Category Archives: শাহাদা (কালেমা)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর মর্মকথা

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর মর্মকথা

বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন আম্মাবাদ।

ইসলাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কতৃক প্রেরিত পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। যুগে যুগে আল্লাহ অসংখ্য নবী রাসুলকে প্রেরণ করেছিলেন যারা তাদের জাতির নিকট “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আর দাওাত দিয়েছেন। কিন্তু আই দাওাত না বুঝতে পারার বা গ্রহন না করার জন্য আজ মানুষ আল্লাহ ব্যাতিত অন্য ইলাহের ইবাদাত করে।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর অর্থঃ  “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ হল “ আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন মাবুদ নেই।“  অন্য কথায় বলা যায় “আল্লাহ ব্যাতীত প্রক্রিত কোন ইলাহ নেই।“ অথবা “ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ব্যাতীত অন্য কোন ইলাহ বা সত্তা ইবাদাত পাবার যোগ্য নয়”।

কিন্তু আমাদের সমাজে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর যে অর্থটা করা হই তা ঠিক নয়। কারন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থ যদি বলা হয় “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা ইলাহ নেই” তাহলে অর্থ যথাথ হয় না কারন আল্লাহ বাতিত অনেক বাতিল ইলাহ বা মাবুদ রয়েছে জাদের ইবাদাত করা হয়। যেমন হিন্দুরা ৩৩ কোটি দেবতার পুজা করে, খ্রিস্টানরা ইসা (আঃ) এর ইবাদাত করে প্রভৃতি আ গুল শব গুলোই ইলাহ। করর, মাজার, গরু, সাপ, পাথর যত কিছুর কাছে কিছু চাওয়া হয় তার সবই ইলাহ। এমনকি আল্লাহর কোন সিফাত যদি মানুষকে দেয়া হয় তাবে সেই মানুষ কে ইলাহে পরিনত করা হয়। যেমনটি আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর ক্ষেত্রে করা হয়েছে তাকে গাউসুল আজম বলে ডাকা হয় অথচ গাউসুল আজম হল আল্লাহ নিজেই কারণ গাউসুল আজম অর্থ হল মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস বা যিনি বিপদ থাকে উদ্ধার করার সবচেয়ে উপযুক্ত। এই ভাবে মানুষ কে আল্লাহর স্থানে বসানো হচ্ছে।

আর আল্লাহ ব্যাতীত আর অন্য ইলাহা রয়েছে তার কথা আল্লাহ নিজে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন,

وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَٰكِن ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ۖ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مِن شَيْءٍ لَّمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبِيبٍ [١١:١٠١]

“আমি কিন্তু তাদের প্রতি জুলুম করি নাই বরং তারা নিজেরাই নিজের উপর অবিচার করেছে। ফলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব মাবুদকে ডাকতো আপনার পালনকর্তার হুকুম যখন এসে পড়ল, তখন কেউ কোন কাজে আসল না। তারা শুধু বিপর্যয়ই বৃদ্ধি করল।“ [সূরা হুদ ১০১]

কিন্তু তারা কোন ইবাদাত পাবার যোগ্য নয়। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই ইবাদাত পাবার যোগ্য।

আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ [٢٢:٦٢]

“ এজন্যেও যে, আল্লাহ, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে ওটা তো অসত্য এবং আল্লাহ, তিনিই তো সমুচ্চ, মহান।“ [ সূরা হাজ্জ ৬২ ]

এই জন্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আর অর্থ করতে হবে “ আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই।“

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহাএর গুরুত্ব ও মর্যাদা

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা” এর গুরুত্ব যে কত অপরিসীম, এর মর্যাদা যে কত উচ্চ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষুদ্র পরিসরে তা বলে শেষ করার মত নয়। তবুও সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা এ কালেমার গুরুত্ব এবং মর্যাদা তুলে ধরছি।

১. এটি ইসলামের মূল কালেমা। এর স্বাক্ষ্য দানই ইসলামে প্রবেশের একমাত্র রাস্তা। কেউ বুঝে শুনে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দিলে সে হবে মুসলিম, আর অস্বীকার করলে সে হবে কাফির। এ হচ্ছে এমন এক কালেমা যা মানুষের ঈমান এবং কুফরীর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। সবারই একথা জানা আছে যে, একজন অন্য ধর্মাবলম্বী যদি ইসলামে আসতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই এ কালেমার স্বীকৃতি দিতে হয়। বর্তমানে যারা নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করছে তাদের জন্যও অবশ্যই জরুরী যে তারা বুঝে-শুনে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেবে অন্যথায় তাদেরও মুসলিম দাবী করা বৃথা হবে। রাসূল (সঃ) যখন মুয়ায (রাঃ) কে ইয়ামানে পাঠিয়েছিলেন তখন বলেছিলেন,নিশ্চয়ই তুমি আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের) এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ। সুতরাং তুমি প্রথমে তাদেরকে কালেমার দাওয়াত দিবে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

২. নাবী-রাসুলদের মূল দাওয়াতই ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা” এর দিকে আহবান করা, যাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মানব জাতির হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছিলেন।আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ [٢١:٢٥]

“আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল পাঠাইনি তার কাছে এই ওহী ছাড়া যে,আমি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই সুতরাং আমারই ইবাদত কর।” [সূরা আম্বিয়া ২১:২৫]

সুতরাং এ কালেমার দাওয়াতই সর্বশ্রেষ্ঠ দাওয়াত, এ কালেমাকে মেনে নেয়াই হেদায়েতের রাস্তা গ্রহণ করা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যানকে মেনে নেয়া।

৩. কালেমা ইসলামের মূল ভিত্তি। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির প্রথম ভিত্তি হচ্ছে শাহাদাতাইন বা দুটি বিষয়ে স্বাক্ষ্য দেয়া। প্রথম যে বিষয়ে স্বাক্ষ্য দিতে হয় তা হচ্ছে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন:-

“ইসলাম ভিত্তি পাঁচটি। এ স্বাক্ষ্য দেয়া যে, “আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল। সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, (আল্লাহর) ঘরের হাজ্জ আদায় করা এবং রমযান মাসে সিয়াম পালন করা।” (বুখারী, মুসলিম)

এটা যেহেতু ইসলামের মুল ভিত্তি, এখন কেউ যদি বলে আমি মুসলিম, আমার দ্বীন ইসলাম তাহলে অবশ্যই তাকে এ কালেমার স্বাক্ষ্য জেনে-শুনে দিতে হবে এবং এটাকে দৃঢ়ভাবে গ্রহন করতে হবে।

৪. কালেমা হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) বলেন-

“ঈমানের শাখা সত্তুরটিরও কিছু বেশী। এর সর্বোচ্চ শাখা এ কথা স্বীকার করা । আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া”। (বুখারী, মুসলিম)
এখন কেউ যদি ঈমান গ্রহন করতে চায় তবে অবশ্যই এ কালেমাকে স্বীকার করতে হবে। আর যারা কুফরীতে নিমজ্জিত থাকতে চায়, তারাই এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

৫. কালেমা কে মেনে নেয়া এবং সে অনুযায়ী কাজ করা, বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্। কারণ এ কালেমা স্বাক্ষ্য দানের মাধ্যমে বান্দাহ্ তাওহীদ কে মেনে নেয়। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্কে এক ও একক হিসেবে মেনে নেয় এবং যাবতীয় ইবাদত শুধু তাঁর জন্য নিবেদন করবে এবং তাঁর ইবাদতে কাউকে শরীক করবে না বলে স্বীকৃতি দেয়।

রাসূল (সঃ) বলেছেন-

“বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্ হচ্ছে তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না।” (মুসলিম, ইফাবা/৫০)

৬. এ কালেমার জন্য আল্লাহতায়ালা মানুষ এবং জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ এ কালেমার স্বীকৃতির মাধ্যমে বান্দাহ্ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর এককত্বকে মেনে নেয়। আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ [٥١:٥٦]

“আমি জ্বিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য”। [সূরা যারিয়াত, ৫১:৫৬]

আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন “আমার (আল্লাহর) একত্বকে মেনে নেয়ার জন্যই আমি তাদের (মানুষ ও জ্বিন) সৃষ্টি করেছি।”

৭. এমন এক মহান কালেমা যার স্বাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহতায়ালা, ফেরেশতা এবং যারা জ্ঞানবান তারা দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ [٣:١٨]

“আল্লাহ্ স্বাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কোন হক্ ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানবান লোকেরা সততা ও ইনসাফের সাথে এ স্বাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে সেই মহা পরাক্রমশালী এবং বিজ্ঞানী ছাড়া কেহই ইলাহ হতে পারে না।” [আল ইমরানঃ ১৮]

আল্লাহ্ বলেছেন যারা জ্ঞানী তারা সততা এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেয়। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে যারা অজ্ঞ, মূর্খ, জাহেল তারাই এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকে।

৮. এমন এক কালেমা যে, আসমান-যমীন এবং এবং এর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে তা যদি এক পাল্লায় তোলা হয় আর কে অপর পাল্লায় তোলা হয় তবে এ পাল্লাই ভারী হবে।
হাদীসে এসেছে আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেন মুসা (আঃ) বলেন,

‘হে আমার রব আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে ডাকতে পারি এবং আপনার যিকর করতে পারি। আলাহ তা’য়ালা বললেন, “হে মুসা! বল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। মুসা (আঃ) বললেন, হে আমার রব আপনার সমস্ত বান্দারাতো ইহা বলে। আল্লাহ আহ্কামুল হাকিমিন, রাব্বুল আলামীন যিনি সব জানেন যেখানে আমরা কিছুই জানিনা, তিনি নাযিল করলেন, “হে মুসা! আমি ছাড়া সাত আকাশ এবং উহার মধ্যে যাহা কিছু আছে এবং সাত যমীন যদি পাল্লার এক দিকে স্থাপন করা হয় এবং অপর দিকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” কে স্থাপন করা হয় তবে দ্বিতীয় অংশটি ভারী হয়ে যাবে।’ (ইবনে হিব্বানঃ২৩২৩, আল-হাকিম ১/৫২৮)

৯. এ কালেমার স্বীকৃতি দেওয়া না দেওয়ার উপরই নির্ভর করে বান্দার সফলতা ব্যর্র্থতা। যে এ কালেমাকে মনে-প্রানে গ্রহন করল সে জান্নাত লাভ করবে । আর জান্নাত পাওয়া বান্দার অনেক বড় সাফল্য। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيرُ [٨٥:١١]

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।এটা অনেক বড় সাফল্য।” [সূরা বুরুজ, ৮৫:১১]

আর এ কালেমার স্বাক্ষ্যদানকারী ব্যক্তি যে চুড়ান্ত ব্যর্থতা জাহান্নাম থেকে বেঁচে চুড়ান্ত সফলতা জান্নাত লাভ করবে। এ ব্যাপারে রাসূল (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (মুসলিম, ইফাবা/২৩)

রাসূল (সঃ) আরও বলেন, “আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের আগুন হারাম করে দিয়েছেন যে একমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করেছে।” (বুখারী, মুসলিম)
মূলকথা হচ্ছে তাওহীদই ইসলামের শুরু ও শেষ, জাহেরী-বাতেনী এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। আর ইহাই সকল রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর দাওয়াত ছিল। এ তাওহীদ (কায়েম) এর লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা‘আলা মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, সকল নাবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং সব আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর এ তাওহীদের কারণেই মানুষ মু‘মিন-কাফির, সৌভাগ্য-দূর্ভাগ্যে বিভক্ত হয়েছে। আর তাওহীদই বান্দাদের উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব। সর্বপ্রথম এর মাধ্যমেই ইসলামে প্রবেশ করে।এবং এ তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া ত্যাগ করে।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ  এর রুকুন বা স্তম্ভ সমূহঃ

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ”  আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই। এই সাক্ষ্যবাণীর ২ টি রুকুন বা স্তম্ভ রয়েছে। একটি না বাচক একটি হা বাচক।

১. প্রথমত “লা ইলাহা” এই অংশটি না বাচক। কারন এই অংশের মাধ্যমে আল্লাহ ব্যাতীত প্রিথিবিতে যাত বাতিল ইলাহের ইবাদাত ইবাদাত করা হয় তাদের সকলকে অস্বীকার করা হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ [٢٢:٦٢]

“ এজন্যেও যে, আল্লাহ, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে ওটা তো অসত্য এবং আল্লাহ, তিনিই তো সমুচ্চ, মহান।“ [ সূরা হাজ্জ ৬২ ]

২. দ্বিতীয়ত “ইল্লাল্লাহ” এই অংশটি হা বাচক। এই অংশে অন্য সকল ইলাহ কে অস্বীকার করার পর শুধুমাত্র আল্লাহই যে সকল প্রকার ইবাদাতের যোগ্য তার স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ “লা ইলাহা”  কথাটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকার করে এবং “ইল্লাল্লাহ” একমাত্র সেই আল্লাহকে উপাস্য হিসাবে স্বীকার করে যিনি এক এবং যার কোন অংশীদার নেই।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্ত সমূহঃ

আলেম উলামাগণ কালেমা অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ৭ শর্ত নির্ধারন করেছেন কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে। যতক্ষন পর্যন্ত কোন ব্যক্তি এ ৭টি শর্তকে পরিপূর্ণভাবে মেনে না নিবে কোন রকম বিরোধিতা ছাড়া ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি কালেমা পরে কোন সার্থকতা লাভ করতে পারবেনা।

শর্তগুলো হলঃ

১. ইলমঃ কালেমার শর্ত সমূহের মধ্যে প্রথম শর্ত হচ্ছে কালেমার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, তার অর্থ জানা। কারন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে প্রথম যে আয়াতটি নাযিল করেছেন তাতেও আল্লাহ   ইলম (العلم) অর্জনকরাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ [٩٦:١]

“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আলাক ০১]

কারন জ্ঞান না থাকার কারনেই মানুষ আল্লাহ ব্যতীত অন্য ইলাহের ইবাদাত করাকে যায়েজ মনে করে। আল্লাহ বলেন,

“… তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে ওরা সাক্ষ্য দেয়……” [ সূরা যুখরুফ ৮৬]

আর সত্য উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন ইলম করণ মূর্খের কাছে সবই সত্য মনে হয়।

২. ইয়াকিনঃ কালেমার ২য় শর্ত হল ইয়াকিন বা বিশ্বাস করা। অন্তর থেকে বিশ্বাস করে এই সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য সত্য কোন ইলাহ নেই। কারণ শয়তানের ধোকায় পরে পূর্ণ বিশ্বাস না করে সাক্ষ্য দিলে সে সাক্ষ্য মিথ্যায় পরিণত হবে।

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ [٤٩:١٥]

“তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি ঈমান আনার পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ।“ [সূরা হুজুরাত ১৫]

৩. কবুলঃ কালেমার তৃতীয় শর্ত হল “ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ” এই কালেমার চাহিদা মোতাবেগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) থেকে যে সমস্ত খবর ও বাণী আমাদের নিকট এসেছে টা সত্য বলে মেনে নেয়া এবং তা যথাযথভাবে গ্রহন করে নেয়া।এই মর্মে  মহান আল্লাহ বলেন,

قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا

“তোমরা বল,আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি”

[সূরা বাকারাহ ১৩৬]

কারণ গ্রহণের বিপরীত হচ্ছে প্রত্যাখ্যান। কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর যথাযথ অর্থ অবগত হল ও বিশ্বাস করলো কিন্তু তা গ্রহন করলনা তবে সে কালেমাকে প্রত্যাখ্যান করল।

আল্লাহ বলেন

فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ [٦:٣٣]

“অতএব,তারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না, বরং জালেমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।“[সূরা আনা’আম ৩৩]

৪. আনুগত্য বা আত্মসমর্পণ (النقيض):এর উদ্দেশ্য হল কালেমা যে সত্তার উপর প্রমান বাহন করে সে সত্তার যথাযথ আনুগত্য করা আর একেই বলে সত্যিকার আত্মসমর্পণ ও বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর নিরদেশাবলির মধ্যে ত্রুটি অনুশন্ধান না করা।মহান আল্লাহ বলেন


وَأَنِيبُوا إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ [٣٩:٥٤]

                                                          

তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না”।[সূরা যুমার ৫৪]

 

এবং একইসাথে রাসূল (সাঃ) যে সমস্ত আদেশ নিষেধ তথা ইসলামি বিধান নিয়ে এসেছেন সে গুলোর ক্ষেত্রেও আনুগত্য স্বীকার করা।

রাসূল(সাঃ) বলেছেন

তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার নিজের কামনাবাসনাকে আমার আনীত শিক্ষার দিকে ফিরিয়ে দেয়।” —সহীহ-বুখারী]

৫. সিদ্ক বা সত্য বিশ্বাসঃ মুসলিম সর্বদা আল্লাহর সাথে সত্য নিষ্ঠার পরিচয় দিবে, যেমন একজন মুসলিম তাঁর ঈমান ও আকীদার ক্ষেত্রে সত্যপরায়ণ হবে। সত্য বিশ্বাসই হল সকল কথার ভিত্তি। কাজেই যে কোন দাবীতে সত্য নিষ্ঠার পরিচয় দেয়া আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়া এবং আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়তের নির্ধারিত নিওম কানুন যথাযথ ভাবে মেনে চলা এ সবই সত্য বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ বলেন


الم [٢٩:١]أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ [٢٩:٢]وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ [٢٩:٣]

“ আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে,আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।“ —সূরা আন-কাবুত ১-৩

তিনি আর বলেছেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।“[সূরা তাওবা ১১৯]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন

যে ব্যক্তি তাঁর অন্তর থেকে সত্য সহকারে এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল তাঁর উপর জাহান্নামকে হারাম দেয়া হবে।[সহিহ বুখারি, কিতবুল ইলম, ফাতহুল বারী ১/১২৮]

৬. ইখলাসঃ ইখলাস হল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কিছু করা। আর কালেমার ক্ষেত্রে ইখলাস হল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলম, বিশ্বাস, সত্যতার সহিত অন্য সকল ইলাহকে ত্যাগ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কে একমাত্র রব বলে মেনে নেয়া। এতে অন্যের সন্তুষ্টির বা লোকদেখানো দুনিয়ার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু থাকবে না। কারণ আল্লাহর শন্তুস্তি ব্যাতীত অনন্যার সন্তুষ্টির জন্য কিছু করার অর্থ হলে তাকে আল্লাহর স্থানে বসানো। আল্লাহ বলেন,

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ

“জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই জন্য।“[সূরা যুমার ৩]

ইখলাস ব্যাতীত কোন আমাল আল্লাহর নিকট গ্রহন যোগ্য নয়। আল্লাহর কথাই তাঁর প্রমাণ

وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا [٢٥:٢٣]

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপে করে দেব। [ সূরা ফুরকান ২৩]

৭. মুহাব্বাত

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই শ্রেষ্ঠ কালিমাকে মনে প্রানে ভালোবাসা কালেমার শর্ত সমূহের মধ্যে একটি। এবং কালেমার চাহিদা মতাবেক  যে সমস্ত অরথের উপর প্রমাণ বহন করে তাকেও ভালোবাসা। আর ঐ সমস্ত ভালোবাসা হল  আল্লাহ ও তার রাসূল(সাঃ) কে মনে প্রানে ভালোবাসা এবং দুনিয়ার সমস্ত কিছুর ভালোবাসার উপরে রাসুল(সাঃ) এর ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেয়া। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٣:٣١]

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান ৩১]

এমনি ভাবে আল্লাহর সাথে গাইরুল্লার মুহাব্বাত করা কালেমাকে ভালোবাসার পরিপন্থী।এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ [٤٧:٩]

“এটা এজন্যে যে,আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন,তারা তা পছন্দ করে না। সে কারণে,আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।“ [সূরা মুহাম্মাদ ৯]

এমনিভাবে রাসূল (সাঃ) এর প্রতি হিংসা বিদ্বেশ পোষণ করা আল্লাহর শত্রুদের সাথে  বন্ধুত্ব রাখা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের শাথে দুষমনি রাখা এসব গুলোই ঐ মুহাব্বাত বা ভালোবাসাকে অস্বীকার করে।