Category Archives: পুরুষদের জন্য

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

তাক্বওয়াঃ (আবু সুমাইয়া মতিউর রহমান)

তাক্বওয়া

আলোচকঃ আবু সুমাইয়া মতিউর রহমান

ডাউনলোড করুন

বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিরক-কুফুরী ও হারম কিভাবে?

বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিরক-কুফুরী ও হারম কিভাবে?

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস্ব সলাতু ওয়াস সালামু আ’লা রসুলিহীল আমীন। শুধুমাত্র পথপভ্রষ্ট মুসলিমদের নাসীহাত ও যারা দালীলগুলো স্পষ্ট করে জানেন না বা বুঝেন না তাদের জন্য লিখাটি দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ একে কবুল করুন এর মাধ্যমে পরিশুদ্ধি দান করুন এবং লিখার ভুল-ত্রুটি গুলো ক্ষমা করে দিন আমীন।

স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবস, বিজয় দিবস এরকম নানা জাতীয় দিবসগুলোতে মানুষ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করে, সম্মানে শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে থাকে, ফুল দেয়, গান গায় এবং নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিন্তু ইসলামে এসব পালন করা হারম ও অনেকক্ষেত্রে শিরক-কুফুরী ও জাহেলিয়াত। কিন্তু অনেক জ্ঞানী-শিক্ষিত (দুনিয়াবী দিকে) লোকের কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট না। আসুন দেখি কুরআন ও সহীহ হাদিস কি বলে।

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ বলেছেনঃ

আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সঃ) কোন কাজের আদেশ করলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর ঐ বিষয়ে আপত্তি করার ক্ষমতা নেই। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়।”   (সুরা আহযাবঃ ৩৬)

►এবার আসি আসল বিষয়ে,

ঈদ শব্দটি নেয়া হয়েছে মুআওয়াদা শব্দের ( যা বার বার ফিরে আসে) এবং ইতিয়াদ (যে কাজ বারবার করা হয়) একই শব্দমূল হতে। অর্থাৎ আমরা যদি কোন আনন্দ-ফুর্তির বিশেষ ক্ষন বারবার করি অথবা বারবার ঐজন্য একই স্থানে জমায়েত হই তাহলে সেটা এক প্রকার ঈদ। অথচ,

“সাহাবী আনাস বিন মালিক (রঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূলে কারীম সা. যখন মদীনায় আসলেন তখন দেখলেন বছরের দুটি দিনে মদীনাবাসীরা আনন্দ-ফুর্তি করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ দিন দুটো কি ? তারা বলল যে আমরা ইসলামপূর্ব মুর্খতার যুগে এ দুদিন আনন্দ-ফুর্তি করতাম। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ আল্লাহ তাআলা এ দুদিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটো দিন তোমাদের দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।(সাহীহ আবু দাউদঃ ১১৩৪ [http://sunnah.com/abudawud/2])

তাহলে আমরা কিভাবে একাধিক দিবস বানিয়ে নিতে পারি?

আবারো খেয়াল করি, জাহেলিয়াতের যুগে যে দুই দিনে মানুষ আনন্দ ফুর্তি করত তা বাদ দিয়ে আমাদের মুসলিমদের দুইটি নতুন ঈদ দেয়া হয়েছে এর মানে আমরা মুসলিম হয়ে থাকলে অন্য সকল দিবস পালন বাতিল হবে।

এবার আসি আরেক ২ সহীহ হাদিসে,

“যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের (যদি কাফির-মুশরিকদের) সাথে মিল বা সাদৃশ্য রাখবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” (আবু দাউদঃ ৪০৩১ [http://sunnah.com/abudawud/34])

এখন প্রশ্ন হল, মুসলিম জাতির মধ্যে কোন বিধানে লিখা আছে, দিবস পালন করতে হবে যেখানে এসব দিবস পালন করে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা।

_____________________________________________________________

 ► দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখব কারো সম্মানে দাড়ানো কেন নিষেধ?

রসুল (সঃ) ও তাঁর খলিফা (রঃ) এর আমলে কোন নিয়ম ছিলই না কারো সম্মানে দাড়ানোর বিষয়টি।

কুর’আন কি বলে দেখা যাকঃ

………আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।  [সূরা বাক্বরঃ ২৩৮]

শুধুমাত্র আল্লাহর সামনেই সম্মানে দাঁড়ানো যায় এমনকি মালাইকারাও আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে থাকে।

১. আনাস বিন মালিক (রঃ) বলেন, “সাহাবায়ে কিরামের নিকট রাসুলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা কোন ব্যক্তিই অধিক প্রিয় ছিল না। অথচ তাঁরা যখন তাঁকে দেখিতেন তখন দাঁড়াতেন না। কেননা,তাঁরা জানতেন যে, তিনি ইহা পছন্দ করেন না”। (সাহীহ তিরমীজিঃ ২৭৫৪ [ http://sunnah.com/tirmidhi/43])

২. মুয়াবিয়াহ (রঃ) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার সম্মুখে অপর লোকদের প্রতি মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা পছন্দ করে,সে যেন জাহান্নামের মধ্যে তার বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (সাহীহ তিরমীজিঃ ২৭৫৫ [http://sunnah.com/tirmidhi/43])

আর কিছু বলা দরকার পড়ে বলে মনে হয় না, বড় বড় আলেমদের মতে এটা শিরক এর একটা ভিত্তি। (দেখুনঃ http://islamqa.info/en/130805) যেখানে রসুল (সঃ) এর সম্মানে দাঁড়ানো যায় না সেখানে জাতীয় সঙ্গীত আর মিনার, মৃত ব্যাক্তির সামনে সম্মানে কিভাবে দাঁড়ানো যায়? আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া ও বাজানো সেটা যে হারম এটা সবাই জানে।

 “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” এটা গানে গানে না বলে অন্তরে বাস্তবায়ন করে দেখানো উচিত। যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য রক্ত দেয় অথচ বর্তমান প্রজম্মরা হিন্দি আর ইংরেজি কার্টুন আর গান ছাড়া কিছুই বুঝে না সে দেশের সমাজের মা-বাবা হিসেবে কতটুকু দেশপ্রেম আমরা দেখাচ্ছি সেটাই ভাববার বিষয়।

► ও আর একটা কথাঃ “দেশপ্রেম ঈমানের অংগ” এটা একটা জাল হাদিস এটা আরবের একটি প্রবাদ ছিল এর কোন ভিত্তিই নাই।

____________________________________________________________

 ►এবার আসি জাতীয়তাবাদ ইসলামে কেন হারম ?

আসাবিয়াহ আর অর্থ বংশবাদ বা জাতীয়তাবাদ বা গোত্রপ্রীতি ব্যাপারে রসুল (সঃ) সরাসরি বলেছেনঃ

যদি তুমি শুনতে পাও কেউ জাহেলিয়া যুগের (আসাবিয়াহ বা জাতীয়তাবাদ) ডাক দিচ্ছে,তাকে বলো সে যেন তার পিতার জননেন্দ্রীয় কামড়ায়”। [মুসনাদে আহমাদ হাদিস নং ২১২৩৩]

আবু দাউদে বর্ণিত হাদীসে আল্লাহ্‌র রাসূল (সঃ) বলেন,

সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়াহ দিকে ডাক দেয়, (ন্যাশনালিজম বা জাতিয়তাবাদ) বা আসাবিয়াহর কারণে লড়াই করে কিংবা আসাবিয়াহর কারণে মৃত্যুবরণ করে”।

একটি বিশদ হাদিসের প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ (সঃ) জাতীয়তাবাদ,বর্ণবাদ এবং দেশপ্রেমের সম্পর্কে বলেন,

এগুলো ত্যাগ কর, এগুলো তো পঁচে গেছে

[বুখারীঃ অধ্যায়ঃ ৬৫-৪৯৫৬, তাওহীদ প্রকাশনীঃ ৪৯০৫ (http://sunnah.com/urn/45850)]

আসাবিয়াহ যে ইসলামে বাতিল সেটা প্রমান হয় “হাজ্জ” এর মাধ্যমে।

এখন প্রশ্ন থাকলো, আমরা নিজেদের মুসলিম উম্মাত দাবি করি, কবরে রাখার আগে দু’আ পড়ি যে, “অমুক লোক মুহাম্মাদী ত্বরীকার উপরে মারা গেছেন” অথচ আমরা জাতীয়তাবাদ নিয়ে লাফাই এটা কি মুসলিম জাতির কাজ নাকি সে রসুল (সঃ) উম্মাহর বহির্ভুত?

_____________________________________________________________

►এবার সবচেয়ে জটিল বিষয়ে আসব, শিরক-কুফুরী কিভাবে হয় সেটা দেখার জন্য এর জন্য ছোট ইতিহাস টানা যাক এবং সেটা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত।

 সুরা নূহঃ ২৩-২৪ পড়া যাক এবং সেটার তাফসীর ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া প্রথম খন্ড (পৃষ্ঠাঃ ২৪৬-২৪৮) এবং বুখারীর ভাষ্য ফাতহুল বারী এর পৃঃ ৬-৭ থেকে যা পাওয়া যায় দেখা যাক

 মহান আল্লাহ বলেনঃ

মুশরিকরা বলছেঃ তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসরকে। অথচ তারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব আপনি জালেমদের পথভ্রষ্টতাই বাড়িয়ে দিন।(সুরা নুহঃ ২৩-২৪)

ঐ নাম গুলো পুর্বের নেকবান্দাদের নাম যাদের মুর্তি বানিয়ে পুজা করা হতো।

(বিস্তারিত হাদিসঃ সাহীহ বুখারী-তাওহীদ প্রকাশনীঃ ৪৯২০)

 আসুন একটি ঘটনার মাধ্যমে জানি কিভাবে মুর্তিপুজার শিরক এসেছে আমাদের এই দুনিয়ায়ঃ

ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসরকে এরা ছিলেন নুহ (আঃ) এর পুর্বের নেকবান্দারা। তাদের সততার জন্য লোকজন তাদের ভালোবাসত। একদিন তারা মারা গেল তাদের কবর দেয়া হলো। সবাই খুব মন খারাপ আর বিষন্ন তাদের হারিয়ে। তাই হঠাৎ ইবলীস (শয়তান) এসে ঐ গোত্রের লোকদের বললঃ ‘তোমরা কি তোমাদের এই নেক বান্দাদের স্মরন করতে চাও না? এক কাজ কর আমি ওদের চেহারার মুর্তি স্মৃতিস্তম্ভে বানিয়ে দেই তোমরা সময়ে সময়ে গিয়ে সেখানে তাদের দেখে আসবে।’ এরপর সবাই রাজি হল। আবার বছর খানেক পর ঈবলীস এসে কুমন্ত্রনা দিয়ে বললঃ ‘আরে তোমরা এত কষ্ট করে এতদুরে ওদের স্মৃতিস্তম্ভে যাও!! বরং তোমরা তোমাদের ঘরে ওদের মতো মুর্তি তৈরি করে স্মরন করলেই হল।’ সবাই তো মহাখুশিতে ঘরে ঘরে মুর্তি বানিয়ে সুবিধা মতো করে মৃতদের স্মরন করে। এবার কয়েক প্রজম্ম পর যখন সবাই ভুলে গেল কি কারনে ঐ মুর্তি রাখা হত তাই আবার ইবলীস এসে ঐ লোকদের সন্তানদের কাছে বললঃ ‘হায়! হায়! তোমরা কি কর! তোমাদের মা-বাবা, পুর্বপুরুষরা তো এদের কাছে রিযিক চাইতো আর ওদের কাছে মাথা নোয়াতো (সিজদাহ)।’ তখন ঐ জাহেল লোকেরা শায়তান এর ধোকায় পড়ে ঐ নেকবান্দা দের পুজা করা শুরু করল। আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসুল নুহ(আঃ) কে পাঠালেন।

এটা ছিল পুর্বের মুর্তি পুজার কাহিনী।

 একই কাহিনী তো আমাদের সমাজেই আছে!! ওলী আউলিয়া মারা গেলেও মাজার করে শিন্নি-দরগাহ পুজা শুরু হয় আর,

ভাষার জন্য শহীদ (!) হয়ে তার জন্য মিনার বানানো হয় সম্মানে সেখানে দাঁড়িয়ে এ প্রজম্ম করে বিনম্র (মানে মাথা নত করে) শ্রদ্ধা। আর বলা হয় “অমর একুশে”  অথচ সুরা রহমানঃ ২৬ বলা আছে, “ভুপৃষ্ঠের সব কিছুই ধ্বংসশীল” একমাত্র আল্লাহই “হাই” অমর, চিরঞ্জীব। কিভাবে আমরা আমাদের মুখ দিয়ে এসব ঘেন্নাকর কথা বলি অথচ আমরা দাবি করি মুসলিম?

 এরকম মিনার, গনকবর এর প্রাচীর আর প্রতিকৃতি একসমইয়  কয়েক প্রজম্ম পরে আমাদের বংশধরেরাই মুর্তি মনে করে, সৎ মনে করে, বরকাতময় মনে করে পুজা শুরু করে দিবে যেভাবে নুহ (আঃ) এর আমলে শুরু হয়েছিল।

দুটি গুরুত্বপুর্ন কথাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,আপনি কি তাদের দেখননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পাওয়ার পরেও প্রতিমা যাদু (জিবত) ও তাগুতের প্রতি ঈমান আনে” (সুরা নিসাঃ ৫১-৫২)

রসুল(সঃ) এর হাদিস,আমি আশংকা করছি তোমরা তোমাদের পুর্ববর্তী লোকদের রীতিনীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, এমনকি তারা যদি সাপের গর্তে ঢুকে তোমরাও তাতে ঢুকে যাবে। সাহাবা(রঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসুল্লাল্লাহ তারা কি ঈয়াহুদী ও খৃষ্টান? তিনি বললেন, তারা ছাড়া আর কারা?”   (বুখারী ও মুসলিম)

 

 

 

 

► একজন বলছিলেন, “ঐ আমলে তো লোকেরা মুর্খ ছিল তাই না বুঝে পুজা করত”

তাকে বলা হচ্ছে,  “এই আমলে মানুষ জ্ঞানী বলেই তো এসব আর বানাবেই না। কারন ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়। কোনো সুস্থ মানুষ কি চাইবে একই ভুল বার বার হোক? যেহেতু তারা না বুঝে মিনার সম্মান থেকে মুর্তি পুজা করেছে সেখানে আমরা জ্ঞানী হয়ে আরো ভালোভাবে বুঝবো যে এসব জিনিষ বানানোও আসলে মুর্খদের কাজ আর পালন করা আরো বেশি মুর্খতা

সর্বশেষ একটি সাধারন কথা,

হয়ত এসব ব্যাখ্যা বুঝলেও হজম করতে অনেক কষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু মাথায় রাখবেন, মারা যাবার পর আল্লাহ যদি আপনাকে আর একজন তাওহীদবাদিকে পাশাপাশি রেখে প্রশ্ন করেন,

 ১. কেন দিবসটা পালন করলা? ২. কেন গান গাওয়ার জন্য দাড়ালা?

৩. কেন মিনার-কবর পাকা করে বানালা? ৪. কেন জাতীয়তাবাদ গ্রহন করলা?

তখন সে হয়ত আল্লাহকে এতটুকু বলতে পারবে যে,  আমি চেষ্টা করেছি এ থেকে বেচে থাকার অন্তর থেকে ঘৃনা করার আর অন্যকে সঠিক তথ্যটা জানানোর।

কিন্তু আপনার কি উত্তর হবে?

আল্লাহ আমাদের অন্তরের না বুঝার অজুহাত দূর করে হক্ব পথে নির্ভয়ে চলার তাওফীক দিন আমীন।

মুসলিমের হক

মুসলিমের হক

আলী হাসান তৈয়ব

ইসলাম আমাদের সুপথ দেখায়

ইসলাম একটি মহান দ্বীন। ইসলাম নির্মাণ করেছে তার অনুসারীদের জন্য সঠিক পথ। এতে রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সুন্দর সমন্বয়। এতে কাউকে ঠকানো হয়নি। সবাইকে দেয়া হয়েছে তার প্রাপ্ত অধিকার। ইসলাম যেসব হক বা অধিকার দিয়েছে, তার অন্যতম হলো, এক মুসলিম ভাইয়ের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক।

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের অর্থ

আমরা জানি, মুসলিমরা আজ স্রোতে ভাসা খড়কুটার মতো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। মুসলিমদের কাতার হয়ে পড়েছে টুকরো টুকরো। তারা হয়ে পড়েছে শতধা বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহর প্রতি সবলের চেয়ে দুর্বল, সম্মানির চেয়ে অসম্মানী ও কাছের চেয়ে দূরের লোকরা বেশি লালায়িত। দৃশ্যত উম্মাহ হয়ে পড়েছে বানর-শূকরের বংশধর পৃথিবীর হীন, তুচ্ছ ও ঘৃণ্যতর জাতির জন্য একটি বৈধ বাসনের মতো। যার ইচ্ছে তা ব্যবহার করতে পারে। যেখানে ইচ্ছে তাকে ফেলে রাখতে পারে। এর প্রধান কারণ, বর্তমান বিশ্ব সম্মান করে শুধু সবলকে। অথচ উম্মাহ হয়ে পড়েছে দুর্বল। কেননা বিভক্তি দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও ধ্বংসের প্রতীক। পক্ষান্তরে শক্তি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও একতার নিদর্শন।

এমন লাঞ্চনাকর ও অপমানজনকভাবে উম্মাহ তখনই বীর্যহীন অবস্থায় আবির্ভূত হয়েছে, যখন তাদের শক্তি ও ঐক্যের উৎস হারিয়ে গেছে। হ্যা, সেটি হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক রচিত আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের বাঁধন বা ‘আল-উখুওয়াহ ফিল্লাহ’। তাওহীদের এই নিরেট, পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত চেতনা ছাড়া বাস্তবে এই ভ্রাতৃত্বের বাঁধনকে পুনর্জীবন দান করা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন এই ভ্রাতৃত্বচেতনা মুসলিমদের প্রথম জামাতকে মেষের রাখাল থেকে সকল জাতি ও সকল দেশের নেতা ও পরিচালকে রূপান্তরিত করেছিল। এ রূপান্তর ও পরিবর্তন তখনই সূচিত হয়েছিল যখন তাঁরা পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া এই ভ্রাতৃত্বকে তাঁদের কর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন। এই উজ্জ্বল, দ্যুতিময় ও দীপান্বিত চিত্র সেদিন ভাস্কর হয়ে ওঠেছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম যেদিন মক্কায় তাওহীদের অনুসারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের উদ্বোধন করেছিলেন। বর্ণ ও গোত্র এবং ভাষা ও ভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে বপণ করেছিলেন এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও একতার বীজ। ভ্রাতৃত্বের এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি কুরাইশ বংশের হামযা, গিফারী বংশের আবূ যর আর পারস্যের সালমান, হাবশার বিলাল ও রোমের হুসাইব রা. প্রমুখকে। একতা ও ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে তাঁরা সবাই যেন অভিন্ন কণ্ঠে আবৃত্তি করছিলেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াত :

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (10)

‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ [সূরা আল-হুজরাত : ১০]

তারা যেন দুলে উঠলেন নিচের এই সুমিষ্ট পঙতির দোলায়-

أبى الإسلام لا أبَ لى سِوَاهُ

إذا افتخروا بقيسٍ أو تميمِ

কবিতাটির মর্মার্থ এমন- ‘যখন তারা কায়েস বা তামীম ইত্যাদি বংশ নিয়ে বড়াই করছিল, ইসলাম তখন বংশ নিয়ে গর্ব ত্যাগ করে বললো, ইসলামই আমার বাপ, ইসলাম ছাড়া আমার কোনো বংশ নেই।’

এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভ্রাতৃত্ব রচনার প্রথম পর্ব। এরপর দ্বিতীয় পর্বে সুদীর্ঘ রক্তাক্ত যুদ্ধ ও বহুকাল ধরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে তিনি ভ্রাতৃত্ব গড়ে দেন মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে! তারপর তৃতীয় পর্বে তিনি ভ্রাতৃত্ব রচনা করেন মদীনার আনসার ও মক্কার মুহাজিরগণের মাঝে। এ ছিল মৈত্রি ও ভালোবাসার এমন উৎসব, পুরো মানবেতিহাসে যার দ্বিতীয় উপমা নেই। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের বন্ধন রচিত হলো। মনের সাথে মনের মিলন হলো। এমন হৃদয়কাড়া দৃশ্যও মঞ্চায়িত হলো বুখারী ও মুসলিমে যার বিবরণ এসেছে এভাবে :

আনাস রা. বলেন,

قَدِمَ عَلَيْنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ وَآخَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَهُ وَبَيْنَ سَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ ، وَكَانَ كَثِيرَ الْمَالِ فَقَالَ سَعْدٌ قَدْ عَلِمَتِ الأَنْصَارُ أَنِّي مِنْ أَكْثَرِهَا مَالاً سَأَقْسِمُ مَالِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ شَطْرَيْنِ وَلِي امْرَأَتَانِ فَانْظُرْ أَعْجَبَهُمَا إِلَيْكَ فَأُطَلِّقُهَا حَتَّى إِذَا حَلَّتْ تَزَوَّجْتَهَا فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ فَلَمْ يَرْجِعْ يَوْمَئِذٍ حَتَّى أَفْضَلَ شَيْئًا مِنْ سَمْنٍ وَأَقِطٍ فَلَمْ يَلْبَثْ إِلاَّ يَسِيرًا حَتَّى جَاءَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَعَلَيْهِ وَضَرٌ مِنْ صُفْرَةٍ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَهْيَمْ قَالَ تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً مِنَ الأَنْصَارِ فَقَالَ مَا سُقْتَ فِيهَا قَالَ وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ ، أَوْ نَوَاةً مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ.

‘আমাদের কাছে আবদুর রহমান বিন আউফ এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ বিন রাবী‘র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে দিলেন। তিনি ছিলেন বিত্তশালী। সা‘দ রা. বললেন, আনসাররা জানে আমি তাদের মধ্যে সবচে বেশি সম্পদশালী। আমি আপনার এবং আমার মাঝে নিজ সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করে নেব। আমার দুইজন স্ত্রী আছে। আপনি দেখেন কাকে আপনার বেশি সুন্দরী মনে হয়। আমি তাকে তালাক দেব। তারপর তার ইদ্দত শেষ হলে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। আবদুর রহমান বললেন, আল্লাহ আপনার সম্পদে বরকত দিন। আপনি আমাকে বাজার কোথায় দেখিয়ে দিন। বাজার থেকে তিনি কেবল তখনই ফিরে এলেন যখন তার কাছে অল্প কিছু মাখন ও পনির অবশিষ্ট রয়ে গেল। ক্ষণকাল বাদেই সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তাঁর ওপর ছিল ….। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমানের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘(মাহইয়াম) ঘটনা কী?’ আবদুর রহমান বললেন, আমি এক আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি বললেন, ‘তাকে কী দিয়েছো’? বললেন, খেজুরের বিচি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা বলেছেন, স্বর্ণের একটি বিচি। তিনি বললেন, ওলীমা করো, হোক না তা একটি ছাগল দিয়ে।’ [বুখারী : ৩৭৮১]

আজ আমরা সা‘দ বিন রবী‘ রা. -এর যুগের কথা কল্পনা করে আফসোস করি আর বলি, কোথায় সেই সা‘দ বিন রবী‘ রা. যিনি নিজ সম্পদ ও সহধর্মীনিকে দুই ভাগে ভাগ করবেন?!! এর উত্তর হলো, সেদিন আর নেই। সেদিন তো তখনই বিদায় হয়েছে যেদিন আবদুর রহমান রা. বিদায় নিয়েছেন। তেমনি যখন জিজ্ঞেস করা হয় কোন সে ব্যক্তি যিনি সা‘দ রা.-এর মতো বদান্যতা ও মহানুভবতা দেখাবেন? তার জবাবে বলা হবে, কোথায় সেই ব্যক্তি যিনি আবদুর রহমান রা.-এর মতো অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করবেন?!!

আরেকটি সুন্দর ঘটনা : এক ব্যক্তি পূর্বসুরী এক নেককার বান্দার কাছে গিয়ে বললেন, কোথায় তারা –

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً

‘যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে’? [সূরা আল-বাকারা : ২৭৪]

তিনি বললেন, তারা তো তাদের সাথেই অতীত হয়েছেন-

لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا

‘যারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না।’ [ সূরা আল-বাকারা : ২৭৩]

প্রিয় পাঠক, এই হলো পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের কিছু চিত্র। আল্লাহর কসম! এই হাদীসটি যদি সর্বোচ্চ স্তরের একটি শুদ্ধ হাদীস না হতো, তাহলে আমি নির্ঘাত একে একটি কাল্পনিক দৃশ্য বলে আখ্যায়িত করতাম।

হ্যা, এটিই নির্ভেজাল ভ্রাতৃত্ব। এই হলো প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব। কারণ, আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে কেবল আকীদার বাঁধন, ঈমানের বন্ধন ও আল্লাহর ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, যার শিকড় কখনো উপড়ে পড়ে না।

ইসলামী ভ্রাতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া একটি সামগ্রিক নেয়ামত। এটি আল্লাহর এমন এক দান, প্রকৃত মুমিনদের প্রতি যা প্রচুর ধারায় প্রবাহিত হয়। আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব শুভ্র ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের মুমিনদের জন্য শারাবান তহুরা বা পবিত্র পানীয় তুল্য।

মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিম ভাইয়ের হক

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক হলো তাকে ভালোবাসা। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ.

‘তিনটি গুণ যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করবে : (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে গোটা সৃষ্টিজগত অপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া। (২) মানুষকে ভালোবাসলে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা। (৩) কুফরিতে ফিরে যাওয়া তার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় হওয়া।’ [বুখারী : ১৬; মুসলিম : ১৭৫]

এদিকে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِى ظِلِّهِ ، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ اللَّهِ ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِى خَلاَءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسْجِدِ ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللَّهِ ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّى أَخَافُ اللَّهَ . وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا ، حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ .

‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের নিচে ছায়া দেবেন যেদিন তাঁর ছায়া বৈ অন্য কোনো ছায়া থাকবে না :

১. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ।

২. এমন যুবক যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে।

৩. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।

৪. এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত।

৫. এমন দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে। এ উদ্দেশ্যেই একত্রিত এবং বিচ্ছিন্ন হয়।

৬. এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত বংশীয় রূপসী নারী ব্যভিচারের প্রতি আহ্বান করে; কিন্তু সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।

৭. যে ব্যক্তি এমন গোপনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাতও তা টের পায় না।’ [বুখারী : ৬৮০৬; মুসলিম : ১৭১২]

মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা রা. থেকে আরও একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ.

‘এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য গ্রামে গেল। পথিমধ্যে আল্লাহ তা‘আলা তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, কোথায় চললে তুমি? বললেন, এ গ্রামে আমার এক ভাই আছে, তার সাক্ষাতে চলেছি। তিনি বললেন, তার ওপর কি তোমার কোনো অনুগ্রহ আছে যা তুমি লালন করে চলেছ? তিনি বললেন, না। তবে এতটুকু যে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে এসেছি। আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন যে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন যেমন তুমি তাকে তাঁর জন্য ভালোবাসো।’ [মুসলিম : ৬৭১৪; ইবন হিব্বান, সহীহ : ৫৭২]

মুসলিম ও আবূ দাউদে বর্ণিত অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لاَ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ.

‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যাবৎ না পরিপূর্ণ মুমিন হবে। আর তোমরা পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন জিনিসের কথা বলে দেব না, যা অবলম্বন করলে তোমাদের পরস্পর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (তা হলো) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ [মুসলিম : ২০৩; আবূ দাউদ : ৫১৯৫]

এক মুসলিমের ওপর মুসলিমের এ হকগুলোও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিচের হাদীসে তুলে ধরেছেন। আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ : إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ، وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ، وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ

‘এক মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো, সেগুলো কী হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, (১) তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে। (২) সে যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে তা রক্ষা করবে। (৩) সে যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে, তুমিও তার শুভ কামনা করবে। (৪) যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে। (৫) যখন সে অসুস্থ হবে, তুমি তাকে দেখতে যাবে। (৬) এবং যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে।’ [ মুসলিম : ৫৭৭৮]

এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার সম্পর্কে মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা। কেননা মুমিন হবে পরিষ্কার মনের অধিকারী। তার অন্তর হবে অনাবিল ও সফেদ। তার হৃদয় হবে কোমল ও দয়ার্দ্র। মুমিন যখন রাতে শয়ন করে তখন সে আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে বলে পৃথিবীর কারও প্রতি তার একবিন্দু হিংসা বা দ্বেষ নেই।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَنَافَسُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا .

‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না এবং একে অন্যের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। বরং একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [মুসলিম : ৬৭০৫; মুসনাদ আহমদ : ৯০৫১]

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, মানুষের অন্তরের ব্যধিসমূহের অন্যতম হলো হিংসা-বিদ্বেষ। (আল্লাহ হেফাজত করুন) অনেকে মানুষকে সুখী দেখে হিংসা করে। তার অন্তরে আগুন জ্বলে। অথচ এই অর্বাচীন লোক ভুলে যায় যে এই রিজিক ও সম্পদ এভাবে আল্লাহই বণ্টন করেছেন। তাই আমাদের কর্তব্য কাউকে সুখ ও প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে থাকলে দেখলে মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা। যে আল্লাহ তাকে এত নেয়ামত ও প্রাচুর্য দিয়েছেন তার কাছে তার জন্য আরও বৃদ্ধির দু‘আ করা। তিনি যেন আমাকেও সম্পদ ও সুখ-প্রাচুর্য দেন সে প্রার্থনা তার কাছেই করা। সেই নেককারদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমাদেরও উচ্চারণ করা উচিত যারা বলতেন :

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (10)

‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ [সূরা আল-হাশর : ১০]

মুসলিমের প্রতি হিংসা না রাখা এবং তাদের জন্য হৃদয়ে ভালোবাসা লালন করা কত বড় আমল তা বুঝতে পারবেন একটি ঘটনা শুনলে। ঘটনাটি আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,

‘আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী ব্যক্তি উপস্থিত হবে।’ তারপর আনসারীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অযুর পানি ঝরছিল। বাম হাতে তার জুতো ধরা। পরদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ বললেন। প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। তৃতীয় দিন এলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একইরকম বললেন। এবারও প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বৈঠক ত্যাগ করলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ‘স তার পিছু নিলেন। তাকে তিনি বললেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া করেছি। এক পর্যায়ে কসম করেছি তিনদিন আমি তার কাছে যাব না। তুমি যদি আমাকে এ সময়টুকু তোমার কাছে থাকতে দিতে? তিনি বললেন, ঠিক আছে। আনাস রা. বলেন, আবদুল্লাহ বলতেন, তিনি তার সাথে তিনটি রাত অতিবাহিত করেছেন। তাকে তিনি রাতে নামাজ পড়তে দেখেননি। তবে এতটুকু দেখেছেন যে, রাতে যখন তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হন, তখন তিনি পাশ ফিরে ফজরের নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জিকির ও তাকবীরে লিপ্ত থাকেন। আবদুল্লাহ বলেন, তবে আমি তাকে ভালো ছাড়া কারও মন্দ বলতে শুনিনি। অতপর যখন তিন রাত অতিক্রম হলো এবং আমি তার আমলকে সামান্য জ্ঞান করতে লাগলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমার ও আমার পিতার মাঝে কোনো রাগারাগি বা ছাড়াছাড়ির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমার সম্পর্কে তিনদিন বলতে শুনেছি : ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী লোক উপস্থিত হবে।’ আর ঘটনাক্রমে তিনবারই তুমি উপস্থিত হয়েছো। এজন্য আমি তোমার সান্বিধ্যে এসেছিলাম তুমি কী আমল করো তা দেখতে। যাতে আমি তোমাকে অনুসরণ করতে পারি। আমি তো তোমাকে খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না। তাহলে তোমার কোন আমল তোমাকে রাসূলুল্লাহ বর্ণিত মর্যাদায় পৌঁছালো? ওই ব্যক্তি বলল, তুমি যা দেখলে তার বেশি কিছুই নয়। তিনি বলেন, যখন আমি ফিরে আসতে নিলাম, সে আমাকে ডাক দিলো। অতপর সে বললো, তুমি যা দেখলে তা তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। তবে মনে আমি কোনো মুসলিমকে ঠকানোর চিন্তা রাখি না এবং আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তাতে কোনো হিংসা বোধ করি না। আবদুল্লাহ বললেন, ‘এটিই তোমাকে ওই মর্যাদায় পৌঁছিয়েছে। আর এটিই তো আমরা পারি না।’ [মুসনাদ আহমদ : ১২৬৯৭]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাধ্যমত সাহায্য করা। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِى عَوْنِ أَخِيهِ

‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে।’ [মুসলিম : ৭০২৮; তিরমিযী : ১৪২৫]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাহায্য করা চাই সে যালেম হোক কিংবা মযলুম। আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا ، أَوْ مَظْلُومًا قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ.

‘তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অত্যাচারিতকে সাহায্য করার অর্থ তো বুঝে আসল, তবে অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরবে (তাকে যুলুম থেকে বাধা প্রদান করবে)।’ [বুখারী : ২৪৪৪; বাইহাকী : ১১২৯০] অর্থাৎ তুমি তোমার ভাইকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করবে। যদি সে জালেম হয় তাহলে যুলুম থেকে তার হাত টেনে ধরবে এবং তাকে বাধা দেবে। আর যদি সে মযলুম হয় তাহলে সম্ভব হলে তাকে সাহায্য করবে। যদিও একটি বাক্য দ্বারা হয়। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটি সবচে দুর্বল ঈমান।

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার দোষ গোপন রাখা এবং তার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা। এটি সবচে বড় হক। কারণ সে তো কোনো আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যশীল ফেরেশতা বা তাঁর প্রেরিত রাসূল নয়। সে মানুষ; ভুল তো তার হবেই। অতএব তার কোনো ভুল হলে তা গোপন রাখা উচিত।

আলিমগণ বলেছেন, ‘মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার হলো যারা মানুষের মাঝে তাকওয়া-পরহেযগারি ও নেক আমলের জন্য সুপরিচিত। তিনি যদি কোনো ভুল করেন বা তার কোনো পদস্খলন হয়ে যায়। তাহলে মুমিনদের কর্তব্য হলো তা গোপন রাখা। তার দোষ অপরের কাছে প্রকাশ না করা।

কেননা বিশুদ্ধ হাদীসে মুসনাদে আহমদ ও আবূ দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আবু বারযা আসলামী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِى بَيْتِهِ.

‘হে ওই সকল লোক যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে আর ঈমান তার হৃদয়ে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমের গীবত করবে না এবং তাদের দোষ খোঁজার পেছনে লেগে থাকো না। কেননা যে তাদের দোষ খোঁজায় লিপ্ত হয়, আল্লাহও তার পেছনে দোষ খোঁজেন। আর আল্লাহ যার পেছনে লাগেন তিনি তাকে তার বাড়িতেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।’ [মুসনাদে আহমদ : ১৯৭৯৭; আবূ দাউদ : ৪৮৮২]

আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা প্রকাশ্যে আল্লাহর নাফরমানি করে এবং গুনাহ প্রকাশ করে। তারা স্রষ্টা তথা আল্লাহকেও লজ্জা করে না আবার মানুষকেও লজ্জা করে না। এরা হলো ফাজের ও ফাসেক। এদের কোনো গীবত নেই।

ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বংশীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে বেশি মজবুত

প্রকৃত সম্পর্ক যা বিচ্ছেদে জোড়া লাগায় এবং বিভক্তিকে যুক্ত করে, সেটি হলো, দীনের সম্পর্ক এবং ইসলামের বন্ধন। যে সম্পর্ক ও বন্ধন পুরো ইসলামী সমাজকে একটি দেহের মতো একাত্ম করেছে। তাকে বানিয়েছে একটি প্রাচীরের মতো, যার ইটগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে লেগে থাকে। দেখুন, মানুষের মাঝে এত বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আরশ বহনকারী ও তাঁদের আশপাশের ফেরেশতাদের হৃদয় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলো। ইরশাদ হলো,

الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ (7)

‘যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, ‘হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আযাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন’। [সূরা আল-মুমিন : ৭]

আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে এ মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আরশ বহনকারী ও তার আশপাশের ফেরেশতা এবং পৃথিবীর বনী আদমের যে মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধন গড়ে ওঠেছে, যার কারণে এই পূণ্যময় দুআ ও প্রার্থনা, তা হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। কারণ তিনি ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা তাঁর প্রতি ঈমান রাখে’ (وَيُؤْمِنُونَ بِهِ) অর্থাৎ তাদের বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা ঈমান এনেছেন। আর বনী আদমের জন্য ফেরেশতাদের দু‘আ সম্পর্কে বলেছেন, (وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا) মুমিনদের (যারা ঈমান এনেছে) জন্য তারা ক্ষমা চায়। এখানে তাদের গুণও বলা হয়েছে ঈমান। এ থেকে বুঝা যায় মানুষ ও ফেরেশতাদের মাঝে সম্পর্কের একমাত্র বাঁধন হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। অতএব ঈমানই সবচে মজবুত বন্ধন।

একতা ও ঐক্যের আহ্বান

আমাদের কর্তব্য একে অপরকে সাহায্য করা এবং একে অন্যের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা। আমাদের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মতো আল্লাহ তা‘আলার সব বান্দা ভাই-ভাই হয়ে থাকা। এতেই আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (46)

‘আর তোমরা পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’ [সূরা আল-আনফাল : ৪৬]

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।’ [ সূরা আলে ইমরান : ১০৩]

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا

‘‌তোমরা একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [ বুখারী : ৬০৬৫; মুসলিম : ৬৬৯৫]

জামা‘আতের ওপর আল্লাহর হাত

আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং জেনে রাখুন জামা‘আত তথা দলের ওপর আল্লাহর হাত। সুতরাং আপনারা আপনাদের দীনী ভাইদের সঙ্গে থাকুন। তারা যেখানেই যান তাদের সঙ্গী হোন। আপনারা সবাই আলাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন এবং বিভক্ত হবেন না। মনে রাখবেন, একতাতেই শক্তি আর বিভক্তিতে দুর্বল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

মাসায়েলে জাহিলিয়া অডিও পর্বঃ ১

মাসায়েলে জাহিলিয়া

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

মাসায়েলে জাহিলিয়া দারস বিষয় সমূহে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলী যুগের আরবদের এবং আহলে কিতাব ইয়াহুদী নাছারাদের বিরোধিতা করেছিলেন। নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রত্যেক মুসলিমের জেনে রাখা অবশ্য প্রয়োজন। কেননা, বিপরীত বস্তু সম্পর্কে জানা থাকলেই কেবল আসল বস্তু চেনা সম্ভব হয়। তবে এখানে সর্বাপেক্ষা ভয়ের ব্যাপার যেটি, সেটি হলো সরাসরি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত দ্বীন সম্পর্কেই ঈমান না রাখা। আর ঐ সংগে যদি কেউ জাহেলিয়াতের দ্বীনকেই ভালবাসে এবং তার উপরেই ঈমান আনে, তাহলে তো ক্ষতির আর শেষ থাকে না। (আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন)। যেমন আল্লাহ স্বীয় পাক কালামে ইরশাদ করেন

وَالَّذِينَ آَمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ . (سورة العنكبوت : ৫২)
‘যারা বাতিলের উপর ঈমান আনলো এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করলো, তারাই সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সূরা আনকাবুত : ২৯ : আয়াত ৫২)

আর তাই আল্লাহর বিশুদ্ধ তাওহীদের দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সুলায়মান আত-তামিমি(রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহর তাওহীদের উপর এই অমূল্য গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) তাওহীদের অর্থ ও ফাযিলত, তাওহীদের বিপরীত শিরক এর প্রকারভেদে এর ভয়াবহতা সহ আরো অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। আর এরই ধারাবাহিক আলোচনা দেয়া হল অডিও রুপে।

প্রথম অংশঃ অধ্যায় ১ থেকে ৪৪

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ৩

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

অসৎ কাজ নিষেধের পদ্ধতি

প্রতিদিন আমরা আমাদের চারপাশে অনেক খারাপ কাজ সংঘটিত হতে দেখি। কিন্তু কেউ এ ধরনের কাজে বাধা প্রদান করি না। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা ঠিক নয়। কারণ হতে পারে মানুষ ভুলবশত ও গাফেল হিসেবে এসব কাজ করছে। বাধা না থাকলে নির্বিঘ্নে একাজ সংগঠিত হতে থাকলে এক সময় দেশ ও জাতি কেউই এ কাজের কুফল হতে রেহাই পাবে না। প্রকৃত মুসলিম ও সচেতন মানুষের অবশ্য কর্তব্য হলো এ ধরনের কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখা। মুসলিমগণ একদিকে যেমন সৎকাজ করবে, অন্যদিকে অসৎকাজের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এ ধরনের সকল উপায় উপকরণ থেকেও মানুষকে সতর্ক করতে হবে। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মদ পান নিষেধ করেন নি বরং তিনি আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগের মদ তৈরী ও রাখার পাত্রসহ যাবতীয় উপকরণকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে একবারে অন্যায়ের মুলোৎপাটন করা অসম্ভব।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবতীয় অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে মানুষকে বারণ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়া, ধাপ ও ক্রমান্বয়ের ফর্মূলা গ্রহণ করেছিলেন। মদপান নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে একথাই প্রতিয়মান হয় যে, পর্যায়ক্রমিকভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন। কুরআনে মাদকতা নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো।

  1. প্রথম পর্যায়ে সূরা আন-নাহলের ৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে

﴿ وَمِن ثَمَرَٰتِ ٱلنَّخِيلِ وَٱلۡأَعۡنَٰبِ تَتَّخِذُونَ مِنۡهُ سَكَرٗا وَرِزۡقًا حَسَنًاۚ ٦٧ ﴾ [النحل: ٦٧]

‘এমনিভাবে খেজুরের গাছ ও আঙ্গুরের ছড়া থেকেও আমরা একটি জিনিস তোমাদের পান করাই, যাকে তোমরা মাদকে পরিণত কর। এবং উত্তম পবিত্র পানীয় তাতে রয়েছে।

 

  1. দ্বিতীয় পর্যায়ে নাযিলকৃত আয়াত:

﴿ ۞يَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلۡخَمۡرِ وَٱلۡمَيۡسِرِۖ قُلۡ فِيهِمَآ إِثۡمٞ كَبِيرٞ وَمَنَٰفِعُ لِلنَّاسِ وَإِثۡمُهُمَآ أَكۡبَرُ مِن نَّفۡعِهِمَاۗ ٢١٩ ﴾ [البقرة: ٢١٩]

‘‘হে রাসূল! আপনাকে তারা মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, আপনি উভয় সম্পর্কে বলুন, মহাপাপ আর মানুষের জন্য লাভজনক তাদের লাভ থেকে পাপই বড়।’’[1]

 

  1. তৃতীয় পর্যায়ে মদকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَقۡرَبُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنتُمۡ سُكَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعۡلَمُواْ مَا تَقُولُونَ ٤٣ ﴾ [النساء: ٤٣]

‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা মাতলামির অবস্থায় নামাযের নিকটও যেও না, যতক্ষণ তোমরা যা বল তা জানতে না পার।’’ (সূরা নিসা: ৪৩)

অত:পর যখন ধর্মীয় অনিষ্ঠতা কোনো কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হলো তখন চিরস্থায়ীভাবে আল্লাহ তায়ালা মদপান হারাম করে দেন। তিনি বলেন-

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡخَمۡرُ وَٱلۡمَيۡسِرُ وَٱلۡأَنصَابُ وَٱلۡأَزۡلَٰمُ رِجۡسٞ مِّنۡ عَمَلِ ٱلشَّيۡطَٰنِ فَٱجۡتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٩٠ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُوقِعَ بَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ فِي ٱلۡخَمۡرِ وَٱلۡمَيۡسِرِ وَيَصُدَّكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَعَنِ ٱلصَّلَوٰةِۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّنتَهُونَ ٩١ ﴾ [المائ‍دة: ٩٠، ٩١]

হে ইমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, টার্গেট করে পশু বধ করা ও মুর্তির নামে গোশত বন্টন শয়তানী কাজের অপবিত্রতা। সুতরাং তোমরা তা ত্যাগ কর তাহলে তোমরা সফলতা লাভ করবে। মনে রেখ শয়তান এ মদ্যপান ও জুয়া খেলার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে চরম শত্রুতা ও হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি করতে সদা সচেষ্ট। সে তোমাদেরকে সালাত ও আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখতে ইছুক। এখন জিজ্ঞাসা এই যে, তোমরা কি একাজ থেকে বিরত থাকবে। (সূরা আল-মায়েদাহ: ৯০-৯১)

রাসূল (স.) অসৎ কাজে বাধা দান করার পদ্ধতি বাতলে দিতে গিয়ে বলেন,

‘‘যদি কোন ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ সংগঠিত হতে দেখে তখন তার কর্তব্য হলো শক্তি দিয়ে এর প্রতিহত করা এতেও যদি যে সামর্থবান না হয় তবে মুখ দিয়ে বাধা দিবে। এক্ষেত্রে যদি সে অসমর্থ হয় তবে অন্তরে খারাপ কাজকে ঘৃনা করবে। আর এটা দুর্বল ঈমানের পরিচয়।”

যখন কোন সমাজে অন্যায় কাজকে অন্যায় বলার মত কোন প্রকৃত মুসলিম না থাকে তখন সে সমাজে সকলের উপর আল্লাহর আযাব ও গজব পতিত হতে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন-

﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ َ ٤١ ﴾ [الروم: ٤١]

‘জ্বলে ও স্থলে যেসব বিপর্যয় প্রকাশিত হচ্ছে তা তোমাদের নিজেদের অর্জন। ’’ (সূরা আর রূম:৪১)

আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে মানুষ দু’শ্রেণী

এখানে মানুষের দু’টি দলই ভুল করে থাকে।

প্রথম দল: তাদের উপর আদেশ ও নিষেধের যে দায়িত্ব, এ আয়াতটির ব্যাখ্যা হিসেবে অবহেলা করে ছেড়ে দিচ্ছে। যেমন প্রথম খলীফা আবু বাকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক ভাষণে বলেছিলেন; হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাক-

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ عَلَيۡكُمۡ أَنفُسَكُمۡۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهۡتَدَيۡتُمۡۚ﴾ [المائ‍دة: ١٠٥]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের স্ব-স্ব হিদায়াতের দায়িত্ব তোমাদের নিজেদের উপর, তোমরা যদি সৎপথপ্রাপ্ত হও তাহলে যারা বিপথগামী হয়েছে তারা তোমাদেরকে ক্ষতি করতে পারবে না’’- (সূরা আল-মায়িদাহ,:১০৫)। অথচ তোমরা সেটার সঠিক অর্থে ব্যবহার করছ না। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি ‘‘নিশ্চয়ই মানুষ যখন অসৎকাজ চলতে দেখবে, অথচ সেটাকে প্রতিহত করবে না, এটা বেশী দূরে নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা ঐ কাজের দায়ে সকলকেই সাধারণভাবে শাস্তি দিবেন।’’

আর দ্বিতীয় দলটি যারা জিহবা বা হাত দ্বারা মোটকথা সৎকাজ আদেশ দিতে ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে চায়, কোন প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সহনশীলতা বা ধৈর্য ছাড়াই এবং সেটার কোনটি কোথায় চলবে, আর কোথায় চলবে না, কোনটি সে করতে পারবে, আর কোনটি সে করতে পারবে না, সেদিকে লক্ষ্য নেই। যেমন- আবু সা‘আলাবাহ আল-খুশানী বর্ণিত হাদীসে আছে, আমি সেটা (ঐ আয়াতটি) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলাম, এতে তিনি বলেছিলেন:

‘‘বরং তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎকাজ হতে নিজেদেরকে নিজেরাই নিষেধ করবে। যখন দেখবে এমন কৃপণতা, যা অন্যেরা অনুসরণ করছে এবং অনুসৃত প্রবৃত্তি, প্রভাব বিস্তারকারী পার্থিব ঐশ্বর্য ও প্রত্যেক ‘আলিম ব্যক্তি স্ব-স্ব রায় নিয়েই খুশি হচ্ছে এবং এমন সব অশ্লীল কর্মকান্ড ঘটতে দেখবে যা ঠেকাবার মত তোমার কোন শক্তি নেই, এমতাবস্থায় ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা ভিত্তিক নিজে নিজেকেই রক্ষা করবে। এমন সময় হলে সর্বসাধারণের চিন্তা-ভাবনা করার তোমার সুযোগ থাকবে না, পারবেও না, কাজেই সেটা বাদ দিও। কেননা তোমার সামনে ধৈর্যের এমন দিন আসবে (তখন কঠিন পরীক্ষা হবে) ঐ দিনগুলোতে ধৈর্যের সাথে ঈমান নিয়ে টিকে থাকা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠিতে ধারণের মতোই কঠিন হবে। ঐ কঠিন দিনগুলোতে সৎকাজের কর্মীদের সাওয়াব হবে তার সমতুল্য আমলকারী পঞ্চাশ জন লোকের সৎ আমলের সমান।’’(সহীহ আত-তিরমিযী: কিতাবুল ফিতান, আবওয়াবুল তাফসীর; আবু দাউদ; ৪/১৫২, কিতাবুল মালাহিম, বাবুল আমরি ওয়াল নাহ-ই)

এমন কঠিন মুহূর্তে কোন একজন আদেশ ও নিষেধ নিয়ে এসে উপস্থিত হবে এ মনে করে যে, সে নিজে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুগত, আসলে সে নিজেই সীমালঙ্ঘনকারী।

যেমন- অনেক বিদ’আতী ও প্রবৃত্তির পূজারীগণ নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশদাতা ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারী হিসেবে নিজেদের সাজিয়ে বয়েছে। এ সকল লোক ঐ খারিজী, মুতাযিলা, শিয়া-রাফিযী ও অনুরূপ অন্যান্য গোষ্ঠীরই মত, যারা তাদের প্রতি আগত আদেশ ও নিষেধাবলীর ক্ষেত্রে ভুল করে বসেছে এবং এভাবেই তাদের সংশোধনী কাজের চেয়ে অনাসৃষ্টিই বেশী হয়েছে। (শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ, সম্পা. আবূ ‘আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ, পৃ.৬৯)

আদেশ দান ও নিষেধ করার ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেণীসমূহ

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ এর মতে এক্ষেত্রে মানুষ ত্রিবিধ:

এক. এমন সম্প্রদায় যারা তাদের নাফস সমূহের চাহিদা ব্যতিরেকে তারা কিছুই করবে না। তাদেরকে যা দেয়া হবে, তা ছাড়া তারা সন্তুষ্ট হবে না। আবার তাদেরকে যা হতে বঞ্চিত করা হবে, তা ব্যতীত (অন্য কোন কারণে) তারা রাগও করবে না। আর যখন তাদের কাউকেও তার প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী, তা হারাম হোক বা হালাল হোক, দেয়া হবে দেখবে তার রোষাগ্নি নির্বাপিত হয়ে গেছে এবং সাথে সাথে সে খুশিও হয়ে গেছে। আর ক্ষণিক পূর্বেও সে বিষয়টি তার নিকট অসৎ ছিল সেটা হতে নিষেধ করত, সেটা করার কারণে শাস্তি দিত, সেটা যে করত তাকে ভৎর্সনা করত, এখন সে স্বয়ং সেটার কর্তাব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা সম্পাদনে সে নিজেও শরীক ও সহযোগী এবং যে সেটা হতে নিষেধ করবে ও তাকে ঘৃণা করবে তার ঘোর শত্রু হয়ে উঠেছে।

এরূপ অবস্থা আদম সন্তানদের মধ্যেই বেশি প্রবল। তুমি দেখে থাকবে, মানুষ সেটার ঘটনা এত শুনছে যে, আল্লাহ ছাড়া সেটার পরিসংখ্যান আর কেউ দিতে পারবে না।

কারণ হলো যে, মানুষ আসলে অতিশয় যালিম ও অজ্ঞ। এজন্যই সে ন্যায়বিচার করে না। বরং সে হয়ত বা উভয়বিধ অবস্থাতেই অত্যাচারী। সে কোন রাজার হাতে প্রজা সাধারণের প্রতি অবিচার ও তাদের উপর সীমাহীন নির্যাতনের কারণে কোন সম্প্রদায়কে ঐ সম্প্রদায়ের হর্তাকর্তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করতে দেখবে। অত:পর ঐ রাজা ঐ সকল অনাস্থাবান লোকদেরকে যৎকিঞ্চিৎ দান-দক্ষিণা দিয়ে সন্তুষ্ট করে নিবে, অত:পর তারা ঐ অত্যাচারী রাজার সাহায্যকারী হয়ে বসবে। তাদের অবস্থাসমূহের মধ্যে মজার বিষয় হল যে, তারা ঐ যালিমের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হতেও বিরত (চুপ) থাকবে। অনুরূপভাবে (হে পাঠক) তাদের কাউকেও কোন মদ্যপায়ী বা ব্যভিচারীর নিকটে দেখবে এবং গানবাদ্য শুনতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তারা তাদের সাথে একত্রে ঐ কাজে প্রবেশ করবে, অথবা সেটার কিছু অংশ দ্বারা তারা তাকে সন্তুষ্ট করে ফেলবে, তখন দেখবে যে, সে তাদের সাহায্যকারী হয়ে গেছে।

দুই. অন্য আর এক সম্প্রদায়, তারা সহীহ দীনী কাজ-কর্মই করে থাকে এবং তাতে তারা একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে এবং যা করে তাতে তারা একনিষ্ঠ হয়ে থাকে এবং ঐ কাজও তাদের জন্য বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল হয়ে থাকে। এমনকি যে সকল ব্যাপারে তাদেরকে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তারা ধৈর্যও অবলম্বন করে থাকে। আর আসলে ঐ সম্প্রদায়ই হল সেসব লোক, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে। আর ঐ সকল লোকই তো (উত্তম-উম্মাহ) অতি উত্তম জাতি, যারা মানব জাতির মহা কল্যাণ সাধনের জন্য সৃজিত হয়েছে। তারাই সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করে থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে।

তিন. আর এক সম্প্রদায়, তারা হল মু’মিনদের (বিশ্বাসীদের) বৃহত্তম অংশ। যাদের অন্তরে দীন আছে, আরও আছে কামরিপু, আবার অন্তরে আল্লাহর আনুগত্যের বাসনাও আছে ও ওদিকে অবাধ্যচরণের ইচ্ছাও বিদ্যমান। তাই কখনও এ আকাঙ্খা প্রবল হয়ে যায় আবার কখনও ঐ বাসনা হয় বেশী প্রবল।


[1]সূরা আল বাকারাহ:২১৯।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ১

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

মহান আল্লাহ মানুষকে এ পৃথিবীতে খিলাফতের এক সুন্দর দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আদম আলাইহিস সালাম ও তার সন্তানাদিকে সর্বপ্রথম এ দায়িত্ব দেয়া হয়। আদম আলাইহিস সালামের সন্তান হাবিলের কুরবানী কবুল হওয়া সম্পর্কে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন:

﴿ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [المائ‍دة: ٢٧]

নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের নিকট হতেই (সৎকর্ম) কেবল গ্রহণ করেন।[1]

মূলত: মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে বারণ করার এক মহান দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টির শুরু হতে শুরু করে সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতদেরও প্রেরণ করা হয়েছে। তাই তো পবিত্র কুরআন সাধারণভাবে সকল উম্মতের অন্যতম দায়িত্ব ঘোষণা দিয়ে বলেছে:

﴿كُنتُمۡ خَيۡرَ أُمَّةٍ أُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَتَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ ﴾ [ال عمران: ١١٠]

‘‘তোমরা সর্বোত্তম জাতি, তোমদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করবে।” [সূরা আলে ইমরান: ১১০]

অতএব আলোচ্য আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ মহান দায়িত্বটি আঞ্জাম দেয়ার মাঝে মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

যুগে যুগে এ পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসূলের আগমন ঘটেছে। আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হন নি; বরং তাদের হেদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছেন কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য নবী ও রাসূলকে। যাঁরা স্ব-স্ব জাতিকে সৎ ও কল্যাণকর কাজের প্রতি উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং অসৎ ও অকল্যাণকর কাজ হতে নিষেধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:٣٦]

‘‘নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসুল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগুতকে পরিত্যাগ করবে”[2]

এখানে তাগুত বলতে আল্লাহবিরোধী শক্তি, শয়তান, কুপ্রবৃত্তি এক কথায় এমন সব কার্যাবলীকে বুঝানো হয়েছে যা সুপ্রবৃত্তি দ্বারা সম্পন্ন হয় না এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে বাধা হয়।

আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও একই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছে। তাঁকে হেদায়াতের মশাল হিসেবে যে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন প্রদান করা হয়েছে তার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে অন্ধকার থেকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, গোমরাহী থেকে হেদায়াতের দিকে, কুফরীর অন্ধকার হতে ঈমানের আলোর দিকে আহ্বান জানানো। আল্লাহ তা‘আলা এ প্রসঙ্গে বলেন,

﴿ الٓرۚ كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ لِتُخۡرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِ رَبِّهِمۡ إِلَىٰ صراط العزيز الحَمِيد ١ ﴾ [ابراهيم: ١]

‘‘আলিফ-লাম-রা, এ হচ্ছে কিতাব, আমরা তোমার প্রতি তা নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে ধাবিত করতে পার, এমন পথে যা প্রবলপরাক্রমশালী, প্রশংসিতের।’’[3]

এ প্রথিবীতে মানুষের যাবতীয় কর্মকে যদি শ্রেণীবিন্যাস করা হয় তাহলে তা হবে ক) সৎকাজ (খ) অসৎকাজ। আর আখেরাতে এ দু’শ্রেণীর কাজের জবাবদিহি ও প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ধারিত হবে। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨﴾ [الزلزلة: ٧، ٨]

‘‘যে অনু পরিমাণ ভাল করবে সে তার প্রতিদান পাবে আর যে অনু পরিমাণ খারাপ কাজ করবে সেও তার প্রতিদান পাবে।’’[4]

অতএব প্রতিদান দিবসে সৎকাজের গুরুত্ব অত্যাধিক। ফলে প্রত্যেকের উচিত সৎকাজ বেশী বেশী করা এবং অসৎ কাজ হতে বিরত থাকা।

কুরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ মানুষের এসব কাজ সংরক্ষণ করা সম্পর্কে বলেছেন:

﴿ كِرَامٗا كَٰتِبِينَ ١١ يَعۡلَمُونَ مَا تَفۡعَلُونَ ١٢ إِنَّ ٱلۡأَبۡرَارَ لَفِي نَعِيمٖ ١٣ وَإِنَّ ٱلۡفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٖ ١٤ يَصۡلَوۡنَهَا يَوۡمَ ٱلدِّينِ ١٥ وَمَا هُمۡ عَنۡهَا بِغَآئِبِينَ ١٦ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا يَوۡمُ ٱلدِّينِ ١٧ ثُمَّ مَآ أَدۡرَىٰكَ مَا يَوۡمُ ٱلدِّينِ ١٨ يَوۡمَ لَا تَمۡلِكُ نَفۡسٞ لِّنَفۡسٖ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَٱلۡأَمۡرُ يَوۡمَئِذٖ لِّلَّهِ ١٩ ﴾ [الانفطار: ١١- ١٩]

‘‘সম্মানিত লেখকবৃন্দ, তারা জানে তোমরা যা কর, নিশ্চয় সৎকর্মপরায়ণরা থাকবে খুব স্বাচ্ছন্দে, আর অন্যায়কারীরা থাকবে প্রজ্বলিত আগুনে, তারা সেখানে প্রবেশ করবে প্রতিদান দিবসে, আর তারা সেখান থেকে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না, আর কিসে তোমাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? তারপর বলছি কিসে তোমাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? সেদিন কোনো মানুষ অন্য মানুষের জন্য কোনো ক্ষমতা রাখবে না, আর সেদিন সকল বিষয় হবে আল্লাহর কর্তৃত্বে।’’[5]

পৃথিবীতে মানুষ ধোঁকা প্রবণ, দুনিয়ার চাকচিক্য ও মোহে পড়ে অনন্ত অসীম দয়ালু আল্লাহর কথা স্মরণ থেকে ভুলে যেতে পারে। সেজন্যে প্রত্যেক সৎ কর্মপরায়ণের উচিৎ পরস্পর পরস্পরকে সদুপদেশ দেয়া, সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা। মহান আল্লাহ ধমক দিয়ে বলেন-

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡإِنسَٰنُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ ٱلۡكَرِيمِ ٦ ﴾ [الانفطار: ٦]

‘‘হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকা দিয়েছে?”[6]

শুধু ধমক দিয়েই ক্ষ্যান্ত হন নি; বরং পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের ভয়াবহ শান্তি হতে বাঁচিয়ে রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূরা আত-তাহরীমে এসেছে-

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦ ﴾ [التحريم: ٦]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর; যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশ্‌তাকূল, যারা আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তাই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়।’’[7]

অতএব বলা যায় যে, বিভিন্নভাবে এ পৃথিবীতে মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। আর তা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো পারস্পারিক সৎ ও কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা ও অসৎ এবং গুনাহের কাজ বর্জন করা। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ﴾ [المائ‍دة: ٢]

‘‘তোমরা পূণ্য ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘণের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”[8]

সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম পরস্পরের সাথে সাক্ষাত হলে এ মহতি কাজটির কথা স্মরণ করে দিতেন। সেজন্য তাদের কেউ কেউ অধিকাংশ সময় মজলিশ হতে বিদায় বেলায় ও প্রথম সাক্ষাতে সূরা আছর তেলাওয়াত করতেন বলে কোনো কোনে বর্ণনায় এসেছে[9]

আল্লাহ বলেন-

﴿ وَٱلۡعَصۡرِ ١ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَفِي خُسۡرٍ ٢ إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾ [العصر: ١، ٣]

‘‘সময়ের কসম, নিশ্চয় আজ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।”[10]

সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ রাসূলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ গুণের পথিকৃত ছিলেন। তিনি নবুওয়তের পূর্বে অন্যায় অবিচার রুখতে হিলফুল ফুযুলে অংশ নিয়েছেন। ছোট বেলা থেকে মৌলিক মানবীয় সৎ গুণাবলী তাঁর চরিত্রে ফুটে উঠায় আল-আমিন, আল সাদিক উপাধিতে তিনি ভুষিত ছিলেন। তাঁর গুণাবলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন-

﴿يَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ﴾ [الاعراف: ١٥٧]

‘‘তিনি সৎকাজের আদেশ করেন এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করেন। মানবজাতির জন্য সকল উত্তম ও পবিত্র জিনিসগুলো বৈধ করেন এবং খারাপ বিষয়গুলো হারাম করেন।’’[11]

আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে তাঁর রিসালাতের পূর্ণ বর্ণনা ফুটে উঠেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সত্ত্বা, যাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেন, তাকে পাঠানো হয়েছে যাতে তিনি সৎকাজের আদেশ দেন, সকল অসৎ কর্ম হতে বারণ করেন, সব উত্তম বিষয় হালাল করেন এবং অপবিত্রগুলো হারাম করেন। এজন্যে রাসূল নিজেও বলেছেন-

«بعثت لأتمم مكارم الأخلاق»

‘‘আমি সকল পবিত্র চরিত্রাবলী পরিপূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’’[12]

শুধু তাই নয় মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি ‘হিসবা’ নামক একটি বিভাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ কাজটি আঞ্জাম দিতেন। পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেীনের যুগেও এ বিভাগটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎ ও অন্যায় কাজ হতে মানুষকে বারণ করা।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা মুমিনের গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত

সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎকাজে বাধা দান মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। মুমিন নিজে কেবল সৎকাজ করবে না, বরং সকলকে সে কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালাতে হবে। কেননা, তারা পরস্পরের বন্ধু। অতএব একবন্ধু অপর বন্ধুর জন্য কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু কামনা করতে পারে না। এদিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন-

﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ سَيَرۡحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ ٧١ ﴾ [التوبة: ٧١]

‘‘মুমিন নারী ও পুরুষ তারা পরস্পরের বন্ধু। তারা একে অপরকে যাবতীয় ভাল কাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় ও পাপ কাজ হতে বিরত রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত পরিশোধ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। তারা এমন লোক যাদের প্রতি অচিরেই আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে।’’[13]

কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মুমিনের অন্যতম চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। সকল স্থানে অন্যান্য গুণাবলীর পাশাপাশি অন্যতম গুণ হিসেবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের অবতারণা করা হয়েছে। কুরআনে এসেছে:

﴿ ٱلتَّٰٓئِبُونَ ٱلۡعَٰبِدُونَ ٱلۡحَٰمِدُونَ ٱلسَّٰٓئِحُونَ ٱلرَّٰكِعُونَ ٱلسَّٰجِدُونَ ٱلۡأٓمِرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱلنَّاهُونَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱلۡحَٰفِظُونَ لِحُدُودِ ٱللَّهِۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١١٢﴾ [التوبة: ١١٢]

‘‘তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, আল্লাহর গোলামীর জীবন-যাপনকারী। তাঁর প্রশংসা উচ্চারণকারী, তাঁর জন্য যমীনে পরিভ্রমণকারী, তাঁর সম্মুখে রুকু ও সিজদায় অবনত। সৎ কাজের আদেশ দানকারী, অন্যায়ের বাধা দানকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষাকারী। হে নবী, তুমি এসব মুমিনদের সুসংবাদ দাও।”[14]

 


[1] সূরা আল-মায়িদাহ:২৭।

[2] সূরা আন-নাহল:৩৬।

[3]সূরা ইবরাহীম:১।

[4] সূরা যিলযাল:৭-৮।

[5] সূরা ইনফিতার:১১-১৯।

[6] সূরা ইনফিতার:৬।

[7] সূরা আত তাহরীম:৬।

[8] সূরা আল মায়িদাহ:২।

[9] তবে বর্ণনাটি দুর্বল।

[10] সূরা আল আছর”১-৩।

[11] সূরা আল আরাফ: ১৫৭।

[12]ইমাম মালিক, মুয়াত্তা ৫/২৫১।

[13]সূরা আত তাওবা: ৭১।

[14] সূরা আত তাওবা:১১২।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস-একটি হারাম দিবস

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস : পেছন ফিরে দেখা

ভালোবাসা শুধু পবিত্র নয় পূণ্যময়ও বটে। নির্দোষ ও পরিশীলিত ভালোবাসা আমাদের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ মসৃণ করে। সৃষ্টিজীবের প্রতি বিশেষ এবং পিতামাতা ও আল্লাহ-রাসূলের প্রতি সবিশেষ ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ.

‘ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ সে পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান থেকে বেশি প্রিয় হই।’ [বুখারী : ১৪]

অপর বর্ণনায় রয়েছে, আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ».

‘তোমাদের মধ্যে কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার কাছে নিজ সন্তান, পিতা-মাতা ও সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসার পাত্র বলে বিবেচিত হই।’ [বুখারী : ১৫; মুসলিম : ১৭৮]

শুধু নিজেকে নয়; অন্যদেরও ভালোবাসতে বলা হয়েছে। প্রতিবেশিসহ সকল মুসলিম ভাইকে ভালোবাসার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। একে অন্যকে ভালোবাসার এমন অবিনাশী চেতনা ইসলাম ছাড়া অন্য কোথাও নেই। ভালোবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, একে অপরের প্রতি ভালোবাসার প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন,

﴿ مُّحَمَّدٞ رَّسُولُ ٱللَّهِۚ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ أَشِدَّآءُ عَلَى ٱلۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيۡنَهُمۡۖ ﴾ [الفتح: ٢٩]

‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়।’ {সূরা আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯}

অন্য ভাইকে ভালোবেসে তার সার্বিক কল্যাণ ও শুভ কামনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ – أَوْ قَالَ لِجَارِهِ – مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ».

‘তোমাদের মধ্যে কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে তার ভাই অথবা তিনি বলেছেন নিজের প্রতিবেশির জন্য তাই পছন্দ করে যা পছন্দ করে সে নিজের জন্য।’ [মুসলিম : ১৭৯]

একই সাহাবী থেকে বর্ণিত অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে,

«لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ».

‘তোমাদের মধ্যে কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে যা পছন্দ করে সে নিজের জন্য।’ [বুখারী : ১৫; মুসলিম : ১৭৯]

ইসলাম শুধু অন্যকে ভালোবাসার কথাই বলেনি, নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্বে থেকে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে। আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«لاَ يَجِدُ أَحَدٌ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ حَتَّى يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ وَحَتَّى أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ وَحَتَّى يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا».

‘কোনো ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না সে পর্যন্ত যাবত না সে মানুষকে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে। আর যাবত সে এমন (ঈমানদার) আল্লাহ তাকে (জাহান্নামের) আগুন থেকে পরিত্রাণ দেবার পর সে কুফরে ফিরে যাবার চেয়ে তার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াই প্রিয়তর হয়। আর যাবত তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাঁদের ছাড়া অন্যদের চেয়ে প্রিয় না হয়।’ [বুখারী : ৬০৪১]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ ».

‘এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য জনপদে গেল। পথিমধ্যে আল্লাহ তা‘আলা তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, কোথায় চললে তুমি? বললেন, এ গ্রামে আমার এক ভাই আছে, তার সাক্ষাতে চলেছি। তিনি বললেন, তার ওপর কি তোমার এমন কোনো নেয়ামত আছে যার প্রতিপালন প্রয়োজন? তিনি বললেন, না। তবে এতটুকু যে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে এসেছি। আল্লাহ তোমাকে বার্তা জানিয়েছেন যে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন যেমন তুমি তাকে তাঁর জন্য ভালোবাসো।’[মুসলিম : ৬৭১৪]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا. أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ».

‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যাবৎ না পরিপূর্ণ মুমিন হবে। আর তোমরা পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন জিনিসের কথা বলে দেব না, যা অবলম্বন করলে তোমাদের পরস্পর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (তা হলো) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’[মুসলিম : ২০৩]

বিভীষিকার রোজ কিয়ামতে যখন সূর্য মাথার হাতখানেক ওপর থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকবে, প্রখন তাপে মাথার মগজ গলে পড়বে, তখন সাত শ্রেণীর লোক মহা প্রভাবশালী আল্লাহর আরশের সুশীতল ছায়াতলে স্থান পাবে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ওই দুই ব্যক্তি যারা শুধু আল্লাহর জন্যই একে অপরকে ভালোবাসে, তার জন্য মিলিত হয় আবার তাঁর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِي خَلاَءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسْجِدِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللهِ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ.

‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন নিজের ছায়া দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না। ন্যায়পরায়ন শাসক, আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন যুবক, ওই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ আর তার চোখ অশ্রু ফেলে, ওই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের ভালোবাসায় ঝুলে থাকে, ওই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, যে ব্যক্তিকে রূপবতী কুলীন কোনো নারী নিজের প্রতি আহ্বান করে আর সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং যে ব্যক্তি এমন সংগোপনে সদাকা করে যে তার বাম হাত জানতে পারে না ডান হাত কী করেছে।’ [বুখারী : ৬৮০৬; মুসলিম : ২৪২৭]

বান্দা যতক্ষণ অপর ভাইয়ের সাহায্য করে আল্লাহ পাকও তাকে সে অবধি সাহায্য করেন। ভালোবাসার অকৃত্রিম প্রেরণায় একে অপরকে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নায় সৃষ্টজীব বিশেষত মানবসেবার প্রতি গুরুত্বারোপ করে অসংখ্য বাণী বিবৃত হয়েছে। যেমন

« مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِى عَوْنِ أَخِيهِ وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِى بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ ».

“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে। আর যে কেউ ইলম অর্জনের কোন পথ দেখাবে, আল্লাহ তাকে এর কারণে জান্নাতের দিকে একটি পথ সুগম করে দিবেন, কিছু লোক যখন আল্লাহর কোন ঘরে বসে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং তা নিয়ে পরস্পর পাঠ করে তখনই সেখানে প্রশান্তি নাযিল করা হয়, রহমত তাদের ঢেকে যায়, আর ফেরেশতা তাদের ঘিরে থাকে এবং আল্লাহ তাঁর কাছে যারা আছে তাদের কাছে এদেরকে স্মরণ করেন, আর যার আমল তাকে ধীর করেছে তাকে তার বংশ দ্রুত করবে না।” [বুখারী : ৭০২৮]

আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا ، أَوْ مَظْلُومًا قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ.

‘তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। তখন তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অত্যাচারিতকে সাহায্য করার অর্থ তো বুঝে আসল, তবে অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরবে (তাকে জুলুম থেকে বাধা প্রদান করবে)।’ [বুখারী : ২৪৪৪]

অর্থাৎ তুমি তোমার ভাইকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করবে। যদি সে জালেম হয় তাহলে জুলুম থেকে তার হাত টেনে ধরবে এবং তাকে বাধা দেবে। আর যদি সে মজলুম হয় তাহলে সম্ভব হলে তাকে সাহায্য করবে। যদিও একটি বাক্য দ্বারা হয়। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটি সবচে দুর্বল ঈমান।

অপরের প্রতি দয়া ও সহযোগিতার হাত সেই বাড়িয়ে দিতে পারে সতত যার মন ভালোবাসায় টইটুম্বুর থাকে। অতএব ভালোবাসা কোনো পঙ্কিল শব্দ নয়, নয় কোনো নর্দমা থেকে উঠে আসা বা বস্তাপঁচা বর্ণগুচ্ছ। ভালোবাসা এক পুণ্যময় ইবাদতের নাম। ভালোবাসতে হবে প্রত্যেক সৃষ্টজীবকে, প্রতিটি মুহূর্তে। এর জন্য কোনো দিন নির্ধারণ করা, বিশেষ উপায় উদ্ভাবন করা মানব জাতির চিরশত্রু ইবলিসের দোসর ছাড়া অন্য কারও কাজ হতে পারে না।

কয়েক বছর পূর্বে এদেশে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’-এর আমদানি করে একটি প্রগতিশীল (?) সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন। প্রতিযোগিতার বাজারে কেউ পিছিয়ে থাকতে চায় না বলে পরের বছর থেকেই অন্যান্য পত্রিকাও এ দিবসের প্রচারণায় নামে। এ দিবসটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষালয়গুলোতে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে রাজধানী ঢাকায় একটি গোলাপ বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার টাকায়! কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও পার্কে তরুণ-তরুণীরা সোল্লাসে পালন করে এ দিবস। মূলত কার্ড ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী বিত্রেতারাই নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে এ দিবসের প্রচারণায় ইন্ধন যোগায়। এদিন যুবক-যুবতীরা যা করে তা শুধু ইসলামের দৃষ্টিতেই নয়, তথাকথিত আবহমানকালের বাঙালী সংস্কৃতির আলোকেও সমর্থনযোগ্য নয়।

ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিবসের প্রয়োজন হয় না। বিশেষ পাত্র বা পাত্রিরও প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা করার জন্য বিশষ সময়, দিবস লাগে, বিশেষ পাত্র বা পাত্রীর দরকার পড়ে। তাই ভালোবাসার কোনো দিবস পালন করা একটি ভাওতাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। হ্যাঁ, বেহায়াপনার জন্য দিবস হতে পারে। কারণ অশ্লীলতা চর্চাকারীরা তাদের নির্লজ্জ আচরণ সবসময় করতে পারে না, সবার সাথে করতে পারে না। এর জন্য উপলক্ষ দরকার। যে দিবসের আড়ালে বেলেল্লাপনা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালোবাসা দিবস পালনের ধরন ও প্রকৃতিই আমাদের বক্তব্যের বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণে যথেষ্ট বলে মনে করি।

তাই আমরা এই দিবসের নাম রাখতে চাই ‘বিশ্ব বেহায়া দিবস’। এখন থেকে কুইজ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন হবে বিশ্ব বেহায়া দিবস কবে? সঠিক উত্তর হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। এভাবে এ দিবসের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসের যে ইতিহাস, তা জানলে কোনো মুসলিম সন্তান এ দিবস পালনে উৎসাহী হতে পারে না। তাই আসুন আমরা সংক্ষিপ্তভাবে এ দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য জেনে নেই।

ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের আগে চতুর্থ শতকে পৌত্তলিক, মূর্তিপূজারীদের সমাজে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেবতার অর্চনা করতে। পশু পাখির জন্য একজন দেবতা দেবতা কল্পনা করত। জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য একজন দেবতার বিশ্বাস করত। যে দেবতার নাম ছিল ‘লুপারকালিয়া’। এই দেবতার সন্তুষ্টির জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ছিল যুবতীদের নামে লটারি ইস্যু করা। যে যুবতীর নাম যে যুবকের ভাগে পড়ত সে তার সাথে অগামী বছরের এ দিন পর্যন্ত বসবাস করত। এ দিন এলে দেবতার উদ্দ্যেশ্যে পশু জবাই করা হতো। জবাইকৃত পশুর চামড়া যুবতীর গায়ে পরিয়ে পশুটির রক্ত ও কুকুরের রক্তে রঞ্জিত চাবুক দিয়ে ছেলে-মেয়েকে আঘাত করত। তারা ভাবত এর দ্বারা নারী সন্তান জন্ম দেয়ার উপযুক্ত শাস্তি হয়। এ অনুষ্ঠানটি পালন করা হতো ১৪ ফেব্রুয়ারি।

খৃষ্টধর্মের আবির্ভাব হলে তারা এটাকে পৌত্তলিক কুসংস্কার বলে ঘোষণা দেয়। কিন্তু এতে দিবসটি পালন বন্ধ হয় না। পাদ্রীরা অপারগ হয়ে এ দিবসকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেন। তারা বলেন, আগে এ অনুষ্ঠান হতো দেবতার নামে, এখন থেকে হবে পাদ্রীর নামে। যুবকরা ১ বছর পাদ্রীর সোহবতে থেকে আত্মশুদ্ধি করবে। এদিনে সেই সোহবত শুরু ও শেষ হবে। ৪৭৬ সনে পোপ জোলিয়াস এ দিবসের নাম পরিবর্তনের পরে এ দিবসের নাম যাজক ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ রাখা হয়। ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে এ দিবসের নাম রাখার কারণ হলো এই খৃষ্টান যাজক কারাগারে বন্দি হওয়ার পর প্রধান কারারক্ষীদের মেয়ের সাথে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে প্রেমিকার উদ্দেশে একটি চিরকুট লিখে যান। এই জন্য খৃষ্টান সমাজে ‘প্রেমিকদের যাজক’ হিসেবে তার খ্যাতি লাভ হয়। এরপর থেকে তার মৃত্যু তারিখ তথা ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে নামে পালিত হতে শুরু করে।

আমাদের যুব সমাজকে এসব ইতিহাস জানতে হবে। খুতবা, বক্তৃতা ও সকল গণমাধ্যমে এ দিবসের জন্মপ্রথা ও তাৎপর্য তুলে ধরতে হবে। বুঝাতে হবে পৌত্তলিকদের উদ্ভাবিত, খৃষ্টানদের সংস্কারকৃত কোনো অনুষ্ঠান মুসলিমরা উদযাপন করতে পারে না। যুবসমাজ হলো জাতির প্রাণ। দেশের ভবিষ্যৎ। যুবসমাজের নৈতিকতার পতন হওয়া মানে ওই জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস হওয়া। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা উস্কে দিয়ে শত্রুরা আমাদের ভবিষ্যতকে গলা টিপে হত্যা করতে চায়। যুবকদের নৈতিকতার বলকে বিচূর্ণ করে আমাদের দুর্বল করে দিতে চায়। যারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক, তারা এ দিবসকে সমর্থন করে দেশ ও জাতির সর্বনাশ করতে পারেন না। যারা প্রগতিশীল, সুশীল ইত্যাদি বিশেষণে নিজেদের বিশেষিত করেন, তাদের প্রতি অনূরোধ-দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তরুণ-তরুণীদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অশ্লীলতার পথ থেকে ফেরান। তাদের নৈতিক পতন রোধ করুন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও উৎসবের নামে নীতি-নৈতিকতা ধ্বংসের প্রতিযোগিতা থেকে তাদের রক্ষা করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর এবং তারঁ পরিবার পরিজন ও সংগী সাথীদের উপর। অতঃপর ধর্মপ্রান মুসলমান ভাইদের প্রতি এই ছোট লিফলেটখানা পেশ করা হল- যাতে সাঊদী আরবের উচ্চ পরিষদের মাননীয় সভাপতি শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীনের নিকতে এক বেনামাজী পরিবার সম্পর্কে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এবং সে প্রশ্নের উত্তর নিচে দেয়া হল।

প্রশ্নঃ একজন ব্যাক্তি যখন তার পরিবারের লোক-জনকে স্বলাতের নির্দেশ দিল, তখন তাদের কেউই তার নির্দেশ মানল না অর্থাৎ স্বলাত পড়ল না। এমতবস্থায় ঐ ব্যাক্তি তার পরিবারের লোকজনের সাথে কি বসবাস করবে? এবং তাদের সাথে মিলেমিশে থাকবে? না সে নিজে পরিবার ছেড়ে, বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবে?

উত্তরঃ যদি ঐ পরিবারের লোকজন কখোনই স্বলাত না পড়ে তাহলে তার সবাই কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে, ফলে ইসলামের গন্ডি থেকে তার বের হয়ে যাবে। কাজেই এ ব্যাক্তির পক্ষ তার পরিবারের সাথে বসবাস করা জায়েজ হবে না।তবে এ ব্যাক্তির উপর এটাই ওয়াজিব হবে যে, তিনি বারবার তাদেরকে স্বলাত পড়ার, কল্যানের পথে আসার জন্য নির্দেশ দিবেন। যাতে করে আল্লাহ তা’আলা তাদের হিদায়াত করেন।

স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফের (এই বড় পাপের কাজ হতে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)আমিন। যা কুর’আন ও হাদিস এর দলীল দ্বারা প্রমাণিত, তাছাড়া সাহাবায়ে কিরামদের কথা এবং সুস্থ বিবেক দ্বারাও প্রমাণিত।

কুর’আন থেকে দালীলঃ

মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٩:١١]

অর্থঃ অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। (তাওবাঃ ১১)

আয়াতের মর্মাথ হলোঃ ঐ সমস্ত মুশরিকরা যতক্ষন পর্যন্ত উল্লেখিত কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করবে ততক্ষন পর্যন্ত তারা মুসলমানদের ভাই হিসাবে গন্য হবে না। এ ছাড়া স্বলাত পরিত্যাগ করা এটা এত বড় পাপ কাজ- যার ফলে ধর্মীয় বন্ধনে কোন কাজে আসবে না।

হাদিস থেকে দালীলঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, “একজন মু’মিন বান্দা এবং কুফর ও শিরক এর মাঝে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা অর্থাৎ, যারা স্বলাত পড়েন তারা ঈমানদার আর যারা স্বলাত পোরে না তারা কাফির ও মুশরিক।” (মুসলিম)

রসুল (সঃ) আরো বলেছেন, “আমাদের মাঝে ও ঐসব মুনাফিক ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী বস্তু হল স্বলাত। অতএব, যে স্বলাত পরিত্যাগ করল, সে আল্লাহর সাথে কুফুরী করল।” (তিরমীজি, আবু দাউদ, নাসায়ী,ও ইবনে মাজাহ)

 

সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) মুখনিঃসৃত বানী হতে দালীলঃ

আমীরুল মু’মীনিন উমার ফারুক(রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যাক্তি স্বলাত পরিত্যাগ করল, তার জন্য ইসলাম ধর্মে সামান্য পরিমান কোন অংশ বা অধিকার নেই।”

আব্দুল্লাহ বিন শাক্বীক(রাঃ) বলেনঃ “নাবী(সঃ) এর সাহাবীরা একমাত্র স্বলাত পরিত্যাগ করা ছাড়া ইসলামী অন্য কোন কাজ পরিত্যাগ করলে যে মানুষ কাফির হয় এটা তারা জানতান না। ”

সুস্থ বিবেকের দ্বারা দালীলঃ

সুস্থ বিবেক কি এটাই সমর্থন করবে- যে একজন মানুষ যার অন্তরে সরিষা পরিমান ঈমান আছে, আর যিনি স্বলাত এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ব্য সম্পর্কে এবং ঐ স্বলাতের মাধ্যমে যে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভ করা যায় এ সমস্ত বিষয়ে যিনি অবগত আছেন। এর পরেও যদি তিনি একাধারে স্বলাত পরিত্যাগকারী করেই চলবেন? এটা কোন রকমেই সম্ভব নয়।

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীন বলেছেনঃ “ স্বলাত পরিত্যাগকারীর বাক্তি কাফির নয় এ মর্মে যে সমস্ত ভায়েরা যে সমস্ত দালিল পেশ করেন, সে সমস্ত দালিলগুলি আমি খুব চিন্তা-ভাবনা করে ও গবেষনা করে দেখেছি যে ঐ সব দালীলগুলি নিম্ন চারটি অবস্থার সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত”

  • ১. ঐ সমস্ত দালীল হয়ত প্রকৃতপক্ষে বেনামাজী ব্যাক্তি কাফির কি না এ বিষয়ে দালীল নয়।
  • ২. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলিকে এমন গুণের সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে গুণের সাথে ঐ দালিলগুলি স্বলাত পরিত্যাগক করাকে অস্বীকার করে।
  • ৩. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলি সাধারন এম্ন অবস্থার সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে অবস্থার ভিতরে এই স্বলাত পরিত্যাগ করাকে ক্ষমার চোখে দেখা হয়েছে।
  • ৪. অথবা ঐ সমস্ত দালিলগুলি সাধারন বা অনির্দিষ্ট। অতঃপর “স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির”। এ সমস্ত হাদিসের দ্বারা উক্ত দালীলগুলোকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। “স্বালাতের পরিত্যাগকারীর ব্যাক্তি কাফির” অনেকেই এ হাদিসের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, “স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির” অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিয়া’মাতকে আস্বীকার করেছে, কাজেই সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না।

এখানে আমাদের কথা হল- হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয় যে, স্বালাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির। এছাড়া কুর’আন ও হাদিসের কোথাও এমন কথা বলা নেই যে বেনামাযী ব্যাক্তি মু’মিন বা সে জান্নাতে প্রবেশ করবে অথবা সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তাহলে আমরা কোন দালীলের ভিত্তিতে অন্যান্যদের মত (স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফের নয়য় বরং সে আল্লাহর নি’আমাত অস্বীকারকারী) এই ব্যাখ্যার প্রতি ধাবিত হব। অতএব, উপরে উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা এটা প্রমাণিত হল যে, নিশ্চয়ই স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির তাহলে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির উপর মুরতাদের বিধানসমুহ প্রয়োগ করা যাবে।

স্বালাত পরিত্যাগকারী মুর্তাদের বিধানসমুহঃ

ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির স্তাহে কোন মহিলার বিবাহ ঠিক হবে না, কেননা ঐ ব্যাক্তিকে যাওদি বিবাহ করিয়ে দেয়া হয় আর এওমতবস্থায় সে যদি স্বলাত না পড়ে তাহলে ঐ বিবাহ বাতিল হয়ে যাএব, ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না। কেননা, মুহাজির মহিলাদের সম্পর্কে আল্লহা তা’আলা বলেনঃ

فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ

অর্থঃ যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। (সুরা মুমতাহিনাঃ ১০)

২। একজন মুসলমান ব্যাক্তি তাকে (মুসলিম রমনীর সাথে) বিবাহ করিয়ে দেয়ার পরে যদি সে স্বালাত একেবারেই ছেড়ে দেয়, তাহলে তার বিবাহ ভেঙ্গে যাবে। ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না, উপরে বর্নিত আয়াতের বিধান অনুযায়ী।

৩। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি যদি কোন জানোয়ার জবেহ করে, তাহলে ঐ জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া যাবে না। কেননা উহা হারাম। তবে জানোয়ার বেনামাযী মুসলমান জ্জবেহ না করে যদি কোন ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহ করে তাহলে তাদের জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া আমাদের জন্য হালাল হবে। (স্বলাত ত্যাগ করার মত এতবড় পাপকাজ হতে আল্লাহ আমাদের হেফাযাত করুন।) কেননা একজন বেনামাযী মুসলমানের জবেহকৃত জানোয়ারের ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহকৃত জানোয়ারের এর চেয়েও নিকৃষ্ট।

৪। আর ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির জন্য মক্কা শরীফে এবং মদীনায় নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রবেশ করা বোইধ নয়। কেননা আল্লাহ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। (সুরা তাওবাঃ ২৮)

৫। যদি সে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির কোন নিকটাত্মীয় মারা যায় তাহলে ঐ মৃত ব্যাক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বা মিরাছে তার কোন হক থাকবে না। এমনি ভাবে যদি কোন মুসলিম স্বলাতী ব্যাক্তি একদিকে তার বেনামাযী ছেলেকে অপরদিকে তার স্বলাতী চাচাত ভাইকে রেখে মারা যায়- তাহলে সম্পর্কের দিন থেকে অতি নিকটে হওয়া সত্ত্বেও বেনামাযী হওয়ার কারনে তার ছেলে মিরাছ পাবে না। আর সম্পর্কের দিক দিয়ে দুরবর্তী হওয়া সত্ত্বেও স্বলাতী হওয়ার কারনে তার চাচাতো ভাই তার মিরাছ পাবে। কেননা উসামা(রাঃ) বলেছেন, “রসুল(সঃ) বলেন, ‘কোন মুসলিম কোন কাফিরের পরিত্যাক্ত সম্পদ হতে কোন অংশ পাবে না । এমনিভাবে কোন কাফির ব্যাক্তি কোন মুসলিমের পরিত্যাক্ত সম্পদের থেকে কোন অংশ পাবে না’”

রসুল(সঃ) বলেছেন, “তোমরা মৃত ব্যাক্তির পরিত্যাক্ত সম্পদকে যথাযথভাবে তার প্রাপ্যদেরকে পৌছে দাও। প্রাপ্যদারদের হক পৌছিয়ে দেয়ার পর যা অতিরিক্ত থাকবে তা আছাবা হিসেবে শুধু পুরুষদের জন্য নির্ধারিত।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করলে তাকে গোছল করানো এবং কাফন পরানো এবং তার জানাযার স্বলাত পড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। এমনিভাবে তাকে মুসলিমদের কবস্থানে কবর দেয়া ঠিক হবে না। বরং ঐ বেনামাযীর লাশকে গোসল না দিয়ে, কাফন না পড়িয়ে তার পরনের কাপড় সহ মাঠে ময়দানের কোন সুবিধামত জাগায় গর্ত করে তাকে মাটি চাপা দিতে হবে। কেননা ইসলামী শরীয়াতে কোন বেনামাযীর জন্য এবং বেনামাযীর লাশের জন্য সম্মান বলতে কিছুই নেই। আর এ জন্যই কোন একজন মুসলিমের সামনে যদি অন্য কোন বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করে তাহলে বেনামাযীর জানাজা স্বলাতের জন্য অন্য কোন মুসলিমদের আহবান জানানো ঐ মুসলিমের জন্য বৈধ হবে না।

৭। কিয়ামাতের দিন ঐ বেনামাযী ব্যাক্তিকে কাফেরদের বড় বড় নেতা যেমন, ফিরাউন, হামান, ক্বারুন এবং উবাই বিন খালফদের সাথে একত্রিত করা হবে। (এই জঘন্য পরিনতি হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি) এছাড়া ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ ব্যাক্তির পরিবার-পরিজনদের মধ্য থেকে কারো পক্ষে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির প্রতি রহমতের জন্য এবং তার ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করা হালাল নয়। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ

অর্থঃ নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্নীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা দোযখী। (সুরা তাওবাঃ ১১৩)

প্রিয় পাঠক ভায়েরা! এই স্বলাত পরিত্যাগ করা বিষয়টা বড়ই বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও বড় দুঃখের বিষয় এই যে, বহু মুসলিম ভাইয়েরা এই স্বলাত ত্যাগ করা এত বড় পাপকাজকে তুচ্ছ মনে করে। এ ব্যাপারে তাদের যেন কোন অনুভুতি নেই। আর এ জন্যই তারা যে কন বেনামাযীকে নিজ বাড়িতে দ্বীধাহীন চিত্তে অবস্থান করার সুযোগ দিয়ে থাকে। উল্লেখিত সব কাজ নাজায়েয।

স্বলাত পরিত্যাগকারী পুরুষ বা মহিলা যেই হোকনা কেন- এটাই স্বলাত পরিত্যাগকরার ইসলামী বিধান। কাজেই ওহে স্বলাত পরিত্যাগকারী! অথবা যথাযথভাবে স্বলাত পড়ার ব্যাপারে অলসতাকারী!, তুমি সাবধান হও, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার বাকি জীবনটাকে পুন্যময় কাজের দ্বারা পুর্ন করার চেষ্টা কর। কেননা তুমি জানো না তোমার মৃত্যু ঘন্টা বাজতে, তোমার জীবন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, তোমার মৃত্যু সংঘটিত হতে আর কত বছর বা কত ঘন্টা বাকি আছে? তোমার মৃত্যুর সংবাদ এর সময় কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কারো জানা নেই। অতএব, তুমি সর্বদা নিম্ন লিখিত আল্লাহর বানী স্মরন করঃ

إِنَّهُ مَن يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ [٢٠:٧٤

অর্থঃ নিশ্চয়ই যে তার রবের কাছে অপরাধী হয়ে আসে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে সে মরবে না এবং বাঁচবেও না। (সুরা ত্বহাঃ ৭৪)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেনঃ

.فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَىٰ.وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا.فَأَمَّا مَن طَغَىٰ

অর্থঃ তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে, এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (সুরা নাযি’আতঃ ৩৭-৩৯)

পরিশেষে হে পাঠকমন্ডলী! আল্লাহ আপনাদের প্রত্যেককেই প্রতিটি ভালো কাজ করার পুর্ন তাওফীক দান করুন। এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলা আপনাদের তারঁ বিধান মুতাবিক জ্ঞান অর্জনের, আমল করার এবং আল্লাহর পথে মানুষদের আহবান জানানোর পুর্ন তাওফীক দান করুন এবং সেই সাথে আপনাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে সৌভাগ্যময় ও আনন্দময় করে গড়ে তুলুন। আমিন

সর্ব বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত নাযিল করুন। আমিন।

[ফযীলাতুশ শায়খ, মুহাম্মাদ বিন সালিহ বিন উছাইমীন (রহঃ)[

 

এক বেনামাযী মৃত ছেলের জন্য তার মায়ের ফাতওয়া তলব

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর যে নাবীর পর আর কোন নাবী আসবে না। অতঃপর এক মহিলা তার এক বেনামাযী ছেলের সম্পর্কে তদানিন্তন সাউদী আরবের প্রধান মুফতি শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বায(রহঃ) এর নিকট ফাতওয়া তলব করেন। পরে শাইখ বিন বায ঐ ফাতওয়া সাউদী আরবের “উচ্চ উলামা” পরিষদের নিকট হস্তান্তর করেন। এরপর ১৪/১/১৪১৯ হিজরী সনে (৪১৫) নম্বরে উচ্চ উলামা পরিষদের উক্ত ফাতওয়াকে সাউদী আরবের সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনার স্থায়ী কমিটির নিকট পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর ঐ কমিটি উলত ফাতওয়ার যে সমাধান দিয়েছিল সেটাই নিচে উল্লেখ করা হলঃ

ঐ মহিলার প্রশ্নঃ

১৭ বছর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল, কিন্তু সে দুর্ভাগ্যবশত আজ থেকে ২ মাস পুর্বে হঠাৎ গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়। ছেলেটি স্বলাত পড়ত না এবং রামাদানে সিয়াল পালন করত না। তবে আমার জানা মতে এ দুটি পাপ ছাড়া আর কোন পাপ তার দ্বারা সংঘটিত হয় নাই। এমতবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ থেকে তার রমাদানের সিয়ামগুলো পুর্ন করা, তার মাতা হিসেবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়জ হবে কি?এমনিভাবে ঐ ছেলের পক্ষ থেকে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিনের সিয়াম, সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এসমস্ত লফল সিয়াম যদি রাখা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে? এমনিভাবে আমি যদি তার পক্ষ থেকে যোহর স্বলাতের প্রথম চার রাকা’আত,যোহর স্বলাতের পরে দুই রাক’আত এবং আছর, মাগরিব ও এশা ও ফজর স্বলাতের পুর্বে দুই দুই রাক’আত করে স্বলাত পড়ি তাহলে কি এ সমস্ত সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?

ফাতওয়া কমিটি গবেষনার পর যে জবাব দিয়েছিলঃ
যে বাক্তি কোন সিয়াম না রেখে এবং বেনামাযী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসেবে গন্য করা যাবে না। কেননা যে বঅ্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বলাত ত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসংগে মুহাম্মাদ(সঃ) বলেনঃ

“একজন মু’মিন বান্দা ও কাফির ও মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা।” অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা স্বলাত পড়ে আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা স্বলাত পড়ে না। অতএব যারা বেনামাযী অবস্থায় জীবন কাটালো এরপর তারা মৃত্যুর আগে আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা। এধরনের ব্যাক্তিদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু’আ করা জায়েজ হবে না। অতএব ঐ ছেলের মা তার ছেলের জন্য মাগফিরাতের যতই দু’আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবে না। কেননা স্বলাত এমন একটি ইবাদাত যা অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করার কোন প্রমান ইসলামী শরীয়াতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল ভালো কাজের তাওফীকদাতা।

পরিশেষে আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত ও শান্তি বর্ষন করুন। আমিন।

 

পক্ষেঃ

ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনা স্থায়ী কমিটি

১. সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)

২. সহ-সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ আলুশ-শাইখ

৩. সদস্যঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-গুদাইয়ান

৪. সদস্যঃ বাকারা বিন আব্দুল্লাহ আবু যাইদ

৫. সদস্যঃ সালিহ- বিন ফাওযান আল-ফাওযান

 

নির্ধারিত সময় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ার বিধান

একমাত্র শারয়ী ওযর এবং বিশেষ কোন অসুবিধা ছাড়া দেরী করে স্বলাত পড়া হারাম ও নাজায়েজ। কেননা স্বলাত আদায় করার জন্য আল্লাহ তা’আলা সময় নির্ধারন করে দিয়েছেন, সেহেতু যথা সময়ে স্বলাত আদায় করা ওয়াজিব। অতএব, যদি কেউ কোন ওযর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতা করে স্বলাতের নির্ধারিত সময় চলে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করে তাহলে তার স্বলাত বাতিল হবে ফলে ঐ স্বলাত আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

অর্থঃ নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। (সুরা আন-নিসাঃ ১০৩)

অতএব যথা সময়ে স্বলাত আদায় না করার কারনে বান্দার স্বলাত যখন নষ্ট হয়ে যাবে, তখন এর কারনে ঐ স্বলাতী ব্যাক্তি কুফুরী করল এবং সে স্বলাত পরিতাগকারী হিসেবে গন্য হবে। শুধু তাই নয়য়, দেরী করে স্বলাত আদায় করা হারাম এবং এটা নিছক কুফুরী কাজ। আর এ কুফুরী কাজের জন্য আল্লাহ তা’আলা কঠন শাস্তি প্রদানের সতর্কবানী বলে দিয়েছেনঃ

فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ ۖ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا

অর্থঃ (পুর্ববর্তী আয়াত দ্রষ্টব্য) অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। (সুরা মরিয়ামঃ ৫৯)

আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ(রাঃ) সহ আরো অনেকেই উল্লেখিত আয়াতের অর্থ নষ্ট করা শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে এখানে (أَضَاعُوا) এর অর্থ এটা নয় যে তারা স্বলাতকে একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা নির্ধারিত সমইয় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ত। যেমন তারা ফজর স্বলাত সুর্য উদয়ের পরে পড়ত, এমনিভাবে তারা আছরের স্বলাত সুর্য ডুবার পরে পড়ত।

আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেন, উমার বিন খাত্তাব(রাঃ) আব্দুর রহমান বিন আওফ(রাঃ) ,মুয়াজ বিন জাবাল(রাঃ) এবং আবু হুরাইরা(রাঃ) সহ আরো অন্যান্য সাহাবী হতে বর্নিত আছে যে,

“নিশ্চয়ই যে ব্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত স্বলাত ছেড়ে দিল, এমতবস্থায় ঐ স্বলাতের নির্ধারিত সময়ের ও পার হয়ে গেল তাহলে ইচ্ছাকৃত এই স্বলাত ত্যাগ করার কারনে ঐ বাক্তি কাফির ও মুরতাদ হয়ে গেল।”

পরিশেষে উক্ত বক্ত্যবের বর্ননাকারী আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেনঃ উপরেউল্লেখিত বিষয়ে প্রখ্যাত চার সাহাবির মধ্যে কেউই উক্ত হাদিসের সম্পর্কে কোন মতানৈক্য করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

স্বলাত দেরী করে পরার ভয়াবহ পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ.فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

অর্থঃ অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর (সুরা মাউ’নঃ ৪-৫)

উল্লেখিত আয়াতঃ তারা নিজেদের মধ্যে স্বলাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে এর অর্থ এ নয়য় যে তারা একেবারেই স্বয়ালত ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা (মুনাফিকরা) স্বলাতের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করত। এখানে কেবলমাত্র স্বলাত দেরী করে পোরার জন্য আল্লাহ তা’আলা ঐ সমস্ত মুনাফিকদের “ওয়ায়িল” নামহ জাহান্নাম বা ভয়াবহ শাস্তি প্রদানের ওয়াদা করেছেন।

এ প্রসংগে হাদিসে বর্নিত আছেঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই যে সমস্ত ব্যাক্তিরা ফরজ স্বলাত না পড়ে ঘুমিয়ে পগেল এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুর পর ঐ সমস্ত ব্যাক্তিদের কবরে তাদের মাথাগুলোকে পাথর দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হবে। তাদের মাথাগুলো পাথর দিয়ে চুর্নবিচুর্ণ করে দেওয়ার পর ঐ মাথাগুলো পুর্বে যেরুপ ছিল আবার সেরুপ হয়ে যাবে। কিয়ামাত পর্যন্ত পালাক্রমে তাদের কবরে এইরুপ আযাব হতেই থাকবে, কোন রকমেই তাদের থেকে এ শাস্তি শিথিল করা হবে না। (বুখারী)

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে যথা সময়ে দৈনিক পাচঁ ওয়াক্ত স্বলাত জামা’আতের সাথে আদায় করার পুর্ন তাওফীক দান কর এবং উল্লেখিত ভয়াবহ সকল প্রকার পরকালীন শাস্তি ও আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করিও। আমীন

মহান আল্লাহ তাআলার দশ অসিয়ত পর্বঃ ২

আল্লাহ তাআলার দশ অসিয়ত

পর্বঃ ২

  • পঞ্চম অসিয়তঃ মানুষ হত্যা না করা

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
“আল্লাহ যা হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তোমরা তা হত্যা করবে না।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের প্রাণ দান করেছেন, তিনি তা রক্ষা করবেন। এ প্রাণ হরণ করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। তার স্পষ্ট নির্দেশ ব্যতীত কোন মানুষকে হত্যা করা বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। যে সকল ব্যাপারে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছেন শুধু সে সকল ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তা বাস-বায়ন করবেন। যেখানে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান শিথিল করে নিহত ব্যক্তির আত্নীয়-স্বজনের সাথে বোঝা পড়া করে বা রক্ত পণ দিয়ে অব্যাহতি লাভের ব্যবস্থা দিয়েছেন সেখানে সে ব্ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাও হত্যার মত অপরাধ।
একটু বিস্তারিত না বললে বিষয়টি হয়তো স্পষ্ট হবে না। মনে করুন কাবীল নামের এক ব্যক্তি হাবীল নামক ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল। আদালত স্বাক্ষ্য প্রমাণে রায় দিল যে, কাবীল, হাবীলের হত্যাকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই কাবীল-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো। এখানে ইসলামী বিধান হল হাবীলের পরিবার যদি কাবীল-কে ক্ষমা করে দেয় কিংবা কাবীলের কাছ থেকে রক্তপণ গ্রহণ করে, তাহলে কাবীলের প্রাণটা বেঁচে যায়। এতে কাবীলের পরিবারের যেমন কাবীলকে হারানোর বেদনা বহন করতে হবে না। তেমনি হাবীলের অসহায় পরিবারটি অর্থ পেয়ে নিজেদের অবস’ার উন্নতিতে কাজে লাগাতে পারবে। আর যদি হাবীলের পরিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবীতে অটল থাকে, তাহলে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। অন্য কোন শক্তির ক্ষমতা নেই তা রোধ করার। এটা হলো ইসলামের বিধান। কিন’ দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা মুসলমান হয়েও ইসলামের এ কল্যাণকর বিধান থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশের আইনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা রয়েছে কোন মৃত্যুদণ্ড রহিত করার। এটি সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী। রাষ্ট্রপতি যদি কাবীলের মৃত্যুদণ্ড রহিত করেন তাহলে হাবীলের পরিবারের লাভ কি হলো? অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে কাবীল জেল থেকে বের হয়ে নিহত হাবীলের পরিবারের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। হাবীলের পরিবার হাবীলকে হারানোর বেদনা বহন করে এখন কাবীলের ভয়ে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বৃটিশের গড়া মানুষগুলো এটতা ইসলাম বিদ্বেষী যে, তারা মনে করে ইসলামী আইন-কানুন যতই কল্যাণকর হোক তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। এ দেশে বৃটিশর রাজত্ব শেষ হয়েছে, কিন’ তাদের গোলামী ও দাসত্বের অবসান হয়নি।
অন্যায়ভাবে শুধু মুসলমানদের হত্যা করা অপরাধ নয়। যে কোন মানুষকে হত্যা করাই অপরাধ। এ আয়াতে তাই মানুষকে হত্যা হারাম করা হয়েছে। হোক সে মুসলিম বা হিন্দু কিংবা অন্য ধর্মালম্বী।
মানুষ হত্যা কত জঘন্য অপরাধ তা আল্লাহ তাআলার এ বানী থেকেও অনুধাবন করা যায়ঃ

أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
“যে ব্যক্তি প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।” সূরা আল- মায়েদা, আয়াত ৩২

আল্লাহর এ অসিয়তের ভাষায় ‘যথাযথ কারণ ব্যতীত হত্যা করা’ হারাম বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন তাহলে যথাযথ কারণ কী, যা পাওয়া গেলে হত্যা করা যায় বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন সে কারণগুলো। তিনি বলেছেনঃ

لا يحل دم إمرىء مسلم إلا بإحدى ثلاث- الثيب الزاني والنفس بالنفس والتارك لدينه المفارق للجماعة . متفق عليه
“তিনটি কারণের কোন একটি কারণ ব্যতীত মুসলমানের রক্ত প্রবাহ বৈধ নয় – বিবাহিত ব্যভিচারকারী, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ ও ইসলাম ধর্ম ত্যাগকারী মুসলিম সমাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী।” বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম

অর্থাত এ তিন কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করা বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ নয়। যদি বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় ও তার ব্যভিচার প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। যদি কেহ কাউকে হত্যা করে, তাহলে এর শাস্তি হিসাবে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। যদি কোন মুসলামান ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায় এবং মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে বিভেদ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়।
এ সকল অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া ও তা কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের। কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দল মৃত্যুদণ্ড দিতেও পারবে না। কার্যকর করতেও পারবে না। এটা ইসলামের বিধান।
মানুষ হত্যা কত বড় অন্যায়, আল্লাহ তাআলার আরেকটি বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারি। তিনি ইরশাদ করেনঃ

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
“কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাসি- জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাসি- প্রস’ত রাখবেন।”সূরা আন-নিসা, আয়াত ৯৩

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অনেক দল নিরীহ নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে থাকেন। তাদের আক্রমনে যারা নিহত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই নিরাপরাধ। এ সকল নির্বিচার আক্রমণ দ্বারা তারা শত্রুকে আতংকিত করতে চান কিংবা নিজেদের প্রচার প্রসারের লক্ষ্য সি’র করেন। বাস-বে দেখা যায় এ ধরনের নির্বিচার আক্রমণ দিয়ে শত্রুকে আতংকিত করা যাচ্ছেনা বরং এতে তাদের হিংস্রতা, পাশবিকতা ও বর্বরতা আরো বেড়ে যায়। সবেচেয়ে বড় কথা হলো এ ধরনের আক্রমণ যাতে নিরাপরাধ মানুষ নিহত হয়, ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। এ রকম কার্যকলাপ সম্পর্কে আল-কুরআনে যেমন নিষেধ আছে, আছে হাদীসেও। এ ছাড়া ইসলামে জিহাদের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের সামনে। সে ইতিহাসে এ ধরনের কোন দৃষ্টান- চোখে পড়ে না। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুধুমাত্র শত্রুদের আঘাত করতে হবে অন্যকে নয়। এ ধরনের কার্যকলাপ দ্বারা তারা যেমন মানুষ হত্যার অপরাধে অপরাধী, তেমনি ইসলামের নামে এ অপকর্ম করে ইসলামের নকল চেহারা প্রদর্শনের অপরাধেও তারা অপরাধী।
হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে নির্বোধ ব্যক্তিরা যা করছে সে কারণে আমাদের পাকড়াও করো না। তাদের কারণে আমাদের শাস্তি দিও না।
এ পাঁচটি অসিয়ত করার পরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
“তোমাদেরকে তিনি এ অসিয়ত করলেন যেন তোমরা অনুধাবন কর।”

এ পাঁচটি অসিয়ত দুর্বোধ্য নয়। একেবারে সহজ সরল ভাবে, সহজ ভাষায় বলা হলো। যাতে তোমরা বুঝতে পারো। ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারো। আর এটা কোন হালকা বিষয় নয়। তোমাদের প্রতিপালক মহান আল্লাহর চুরান্ত অসিয়ত।

  • ষষ্ঠ অসিয়তঃ ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস না করা

وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ.
ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত তোমরা তার সম্পত্তির কাছে যাবে না
ইয়াতীমের সম্পদ ও তার স্বার্থ রক্ষা সম্পর্কে এ হল এক ঐশী অসিয়ত। ইয়াতীম হল, এমন শিশু যার পিতা মারা গেছে আর সে এখনো বয়ো:প্রাপ্ত হয়নি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুধু ইয়াতীমের মাল আত্মসাত বা ভক্ষণ করতে নিষেধ করেননি বরং তার ধারে কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন। তবে ইয়াতীম সম্পদ সংরক্ষণ, তার বৃদ্ধি ও তার জন্য খরচ করার লক্ষে ব্যবস’া নিতে তার কাছে যাওয়া যাবে। যেমন এ আয়াতেই বলা হয়েছে ‘উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত’ ইয়াতীমের সম্পদের কাছে যেও না। উত্তম ব্যবস’া বলতে ইয়াতীমের সম্পদ তারই জন্য খরচ, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করা-কে বুঝায়।
ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাত বা ভোগ দখল করা কত বড় মারাত্মক অন্যায় তা এ আয়াত দিয়েও অনুধাবন করা যায়ঃ

إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
“যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে আগুন ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্যিই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে।” সূরা আন- নিসা, আয়াত ১০

ইয়াতীম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন- তার সম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর অর্থ এ নয় যে, সে প্রাপ্ত বয়স্ক হলে তার সম্পদ ভোগ করা যাবে। বরং এ কথার অর্থ হল: ইয়াতীম প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে তার সম্পদ তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

فَإِنْ آَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
“অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেকবুদ্ধি পরিদৃষ্ট হওয়া লক্ষ কর, তবে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ কর।” সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬

যে কোন মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাত করা বড় পাপ, তা সত্বেও বিশেষভাবে ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতের বিষয়ে ভিন্ন করে সাবধানবাণী এসেছে। বিষয়টি গুরুতর বিধায় এ অসিয়ত করা হয়েছে।
এ অসিয়তে আমরা ইয়াতীমের লালন-পালন ও তার কল্যাণে কাজ করার জন্য নির্দেশ লাভ করতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا وأشار بالسبابة والوسطي وفرج بينهما. رواه البخاري .

“আমি এবং ইয়াতীমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে এক সাথে থাকব।” এ কথা বলে তিনি তার হাতের মধ্যমা ও তর্জনী অঙ্গুলিদ্বয় একত্র করে ও পৃথক করে দেখিয়েছেন। বর্ণনায়ঃ বুখারী

 

  • সপ্তম অসিয়তঃ ওযন ও পরিমাপে কম না দেয়া

وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“এবং পরিমাণ ও মাপে ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দিবে।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারা যে লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়ে মাপে ও ওযনে পুরোপুরি দেয়, কম না দেয়। কেহ যেন তার অধিকারের চেয়ে বেশী ভোগ না করে। এমনিভাবে কেহ যেন তার অধিকারের চেয়ে কম না পায়।
মাপে কম দেয়ার এ খাছলতের কঠোর নিন্দা করেছেন, শাসি-র কথা ঘোষণা করেছেন আল্লাহ পবিত্র কুরআনেঃ

وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ ﴿১﴾ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ ﴿২﴾ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ ﴿৩﴾ أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ ﴿৪﴾ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ ﴿৫﴾ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿৬﴾
“দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের নিকট হতে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওযন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে? যে দিন দাড়াবে সকল মানুষ জগতসমূহের প্রতিপালকের সম্মুখে।” সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১-৬

নবী শুয়াইব আ. এর যুগে মানুষেরা মাপে ও ওযনে কম দিত। তাদের এ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ শুয়াইব আ. কে প্রেরণ করেন তাদের কাছে। তিনি মাপে কম দেয়া থেকে তাদের বারণ করতে থাকলেন। কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করেনি। ফলে আল্লাহ তাদের উপর গযব নাযিল করে ধ্বংস করে দেন। যেমন আল্লাহ তার বিবরণ দিয়েছেন আল-কুরআনেঃ

وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ وَلَا تَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِنِّي أَرَاكُمْ بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُحِيطٍ ﴿৮৪﴾ وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ ﴿৮৫﴾
“মাদইয়ানবাসীদের নিকট তাদের ভাই শুয়াইবকে আমি পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। আর মাপে ও ওযনে কম দিও না; আমিতো তোমাদের সমৃদ্ধশালী দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের জন্য ভয় করছি এক সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তি।হে আমার জাতি! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ঠিকমত মেপে দিবে ও ওযন করবে, লোকদের তাদের সামগ্রীতে কম দিবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াবে না।” সূরা হুদ, আয়াত ৮৪-৮৫

কিন্তু তারা নবীর আহবানে সাড়া দিল না। তারা মনে করল, তাদের অর্থনৈতিক ব্যাপারে নবীর কথা বলার কী প্রয়োজন আছে? নবী নামাজ পড়বেন। আল্লাহর গুনগান করবেন। লোকের তাদের অর্থনীতি ও সম্পদের আদান-প্রদানে যা ইচ্ছা তা করবে। এখানে ধর্মের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কী? আল্লাহ তাদের বক্তব্য উল্লেখ করে বলেনঃ

قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَنْ نَتْرُكَ مَا يَعْبُدُ آَبَاؤُنَا أَوْ أَنْ نَفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ إِنَّكَ لَأَنْتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ
“তারা বলল, হে শুয়াইব! তোমার নামায কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা যার ইবাদত করত আমাদের তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও বর্জন করতে? তুমি তো অবশ্যই ধৈর্যশীল, ভাল মানুষ।” সূরা হুদ, আয়াত ৮৭

পরে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিলেন।
وَأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دِيَارِهِمْ جَاثِمِينَ
“আর যারা সীমালংঘন করেছিল মহানাদ তাদের আঘাত করল, ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে নতজানু অবস্থায় পড়ে রইল।” সূরা হুদ, আয়াত ৯৪
এ অসিয়তটি করার পর আল্লাহ বলেনঃ
لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত ভার অর্পন করি না।” সঠিক মাপ ও ওযনে ক্রয়-বিক্রয় করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মানুষকে না ঠকানোর যে নির্দেশ আমি দিলাম তা পালন করা কঠিন কোন কাজ নয়। বরং মানুষ্য প্রকৃতি ও বিবেক এটাকে সমর্থন করে। এর বিপরীত আচরণকে সমর্থন করে না।

 

  • অষ্টম অসিয়তঃ কথা ও কাজে ন্যায় ও সততা রক্ষা করা

وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى
যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায় পরায়ণতা অবলম্বন করবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও।
যখন কারো সম্পর্কে কোন কথা বলা হয়, হোক তা সমালোচনামুলক বা কারো পক্ষে-বিপক্ষে স্বাক্ষ্য অথবা করো সম্পর্কে মুল্যায়ন কিংবা বিচার-ফয়সালা করা হয়, তখন অবশ্যই সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করতে হবে। ন্যায়পরায়ণতার সাথে কথা বললে তা যদিও শত্রুর পক্ষে যায় কিংবা আপনজনের বিপক্ষে যায় তবুও কোন ছাড় নেই। সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক কথাই বলতে হবে। এমনিভাবে যখন বিচার- ফয়সালা, শালিসি করা হবে তখন ন্যায় ভিত্তিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজ দলীয় – ভিন দলীয়, আত্নীয়-পর, উচ্চ বংশীয়-নিম্ন বংশীয়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে কারো সাথে বৈষম্য করা যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় থাকবে আল্লাহর স্বাক্ষী স্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্নীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে ধনী হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায় বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে যাও তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন।” সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫

তিনি আরো বলেনঃ

وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآَنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“কোন সমপ্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো ন্যায় বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। ন্যায় বিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করবে, তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক খবর রাখেন।” সূরা মায়িদা, আয়াত ৮

আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশ বাস্তবায়নে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখেছেন তাঁরই প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিচারের ক্ষেত্রে কোন পক্ষপাতিত্ব করতেন না। কেহ করতে শুপারিশ করলে তিনি তা সহ্য করতেন না। তিনি আরো বলেছেন, বিচারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও জুলুম করার কারণে দেশ, জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মাত্র একটি হাদীস পেশ করা হল:

َعَنْ عَائِشَةَ رضِيَ اللَّهُ عَنْهَا ، أَنَّ قُرَيْشاً أَهَمَّهُمْ شَأْنُ المرْأَةِ المخْزُومِيَّةِ الَّتي سَرَقَتْ فَقَالُوا : منْ يُكَلِّمُ فيها رَسُولَ اللَّه صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم ، فَقَالُوا : وَمَنْ يَجْتَريءُ عَلَيْهِ إِلاَّ أُسَامَةُ بْنُ زَيدٍ، حِبُّ رسولِ اللَّهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم ،فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم:্রأَتَشْفَعُ في حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ تَعَالى ؟গ্ধ ثم قام فاحتطب ثُمَّ قَالَ : ্র إِنَّمَا أَهلَكَ الَّذينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهمْ كَانُوا إِذا سَرَقَ فِيهم الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ ، أَقامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فاطِمَةَ بِنْبتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتَ لَقَطَعْتُ يَدَهَا গ্ধمتفقٌ عليه .
“আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, কুরাইশ বংশের লোকেরা তাদের বংশীয় মাখযুম গোত্রের এক মহিলার ব্যাপারে চিনি-ত হয়ে পড়ল। যে মহিলা চুরি করছিল। কুরাইশরা বলল, কোন ব্যক্তি এ মহিলার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলতে পারে? তারাই বলল, যে উসামা বিন যায়েদ রাসূলের কাছে প্রিয়। সে এ ব্যাপারে তার সাথে কথা বলবে। উসামা মহিলাকে শানি- না দেয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আবেদন করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে তুমি আমার কাছে শুপারিশ করছ?” অথঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ালেন, বক্তব্যে বললেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের মধ্যে যখন প্রভাবশালী, বংশীয় লোক চুরি করত তাকে ছেড়ে দিত (বিচার না করে)। আর যখন দুর্বল ব্যক্তি চুির করত তখন তার উপর শাসি- প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমা চুরি করত, তাহলে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।” বর্ণনায়ঃ বুখারী ও মুসলিম।

লোকদের ধারনা ছিল, কুরাইশ হল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিজ বংশ। তার বংশের এক মহিলা চুরি করেছে। তাঁর কাছে শুপারিশ করলে হয়ত তিনি নিজের বংশ ও মহিলার সম্মানের দিক বিবেচনা করে শাসি- থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। কিন’ আল্লাহর রাসূল সাফ জানিয়ে দিলেন, বিচারে কোন পক্ষপাতিত্ব চলতে পারে না। বংশ তো পরের কথা, আমার কলিজার টুকরা ফাতেমা যদি চুরি করে তাহলে তার উপরও শাসি- প্রয়োগ করা হবে যথাযথভাবে। আর এ ধরনের অন্যায়-অবিচার ও আইন প্রয়োগ ও বিচারে বৈষম্য করা দেশ, জাতি ধ্বংশের একটি বড় কারণ।
আমাদের সমাজে আইন-প্রয়োগ, বিচার ও শাসি- প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য মুলক আচরণ ব্যাপক ভাবে দেখা যায়। যাদের টাকা-পয়সা, প্রভাব-প্রতিপত্তি বা দাপট আছে, তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ ও শাসি- এক ধরনের। এমনকি তাদের জন্য আদালত ও জেল ভি আই পি গোছের। আর যাদের তেমন কিছু নেই তাদের ক্ষেত্রে আইন ও শাসি-র প্রয়োগ হয় কঠোরের চেয়েও কঠোর। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যেন আগেকার যুগের রাজা-বাদশাদের রাজপুত্র আর রাজ-কন্যার মত। তারা সাতটি খুন করলেও তা খুন বলে ধরা হতো না। এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল অবরোধের নামে যত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, যত মানুষ পিটিয়ে মেরেছে, তার কি কোন একটিরও বিচার হয়েছে? কেহ কি এর বিচারের দাবী তুলেছে? এটাইতো জুলুম। এ জুলুমের জন্যইতো দেশ, জাতি ধ্বংস হয়ে যায় বলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন। ইতিহাসও তাই বলে।
যারা সংবাদ-পত্র বা বিভিন্ন মিডিয়াতে কাজ করেন, তাদের জন্য রয়েছে এ আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অনেক সময় দেখা যায় তারা সংবাদ পরিবেশনে ন্যায়নীতির ধার ধারে না। সত্য ও মিথ্যা বলতে যেন তাদের অভিধানে কিছু নেই। যা ইচ্ছা তা প্রচার করে অপরকে অপমানিত করতে তাদের বিবেক কোন বাধা দেয় না।
এমনকি অনেক আলেম-উলামাকে দেখা যায় যে, কোন তুচ্ছ বিষয়ে কারো সাথে মতভেদ হলে তারা তাদের বিরোধী পক্ষকে গালিগালাজ করেন। গোমরাহ, বিভ্রান-, মুর্খ, ইসলামের শত্রু ইত্যাদি বাক্য প্রয়োগ করতে দ্বিধা করে না। এটা আল্লাহর এ অসিয়তের চরম লংঘন। মানুষ যা বলে তার সব কিছুর ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জওয়াবদিহি করা হবে।

  • নবম অসিয়তঃ আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পুরণ করা

وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا
আল্লাহর সাথে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে
রব হিসাবে ও উপাস্য বা ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সাথে সকল ওয়াদা পুরণ করতে হবে। যে সকল বিষয় এ দশ অসিয়তের মধ্যে উল্লেখ করা হয়নি তার সকল এ নবম অসিয়তে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। যা কিছু আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা করা এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা বর্জন করা হল আল্লাহর সাথে ওয়াদা পুরণ। যেমন সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, চুরি করা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা হল আল্লাহর সাথে ওয়াদা।
এ আয়াতের চারটি অসিয়ত শেষে আল্লাহ তাআলা বললেন,
ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
“তোমাদেরকে তিনি অসিয়ত করলেন, তোমরা যেন মনে রেখ ও উপদেশ গ্রহণ কর।”

 

  • দশম অসিয়তঃ কাফেরদের পথ অনুসরণ না করা ও বেদআত বর্জন করা

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ.
আর এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রদর্শিত এ সরল পথ হল আস-সিরাতুল মুস্তাকীম। একমাত্র পথ, দ্বিতীয় কোন পথ নেই। নেই কোন বক্রতা, দ্বিমুখীতা বা পরস্পর বিরোধীতা। সত্য এ পথ একটাই। তাহলে আল-কুরআন ও সুন্নাহর পথ। যে পথ অনুসরণ করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম। আর বাতিল পথ ও মত হল অনেক। তাইতো আল্লাহ এ আয়াতে বললেন, “ভিন্ন পথগুলো অনুসরণ করবে না।”
হাদীসে এসেছে

عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال : إن رسول الله صلى الله عليه وسلم خط خطوطا بيده ثم قال هذا سبيل الله مستقيما وخطا عن يمينه وعن شماله ثم قال هذه السبل ليس منها إلا عليه شيطان يدعو إليه ثم قرأ وأن هذا صراطي مستقيما . . .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নিজ হাত দিয়ে একটি রেখা টানলেন, অতঃপর বললেন, “এটা হল আল্লাহর সরল পথ।” এরপর ডানে বামে অনেকগুলো রেখা টানলেন, অতঃপর বললেন, “এ গুলো হল বিভিন্ন পথ। এর প্রত্যেকটি পথে শয়তান আছে। সে এ পথের দিকে মানুষকে আহবান করতে থাকে। এরপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ.
আরই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।” বর্ণনায় : নাসায়ী, আহমাদ, দারামী

যেভাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুসরণ করেছেন, ঠিক সেভাবে যদি অনুসরণ না করা হয় তাহলেই সেটা হবে শয়তানের পথ। সেটা কখনো আস-সিরাতুল মুস্তাকীম বলে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আস-সিরাতুল মুস্তাকীম ব্যতীত যত পথ ও মত আছে সব বাতিল। এগুলো সাধারণত দু ধরনের : (ক) কাফের বা অমুসলিমদের পথ। (খ) ইসলামের নামে এমন আচার-আচরণ, অনুষ্ঠান, ইবাদত যা কুরআন বা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটা হল বেদআত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এ দশম অসিয়তে উভয় প্রকার বাতিল পথসমূহ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। যদি কাফেরদের অনুসরণ করা হয় তাহলেও আস-সিরাতুল মুস-াকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আবার যদি ইসলামের মধ্যে অবস’ান করে কেহ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কাজ বা আচার-অনুষ্ঠান ধর্মীয় আচার হিসাবে পালন করে তাহলে আস-সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। উভয় পথই শয়তানের পথ।
এ বেদআত সম্পর্কে আল্লার রাসূল বহু হাদীসে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। বেদআতের শাস্তি উল্লেখ করেছেন।
ঈমান ও ইসলাম অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটো নেআমাত মুসলমানদের। এ দশটি অসিয়তের প্রথমটিতে আল্লাহ তাআলা শিরক বর্জন করতে বলেছেন। শিরক বর্জন করলে ঈমানের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। আর সর্বশেষ অসিয়তে বেদআত বর্জন করতে বলেছেন। বেদআত বর্জন করলে ইসলামের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। ধর্মে বেদআত প্রবেশ করার কারণে ধর্ম, অধর্মে পরিণত হয়ে যায়। খৃষ্ট ধর্ম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তেমনি ইসলামে যদি বেদআত প্রচলন করা হয় তাহলে ইসলামের মূল রূপ চলে যায়।
বেদআত কাকে বলে ?
যে বিশ্বাস বা কাজ আল্লাহ বা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীনে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করেননি কিংবা পালন করতে নির্দেশ দেননি সে ধরনের বিশ্বাস ও কাজকে ধর্মের অন্তর্ভুক্ত মনে করা, তা করলে সওয়াব হবে বলে বিশ্বাস করা ও পালন করার নাম হল বেদআত। আলোচ্য এ তিনটি আয়াত বর্ণনা কালে প্রথম আয়াত শেষে আল্লাহ বললেন, ‘যাতে তোমরা অনুধাবন কর।’
দ্বিতীয় আয়াত শেষে বললেন, ‘যাতে তোমরা মনে রাখ ও উপদেশ গ্রহণ কর।’ তৃতীয় আয়াত শেষে বললেন, ‘যাতে তোমরা মুত্তাকী বা আল্লাহর ব্যাপারে সাবধানী হও।’
তাই বলা যায় প্রথমে বুঝতে ও শিখতে হবে। তারপরে মনে রাখার জন্য ও বাস-বায়ন করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। তারপর ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে।
এ আয়াতসমূহে বর্ণিত দশ অসিয়ত সম্পর্কে হাদীসে আরো এসেছেঃ
عن عبادة بن الصامت قال: قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم: (أيكم يبايعني على هؤلاء الآيات الثلاث، ثم تلا: (قل تعالوا أتل ما حرم ربكم) إلى ثلاث آيات، ثم قال: (من وفى بهن فأجره على الله، ومن انتقص منهن شيئاً فأدركه الله في الدنيا كانت عقوبته، ومن أخره إلى الآخرة كان أمره إلى الله إن شاء آخذه وإن شاء عفا عنه).
উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে আছে এ তিন আয়াতের বিষয়ে আমার হাতে বাইয়াত (শপথ) নেবে। এরপর তিনি এ আয়াত তিনটি পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন, যে ব্যক্তি এ অসিয়তগুলো পালন করবে তার পুরস্কার আছে আল্লাহর কাছে। আর যে এর কোনটিতে শিথিলতা করবে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতেই শাসি- দিতে পারেন। আর যদি তিনি আখেরাত পর্যন- শাসি-কে বিলম্বিত করেন, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছা তিনি শাসি- দেবেন বা ক্ষমা করবেন।” (তাফসীর ইবনে কাসীর)
এ তিনটি আয়াতে যে দশটি হারাম বর্ণনা করা হলো তা মনে রাখার সুবিধার্থে সংক্ষেপে এ রকম বলা যায়ঃ

এক. আল্লাহর সাথে শিরক করা
দুই. মাতা পিতার অবাধ্য আচরণ করা
তিন. দারিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা করা
চার. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা
পাঁচ. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা
ছয়. ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস করা
সাত. মাপে ওযনো কম দেয়া
আট. অন্যায় বিচার-ফয়সালা ও অন্যায় কথা বলা
নয়. আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদাসমূহ পূরণ না করা
দশ. কাফেরদের অনুসরণ ও বিদআতে লিপ্ত হওয়া
এ দশটি হারাম কাজ,কবীরা গুনাহ সন্দেহ নেই। এর সমমানের আরো যে সকল কবীরা গুনাহ বা মারাত্নক পাপ আছে তা হলো : সূদ খাওয়া, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, যাদু করা, সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। এগুলোকে হাদীসে মুহলিকাত বা ধ্বংসাত্নক পাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে।