং তৃতীয় সপ্তাহে তাপ আরও দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখার প্রয়োজনে ডিম থেকে উঠে আসা আরও কমিয়ে দেয়া হয়। শুধু যে ডিমের তাপ সংরক্ষিত রাখার জন্য তার বসে থাকতে হয়, তা নয়, বরং ডিমগুলি মাঝে মাঝে নাড়তে হয়। নেড়েচেড়ে তার সকল দিকের পরিচর্যা সুসমঞ্জসভাবে করা লাগে। এ বিষয়েও তাকে গায়েবি নির্দেশ দেয়া হয়। একুশ দিন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ডিমের মধ্যে বাচ্চার গঠন যখন পূর্ণ হয়ে যায় তখন গায়েবি নির্দেশ আসে : এখন আর ডিম নাড়াচাড়া নয়, এখন দুনিয়ার জীবনে পদার্পণ করার জন্য বাচ্চা প্রস্তুত, তার দেহ অত্যন্ত নাজুক ; অতএব সে নিজে নিজে চেষ্টা করে শক্ত খোলটি ভেঙে ফেলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবে। সুতরাং সবর করতে হবে, যখন তার কানে হালকা হালকা মনোরম আওয়াজ আসতে থাকে। এ সময়ে বাচ্চাকে দেখার জন্য মুরগিটি অস্থির হয়ে উঠে। এজন্য সে ডিমের উপর বার বার ঠোকর দিতে থাকে। তখন তাকে সতর্ক করার জন্য তার কানে গায়েবি শব্দ বেসে আসে : হে নাদান মুরগি, তোর সামান্য ভুলের কারণে ডিমের মধ্যে এতদিন ধরে লালিত বাচ্চাটি মারা যেতে পারে। তুই যদি তোর চঞ্চু দিয়ে ঠোকর মেরে বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি বের করার চেষ্টা করিস সেই আঘাত বা চাপে বাচ্চাটা মারা যেতে পারে। সুতরাং মুরগির কর্তব্য হচ্ছে, বাচ্চা নিজে নিজেই খোল ভেঙে বেরিয়ে আসুক-তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকা। গায়েবের জগতে আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালন, রহমত এবং হেদায়েত দানের কাজ একই সাথে চলছে। এখন আসুন, আমরা বুঝতে চেষ্টা করি কেমন করে অদৃশ্য জগৎ থেকে কীভাবে ডিমের মধ্যে প্রাণ সৃষ্টি সম্ভব হয়। অতি দুর্বল নবজাতক মুরগি বা মুরগির বাচ্চা কঠিন একটি পরদা ও তার উপরের শক্ত খোলের মধ্যে কীভাবে প্রাণ পেল, কীভাবে বন্দী জীবন যাপন করল, কীভাবে পেল পরদা ও খোলের জিন্দানখানা ভেঙে দুনিয়াতে আসার সামর্থ্য ! যে পরদা ও খোলের মধ্যে এতদিন সে বাস করল, সেখানে না ছিল চোখ খোলার কোন উপায়, না বাহু বা পাখনা মেলার জায়গা। সেখানে সে না পা বিস্তার করতে পারে, আর না বাহ্যিক জগতের সাথে তার কোন সম্পর্ক গড়ে উঠে যার ফলে বাইরের কোন সাহায্য পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব। এ সময় তার মালিক, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহ তা‘আলাই তার একমাত্র সাহায্যকারী এবং ত্রাণকর্তা, আর অবশ্যই তার জীবনশিরা বা শাহ্‌রগ থেকেও তিনি তার সন্নিকটে। ঐ রহস্যময় অজানা-অচেনা গভীর অন্ধকার জগৎ থেকে দিকনির্দেশনা আসে ডিমের খোলের মধ্যে আগত নবীন ঐ বাচ্চাটির জন্য এবং তখন সে তার ছোট্ট মোলায়েম ঠোঁট বা চঞ্চু দিয়ে ঠোকর মেরে মেরে পরদার স্তরগুলি ছিঁড়ে ফেলতে থাকে এবং পরিশেষে বাহিরের শক্ত খোলটি ভেঙে সে বাহিরে আসার পথ করে নেয়। ঠিক কোন্‌ মুহূর্তে কীভাবে সে পথ করে নেবে, তা তাকে জানানো হতে থাকে কুল মখলুকাতের মালিকের পক্ষ থেকে। যাঁর একক নিয়ন্ত্রণে সবকিছু চলছে ও সংঘটিত হচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে ডিমের মধ্যে রক্ষিত বিভিন্ন স্তর ও আকৃতি উদ্দেশ্যবিহীন নয়। লাটিমের মত এই গোলকটির নীচের দিকে থাকে একটি কালো ক্ষুদ্র গোলক। এই কালো বিন্দুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তার মাথা এবং উপরের মোটা অংশটিতে ধড়। এভাবে আরও বিভিন্ন স্তরে তার পাখনা, হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, পাকস্থলী ইত্যাদির গঠন হতে থাকে মালিকের ইচ্ছা মত। এসব কিছুর পরিচর্যার জন্য সে ব্যবস্থা নিতে থাকে।

ডিমের সরু অংশ যেখানে ছোট্ট গোলকটি উৎপন্ন হয়ে মাথা তৈরির কাজ করে, ঠোকর মেরে খোলসটি ভাঙ্গার কাজ কিন্তু ওখান থেকে হয় না। কারণ ঐ অংশটি থাকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও শক্ত। ওখান থেকে মাথা বের হতে পারলেও বড় ধড়টি বের হওয়া মুশকিল। এজন্য খোলটির সাথে সংলগ্ন উপরের ঝিল্লির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাচ্চাটিকে ঘুরতে হয় এবং এটা রাব্বুল আলামিনের নির্দেশেই সে করে। তবে, গম্বুজের মত মোটা অংশের দিকে ঘুরে সে ঠোকরাতে থাকে না। এ পদ্ধতি তার বাহিরে বেরিয়ে আসার পথ সুগম না হয়ে তার মৃত্যু ডেকে আনবে। যেহেতু মোটা অংশে থাকে অক্সিজেন ট্যাংক, এজন্য তাকে পাশে ঠোকর দিয়ে বেরোনোর পথ করে নিতে হয়। একটু খেয়াল করলেই আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বুঝতে পারব। নরম তুলতুলে ঐ মুরগির বাচ্চাটির শরীরে কোন প্রকার চাপ বা আঁচড় না লাগে তার জন্য তাকে তিনি এলহামের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন : ধীরে ধীরে ঠোকর দিয়ে খোলটির এমনভাবে দাগ করে দাও যেন খোলটি দুর্বল হয়ে দু‘ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং তুমি আসানীতে দুনিয়ার আলোতে বেরিয়ে আসতে পার। কে তাকে এই সুনিপুণভাবে ডিমের গায়ে দাগ লাগিয়ে দেয়ার কৌশল ও টেকনিক শেখাল ? এসব আর কিছু নয়, প্রকৃতির যাবতীয় বিষয়ের উপর আল্লাহ তা‘আলার নিয়ন্ত্রণ ও হেদায়েত বা ওহির মাধ্যমে পরিচালনার ফল যা ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তাকালে বুঝা যাবে না।

মাকড়সা

সকল গৃহের মধ্যে যে ঘরটি সব থেকে সূক্ষ্ম এবং নরম তা হচ্ছে মাকড়সা নির্মিত ঘর। মাকড়সা নিজেও অত্যন্ত নাজুক। এদেরকে রক্তপায়ী প্রাণী-যেমন বিচ্ছু ইত্যাদির বংশোদ্ভুত মনে করা হয়। এরা দুরন্ত অনুভূতিশীল এবং অত্যন্ত মেধাবী বা স্মরণ শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে এক আশ্চর্যজনক জ্ঞান দিয়েছেন। তাদের ঘর তৈরির সকল সরঞ্জাম বা উপাদান তারা তাদের নিজেদের শরীর থেকেই পেয়ে থাকে। বাইরের মাটি পাথর ঘাস পানি ইত্যাদি কোন কিছুরই প্রয়োজন হয় না এবং তারা নিজেরাই এর নির্মাতা। তাদের নিজেদের অস্তিত্ব থেকে সংগৃহীত নির্মাণ সামগ্রী দ্বারা তৈরি এ ঘরই তাদের একমাত্র নিরাপদ বাসস্থল এবং এই ঘর থেকেই তারা তাদের জীবন ধারণ সামগ্রী লাভ করে। এ ঘরের সুন্দর জালে ধরা পড়ে পোকা মাকড়, মশা-মাছি এবং ছোট ছোট পাখি তাদের খোরাকে পরিণত হয়। আজব এ পোকার জ্ঞান, অদ্ভুত তার বাসগৃহ, আশ্চর্যজনক তার বুনন পদ্ধতি, এ ঘরের দেয়াল ও দরজা বিস্ময়কর, তাঁর জীবনটাও বড় চমকপ্রদ, মৃত্যুও ততোধিক বিচিত্র। মাকড়সা যখন গর্ভবতী হয় তখন গাছের খোল অথবা পাথরের ফোকরের মধ্যে স্থান গ্রহণ করে। তার পেট থেকে ডিম বের হওয়া থেকে নিয়ে বাচ্চা ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সে বসে থাকে এবং বাচ্চারা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই তারা মাকে খাওয়া শুরু করে দেয় এবং শক্তিশালী হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এসব পর্যবেক্ষণ করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলতে ইচ্ছা হয়। ‘হে সকল বিস্ময়কর ও অজানা বিষয়ের প্রকাশক, অবশ্যই আপনি সর্বজ্ঞ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়’।

একটি সিজদা হাজার গোলামি থেকে মুক্তি

আমরা পূর্বেই বলেছি যে, মূলত: আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা ইতিহাসের কোন যুগেই ছিল না। নবী রাসূলগণ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করানোর উদ্দেশ্যে এ পৃথিবীতে আসেন নি। কাফেরদের যখন জিজ্ঞাসা করা হতো যে, এ চন্দ্র, সূর্য, আকাশ, পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তখন তারা বলতো, আল্লাহ। নবী রাসূলগণ এসেছেন আল্লাহকে আড়াল করে সমাজে যে সমস্ত কুসংস্কারের জন্ম হয়েছিল, তা দূর করার জন্য। আল্লাহর গুনাবলী, তাঁর পবিত্র নাম, অন্য কথায় তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির প্রতি মানুষকে আহ্বান করার জন্যই তাঁরা পৃথিবীতে এসেছিলেন। আল্লাহই সর্বময় ক্ষমতার মালিক। তাঁর সৃষ্টি- নৈপুণ্যে অন্য কারো বিন্দুমাত্রও অংশীদারিত্ব নেই। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই একমাত্র মালিকানার দাবি করতে পারেন। যিনি রিজিক দান করেন, তিনিই আনুগত্য চাইতে পারেন। যিনি প্রতি মুহূর্তে আলো-বাতাস আর পানি-অক্সিজেন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিপালন করে যাচ্ছেন এবং আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন-মাথা শুধু তাঁর সামনে অবনত হতে পারে। অন্য সব মিথ্যা ক্ষমতা আর অসত্য গুণের দাবিদারকে অস্বীকার করে সর্বময় ক্ষমতার প্রকৃত মালিককে স্বীকার করানোর জন্যই পৃথিবীতে নবী ও রাসূলগণ এসেছেন। আর তাঁরা যা নিয়ে এসেছেন, আর নামই হলো ইসলাম। প্রকৃত মালিকের আনুগত্যের স্বীকৃতি। আর এ আনুগত্যের মাধ্যমেই আসে ইহকাল ও পরকালের শান্তি। এটাই হচ্ছে ইসলামের অর্থ ! মূলত: একমাত্র মালিকের আনুগত্য স্বীকার করার মধ্যে বান্দার প্রকৃত আজাদি রয়েছে। এ একটি সত্তার আনুগত্য স্বীকার করলে তাকে অসংখ্য শক্তির সম্মুখে মাথা নত করতে হয় না। আর এটাই সমস্ত কথার মূলকথা। এই কথাকেই ড. ইকবাল তাঁর কবিতায় এভাবে বলেছেন-
সে হলো একটি সিজদা-

যাকে তুমি বোঝা মনে কর,
প্রকৃতপক্ষে সে সিজদাই তোমাকে
আরো হাজার সিজদা থেকে নিষ্কৃতি দেয়।

ডিএনএ সংক্রান্ত জ্ঞান

চিকিৎসা বিজ্ঞানে নজিরবিহীন অগ্রগতি এনে দিয়েছে ক্ষুধা দারিদ্র্য অজ্ঞতা এবং রোগব্যাধি মানুষের চিরন্তন শত্রু। মানুষ সবসময় এর যন্ত্রণা ও পীড়া থেকে মুক্তির প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সার্বিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও মানুষের অনেক কিছু অর্জনের বাকি রয়েছে। সুদীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসাবে ডিএনএ সংক্রান্ত পরিষ্কার ধারণা আমাদের সম্মুখে এসে গেছে। এর ফলে মানসিক রোগ, হৃদ্‌রোগ, বহুমূত্র, হুপিংকাশি, মাদকাসক্তি এবং আরো অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির কারণ নির্ণয় ও প্রতিকারের ব্যবস্থা সহজ হয়ে গেছে। এখন এর মাধ্যমে অঙ্গ বিকৃতি ব্যাধি সমূহের প্রতিরোধ সম্ভব হয়ে উঠবে। সত্যি বলতে কি একুশ শতক জিন থেরাপী যুগের সূচনা করেছে।

ধর্ম-বিমুখতা ও এইডসের আজাব

আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস ও ধর্ম-বিমুখতার কারণে বর্তমান বিশ্বে অবাধ যৌনাচার তীব্র হয়ে উঠেছে। এমনকি সম-মৈথুনও ব্যাপকতর হচ্ছে। কোন কোন নবীর যুগেও তার জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম-মৈথুনের প্রচলন ছিল। এই অপবিত্র অপকর্ম পরিহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে সতর্ক-বাণীও উচ্চারিত হয়েছিল। আল্লাহর শাস্তি হিসাবে লুতের জনগোষ্ঠীর অনিবার্য ধ্বংসের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠী সব ধরনের সতর্ক-বাণীকে অগ্রাহ্য করে। এর পরিণতিতে আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তি গন্ধক ও অগ্নি বৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে পুরো জনগোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এইসব অপকর্মের শাস্তি হিসাবে গত কয়েক শতাব্দী ধরে সিফিলিস ও গনোরিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়। বর্তমানে মানব হন্তা নতুন রোগ এইডস বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগ অবাধ যৌনাচারের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে থাকে। এ জন্য এ থেকে নিষ্কৃতির পথ হল পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করা।

এ যুগের নাস্তিক বনাম জাহেলী যুগের কাফির

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর যুগের বড় বড় কাফির আবু জাহেল, আবু লাহাবও আল্লাহর অস্তিত্বকে কোনদিন অস্বীকার করে নি। তারা অস্বীকার করত শুধু তাঁর গুণাবলি ও সর্বময় ক্ষমতার একক অধিকারকে। অন্ধকার যুগ বলে আমরা যাকে আখ্যায়িত করি, সে যুগের লোকেরাও আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,

রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর জন্মের পূর্বে আবরাহা বাদশা যখন কাবা-ঘর ধ্বংস করতে আসল এবং তার সৈন্যরা কোরাইশ সম্প্রদায়ের কিছু উট ছিনিয়ে নিল। এ উটের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কিছু উটও ছিল, তিনি আবরাহার দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, আপনার লোকজন আমার উট ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে, আমি তা ফেরত চাই। বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে বললেন, আমরা কা’বাঘর ধ্বংস করতে এসেছি, সে ব্যাপারে কোন কথা না বলে আপনি সাধারণ উটের কথা বললেন। আব্দুল মুত্তালিব উত্তরে বললেন, আমি উটের মালিক, আমি উট চাই, কা’বাঘরের একজন মালিক আছেন, তিনিই এটা রক্ষা করবেন।

কাজেই, এখান থেকে বুঝা যায়, জাহেলিয়াতের যুগেও লোকেরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো। তারা হজ ও উমরা পালন করত। এর সাথে সাথে তারা দেব-দেবীরও পূজা করত।

ইতিহাসের এক পর্যায়ে সত্য-মিথ্যার ফয়সালা হয়েছিল বদরের ময়দানে,

সেখানে আরবের শক্তিধর সেনাপতি আবু জাহেল বদরের ময়দানের দিকে রওনার পূর্ব ক্ষণে কা’বাঘরের গিলাফ ধরে বলল, হে ঘরের মালিক, আমাদের দ্বীন যদি সত্য হয়, তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মুসলিম বাহিনী নিয়ে বদরের ময়দানে আসছে, তার একজনও যেন জিন্দা অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। আমরা যেন তাদেরকে ধরাশায়ী করতে পারি। আর যদি মুহাম্মদের দ্বীন সত্য হয়, তাহলে আমরা আরবের সর্দার ৭০ জনের একজনও যেন জিন্দা অবস্থায় ফিরে না আসি। আল্লাহ তা‘আলা আবু জাহেলের দোয়া কবুল করলেন।

নাস্তিকদের নিকট একটি জিজ্ঞাসা ???

পূর্বের আলোচনা থেকে বুঝা গেল জাহেলিয়াতের জমানায়ও তারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। আমাদের এ যুগের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নাস্তিকরা আবু জাহেল, আবু লাহাব থেকেও অনেক অধম, হতভাগ্য। দুঃখ হয় এদের বুদ্ধির দাবি শুনলে। মূলত: এরাই সর্ব-যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জাহেল। এসব নাস্তিকদের আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই : ধরে নেয়া যাক আল্লাহ নেই, কিন্তু মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসবে, দুটি চক্ষু মুদিত হয়ে আসার সাথে সাথে যখন দেখতে পাবে ফেরেশতাদের, দেখবে জান্নাত- দোজখ, আর দেখবে সবকিছুই এক এক করে উদ্ভাসিত হচ্ছে, তখন কি করবে ? এ অবস্থায় যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পূর্বাহ্নেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, তারা তো বেঁচে যাবে। আর আল্লাহ তা‘আলার বেহেশ্‌ত-দোজখ, ফেরেশতা যদি নাও থাকে (নাউযুবিল্লাহ) তাতেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তাহলে বুদ্ধিমানের কাজ হলো এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে উভয় অবস্থায় বিপদমুক্ত থাকার চেষ্টা করা। এ কথাগুলো গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য আমরা মুক্তমনের বুদ্ধিমানদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি। এতে তাঁরা নিজেরা বেঁচে যাবেন অনন্ত অসীম জগতে, যেখানে আর কোন মৃত্যু আসবে না। কুরআনে আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন :

وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ (وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ (فاطر: 36-37

আর যারা অস্বীকার করবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের জন্য মৃত্যুর আদেশও দেওয়া হবে না যে তারা মরে যাবে এবং শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমরা এভাবেই প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি। যেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, হে প্রভু! আমাদের বের করে নাও এখান থেকে, (এবার) আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা আর করব না। আল্লাহ তা‘আলা উত্তর দেবেন, আমি কি তোমাদেরকে পূর্বেই সময় দেই নি, যখন যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে ? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিলেন। এবার আজাব ভোগ কর। মূলত: জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা-ফাতের: ৩৬-৩৭)

একটি বিতর্কসভার কাহিনী

আমরা একজন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদের সাথে এক নাস্তিকের বিতর্ক-সভার বর্ণনা দিয়ে এই আলোচনা শেষ করছি। এক বিরাট জনসমাবেশে উক্ত নাস্তিকের সাথে তার বিতর্কের প্রোগ্রাম ঠিক হলো। কিন্তু উক্ত ইসলামি চিন্তাবিদ অনেক দেরিতে উপস্থিত হলেন। নাস্তিক ভদ্রলোক বলল, এত দেরি করে কেন আসলেন ? আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। উত্তরে তিনি বললেন, আমরা আসার পথে ছিল একটি নদী। পারাপারের উপায় ছিল না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ কি দেখলাম ! আমার সম্মুখেই একটা বৃক্ষ গজাচ্ছে। এ বৃক্ষটা অল্প সময়েই বড় হয়ে গেল। অত:পর আসল একটা কুড়াল। এই কুড়ালটি গাছটিকে কেটে ফেলল। তার পর দেখলাম আসল করাত। করাত গাছটিকে ছিলে তক্তা বানিয়ে ফেলল। অত:পর পেরেক হাতুড়ি ইত্যাদি এসে গেল। আর তৈরি হয়ে গেল নৌকা। সে নৌকাটি আমার সম্মুখে চলে আসল এবং সে নৌকা দিয়েই আমি পার হয়ে আসলাম। এতে একটু দেরি হয়ে গেল বৈকি ? নাস্তিক চিৎকার করে উঠল, সাহেব আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন? এতগুলো কাজ কীভাবে নিজে নিজে হয়ে গেল ? চিন্তাবিদ বললেন, এটাই হচ্ছে আপনার বিতর্ক সভার উত্তর। আপনি কীভাবে চিন্তা করতে পারলেন যে, এই বিশাল সৃষ্টি জগতে গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ-পৃথিবী, আলো-বাতাস, গাছ-পালা, মানুষ, পশু-পাখি, অসংখ্য জীব-জন্তু এসব কিছু নিজে নিজেই তৈরি হয়ে গেল ? উত্তর শুনে নাস্তিক হতবাক হয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করল এর পিছনে একজন শক্তিশালী সুনিপুণ কারিগর অবশ্যই আছেন। আর তিনিই হচ্ছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ, এ জগতের সৃষ্টিকর্তা ও তার একমাত্র মালিক।

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ مَاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (البقرة: 163

নিঃসন্দেহে আসমান জমিনের সৃষ্টির মাঝে, রাত্রি ও দিনের আবর্তনের মাঝে, মহাসাগরে ভাসমান জাহাজসমূহে, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়-(এ সবকিছুতে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন), আরো রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার বর্ষণ করা বৃষ্টির পানির মাঝে, ভূমির নির্জীব হওয়ার পর তিনি এ পানি দ্বারা তাতে নতুন জীবন দান করেন, অত:পর এই ভূখণ্ডে সব ধরনের প্রাণের আবির্ভাব ঘটান। অবশ্যই বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি করার মাঝে এবং সেই মেঘমালা যাকে আসমান জমিনের মাঝে অনুগত করে রাখা হয়েছে -তার মাঝে সুস্থ বিবেকবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (বাকারাহ ১৬৩ )

কালামে পাকের এই একটিমাত্র আয়াতে বিধৃত আল্লাহ পাকের এই নিদর্শন সমূহ চিন্তাশীলদের মনোযোগ আকর্ষণ করে :

  • (ক) আসমান জমিনের সৃষ্টি।
  • (খ) রাত্রি এবং দিনের পার্থক্য।
  • (গ) সাগরে ভাসমান জাহাজ সমূহের মধ্যে মানবকল্যাণ।
  • (ঘ) মহান আল্লাহ কর্তৃক আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের পর বিরান ভূমির সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠা এবং সেখানে সব ধরনের প্রাণী আবির্ভূত হওয়া।
  • (ঙ) বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি
  • (চ) মেঘমালাকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে অনুগত করে রাখা।

সমাপ্তি

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


হার্ট একটি সূক্ষ্ম জেনারেটর

দ্বিতীয় শক্তিশালী বস্তু হচ্ছে জেনারেটর, স্বয়ংক্রিয় শক্তি উৎপাদন যন্ত্র। আমরা একে বলি হার্ট কিংবা হৃদ্‌যন্ত্র। মানব দেহের বাম পাশে সামনের দিকে পেটের একটু উপরে এই ছোট অংশটি হচ্ছে মানবদেহের সর্বাধিক জরুরি অংশ। মানব সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে এটিই সর্ব প্রথম তৈরি করা হয়েছে। তাই বলা যায় এটিই সৃষ্টির শুরু। আবার এর তৎপরতা বন্ধের মাধ্যমে মানবীয় জীবনের ঘটে অবসান। এ জেনারেটর যখন অচল হয়ে যায় তখন দেহের অন্যান্য সব কটি যন্ত্র চালু থাকলেও মূল মানুষটিকে আর জীবন্ত বলা যায় না। ভিন্নভাবে বললে, এ হার্টই হচ্ছে মানুষের জীবন। এর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে এর ফলে শরীরে অন্যান্য যন্ত্রও মাঝে মাঝে তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেমন, শরীরের যে কোটি কোটি সেলকে বলা হয়েছে গরম-ঠান্ডা অনুভব করার কাজে তৎপর থাকার জন্য, এই মনের শক্তির কাছে তা-ও তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই মন কিংবা হৃদয়টাই হচ্ছে মানুষের আসল শক্তি। এটা ভালো তো সব ভালো, এর কথাই আসল কথা। আমরা যে দেহ নিয়ে চলি, যে চোখ দিয়ে দেখি, যে কান দিয়ে শুনি, যে মুখ দিয়ে কথা বলি তার প্রতিটি অংশই হচ্ছে এক-একটি গবেষণার সমুদ্র। চোখ দিয়ে আমরা প্রাথমিক ভাবে যা দেখি তা তো থাকে চিত্রের নেগেটিভ। কোন কুশলী আমাদের ব্রেনে এই চিত্রকে পজিটিভ করে পেশ করে ? কান দিয়ে হাজার কথা একত্রে শুনি কিন্তু কে এর ভিতরে ওয়েভ-গুলোকে সুবিন্যস্ত করে রাখে ? এক কথার সাথে অন্য কথার সংঘাত হয় না কেন ? জিহ্বা দিয়ে যখন কথা বলি তখন তার এক লক্ষ সতের হাজার সেল একত্রে এসে কীভাবে আমার কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয় ? কে সেই মহান সৃষ্টি-কুশলী, মানুষ ছাড়া যিনি অন্য কোনো প্রাণীর জিহ্বায় এ সেলগুলো তৈরি করেননি ?

পশু-পাখির বিজ্ঞান

আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিমানদেরকে ঠিক সেভাবেই আহ্বান করছি যেভাবে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানীদের আহ্বান করেছেন। আমরা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় আল্লাহর একটা নিদর্শন ও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে পারব না বলে সেদিক যাচ্ছি না। পশুপক্ষী ও মৌমাছির কথাই ধরা যাক। কে শিক্ষা দিল তাকে এ ধরনের কূটকৌশল, এ সম্পর্কে আমরা একজন জগদ্‌বিখ্যাত বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতির অংশ-বিশেষ এখানে তুলে ধরছি। নিউইয়র্ক বিজ্ঞান একাডেমীর চেয়ারম্যান বিজ্ঞানী ক্রেসী মরিসন মানুষ একাকী বাস করে না-গ্রন্থে বলেন, আপন জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তনে পাখিকুলের প্রচণ্ড সহজাত ঝোঁক থাকে। তোমার ঘরের দরজার পাশেই যে চড়ুই-এর বাসা, সে শরৎকালে দক্ষিণে চলে যাবে, কিন্তু পরবর্তী বসন্তেই সে ফিরে আসবে। সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের (অর্থাৎ আমেরিকার) অধিকাংশ পাখি দক্ষিণ দিকে চলে যায়। অধিকাংশ সময় তারা সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রায় হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে। কিন্তু তারা তাদের পথ হারায় না বা ঠিকানা ভুলে না। আর পত্রবাহক পায়রা যখন কোন দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণকালে নিত্য-নতুন শব্দ শুনতে শুনতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, তখন ক্ষণিকের জন্য আশ-পাশে চক্কর দেয় এবং তার পরেই সে নিজের গন্তব্য স্থানের দিকে নির্ভুলভাবে পাড়ি জমায়।

প্রকৌশলী মৌমাছির সূক্ষ্ম কৌশল

গাছ-পালার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়-ঝঞ্ঝা যখন মৌমাছির পরিচিত সকল আলামত নষ্ট করে দেয়, তখনও মৌমাছি পালনে ব্যবহৃত কাঠামোতে বিভিন্ন আকারের বহু সংখ্যক কক্ষ বানায়। এগুলোর মধ্য থেকে ছোট ছোট কক্ষ সাধারণ শ্রমিকদের এবং সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে পুরুষ মৌমাছির জন্য। রানি মৌমাছি পুরুষদের জন্য নির্ধারিত কুঠরিগুলিতে অনুৎপাদনশীল ডিম পাড়ে, অথচ স্ত্রী জাতীয় শ্রমিক মৌমাছিও অপেক্ষমাণ রানি মৌমাছিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোতে উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। আর যে সব স্ত্রী জাতীয় মৌমাছি নতুন প্রজন্মের আগমনের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিন কাটানোর পর স্ত্রীর ভূমিকায় পরিবর্তিত দায়িত্ব গ্রহণ করে, তারা শিশু মৌমাছির জন্য খাদ্য তৈরি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। মধু ও তার রেণু চিবানোর অগ্রিম পরিপাকের মাধ্যমে তারা এ কাজটি সম্পন্ন করে। এরপর পুরুষ ও স্ত্রী মৌমাছিদের বয়স বাড়ার পর এক পর্যায়ে তারা চিবানো ও অগ্রিম পরিপাকের কাজ থেকে অবসর নেয়। তারা তখন মধু ও রেণু ছাড়া আর কিছুই অন্যদের খাওয়ায় না। যে সকল স্ত্রী মৌমাছি এভাবে কাজ করে, তারা শ্রমিকে পরিণত হয়। রানি মৌমাছির কক্ষগুলিতে যেসব স্ত্রী-মৌমাছি থাকে, তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকে চিবানো ও অগ্রিম পরিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আর এ কাজ যারা করে তারা একদিন মৌমাছিদের রানি হয়ে যায়। পরে শুধু এরাই উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। এই পৌনঃপুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ কক্ষ ও বিশেষ বিশেষ ডিমের প্রয়োজন হয়। অনুরূপ খাদ্য পরিবর্তনের বিস্ময়কর প্রভাবেরও প্রয়োজন হয়। আর এ প্রক্রিয়া সমূহের জন্য যা অত্যাবশ্যক, তা হলো ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করা, বাছ বিচার করে খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত তথ্য বাস্তবায়ন করা। এই পরিবর্তনগুলো বিশেষভাবে একটি সামষ্টিক জীবনে কার্যকর হয়, যা তাদের অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য। এ জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা অত্যাবশ্যক, তা এ সামষ্টিক জীবন শুরু করার পর অনিবার্যভাবে অর্জিত হয়ে যায়। অথচ এই জ্ঞান ও দক্ষতা জন্মগতভাবে কোন মৌমাছির সত্তা ও তার টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য নয়। এ থেকে বুঝা যায় যে, বিশেষ বিশেষ অবস্থায় খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের চেয়েও মৌমাছির বেশ। কি বিস্ময়কর পরিকল্পনা ! কে এই পরিকল্পনার ইঞ্জিনিয়ার ? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক উচ্চকণ্ঠে বলে উঠবে যে, একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ এটা করতে পারেন। অন্য কারো দ্বারা এটা সম্ভব নয়। বোকা নাস্তিকরা বলে এটা নাকি প্রকৃতি। কিন্তু প্রশ্ন, এই প্রকৃতিটা কে তৈরি করল ? এ ধরনের প্রশ্ন আর উত্তর চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত একখানেই গিয়ে শেষ হবে, তা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন- আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন : পর্বত-গাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু ডালে গৃহ তৈরি কর, এরপর সর্বপ্রকার ফল মূল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে নিঃসৃত হয় নানাবিধ পানীয়, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার, নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা নহল, আয়াত: ৬৯)

মধুর মধ্যে নিহিত প্রকাশ্য ও গোপন সত্য

মধু সম্পর্কে আল্লাহ পাকের বাণীতে বলা হয়েছ:

ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (النحل: 67

মানুষের জন্য আরোগ্য। (সুরা নহল: ৬৯)

এখানে আল্লাহপাক আরোগ্যের কথা বলেছেন কিন্তু কোন বিশেষ অসুখের নাম নেননি। অতএব এর ব্যাপ্তি বিশাল। এর ক্ষেত্র সীমিত নয়। অসীম। বরং মানুষের যাবতীয় ব্যাধি বলতে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক-সবই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কারণ মানুষ একাধারে বস্তু ও আত্মার সমষ্টি। আর এ জন্যই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যত প্রকারের অসুখ মানুষের হোক না কেন, তার সূচনা হয় তার মন বা আত্মা থেকে এবং তার পরিণতি বা প্রতিক্রিয়ায় দেহ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এখন আসুন, আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি অনুযায়ী মধুর মধ্যে নিহিত মূল রহস্য সম্পর্কে বুঝতে গিয়ে, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার পর্যালোচনা করে, দেখি। “সকল মানুষের মানুষের জন্য আরোগ্য – এ কথাটি দ্বারা আল্লাহ তাআলা বুঝাতে চেয়েছেন : মধু মানুষের অন্তরাত্মা, জীবন এবং শরীরের জন্য আরোগ্য বা নিরাময় দানকারী। কিন্তু কীভাবে ? এ প্রসঙ্গে মধুর সৃষ্টি এবং মৌচাকে যে নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে তা বুঝার জন্য নিজেদের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তাআলা মৌমাছির নিকট এলহামের মাধ্যমে জানিয়েছেন- খাও সকল ফলমূল থেকে ।

অর্থাৎ, সকল প্রকার ফলের নির্যাস থেকে খাও এবং সেই সব নির্যাসের মধ্যে নিরাময়কারী সুধা তোমাদের পেটের কারখানাতে রেখে তাকে শক্তিশালী কর। আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ঐ আহরিত নির্যাস অবশেষে মানবমণ্ডলীর ব্যাধি সমূহের জন্য পরম আরোগ্য দানকারী মধুতে পরিণত হয়। ফুলের রস, পাতা এবং বৃক্ষ ছাল ও মূল থেকে মধু হয় না। এই সঞ্জীবনী সুধার জন্য বিশ্ব-সম্রাটের নির্দেশে বিশেষ বিশেষ উপাদান সমন্বয়ে প্রক্রিয়াকরণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। আর এ জন্যই এই সুধার মাঝে কোন ভেজাল, ভ্রান্তি বা ত্রুটির কোন সম্ভাবনা নেই। একটু চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীর সকল চিকিৎসাবিদ একত্রিত হয়ে কোন রোগীর জন্য যদি কোন ওষুধ নির্বাচন করে, তবু তারা নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারবে না যে ঐ ওষুধ শতকরা একশত ভাগ কার্যকরী হবে, অথবা ঐ ঔষধের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। আজকের উন্নত বিশ্বের ডাক্তারগণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছেন বলে দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক রোগের ওষুধ হয়তো ঐ রোগকে উপশম করছে, কিন্তু তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আরও বহু অসুখের জন্ম দিচ্ছে। অথচ মধু সম্পর্কে সবজান্তা ও সর্বময় ক্ষমতার মালিক নিজেই ঘোষণা দিচ্ছেন-“মানবমণ্ডলীর জন্য আরোগ্য”। যেমন সবাই জানেন, মৌমাছিরা সর্বপ্রকার সবুজ বৃক্ষের ফুলের খুশবু এবং ওইসব গাছ-গাছালির মধ্যে নিহিত জীবনী শক্তিসমূহ ভক্ষণ করে নিজেদের পেটের মধ্যে এক বিশেষ স্থানে লালা তৈরি করে, আর তাকেই আমরা মধু বলি। সুতরাং, বুঝা গেল সর্বপ্রকার ফল ফুল এবং ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে উৎপন্ন পত্রপল্লবের স্বাদ ও গন্ধ সমন্বয়ে-স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার অদৃশ্য তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় এই মহামূল্যবান পানীয়। এসব গাছপালা, ফল ও ফুলের মধ্যে অবস্থিত খুশবু ও স্বাদের সঠিক উপকারিতা বা তাৎপর্য খুব কম মানুষই জানে বা চিন্তা করে। এজন্য যারা মধু সেবন করে তাদের আত্মা ও মেধা-মননের গভীরে মধু প্রভাব বিস্তার করে। তারপর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং প্রতিটি লোমকূপে। অত:পর আত্মা ও অবয়বে মধু ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত পবিত্র প্রাণশক্তি সর্বাগ্রে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং ঐ বিশুদ্ধ রক্তের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয় সকল ধমনিতে, ফলে পবিত্রতার এ অমিত তেজ এবং অদৃশ্য অমোঘ শক্তি উদ্দীপ্ত করে অকল্পনীয়ভাবে এবং মুক্ত করে তাকে বহু জটিল রোগ ব্যাধি থেকে। আল্লাহপাক পাক কোরআনে মধুর বিভিন্ন রঙের উল্লেখ করেছেন।

এইভাবে রং মানুষের জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে। আমাদের মন মস্তিষ্কের মধ্যে চিন্তা করার জন্য যে কোষগুলি কাজ করে সেগুলির উপর সৃষ্টি জগৎ এবং তার বাহির থেকে আগত জ্যোতি এবং নুরের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রং এবং মধুর উজ্জ্বলতার মধ্যে রয়েছে আরোগ্য দান করার জন্য সর্বপ্রধান ভূমিকা ; তাই এরশাদ হচ্ছে-এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রং, (যা) আরোগ্য মানবমণ্ডলীর জন্য।”(সুরা নহল: ৬৯ ) সেই বিখ্যাত লেখক মি. ক্রেসী মরিসন তাঁর গ্রন্থে আরো যেসব উদাহরণ পেশ করেছেন তার মধ্যে কুকুরের অনুসন্ধানী নাক সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। অথচ মানুষ আজ পর্যন্ত এমন কোন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি, যা তার নিজের দুর্বল ঘ্রাণশক্তিকে তীব্রতর করতে পারে। তিনি আরো বলেছেন, জলজ মাকড়সা নিজস্ব জাল দিয়ে নিজের জন্য বেলুন আকৃতির যে বাসা তৈরি করে থাকে, তা মানুষের চিন্তা-শক্তিরও অনেক ঊর্ধ্বে।

সলোমান মাছ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, কীভাবে বছরের পর বছর সমুদ্রে কাটাবার পর এই মাছ তার জন্মস্থান নদীতে ফিরে আসে। তার চেয়ে আরো বিস্ময়কর ঘটনা এ লেখক উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে জলজ সাপের বিস্ময়কর সফর। এ সাপের স্বভাব ঠিক সলোমান মাছের বিপরীত। এই প্রাণীটি বয়স হলেই নিজ পুকুর, নদী, খাল-বিল হতে হিজরত করে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে চলে যায়। এই ধরনের আরো অনেক তথ্য দিয়ে তিনি তাঁর গ্রন্থকে একটি বিস্ময়কর গ্রন্থে পরিণত করেছেন। সত্যিই মহান আল্লাহর এই কুদরতি, সৃষ্টি-কুশলতা ও কারিগরি নৈপুণ্য তাঁর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করতে মানুষের বিবেককে বাধ্য করে।

রেশম বা তুঁত পোকা

তাহলে বল, তোমাদের প্রভুর কোন নেয়ামত তোমরা অস্বীকার করবে ? (সুরা আর রাহমান) আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামতের মধ্যে রেশম বা তুঁত পোকা এক উত্তম নেয়ামত। রেশম পোকা, তার নিজেরই দেহ নিঃসৃত আঠা দ্বারা কত মজবুত, মোলায়েম মসৃণ ও সুন্দর সোনালি রঙের সুতা তৈরি করে, যা চিন্তা করলে হয়রান হতে হয়। অথচ মানুষ ঐ সুতা লাভ করার জন্য কত নির্দয়ভাবে সেই পোকা হত্যা করে। সেই সুতা দিয়ে মূল্যবান কাপড় তৈরি করে ব্যবসা করে এবং অর্থ রোজগার করে। নিষ্পাপ এই ক্ষুদ্র কীটটি মানুষের জন্য মূল্যবান সুতা সরবরাহ করা ছাড়া জ্ঞান ও কৌশলগত কত শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে, সচরাচর কেউ হিসাব করে না। সুতা বানাতে গিয়ে তাকে কোন্‌ কোন্‌ পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, আর সেই বুদ্ধি হিকমতের পিছনে কোন সে মহান কুশলীর অদৃশ্য হাত কাজ করে, তা অপরিণামদর্শী লঘুচেতা ও ভাসা ভাসা জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসাব করে না। যদি ঐ কীটের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও বুদ্ধির কথা মানুষ চিন্তা করত, তাহলে সে তার মনযিলে মকসুদ, অর্থাৎ আখেরাতের জিন্দিগির রহস্য বুঝতে পারতো, অনুধাবন করতে পারতো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন হাদিসের মাধ্যমে প্রদত্ত জীবন পদ্ধতির তাৎপর্য ও উপকারিতা। সর্বোপরি জানতে পারতো সবকিছুর পিছনে দয়াময় পরওয়ারদেগারের জ্ঞান, ইচ্ছা ও হিকমত প্রচ্ছন্ন থাকার কথা এবং এর ফলে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত তার ঈমান ও সত্যপথে টিকে থাকার অবিচলতা। এবার আমরা সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে দেখি ঐ ক্ষুদ্র কীটের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ইলহামী জ্ঞানের দিকে। মহান রব্বুল ইজ্জতের অদৃশ্য ইশারাতে ঐ পোকা খায় আঠাযুক্ত পত্রপল্লব, যেমন কুল বা বরই পাতা, তুঁত-পাতা ইত্যাদি। এসব আঠাযুক্ত পাতা তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থিত আরও কিছু উপাদানের সংমিশ্রণে এই মূল্যবান সুতা তৈরি হয় এবং তাকে জীবন সঞ্জীবনী নেয়ামতের অধিকারী বানায়। এইভাবে প্রকাশ পায় তার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের করুণারাশির ঝরনাধারা। রেশম-কীট জন্ম-লগ্নে ছোট একটি পিঁপড়ার মত ক্ষুদ্র থাকে এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে, বসন্ত সমাগমের সাথে সাথে দিবালোকে বেরিয়ে আসে। এ সময়ে গাছে গাছে দেখা দেয় পত্রপল্লবের কুঁড়ি ও কচি-কচি মনোরম পাতা। রেশম কীটের এই বাচ্চাগুলি ঐ তুলতুলে পাতাগুলি খেতে খেতে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে এবং শীঘ্রই পূর্ণ পোকায় পরিণত হয়। তারপর রাব্বুল আলামিনের অদৃশ্য ইশারায় নিরাপদ বাসস্থান লাভের আশায় ঘর তৈরির দিকে তারা পারপূর্ণ মনোযোগ দেয়। সে ঘর এমনই সুপরিকল্পিত ও সুগঠিত এবং এত সুন্দর যে, দেখলে মনে হয়-এ ঘরের পূর্ণ ছবি তার নিজের মধ্যে খোদিত ছিল এবং সেটাই এখন বাস্তবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এভাবে ঘরগুলি নজরে পড়তে থাকে। এসব ঘরের মধ্যে তারা আরামে শুয়ে পড়ে এবং মুখ নিঃসৃত আঠা দ্বারা প্রস্তুত সূক্ষ্ম সুতার বেষ্টনী দিয়ে ঘরের আচ্ছাদন বাড়াতে থাকে। ঘরের একটি অংশ হাওয়া বা অক্সিজেন প্রবেশের জন্য খোলা রাখে। কবুতরের ডিমের মত ঘরের প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে ক্লান্ত-শ্রান্ত কীটগুলি পরিপূর্ণ বিশ্রামের জন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে শুয়ে পড়ে। এরপর শীত মৌসুমের আগমনে কীটগুলি নিজ নিজ ঘরের মধ্যেই অদৃশ্য জগতের উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যায়।

কী মজার ব্যাপার ! ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ পড়ার সাথে সাথে, হঠাৎ করে দেখা যায়, পোকাগুলি নিজ নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে এবং তাদের বাচ্চাদেরকে ডিম থেকে বের করে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ছেড়ে দিচ্ছে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন, শীত আসছে-কে পূর্বাহ্নে তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয় যে জন্য তারা শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে তড়িঘড়ি ঘর বানাতে শুরু করে। এবং এত চমৎকার ও মজবুত কেল্লার মত ঘর বানাতে তাদেরকে কে শেখায় ! কে তাদের কে তিনটি মাস ধরে অভুক্ত অবস্থায় বাইরের আলো বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখে ! কে দেয় তাদেরকে এ জ্ঞান বুদ্ধি ও হিকমত ! আবার ফেব্রুয়ারি মাস আসার সাথে সাথে কে তাদেরকে ঐ গভীর নিদ্রা থেকে জাগিয়ে কর্মতৎপর করে তোলে ! আসুন, ঊর্ধ্বলোকে সফরের সাথি ভাইয়েরা, এই রেশম কীটদের প্রদত্ত গায়েবি জ্ঞান সম্পর্কে একবার চিন্তা করুন এবং ভাবুন, কে নিয়ন্ত্রণ করছে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে এবং দুনিয়ার সকল সৃষ্টিসমূহকে।

চলবে……………………

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ২)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


  • কুফরের সংজ্ঞা

যে মানুষের কথা উপরে বলা হলো, তার মোকাবিলায় রয়েছে আর এক শ্রেণির মানুষ। সে মুসলিম হয়েই পয়দা হয়েছে এবং না জেনে, না বুঝে জীবনভর মুসলিম হয়েই থেকেছে। কিন্তু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। কুফর শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোককে কাফের (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পরদা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামি স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অঙ্গ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামি স্বভাবের উপর। তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়া চলছে ইসলামের পথ ধরে। কিন্তু তার বুদ্ধির উপর পড়েছে পরদা। সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বিপরীতমুখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে। এখন বুঝা গেল, যে মানুষ কাফের, সে কত বড় বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে।

কুফরের অনিষ্ট

কুফর হচ্ছে এক ধরনের মূর্খতা, বরং, কুফরই হচ্ছে আসল ও নিখাদ মূর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে অজ্ঞ হয়ে থাকলে তার চেয়ে বড় মূর্খতা আর কি হতে পারে ? এক ব্যক্তি দিন-রাত দেখেছে, সৃষ্টির এত বড় বিরাট কারখানা চলেছে, অথচ সে জানে না, কে এ কারখানার স্রষ্টা ও চালক। কে সে কারিগর, যিনি কয়লা, লোহা, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম ও আরো কয়েকটি পদার্থ মিলিয়ে অস্তিত্বে এনেছেন মানুষের মত অসংখ্য অতুলনীয় সৃষ্টিকে ? মানুষ দুনিয়ার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছে এমন সব বস্তু ও কার্যকলাপ, যার ভিতরে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিতবিদ্যা, রসায়ন ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অপূর্ব পূর্ণতার নিদর্শন, কিন্তু সে জানে না, অসাধারণ সীমাহীন জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ কোন সে সত্তা চালিয়ে যাচ্ছেন সৃষ্টির এ সব কার্যকলাপ। ভাবা দরকার যে মানুষ জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরের খবরও জানে না, কি করে তার দৃষ্টির সামনে উন্মুক্ত হবে সত্যিকার জ্ঞানের তোরণ-দ্বার ? যতই চিন্তা-ভাবনা করুক, যতই অনুসন্ধান করুক-সে কোন দিকেই পাবে না সরল সঠিক নির্ভরযোগ্য পথ। কেননা তার প্রচেষ্টার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি সব স্তরেই দেখা যাবে অজ্ঞতার অন্ধকার। কুফর একটি জুলুম, বরং সব চেয়ে বড় জুলুমই হচ্ছে এ কুফর। জুলুম কাকে বলে ? জুলুম হচ্ছে কোন জিনিস থেকে তার সহজাত প্রকৃতির খেলাপ কাজ জবরদস্তি করে আদায় করে নেয়া। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুনিয়ার যত জিনিস রয়েছে, সবই আল্লাহর ফরমানের অনুসারী এবং তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাত) হচ্ছে ইসলাম অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। মানুষের দেহ ও তার প্রত্যেকটি অংশ এ প্রকৃতির উপর জন্ম নিয়েছে। অবশ্য আল্লাহ এসব জিনিসকে পরিচালনা করবার কিছুটা স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন কিন্তু প্রত্যেকটি জিনিসের সহজাত প্রকৃতির দাবি হচ্ছে এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কুফর করছে সে তাকে লাগাচ্ছে তার প্রকৃতি বিরোধী কাজে। সে নিজের দিলের মধ্যে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রেম ও ভীতি পোষণ করবে। সে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর দুনিয়ায় তার আধিপত্যের অধীন সব জিনিসকে কাজে লাগাচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, অথচ তাদের প্রকৃতির দাবি হচ্ছে তাদের কাছ থেকে আল্লাহর বিধান মুতাবিক কাজ আদায় করা। এমনি করে যে লোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রত্যেকটি জিনিসের উপর, এমন কি নিজের অস্তিত্বের উপর ক্রমাগত জুলুম করে যাচ্ছে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে ?

কুফর কেবল জুলুমই নয় ; বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামিও বটে। ভাবা যাক, মানুষের আপন বলতে কি জিনিস আছে। নিজের মস্তিষ্ক সে নিজেই পয়দা করে নিয়েছে না আল্লাহ পয়দা করেছেন ? নিজের দিল, চোখ, জিহ্বা, হাত-পা, আর সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবকিছুর স্রষ্টা সে নিজে না আল্লাহ ? তার চার পাশে যত জিনিস রয়েছে, তার স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ ? এসব জিনিস মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী করে তৈরি করা এবং মানুষকে তা কাজে লাগাবার শক্তি দান করা কি মানুষের নিজের না আল্লাহর কাজ ? সকলেই বলবে, আল্লাহরই এসব জিনিস, তিনিই এগুলো পয়দা করেছেন, তিনিই সবকিছুর মালিক এবং আল্লাহর দান হিসেবেই মানুষ আধিপত্য লাভ করেছে এসব জিনিসের উপর। আসল ব্যাপার যখন এই, তখন যে লোক আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত চিন্তা করার সুবিধা আদায় করে নেয়, তার চেয়ে বড় বিদ্রোহী আর কে ? আল্লাহ তাকে চোখ, জিহ্বা, হাত-পা এবং আরো কত জিনিস দান করেছেন, তার সব কিছুই সে ব্যবহার করেছে আল্লাহর পছন্দ ও ইচ্ছা বিরোধী কাজে।

যদি কোন ভৃত্য তার মনিবের নিমক খেয়ে তার বিশ্বাসের প্রতিকুল কাজ করে, তবে তাকে সকলেই বলবে নেমকহারাম। কোন সরকারী অফিসার যদি সরকারের দেয়া ক্ষমতা সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে থাকে, তাকে বলা হবে বিদ্রোহী। যদি কোন ব্যক্তি তার উপকারী বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে, সকলেই বিনা দ্বিধায় তাকে বলবে অকৃতজ্ঞ

কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার বাস্তবতা কতখানি ? মানুষ মানুষকে আহার দিচ্ছে কোত্থেকে ? সে তো আল্লাহরই দেয়া আহার। সরকার তার কর্মচারীদেরকে যে ক্ষমতা অর্পণ করে, সে ক্ষমতা এলো কোত্থেকে ? আল্লাহই তো তাকে রাজ্য পরিচালনার শক্তি দিয়েছেন। কোন উপকারী ব্যক্তি অপরের উপকার করছে কোত্থেকে ? সবকিছুই তো আল্লাহর দান। মানুষের উপর সবচেয়ে বড় হক বাপ-মার। কিন্তু বাপ-মার অন্তরে সন্তান বাৎসল্য উৎসারিত করেছেন কে ? মায়ের বুকে স্তন দান করেছেন কে ? বাপের অন্তরে কে এমন মনোভাব সঞ্চার করেছেন ? যার ফলে তিনি নিজের কঠিন মেহনতের ধন সানন্দে একটা নিষ্ক্রিয় মাংসপিণ্ডের জন্য লুটিয়ে দিচ্ছেন এবং তার লালন পালনের ও শিক্ষার জন্য নিজের সময়, অর্থ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোরবান করে দিচ্ছেন ?

যে আল্লাহ মানুষের আসল কল্যাণকারী, প্রকৃত বাদশাহ, সবার বড় পরওয়ারদেগার, মানুষ যদি তাঁর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে, তাঁকে আল্লাহ বলে না মানে, তাঁর দাসত্ব অস্বীকার করে, আর তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামি আর কি হতে পারে। কখনও মনে করা যেতে পারে না যে, কুফরি করে মানুষ আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারছে। যে বাদশার সাম্রাজ্য এত বিপুল-বিরাট যে বৃহত্তম দূরবীন লাগিয়েও আমরা আজও স্থির করতে পারিনি কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ। যে বাদশাহ এমন প্রবল প্রতাপশালী যে তাঁর ইশারায় আমাদের এ পৃথিবী, সূর্য, মঙ্গলগ্রহ এবং আরো কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ বলের মত চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ; যে বাদশাহ এমন অফুরন্ত সম্পদশালী যে, সারা সৃষ্টির আধিপত্যে কেউ তার অংশীদার নেই ; যে বাদশাহ এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল যে সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারুর মুখাপেক্ষী নন, মানুষের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে তাকে মেনে বা না মেনে সেই বাদশার কোন অনিষ্ট করবে ? কুফর ও বিদ্রোহের পথ ধরে মানুষ তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারে না, বরং নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে। কুফর ও নাফারমানীর অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে এই যে, এর ফলে মানুষ চিরকালের জন্য ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে যায়। এ ধরনের লোক জ্ঞানের সহজ পথ কখনও পাবে না, কারণ যে জ্ঞান আপন স্রষ্টাকে জানে না, তার পক্ষে আর কোন জিনিসের সত্যিকার পরিচয় লাভ অসম্ভব। তার বুদ্ধি সর্বদা চালিত হয় বাঁকা পথ ধরে। কারণ, সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে গিয়ে ভুল করে, আর কোন জিনিসকে সে বুঝতে পারে না নির্ভুলভাবে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে তার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা অবধারিত। তার নীতিবোধ, কৃষ্টি, সমাজ ব্যবস্থা, তার জীবিকা অর্জন পদ্ধতি, শাসন পরিচালন ব্যবস্থা ও রাজনীতি- এক কথায়, তার জীবনের সর্ববিধ কার্যকলাপ বিকৃতির পথে চালিত হতে বাধ্য। দুনিয়ার বুকে সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, অত্যাচার উৎপীড়ন করবে, বদখেয়াল অন্যায়-অনাচার ও দুষ্কৃতি দিয়ে তার নিজের জীবনকেই করে তুলবে তিক্ত-বিস্বাদ। তারপর এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন আখেরাতে পৌঁছবে, তখন জীবনভর যেসব জিনিসের উপর সে জুলুম করে এসেছে, তারা তার বিরুদ্ধে নালিশ করবে। তার মস্তিষ্ক, দিল, চোখ, তার কান, হাত-পা-এক কথায়, তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর আদালতে অভিযোগ করে বলবে : এ আল্লাহদ্রোহী জালিম তার বিদ্রোহের পথে জবরদস্তি করে আমাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছে। যে দুনিয়ার বুকে সে নাফরমানির সাথে চলেছে ও বসবাস করেছে, যে জীবিকা সে অবৈধ পন্থায় অর্জন করেছে, যে সম্পদ সে হারাম পথে রোজগার করে হারামের পথে ব্যয় করেছে, অবাধ্যতার ভিতর দিয়ে যে সব জিনিস সে জবরদখল করেছে, যেসব জিনিস সে তার বিদ্রোহের পথে কাজে লাগিয়েছে, তার সবকিছুই ফরিয়াদি হয়ে হাজির হবে তাঁর সামনে এবং প্রকৃত ন্যায় বিচারক আল্লাহ সেদিন মজলুমদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারে বিদ্রোহীকে দেবেন অপমানকর শাস্তি।

বিশাল ঊর্ধ্ব-জগৎ ও গ্যলাক্সি

ঊর্ধ্ব-জগৎ বা মহাশূন্য সম্পর্কে আজ প্রতিটি শিক্ষিত লোকই জানে। সে এক বিশাল জগৎ। যাকে বলা হয় গ্যলাক্সি। বৈজ্ঞানিকগণ এই সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছে, তা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের তুলনায় ক্ষুদ্র একটি বালু-কণার চেয়েও নগণ্য। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। বৈজ্ঞানিকদের বিশ্বাস এ বিশাল গ্যলাক্সিতে এমন সব বৃহদাকার তারকারাজি রয়েছে যার আলো আজও পৃথিবীতে এসে পৌঁছে নি। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, এ ধরনের বৃহদাকার লক্ষ লক্ষ তারকারাজিকে গিলে ফেলতে পারে, এ ধরনের অসংখ্য কূপ রয়েছে এ গ্যলাক্সিতে। যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা কোরআনে ইঙ্গিত করে বলেছেন :

فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ ﴾ وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ (الواقعة: 75-76

আমি এ তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করছি, নিশ্চয়ই এটা এক মহা শপথ। যদি তোমরা জানতে পার।” (সুরা ওয়াকেয়া, আয়াত: ৭৫-৭৬)

সৌরজগৎ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সূর্যকেই নেয়া যাক। মুনিরুদ্দিন আহমাদের এর লেখা বিস্ময়কর তথ্য সংবলিত একটি গ্রন্থ প্রজন্মের প্রহসন থেকে এই উদ্ধৃতিগুলো এখানে পেশ করছি-

সূর্য একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড

সমগ্র সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই সূর্য। বলতে গেলে গোটা সৌরজগৎটা সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘোরা-ফিরা করে, কিন্তু আমরা যারা নিত্য এই জ্বলন্ত প্রদীপটাকে দেখি, এর সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি। সকালে সূর্যের আলো দেখি, এক পর্যায়ে আবার আলোকে ডুবে যেতে দেখি, শীতের সকালে তা আমাদের আরাম দেয়। আবার গ্রীষ্মের প্রখরতায় তা থেকে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি, সব মিলে এটুকুই হচ্ছে আমাদের সাথে তার সম্পর্ক। সূর্য হচ্ছে এ বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি সাধারণ নক্ষত্র, তার প্রখরতা ও উষ্ণতাকে কোনদিনই কোন মানবীয় জ্ঞান পরিমাপ করতে পারেনি। প্রতি সেকেন্ডে ৪০ লক্ষ টন হাইড্রোজেন এর থেকে ছিটকে পড়ছে এমন সব তারকালোকে, যার তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীর বুকে মানব-সভ্যতার বিকাশের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত মানবকুল যতো এনার্জি ব্যয় করেছে তার চেয়ে দশগুণ বেশি এনার্জি প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার চারদিকে বিতরণ করে যাচ্ছে। যে গতিতে সূর্য তার হাইড্রোজেন ছড়াচ্ছে, তা একটি হাইড্রোজেন বোমার তুলনায় ১০ কোটি গুণ বেশি ক্ষমতা ও গতিসম্পন্ন। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার আশে-পাশে যে হিলিয়াম’ নামক তরল গ্যাস তৈরি করছে, তার পরিমাণ হচ্ছে ৫৬০৪ কোটি টন। এর শক্তি ও প্রখরতা এতো বেশি যে, যদি এর সামান্যতমও এই ভূমণ্ডলের কোথাও গিয়ে পড়ে, তাহলে তার ১০০ মাইলের ভেতর কোনো জীবজন্তু থাকলে তা জ্বলে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে। এই জ্বলন্ত সূর্যের সম্মুখ ভাগ থেকে প্রতি সেকেন্ডে আর একটি জ্বালানি গ্যাস নির্গত হয়, বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন স্পাইকুলাস’।এই গ্যাসের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মাইল। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এক অদ্ভুত বিকর্ষণশক্তি তাকে মুহূর্তেই আবার সূর্যের কোলে ছুঁড়ে মারে। এই যে অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডলী বানিয়ে রাখা হয়েছে, যার একটি অনু-পরমাণুও যদি ভূ-গোলকে সরাসরি ধাক্কা লাগে, তাহলে গোটা পৃথিবীটাই জলে-পুড়ে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে বলে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন। কিন্তু পৃথিবীর বুকে আলো বিতরণ করে একে ফলে-ফুলে সাজিয়ে দেয়ার এ আয়োজনটুকু করেছেন কে ? কে এই মহা শক্তিধর, একে এর ধ্বংসক্রিয়ার বদলে গড়ার কাজে লাগিয়ে রেখেছেন যিনি?

মানবীয় শরীর একটি ক্ষুদ্র জগৎ

মূলত: মানুষকে এ ব্যাপারে অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি-ইত্যাদি ছোট ছোট মাত্র কয়েকটির খবর তারা জানে, যা সমুদ্র হতে পাখির ঠোঁটে করে উঠানো এক ফোটা পানির চেয়েও নগণ্য। আজ বৈজ্ঞানিকগণ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সত্যই বলেছেন

– وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا(الإسراء: 85

তোমাদের খুব সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সুরা বনী ইসরাইল: ৮৫)

বিশ্বচরাচর ও ব্যক্তিসত্তা উভয়ের মধ্যে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনাবলী রয়েছে। বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে কুদরতের অনেক নিদর্শন আছে এবং আছে তোমাদের মধ্যেও। তোমরা কি অনুধাবন করবে না ? (সূরা যারিয়াত আয়াত ২০/২১) এখানে নিদর্শনাবলীর বর্ণনায় আকাশ ও সৌরজগতের সৃষ্টির কথা বাদ দিয়ে কেবল ভূপৃষ্ঠের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, এটা মানুষের খুব নিকটবর্তী এবং মানুষ এর উপর বসবাস ও চলাফেরা করে। আলোচ্য আয়াতে এর চাইতেও নিকটবর্তী খোদ মানুষের ব্যক্তিসত্তার প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠে ও ভূ-পৃষ্ঠের সৃষ্ট বস্তু বাদ দাও, খোদ তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে চিন্তা- ভাবনা করলে তোমরা এক একটি অঙ্গকে আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের এক একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তক হিসাবে দেখতে পাবে। তোমরা সহজেই হৃদয়ংগম করতে সক্ষম হবে যে, সমগ্র বিশ্বে কুদরতের যে নিদর্শন রয়েছে, সেইসব যেন মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের মধ্যে সংকুচিত হয়ে রয়েছে। এ কারণেই মানুষের। অস্তিত্বকে ক্ষুদ্র একটি জগৎ বলা হয়। সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টান্ত মানুষের অস্তিত্বের মধ্যে এসে স্থান লাভ করেছে। মানুষ যদি তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমগ্র অবস্থা পর্যালোচনা করে, তবে সে দৃষ্টির সামনে আল্লাহ তা‘আলাকে সদা উপস্থিত দেখতে পাবে। আসুন এবার তা হলে বেশি দুরে নয় একেবারেই নিজ দেহটার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায়। “প্রজন্মের প্রহসন” থেকে এ প্রসঙ্গের আর একটি উদ্ধৃতি এখানে পেশ করা গেল।

মানব শরীর সত্যিই এক অভূতপূর্ব মেশিন। এমন এক মেশিন যার যথার্থ বর্ণনা পেশ করা কোন দিনই কোন মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সম্ভব হবেই বা কি করে, এই শরীর তো কোন মানুষ নিজে বানায়নি যে, সে তার নিজস্ব সৃষ্টির যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্ব আপনাকে বলে দেবে। এই দেহের অভ্যন্তরীণ পরিশীলনের কথাই ধরুন না কেন, আমাদের হার্ট প্রতি মিনিটে ১০ পাউন্ড রক্ত সঞ্চালন করে, ব্যায়ামের সময় হার্টের এই রক্ত- সঞ্চালনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ পাউন্ডে। আমাদের শরীরে যতো রগ, শিরা-উপশিরা রয়েছে তার সবগুলোকে বাইরে এনে একটার সাথে জড়িয়ে লম্বা করতে থাকলে এর পরিমাণ হবে ৬০ হাজার মাইল। অর্থাৎ একটি মানুষের শরীরে শিরা-উপশিরা দিয়ে একজন মানুষ গোটা পৃথিবী প্রায় ৩ বার ঘুরে আসতে পারবে। সাধারণত: মানুষের শরীরে ৬ থেকে ১০ পাউন্ড রক্ত সর্বদা মওজুদ থাকে। রক্তের আবার দু,ধরনের রক্ত-কণিকা। কিছু আছে রেড সেল (লাল কণিকা) যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বহন করে। কিছু আছে হোয়াইট সেল (সাদা কণিকা) যার কাজ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রোগের প্রতিরোধ করা।

তা নিম্নরূপ :—

এক একজন মানুষের রক্তে রেড সেলের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি আর হোয়াইট সেল হচ্ছে আড়াই শত কোটি। অধিকাংশ হোয়াইট সেলের জীবনকাল হচ্ছে মাত্র ১২ ঘণ্টা, রেড সেলগুলো পরিমাণে একটু বেশিই বাঁচে, কোন কোন সেল ১২০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। একজন মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের জন্য যে শিরা বানানো হয়েছে, তার সবগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর জমির প্রয়োজন হবে। এর সব শিরাগুলো কিন্তু আবার একত্রে খোলা রাখা হয় না। তা হলে এক সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে সমস্ত রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে আসবে। এই শরীরের একটি অংশ যেখানে সর্বদাই রক্তের প্রয়োজন, তা হচ্ছে ফুসফুস।তার উপশিরাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সেখানকার রক্তকে পরিশুদ্ধ করে। গড়ে একজন মানুষ সারা জীবনে ৫০ কোটি বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। এই যে রক্তের কথা বললাম তা কী? রক্ত হচ্ছে পনির চেয়ে ঘন একটি পদার্থ, যদিও মানুষের শরীরের ৬০ ভাগই হচ্ছে পনি। এর পরিমাণ গড়ে ১০ গ্যালন। সেই হিসেবে রক্তের পরিমাণ হচ্ছে শতকরা ১০ ভাগ। মানুষের শরীরে আরো বহু ধরনের উপাদান রয়েছে। যেমন মানব দেহে এতো চর্বি আছে, যা দিয়ে ৭টি বড়ো জাতের কেক বানানো যাবে। এই পরিমাণ কার্বন, আছে যে, তা দিয়ে ২৮ পাউন্ড ওজনের এক ব্যাগ কেক বানানো যাবে। এত পরিমাণ ফসফরাস আছে যে, তা দিয়ে ২২ শত ম্যাচ বনানো যাবে। এই সব মিলে মানুষ্য শরীরটা হচ্ছে এক বিচিত্র সংগ্রহ-শালা। এখানে সব কেমিক্যাল আবার একত্রে না থাকলে তাতে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।

যেমন মানুষের খাবারে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়োডিন না থাকে, তাহলে তার গলদেশের নিম্ন-ভাগ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে, পরে এতে মারাত্মক ধরনের রোগ (goitr) দেখা দেবে। একটি শিশুর যখন জন্ম হয় তখন তার শরীরে হাড়ের পরিমাণ থাকে ৩০০৫টি। পরে অবশ্য এক দুটো মিশে পরিমাণ কমে তা ২০৬ এ দাঁড়ায়। ৬৫০টি পেশির দ্বারা হাড়গুলো বেঁধে রাখা হয়। গিরার পরিমাণ একশত। পেশির সাথে যেখানে হাড়ের সম্মিলন ঘটে, তা থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তার প্রতি বর্গইঞ্চি পরিমাণ জায়গার উপর কমপক্ষে ৮ হাজার কেজির মতো বোঝা সহজেই চাপানো যেতে পারে। এই আশ্চর্যজনক মেশিনটাকে ঢেকে রাখা হয়েছে একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক দ্বারা, যার নাম হচ্ছে চামড়া। গড়ে একজন মানুষের শরীরে এই চামড়ার পরিমাণ হচ্ছে ২০ বর্গফুট। এর উপরিভাগে আবার রয়েছে এক কোটি লোমকূপ। আমাদের রুচিবোধের জন্য কোনটা আমরা পছন্দ করি, কোনটা আমরা অপছন্দ করি-এটা বলে দেয়ার জন্য রয়েছে ৯ হাজার ছোট সেল। এগুলোকে যথারীতি সাহায্য করার জন্য রয়েছে আরো ১ কোটি ৩০ লক্ষ নার্ভ সেল। শরীরের বাইরের বস্তুগুলোর অনুভূতির জন্য দিয়ে রাখা হয়েছে ৪০ লক্ষ বহুমুখী সেল। এগুলোই আমাদের বলে দেয় কোনটা গরম, কোনটা ঠান্ডা, কোনটাতে কষ্ট লাগে, কোনটাতে আরাম অনুভূত হয়। এসব মেশিনপত্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মানবদেহের প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি শক্তির। একজন স্বাস্থ্যবান লোক গোটা জীবনে ৫০ হাজার কেজি পরিমাণ খাবার সংগ্রহ করে। পানীয়ের পরিমাণ হচ্ছে ১১ হাজার গ্যালন। যদি সে শহরের অধিবাসী হয়, তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে গড়ে সাত হাজার মাইল। আর যদি সে গ্রামের মানুষ হয় তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে ২৮ হাজার মাইল। এ লক্ষ-কোটি সেল, নার্ভ ও জটিল মেশিনপত্রের সমন্বয়ে তৈরি করা মানুষের শরীর। তার জন্য দুটো মূল্যবান বস্তু রয়েছে। একটি হচ্ছে এর কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ-কক্ষ, আরেকটি হচ্ছে জেনারেটর বা শক্তি উৎপাদন-যন্ত্র।

ব্রেন একটি বিস্ময়কর কম্পিউটার

প্রথমে বলি নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কথা। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কম্পিউটারের চেয়ে হাজার কোটি গুণ জটিল এই ছোট মেশিনটির নাম হচ্ছে ব্রেন। মাত্র তিন পাউন্ড ওজনের এ বস্তুটিকে একটি খুলির মাঝখানে এমনভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে যে, তা গোটা দেহের কোটি কোটি সেনা ও প্রহরীকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এর প্রতিটি কর্মতৎপর সেলের নাম হচ্ছে নিউরন। প্রতি সেকেন্ডে শত শত নিউরন এসে ব্রেনের প্রথম স্তরে জমা হতে থাকে। এগুলো এতো ক্ষুদ্র যে, এর কয়েক শত এক সাথে একটা আলপিনের মাথায় বসতে পারে। এগুলো হচ্ছে এক একটি ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল-যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রকের আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়। আমাদের পেছনে যে মেরুদণ্ড রয়েছে, তার মাধ্যমে তার সারা শরীরের যন্ত্রপাতিগুলোকে সজীব ও তৎপর রাখে। এর আবার স্বতন্ত্র কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। এক এক বিভাগের উপর একেক ধরনের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন কোন অংশকে বলা হয়েছে শোনার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে বলার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে দেখার জন্য। আবার কোন অংশকে বলা হয়েছে অনুভূতিগুলোকে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল টাওয়ারে ট্রান্সমিট করে দেয়ার জন্য। সর্বশেষ এতে আবার বসানো হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তিশালী মেমোরি সেল। যার কাজ নিত্য নতুন সংগ্রহগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় তাকে রিওয়াইন করে মেমোরিগুলোকে সামনে নিয়ে আসা। এই স্মৃতি সংরক্ষণশালা প্রতি সেকেন্ডে ১০টি নতুন বস্তুকে স্থান করে দিতে পারে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বপ্রকারের যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বকে যদি এক জায়গায় একত্র করে এ মেমোরি সেলে রাখা যায়, তাতে এর লক্ষ ভাগের এক ভাগ জায়গাও পূরণ হবে না।

 

চলবে……………

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ১)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪

প্রোফেসর সাহেবের ইউনিভারসিটি পড়ুয়া মেয়ে টেবিলে বাবার জন্য খাবার প্রস্তুত করে রেখেছেন ঘণ্টা দেড়েক থেকে। প্রতিদিনের মতো আজও বাবার সাথে খাবে-এ আশায় অপেক্ষা করছে অনেকক্ষণ থেকেই। কই ! বাবা যে আসছে না এখনও। বারবার হাতঘড়ির প্রতি দৃষ্টি দিচ্ছে আর বারান্দায় পায়চারি করছে প্রোফেসর সাহেবের একমাত্র মেয়ে অনার্সের শেষ বর্ষের ছাত্রী। পরীক্ষাও খুব কাছে এসে গেছে তার। খাওয়া শেষ করে পড়তে বসবে। হঠাৎ বাবার ফিরতে দেরি হওয়া অস্থিরতার কারণ হলো। খাওয়ার টেবিলে প্রতিদিনই নানা কথা হয় বাবা-মেয়ের মাঝে। মেয়ের কিশোর বয়সেই মা পৃথক হয়ে চলে গেছে অন্যত্র বিয়ে বসে। বাড়িতে বাপ মেয়ে ছাড়া অন্য কেউ নেই। হঠাৎ বারান্দা থেকেই দেখা গেল বাবা আসছেন। মলিন চেহারা, উসকো-খুসকো মাথার সাদা চুল। অবসাদের চিহ্ন ফুটে উঠেছে সারা মুখমণ্ডলে। অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট সারা অবয়বে। আঁৎকে উঠে বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে। ‎

কি হয়েছে বাবা ? তোমার এ অবস্থা কেন ? কারো সাথে ঝগড়া হয়েছে, না অন্য কোন সমস্যা ? প্রোফেসর সাহেব মুখ খুলছেন না। বলেন, না কিছুই হয়নি মা, আমি ঠিকই আছি। কিন্তু মেয়ে নাছোড়বান্দা। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, তোমাকে বলতেই হবে। বাবা, আমি জানতে চাই তুমি কেন আপসেট। মেয়ের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হন প্রোফেসর ইমতিয়াজ। তিনি বলেন, লোকেরা নানা প্রশ্নে আমাকে জর্জরিত করে দিয়েছে আজ। সারা জীবন যে মতবাদ প্রচার করেছি, যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে প্রমাণ করে এসেছি, ক্লাসে, লেখায় ও বক্তৃতায় দীর্ঘদিন শিক্ষা দিয়ে আসলাম। এখন এ চিন্তাধারা ভুল প্রমাণ করে আমাকে নাজেহাল করল তারা। আমি বাধ্য হয়ে বেরিয়ে এলাম ফিলোজফির ক্লাস থেকে। শুনে মেয়ে বলল, বাবা, তুমি এভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ? তোমার পূর্বে যারা এ চিন্তাধারার সূচনা করেছে, তাদের কথা স্মরণ কর।

সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছুই নেই। সবকিছু প্রকৃতি-এটা প্রচার করতে তাদেরকেও হিমশিম খেতে হয়েছিল। কিন্তু যতই যুক্তি-প্রমাণ আসতো, তাদের কথা ছিল একটিই। কোন যুক্তিতর্ক নেই। যা বলা হচ্ছে, তাই একমাত্র সত্য, এটাই মানতে হবে। এককথার উপর সুদৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে হবে। বাবা, প্লেটো, ডারউইন, কাল মার্কস-ইত্যাদি বড় বড় নামকরা বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আর দার্শনিকরা এমনই বলত। সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছুই নেই। এটা যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে ঠেকানো যাবে না- কোনকালেও। তারপরও বলে যেতো সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে। এটাই হচ্ছে মূলত নাস্তিকদের একমাত্র অস্ত্র যুক্তিতর্কের ধার তারা ধারে না। তারা এবং তাদের গুরুরা মূলত: এভাবেই প্রচার করতো নাস্তিকতাবাদ। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আমরা এসকল অথর্ব বোকা ও অর্বাচীনদের জন্য কিছু আলোচনা করব অতি সংক্ষিপ্তভাবে। পাঠকদের অনুরোধ করব এদের হাতে বইটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য, যা তাদের আখেরাতের পাথেয় হিসাবে কাজে লাগবে।

  • ভূমিকা

মানব ইতিহাসের কোন স্তরেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ কখনও কোন সন্দেহ করেনি, করার প্রশ্নও আসেনি। কোন বিবেকবান মানুষ, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক বা বুদ্ধিজীবী অতীতে কল্পনাও করতে পারেনি এ ধরনের চিন্তাধারার। প্রকৃতির প্রতিটি নিদর্শন, আর সৃষ্টির প্রতিটি পত্র-পল্লব যখন তাদের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের কথা চিৎকার করে ঘোষণা করছে । তখন মানুষ নামী একদল অনুভূতিহীন গোষ্ঠী বলে বেড়াচ্ছে যে, সবকিছু আপনা-আপনিতে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয়েছে। কেউ এসব সৃষ্টি করেনি। অন্যকথায়, সৃষ্টিকর্তা বলতে কেউ নেই, কিছু নেই। বিস্মিত হতে হয় যখন দেখা যায় যে এদেরকে আবার সমাজের কিছু লোক দার্শনিক বা বুদ্ধিজীবী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে এসব তথাকথিত লোকদের যুক্তি ও তথ্যসমূহ খুবই হাস্যকর। দর্শনের নামে কতগুলো উদ্ভট তথ্য তারা সমাজে প্রচার করে যাচ্ছে। আধুনিক যুগে খ্রিস্টান ধর্ম-যাজকদের একক সৃষ্টিকর্তার বদলে ত্রিত্ববাদ অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্‌ভাবনের বিরুদ্ধে গোঁড়ামিসূচক আচরণ দ্বারা পৌরোহিত্য প্রতিষ্ঠার কারণে গোটা পাশ্চাত্য সমাজ এ-ভ্রান্ত ও খুবই অযৌক্তিক মতবাদটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠে। এ সুযোগে একদল দার্শনিক অমূলক যুক্তি প্রদর্শন করে সেক্যুলার মিডিয়ার মাধ্যমে অবিরামভাবে জগৎব্যাপী প্রচার করতে সক্ষম হয়। সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত তথাকথিত দার্শনিকদের সেসব যুক্তিকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপের পরিবর্তে আরও যুক্তির দাবি আসতে থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে। প্রসিদ্ধি লাভের জন্য এসব তথাকথিত দার্শনিকগণ এভাবে অরও উৎসাহী হয়ে উঠে। জগৎবাসী তাদেরকে ঘাড় ধরে জিজ্ঞেস করেনি যে, ঘর থাকলে নির্মাতা থাকবে, কুড়াল থাকলে কামার থাকবে, নৌকা থাকলে কাঠ-মিস্ত্রি থাকবে, তাহলে কেন এ বিশাল জগৎটির সৃষ্টির পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা থাকবেন না ? অথচ মস্তিষ্কবিকৃত ব্যক্তি ছাড়া, একজন সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিও জানে যে, একটি ঘরের জন্য নির্মাতা, কুড়ালের জন্য কামার, গাড়ির জন্য ইঞ্জিনিয়ার যেমন অপরিহার্য, তেমনি এ বিশাল বিশ্ব-ব্যবস্থা সৃষ্টির পিছনে রয়েছেন মহান শক্তিশালী ও সুদক্ষ একজন কারিগর। আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই এ ধরনের অসংখ্য নিদর্শন সৃষ্টিকর্তার প্রমাণ হিসাবে উদ্ভাসিত হয়ে আছে। যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আমরা এ জগতের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ও অতি সাধারণ সামান্য জিনিসগুলো সম্পর্কেও বিশ্বাস রাখি যে, এসব কিছুর পিছনে একজন কারিগর রয়েছেন। এটা অস্বীকার করাকে অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতা ও গোঁয়ারতুমি ধরে নেয়া হয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এ বিশাল জগতের সৃষ্টি রহস্যের পেছনে সর্বশক্তিমান ও বিচক্ষণ সত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে যারা সন্দেহ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে যাচ্ছে, তাদেরকে এ যুগে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে মস্ত বড় বৈজ্ঞানিক-বিরাট দার্শনিক হিসাবে।

মূলত: অষ্টাদশ শতাব্দীতেই তথাকথিত বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন এবং কমিউনিজমের উদ্ভাবক কাল মার্কস এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ধারণা সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে প্রচার শুরু করেন পাশ্চাত্যের খ্রিস্ট মতবাদের ভ্রান্ত ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে, যা তাওহীদবাদী যুক্তি ভিত্তিক ইসলামের মোকাবিলায় টিকতেই পারে না। এদেরই অনুসারীরা অন্ধবিশ্বাসের ন্যায় এ মতবাদেও স্বপক্ষে ওকালতি করে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীর সর্বত্রই এদের কিছু অনুচর রয়েছে, যারা ধর্মহীন উচ্ছৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য ডারউইন ও কাল মার্কস-এর উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত।

সম্প্রতি বাংলাদেশে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুক্ত-বুদ্ধির দাবিদার কিছু কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর মাঝে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার সত্তাকে অস্বীকার করা আজকাল যেন একটা ফ্যাশানে পরিণত হতে চলেছে। মানুষ নামী এসব জীবগুলোকে আশরাফুল মখলুকাত এর উচ্চাসনে ফিরিয়ে আনার একটা প্রয়াসের প্রয়োজন অনেকদিন থেকেই অনুভূত হচ্ছে। আলাপ-আলোচনা আর তর্কবিতর্কের পরিবেশ দেশে অনুপস্থিত থাকায় লেখা বা প্রকাশনার মাধ্যমে এ কাজ সহজেই করা যায় বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

আল্লাহর পরিচয়

আল্লাহ একটি আরবি শব্দ। এ শব্দটি এমন এক সত্তার জন্যে নির্ধারিত, যিনি অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের অধিকারী, যিনি যাবতীয় পবিত্রতা, পরিপূর্ণতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার গুণাবলিতে ভূষিত এবং সকল প্রকার অসম্পূর্ণতা, অপবিত্রতা ও যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। সর্বোপরি যিনি এসব গুণাবলির একমাত্র অধিকারী। অর্থাৎ, যিনি ব্যতীত এসব গুণাবলির অধিকারী অপর কেউই নেই, তিনিই হলেন আল্লাহ। সর্বময় ক্ষমতার মালিক ও শক্তির একক আধার।

আল্লাহ ছাড়া এরূপ মর্যাদায় মর্যাদাবান আর কেউ নেই। এক্ষেত্রে তিনি একক, অনন্য। তার সমকক্ষ ও সমতুল্য কেউ নেই এবং থাকতে পারে না। তিনি তার সত্তা, গুণাবলি ও কার্যাবলির ব্যাপারে এক কথায় সর্বদিক থেকে একক, অনন্য ও অদ্বিতীয়। তাই তিনি শির্‌ক থেকে যেমন পবিত্র, তেমনি মুক্ত ও পবিত্র সৃষ্টির সাথে যাবতীয় সাদৃশ্যতা থেকে। বিশ্বজগতের তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, তিনিই একমাত্র অবশ্যম্ভাবী সত্তা (ওয়াজিবুল ওজুদ)। যাবতীয় সৃষ্ট বস্তুর সাথে সাদৃশ্য থেকে তিনি পবিত্র। মোটকথা, গোটা সৃষ্টিজগতের কেউ কোন দিক থেকে তাঁর মত নয়। তাঁর সাথে কারোই যেমন কোন প্রকার তুলনা হয় না, তদ্রুপ কোন কিছুর সাথে তাঁরও সামান্যতম তুলনা বা সাদৃশ্য নেই। আল্লাহ তা‘আলআহাদ’ তথা একক ও অনন্য হওয়ার প্রকৃত অর্থ এটাই। তাঁর সম্পর্কে এরূপ আকিদা বিশ্বাস পোষণ করাকেই ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় তাওহীদ’। আর এটাই ইসলামের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি

আল্লাহ কোন বস্তু নন এবং তাঁর গুণ-রাজি শুধু তাঁরই জন্য। তাঁর কোন গুণই অপর কারো মধ্যে কল্পনা করা যায় না। আল্লাহকে জানবার অসংখ্য পন্থা তাঁর সৃষ্টিজগতে উপস্থিত আছে। বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টির মাঝেই মূলত: আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্বের নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে নিজ পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন –

اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ. ( البقرة : 254 )

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া ? দৃষ্টির সামনে বা পিছনে যা কিছু রয়েছে, তিনি তার সবই জানেন। তাঁর জ্ঞান-সীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না-তবে যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর আসন (সার্বভৌম ক্ষমতা) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনি সর্বোচ্চ ও সর্বাপেক্ষা মহান। সুরা বকারা (আয়াতুল কুরসি), আয়াত নং ২৫৫।

তিনি আরও বলেছেন

تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴾ الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ ﴾ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ. ( الملك: 1-4 )

পুণ্যময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব বা সর্বময় ক্ষমতা। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান, যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমতাময়। তিনি সপ্ত আকাশকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিতে কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফিরাও, কোন ভ্রান্তি দেখতে পাও কি ? অতপর তুমি বার বার তাকিয়ে দেখ, তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে। (সুরামুলক ১-৪ আয়াত)

নাস্তিকদের যুক্তি ও সৃষ্টির নিদর্শন

নাস্তিকরা আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করার যুক্তি হিসেবে কতগুলো উদ্ভট ও অযৌক্তিক প্রমাণাদি পেশ করার অপ-প্রয়াস চালিয়ে থাকে। তারা বলে আল্লাহকে কেউ দেখে না, ধর্মের ধ্বজাধারীরা সাধারণ মানুষকে শোষণ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর একটা ধারণা প্রসূত মতবাদ দাঁড় করানোর জন্য অদেখা-অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে মনগড়া কথাবার্তা চালু করে রেখেছে। জীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা এখন আর অসম্ভব নয় বলে অবৈজ্ঞানিক অস্পষ্ট চিন্তাধারার বিশ্বাস করারও কোন প্রয়োজন নেই। ভীতি প্রদর্শনের জন্য পরকালের কঠোর আজাবের কথা আর ভোগ লালসার আশ্বাসবাণীর জন্য স্বর্গ-এগুলো ধর্মেরই তৈরি, যার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা যা অনুভাব করা যায় না, তা কিভাবে বিশ্বাস করা যেতে পারে ? আল্লাহ নামক এই ধারণা মানুষেরই সৃষ্টি। মূলত: আল্লাহ বলতে কিছু নেই।

নাস্তিকদের মোটামুটি যুক্তিগুলো এ ধরনেরই। এসব কথাকেই নানাভাবে, নানা ভঙ্গিতে তারা পেশ করার চেষ্টা করে। অথচ তারাই আবার এমন সব জিনিস সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় না-যা আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত অনুভাব করি ও বিশ্বাস করি। অদেখা হাজারো জিনিস আমরা প্রতিনিয়ত অনুভাব করে, না দেখে বিশ্বাস করি। মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। দেয়ালের অপর পাশে কি আছে, তা দেখার শক্তি আমাদের নেই। ধুয়ার কুণ্ডলী দেখলেই আমরা বুঝতে পারি পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে। আগুনের লেলিহান শিখা কিন্তু আমরা দেখিনি, দেখেছি তার নিদর্শন। তাতেই আমাদের বিশ্বাস হয়েছে-ওখানে অবশ্যই আগুন আছে। তখন কিন্তু আমরা যুক্তি দিতে চেষ্টা করি না যে, না, আগুনতো দেখা যাচ্ছে না। তাই বিশ্বাসও করব না। এ যুগের অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ইলেক্ট্রনিক, ইথর, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন-আরো অনেক জিনিস আমরা শুধু নিদর্শন দেখেই বিশ্বাস করে থাকি। রেডিওর আওয়াজ, বিদ্যুতের আলো আর শ্বাস-প্রশ্বাসের নির্গত ও বহির্গত বায়ুও আমরা দেখি না, শুধু অনুভব করি। কেউ কি বলতে পারে যে এসব অদৃশ্য কথাবার্তায় আমরা বিশ্বাস করব না। এগুলো আমাদের দেখতে হবে। তবেই মাত্র বিশ্বাস করা যাবে। এ ছাড়াও বলা যায়, আগামী কিছুদিন পরই আরম্ভ হচ্ছে ২০০০ সালের বর্ষ বরণ উৎসব। তা শুনে আমরা সবাই বিশ্বাস করেছি। এটা কেন বলা হচ্ছে না যে- ২০০০ সাল আসুক, উৎসব উদ্‌যাপিত হক, তারপর বিশ্বাস করব-এখন না দেখে কীভাবে বিশ্বাস করব ? ক্রুজ মিসাইল আমরা দেখি না। কিন্তু আছে, তা বিশ্বাস করি। এখানে এ প্রশ্ন করি না কেন-দেখি না তাই বিশ্বাসও করব না। তাহলে স্রষ্টার এ বিশাল জগৎটা এত সুন্দর ও সুবিন্যস্ত আর সুশৃঙ্খল দেখেও কেন আমরা তাঁর শক্তিধর সূক্ষ্ম কারিগর সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করব ? আহম্মকী-বোকামি আর বিকৃতিরও একটা সীমা আছে।

মানুষ ব্রেনের করণেই সৃষ্টির সেরা জীব-আশরাফুল মখলুকাত। কিন্তু এ ব্রেন থাকা সত্ত্বেও এর অপব্যবহার করে সে যদি নিজেকে গরু-ভেড়া আর ছাগলের স্তরে নামিয়ে পশুর লাইনে দাঁড়াতে চায় তাহলে কে তাকে রক্ষা করতে পারে ! এসব বিকৃতমনা তথাকথিত বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকরা মূলত: নিজেরাই নিজেদের জন্তু জানোয়ারের স্তরে নিয়ে গেছে। আমাদের দেশে সেই অ-কবরী” বুদ্ধিজীবীদের এখনও যারা শ্রদ্ধা জানাতে ব্যস্ত তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা দরকার, ওরা যখন আবার ঢাকার আবহাওয়াকে দূষিত-কলুষিত করার চেষ্টা করবে তখনও কি এরা ছুটে যাবে সেখানে নাকে কাপড় গুঁজে ওদের শ্রদ্ধা জানাতে ? মূলত: এদেরকে লক্ষ করেই কোরআন বলেছে-

خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ (البقرة :7 )

তাদের হৃদয় ও কর্ণকুহরে সিল মেরে দেওয়া হয়েছে আর তাদের চক্ষুর সম্মুখে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অন্ধত্ব। (সুরা বাকারা :৭)

ঐ অ-কবরীর এ জ্বলন্ত আজাব দেখেও তারা দীক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না, এটাই বিস্ময়ের ব্যাপার।

কিছু মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্টতর

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের নিজের শরীরের মধ্যে তার অস্তিত্বের বহু নিদর্শন রেখে দিয়েছেন। বিস্মিত হতে হয় যখন কেউ গভীরভাবে তার নিজস্ব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর চিন্তা করে। সামান্য একটি অঙ্গকে বিশ্লেষণ করলেই সে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। এসব কথা ভাবলে কোন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়াও যে কোন বিবেকবান লোক অনায়াসেই আল্লাহর অস্তিত্বের বিশ্বাসী হতে বাধ্য। হৃৎপিণ্ডের চালিকাশক্তি ঠিক জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলছে। এক মুহূর্তও এর গতি বন্ধ হয়নি। চলছে আর চলছে। কে এ মেশিনটাতে রক্ত সঞ্চালন করছে ? এ ধরনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শারীরিক মেশিনসমূহ দিন-রাত ক্রমাগত চলছে, কোন বিরতি নেই। সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকারকারী নাস্তিক আর তাঁর আনুগত্যকারী মোমিন একই ভাবে এর দ্বারা বেঁচে আছে। আরও অসংখ্য মেশিন তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রতিনিয়ত সেবায় নিয়োজিত। এসব নিদর্শন রয়েছে তার অতি নিকট এবং নাগালের মধ্যে। কিন্তু আল্লাহ যাকে অন্ধ বানিয়েছেন, সে কি আর দু চোখ মেলে কিছু দেখতে পায়? এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা মোমিনদের বলেছেন চক্ষুষ্মান আর কাফেরদের বলেছেন অন্ধ। কাফির শব্দটা কোন ফতোয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে অস্বীকারকারী | ঠিক দুপুর সময়ে মধ্য আকাশে যখন সূর্য থাকে, তখন যদি কোন লোক বলে এখন রাত্রি-দ্বিপ্রহর, তখন তাকে আপনি কি বলবেন ? মূলত: এরা বোকা, অজ্ঞ আর জন্তু-জানোয়ারের মত। নিজেদের তারা যতই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মনে করুক না কেন।

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آَذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ (الأعراف: 179 )

আমি অনেক জিন ও মানুষকে দোজখের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের অন্তর রয়েছে, তারা তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা তারা দেখে না আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শুনে না, তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। (সুরা আরাফ:১৭৯)

 

চলবে………………