Category Archives: সহীহ আক্বীদা

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

সহীহ আক্বীদা এর মাস’আলার বই

কুর’আন ও সহীহ সুন্নাহভিত্তিক (ঈমান) আক্বীদা

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি জ্বীন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদাতের জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় রসূল (সঃ) এর উপর যাকে পাঠানো হয়েছে সমস্ত দুনিয়ার উপর রহমত স্বরুপ। সুরা আলাক্বে আল্লাহ বলেন “পড় তোমার রবের নামে” তাই প্রত্যেক মুসলিমের উপর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ফরজ। আর সর্বপ্রথম জানতে হবে আল্লাহ সম্পর্কে, স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে।কেননা মহান আল্লাহ বলেনঃ

কিছু মানুষ জ্ঞান-প্রমাণ ও স্পষ্ট কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে [সুরা হাজ্জঃ ৮]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [৩]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের অন্তুর্ভুক্ত কয়েকটি বিষয়

আল্লাহর পথে প্রীতি-ভালবাসা, বিদ্বেষ, বন্ধুত্ব এবং শক্রতা পোষণ করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্ন্তগত। সূতরাং মু‘মিন ব্যক্তি অপর মু’মিনদের ভালবাসবে এবং তাদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবে। পক্ষান্তরে, সে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে এবং তাদের সাথে বৈরীতা বজায় রাখবে। মুসলিম উম্মাহর মু’মিনদের শীর্ষস্থানে রয়েছেন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। তাই, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তাদের প্রতি সম্প্রীতি ও গভীর ভালবাসা পোষণ করে।। আর একথাও বিশ্বাস করে যে, এরাই নবীকুলের পর সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«خَيْرُ النّاس قَرْنِي ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ»

“সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী আমরা যুগের লোকেরা, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তারপর এদের পরবর্তীগণ’। (অত্র হাদীসের বিশুদ্ধতার উপর বুখারী ও মুসলিম একমত)

তারা আরো বিশ্বাস করেন যে, এই সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আবু বকর সিদ্দীক হলেন সর্বোত্তম, তারপর উমর ফারুক, তারপর উসমান জুন্‌নুরাইন, তারপর আলী মুরতাজা (তাদরে সবার উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক)। তাঁদের পর হলেন বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত অপর সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তারপর আরো বাকী সব সাহাবীগণের স্থান (আল্লহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন)। আহলেসুন্নাত ওয়াল জামায়াত সাহাবীদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ-বিসংবাদ সম্পর্কে কোনরূপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা মনে করেন যে, সাহাবীগণ ঐ সব ব্যাপারে মুজতাহিদ ছিলেন। যাদের ইজতেহাদ সঠিক ছিল তাঁরা এক গুণ সাওয়াবের অধিকারী। তাঁরা রাসূলুল্লার প্রতি, বিশ্বাসী তাঁর বংশধরদের ভারবাসেন এবং তাঁদের প্রতি ভক্তি প্রদর্শণ করেন। তাঁরা মুমিনগণের মাতৃকুল রাসূলুল্লাহর সহধর্মিনীদের ভক্তি করেন এবং তাঁদের সকলের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন।

এভাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা নিজেদেরকে রাফেজীদের নীতি থেকে মুক্ত রাখেন। রাফেজীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগনের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে এবং তাঁদের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শণ করে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত স্থানের আরো উপরে মর্যাদা প্রাদন করে।

আহলে সুন্নাত ওয়ার জামা‘আত ঐ সব ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের নীতি থেকেও নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন, যারা কোন কোন কোথাও কাজের দ্বারা আহলে বাইতকে যন্ত্রণা প্রদান করে। আমি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা উল্লেখ করেছি,সেসব সেই বিশুদ্ধ আকীদা বা ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত যা দিয়ে আল্লাহ ত‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। এটিই নাজাত প্রাপ্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ধর্মবিশ্বাস, যাদের সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:

«لاَ تَزَالْ طَائِفَةُ مِنْ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ مَنْصُوْرةَ لاَ يَضُرُّهُمْ مِنْ خَذَلَّهُمْ حَتَّى يَأتِيْ أَمْرُ اللهِ سُبْحَانَهُ»

“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকবে। কারো অপমান, অত্যাচার তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা, যতক্ষণ না আল্লাহ পাকের নির্দেশ (কিয়ামত) সমুপস্থিত হবে’।

তিনি আরো বলেন:

«إفْتَرَتِ الْيَهُوْدَُ عَلَى إحْدِى وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً وَ افْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى إِثْنَتَيْنَ فِرْقَةً, وَسَتَفْرِقُ هَذِهِ لأُمَّةُ عَلَى ثَلاَثَ وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً , كُلُّهَا فِيْ النَّارِ إلاَّ وَاحِدَةً »

‘ইয়াহুদী সম্প্রদায় একাত্তর দলে বিভক্ত হলো এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বাহাত্তর দলে বিভক্ত হলো, আর আমার এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। তম্মধ্যে একটি বাদে সবক’টি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন সাহাবীগন বলে উঠলেন: হে আল্লাহর রাসূল, সে দলটি কেমন হবে? উত্তরে তিনি বললেন:

« منْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَ أَصْحَابِيْ »

‘যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের অনুসৃত নীতির উপর চলবে’।

এই নীতিই সেই আকীদা বা ধর্ম বিশ্বাসের নামন্তর যার উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা এবং তারা পরিপন্থী বিষয় হতে সতর্ক থাকা সকলের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য। আর যারা এই আকীদা হতে পথভ্রষ্ট এবং এর বিপরীত পথে পরিচালিত, তারা কয়েক প্রকারে বিভক্ত। যথা; মূর্তিপুজক, প্রতিমাপুজক, ফেরেশতা, আউলিয়া, জ্বিন, বৃক্ষ, প্রস্তর ইত্যাদির ইবাদতকারীগণ। এসব লোক আল্লাহর রাসূলদের আহ্‌বানে সাড়া না দিয়ে তাঁদের বিরোধিতা ও শক্রতা করেছে। যেমনটা করেছে কুরাইশ ও বিভিন্ন আরব গোত্র আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে। তারা তাদের মা‘বুদদের কাছে স্বীয় অভাব পূরণের, রোগমুক্তি ও শক্রর উপর বিজয় লাভের জন্য প্রার্থণা জানাতো এবং এই মা‘বুদদেরই উদ্দেশ্যে জবাই ও মানত নিবেদন করতো। ফলে, যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তাদেরকে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে খলেছভাবে ইবাদত করার আহ্‌বান জানালেন, তখনই তারা এই আহ্‌বানকে অস্বাভাবিক মনে করে এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগলো এবং বলতে লাগলো:

﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ﴾ [ص: 5]

“সে কি বহু মা‘বুদদের পরিবর্তে মাত্র এক মা‘বুদ বানিয়ে নিল? এতো এক নিশ্চিত অদ্ভূত ব্যাপার”। (সূরা ছাদ: ৫)

অনন্তর, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ডাকতে থাকেন এবং শিরক থেকে ভীতি প্রদর্শণ ও তাদের কাছে স্বীয় আহবানের হাকীকত বিশ্লেষণে আত্ননিয়োগ করেন। যার ফলে আল্লাহপাক প্রথম দিকে তাদের কিছুসংখ্যক লোককে হেদায়াত দান করেন এবং পরে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে পবেশ করে। এইভাবে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবাণ অনুসারী তাবেইনদের ধারাবহিক প্রচার ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর আল্লাহুর দ্বীন অন্যান্য সমুদয় ভ্রান্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী বেশে আত্মপ্রকাশ করলো।

  • পরবর্তী কালের মুশরিক সম্প্রদায়

সময়ের ব্যবধানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং অধিকাংশ লোক অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হলো। সংখ্যাগুরু জনগণ আম্বিয়া-আওলিয়াগণের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং বিপদ-আপদে তাদের নিকট প্রার্থণাসহ অন্যান্য শিরকের মাধ্যমে ইসলাম পূর্ব অন্ধকার যুগে ফিরে গেল। তারা কালেমা ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু’র প্রকৃত অর্থ এতটুকু অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল, যতটুকু আরবের কাফেররা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আল্লাহ সকলকে সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। অজ্ঞতার সয়লাবে তথা নবুওয়াতের যুগ হতে দুরত্বের ফলে বর্তমান কাল পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে উক্ত শিরক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান কালে মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা হুবহু পূর্ববর্তী মুশরিকদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। তারা বলতো:

﴿هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ﴾ [يونس: 18]

“তারা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশকারী”। (সূরা ইউনুস-১৮)

তাদের একথাও ছিল;

﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ﴾ [الزمر:3]

“আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহ তা‘আলা এ ভ্রান্তির অপনোদন করে স্পষ্ট বলে দিলেন যে, আল্লাহ ভিন্ন কারো ইবাদত করা সে যে কেউ হোক না কেন আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফরী করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ …﴾

“তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপরকারও করতে পারে না। তদুপরি তারা বলে যে, এগুলি আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী”।

আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন:

﴿… قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾ [يونس: 18]

“(হে রাসূল) তাদেরকে বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? তিনি পুত-পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি বহু উর্ধ্বে”। (সূরা ইউনুস: ১৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি ভিন্ন কোন ওলী, পয়গাম্বর বা অন্য কারো ইবাদত করা মহাশিরক, যদিওবা শিরককারীরা এর অন্য নাম দিয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ …﴾

“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে: “আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহপাক তাদের উত্তরে বলেন:

﴿… إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾ [الزمر: 3]

“তারা যে বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে এর ফায়সালা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না যে জঘন্য মিথ্যুক, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী”। (সূরা যুমার : ৩)

উপরোক্তবাণীর মাধ্যমে আল্লাহপাক একথাটি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন যে, দু‘আ, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ আল্লাহপাকের সাথে কুফরী করা এবং তাদের মা‘বুদগণ তাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে, এ কথাটি তাদের একটি জঘন্যতম মিথ্যা বৈ কছিুই নয়।

  • সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের পরিপন্থী কতিপয় মতবাদ

বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী ও আল্লাহর রাসূলগণ (তাঁদের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক) কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী একটি মতবাদ হলো বর্তমান কালে নাস্তিকতা ও কুফরীর ধ্বজ্জাবাহী মার্কস-লেলিন প্রমুখ পন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ। তারা একে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম বা অন্য যে, নাস্তিকদের মূলমন্ত্র হলো, ‘মা‘বুদ বা উপাস্য বলতে কেউ নেই এবং এই পার্থিব জীবন এবটি বস্তুগত ব্যাপার মাত্র’। পরকাল, বেহেশ্‌ত, দোযখ এবং সমস্ত ধর্মের প্রতি অস্বীকৃতি তাদের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বই-পুস্তক পর্যালোচনা করলে একথা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করা যায়। নিঃসন্দেহে এটা সমস্ত ঐশী ধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এক মতবাদ, যা দুনিয়া ও আখেরাতে এর অনুসারীদের এক চরম অশুভ পরিণতির দিকে পরিচালিত করছে।

  • সত্যের পরিপন্থী আরেকটি মতবাদ হলো:

কোন কোন বাতেনী ও সূফী সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, তথাকথিত আওলীয়ারা এ সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহর সাথে শরীক থাকে। তারা তাদেরকে কুতুব (পীর-দরবেশ), আওতাদ (নির্ভরযোগ্য খুঁটিস্বরূপ), গাওস (ফরিয়াদ শ্রবণকারী) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। তারাই স্বীয় মা‘বুদদের জন্যে এসব নাম উদ্ভাবন করেছে। আল্লাহর প্রভূত্বে এটি একটি জঘণ্যতম শিরক। ইহা ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের শিরক থেকেও জঘণ্য। কেননা, আরবের কাফেরগণ আল্লাহর প্রভূত্বে শিরক করেনি, তাদের শিরক ছিল ইবাদতে এবং তাও ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দের অবস্থায়। দুর্যোগ অবস্থায় তারা ইবাদত আল্লাহর জন্যেই খালেছ করে নিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ﴾ [العنكبوت:65]

“যখন তারা জলযানে আরোহন করে তখন বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ কে ডাকে। তারপর যখন আল্লাহ তাদেরকে স্থলে ভিড়ায়ে উদ্ধার করেন, তখন তারা শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়”। (সূরা আনকাবুত ৬৫)

প্রভূত্বের প্রশ্নে তারা স্বীকার করতো যে, ইহা একমাত্র আল্লাহরই অধিকার। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ﴾ [الزخرف:87]

“আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ”। (সূরা যুখ্‌রুখ: ৮৭)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ [يونس:31]

“বল, আকাশ ও পৃথিবী হতে কে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কার কর্তৃত্বাধীন এবং কে জীবিতকে মৃত হতে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত হতে নির্গত করে? আর কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, ‘ আল্লাহ’। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবেনা”? (সূরা ইউনুস: ৩১)

  • পরবতীর্কালের মুশরিকরা আরো দুটি বিষয়ে অগ্রগামী রয়েছে:
  • [এক] তাদের কেউ কেউ আল্লাহ্‌র প্রভূত্বে শিরক করে।
  • [দুই] সুর্দিনে উভয় অবস্থায়ও তারা শিরক করে। একথা কেবল ঐসব লোকেরাই ভাল করে জানতে পারবে যারা তাদের সাথে মিশে স্বচক্ষে তাদের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ লাভ করবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঐসব ক্রিয়া কলাপ অবলোকন করবে যা মিশরস্থ হুসাইন, বাদাভী গংদের কবরে, ইডেনস্থ ইঁদরূসের কবরে, ইয়েমেনে আল হাদীর কবরে, সিরিয়ায় ইবনে আরাবীর কবরে, ইরাকে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর কবরসহ বিভিন্ন প্রসিদ্ধ সমাধি ক্ষেত্রের আশেপাশে দৈনন্দিন ঘটে চলছে।

সাধারণ লোকেরা মৃতের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করছে এবং সেখানে আল্লাহ পাকের বহু অধিকার খর্ব করছে। কিন্তু অতি অল্প লোকই তাদের এসব অপকীর্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রকৃত তাওহীদের বাণী তাদের কাছে উপস্থাপিত করার সাহাস করছে। অথচ এই তাওহীদের বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যেই আল্লাহপাক তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে (তাদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) প্রেরণ করেছেন। আর আমাদেরকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে:

﴿إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ﴾ [البقرة:156]

“আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই পানে আমরা প্রত্যাবর্তনকারী”। (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৬)

আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ঐসব লোককে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদের মধ্যে সৎপথে আহবানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। আর, মুসলিম শাসকবৃন্দ ও উলাময়ে কেরামকে শিরকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এর যাবতীয় উপকরণ নির্মুল সাধনের তৌফিক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, অতি সন্নিকটে।

আল্লাহপাকের নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী আরও কয়েকটি আকীদা হলো জাহ্‌মিয়্যাহ, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুসারী বিদআ‘তপন্থীদের মতবাদসমূহ। এরা মহামহিম আল্লাহপাকের প্রকৃত গুনাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁকে সম্পূর্ণ ও নিখুত গুনাবলী থেকে বিমুক্ত বলে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে, তারা আল্লাহকে অস্তিত্বহীনতা, জড়তা ও অসম্ভাব্য গুণে বিশেষিত করার প্রয়াস পায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাক তাদের এসব অপবাদ হতে বহু উর্ধ্বে।

এতদ্ব্যতীত, যারা আল্লাহপাকের কেন কোন গুণ প্রতিষ্ঠিত করে এবং অপর কোন কোন গুণ অস্বীকার করে তারাও উপরোক্ত ভ্রান্ত মতবাদিদের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ স্বরূপ আশাআ’রী পন্থীদের নাম উল্লেখ করা য়ায়। কেননা, কিছুসংখ্যক গুণের স্বীকৃতির মধ্যেই তাদরে পক্ষে ঐসব গুণাবলীর অনুরূপ অর্থ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে. যেগুলো তারা সরাসরি উপেক্ষা করত: তারা প্রমানাদির অপব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে তারা শ্রুত ও প্রমাণ্য উভয় প্রকার দলীলগুলোর বিরোধিতা এবং পরস্পর বিরোধী বিশ্বাসাসের ঘুর্ণিপাকে নিপতিত হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত আল্লাহ্‌র ঐসব পবিত্র নাম ও নিখুঁত গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত করে যেগুলি নিজের জন্য তিনি স্বয়ং বা তাঁর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁরা আল্লাহপাককে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে এমনভাবে পুত পবিত্র রাখেন যাতে তা‘তীল বা গুণ বিমুক্তির কোন লেশ থাকে না। এভাবে তারা এ সম্পর্কে সমুদয় প্রমাণাদির উপর আমল করতে সক্ষম হয় এবং কোনরূপ বিকৃতি বা তা‘লীল না করে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাস থেকে নিরাপদ থাকে। এই বিশ্বাসই দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের একমাত্র পূর্ববর্তী মুসলিম উম্মত ও তাদের ইমামবর্গ।

একথা অতীব সত্য যে, পরবর্তী লোকগণ কেবল সে পথেই পরিশুদ্ধ হতে পারে, যে পথে তাদের পুর্ববর্তীরা পরিশুদ্ধ হয়ে গেছেন। আর সে পথটি হলো: ‘কুরআন ও সুন্নাতের সঠিক অনুসরণ এবং এতদুভয়ের পরিপন্থী বিষয়সমূহ বর্জন করে চলা।’

আল্লাহই আমাদের তৌফিকদাতা, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং পরমোত্তম প্রভূ। তিনি ব্যতীত কারো কোন শক্তি সামর্থ নেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাহ ও রাসূল মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীদের উপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [২]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

[দ্বিতীয় নীতি]

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান

ফেরেশতাগণের প্রতি ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। একজন মুসলিম ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা রয়েছেন। তাদেরকে তিনি নিজ আনুগত্যের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাদের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন যে, তারা আল্লাহর আগেভাগে কোন কথা বলে না, বরং তারা সবর্দা তাঁর আদেশানুসারে নিজ নিজ পালন করে থাকে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿عِبَادٞ مُّكۡرَمُونَ ٢٦ لَا يَسۡبِقُونَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ ٢٧ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ﴾ [الأنبياء: 26-28]

“তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দাহ। তাঁর (আল্লাহর) আগেভাগে তারা কথা বলে না বরং তারা সর্বদা তাঁকেই আদেশানুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। তাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর জানা রয়েছে। যাদের পক্ষে সুপারিশ করবে। আর তারা (ফেরেশতারা) আল্লাহর ভয়ে সদা সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে”। (সূরা আম্বিয়া-২৬-২৮)

আল্লাহর ফেরেশতাগণ অনেক প্রকার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তম্মধ্যে একদল তাঁর আরশ উত্তোলন কাজে, অপর একদল বেহেশ্‌ত-দোযখের তত্বাবধানে এবং আরেক দল মানুষের আমলনামা সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

আর আমরা বিশদভাবে ঐসব ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, যাদের নাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উল্লেখ করেছেন। যেমন-জীবরিল, মিকাঈল, মালিক-তিনি দোযখের তত্বাবধায়ক এভং ইসরাফীল-তিনি মহাপ্রলয়ের দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। একাধিক সহীহ হাদীসে তাঁর কথা উল্লেখ আছে।

আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা) হতে বর্ণিত এক সহীহ হাদীসে আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতাগণ নুরের সৃষ্টি, জ্বিনকুল খাঁটি আগুন থেকে সৃষ্টি এবং আদমকে যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা আল্লাহ তা‘আলা (কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে) তোমাদেরকে বলে দিয়েছেন”। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি সহীহ সনদে স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

[তৃতীয় নীতি]

আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

এভবে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের প্রতি ইমান আনয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আল্লাহ পাক আপন সত্যের ঘোষণা এবং এর প্রতি আহ্‌বান জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর নবী ও রাসূলগণের উপর অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন:

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ﴾ [الحديد: 25]

“আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও মানদন্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে”। (সূরা হাদীদ : ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِۚ﴾ [البقرة:213]

“প্রথমদিকে মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। অনন্তর আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করেন সঠিক পথের অুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং বিভ্রান্তদের জন্য ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে। আর, তাদের সাথে নাজিল করেন সত্যের প্রতীকসমূহ, এ উদ্দেশ্যে যে, লোকদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তিনি তার চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেন”। (সূরা আল-বাকারা:২১৩)

আর বিশদভাবে আমরা ঐসব কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবো যেগুলির নাম আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন, তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর ও কুরআন। এগুলির মধ্যে কুরআনই সর্বোত্তম ও সর্বশেষ কিতাব যা পূর্ববর্তী অপর কিতাবসমূহের সংরক্ষক ও সত্যয়নকারী। সমগ্র উম্মতকে ইহারই অনুসরণ করতে হবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ সুন্নাতসহ ইহারই ফায়সালা মেনে নিতে হবে। কেননা, আল্লাহপাক তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র জ্বিন ও ইনসানের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর প্রতি এই মহান কিতাব ‘কুরআন শরীফ’ নাযিল করেছেন, যাতে তিনি ইহা দ্বারা লোকদের মধ্যে ফায়সালা করেন। উপরন্তু, আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনকে তাদের অন্তরস্থ যাবতীয় ব্যাধির প্রতিকার, তাদের প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট প্রতিপাদক এবং মু’মিনদের জন্য হেদায়াত ও রহমতস্বরূপ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ مُبَارَكٞ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُواْ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ﴾ [الأنعام:155]

“আর, ইহা এক মাহকল্যাণময় গ্রন্থ যা আমি অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তোমরা ইহারই অনুসরন কর এবং তাকওয়াপূর্ণ আচরণ-বিধি গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের প্রতি রহমত নাজিল হবে”। (সূরা আল-আনআম: ১৫৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ﴾ [النحل:89]

“আমি মুসলিমদের জন্য প্রত্যেকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ এই কিতাব অবতীর্ণ করলাম”। (সূরা আন-নাহল: ৮৯)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ فَ‍َٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ﴾ [الأعراف: 158]

“(হে রাসূল) বল, ওহে মানবমন্ডলী ! নিশ্চয়ই আমি তোমদের সকলের প্রতি প্রেরিত সেই আল্লাহর রাসূল যিনি জমীন ও আকাশ সমূহের একচ্ছত্র মালিক। তিনি ব্যাতীত আর কোন মা‘বুদ নেই, তিনিই জীবন মৃত্যু দান করেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আন, যে আল্লাহ ও তাঁর সকল বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান লাভ করতে পার”। (সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৮)

[চতুর্থ নীতি]

রাসূলুগণের প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের প্রতিও ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহপাক আপন বান্দাদের প্রতি তাদের মধ্য হতে বহু সংখ্যক রাসূল-শুভসংবাদবাহী, ভীতি প্রদর্শণকারী ও সত্যের পানে আহবায়ক রূপে প্রেরণ করেছেন। যে ব্যক্তি তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছে সে সৌভাগ্যের পরশ লাভ করেছে, আর যে তাদের বিরোধিতা করেছে সে হত্যাশা ও অনুশোচনার শিকারে নিপতিত হয়েছে।

রাসূলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ,তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে,তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতের (শয়তান বা শয়তানী শক্তির) ইবাদত থেকে দূরে থাক”। (সূরা আন-নাহল: ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ﴾ [النساء: 165]

“আমি তাদর সবাইকে শুভসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রাসূল হিসেবে প্রেবণ করেছি যাতে এ রাসূলগণের আগমণের পর মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকে”। (সূরা নিসা-১৬৫)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَۗ﴾ [الأحزاب:40]

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন বরং তিনি তো আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী”। (সূরা আল-আহ্‌যাব: ৪০)

ঐ সমস্ত নবী –রাসূলগণেরে মধ্যে আল্লাহ যাদের নাম উল্লেখ করেছেন বা যাদের নাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে তাদের প্রতি আমরা বিশদভাবে ও নির্দিষ্ট করে বিশ্বাস স্থাপন করি। যেমন: -হযরত নূহ, হযরত হুদ, হযরত সালেহ, হযরত ইবরাহীম ও অন্যান্য রাসূলগণ। আল্লাহ তাঁদের সকলের উপর, তাদের পরিবারবর্গ ও অনুসারীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

[পঞ্চম নীতি]

আখেরাত দিবসের উপর ঈমান

পরকাল সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে যেমন: কবরের পরীক্ষা, সেখানকার আযাব ও নেয়ামত, রোজা কেয়ামতের ভয়াবহতা ও প্রচন্ডতা, পুলসিরাত, দাঁড়িপাল্লাহ, হিসাব-নিকাশ, প্রতিফল প্রদান, মানুষের মধ্যে তাদের আমলনামা বিতরণ: তখন কেউবা তা ডান হাতে গ্রহণ করবে আবার কেউবা তা বাম হাতে বা পিছনের দিক হতে গ্রহন করবে ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন উক্ত ঈমানের আওতাভূক্ত। এতদ্ব্যতীত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবতরনের জন্য নির্ধারিত হাউজে কাউসার, বেহেশত-দোযখ, মুমিন বান্দাগণ কর্তৃক তাদের প্রভু পাকের দর্শন লাভে এবং তাদের সাথে আল্লাহর কথোপকথনসহ অন্যান্য যা কিছু কুরআনে কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং উপরোক্ত সব কয়টি বিষয়ের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় বিশ্বাস করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

[যষ্ঠ নীতি]

ভাগ্যের প্রতি ঈমান

ভাগ্যের প্রতি ঈমান বলতে নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপনকে বুঝায়:

  • প্রথমত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, অতীতে যা কিছু ছিল এবং বর্তমান বা ভবিষ্যতে যা কিছু হবে তার সবকিছুই আল্লাহ পাকের জানা আছে। তিনি আপন বান্দাদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। তাদের রিজিক, তাদের মৃত্যুক্ষণ, তাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীসহ অন্যান্য সব বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত, কোন কিছুই তাঁর অগোচরে নেই। তিনি পুত-পবিত্র মহান। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ﴾ [العنكبوت:62]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকটি বস্তু সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত”। (সূরা আল আনকাবুত: ৬২)

মহামহিম আল্লাহ আরো বলেন:

﴿لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ وَأَنَّ ٱللَّهَ قَدۡ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عِلۡمَۢا﴾ [الطلاق: 12]

“যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান এবং একথাও জানতে পার যে, আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুতেই পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে”।(সূরা তালাক-১২)

  • দ্বিতীয়ত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ পাক যা কিছু নির্দ্ধারণ ও সম্পাদন করেছেন সব কিছুই তাঁর লিখা রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

﴿قَدۡ عَلِمۡنَا مَا تَنقُصُ ٱلۡأَرۡضُ مِنۡهُمۡۖ وَعِندَنَا كِتَٰبٌ حَفِيظُۢ﴾ [ق: 4]

“পৃথিবী তাদের দেহ থেকে যা কিছু ক্ষয় করে তা আমার জানা আছে এবং আমার নিকট একটি সংরক্ষক কিতাব রয়েছে”। (সূরা ক্বাফ:৪)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَكُلَّ شَيۡءٍ أَحۡصَيۡنَٰهُ فِيٓ إِمَامٖ مُّبِينٖ﴾ [يس: 12]

“এবং আমি প্রতিটি বস্তু একটি স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি”। (সূরা ইয়াসিন-১২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ﴾ [الحج:70]

“তোমার কি জানা নেই, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা অবগত আছেন? নিশ্চয়ই ইহা একটি কিতাবে সংরক্ষিত আছে। ইহা আল্লাহর নিকট অতি সহজ”। (সূরা হজ্জ-৭০)

  • তৃতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলার কার্যকরী ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ﴾ [الحج:18]

“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন” (সূরা হজ্জ-১৮)

মহামহীম আল্লাহ আরো বলেন:

﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡ‍ًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ﴾ [يس: 82]

“বস্তুত: তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তার কাজ শুধু এই হয় যে, তিনি তাকে বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়” । (সূরা ইয়াসিন-৮২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [التكوير:29]

“আর, আসলে তোমদের চাওয়ায় কিছু হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাহেন”। (সূরা তাকভীর: ২৯)

  • চতুর্থত: এই বিশ্বাস রাখা যে, সমগ্র বস্তুজগত আল্লাহ পাকের সৃষ্টি। তিনি ব্যতীত না আেকান স্রষ্টা, না আছে কোন প্রভু-প্রতিপালক।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر: 62]

“আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর কর্মবিধায়ক”। (যুমার: ৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡۚ هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ﴾ [فاطر:3]

“হে মানব মন্ডলী, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্বরূপ কর। আল্লাহ ব্যতীত কি তোমাদের কোন স্রষ্টা আছে ! যে তোমাদিগকে আকাশ ও পৃথিবী হতে রিজিক দান করে? তিনি ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তোমরা কোন পথে পরিচালিত হচ্ছো”? (সূরা ফাতির: ৩)

অতএব, ভাগ্যের উপর ঈমান বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকেই বুঝায়। পক্ষান্তরে, বিদ্‌আ‘ত পন্থীরা ইহার কোন কোনটি অস্বীকার করে থাকে। উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহর উপর ঈমানের মধ্যে এ বিশ্বাসও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে যে, ঈমান মানে কথা ও কাজ যা পূণ্যে বৃদ্ধি এবং পাপে হ্রাস পায়। একথাও ইমানের অন্তর্ভুক্ত যে, কুফরী ও শিরক ব্যতীত কোন কবীরা গুনাহ-যেমন, ব্যভিচার, চুরি, সুদ গ্রহণ, মদ্যপান, পিতামাতার অবাধ্যতা ইত্যাদির জন্য কোন মুসলিমকে কাফের বলা যাবেনা, যতক্ষণ না সে তা হালাল বলে গণ্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء:116]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সবকিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন”। (সূরা নিসা-১১৬)

দ্বিতীয় প্রমাণ হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একাধিক মুতাওয়াতির হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরকালে এমন লোককেও মুক্ত করবেন যার অন্তরে (এ জগতে) শষ্যদানা পরিমাণ ঈমান বিদ্যমান ছিল।

চলবে……………

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [১]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

[প্রথম নীতি]

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের প্রথম কথা হলো এই বিশ্বাসই স্থাপন করা যে, তিনিই ইবাদতের একমাত্র যোগ্য, সত্যিকার মা‘বুদ, অন্য কেউ নয়। কেননা, একমাত্র তিনিই বান্দাহদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী এবং তাদের জীবিকার ব্যবস্থাপক। তিনি তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে প্রতিফলদানে ও অবাধ্যজনকে শাস্তি প্রদানে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর এই ইবাদতের জন্যেই আল্লাহ্‌ তা‘আলা জ্বিন ও ইন্‌সানকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ ٥٧ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ﴾ [الذاريات:56-57]

“আমি জ্বিন ও ইনসানকে কেবল আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন রিজিক চাইনা, এটাও চাইনা যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিজেইতো রিজিকদাতা, মহান শক্তিধর ও প্রবল পরাক্রান্ত”। (সূরা যারিয়াত: ৫৬,৫৭)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ٢٢﴾ [البقرة: 21-22]

“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রভূ প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকলকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। তিনিই সেই প্রভূ যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ, আকাশকে ছাদ স্বরূপ তৈরী করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে এর সাহায্যে নানা প্রকার ফল-শষ্য উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অতএব, তোমরা এসব কথা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করোনা”। (সূরা বাকার : ২১,২২)

এ সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এবং এর প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে এর পরিপন্থী বিষয় থেকে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) এর ইবাদত থেকে দুরে থাক”। (সূরা নাহল-৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ﴾ [الأنبياء:25]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) আর কোন মা‘বুদ নেই। অতএব, তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর”। (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿كِتَٰبٌ أُحۡكِمَتۡ ءَايَٰتُهُۥ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِن لَّدُنۡ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ١ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ وَبَشِيرٞ﴾ [هود:1-2]

“ইহা এমন একটি কিতাব যার আয়াতসমূহ এক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্তার নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না কর। অনন্তর, আমি তাঁরই পক্ষ হতে তোমদের প্রতি একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা”। (সূরা হূদ : ১.২)

উল্লেখিত ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো: যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের তরেই নিবেদিত করা। প্রার্থনা, ভয়, আশা, নামায, রোজা, জবেহ, মানত ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবদত তাঁরই প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় ও পূর্ণ বশ্যতা সহকারে সম্পাদন করা। কুরআন শরীফের অধিকাংশ আয়াত এই মহান মৌলিক নীতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

﴿ِ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ﴾ [الزمر:2-3]

“অতএব তুমি এক আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর, দ্বীনকে একমাত্র তাঁরই জন্যে খালেছ কর। সাবধান, খালেছ দ্বীনতো একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য”। (সূরা যুমার: ২, ৩)

আল্লাহ্‌ পাক বলেন:

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ﴾ [الإسراء:23]

“তোমার প্রতিপালক এই বিধান করে দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কারো নয়”। (সূরা ইসরা: ২৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

﴿فَٱدۡعُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ﴾ [غافر:14]

“অতএব, তোমরা আল্লাহকেই ডাক, নিজেদের দ্বীনকে কেবল তাঁরই জন্যে খালেছ ভাবে নির্দিষ্ট কর, কাফেরদের কাছে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন”। (সূরা গাফের: ১৪)

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘বান্দার উপর আল্লাহ্‌র অধিকার হলো তারা যেন কেবল তাঁরই ইবাদত করে এবং এতে অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার না করে’।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো-ঐ সমস্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থপন করা, যা আল্লাহ্‌ পাক তাঁর বান্দাগণের উপর ওয়াজিব ও ফরজ করেছেন। যথা: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ:

  • (১) সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র রাসূল ।
  • (২) নামাজ প্রতিষ্ঠা করা
  • (৩) যাকাত দেয়া
  • (৪) রমজানের রোজা পালন
  • (৫) বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছার সামর্থ থাকলে হজ্জব্রত পালন করা ইত্যাদি সহ অন্যান্য ফরজগুলি, যা নিয়ে পবিত্র শরীয়তের আগমন ঘটেছে।

উপরোক্ত স্তম্ভ বা রুকনগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান করুন হলো এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহুর রাসূল। এটিই হলো কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’এর প্রকৃত মর্মার্থ। কেননা, এর যথার্থ অর্থ হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তাঁকে ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয়, সে মানব সন্তান হোক আর ফেরেশতা, জ্বিন বা অন্য এই যাই হোক সবই বাতেল। সত্যিকার মা‘বুদ হলেন কেবল সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহপাক বলেন:

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ﴾ [الحج:62]

“তা এই জন্যে যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য এবং তাঁকে বাদ দিয়ে ওরা যারা ইবাদত করছে তা নিঃসন্দেহে বাতেল”। (সূরা হজ্জ: ৬২)

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এই যথার্থ মৌলিক বিষয়ের উদ্দেশ্যেই জ্বিন ও ইন্‌সান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে পাঠক; বিষয়টি ভাল করে ভেবে দেখুন এবং এ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠবে, অধিকাংশ মুসলিম উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার মধ্যে নিপতিত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্যেরও ইবাদত করছে এবং তাঁর প্রাপ্য ও খালেছ অধিকার অন্যের তরে নিবেদিত করে চলছে।

এ বিশ্বাসও আল্লাহ্‌ পাকের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনিই সর্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা, তাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক এবং আল্লাহ্‌ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্বীয় জ্ঞান ও কুদরতের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দুনিয়া-আখেরাতের মালিক ও সমগ্র জগৎবাসীর প্রতিপালক। তিনিই আপন বান্দাহগণের যাবতীয় সংশোধন, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যানের প্রতি আহবান জানানোর উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। ঐ সমস্ত ব্যাপারে পবিত্র আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই। তিনি আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر:62]

“ আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সর্ব বিষয়ের যিম্মাদার”। (সূরা যুমার-৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [الأعراف:54]

“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভূ হলেন আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠলেন হলেন। তিনি রাতকে দিনের অনুসরণ করে চলে। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সবই তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি আর হুকুম প্রদানের মালিক তিনিই। চির মঙ্গলময় মহান আল্লাহ তিনিই সর্বজগতের প্রভূ”। (সূরা আল-আ’রাফ-৫৪)

আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো, কুরআন শরীফে উদ্ধৃত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত আল্লাহর সর্ব সৃন্দর নামসমূহ ও তাঁর সর্বোন্নত গুণরাজির উপর কোন প্রকার বিকৃতি, অস্বীকৃতি, ধরন, গঠন বা সাদৃশ্য আরোপ না করে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [الشورى:11]

“কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। (সূরা শূরা-১১)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿فَلَا تَضۡرِبُواْ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡثَالَۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾ [النحل:74]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র কোন সদৃশ্য স্থির করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ই জানেন, তোমরা জান না”। (সূরা নাহল : ৭৪)

এই হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা বা বিশ্বাস। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী রহিমাহুল্লাহ্‌ তাঁর ‘আল-মাকালাত আন আসহাবিল হাদীস অ আহলিস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই আকীদার কথাই উদ্ধৃত করেছেন। এভাবে ইল্‌ম ও ঈমানের বিজ্ঞজনেরাও বর্ণনা করে গেছেন। ঈমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন: ইমাম যুহরী ও মাকহুলকে আল্লাহ্‌র গুণরাজি সম্পর্কিত আয়াতগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা বলেন: এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবেই মেনে নাও। ওয়ালীদ বিন মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন ইমাম মালেক, আওযায়ী, লাইছ বিন সা‘দ ও সুফইয়ান ছাওরীকে আল্লাহর গুণরাজি সম্বন্ধে বর্ণিত হাদিসসমূহ জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা সকলেই উত্তরে বলেন: ‘এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবে মেনে নাও’। ইমাম আওযায়ী বলেন: বহুল সংখ্যায় তাবেয়ীগণের জীবদ্দশায় আমরা বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ পাক তাঁর আরশের উপর বিরাজমান রয়েছেন এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত তাঁর সব গুণাবলীর উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি।

ইমাম মালেকের উস্তাদ রাবীআ বিন আবু আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহকে (আল্লাহ তাঁরই আরশের উপর উঠা) সম্পর্কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর আরশের উপর উঠা অজানা ব্যাপার নয়; তবে এর বাস্তব ধরণ আমাদের বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে রিসালাত, আর রাসূলের দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে এর ঘোষণা করা এবং আমাদের কর্তব্য হলো এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ কে [الاستواء] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন: উপরে উঠা আমাদের জ্ঞাত আছে তবে এর বাস্তবধরণ অজ্ঞাত, এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা বিদ‘আত। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে ঐ একই অর্থে হাদীস বর্ণিত আছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ‘ত আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ঐসব গুণাবলী সাদৃশ্যহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তিনি স্বীয় কোরআন শরীফে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহীহ হাদীসসমূহে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ হওয়া থেকে এমনভাবে পবিত্র রাখেন যার মধ্যে তা‘তীল বা গুণমুক্ত হওয়ার কোন লেশ থাকেনা। ফলে তারা পরস্পর বিরোধী আস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকেন।

বস্তুত: আল্লাহ পাকের বিধানই হলো, যেন মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরিত সত্যকে আঁকড়ে তাঁর সমুদয় সামর্থ সে পথে ব্যয় করে এবং নিষ্ঠার সাথে এর অম্বেষায় থাকে, তবেই তাকে আল্লাহ সত্যের পথে চলার তৌফিক দান করেন এবং তার বক্তব্যকে বিজয়ী করে দেন। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿بَلۡ نَقۡذِفُ بِٱلۡحَقِّ عَلَى ٱلۡبَٰطِلِ فَيَدۡمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٞۚ وَلَكُمُ ٱلۡوَيۡلُ مِمَّا تَصِفُونَ﴾ [الأنبياء:18]

“বরং আমিতো বাতেলের উপর সত্যের আঘাত হেনে থাকি, ফলে তা অসত্যকে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষনাৎই বাতেল বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া : ১৮)

আল্লাহ তা‘আলা আরেকটি আয়াতে বলেন:

﴿وَلَا يَأۡتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ وَأَحۡسَنَ تَفۡسِيرًا﴾ [الفرقان: 33]

“আর যখনই তারা তোমার সম্মুখে কোন নুতন কথা নিয়ে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি এর জবাব তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি এবং অতি উত্তমভাবে মূল কথা ব্যক্ত করে দিয়েছি”। (সূরা ফুরকান: ৩৩)

হাফেয ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ পাকের বাণী:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ﴾ [الأعراف:54]

“বস্তুত তোমাদের প্রভু সেই আল্লাহ যিনি আকাশ মন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনের মধ্যে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠেন”। (সূরা আরাফ: ৫৪)

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অতি সুন্দর কথা বলেছেন যা অত্যন্ত উপকারী বিধায় এখানে প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেন, এ প্র্রসঙ্গে লোকদের বক্তব্য অনেক, এর বিস্তারিত বর্ণনার স্থান এখানে নয়। আমরা এ ব্যাপারে ঐ পথই গ্রহণ করবো, যে পথে চলেছেন পূর্বেকার সুযোগ্য মনীষী ইমাম মালেক, আওযায়ী, ছাওরী, লাইছ বিন সা‘দ, শাফেয়ী, আহমদ বিন রাহওয়া সহ তৎকালীন ও পরবর্তী মুসলিমদের ইমামগণ। আর তা হলো: আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেয়া, এর কোন ধরণ, সাদৃশ্য বা গুণ বিমুক্তি নির্ণয় ব্যতিরেকেই। সাদৃশ্য পন্থিদের মস্তিষ্কে প্রথম লগ্নেই আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে যে কল্পনার উদয় ঘটে তা আল্লাহপাক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদুরিত। কেননা কোন ব্যাপারেই কোন সৃষ্টি আল্লাহর সদৃশ হতে পারে না। তাঁর সমতুল্য কোন বস্তু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তদ্রুপই, যেরূপ শ্রদ্ধেয় ইমামগণ বলে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারীর উস্তাদ নায়ীম বিন হাম্মাদ আল খুজায়ী অন্যতম। তিনি বলেছেন: যে লোক আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কোন ব্যাপারে সদৃশ মনে করে সে কাফের এবং যে আল্লাহুর সব গুণরাজি অস্বীকার করে যা দ্বারা তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন, সেও কাফের। কেননা আল্লাহকে স্বয়ং তিনি বা তাঁর রাসূল যেসব গুণরাজির দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোন সাদৃশ্য নেই।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে কুরআন শরীফের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত গুণরাজি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যা, আল্লাহর মহত্বের সাথে মানানসই হয় এবং তাঁকে যাবতীয় অপূর্ণতা, খুঁত বা ক্রটি-বিচ্যুতি থেকে পাক-পবিত্র রাখে সে ব্যক্তিই হেদায়াতের পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলে।

চলবে……

সহীহ আক্বীদা [২]

আকীদা তাহাবী

সংকলক : ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, ফকীহ, আল্লামা আবু জাফর ওয়াররাক আততাহাবী র. মিসরে অবস্থান কালে বলেছিলেন:

ফুকাহায়ে মিল্লাত আবূ হানীফা আন-নুমান বিন সাবেত আল কুফী, আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারী এবং আবু আব্দুল্লাহ বিন আল হাসান আশ শায়বানী রাহিমাহুমুল্লাহদের অনুসৃত নীতি অনুসারে এটা হল সাহাবা ও পরবর্তী জামা’আত সলফে সলেহীনদের ‘আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস। এবং তারা ধর্মের নীতিসমূহের প্রতি যে ‘আক্বীদাহ পোষণ করতেন এবং সে সব নীতি অনুসারে তারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের মনোনীত ধর্ম ইসলাম অনুসরণ করতেন তার বিবরণ।

মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে আমি বলছি :

  • ৪৯। আরশ এবং কুরসী সত্য।
  • ৫০। আল্লাহ তাআলা আরশ ও অন্যান্য বস্তু হতে অমুখাপেক্ষী।
  • ৫১। তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সব কিছুরই উর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাঁকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে অক্ষম।
  • ৫২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীল বা বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কথোপকথন করেছেন। এর পতি আমরা বিশ্বাস রাখি, উহার সত্যতা স্বীকার করি এবং তার উপর একান্ত আনুগত্য প্রকাশ করে থাকি।
  • ৫৩। আল্লাহর ফেরেশ্‌তাগন এবং নবীগণের প্রতি ঈমান রাখি এবং রাসূলগণের প্রতি প্রেরিত কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করি এবং সাক্ষ্য প্রদান করি যে, তারা প্রকাশ্য সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
  • ৫৪। আমাদের ক্বিবলাকে (বায়তুল্লাহ) যারা ক্বিবলা বলে স্বীকার করে আমরা তাদেরকে মুসলিম ও মু’মিন বলে আখ্যায়িত করি যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নবী কর্তৃক প্রবর্তিত শরীয়তকে স্বীকার করে এবং তিনি যা কিছু বলেছেন তাকে সত্য বলে গ্রহণ করে।
  • ৫৫। আমরা আল্লাহর সত্ত্বা (জাত) সম্পর্কে অন্যায় গবেষণায় প্রবৃত্ত হই না এবং তাঁর দ্বীন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হই না।
  • ৫৬। কুরআন সম্পর্কে আমরা কোন তর্কে লিপ্ত হই না এবং সাক্ষ্য প্রদান করি যে, কুরআন বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালক পরওয়ারদিগারের কালাম। এটা জিবরীল আমীনের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর উহা নবীকূল শিরোমণি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিক্ষা দেয়া হয়। ইহা আল্লাহ তাআলার কালাম, কোন সৃষ্টির কালাম এর সমতুল্য নয়। আর আমরা একে মাখলুক বলি না এবং আমরা মুসলিম মিল্লাতের বিরুদ্ধাচরণ করি না।
  • ৫৭। কোন গুনাহর কারণে কোন আহলে ক্বিবলাকে (মুসলিমকে) কাফির বলে অভিহিত করি না যতক্ষণ না সে উক্ত গুনাহকে হালাল (জায়েয) মনে করে।
  • ৫৮। আমরা আশা করি যে, সৎকর্মশীল মু’মিনগণকে আল্লাহপাক ক্ষমা করবেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আমরা তাদের সর্ম্পকে নিশ্চিত নই, আর তাদের জান্নাতে প্রবেশেরও ঘোষণা দান করি না এবং তাদের গুনাহসমূহের জন্য আল্লাহর নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং আমরা তাদের জন্য আশংকা বোধ করব, কিন্তু নিরাশ হব না।
  • ৬০। নিশ্চিন্ততা ও নৈরাশ্যবোধ একজন মুসলিমকে মিল্লাতে ইসলামিয়া থেকে বের করে দেয়। অথচ আহলে ক্বিবলার জন্য সত্য পথ এতদুভয়ের মধ্যে নিহিত।
  • ৬১। আল্লাহ রাব্বুল ইয্‌যত যে সব বস্তুকে ঈমানের অংগ করেছেন সে সব বস্তুকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কোন বান্দাই ঈমানের বৃত্ত হতে বের হয় না।
  • ৬২। শরীআত এবং উহার ব্যাখ্যা- যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে সঠিকভাবে প্রাপ্ত, তার সবগুলো সত্য।
  • ৬৪। ঈমান এক। ঈমানদার ব্যক্তিরা প্রকৃত প্রস্তাবে সবাই সমান, তবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য হয়ে থাকে আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কৃ-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ এবং উত্তম বস্তুকে আকড়ে ধরার মাধ্যমে।
  • ৬৫। সব মু’মিন দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অলী এবং তাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে তাঁর অধিক অনুগত এবং কুরআনের বেশী অনুসারী।
  • ৬৬। ঈমান হচ্ছেঃ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্‌তা, তাঁর গ্রন্থ (আল-কুরআন), তাঁর রাসূল, ক্বেয়ামাহ দিবস, তাক্বদীরের ভাল মন্দ, মিষ্টি ও তিক্ত, সবই আল্লাহর তরফ থেকে- এই সবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
  • ৬৭। আমরা উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করি, আমরা রাসূলদের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাঁরা যে সকল বিধি-বিধান নিয়ে এসেছিলেন তা সবই সত্য বলে স্বীকার করি।
  • ৬৮। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মাতের মধ্যে যারা কবীরাহ গুনাহ করবে তারা জাহান্নামে যাবে বটে, কিন্তু চিরস্থায়ী হবে না- যদি তারা একত্ববাদী হযে মৃত্যু বরণ করে, আর তাওবা নাও করে, কিন্তু ঈমানদার হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করে এবং তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও বিচারের উপর নির্ভরশীল হয়। তবে যদি তিনি চান তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং নিজ গুণে তাদের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করবেন। যেমন, আল্লাহ বারী তা’আলা তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেনঃ“শিরক ব্যতীত অন্যান্য সব অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪- ৪৮ আয়াত)
    আর যদি তিনি চান, তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবেন এবং তা হবে তার ন্যায় বিচার। অতঃপর আল্লাহপাক তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর অনুমতিপ্রাপ্ত সুপারিশকারীদের সুপারিশের ফলে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।এর কারণ হল এই যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের অস্বীকারকারীদের ন্যায় করেননি, যারা তাঁর হিদায়েতের পথ হতে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা তো তাঁর বন্ধুত্ব লাভে বঞ্চিত হয়েছে। হে ইসলাম ও মুসলিমদের অভিভাবক মহান আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখ যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা তোমার সাথে মিলিত হই।
  • ৬৯। প্রত্যেক সৎ ও পাপী মুসলিমের পিছনে নামাজ আদায় করা এবং প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জন্য জানাযার নামাজ আদায় করা জায়েয বলে আমরা মনে করি।
  • ৭০। আমরা কাউকে জান্নাতী ও জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করব না এবং কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফরী ও শিরকের অথবা নিফাকের সাক্ষ্য প্রদান করব না, যতক্ষণ না এগুলির কোন একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেই।
  • ৭১। আমীর ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না, যদিও তারা অত্যাচার করে। আমরা তাদের অভিশাপ দিব না এবং আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিব না। তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সাপেক্ষে ফরয, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যচরণের আদেশ দেয়। আমরা তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দু’আ করব।
  • ৭৩। আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসরণ করব। আমরা জামাআত হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং জামাআতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকব।
  • ৭৪। আমরা ন্যায় পরায়ন ও আমানতদার ব্যক্তিদেরকে ভালবাসব এবং অন্যায়কারী ও আমানতের খেয়ানতকারীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করব।
  • ৭৫। যে সব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট সে সব বিষয়ে আমরা বলবঃ “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অধিক জানেন।
  • ৭৬। সফরে ও গৃহে হাদীছের নিয়মানুসারে আমরা মোজার উপরে মাসেহ করা জায়েয মনে করি।
  • ৭৭। মুসলিম শাসক ভাল হউক কিংবা মন্দ হউক- তার অনুগামী হয়ে জিহাদ করা এবং হজ করা কেয়ামাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ দু’টি জিনিসকে কেউ বাতিল বা ব্যাহত করতে পারবে না।
  • ৭৮। আমরা কিরামান-কাতিবীন ফেরেশ্‌তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আমাদের পর্যবেক্ষক নির্বাচিত করেছেন।
  • ৭৯। আমরা মালাকুল মাউতের (মৃত্যুর ফেরেশ্‌তার) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। তাকে বিশ্বের রূহসমূহ কবয্‌ করার দায়িত্ব অর্পণ রা হয়েছে।
  • ৮০। আমরা শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য কবরের আযাবের প্রতি বিশ্বাস রাখি এবং এও বিশ্বাস করি যে, কবরের মুনকার ও নাকীর (দুই ফেরেশ্‌তা) মৃত ব্যক্তির রব, দ্বীন, ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ছাহাবায়ে কেরামদের নিকট হতে বহু হাদীছ ও উক্তি বর্ণিত হয়েছে।
  • ৮১। কবর জান্নাতের বাগিচা সমূহের অন্যতম অথবা ইহা জাহান্নামের গহ্বর সমূহের অন্যতম।
  • ৮২। আমরা পুনরুত্থান, কেয়ামাত দিবস আমলের প্রতিফল, হিসাব নিকাশ আমলনামা পাঠ, সওয়াব (প্রতিদান) শাস্তি, পুলসিরাত এবং মীযান এসবই সত্য বলে বিশ্বাস করি।
  • ৮৩। জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব হতে সৃষ্ট হয়ে আছে। এ দু’টি কোন দিন লয় প্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয় প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তা হবে তার ন্যায় বিচার। আর প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।
  • ৮৪। ভাল ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
  • ৮৫। “সামর্থ”- যে কোন কর্মের জন্য অপরিহার্য। উহা দু’ধরণের- (১) তাওফীক, (যা আল্লাহ পাকের অন্যতম গুণ)। এর দ্বারা মাখলুককে ভুষিত করা যায় না। এ ধরণের সামর্থ বান্দার কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট (কর্ম বাস্তবায়িত করার জন্য অপরিহার্য)। (২) যে “সামর্থ” কর্মের পূর্বেই প্রয়োজন যেমন সুস্থতা, সচ্ছলতা, ক্ষমতা, অঙ্গ প্রতঙ্গের নিরাপত্তা, আর এরই সাথে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“তিনি কাউকে তার ক্ষমতার উর্ধ্বে দায়িত্ব দেন না। (সূরা বাকারা ২-২৮৬ আয়াত)।
  • ৮৬। বান্দাদের যাবতীয় কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি এবং উহা বান্দাদের উপার্জন।
  • ৮৭। আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের উপর তাদের সামর্থের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন না। বরং তারা যতটুকু দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে ততটুকু বোঝাই তিনি চাপিয়ে থাকেন। এটাই হলঃ “আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন সৎ কর্ম হতে বিরত থাকার ক্ষমতা কারও নেই।” এর ব্যাখ্যা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া কারো কোন প্রকার নড়া-চড়া এবং আল্লাহর অবাধ্যচরণ হতে বিরত থাকার ক্ষমতা নেই। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তাআলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য বরণ করার এবং তার উপরে দৃঢ় থাকার সাধ্য কারও নেই।
  • ৮৮। পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান, তাঁর ফায়সালা এবং তাঁর বিধান অনুসারেই হয়ে থাকে। তাঁর ইচ্ছা সমস্ত ইচ্ছার উপরে। তাঁর ফায়সালা সমস্ত কৌশলের ঊর্ধ্বে। যা ইচ্ছা তিনি তাই করেন। তিনি কখনও অত্যাচার করেন না। তিনি সর্ব প্রকার কলুষ ও কালিমা হতে পবিত্র এবং সব রকমের দোষ ত্রুটি হতে বিমুক্ত। তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। পক্ষান্তরে, অন্য সবই নিজের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আম্বীয়া ২১ : ২৩ আয়াত)
  • ৮৯। জীবিত ব্যক্তিদের দুআ এবং দান খয়রাত দ্বারা মৃত বক্তিরা উপকৃত হয়ে থাকে।
  • ৯০। আল্লাহ বারী তাআলা দুআ কবুল করেন এবং বান্দাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন।
  • ৯১। আল্লাহ তাআলা সব কিছুরই মালিক এবং তাঁর মালিক কেউ নয়। মুহুর্তের জন্যও কারো পক্ষে আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি মুহুর্তের জন্য আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হতে চাবে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং লাঞ্ছিত হবে।
  • ৯২। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ক্রুদ্ধ এবং রুষ্ট হন, তবে তা মাখলুকের ন্যায় নয়।
  • ৯৩। আমরা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদেরকে ভালবাসি, তবে তাদের ভালবাসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করি না এবং তাদের কাউকেও তিরস্কার করি না। তাদের সাথে যারা বিদ্বেষ পোষণ করে অথবা যারা তাদেরকে অসম্মানজনক ভাবে স্মরণ করে আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি। আমরা তাদেরকে শুধু কল্যাণের সাথেই স্মরণ করি। তাদের সঙ্গে মহব্বত রাখা দ্বীন ও ঈমান এবং এহসানের অংশ। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, কুফরী, মুনাফিকী এবং সীমা লংঘন করার পর্যায়ভূক্ত।
  • ৯৪। আমরা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর সর্বপ্রথম আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহুর খেলাফতবে স্বীকৃতি দেই। অতঃপর পর্যায়ে ক্রমে উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) উসমান (রাঃ) ও আলীকে (রাঃ) খলীফা বলে স্বীকার করি। তাঁরাই ছিলেন সুপথগামী খলীফা ও হিদায়েত-প্রাপ্ত নেতা।
  • ৯৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দশজন সাহাবার নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পর্কে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, আমরা তাদের জান্নাতে প্রবেশের স্বাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ, এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দান করেছেন এবং তাঁর উক্তি সত্য।তাঁরা হলেনঃ

    • (১) আবু বকর (রাঃ)
    • (২) উমর (রাঃ)
    • (৩) উসমান (রাঃ)
    • (৪) আলী (রাঃ)
    • (৫) তালহা (রাঃ)
    • (৬) যুবাইর (রাঃ)
    • (৭) সা’দ (রাঃ)
    • (৮) সা’ঈদ (রাঃ)
    • (৯) আউফ (রাঃ) এবং
    • (১০) আমীনুল উম্মাহ (জাতির বিশ্বাসভাজন) আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)

     

  • ৯৬। যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবা ও তাঁর পুতঃপবিত্র সহধর্মিনী ও বংশধরগণ সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করে সে মুনাফিকী হতে নিস্কৃতি পায়।
  • ৯৭। সালাফে ছালেহীন (পূর্ববর্তী নেককার বান্দাগণ) ও তাঁদের পদাংক অনুসারী সৎ কর্মশীল ব্যক্তিগণ এবং ফক্বীহ ও চিন্তাবিদগণকে আমরা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি, আর যারা এদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে তারা সঠিক পথের পথিক নয়।
  • ৯৮। আমরা কোন অলীকে কোন নবীর উপরে প্রাধান্য দেই না বরং আমরা বলি, যে কোন একজন রাসূল সমস্ত আওলীয়াকুল হতে শ্রেষ্ঠ।
  • ৯৯। আওলীয়াদের কারামত সম্পর্কে যে খবরাখবর আমাদের নিকট পৌঁছেছে এবং যা বিশ্বস্ত বর্ণনার মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি।
  • ১০০। আমরা কেয়ামাতের নিম্নলিখিত নিদর্শনাবলীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিঃ দাজ্জালের আবির্ভাব, আসমান হতে ঈসা আ. এর অবতরণ, পশ্চিম গগনে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরয নামক প্রাণীর নিজ স্থান হতে আবির্ভাব।
  • ১০১। আমরা কোন ভবিষ্যৎ বক্তা অথবা কোন জ্যোতিষীকে সত্য বলে মনে করি না এবং ঐ বক্তিকেও সত্য বলে মনে করি না, যে আল্লাহর কিতাব, নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ ও উম্মতের এজমার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখে।
  • ১০২। আমরা (মুসলিম জাতির) ঐক্যকে সত্য ও সঠিক বলে মনে করি এবং তা হতে বিচ্ছিন্নতাকে বক্রতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করি।
  • ১০৩। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে আল্লাহর দ্বীন এক এবং অভিন্ন। তা হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” (সুরা ইমরান, ৩ – ১৯ আয়াত)।

অন্যত্র তিনি আরও বলেন-

“এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়েদা,আয়াত : ৩ )

  • ১০৪। ইসলাম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম। এতে বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতা, তাশবীহ ও তা’তীল জবর ও ক্বদরের স্থান নেই। ইহা নিশ্চিন্ততা ও নৈরাশ্যের মধ্যবর্তী একটি পথ।
  • ১০৫। এগুলিই হচ্ছে আমাদের দ্বীন এবং আমাদের আক্বীদাহ বা মৌলিক ধর্ম বিশ্বাস। যা প্রকাশ্যে এবং অন্তরে উহা ধারণ করি। যারা উল্লিখিত বিষয় বস্তুর বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনই সম্পর্ক নেই।

সর্বশেষ বারগাহে এলাহীতে আমাদের আরযঃ তিনি যেন আমাদেরকে ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক প্রদান করেন এবং আমাদের জীবনাবসান ঈমানের সাথে করেন এবং আমাদেরকে রক্ষা করেন বিভিন্ন প্রবৃত্তি পরায়ণতা ও মতামতসমূহ হতে এবং মুশাববিহা, মু’তাযিলা, জাহমিয়া, জাবরিয়া, ক্বাদরিয়া প্রভৃতি বাতিল মাযহাবসমূহের মধ্যে যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং যারা ভ্রষ্টতার উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য শপথ গ্রহণ করে, আমরা তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করছি। তারা আমাদের মতে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত। পরিশেষে আল্লাহর নিকটেই যাবতীয় ভ্রান্তি হতে নিরাপত্তা এবং সৎপথে চলার তাওফীক কামনা করছি।


সহীহ আক্বীদা [১]

আকীদা তাহাবী

সংকলক : ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, ফকীহ, আল্লামা আবু জাফর ওয়াররাক আততাহাবী র. মিসরে অবস্থান কালে বলেছিলেন:

ফুকাহায়ে মিল্লাত আবূ হানীফা আন-নুমান বিন সাবেত আল কুফী, আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারী এবং আবু আব্দুল্লাহ বিন আল হাসান আশ শায়বানী রাহিমাহুমুল্লাহদের অনুসৃত নীতি অনুসারে এটা হল সাহাবা ও পরবর্তী জামা’আত সলফে সলেহীনদের ‘আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস। এবং তারা ধর্মের নীতিসমূহের প্রতি যে ‘আক্বীদাহ পোষণ করতেন এবং সে সব নীতি অনুসারে তারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের মনোনীত ধর্ম ইসলাম অনুসরণ করতেন তার বিবরণ।

মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে আমি বলছি :

  • ১। নিশ্চয়ই আল্লাহ এক, যাঁর কোন শরীক (অংশীদার) নেই।
  • ২। তাঁর মত কিছুই নেই। (কেউ তাঁর সমতুল্য নয়)।
  • ৩। কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।
  • ৪। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
  • ৫। তিনি অনাদি, যার কোন আদি নেই। তিনি অনন্ত, যার কোন অন্ত নেই।
  • ৬। তাঁর ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই।
  • ৭। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুই সংঘটিত হয় না।
  • ৮। কল্পনা তাঁর ধারে কাছে পৌঁছে না এবং ইন্দ্রিয় জ্ঞান তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না।
  • ৯। সৃষ্ট বস্তু তাঁর সদৃশ্য হতে পারে না।
  • ১০। তিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই এবং তিনি চির জাগ্রত, যাঁর নিদ্রার দরকার নেই।
  • ১১। তিনি এমন সৃষ্টিকর্তা যার সৃষ্টিতে কোন সাহায্যের মুখাপেক্ষী হন না এবং তিনি অক্লান্ত রিযক দাতা।
  • ১২। তিনি নির্ভয়ে প্রাণ সংহারকারী এবং নির্বিবাদে পুনরুত্থানকারী।
  • ১৩। সৃষ্টির বহু পূর্বেই তিনি তাঁর অনাদি গুণাবলীসহ বিদ্যমান ছিলেন, আর সৃষ্টির কারণে তাঁর নতুন কোন গুণের সংযোজন ঘটেনি এবং তিনি তাঁর গুণাবলীসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনি তিনি স্বীয় গুণাবলীসহ অনন্ত থাকবেন।
  • ১৪। সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “খালেক” (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি। অথবা বিশ্ব জাহান সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “বারী” (উদ্ভাবক) হয়নি।
  • ১৫। প্রতিপাল্যের অবিদ্যমানতায়ও তিনি ছিলেন ‘রব’ বা প্রতিপালক, আর মাখলুক সৃষ্টির পূর্বেও তিনি ছিলেন ‘খালেক’ বা সৃষ্টিকর্তা।
  • ১৬। মৃতকে জীবন দান করার ফলে তাঁকে ‘জীবনদানকারী’ বলা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কোন বস্তুকে জীবন দান করার পূর্বেও তিনি এই নামের (জীবন দানকারী) অধিকারী ছিলেন। অনুরূপভাবে তিনি সৃজন ছাড়াই সৃষ্টি কর্তার নামের অধিকারী ছিলেন।
  • ১৭। এটা এই জন্য যে, তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর অনুগ্রহ ভিখারী; সব কিছুই তাঁর জন্য সহজ তিনি কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। “তাঁর মত কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
  • ১৮। তিনি স্বীয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন।
  • ১৯। এবং তাদের (সৃষ্ট বস্তুর) জন্য সব কিছুরই পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।
  • ২০। এবং তাদের জন্য মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করেছেন।
  • ২১। সৃষ্ট জীবের সৃষ্টির পূর্বে কোন কিছুই তাঁর অজ্ঞাত ছিল না। জীব জগতের সৃষ্টির পূর্বেই তাদের সৃষ্টির পরবর্তীকালের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন।
  • ২২। এবং তিনি তাদের স্বীয় আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর অবাধ্যচরণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
  • ২৩। সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এবং একমাত্র তাঁরই ইচ্ছা কার্যকর হয়, এবং (আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া) বান্দার কোন ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। অতএব তিনি বান্দাদের জন্য যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না।
  • ২৪। আল্লাহপাক যাকে ইচ্ছা হিদায়েত, আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ, পক্ষান্তরে যে পথভ্রষ্ট হতে চায়, তাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে অপমানিত ও বিপদগ্রস্ত করেন। এটা তাঁর ন্যায় বিচার।
  • ২৫। সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে থাকে তাঁর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে এবং সুবিচারের মাধ্যমে।
  • ২৬। তিনি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমকক্ষ হওয়ার উর্ধ্বে।
  • ২৭। তাঁর মীমাংসার কোন পরিবর্তন নেই। কেউই তাঁর নির্দেশ বাতিল করার নেই এবং তাঁর নির্দেশকে পরাভূত করারও কেউ নেই।
  • ২৮। উপরে উল্লিখিত সব কিছুর প্রতিই আমরা ঈমান এনেছি এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করছি যে, এর প্রতিটি বিষয় আল্লাহর তরফ হতে সমাগত।
  • ২৯। নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নির্বাচিত বান্দা, মনোনীত নবী এবং প্রিয় রাসূল।
  • ৩০। তিনি নবীগণের সর্বশেষ, মুত্তাক্বীনদের ইমাম, রাসূলগণের নেতা এবং বিশ্বের মহান প্রতিপালকের হাবীব (বন্ধু)।
  • ৩১। তাঁর পরবর্তী যুগে নবুওয়াতের যে সব দাবী উত্থাপিত হয়েছে, তার সবগুলিই ভ্রান্ত ও প্রবৃত্তি পরায়ণতার শিকার।
  • ৩২। তিনি সত্য, হিদায়েত এবং নূর সহকারে সকল জিন ও সমস্ত মাখলুকের প্রতি প্রেরিত।
  • ৩৩। নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর কালাম, ইহা আল্লাহর নিকট হতে উৎসারিত হয়েছে, তবে সাধারণ কথা বার্তার পদ্ধতিতে নয়। এই কালামকে তিনি তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি অহী হিসাবে নাযিল করেছেন এবং বিশ্বাসীগণ তাঁকে এ ব্যাপারে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এবং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন যে, উহা সত্যিই আল্লাহর কালাম। উহা মাখলুকের কালামের ন্যায় সৃষ্ট বস্তু নয়। অতএব, যে ব্যক্তি একথা শুনেও তাকে মানুষের কালাম বলে ধারণা করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ বারী তাআলা তার নিন্দাবাদ করেছেন, তিরস্কার করেছেন এবং তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “শীঘ্রই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সূরা মুদদাচ্ছির, ৭৪- ২৬আয়াত) আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন ঐ ব্যক্তির জন্য যে বলবেঃ “এটাতো মানুষের কথা বৈ আর কিছুই নয়”। (সূরা মাদ্দাচ্ছির ৭৪ -২৫ আয়াত) অতএব, আমরা অবহিত হলাম এবং বিশ্বাস স্থাপন করলাম যে, ইহা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তারই কালাম এবং সৃষ্ট জীবের কালামের সাথে এর কোন তুলনা হয় না।
  • ৩৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানবীয় কোন গুণ আরোপ করে, সে কাফের। অতএব, (ক) যে ব্যক্তি এতে অন্তঃদৃষ্টি প্রদান করবে সে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে। ফলে (আল্লাহ সম্পর্কে) কাফেরদের মত নিরর্থক কথা বলা হতে বিরত থাকবে এবং (খ) সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর গুণাবলীতে মানুষের মত নন।
  • ৩৫। আল্লাহর সাথে সাক্ষাত জান্নাতীদের জন্য সত্য। তার পদ্ধতি আমাদের অজানা। এ ব্যাপারে কুরআন ঘোষণা করেছেঃ “সেদিন কতকগুলো মুখমন্ডল উজ্জল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সুরা কিয়ামা: ৭৫- ২২ আয়াত) । এর ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন এবং এ সম্পর্কে যা কিছু সহীহ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে তা অবিকৃত অবস্থায় গৃহীত হবে। অতএব, এতে আমরা আমাদের বিবেক বুদ্ধি অনুসারে কোন প্রকার অসঙ্গত তাৎপর্যের অনুপ্রবেশ ঘটাব না, অথবা স্বীয় প্রবৃত্তির প্ররোচনায় কোন সংশয় সৃষ্টিকারীর সংশয়কে প্রশয় দেব না। কারণ, ধর্মীয় ব্যাপারে একমাত্র সেই ব্যক্তিই পদস্খলন হতে নিরাপদ থাকতে পারে যে আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে (ভুল ধারণাকারীর বিভ্রান্তি হতে) নিরাপদ থাকে এবং যে ব্যক্তি সংশয়যুক্ত ব্যাপার সমূহকে সর্বজ্ঞানের অধিকারী আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়।
  • ৩৬। আত্ম-সমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার ছাড়া কারও পা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকতে পাবে না। আর যে ব্যক্তি এমন বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের পিছনে লেগে থাকবে যা তার জ্ঞানের নাগালের বাইরে এবং যার বিবেক আত্মা- সমর্পণে সন্তুষ্ট হবে না সে নির্ভেজাল তাওহীদ, নির্দোষ মারেফাত ও বিশুদ্ধ ঈমান হতে বঞ্চিত থাকবে। অতএব, সে কুফরী ও ঈমান সত্য ও মিথ্যা, স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি অনিশ্চয়তার বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকবে। সে না সত্যবাদী মু’মিন হবে, আর না অস্বীকারকারীরা মিথ্যাবাদী হবে।
  • ৩৭। যে ব্যক্তি জান্নাতীদের আল্লাহর সাক্ষাত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে, স্বীয় জ্ঞান অনুসারে সেই সাক্ষাতের ভুল ব্যাখ্যা দিবে, সে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রকৃত তাৎপর্য্য হচ্ছে- সে সম্পর্কে কোনরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার অপচেষ্টা না করা এবং উহাকে অবিকৃত ভাবে গ্রহণ করা। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের অনুসৃত নীতি। যে ব্যক্তি নফী অস্বীকৃতি এবং তাশবীহ (সাদৃশ্য) হতে আত্মরক্ষা করবে না তার নিশ্চিত পদস্খলন ঘটবে এবং সে সঠিকভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণায় ব্যর্থ হবে। কারণ, আমাদের মহান প্রতিপালক একক ও নজীরবিহীন হওয়ার গুণে ¸গুন্বানিত মাখলুকের মধ্যে কেউ তাঁর গুণে ভূষিত নয়।
  • ৩৮। আল্লাহপাক সীমা পরিধি থেকে মুক্ত। তিনি অঙ্গ-প্রতঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুখাপেক্ষীহীন। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না।
  • ৩৯। মি’রাজ সত্য, মুহাম্মদকে নৈশকালে ভ্রমণ করান হয়েছিল, তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে উর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো উর্ধ্বে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন। তার অন্তর যা দেখেছিল তা মিথ্যা নয়। আল্লাহপাক তাঁর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রহমত বর্ষন করুন।
  • ৪০। হাউয-এ কাওসার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানিত করেছেন এবং যা তাঁর উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে তাঁকে দান করেছেন। এ বিষয়টি সত্য।
  • ৪১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত, যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন তা সত্য ।
  • ৪২। “মীসাক” (অঙ্গীকার), যা আল্লাহ তাআলা আদম এবং তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তা সত্য।
  • ৪৩। অনাদিকাল হতে আল্লাহপাক সার্বিকভাবে জানেন যে, কত লোক জান্নাতে যাবে আর কত লোক জাহান্নামে যাবে। এতে ব্যতিক্রম হবে না। এদের সংখ্যা কমও হবে না, বেশীও হবে না।
  • ৪৪। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত এবং যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ সাধ্য। শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগ্য সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় হতভাগ্য বলে নির্ধারিত হয়েছে।
  • ৪৫। “তাকদীর” সম্পর্কে আসল কথা এই যে, এটা বান্দা সম্পর্কে আল্লাহর একটি রহস্য। এ রহস্য তাঁর নিকটবর্তী কোন ফেরেশ্‌তাও জানেন না অথবা তাঁর কোন প্রেরিত নবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে তথ্য আবিস্কার করতে যাওয়া অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ধৃষ্টতার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমা লংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা ‘তাকদীর’ সম্পর্কিত জ্ঞান সৃষ্ট বস্তু হতে গোপন রেখেছেন এবং এর উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা (তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে) জিজ্ঞাসিত হবে”। (সুরা আম্বীয়া ২১- ২৩ আয়াত) অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে “তিনি কেন এ কাজ করলেন?” সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হল।
  • ৪৬। আল্লাহর নূরে জ্যোতিদীপ্ত অলী আওলিয়াগনও উক্ত বিষয় (অর্থাৎ তক্বদীরকে অনুরূপভাবে মেনে নেয়ায়) থেকে মুক্ত নন। এতদ্বারা জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞা বিভূষিত ব্যক্তিদের মর্যাদাই প্রতিষ্ঠিত হয়। (এ প্রসঙ্গে) উল্লেখ্য যে, জ্ঞান দু’প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট অবিদ্যমান। বিদ্যমানকে অস্বীকারকরাও যেমন কুফরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফরী। বিদ্যমান জ্ঞানের সাধনা করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের আন্বেষান করা হতে বিরত থাকাই সুদৃঢ় ঈমানের পরিচয়।
  • ৪৭। লাওহে মাহফুয এবং তাতে যা কিছু লিখিত হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি। আমরা আরও বিশ্বাস করি কলমের প্রতি। যা হবে বলে আল্লাহ লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা হবেই। সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তার কিছু রোধ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। যা প্রলয় দিবস পর্যন্ত ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে এবং কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার ভাগ্যে লিখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না এবং যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা হবেই হবে।
  • ৪৮। বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলি সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত রয়েছেন। অতএব, তিনি তাকে তাদের জন্য অকাট্য ও অবিচল ভাগ্য হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। এটাকে কেউ বানচাল করতে পারবে না, অথবা এর বিরোধিতাও করতে পারবে না, একে কেউ অপসারিত অথবা পরিবর্তিতও করতে পারবে না। আসমান ও যমীনের কোন মাখলুক একে সংকুচিত কিংবা বর্ধিত করতে পারবে না। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তাআলার ওয়াহদানিয়াত ও রবুবিয়ত সম্পর্কে স্বিকৃতী দান। যেমন আল্লাহ বারী তাআলা তাঁর গ্রন্থে ঘোষণা করেছেনঃ “তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫- ৩ আয়াত)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেনঃ

“আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত।” (সূরা আহযাব ৩৮ আয়াত)।

অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগগ্রস্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হবে।

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


মুরগি ও ডিমের বিস্ময়কর রহস্য

সৃষ্টির অগণিত রহস্যের মধ্যে আমাদের গৃহপালিত পক্ষীকুলের একটি হল মোরগ মুরগি। তাকিয়ে দেখুন তাদের জন্ম রহস্য এবং চলাফেরার মধ্যে কত আশ্চর্যজনক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিষয় রয়েছে। মোরগ-মুরগি ভোর বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই তারা তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের সন্ধানে আবর্জনার স্তূপের দিকে এগিয়ে যায় এবং সেখান থেকে তারা পছন্দ ও রুচি-মত খাদ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তাদের বিচিত্র পছন্দ থেকে পোকামাকড়, সাপের বাচ্চা, বিচ্ছু, কীটপতঙ্গ,ঘাস, ফল-ফুল, কাচ পাথর বালি সোনা-চাঁদি-কিছুই বাদ পড়ে না। তাদের পাকস্থলী আল্লাহ তা‘আলার নির্মিত এমনই এক অভিনব কারখানা যেখানে পড়ার সাথে সাথে সকল কিছু হজম বা আত্মস্থ হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় উপাদান তাদের শরীরে পৌঁছে যাওয়ার পর বর্জ্য-পদার্থ মল আকারে বেরিয়ে যায়। এমন পাকস্থলী বাঘ-ভল্লুক হাতি-ঘোড়া, এমনকি মানুষেরও নেই, যেখানে লোহা-কাচ পাথর, শাক-সবজি, ঘাস-পাতা, তরিতরকারি, গোশত, মাছ-সবকিছুই হজম হয়ে যায়। যা তার শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রকৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, রাব্বুল আলামিন তার মধ্যে এমন বীজ রেখে দিয়েছেন, যার ফলে এমনি আরো মুরগি পয়দা হবে এবং দুনিয়ায় তাদের বংশ বিস্তার হতে থাকবে। এইভাবে, প্রতিনিয়তই আমরা দেখতে পাব যে প্রকৃতির মধ্যে অবস্থিত জীব-জন্তু ও পক্ষীকুলকে আল্লাহ তা‘আলা ভিন্ন ধরনের ওহি বা ইলহাম দ্বারা তাদের কার্যক্রম ও খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। রাব্বুল আলামিনের ইলহামী ইশারাতে মুরগি জমিনের অভ্যন্তরে ও উপরিভাগের অসংখ্য জিনিস থেকে ডিম দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মালমসলা সংগ্রহ করে নেয়। কিন্তু যখন ডিম দেয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তখন আল্লাহপাক তাকে গোপন ওহির মাধ্যমে নির্দেশ দেন : এখন তার এতসব খাদ্য দরকার নেই, এতদিন ডিমের খোলস শক্ত বানানোর জন্য নানাবিধ খাদ্যসহ ওইসব ধাতব দ্রব্য প্রয়োজন ছিল। এখন ডিম দেয়া বন্ধ, কাজেই ঐগুলি আর খেয়ো না এবং প্রজননের জন্য এখন নর ও মাদির মিলনের দরকার নেই। এবার একুশ দিনের জন্য বসে যাও, ডিমগুলি তা দিতে থাক। এ জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে যতটুকু প্রয়োজন আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে ততটুকু খাদ্য গ্রহণের জন্য দিনে একবার বের হবে। কতটুকু তাপ কত সময় ধরে দিতে হবে সে বিষয়েও তাকে ইলহামের মাধ্যমে জানানো হয়। তাই সে প্রথম সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বেরিয়ে কিছু খাবার খেয়ে আবার গিয়ে বসে। দ্বিতীয় সপ্তাহে তার বের হওয়ার সময় আরও কমিয়ে দেওয়া হয় এবং তৃতীয় সপ্তাহে তাপ আরও দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখার প্রয়োজনে ডিম থেকে উঠে আসা আরও কমিয়ে দেয়া হয়। শুধু যে ডিমের তাপ সংরক্ষিত রাখার জন্য তার বসে থাকতে হয়, তা নয়, বরং ডিমগুলি মাঝে মাঝে নাড়তে হয়। নেড়েচেড়ে তার সকল দিকের পরিচর্যা সুসমঞ্জসভাবে করা লাগে। এ বিষয়েও তাকে গায়েবি নির্দেশ দেয়া হয়। একুশ দিন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ডিমের মধ্যে বাচ্চার গঠন যখন পূর্ণ হয়ে যায় তখন গায়েবি নির্দেশ আসে : এখন আর ডিম নাড়াচাড়া নয়, এখন দুনিয়ার জীবনে পদার্পণ করার জন্য বাচ্চা প্রস্তুত, তার দেহ অত্যন্ত নাজুক ; অতএব সে নিজে নিজে চেষ্টা করে শক্ত খোলটি ভেঙে ফেলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবে। সুতরাং সবর করতে হবে, যখন তার কানে হালকা হালকা মনোরম আওয়াজ আসতে থাকে। এ সময়ে বাচ্চাকে দেখার জন্য মুরগিটি অস্থির হয়ে উঠে। এজন্য সে ডিমের উপর বার বার ঠোকর দিতে থাকে। তখন তাকে সতর্ক করার জন্য তার কানে গায়েবি শব্দ বেসে আসে : হে নাদান মুরগি, তোর সামান্য ভুলের কারণে ডিমের মধ্যে এতদিন ধরে লালিত বাচ্চাটি মারা যেতে পারে। তুই যদি তোর চঞ্চু দিয়ে ঠোকর মেরে বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি বের করার চেষ্টা করিস সেই আঘাত বা চাপে বাচ্চাটা মারা যেতে পারে। সুতরাং মুরগির কর্তব্য হচ্ছে, বাচ্চা নিজে নিজেই খোল ভেঙে বেরিয়ে আসুক-তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকা। গায়েবের জগতে আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালন, রহমত এবং হেদায়েত দানের কাজ একই সাথে চলছে। এখন আসুন, আমরা বুঝতে চেষ্টা করি কেমন করে অদৃশ্য জগৎ থেকে কীভাবে ডিমের মধ্যে প্রাণ সৃষ্টি সম্ভব হয়। অতি দুর্বল নবজাতক মুরগি বা মুরগির বাচ্চা কঠিন একটি পরদা ও তার উপরের শক্ত খোলের মধ্যে কীভাবে প্রাণ পেল, কীভাবে বন্দী জীবন যাপন করল, কীভাবে পেল পরদা ও খোলের জিন্দানখানা ভেঙে দুনিয়াতে আসার সামর্থ্য ! যে পরদা ও খোলের মধ্যে এতদিন সে বাস করল, সেখানে না ছিল চোখ খোলার কোন উপায়, না বাহু বা পাখনা মেলার জায়গা। সেখানে সে না পা বিস্তার করতে পারে, আর না বাহ্যিক জগতের সাথে তার কোন সম্পর্ক গড়ে উঠে যার ফলে বাইরের কোন সাহায্য পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব। এ সময় তার মালিক, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহ তা‘আলাই তার একমাত্র সাহায্যকারী এবং ত্রাণকর্তা, আর অবশ্যই তার জীবনশিরা বা শাহ্‌রগ থেকেও তিনি তার সন্নিকটে। ঐ রহস্যময় অজানা-অচেনা গভীর অন্ধকার জগৎ থেকে দিকনির্দেশনা আসে ডিমের খোলের মধ্যে আগত নবীন ঐ বাচ্চাটির জন্য এবং তখন সে তার ছোট্ট মোলায়েম ঠোঁট বা চঞ্চু দিয়ে ঠোকর মেরে মেরে পরদার স্তরগুলি ছিঁড়ে ফেলতে থাকে এবং পরিশেষে বাহিরের শক্ত খোলটি ভেঙে সে বাহিরে আসার পথ করে নেয়। ঠিক কোন্‌ মুহূর্তে কীভাবে সে পথ করে নেবে, তা তাকে জানানো হতে থাকে কুল মখলুকাতের মালিকের পক্ষ থেকে। যাঁর একক নিয়ন্ত্রণে সবকিছু চলছে ও সংঘটিত হচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে ডিমের মধ্যে রক্ষিত বিভিন্ন স্তর ও আকৃতি উদ্দেশ্যবিহীন নয়। লাটিমের মত এই গোলকটির নীচের দিকে থাকে একটি কালো ক্ষুদ্র গোলক। এই কালো বিন্দুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তার মাথা এবং উপরের মোটা অংশটিতে ধড়। এভাবে আরও বিভিন্ন স্তরে তার পাখনা, হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, পাকস্থলী ইত্যাদির গঠন হতে থাকে মালিকের ইচ্ছা মত। এসব কিছুর পরিচর্যার জন্য সে ব্যবস্থা নিতে থাকে।

ডিমের সরু অংশ যেখানে ছোট্ট গোলকটি উৎপন্ন হয়ে মাথা তৈরির কাজ করে, ঠোকর মেরে খোলসটি ভাঙ্গার কাজ কিন্তু ওখান থেকে হয় না। কারণ ঐ অংশটি থাকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও শক্ত। ওখান থেকে মাথা বের হতে পারলেও বড় ধড়টি বের হওয়া মুশকিল। এজন্য খোলটির সাথে সংলগ্ন উপরের ঝিল্লির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাচ্চাটিকে ঘুরতে হয় এবং এটা রাব্বুল আলামিনের নির্দেশেই সে করে। তবে, গম্বুজের মত মোটা অংশের দিকে ঘুরে সে ঠোকরাতে থাকে না। এ পদ্ধতি তার বাহিরে বেরিয়ে আসার পথ সুগম না হয়ে তার মৃত্যু ডেকে আনবে। যেহেতু মোটা অংশে থাকে অক্সিজেন ট্যাংক, এজন্য তাকে পাশে ঠোকর দিয়ে বেরোনোর পথ করে নিতে হয়। একটু খেয়াল করলেই আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বুঝতে পারব। নরম তুলতুলে ঐ মুরগির বাচ্চাটির শরীরে কোন প্রকার চাপ বা আঁচড় না লাগে তার জন্য তাকে তিনি এলহামের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন : ধীরে ধীরে ঠোকর দিয়ে খোলটির এমনভাবে দাগ করে দাও যেন খোলটি দুর্বল হয়ে দু‘ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং তুমি আসানীতে দুনিয়ার আলোতে বেরিয়ে আসতে পার। কে তাকে এই সুনিপুণভাবে ডিমের গায়ে দাগ লাগিয়ে দেয়ার কৌশল ও টেকনিক শেখাল ? এসব আর কিছু নয়, প্রকৃতির যাবতীয় বিষয়ের উপর আল্লাহ তা‘আলার নিয়ন্ত্রণ ও হেদায়েত বা ওহির মাধ্যমে পরিচালনার ফল যা ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তাকালে বুঝা যাবে না।

মাকড়সা

সকল গৃহের মধ্যে যে ঘরটি সব থেকে সূক্ষ্ম এবং নরম তা হচ্ছে মাকড়সা নির্মিত ঘর। মাকড়সা নিজেও অত্যন্ত নাজুক। এদেরকে রক্তপায়ী প্রাণী-যেমন বিচ্ছু ইত্যাদির বংশোদ্ভুত মনে করা হয়। এরা দুরন্ত অনুভূতিশীল এবং অত্যন্ত মেধাবী বা স্মরণ শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে এক আশ্চর্যজনক জ্ঞান দিয়েছেন। তাদের ঘর তৈরির সকল সরঞ্জাম বা উপাদান তারা তাদের নিজেদের শরীর থেকেই পেয়ে থাকে। বাইরের মাটি পাথর ঘাস পানি ইত্যাদি কোন কিছুরই প্রয়োজন হয় না এবং তারা নিজেরাই এর নির্মাতা। তাদের নিজেদের অস্তিত্ব থেকে সংগৃহীত নির্মাণ সামগ্রী দ্বারা তৈরি এ ঘরই তাদের একমাত্র নিরাপদ বাসস্থল এবং এই ঘর থেকেই তারা তাদের জীবন ধারণ সামগ্রী লাভ করে। এ ঘরের সুন্দর জালে ধরা পড়ে পোকা মাকড়, মশা-মাছি এবং ছোট ছোট পাখি তাদের খোরাকে পরিণত হয়। আজব এ পোকার জ্ঞান, অদ্ভুত তার বাসগৃহ, আশ্চর্যজনক তার বুনন পদ্ধতি, এ ঘরের দেয়াল ও দরজা বিস্ময়কর, তাঁর জীবনটাও বড় চমকপ্রদ, মৃত্যুও ততোধিক বিচিত্র। মাকড়সা যখন গর্ভবতী হয় তখন গাছের খোল অথবা পাথরের ফোকরের মধ্যে স্থান গ্রহণ করে। তার পেট থেকে ডিম বের হওয়া থেকে নিয়ে বাচ্চা ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সে বসে থাকে এবং বাচ্চারা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই তারা মাকে খাওয়া শুরু করে দেয় এবং শক্তিশালী হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এসব পর্যবেক্ষণ করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলতে ইচ্ছা হয়। ‘হে সকল বিস্ময়কর ও অজানা বিষয়ের প্রকাশক, অবশ্যই আপনি সর্বজ্ঞ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়’।

একটি সিজদা হাজার গোলামি থেকে মুক্তি

আমরা পূর্বেই বলেছি যে, মূলত: আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা ইতিহাসের কোন যুগেই ছিল না। নবী রাসূলগণ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করানোর উদ্দেশ্যে এ পৃথিবীতে আসেন নি। কাফেরদের যখন জিজ্ঞাসা করা হতো যে, এ চন্দ্র, সূর্য, আকাশ, পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তখন তারা বলতো, আল্লাহ। নবী রাসূলগণ এসেছেন আল্লাহকে আড়াল করে সমাজে যে সমস্ত কুসংস্কারের জন্ম হয়েছিল, তা দূর করার জন্য। আল্লাহর গুনাবলী, তাঁর পবিত্র নাম, অন্য কথায় তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির প্রতি মানুষকে আহ্বান করার জন্যই তাঁরা পৃথিবীতে এসেছিলেন। আল্লাহই সর্বময় ক্ষমতার মালিক। তাঁর সৃষ্টি- নৈপুণ্যে অন্য কারো বিন্দুমাত্রও অংশীদারিত্ব নেই। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই একমাত্র মালিকানার দাবি করতে পারেন। যিনি রিজিক দান করেন, তিনিই আনুগত্য চাইতে পারেন। যিনি প্রতি মুহূর্তে আলো-বাতাস আর পানি-অক্সিজেন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিপালন করে যাচ্ছেন এবং আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন-মাথা শুধু তাঁর সামনে অবনত হতে পারে। অন্য সব মিথ্যা ক্ষমতা আর অসত্য গুণের দাবিদারকে অস্বীকার করে সর্বময় ক্ষমতার প্রকৃত মালিককে স্বীকার করানোর জন্যই পৃথিবীতে নবী ও রাসূলগণ এসেছেন। আর তাঁরা যা নিয়ে এসেছেন, আর নামই হলো ইসলাম। প্রকৃত মালিকের আনুগত্যের স্বীকৃতি। আর এ আনুগত্যের মাধ্যমেই আসে ইহকাল ও পরকালের শান্তি। এটাই হচ্ছে ইসলামের অর্থ ! মূলত: একমাত্র মালিকের আনুগত্য স্বীকার করার মধ্যে বান্দার প্রকৃত আজাদি রয়েছে। এ একটি সত্তার আনুগত্য স্বীকার করলে তাকে অসংখ্য শক্তির সম্মুখে মাথা নত করতে হয় না। আর এটাই সমস্ত কথার মূলকথা। এই কথাকেই ড. ইকবাল তাঁর কবিতায় এভাবে বলেছেন-
সে হলো একটি সিজদা-

যাকে তুমি বোঝা মনে কর,
প্রকৃতপক্ষে সে সিজদাই তোমাকে
আরো হাজার সিজদা থেকে নিষ্কৃতি দেয়।

ডিএনএ সংক্রান্ত জ্ঞান

চিকিৎসা বিজ্ঞানে নজিরবিহীন অগ্রগতি এনে দিয়েছে ক্ষুধা দারিদ্র্য অজ্ঞতা এবং রোগব্যাধি মানুষের চিরন্তন শত্রু। মানুষ সবসময় এর যন্ত্রণা ও পীড়া থেকে মুক্তির প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সার্বিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও মানুষের অনেক কিছু অর্জনের বাকি রয়েছে। সুদীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসাবে ডিএনএ সংক্রান্ত পরিষ্কার ধারণা আমাদের সম্মুখে এসে গেছে। এর ফলে মানসিক রোগ, হৃদ্‌রোগ, বহুমূত্র, হুপিংকাশি, মাদকাসক্তি এবং আরো অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির কারণ নির্ণয় ও প্রতিকারের ব্যবস্থা সহজ হয়ে গেছে। এখন এর মাধ্যমে অঙ্গ বিকৃতি ব্যাধি সমূহের প্রতিরোধ সম্ভব হয়ে উঠবে। সত্যি বলতে কি একুশ শতক জিন থেরাপী যুগের সূচনা করেছে।

ধর্ম-বিমুখতা ও এইডসের আজাব

আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস ও ধর্ম-বিমুখতার কারণে বর্তমান বিশ্বে অবাধ যৌনাচার তীব্র হয়ে উঠেছে। এমনকি সম-মৈথুনও ব্যাপকতর হচ্ছে। কোন কোন নবীর যুগেও তার জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম-মৈথুনের প্রচলন ছিল। এই অপবিত্র অপকর্ম পরিহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে সতর্ক-বাণীও উচ্চারিত হয়েছিল। আল্লাহর শাস্তি হিসাবে লুতের জনগোষ্ঠীর অনিবার্য ধ্বংসের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠী সব ধরনের সতর্ক-বাণীকে অগ্রাহ্য করে। এর পরিণতিতে আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তি গন্ধক ও অগ্নি বৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে পুরো জনগোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এইসব অপকর্মের শাস্তি হিসাবে গত কয়েক শতাব্দী ধরে সিফিলিস ও গনোরিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়। বর্তমানে মানব হন্তা নতুন রোগ এইডস বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগ অবাধ যৌনাচারের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে থাকে। এ জন্য এ থেকে নিষ্কৃতির পথ হল পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করা।

এ যুগের নাস্তিক বনাম জাহেলী যুগের কাফির

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর যুগের বড় বড় কাফির আবু জাহেল, আবু লাহাবও আল্লাহর অস্তিত্বকে কোনদিন অস্বীকার করে নি। তারা অস্বীকার করত শুধু তাঁর গুণাবলি ও সর্বময় ক্ষমতার একক অধিকারকে। অন্ধকার যুগ বলে আমরা যাকে আখ্যায়িত করি, সে যুগের লোকেরাও আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,

রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর জন্মের পূর্বে আবরাহা বাদশা যখন কাবা-ঘর ধ্বংস করতে আসল এবং তার সৈন্যরা কোরাইশ সম্প্রদায়ের কিছু উট ছিনিয়ে নিল। এ উটের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কিছু উটও ছিল, তিনি আবরাহার দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, আপনার লোকজন আমার উট ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে, আমি তা ফেরত চাই। বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে বললেন, আমরা কা’বাঘর ধ্বংস করতে এসেছি, সে ব্যাপারে কোন কথা না বলে আপনি সাধারণ উটের কথা বললেন। আব্দুল মুত্তালিব উত্তরে বললেন, আমি উটের মালিক, আমি উট চাই, কা’বাঘরের একজন মালিক আছেন, তিনিই এটা রক্ষা করবেন।

কাজেই, এখান থেকে বুঝা যায়, জাহেলিয়াতের যুগেও লোকেরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো। তারা হজ ও উমরা পালন করত। এর সাথে সাথে তারা দেব-দেবীরও পূজা করত।

ইতিহাসের এক পর্যায়ে সত্য-মিথ্যার ফয়সালা হয়েছিল বদরের ময়দানে,

সেখানে আরবের শক্তিধর সেনাপতি আবু জাহেল বদরের ময়দানের দিকে রওনার পূর্ব ক্ষণে কা’বাঘরের গিলাফ ধরে বলল, হে ঘরের মালিক, আমাদের দ্বীন যদি সত্য হয়, তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মুসলিম বাহিনী নিয়ে বদরের ময়দানে আসছে, তার একজনও যেন জিন্দা অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। আমরা যেন তাদেরকে ধরাশায়ী করতে পারি। আর যদি মুহাম্মদের দ্বীন সত্য হয়, তাহলে আমরা আরবের সর্দার ৭০ জনের একজনও যেন জিন্দা অবস্থায় ফিরে না আসি। আল্লাহ তা‘আলা আবু জাহেলের দোয়া কবুল করলেন।

নাস্তিকদের নিকট একটি জিজ্ঞাসা ???

পূর্বের আলোচনা থেকে বুঝা গেল জাহেলিয়াতের জমানায়ও তারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। আমাদের এ যুগের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নাস্তিকরা আবু জাহেল, আবু লাহাব থেকেও অনেক অধম, হতভাগ্য। দুঃখ হয় এদের বুদ্ধির দাবি শুনলে। মূলত: এরাই সর্ব-যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জাহেল। এসব নাস্তিকদের আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই : ধরে নেয়া যাক আল্লাহ নেই, কিন্তু মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসবে, দুটি চক্ষু মুদিত হয়ে আসার সাথে সাথে যখন দেখতে পাবে ফেরেশতাদের, দেখবে জান্নাত- দোজখ, আর দেখবে সবকিছুই এক এক করে উদ্ভাসিত হচ্ছে, তখন কি করবে ? এ অবস্থায় যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পূর্বাহ্নেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, তারা তো বেঁচে যাবে। আর আল্লাহ তা‘আলার বেহেশ্‌ত-দোজখ, ফেরেশতা যদি নাও থাকে (নাউযুবিল্লাহ) তাতেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তাহলে বুদ্ধিমানের কাজ হলো এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে উভয় অবস্থায় বিপদমুক্ত থাকার চেষ্টা করা। এ কথাগুলো গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য আমরা মুক্তমনের বুদ্ধিমানদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি। এতে তাঁরা নিজেরা বেঁচে যাবেন অনন্ত অসীম জগতে, যেখানে আর কোন মৃত্যু আসবে না। কুরআনে আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন :

وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ (وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ (فاطر: 36-37

আর যারা অস্বীকার করবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের জন্য মৃত্যুর আদেশও দেওয়া হবে না যে তারা মরে যাবে এবং শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমরা এভাবেই প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি। যেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, হে প্রভু! আমাদের বের করে নাও এখান থেকে, (এবার) আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা আর করব না। আল্লাহ তা‘আলা উত্তর দেবেন, আমি কি তোমাদেরকে পূর্বেই সময় দেই নি, যখন যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে ? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিলেন। এবার আজাব ভোগ কর। মূলত: জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা-ফাতের: ৩৬-৩৭)

একটি বিতর্কসভার কাহিনী

আমরা একজন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদের সাথে এক নাস্তিকের বিতর্ক-সভার বর্ণনা দিয়ে এই আলোচনা শেষ করছি। এক বিরাট জনসমাবেশে উক্ত নাস্তিকের সাথে তার বিতর্কের প্রোগ্রাম ঠিক হলো। কিন্তু উক্ত ইসলামি চিন্তাবিদ অনেক দেরিতে উপস্থিত হলেন। নাস্তিক ভদ্রলোক বলল, এত দেরি করে কেন আসলেন ? আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। উত্তরে তিনি বললেন, আমরা আসার পথে ছিল একটি নদী। পারাপারের উপায় ছিল না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ কি দেখলাম ! আমার সম্মুখেই একটা বৃক্ষ গজাচ্ছে। এ বৃক্ষটা অল্প সময়েই বড় হয়ে গেল। অত:পর আসল একটা কুড়াল। এই কুড়ালটি গাছটিকে কেটে ফেলল। তার পর দেখলাম আসল করাত। করাত গাছটিকে ছিলে তক্তা বানিয়ে ফেলল। অত:পর পেরেক হাতুড়ি ইত্যাদি এসে গেল। আর তৈরি হয়ে গেল নৌকা। সে নৌকাটি আমার সম্মুখে চলে আসল এবং সে নৌকা দিয়েই আমি পার হয়ে আসলাম। এতে একটু দেরি হয়ে গেল বৈকি ? নাস্তিক চিৎকার করে উঠল, সাহেব আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন? এতগুলো কাজ কীভাবে নিজে নিজে হয়ে গেল ? চিন্তাবিদ বললেন, এটাই হচ্ছে আপনার বিতর্ক সভার উত্তর। আপনি কীভাবে চিন্তা করতে পারলেন যে, এই বিশাল সৃষ্টি জগতে গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ-পৃথিবী, আলো-বাতাস, গাছ-পালা, মানুষ, পশু-পাখি, অসংখ্য জীব-জন্তু এসব কিছু নিজে নিজেই তৈরি হয়ে গেল ? উত্তর শুনে নাস্তিক হতবাক হয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করল এর পিছনে একজন শক্তিশালী সুনিপুণ কারিগর অবশ্যই আছেন। আর তিনিই হচ্ছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ, এ জগতের সৃষ্টিকর্তা ও তার একমাত্র মালিক।

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ مَاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (البقرة: 163

নিঃসন্দেহে আসমান জমিনের সৃষ্টির মাঝে, রাত্রি ও দিনের আবর্তনের মাঝে, মহাসাগরে ভাসমান জাহাজসমূহে, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়-(এ সবকিছুতে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন), আরো রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার বর্ষণ করা বৃষ্টির পানির মাঝে, ভূমির নির্জীব হওয়ার পর তিনি এ পানি দ্বারা তাতে নতুন জীবন দান করেন, অত:পর এই ভূখণ্ডে সব ধরনের প্রাণের আবির্ভাব ঘটান। অবশ্যই বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি করার মাঝে এবং সেই মেঘমালা যাকে আসমান জমিনের মাঝে অনুগত করে রাখা হয়েছে -তার মাঝে সুস্থ বিবেকবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (বাকারাহ ১৬৩ )

কালামে পাকের এই একটিমাত্র আয়াতে বিধৃত আল্লাহ পাকের এই নিদর্শন সমূহ চিন্তাশীলদের মনোযোগ আকর্ষণ করে :

  • (ক) আসমান জমিনের সৃষ্টি।
  • (খ) রাত্রি এবং দিনের পার্থক্য।
  • (গ) সাগরে ভাসমান জাহাজ সমূহের মধ্যে মানবকল্যাণ।
  • (ঘ) মহান আল্লাহ কর্তৃক আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের পর বিরান ভূমির সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠা এবং সেখানে সব ধরনের প্রাণী আবির্ভূত হওয়া।
  • (ঙ) বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি
  • (চ) মেঘমালাকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে অনুগত করে রাখা।

সমাপ্তি

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


হার্ট একটি সূক্ষ্ম জেনারেটর

দ্বিতীয় শক্তিশালী বস্তু হচ্ছে জেনারেটর, স্বয়ংক্রিয় শক্তি উৎপাদন যন্ত্র। আমরা একে বলি হার্ট কিংবা হৃদ্‌যন্ত্র। মানব দেহের বাম পাশে সামনের দিকে পেটের একটু উপরে এই ছোট অংশটি হচ্ছে মানবদেহের সর্বাধিক জরুরি অংশ। মানব সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে এটিই সর্ব প্রথম তৈরি করা হয়েছে। তাই বলা যায় এটিই সৃষ্টির শুরু। আবার এর তৎপরতা বন্ধের মাধ্যমে মানবীয় জীবনের ঘটে অবসান। এ জেনারেটর যখন অচল হয়ে যায় তখন দেহের অন্যান্য সব কটি যন্ত্র চালু থাকলেও মূল মানুষটিকে আর জীবন্ত বলা যায় না। ভিন্নভাবে বললে, এ হার্টই হচ্ছে মানুষের জীবন। এর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে এর ফলে শরীরে অন্যান্য যন্ত্রও মাঝে মাঝে তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেমন, শরীরের যে কোটি কোটি সেলকে বলা হয়েছে গরম-ঠান্ডা অনুভব করার কাজে তৎপর থাকার জন্য, এই মনের শক্তির কাছে তা-ও তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই মন কিংবা হৃদয়টাই হচ্ছে মানুষের আসল শক্তি। এটা ভালো তো সব ভালো, এর কথাই আসল কথা। আমরা যে দেহ নিয়ে চলি, যে চোখ দিয়ে দেখি, যে কান দিয়ে শুনি, যে মুখ দিয়ে কথা বলি তার প্রতিটি অংশই হচ্ছে এক-একটি গবেষণার সমুদ্র। চোখ দিয়ে আমরা প্রাথমিক ভাবে যা দেখি তা তো থাকে চিত্রের নেগেটিভ। কোন কুশলী আমাদের ব্রেনে এই চিত্রকে পজিটিভ করে পেশ করে ? কান দিয়ে হাজার কথা একত্রে শুনি কিন্তু কে এর ভিতরে ওয়েভ-গুলোকে সুবিন্যস্ত করে রাখে ? এক কথার সাথে অন্য কথার সংঘাত হয় না কেন ? জিহ্বা দিয়ে যখন কথা বলি তখন তার এক লক্ষ সতের হাজার সেল একত্রে এসে কীভাবে আমার কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয় ? কে সেই মহান সৃষ্টি-কুশলী, মানুষ ছাড়া যিনি অন্য কোনো প্রাণীর জিহ্বায় এ সেলগুলো তৈরি করেননি ?

পশু-পাখির বিজ্ঞান

আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিমানদেরকে ঠিক সেভাবেই আহ্বান করছি যেভাবে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানীদের আহ্বান করেছেন। আমরা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় আল্লাহর একটা নিদর্শন ও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে পারব না বলে সেদিক যাচ্ছি না। পশুপক্ষী ও মৌমাছির কথাই ধরা যাক। কে শিক্ষা দিল তাকে এ ধরনের কূটকৌশল, এ সম্পর্কে আমরা একজন জগদ্‌বিখ্যাত বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতির অংশ-বিশেষ এখানে তুলে ধরছি। নিউইয়র্ক বিজ্ঞান একাডেমীর চেয়ারম্যান বিজ্ঞানী ক্রেসী মরিসন মানুষ একাকী বাস করে না-গ্রন্থে বলেন, আপন জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তনে পাখিকুলের প্রচণ্ড সহজাত ঝোঁক থাকে। তোমার ঘরের দরজার পাশেই যে চড়ুই-এর বাসা, সে শরৎকালে দক্ষিণে চলে যাবে, কিন্তু পরবর্তী বসন্তেই সে ফিরে আসবে। সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের (অর্থাৎ আমেরিকার) অধিকাংশ পাখি দক্ষিণ দিকে চলে যায়। অধিকাংশ সময় তারা সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রায় হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে। কিন্তু তারা তাদের পথ হারায় না বা ঠিকানা ভুলে না। আর পত্রবাহক পায়রা যখন কোন দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণকালে নিত্য-নতুন শব্দ শুনতে শুনতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, তখন ক্ষণিকের জন্য আশ-পাশে চক্কর দেয় এবং তার পরেই সে নিজের গন্তব্য স্থানের দিকে নির্ভুলভাবে পাড়ি জমায়।

প্রকৌশলী মৌমাছির সূক্ষ্ম কৌশল

গাছ-পালার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়-ঝঞ্ঝা যখন মৌমাছির পরিচিত সকল আলামত নষ্ট করে দেয়, তখনও মৌমাছি পালনে ব্যবহৃত কাঠামোতে বিভিন্ন আকারের বহু সংখ্যক কক্ষ বানায়। এগুলোর মধ্য থেকে ছোট ছোট কক্ষ সাধারণ শ্রমিকদের এবং সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে পুরুষ মৌমাছির জন্য। রানি মৌমাছি পুরুষদের জন্য নির্ধারিত কুঠরিগুলিতে অনুৎপাদনশীল ডিম পাড়ে, অথচ স্ত্রী জাতীয় শ্রমিক মৌমাছিও অপেক্ষমাণ রানি মৌমাছিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোতে উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। আর যে সব স্ত্রী জাতীয় মৌমাছি নতুন প্রজন্মের আগমনের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিন কাটানোর পর স্ত্রীর ভূমিকায় পরিবর্তিত দায়িত্ব গ্রহণ করে, তারা শিশু মৌমাছির জন্য খাদ্য তৈরি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। মধু ও তার রেণু চিবানোর অগ্রিম পরিপাকের মাধ্যমে তারা এ কাজটি সম্পন্ন করে। এরপর পুরুষ ও স্ত্রী মৌমাছিদের বয়স বাড়ার পর এক পর্যায়ে তারা চিবানো ও অগ্রিম পরিপাকের কাজ থেকে অবসর নেয়। তারা তখন মধু ও রেণু ছাড়া আর কিছুই অন্যদের খাওয়ায় না। যে সকল স্ত্রী মৌমাছি এভাবে কাজ করে, তারা শ্রমিকে পরিণত হয়। রানি মৌমাছির কক্ষগুলিতে যেসব স্ত্রী-মৌমাছি থাকে, তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকে চিবানো ও অগ্রিম পরিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আর এ কাজ যারা করে তারা একদিন মৌমাছিদের রানি হয়ে যায়। পরে শুধু এরাই উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। এই পৌনঃপুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ কক্ষ ও বিশেষ বিশেষ ডিমের প্রয়োজন হয়। অনুরূপ খাদ্য পরিবর্তনের বিস্ময়কর প্রভাবেরও প্রয়োজন হয়। আর এ প্রক্রিয়া সমূহের জন্য যা অত্যাবশ্যক, তা হলো ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করা, বাছ বিচার করে খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত তথ্য বাস্তবায়ন করা। এই পরিবর্তনগুলো বিশেষভাবে একটি সামষ্টিক জীবনে কার্যকর হয়, যা তাদের অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য। এ জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা অত্যাবশ্যক, তা এ সামষ্টিক জীবন শুরু করার পর অনিবার্যভাবে অর্জিত হয়ে যায়। অথচ এই জ্ঞান ও দক্ষতা জন্মগতভাবে কোন মৌমাছির সত্তা ও তার টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য নয়। এ থেকে বুঝা যায় যে, বিশেষ বিশেষ অবস্থায় খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের চেয়েও মৌমাছির বেশ। কি বিস্ময়কর পরিকল্পনা ! কে এই পরিকল্পনার ইঞ্জিনিয়ার ? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক উচ্চকণ্ঠে বলে উঠবে যে, একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ এটা করতে পারেন। অন্য কারো দ্বারা এটা সম্ভব নয়। বোকা নাস্তিকরা বলে এটা নাকি প্রকৃতি। কিন্তু প্রশ্ন, এই প্রকৃতিটা কে তৈরি করল ? এ ধরনের প্রশ্ন আর উত্তর চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত একখানেই গিয়ে শেষ হবে, তা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন- আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন : পর্বত-গাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু ডালে গৃহ তৈরি কর, এরপর সর্বপ্রকার ফল মূল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে নিঃসৃত হয় নানাবিধ পানীয়, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার, নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা নহল, আয়াত: ৬৯)

মধুর মধ্যে নিহিত প্রকাশ্য ও গোপন সত্য

মধু সম্পর্কে আল্লাহ পাকের বাণীতে বলা হয়েছ:

ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (النحل: 67

মানুষের জন্য আরোগ্য। (সুরা নহল: ৬৯)

এখানে আল্লাহপাক আরোগ্যের কথা বলেছেন কিন্তু কোন বিশেষ অসুখের নাম নেননি। অতএব এর ব্যাপ্তি বিশাল। এর ক্ষেত্র সীমিত নয়। অসীম। বরং মানুষের যাবতীয় ব্যাধি বলতে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক-সবই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কারণ মানুষ একাধারে বস্তু ও আত্মার সমষ্টি। আর এ জন্যই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যত প্রকারের অসুখ মানুষের হোক না কেন, তার সূচনা হয় তার মন বা আত্মা থেকে এবং তার পরিণতি বা প্রতিক্রিয়ায় দেহ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এখন আসুন, আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি অনুযায়ী মধুর মধ্যে নিহিত মূল রহস্য সম্পর্কে বুঝতে গিয়ে, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার পর্যালোচনা করে, দেখি। “সকল মানুষের মানুষের জন্য আরোগ্য – এ কথাটি দ্বারা আল্লাহ তাআলা বুঝাতে চেয়েছেন : মধু মানুষের অন্তরাত্মা, জীবন এবং শরীরের জন্য আরোগ্য বা নিরাময় দানকারী। কিন্তু কীভাবে ? এ প্রসঙ্গে মধুর সৃষ্টি এবং মৌচাকে যে নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে তা বুঝার জন্য নিজেদের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তাআলা মৌমাছির নিকট এলহামের মাধ্যমে জানিয়েছেন- খাও সকল ফলমূল থেকে ।

অর্থাৎ, সকল প্রকার ফলের নির্যাস থেকে খাও এবং সেই সব নির্যাসের মধ্যে নিরাময়কারী সুধা তোমাদের পেটের কারখানাতে রেখে তাকে শক্তিশালী কর। আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ঐ আহরিত নির্যাস অবশেষে মানবমণ্ডলীর ব্যাধি সমূহের জন্য পরম আরোগ্য দানকারী মধুতে পরিণত হয়। ফুলের রস, পাতা এবং বৃক্ষ ছাল ও মূল থেকে মধু হয় না। এই সঞ্জীবনী সুধার জন্য বিশ্ব-সম্রাটের নির্দেশে বিশেষ বিশেষ উপাদান সমন্বয়ে প্রক্রিয়াকরণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। আর এ জন্যই এই সুধার মাঝে কোন ভেজাল, ভ্রান্তি বা ত্রুটির কোন সম্ভাবনা নেই। একটু চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীর সকল চিকিৎসাবিদ একত্রিত হয়ে কোন রোগীর জন্য যদি কোন ওষুধ নির্বাচন করে, তবু তারা নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারবে না যে ঐ ওষুধ শতকরা একশত ভাগ কার্যকরী হবে, অথবা ঐ ঔষধের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। আজকের উন্নত বিশ্বের ডাক্তারগণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছেন বলে দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক রোগের ওষুধ হয়তো ঐ রোগকে উপশম করছে, কিন্তু তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আরও বহু অসুখের জন্ম দিচ্ছে। অথচ মধু সম্পর্কে সবজান্তা ও সর্বময় ক্ষমতার মালিক নিজেই ঘোষণা দিচ্ছেন-“মানবমণ্ডলীর জন্য আরোগ্য”। যেমন সবাই জানেন, মৌমাছিরা সর্বপ্রকার সবুজ বৃক্ষের ফুলের খুশবু এবং ওইসব গাছ-গাছালির মধ্যে নিহিত জীবনী শক্তিসমূহ ভক্ষণ করে নিজেদের পেটের মধ্যে এক বিশেষ স্থানে লালা তৈরি করে, আর তাকেই আমরা মধু বলি। সুতরাং, বুঝা গেল সর্বপ্রকার ফল ফুল এবং ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে উৎপন্ন পত্রপল্লবের স্বাদ ও গন্ধ সমন্বয়ে-স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার অদৃশ্য তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় এই মহামূল্যবান পানীয়। এসব গাছপালা, ফল ও ফুলের মধ্যে অবস্থিত খুশবু ও স্বাদের সঠিক উপকারিতা বা তাৎপর্য খুব কম মানুষই জানে বা চিন্তা করে। এজন্য যারা মধু সেবন করে তাদের আত্মা ও মেধা-মননের গভীরে মধু প্রভাব বিস্তার করে। তারপর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং প্রতিটি লোমকূপে। অত:পর আত্মা ও অবয়বে মধু ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত পবিত্র প্রাণশক্তি সর্বাগ্রে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং ঐ বিশুদ্ধ রক্তের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয় সকল ধমনিতে, ফলে পবিত্রতার এ অমিত তেজ এবং অদৃশ্য অমোঘ শক্তি উদ্দীপ্ত করে অকল্পনীয়ভাবে এবং মুক্ত করে তাকে বহু জটিল রোগ ব্যাধি থেকে। আল্লাহপাক পাক কোরআনে মধুর বিভিন্ন রঙের উল্লেখ করেছেন।

এইভাবে রং মানুষের জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে। আমাদের মন মস্তিষ্কের মধ্যে চিন্তা করার জন্য যে কোষগুলি কাজ করে সেগুলির উপর সৃষ্টি জগৎ এবং তার বাহির থেকে আগত জ্যোতি এবং নুরের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রং এবং মধুর উজ্জ্বলতার মধ্যে রয়েছে আরোগ্য দান করার জন্য সর্বপ্রধান ভূমিকা ; তাই এরশাদ হচ্ছে-এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রং, (যা) আরোগ্য মানবমণ্ডলীর জন্য।”(সুরা নহল: ৬৯ ) সেই বিখ্যাত লেখক মি. ক্রেসী মরিসন তাঁর গ্রন্থে আরো যেসব উদাহরণ পেশ করেছেন তার মধ্যে কুকুরের অনুসন্ধানী নাক সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। অথচ মানুষ আজ পর্যন্ত এমন কোন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি, যা তার নিজের দুর্বল ঘ্রাণশক্তিকে তীব্রতর করতে পারে। তিনি আরো বলেছেন, জলজ মাকড়সা নিজস্ব জাল দিয়ে নিজের জন্য বেলুন আকৃতির যে বাসা তৈরি করে থাকে, তা মানুষের চিন্তা-শক্তিরও অনেক ঊর্ধ্বে।

সলোমান মাছ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, কীভাবে বছরের পর বছর সমুদ্রে কাটাবার পর এই মাছ তার জন্মস্থান নদীতে ফিরে আসে। তার চেয়ে আরো বিস্ময়কর ঘটনা এ লেখক উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে জলজ সাপের বিস্ময়কর সফর। এ সাপের স্বভাব ঠিক সলোমান মাছের বিপরীত। এই প্রাণীটি বয়স হলেই নিজ পুকুর, নদী, খাল-বিল হতে হিজরত করে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে চলে যায়। এই ধরনের আরো অনেক তথ্য দিয়ে তিনি তাঁর গ্রন্থকে একটি বিস্ময়কর গ্রন্থে পরিণত করেছেন। সত্যিই মহান আল্লাহর এই কুদরতি, সৃষ্টি-কুশলতা ও কারিগরি নৈপুণ্য তাঁর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করতে মানুষের বিবেককে বাধ্য করে।

রেশম বা তুঁত পোকা

তাহলে বল, তোমাদের প্রভুর কোন নেয়ামত তোমরা অস্বীকার করবে ? (সুরা আর রাহমান) আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামতের মধ্যে রেশম বা তুঁত পোকা এক উত্তম নেয়ামত। রেশম পোকা, তার নিজেরই দেহ নিঃসৃত আঠা দ্বারা কত মজবুত, মোলায়েম মসৃণ ও সুন্দর সোনালি রঙের সুতা তৈরি করে, যা চিন্তা করলে হয়রান হতে হয়। অথচ মানুষ ঐ সুতা লাভ করার জন্য কত নির্দয়ভাবে সেই পোকা হত্যা করে। সেই সুতা দিয়ে মূল্যবান কাপড় তৈরি করে ব্যবসা করে এবং অর্থ রোজগার করে। নিষ্পাপ এই ক্ষুদ্র কীটটি মানুষের জন্য মূল্যবান সুতা সরবরাহ করা ছাড়া জ্ঞান ও কৌশলগত কত শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে, সচরাচর কেউ হিসাব করে না। সুতা বানাতে গিয়ে তাকে কোন্‌ কোন্‌ পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, আর সেই বুদ্ধি হিকমতের পিছনে কোন সে মহান কুশলীর অদৃশ্য হাত কাজ করে, তা অপরিণামদর্শী লঘুচেতা ও ভাসা ভাসা জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসাব করে না। যদি ঐ কীটের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও বুদ্ধির কথা মানুষ চিন্তা করত, তাহলে সে তার মনযিলে মকসুদ, অর্থাৎ আখেরাতের জিন্দিগির রহস্য বুঝতে পারতো, অনুধাবন করতে পারতো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন হাদিসের মাধ্যমে প্রদত্ত জীবন পদ্ধতির তাৎপর্য ও উপকারিতা। সর্বোপরি জানতে পারতো সবকিছুর পিছনে দয়াময় পরওয়ারদেগারের জ্ঞান, ইচ্ছা ও হিকমত প্রচ্ছন্ন থাকার কথা এবং এর ফলে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত তার ঈমান ও সত্যপথে টিকে থাকার অবিচলতা। এবার আমরা সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে দেখি ঐ ক্ষুদ্র কীটের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ইলহামী জ্ঞানের দিকে। মহান রব্বুল ইজ্জতের অদৃশ্য ইশারাতে ঐ পোকা খায় আঠাযুক্ত পত্রপল্লব, যেমন কুল বা বরই পাতা, তুঁত-পাতা ইত্যাদি। এসব আঠাযুক্ত পাতা তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থিত আরও কিছু উপাদানের সংমিশ্রণে এই মূল্যবান সুতা তৈরি হয় এবং তাকে জীবন সঞ্জীবনী নেয়ামতের অধিকারী বানায়। এইভাবে প্রকাশ পায় তার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের করুণারাশির ঝরনাধারা। রেশম-কীট জন্ম-লগ্নে ছোট একটি পিঁপড়ার মত ক্ষুদ্র থাকে এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে, বসন্ত সমাগমের সাথে সাথে দিবালোকে বেরিয়ে আসে। এ সময়ে গাছে গাছে দেখা দেয় পত্রপল্লবের কুঁড়ি ও কচি-কচি মনোরম পাতা। রেশম কীটের এই বাচ্চাগুলি ঐ তুলতুলে পাতাগুলি খেতে খেতে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে এবং শীঘ্রই পূর্ণ পোকায় পরিণত হয়। তারপর রাব্বুল আলামিনের অদৃশ্য ইশারায় নিরাপদ বাসস্থান লাভের আশায় ঘর তৈরির দিকে তারা পারপূর্ণ মনোযোগ দেয়। সে ঘর এমনই সুপরিকল্পিত ও সুগঠিত এবং এত সুন্দর যে, দেখলে মনে হয়-এ ঘরের পূর্ণ ছবি তার নিজের মধ্যে খোদিত ছিল এবং সেটাই এখন বাস্তবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এভাবে ঘরগুলি নজরে পড়তে থাকে। এসব ঘরের মধ্যে তারা আরামে শুয়ে পড়ে এবং মুখ নিঃসৃত আঠা দ্বারা প্রস্তুত সূক্ষ্ম সুতার বেষ্টনী দিয়ে ঘরের আচ্ছাদন বাড়াতে থাকে। ঘরের একটি অংশ হাওয়া বা অক্সিজেন প্রবেশের জন্য খোলা রাখে। কবুতরের ডিমের মত ঘরের প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে ক্লান্ত-শ্রান্ত কীটগুলি পরিপূর্ণ বিশ্রামের জন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে শুয়ে পড়ে। এরপর শীত মৌসুমের আগমনে কীটগুলি নিজ নিজ ঘরের মধ্যেই অদৃশ্য জগতের উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যায়।

কী মজার ব্যাপার ! ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ পড়ার সাথে সাথে, হঠাৎ করে দেখা যায়, পোকাগুলি নিজ নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে এবং তাদের বাচ্চাদেরকে ডিম থেকে বের করে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ছেড়ে দিচ্ছে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন, শীত আসছে-কে পূর্বাহ্নে তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয় যে জন্য তারা শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে তড়িঘড়ি ঘর বানাতে শুরু করে। এবং এত চমৎকার ও মজবুত কেল্লার মত ঘর বানাতে তাদেরকে কে শেখায় ! কে তাদের কে তিনটি মাস ধরে অভুক্ত অবস্থায় বাইরের আলো বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখে ! কে দেয় তাদেরকে এ জ্ঞান বুদ্ধি ও হিকমত ! আবার ফেব্রুয়ারি মাস আসার সাথে সাথে কে তাদেরকে ঐ গভীর নিদ্রা থেকে জাগিয়ে কর্মতৎপর করে তোলে ! আসুন, ঊর্ধ্বলোকে সফরের সাথি ভাইয়েরা, এই রেশম কীটদের প্রদত্ত গায়েবি জ্ঞান সম্পর্কে একবার চিন্তা করুন এবং ভাবুন, কে নিয়ন্ত্রণ করছে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে এবং দুনিয়ার সকল সৃষ্টিসমূহকে।

চলবে……………………

আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ২)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


  • কুফরের সংজ্ঞা

যে মানুষের কথা উপরে বলা হলো, তার মোকাবিলায় রয়েছে আর এক শ্রেণির মানুষ। সে মুসলিম হয়েই পয়দা হয়েছে এবং না জেনে, না বুঝে জীবনভর মুসলিম হয়েই থেকেছে। কিন্তু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। কুফর শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোককে কাফের (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পরদা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামি স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অঙ্গ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামি স্বভাবের উপর। তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়া চলছে ইসলামের পথ ধরে। কিন্তু তার বুদ্ধির উপর পড়েছে পরদা। সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বিপরীতমুখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে। এখন বুঝা গেল, যে মানুষ কাফের, সে কত বড় বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে।

কুফরের অনিষ্ট

কুফর হচ্ছে এক ধরনের মূর্খতা, বরং, কুফরই হচ্ছে আসল ও নিখাদ মূর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে অজ্ঞ হয়ে থাকলে তার চেয়ে বড় মূর্খতা আর কি হতে পারে ? এক ব্যক্তি দিন-রাত দেখেছে, সৃষ্টির এত বড় বিরাট কারখানা চলেছে, অথচ সে জানে না, কে এ কারখানার স্রষ্টা ও চালক। কে সে কারিগর, যিনি কয়লা, লোহা, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম ও আরো কয়েকটি পদার্থ মিলিয়ে অস্তিত্বে এনেছেন মানুষের মত অসংখ্য অতুলনীয় সৃষ্টিকে ? মানুষ দুনিয়ার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছে এমন সব বস্তু ও কার্যকলাপ, যার ভিতরে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিতবিদ্যা, রসায়ন ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অপূর্ব পূর্ণতার নিদর্শন, কিন্তু সে জানে না, অসাধারণ সীমাহীন জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ কোন সে সত্তা চালিয়ে যাচ্ছেন সৃষ্টির এ সব কার্যকলাপ। ভাবা দরকার যে মানুষ জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরের খবরও জানে না, কি করে তার দৃষ্টির সামনে উন্মুক্ত হবে সত্যিকার জ্ঞানের তোরণ-দ্বার ? যতই চিন্তা-ভাবনা করুক, যতই অনুসন্ধান করুক-সে কোন দিকেই পাবে না সরল সঠিক নির্ভরযোগ্য পথ। কেননা তার প্রচেষ্টার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি সব স্তরেই দেখা যাবে অজ্ঞতার অন্ধকার। কুফর একটি জুলুম, বরং সব চেয়ে বড় জুলুমই হচ্ছে এ কুফর। জুলুম কাকে বলে ? জুলুম হচ্ছে কোন জিনিস থেকে তার সহজাত প্রকৃতির খেলাপ কাজ জবরদস্তি করে আদায় করে নেয়া। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুনিয়ার যত জিনিস রয়েছে, সবই আল্লাহর ফরমানের অনুসারী এবং তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাত) হচ্ছে ইসলাম অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। মানুষের দেহ ও তার প্রত্যেকটি অংশ এ প্রকৃতির উপর জন্ম নিয়েছে। অবশ্য আল্লাহ এসব জিনিসকে পরিচালনা করবার কিছুটা স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন কিন্তু প্রত্যেকটি জিনিসের সহজাত প্রকৃতির দাবি হচ্ছে এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কুফর করছে সে তাকে লাগাচ্ছে তার প্রকৃতি বিরোধী কাজে। সে নিজের দিলের মধ্যে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রেম ও ভীতি পোষণ করবে। সে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর দুনিয়ায় তার আধিপত্যের অধীন সব জিনিসকে কাজে লাগাচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, অথচ তাদের প্রকৃতির দাবি হচ্ছে তাদের কাছ থেকে আল্লাহর বিধান মুতাবিক কাজ আদায় করা। এমনি করে যে লোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রত্যেকটি জিনিসের উপর, এমন কি নিজের অস্তিত্বের উপর ক্রমাগত জুলুম করে যাচ্ছে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে ?

কুফর কেবল জুলুমই নয় ; বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামিও বটে। ভাবা যাক, মানুষের আপন বলতে কি জিনিস আছে। নিজের মস্তিষ্ক সে নিজেই পয়দা করে নিয়েছে না আল্লাহ পয়দা করেছেন ? নিজের দিল, চোখ, জিহ্বা, হাত-পা, আর সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবকিছুর স্রষ্টা সে নিজে না আল্লাহ ? তার চার পাশে যত জিনিস রয়েছে, তার স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ ? এসব জিনিস মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী করে তৈরি করা এবং মানুষকে তা কাজে লাগাবার শক্তি দান করা কি মানুষের নিজের না আল্লাহর কাজ ? সকলেই বলবে, আল্লাহরই এসব জিনিস, তিনিই এগুলো পয়দা করেছেন, তিনিই সবকিছুর মালিক এবং আল্লাহর দান হিসেবেই মানুষ আধিপত্য লাভ করেছে এসব জিনিসের উপর। আসল ব্যাপার যখন এই, তখন যে লোক আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত চিন্তা করার সুবিধা আদায় করে নেয়, তার চেয়ে বড় বিদ্রোহী আর কে ? আল্লাহ তাকে চোখ, জিহ্বা, হাত-পা এবং আরো কত জিনিস দান করেছেন, তার সব কিছুই সে ব্যবহার করেছে আল্লাহর পছন্দ ও ইচ্ছা বিরোধী কাজে।

যদি কোন ভৃত্য তার মনিবের নিমক খেয়ে তার বিশ্বাসের প্রতিকুল কাজ করে, তবে তাকে সকলেই বলবে নেমকহারাম। কোন সরকারী অফিসার যদি সরকারের দেয়া ক্ষমতা সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে থাকে, তাকে বলা হবে বিদ্রোহী। যদি কোন ব্যক্তি তার উপকারী বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে, সকলেই বিনা দ্বিধায় তাকে বলবে অকৃতজ্ঞ

কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার বাস্তবতা কতখানি ? মানুষ মানুষকে আহার দিচ্ছে কোত্থেকে ? সে তো আল্লাহরই দেয়া আহার। সরকার তার কর্মচারীদেরকে যে ক্ষমতা অর্পণ করে, সে ক্ষমতা এলো কোত্থেকে ? আল্লাহই তো তাকে রাজ্য পরিচালনার শক্তি দিয়েছেন। কোন উপকারী ব্যক্তি অপরের উপকার করছে কোত্থেকে ? সবকিছুই তো আল্লাহর দান। মানুষের উপর সবচেয়ে বড় হক বাপ-মার। কিন্তু বাপ-মার অন্তরে সন্তান বাৎসল্য উৎসারিত করেছেন কে ? মায়ের বুকে স্তন দান করেছেন কে ? বাপের অন্তরে কে এমন মনোভাব সঞ্চার করেছেন ? যার ফলে তিনি নিজের কঠিন মেহনতের ধন সানন্দে একটা নিষ্ক্রিয় মাংসপিণ্ডের জন্য লুটিয়ে দিচ্ছেন এবং তার লালন পালনের ও শিক্ষার জন্য নিজের সময়, অর্থ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোরবান করে দিচ্ছেন ?

যে আল্লাহ মানুষের আসল কল্যাণকারী, প্রকৃত বাদশাহ, সবার বড় পরওয়ারদেগার, মানুষ যদি তাঁর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে, তাঁকে আল্লাহ বলে না মানে, তাঁর দাসত্ব অস্বীকার করে, আর তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামি আর কি হতে পারে। কখনও মনে করা যেতে পারে না যে, কুফরি করে মানুষ আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারছে। যে বাদশার সাম্রাজ্য এত বিপুল-বিরাট যে বৃহত্তম দূরবীন লাগিয়েও আমরা আজও স্থির করতে পারিনি কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ। যে বাদশাহ এমন প্রবল প্রতাপশালী যে তাঁর ইশারায় আমাদের এ পৃথিবী, সূর্য, মঙ্গলগ্রহ এবং আরো কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ বলের মত চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ; যে বাদশাহ এমন অফুরন্ত সম্পদশালী যে, সারা সৃষ্টির আধিপত্যে কেউ তার অংশীদার নেই ; যে বাদশাহ এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল যে সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারুর মুখাপেক্ষী নন, মানুষের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে তাকে মেনে বা না মেনে সেই বাদশার কোন অনিষ্ট করবে ? কুফর ও বিদ্রোহের পথ ধরে মানুষ তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারে না, বরং নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে। কুফর ও নাফারমানীর অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে এই যে, এর ফলে মানুষ চিরকালের জন্য ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে যায়। এ ধরনের লোক জ্ঞানের সহজ পথ কখনও পাবে না, কারণ যে জ্ঞান আপন স্রষ্টাকে জানে না, তার পক্ষে আর কোন জিনিসের সত্যিকার পরিচয় লাভ অসম্ভব। তার বুদ্ধি সর্বদা চালিত হয় বাঁকা পথ ধরে। কারণ, সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে গিয়ে ভুল করে, আর কোন জিনিসকে সে বুঝতে পারে না নির্ভুলভাবে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে তার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা অবধারিত। তার নীতিবোধ, কৃষ্টি, সমাজ ব্যবস্থা, তার জীবিকা অর্জন পদ্ধতি, শাসন পরিচালন ব্যবস্থা ও রাজনীতি- এক কথায়, তার জীবনের সর্ববিধ কার্যকলাপ বিকৃতির পথে চালিত হতে বাধ্য। দুনিয়ার বুকে সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, অত্যাচার উৎপীড়ন করবে, বদখেয়াল অন্যায়-অনাচার ও দুষ্কৃতি দিয়ে তার নিজের জীবনকেই করে তুলবে তিক্ত-বিস্বাদ। তারপর এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন আখেরাতে পৌঁছবে, তখন জীবনভর যেসব জিনিসের উপর সে জুলুম করে এসেছে, তারা তার বিরুদ্ধে নালিশ করবে। তার মস্তিষ্ক, দিল, চোখ, তার কান, হাত-পা-এক কথায়, তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর আদালতে অভিযোগ করে বলবে : এ আল্লাহদ্রোহী জালিম তার বিদ্রোহের পথে জবরদস্তি করে আমাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছে। যে দুনিয়ার বুকে সে নাফরমানির সাথে চলেছে ও বসবাস করেছে, যে জীবিকা সে অবৈধ পন্থায় অর্জন করেছে, যে সম্পদ সে হারাম পথে রোজগার করে হারামের পথে ব্যয় করেছে, অবাধ্যতার ভিতর দিয়ে যে সব জিনিস সে জবরদখল করেছে, যেসব জিনিস সে তার বিদ্রোহের পথে কাজে লাগিয়েছে, তার সবকিছুই ফরিয়াদি হয়ে হাজির হবে তাঁর সামনে এবং প্রকৃত ন্যায় বিচারক আল্লাহ সেদিন মজলুমদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারে বিদ্রোহীকে দেবেন অপমানকর শাস্তি।

বিশাল ঊর্ধ্ব-জগৎ ও গ্যলাক্সি

ঊর্ধ্ব-জগৎ বা মহাশূন্য সম্পর্কে আজ প্রতিটি শিক্ষিত লোকই জানে। সে এক বিশাল জগৎ। যাকে বলা হয় গ্যলাক্সি। বৈজ্ঞানিকগণ এই সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছে, তা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের তুলনায় ক্ষুদ্র একটি বালু-কণার চেয়েও নগণ্য। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। বৈজ্ঞানিকদের বিশ্বাস এ বিশাল গ্যলাক্সিতে এমন সব বৃহদাকার তারকারাজি রয়েছে যার আলো আজও পৃথিবীতে এসে পৌঁছে নি। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, এ ধরনের বৃহদাকার লক্ষ লক্ষ তারকারাজিকে গিলে ফেলতে পারে, এ ধরনের অসংখ্য কূপ রয়েছে এ গ্যলাক্সিতে। যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা কোরআনে ইঙ্গিত করে বলেছেন :

فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ ﴾ وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ (الواقعة: 75-76

আমি এ তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করছি, নিশ্চয়ই এটা এক মহা শপথ। যদি তোমরা জানতে পার।” (সুরা ওয়াকেয়া, আয়াত: ৭৫-৭৬)

সৌরজগৎ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সূর্যকেই নেয়া যাক। মুনিরুদ্দিন আহমাদের এর লেখা বিস্ময়কর তথ্য সংবলিত একটি গ্রন্থ প্রজন্মের প্রহসন থেকে এই উদ্ধৃতিগুলো এখানে পেশ করছি-

সূর্য একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড

সমগ্র সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই সূর্য। বলতে গেলে গোটা সৌরজগৎটা সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘোরা-ফিরা করে, কিন্তু আমরা যারা নিত্য এই জ্বলন্ত প্রদীপটাকে দেখি, এর সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি। সকালে সূর্যের আলো দেখি, এক পর্যায়ে আবার আলোকে ডুবে যেতে দেখি, শীতের সকালে তা আমাদের আরাম দেয়। আবার গ্রীষ্মের প্রখরতায় তা থেকে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি, সব মিলে এটুকুই হচ্ছে আমাদের সাথে তার সম্পর্ক। সূর্য হচ্ছে এ বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি সাধারণ নক্ষত্র, তার প্রখরতা ও উষ্ণতাকে কোনদিনই কোন মানবীয় জ্ঞান পরিমাপ করতে পারেনি। প্রতি সেকেন্ডে ৪০ লক্ষ টন হাইড্রোজেন এর থেকে ছিটকে পড়ছে এমন সব তারকালোকে, যার তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীর বুকে মানব-সভ্যতার বিকাশের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত মানবকুল যতো এনার্জি ব্যয় করেছে তার চেয়ে দশগুণ বেশি এনার্জি প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার চারদিকে বিতরণ করে যাচ্ছে। যে গতিতে সূর্য তার হাইড্রোজেন ছড়াচ্ছে, তা একটি হাইড্রোজেন বোমার তুলনায় ১০ কোটি গুণ বেশি ক্ষমতা ও গতিসম্পন্ন। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার আশে-পাশে যে হিলিয়াম’ নামক তরল গ্যাস তৈরি করছে, তার পরিমাণ হচ্ছে ৫৬০৪ কোটি টন। এর শক্তি ও প্রখরতা এতো বেশি যে, যদি এর সামান্যতমও এই ভূমণ্ডলের কোথাও গিয়ে পড়ে, তাহলে তার ১০০ মাইলের ভেতর কোনো জীবজন্তু থাকলে তা জ্বলে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে। এই জ্বলন্ত সূর্যের সম্মুখ ভাগ থেকে প্রতি সেকেন্ডে আর একটি জ্বালানি গ্যাস নির্গত হয়, বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন স্পাইকুলাস’।এই গ্যাসের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মাইল। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এক অদ্ভুত বিকর্ষণশক্তি তাকে মুহূর্তেই আবার সূর্যের কোলে ছুঁড়ে মারে। এই যে অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডলী বানিয়ে রাখা হয়েছে, যার একটি অনু-পরমাণুও যদি ভূ-গোলকে সরাসরি ধাক্কা লাগে, তাহলে গোটা পৃথিবীটাই জলে-পুড়ে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে বলে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন। কিন্তু পৃথিবীর বুকে আলো বিতরণ করে একে ফলে-ফুলে সাজিয়ে দেয়ার এ আয়োজনটুকু করেছেন কে ? কে এই মহা শক্তিধর, একে এর ধ্বংসক্রিয়ার বদলে গড়ার কাজে লাগিয়ে রেখেছেন যিনি?

মানবীয় শরীর একটি ক্ষুদ্র জগৎ

মূলত: মানুষকে এ ব্যাপারে অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি-ইত্যাদি ছোট ছোট মাত্র কয়েকটির খবর তারা জানে, যা সমুদ্র হতে পাখির ঠোঁটে করে উঠানো এক ফোটা পানির চেয়েও নগণ্য। আজ বৈজ্ঞানিকগণ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সত্যই বলেছেন

– وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا(الإسراء: 85

তোমাদের খুব সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সুরা বনী ইসরাইল: ৮৫)

বিশ্বচরাচর ও ব্যক্তিসত্তা উভয়ের মধ্যে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনাবলী রয়েছে। বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে কুদরতের অনেক নিদর্শন আছে এবং আছে তোমাদের মধ্যেও। তোমরা কি অনুধাবন করবে না ? (সূরা যারিয়াত আয়াত ২০/২১) এখানে নিদর্শনাবলীর বর্ণনায় আকাশ ও সৌরজগতের সৃষ্টির কথা বাদ দিয়ে কেবল ভূপৃষ্ঠের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, এটা মানুষের খুব নিকটবর্তী এবং মানুষ এর উপর বসবাস ও চলাফেরা করে। আলোচ্য আয়াতে এর চাইতেও নিকটবর্তী খোদ মানুষের ব্যক্তিসত্তার প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠে ও ভূ-পৃষ্ঠের সৃষ্ট বস্তু বাদ দাও, খোদ তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে চিন্তা- ভাবনা করলে তোমরা এক একটি অঙ্গকে আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের এক একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তক হিসাবে দেখতে পাবে। তোমরা সহজেই হৃদয়ংগম করতে সক্ষম হবে যে, সমগ্র বিশ্বে কুদরতের যে নিদর্শন রয়েছে, সেইসব যেন মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের মধ্যে সংকুচিত হয়ে রয়েছে। এ কারণেই মানুষের। অস্তিত্বকে ক্ষুদ্র একটি জগৎ বলা হয়। সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টান্ত মানুষের অস্তিত্বের মধ্যে এসে স্থান লাভ করেছে। মানুষ যদি তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমগ্র অবস্থা পর্যালোচনা করে, তবে সে দৃষ্টির সামনে আল্লাহ তা‘আলাকে সদা উপস্থিত দেখতে পাবে। আসুন এবার তা হলে বেশি দুরে নয় একেবারেই নিজ দেহটার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায়। “প্রজন্মের প্রহসন” থেকে এ প্রসঙ্গের আর একটি উদ্ধৃতি এখানে পেশ করা গেল।

মানব শরীর সত্যিই এক অভূতপূর্ব মেশিন। এমন এক মেশিন যার যথার্থ বর্ণনা পেশ করা কোন দিনই কোন মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সম্ভব হবেই বা কি করে, এই শরীর তো কোন মানুষ নিজে বানায়নি যে, সে তার নিজস্ব সৃষ্টির যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্ব আপনাকে বলে দেবে। এই দেহের অভ্যন্তরীণ পরিশীলনের কথাই ধরুন না কেন, আমাদের হার্ট প্রতি মিনিটে ১০ পাউন্ড রক্ত সঞ্চালন করে, ব্যায়ামের সময় হার্টের এই রক্ত- সঞ্চালনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ পাউন্ডে। আমাদের শরীরে যতো রগ, শিরা-উপশিরা রয়েছে তার সবগুলোকে বাইরে এনে একটার সাথে জড়িয়ে লম্বা করতে থাকলে এর পরিমাণ হবে ৬০ হাজার মাইল। অর্থাৎ একটি মানুষের শরীরে শিরা-উপশিরা দিয়ে একজন মানুষ গোটা পৃথিবী প্রায় ৩ বার ঘুরে আসতে পারবে। সাধারণত: মানুষের শরীরে ৬ থেকে ১০ পাউন্ড রক্ত সর্বদা মওজুদ থাকে। রক্তের আবার দু,ধরনের রক্ত-কণিকা। কিছু আছে রেড সেল (লাল কণিকা) যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বহন করে। কিছু আছে হোয়াইট সেল (সাদা কণিকা) যার কাজ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রোগের প্রতিরোধ করা।

তা নিম্নরূপ :—

এক একজন মানুষের রক্তে রেড সেলের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি আর হোয়াইট সেল হচ্ছে আড়াই শত কোটি। অধিকাংশ হোয়াইট সেলের জীবনকাল হচ্ছে মাত্র ১২ ঘণ্টা, রেড সেলগুলো পরিমাণে একটু বেশিই বাঁচে, কোন কোন সেল ১২০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। একজন মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের জন্য যে শিরা বানানো হয়েছে, তার সবগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর জমির প্রয়োজন হবে। এর সব শিরাগুলো কিন্তু আবার একত্রে খোলা রাখা হয় না। তা হলে এক সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে সমস্ত রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে আসবে। এই শরীরের একটি অংশ যেখানে সর্বদাই রক্তের প্রয়োজন, তা হচ্ছে ফুসফুস।তার উপশিরাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সেখানকার রক্তকে পরিশুদ্ধ করে। গড়ে একজন মানুষ সারা জীবনে ৫০ কোটি বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। এই যে রক্তের কথা বললাম তা কী? রক্ত হচ্ছে পনির চেয়ে ঘন একটি পদার্থ, যদিও মানুষের শরীরের ৬০ ভাগই হচ্ছে পনি। এর পরিমাণ গড়ে ১০ গ্যালন। সেই হিসেবে রক্তের পরিমাণ হচ্ছে শতকরা ১০ ভাগ। মানুষের শরীরে আরো বহু ধরনের উপাদান রয়েছে। যেমন মানব দেহে এতো চর্বি আছে, যা দিয়ে ৭টি বড়ো জাতের কেক বানানো যাবে। এই পরিমাণ কার্বন, আছে যে, তা দিয়ে ২৮ পাউন্ড ওজনের এক ব্যাগ কেক বানানো যাবে। এত পরিমাণ ফসফরাস আছে যে, তা দিয়ে ২২ শত ম্যাচ বনানো যাবে। এই সব মিলে মানুষ্য শরীরটা হচ্ছে এক বিচিত্র সংগ্রহ-শালা। এখানে সব কেমিক্যাল আবার একত্রে না থাকলে তাতে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।

যেমন মানুষের খাবারে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়োডিন না থাকে, তাহলে তার গলদেশের নিম্ন-ভাগ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে, পরে এতে মারাত্মক ধরনের রোগ (goitr) দেখা দেবে। একটি শিশুর যখন জন্ম হয় তখন তার শরীরে হাড়ের পরিমাণ থাকে ৩০০৫টি। পরে অবশ্য এক দুটো মিশে পরিমাণ কমে তা ২০৬ এ দাঁড়ায়। ৬৫০টি পেশির দ্বারা হাড়গুলো বেঁধে রাখা হয়। গিরার পরিমাণ একশত। পেশির সাথে যেখানে হাড়ের সম্মিলন ঘটে, তা থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তার প্রতি বর্গইঞ্চি পরিমাণ জায়গার উপর কমপক্ষে ৮ হাজার কেজির মতো বোঝা সহজেই চাপানো যেতে পারে। এই আশ্চর্যজনক মেশিনটাকে ঢেকে রাখা হয়েছে একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক দ্বারা, যার নাম হচ্ছে চামড়া। গড়ে একজন মানুষের শরীরে এই চামড়ার পরিমাণ হচ্ছে ২০ বর্গফুট। এর উপরিভাগে আবার রয়েছে এক কোটি লোমকূপ। আমাদের রুচিবোধের জন্য কোনটা আমরা পছন্দ করি, কোনটা আমরা অপছন্দ করি-এটা বলে দেয়ার জন্য রয়েছে ৯ হাজার ছোট সেল। এগুলোকে যথারীতি সাহায্য করার জন্য রয়েছে আরো ১ কোটি ৩০ লক্ষ নার্ভ সেল। শরীরের বাইরের বস্তুগুলোর অনুভূতির জন্য দিয়ে রাখা হয়েছে ৪০ লক্ষ বহুমুখী সেল। এগুলোই আমাদের বলে দেয় কোনটা গরম, কোনটা ঠান্ডা, কোনটাতে কষ্ট লাগে, কোনটাতে আরাম অনুভূত হয়। এসব মেশিনপত্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মানবদেহের প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি শক্তির। একজন স্বাস্থ্যবান লোক গোটা জীবনে ৫০ হাজার কেজি পরিমাণ খাবার সংগ্রহ করে। পানীয়ের পরিমাণ হচ্ছে ১১ হাজার গ্যালন। যদি সে শহরের অধিবাসী হয়, তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে গড়ে সাত হাজার মাইল। আর যদি সে গ্রামের মানুষ হয় তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে ২৮ হাজার মাইল। এ লক্ষ-কোটি সেল, নার্ভ ও জটিল মেশিনপত্রের সমন্বয়ে তৈরি করা মানুষের শরীর। তার জন্য দুটো মূল্যবান বস্তু রয়েছে। একটি হচ্ছে এর কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ-কক্ষ, আরেকটি হচ্ছে জেনারেটর বা শক্তি উৎপাদন-যন্ত্র।

ব্রেন একটি বিস্ময়কর কম্পিউটার

প্রথমে বলি নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কথা। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কম্পিউটারের চেয়ে হাজার কোটি গুণ জটিল এই ছোট মেশিনটির নাম হচ্ছে ব্রেন। মাত্র তিন পাউন্ড ওজনের এ বস্তুটিকে একটি খুলির মাঝখানে এমনভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে যে, তা গোটা দেহের কোটি কোটি সেনা ও প্রহরীকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এর প্রতিটি কর্মতৎপর সেলের নাম হচ্ছে নিউরন। প্রতি সেকেন্ডে শত শত নিউরন এসে ব্রেনের প্রথম স্তরে জমা হতে থাকে। এগুলো এতো ক্ষুদ্র যে, এর কয়েক শত এক সাথে একটা আলপিনের মাথায় বসতে পারে। এগুলো হচ্ছে এক একটি ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল-যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রকের আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়। আমাদের পেছনে যে মেরুদণ্ড রয়েছে, তার মাধ্যমে তার সারা শরীরের যন্ত্রপাতিগুলোকে সজীব ও তৎপর রাখে। এর আবার স্বতন্ত্র কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। এক এক বিভাগের উপর একেক ধরনের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন কোন অংশকে বলা হয়েছে শোনার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে বলার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে দেখার জন্য। আবার কোন অংশকে বলা হয়েছে অনুভূতিগুলোকে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল টাওয়ারে ট্রান্সমিট করে দেয়ার জন্য। সর্বশেষ এতে আবার বসানো হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তিশালী মেমোরি সেল। যার কাজ নিত্য নতুন সংগ্রহগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় তাকে রিওয়াইন করে মেমোরিগুলোকে সামনে নিয়ে আসা। এই স্মৃতি সংরক্ষণশালা প্রতি সেকেন্ডে ১০টি নতুন বস্তুকে স্থান করে দিতে পারে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বপ্রকারের যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বকে যদি এক জায়গায় একত্র করে এ মেমোরি সেলে রাখা যায়, তাতে এর লক্ষ ভাগের এক ভাগ জায়গাও পূরণ হবে না।

 

চলবে……………