Category Archives: সুন্নাহ

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

মুসলিমের হক

মুসলিমের হক

আলী হাসান তৈয়ব

ইসলাম আমাদের সুপথ দেখায়

ইসলাম একটি মহান দ্বীন। ইসলাম নির্মাণ করেছে তার অনুসারীদের জন্য সঠিক পথ। এতে রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সুন্দর সমন্বয়। এতে কাউকে ঠকানো হয়নি। সবাইকে দেয়া হয়েছে তার প্রাপ্ত অধিকার। ইসলাম যেসব হক বা অধিকার দিয়েছে, তার অন্যতম হলো, এক মুসলিম ভাইয়ের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক।

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের অর্থ

আমরা জানি, মুসলিমরা আজ স্রোতে ভাসা খড়কুটার মতো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। মুসলিমদের কাতার হয়ে পড়েছে টুকরো টুকরো। তারা হয়ে পড়েছে শতধা বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহর প্রতি সবলের চেয়ে দুর্বল, সম্মানির চেয়ে অসম্মানী ও কাছের চেয়ে দূরের লোকরা বেশি লালায়িত। দৃশ্যত উম্মাহ হয়ে পড়েছে বানর-শূকরের বংশধর পৃথিবীর হীন, তুচ্ছ ও ঘৃণ্যতর জাতির জন্য একটি বৈধ বাসনের মতো। যার ইচ্ছে তা ব্যবহার করতে পারে। যেখানে ইচ্ছে তাকে ফেলে রাখতে পারে। এর প্রধান কারণ, বর্তমান বিশ্ব সম্মান করে শুধু সবলকে। অথচ উম্মাহ হয়ে পড়েছে দুর্বল। কেননা বিভক্তি দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও ধ্বংসের প্রতীক। পক্ষান্তরে শক্তি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও একতার নিদর্শন।

এমন লাঞ্চনাকর ও অপমানজনকভাবে উম্মাহ তখনই বীর্যহীন অবস্থায় আবির্ভূত হয়েছে, যখন তাদের শক্তি ও ঐক্যের উৎস হারিয়ে গেছে। হ্যা, সেটি হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক রচিত আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের বাঁধন বা ‘আল-উখুওয়াহ ফিল্লাহ’। তাওহীদের এই নিরেট, পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত চেতনা ছাড়া বাস্তবে এই ভ্রাতৃত্বের বাঁধনকে পুনর্জীবন দান করা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন এই ভ্রাতৃত্বচেতনা মুসলিমদের প্রথম জামাতকে মেষের রাখাল থেকে সকল জাতি ও সকল দেশের নেতা ও পরিচালকে রূপান্তরিত করেছিল। এ রূপান্তর ও পরিবর্তন তখনই সূচিত হয়েছিল যখন তাঁরা পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া এই ভ্রাতৃত্বকে তাঁদের কর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন। এই উজ্জ্বল, দ্যুতিময় ও দীপান্বিত চিত্র সেদিন ভাস্কর হয়ে ওঠেছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম যেদিন মক্কায় তাওহীদের অনুসারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের উদ্বোধন করেছিলেন। বর্ণ ও গোত্র এবং ভাষা ও ভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে বপণ করেছিলেন এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও একতার বীজ। ভ্রাতৃত্বের এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি কুরাইশ বংশের হামযা, গিফারী বংশের আবূ যর আর পারস্যের সালমান, হাবশার বিলাল ও রোমের হুসাইব রা. প্রমুখকে। একতা ও ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে তাঁরা সবাই যেন অভিন্ন কণ্ঠে আবৃত্তি করছিলেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াত :

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (10)

‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ [সূরা আল-হুজরাত : ১০]

তারা যেন দুলে উঠলেন নিচের এই সুমিষ্ট পঙতির দোলায়-

أبى الإسلام لا أبَ لى سِوَاهُ

إذا افتخروا بقيسٍ أو تميمِ

কবিতাটির মর্মার্থ এমন- ‘যখন তারা কায়েস বা তামীম ইত্যাদি বংশ নিয়ে বড়াই করছিল, ইসলাম তখন বংশ নিয়ে গর্ব ত্যাগ করে বললো, ইসলামই আমার বাপ, ইসলাম ছাড়া আমার কোনো বংশ নেই।’

এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভ্রাতৃত্ব রচনার প্রথম পর্ব। এরপর দ্বিতীয় পর্বে সুদীর্ঘ রক্তাক্ত যুদ্ধ ও বহুকাল ধরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে তিনি ভ্রাতৃত্ব গড়ে দেন মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে! তারপর তৃতীয় পর্বে তিনি ভ্রাতৃত্ব রচনা করেন মদীনার আনসার ও মক্কার মুহাজিরগণের মাঝে। এ ছিল মৈত্রি ও ভালোবাসার এমন উৎসব, পুরো মানবেতিহাসে যার দ্বিতীয় উপমা নেই। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের বন্ধন রচিত হলো। মনের সাথে মনের মিলন হলো। এমন হৃদয়কাড়া দৃশ্যও মঞ্চায়িত হলো বুখারী ও মুসলিমে যার বিবরণ এসেছে এভাবে :

আনাস রা. বলেন,

قَدِمَ عَلَيْنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ وَآخَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَهُ وَبَيْنَ سَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ ، وَكَانَ كَثِيرَ الْمَالِ فَقَالَ سَعْدٌ قَدْ عَلِمَتِ الأَنْصَارُ أَنِّي مِنْ أَكْثَرِهَا مَالاً سَأَقْسِمُ مَالِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ شَطْرَيْنِ وَلِي امْرَأَتَانِ فَانْظُرْ أَعْجَبَهُمَا إِلَيْكَ فَأُطَلِّقُهَا حَتَّى إِذَا حَلَّتْ تَزَوَّجْتَهَا فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ فَلَمْ يَرْجِعْ يَوْمَئِذٍ حَتَّى أَفْضَلَ شَيْئًا مِنْ سَمْنٍ وَأَقِطٍ فَلَمْ يَلْبَثْ إِلاَّ يَسِيرًا حَتَّى جَاءَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَعَلَيْهِ وَضَرٌ مِنْ صُفْرَةٍ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَهْيَمْ قَالَ تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً مِنَ الأَنْصَارِ فَقَالَ مَا سُقْتَ فِيهَا قَالَ وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ ، أَوْ نَوَاةً مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ.

‘আমাদের কাছে আবদুর রহমান বিন আউফ এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ বিন রাবী‘র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে দিলেন। তিনি ছিলেন বিত্তশালী। সা‘দ রা. বললেন, আনসাররা জানে আমি তাদের মধ্যে সবচে বেশি সম্পদশালী। আমি আপনার এবং আমার মাঝে নিজ সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করে নেব। আমার দুইজন স্ত্রী আছে। আপনি দেখেন কাকে আপনার বেশি সুন্দরী মনে হয়। আমি তাকে তালাক দেব। তারপর তার ইদ্দত শেষ হলে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। আবদুর রহমান বললেন, আল্লাহ আপনার সম্পদে বরকত দিন। আপনি আমাকে বাজার কোথায় দেখিয়ে দিন। বাজার থেকে তিনি কেবল তখনই ফিরে এলেন যখন তার কাছে অল্প কিছু মাখন ও পনির অবশিষ্ট রয়ে গেল। ক্ষণকাল বাদেই সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তাঁর ওপর ছিল ….। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমানের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘(মাহইয়াম) ঘটনা কী?’ আবদুর রহমান বললেন, আমি এক আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি বললেন, ‘তাকে কী দিয়েছো’? বললেন, খেজুরের বিচি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা বলেছেন, স্বর্ণের একটি বিচি। তিনি বললেন, ওলীমা করো, হোক না তা একটি ছাগল দিয়ে।’ [বুখারী : ৩৭৮১]

আজ আমরা সা‘দ বিন রবী‘ রা. -এর যুগের কথা কল্পনা করে আফসোস করি আর বলি, কোথায় সেই সা‘দ বিন রবী‘ রা. যিনি নিজ সম্পদ ও সহধর্মীনিকে দুই ভাগে ভাগ করবেন?!! এর উত্তর হলো, সেদিন আর নেই। সেদিন তো তখনই বিদায় হয়েছে যেদিন আবদুর রহমান রা. বিদায় নিয়েছেন। তেমনি যখন জিজ্ঞেস করা হয় কোন সে ব্যক্তি যিনি সা‘দ রা.-এর মতো বদান্যতা ও মহানুভবতা দেখাবেন? তার জবাবে বলা হবে, কোথায় সেই ব্যক্তি যিনি আবদুর রহমান রা.-এর মতো অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করবেন?!!

আরেকটি সুন্দর ঘটনা : এক ব্যক্তি পূর্বসুরী এক নেককার বান্দার কাছে গিয়ে বললেন, কোথায় তারা –

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً

‘যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে’? [সূরা আল-বাকারা : ২৭৪]

তিনি বললেন, তারা তো তাদের সাথেই অতীত হয়েছেন-

لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا

‘যারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না।’ [ সূরা আল-বাকারা : ২৭৩]

প্রিয় পাঠক, এই হলো পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের কিছু চিত্র। আল্লাহর কসম! এই হাদীসটি যদি সর্বোচ্চ স্তরের একটি শুদ্ধ হাদীস না হতো, তাহলে আমি নির্ঘাত একে একটি কাল্পনিক দৃশ্য বলে আখ্যায়িত করতাম।

হ্যা, এটিই নির্ভেজাল ভ্রাতৃত্ব। এই হলো প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব। কারণ, আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে কেবল আকীদার বাঁধন, ঈমানের বন্ধন ও আল্লাহর ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, যার শিকড় কখনো উপড়ে পড়ে না।

ইসলামী ভ্রাতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া একটি সামগ্রিক নেয়ামত। এটি আল্লাহর এমন এক দান, প্রকৃত মুমিনদের প্রতি যা প্রচুর ধারায় প্রবাহিত হয়। আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব শুভ্র ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের মুমিনদের জন্য শারাবান তহুরা বা পবিত্র পানীয় তুল্য।

মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিম ভাইয়ের হক

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক হলো তাকে ভালোবাসা। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ.

‘তিনটি গুণ যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করবে : (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে গোটা সৃষ্টিজগত অপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া। (২) মানুষকে ভালোবাসলে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা। (৩) কুফরিতে ফিরে যাওয়া তার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় হওয়া।’ [বুখারী : ১৬; মুসলিম : ১৭৫]

এদিকে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِى ظِلِّهِ ، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ اللَّهِ ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِى خَلاَءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسْجِدِ ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللَّهِ ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّى أَخَافُ اللَّهَ . وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا ، حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ .

‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের নিচে ছায়া দেবেন যেদিন তাঁর ছায়া বৈ অন্য কোনো ছায়া থাকবে না :

১. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ।

২. এমন যুবক যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে।

৩. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।

৪. এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত।

৫. এমন দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে। এ উদ্দেশ্যেই একত্রিত এবং বিচ্ছিন্ন হয়।

৬. এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত বংশীয় রূপসী নারী ব্যভিচারের প্রতি আহ্বান করে; কিন্তু সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।

৭. যে ব্যক্তি এমন গোপনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাতও তা টের পায় না।’ [বুখারী : ৬৮০৬; মুসলিম : ১৭১২]

মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা রা. থেকে আরও একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ.

‘এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য গ্রামে গেল। পথিমধ্যে আল্লাহ তা‘আলা তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, কোথায় চললে তুমি? বললেন, এ গ্রামে আমার এক ভাই আছে, তার সাক্ষাতে চলেছি। তিনি বললেন, তার ওপর কি তোমার কোনো অনুগ্রহ আছে যা তুমি লালন করে চলেছ? তিনি বললেন, না। তবে এতটুকু যে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে এসেছি। আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন যে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন যেমন তুমি তাকে তাঁর জন্য ভালোবাসো।’ [মুসলিম : ৬৭১৪; ইবন হিব্বান, সহীহ : ৫৭২]

মুসলিম ও আবূ দাউদে বর্ণিত অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لاَ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ.

‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যাবৎ না পরিপূর্ণ মুমিন হবে। আর তোমরা পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন জিনিসের কথা বলে দেব না, যা অবলম্বন করলে তোমাদের পরস্পর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (তা হলো) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ [মুসলিম : ২০৩; আবূ দাউদ : ৫১৯৫]

এক মুসলিমের ওপর মুসলিমের এ হকগুলোও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিচের হাদীসে তুলে ধরেছেন। আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ : إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ، وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ، وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ

‘এক মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো, সেগুলো কী হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, (১) তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে। (২) সে যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে তা রক্ষা করবে। (৩) সে যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে, তুমিও তার শুভ কামনা করবে। (৪) যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে। (৫) যখন সে অসুস্থ হবে, তুমি তাকে দেখতে যাবে। (৬) এবং যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে।’ [ মুসলিম : ৫৭৭৮]

এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার সম্পর্কে মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা। কেননা মুমিন হবে পরিষ্কার মনের অধিকারী। তার অন্তর হবে অনাবিল ও সফেদ। তার হৃদয় হবে কোমল ও দয়ার্দ্র। মুমিন যখন রাতে শয়ন করে তখন সে আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে বলে পৃথিবীর কারও প্রতি তার একবিন্দু হিংসা বা দ্বেষ নেই।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَنَافَسُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا .

‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না এবং একে অন্যের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। বরং একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [মুসলিম : ৬৭০৫; মুসনাদ আহমদ : ৯০৫১]

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, মানুষের অন্তরের ব্যধিসমূহের অন্যতম হলো হিংসা-বিদ্বেষ। (আল্লাহ হেফাজত করুন) অনেকে মানুষকে সুখী দেখে হিংসা করে। তার অন্তরে আগুন জ্বলে। অথচ এই অর্বাচীন লোক ভুলে যায় যে এই রিজিক ও সম্পদ এভাবে আল্লাহই বণ্টন করেছেন। তাই আমাদের কর্তব্য কাউকে সুখ ও প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে থাকলে দেখলে মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা। যে আল্লাহ তাকে এত নেয়ামত ও প্রাচুর্য দিয়েছেন তার কাছে তার জন্য আরও বৃদ্ধির দু‘আ করা। তিনি যেন আমাকেও সম্পদ ও সুখ-প্রাচুর্য দেন সে প্রার্থনা তার কাছেই করা। সেই নেককারদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমাদেরও উচ্চারণ করা উচিত যারা বলতেন :

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (10)

‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ [সূরা আল-হাশর : ১০]

মুসলিমের প্রতি হিংসা না রাখা এবং তাদের জন্য হৃদয়ে ভালোবাসা লালন করা কত বড় আমল তা বুঝতে পারবেন একটি ঘটনা শুনলে। ঘটনাটি আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,

‘আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী ব্যক্তি উপস্থিত হবে।’ তারপর আনসারীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অযুর পানি ঝরছিল। বাম হাতে তার জুতো ধরা। পরদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ বললেন। প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। তৃতীয় দিন এলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একইরকম বললেন। এবারও প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বৈঠক ত্যাগ করলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ‘স তার পিছু নিলেন। তাকে তিনি বললেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া করেছি। এক পর্যায়ে কসম করেছি তিনদিন আমি তার কাছে যাব না। তুমি যদি আমাকে এ সময়টুকু তোমার কাছে থাকতে দিতে? তিনি বললেন, ঠিক আছে। আনাস রা. বলেন, আবদুল্লাহ বলতেন, তিনি তার সাথে তিনটি রাত অতিবাহিত করেছেন। তাকে তিনি রাতে নামাজ পড়তে দেখেননি। তবে এতটুকু দেখেছেন যে, রাতে যখন তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হন, তখন তিনি পাশ ফিরে ফজরের নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জিকির ও তাকবীরে লিপ্ত থাকেন। আবদুল্লাহ বলেন, তবে আমি তাকে ভালো ছাড়া কারও মন্দ বলতে শুনিনি। অতপর যখন তিন রাত অতিক্রম হলো এবং আমি তার আমলকে সামান্য জ্ঞান করতে লাগলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমার ও আমার পিতার মাঝে কোনো রাগারাগি বা ছাড়াছাড়ির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমার সম্পর্কে তিনদিন বলতে শুনেছি : ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী লোক উপস্থিত হবে।’ আর ঘটনাক্রমে তিনবারই তুমি উপস্থিত হয়েছো। এজন্য আমি তোমার সান্বিধ্যে এসেছিলাম তুমি কী আমল করো তা দেখতে। যাতে আমি তোমাকে অনুসরণ করতে পারি। আমি তো তোমাকে খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না। তাহলে তোমার কোন আমল তোমাকে রাসূলুল্লাহ বর্ণিত মর্যাদায় পৌঁছালো? ওই ব্যক্তি বলল, তুমি যা দেখলে তার বেশি কিছুই নয়। তিনি বলেন, যখন আমি ফিরে আসতে নিলাম, সে আমাকে ডাক দিলো। অতপর সে বললো, তুমি যা দেখলে তা তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। তবে মনে আমি কোনো মুসলিমকে ঠকানোর চিন্তা রাখি না এবং আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তাতে কোনো হিংসা বোধ করি না। আবদুল্লাহ বললেন, ‘এটিই তোমাকে ওই মর্যাদায় পৌঁছিয়েছে। আর এটিই তো আমরা পারি না।’ [মুসনাদ আহমদ : ১২৬৯৭]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাধ্যমত সাহায্য করা। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِى عَوْنِ أَخِيهِ

‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে।’ [মুসলিম : ৭০২৮; তিরমিযী : ১৪২৫]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাহায্য করা চাই সে যালেম হোক কিংবা মযলুম। আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا ، أَوْ مَظْلُومًا قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ.

‘তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অত্যাচারিতকে সাহায্য করার অর্থ তো বুঝে আসল, তবে অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরবে (তাকে যুলুম থেকে বাধা প্রদান করবে)।’ [বুখারী : ২৪৪৪; বাইহাকী : ১১২৯০] অর্থাৎ তুমি তোমার ভাইকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করবে। যদি সে জালেম হয় তাহলে যুলুম থেকে তার হাত টেনে ধরবে এবং তাকে বাধা দেবে। আর যদি সে মযলুম হয় তাহলে সম্ভব হলে তাকে সাহায্য করবে। যদিও একটি বাক্য দ্বারা হয়। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটি সবচে দুর্বল ঈমান।

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার দোষ গোপন রাখা এবং তার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা। এটি সবচে বড় হক। কারণ সে তো কোনো আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যশীল ফেরেশতা বা তাঁর প্রেরিত রাসূল নয়। সে মানুষ; ভুল তো তার হবেই। অতএব তার কোনো ভুল হলে তা গোপন রাখা উচিত।

আলিমগণ বলেছেন, ‘মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার হলো যারা মানুষের মাঝে তাকওয়া-পরহেযগারি ও নেক আমলের জন্য সুপরিচিত। তিনি যদি কোনো ভুল করেন বা তার কোনো পদস্খলন হয়ে যায়। তাহলে মুমিনদের কর্তব্য হলো তা গোপন রাখা। তার দোষ অপরের কাছে প্রকাশ না করা।

কেননা বিশুদ্ধ হাদীসে মুসনাদে আহমদ ও আবূ দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আবু বারযা আসলামী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِى بَيْتِهِ.

‘হে ওই সকল লোক যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে আর ঈমান তার হৃদয়ে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমের গীবত করবে না এবং তাদের দোষ খোঁজার পেছনে লেগে থাকো না। কেননা যে তাদের দোষ খোঁজায় লিপ্ত হয়, আল্লাহও তার পেছনে দোষ খোঁজেন। আর আল্লাহ যার পেছনে লাগেন তিনি তাকে তার বাড়িতেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।’ [মুসনাদে আহমদ : ১৯৭৯৭; আবূ দাউদ : ৪৮৮২]

আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা প্রকাশ্যে আল্লাহর নাফরমানি করে এবং গুনাহ প্রকাশ করে। তারা স্রষ্টা তথা আল্লাহকেও লজ্জা করে না আবার মানুষকেও লজ্জা করে না। এরা হলো ফাজের ও ফাসেক। এদের কোনো গীবত নেই।

ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বংশীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে বেশি মজবুত

প্রকৃত সম্পর্ক যা বিচ্ছেদে জোড়া লাগায় এবং বিভক্তিকে যুক্ত করে, সেটি হলো, দীনের সম্পর্ক এবং ইসলামের বন্ধন। যে সম্পর্ক ও বন্ধন পুরো ইসলামী সমাজকে একটি দেহের মতো একাত্ম করেছে। তাকে বানিয়েছে একটি প্রাচীরের মতো, যার ইটগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে লেগে থাকে। দেখুন, মানুষের মাঝে এত বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আরশ বহনকারী ও তাঁদের আশপাশের ফেরেশতাদের হৃদয় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলো। ইরশাদ হলো,

الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ (7)

‘যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, ‘হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আযাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন’। [সূরা আল-মুমিন : ৭]

আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে এ মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আরশ বহনকারী ও তার আশপাশের ফেরেশতা এবং পৃথিবীর বনী আদমের যে মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধন গড়ে ওঠেছে, যার কারণে এই পূণ্যময় দুআ ও প্রার্থনা, তা হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। কারণ তিনি ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা তাঁর প্রতি ঈমান রাখে’ (وَيُؤْمِنُونَ بِهِ) অর্থাৎ তাদের বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা ঈমান এনেছেন। আর বনী আদমের জন্য ফেরেশতাদের দু‘আ সম্পর্কে বলেছেন, (وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا) মুমিনদের (যারা ঈমান এনেছে) জন্য তারা ক্ষমা চায়। এখানে তাদের গুণও বলা হয়েছে ঈমান। এ থেকে বুঝা যায় মানুষ ও ফেরেশতাদের মাঝে সম্পর্কের একমাত্র বাঁধন হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। অতএব ঈমানই সবচে মজবুত বন্ধন।

একতা ও ঐক্যের আহ্বান

আমাদের কর্তব্য একে অপরকে সাহায্য করা এবং একে অন্যের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা। আমাদের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মতো আল্লাহ তা‘আলার সব বান্দা ভাই-ভাই হয়ে থাকা। এতেই আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (46)

‘আর তোমরা পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’ [সূরা আল-আনফাল : ৪৬]

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।’ [ সূরা আলে ইমরান : ১০৩]

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا

‘‌তোমরা একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [ বুখারী : ৬০৬৫; মুসলিম : ৬৬৯৫]

জামা‘আতের ওপর আল্লাহর হাত

আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং জেনে রাখুন জামা‘আত তথা দলের ওপর আল্লাহর হাত। সুতরাং আপনারা আপনাদের দীনী ভাইদের সঙ্গে থাকুন। তারা যেখানেই যান তাদের সঙ্গী হোন। আপনারা সবাই আলাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন এবং বিভক্ত হবেন না। মনে রাখবেন, একতাতেই শক্তি আর বিভক্তিতে দুর্বল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নবী (সঃ) এর ঘরে ঈদ

নবী ঘরে ঈদ

(আল্লাহ তাআলা আমাদের ও তোমাদের রোজা, তারাবির নামাজ ও অন্যান্য সকল নেক আমল কবুল করুক। আর তোমরা সারাটি বছর সুখে থাক।)

♥ মদীনার ইতিহাসে একটি আলোকোজ্জল দিন তথা ঈদের দিন সকাল বেলায় নবীঘর ও আশে পাশের সবকয়টি জায়গায় ঈদ উৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আর এ সব কিছুই হচ্ছিল মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখের সামনে। প্রত্যেকে ঈদ উৎসবে নিজ নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করছিল। তারা সকলেই চাইত তাদের নিজ নিজ অনুষ্ঠান সম্পর্কে যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবগত হন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালোবাসা ও সম্মানের খাতিরেই তারা এসব করেছিল।

এদিকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরের অবস্থা সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বর্ণনা হলো : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দুটি ছোট মেয়ে গান গাইতেছিল। তাদের দেখে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন।

ইতোমধ্যে আবু বকর রা. ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির কাছে শয়তানের বাশি?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা শুনে বললেন : মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও। অতঃপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য মনস্ক হলেন তখন আমি মেয়ে দুটিকে ইশারা করলে তারা বের হয়ে গেল।

হুজরা শরিফের খুবই নিকটে আরেকটি অনুষ্ঠান চলতেছিল, যেটির বর্ণনা দিয়েছেন স্বয়ং আয়েশা রা.। তিনি বলেন: ঈদের দিন আবি সিনিয়ার কিছু লোকজন লাঠি-শোঠা নিয়ে খেলা-দুলা করতেছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রা. কে ডেকে বললেন : আয়েশা তুমি কী দেখতে চাও? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি আমাকে তাঁর পিছনে দাড় করিয়ে দিলেন, আমার গাল তাঁর গালের উপর রাখলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন: হে বনি আরফেদা, তোমরা শক্ত করে ধর।

এরপর আমি যখন ক্লান্ত হয়ে গেলাম তখন তিনি বললেন, তোমার দেখা হয়েছে তো? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন: তাহলে এবার যাও। (বুখারী, মুসলিম)

নবীজির হুজরার সন্নিকটে আরেকটি স্পটে ঈদ উপলক্ষে আরেকটি অনুষ্ঠান শুরু হল। কতগুলো বালক নবীর শানে উচ্চাঙ্গের ও মানসম্পন্ন কবিতা আবৃতি করতে লাগল।

আয়েশা রা. বলেন: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা ছিলেন, ইত্যবসরে আমরা বাচ্চাদের চেচামেচি শুনতে পেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দেখলেন হাবশিরা খেলাদুলা করতেছে আর ছোট ছোট শিশুরা তাদের চারদিকে হৈ চৈ করতেছে। তিনি বললেন : আয়েশা এদিকে এসে দেখে যাও। অতঃপর আমি এসে আমার থুতনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গর্দানের উপর রেখে তার পিছনে থেকে তাকাতেছিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন: তুমি পরিতৃপ্ত হওনি? তুমি কী এখনও পরিতৃপ্ত হওনি? আমি তখন তার নিকট আমার অবস্থান পরীক্ষা করার জন্য বলতেছিলাম না এখনও হয়নি। হঠাৎ ওমর রা. এর আগমন ঘটল। সাথে সাথে লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করলেন: আমি দেখলাম জিন ও মানুষ শয়তানগুলো ওমরকে দেখে পালিয়ে গেল। (তিরমিজি)

ওরা যে কবিতাগুলো আবৃতি করতেছিল সেগুলো অর্থ বুঝা যাচ্ছিলনা, কেননা সেগুলো ছিল তাদের নিজস্ব ভাষায়। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কবিতাগুলোর অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মুসনাদ ও সহীহ ইবনে হিব্বানে আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, হাবশিরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এমন কিছু পাঠ করতেছিল যা তিনি বুঝতেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কী বলছে? সাহাবাগণ বললেন, ওরা বলছে : মুহাম্মদ সৎ ও নেককার বান্দা।

উপরোল্লেখিত আলোচনা থেকে আলেমগণ কয়েকটি বিষয় উদঘাটন করেছেন।

১. পরিবারের দেহ ও মন যেভাবে উৎফুল্ল হয় ঈদ মৌসুমে উদারতার সাথে তার আয়োজন করা শরীয়তসম্মত। সম্মানিত ব্যক্তি তার বয়স ও ষ্ট্যাটাজের দরূন যদিও সে নিজে আনন্দ উৎসবে জড়িত হতে পারে না বটে। তার জন্য যা মানানসই সে তাতে যোগ দেবে। কিন্তু পরিবারের যে সব সদস্যের বয়স কম তারা স্বভাবগতভাবেই ঐসব খেল-তামাশার দিকে ধাবিত হয়. তাদের জন্য শরীয়তের সীমার ভিতর থেকে খেলা-ধুলা ও আনন্দ-ফুর্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

২. ঈদ উৎসবে আনন্দ প্রকাশ করা দ্বীনের একটি প্রতীক। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি বালিকাকে গান গাইতে দেখে বারণ করেননি। শুধু তা-ই নয়, যখন আবু বকর রা. তাদের বাঁধা দিতে চাইলেন তখন তিনি আবু বকরকে নিষেধ করলেন।

অপর একটি রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে আবু বকর প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।

অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে- ইহুদিরা যাতে বুঝতে পারে, আমাদের ধর্মেও আনন্দ উৎসবের সুযোগ আছে। আর নিশ্চয় আমি উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।

৩. স্ত্রীর প্রতি সদয় আচরণ এবং তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে আনার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কেননা নারী জাতিকে নরম হৃদয় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তার প্রকৃতিগত স্বভাবের প্রতি কেউ সাড়া দিলে সে সহজেই তার দিকে ঝুকে পড়ে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ভালোবেসে কাছে টানার উত্তম দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তার ঘর ছিল মুহাব্বত, ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের উজ্জল নমুনা। আয়েশা রা. এর বর্ণনা, (আমার চোয়াল নবীর চোয়ালের সাথে মিশে গেল) দ্বারা স্ত্রীর প্রতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটুকু আন্তরিকতা ছিল তা প্রকাশ পাচ্ছে, যা ঈদ উপলক্ষে বাস্তবায়িত হয়েছে।

৪. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুউচ্চ মর্যাদা, তার ব্যক্তিত্ব ও সুমহান দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও তিনি আয়েশা রা. এর মনে তৃপ্তিদানের জন্য দাড়িয়ে থাকার মাঝে পিতা-মাতা, ভাই-বন্ধু ও স্বামীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। স্বামীগণ স্ত্রীদের আর পিতা-মাতা সন্তানদের মনোবাসনা পূরণ করার ব্যাপারে যদি এগিয়ে না আসে তাহলে স্ত্রী ও সন্তানদের মনে এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে। যা তাকে মানসিক ও সামাজিক ভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

৫. খেলা-ধুলায় ব্যস্ত হওয়ার সময় অবশ্যই শরীয়তের সীমারেখার ভিতর থাকতে হবে। কোন গুনাহে লিপ্ত হয়ে অথবা আল্লাহর বিধান নষ্ট করে কখনও খেলাধুলা করা যাবে না। আয়েশা রা. এর বক্তব্য বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন : আমি হাবশিদের খেলা দেখার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আড়াল করে ছিলেন। বর্ণনা থেকে বুঝা গেল যে মেয়ে দুটো গাইতেছিল তারাও ছিল নাবালেগা। তাই উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা মেয়েদের গাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া গান গাওয়া তাদের পেশা ছিল না। তারা শুধু কবিতা আবৃতির মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছিল যা শরীয়ত বহির্ভূত ছিল না।

ইসলামে ঈদ কোন ব্যক্তি কেন্দ্রীক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। তাই কিছু মানুষের আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে এর হক আদায় হবে না। বরং ঈদ হলো সমগ্র মুসলিম জাতির আনন্দ। শরীয়ত বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে। সবচেয়ে কাছের মানুষ পিতা-মাতা থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সকলে মিলে আনন্দ উপভোগ করবে। এটাই শরীয়তের দাবি। ঈদুল ফিতরের দিন সকাল বেলা সকল মুসলমানের জন্য খাবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি আরো পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর ঈদুল আজহার দিন কুরবানির ব্যবস্থা করেও তিনি ব্যাপারটি ফুটিয়ে তুলেছেন। পৃথিবীতে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন রীতি আদর্শ ফকির মিসকিনদের জন্য এমন ব্যাপকভাবে খাবার দাবারের আয়োজন করতে সক্ষম হয়নি।

তাই তো মুসলমানদের মধ্য থেকে মহান দানশীল ব্যক্তিবর্গ মানুষের প্রয়োজন মিটানোর ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ঈদ হলো আনন্দ, দয়া, ভালোবাসা ও মিল মুহাব্বতের আদান প্রদানের নাম। ইতিহাস স্বাক্ষ্য বহন করে, ঐ সকল মহামানবগণের আনন্দ পরিপূর্ণ হত না যতক্ষণ না তারা তাদের চারি পাশের ফকির ও অভাবী মানুষের প্রয়োজন মেটাতে না পারতেন। তাই তারা গরীব-দুঃখীকে খাবার খাওয়াতেন, তাদের মাঝে পোশাক বিতরণ করতেন এবং তাদের পাশে এসে দাড়াতেন।

সবচেয়ে বড় কথা হলো অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়া ও তাদের ইসলামের হাকীকত সম্পর্কে অবগত করানোর জন্য ঈদ একটি বড় ধরণের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কালামে এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন।

(لا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ) [الممتحنة:8].

আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ঐ সকল লোকের সাথে ভাল ব্যবহার করতে ও তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে নিষেধ করেন না যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেয়নি। (সূরা মুমতাহিনাহ : ৮)

ইসলামে ঈদ একটি সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ প্রতীক। যা দেহ ও মনের প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়। মাহে রমজান ও হজের মাসসমূহের ইবাদত বন্দেগির বাহক হিসাবে ঈদের আগমন ঘটে। ঐ সকল মাসের সব কয়টি ইবাদতই রূহের খোরাক যোগায়। এরশাদ হচ্ছে :

(قُلْ بِفَضْلِ اللّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُواْ) [يونس:58].

তুমি বল : আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত, এ নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। (সূরা ইউনুস : ৫৮)

আর শরীরের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে খেলা-ধুলা ও আনন্দ ফুর্তি ইসলামে বৈধ করা হয়েছে। আর এ কারণেই ঈদের দিনগুলোতে সিয়াম সাধনা হারাম করা হয়েছে। কেননা রোজা রেখে খানা-পিনা ছেড়ে দিয়ে ঈদ উদযাপন করা আদৌ সম্ভব নয়। সাহাবী আনাস রা. এর বর্ণনায় এর ইঙ্গিত বহন করে- তিনি বলেন :

قدِمَ رسولُ الله صلى الله عليه وسلم المدينةَ ولهم يومان يلعبون فيهما، فقال: “قد أبدَلكم الله خيراً منهما: يوم الأضحى ويوم الفطر” رواه أبو داود والنسائي.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন ইহুদিরা দুটি দিন খেলা-ধুলা ও আনন্দ ফুর্তি করে। তখন তিনি বললেন : আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন, তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন। (আবু দাউদ, নাসায়ী)

ইবনে জারির রা. দ্বিতীয় হিজরিতে সংঘটিত ঘটনাবলির মাঝে ঈদের নামাজের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এ বছরই মানুষদেরকে নিয়ে ঈদগাহে গমন করলেন এবং ঈদের নামাজ আদায় করেন, আর এটিই ছিল প্রথম ঈদের নামাজ।
আর এভাবেই মুসলিম উম্মাহ পরিপূর্ণ নেয়ামত কামেল শরীয়ত নিয়ে সয়ংসম্পন্ন হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে –

(وَلاَ تَتَّبِعْ أَهْوَاءهُمْ عَمَّا جَاءكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجاً) [المائدة:48].

তোমার নিকট যে হক এসেছে তা বাদ দিয়ে তুমি তাদের অনুসরণ করো না, কেননা আমি তোমাদের সকলকে শরীয়ত ও বিধান দান করেছি। (সূরা মায়েদা : ৪৮)

নবী জীবনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মূহুর্তই ছিল যেন ঈদের দিন, যারা তার সাথে উঠাবসা ও চলাফেরা করতেন, এবং তাঁর শরীয়তের আলোকরশ্মি দ্বারা আলোকিত হতেন তাদের জন্য। আর এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আশে পাশে সর্বদাই বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন প্রকৃতির লোকজনের ভিড় লেগে থাকত। বৈদেশিক প্রতিনিধি দল, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন, আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা এমনকি নারীরা পর্যন্ত তার নিকট শিক্ষা অর্জন করতে আসত। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশ বুঝে নিতেন হেদায়েত ও নেয়ামতের ভাণ্ডার থেকে।

কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য এ নেয়ামতের ধারা অবশ্যই চালু থাকবে। যে ব্যক্তি নবী আদর্শের উপর অটল থাকবে এবং তাঁর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে সেই দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হবে।

এরশাদ হচ্ছে :

(لَقَدْ مَنَّ اللّهُ عَلَى الْمُؤمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبْلُ لَفِي ضَلالٍ مُّبِينٍ) [آل عمران:164].

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন তাদের মাঝে তাদের থেকেই একজন রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে, যিনি তাদেরকে আয়াত পাঠ করে শুনান এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন, আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা ইতিপূর্বে প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪)

বইঃ ইত্তিবায়ে সুন্নাতের মাসায়েল

সৌদি আরব, রিয়াদে বিশিষ্ট ব্যক্তি জনাব মুহাম্মদইকবাল কিলানী সাহেব কুরআন ও সহীহ হাদিসসমূহের আলোকে ‘কিতাবু ইত্তিবায়িস সুন্নাহ’ নামে একটি প্রামান্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইনশাআল্লাহ হাদিস ও সুন্নাহ বিষয়ে এই পুস্তিকাটি শিক্ষার্থি ও সাধারণ মানুষের জন্য সমানভাবে উপকারি ও সহায়ক হবে বলে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস রেখে ‘কিতাবু ইত্তিবায়িস সুন্নাহ’ বাংলা ভাষায় অনুদিত হল।

বইটিতে আলোচিত হয়েছে:

  • সুন্নাহর পরিচয়,
  • কুরআনের দৃষ্টিতে সুন্নাহ,
  • সুন্নাহর ফযীলত ও গুরুত্ত,
  • সুন্নাহর মর্যাদা,
  • সুন্নাহর পরিবর্তে মানুষের মতামতের স্থান,
  • কুরআন বুঝার জন্য সুন্নাহর প্রয়োজনীয়তা,
  • সুন্নাহ মতে আমলের অপরিহার্যতা,
  • সাহাবীদের দৃষ্টিতে সুন্নাহ
  • ইমামের দৃষ্টিতে সুন্নাহ
  • বিদাতের পরিচয় এবং বিদাতের নিন্দা
  • বিদাত প্রচারের কারণ
  • হাদিস অস্বীকারের ফিতনা

এছারাও হাদিস অস্বীকারকারীদের অভিযোগ খন্ডন করে সংক্ষিপ্তাকারে অতি সুন্দর ভাবে হাদিস সংকলনের ইতিহাসও বর্নিত হয়েছে। এছাড়াও জাল ও দুর্বল হাদিস নিয়ে দ্বিধাদন্দ্বের জন্য জাল ও দুর্বল হাদিস নামে পরিশিষ্ট যোগ হয়েছে। সব মিলে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক পাঠিকাগণ এই পুস্তিকার মাধ্যমে হাদিস ও সুন্নাহের গুরুত্ত ও মর্যাদা, হাদিস সংকনের ইতিহাস, সুন্নাহের অনুসরণের আবশ্যকীয়তা, এবং বিদাতের অপকারিতা ও বিদাত থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ত ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা পেতে সক্ষম হবেন।

ডাউনলোড

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনাঃ মৃত্যুর পুর্বেই মরো

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনা : প্রয়োজন ও পদ্ধতি

পর্বঃ ১ । । পর্বঃ ২

সাতসকালে মনের সঙ্গে অঙ্গীকার

এখানে একটি পদ্ধতি দেয়া হল, সেটি হলো প্রতিদিন কয়েকটি কাজ করবে। প্রথম কাজ হলো, ‘সকালে ঘুম থেকে জেগে নফসের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার নেবে যে, আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো গুনাহ করব না। আমার দায়িত্বে যত ফরয, ওয়াজিব এবং সুন্নাত আছে সব ঠিকমত আদায় করব। আমার ওপর আল্লাহর যত হক আছে, বান্দার হক আছে সব পুরোপুরি আদায় করব। হে নফস! মনে রেখ, ভুলক্রমে অঙ্গীকারের বিপরীত কোনো কাজ করলে তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।’ এই হলো প্রথম কাজ এর নাম দিয়েছেন তিনি ‘মুশারাতা’ বা ‘আত্ম অঙ্গীকার’।

উপরের কথার সাথে একটু সংযোগ করে বলা যায়, এই ‘আত্ম অঙ্গীকারের’ পর আল্লাহর কাছে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আজ আমি গুনাহ করব না বলে অঙ্গীকার করেছি। আমি সব ফরজ, ওয়াজিব আদায় করব। শরীয়ত অনুযায়ী চলবো। হুকুল্লাহ এবং হুকুকুল ইবাদ সঠিকভাবে আদায় করবো। কিন্তু ইয়া মাবুদ, আপনার তাওফীক ছাড়া এই প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেহেতু আমি পণ করেছি, তাই আপনি আমাকে তাওফীক দিন। আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা থেকে রক্ষা করুন। পুরোপুরিভাবে এ প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

পুরো দিন নিজের আমলের ‘মনযোগ’

এ দু‘আ করে জীবিকার জন্য বেরিয়ে যাও। চাকরি করলে চাকরিতে, ব্যবসা করলে ব্যবসায়, দোকান করলে দোকানে চলে যাও। সেখানে গিয়ে এই কাজ করো যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে একটু ভেবে দেখ, এই কাজটি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কি-না। এই শব্দ যা উচ্চারণ করছি তা প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী কি-না। যদি প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী মনে হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করো। এটাকে তিনি বলেছেন ‘মনযোগ’। এটাই হলো দ্বিতীয় কাজ।

শোয়ার আগে মুহাসাবা

তৃতীয় কাজটি করতে হবে শোয়ার আগে, আর তা হলো ‘মুহাসাবা’ অর্থাৎ নফসকে বলবে, তুমি সারাদিন গুনাহ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। প্রতিটি কাজ শরিয়তমত করবে। হুকুকুল্লাহ তথা আল্লাহর হক ও হুকুকুল ইবাদ তথা বান্দার হক ঠিক মত আদায় করবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। এখন বলো কোন কাজ তুমি প্রতিজ্ঞামত করেছ, আর কোন কাজ প্রতিজ্ঞামত কর নি? এভাবে সারাদিনের সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করবে। সকালে যখন বাড়ি ত্যাগ করলে তখন অমুক লোককে কি বলেছ? চাকরি ক্ষেত্রে গিয়ে নিজ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছ? ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করেছ? হালালভাবে না হারাম পদ্ধতিতে? যত লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের হক কিভাবে আদায় করেছ? বিবি, বাচ্চার হক কিভাবে আদায় করেছ? এভাবে যাবতীয় কাজের হিসাব নেয়াকে ‘মুহাসাবা’ বলা হয়।

অতঃপর শুকরিয়া আদায় কর

এই ‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই হয় যে, ‘সকালের প্রতিজ্ঞায় তুমি সফল’ তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। বলো, হে আল্লাহ! তোমার অশেষ শুকরিয়া যে, তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দিয়েছ। (আল্লহুম্মা লাকাল হামদু ওয়া লাকাশ শুকুর) শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা‘আলা তা বৃদ্ধি করে দেন। তাই আগামী দিনেও প্রতিজ্ঞায় অটল থাকার তাওফীক দেবেন।

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

﴿ وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧ ﴾ [ابراهيم: ٧]

‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৭}

অতএব প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে ভবিষ্যতে নেয়ামত বৃদ্ধি করা হবে এবং অতিরিক্ত নেকীও অর্জন হবে।

অন্যথায় তাওবা কর

‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই দাঁড়ায় যে, অমুক স্থানে প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী কাজ করেছো, অমুক সময় প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছো, পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছো এবং স্বীয় কৃত প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারো নি, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাওবা করো, বলো, ‘হে আল্লাহ! আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায়, প্রবৃত্তির তাড়নায় প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারিনি। হে মাবুদ! আমি তোমার কাছে তাওবা করছি এবং ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি আমার তাওবা কবুল করে আমার পাপ মাফ করে দাও। ভবিষ্যতে আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করো।

নফসকে শাস্তি প্রদান কর

তাওবার সাথে সাথে নফসকে একটু শাস্তিও দাও। নফসকে বলো, তুমি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কাজ করেছ, সুতরাং শাস্তি স্বরূপ তোমাকে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করতে হবে। এ শাস্তিটা প্রভাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সময়ই নির্ধারণ করো। সুতরাং রাতে নফসকে বলবে, তুমি নিজের সুখ-শান্তির জন্য, সামান্য আনন্দ উপভোগের জন্য আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে লিপ্ত করেছ। অতএব এখন তোমাকে সাজা ভোগ করতে হবে। তোমার শাস্তি হলো, এখন শোয়ার আগে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করো। তারপর বিছানায় যাও। এর আগে বিছানায় যাওয়া নিষেধ।

শাস্তি হওয়া চাই পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ

আমার সম্মানিত উস্তাদ বলতেন, এমন শাস্তি নির্ধারণ করো যা হবে ভারসাম্যপূর্ণ, সঙ্গতিপূর্ণ ও পরিমিত। এতো বড় ধরনের শাস্তি দিও না যে, নফস বিগড়ে যায়। আবার এতো ছোট ও হালকা শাস্তি দিও না যে, তাতে নফসের কোনো কষ্টই না হয়।

হিন্দুস্তানে স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে নিয়ম করলেন, প্রত্যেক ছাত্রকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। যারা সালাতে অনুপস্থিত থাকবে তাদের জরিমানা দিতে হবে। এক ওয়াক্ত সালাতের জরিমানা সম্ভবত এক আনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফল দাঁড়ালো উল্টা। যেসব ছাত্রের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল, তারা এক মাসের সব সালাতের জরিমানা অগ্রিম জমা দিয়ে বলতো, এই হলো এক মাসের সমুদয় সালাতের জরিমানা। সুতরাং একমাস সালাত আদায় থেকে ছুটি।

তিনি রহ. বলতেন, এত অল্প ও মামুলি অর্থদণ্ড হওয়া সমীচীন নয়, যা একেবারেই জমা দিতে পারে। আবার এত বেশি হওয়াও ঠিক নয় যে, মানুষ তা থেকে পলায়ন করে। বরং মধ্যম ধরনের ও ভারসাম্যপূর্ণ শাস্তি নির্ধারণ করা উচিৎ। উদাহরণ স্বরূপ যেমন আট রাকাত নফল সালাত শাস্তি নির্ধারণ করা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাজা।

একটু সাহস করতে হবে

মোটকথা, আত্মশুদ্ধি করতে হলে হাত-পা নাড়াতে হবে, একটু একটু হিম্মৎ করতে হবে, কমবেশি কষ্ট সহ্য করতে হবে এবং এর জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও দুরন্ত ইচ্ছা করতে হবে। শুধু ঘরে বসে বসে নফসের তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি হতে পারে না। তাই শাস্তি নির্ধারণ করে নাও যে, নফস ভুল পথে গেলে আট রাকাত নফল সালাত তাকে অবশ্যই পড়তে হবে। নফস যখন বুঝতে পারবে যে, আট রাকাত নফল পড়ার নতুন আপদ খাড়া হয়েছে, তখন সে ভয়ে গুনাহ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। নিজের নফস এভাবে আস্তে আস্তে সঠিক পথে উঠে আসবে। ভবিষ্যতে আর তোমাকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে না ইনশাল্লাহ।

করতে হবে শুধু চারটি কাজ

উপদেশের সার সংক্ষেপ হলো, ‘মাত্র চারটি কাজ করো’।

এক. সকালে মোশারাতা বা আত্ম অঙ্গীকার।

দুই. সব কাজের সময় মুরাকাবা।

তিন. রাতে শোয়ার আগে মুহাসাবা।

চার. নফস প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে মো‘য়াকাবা বা শাস্তি প্রদান।

ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে

একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, শুধু দু’চারদিন এ আমল করে এ কথা ভাবা উচিৎ নয় যে, ব্যাস আমি পূর্ণতায় পৌঁছে গেছি, আমি বুযুর্গ হয়ে গেছি। বরং ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে। কখনো তুমি নফসের ওপর বিজয়ী হবে আবার কখনো শয়তান বিজয়ী হবে। কিন্তু এতে ঘাবড়ালে চলবে না। আমল ছেড়ে দেয়া যাবে না। কারণ, এতে আল্লাহর কোনো রহস্য ও হেকমত লুকায়িত থাকতে পারে। ইনশাআল্লাহ এভাবে জয়-পরাজয় ও উন্নতি-অবনতির পথ ধরে একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

এ আমল করে প্রথম দিনই যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাও, তবে ‘আমি অনেক বড় কিছু বনে গেছি’- এ ধরনের আত্মতুষ্টি বা হামবড়া ভাব তোমাকে বিভ্রান্ত করবে। সুতরাং এ আমলে কখনো সফলতা আবার কখনো ব্যর্থতার দেখা মিলবে। যেদিন সফলতা আসবে, সেদিন শুকরিয়া আদায় করবে। যেদিন ব্যর্থতা আসবে, সেদিন তওবা-ইস্তেগফার করবে। নিজের নফসের ওপর শাস্তি জারি করবে এবং নিজের খারাপ আমলের ব্যাপারে অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করবে। ‘এ অনুতাপ মানুষকে নিম্ন থেকে অনেক উচ্চে পৌঁছিয়ে দেয়’।

অনুশোচনা ও তওবা দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি পায়

মানুষ যদি আপন কৃতকর্মের প্রতি খাঁটি মনে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার এত বেশি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যার কল্পনাই সে করতে পারে না।

শায়খ আবদুল হাই রহ. বলতেন, যখন কোনো বান্দা পাপ করে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তা‘আলা সেই বান্দাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি যে ভুল করে পাপাচারে লিপ্ত হয়েছ, যা তোমাকে আমার সাত্তার (দোষ গোপনকারী) গাফ্ফার (ক্ষমাশীল) ও রহমান (দয়াশীল) গুণের আশ্রয়প্রার্থী বানিয়েছে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলবাহী বনে গেল।

হাদীসে এসেছে, ঈদের দিনে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের কাছে স্বীয় ইজ্জত ও জালাল তথা মর্যাদা ও মাহত্মের শপথ করে বলেন, আজ এসব লোকেরা সমবেত হয়ে কর্তব্য পালন করছে। আমাকে ডাকছে, ক্ষমা প্রার্থনা করছে এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তুর আবেদন জানাচ্ছে। আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, আমি তাদের দু‘আ কবুল করব। তাদের গুনাহসমুহকে নেকী দ্বারা বদলে দেব।

যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, (দীর্ঘ হাদীসের শেষের দিকে গিয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ বলেন,

« فَإِنِّي أُشْهِدُكُمْ يَا مَلَائِكَتِي أَنِّي قَدْ جَعَلْتُ ثَوَابَهُمْ مِنْ صِيَامِهِمْ شَهْرَ رَمَضَانَ وَقِيَامَهُ رِضَائِي وَمَغْفِرَتِي، وَيَقُولُ: يَا عِبَادِي، سَلُونِي فَوَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا تَسْأَلُونِي الْيَوْمَ شَيْئًا فِي جَمْعِكُمْ لِآخِرَتِكُمْ إِلَّا أَعْطَيْتُكُمْ، وَلَا لِدُنْيَاكُمْ إِلَّا نَظَرْتُ لَكُمْ فَوَعِزَّتِي لَأَسْتُرَنَّ عَلَيْكُمْ عَثَرَاتِكُمْ مَا رَاقَبْتُمُونِي، فوَعِزَّتِي لَا أَخْزِيكُمْ وَلَا أَفْضَحُكُمْ بَيْنَ يَدَيْ أَصْحَابِ الْحُدُودِ، انْصَرِفُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ أَرْضَيْتُمُونِي وَرَضِيتُ عَنْكُمْ، فَتَفَرَحُ الْمَلَائِكَةُ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِمَا يُعْطِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَذِهِ الْأُمَّةَ إِذَا أَفْطَرُوا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ » .

‘হে আমার ফেরেশতারা, আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের রমযান মাসের সিয়াম সাধনা এবং কিয়ামুল লাইল বা সালাতে রাত্রি জাগরণের বিনিময়ে প্রতিদান এই দিলাম যে তাদের পাপসমূহ মার্জনা করে দিলাম আর আমি তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। তারপর তিনি বলেন, হে আমার বান্দা, আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, তোমাদের এই আখিরাতের সমাবেশে আমার কাছে যা-ই চাইবে আমি তা দিয়ে দেব। আর তোমাদের দুনিয়ার যার কথাই বলবে আমি তার প্রতি দৃষ্টি দেব। আমার ইজ্জতের কছম, আমি অবশ্যই তোমাদের ওই অপরাধগুলো ক্ষমা করব যা আমার পর্যবেক্ষণে তোমরা করেছিলে। আমার ইজ্জতের কছম, আমি তোমাদেরকে শাস্তিপ্রাপ্তদের সামনে লজ্জিত করব না, অপমানিত করব না। তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে (ঘরে) প্রত্যাবর্তন কর। তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছ; আমিও তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। তখন এই উম্মতের রমযানের সিয়াম সাধনা সমাপ্তিতে আল্লাহ জাল্লা শানুহূর প্রতিদান দেখে ফেরেশতুকূল আনন্দিত হবেন এবং তাঁরা সুসংবাদ পেয়ে আহ্লাদিত হবেন।[1]

এখন প্রশ্ন জাগে, এসব গুনাহ নেকী দ্বারা কিভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে? উত্তর হলো, মানুষ ভুল করে যখন কোনো পাপকাজ করে এবং সে অনুতাপ ও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, আল্লাহকে কাতরভাবে ডেকে বলে, ‘হে মাবুদ, অজ্ঞাতে অবহেলায় এ অন্যায় করে ফেলেছি। দয়া করে মাফ করেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা শুধু মাফই করেন না, বরং এর বদৌলতে তার মর্যাদাও বৃদ্ধি করে দেন। এভাবে এ গুনাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়ে যায় এবং তার জন্য সুফল হিসেবে আবির্ভূত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٧٠ ﴾ [الفرقان: ٦٩]

‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। {সূরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৬৯}

গুনাহ আমার কী ক্ষতি করবে?

ভারতের উত্তর প্রদেশে নাজমুল হাসান নামক একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সবসময় নেককার আলেমদের সোহবতে থাকতেন। তিনি একজন বড় মাপের আবেদও ছিলেন। তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁর একটি পংক্তি আমার ভালো লাগে এবং বারবার মনে পড়ে। যার অর্থ হলো-

অনুতাপ প্রকাশের পেয়ে গেছি ধন,

পাপ আর করবে কি অহিত সাধন।

অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু আমাদেরকে অনুতাপ অনুশোচনা ও রোনাজারি দান করেছেন, আর আমরা দু‘আও করছি, ‘হে আল্লাহ! আমার এ অপরাধ ক্ষমা করে দিন’ তাই এ গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না।

গুনাহ আল্লাহ তা‘আলারই সৃষ্টি। আর হিকমত ছাড়া কোনো কিছুই তিনি সৃষ্টি করেন না। গুনাহ তৈরির হিকমত হলো- গুনাহ করার পর তাওবা করলে, অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করলে এবং ভবিষ্যতে না করার প্রতিজ্ঞা করলে এ তাওবার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যা কল্পনায়ও ছিলো না।

আজীবন লড়াই চলবে

সুতরাং রাতে ‘মুহাসাবা’ করার সময় যখন জানতে পারবে গুনাহ সংঘটিত হয়েছে, তখন তাওবা ও ইস্তেগফার করবে। আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, হতাশ হবে না। কারণ, জীবনটা এক ধরনের লড়াইয়ের নাম। মৃত্যু পর্যন্ত নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আর লড়াইয়ের অমোঘ নিয়ম হলো, কখনো তুমি জিতবে, কখনো প্রতিপক্ষ জিতবে। তাই শয়তান তোমাকে পরাজিত করলে সাহস হারিয়ে বসে পড়ো না বরং পুনরায় সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে শয়তানের সাথে লড়াই করো। ‘সাহস না হারিয়ে পুনরায় মোকাবেলার জন্য দাঁড়ালে শেষ বিজয় আমাদেরই হবে’ -এ ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ تِلۡكَ ٱلدَّارُ ٱلۡأٓخِرَةُ نَجۡعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوّٗا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فَسَادٗاۚ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ٨٣ ﴾ [القصص: ٨٣]

‘এই হচ্ছে আখিরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা যমীনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য’। {সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৮৩}

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱللَّهِ وَٱصۡبِرُوٓاْۖ إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦۖ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ١٢٨ ﴾ [الاعراف: ١٢٨]

‘মূসা তার কওমকে বলল, ‘আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।’ {সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ১২৮}

অগ্রসর হও, আল্লাহ স্বাগতম জানাবেন

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩ ﴾ [العنكبوت: ٦٩]

‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন’। {সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৯}

‘যারা আমার পথে জিহাদ করে’ অর্থাৎ নফস ও শয়তানের সাথে তোমরা এভাবে লড়াই করবে যে, শয়তান তোমাদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে, আর তোমরা তার মোকাবেলা করছ এবং মরণপণ প্রচেষ্টায় ভ্রান্ত পথ থেকে বেঁচে চলছ, তবে আমার প্রতিশ্রুতি রইল যে, অবশ্যই অবশ্যই আমি প্রচেষ্টাকারী ও লড়াইকারীদের নিজের রাস্তার সন্ধান দেব।

আয়াতটি বুঝাতে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, শিশু যখন হাঁটা শুরু করে, বাবা-মা তখন তাকে চলতে ও হাঁটতে শেখায়। একটু দূরে দাঁড় করে দিয়ে বলে ‘এদিকে এসো’। বাচ্চা যদি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সামনে পা না বাড়ায়, তাহলে বাবা-মাও দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে কোলে নেয় না। কিন্তু বাচ্চা এক পা ফেলে অপর পা ফেলতে পড়ে যেতে লাগলে বাবা-মা পড়ে যাওয়ার আগেই তাকে ধরে ফেলে এবং পরম স্নেহে কোলে নেয়। কারণ বাচ্চা তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে।

এমনিভাবে মানুষ আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করলে, তার পথে পা বাড়ালে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন না, এগিয়ে এসে তাকে ধরবেন না, এমনটি হতেই পারে না। বরং এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াদা দিচ্ছেন, তোমরা চলতে শুরু করলে আমি এগিয়ে গিয়ে তোমাদের হাত ধরব। সরাসরি তোমাদের সাহায্য করব। অতএব সাহসিকতার সাথে নফস ও শয়তানের মোকাবেলা করো। তাঁর দরবারে হতাশার স্থান নেই। অন্যায় হলেও নিরাশ হয়ো না, চেষ্টা অব্যাহত রাখ। ইনশাআল্লাহ একদিন সফল হবেই।

সারকথা হলো, তুমি তোমার কাজ করো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাজ অবশ্যই করবেন। মনে রেখ, তোমার কাজে ত্রুটি হতে পারে কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতির কোনো সম্ভাবনা নেই। তুমি পা বাড়ালে তিনি পথ খুলে দেবেন। এ দিকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে, মরার আগে মরো আর হিসাবের আগেই হিসাব করো।

আল্লাহর সামনে কী জবাব দেবে?

একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, মুহাসাবার একটি পদ্ধতি হলো, তুমি কল্পনা করো ‘এখন তুমি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছো, তোমার হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে, আমলনামা পেশ করা হচ্ছে, তোমার আমলনামায় যেসব অপকর্ম ছিল সকলের সামনে তা উন্মোচিত হচ্ছে এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রশ্ন করছেন- এ অপকর্ম তুমি কেন করেছ?’

এর উত্তরে তখন কি বলবে? আজ কোনো মৌলবী সাহেব যখন তোমাকে বলে, অমুক কাজ করো না, দৃষ্টির হেফাজত করো, সুদ-ঘুষ থেকে বেঁচে চলো, মিথ্যা বলো না, গীবত করো না, টিভি দেখো না, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানাদিতে পর্দাহীনতা থেকে বেঁচে চলো। উত্তরে তোমরা তাদেরকে বলে থাক, আমরা কি করব, যুগটাই খারাপ। পৃথিবী উন্নতি ও সভ্যতার শিখরে পৌঁছে গেছে। মানুষ চাঁদে গেছে। আমরা কি তাদের থেকে পিছিয়ে থাকব? দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে পড়ব? বর্তমান সমাজে চলতে গেলে এসব না করে উপায় নেই।

এ উত্তর মৌলবীদের দিতে পারো। কিন্তু কিয়ামতের ভয়ংকর দিবসে মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর সামনে এ অজুহাত দেখাতে পারবে কি? বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলো, এ জবাব যদি সেখানে না চলে এখানে কিভাবে চলবে?

আল্লাহর কাছে সাহস ও প্রত্যয় প্রার্থনা করো

তোমরা যদি আল্লাহর কাছে এ উত্তর দাও যে, ‘হে আল্লাহ! সমাজ ও পরিবেশের কারণে অপারগ হয়ে আমি গুনাহ করতে বাধ্য হয়েছি’। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, ‘অপারগ তুমি ছিলে না আমি ছিলাম?’ তোমরা উত্তর দেবে, ‘ওহে মাবুদ! আমিই অপারগ ছিলাম’। আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন, ‘তবে তুমি তোমার অপারগতা দূর করার প্রার্থনা করোনি কেন? আমি কি তা দূর করতে সক্ষম ছিলাম না? আমার নিকট দু‘আ করতে, হে আল্লাহ! আমি অপারগ, আপনি আমার অপারগতা দূর করে দিন, নয়তো আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে শাস্তি দেবেন না।

বলুন! আল্লাহ তা‘আলার এ পাল্টা প্রশ্নের কোনো উত্তর আছে কি? না থাকলে একটি কাজ করুন, আর তা হলো, নিজেদেরকে যে কাজ করতে অপারগ দেখছেন, চাই বাস্তব সম্মত অপারগতা হোক আর সামাজিক অপারগতাই হোক এ ব্যাপারে প্রতি দিন দু‘আ করুন, ‘হে আল্লাহ! আমার সামনে এই অপারগতা। আমি এ থেকে বাঁচার সাহস পাচ্ছি না। আপনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ অপারগতা ও সাহসহীনতা দূর করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সাহস ও হিম্মৎ দান করুন। আমীন।

আল্লাহর দানের ভাণ্ডারে কোনো অভাব নেই

মোটকথা, আল্লাহর কাছে চাও, প্রার্থনা কর। অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত, আল্লাহর কাছে চাইলে তাকে অবশ্যই দেবেন। না চাইলে দেবেন কী? রোগের ব্যথায় কাতরতা না থাকলে, গুনাহ থেকে বাঁচার আকুলতা না থাকলে তাকে চিকিৎসা দেবে কে? প্রার্থনাকারীকে দেয়ার জন্য আল্লাহর ভাণ্ডার সদা উন্মুক্ত।

সকাল-সন্ধ্যা যে চারটি আমলের কথা বলা হলো, এর ওপর আমল করলে আলোচ্য বাণী তথা ‘মরার আগেই মরো, হিসেবের আগেই নিজের হিসাব করো’ অনুযায়ী আমলকারী হিসেবে গণ্য হওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দান করুন, ক্ষমা করুন এবং এসব কথার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


[1]. বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান : ৩৪২১; দিমইয়াতী, আত-মুতজিরুর-রাবেহ : ১৩৩। ইবনুল মুনযিরী রহ. বলেন, হাদীসটি ইবন হিব্বান সংকলন করেছেন কিতাবুছ-ছাওয়াব অধ্যায়ে, তেমনি বাইহাকী হাদীসটি সংকলন করেছেন ফাযাইলুল আওকাত অধ্যায়ে। হাদীসের সনদে এমন কেউ নেই যার ‘যঈফ’ হবার ব্যাপারে সবাই একমত। [আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব : ২/৬১]

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনাঃ মৃত্যুর পুর্বেই মরো

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনা : প্রয়োজন ও পদ্ধতি

পর্বঃ ১ । । পর্বঃ ২

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সলাতু ওয়াস সলামু আ’লা রসুলুল্লাহ। মৃত্যুর পুর্বেই মরো!! আমাদের প্রত্যেকেরই এই নিশ্চিত বিষয়টি মাথার উপরে ঝুলছে অথচ আমরা গাফেল। তাই মুহাসাবা সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করা হল। আল্লাহ আমাদের এথেকে জেনে বুঝে আমালের তাওফীক দান করুন আমীন।

মৃত্যু সুনিশ্চিত বিষয়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر، يوم لا تخفى عليكم خافية.

‘তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো। সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।’

মায়মূন ইবন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

لاَ يَكُونُ العَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ.

‘সে অবধি কোনো ব্যক্তি মুত্তাকী বা আল্লাহভীরু হতে পারবে না যাবৎ সে নিজেই নিজের হিসেব নেয় বা মুহাসাবা করে। যেভাবে সে তার সঙ্গীর সঙ্গে হিসেব করে কোথায় তার আহার আর কোথায় তার পোশাক।

মৃত্যু আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নেই কোনো দ্বিধা বা সংশয়। এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করে নি। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, রাসূলকে অস্বীকার করেছে, কিন্তু মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারে নি। পৃথিবীতে আসলে একদিন যেতে হবে, মৃত্যুর তেতো স্বাদ নিতে হবে এ কথা সবাই মানে। আবার এ ব্যাপারেও সবাই একমত, ‘মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। হতে পারে মৃত্যু এখনই এসে পড়বে কিংবা এক মিনিট, এক ঘন্টা, একদিন, এক সপ্তাহ অথবা এক বছর পর আসবে। কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞানের গবেষণা উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছলেও ‘কে কখন কোথায় মরবে’ এ তথ্য দিতে পারছে না।

মৃত্যুর পূর্বেই মরার ব্যাখ্যা

মৃত্যুর আগমন যেহেতু সন্দেহাতীত, এর দিন-ক্ষণ জানাও সাধ্যাতীত, তাই অপ্রস্তুত অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, আল্লাহ জানেন ওপারে সে কোনো অবস্থার সম্মুখীন হবে। এমন যেন না হয়, ওপারে পৌঁছে আল্লাহর আযাব বা ক্রোধের মুখে পড়তে হয়। অসন্তোষ বা অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সাহাবী বলেন, এই রুঢ় বাস্তব ‘মৃত্যু’ আসার পূর্বেই মরো।

কিভাবে মরবে? মরার আগে মরার ব্যাখ্যা কী? উলামায়ে কেরাম এর দু’ রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. প্রকৃত মৃত্যু আগমনের পূর্বে আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এর পরিপন্থি মনের সকল কামনা-বাসনা এবং পাপ, নাফরমানী ও অবৈধ কাজ করার যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, সব কিছুকে পদদলিত ও মথিত করে দাও। ধ্বংস ও বিনাশ করে দাও। দুই. মরণের আগে মরণের চিন্তা ও ধ্যান করো। চিন্তা করো, একদিন আমাকে এ জগৎ ছেড়ে যেতে হবে খালি ও রিক্ত হাতে। টাকা-পয়সা সাথে যাবে না। সন্তানাদি, কুঠি-বাংলো, বন্ধু-বান্ধব কেউ সাথে যাবে না, বরং যেতে হবে একাকী, শূন্য হাতে। এসব একটু ভেবে দেখো।

বাস্তব কথা হলো, পৃথিবীতে আমাদের মাধ্যমে যত অনাচার, পাপাচার সংঘটিত হয়, গুনাহ নাফরমানী প্রকাশ পায় এর বড় কারণ হলো, ‘মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া’। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, স্বাস্থ্য ভালো আছে, হাত-পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল আছে, ততদিন মানুষ নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবে। আকাশ কুসুম কল্পনা ফাঁদে। অহংকার ও আত্মগৌরব করে। অন্যের ওপর জুলুম করে। অপরের অধিকার হরণ করে। মানুষ এসব যৌবনকালে অবলীলায় করতে থাকে। ‘তাকে একদিন মরতে হবে’ এ কথা তার কল্পনাতেই আসে না। আপনজনের জানাযা বহন করে, নিজ হাতে প্রিয়জনকে কবরস্থ করে, তবুও ভাবনার পরিবর্তন হয় না। মনে করে, সেই তো মরেছে, আমি তো আর মরি নি। এভাবে উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতার ভেতর দিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, ফলে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায় না।

দুটি বড় নেয়ামত ও আমাদের উদাসীনতা

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ » .

‘আল্লাহর দেয়া দু’টি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ লোকই প্রবঞ্চনায় লিপ্ত।

এক. সুস্থতার নেয়ামত। দুই. অবসরের নেয়ামত।[1]

মনে হয় ‘সুস্থতার নেয়ামত চিরকালই অক্ষুন্ন থাকবে’। ফলে সুস্থকালে পুণ্য ও নেকীর কাজের তাগাদা বোধ হয় না। কাল করব, পরশু করব- এভাবে পেছায়। এক সময় নেয়ামত ফুরিয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘অবসর বা সুযোগ’ নেয়ামতেরও মূল্যায়ন করা হয় না। এখন কাজ করার সময় ও সুযোগ আছে; কিন্তু মানুষ ভালো কাজ করে না এ ভেবে যে, এখনো সময় আছে; পরে করে নেব ইত্যাদি।

যৌবন এখনো অটুট আছে, তারুণ্যের ইস্পাত শক্তি বলে বলবান তরুণ পাহাড়-পর্বত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। অনেক শ্রম ও কষ্টসাধ্য কাজ করতে পারে। চাইলে এই যৌবনে অনেক ইবাদত করতে পারে। আল্লাহর পথে ত্যাগ ও সাধনা করতে পারে। সৃষ্টির সেবা করতে পারে। আল্লাহকে খুশি করার জন্য আমলমানায় নেকীর স্তুপ গড়তে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কে এ কথা বসে গেছে, আমি এখনো যুবক আছি, এখন একটু যৌবনের স্বাদ গ্রহণ করি। ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজ করার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। এগুলো পরে করবো। এভাবে সে নেক কাজ টলাতে থাকে। যৌবন কখন শেষ হয়ে যায় তা টেরই পায় না। দুর্বল হয়ে পরে। ফলে ইবাদত ও নেক কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর করতে পারে না। কারণ এখন তার দেহে শক্তি নেই। স্বাস্থ্য ভালো নেই। অবসরের সংকট ও কাজের ব্যস্ততা এতো বেশি যে, এসবের জন্য সময়ই বের করতে পারে না। এর একমাত্র কারণ হলো, মানুষ মৃত্যু থেকে উদাসীন। মৃত্যুর কথা স্মরণ করে না।

শায়খ বাহলুল রহ. -এর শিক্ষামূলক ঘটনা

বাদশা হারুনুর রশীদের আমলে ‘বাহলুল’ নামক বড় এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহওয়ালা এ ব্যাক্তির সাথে বাদশা হাস্য-কৌতুক করতেন। পাগল হলেও জ্ঞানী সুলভ কথা বলতেন। বাদশা তার প্রহরীকে বলে রেখেছিলেন, এ ব্যক্তিটি আমার সাক্ষাতে যখনই আসতে চায়, তখনই তাকে আসতে দিও। সুতরাং যখন খুশি তিনি রাজ দরবারে হাজির হতেন।

একদিন তিনি দরবারে প্রবেশ করে বাদশা হারুনুর রশীদের হাতে একটি ছড়ি দেখতে পেলেন। হারুনুর রশীদ কৌতুক করে বললেন, ‘বাহলুল সাহেব তোমার কাছে একটা অনুরোধ রাখব’। বাহলুল বললেন, কী অনুরোধ? হারুনুর রশীদ তাকে ছড়িটি দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমাকে আমানত স্বরূপ দিচ্ছি’। পৃথিবীর বুকে তোমার চেয়ে বড় কোনো বেকুব যদি খুঁজে পাও তাকে আমার পক্ষ থেকে এটি উপহার দেবে।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ বলে ছড়িটি বাহলুল নিজের কাছে রেখে দিল। আসলে বাদশা ঠাট্টা করে বাহলুলকে এটাই বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তোমার চেয়ে বড় নির্বোধ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। যা হোক তখনকার মতো বাহলুল ছড়ি নিয়ে দরবার থেকে চলে গেল।

কয়েক বছর পরের ঘটনা। একদিন বাহলুল জানতে পারল, হারুনুর রশিদ খুব অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তাঁর চিকিৎসা চলছে, কিন্তু কোনো ফল দিচ্ছে না। বাহলুল বাদশার শুশ্রুষার জন্য তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমিরুল মুমিনীন কেমন আছেন?’ বাদশা বললেন, ‘অবস্থা আর কি, সামনে সুদূর সফর উপস্থিত’।

– বাহলুল জিজ্ঞেস করল, ‘কোথাকার সফর?’

– আখেরাতের সফর! এখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি।

– কতদিন পর ফিরে আসবেন?

– আরে ভাই! এটাতো আখেরাতের সফর। এ সফরে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না।

– আচ্ছা আপনি তো এ সফর থেকে আর ফিরবেন না, তাই সফরে আরাম ও সুবিধার জন্য কী কী ব্যবস্থা করেছেন?

– তুমি দেখি আবার নির্বোধের মত কথাবার্তা বলতে শুরু করেছ। আখেরাতের সফরে কেউ সঙ্গে যেতে পারে নাকি? এ সফরে বডিগার্ড, সৈন্য-লশকর কেউ সাথে যেতে পারে না। সঙ্গীহীন একাকী যেতে হয়। এ এক মহা সফর।

– এত দীর্ঘ সফর! সেখান থেকে আর ফিরবেন না, তবুও সৈন্য-সামন্ত কিছু পাঠালেন না? অথচ ইতোপূর্বে সব সফরেই এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনার জন্য আগে থেকেই আসবাব-পত্র ও সৈন্য-সামন্ত প্রেরণ করতেন। এ সফরে কেন পাঠালেন না?

– এটা এমন সফর যে, এতে সৈন্য পাঠানো যায় না।

– জাঁহাপনা! বহুদিন হলো আপনার একটি আমানত আমার কাছে রয়ে গেছে। সেটি একটি ছড়ি। আমার চেয়ে বড় কোনো নির্বোধ পেলে এটা তাকে উপহার দিতে বলেছিলেন। আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু আপনার চেয়ে বড় নির্বোধ আর কাউকে পেলাম না। কারণ, আমি দেখেছি আপনি কোনো সংক্ষিপ্ত সফরে গেলেও মাস খানেক পূর্ব থেকেই তার প্রস্তুতি চলত। পানাহারের আসবাব, তাবু, সৈন্য, বডিগার্ড ইত্যাদি আগে থেকেই পাঠানো হতো। আর এখন এতো দীর্ঘ সফর, যেখান থেকে ফেরার সম্ভাবনাও নেই, অথচ এর জন্য কোনো প্রস্তুতি নেই। আপনার চেয়ে বড় বোকা জগতে আর কে আছে? অতএব আপনার আমানত আপনাকেই ফেরৎ দিচ্ছি। এসব শুনে বাদশা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং বিলাপ করে বলতে লাগলেন, বাহলুল! তুমি সঠিক বলেছো। আজীবন তোমাকে বোকা ভেবেছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো তুমি বুদ্ধিমান। তুমি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলেছ। বাস্তবেই আমি সারা জীবন বৃথা কাটিয়েছি। আখেরাতের কোনো প্রস্তুতি নেই নি।

প্রকৃত জ্ঞানী কে?

বাহলুল যা বলেছেন, তা একটি হাদীসের মর্মকথা। শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ».

‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নেক কাজ করেছে। আর অক্ষম সেই যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির পেছনে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল প্রত্যাশা করে।’[2]

হাদীসে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো, কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগে দুনিয়ায় নিজেই নিজের হিসেব নেয়া তথা মুহাসাবা করা।

উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘প্রকৃত জ্ঞানী’র পরিচয় দিয়েছেন। অথচ যে ব্যক্তি পৃথিবীতে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারে, টাকা থেকে টাকা কামাই করতে পারে, দুনিয়াকে বোকা বানিয়ে দিতে পটু, তাকেই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানি মনে করা হয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসে বলেছেন, প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফস তথা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রবৃত্তির সকল চাহিদার পেছনে না চলে নফসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুগামী বানায়, মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এর ব্যতিক্রম হলে সে নির্বোধ-বোকা। কারণ সে সারাটা জীবন অর্থহীন কাজে ব্যয় করল কিন্তু চিরকাল যেখানে থাকতে হবে তার জন্য কোনো পাথেয় সংগ্রহ করল না।

আমরা সবাই বোকা

হারুনুর রশীদকে বাহলুল যা বলেছেন, গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য বলে মনে হবে। পৃথিবীতে বসবাসের জন্য সবাই চিন্তা করে, সে কোথায় বাড়ি বানাবে? কেমন গৃহ নির্মাণ করবে? সুখ ও বিলাসিতার কী কী উপকরণ সংগ্রহ করবে? কোথাও ভ্রমণে গেলে ‘সিট পায় কি না’ এই ভয়ে আগেই টিকিট বুকিং করে, প্রস্তুতি শুরু করে। যেখানে যাচ্ছে সেখানে সংবাদ পাঠায়। হোটেলে বুকিং করায়। মাত্র তিন দিনের সফরেও এসব প্রস্তুতি নেয়া হয়।

অথচ যেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে, যে জীবনের শুরু আছে শেষ নেই, তার কোনো চিন্তাই করে না যে, সেখানে কেমন ঘর নির্মাণ করবে? সেখানকার জন্য কিভাবে বুকিং করবে?

উপরোক্ত হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়। অন্যথায় সে হলো বেকুব। চাই সে যতবড় বিত্তশালী বা পুঁজিপতিই হোক না কেন। আর আখেরাতের প্রস্তুতির পথ এটিই যে, ‘মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর ধ্যান করবে’। এ কথা চিন্তা করবে যে, ‘একদিন আমাকে মরতে হবে’।

মৃত্যু এবং আখেরাতের মুহাসাবা বা কল্পনা করার পদ্ধতি

সারাদিনের মধ্যে একটি নির্জন-নিভৃত সময় বের করে এভাবে কল্পনা করা, ‘আমার অন্তিম মুহূর্ত এসে গেছে, জান কবজ করার জন্য ফেরেশতারা উপস্থিত হয়েছেন, আমার জান বের করেছে, আত্মীয়-স্বজন গোসল ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থায় লেগে গেছে, কাফন পরিয়ে নিয়ে গেছে, জানাযার নামায পড়ে কবরে রেখেছে, অতঃপর কবর বন্ধ করে দিয়েছে, ওপর থেকে মাটি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেছে, অন্ধকার কবরে এখন আমি একা, শুধুই একা। অতঃপর ফেরেশতাগণ এসে প্রশ্নোত্তর শুরু করেছে।’

এরপর আখেরাত কল্পনা করা যে, ‘আমাকে কবর থেকে পুনরায় উঠানো হয়েছে, হাশরের মাঠ কায়েম হয়েছে, সব মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছে, সেখানে প্রচণ্ড গরম লাগছে, দরদর করে ঘাম বয়ে পড়ছে, সূর্য একেবারে নিকটে এসেছে, সবাই দুশ্চিন্তা ও টেনশনে ভুগছে, তখন তারা নবীগণের কাছে গিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার আবেদন করছে।’

এভাবে হিসাব-কিতাব, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদির কল্পনা করা। রোজ ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত, মাসনূন দু‘আ এবং যিকির-আযকার শেষ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করা, এ সময় অবশ্যই আসবে। জানা নেই কখন আসবে। হতে পারে এখনই আসবে, আজই আসবে। এসব কল্পনা করে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আমি দুনিয়াবী কাজ-কর্মের জন্য বের হচ্ছি। আমার দ্বারা যেন এমন কোনো কাজ সংঘটিত না হয়, যা আমার আখেরাতকে বরবাদ ও ধ্বংস করে দেয়।’

প্রতিদিন এভাবে ধ্যান করতে থাকা। একবার যদি মৃত্যুর চিন্তা অন্তরে বসে যায়, তাহলে আত্মশুদ্ধির দিকে মনযোগ যাবে এবং আখেরাতের চিন্তা মাথায় আসবে ইনশাআল্লাহ।

আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ.

আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. একজন বড় মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর জীবনকালে এক ব্যক্তি মনে মনে ভাবলো, আমি বিভিন্ন আলেম, মুহাদ্দিস, ফকীহদের কাছে প্রশ্ন করব যে, যদি জানতে পারেন ‘আগামীকাল আপনার মৃত্যু হবে’। জীবনের শুধুমাত্র একদিন বাকি আছে। তবে আপনারা কীভাবে সে দিনটি কাটাবেন? প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তাঁরা যেসব ভালো ভালো কাজের কথা বলবেন, তা সে নিজেও করবে। অতঃপর তাঁদেরকে প্রশ্ন করে বিভিন্ন আমলের কথা জানতে পারলেন।

এক পর্যায়ে যখন শায়খ আবদুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. এর কাছে গিয়ে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বললেন, প্রতিদিন যে কাজ করি সেদিনও তাই করব। কারণ, আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের কর্মসূচী ও কাজের রুটিন এ ধারণাকে সামনে রেখে বানিয়ে নিয়েছি যে, ‘হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ দিন’। ‘হতে পারে আজই আমার মরণ এসে পড়বে’। এই সূচিতে পরিবর্তন বা সংযোজন করার মত কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিন যা করি জীবনের শেষ দিনও তাই করব।

এটাই হলো “মূ-তূ ক্ববলা আন তা মূ-তূ”বা ‘মরার আগেই মরো’র বাস্তব নমুনা। এসব মহা মনীষী মৃত্যুর চিন্তা ও আখেরাতের খেয়াল দ্বারা নিজের জীবন এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছিলেন যে, সর্বক্ষণ মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। মৃত্যু যখনই আসতে চায় আসুক।

প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা

উবাদা ইবন ছামিত রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ » . قَالَتْ عَائِشَةُ أَوْ بَعْضُ أَزْوَاجِهِ إِنَّا لَنَكْرَهُ الْمَوْتَ . قَالَ « لَيْسَ ذَاكَ ، وَلَكِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ الْمَوْتُ بُشِّرَ بِرِضْوَانِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، فَأَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا حُضِرَ بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَعُقُوبَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَكْرَهَ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ »

‘যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, আল্লাহর মিলন প্রত্যাশী হয়, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপ্রিয় ভাবে, আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।’ এ কথা শুনে আয়েশা কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রী বললেন, আমরা তো মৃত্যু অপ্রিয়ই জ্ঞান করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা নয় ; বরং ব্যাপার হলো, যখন মু’মিনের সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হয়। তখন তার কাছে কোনো জিনিসই এর চেয়ে প্রিয় মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাত পছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে কাফের ব্যক্তির সামনে যখন মৃত্যু উপস্থিত, তখন তাকে আল্লাহর শাস্তি ও আযাবের দুঃসংবাদ শোনানো হয়, এমতাবস্থায় তার কাছে এর চেয়ে অপ্রিয় আর কিছু মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।[3]

সুতরাং এমন সৌভাগ্যবান প্রকৃত মু’মিন মাত্রেই সর্বদা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকেন। অর্থাৎ, আগামীকাল আপন প্রিয়জন তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের সাথে সাক্ষাত হবে। এই মৃত্যু চিন্তার প্রভাবেই মানুষের জীবন সুন্নত ও শরীয়তের রাজপথে উঠে আসে এবং তাকে সর্বক্ষণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখে।

যা হোক প্রতিদিন কিছু সময় বের করে মৃত্যুর কল্পনা করতে হবে। ভাবতে হবে ‘মৃত্যু আসছে, আমি কি প্রস্তুত হয়েছি?’

আজই নিজের হিসাব কষে নিতে হবে

আলোচ্য বাণীর দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে, কিয়ামত দিবসে হিসাব গ্রহণের আগেই তুমি তোমার হিসাব নাও। আখেরাতে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨ ﴾ [الزلزلة: ٧، ٨]

‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালোকাজ করলে তা সে দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে’। {সূরা আয-যিলযাল, আয়াত : ৭-৮}

অর্থাৎ, তোমরা যে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করেছ তা সামনে আসবে, আর যে মন্দ কাজ করেছ তাও সামনে উপস্থিত পাবে। ‘কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগেই নিজের হিসাব নেয়া শুরু করো’ প্রত্যহ রাতে মনকে জিজ্ঞেস করো, আজ সারাটা দিন এমন কী কী কাজ করেছি, যে ব্যাপারে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হলে আমি উত্তর দিতে পারব না। এভাবে প্রতিদিন করতে থাক।


[1]. বুখারী : ৬৪১২; তিরমিযী : ২৩০৪।

[2]. তিরমিযী : ২৪৫৯; তাবরানী, মু‘জামুল কাবীর : ৬৯৯৫; মুসতাদরাক আলাস-সাহীহ : ৭৬৩৯; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটিকে হাসান সহীহ, তবে বুখারী ও মুসলিম এটি সংকলন করেন নি। তালখীস নামক গ্রন্থে ইমাম যাহবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[3]. বুখারী : ৬৫০৭; মুসলিম : ৪৮৪৪।

মিথ্যা থেকে বাঁচার উপায়

মিথ্যা থেকে বাঁচার উপায়

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

মিথ্যা যে একটি বদ অভ্যাস তাতে কেউ সন্দেহ করে বলে আমি মনে করি না, কারণ মিথ্যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধ্বংসকর বলে মন্তব্য করেছেন। আরো বলেছেন, মিথ্যা মুনাফেকীর নিদর্শন। মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে এক সময় আল্লাহর দরবারে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত হয়। আর সত্য বলা ও সত্য বলার প্রচেষ্টায় রত থাকলে আল্লাহ্ তাকে সত্যবাদী বলে লিখে নেন; এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীসের ভাষ্যই উদ্ধৃত করলাম।

কথা উঠেছিল আমাদের এক শিক্ষককে নিয়ে যিনি মিথ্যা কথা বলতে ছাত্রদেরকে নিষেধ করতেন। একদা আমরা তার বৈঠকখানায় অবস্থান করছিলাম, এমতাবস্থায় সেখানে এমন এক লোক এসে উপস্থিত যাকে তিনি পছন্দ করতেন না। আসা মাত্রই লোকটি প্রশ্ন করলো: “তোমাদের গুরুমশাই কোথায়”? আমরা জানতাম যে, উস্তাদজী তার সাথে দেখা করতে চান না; অথচ আমাদেরকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যকার সর্বকনিষ্ঠ জন সভয়ে বলে ফেললো যে, তিনি পাশের ফ্লাটে আছেন। উস্তাদজীকে তার কথামত ডাকা হলো, তিনি আসলেন এবং তার সাথে জরুরী কথাবার্তা সারলেন। কিছুক্ষণ পর লোকটি বিদায় নিলো। আমরা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। আমাদের অবস্থা দেখে তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার অবস্থান বলে দেয়ায় তিনি যে খুশী হননি, এটা আমরা বুঝতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু আমরা অপরাগ ছিলাম, কারণ মিথ্যা বলা যাবে না। তিনি ব্যাপারটা সহজ করে নিতে নিতে বললেন, তোমরা এমনটি বললেই পারতে যে, “তিনি এখানে নেই”।

আমরা বলে উঠলাম: এটা কি মিথ্যা নয়?

তিনি বললেন: না, এটা মিথ্যা নয়; বরং معاريض বা বলার কৌশল। সাহাবী ইমরান ইবন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, إن في المعاريض لمندوحة عن الكذب অর্থাৎ, “বাচনভঙ্গী ও কথার কৌশলের মাধ্যমে মিথ্যা থেকে বাঁচা যায়”। [বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ: ৮৫৭]

আমরা জানতে চাইলাম: কুরআন, হাদীস বা সালফে সালেহীনের জীবনে এ প্রকার বাচনভঙ্গীর ব্যবহার আছে কি?

তিনি বললেন: তোমাদের এ প্রশ্নটি আমার কাছে ভালো লেগেছে। আসলে দ্বীনী ব্যাপারে কোন কিছু বলার পূর্বে আমাদের জানা আবশ্যক যে, আমাদের কথাটা কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী হয়েছে কি না। আর যে আয়াত বা হাদীসকে আমি বা আমরা দলীল হিসেবে পেশ করবো, সে আয়াত বা হাদীস দ্বারা আমাদের সালফে সালেহীন তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবেতাবেয়ীনের অনুসারীগণ আমরা যে রকম বুঝেছি সে রকম বুঝেছেন কি না? নাকি আমরা আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যায় নতুন কোন কথা সংযোজন করেছি? কেননা জগতে যত ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়েছে আর যত ফির্কার উৎপত্তি হয়েছে, সবাই দলীল হিসেবে কুরআন ও হাদীসের বাণী উদ্ধৃত করে থাকে, যদি সব ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য হতো তাহলে দ্বীনের অস্তিত্ব টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ত। তাই সালফে-সালেহীনের ব্যাখ্যা অনুসারেই কুরআন বা হাদীসকে আমাদের বুঝতে হবে।

এখন আসা যাক তোমাদের প্রশ্নের উত্তরে-

তোমারা জানতে চেয়েছ কুরআন, সুন্নাহ্ এবং সালফে-সালেহীনের জীবনে এ প্রকারের معاريض বা বাচনভঙ্গির ব্যবহার হয়েছে কি না? আমি বলবো: হাঁ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালামের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: فَنَظَرَ نَظْرَةً فِي النُّجُومِ অর্থাৎ, “তিনি ক্ষণিকের জন্য তারকারাজির প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন: ‘আমি অসুস্থ’।” এখানে ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালামকে তার জাতির লোকেরা মূর্তিপূজা করতে আহ্বান করেছিল। তাঁকে আহ্বান করেছিল মেলায় মূর্তি বিক্রয় করার জন্য। কিন্তু তিনি এ থেকে বাঁচার জন্য চমৎকার এক বাচনভঙ্গি ব্যবহার করলেন যাতে মিথ্যাও হয়নি আবার শির্কেও লিপ্ত হতে হয়নি। তার জাতির লোকেরা বিশ্বাস করত যে, নক্ষত্ররাজি মানুষের রোগ, শোক, আরোগ্য এসব দিয়ে থাকে। তাই ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম তাদেরকে বোকা বানানোর জন্য তারকারাজির দিকে ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন, তারপর বললেন যে, “আমি অসুস্থ হয়ে যাবো”, তাঁর জাতির লোকেরা বুঝলো যে, ইব্রাহীম তারকার অবস্থান দেখে বুঝেছে সে অসুস্থ হয়ে যাবে তাই সে মেলায় যাচ্ছে না। অথচ ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালামের উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে বোকা বানানো আর “আমি রোগগ্রস্ত” কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি মানসিক ভাবে তোমাদের কর্মকাণ্ডে খুশী নই।

অনুরূপভাবে আইয়ূব ‘আলাইহিস্ সালাম তাঁর স্ত্রীকে একশ’ বেত্রাঘাত করার শপথ করেছিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে সে শপথ পূর্ণ করার কৌশল এভাবে বাতলে দিয়েছিলেন যে,

﴿ وَخُذۡ بِيَدِكَ ضِغۡثٗا فَٱضۡرِب بِّهِۦ وَلَا تَحۡنَثۡۗ إِنَّا وَجَدۡنَٰهُ صَابِرٗاۚ نِّعۡمَ ٱلۡعَبۡدُ إِنَّهُۥٓ أَوَّابٞ ٤٤ ﴾ [ص: ٤٤]

“তুমি তোমার হাতে (একশ’) ছড়ির এক আঁটি বানিয়ে তা দিয়ে এক বেত্রাঘাত করো, শপথ ভঙ্গ করো না।” [সূরা সদ: ৪৪]

তদ্রূপ ইউসুফ ‘আলাইহিস্ সালামও তাঁর ভাইকে আটকে রাখার জন্য এক প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ্ তা‘আলা সে ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন:

﴿ فَبَدَأَ بِأَوۡعِيَتِهِمۡ قَبۡلَ وِعَآءِ أَخِيهِ ثُمَّ ٱسۡتَخۡرَجَهَا مِن وِعَآءِ أَخِيهِۚ كَذَٰلِكَ كِدۡنَا لِيُوسُفَۖ مَا كَانَ لِيَأۡخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ ٱلۡمَلِكِ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُۚ﴾ [يوسف: ٧٦]

“তখন সে তার ভাইয়ের ভাণ্ডের আগে অন্যদের ভাণ্ডে খোঁজা শুরু করল। এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করেছি, নতুবা সে কোনভাবেই আল্লাহ না চাইলে রাষ্ট্রীয় আইন মোতাবেক তার ভাইকে আটকে রাখতে পারে না।” [সূরা ইউসুফ: ৭৬]

রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসেও এসেছে, বদরের যুদ্ধে তিনি (সা) কাফেরদের অবস্থান বুঝার জন্য অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর সেখানকার লোকদের কাছ থেকে তাদের অবস্থান জানার পর লোকেরা প্রশ্ন করেছিল: তোমরা কোথা থেকে এসেছ? রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন: نحن من ماء অর্থাৎ “আমরা পানি হতে”। লোকেরা বুঝে নিল যে, তারা কোন পানির কুপের কাছে থাকে, সেখান থেকে এসেছে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল একথা বলা যে, আমরা পানি থেকে সৃষ্ট; কারণ সব সৃষ্টির মূলেই রয়েছে পানি।

তদ্রূপ আমাদের সালফে-সালেহীনের জীবনেও এ প্রকার معاريض ব্যবহারের নজির রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আমি কয়েকটি ঘটনা উদ্ধৃত করছি-

প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একবার তাঁর স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার ক্রিতদাসীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়। তাঁর স্ত্রী হঠাৎ তাদেরকে ঐ অবস্থায় দেখে ফেলেন এবং রাগের মাথায় দা নিয়ে কোপাতে আসে। কিন্তু ইত্যবসরে তিনি তাঁর কর্ম সম্পাদন করে ফেলেছেন। তাঁর স্ত্রী এসে বললেন যে, যদি আমি তোমাদেরকে ঐ অবস্থায় পেতাম তাহলে তোমার মাথা কেটে ফেলতাম। তিনি বললেন: আমি কি করেছি? তাঁর স্ত্রী বললেন: যদি সত্যিই তুমি কিছু না করে থাক, তাহলে এখন এ অবস্থায় কুরআন পাঠ করতে পারবে কি? আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা সাথে সাথে পড়া শুরু করলেন:

شهدت بأن وعد الله حق = وأن النار مثوى الكافرينا

وأن العرش فوق الماء طاف = وفوق العرش رب العالمينا

وتحمله ملائكة كرام = ملائكة الإله مقربينا[1]

মূলতঃ এটা ছিল একটি কবিতার কিছু অংশ। কিন্তু তাঁর স্ত্রী এর মাঝে আর কুরআনের মাঝে পার্থক্য বুঝতেন না। বরং যখন তিনি পড়ছিলেন তখন তাঁর স্ত্রী মনে করেছিলেন যে, কুরআন পড়ছে। আর যদি সে এ অবস্থায় কুরআন পড়তে পারে তাহলে নিশ্চয় সে কাউকে স্পর্শ করে নি। অবশেষে তাঁর স্ত্রী বললেন যে, আমি আল্লাহর কিতাবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আমার দেখাটাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করলাম। এরপর সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এ ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ভাবে হাসলেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দৃস্টিগোচর হয়েছিল।

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করা হয়, তিনি বলেছেন যে, আমি আশ্চর্য হই এই ভেবে যে, “কোন ব্যক্তি معاريض বা কথা বলার কৌশল জানার পরেও মিথ্যা বলার দিকে ধাবিত হয় কি করে?” [মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একবার খাবার খেতে ডাকা হলো, সেখানে তিনি কোনো কারণে খাওয়া অপছন্দ করলেন, তাই তিনি বললেন: ‘আমি রোযাদার’। তারপর তারা তাকে খেতে দেখলো। তারা বললো: ‘আপনি কি বলেন নি যে, আপনি রোযাদার? তিনি জবাবে বললেন: ‘রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেননি যে, প্রত্যেক মাসে তিনদিন রোযা রাখা মানে চিরদিন রোযা রাখা?’ (অর্থাৎ ‘সে অনুসারে আমি রোযাদার’। কারণ তিনি প্রত্যেক মাসের ১৪, ১৫, ১৬ এ তিনদিন রোযা রাখতেন।)

প্রখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবন সিরীন রাহিমাহুল্লাহর নিকট যদি কোন ঋণদাতা তার ঋণ চাইত এবং তার কাছে দেওয়ার মত কিছু না থাকত, তবে তিনি বলতেন: ‘তোমাকে আমি দু’দিনের একদিনে পরিশোধ করব। ঋণদাতা মনে করত যে, আজ বা কাল দিয়ে দিবে অথচ তাঁর উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার দিনে বা আখেরাতের দিনে আমি তোমার ঋণ পরিশোধ করে দেব’।

ইবনে সিরীন থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, কোন এক লোকের ভীষণ চোখ লাগতো (নযর লাগা)। কাজী সুরাইহ্ রাহিমাহুল্লাহ্ তার খচ্চরটি নিয়ে ঐ লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, লোকটি খচ্চরটির উপর চোখ লাগাতে চাইল। কাজী সুরাইহ্ রাহিমাহুল্লাহ্ সবকিছু বুঝতে পেরে সাথে সাথে বললেন: ‘আমার এই খচ্চরটা এমন বাজে যে, একবার বসে পড়লে আবার দাঁড় করিয়ে না দেয়া পর্যন্ত উঠবে না’। লোকটি বলল: ‘ধ্যাৎ, এমন বাজে জিনিস?’ এভাবে সুরাইহ্ রাহিমাহুল্লাহ্ লোকটির চোখ লাগানো থেকে তাঁর খচ্চরটাকে হেফাযত করলেন। অথচ কাজী সুরাইহ্-এর কথা ‘বসে পড়লে উঠিয়ে না দেয়া পর্যন্ত উঠে না’-এর অর্থ এ নয় যে, সত্যি সত্যিই সেটি উঠে না; বরং উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ্ যতক্ষণ না উঠান ততক্ষণ সেটি উঠতে পারে না।

ইব্রাহীম নাখয়ী রাহিমাহুল্লাহ্ থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার তার স্ত্রী তাকে কোন একটা কিছু দেয়ার বিষয়ে খুব পীড়াপীড়ি করছিল, তখন তার হাতে একটা পাখা ছিল। তিনি পীড়াপীড়িতে অতিষ্ট হয়ে বলে উঠলেন: ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি এটা তোমার!’ তার স্ত্রী শান্ত হলে তিনি তার শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমরা কি বুঝলে?’ তারা বলল: ‘আপনি আপনার স্ত্রীকে ঐ বস্তুটা দিয়ে দিলেন’। তিনি বললেন: ‘কখখনো নয়! তোমরা কি দেখনি যে, আমি পাখাটির দিকেই ইঙ্গিত করছিলাম? আমার উদ্দেশ্য ছিল পাখাটা দেয়া।’

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাম্মাদ বিন যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ্-এর কাছে যদি এমন কোন লোক আসত যার সাথে তিনি সাক্ষাৎ করতে চাইতেন না, সাথে সাথে তিনি তাঁর হাতটা মাড়ির দাঁতের উপর রেখে বলতেন: ’হায় আমার দাঁত! হায় আমার দাঁত! এভাবে বলতে থাকতেন। লোকটি মনে করত তাঁর বুঝি দাঁতে ব্যাথা তাই কথা বলবেন না, অথচ তিনি দাঁতে ব্যাথা হয়েছে এমন কথা বলেন নি।’

ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ্-এর নিকট তাঁর শিষ্য মাররূযী রাহিমাহুল্লাহ্ বসেছিলেন, ইত্যবসরে সেখানে এক লোক এসে জিজ্ঞাসা করল: ‘এখানে মাররূযী আছে?’ ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ্ চাইলেন যে, মাররূযী লোকটির সাথে বের না হোক, তাই তিনি সাথে সাথে তাঁর আঙ্গুলকে হাতের কব্জির উপর রাখলেন এবং বললেন: ‘মাররূযী এখানে নেই, সে এখানে কি করবে?’

এ প্রকারের শত শত معاريض বা কথা বলার কৌশলের মাধ্যমে উপস্থিত পরিস্থিতিতে সুন্দর সমাধানের নজীর সাফলে সালেহীনের জীবনে রয়েছে।

এ পর্যন্ত বলে উস্তাদজী চুপ করলেন; আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম: উস্তাদজী! এটা কি হিলা বা বাহানা করা নয়? আর হিলা বা বাহানা করা তো হারাম।

তিনি জবাবে বললেন: এটা যে এক প্রকার হিলা বা বাহানা তাতে সন্দেহ নেই। তবে জগতে যতপ্রকার গন্ডগোলের সূত্রপাত হয়েছে তার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, ‘কোন কিছুকে বিচার-বিশ্লেষণ না করে তার ব্যাপারে তড়িৎ হুকুম প্রদান করা’।

মনে রাখবে, এটা একটা হিলা বা বাহানা, কিন্তু সব হিলা-ই নিষিদ্ধ নয়; কারণ, হিলা তিন প্রকার- (১) এক প্রকার হিলা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। যেমনটি করেছিলেন ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম শির্ক থেকে বাঁচার জন্য।

(২) আরেক প্রকার হিলা করা জায়েয। তবে ধর্মীয় স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে কখনো তা করা ভালো বলে বুঝায়, আবার কখনো ত্যাগ করা ভালো বলে প্রতীয়মান হয়। যার কিছু উদাহরণ আগেই পেশ করেছি।

(৩) তৃতীয় আরেক প্রকার হিলা বা বাহানা আছে যা করা হয় শরীয়তের কোন ফরদ্ব কাজ ত্যাগ করার জন্য বা কোন হারাম কাজকে হালাল করার জন্য অথবা অত্যাচারীকে নির্দোষ আর নির্দোষকে অত্যাচারী বানানোর জন্য, হককে বাতিল আর বাতিলকে হকের রূপে রূপদান করার জন্য; এ প্রকার হিলা বা বাহানা করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

এ প্রকারের হিলাকারীরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের লা’নতের ভাগীদার হওয়ার পথের পথিক। যেমনটি কোন কোন দেশের কিছু মুসলমানদের মধ্যে দেখা যায় তিন তালাকের মাসআলাতে অন্যস্থানে বিয়ে দেয়ার নামে মৌখিক বিয়ে ও সাথে সাথে মৌখিক তালাকের প্রচলন কিংবা এক রাতের জন্য চুক্তি করে ও পরদিন তালাক দেয়ার শর্তে বিয়ে করার হিলা বা বাহানা ইত্যাদি। আল্লাহ্ আমাদেরকে এ প্রকারের বাহানা অনুসরণ করার মাধ্যমে তাঁর লা’নতে পতিত হওয়া থেকে হেফাযত করুন। আমীন।

আমরা উস্তাদজীর আলোচনায় প্রীত হলাম। অন্যান্য দিনের মত আজও চা চক্রের মাধ্যমে আসরের সমাপ্তি ঘটিয়ে যে যার বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হলাম।

(ইবনুল কাইয়্যেমের “ইগাছাতুল লাহফান” অবলম্বনে রচিত)


[1] অর্থ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহর ওয়াদা সত্য, আর আগুন হচ্ছে কাফেরদের ঠিকানা আর আরশ পানির উপর ভাসছে, আর আরশের উপর আছেন সৃষ্টিকুলের রব, তাঁকে বহন করছে সম্মানিত ফেরেশতাগণ, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদল

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ৪

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

পুর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা পাই যে, আমাদের নাফসএর বিবধিঃ

এ ত্রিবিধ বণ্টনটা হল যেমন কথিত আছে নাফসসমূহ (আত্মা) তিনটি:

  • নাফস আম্মারাহ: যা খারাপ কাজে উদ্ধুদ্ধ করে।
  • লাওয়ামাহ : যা বেশি বেশি ভৎর্সনা করে।
  • মুতমাইন্নাহ: যা ভাল কাজে তৃপ্ত থাকে

তন্মধ্যে প্রথম শ্রেণীর লোক তারা যারা নাফসে আম্মারার অধিকারী, যারা কু-কাজের জন্য বেশি আদেশ দিয়ে থাকে। আর মধ্যম দল তারা, যারা নাফসে মুতমাইন্নার অধিকারী, যাকে সম্বোধন করে (কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষ হতে) বলা হবে-

 

﴿ يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧ ٱرۡجِعِيٓ إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةٗ مَّرۡضِيَّةٗ ٢٨ فَٱدۡخُلِي فِي عِبَٰدِي ٢٩ وَٱدۡخُلِي جَنَّتِي ٣٠ ﴾ [الفجر: ٢٧، ٣٠]

‘‘হে নাফসে মুতমাইন্নাহ (অর্থা- শান্তিময় আত্মা) তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে চল এভাবে যে, তুমি তার প্রতি সন্তুষ্ট্ এবং তিনিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। অনন্তর তুমি আমার বিশিষ্ট বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’’ (সূরা আল ফাজর:২৭-৩০)

আর ঐ সকল লোক হল বেশি ভৎর্সনাকারী আত্মার অধিকারী যারা পাপকাজ করে এবং তজ্জন্য আবার নিজেদের ভৎর্সনাও করে এবং রং-বেরং ধারণ করে। কখনও এরূপ, আবার কখনও বা সেরূপ এবং ভাল কাজসমূহের সাথে খারাপ কাজ মিলিয়ে ফেলে।

আর এজন্যই যখন মানুষ আবু বকর (রা.) ও ঊমার (রা.) এর যুগে ছিল-তাঁরা দু’জন তো এমন ছিলেন যে, তাঁদের আনুগত্য তথা অনুসরণ করার জন্য মুসলিমগণকে আদেশ দেয়া হয়েছিল। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘‘হে লোক সকল! আমার (অব্যবহিত) পরেই যে দু’জন আসবেন- আবু বকর ও উমর- তাদের অনুসরণ করো।’’ (আবু-দাউদ: ৫/১৩: কিতাবুস সুন্নাহ বাবু-ফি লুজুমিস সুন্নাহ; আন-নাসায়ী: ৫-৪৪, হা: নং- ২৬৭৬, কিতাবুল ইলম, বাবু-মাযায়া ফি আল-আখজি বিসসুন্নাহ; ইবনে মাজাহ: ১/১৫, আল-মুকাদ্দিমাহ, বাব-ইত্তিবা-ই- সুন্নাতিল খুলাফা-ইর- রাশিদীন; আল- দারিমী: ১/৪৪, আল-মুকাদ্দিমাহ বাবু ইত্তিবা-ইস সুন্নাহ; ইবনে হাম্মাল: ৪/১২৬-১২৭)

যখন মানুষ রিসালাত (নাবুওয়াতের)-এর অতি নিকটতম যুগে ছিল, ঈমান ও সততার দিক হতে ছিল সুমহান, তখন তাদের নেতৃবর্গও ছিলেন দায়িত্ব পালনে অত্যধিক তৎপর এবং শান্তিময়তার ক্ষেত্রে ছিলেন বেশি স্থির। তখন ফিতনাহ-ফাসাদ ঘটে নি। ঐ সময় তারা মধ্যবর্তী দলের মধ্যে বিবেচিত হতেন।

যখন মানুষ উসমান (রা.)-এর খিলাফাতের শেষ পর্যায়ে ও আলী (রা.) এর খিলাফাতের সময় ছিল তখন তৃতীয় শ্রেণীর লোক সংখ্যা বর্ধিত হয়ে গিয়েছিল, ঐ সময় মানুষের মধ্যে দীন ও ঈমান থাকা সত্ত্বেও আকাঙ্খা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা কতিপয় প্রাদেশিক গভর্ণর ও কিছু সংখ্যক প্রজা সাধারণের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর সেটা ক্রমান্বয়ে (আরও বেড়ে) বেশি হয়ে পড়েছিল।

এভাবেই ফিতনার সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণ, শাসক (গভর্নর) ও প্রজা উভয় পক্ষেরই তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও আনুগত্য অবলম্বন না করা, শাসক ও প্রজা উভয় শ্রেণির মধ্যেই এক প্রকারের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও গুনাহের প্রতি আকর্ষণের সংমিশ্রণ ঘটা, আর উভয় পক্ষই ছিল মনগড়া ব্যাখার আশ্রয়গ্রহণকারী যে সে সৎ কাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে থাকে এবং সে সত্য ও ন্যায়নীতির সাথে আছে বলে দাবী করা। অথচ এরূপ মনগড়া ব্যাখ্যার সাথে এক প্রকারের প্রবৃত্তি অনুসরণের মনোবৃত্তিও রয়েছে। আর এর মধ্যে রয়েছে একটু কিছু সন্দেহ এবং মন যা চায় তারই আকাঙ্খা পোষণ। যদিও দু‘পক্ষের একপক্ষ সত্যের (খিলাফাতের) জন্য অধিকযোগ্য ছিল।

অতএব বিশ্বাসী ব্যক্তির উচিত হল, সে যেন আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তার অন্তরকে ঈমান ও আল্লাহভীতি দ্বারা আবাদ করে, অন্তরকে বক্র না করে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও হিদায়াতের উপর স্থির রাখে এবং সে যেন প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, এ সকল বিষয়ে আল্লাহরই উপর পূর্ণ আস্থা রাখে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

﴿ فَلِذَٰلِكَ فَٱدۡعُۖ وَٱسۡتَقِمۡ كَمَآ أُمِرۡتَۖ وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَهُمۡۖ وَقُلۡ ءَامَنتُ بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ مِن كِتَٰبٖۖ وَأُمِرۡتُ لِأَعۡدِلَ بَيۡنَكُمُۖ ٱللَّهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمۡۖ لَنَآ أَعۡمَٰلُنَا وَلَكُمۡ أَعۡمَٰلُكُمۡۖ لَا حُجَّةَ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُۖ ٱللَّهُ يَجۡمَعُ بَيۡنَنَاۖ وَإِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ ١٥ ﴾ [الشورا: ١٥]

‘‘অতএব আপনি সেদিকেই ডাকতে থাকুন এবং আপনাকে যেরূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে(তাতে) দৃঢ় থাকুন আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, আর বলে দিন আল্লাহ যত কিতাব নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান আনছি আর আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, তোমাদের মধ্যে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠিত রাখি, আল্লাহ আমাদেরও মালিক এবং তোমাদেরও মালিক।’’ (সূরা আশ-শূরা ৪২:১৫)

এটাই হল জাতির অবস্থা ঐ সকল বিষয়ে, যাতে সে বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং কথাবার্তা ও ইবাদাতে মতবিরোধ করেছে। এগুলো এমন সব বিষয়ের আওতাভুক্ত যার ফলে মু’মিনদের উপর বিপদাপদ প্রকট হয়ে আসে। সুতরাং তারা দুটি জিনিসের মুখাপেক্ষী:

নিজেদের থেকে দুনিয়া ও ধর্মীয় ফিতনা, যদ্বারা তাদের অনুরূপ লোকজন (পূর্বেও) পরীক্ষিত হয়েছিল, সেটার কারণ থাকা সত্বেও তা প্রতিহত করা। কেননা তাদের সাথেও রয়েছে নাফসসমূহ ও শয়তান, যেমন রয়েছে অন্যদের সাথেও। … অনেক এমন লোক আছে যে সে অন্যকে করতে না দেখা পর্যন্ত কোনও ভাল কাজ বা খারাপ কাজ করে না, তারপর অপরের দেখাদেখি সেটা করে বসে।

আর এজন্যই কোন ভাল বা মন্দ কাজের সূচনাকারী ( তার) অনুকরণকারীদের সকলের সমান পূর্ণ বা পাপের অধিকারী হবে। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-

«مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً، فَلَهُ أَجْرُهَا، وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً، كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ»

‘‘যে ব্যক্তি কোনও সুন্দর আদর্শের প্রচলণ করবে সে সেটার প্রতিফল (সাওয়াব) তো পাবেই তদুপরি কিয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসরণে আমল করবে তাদের সকলের সম্মিলিত ‘আমলের সাওয়াবও ঐ প্রচলনকারী পাবে(অথচ) ঐ সকল অনুসরণকারীদের সাওয়াবে কোনরূপ ঘাটতি হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোন খারাপ আদর্শের প্রচলন করবে সে সেটার ফলে পাপী তো হবেই তদুপরি কিয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসরণে আমল করবে তাদের সকলের সম্মিলিত পাপরাশির পরিমাণ পাপের দায়ীও সে ব্যক্তি হবে, (অথচ) ঐ সকল অনুসরণকারীদের পাপে এতটুকুও ঘাটতি হবে না। (মুসলিম: কিতাবুল ‘ইলম: ৮/৬১, কিতাবুল যাকাত: ৩/৮৭, আন- নাসায়ী: ৫/৭৮; ইবনে হাম্বল: ৪/৩৫৭-৩৫৯)

যেহেতু তারা মৌলিক বিষয়ে শরীক হয়েছে এ কারণে। আর যেহেতু কোন জিনিসের জন্য সেটার সমতূল্য জিনিসের ব্যাপারে গৃহীত সিদ্ধান্তই প্রযোজ্য। কোন জিনিসের অনুরূপ বস্ত্ত তারই দিকে আকর্ষিত হয়ে থাকে। সুতরাং যখন এ আহবানকারীদ্বয় শক্তিশালী হবে, তখন যদি আরও দু’জন আহবানকারী এসে তাদের সাথে মিলিত হয়ে সংগঠিত হয়, তবে এ অবস্থায় বিষয়টি কেমন দাঁড়াবে?

অসৎকাজের লোকেরা তাদের অনুসারীদের ভালবাসে

আর সেটা হল এই যে, খারাপ কাজের অনেক লোক তাদেরকেই ভালবাসে, যারা তাদের এ অবস্থায় থাকাকে গ্রহণ করে নিয়েছে, আর যারা তাদেরকে গ্রহণ করতে পারে নি তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। এ অবস্থা বাতিল ধর্মগুলোর মধ্যে (দিবালোকের মত) প্রকাশিত। প্রত্যেক জাতির (সম্প্রদায়ের) বন্ধুত্ব তাদের সমমনাদের সাথে, আর যারা তাদের সমমনা নয় তাদের সাথে রয়েছে শত্রুতা। এরূপ অবস্থাই রয়েছে পার্থিব ও প্রবৃত্তির অভ্যাসের বিষয়গুলোতেও। ঐসব অসৎ লোকগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পছন্দ ও প্রবৃত্তির চাহিদায় অংশগ্রহণ করবে। হয়ত: ঐ বিষয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করবে, যেমনটি হয়ে থাকে রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হর্তা-কর্তাগণ ও ডাকাত-ছিনতাইকারী বা অনুরূপপদের বেলায়। অথবা একাত্মতার মাধ্যমে আস্বাদন গ্রহণের নিমিত্তে।

যেমন- মদপানের জন্য জমায়েত হওয়া লোকদের বেলায় প্রযোজ্য আর তারা এটাই পছন্দ করবে যে, তাদের নিকটে যারা উপস্থিত হয়েছে তারা সকলেই যেন মদপান করে। হয়তো তার একাকী শালীনতা তথা ভাল থাকাটি তাদের নিকট ঘৃণার কারণে, সেটা তার হিংসার জন্য, অথবা সে একা ভাল থাকা ব্যক্তি যেন সমাজে তাদের চাইতে উচ্চ স্থান পেতে না পারে সেজন্য এবং তাদেরকে বাদ দিয়ে লোকেরা যে তারই প্রশংসা করবে অথবা ঐ একাকী ভাল থাকা ব্যক্তির যেন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবার মত কোন যুক্তি প্রমাণ আর না থাকে অথবা সে নিজে তাদেরকে কোন শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে এ ভয়ে, অথবা সে ঐ বিষয়টি কারও কাছে তুলে ধরলে সে তাদেরকে শাস্তি দিবে এ ভয়ে, অথবা তারা এ ভাল থাকা লোকটির অনুগ্রহের পাত্র না হয়ে বা তার ভয়ের নীচে তাদের থাকতে না হয় এরূপ অন্যবিধ আরও কারণে তারা সকলেই তাকে এ পথে চলার সাথী করতে চায়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَدَّ كَثِيرٞ مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ لَوۡ يَرُدُّونَكُم مِّنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِكُمۡ كُفَّارًا حَسَدٗا مِّنۡ عِندِ أَنفُسِهِم مِّنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ ٱلۡحَقُّۖ فَٱعۡفُواْ وَٱصۡفَحُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦٓۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ١٠٩ ﴾ [البقرة: ١٠٩]

‘‘কিতাবীদের মধ্য হতে অনেকেই একান্ত মনে চায় তোমাদের ঈমান আনার পর আবার তোমাদেরকে কাফির করে ফেলে, শুধু তাদের অন্তর্নিহিত হিংসার দরুন, তাদের নিকট সত্য উদ্ভাসিত হবার পর।’’ (সূরা আল-বাকারাহ :১০৯)

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন:

﴿ وَدُّواْ لَوۡ تَكۡفُرُونَ كَمَا كَفَرُواْ فَتَكُونُونَ سَوَآءٗۖ ٨٩ ﴾ [النساء: ٨٩]

‘‘তারা এ আশা করে যে, যেমন তারা কাফির তদ্রুপ তোমরাও কাফির হয়ে যাও, যাতে তারা ও তোমরা একরূপ সমান হয়ে যাও।’’ (সূরা আন-নিসা:৮১)

উসমান ইবন আফফান (রা.) বলেছেন:

‘‘ব্যভিচারিণী একান্ত মনে চায়, হায় স্ত্রীলোক সকলেই যদি ব্যভিচার করত!’’

আর এ অংশগ্রহণ কখনও কখনও একই পাপকার্যে হয়, যেমন মদপানে অংশগ্রহণ, মিথ্যা বলা, খারাপ বিশ্বাসে অংশগ্রহণ ইত্যাদি। আবার কখনও বা পছন্দ করে যে, অংশগ্রহণটি যেন খারাপ কাজের কোন এক শ্রেণীতে হয় যেমন- ব্যভিচারী, সে চায় যে, অন্য সকলেও যেন ব্যভিচার করে। আর চোর চায় যে, অন্যরাও যেন চুরিই করে কিন্তু শুধু সে যার সাথে ব্যভিচার করেছে তাকে ছাড়া এবং যা চুরি করেছে তা সব ছাড়া যেন হয়।

আর দ্বিতীয় কারণটি হল: তারা ঐ ব্যক্তিকে যে পাপ কাজে লিপ্ত আছে সে পাপ কাজে শরীক হতে আদেশ করে থাকে, যদি তাদের সাথে শরীক হয় তো ভাল, অন্যথায় তার সাথে শত্রুতা করবে এবং এমন কষ্ট দিবে যে, সেটা শক্তি প্রয়োগের স্তরে পৌঁছায় বা পৌছায়ও না।

অত:পর ঐ সকল লোক তাদের অশ্লীল কাজে অন্যের যোগদান করা পছন্দ করে অথবা তাকে উক্ত খারাপ কাজ করতে আদেশ করে এবং তারা যা করতে চায় তজ্জন্য তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এভাবে (তাকে রাজী বা বাধ্য করার পর ) যখন সে তাদের সাথে শরীক হল বা তাদেরকে সহযোগিতা করল বা তাদের আনুগত্য করল তখনই তারা তাকে ত্রুটিপূর্ণ, খাটো বা নিম্নশ্রেণীর মনে করল ও তাকে হালকা জ্ঞান করল এবং ঐ অংশগ্রহণ করাটাকেই তার বিরুদ্ধে (অন্যান্য ব্যাপারে) প্রমাণ হিসেবে খাড়া করল। পক্ষান্তরে যদি সে তাদের সাথে শরীক না হত তাহলে তারা তার শত্রুতা করত ও তাকে কষ্ট দিত। আর এই তো হল অধিকাংশ ক্ষমতাশীল যালিমদের অবস্থা।

এ যা কিছু অসৎকাজের মধ্যে বিদ্যমান সেটার সমতুল্য অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে সৎকাজে বরং সেটা হতেও প্রবল। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ﴾ [البقرة: ١٦٥]

‘‘আর যারা মু’মিন তাদের ভালবাসা আল্লাহর সঙ্গেই সুদৃঢ় রয়েছে।’’(সূরা আল-বাকারাহ:১৬৫)

কেননা পূণ্য কাজের আহবায়ক স্বভাবতই অধিকতর শক্তিশালী। যেহেতু মানব তাতে আহবায়ক, সে ঈমান ও ইলম, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা এবং আমানত আদায়ের দিকেই আহবান করবে। যদি সে অন্য কাউকেও তারই অনুরূপ করতে পেরে ফেলে, তাহলে সে সেটার জন্য দ্বিতীয় আরও একজন আহবায়ক হয়ে গেল, বিশেষ করে সে যদি তার সমতুল্য হয়ে থাকে। আর যদি প্রতিযোগিতার সাথে হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। আসলে এটাই হল সুন্দর ও প্রশংসিত বিষয়।

মু’মিনদের মধ্য হতে এমন কাউকেও যদি পাওয়া যায় যিনি তার সাথে একাত্ম হবেন এবং উক্ত (ভাল) কাজের শরীকদেরকে পছন্দ করবেন এবং যদি সে সেটা না করে, তাহলে তাকে ঘৃণা করবেন, তিনি তখন তৃতীয় আর একজন আহবায়ক হয়ে যাবেন।

আর যদি তারা তাকে ঐ কাজ করতে আদেশ দেয়, সেটা করতে সহযোগিতা করে, সেটা না করার ফলে তার সাথে তার শত্রুতা করে এবং তাকে শাস্তি দেয় সে তখন তার জন্য চতুর্থ আহবায়ক হবে। তাকে এখন তার শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী এ চার প্রকার আহবায়ক সকলে একত্রিতভাবে অন্যকে সংশোধন করতেও আদেশ দেয়া হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱلۡعَصۡرِ ١ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَفِي خُسۡرٍ ٢ إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾ [العصر: ١، ٣]

‘‘যুগের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে কিন্তু যারা ঈমান আনে এবং যারা নেক কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের প্রতি উপদেশ দিতে থাকে, এবং একে অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দিতে থাকে’’ (সূরা আল-আসর:১-৩)

ইমাম শাফিঈ (রহ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন-‘‘হায়, যদি সকল মানুষ (শুধু) সূরা আল-আসরের বিষয়বস্তুর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করত তবে সেটাই তাদের মঙ্গল বিধানে যথেষ্ট হত।’’ বিষয়টি আসলে তিনি যেমন বলেছেন তেমনই। কেননা আল্লাহ উক্ত সূরায় সংবাদ দিয়েছেন যে, সমস্ত মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত, শুধু যে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও বিশ্বাসী এবং অন্যের সাথে (সামাজিকভাবে) সত্যের দিকে উপদেশ দানকারী, ধৈর্যের জন্য উপদেশ দানকারী (সে ক্ষতিগ্রস্ত নয়)।

 

সমাপ্ত

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ৩

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

অসৎ কাজ নিষেধের পদ্ধতি

প্রতিদিন আমরা আমাদের চারপাশে অনেক খারাপ কাজ সংঘটিত হতে দেখি। কিন্তু কেউ এ ধরনের কাজে বাধা প্রদান করি না। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা ঠিক নয়। কারণ হতে পারে মানুষ ভুলবশত ও গাফেল হিসেবে এসব কাজ করছে। বাধা না থাকলে নির্বিঘ্নে একাজ সংগঠিত হতে থাকলে এক সময় দেশ ও জাতি কেউই এ কাজের কুফল হতে রেহাই পাবে না। প্রকৃত মুসলিম ও সচেতন মানুষের অবশ্য কর্তব্য হলো এ ধরনের কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখা। মুসলিমগণ একদিকে যেমন সৎকাজ করবে, অন্যদিকে অসৎকাজের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এ ধরনের সকল উপায় উপকরণ থেকেও মানুষকে সতর্ক করতে হবে। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মদ পান নিষেধ করেন নি বরং তিনি আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগের মদ তৈরী ও রাখার পাত্রসহ যাবতীয় উপকরণকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে একবারে অন্যায়ের মুলোৎপাটন করা অসম্ভব।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবতীয় অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে মানুষকে বারণ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়া, ধাপ ও ক্রমান্বয়ের ফর্মূলা গ্রহণ করেছিলেন। মদপান নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে একথাই প্রতিয়মান হয় যে, পর্যায়ক্রমিকভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন। কুরআনে মাদকতা নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো।

  1. প্রথম পর্যায়ে সূরা আন-নাহলের ৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে

﴿ وَمِن ثَمَرَٰتِ ٱلنَّخِيلِ وَٱلۡأَعۡنَٰبِ تَتَّخِذُونَ مِنۡهُ سَكَرٗا وَرِزۡقًا حَسَنًاۚ ٦٧ ﴾ [النحل: ٦٧]

‘এমনিভাবে খেজুরের গাছ ও আঙ্গুরের ছড়া থেকেও আমরা একটি জিনিস তোমাদের পান করাই, যাকে তোমরা মাদকে পরিণত কর। এবং উত্তম পবিত্র পানীয় তাতে রয়েছে।

 

  1. দ্বিতীয় পর্যায়ে নাযিলকৃত আয়াত:

﴿ ۞يَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلۡخَمۡرِ وَٱلۡمَيۡسِرِۖ قُلۡ فِيهِمَآ إِثۡمٞ كَبِيرٞ وَمَنَٰفِعُ لِلنَّاسِ وَإِثۡمُهُمَآ أَكۡبَرُ مِن نَّفۡعِهِمَاۗ ٢١٩ ﴾ [البقرة: ٢١٩]

‘‘হে রাসূল! আপনাকে তারা মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, আপনি উভয় সম্পর্কে বলুন, মহাপাপ আর মানুষের জন্য লাভজনক তাদের লাভ থেকে পাপই বড়।’’[1]

 

  1. তৃতীয় পর্যায়ে মদকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَقۡرَبُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنتُمۡ سُكَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعۡلَمُواْ مَا تَقُولُونَ ٤٣ ﴾ [النساء: ٤٣]

‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা মাতলামির অবস্থায় নামাযের নিকটও যেও না, যতক্ষণ তোমরা যা বল তা জানতে না পার।’’ (সূরা নিসা: ৪৩)

অত:পর যখন ধর্মীয় অনিষ্ঠতা কোনো কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হলো তখন চিরস্থায়ীভাবে আল্লাহ তায়ালা মদপান হারাম করে দেন। তিনি বলেন-

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡخَمۡرُ وَٱلۡمَيۡسِرُ وَٱلۡأَنصَابُ وَٱلۡأَزۡلَٰمُ رِجۡسٞ مِّنۡ عَمَلِ ٱلشَّيۡطَٰنِ فَٱجۡتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٩٠ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُوقِعَ بَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ فِي ٱلۡخَمۡرِ وَٱلۡمَيۡسِرِ وَيَصُدَّكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَعَنِ ٱلصَّلَوٰةِۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّنتَهُونَ ٩١ ﴾ [المائ‍دة: ٩٠، ٩١]

হে ইমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, টার্গেট করে পশু বধ করা ও মুর্তির নামে গোশত বন্টন শয়তানী কাজের অপবিত্রতা। সুতরাং তোমরা তা ত্যাগ কর তাহলে তোমরা সফলতা লাভ করবে। মনে রেখ শয়তান এ মদ্যপান ও জুয়া খেলার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে চরম শত্রুতা ও হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি করতে সদা সচেষ্ট। সে তোমাদেরকে সালাত ও আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত রাখতে ইছুক। এখন জিজ্ঞাসা এই যে, তোমরা কি একাজ থেকে বিরত থাকবে। (সূরা আল-মায়েদাহ: ৯০-৯১)

রাসূল (স.) অসৎ কাজে বাধা দান করার পদ্ধতি বাতলে দিতে গিয়ে বলেন,

‘‘যদি কোন ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ সংগঠিত হতে দেখে তখন তার কর্তব্য হলো শক্তি দিয়ে এর প্রতিহত করা এতেও যদি যে সামর্থবান না হয় তবে মুখ দিয়ে বাধা দিবে। এক্ষেত্রে যদি সে অসমর্থ হয় তবে অন্তরে খারাপ কাজকে ঘৃনা করবে। আর এটা দুর্বল ঈমানের পরিচয়।”

যখন কোন সমাজে অন্যায় কাজকে অন্যায় বলার মত কোন প্রকৃত মুসলিম না থাকে তখন সে সমাজে সকলের উপর আল্লাহর আযাব ও গজব পতিত হতে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন-

﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ َ ٤١ ﴾ [الروم: ٤١]

‘জ্বলে ও স্থলে যেসব বিপর্যয় প্রকাশিত হচ্ছে তা তোমাদের নিজেদের অর্জন। ’’ (সূরা আর রূম:৪১)

আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে মানুষ দু’শ্রেণী

এখানে মানুষের দু’টি দলই ভুল করে থাকে।

প্রথম দল: তাদের উপর আদেশ ও নিষেধের যে দায়িত্ব, এ আয়াতটির ব্যাখ্যা হিসেবে অবহেলা করে ছেড়ে দিচ্ছে। যেমন প্রথম খলীফা আবু বাকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক ভাষণে বলেছিলেন; হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাক-

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ عَلَيۡكُمۡ أَنفُسَكُمۡۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهۡتَدَيۡتُمۡۚ﴾ [المائ‍دة: ١٠٥]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের স্ব-স্ব হিদায়াতের দায়িত্ব তোমাদের নিজেদের উপর, তোমরা যদি সৎপথপ্রাপ্ত হও তাহলে যারা বিপথগামী হয়েছে তারা তোমাদেরকে ক্ষতি করতে পারবে না’’- (সূরা আল-মায়িদাহ,:১০৫)। অথচ তোমরা সেটার সঠিক অর্থে ব্যবহার করছ না। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি ‘‘নিশ্চয়ই মানুষ যখন অসৎকাজ চলতে দেখবে, অথচ সেটাকে প্রতিহত করবে না, এটা বেশী দূরে নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা ঐ কাজের দায়ে সকলকেই সাধারণভাবে শাস্তি দিবেন।’’

আর দ্বিতীয় দলটি যারা জিহবা বা হাত দ্বারা মোটকথা সৎকাজ আদেশ দিতে ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে চায়, কোন প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সহনশীলতা বা ধৈর্য ছাড়াই এবং সেটার কোনটি কোথায় চলবে, আর কোথায় চলবে না, কোনটি সে করতে পারবে, আর কোনটি সে করতে পারবে না, সেদিকে লক্ষ্য নেই। যেমন- আবু সা‘আলাবাহ আল-খুশানী বর্ণিত হাদীসে আছে, আমি সেটা (ঐ আয়াতটি) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলাম, এতে তিনি বলেছিলেন:

‘‘বরং তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎকাজ হতে নিজেদেরকে নিজেরাই নিষেধ করবে। যখন দেখবে এমন কৃপণতা, যা অন্যেরা অনুসরণ করছে এবং অনুসৃত প্রবৃত্তি, প্রভাব বিস্তারকারী পার্থিব ঐশ্বর্য ও প্রত্যেক ‘আলিম ব্যক্তি স্ব-স্ব রায় নিয়েই খুশি হচ্ছে এবং এমন সব অশ্লীল কর্মকান্ড ঘটতে দেখবে যা ঠেকাবার মত তোমার কোন শক্তি নেই, এমতাবস্থায় ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা ভিত্তিক নিজে নিজেকেই রক্ষা করবে। এমন সময় হলে সর্বসাধারণের চিন্তা-ভাবনা করার তোমার সুযোগ থাকবে না, পারবেও না, কাজেই সেটা বাদ দিও। কেননা তোমার সামনে ধৈর্যের এমন দিন আসবে (তখন কঠিন পরীক্ষা হবে) ঐ দিনগুলোতে ধৈর্যের সাথে ঈমান নিয়ে টিকে থাকা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠিতে ধারণের মতোই কঠিন হবে। ঐ কঠিন দিনগুলোতে সৎকাজের কর্মীদের সাওয়াব হবে তার সমতুল্য আমলকারী পঞ্চাশ জন লোকের সৎ আমলের সমান।’’(সহীহ আত-তিরমিযী: কিতাবুল ফিতান, আবওয়াবুল তাফসীর; আবু দাউদ; ৪/১৫২, কিতাবুল মালাহিম, বাবুল আমরি ওয়াল নাহ-ই)

এমন কঠিন মুহূর্তে কোন একজন আদেশ ও নিষেধ নিয়ে এসে উপস্থিত হবে এ মনে করে যে, সে নিজে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুগত, আসলে সে নিজেই সীমালঙ্ঘনকারী।

যেমন- অনেক বিদ’আতী ও প্রবৃত্তির পূজারীগণ নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশদাতা ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারী হিসেবে নিজেদের সাজিয়ে বয়েছে। এ সকল লোক ঐ খারিজী, মুতাযিলা, শিয়া-রাফিযী ও অনুরূপ অন্যান্য গোষ্ঠীরই মত, যারা তাদের প্রতি আগত আদেশ ও নিষেধাবলীর ক্ষেত্রে ভুল করে বসেছে এবং এভাবেই তাদের সংশোধনী কাজের চেয়ে অনাসৃষ্টিই বেশী হয়েছে। (শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ, সম্পা. আবূ ‘আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ, পৃ.৬৯)

আদেশ দান ও নিষেধ করার ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেণীসমূহ

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ এর মতে এক্ষেত্রে মানুষ ত্রিবিধ:

এক. এমন সম্প্রদায় যারা তাদের নাফস সমূহের চাহিদা ব্যতিরেকে তারা কিছুই করবে না। তাদেরকে যা দেয়া হবে, তা ছাড়া তারা সন্তুষ্ট হবে না। আবার তাদেরকে যা হতে বঞ্চিত করা হবে, তা ব্যতীত (অন্য কোন কারণে) তারা রাগও করবে না। আর যখন তাদের কাউকেও তার প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী, তা হারাম হোক বা হালাল হোক, দেয়া হবে দেখবে তার রোষাগ্নি নির্বাপিত হয়ে গেছে এবং সাথে সাথে সে খুশিও হয়ে গেছে। আর ক্ষণিক পূর্বেও সে বিষয়টি তার নিকট অসৎ ছিল সেটা হতে নিষেধ করত, সেটা করার কারণে শাস্তি দিত, সেটা যে করত তাকে ভৎর্সনা করত, এখন সে স্বয়ং সেটার কর্তাব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা সম্পাদনে সে নিজেও শরীক ও সহযোগী এবং যে সেটা হতে নিষেধ করবে ও তাকে ঘৃণা করবে তার ঘোর শত্রু হয়ে উঠেছে।

এরূপ অবস্থা আদম সন্তানদের মধ্যেই বেশি প্রবল। তুমি দেখে থাকবে, মানুষ সেটার ঘটনা এত শুনছে যে, আল্লাহ ছাড়া সেটার পরিসংখ্যান আর কেউ দিতে পারবে না।

কারণ হলো যে, মানুষ আসলে অতিশয় যালিম ও অজ্ঞ। এজন্যই সে ন্যায়বিচার করে না। বরং সে হয়ত বা উভয়বিধ অবস্থাতেই অত্যাচারী। সে কোন রাজার হাতে প্রজা সাধারণের প্রতি অবিচার ও তাদের উপর সীমাহীন নির্যাতনের কারণে কোন সম্প্রদায়কে ঐ সম্প্রদায়ের হর্তাকর্তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করতে দেখবে। অত:পর ঐ রাজা ঐ সকল অনাস্থাবান লোকদেরকে যৎকিঞ্চিৎ দান-দক্ষিণা দিয়ে সন্তুষ্ট করে নিবে, অত:পর তারা ঐ অত্যাচারী রাজার সাহায্যকারী হয়ে বসবে। তাদের অবস্থাসমূহের মধ্যে মজার বিষয় হল যে, তারা ঐ যালিমের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হতেও বিরত (চুপ) থাকবে। অনুরূপভাবে (হে পাঠক) তাদের কাউকেও কোন মদ্যপায়ী বা ব্যভিচারীর নিকটে দেখবে এবং গানবাদ্য শুনতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তারা তাদের সাথে একত্রে ঐ কাজে প্রবেশ করবে, অথবা সেটার কিছু অংশ দ্বারা তারা তাকে সন্তুষ্ট করে ফেলবে, তখন দেখবে যে, সে তাদের সাহায্যকারী হয়ে গেছে।

দুই. অন্য আর এক সম্প্রদায়, তারা সহীহ দীনী কাজ-কর্মই করে থাকে এবং তাতে তারা একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে এবং যা করে তাতে তারা একনিষ্ঠ হয়ে থাকে এবং ঐ কাজও তাদের জন্য বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল হয়ে থাকে। এমনকি যে সকল ব্যাপারে তাদেরকে কষ্ট দেয়া হয় তাতে তারা ধৈর্যও অবলম্বন করে থাকে। আর আসলে ঐ সম্প্রদায়ই হল সেসব লোক, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে। আর ঐ সকল লোকই তো (উত্তম-উম্মাহ) অতি উত্তম জাতি, যারা মানব জাতির মহা কল্যাণ সাধনের জন্য সৃজিত হয়েছে। তারাই সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করে থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে।

তিন. আর এক সম্প্রদায়, তারা হল মু’মিনদের (বিশ্বাসীদের) বৃহত্তম অংশ। যাদের অন্তরে দীন আছে, আরও আছে কামরিপু, আবার অন্তরে আল্লাহর আনুগত্যের বাসনাও আছে ও ওদিকে অবাধ্যচরণের ইচ্ছাও বিদ্যমান। তাই কখনও এ আকাঙ্খা প্রবল হয়ে যায় আবার কখনও ঐ বাসনা হয় বেশী প্রবল।


[1]সূরা আল বাকারাহ:২১৯।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ২

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

দীন হলো কল্যাণ কামনা

সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা দান দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মূলত: দীন হলো পরস্পরের কল্যাণ কামনা। আর এটি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ব্যতীত অসম্ভব। কারণ সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করলে পরস্পর কল্যাণের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারে। আবার অসৎ কাজে বাধা দিলে ক্ষতি থেকে বিরত রাখা সহজ হয়। অতএব এটি দীনের অন্যতম মূলনীতি। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

«الدين النصيحة.قلنا لمن قال للله ولرسوله ولأئمة المسلمين وعامتهم».

দীন হলো মানুষের কল্যাণ কামনা। আমরা বললাম এটা কাদের জন্য? রাসূল বললেন, এটা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সকল মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণের জন্য।”

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ দীনের সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করে। মহান আল্লাহ যাবতীয় হালাল ও বৈধ বস্তুকে সৎকাজের নামান্তর এবং অবৈধ জিনিসকে অসৎ কাজ হিসেবে বারণ করার অধীন করেছেন। পূর্ববর্তী নবীগণ তাদের উম্মতের উপর কতক বৈধ জিনিসকে অবৈধ ঘোষণা করতেন। কুরআনে এসেছে-

﴿ فَبِظُلۡمٖ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ طَيِّبَٰتٍ أُحِلَّتۡ لَهُمۡ ﴾ [النساء: ١٦٠]

‘‘অতএব ইয়াহূদীদের যুলুমের কারণে তাদের উপর এমন কিছু জিনিস হারাম করে দিয়েছি যা তাদের জন্য হালাল ছিল।’’[1]

অথচ তাদের উপর এসব হারাম ছিল না। পবিত্র কুরআনে আরেকটি আয়াত এর সাক্ষ্য বহন করছে। আল্লাহ বলেন,

﴿ ۞كُلُّ ٱلطَّعَامِ كَانَ حِلّٗا لِّبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسۡرَٰٓءِيلُ عَلَىٰ نَفۡسِهِۦ ﴾ [ال عمران: ٩٣]

‘‘প্রত্যেকটি খাদ্য দ্রব্যই ইসরাইল বংশীয়দের জন্য হালাল ছিল, শুধু ঐ জিনিসটি ব্যতীত, যা ইসরাইল (ইয়াকুব) স্বয়ং নিজের উপর অবৈধ করে নিয়েছিল।”[2]

কোনো খারাপ জিনিস অবৈধ করা অসৎ কাজ হতে নিষেধ করারই অন্তর্গত। যেমনিভাবে পবিত্র জিনিসটা বৈধ করাও সৎ কাজে আদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। কেননা, উত্তম জিনিসকে অবৈধ করা, আল্লাহ যা করতে নিষেধ করেছেন তারই অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে সকল সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলের উন্নত চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধন করেছেন। আল্লাহ রাববুল আলামীন ইরশাদ করেন-

﴿ ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٣]

‘‘আমি আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামত সম্পন্ন করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন ইসলামকে একমাত্র দীন বা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।”[3]

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা অপরিহার্য

জাতিকে সৎকাজে আদেশ দান এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করা ওয়াজিব-ই- কিফাইয়াহ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ‘ইরশাদ করেছেন:

﴿ وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤ ﴾ [ال عمران: ١٠٤]

‘‘তোমাদের মধ্য হতে এমন একটি জাতি হওয়া উচিত যারা সকল ভাল তথা উত্তম বিষয়ের দিকে আহবান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে, আসলে তারাই হচ্ছে সফলকাম সম্প্রদায়।’’ (সূরা-আলে ইমরান:১০৪)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যখন, তাদের দ্বারা সৎকাজের আদেশ সংঘটিত হবে বলে সংবাদ দিয়েছেন, তখন প্রাপ্তবয়স্ক লোকগণের নিকট ঐ আদেশ ও নিষেধ যেন পৌঁছে এ ব্যবস্থা করতে হবে। অত:পর যদি তারা গাফলতি করে, তবে তারা এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

অনুরূপভাবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা নির্দিষ্ট করে প্রত্যেকের উপর বর্তাবে না; বরং পবিত্র কুরআনের প্রমাণ অনুসারে সেটা ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ।

জিহাদও ঠিক অনুরূপভাবে ওয়াজিব-ই-কিফায়াহ। অতএব সেটার দায়িত্বশীল যখন সেটা সম্পাদনে ব্রতী হবেন না, তখন সকল সামর্থ্য ব্যক্তিগণ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব পালন না করার দোষে সমভাবে দোষী হবেন। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবেই বুঝা গেল যে, প্রতিটি মানুষের উপরই তার শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব বর্তাবে। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে বলেছেন:

«من رأى منكم منكرا فليغره بيده فإن لم يستطع فبلسانه فإن لم يستطع فبقلبه وذلك أضعف الإيمان»

‘‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ একটি অসৎকাজ (হতে) দেখবে, সে যেন তাকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। তবে যদি সে ঐরূপ করতে অক্ষম হয়, তাহলে কথা দ্বারা যেন তাকে প্রতিহত করে, যদি এরপরও করতে অক্ষম হয়, তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তাকে ঘৃণা করে। আর সেটা হবে সবচাইতে দুর্বল ঈমান।’’(বুখারী: কিতাবুল ‘ইলম; মুসলিম: কিতাবুল ঈমান; আবু দাউদ; বা-বুল আমরি ওয়ান্নাহই; ইবনে মাযাহ: কিতাবুল ফিতান, বাবুল আমরি বিল মা’রূফি ওয়ান্নাহই আনিল মুনকার; আত-তিরমিযী: কিতাবুল রাইয়্যাত, আল-নাসায়ী: কিতাবুল ঈমান; আল-দারিমী: কিতাবুর রূইয়্যা; ইবনে হাম্বাল ২/৪)

যদি বিষয়টি ঐ রকমই হয়, তাহলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা, একটি বৃহত্তর সৎকাজ; যার জন্য আমরা আদিষ্ট হয়েছি। তার জন্যই বলা হয়েছে- তোমার আদেশ যেন সৎকাজের জন্য হয় এবং অসৎকাজে তোমার নিষেধ করাও যেন সৎ হয়।

যখন এটা সর্বোত্তম ওয়াজিব এবং পছন্দনীয় কাজ, সুতরাং এ ওয়াজিবসমূহ (অপরিহার্য) ও মুস্তাহাবগুলোর সুফল তাদের (প্রয়োগের কারণে) অপকারের চাইতে বেশী ভারি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু এটা সহকারেই রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছে এবং আসমানী গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা কখনও ফাসাদ বা অনাসৃষ্টি পছন্দ করেন না। উপরন্ত আল্লাহ যার আদেশ করবেন, তা উত্তমই হবে। আল্লাহ তা‘আলা সৎকাজ ও সৎকর্মীদের প্রশংসা করে বলেছেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ ٨٢ ﴾ [البقرة: ٨٢]

“আর যাঁরা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে।’’(সূরা আল বাকারা:৮২)

আবার ফাসাদ ও ফাসাদকারীদের কুৎসা করেছেন একাধিক স্থানে। অতএব যেখানে আদেশ ও নিষেধের উপকার হতে সেটার অপকারই মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে সেটা, আল্লাহ যে সকল বিষয়ে আদেশ করেছেন তার অন্তর্ভুক্ত হয় না। আর যদি ঐ রকম হয়ে যায়, তবে যেন ওয়াজিবই ছাড়া হয়ে গেল; আর নিষিদ্ধ কাজই করা হল। এরূপ ক্ষেত্রে মু’মিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর বান্দাহদের ব্যাপারে আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করা, তাদেরকে হিদায়াত করা তার দায়িত্ব নয়। এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার কথারই অর্থ বহন করে:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ عَلَيۡكُمۡ أَنفُسَكُمۡۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهۡتَدَيۡتُمۡۚ ﴾ [المائ‍دة: ١٠٥]

‘‘হে মু’মিনগণ! তোমরা যদি সৎপথের যাত্রী হয়েই থাক, তাহলে যারা পথ ভুলে গিয়েছে তারা তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না’’- (সূরা আল-মায়িদাহ: ১০৫)।

দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সৎপথের সন্ধানকারী পূর্ণতা লাভ করে থাকে। সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি যদি তার করণীয় কাজ কথা সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে থাকে, যেমন- অন্যান্য ওয়াজিব কাজগুলো আদায় করে থাকে, তবে পথভ্রষ্ট লোকদের পথভ্রাষ্টতা তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

অসৎকাজ হতে নিষেধ করা কখনও শক্তি দ্বারা হতে পারে, আবার কখনও বা রসনার দ্বারা, আবার কখনও শুধু অন্তরের ঘৃণা দ্বারাই হয়ে থাকে। অন্তর দ্বারা সেটা করা সর্বাবস্থায়ই ওয়াজিব হবে। যেহেতু সেটা করতে কোনই ক্ষতি নেই। যে ব্যক্তি এতটুকু ঘৃণাও পোষণ করে না সে আসলে মু’মিনই নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী হতে এরূপই বুঝা যায়। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: وذلك أضعف الإيمان ‘‘আর সেটা হল সবচাইতে দুর্বল ঈমান।’’

সৎকাজে আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার ক্ষেত্রে শর্তাবলী

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ বলেন,

  1. তার কাজ সুষ্ঠু হবে না যদি না সেটা পরিমিত শিক্ষা ও তীক্ষ্মজ্ঞানভিত্তিক হয়।

যেমন- উমার ইবন আবদুল আযীয (রহ.) বলেছেন-

‘যে ব্যক্তি বিনা বিদ্যায় আল্লাহর ইবাদত করে, সে যতটুকু ভাল করে, তার চাইতে খারাপই বেশি করে।’’

যেমন- মু‘আয ইবন জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসে আছে:

‘‘কাজ করার আগে প্রয়োজন জ্ঞান; কাজের স্থান হল বিদ্যার্জনের পর।’’ এটা তো একেবারেই স্পষ্ট। কেননা ইচ্ছা করা ও কর্ম সম্পাদন করা যদি জ্ঞানের আলোকেই না হয়, তাহলে সেটাই মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা, সর্বোপরি প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং সৎ ও অসৎকাজ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা ও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার মত উপযুক্ত শিক্ষা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন এবং যাকে কোন বিষয়ে আদেশ করা হবে বা কোন কাজ হতে নিষেধ করা হবে, তার অবস্থা সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।

  • উত্তমভাবে আদেশ বা নিষেধ করা। যেমন, সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সরলপথ অনুযায়ী হয়। আসলে সিরাতাল মুস্তাকীম হল-উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে অতি দ্রুত পৌঁছাবার মত সংক্ষিপ্ত তথা নিকটতম পথ।
  • সুনম্র ব্যবহার ঐ কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‘‘যে বিষয়েই নম্রতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই সুশোভিত করেছে, আবার যে বিষয়েই খানিকটা কঠোরতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই অশোভিত করেছে- দৃষ্টিকটু করে ফেলেছে’’- (মুসলিম: হা: নং- ২৫৯৪)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন-

নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়াশীল, প্রত্যেকটি বিষয়েই নম্র ব্যবহার তিনি পছন্দ করেন, নম্রতাপূর্ণ ব্যবহারের ফলে তিনি যা দান করেন কঠোরতার কারণে তা দেন না।’’

(বুখারী: ১২/২৮০, ফাতহুল বারী আলা শারহিল বুখারী, কিতাবুল ইসতিহাবাহ; মুসলিম: কিতাবুসসিয়ার, ৮/২২; আবু দাউদ, কিতাবুল আমওয়াল, ৫/১৫৫; আত-তিরমিযী: ৫/৬০, হা: নং-১৭০১; ইবনে মাজাহ: ২/১২১৬, কিতাবুল আদব-বাবুন ফিররিফক; আল-দারিমী: ২/৩২৩; ইববে হাম্বল: ১/১১২)

  1. আদেশ দানকারী বা নিষেধকারীকে অবশ্যই কষ্টে সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হতে হবে। কেননা, এ কথা সত্য যে, তার উপর বিপদ আসবেই। এমন সময় যদি সে ধৈর্য ধারণই না করে, সহ্যই না করে, তাহলে সে যা ভাল করতে পারত তার চাইতে নষ্টই করে বসবে বেশি। যেমন- লুকমান হাকীম তদীয় তনয়কে উপদেশ দানকালে বলেছিলেন:

﴿ وَأۡمُرۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱنۡهَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَآ أَصَابَكَۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ١٧ ﴾ [لقمان: ١٧]

‘‘এবং (হে বৎস)! সৎকাজ আদেশ দান কর এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ কর, (এ কাজ করতে যেয়ে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হবে তাতে ধৈর্য অবলম্বন কর, নি:সন্দেহে সেটা একটি মহৎ কাজ।’’ (সূরা লুকমান:১৭)

এজন্যই আল্লাহ তা‘আলার রাসূলগণ, অথচ তাঁরা সৎকাজে আদেশ দানকারী ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারীদের নেতা, তাদেরকেও ধৈর্য অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। যেমন- তিনি সর্বশেষ রাসূল (স.) কে বলেছেন। আসলে সেটা (ধৈর্য) রিসালাতের দায়িত্ব তাবলীগের সাথেই জড়িত। কেননা সর্বপ্রথম যখন তাঁকে (সা) রাসূল হিসেবে গণ্য করা হল, তখনই সূরা ‘ইকরা’ নাযিল হবার পর (যার মাধ্যমে তাঁকে নাবী বলে সংবাদ দেয়া হয়েছে) আল্লাহ তাঁকে আদরভরে সম্বোধন করে বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ ١ قُمۡ فَأَنذِرۡ ٢ وَرَبَّكَ فَكَبِّرۡ ٣ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ ٤ وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ ٥ وَلَا تَمۡنُن تَسۡتَكۡثِرُ ٦ وَلِرَبِّكَ فَٱصۡبِرۡ ٧ ﴾ [المدثر: ١، ٧]

‘‘হে চাদর আচ্ছাদনকারী! উঠুন এবং ভয় প্রদর্শন করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন, আপনার বেশভূষা পবিত্র করুন, অপবিত্রতা (মূর্তি) পরিত্যাগ করুন, আর কাউকেও এ উদ্দেশে দান করবেন না যে, অতিরিক্ত বিনিময় প্রত্যাশা করেন এবং আপনার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির উদ্দেশেই ধৈর্য অবলম্বন করুন।’’ (সুরা আল-মুদ্দাসসির:১-৭)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে সৃষ্টি জগতে প্রেরণের এ আয়াতগুলো ভীতি প্রদর্শনমূলক বিষয় দ্বারাই শুরু তথা সূচনা করেছেন এবং ধৈর্য ধারনের আদেশ দানের মাধ্যমে শেষ করেছেন। মুলত শাস্তির ভয় প্রদর্শনই হল সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা।

অতএব জানা হয়ে গেল যে, ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব, তথা অপরিহার্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ لِحُكۡمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعۡيُنِنَاۖ ٤٨ ﴾ [الطور: ٤٨]

‘‘এবং আপনার প্রতিপালকের এ ব্যবস্থার উপর (ফায়সালার অপেক্ষায়) ধৈর্য অবলম্বন করুন, নিঃসন্দেহে আপনি আমাদেরই দৃষ্টিতে আছেন।’’(সূরা আত-তুর:৪৮)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা অন্যত্র আরও বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَٱهۡجُرۡهُمۡ هَجۡرٗا جَمِيلٗا ١٠ ﴾ [المزمل: ١٠]

‘‘তাদের কথায় (বিচলিত না হয়ে বরং) ধৈর্য অবলম্বন করুন এবং তাদেরকে নির্দ্বিধায় পরিত্যাগ করুন।’’ (সূরা আল-মুযযাম্মিল:১০)

অন্য আয়াতে এ প্রসঙ্গে আল্লা তা‘আলা আরও বলেছেন:

﴿ فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ ٣٥ ﴾ [الاحقاف: ٣٥]

‘‘দৃঢ় সংকল্পচিত্ত রাসূলগণের মতই আপনিও ধৈর্য ধারণ করুন।’’ (সূরা- আল-আহকাফ:৩৫)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আরও বলেছেন:

﴿ فَٱصۡبِرۡ لِحُكۡمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ ٱلۡحُوتِ ٤٨ ﴾ [القلم: ٤٨]

‘‘আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করুন এবং (খবরদার) মাছের কাহিনীর সে লোক (ইউনুস) আলাইহিস সালাম এর মতো অধৈর্য হবেন না।’’ ( সূরা আল-কালাম:৪৮)

ধৈর্য সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র আরও বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ وَمَا صَبۡرُكَ إِلَّا بِٱللَّهِۚ ١٢٧ ﴾ [النحل: ١٢٧]

ধৈর্য অবলম্ব করতে থাকুন, আসলে আপনার ধৈর্য ধারণ তো একমাত্র আল্লাহরই জন্য ছাড়া নয়।’’ (সূরা আন-নাহল:১২৭)

আবার আর এক স্থানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١١٥ ﴾ [هود: ١١٥]

‘‘আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, কেননা আল্লাহ তা‘আলা নিষ্ঠাবানদের কর্মফল বিলীন অর্থাৎ- নষ্ট করেন না।’’ (সূরা হূদ:১১৫)

সুতরাং শিক্ষা, নম্রতা ও ধৈর্য-এ তিনটি বিষয় ছাড়া কোন ক্রমেই চলবে না। আদেশ করা বা নিষেধ করার পূর্বেই জ্ঞানের দরকার এবং সে সঙ্গে নম্রতা, আর এটার পরেই প্রয়োজন ধৈর্যের। যদিও এ ত্রিবিধ বিষয়গুলোই সর্বাবস্থাতেই একই সঙ্গে পাওয়া যেতে হবে।

যেমন- সালফে সালিহীনদের কোনো একজনের উক্তি বর্ণনাকারী পরস্পরায় কাজী আবূ ইয়ালা ‘‘আল-মু‘তামাদ’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

لايأمرهم با لمعروف ولا ينهى عن المنكر إلا من كان فقيها فيما يأمرهم به فقيها فيما ينهى عنه رفيقا فيما يأمربه رفيقا فيما ينهى عنه حليما فيما يأمربه حليمافيما ينهى عنه.

‘‘যিনি সৎকাজে আদেশ করবেন ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করবেন, তিনি যদি ঐ বিষয়ে সুবিজ্ঞ আলিম তথা ফকীহ না হন, তাহলে তিনি তা করতে পারেন না। অনুরূপ তিনি যে বিষয়ে আদেশ দিবেন, সে বিষয়ে নম্র হবেন এবং যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও নম্র হবেন এবং যে বিষয়ে আদেশ দিবেন সে বিষয়ে তাকে সহিষ্ণু হতে হবে, আবার যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও তাকে সহিষ্ণু হতে হবে।’’ তা না হলে তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে পারবেন না। সে যেন এটাও জেনে রাখে যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার কতগুলো পদ্ধতি তথা নীতি আছে, যার জটিলতা অনেকের উপরই এনে ফেলে। তখন সে ধারণা করে যে, ঐ সকল জটিলতার কারণে সেটা হতে বাদ পড়ে যাবে। ফলে সে এ কাজই ছেড়ে দেয়। সেটা এমন বিষয়সমূহের অন্তর্গত যে, এ পদ্ধতিগুলো না পাওয়া গেলে তার মূল বিষয়টিকে (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ) ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কেননা অবশ্য করণীয় কাজটি না করাও পাপ। আবার আল্লাহ তা‘আলা যা করতে নিষেধ করেছেন সেটা করাও পাপ।

সুতরাং এক পাপ হতে অন্য পাপে জড়িয়ে পড়ার উদাহরণ হল, একটি বাতিল দীন হতে সরে অন্য আর একটি বাতিল দীন গ্রহণ করা। এমন হওয়াও সম্ভব যে, প্রথমটির চাইতে দ্বিতীয়টি বেশী মাত্রায় খারাপ, আবার এটার মাত্রা একটু কমও হতে পারে। হয়তো বা দু’টি দীনই খারাপ হিসেবে সমান। সৎকাজে আদেশদানকারী ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারী যাদের মধ্যে ত্রুটি পাওয়া যাবে, অর্থাৎ ভালরূপে দায়িত্ব পালন করতে পারে নি অথবা তাতে সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদের কাউকে পাবে যে, এই জনের দোষ সাংঘাতিক বড়, ঐ জনের পাপ সাংঘাতিক ধরনের বড়, আবার হয়তো বা উভয়েই পাপে বরাবর বা একই শ্রেণীভুক্ত।


[1] সূরা আন নিসা: ১৬০।

[2]সূরা আলে ইমরান: ৯৩।

[3]সুরা আল মায়িদাহ:৩।