Category Archives: তাওহীদ

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

কিতাব আত তাওহীদের দারস – পর্বঃ ১

কিতাব আত-তাওহীদ

 

ডাউনলোড করুন অধ্যায়-১ [তাওহীদ সমস্ত ইবাদাতের মূল] এর উপর বিস্তারিত আলোচনা- আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

কিতাব আত-তাওহীদ দারস- [১]-[তাওহীদ সমস্ত ইবাদাতের মূল]

আলহামদুলিল্লাহির রব্বিল আ’আলামীন ওয়াস সলাতু ওয়াস্ব সলামু আ’লা রসুলিহীল আমীন। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’আলার জন্য আর সলাত ও সালাম বর্ষিত্ হোক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর। তাওহীদ মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বিষয়। পৃথীবির সকল নাবী-রসূল এই তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। আর তার ধারাবাহিকতায় সাহাবারা, তাবেয়ী ও ইমামগন তাদের সাধ্যমত তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী হয়েছেন। মানুষের মাঝে তাওহীদ এর বিষয়টা ভালোভাবে প্রবেশ করানোর জন্য নানা কিতাব লিখা হয়েছে। তাওহীদপন্থী আলেম উলামাগন- ইসলামে এই কিতাবুত তাওহীদ এর মত আর কোন গ্রন্থ রচিত হয় নি। এটি একটি সহজ ভাষায় দাওয়াতী প্রচারের বই। কারন শায়খ মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আত-তামীমি (রহঃ) তার রচিত এই কিতাবে তাওহীদের মূল প্রমান, অর্থ ও ফযিলাত বর্ননা করেছেন। তাওহীদের বিপরীতে শিরকের ও আলোচনা করে তার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। তাই আপনি যেখানেই থাকুন না কেন এই কিতাবটি পড়া, মুখস্ত করা ও অনুধাবন করা অতন্ত্য জরুরী।

এ কিতাবের দারস এর মূল উদ্দেশ্য হলঃ

  • ১. মহান আল্লাহকে জানা
  • ২. তার সাথে শিরক না করা
  • ৩. তাওহীদের মুলনীতি গুলো অনুধাবন করা
  • ৪. শিরকের ছিদ্রপথ গুলো বন্ধ করা
  • ৫. মুশ্রিকদের সাথে আচরন ও তাদের প্রতি দাওয়াতের মুলনীতি জানা
  • ৬. জাহেল সমাজে তাওহীদের গুরুত্ব ও এর আসল রুপরেখা তুলে ধরা
  • ৭. শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জানা ও মানা।

মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

শুধুমাত্র আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। [সুরা যারিয়াতঃ ৫৬]

আল্লাহর এ বানীর মর্ম হলঃ আমি জীন ও মানুষকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি শুধুমাত্র একটি কারনে কএরছি আর তা হল- আমার ইবাদাত করার জন্য। ইবাদাত হল সেই জিনিষ যা আদেশ তা পালন করলে আল্লাহ খুশি হন আর যা নিষেধ তা না পালন করলে আল্লাহ খুশি হন। জীবনের প্রত্যেকটি হালাল কাজ আল্লাহর জন্য করাই ইবাদাত। এ আয়াতে তাওহীদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা আছে { إِلَّا لِيَعْبُدُونِ } এর মাঝে। এর অর্থে বলা হচ্ছেঃ আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করব আর তাঁর ইবাদাতে কাউকে শরীক করব না। কেননা আমাদের প্রত্যেক নাবী ও রসূলগন তাওহীদের উদেশ্যেই এই দুনিয়াতে এসেছেন। “ইবাদাত” এর শাব্দিক অর্থ হল: বিনয়-নম্রতা ” কিন্তু এর সাথে যদি ভালোবাসা ও ভয়ের সাথে আনুগত্য যুক্ত হয় তাহলে সেটা হল শারীয় ইবাদাত’। অর্থাৎ আমাদের ইবাদাত আল্লাহর জন্য আর ইবাদাত হলঃ

ভালোবাসা, আশা ও ভয়ভীতির সাথে যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই ইবাদাত

মহান আল্লাহ আবার বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। [সুরা নাহলঃ ৩৬]

এ আয়াতে ইবাদাত ও তাওহীদের ব্যাখ্যা আছে। আর এখানে বলা হচ্ছে প্রত্যেক রসুল দুটি বানী নিয়ে দুনিয়াতে এসেছেনঃ

  • ১. তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর।
  • ২. তাগুত থেকে দূরে থাকো।

[اعْبُدُوا اللَّهَ] অংশে রয়েছে তাওহীদের কথা আর [وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ] – অংশে রয়েছে শিরকের সাথে অস্বীকার করার কথা। বান্দা তার ইবাদাত ও আনুগত্য এর সীমা অতিক্রম করে যার নিকট নিজেকে সপে দেয় তাকেই তাগুন বলে।

অন্য জাগায় আল্লাহ বলেনঃ

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। [সুরা ইসরাঃ ২৩]

এখানে [وَقَضَىٰ رَبُّكَ] এর অর্থ হল আদেশ করা বা উপদেশ দেয়া। আর [أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ]—এর অর্থ হলঃ “ইবাদাতকে শুধুমাত্র আল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর কারো মধ্যে নয়।” অর্থাৎ যদি সিজদাহ করি তাহলে একমাত্র আল্লাহর জন্য, যদি কুরবানী দেই তাও শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। অর্থাৎ জীবনের প্রত্যেক হালাল কাজে তার সন্তুষ্টি থাকতে হবে। এখানে কোন [পীর, হুজুর, কেবলা, ইমাম বা দরবেশ- কে শরীক করা যাবে না]। আর বাস্তবে এটাই হলঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর – মুল কথা।

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ ۖ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا

(হে মুহাম্মাদ!)আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পড়ে শুনাই, যেগুলো তোমাদের রব তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। আর সেটা হল, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না। [সুরা আন’আমেরঃ ১৫১]

অর্থাৎ আল্লাহ তারঁ রসুলকে দিয়ে আমাদের কে সর্বপ্রথম এই শিক্ষা দিচ্ছেন যে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপা হল “শিরক” আর তাই এথেকে আমাদের বিরত থাকতে বলেছেন।

আর এর আরো একটি আয়াতের মর্মাথ হলঃ

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا

আর ইবাদাত কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। [সুরা নিসাঃ ৩৬]

এ আয়াতে শিরকে আসগার(ছোট শিরক), শিরকে আকবার(বড় শিরক) ও শিরকে খাফী(গোপন শিরক) সব কিছু নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ঘোষনা করা হয়েছে। এছাড়াঃ “কোন মালায়িকা, নাবী রসুল, নেককার বান্দা, দুনিয়াবী বস্তু, জ্বীন এর সাথে আল্লাহর শরীক করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ

ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

“যে ব্যাক্তি মুহাম্মাদ (সঃ) এর মোহরাংকিত উপদেশ দেখতে চায় সে যেন মহান আল্লাহর এ বানী পাঠ করেঃ

‘[সুরা আন’আমের ১৫১-১৫৩ পর্যন্তঃ (হে মুহাম্মাদ!)আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পড়ে শুনাই, যেগুলো তোমাদের রব তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। আর সেটা হল, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না………………… নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না…’ ”

এ আয়াতে আল্লাহর তরফ থেকে দশটি উপদেশ আছে আর তা নিম্ন রুপঃ

  • ১. আল্লাহর সাথে শরীক না করা
  • ২. পিতা মাতার সাথে সদ্বাচারন করা
  • ৩. নিজ সন্তানকে দারিদ্রের কারনে হত্যা না করা
  • ৪. প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে নির্লজ্জতার কাছে না যাওয়া
  • ৫. যাকে হত্যা করা হারাম তাকে হত্যা না করা
  • ৬. এতীমের ধনসম্পদ মেরে না খাওয়া
  • ৭. ওজন ও মাপ সঠিক দেয়া
  • ৮. ন্যায় বিচার করা কোন পক্ষপাত্বিত্ব না করা
  • ৯. আল্লাহর তরফ থেকে উপদেশ গ্রহন করা
  • ১০. তাকওয়া অর্জন করা

আর সর্ব প্রথম যে আদেশ আছে তা হল “শিরক না করা”।

মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

“আমি গাধার পিঠে মহানবী (সঃ) এর পেছনে বসে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন- ‘হে মুয়াজ! বান্দার উপর আল্লাহর হক কি? এবং আল্লহর উপর বান্দার হাক্ব কি জানো?’ আমি বললাম- ‘আল্লাহ ও তারঁ রসূল (সঃ) ই ভালো জানেন।’ তখন মুহাম্মাদ (সঃ) বললেন- ‘বান্দার উপর আল্লাহর হক এই যে বান্দা শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করবে এবং তারঁ সাথে কাউকে শরীক করবে না।। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক্ব এই যে, যে ব্যাক্তি আল্লাহর সাথে কোন শরীক সাবস্ত্য না করে তাকে শাস্তি না দেয়া।।’ আমি বললাম- ‘হে রসুলুল্লাহ (সঃ) আমি কি মানুষকে এই সুসংবাদ দিয়ে দেব না??’ তিনি বললেন- ‘তাদের এ সুসংবাদ দিও না তাহলে তারা আমল বিমুখ হয়ে পড়বে।’” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

 

এথেকে বোঝা যায় তাওহীদ মেনে চলা আল্লাহর জন্য একটি ওয়াজিব হাক্ব। বান্ন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ওয়াজিব এটা।

আমরা এই অধ্যায় থেকে আরো কিছু জিনিষ জানতে পারি তা হ্লঃ

  • ১. জ্বীন ও মানুষ সৃষ্টির রহস্য
  • ২. ইবাদাতই হল- তাওহীদ। কারন এর মাঝে বিরোধ হয়।
  • ৩. যে ব্যাক্তি তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করল না সে কোন ইবাদাতই করল না।
  • ৪. নাবী-রসুলদের পাঠানোর রহস্য
  • ৫. প্রত্যেক আন্তির নিকট নাবী-রসুল পাঠানো হয়েছে
  • ৬. সকল নাবীর দ্বীন- এক ও জীবন ব্যাবস্থাও এক [ইসলাম]
  • ৭. তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদাত হবে না।
  • ৮. আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদাত করা হয় সেটাই তাগুত
  • ৯. সুরা আন’আমে দশটি উপদেশ
  • ১০. সুরা ইসরায় আরো আঠারোটি বিষয় আল্লাহ বলেছেন।
  • ১১. আল্লাহর ও বান্দার মাঝে হক এর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা রাখা
  • ১২. অধিকাংশই সাহাবীরা (রঃ) এবিষয়টি [মুয়াজ বিন জাবাল (রঃ) এর হাদিসটি] জানতেন না
  • ১৩. কল্যানের স্বার্থে এলেম গোপন রাখা
  • ১৪. মুসলমানদের আনন্দের সংবাদ দেয়া মুস্তাহাব
  • ১৫. আল্লাহর দয়ার সীমার কথা ভেবে আমল বিমুখ হওয়ার আশংকা

 

ইনশাহ আল্লাহ! আমরা আগামী দারস-এ আরো তাওহীদের বিষয়গুলো জানব। আল্লাহ আমাদের এই দারস কবুল করুন এবং এর মাধ্যমে আমাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করে তাওহীদের পথে চলার জন্য সহজ করে দিন আমীন।

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান (পর্বঃ ১ – ৭)

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান

মুহাম্মদ উসমান গনি

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

কুরআন মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে মানুষের জন্য হিদায়েত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার একমাত্র সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ। এটি এমন একটি কিতাব যাতে আছে জীবনকে সুন্দর সহজ ভাবে সৎ পথে পরিচলার দিক-নির্দেশনাসহ জাতিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও পরকালীন জীবনের বিস্তারিত নর্ণনা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করার উপায়। যেহেতু এটি একটি হিদায়েতের কিতাব কাজেই শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্বরুপ বলা যায় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, পর্দাথ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিজ্ঞান যে ষিয়েই পারদর্শী হোন না কেন উক্ত সর্ব বিষয়েই পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত রয়েছে বলে মানুষ হিদায়েত পেতে পারে। এব্যাপারে ২/১টি উদাহরণ তুলে ধরছি যাতে সবার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়। সূরা কাহাফে আসহাবে কাহাফদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ . سورة الكهف : 18ِ

“তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে। [সুরা কাহফঃ ১৮]

এই সূরা, এমনকি কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অধ্যায়ন করলে দীর্ঘ দিন ঘুমন্ত লোককে ডান দিকে ও বাম দিকে পরিবর্তন করানোর কথাটি বলার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হবে না। এতে না আছে পূর্বের বা পরের আয়াতের মিল, না আছে কোন প্রশ্নের উত্তর, আর না আছে কোন হিদায়েতের কথা। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হবে এই কথাটি বলাই ছিল নিসপ্রয়োজন। কিন্তু না, তা কখনোই না। মহাজ্ঞানী আল্লাহ কি বিনা কারণে কুরআনের মত অহী গ্রন্থে এসব উল্লেখ করেছেন? আমি ডাক্তার হিসাবে এই আয়াতের অর্থ প্রথম পড়ার পর মনে হয়েছে সারা জীবন ও যদি সিজদায় পড়ে থাকি তাহলেও মানর জাতির জন্য এই শিক্ষার বিনিময় আদায় করা অসম্ভব। আমি নিজের অজান্তেই আল হামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ পড়ে কতক্ষণ যে নিশ্চুপ হয়েছিলাম তা মনে নেই। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। মানুষের দীর্ঘ দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা আবস্থায় যদি পার্শ্ব পরিবর্তন করানো না হয় তাহলে শরীরের নীচের অংশে ঘা হয়ে পচন ধরে। এক ভালো করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এমনকি রোগী রোগমুক্ত হয়েও এ মারা যায়। কাজেই ডাক্তারের কাছে অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তন করানোটা কত যে মূল্যবান তা বুঝতেই পারেন। সে ই কারণে আমরা অজ্ঞান রোগীর জন্য নেই ঘন ঘন পার্শ্ব পরিবর্তন করার. ভাবতে কেমন লাগে যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিস্কারের অনেক আগেই অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তনের নির্দেশ দিচ্ছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা । এই ব্যাপারটি আপনারা কিভাবে নিবেন তা আপনাদের বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম। আর একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-কাসাসে ঘোষণা দেনঃ

إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فيه. سورة القصص: 72

অর্থ: আল্লাহ যদি দিবসকে কেয়ামত পর্যনত স্থায়ী রাখেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্য আছে কি যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম? [সুরা কাসসঃ ৭২]

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে লাটিমের মত (লাটিম যেমন নিজের অক্ষের উপর ঘুরে, আবার দৌড়ায়ও) ঘুরে বলেই দিন, রাত্রি ও ঋতুর পরিবর্তন হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সূর্যের দিকে আজীবন একই দিকে মুখ করে ঘুরত তাহলে একদিক হতো চিরদিনের জন্য শুধু গরম আর গরম , আর অন্যদিক হতো অন্ধকার (রাত্রি) এবং ঠান্ডা আর ঠান্ডা। অথবা পৃথিবীর যে দিকে সূর্য আছে তার অপর দিকে যদি আরও একটি সূর্য থাকত তাহলে পৃথিবী যেভাবেই ঘুরত না কেন, সব সময়েই পৃথিবীর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ থাকত আলোকিত এবং গরম আর গরম। এই উভয় অবস্থাতেই পৃথিবীতে কোন জীব জন্তুর বসবাস করা সম্ভব হত না , যেমন চাঁদে কোন দিনই মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব হবে না । কারণ একেতো ওখানে বাতাস নেই, অধিকন্তু সব সময়েই একদিক পৃথিবীর দিকে মুখ করে ঘুরে বলে চাঁদের এক পৃষ্টের তাপমাত্রা ১১৭’, আর অন্য পৃষ্ঠের তাপমাত্রা (-) ১৩৬’। অতএব এক পৃষ্ঠে অতি গরম, আর অন্য পৃষ্ঠে অতি ঠান্ডা বিধায় মানুষের বসবানের অনুপযোগী। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, নভোচারীরা কি করে চাঁদে ঘুরে এলো? নভোচারীরা যে পোশাক পরিধান করে চাঁদে ভ্রমন করেছিলেন তা চাঁদের আবহাওয়ায় ক্ষতি করতে পারে না। এই ধরণের পোশাক পরে মানুষ কিছু দিন থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ দিন থাকতে পারবে না। এরই মধ্যে অক্সিজেন, খাওয়া দাওয়া, টয়লেট, সব কিছুর সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। আর বর্তমানে এর মূল্য ১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫৭ কোটি টাকা)। চাঁদে বসে এই পোশাক পরিবর্তন ও করতে পারবে না। পরিবর্তন করতে গেলেই সে মারা যাবে।

আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ। এই গ্রহের মত অরেক গ্রহ আছে যেখানে কোন রাত্রি নেই। এমনি একটি উদাহরণ হলো যার দুটি সূর্য এবং অষঢ়যধ মবহরঃরপ যার সূর্যের সংখ্যা ৩টি। অতএব পৃথিবী যদি উপরোক্ত অবস্থায় পতিত হতো তাহলে আমাদের অবস্থা কি হতো, একটু ভেবে দেখবেন কি?

 

এই আলোচ্য বইটিতে বিভিন্ন অধ্যায় এ সৃষ্টির বিভিন্ন দিক ও তার মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদের উদাহরনগুলো সুন্দর ভাবে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়কে নিচে LINK করে দেয়া হলঃ

  • আল্লাহর সাথে শরীক করা,
  • মানুষ সৃষ্টির কারণ এবং
  • ইবাদাতের অর্থ কি?

ছবি ও মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের হুকুম

ছবি ও মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের হুকুম

আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান || সম্পাদনা : চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ

ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমস্ত মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ডাকার জন্য। আর সাথে সাথে আউলিয়া কিংবা অন্যান্য নেককারদের অথবা অন্য কোন গাইরুল্লাহর ইবাদত করা হতে বিরত রাখার জন্য। এদের পূজা করা হয় মূর্তি, ভাস্কর অথবা ছবি বানিয়ে। এই দাওয়াত বহু পূর্ব হতে চালু হয়েছে, যখন থেকে আল্লাহপাক তাঁর রাসূলদের প্রেরণ করা শুরু করেছেন মানুষের হিদায়েতের জন্য।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ (النحل 36)

আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি এই বলে যে, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর, আর তাগুত(তাগুত হচ্ছে ঐ সমস্ত ব্যক্তি বা জিনিস যাদের ইবাদত করা হয় আল্লাহকে ছেড়ে, আর তাতে তারা রাজী খুশী থাকে) থেকে বিরত থাক। (সূরা নাহল ১৬: ৩৬ আয়াত)

এই সমস্ত মূর্তির কথা সুরা নুহতে উল্লেখিত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় দলিল হল, ঐ মুর্তিগূলি ছিল ঐ যামানার সর্বোত্তম নেককারগণের। এই হাদীস ইবনে আব্বাস রা. হতে বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে আল্লাহপাকের ঐ কথার ব্যাখ্যায়:

 

وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آَلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴿23﴾ وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا (نوح 23-24)

আর তারা বলল. তোমরা কোন অবস্থাতেই তোমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ কর না, আর ওদ্দা, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউকনাসরাকে কক্ষনই পরিত্যাগ কর না। আর তারা তো অনেককেই গোমরাহ করেছে। (সূরা নূহ, আয়াত : ২৩ ও ২৪)

তিনি বলেন: তারা ছিলেন নূহ আ. কওমের নেককার বান্দা। যখন তারা মৃত্যুমুখে পতিত হন তখন শয়তান তাদের গোপনে কুমন্ত্রনা দেয় যে তারা যে সমস্ত স্থানে বসত সেখানে তাদের মূর্তি বানিয়ে রাখ, আর ঐ মূর্তিদেরকে তাদের নামেই পরিচিত কর। তখন তারা তাই করল, কিন্তু তখনও তাদের ইবাদত শুরু হয়নি। তারপর যখন ঐ যামানার লোকেরাও মারা গেল, তখন তাদের পরের যামানার লোকেরা ভূলে গেল যে, কেন ঐ মূর্তিগুলির সৃষ্টি করা হয়েছিল। তখনই তাদের পুজা শুরু হয়ে গেল। (ফতহুল বারী ৬/৭ পৃষ্ঠা)।

এই ঘটনা হতে এটা শিক্ষা পাওয়া যায় যে, গাইরুল্লাহর ইবাদতের কারণগুলির একটি হল এই যে, জাতীয় নেতাদের মূর্তি তৈরী করা। অনেকেরই ধারনা এই সময় মূর্তি , বিশেষ করে ছবি হারাম নয়, বরঞ্চ হালাল। কারণ, বর্তমানে কেউ ছবি বা র্মর্তির পূজা করে না। কিন্তু এটা কয়েকটি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়:

বর্তমান যামানায়ও মূর্তি ও ছবির পূজা হয়ে থাকে। যেমন গির্জা সমূহে আল্লাহকে ছেড়ে ইসা আ. ও তার মাতা মারইয়ামের আ. ছবির পূজা হয়। এমনকে ক্রুশের সামনে তারা রুকুও করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র তৈরী করা হয়েছে ইসা আ. ও তার মায়ের উপর, যা খুবই উচ্চ মুল্যে বিক্রি করা হয়। আর উহা ঞরে ঝুলিয়ে রাখা হয় তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ইবাদত করার জন্য।

এই সমস্ত ভাস্কর যা দুনিয়ার দিক দিয়ে উন্নত ও রুহানী দিক দিয়ে অনগ্রসর জাতি কিংবা জাতীয় নেতারা সম্মান প্রর্দশন করেন তাদের মস্তক হতে টুপি খুলে, অথবা তাদের সম্মুখ দিয়ে যাবার সময় তাদের মাথা ঝুকিয়ে অতিক্রম করে। যেমন আমেরিকায় জর্জ ওয়াশিংটনের ভাস্কার্য, ফ্রান্সে নিপোলিয়ানের মূর্তি, রাশিয়ায় লেলিন ও ষ্টালিনের ভাস্কার্যের সম্মুখে এবং এ জাতীয় ভাস্কার্য বড় বড় রাস্তায় স্থাপন করা হয়েছে। তাদের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমের সময় পথচারিরা মস্তক ছুকিয়ে সালাম দেয়। এমনকি ইই ধরনের ভাস্কার্যের চিন্তা ভাবনা অনেক আরব দেশে ডর্যন্ত ছড়িয়ে পড়িছে। এভাবেই তারা কাফেরদের অনুসরন করতে উদ্যোগী হয়েছে, আর রাস্তা ঘাটে এরকম ভাস্কার্যের সৃষ্টি করেছে আস্তে আস্তে এই সমসত ভাস্কার্য ও মূর্তি আরবের মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে, যদিও ওয়াজিব ছিল এই চাতীয় ভাস্কার্য তৈরী না করে ঐ ধন দৌলত মসজিদ মাদ্রাসা, হাসপাতাল, সাহায্য সংস্থা ইত্যাদি তৈরীর জন্য ব্যয় করা যাতে এই উপকার সকলের নিকট পৌছেঁ, যদিও তারা এটা তাদের নামে নাম করণ করুক না কেন তাতে কোন ক্ষতি নেই।

আর এমন একদিন আসবে, যখন এই ভাস্কার্যগুলির সম্মুখে মস্তক অবনত করে সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং তাদের ইবাদত করা হবে, যেমনভাবে ইউরোপ, তুর্কী এবং অন্যান্য দেশে হচ্ছে। আর তাদের পূর্বে নুহ আ. এর কওম তা করেছিল। তারা তাদের নেতাদের ভাস্কার্য তৈরী করেছিল, অত:পর তাকে সম্মান করত ও ইবাদত করত।

রাসূল সা. আলীকে রা. হুকুম করে বলেন:

لا تَدَعْ تِمْثَالاً إلاَّ طَمَسْتَهُ ولا قَبْرًا مُشْرِفًا إلاَّ سَوَّيْتَهُ (رواه مسلم)

যেখানে যত মুর্তিই দেখ না কেন, তাকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে ফেল। আর যত উচুঁ কবর দেখবে, তাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে। (মুসলিম)

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, যত ছবি দেখবে তাকে টুকরা টুকরা করে ফেলবে।

ছবি ও মূর্তির ক্ষতিকর দিক সমূহ

ইসলামে যত জিনিসকেই হারাম করা হয়েছে তা দ্বীনের ক্ষেত্রে কিংবা চরিত্রের ক্ষেত্রে কিংবা সম্পদ অথবা অন্যান্য কোন ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করেই করা হয়েছে। আর সত্যিকারের মুসলিম সর্বদা আল্লাহ ও তার রাসূলের হুকুমের কাছে নিজেকে অবনত করে, যদিও সে ঐ হুকুমের হাকিকত নাও জানতে পারে তথাপিও। মূর্তি ও ছবির অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। ঐ গুলি হচ্ছে:

  • ১। আকীদা ও দ্বীনের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে, ছবি মূর্তি বহু লোকেরই আকীদা নষ্ট করে ফেলেছে। কারণ, খৃষ্টানরা ইসা আ. মারইয়াম আ. এবং ক্রুশের ছবির পূজা করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় তাদের নেতাদের মূর্তির পূজা করা হয়।

আর ঐ মূর্তিগুলির সামনে নিজেদের মস্তক সমূহকে অবনত করে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে। তাদের সাথে পা মিলিয়ে চলছে কোন কোন মুসলিম ও আরব দেশ। তারাও তাদের নেতাদের মূর্তি ও ভাস্কার্য স্থাপন করেছে। তারপর কোন কোন সূফি পীরদের মধ্যে এর প্রবনতা দেখা দিয়েছে। তারা তাদের পীর মাশায়েখদের ছবি, সালাত আদায় করার সময়, তাদের সম্মুখে স্থাপন করে এই নিয়তে যে, এতে তাদের মধ্যে খুশু বা আল্লাহর ভয় পয়দা হয়। আর তাদের মাশায়েখরা যখন যিকর করতে থাকে তখন তাদের ছবি উত্তোলন করে। ফলে তাদের মরাকাবা ও মুশাহাদা দেখাতে বিঘ্ন ঘটায়। কোন কোন স্থানে তাদের ছবিকে সম্মান দেখিয়ে লটকিয়ে রাখে এই ধারনা করে যে এত বরকত হয়।

সেই রকম অনেক গায়ক গায়িকা ও শিল্পীদের ছবি তাদের অনুসারীরা ভালবাসে। তারা ওদের ছবি সংগ্রহ করে সম্মান এবং পবিত্রতা দেখানোর জন্য ঘরে অথবা অন্যত্র ঝুলিয়ে রাখে। এ সম্বন্ধে লেখক বলেছেন ঐ গায়কের ঘটনা যা ১৯৬৭ সালে ইয়াহুদিদের সাথে যুদ্ধে ঘটেছিল। ফলে তাদের পরাজয় ঘটে। কারণ তাদের সাথে গায়করা ছিল, আল্লাহ ছিলেন না। ফলে ঐ গায়ক গায়িকারা কোন উপকার করতে পারেনি। বরঞ্চ এদর কারণেই তাদের পরাজয় ঘটেছিল। হায়! যদি আরবগণ এই ঘটনা হতে শিক্ষা গ্রহণ করে সর্বান্তকরনে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করত, তবে তারা আল্লাহর সাহায্য পেত।

  • ২। ছবি ও মূর্তি যে কিভাবে যুবক, যুবতিদের স্বভাব চরিত্র নষ্ট করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাস্তাঘাট বাড়িঘর পূর্ণ হয়ে আছে এই ধরণের তথকাথিত শিল্পীদের ছবিতে যারা নগ্ন, অর্ধ নগ্ন অবস্থায় ছবি উঠিয়েছে। ফলে, যুবকরা তাদের প্রতি আশেক হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নানা ধরনের ফাহেশা কাজে তারা লিপ্ত হয়ে পড়েছে। তাদের চরিত্র ও অভ্যাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে, তারা না দ্বীন সম্বন্ধে চিন্তা করছে, আর না বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার চিন্তা ভাবনা করছে। না সম্মান, আর না জিহাদের চিন্তা ভাবনা করে। আজকের যামানায় ছবির প্রচার খুবই বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে মহিলা ও শিল্পীদের ছবি। এমনকি জুতার বাক্স, পত্রিকা, পাক্ষিক, বই পুস্তক, টেলিভিশন ইত্যাদিতেও। বিশেষ করে যৌন উত্তেজক সিনেমা, ধারাবাহিক নাটক এবং ডিটেকটিভ চলচিত্র সমূহে। অনেক ধরনের কার্টুন ছবিতেও যাতে আল্লাহ পাকের সৃষ্টিকে বিকৃত করা হচ্ছে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা লম্বা নাক, বড় কান কিংবা বিরাট বিরাট চোখ সৃষ্টি করেননি, যা তারা এই ছবি সমূহে অংকন করে থাকে। বরঞ্চ আল্লাহ তাআলা মানুষকে অতি উত্তমরূপে সৃষ্টি করেছেন।
  • ৩। ছবি ও মূর্তির ক্ষেত্রে যে ধন দৌলত নষ্ট হয়, প্রকাশ্যভাবে তা সকলেরই গোচরীভূত হয়। এই জাতীয় ভাস্কর মূর্তি সমূহ সৃষ্টি করার জন্য হাজার হাজার, লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয় শয়তানের রাস্তায়। বহু লোক এই জাতীয় ঘোড়া, উট, হাতি, মানুষের মূর্তি ইত্যাদি ক্রয় করে তাদের ঘরে নিয়ে কাচেঁর আলমারীতে সাজিয়ে রাখে। আবার অনেকে তাদের মাতা পিতা বা পরিবারের লোকদের ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে। এই সমস্ত কাজে যে ধন দৌলত তারা ব্যয় করে তা যদি গরীব মিসকীনদের মাঝে দান ছাদাকাহ করত, তবে মৃতের রুহ তাতে শান্তি পেত। এর থেকেও লজ্জাকর ঘটনা হল, কেউ কেউ বাসর রাতে স্ত্রীর সাথে যে ছবি তোলে তা ড্রইং রুমে ঝুলিয়ে রাখে অন্যদের দেখানোর জন্য। মনে হয় যেন তার স্ত্রী তার একার নয়, বরঞ্চ তা সকলেরই।

ছবি ও মূর্তির কি একই হুকুম


অনেকে এই ধারণা করে যে, জাহিলিয়াত যামানায় যে সমস্ত মূর্তি তৈরী করা হত একমাত্র ঐ গুলিই হারাম। এতে বর্তমান যামানার অধুনিক ছবি অর্ন্তভূক্ত নয়। এটা বড়ই আবাক হওয়ার কথা। মনে হচ্ছে, তারা যেন ছবিকে হারাম করে যে সমস্ত হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে তা শ্রবনই করেনি। তার মধ্য থেকে কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখিত হল:

আয়েশা রা. একটি ছোট বালিশ ক্রয় করেছিলেন। তাতে ছবি আকা ছিল। ঘরে প্রবেশের সময় রাসূল সা. এর দৃষ্টি এতে পতিত হলে তিনি আর ঘরে প্রবেশ করলেন না। আয়েশা রা. তার মুখ মন্ডল দেখেই তা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন: আমি আল্লাহ ও তার রাসূলের নিকট তওবা করছি। আমি কি গুনাহ করেছি? রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন: এই ছোট বালিশটি কোথায় পেলে? তিনি বললেন: আমি এটা এ জন্য খরিদ করেছি যাতে আপনি এতে হেলান দিয়ে বিশ্রাম করতে পারেন। তখন রাসূল সা. বললেন: যারা এই সমস্ত ছবি অংকন করেছে কিয়ামতের মাঠে তাদেরকে আযাব দেয়া হবে। তাদের বলা হবে: তোমরা যাদের সৃষ্টি করেছিলে. তাদের জীবিত কর। অত:পর তিনি বললেন: যে ঘরে ছবি আছে সে ঘরে মালাইকাগণ প্রবেশ করেন না। (বুখারী ও মুসলিমের মিলিত হাদীস)

তিনি আরো বলেছেন:

أشَدُّ النَّاسِ عَذابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِيْنِ يُضَاهُوْنَ بِخَلْقِ اللهِ (متفق عليه)

কিয়ামতের মাঠে ঐ সমস্ত লোকেরা (যারা ছবি আঁকে তারা আল্লাহর সৃষ্টির মতই কিছু করতে উদ্যত হয়।)সবচেয়ে বেশী আযাব ভোগ করবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করে। (বুখারী ও মুসলিমের মিলিত হাদীস)

বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে:

أنَّ النَّبيَّ صلي الله عليه وسلم لَمَّا رأي الصُّوَرَ في البيتِ لَمْ يَدْخُلْ حتّي مُحِيَتْ (رواه البخاري)

রাসূল সা. কোন ঘরে ছবি দেখলে, তা সরিয়ে না ফেলা পর্যন্ত ঐ ঘরে প্রবেশ করতেন না। (বুখারী)

রাসূল সা. বাড়ীতে ছবি ঝুলাতে নিষেধ করেছেন আর অন্যদের উহা আঁকতে কিংবা তোলতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী)

যে সমস্ত ছবি বা মূর্তি জায়েয

গাছপালা, চন্দ্র, তারকা, পাহাড় পর্বত, পাথর, সাগর, নদনদী, সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য, পবিত্র স্থানের ছবি যেমন কাবাঘর মদীনা শরীফ, বাইতুল মোকাদ্দাস, বা অন্যান্য মসজিদের ছবি, যা কোন মানুষ বা প্রাণী নয় তার ছবি উঠানো কিংবা ভাস্কর বানানো জায়েয। দলীল: এ সম্বন্ধে ইবনে আব্বাস রা. বলেন: যদি তোমাকে ছবি বা মূর্তি বানাতেই হয়, তবে কোন বৃক্ষ বা এমন জিনিসের ছবি আঁক যাদের জীবন নেই।

পরিচয় পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা এ জাতীয় কাজে এটা জায়েয অতিশয় প্রয়োজনের খাতিরে।

হত্যাকারী বা অপরাধীদের ছবি তোলা জায়েয, যাতে করে তাদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়। সেইরকম বিজ্ঞানের প্রয়োজনে যা তোলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছবি, যে সস্বন্ধে কিছু উলামা জায়েযের ফতোয়া দিয়েছেন।

যেই রকম ছোট বাচ্চা মেয়েরা যদি ঘরে বানানো কাপড় দিয়ে পুতুল খেলে তা জায়েয যা পোশাক পরিহিত হবে পাক পরিস্কার হবে, যাতে করে কিভাবে শিশুকে পালন করতে হয় তা বাচ্চারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ফলে, বড় হয়ে মা হলে তা তাদের উপকারে আসবে।

দলিল: আয়েশা রা. বলেন: আমি রাসূলের সা. নিকট আমার পুতুল মেয়ে নিয়ে খেলা করতাম। (বুখারী)

তবে বাচ্চাদের জন্য বিদেশী কোন পুতুল খরিদ করা জায়েয নেই। বিশেষ করে ঐ সমস্ত পুতুল যা নগ্ন কিংবা বেপর্দা অবস্থায় আছে। যদি এটা দ্বারা বাচ্চারা খেলাধূলা করে তবে তা থেকে তারা অনুকরণ করে সেই মত চলতে তারা উদ্যাগী হবে। আর এভাবেই সমাজকে নষ্ট করে দিবে। অধিকন্ত এই টাকা পয়সা কাফিরদের দেশে ও ইয়াহুদীদের নিকট পৌঁছবে।

ছবির মাথা যদি কেটে দেয়া হয়. তবে তা ব্যবহার করার অনুমতি আছে। কারণ, ছবির মূল হল মাথা। তাই যদি ছেদ করে দেয়া হয় তবে আর রুহ থাকল না। তখন তা জড় পদার্থের পর্যায়ে পড়ে। এ সম্বন্ধে জিবরাইল আ. রাসূলকে সা. বলেন:

مُر برأسِ التِّمْثَالِ يَقْطَعُ فَيَصِيْرُ عَلي هَيئَةِ الشَّجَرَةِ وَمُرْ بِالسَّتْرِ فلْيَقْطَعْ فليَجْعَلْ مِنْهُ وِسَادَتَيْنِ تَوطأنِ (رواه ابوداود)

আপনি মূর্তির মাথা কেটে দিতে বলেন, ফলে উহা গাছের মত কিছু একটাতে পরিবর্তিত হবে। আর পর্দার কাপড়কে দুটুকরা করে তা দ্বারা দুটি বালিশ বানাতে বলেন। (আবু দাউদ)

সন্তানকে তাওহীদের শিক্ষা

আলী হাসান তৈয়ব – সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সন্তানকে বুদ্ধি বিকাশের প্রথম প্রহরেই দীন সম্পর্কে ধারণা দিতে ইচ্ছুক থাকি। সন্তান কথা বলা শুরু করতেই আমরা অনেকে আল্লাহ, আব্বু-আম্মু শিক্ষা দেই। কালেমায়ে শাহাদাহ শেখাই। তারপর ক্রমেই তাকে সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদতের সঙ্গে পরিচিত করাই। কিন্তু যে কাজটি আমরা করি না তা হলো সন্তানকে শুধু কালেমা শেখানোই নয়; তাকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া, ঈমানের মোটামুটি বিস্তারিত শিক্ষা দেয়া এবং তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দিকগুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়া।

তাইতো দেখা যায় আমাদের সন্তানরা বড় হয়েও অবচেতন মনে তাওহীদের শিক্ষা পরিপন্থী কাজ করে বসে। শিরকের গন্ধ মিশ্রিত কথা বলে বসে। শিশুকালের এই ঘাটতি আর সারা জীবন পূরণ হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় পরবর্তীতে তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি এটাকে অপমান হিসেবে দেখেন। এমনকি অনেকে বলেই বসেন, হ্যা, বাপ-দাদার আমল থেকে কি তবে ভুলই করে আসছি!

অথচ সাহাবীদের অবস্থা দেখুন। তাঁরা বুদ্ধির উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই শিশুকে তাওহীদ শেখাতেন। ঈমানের শিক্ষাকে তাঁরা এলেম ও আমলের শিক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দিতেন। কারণ, এলেম ও আমলেরও আগে ঈমান। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ ، فَتَعَلَّمْنَا الإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ ، ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ , فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا»

‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থাকতাম। তখন আমরা টগবগে যুবা ছিলাম। সে সময় আমরা ঈমান শিখি আমাদের কুরআন শেখার আগে। এরপর আমরা কুরআন শিখি। এতে করে আমাদের ঈমান বেড়ে যায় বহুগুণে।’ (সহীহ ইবন মাজা : ৬১।)

এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে কুরআন শেখানোর আগে ঈমান শিক্ষা দেন। আর ঈমান হলো- হাদীসে যেমন এসেছে : আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ».

‘ঈমানের সত্তরের কিছু বেশি অথবা (বর্ণনাকারীর মতে তিনি বলেছেন) ষাটের কিছু বেশি শাখা রয়েছে। এসবের সর্বোচ্চটি হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্নটি হলো পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জা ঈমানের একটি অংশ।’ (মুসলিম : ১৬২; মুসনাদ আহমদ : ৯৩৫০।)

প্রিয় পাঠক, আপনি নিশ্চয় দেখে থাকবেন, ছোট্র শিশু যে এখনো ভালো করে কথা বলতেও শেখেনি। যখন সে আজানের বাক্য শুনতে পায়, এর সুরে সুর মিলিয়ে, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের অনুকরণে সেও তার আওয়াজ লম্বা করে। এমনকি উপস্থিত ব্যক্তিদের অলক্ষ্যে সে প্রায়শই প্রতিবার আজানের সময় সচকিত ও উৎকর্ণ হয়। তারপর সে নিজের থেকেই তাওহীদের কালেমা, তাওহীদের নবীর রেসালাতের সাক্ষ্যের কালেমা আবৃত্তি করতে থাকে।

আমার পাশের বাসার ছয় বছর বয়েসী নার্সারিতে পড়া বাচ্চাটি রোজ আজান দেয়। মসজিদের আজান শুরু হওয়া মাত্র পশ্চিম দিকের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সেও শুরু করে আজান দেয়া। বিস্ময়কর এবং ঈমান জাগানিয়া ব্যাপার হলো, বাচ্চাটির আজান হয় প্রায় নির্ভুল এবং উচ্চারণ ও কণ্ঠস্বর বেশ আকর্ষণীয়। সুতরাং প্রতিটি অভিভাবকেরই উচিত, কুঁড়ি থেকে মুকুলিত হবার আগেই নিজের শিশু সন্তানের যত্ন নেয়া। সুন্দর উচ্চারণে শিশুকে কালেমায়ে তাওহীদ তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিক্ষা দেয়া। তারপর কালেমার মর্ম ও মাহাত্ম্য শিখিয়ে দেয়া।

সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, আপনি যদি (‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’) কালেমায়ে তাওহীদের মর্ম উপলব্ধি করতেন, এর মাহাত্ম্য ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হতেন, তবে নিশ্চয় তা নিজের ভেতর দৃঢভাবে ধারণ করতেন এবং নিজ সন্তানকে এ কালেমা বারবার উচ্চারণ ও আবৃত্তি করার নির্দেশ দিতেন। আহমদ বিন হাম্বল রহ. আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ نُوحًا صلى الله عليه وسلم لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ قَالَ لِابْنِهِ : إِنِّي قَاصٌّ عَلَيْكَ الْوَصِيَّةَ ، آمُرُكَ بِاثْنَتَيْنِ ، وَأَنْهَاكَ عَنِ اثْنَتَيْنِ : آمُرُكَ بِلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، فَإِنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالأَرَضِينَ السَّبْعَ ، لَوْ وُضِعْنَ فِي كِفَّةٍ وَوُضِعَتْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فِي كِفَّةٍ لَرَجَحَتْ بِهِنَّ ، وَلَوْ أَنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالأَرَضِينَ السَّبْعَ كُنَّ حَلْقَةً مُبْهَمَةً لَقَصَمَتْهُنَّ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ».

‘নূহ আলাইহিস সালামের যখন মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি তখন তার পুত্রের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি তোমাকে সংক্ষেপে অসিয়ত করছি। তোমাকে দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর। কেননা সাত আকাশ আর সাত যমীনকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কে রাখা হয় আরেক পাল্লায় তবে সাত আসমান ও যমীনের চেয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র পাল্লাই ভারী হবে। যদি সাত আসমান আর সাত যমীন কোনো হেঁয়ালীপূর্ণ বৃত্ত ধারণ করে তবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তা ভেদ করে চলে যাবে। [আল-আদাবুল মুফরাদ : ৫৪৮; মুসনাদ আহমদ : ৬৫৮৩।]

উদ্দেশ্য হলো, সন্তান যখন আধো আধো ভাষায় অস্ফূটকণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে, প্রথম যখন তার বাকপ্রতিভার অভিষেক ঘটে, তখন ঈমানের শাখাগুলোর মধ্যে প্রথম ও সর্বোচ্চটি তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মাধ্যমেই তা করার চেষ্টা করা উচিত।

একটি বিদেশি পত্রিকায় আমি একটি কার্টুন দেখেছিলাম। এর ক্যাপশনটি ছিল এমন : নিজ সন্তানের প্রথম বাক্যোচ্চারণ শুনে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে গায়ক স্বামী তার স্ত্রীকে বলছেন, দেখ, আমাদের বাবুটি গড না বলে প্রথমেই বলছে ‘রাত’!! একজন কণ্ঠশিল্পীর শিশুর কাছে অবশ্য এমনটি অতি বেশি আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু বিপত্তি হলো আজকালের মুসলিম পরিচয়ধারী ভাইদের থেকেও এমন ঘটনা ঘটছে। যারা ইসলামের অনুসরণকে ধর্মান্ধতা (?) ভাবলেও নিজেরাই আবার পশ্চিমাদের অনুকরণ করেন অন্ধভাবে। ইদানীং এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। কেবল একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যাক :

এক ভদ্রলোক তার নিষ্পাপ শিশুকে নিয়ে পথ চলছেন। বয়স তার অনুর্ধ্ব চার বছর। পথে দেখা হলে তার এক বন্ধু বাচ্চাটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? বাচ্চাটি একজন পপ গায়কের নামে তার পরিচয় দিল। বন্ধুটি বললেন, বাহ্! তুমি কি ওই শিল্পীর মতো গান গাইতে পারো? শিশুর বাবা গর্বিত কণ্ঠে বললেন, হ্যা, অবশ্যই। এমনকি তিনি সন্তানকে গান শুনিয়ে দিতেও নির্দেশ দিলেন। বাবার নির্দেশ পেয়ে শিশুটি গাইতে শুরু করলো। অথচ শিশুটি এখনো অনেক শব্দ উচ্চারণ করতে শেখেনি! ট কে সে বলছিল ত আর কঠিন শব্দগুলো উচ্চারণ করছিল তার কল্পনা মতো।

আশা করি শিক্ষণীয় বিষয়টি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। হ্যা, বলছিলাম নিজের শিশুটিকে শুরু থেকেই আল্লাহর নাফরমানীতে অভ্যস্ত না করে তাঁর প্রশংসা ও বড়ত্ব সূচক সুন্দর বাক্য উচ্চারণে অভ্যস্ত করা উচিত। আমাদের ভেবে দেখা দরকার নিজ সন্তানকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আমরা আর কোথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী? কোথায় তাঁদের সন্তান আর কোথায় আমাদের সন্তান?

﴿فَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يَهۡدِيَهُۥ يَشۡرَحۡ صَدۡرَهُۥ لِلۡإِسۡلَٰمِۖ وَمَن يُرِدۡ أَن يُضِلَّهُۥ يَجۡعَلۡ صَدۡرَهُۥ ضَيِّقًا حَرَجٗا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي ٱلسَّمَآءِۚ كَذَٰلِكَ يَجۡعَلُ ٱللَّهُ ٱلرِّجۡسَ عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ﴾ [البقرة:125]

‘সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না’। সুরা বাকরা-১২৫

হে আল্লাহ, আমাদের বক্ষগুলোকে আপনার হিদায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আমাদের সন্তাদের আপনার সন্তুষ্টিমাফিক গড়ে তোলার তাওফীক দেন। আমীন।

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর মর্মকথা

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর মর্মকথা

বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন আম্মাবাদ।

ইসলাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কতৃক প্রেরিত পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। যুগে যুগে আল্লাহ অসংখ্য নবী রাসুলকে প্রেরণ করেছিলেন যারা তাদের জাতির নিকট “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আর দাওাত দিয়েছেন। কিন্তু আই দাওাত না বুঝতে পারার বা গ্রহন না করার জন্য আজ মানুষ আল্লাহ ব্যাতিত অন্য ইলাহের ইবাদাত করে।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর অর্থঃ  “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ হল “ আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন মাবুদ নেই।“  অন্য কথায় বলা যায় “আল্লাহ ব্যাতীত প্রক্রিত কোন ইলাহ নেই।“ অথবা “ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ব্যাতীত অন্য কোন ইলাহ বা সত্তা ইবাদাত পাবার যোগ্য নয়”।

কিন্তু আমাদের সমাজে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর যে অর্থটা করা হই তা ঠিক নয়। কারন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থ যদি বলা হয় “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা ইলাহ নেই” তাহলে অর্থ যথাথ হয় না কারন আল্লাহ বাতিত অনেক বাতিল ইলাহ বা মাবুদ রয়েছে জাদের ইবাদাত করা হয়। যেমন হিন্দুরা ৩৩ কোটি দেবতার পুজা করে, খ্রিস্টানরা ইসা (আঃ) এর ইবাদাত করে প্রভৃতি আ গুল শব গুলোই ইলাহ। করর, মাজার, গরু, সাপ, পাথর যত কিছুর কাছে কিছু চাওয়া হয় তার সবই ইলাহ। এমনকি আল্লাহর কোন সিফাত যদি মানুষকে দেয়া হয় তাবে সেই মানুষ কে ইলাহে পরিনত করা হয়। যেমনটি আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর ক্ষেত্রে করা হয়েছে তাকে গাউসুল আজম বলে ডাকা হয় অথচ গাউসুল আজম হল আল্লাহ নিজেই কারণ গাউসুল আজম অর্থ হল মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস বা যিনি বিপদ থাকে উদ্ধার করার সবচেয়ে উপযুক্ত। এই ভাবে মানুষ কে আল্লাহর স্থানে বসানো হচ্ছে।

আর আল্লাহ ব্যাতীত আর অন্য ইলাহা রয়েছে তার কথা আল্লাহ নিজে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন,

وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَٰكِن ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ۖ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مِن شَيْءٍ لَّمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبِيبٍ [١١:١٠١]

“আমি কিন্তু তাদের প্রতি জুলুম করি নাই বরং তারা নিজেরাই নিজের উপর অবিচার করেছে। ফলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব মাবুদকে ডাকতো আপনার পালনকর্তার হুকুম যখন এসে পড়ল, তখন কেউ কোন কাজে আসল না। তারা শুধু বিপর্যয়ই বৃদ্ধি করল।“ [সূরা হুদ ১০১]

কিন্তু তারা কোন ইবাদাত পাবার যোগ্য নয়। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই ইবাদাত পাবার যোগ্য।

আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ [٢٢:٦٢]

“ এজন্যেও যে, আল্লাহ, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে ওটা তো অসত্য এবং আল্লাহ, তিনিই তো সমুচ্চ, মহান।“ [ সূরা হাজ্জ ৬২ ]

এই জন্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আর অর্থ করতে হবে “ আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই।“

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহাএর গুরুত্ব ও মর্যাদা

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা” এর গুরুত্ব যে কত অপরিসীম, এর মর্যাদা যে কত উচ্চ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষুদ্র পরিসরে তা বলে শেষ করার মত নয়। তবুও সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা এ কালেমার গুরুত্ব এবং মর্যাদা তুলে ধরছি।

১. এটি ইসলামের মূল কালেমা। এর স্বাক্ষ্য দানই ইসলামে প্রবেশের একমাত্র রাস্তা। কেউ বুঝে শুনে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দিলে সে হবে মুসলিম, আর অস্বীকার করলে সে হবে কাফির। এ হচ্ছে এমন এক কালেমা যা মানুষের ঈমান এবং কুফরীর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। সবারই একথা জানা আছে যে, একজন অন্য ধর্মাবলম্বী যদি ইসলামে আসতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই এ কালেমার স্বীকৃতি দিতে হয়। বর্তমানে যারা নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করছে তাদের জন্যও অবশ্যই জরুরী যে তারা বুঝে-শুনে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেবে অন্যথায় তাদেরও মুসলিম দাবী করা বৃথা হবে। রাসূল (সঃ) যখন মুয়ায (রাঃ) কে ইয়ামানে পাঠিয়েছিলেন তখন বলেছিলেন,নিশ্চয়ই তুমি আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের) এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ। সুতরাং তুমি প্রথমে তাদেরকে কালেমার দাওয়াত দিবে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

২. নাবী-রাসুলদের মূল দাওয়াতই ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা” এর দিকে আহবান করা, যাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মানব জাতির হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছিলেন।আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ [٢١:٢٥]

“আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল পাঠাইনি তার কাছে এই ওহী ছাড়া যে,আমি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই সুতরাং আমারই ইবাদত কর।” [সূরা আম্বিয়া ২১:২৫]

সুতরাং এ কালেমার দাওয়াতই সর্বশ্রেষ্ঠ দাওয়াত, এ কালেমাকে মেনে নেয়াই হেদায়েতের রাস্তা গ্রহণ করা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যানকে মেনে নেয়া।

৩. কালেমা ইসলামের মূল ভিত্তি। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির প্রথম ভিত্তি হচ্ছে শাহাদাতাইন বা দুটি বিষয়ে স্বাক্ষ্য দেয়া। প্রথম যে বিষয়ে স্বাক্ষ্য দিতে হয় তা হচ্ছে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন:-

“ইসলাম ভিত্তি পাঁচটি। এ স্বাক্ষ্য দেয়া যে, “আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসুল। সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, (আল্লাহর) ঘরের হাজ্জ আদায় করা এবং রমযান মাসে সিয়াম পালন করা।” (বুখারী, মুসলিম)

এটা যেহেতু ইসলামের মুল ভিত্তি, এখন কেউ যদি বলে আমি মুসলিম, আমার দ্বীন ইসলাম তাহলে অবশ্যই তাকে এ কালেমার স্বাক্ষ্য জেনে-শুনে দিতে হবে এবং এটাকে দৃঢ়ভাবে গ্রহন করতে হবে।

৪. কালেমা হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) বলেন-

“ঈমানের শাখা সত্তুরটিরও কিছু বেশী। এর সর্বোচ্চ শাখা এ কথা স্বীকার করা । আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া”। (বুখারী, মুসলিম)
এখন কেউ যদি ঈমান গ্রহন করতে চায় তবে অবশ্যই এ কালেমাকে স্বীকার করতে হবে। আর যারা কুফরীতে নিমজ্জিত থাকতে চায়, তারাই এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

৫. কালেমা কে মেনে নেয়া এবং সে অনুযায়ী কাজ করা, বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্। কারণ এ কালেমা স্বাক্ষ্য দানের মাধ্যমে বান্দাহ্ তাওহীদ কে মেনে নেয়। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্কে এক ও একক হিসেবে মেনে নেয় এবং যাবতীয় ইবাদত শুধু তাঁর জন্য নিবেদন করবে এবং তাঁর ইবাদতে কাউকে শরীক করবে না বলে স্বীকৃতি দেয়।

রাসূল (সঃ) বলেছেন-

“বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্ হচ্ছে তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না।” (মুসলিম, ইফাবা/৫০)

৬. এ কালেমার জন্য আল্লাহতায়ালা মানুষ এবং জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ এ কালেমার স্বীকৃতির মাধ্যমে বান্দাহ্ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর এককত্বকে মেনে নেয়। আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ [٥١:٥٦]

“আমি জ্বিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য”। [সূরা যারিয়াত, ৫১:৫৬]

আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন “আমার (আল্লাহর) একত্বকে মেনে নেয়ার জন্যই আমি তাদের (মানুষ ও জ্বিন) সৃষ্টি করেছি।”

৭. এমন এক মহান কালেমা যার স্বাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহতায়ালা, ফেরেশতা এবং যারা জ্ঞানবান তারা দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ [٣:١٨]

“আল্লাহ্ স্বাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কোন হক্ ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানবান লোকেরা সততা ও ইনসাফের সাথে এ স্বাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে সেই মহা পরাক্রমশালী এবং বিজ্ঞানী ছাড়া কেহই ইলাহ হতে পারে না।” [আল ইমরানঃ ১৮]

আল্লাহ্ বলেছেন যারা জ্ঞানী তারা সততা এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেয়। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে যারা অজ্ঞ, মূর্খ, জাহেল তারাই এ কালেমার স্বাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকে।

৮. এমন এক কালেমা যে, আসমান-যমীন এবং এবং এর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে তা যদি এক পাল্লায় তোলা হয় আর কে অপর পাল্লায় তোলা হয় তবে এ পাল্লাই ভারী হবে।
হাদীসে এসেছে আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেন মুসা (আঃ) বলেন,

‘হে আমার রব আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে ডাকতে পারি এবং আপনার যিকর করতে পারি। আলাহ তা’য়ালা বললেন, “হে মুসা! বল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। মুসা (আঃ) বললেন, হে আমার রব আপনার সমস্ত বান্দারাতো ইহা বলে। আল্লাহ আহ্কামুল হাকিমিন, রাব্বুল আলামীন যিনি সব জানেন যেখানে আমরা কিছুই জানিনা, তিনি নাযিল করলেন, “হে মুসা! আমি ছাড়া সাত আকাশ এবং উহার মধ্যে যাহা কিছু আছে এবং সাত যমীন যদি পাল্লার এক দিকে স্থাপন করা হয় এবং অপর দিকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” কে স্থাপন করা হয় তবে দ্বিতীয় অংশটি ভারী হয়ে যাবে।’ (ইবনে হিব্বানঃ২৩২৩, আল-হাকিম ১/৫২৮)

৯. এ কালেমার স্বীকৃতি দেওয়া না দেওয়ার উপরই নির্ভর করে বান্দার সফলতা ব্যর্র্থতা। যে এ কালেমাকে মনে-প্রানে গ্রহন করল সে জান্নাত লাভ করবে । আর জান্নাত পাওয়া বান্দার অনেক বড় সাফল্য। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيرُ [٨٥:١١]

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।এটা অনেক বড় সাফল্য।” [সূরা বুরুজ, ৮৫:১১]

আর এ কালেমার স্বাক্ষ্যদানকারী ব্যক্তি যে চুড়ান্ত ব্যর্থতা জাহান্নাম থেকে বেঁচে চুড়ান্ত সফলতা জান্নাত লাভ করবে। এ ব্যাপারে রাসূল (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (মুসলিম, ইফাবা/২৩)

রাসূল (সঃ) আরও বলেন, “আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের আগুন হারাম করে দিয়েছেন যে একমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করেছে।” (বুখারী, মুসলিম)
মূলকথা হচ্ছে তাওহীদই ইসলামের শুরু ও শেষ, জাহেরী-বাতেনী এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। আর ইহাই সকল রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর দাওয়াত ছিল। এ তাওহীদ (কায়েম) এর লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা‘আলা মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, সকল নাবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং সব আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর এ তাওহীদের কারণেই মানুষ মু‘মিন-কাফির, সৌভাগ্য-দূর্ভাগ্যে বিভক্ত হয়েছে। আর তাওহীদই বান্দাদের উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব। সর্বপ্রথম এর মাধ্যমেই ইসলামে প্রবেশ করে।এবং এ তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া ত্যাগ করে।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ  এর রুকুন বা স্তম্ভ সমূহঃ

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ”  আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই। এই সাক্ষ্যবাণীর ২ টি রুকুন বা স্তম্ভ রয়েছে। একটি না বাচক একটি হা বাচক।

১. প্রথমত “লা ইলাহা” এই অংশটি না বাচক। কারন এই অংশের মাধ্যমে আল্লাহ ব্যাতীত প্রিথিবিতে যাত বাতিল ইলাহের ইবাদাত ইবাদাত করা হয় তাদের সকলকে অস্বীকার করা হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ [٢٢:٦٢]

“ এজন্যেও যে, আল্লাহ, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে ওটা তো অসত্য এবং আল্লাহ, তিনিই তো সমুচ্চ, মহান।“ [ সূরা হাজ্জ ৬২ ]

২. দ্বিতীয়ত “ইল্লাল্লাহ” এই অংশটি হা বাচক। এই অংশে অন্য সকল ইলাহ কে অস্বীকার করার পর শুধুমাত্র আল্লাহই যে সকল প্রকার ইবাদাতের যোগ্য তার স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ “লা ইলাহা”  কথাটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকার করে এবং “ইল্লাল্লাহ” একমাত্র সেই আল্লাহকে উপাস্য হিসাবে স্বীকার করে যিনি এক এবং যার কোন অংশীদার নেই।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্ত সমূহঃ

আলেম উলামাগণ কালেমা অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ৭ শর্ত নির্ধারন করেছেন কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে। যতক্ষন পর্যন্ত কোন ব্যক্তি এ ৭টি শর্তকে পরিপূর্ণভাবে মেনে না নিবে কোন রকম বিরোধিতা ছাড়া ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি কালেমা পরে কোন সার্থকতা লাভ করতে পারবেনা।

শর্তগুলো হলঃ

১. ইলমঃ কালেমার শর্ত সমূহের মধ্যে প্রথম শর্ত হচ্ছে কালেমার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, তার অর্থ জানা। কারন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে প্রথম যে আয়াতটি নাযিল করেছেন তাতেও আল্লাহ   ইলম (العلم) অর্জনকরাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ [٩٦:١]

“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আলাক ০১]

কারন জ্ঞান না থাকার কারনেই মানুষ আল্লাহ ব্যতীত অন্য ইলাহের ইবাদাত করাকে যায়েজ মনে করে। আল্লাহ বলেন,

“… তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে ওরা সাক্ষ্য দেয়……” [ সূরা যুখরুফ ৮৬]

আর সত্য উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন ইলম করণ মূর্খের কাছে সবই সত্য মনে হয়।

২. ইয়াকিনঃ কালেমার ২য় শর্ত হল ইয়াকিন বা বিশ্বাস করা। অন্তর থেকে বিশ্বাস করে এই সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ব্যাতীত ইবাদাতের যোগ্য সত্য কোন ইলাহ নেই। কারণ শয়তানের ধোকায় পরে পূর্ণ বিশ্বাস না করে সাক্ষ্য দিলে সে সাক্ষ্য মিথ্যায় পরিণত হবে।

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ [٤٩:١٥]

“তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি ঈমান আনার পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ।“ [সূরা হুজুরাত ১৫]

৩. কবুলঃ কালেমার তৃতীয় শর্ত হল “ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ” এই কালেমার চাহিদা মোতাবেগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) থেকে যে সমস্ত খবর ও বাণী আমাদের নিকট এসেছে টা সত্য বলে মেনে নেয়া এবং তা যথাযথভাবে গ্রহন করে নেয়া।এই মর্মে  মহান আল্লাহ বলেন,

قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا

“তোমরা বল,আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি”

[সূরা বাকারাহ ১৩৬]

কারণ গ্রহণের বিপরীত হচ্ছে প্রত্যাখ্যান। কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর যথাযথ অর্থ অবগত হল ও বিশ্বাস করলো কিন্তু তা গ্রহন করলনা তবে সে কালেমাকে প্রত্যাখ্যান করল।

আল্লাহ বলেন

فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ [٦:٣٣]

“অতএব,তারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না, বরং জালেমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।“[সূরা আনা’আম ৩৩]

৪. আনুগত্য বা আত্মসমর্পণ (النقيض):এর উদ্দেশ্য হল কালেমা যে সত্তার উপর প্রমান বাহন করে সে সত্তার যথাযথ আনুগত্য করা আর একেই বলে সত্যিকার আত্মসমর্পণ ও বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর নিরদেশাবলির মধ্যে ত্রুটি অনুশন্ধান না করা।মহান আল্লাহ বলেন


وَأَنِيبُوا إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ [٣٩:٥٤]

                                                          

তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না”।[সূরা যুমার ৫৪]

 

এবং একইসাথে রাসূল (সাঃ) যে সমস্ত আদেশ নিষেধ তথা ইসলামি বিধান নিয়ে এসেছেন সে গুলোর ক্ষেত্রেও আনুগত্য স্বীকার করা।

রাসূল(সাঃ) বলেছেন

তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার নিজের কামনাবাসনাকে আমার আনীত শিক্ষার দিকে ফিরিয়ে দেয়।” —সহীহ-বুখারী]

৫. সিদ্ক বা সত্য বিশ্বাসঃ মুসলিম সর্বদা আল্লাহর সাথে সত্য নিষ্ঠার পরিচয় দিবে, যেমন একজন মুসলিম তাঁর ঈমান ও আকীদার ক্ষেত্রে সত্যপরায়ণ হবে। সত্য বিশ্বাসই হল সকল কথার ভিত্তি। কাজেই যে কোন দাবীতে সত্য নিষ্ঠার পরিচয় দেয়া আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়া এবং আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়তের নির্ধারিত নিওম কানুন যথাযথ ভাবে মেনে চলা এ সবই সত্য বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ বলেন


الم [٢٩:١]أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ [٢٩:٢]وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ [٢٩:٣]

“ আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে,আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।“ —সূরা আন-কাবুত ১-৩

তিনি আর বলেছেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।“[সূরা তাওবা ১১৯]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন

যে ব্যক্তি তাঁর অন্তর থেকে সত্য সহকারে এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল তাঁর উপর জাহান্নামকে হারাম দেয়া হবে।[সহিহ বুখারি, কিতবুল ইলম, ফাতহুল বারী ১/১২৮]

৬. ইখলাসঃ ইখলাস হল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কিছু করা। আর কালেমার ক্ষেত্রে ইখলাস হল শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলম, বিশ্বাস, সত্যতার সহিত অন্য সকল ইলাহকে ত্যাগ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কে একমাত্র রব বলে মেনে নেয়া। এতে অন্যের সন্তুষ্টির বা লোকদেখানো দুনিয়ার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু থাকবে না। কারণ আল্লাহর শন্তুস্তি ব্যাতীত অনন্যার সন্তুষ্টির জন্য কিছু করার অর্থ হলে তাকে আল্লাহর স্থানে বসানো। আল্লাহ বলেন,

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ

“জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই জন্য।“[সূরা যুমার ৩]

ইখলাস ব্যাতীত কোন আমাল আল্লাহর নিকট গ্রহন যোগ্য নয়। আল্লাহর কথাই তাঁর প্রমাণ

وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا [٢٥:٢٣]

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপে করে দেব। [ সূরা ফুরকান ২৩]

৭. মুহাব্বাত

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই শ্রেষ্ঠ কালিমাকে মনে প্রানে ভালোবাসা কালেমার শর্ত সমূহের মধ্যে একটি। এবং কালেমার চাহিদা মতাবেক  যে সমস্ত অরথের উপর প্রমাণ বহন করে তাকেও ভালোবাসা। আর ঐ সমস্ত ভালোবাসা হল  আল্লাহ ও তার রাসূল(সাঃ) কে মনে প্রানে ভালোবাসা এবং দুনিয়ার সমস্ত কিছুর ভালোবাসার উপরে রাসুল(সাঃ) এর ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেয়া। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٣:٣١]

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান ৩১]

এমনি ভাবে আল্লাহর সাথে গাইরুল্লার মুহাব্বাত করা কালেমাকে ভালোবাসার পরিপন্থী।এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ [٤٧:٩]

“এটা এজন্যে যে,আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন,তারা তা পছন্দ করে না। সে কারণে,আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।“ [সূরা মুহাম্মাদ ৯]

এমনিভাবে রাসূল (সাঃ) এর প্রতি হিংসা বিদ্বেশ পোষণ করা আল্লাহর শত্রুদের সাথে  বন্ধুত্ব রাখা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের শাথে দুষমনি রাখা এসব গুলোই ঐ মুহাব্বাত বা ভালোবাসাকে অস্বীকার করে।

তাওহীদ

◕•◕তাওহীদ ◕•◕

তাওহীদ শব্দটি আরবী শব্দ “ওয়াহাদা” ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ “এক হওয়া” “একক হওয়া” অতুলনীয় হওয়া” অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবাহানাহুয়াতাআলা এক, তাঁর কর্তৃত্বে ও প্রভুত্বে কোন শরীক বা অংশীদার নেই , তাঁর যাত স্বত্তা ও গুনাবলীতে কোন সদৃশ নেই, তথা তিনি একক ও অতুলনীয় এবং সকল প্রকার ইবাদত যোগ্য হিসেবে তথা ইলাহ হওয়ার যোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোন প্রতিদ্বন্দি নেই । তাওহীদ নামক এই পরিভাষাটি আল্লাহ্র একত্বের (তাওহীদুল্লাহ) ব্যাপারে ব্যবহৃত হলে তা দ্বারা আল্লাহ্র সঙ্গে মানুষের সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্রিয়াকলাপ তথা ইবাদতে তাঁর একত্ব উপলব্ধি করা তা নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্ষুন্ন রাখা বুঝায় অর্থাৎ যা কিছু আল্লাহ্র জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুনির্ধারিত সে সব ক্ষেত্রে আল্লাহ্র একত্ব অক্ষুন্ন রাখা বুঝায়

তাওহীদ হল ইসলামের বুনিয়াদ । ইসলামের সকল স্তম্ভ ও তত্ত্ব শুধুমাত্র তাওহীদকে ভিত্তি করেই সুপ্রতিষ্ঠিত। একমাত্র নির্ভেজাল তাওহীদই হচ্ছে আল্লাহ্র প্রেরিত সকল নবী ও রসূল(সাঃ) কর্তৃক আনীত ইসলামের বানীর নির্যাস ।তাওহীদ হল ইসলামের মুল ভিত্তি। আর এ ভিত্তি যদি স্বীয় হৃদয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে তবে আক্বীদাহ ও ইবাদতসহ ব্যক্তিগত ও সামাজিক ও সার্বিক জীবন ব্যবস্থায় বিশুদ্ধ ও ত্রুটিমুক্ত হবে । চৌদ্দশ বছর পূর্বে এ তাওহীদের সূর্য উদয় আরব মরুভূমিতে লাত, মানাত ও হুবলসহ সমস্ত পৌত্তলিকতার অন্তিম সূর্য অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে । যার ফলে শিরক্,কুফর ,গোমরাহি, বিদআত কুসংস্কার ও যাবতীয় পাপাচারের ক্ষেত্রসমূহ বিরানে পরিণত হয় । এ সবের স্থান দখল করে ঈমান- ইয়াকীন ও তাওহীদ । যার ফলে ইসলাম স্বীয় শক্তি বিস্তার করে বিশ্বে জনপ্রিয়তা ও সার্বজনীনতা লাভ করে । তাওহীদ হল বিশ্বজগতের প্রতি সমস্ত নবী রাসুলের ছেড়ে যাওয়া অমূল্য আমানত । যা খতমে নবুয়্যতের বরকতে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে স্থান দখল করার ফলে উম্মাত ইলম, আমল, ইখলাস ও তাকওয়ার পোশাকে সুশোভিত হয় ।

“আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই”

একথার সাক্ষ্য দেয়া ব্যতীত কোন ব্যক্তির তাওহীদ পূর্ণ হবে না। যে ব্যক্তি এই সাক্ষ্য প্রদান করবে, সে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল বস্তু হতে উলুহিয়্যাতকে (ইবাদত) অস্বীকার করে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করবে। অর্থাৎ নাফী (না বোধক) ও ইছবাত (হ্যাঁ বোধক) বাক্যের সমন্বয় ব্যতীত তাওহীদ কখনো প্রকৃত তাওহীদ হিসাবে গণ্য হবে না।

তাওহীদ ইসলামের মুল ভিত্তি। মুসলিম বিদ্বানগণ তাওহীদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন।

১) তাওহীদুর রুবূবীয়্যাহ (রব হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ)

২) তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ (মাবুদ হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ)

৩) তাওহীদুল আসমা অস্ সিফাত (আল্লাহর নাম গুণাবলীতে একত্ববাদ)

কুরআন ও হাদীস গভীরভাবে গবেষণা করে আলেমগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, তাওহীদ উপরোক্ত তিন প্রকারের মাঝে সীমিত।

তাওহীদে রুবূবীয়্যার বিস্তারিত পরিচয়ঃ

সৃষ্টি, রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও পরিচালনায় আল্লাহকে এক হিসাবে বিশ্বাস করার নাম তাওহীদে রুবূবীয়্যাহ্।

১- সৃষ্টিতে আল্লাহর একত্বঃ

“হে লোক সকল !একটি উপমা দেয়া হচ্ছে মনযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর ;তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা তো কক্ষনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না,এই উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্রিত হলেও ;এবং মাছি যদি সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের নিকট হতে,এটাও তারা ওর নিকট হতে উদ্ধার করতে পারবে না; কত দুর্বল সেই উপাসনাকারী ও কত দুর্বল সেই উপাস্য!” [সুরা-হজ্জ,আয়াত-৭৩]

আল্লাহ একাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

“আল্লাহ ছাড়া কোন স্রষ্টা আছে কি? যে তোমাদেরকে আকাশ ও জমিন হতে জীবিকা প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই।” [সূরা-ফাতির, আয়াত- ৩]

কাফিরদের অন্তসার শুন্য মা’বূদদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে আল্লাহ বলেন:

“সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তারই মত, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?” [সূরা-নাহল,আয়াত ১৭]

সুতরাং আল্লাহ তাআ’লাই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআ’লার কর্ম এবং মাখলুকাতের কর্ম সবই আল্লাহর সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত। তাই আল্লাহ তাআ’লা মানুষের কর্মসমূহও সৃষ্টি করেছেন- একথার উপর ঈমান আনলেই তাকদীরের উপর ঈমান আনা পূর্ণতা লাভ করবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

“আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমাদের কর্মসমূহকেও সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা-আস-সাফ্ফাত, আয়াত-৯৬]

মানুষের কাজসমূহ মানুষের গুণের অন্তর্ভূক্ত। আর মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। কোন জিনিষের স্রষ্টা উক্ত জিনিষের গুণাবলীরও স্রষ্টা।

যদি বলা হয় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রেও তো সৃষ্টি কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ

“আল্লাহ সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে উত্তম সৃষ্টিকর্তা।” [সূরা-মুমিনূন, আয়াত-১৪]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

“কিয়ামতের দিন ছবি অংকনকারীদেরকে বলা হবে, তোমরা দুনিয়াতে যা সৃষ্টি করেছিলে, তাতে রূহের সঞ্চার কর।” [বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল বুয়ূ ]

উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই যে, আল্লাহর মত করে কোন মানুষ কিছু সৃষ্টি করতে অক্ষম। মানুষের পক্ষে কোন অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দেয়া সম্ভব নয়। কোন মৃত প্রাণীকেও জীবন দান করা সম্ভব নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্যের তৈরী করার অর্থ হল নিছক পরিবর্তন করা এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা মাত্র। মূলতঃ তা আল্লাহরই সৃষ্টি। ফটোগ্রাফার যখন কোন বস্তুর ছবি তুলে, তখন সে উহাকে সৃষ্টি করে না। বরং বস্তুটিকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করে মাত্র। যেমন মানুষ মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি তৈরী করে এবং অন্যান্য জীব-জন্তু বানায়। সাদা কাগজকে রঙ্গীন কাগজে পরিণত করে। এখানে মূল বস্তু তথা কালি, রং ও সাদা কাগজ সবই তো আল্লাহর সৃষ্টি। এখানেই আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

২- রাজত্বে আল্লাহর একত্বঃ

মহান রাজাধিরাজ একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। তিনি বলেনঃ

“সেই মহান সত্বা অতীব বরকতময়, যার হাতে রয়েছে সকল রাজত্ব। আর তিনি প্রতিটি বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।” [সূরা-মুলক,আয়াত- ১]

আল্লাহ আরো বলেন,

“হে নবী! আপনি জিজ্ঞাসা করুন, সব কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপর কোন আশ্রয় দাতা নেই।” [সূরা মুমিনূন,আয়াত- ৮৮]

সুতরাং সর্ব সাধারণের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে বাদশাহ বলা হলে তা সীমিত অর্থে বুঝতে হবে। আল্লাহ তাআ’লা অন্যের জন্যেও রাজত্ব ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন। তবে তা সীমিত অর্থে। যেমন তিনি বলেন,

“অথবা তোমরা যার চাবি-কাঠির (নিয়ন্ত্রনের) মালিক হয়েছো।” [সূরা-নূর,আয়াত-৬১]

আল্লাহ আরো বলেনঃ

“তবে তোমাদের স্ত্রীগণ অথবা তোমাদের আয়ত্বধীন দাসীগণ ব্যতীত।” [সূরা- মুমিনূন,আয়াত-৬]

আরো অনেক দলীলের মাধ্যমে জানা যায় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরও রাজত্ব রয়েছে। তবে এই রাজত্ব আল্লাহর রাজত্বের মত নয়। সেটা অসম্পূর্ণ রাজত্ব। তা ব্যাপক রাজত্ব নয়। বরং তা একটা নির্দিষ্ট সীমা রেখার ভিতরে। তাই উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, যায়েদের বাড়ীতে রয়েছে একমাত্র যায়েদেরই কর্তৃত্ব ও রাজত্ব। তাতে আমরের হস্তক্ষেপ করার কোন ক্ষমতা নেই এবং বিপরীত পক্ষে আমরের বাড়ীতে যায়েদও কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তারপরও মানুষ আপন মালিকানাধীন বস্তুর উপর আল্লাহ প্রদত্ত নির্ধারিত সীমা-রেখার ভিতরে থেকে তাঁর আইন-কানুন মেনেই রাজত্ব করে থাকে। এজন্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অকারণে সম্পদ বিনষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,

“যে সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ তোমাদের জীবন ধারণের উপকরণ স্বরূপ দান করেছেন, তা তোমরা নির্বোধ লোকদের হাতে তুলে দিওনা।” [সূরা-নিসা,আয়াত-৫]

মানুষের রাজত্ব ও মুলূকিয়ত খুবই সীমিত। আর আল্লাহর মালিকান ও রাজত্ব সর্বব্যাপী এবং সকল বস্তুকে বেষ্টনকারী। তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা, তাই করেন। তাঁর কর্মের কৈফিয়ত তলব করার মত কেউ নেই। অথচ সকল মানুষ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।

৩- পরিচালনায় আল্লাহর একত্বঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক ও অদ্বিতীয় ব্যবস্থাপক এবং পরিচালক। তিনি সকল মাখলূকাত এবং আসমা-যমিনের সব কিছু পরিচালনা করেন।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“সৃষ্টি করা ও আদেশ দানের মালিক একমাত্র তিনি। বিশ্ব জগতের প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলা অতীব বরকতময়।” [সূরা-আ’রাফ,আয়াত-৫৪]

আল্লাহর এই পরিচালনা সর্বব্যাপী। কোন শক্তিই আল্লাহর পরিচালনাকে রুখে দাঁড়তে পারে না। কোন কোন মাখলূকের জন্যও কিছু কিছু পরিচালনার অধিকার থাকে। যেমন মানুষ তার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং কর্মচারীদের উপর কর্তৃত্ব করে থাকে। কিন্তু এ কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট একটি সীমার ভিতরে। উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমাদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হল যে, তাওহীদে রুবূবীয়্যাতের অর্থ সৃষ্টি, রাজত্ব এবং পরিচালনায় আল্লাহকে একক হিসাবে বিশ্বাস করা।

তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ্ঃ

এককভাবে আল্লাহর এবাদত করার নাম তাওহীদে উলুহীয়্যাহ। মানুষ যেভাবে আল্লাহর এবাদত করে এবং নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে, অনুরূপ অন্য কাউকে এবাদতের জন্য গ্রহণ না করা। তাওহীদে উলুহীয়্যাতের ভিতরেই ছিল আরবের মুশরিকদের গোমরাহী। এ তাওহীদে উলূহিয়াকে কেন্দ্র করেই তাদের সাথে জিহাদ করে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের জান-মাল, ঘরবাড়ী ও জমি-জায়গা হরণ হালাল করেছিলেন। তাদের নারী-শিশুদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছিলেন। এই প্রকার তাওহীদ দিয়েই আল্লাহ তাআ’লা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন এবং সমস্ত আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন। যদিও তাওহীদে রুবূবীয়্যাত এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্ সিফাতও নবীদের দাওয়াতের বিষয়বস্তু ছিল, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই নবীগণ তাদের স্বজাতীয় লোকদেরকে তাওহীদে উলুহীয়্যার প্রতি আহবান জানাতেন। মানুষ যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য এবাদতের কোন অংশই পেশ না করে, সদা সর্বদা রাসূলগণ তাদের উম্মতদেরকে এই আদেশই দিতেন। চাই সে হোক নৈকট্যশীল ফেরেশতা, আল্লাহর প্রেরিত নবী, আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ অলী বা অন্য কোন মাখলুক। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও এবাদত করা বৈধ নয়।

আল্লাহ সুবাহানাহুয়াতাআলা বলেছেনঃ

“কাফিররা কি ধারনা করে যে ,তারা আমাকে ব্যতীত আমার বান্দাদেরকে আউলিয়া হিসাবে গ্রহন করবে? নিশ্চয়ই আমি কাফিরদের অভ্যর্থনার জন্য জাহান্নাম তৈরি রেখেছি।” [সূরা-কাহাফ,আয়াত-১০২]

যে ব্যক্তি এই প্রকার তাওহীদে ত্রুটি করবে, সে কাফির মুশরিক। যদিও সে তাওহীদে রুবূবীয়াহ এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্ সিফাতের স্বীকৃতী প্রদান করে থাকে। সুতরাং কোন মানুষ যদি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকারী, একমাত্র মালিক এবং সব কিছুর পরিচালক, কিন্তু আল্লাহর এবাদতে যদি অন্য কাউকে শরীক করে, তবে তার এই স্বীকৃতী ও বিশ্বাস কোন কাজে আসবে না। যদি ধরে নেয়া হয় যে, একজন মানুষ তাওহীদে রুবূবীয়াতে এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্ সিফাতে পূর্ণ বিশ্বাস করে, কিন্তু সে কবরের কাছে যায় এবং কবরবাসীর এবাদত করে কিংবা তার জন্য কুরবানী পেশ করে বা পশু জবেহ করে তাহলে সে কাফির এবং মুশরিক। মৃত্যুর পর সে হবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

আল্লাহ তাআ’লা বলেন,

“নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি শির্কে লিপ্ত হবে, আল্লাহ তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা-মায়িদা,আয়াত-৭২]

“আর তোমরা যাদেরকে আল্লাহ্ ব্যতীত ডাক তারা খেজুরের বিচির উপরে হালকা আবরনেরও মালিক নয় যদি তোমরা তাদেরকে ডাক তারা তোমাদের ডাক শুনবেনা ।যদিও তারা শুনে তারা উত্তর করবে না ।আর তারা কিয়ামত দিবসে তোমাদের এই শিরককে অস্বীকার করবে ।” [সূরা-ফাতির – ১৩-১৪ ]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে ডাকে,আর এ অবস্থায় মারা যায় সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।” [বুখারী]

কুরআনের প্রতিটি পাঠকই একথা অবগত আছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সমস্ত কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, তাদের জান-মাল হালাল মনে করেছেন এবং তাদের নারী-শিশুকে বন্দী করেছেন ও তাদের দেশকে গণীমত হিসাবে দখল করেছেন, তারা সবাই একথা স্বীকার করত যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক।

তাই আল্লাহ সুবাহানাহুয়াতাআলা বলেছেনঃ

“অধিকাংশ লোক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনা সত্তেও মুশরিক” [সূরা-ইউসুফ,আয়াত-১০৬]

তারা এতে কোন সন্দেহ পোষণ করত না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবাহানাহুতাআলা বলেনঃ

“তুমি বল-তিনিকে,যিনি তোমাদেরকে আসমান ও যমীন হতে রিযিক পৌছিয়ে থাকেন? অথবা কে তিনি,যিনি কর্ণ ও চক্ষুসমূহের উপর পূর্ণ অধিকার রাখেন?আর তিনি কে যিনি জীবন্তকে প্রানহীন হতে বের করেন,আর প্রাণহীনকে জীবন্ত হতে বের করেন?আর তিনি কে যিনি,সমস্ত কাজ পরিচালনা করেন?তখন অবশ্যই তারা বলবে যে,আল্লাহ্;অতএব তুমি বল-তবে কেন তোমরা (শিরক হতে) নিবৃত্ত থাকছো না?” [সুরা-ইউনুস,আয়াত-৩১]

কিন্তু যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে অন্যেরও উপাসনা করত, তাই তারা মুশরিক হিসাবে গণ্য হয়েছে এবং তাদের জান-মাল হরণ হালাল বিবেচিত হয়েছে।

তাওহীদুল্ আসমা ওয়াস্ সিফাতঃ

তাওহীদুল্ আসমা ওয়াস্ সিফাতের অর্থ হল, আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত নামে নামকরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন সে সমস্ত নাম ও গুণাবলীতে আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় হিসাবে মেনে নেওয়া। আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তাতে কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, তার ধরণ বর্ণনা এবং কোন রূপ উদাহরণ পেশ করা ব্যতীত আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করার মাধ্যমেই এ তাওহীদ বাস্তবায়ন হতে পারে।

সুতরাং আল্লাহ নিজেকে যে নামে পরিচয় দিয়েছেন বা নিজেকে যে গুণাবলীতে গুণান্বিত করেছেন, তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক। এ সমস্ত নাম ও গুণাবলীর আসল অর্থ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করে তার উপর ঈমান আনতে হবে- কোন প্রকার ধরণ বর্ণনা করা বা দৃষ্টান্ত পেশ করা যাবেনা। এই প্রকারের তাওহীদে আহলে কিবলা তথা মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ গোমরাহীতে পতিত হয়েছে। এক শ্রেণীর লোক আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকারের ক্ষেত্রে এতই বাড়াবাড়ি করেছে যে, এর কারণে তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। আর এক শ্রেণীর লোক মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছে। আর এক শ্রেণীর লোক আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কাছাকাছি। কিন্তু সালাফে সালেহীনের মানহাজ হল, আল্লাহ নিজের জন্য যে নাম নির্ধারণ করেছেন এবং নিজেকে যে সবগুণে গুণাম্বিত করেছেন, সে সব নাম ও গুণাবলীরর উপর ঈমান আনয়ন করতে হবে।

আল্লাহর কতিপয় নামের দৃষ্টান্তঃ

১) الحي القيوم)) আল্লাহ তাআ’লার অন্যতম নাম হচ্ছে, “আল হাইয়্যুল্ কাইয়্যুম” এই নামের উপর ঈমান রাখা আমাদের উপর ওয়াজিব। এই নামটি আল্লাহর একটি বিশেষ গুণেরও প্রমাণ বহন করে। তা হচ্ছে, আল্লাহর পরিপূর্ণ হায়াত। যা কোন সময় অবর্তমান ছিলনা এবং কোন দিন শেষও হবে না। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ’লা চিরঞ্জীব। তিনি সবসময় আছেন এবং সমস্ত মাখলুকাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকবেন। তাঁর কোন ধ্বংস বা ক্ষয় নেই।

২) আল্লাহ নিজেকে السميع (আস্ সামীউ) শ্রবণকারী নামে অভিহিত করেছেন। তার উপর ঈমান আনা আবশ্যক। শ্রবণ করা আল্লাহর একটি গুণ। তিনি মাখলুকাতের সকল আওয়াজ শ্রবণ করেন। তা যতই গোপন ও অস্পষ্ট হোক না কেন।

আল্লাহর কতিপয় সিফাতের দৃষ্টান্তঃ

আল্লাহ বলেনঃ

“ইয়াহুদীরা বলে আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। বরং তাদের হাতই বন্ধ। তাদের উক্তির দরুন তারা আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হয়েছে, বরং আল্লাহর উভয় হাত সদা উম্মুক্ত, যেরূপ ইচ্ছা ব্যয় করেন।” [সূরা-মায়িদা,আয়াত-৬৪]

এখানে আল্লাহ তাআ’লা নিজের জন্য দু’টি হাত সাব্যস্ত করেছেন। যা দানের জন্য সদা প্রসারিত। সুতরাং আল্লাহর দু’টি হাত আছে। এর উপর ঈমান আনতে হবে। কিন্তু আমাদের উচিৎ আমরা যেন অন্তরের মধ্যে আল্লাহর হাত কেমন হবে সে সম্পর্কে কোন কল্পনা না করি এবং কথার মাধ্যমে যেন তার ধরণ বর্ণনা না করি ও মানুষের হাতের সাথে তুলনা না করি। কেননা আল্লাহ বলেছেন,

“কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা-শুরা,আয়াত-১১]

আল্লাহ বলেন,

“হে মুহাম্মাদ! আপনি ঘোষণা করে দিন যে, আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় ও অসংগত বিদ্রোহ ও বিরোধিতা এবং আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা, যার পক্ষে আল্লাহ কোন দলীল-প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি, আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, (ইত্যাদি কাজ ও বিষয় সমূহ) হারাম করেছেন।” [সূরা-আরাফ,আয়াত-৩৩]

আল্লাহ আরো বলেন,

“যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই, সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না, নিশ্চয়ই কর্ণ, চক্ষু, অন্তর ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।” [সূরা-বানী ইসরাঈল ,আয়াত-৩৬]

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর হাত দু’টিকে মানুষের হাতের সাথে তুলনা করল, সে আল্লাহর বাণী “কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়” একথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল এবং আল্লাহর বাণী,

“তোমরা আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না।” [সূরা-নাহল,আয়াত-৭৪]

এর বিরুদ্ধাচরণ করল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলীর নির্দিষ্ট কোন কাইফিয়ত বর্ণনা করল, সে আল্লাহর ব্যাপারে বিনা ইলমে কথা বলল এবং এমন বিষয়ের অনুসরণ করল, যে সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান নেই।

আল্লাহর সিফাতের আরেকটি উদাহরণ পেশ করব। তা হল আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া। কুরআনের সাতটি স্থানে আল্লাহ তাআ’লা উল্লেখ করেছেন যে তিনি আরশের উপরে বিরাজমান। প্রত্যেক স্থানেই (استوى على العرش) “ইসতাওয়া আলাল আরশি” বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। আমরা যদি আরবী ভাষায় ইসতিওয়া শব্দটি অনুসন্ধান করতে যাই তবে দেখতে পাই যে,(استوى) শব্দটি সব সময় (على) অব্যয়ের মাধ্যমে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর (استوى) শব্দটি এভাবে ব্যবহার হলে ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘উপরে হওয়া’ ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহার হয় না। সুতরাং الرَّحْمَنُ عَلَىْ العَرْشِ اسْتَوَى এবং এর মত অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের উপরে সমুন্নত হওয়া ছাড়াও আরশের উপরে বিশেষ একভাবে সমুন্নত। প্রকৃতভাবেই আল্লাহ আরশের উপরে। আল্লাহর জন্য যেমনভাবে সমুন্নত হওয়া প্রযোজ্য, তিনি সেভাবেই আরশের উপরে সমুন্নত। আল্লাহর আরশের উপরে হওয়া এবং মানুষের খাট-পালং ও নৌকায় আরোহনের সাথে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। এমনিভাবে মানুষের যানবাহনের উপরে চড়া এবং আল্লাহর আরশের উপরে হওয়ার মাঝে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,

“তিনি তোমাদের আরোহনের জন্য সৃষ্টি করেন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা তার উপর আরোহণ করতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের জন্য বশীভূত করেছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশীভূত করতে। আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবো।” [সূরা-যুখরুফ – ১২-১৪]

সুতরাং মানুষের কোন জিনিষের উপরে উঠা কোন ক্রমেই আল্লাহর আরশের উপরে হওয়ার সদৃশ হতে পারে না। কেননা আল্লাহর মত কোন কিছু নেই।

যে ব্যক্তি বলে যে, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়ার অর্থ আরশের অধিকারী হয়ে যাওয়া, সে প্রকাশ্য ভুলের মাঝে রয়েছে। কেননা এটা আল্লাহর কালামকে আপন স্থান থেকে পরির্বতন করার শামিল এবং ছাহাবী এবং তাবেয়ীদের ইজমার সম্পূর্ণ বিরোধী। এ ধরণের কথা এমন কিছু বাতিল বিষয়কে আবশ্যক করে, যা কোন মুমিনের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়া সংগত নয়। কুরআন মাজীদ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

“আমি এই কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।” [সূরা-যুখরুফ,আয়াত-৩]

আরবী ভাষায় ইসতাওয়া শব্দের অর্থ ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘স্থির হওয়া’। আর এটাই হল ইসতিওয়া শব্দের আসল অর্থ। সুতরাং আল্লাহর বড়ত্বের শানে আরশের উপর যেভাবে বিরাজমান হওয়া প্রযোজ্য, সেভাবেই তিনি বিরাজমান। যদি ইসতিওয়ার (সমুন্নত হওয়ার) অর্থ ইসতিওলা (অধিকারী) হওয়ার মাধ্যমে করা হয়, তবে তা হবে আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করার শামিল। আর যে ব্যক্তি এরূপ করল, সে কুরআনের ভাষা যে অর্থের উপর প্রমাণ বহণ করে, তা অস্বীকার করল এবং অন্য একটি বাতিল অর্থ সাব্যস্ত করল।

তাছাড়া “ইসতিওয়া” এর যে অর্থ আমরা বর্ণনা করলাম, তার উপর সালাফে সালেহীন ঐকমত্য (ইজমা) পোষণ করেছেন। কারণ উক্ত অর্থের বিপরীত অর্থ তাদের থেকে বর্ণিত হয়নি। কুরআন এবং সুন্নাতে যদি এমন কোন শব্দ আসে সালাফে সালেহীন থেকে যার প্রকাশ্য অর্থ বিরোধী কোন ব্যাখ্যা না পাওয়া যায়, তবে সে ক্ষেত্রে মূলনীতি হল উক্ত শব্দকে তার প্রকাশ্য অর্থের উপর অবশিষ্ট রাখতে হবে এবং তার মর্মার্থের উপর ঈমান রাখতে হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, সালাফে সালেহীন থেকে কি এমন কোন কথা বর্ণিত হয়েছে যা প্রমাণ করে যে, “ইসতাওয়া” অর্থ “আলা” (আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন)? উত্তরে আমরা বলব হ্যাঁ, অবশ্যই তা বর্ণিত হয়েছে। যদি একথা ধরে নেয়া হয় যে, তাঁদের থেকে এর প্রকাশ্য তাফসীর বর্ণিত হয়নি, তবেও এ সমস্ত ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের মানহাজ (নীতি) হল, কুরআন এবং সুন্নাহর শব্দ যে অর্থ নির্দেশ করবে, আরবী ভাষার দাবী অনুযায়ী শব্দের সে অর্থই গ্রহণ করতে হবে।
ইসতিওয়ার অর্থ ইসতিওলা দ্বারা করা হলে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দেয়ঃ

১) ইসতিওলা অর্থ কোন বস্তুর মালিকানা হাসিল করা বা কোন যমিনের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাই ইসতিওয়ার অর্থ ইসতিওলার মাধ্যমে করা হলে অর্থ দাঁড়ায়, আকাশ-জমিন সৃষ্টির আগে আল্লাহ আরশের মালিক ছিলেন না, পরে মালিক হয়েছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,

“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন সেই আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশ এবং জমিন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপরে সমুন্নত হলেন।” [সূরা-আরাফ,আয়াত-৫৪]

২) “আর রাহমানু আ’লাল আরশিস্ তাওয়া” অর্থ যদি ইস্তাওলার মাধ্যমে করা শুদ্ধ হয় তাহলে এ কথাও বলা শুদ্ধ হবে যে, আসমান-যমিন সৃষ্টি করার পূর্বে বা সৃষ্টি করা পর্যন্ত আরশ আল্লাহর কর্তৃত্বের মধ্যে ছিলনা। এমনিভাবে অন্যান্য মাখলুকাতের ক্ষেত্রেও একই ধরণের কথা প্রযোজ্য। এ ধরণের অর্থ আল্লাহর শানে শোভনীয় নয়।

৩) এটি আল্লাহর কালামকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেয়ার শামিল।

৪) এ ধরণের অর্থ করা সালাফে সালেহীনের ইজমার পরিপন্থী।

তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের ক্ষেত্রে সার কথা এই যে, আল্লাহ নিজের জন্য যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন, কোন পরিবর্তন, বাতিল বা ধরণ-গঠন কিংবা দৃষ্টান্ত পেশ করা ছাড়াই তার প্রকৃত অর্থের উপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

তাওহীদের মাধ্যমেই মুসলিম জাতি অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এটাই জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে মূল বিভাজন রেখা তৈরি করে। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা, মানুষ, জিন, ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব-নিকাশ ইত্যাদির ব্যবস্থা রেখেছেন। যুগে যুগে আসমানী কিতাব নাজিল হয়েছে, নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে এই তাওহীদ তথা এক আল্লাহর দাসত্বের পথে আহবানের নিমিত্তে।