Category Archives: যাকাত

সদকাতুল ফিতর কি, কেন, কিভাবে?

সদকাতুল ফিতর

সম্মানিত পাঠক! নিশ্চয় রমজান একটি সম্মানিত মাস যা আপনার শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু এটা বেশি দিন স্থায়ী নয়। যে ব্যক্তি এটা যথাযথ মূল্যায়নের সাথে অতিবাহিত করেছে সে যেন আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করে অতঃপর এটা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করে। আর যে এটা অলসতায় অতিবাহিত করেছে, সে যেন আল্লাহর নিকট তওবা করে এবং নিজ ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য আল্লাহর তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।

সম্মানিত পাঠক! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এই মাসে আপনাদের উপর সাদাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন। এটা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঈদের নামাযের পূর্বে।

আর এটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুসলিমের উপর অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর রাসূল যা ওয়াজিব করেছেন তা মানতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظٗا ٨٠﴾ [النساء: ٨٠]

যে রাসূলকে অনুসরণ করল, সে আল্লাহ তাআলাকে অনুসরণ করল। আর যে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, তবে আপনাকে তো আমরা তাদের উপর রক্ষক (প্রহরী) করে প্রেরণ করিনি। (সূরা নিসা, আয়াত ৮০)

আর আল্লাহ বলেন-

﴿وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا ١١٥﴾ [النساء: ١١٥]

আর যারা তাদের নিকট হিদায়াত পৌঁছার পরও রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের ব্যতীত অন্যদের পথের অনুসরণ করে, তারা যেভাবে ফিরে যায়, আমরাও তাদেরকে সেদিকে ফিরিয়ে রাখব এবং জাহান্নামে দগ্ধ করাব। আর তা কতই না খারাপ প্রত্যাবর্তনস্থল। (সূরা আন নিসা, আয়াত ১১৫)

আর আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧﴾ [الحشر: ٧]

তোমাদের রাসূল যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তা থেকে বিরত থাক। (সূরা আল হাশর, আয়াত ৭)

আর এটা বড় ছোট, পুরুষ, মহিলা, স্বাধীন, পরাধীন সকল মুসলিমের উপর ফরয।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে সাদাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন এবং এক ছা খেজুর অথবা এক ছা যব ফরয করেছেন। এটা স্বাধীন, পরাধীন, পুরুষ, মহিলা, ছোট বড় সকল মুসলিমের উপর ফরয। (বোখারী ও মুসলিম)

অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের উপর সরাসরি সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয়। তবে তার অভিভাবকগণ তাদের পক্ষ থেকে আদায় করবে। আমিরুল মুমিনিন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গর্ভস্থ সন্তানের পক্ষ হতেও সাদকাতুল ফিৎরা গ্রহণ করেছেন। আর এটা নিজের পক্ষ থেকে ব্যয় করবে। আর এমনিভাবে সে যার দায়িত্বশীল সে তার পক্ষ হতে আদায় করে দেবে। স্বামী তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করে দেবে, যদি স্ত্রী নিজের পক্ষ হতে আদায় করতে না পারে। আর যদি সে নিজের পক্ষ হতে আদায় করতে পারে তাহলে সে নিজেই আদায় করবে। আর সেটাই উত্তম।

আর সে ব্যক্তির উপর যাকাতুল ফিতর ওয়াযিব নয় ঈদের দিনে যার খরচের অতিরিক্ত কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যদি ঈদের দিন ভোরে তার কাছে এক ছা পরিমাণ খাদ্য শস্য বা তার সমপরিমাণ সম্পদের চেয়ে কম থাকে তবে তাও যেন সে সদকাতুল ফিৎর হিসেবে আদায় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন;

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ﴾ [التغابن: ١٦]

তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যথা সম্ভব। (সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত ১৬)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন:

«إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ» (متفق عليه(

যখন তোমাদেরকে কোন ব্যাপারে আদেশ করি, তোমরা উহা তোমাদের সাধ্যমত পালন কর।

আর সদকাতুল ফিতরের বাহ্যিক হিকমত হল : এর মধ্যে রয়েছে ফকিরদের জন্য দয়া এবং তাদেরকে ঈদের দিনে অন্যের নিকট চাওয়া হতে বিরত রাখা। ঈদের দিনে তারা যেন ধনীদের মত আনন্দ উপভোগ করতে পারে এবং ঈদ যেন সকলের জন্য সমান হয়। আর এর মধ্যে আরো আছে সাম্য ও সহমর্মিতা, সৃষ্টিজীবের জন্য ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ব। আর এর মাধ্যমে রোযাদারদের রোযা পবিত্র হয় এবং রোযার ত্রুটির হয়েছিল ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর রোযার এই ত্রুটি হতে পারে কথার মাধ্যমে অথবা গুনাহের মাধ্যমে।

সদকাতুল ফিতর আদায়ে আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া প্রকাশ পায়। কারণ তিনিই রমযান মাসের রোযা পূর্ণভাবে রাখার সামর্থ দিয়েছেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:

সাদাকাতুল ফিতর হচ্ছে রোযাদারের জন্য পবিত্রতা এবং মিসকিনদের জন্য খাদ্য। আর যে তা ঈদের নামায আদায় করার পূর্বে আদায় করে তা কবুল করা হয়। আর সে উহা ঈদের নামায আদায় করার পর আদায় করে, তাহলে তা সদাকাতুল ফিতর না হয়ে সাধারণ সদকাহ হিসাবে আদায় হয়ে যাবে। (আবু দাউদ এবং ইব্‌ন মাজাহ্‌)

আর যা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা হবে তাহলো- মানুষের খাদ্যদ্রব্য যেমন, খেজুর গম, চাল, কিসমিস, পনির ইত্যাদি।

আর বুখারী ও মুসলিমে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সদকাতুল ফিতর খেজুর অথবা যব দ্বারা আদায় করতে বলেছেন। আর তখন তাদের খাবার ছিল যব। যেমন আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের সময় সদকাতুল ফিতর এক ছা’ খাদ্য দ্বারা আদায় করতাম। আর আমাদের খাবার ছিল যব, কিসমিস, পনির এবং খেজুর। (বুখারী)

আর জন্তু-জানোয়ারের খাদ্য দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করলে আদায় হবে না। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম উহা ফরয করেছেন মিসকিনদের খাদ্য দানের জন্য। জন্তু-জানোয়ারের খাদ্যের জন্য নয়।

আর সদকাতুল ফিতর কাপড়, বিছানা, পানপাত্র, স্বর্ণ-রৌপ্য ইত্যাদি দ্বারা আদায় হবে না। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম উহা খাদ্য দ্বারা আদায় করা ফরয করেছেন।

আর উহা খাদ্যের মূল্য দ্বারা আদায় করলে আদায় হবে না। কেননা এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এর নির্দেশের বিপরীত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন কাজ করল কিন্তু উহা আমার নির্দেশমত নয়, তাহলে তা পরিত্যাজ্য। অন্য এক বর্ণনায় আছে, যে কোন বিষয়ের প্রচলন করল অথচ তা আমার নির্দেশ মত নয় তাহলে তা পরিত্যাজ্য। (মুসলিম)

বুখারী ও মুসলিমে যে “রদ” শব্দ এসেছে তার অর্থ পরিতাজ্য। কেননা খাদ্যের মূল্য দিয়ে সাদকাতুল ফিত্‌র পরিশোধ করা সাহাবাদের আমলের বিপরীত। তারা তা আদায় করতেন খাদ্য দ্রব্যের মাধ্যমেই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের জন্য অনুসরণ যোগ্য হল, আমার আদর্শ ও খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শ। কেননা সদকাতুল ফিতরা নির্দিষ্ট কিছু বস্তু দ্বারা আদায় করার জন্য ফরয করা হয়েছে। সুতরাং তা নির্দিষ্ট কিছু বস্তু ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আদায় করলে আদায় হবে না। যেমনিভাবে তা নির্দিষ্ট সময় ছাড়া আদায় করা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম যাকাতুল ফিতর আদায় করার জন্য বিভিন্ন ধরণের খাদ্য সামগ্রী থেকে তা আদায় করতে বলেছেন; যেগুলোর মূল্য সাধারণত বিভিন্ন। যদি তার মূল্য আদায় করা যেত তবে কোন এক প্রকার নির্ধারিত হয়ে অন্য প্রকারের জন্য সমমূল্য দেয়ার কথা বলা হতো। তাছাড়া ফিতরা মূলত: একটি প্রকাশ্য নিদর্শন। মূল্য প্রদান করার মাধ্যমে ফিতরা দেয়ার কাজটি প্রকাশ্য নিদর্শন থেকে গোপন সদকায় পরিণত হবে। কারণ, এক সা’ খাবার দেয়ার কাজটি ছোট বড় সবাই এর পরিমাণ ও বিতরণ প্রত্যক্ষ করে থাকে, আর এতে পরস্পর পরিচিতি লাভ হয়; যা মূল্য প্রদানের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। কেননা, তা কেউ টাকা প্রদান করলে তা দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

আর সাদকাতুল ফিতর একই জাতীয় গমের মূল্য দ্বারা আদায় করবে। অথবা সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে এমন খাদ্য দ্বারা যা ছোট বড় সকল মানুষের নিকট সুপরিচিত।

আর ফিতরা এর পরিমাণ হলো এক সা, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের যুগে ছিল। এর ওজন মিসকাল -এ হয়: ৪৮০ মিসকাল ভালো গমের ওজন; আর গ্রামের হিসেবে, ২ কিলোগ্রাম ৪০ গ্রাম ভাল গমের ওজন। কেননা, ১ মিসকালের ওজন হচ্ছে ৪/; এ হিসেবে ৪৮০ মিসকাল হয় ২০৪০ গ্রাম।

কাজেই আপনি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এর সা’ জানতে চান, তবে দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম ভাল গম এমন একটি পাত্রে নিন, যাতে তা সম্পপূর্ণরূপে পরিপূর্ণ থাকে। তারপর সেই পাত্র দ্বারা এক সা হিসেব করুন।

আর সাদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় হচ্ছে, ঈদের রাত্রের সূর্যাস্ত। সুতরাং সুর্যাস্তের সময় যে ব্যক্তি ফিতরা দেয়ার সামর্থ রাখে, তার উপরই ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হবে, নতুবা নয়। ফলে যদি কোন ব্যক্তি ঈদের পূর্ব দিন সূর্য ডুবার পূর্বে মারা যায় তাহলে তার জন্য ফিত্‌রা ওয়াজিব হবে না। আর যদি তার পর মারা যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হবে। আর যদি সূর্যাস্তের পর কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তার ফিতরা ওয়াজিব হবে না। অবশ্য তার ফিতরা আদায় করা হলে দোষের কিছু নেই- যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পূর্বেও ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হবে।

ঈদের পূর্বদিনের সূর্যাস্ত ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময় হিসেবে নির্ধারিত হওয়ার কারণ হচ্ছে, এই সময়েই রমযান থেকে ফিতর তথা রোযাভঙ্গ হয়। আর এর নামকরণও এর সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই বলা হয়: যাকাতুল ফিতর বা রোযা ভঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট যাকাত। তাই সেই সময়টিই বিধানটির কারণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

ফিতরা আদায় করার দুইটি সময়। একটা হলো ফযিলতের সময়, আর একটা হলো জায়েয সময়। আর উত্তম সময় হলো ঈদের দিন সকাল বেলা ঈদের নামায আদায় করার পূর্বে। যেমনিভাবে বুখারী শরীফে এসেছে-

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর যামানায় ঈদের দিনে খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতাম। আর এমনিভাবে ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতরা আদায় করতে বলেছেন নামায আদায় করতে যাওয়ার পূর্বে। (মুসলিম)

আর সে জন্যই উত্তম হচ্ছে, ঈদুল ফিতর এর দিনে ঈদের নামায কিছু দেরী করে পড়া, যাতে করে ফিতরা আদায় করা সম্ভব হয়।

আর যাকাতুল ফিতর আদায় করার জায়েয সময় হলো, ঈদের একদিন পূর্বে অথবা দুইদিন পূর্বে। যেমনিভাবে সহীহ বুখারীতে নাফে হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ইব্‌নে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছোট বড় সকলের পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর আদায় করতেন, এমনকি তিনি আমার সন্তানদের পক্ষ থেকেও আদায় করতেন, আর তিনি তাদেরকেই সেটা দিতেন যারা গ্রহণ করতে চাইতো, আর তিনি তা দিতেন ঈদের একদিন অথবা দুইদিন পূর্বে। [বুখারী]

আর ঈদের নামাযের পর পর্যন্ত যাকাতুল ফিতর আদায় করতে বিলম্ব করা জায়েয নেই। বিনা ওযরে ঈদের নামাযের পর পর্যন্ত বিলম্ব করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এর নির্দেশ এর বিপরীত। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি বলেন, যিনি সাদকাতুল ফিতর ঈদের নামাযের পূর্বে আদায় করবে তাহলে উহা গ্রহণ বা আদায় বলে গণ্য হবে। আর যদি ঈদের নামাযের পর আদায় করা হয়, তবে উহা সাধারণ সদকাহ এর ন্যায় হবে।

আর যদি কেউ তা ওযর বশত বিলম্বে আদায় করে তবে কোন দোষ নেই। যেমন ঈদের নামায কাউকে এমন স্থানে পেয়েছে যেখানে আদায় করার মত কোন জিনিস তার নিকট নেই যার দ্বারা সে তা আদায় করবে। অথবা তার নিকট এমন কোন ব্যক্তিও নেই যাকে সে যাকাতুল ফিতর দিবে। অথবা তার কাছে ঈদের সংবাদ হঠাৎ করেই এসেছে ফলে সে নামাযের আগে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে সমর্থ হয়নি। অথবা সে যাকাতুল ফিতর আদায় করার ব্যাপারে কারও উপর দায়িত্ব প্রদান করেছিল কিন্তু লোকটি তা প্রদান করতে ভুলে গিয়েছিল। উপরোক্ত অবস্থাসমূহে ঈদের পরেও আদায় করা যাবে, কারণ তার গ্রহণযোগ্য ওযর রয়েছে।

আর যাকাতুল ফিতর আদায় করার ওয়াজিব হলো, তা তার প্রাপ্য বক্তিগণের নিকট পৌছিঁয়ে দেয়া। অথবা তা নামাযের পূর্বে আদায় করার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা। যদি কোন লোককে দেয়ার জন্য নিয়্যত করে কিন্তু তার কাছে সেটা আদায় করার মত কোন লোক পাওয়া না যায় এবং সে লোকের কোন প্রতিনিধিও পাওয়া না যায়, তাহলে আদায় করার সময় শেষ হওয়ার আগেই অন্য কাউকে তা প্রদান করতে হবে। কোনভাবেই এর নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করা যাবে না।

আর ফিতরা আদায় করার স্থান হলো আদায় করার সময়ে যে যেখানে আছে সেখানকার অভাবীদের মাঝে, সেটা তার নিজের স্থায়ী আবাসস্থল হোক কিংবা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোথাও হোক; বিশেষ করে যদি তা সম্মানিত স্থান হয় অথবা সে স্থানের অভাবীরা অধিক মুখাপেক্ষী হয়।

আর যদি এমন কোন স্থানে থাকে যেখানে সদকা গ্রহণ করার মত কোন লোক পাওয়া না যায়, অথবা যদি যাকাতুল ফিতর এর হকদার সম্পর্কে জানতে না পারে, তাহলে তা অন্য কোন স্থানের হকদারদের কাছে আদায় করার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করবে।

আর ফিতরা পাওয়ার অধিকারী হলো ফকির তথা অভাবী আর এমন ঋণগ্রস্ত যে তার ঋণ আদায় করতে সক্ষম নয়। তখন তাদেরকে তাদের প্রয়োজন মোতাবেক প্রদান করা যাবে। আর এক ফিতরা একাধিক ফকীরকেও দেয়া যাবে। অনুরূপভাবে একাধিক ফিতরা একজন মিসকিনকেও দেয়া যাবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন কিন্তু প্রাপকদের নির্ধারণ করেন নি। সুতরাং যদি একদল লোক তাদের ফিতরা মেপে একত্র করে লোকদেরকে তা থেকে পুনরায় ওজন না করেই দিতে থাকে তবে তা যথেষ্ট হবে। তবে যাকে দেয়া হচ্ছে তাকে জানিয়ে দিতে হবে যে, তাকে যা দেয়া হচ্ছে তার পরিমাণ অজানা। যাতে করে সে ফকীর যদি এর থেকে তার নিজের ফিতরা দিতে চায় যেন পরিমান সম্পর্কে ভুল ধারণা করে না বসে। আর ফকীর যদি কোন ব্যক্তি থেকে ফিতরা গ্রহণ করে, প্রদানকারী তাকে জানায় যে, তা একটি পরিপূর্ণ ফিতরা এবং সে তার কথা বিশ্বাস করে, তবে তার জন্য এই ফিতরা দ্বারা নিজের বা নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে আদায় করা জায়েয আছে।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দাও; যেভাবে আপনি সন্তুষ্ট হন সেভাবে। আর আমাদের আত্মাসমূহকে পবিত্র কর। আর বিশুদ্ধ কর আমাদের কথা, কাজসমূহকে এবং আমাদেরকে খারাপ আকীদা কথা ও কাজ সমূহ থেকে পবিত্র কর। নিশ্চয় তুমি উত্তম দানশীল।

যাকাতের পরিচয়

যাকাতের পরিচয়

  • যাকাত কাকে বলে?

যাকাত শব্দের অর্থ “পবিত্র” করা অথবা “বৃদ্ধি পাওয়া” ।

পরিভাষায় যাকাত বলা হয়, শরীয়তের নির্দেশ ও নির্ধারণ অনুযায়ী নিজের সম্পদের একাংশের স্বত্বাধিকার কোন অভাবী গরীবের প্রতি অর্পণ করা এবং এর যে কোন প্রকার মুনাফা হতে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা।

প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে, গরীব-দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়। সাধারণত নির্ধারিত সীমাতিক্রমকারী সম্পত্তির ২.৫ শতাংশ (২.৫%) অংশ বছর শেষে বিতরণ করতে হয়।

কোরআনের আলোকে যাকাত

আল্লাহপাক কোরআনে পাকের যত জাগায় নামাযের কথা বলেছেন তত জাগায় যাকাত আদায়ের কথা বলেছেন। ঈমান ও নামাযের ন্যায় যাকাত ও একটি ইসলামের মৌলিক বিধান। এ সম্পর্কিত একটি আয়াত হলঃ

 

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ

আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়। (সুরা বাকরাঃ ৪৩)

 

হাদীসের আলোকে যাকাত

ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১.শাহাদা (ঈমান) ২.নামায কায়েম করা ৩.যাকাত আদায় করা ৪.হজ করা ৫.রমজান মাসে রোযা রাখা (বুখারী ও মুসলিম)

উক্ত হাদীসে যাকাত কে তৃতীয় স্তম্ভ বলে রাসূল সা. ঘোষণা করেছেন। এর দ্বারা যাকাতের কি গুরুত্ব তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

এভাবে আরো অনেক হাদীস দ্বারা যাকাত ফরয হওয়া ও তা আদায়ের লাভ ও গুরুত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।

যাকাত আদায় না করার পরিণাম

  • কোরআনের আলোকেঃ-

যারা যাকাত আদায় করে না তাদের ব্যাপারে আল্লাহপাক বলেন,

ۗ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ [٩:٣٤]

يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ ۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ [٩:٣٥]

“যারা সোনা রূপা জমা করে,অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা খরচ করে না( যাকাত আদায় করে না) তাদের কে কষ্টদায়ক আযাবের সংবাদ দিন যেই দিন দোযখের আগুনে তাদের কে গরম করা হবে। অতপর দাগ দেওয়া হবে সেগুলো দ্বারা(জমাকৃত সোনা রূপা) তাদের ললাটে,পার্শদেশে ও তাদের পৃষ্টদেশে। ( এবং বলা হবে) স্বাদ গ্রহন কর ঐ জিনিসের যা তোমরা দুনিয়াতে জমা করেছিলে। ” ( সুরা তাওবাঃ ৩৪-৩৫)

 

  • হাদীসের আলোকেঃ-

যে সম্পদের যাকাত দেয়া হয় না তাকে বলে “কানজ” এধরনের সম্পদ সঞ্চয়কারীদের ব্যাপারে শাস্তি স্বরুপ হাদিসে এসেছেঃ

আল্লাহর রসুল(সঃ) বলেন, যে তার সম্পদের উপর যাকাত আদায় করে না, কিয়ামাতের দিন তার জন্য আগুনের পাত তৈরি করে ঐ পাত কে জাহান্নামের আগুনে জ্বালিয়ে এর দ্বারা গরম করে ঐ ব্যাক্তির পিঠে ও কপালে, পাশে ছেকা দেয়া হবে। যহকন উহা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন আবার ওটাকে গরম করে শাস্তি দেয়া হবে। এভাবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে যার সমকাল হল- দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর বিচার শেষে কর্মফল হিসেবে বেছে নিবে- জান্নাত বা জাহান্নাম। (মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন,যাকে আল্লাহপাক সম্পদ দান করেছেন আর সে সঠিকভাবে উক্ত সম্পদের যাকাত আদায় করেনি,কিয়ামতের দিন তার সম্পদ কে তার জন্য একটি বিষাক্ত সর্পের রুপ ধারণ করাবেন। সে সর্পকে তার গলায় বেড়ী স্বরূপ করা হবে। সর্পটি নিজ মুখের দুই দিক দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে আমি তোমার মাল,আমি তোমার জমাকৃত সম্পদ। অতপর রাসূল সা. হাদীসের সমর্থনে এই আয়াতটি পাঠ করলেন,

وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পন্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পন্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। (মেশকাত-১৫৫)

অপর হাদীসে আছে, হযরত বুরাইদা রা. বলেন,যে সমপ্রদায় যাকাত আদায় করে না,আল্লাহ পাক তাদের কে দূর্ভীক্ষের কবলে নিক্ষেপ করেন। অপর এক হাদীসে আছে তাদের উপর রহমতের বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। (হাকেম)

যাকাত অস্বীকার করা কেমন ?

যাকাত যেহেতু চার অকাট্য প্রমাণ তথা কোরআন হাদীস, এজমা, কিয়াসের দ্বারা সু স্পষ্টভাবে প্রমাণিত সুতরাং যাকাত অস্বীকার করা কুফরী। এ জন্যই তো ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. তাঁর খেলাফত কালে যারা যাকাত অস্বীকার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। আর যাকাতের বিধান স্বীকার করে আদায় না করা ফাসেকী ও কবীরা গুনাহ

যাকাত দিলে সম্পদ কমে না

অনেকে মনে করে যাকাত আদায় করলে সম্পদ কমে যাবে। অথচ তা সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। কারণ দান সদকা,যাকাত ইত্যাদি দ্বারা বাস-বে কখন ও ধন সম্পদ কমে না। যদি ও বা দেখা যায় যে সাময়িকভাবে তহবীলে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে কিন’ আল্লাহর রহমতে অন্য কোন পন্থায় সে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। তাছাড়া তা পরকালের একাউন্টে জমা হয় বিধায় চিন্তার কোন কারণ নেই। দুনিয়ার অল্প দিনের হায়াতের জন্য আমরা কত টাকা ব্যাংকে জমা রাখি,পরকালের জন্য কিছু জমা রাখলে অসুবিধাটা কোথায় ? তাছাড়া দেখা যায় যে যারা ঠিক ভাবে যাকাত আদায় করে না তাদের মাল দৌলতে বিপদ মুসিবত,দূর্ঘটনা লেগেই থাকে। তখন অল্প বাচাঁতে গিয়ে বেশি নষ্ট হয়ে যায়। তাই মনে করতে হবে যে যাকাত আদায় করা মানে নিজ অবশিষ্ট সম্পদের হেফাজত করা। হাদীস থেকে বুঝা যায় যে,যাকাত না দিলে সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সম্পদ কমে যাওয়ার ভয়ে যাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকা ঈমানদারী ও চালাকির পরিচয় নয়।

যাকাত কাকে দিতে হয় ?

আল্লাহ পাক কোরআনে আট প্রকারের লোক কে যাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদে হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। ( সূরা তাওবাঃ ৬০)

সুতরাং তারা হল-

 

  • ১) মুসলমান ফকীর
  • ২) মিসকীন যার কাছে কিছুই নেই।
  • ৩) যাকাত আদায়কারী (যাকাত আদায় করার কাজে যে নিয়োজিত)
  • ৪) (অমুসলিমদের) মন জয় করার জন্য
  • ৫) দাস মুক্তির জন্য
  • ৬) ঋণগ্রস্তদের ঋণপরিশোধকল্পে
  • ৭) আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্য
  • ৮) ঐ মুসাফির যে সফরে শূণ্য হাত হয়ে গেছে।

যাকাত আদায়ের বিবিধ উপকারিতা নিম্নরূপ:

  • ১. গরীবের প্রয়োজন পূর্ণ করা; অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন করা; সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতাকে শেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা।
  • ২. মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করা; দারিদ্র বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
  • ৩. চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই সহ সবরকম অভাবজনিত অপরাধের মূলোৎপাটন করা। গরীব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করা।
  • ৪. সম্পদের বরকত ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি। নবীজী স. বলেন, ما نقصت صدقة من مال – যাকাতের সম্পদ কমে না [মুসলিম:৬৭৫৭, তিরমিযী:২০২৯] – অর্থাৎ, হয়ত দৃশ্যতঃ সম্পদের পরিমাণ কমবে, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা এই স্বল্প সম্পদের মাঝেই বেশি সম্পদের কার্যকারী ক্ষমতা দিয়ে দিবেন।
  • ৫. সম্পদের উপকারিতার পরিধি বৃদ্ধি করা। কেননা সম্পদ যখন যাকাতের মাধ্যমে অভাবীদের মাঝে বণ্টিত হয়, তখন এর উপকারিতার পরিধি বিস্তৃত হয়। আর যখন তা ধনীর পকেটে কুক্ষিগত থাকে, তখন এর উপকারিতার পরিধিও সঙ্কীর্ণ হয়।
  • ৬. যাকাত প্রদানকারীর দান ও দয়ার গুণে গুণান্বিত হওয়া; অন্তরে অভাবীর প্রতি মায়া-মমতা সৃষ্টি হওয়া।
  • ৭. কৃপণতার ন্যায় অসৎ গুণ থেকে নিজেকে পবিত্র করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন, خذ من أموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم بها – তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করো; যেন তুমি সেগুলোকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও বরকতময় করতে পার। [৯:১০৩]
  • ৮. সর্বোপরি আল্লাহর বিধান পালন করার মাধ্যমে ইহকাল ও পরকালে তাঁর নৈকট্য লাভ করা।

 

যাকাত কখন ফরয হয়:

যাকাত ৪ ধরনের বস্তুর উপর ফরজঃ

  • ১. জমিতে উৎপন্ন ফসল
  • ২. চারনভুমি
  • ৩.স্বর্ন ও রৌপ্য
  • ৪. ব্যবসা সামগ্রী

যাকাতের শর্তসমূহ

স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে তার উপর যাকাত ফরয হয়ে থাকে। যেমন:

  • ১. সম্পদের উপর পূর্ণ মালিকানা

সম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ সম্পদ, মালিকের অধিকারে থাকা, সম্পদের উপর অন্যের অধিকার বা মালিকানা না থাকা এবং নিজের ইচ্ছামতো সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার করার পূর্ণ অধিকার থাকা।

  • ২. সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়া

যাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, প্রবৃদ্ধিশীল হতে হবে, অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধি পাবার যোগ্যতাই যথেষ্ট। যেমন: গরু, মহিষ, ব্যবসায়ের মাল, নগদ অর্থ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রীত যন্ত্রপাতি ইত্যাদি মালামাল বর্ধনশীল। অর্থাৎ যেসকল মালামাল নিজের প্রবৃদ্ধি সাধনে সক্ষম নয়, সেসবের উপর যাকাত ধার্য হবে না, যেমন: ব্যক্তিগত ব্যবহারের মালামাল, চলাচলের বাহন ইত্যাদি।

  • ৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ

যাকাত ফরয হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে শরীয়ত নির্ধারিত সীমাতিরিক্ত সম্পদ থাকা। সাধারণ ৫২.৫ তোলা রূপা বা ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা উভয়টি মিলে ৫২ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে সে সম্পদের যাকাত দিতে হয়। পশুর ক্ষেত্রে এই পরিমাণ বিভিন্ন।

  • ৪. মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ থাকা

সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে যে সম্পদ উদ্ধৃত থাকবে, শুধুমাত্র তার উপরই যাকাত ফরয হবে। এপ্রসঙ্গে আল-কুরআনে উল্লেখ রয়েছে:

 

وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ

লোকজন আপনার নিকট (মুহাম্মদের [স.] নিকট) জানতে চায়, তারা আল্লাহর পথে কী ব্যয় করবে? বলুন, যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। আল্লাহ এভাবেই তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট বিধান বলে দেন। (সুরা বাকরাঃ২১৯)

 

মুহাম্মদের [স.] সাহাবী ইবনে আব্বাস [রা.] বলেছেন,

“ অতিরিক্ত বলতে পরিবারের ব্যয় বহনের পর যা অতিরিক্ত বা অবশিষ্ট থাকে তাকে বুঝায়।”

  • ৫. ঋণমুক্ততা

নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলেও ব্যক্তির ঋণমুক্ততা, যাকাত ওয়াজিব হওয়ার অন্যতম শর্ত। যদি সম্পদের মালিক এত পরিমাণ ঋণগ্রস্থ হন যা, নিসাব পরিমাণ সম্পদও মিটাতে অক্ষম বা নিসাব পরিমাণ সম্পদ তার চেয়ে কম হয়, তার উপর যাকাত ফরয হবে না। ঋণ পরিশোধের পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই কেবল যাকাত ওয়াজিব হয়।

  • ৬. সম্পদ এক বছর আয়ত্বাধীন থাকা

নিসাব পরিমাণ স্বীয় সম্পদ ১ বছর নিজ আয়ত্বাধীন থাকাই যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পূর্বশর্ত। তবে কৃষিজাত ফসল, খনিজ সম্পদ ইত্যাদির যাকাত (উশর) প্রতিবার ফসল তোলার সময়ই দিতে হবে।

সুতরাং আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের সকল মুসলিম ভাই-বোনদের সত্য জ্ঞান দান করেন আর সাদাকা করার মন-মানসিকতা বৃদ্ধি করে দেন। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের যাকাত আদায়ের তাওফীক দান করেন আমীন।