Category Archives: স্বলাত (নামাজ)

নবী করীম [সাঃ]এর নামায আদায়ের পদ্ধতি পর্বঃ ২

নবী করীম [সাঃ]এর স্বলাত আদায়ের পদ্ধতি

১০. আল্ল্লাহু আকবার বলে [সিজদাহ থেকে] মাথা উঠাবে। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া করে রাখবে। দু’হাত তার উভয় রান [ঊরু] ও হাঁটুর উপর রাখবে। এবং নিচের দু’আটি বলবে।

( رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ اَللَّهُمَ اغْفِرْلِيْ، وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَارْزُقْنِيْ وَعَافِنِيْ وَاجْبُرْنِيْ )
উচ্চারণঃ রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী, আল্লাহুমাগফিরলী ওয়ারহামনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী ওয়া আ’ফিনী ওয়াজবুরনী।

অর্থঃ“হে আল্লাহ ! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ ! আমাকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হিদায়েত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে সুস্থতা দান কর এবং আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ কর।”

এই বৈঠকে ধীর স্থির থাকবে যাতে প্রতিটি হাড়ের জোর তার নিজস্ব স্থানে ফিরে যেতে পারে রুকুর পরের ন্যায় সি’র দাঁড়ানোর মতো। কেননা নাবী কারীম [সাঃ] রুকুর পরে ও দু’সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে সি’রতা অবলম্বন করতেন।
১১.আল্ল্লাহু আকবার বলে দ্বিতীয় সিজদাহ করবে। এবং দ্বিতীয় সিজদায় তাই করবে প্রথম সিজদায় যা করেছিল।
১২. সিজদাহ থেকে আল্ল্লাহু আকবার বলে মাথা উঠাবে। ক্ষণিকের জন্য বসবে, যে ভাবে উভয় সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে বসেছিল। এ ধরনের পদ্ধতিতে বসাকে “জলসায়ে ইসতেরাহা” বা আরামের বৈঠক বলা হয়। আলেমদের দু’টি মতের মধ্যে অধিক সহীহ মতানুসারে এ ধরনের বসা মুস্তাহাব এবং তা ছেড়ে দিলে কোন দোষ নেই।“জলসায়ে ইস্‌তেরাহা”এ পড়ার জন্য [নির্দিষ্ট] কোন দু’আ নেই।
অত:পর দ্বিতীয় রাকআতের জন্য যদি সহজ হয় তাহলে উভয় হাঁটুতে ভর করে উঠে দাঁড়াবে। তার প্রতি কষ্ট হলে উভয় হাত মাটিতে ভর করে দাঁড়াবে। এরপর [প্রথমে] সূরাহ ফাতিহা এবং কুরআনের অন্য কোন সহজ সূরাহ পড়বে। প্রথম রাকআতে যেভাবে করেছে ঠিক সে ভাবেই দ্বিতীয় রাকআতেও করবে।
মুকতাদী তার ইমামের পূর্বে কোন কাজ করা জায়েয নেই। কারণ নাবী কারীম [সাঃ] তাঁর উম্মতকে এ রকম করা থেকে সতর্ক করেছেন। ইমামের সাথে সাথে (একই সঙ্গে) করা মাকরুহ। সুন্নাত হলো যে, মুকতাদীর প্রতিটি কাজ কোন শিতিলতা না করে ইমামের আওয়াজ শেষ হওয়ার সাথে হবে। এ সম্পর্কে নবী করীম [সাঃ] এরশাদ করেন।

( إنما جعل الإمام ليؤتم به فلا تختلفوا عليه؛ فإذا كبر فكبروا؛ وإذا ركع فاركعوا؛ وإذا قال سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فقولوا رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ؛ وإذا سجد فاسجدوا ) الحديث – متفق عليه
অর্র্থঃ“ইমাম এই জন্যই নির্ধারণ করা হয়,যাতে তাকে অনুসরণ করা হয়, তার প্রতি তোমরা ইখতেলাফ করবে না। সুতরাং ইমাম যখন আল্ল্লাহু আকবার বলবে তোমরাও আল্ল্লাহু আকবার বলবে এবং যখন তিনি রুকু করবেন তোমরাও রুকু করবে এবং তিনি যখন “সামি’আল্ল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলবেন তখন তোমরা “রাব্বানা ওয়া লাকাল হাম্‌দ”বলবে আর ইমাম যখন সিজদাহ করবেন তোমরাও সিজদাহ করবে।” বুখারী ও মুসলিম

১৩. স্বলাত যদি দু’রাক্‌আত বিশিষ্ট হয় যেমনঃ ফজর, জুমআ ও ঈদের স্বলাত, তা’হলে দ্বিতীয় সিজদাহ থেকে মাথা উঠিয়ে ডান পা খাড়া করে বাম পায়ের উপর বসবে। ডান হাত ডান ঊরুর উপর রেখে শাহাদাত বা তর্জনী আঙ্গুলি ছাড়া সমস্ত আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ করে দুআ ও আল্লাহর নাম উল্লেখ করার সময় শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা নাড়িয়ে তাওহীদের ইশারাহ করবে। যদি ডান হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা বন্ধ রেখে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি মধ্যমাঙ্গুলির সাথে মিলিয়ে গোলাকার করে শাহাদাত বা তর্জনী দ্বারা ইশারা করে তবে তা ভাল। কারণ নাবী কারীম [সাঃ] থেকে দু’ধরনের বর্ণনাই প্রমাণিত। উত্তম হলো যে, কখনও এভাবে এবং কখনও ওভাবে করা। এবং বাম হাত বাম ঊরু ও হাঁটুর উপর রাখবে। অত:পর এই বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যতু) পড়বে।

তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যতুঃ
(( اَلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِيْنَ، أَشْهَدُ أَن لَّاإِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ))
উচ্চারণঃ“আত্তাহিয়্যাতু লিল্ল্লাহি ওয়াস্‌সালাওয়াতু ওয়াত্‌ তাইয়্যিবাতু আছ্‌ছালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্ল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আছ্‌ছালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্ল্লাহিছ ছালিহীন। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান্‌ আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।
[অর্থঃ“যাবতীয় ইবাদত, মৌখিক, শারীরিক ও আর্থিক সমস্তই আল্ল্লাহর জন্য। হে নাবী ! আপনার উপর আল্ল্লাহর শানি-, রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্ল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ [সাঃ] আল্ল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।”]

অতঃপর [দরূদ] বলবেঃ
( اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ, وبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِْيدٌ مَجِيْدٌ )
উচ্চারণ:“ আল্ল্লাহুম্মা সাল্ল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা সাল্ল্লাইতা আলা ইব্‌রা-হীমা ওয়া আলা আ-লি ইব্‌রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বা-রিক আলা মুহাম্মাদিউঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রাকতা আলা ইব্‌রা-হীমা ওয়া আলা আলি-ইব্‌রা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।”
[অর্থঃ“হে আল্ল্লাহ! মুহাম্মাদ সাল্ল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ কর। যেমনঃ তুমি ইব্‌রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বর্কত নাযিল কর, যেমনঃ তুমি ইব্‌রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর নাযিল করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরাবান্বিত।”

অতঃপর নিচের দু‘আটি পড়বেঃ-

এরপর আল্ল্লাহর কাছে চারটি বস’ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।
( اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجَّالِ )
উচ্চারণঃ আল্লা্লহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযাবিল ক্বাবরি, ওয়া মিন ফিতনাতিল্‌ মাহইয়া ওয়ালমামাতি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
অর্থঃ“আমি আল্ল্লাহর আশ্রয় কামনা করি জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের শাসি- থেকে, জীবন ও মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফেত্‌না থেকে।”

এরপর দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল কামনা করে নিজের পছন্দমত যে কোন দু’আ করবে। যদি তার পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুসলমানের জন্য দু’আ করে তাতে কোন দোষ নেই। দু’আ করার বিষয়ে ফরজ অথবা নফল স্বলাত কোনই পার্থক্য নেই। কারণ নাবী কারীম [সাঃ] এর কথায় ব্যাপকতা রয়েছে, ইবনে মাসউদের হাদীসে যখন তিনি তাশাহহুদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন তখন বলেছিলেন :
( ثُمَّ لِيَتَخَيَّرْ مِنَ الدُّعاَءِ أَعْجَبَهُ إِلَيْهِ فَيَدْعُوْا )
অর্থঃ“অত:পর তার কাছে যে দু’আ পছন্দনীয়, তা নির্বাচন করে দু’আ করবে।” অন্য এক বর্ণনায় আছে,
( ثُمَّ يَتَخَيَّرْ مِنَ الْمَسْأَلَةِ مَا شَاءَ )
অর্থঃ“ অতঃপর যা ইচ্ছা চেয়ে দু’আ করতে পারে।”
এই দু’আগুলি যেন বান্দাহর দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত বিষয়কে শামিল করে। অতঃপর [স্বলাতী] তার ডান দিকে [তাকিয়ে] “আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্ল্লাহ” অর্থঃ-“তোমাদের উপর শানি- ও আল্ল্লাহর রহমত নাযিল হউক এবং বাম দিকে [তাকিয়ে] “আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ” বলে ছালাম ফিরাবে।
১৪. স্বলাত যদি তিন রাকআত ওয়ালা হয়, যেমনঃ মাগরিবের স্বলাত অথবা চার রাকআত ওয়ালা যেমনঃ জোহর, আছর ও এশার স্বলাত, তা’হলে পূর্বোল্লিখিত “তাশাহহুদ” পড়বে এবং এর সাথে নাবী [সাঃ] এর প্রতি দরূদও পাঠ করা যাবে। অতঃপর আল্লা্লহু আকবার বলে হাটুতে ভর করে (সোজা হয়ে) দাড়িয়ে উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠিয়ে পূর্বের ন্যায় বুকের উপর রাখবে। এবং শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। যদি কেউ জোহর ও আসরের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতে কখনও সূরা ফাতিহার অতিরিক্ত অন্য কোন সূরা পড়ে তবে কোন বাধা নেই। কেননা এবিষয়ে আবু সাঈদ খুদরী [রাঃ] কতৃক নাবী কারীম [সাঃ] থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। প্রথম তাশাহহুদে যদি নাবী কারীম [সাঃ] এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ছেড়ে দেয় এতেও কোন ক্ষতি নেই। কারণ প্রথম বৈঠকে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব।
অতঃপর মাগরিবের স্বলাতের তৃতীয় রাকআত এবং জোহর,আসর ও এশার স্বলাতের চতুর্থ রাকআতের পর তাশাহহুদ পড়বে এবং নাবী কারীম [সাঃ] এর উপর দরূদ পাঠ করবে আর আল্ল্লাহর কাছে জাহান্নামের আযাব, কবরের আযাব, জীবিত ও মৃত্যুর ফেতনা এবং মাসীহে দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বেশি বেশি দু’আ করবে।
স্বলাতের শেষ বৈঠকে এবং এর পরবর্তী সময়ে সুন্নাতী কিছু দু’আঃ-
আনাস [রাঃ] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নাবী কারীম [সাঃ] অধিক সময় নিচের দু’আটি পাঠ করতেন।
]رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ {
যেমন তা দুরাক্‌আত ওয়ালা স্বলাতে উল্লেখ হয়েছে। [অতঃপর শেষ বৈঠকের জন্য বসবে] তবে এ বৈঠকে তাওয়াররুক করে বসবে অর্থাৎ ডান পা খাড়া করে এবং বাম পা ডান পায়ের নিু দিয়ে বের করে রাখবে। পাছা যমীনের উপর সি’র রাখবে। এ বিষয়ে আবু হুমাইদ [রাঃ] থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এরপর সব শেষে “আস্‌সালামু আলাইকুম অরাহমাতুল্ল্লাহ” বলে প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফিরাবে।
[সালামের পর] ৩বার “আছ্‌তাগফিরুল্ল্লাহ” পড়বে (আমি আল্ল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি) নিুের দু’আগুলি [১ বার] পড়বেঃ
( اَللَّهُمَّ أنْتَ الّسَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَاذَاالْجَلاَلَِ واْلإِكْرَامِ-لاَإِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ- اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَاالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ- لاَحَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ ؛ لاإِلَهَ إ لاَّ اللهُ وَلاَ نَعْبُدُ إِلاَّ إِيَّاهُ؛ لَهُ النِّعْمَةُ َولَهُ الْفَضْلُ وَلَهُ الثَّنَاءُ الْحَسَنُ ؛ لاَ إِلَه اِلاَّ اللهُ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ وَلَوْكَرِهَ الْكَافِرُوْنَ )
উচ্চারণঃ আল্ল্লাহুম্মা আনতাছ ছালামু, অমিনকাছ ছালামু, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইক্‌রাম।
লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুল্‌কু অলাহুল হাম্‌দু ওয়াহুয়া আলা কুল্ল্লি শাইইন ক্বাদীর। আল্ল্লাহুম্মা ! লা- মানি‘আ লিমা ‘আতাইতা ওয়ালা মু‘তিয়া
লিমা মানা‘তা ওয়ালা ইয়ানফা‘উ যালজাদ্দি মিনকাল্‌জাদ্দু। লা- হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্ল্লা- বিল্লাহি, লা -ইলাহা ইল্ল্লাল্লাহু,ওয়ালা না’বুদু ইল্ল্লা ইয়্যাহু, লাহুননি’মাতু ওয়ালাহুল ফাজলু ,ওয়ালাহুস্‌ সানাউল হাসানু, লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্লা্লহু মুখলিসীনা লাহুদদীনা ওয়ালাউ কারিহাল কাফিরূন।
অর্থঃ“হে আল্ল্লাহ! তুমি শানি- দাতা, আর তোমার কাছেই শানি-, তুমি বরকতময়, হে মর্যাদাবান এবং কল্যাণময়।“আল্ল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই , তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপরেই ক্ষমতাশালী। একমাত্র অল্ল্লাহ ছাড়া দুঃখ কষ্ট দূরকরণ এবং সম্পদ প্রদানের ক্ষমতা আর কারো নেই।
হে আল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না।”
আল্ল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, নিয়ামত সমূহ তাঁরই,অনুগ্রহও তাঁর এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্ল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) মা’বূদ নেই । আমরা তাঁর দেয়া জীবন বিধান একমাত্র তাঁর জন্য একনিষ্ঠ ভাবে পালন করি। যদিও কাফিরদের নিকট উহা অপছন্দনীয়।
“সুব্‌হানাল্ল্লাহ”৩৩ বার (আল্ল্লাহ পূত ও পবিত্র) “আল্‌হামদুলিল্লা্লহ” ৩৩ বার (সকল প্রশংসা আল্ল্লাহর)“ আল্ল্লাহু আকবার” ৩৩ বার পড়বে (আল্ল্লাহ সবচেয়ে বড়) আর একশত পূর্ণ করতে নিুের দু’আটি পড়বে।
( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَعَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ )
উচ্চারণঃ লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্ল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ,লাহুল মুল্‌কু ওয়ালাহুল হাম্‌দু,ওয়াহুয়া আলা কুল্ল্লি শাইইন ক্বাদীর।
[অর্থঃ “আ্লল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই , তিনি একক ,তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই সব কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী।”]
অতঃপর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেঃ
[[উচ্চারণঃ “আল্ল্লাহু লা- ইলাহা ইল্ল্লা হুঅ, আল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা-তা’খুযুহু ছিনাতুউ অলা নাউম, লাহু মা ফিচ্ছামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদি; মান্‌যাল্ল্লাযী ইয়াশফা’উ ইন্‌দাহু ইল্ল্লা বিইযনিহি, ইয়া’লামু মা-বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহী,ইল্ল্লা বিমা শা -য়া ,ওয়াছিআ কুরছিইয়্যুহুচ্ছামাওয়াতি, ওয়াল আরদা, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিইয়ুল আযীম।”]]
[অর্থঃ“আল্ল্লাহ তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মাবূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক,তাঁকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না । আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে এমন
যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে ? তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত আছেন। যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন, ততটুকু ছাড়া তারা তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে রক্ষণা-বেক্ষণ করা তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি মহান শ্রেষ্ঠ।” সূরা আল বাকারাহ -২৫৫ আয়াত]
প্রত্যেক স্বলাতের পর আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাছ পড়বে। মাগরিব ও ফজর স্বলাতের পরে এই সূরা তিনটি [ইখলাস, ফালাক এবং নাছ] তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করা মুস্তাহাব। কারণ নবী করীম [সাঃ] থেকে এ সম্পর্কে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
একই ভাবে পূর্ববর্তী দুআগুলির সাথে ফজর ও মাগরিবের স্বলাতের পর নিুের দুআটি বৃদ্ধি করে দশ বার করে পাঠ করা মুস্তাহাব। কারণ নবী করাীম [সাঃ] থেকে এ সম্পর্কে [হাদীসে] প্রমাণিত আছে।
( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْييِ وَيُمِيْتُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ )
উচ্চারণঃ“লা-ইলাহা ইল্ল্লাল্ল্লাহু,ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হাম্‌দু,ইওহয়্যি ওয়া ইওমীতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।”
অর্থঃ “ আল্ল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক ,তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন। তিনিই সব কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী।”
অত:পর ইমাম হলে তিনবার “আছ্‌তাগফিরুল্ল্লাহ”এবং “ আল্ল্লাহুম্মা আন্‌তাছ ছালামু, ওয়ামিনকাছ ছালামু,তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইক্‌রাম।” বলে মুকতাদীদের দিকে ফিরিয়ে মুখা- মুখী হয়ে বসবে। অতঃপর পূর্বোল্লিখিত দুআগুলি পড়বে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এর মধ্য থেকে সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) কতৃক নবী করীম [সাঃ] থেকে বর্ণিত আছে। এই সমস্ত আযকার বা দু’আ পাঠ করা সুন্নাত,ফরজ নয়।
প্রত্যেক মুসলমান নারী এবং পুরুষের জন্যে জোহর স্বলাতর পূর্বে ৪ রাক্‌আত এবং পরে ২ রাক্‌আত, মাগরিবের স্বলাতের পর ২ রাক্‌আত, এশার স্বলাতের পর ২ রাক্‌আত এবং ফজরের স্বলাতর পূর্বে ২ রাক্‌আত । এই মোট ১২ রাক্‌আত স্বলাত পড়া মুস্তাহাব। এই ১২ [বার] রাক্‌আত স্বলাতকে সুনানে রাওয়াতিব বলা হয়। কারণ নাবী কারীম [সাঃ] উক্ত রাকআতগুলি মুকীম অবস্থায় নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করতেন। আর সফরের অবস্থায় ফজরের সুন্নাত ও [এশার] বিতর ব্যতীত অন্যান্য রাকআতগুলি ছেড়ে দিতেন। নাবী কারীম [সাঃ] সফর এবং মুকীম অবস্থায় উক্ত ফজরের সুন্নাত ও বিতর নিয়মিত আদায় করতেন। তাই আমাদের জন্য নবী করীম [সাঃ] এর আমলই হলো উত্তম আদর্শ। আল্ল্লাহ পাক এরশাদ করেন,

]لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ[ (২১) الأحزاب
অর্থঃ“ নিশ্চয়ই রাসূলুল্ল্লাহ [সঃ] এর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।”সূরা আহযাব- ২১

রাসূলুল্ল্লাহ [সাঃ] এরশাদ করেনঃ

( صَلٌّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ ) رواه البخاري
অর্থঃ“তোমরা সেভাবে স্বলাত আদায় কর, যে ভাবে আমাকে স্বলাত আদায় করতে দেখ।” বুখারী

এই সমস্ত সুনানে রাওয়াতিব এবং বিতরের স্বলাত নিজ ঘরেই পড়া উত্তম। যদি কেউ তা মসজিদে পড়ে তাতে কোন দোষ নেই। এ সম্পর্কে নবী করীম [সাঃ] এরশাদ করেনঃ
( أَفْضَلُ صَلاَةِ الْمَرْءِ فِيْ بَيْتِهِ إِلاَّ الْمَكْتوبَةْ ) متفق على صحته
অর্থঃ“ফরজ স্বলাত ব্যতীত মানুষের অন্যান্য স্বলাত [নিজ] ঘরেই পড়া উত্তম।”হাদীসটি সহীহ
এই সমস্ত রাকআতগুলি [১২ রাকআত স্বলাত] নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করা হলো জান্নাতে প্রবেশের একটি মাধ্যম।
সহীহ মুসলিমে উম্মে হাবীবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনে বলেন যে, আমি রাসূুলুল্ল্লাহ [সাঃ] কে বলতে শুনেছিঃ
( مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُصَلِّيْ لِلَّهِ كُلَّ يَوْمٍ ثِنْتَيْ عَشَرَةَ رَكْعَةً تَطَوُعًا إِلاَّ بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتاً فِي الْجَنَّةِ )
অর্থঃ“যে কোন মুসলিম ব্যক্তিই আল্ল্লাহর জন্য [খালেস নিয়্যতে] দিবা-রাত্রে ১২ [বার] রাক্‌আত নফল স্বলাত পড়বে, আল্ল্লাহ অবশ্যই তার জন্য একটি জান্নাতে ঘর বানাবেন।” আমরা যা পূর্বে উল্ল্লেখ করেছি ইমাম তিরমিযী তার বর্ণনায় অনুরূপ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
যদি কেউ আসরের স্বলাতের পূর্বে ৪ [চার] রাকআত এবং মাগরিবের স্বলাতের পূর্বে ২ [দুই] রাকআত এবং এশার স্বলাতের পূর্বে ২ [দুই] রাকআত পড়ে, তা হলে তা উত্তম হবে। কেননা নবী করীম [সাঃ] বলেছেনঃ
( رَحِمَ اللَّهُ امْرَأً صَلَّى أَرْبَعًا قَبْلَ الْعَصْرِ )
অর্থ“আল্ল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহম করুন,যে আসরের (ফরয) স্বলাতের পূর্বে চার রাকআত (নফল) স্বলাত পড়ে থাকে।” হাদীসটি ইমাম আহমাদ, আবুদাউদ, তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং ইবনে খুযায়মাহ সহীহ বলেছেন। রাসূলুল্ল্লাহ [সাঃ] বলেছেনঃ
( بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ ثُمَّ قَالَ فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ )
অর্থ“প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল) স্বলাত, প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল) নানায।” তৃতীয় বার বলেন “যে ব্যক্তি পড়ার ইচ্ছে করে।” বুখারী
যদি কেউ জোহরের পূর্বে ৪ [চার] রাকআত এবং পরে ৪ [চার] রাকআত পড়ে তবে তা ভাল। এর প্রমাণে রাসূলুল্ল্লাহ [সাঃ] বলেনঃ
( مَنْ حَافَظَ عَلَى أَرْبَعٍ قَبْلَ الظُّهْرِ وَأَرْبْعٍ بَعْدَهَا حَرَّمَهُ اللَّهُ تَعَالىَ عَلَى النّاَرِ )
অর্থঃ“যে ব্যক্তি জোহরের পূর্বে ৪ [চার] রাক্‌আত ও পরে ৪ [চার] রাক্‌আত (সুন্নাত স্বলাত) এর প্রতি যত্নবান থাকে, আল্ল্লাহ পাক তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন।”ইমাম আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আহলে সুনান সহীহ সূত্রে উম্মে হাবীবাহ থেকে উল্ল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সুনানে রাতেবার স্বলাতে জোহরের পরে ২ রাকআত বৃদ্ধি করে পড়বে। কারণ জোহরের পূর্বে ৪ রাকআত এবং পরে ২ রাকআত পড়া সুনানে রাতেবাহ। অতএব জোহরের পরে ২ রাকআত বৃদ্ধি করলে উম্মে হাবীবাহর হাদীসের প্রতি আমল হবে। আল্ল্লাহই তাওফীকদাতা। দরূদ ও ছালাম বর্ষিত হোক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ৎ, তাঁর পরিবার- পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা তাঁর ইত্তেবা’ করবেন তাদের প্রতিও।

নবী করীম [সাঃ]এর নামায আদায়ের পদ্ধতি পর্বঃ ১

নবী করীম [সাঃ]এর স্বলাত আদায়ের পদ্ধতি

স্বলাত এর সংক্ষিপ্ত সচিত্র গাইড এখানে ক্লিক করুন

যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্ল্লাহর জন্য এবং দরূদ ও ছালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ [সাঃ], তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি।
প্রত্যেক মুসলমান নারী ও পুরুষের উদ্দেশ্যে নবী করীম [সাঃ] এর স্বলাত আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করতে ইচ্ছা করছি। এর উদ্দেশ্য হলো যেন, তাঁরা যেন প্রত্যেকেই স্বলাত পড়ার বিষয়ে নবী করীম [সাঃ] এর অনুসরণ করতে পারেন। এ সম্পর্কে নবী করীম [সাঃ] এরশাদ করেন:

( صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ ) رواه البخاري
অর্থঃ“তোমরা সেভাবে স্বলাত আদায় কর, যে ভাবে আমাকে স্বলাত আদায় করতে দেখ।” বুখারী

পাঠকের উদ্দেশ্যে (নিম্নে) তা বর্ণনা করা হলোঃ

১.সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে ওযু করবেঃ আল্ল্লাহ পাক কুরআনে যে ভাবে ওযু করার নির্দেশ প্রদান করেছেন সে ভাবে ওযু করাই হলো পরিপূর্ণ ওযু। আল্ল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এ সম্পর্কে এরশাদ করেনঃ

]يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوْهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ [ (৬) المائدة
অর্থঃ“ হে মুমিনগণ! যখন তোমরা স্বলাতের উদ্দেশ্যে দন্ডায়মান হও তখন (স্বলাতের পূর্বে) তোমাদের মুখমন্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলোকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, আর মাথা মসেহ কর এবং পা গুলোকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল।” [সূরা মায়েদাহ – ৬]

এবং নবী করীম [সাঃ] এরশাদ হলোঃ
( لاَ تُقْبَلُ صَلاَةٌ بِغِيْرِ طَهُوْرٍ وَلاَ صَدَقَةٌ مِنْ غُلُوْلٍ (
অর্থঃ“ পবিত্রতা ব্যতীত স্বলাত কবুল করা হয় না। আর খিয়ানতকারীর দান গ্রহণ করা হয় না।” ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন্ত
নবী করীম [সাঃ] এক ব্যক্তিকে স্বলাতে ভুল করার কারণে বললেনঃ

( ِإذَا قُمْتَ إِلىَ الصَّلاَةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوْءَ )
অর্থঃ“তুমি যখন স্বলাত দাড়াবে (স্বলাতের পূর্বে) উত্তম রূপে ওযু করবে।”

২. মুসল্লি বা স্বলাতী ব্যক্তি কিবলামুখী হবেঃ সে যে কোন জায়গায় থাক না কেন,তার সমস্ত শরীর ও মনকে যে ফরজ বা নফল স্বলাত আদায়ের ইচ্ছা করছে অন্তরকে সে

স্বলাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। এবং মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করবে না, কারণ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা শরীয়ত সম্মত নয় বরং বা তা বিদ্‌আত। কারণ নাবী কারীম [সাঃ] এবং তাঁর সাহাবাগণ কেউ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করেন নেই। সুন্নত সম্মত হলো যে, স্বলাতী তিনি ইমাম হয়ে স্বলাত আদায় করুন অথবা একা, তার সামনে সুতরাহ (স্বলাতের সময় সামনে স্থাপিত সীমাচিহ্ন) রেখে স্বলাত পড়বেন। কারণ রাসূলুল্লাহ [সাঃ] স্বলাতের সামনে সুতরাহ ব্যবহার করে স্বলাত পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিবলামুখী হওয়া স্বলাতের শর্ত।
৩. আল্ল্লাহু আকবার বলে তাকবীরে তাহরীমাহ দিয়ে স্বলাতে দাড়াবে এবং দৃষ্টিকে সিজদার স্থানে নিবদ্ধ রাখবে।
৪.তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাতকে কাঁধ অথবা কানের লতির বরাবর উঠাবে।
৫.এরপর ডান হাতের তালুকে তার বাম হাতের উপরে কবব্জি অথবা বাহু ধারণ করে উভয় হাত রাখবে। বুকের উপর হাত রাখা সম্পর্কে সাহাবী অয়েল ইবনে হুজর এবং কাবীসাহ ইবনে হুলব আততায়ী [রাযিয়াল্লাহু আনহুমা] তিনি তার পিতা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
৬. দু’আ ইস্তেফতাহ [সানা] পাঠ করা সুন্নাত। দুআ ইস্তেফতাহ নিম্নরূপঃ

(اَللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِيْ وَبَيْنَ خَطَاياَيَ كَمَا بَاعَدتَّ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ. اَللَّهُمَّ نَقِّنِيْ مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ. اَللَّهُمَّ اغْسِلْنِيْ مِنْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرْدِ )
উচ্চারণঃ আল্ল্লাহুম্মা বা-ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাতাইয়ায়া, কামা বা’আদ্‌তা বাইনাল মাশরিক্বী ওয়াল মাগরিবি, আল্ল্লাহুম্মা নাক্কিনী মিন খাতাইয়ায়া কামা ইউনাক্কাছ ছাওবুল আবইয়াদু মিনাদ্‌দানাসি, আলা্ল্লহুম্মাগছিলনী মিন খাতাইয়ায়া বিল মায়ি, ওয়াছ্‌ছালজি, ওয়াল বারাদি।
[অর্থঃ“হে আল্ল্লাহ ! তুমি আমাকে আমার পাপগুলি থেকে এত দূরে রাখ যেমনঃ পূর্ব ও পশ্চিমকে পরস্পরকে পরস্পর থেকে দূরে রেখেছ। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে এমন ভাবে পরিষ্কার করে দাও, যেমনঃ সাদা কাপড়কে ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে (পবিত্র করার জন্য) পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও।”] বুখারী ও মুসলিম

অন্য এক হাদীসে আবু হুরাইরাহ [রাঃ] থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী কারীম [সাঃ] হতে বর্ণনা করেন যে, যদি কেউ চায় তা’হলে পূর্বের দুআর পরিবর্তে নিচের দুআটিও পাঠ করতে পারে। কারণ নবী করীম [সাঃ] থেকে তা পাঠ করার প্রমাণ রয়েছে।

(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ ))
উচ্চারণঃ সুবহানাকা আল্ল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাস্‌মুকা, ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।
অর্থঃ“ হে আল্ল্লাহ! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তুমি প্রশংসাময়, তোমার নাম বরকতময়, তোমার মর্যাদা অতি উচ্চে,আর তুমি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা’বূদ নেই।”

পূর্বের দুআ দুটি ছাড়াও যদি নবী [সাঃ] থেকে অন্যান্য যে সমস্ত দুআয়ে ইস্তেফতাহ বা সানা বলা প্রমাণিত তা পাঠ করে তবে কোন বাধা নেই। কিন্তু উত্তম হলো যে কখনও এটি আবার কখনও অন্যটি পড়া। কারণ এর মাধ্যমে রাসূল [সাঃ] এর পরিপূর্ণ অনুসরণ প্রতিফলিত হবে।
এরপর বলবেঃ

আঊযু বিল্ল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম, বিসমিল্ল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থঃ“আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্ল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

অতঃপর সূরা ফাতিহা পাঠ করবে । কেননা রাসূলল্ল্লাহ [সাঃ] বলেছেনঃ

( لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ )
অর্থঃ“ যে ব্যক্তি (স্বলাতে) সূরা ফতিহা পাঠ করে না তার স্বলাত হয় না।” [বুখারী ও মুসলিম]

সূরা ফতিহা পাঠ শেষে জাহরী স্বলাতে (যেমনঃ মাগরিব, এশা ও ফজর) উচ্চস্বরে আওয়াজ করে এবং ছিররি স্বলাতে (যেমনঃ জোহর ও আসর) মনে মনে আ-মীন বলবে। এরপর পবিত্র কুরআন থেকে যে পরিমাণ সহজসাধ্য হয় পাঠ করবে। উত্তম হলো যে, জোহর, আসর এবং এশার স্বলাতে কুরআন মজিদের আওছাতে মুফাচ্ছাল [সূরা নাস থেকে সূরা যুহা পর্যন্ত এবং ফজরে তেওয়াল [সূরা কাফ থেকে সূরা নাবা পর্যন্ত] আর মাগরিবে কিসার [সূরা যুহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত] থেকে পাঠ করা। মাগরিব স্বলাতে কখনও তেওয়াল অথবা আওসাত থেকে পাঠ করবে। এভাবে পাঠ করা নবী কারীম [সাঃ] থেকে প্রমাণিত রয়েছে। আসরের কিরআতকে জোহর এর কিরআত থেকে হালকা করা জায়েয আছে।
৭.উভয় হাত দু’কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে আল্ল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবে। মাথাকে পিঠ বরাবর রাখবে এবং উভয় হাতের আঙ্গুলগুলিকে খোলাবস্থায় উভয় হাটুর উপরে রাখবে। রুকুতে ইতমিনান বা সি’রতা অবলম্বন করবে। এরপর বলবেঃ “সুবহানা রাব্বিয়াল আজীম”। অর্থঃ-‘‘আমি আমার মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি।”
দুআটি তিন বা তার অধিক পড়া ভাল এবং এর সাথে নিচেরর দুআটিও পাঠ করা মুস্তাহাব-জায়েয।

( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ )
উচ্চারণঃ সুবহানাকা আল্ল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্ল্লাহুম্মাগ্‌ফিরলি।
অর্থঃ“হে আল্ল্লাহ ! আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্ল্লাহ ! আমাকে ক্ষমা কর।”

৮.উভয় হাত কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে “সামি’আল্ল্লাহু লিমান হামিদাহ”
বলে রুকু থেকে মাথা উঠাবে। ইমাম বা একাকী উভয়ই দু’আটি পাঠ করবে। রুকু থেকে খাড়া হয়ে বলবেঃ

( رَبَّنَاوَلَكَ الْحَمْدُ،حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا ِفيْهِ؛ مِلْءَ السَّمَاوَاتِ وَ مِلْءَ الْأَرْضِ؛ وَمِلَءَ ماَ بَيْنَهُمَا ؛ وَمِلْءَ ماَ شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ )
উচ্চারণঃ রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ্‌, হামদান কাছিরান তাইয়্যেবাম মুবারাকান ফি-হ, মিলয়াস সামাওয়াতি ওয়া মিলয়াল আরজি, ওয়া মিলয়া মা বায়নাহুমা,ওয়া মিলয়া মা শি’তা মিন শাইয়িন বা’দু।
অর্থঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। তোমার প্রশংসা অসংখ্য, উত্তম ও বরকতময়,যা আকাশ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয়, উভয়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে এবং এ’গুলি ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু চাও তাও পূর্ণ করে দেয়।”

পূর্বের দু’আটির পরে যদি নিুের দু’আটিও পাঠ করা হয় তাহলে ভাল।
( أَهْلُ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ؛ أَحَقُّ مَا قاَلَ الْعَبْدُ؛ وَكُلُّناَلَكَ عَبْدٌ؛ اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ )
উচ্চারণঃ আহলুস্‌সানায়ি ওয়াল মাজদি,আহাক্কু মা কালাল আবদু’ ওয়া কুল্লুনা লাকা আবদুন। আল্ল্লাহুম্মা ! লা- মানি‘আ লিমা আ‘তাইতা ওয়ালা মু‘তিয়া লিমা মানা‘তা, ওয়ালা ইয়ানফা‘উ যালজাদ্দি মিনকাল্‌জাদ্দু।
অর্থঃ “হে আল্ল্লাহ! তুমিই প্রশংসা ও মর্যাদার হক্কদার, বান্দাহ যা বলে তার চেয়েও তুমি অধিকতর হকদার। এবং আমরা সকলে তোমারই বান্দাহ। হে আল্ল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না।”
কোন কোন সহীহ হাদীসে নাবী কারীম [সাঃ] থেকে এই [পূর্বের] দু’আটি পড়া প্রমাণিত আছে। আর মুকতাদী হলে রুকু থেকে উঠার সময় “ রাব্বানা ওয়া লাকাল হাম্‌দ–”দুআটি শেষ পর্যন্ত পড়বে। রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর ইমাম ও মুকতাদী সকলের জন্য দাড়ানো অবস্থায় যে ভাবে উভয় হাত বুকের উপর ছিল সে ভাবে বুকের উপর উভয় হাত রাখা মুস্তাহাব। এ বিষয়ে নাবী কারীম [সাঃ] থেকে অয়েল ইবনে হুজর এবং সাহল বিন সা’দ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এর বর্ণিত হাদীস থেকে প্রমাণিত।
৯.আল্লাহু আকবার বলে । যদি কোন প্রকার কষ্ট না হয় তা হলে দুই হাটু উভয় হাতের আগে (মাটিতে রেখে) সিজদায় যাবে আর কষ্ট হলে উভয় হাত হাটুর পূর্বে (মাটিতে) রাখা যাবে। হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলি ক্বিবলামুখী থাকবে। এবং হাতের আঙ্গুলগুলি মিলিত ও প্রসারিত হয়ে থাকবে। সিজদাহ হবে সাতটি অঙ্গের উপর। অঙ্গগুলো হলোঃ নাক সহ কপাল, উভয় হাতুলী, উভয় হাটু এবং উভয় পায়ের আঙ্গুলের ভিতরের অংশ। সিজদায় গিয়ে বলবেঃ

“সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা”(অর্থঃ আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের [আল্লাহর] প্রশংসা করছি।)

তিন বা তার অধিকবার তা পুনরাবৃত্তি করবে। এর সাথে নিুের দু’আটি পড়া মুস্তাহাব।
( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ )
উচ্চারণঃ সুবহানাকা আল্ল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা অ্লাল্লাহুম্মাগফিরলি।
[অর্থঃ“হে আল্ল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক,তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্ল্লাহ ! আমাকে ক্ষমা কর।”]

[সিজদায়] বেশি বেশি দু’আ করা মুস্তাহাব। কেননা নাবী কারীম [সাঃ] এরশাদ করেছেনঃ
( فأما الركوع فعظموا فيه الرب وأما السجود فاجتهدوا في الدعاء فقمن أن يستجاب )
অর্থঃ“তোমরা রুকু অবস্থায় মহান প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত বর্ণনা কর এবং সিজদারত অবস্থায় অধিক দুআ পড়ার চেষ্টা কর, কেননা তোমাদের দুআ’ কবুল হওয়ার উপযোগী।” মুসলিম

রাসূলুল্ল্লাহ [সাঃ] আরও এরশাদ করেনঃ

( أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِن رَّبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوْا الدُّعَاءَ. )
অর্থঃ“বান্দাহ সিজদাহ অবস্থায় তার প্রতিপালকের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব এই অবস্থায় তোমরা বেশি বেশি দুআ করবে।” মুসলিম

ফরজ অথবা নফল উভয় স্বলাতে মুসলিম [স্বলাতী] সিজদার মধ্যে তার নিজের এবং মুসলমানদের জন্য আল্ল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দুআ করবে। সিজদার সময় উভয় বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে, পেটকে উভয় উরূ এবং উভয় উরূ পিন্ডলী থেকে আলাদা রাখবে। এবং উভয় বাহু [কনুই] মাটি থেকে উপরে রাখবে। (কেননা নাবী কারীম [সাঃ] এরকম করতে নিষেধ করেছেন।)
নাবী কারীম [সাঃ] এরশাদ করেছেনঃ
( اِعْتَدِلُوْا فِي السُّجُوْدِ وَلاَيبسِطُ أَحْدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ إِنْبِسَاطَ الْكَلْبِ ) متفق عليه
অর্থঃ“তোমরা সিজদায় বরাবর সোজা থাকবে। তোমাদের কেউ যেন তোমাদের উভয় হাতকে কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে প্রসারিত না রাখে।” বুখারী ও মুসলিম

স্বলাত সম্পাদনের পরবর্তী পর্বঃ ২>>

স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর এবং তারঁ পরিবার পরিজন ও সংগী সাথীদের উপর। অতঃপর ধর্মপ্রান মুসলমান ভাইদের প্রতি এই ছোট লিফলেটখানা পেশ করা হল- যাতে সাঊদী আরবের উচ্চ পরিষদের মাননীয় সভাপতি শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীনের নিকতে এক বেনামাজী পরিবার সম্পর্কে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এবং সে প্রশ্নের উত্তর নিচে দেয়া হল।

প্রশ্নঃ একজন ব্যাক্তি যখন তার পরিবারের লোক-জনকে স্বলাতের নির্দেশ দিল, তখন তাদের কেউই তার নির্দেশ মানল না অর্থাৎ স্বলাত পড়ল না। এমতবস্থায় ঐ ব্যাক্তি তার পরিবারের লোকজনের সাথে কি বসবাস করবে? এবং তাদের সাথে মিলেমিশে থাকবে? না সে নিজে পরিবার ছেড়ে, বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবে?

উত্তরঃ যদি ঐ পরিবারের লোকজন কখোনই স্বলাত না পড়ে তাহলে তার সবাই কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে, ফলে ইসলামের গন্ডি থেকে তার বের হয়ে যাবে। কাজেই এ ব্যাক্তির পক্ষ তার পরিবারের সাথে বসবাস করা জায়েজ হবে না।তবে এ ব্যাক্তির উপর এটাই ওয়াজিব হবে যে, তিনি বারবার তাদেরকে স্বলাত পড়ার, কল্যানের পথে আসার জন্য নির্দেশ দিবেন। যাতে করে আল্লাহ তা’আলা তাদের হিদায়াত করেন।

স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফের (এই বড় পাপের কাজ হতে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)আমিন। যা কুর’আন ও হাদিস এর দলীল দ্বারা প্রমাণিত, তাছাড়া সাহাবায়ে কিরামদের কথা এবং সুস্থ বিবেক দ্বারাও প্রমাণিত।

কুর’আন থেকে দালীলঃ

মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٩:١١]

অর্থঃ অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। (তাওবাঃ ১১)

আয়াতের মর্মাথ হলোঃ ঐ সমস্ত মুশরিকরা যতক্ষন পর্যন্ত উল্লেখিত কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করবে ততক্ষন পর্যন্ত তারা মুসলমানদের ভাই হিসাবে গন্য হবে না। এ ছাড়া স্বলাত পরিত্যাগ করা এটা এত বড় পাপ কাজ- যার ফলে ধর্মীয় বন্ধনে কোন কাজে আসবে না।

হাদিস থেকে দালীলঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, “একজন মু’মিন বান্দা এবং কুফর ও শিরক এর মাঝে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা অর্থাৎ, যারা স্বলাত পড়েন তারা ঈমানদার আর যারা স্বলাত পোরে না তারা কাফির ও মুশরিক।” (মুসলিম)

রসুল (সঃ) আরো বলেছেন, “আমাদের মাঝে ও ঐসব মুনাফিক ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী বস্তু হল স্বলাত। অতএব, যে স্বলাত পরিত্যাগ করল, সে আল্লাহর সাথে কুফুরী করল।” (তিরমীজি, আবু দাউদ, নাসায়ী,ও ইবনে মাজাহ)

 

সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) মুখনিঃসৃত বানী হতে দালীলঃ

আমীরুল মু’মীনিন উমার ফারুক(রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যাক্তি স্বলাত পরিত্যাগ করল, তার জন্য ইসলাম ধর্মে সামান্য পরিমান কোন অংশ বা অধিকার নেই।”

আব্দুল্লাহ বিন শাক্বীক(রাঃ) বলেনঃ “নাবী(সঃ) এর সাহাবীরা একমাত্র স্বলাত পরিত্যাগ করা ছাড়া ইসলামী অন্য কোন কাজ পরিত্যাগ করলে যে মানুষ কাফির হয় এটা তারা জানতান না। ”

সুস্থ বিবেকের দ্বারা দালীলঃ

সুস্থ বিবেক কি এটাই সমর্থন করবে- যে একজন মানুষ যার অন্তরে সরিষা পরিমান ঈমান আছে, আর যিনি স্বলাত এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ব্য সম্পর্কে এবং ঐ স্বলাতের মাধ্যমে যে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভ করা যায় এ সমস্ত বিষয়ে যিনি অবগত আছেন। এর পরেও যদি তিনি একাধারে স্বলাত পরিত্যাগকারী করেই চলবেন? এটা কোন রকমেই সম্ভব নয়।

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীন বলেছেনঃ “ স্বলাত পরিত্যাগকারীর বাক্তি কাফির নয় এ মর্মে যে সমস্ত ভায়েরা যে সমস্ত দালিল পেশ করেন, সে সমস্ত দালিলগুলি আমি খুব চিন্তা-ভাবনা করে ও গবেষনা করে দেখেছি যে ঐ সব দালীলগুলি নিম্ন চারটি অবস্থার সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত”

  • ১. ঐ সমস্ত দালীল হয়ত প্রকৃতপক্ষে বেনামাজী ব্যাক্তি কাফির কি না এ বিষয়ে দালীল নয়।
  • ২. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলিকে এমন গুণের সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে গুণের সাথে ঐ দালিলগুলি স্বলাত পরিত্যাগক করাকে অস্বীকার করে।
  • ৩. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলি সাধারন এম্ন অবস্থার সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে অবস্থার ভিতরে এই স্বলাত পরিত্যাগ করাকে ক্ষমার চোখে দেখা হয়েছে।
  • ৪. অথবা ঐ সমস্ত দালিলগুলি সাধারন বা অনির্দিষ্ট। অতঃপর “স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির”। এ সমস্ত হাদিসের দ্বারা উক্ত দালীলগুলোকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। “স্বালাতের পরিত্যাগকারীর ব্যাক্তি কাফির” অনেকেই এ হাদিসের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, “স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির” অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিয়া’মাতকে আস্বীকার করেছে, কাজেই সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না।

এখানে আমাদের কথা হল- হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয় যে, স্বালাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির। এছাড়া কুর’আন ও হাদিসের কোথাও এমন কথা বলা নেই যে বেনামাযী ব্যাক্তি মু’মিন বা সে জান্নাতে প্রবেশ করবে অথবা সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তাহলে আমরা কোন দালীলের ভিত্তিতে অন্যান্যদের মত (স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফের নয়য় বরং সে আল্লাহর নি’আমাত অস্বীকারকারী) এই ব্যাখ্যার প্রতি ধাবিত হব। অতএব, উপরে উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা এটা প্রমাণিত হল যে, নিশ্চয়ই স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির তাহলে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির উপর মুরতাদের বিধানসমুহ প্রয়োগ করা যাবে।

স্বালাত পরিত্যাগকারী মুর্তাদের বিধানসমুহঃ

ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির স্তাহে কোন মহিলার বিবাহ ঠিক হবে না, কেননা ঐ ব্যাক্তিকে যাওদি বিবাহ করিয়ে দেয়া হয় আর এওমতবস্থায় সে যদি স্বলাত না পড়ে তাহলে ঐ বিবাহ বাতিল হয়ে যাএব, ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না। কেননা, মুহাজির মহিলাদের সম্পর্কে আল্লহা তা’আলা বলেনঃ

فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ

অর্থঃ যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। (সুরা মুমতাহিনাঃ ১০)

২। একজন মুসলমান ব্যাক্তি তাকে (মুসলিম রমনীর সাথে) বিবাহ করিয়ে দেয়ার পরে যদি সে স্বালাত একেবারেই ছেড়ে দেয়, তাহলে তার বিবাহ ভেঙ্গে যাবে। ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না, উপরে বর্নিত আয়াতের বিধান অনুযায়ী।

৩। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি যদি কোন জানোয়ার জবেহ করে, তাহলে ঐ জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া যাবে না। কেননা উহা হারাম। তবে জানোয়ার বেনামাযী মুসলমান জ্জবেহ না করে যদি কোন ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহ করে তাহলে তাদের জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া আমাদের জন্য হালাল হবে। (স্বলাত ত্যাগ করার মত এতবড় পাপকাজ হতে আল্লাহ আমাদের হেফাযাত করুন।) কেননা একজন বেনামাযী মুসলমানের জবেহকৃত জানোয়ারের ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহকৃত জানোয়ারের এর চেয়েও নিকৃষ্ট।

৪। আর ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির জন্য মক্কা শরীফে এবং মদীনায় নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রবেশ করা বোইধ নয়। কেননা আল্লাহ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। (সুরা তাওবাঃ ২৮)

৫। যদি সে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির কোন নিকটাত্মীয় মারা যায় তাহলে ঐ মৃত ব্যাক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বা মিরাছে তার কোন হক থাকবে না। এমনি ভাবে যদি কোন মুসলিম স্বলাতী ব্যাক্তি একদিকে তার বেনামাযী ছেলেকে অপরদিকে তার স্বলাতী চাচাত ভাইকে রেখে মারা যায়- তাহলে সম্পর্কের দিন থেকে অতি নিকটে হওয়া সত্ত্বেও বেনামাযী হওয়ার কারনে তার ছেলে মিরাছ পাবে না। আর সম্পর্কের দিক দিয়ে দুরবর্তী হওয়া সত্ত্বেও স্বলাতী হওয়ার কারনে তার চাচাতো ভাই তার মিরাছ পাবে। কেননা উসামা(রাঃ) বলেছেন, “রসুল(সঃ) বলেন, ‘কোন মুসলিম কোন কাফিরের পরিত্যাক্ত সম্পদ হতে কোন অংশ পাবে না । এমনিভাবে কোন কাফির ব্যাক্তি কোন মুসলিমের পরিত্যাক্ত সম্পদের থেকে কোন অংশ পাবে না’”

রসুল(সঃ) বলেছেন, “তোমরা মৃত ব্যাক্তির পরিত্যাক্ত সম্পদকে যথাযথভাবে তার প্রাপ্যদেরকে পৌছে দাও। প্রাপ্যদারদের হক পৌছিয়ে দেয়ার পর যা অতিরিক্ত থাকবে তা আছাবা হিসেবে শুধু পুরুষদের জন্য নির্ধারিত।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করলে তাকে গোছল করানো এবং কাফন পরানো এবং তার জানাযার স্বলাত পড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। এমনিভাবে তাকে মুসলিমদের কবস্থানে কবর দেয়া ঠিক হবে না। বরং ঐ বেনামাযীর লাশকে গোসল না দিয়ে, কাফন না পড়িয়ে তার পরনের কাপড় সহ মাঠে ময়দানের কোন সুবিধামত জাগায় গর্ত করে তাকে মাটি চাপা দিতে হবে। কেননা ইসলামী শরীয়াতে কোন বেনামাযীর জন্য এবং বেনামাযীর লাশের জন্য সম্মান বলতে কিছুই নেই। আর এ জন্যই কোন একজন মুসলিমের সামনে যদি অন্য কোন বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করে তাহলে বেনামাযীর জানাজা স্বলাতের জন্য অন্য কোন মুসলিমদের আহবান জানানো ঐ মুসলিমের জন্য বৈধ হবে না।

৭। কিয়ামাতের দিন ঐ বেনামাযী ব্যাক্তিকে কাফেরদের বড় বড় নেতা যেমন, ফিরাউন, হামান, ক্বারুন এবং উবাই বিন খালফদের সাথে একত্রিত করা হবে। (এই জঘন্য পরিনতি হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি) এছাড়া ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ ব্যাক্তির পরিবার-পরিজনদের মধ্য থেকে কারো পক্ষে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির প্রতি রহমতের জন্য এবং তার ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করা হালাল নয়। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ

অর্থঃ নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্নীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা দোযখী। (সুরা তাওবাঃ ১১৩)

প্রিয় পাঠক ভায়েরা! এই স্বলাত পরিত্যাগ করা বিষয়টা বড়ই বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও বড় দুঃখের বিষয় এই যে, বহু মুসলিম ভাইয়েরা এই স্বলাত ত্যাগ করা এত বড় পাপকাজকে তুচ্ছ মনে করে। এ ব্যাপারে তাদের যেন কোন অনুভুতি নেই। আর এ জন্যই তারা যে কন বেনামাযীকে নিজ বাড়িতে দ্বীধাহীন চিত্তে অবস্থান করার সুযোগ দিয়ে থাকে। উল্লেখিত সব কাজ নাজায়েয।

স্বলাত পরিত্যাগকারী পুরুষ বা মহিলা যেই হোকনা কেন- এটাই স্বলাত পরিত্যাগকরার ইসলামী বিধান। কাজেই ওহে স্বলাত পরিত্যাগকারী! অথবা যথাযথভাবে স্বলাত পড়ার ব্যাপারে অলসতাকারী!, তুমি সাবধান হও, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার বাকি জীবনটাকে পুন্যময় কাজের দ্বারা পুর্ন করার চেষ্টা কর। কেননা তুমি জানো না তোমার মৃত্যু ঘন্টা বাজতে, তোমার জীবন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, তোমার মৃত্যু সংঘটিত হতে আর কত বছর বা কত ঘন্টা বাকি আছে? তোমার মৃত্যুর সংবাদ এর সময় কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কারো জানা নেই। অতএব, তুমি সর্বদা নিম্ন লিখিত আল্লাহর বানী স্মরন করঃ

إِنَّهُ مَن يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ [٢٠:٧٤

অর্থঃ নিশ্চয়ই যে তার রবের কাছে অপরাধী হয়ে আসে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে সে মরবে না এবং বাঁচবেও না। (সুরা ত্বহাঃ ৭৪)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেনঃ

.فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَىٰ.وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا.فَأَمَّا مَن طَغَىٰ

অর্থঃ তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে, এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (সুরা নাযি’আতঃ ৩৭-৩৯)

পরিশেষে হে পাঠকমন্ডলী! আল্লাহ আপনাদের প্রত্যেককেই প্রতিটি ভালো কাজ করার পুর্ন তাওফীক দান করুন। এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলা আপনাদের তারঁ বিধান মুতাবিক জ্ঞান অর্জনের, আমল করার এবং আল্লাহর পথে মানুষদের আহবান জানানোর পুর্ন তাওফীক দান করুন এবং সেই সাথে আপনাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে সৌভাগ্যময় ও আনন্দময় করে গড়ে তুলুন। আমিন

সর্ব বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত নাযিল করুন। আমিন।

[ফযীলাতুশ শায়খ, মুহাম্মাদ বিন সালিহ বিন উছাইমীন (রহঃ)[

 

এক বেনামাযী মৃত ছেলের জন্য তার মায়ের ফাতওয়া তলব

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর যে নাবীর পর আর কোন নাবী আসবে না। অতঃপর এক মহিলা তার এক বেনামাযী ছেলের সম্পর্কে তদানিন্তন সাউদী আরবের প্রধান মুফতি শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বায(রহঃ) এর নিকট ফাতওয়া তলব করেন। পরে শাইখ বিন বায ঐ ফাতওয়া সাউদী আরবের “উচ্চ উলামা” পরিষদের নিকট হস্তান্তর করেন। এরপর ১৪/১/১৪১৯ হিজরী সনে (৪১৫) নম্বরে উচ্চ উলামা পরিষদের উক্ত ফাতওয়াকে সাউদী আরবের সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনার স্থায়ী কমিটির নিকট পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর ঐ কমিটি উলত ফাতওয়ার যে সমাধান দিয়েছিল সেটাই নিচে উল্লেখ করা হলঃ

ঐ মহিলার প্রশ্নঃ

১৭ বছর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল, কিন্তু সে দুর্ভাগ্যবশত আজ থেকে ২ মাস পুর্বে হঠাৎ গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়। ছেলেটি স্বলাত পড়ত না এবং রামাদানে সিয়াল পালন করত না। তবে আমার জানা মতে এ দুটি পাপ ছাড়া আর কোন পাপ তার দ্বারা সংঘটিত হয় নাই। এমতবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ থেকে তার রমাদানের সিয়ামগুলো পুর্ন করা, তার মাতা হিসেবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়জ হবে কি?এমনিভাবে ঐ ছেলের পক্ষ থেকে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিনের সিয়াম, সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এসমস্ত লফল সিয়াম যদি রাখা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে? এমনিভাবে আমি যদি তার পক্ষ থেকে যোহর স্বলাতের প্রথম চার রাকা’আত,যোহর স্বলাতের পরে দুই রাক’আত এবং আছর, মাগরিব ও এশা ও ফজর স্বলাতের পুর্বে দুই দুই রাক’আত করে স্বলাত পড়ি তাহলে কি এ সমস্ত সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?

ফাতওয়া কমিটি গবেষনার পর যে জবাব দিয়েছিলঃ
যে বাক্তি কোন সিয়াম না রেখে এবং বেনামাযী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসেবে গন্য করা যাবে না। কেননা যে বঅ্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বলাত ত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসংগে মুহাম্মাদ(সঃ) বলেনঃ

“একজন মু’মিন বান্দা ও কাফির ও মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা।” অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা স্বলাত পড়ে আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা স্বলাত পড়ে না। অতএব যারা বেনামাযী অবস্থায় জীবন কাটালো এরপর তারা মৃত্যুর আগে আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা। এধরনের ব্যাক্তিদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু’আ করা জায়েজ হবে না। অতএব ঐ ছেলের মা তার ছেলের জন্য মাগফিরাতের যতই দু’আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবে না। কেননা স্বলাত এমন একটি ইবাদাত যা অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করার কোন প্রমান ইসলামী শরীয়াতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল ভালো কাজের তাওফীকদাতা।

পরিশেষে আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত ও শান্তি বর্ষন করুন। আমিন।

 

পক্ষেঃ

ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনা স্থায়ী কমিটি

১. সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)

২. সহ-সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ আলুশ-শাইখ

৩. সদস্যঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-গুদাইয়ান

৪. সদস্যঃ বাকারা বিন আব্দুল্লাহ আবু যাইদ

৫. সদস্যঃ সালিহ- বিন ফাওযান আল-ফাওযান

 

নির্ধারিত সময় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ার বিধান

একমাত্র শারয়ী ওযর এবং বিশেষ কোন অসুবিধা ছাড়া দেরী করে স্বলাত পড়া হারাম ও নাজায়েজ। কেননা স্বলাত আদায় করার জন্য আল্লাহ তা’আলা সময় নির্ধারন করে দিয়েছেন, সেহেতু যথা সময়ে স্বলাত আদায় করা ওয়াজিব। অতএব, যদি কেউ কোন ওযর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতা করে স্বলাতের নির্ধারিত সময় চলে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করে তাহলে তার স্বলাত বাতিল হবে ফলে ঐ স্বলাত আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

অর্থঃ নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। (সুরা আন-নিসাঃ ১০৩)

অতএব যথা সময়ে স্বলাত আদায় না করার কারনে বান্দার স্বলাত যখন নষ্ট হয়ে যাবে, তখন এর কারনে ঐ স্বলাতী ব্যাক্তি কুফুরী করল এবং সে স্বলাত পরিতাগকারী হিসেবে গন্য হবে। শুধু তাই নয়য়, দেরী করে স্বলাত আদায় করা হারাম এবং এটা নিছক কুফুরী কাজ। আর এ কুফুরী কাজের জন্য আল্লাহ তা’আলা কঠন শাস্তি প্রদানের সতর্কবানী বলে দিয়েছেনঃ

فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ ۖ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا

অর্থঃ (পুর্ববর্তী আয়াত দ্রষ্টব্য) অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। (সুরা মরিয়ামঃ ৫৯)

আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ(রাঃ) সহ আরো অনেকেই উল্লেখিত আয়াতের অর্থ নষ্ট করা শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে এখানে (أَضَاعُوا) এর অর্থ এটা নয় যে তারা স্বলাতকে একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা নির্ধারিত সমইয় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ত। যেমন তারা ফজর স্বলাত সুর্য উদয়ের পরে পড়ত, এমনিভাবে তারা আছরের স্বলাত সুর্য ডুবার পরে পড়ত।

আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেন, উমার বিন খাত্তাব(রাঃ) আব্দুর রহমান বিন আওফ(রাঃ) ,মুয়াজ বিন জাবাল(রাঃ) এবং আবু হুরাইরা(রাঃ) সহ আরো অন্যান্য সাহাবী হতে বর্নিত আছে যে,

“নিশ্চয়ই যে ব্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত স্বলাত ছেড়ে দিল, এমতবস্থায় ঐ স্বলাতের নির্ধারিত সময়ের ও পার হয়ে গেল তাহলে ইচ্ছাকৃত এই স্বলাত ত্যাগ করার কারনে ঐ বাক্তি কাফির ও মুরতাদ হয়ে গেল।”

পরিশেষে উক্ত বক্ত্যবের বর্ননাকারী আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেনঃ উপরেউল্লেখিত বিষয়ে প্রখ্যাত চার সাহাবির মধ্যে কেউই উক্ত হাদিসের সম্পর্কে কোন মতানৈক্য করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

স্বলাত দেরী করে পরার ভয়াবহ পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ.فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

অর্থঃ অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর (সুরা মাউ’নঃ ৪-৫)

উল্লেখিত আয়াতঃ তারা নিজেদের মধ্যে স্বলাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে এর অর্থ এ নয়য় যে তারা একেবারেই স্বয়ালত ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা (মুনাফিকরা) স্বলাতের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করত। এখানে কেবলমাত্র স্বলাত দেরী করে পোরার জন্য আল্লাহ তা’আলা ঐ সমস্ত মুনাফিকদের “ওয়ায়িল” নামহ জাহান্নাম বা ভয়াবহ শাস্তি প্রদানের ওয়াদা করেছেন।

এ প্রসংগে হাদিসে বর্নিত আছেঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই যে সমস্ত ব্যাক্তিরা ফরজ স্বলাত না পড়ে ঘুমিয়ে পগেল এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুর পর ঐ সমস্ত ব্যাক্তিদের কবরে তাদের মাথাগুলোকে পাথর দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হবে। তাদের মাথাগুলো পাথর দিয়ে চুর্নবিচুর্ণ করে দেওয়ার পর ঐ মাথাগুলো পুর্বে যেরুপ ছিল আবার সেরুপ হয়ে যাবে। কিয়ামাত পর্যন্ত পালাক্রমে তাদের কবরে এইরুপ আযাব হতেই থাকবে, কোন রকমেই তাদের থেকে এ শাস্তি শিথিল করা হবে না। (বুখারী)

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে যথা সময়ে দৈনিক পাচঁ ওয়াক্ত স্বলাত জামা’আতের সাথে আদায় করার পুর্ন তাওফীক দান কর এবং উল্লেখিত ভয়াবহ সকল প্রকার পরকালীন শাস্তি ও আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করিও। আমীন