মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনাঃ মৃত্যুর পুর্বেই মরো

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনা : প্রয়োজন ও পদ্ধতি

পর্বঃ ১ । । পর্বঃ ২

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সলাতু ওয়াস সলামু আ’লা রসুলুল্লাহ। মৃত্যুর পুর্বেই মরো!! আমাদের প্রত্যেকেরই এই নিশ্চিত বিষয়টি মাথার উপরে ঝুলছে অথচ আমরা গাফেল। তাই মুহাসাবা সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করা হল। আল্লাহ আমাদের এথেকে জেনে বুঝে আমালের তাওফীক দান করুন আমীন।

মৃত্যু সুনিশ্চিত বিষয়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر، يوم لا تخفى عليكم خافية.

‘তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো। সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।’

মায়মূন ইবন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

لاَ يَكُونُ العَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ.

‘সে অবধি কোনো ব্যক্তি মুত্তাকী বা আল্লাহভীরু হতে পারবে না যাবৎ সে নিজেই নিজের হিসেব নেয় বা মুহাসাবা করে। যেভাবে সে তার সঙ্গীর সঙ্গে হিসেব করে কোথায় তার আহার আর কোথায় তার পোশাক।

মৃত্যু আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নেই কোনো দ্বিধা বা সংশয়। এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করে নি। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, রাসূলকে অস্বীকার করেছে, কিন্তু মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারে নি। পৃথিবীতে আসলে একদিন যেতে হবে, মৃত্যুর তেতো স্বাদ নিতে হবে এ কথা সবাই মানে। আবার এ ব্যাপারেও সবাই একমত, ‘মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। হতে পারে মৃত্যু এখনই এসে পড়বে কিংবা এক মিনিট, এক ঘন্টা, একদিন, এক সপ্তাহ অথবা এক বছর পর আসবে। কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞানের গবেষণা উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছলেও ‘কে কখন কোথায় মরবে’ এ তথ্য দিতে পারছে না।

মৃত্যুর পূর্বেই মরার ব্যাখ্যা

মৃত্যুর আগমন যেহেতু সন্দেহাতীত, এর দিন-ক্ষণ জানাও সাধ্যাতীত, তাই অপ্রস্তুত অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, আল্লাহ জানেন ওপারে সে কোনো অবস্থার সম্মুখীন হবে। এমন যেন না হয়, ওপারে পৌঁছে আল্লাহর আযাব বা ক্রোধের মুখে পড়তে হয়। অসন্তোষ বা অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সাহাবী বলেন, এই রুঢ় বাস্তব ‘মৃত্যু’ আসার পূর্বেই মরো।

কিভাবে মরবে? মরার আগে মরার ব্যাখ্যা কী? উলামায়ে কেরাম এর দু’ রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. প্রকৃত মৃত্যু আগমনের পূর্বে আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এর পরিপন্থি মনের সকল কামনা-বাসনা এবং পাপ, নাফরমানী ও অবৈধ কাজ করার যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, সব কিছুকে পদদলিত ও মথিত করে দাও। ধ্বংস ও বিনাশ করে দাও। দুই. মরণের আগে মরণের চিন্তা ও ধ্যান করো। চিন্তা করো, একদিন আমাকে এ জগৎ ছেড়ে যেতে হবে খালি ও রিক্ত হাতে। টাকা-পয়সা সাথে যাবে না। সন্তানাদি, কুঠি-বাংলো, বন্ধু-বান্ধব কেউ সাথে যাবে না, বরং যেতে হবে একাকী, শূন্য হাতে। এসব একটু ভেবে দেখো।

বাস্তব কথা হলো, পৃথিবীতে আমাদের মাধ্যমে যত অনাচার, পাপাচার সংঘটিত হয়, গুনাহ নাফরমানী প্রকাশ পায় এর বড় কারণ হলো, ‘মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া’। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, স্বাস্থ্য ভালো আছে, হাত-পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল আছে, ততদিন মানুষ নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবে। আকাশ কুসুম কল্পনা ফাঁদে। অহংকার ও আত্মগৌরব করে। অন্যের ওপর জুলুম করে। অপরের অধিকার হরণ করে। মানুষ এসব যৌবনকালে অবলীলায় করতে থাকে। ‘তাকে একদিন মরতে হবে’ এ কথা তার কল্পনাতেই আসে না। আপনজনের জানাযা বহন করে, নিজ হাতে প্রিয়জনকে কবরস্থ করে, তবুও ভাবনার পরিবর্তন হয় না। মনে করে, সেই তো মরেছে, আমি তো আর মরি নি। এভাবে উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতার ভেতর দিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, ফলে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায় না।

দুটি বড় নেয়ামত ও আমাদের উদাসীনতা

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ » .

‘আল্লাহর দেয়া দু’টি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ লোকই প্রবঞ্চনায় লিপ্ত।

এক. সুস্থতার নেয়ামত। দুই. অবসরের নেয়ামত।[1]

মনে হয় ‘সুস্থতার নেয়ামত চিরকালই অক্ষুন্ন থাকবে’। ফলে সুস্থকালে পুণ্য ও নেকীর কাজের তাগাদা বোধ হয় না। কাল করব, পরশু করব- এভাবে পেছায়। এক সময় নেয়ামত ফুরিয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘অবসর বা সুযোগ’ নেয়ামতেরও মূল্যায়ন করা হয় না। এখন কাজ করার সময় ও সুযোগ আছে; কিন্তু মানুষ ভালো কাজ করে না এ ভেবে যে, এখনো সময় আছে; পরে করে নেব ইত্যাদি।

যৌবন এখনো অটুট আছে, তারুণ্যের ইস্পাত শক্তি বলে বলবান তরুণ পাহাড়-পর্বত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। অনেক শ্রম ও কষ্টসাধ্য কাজ করতে পারে। চাইলে এই যৌবনে অনেক ইবাদত করতে পারে। আল্লাহর পথে ত্যাগ ও সাধনা করতে পারে। সৃষ্টির সেবা করতে পারে। আল্লাহকে খুশি করার জন্য আমলমানায় নেকীর স্তুপ গড়তে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কে এ কথা বসে গেছে, আমি এখনো যুবক আছি, এখন একটু যৌবনের স্বাদ গ্রহণ করি। ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজ করার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। এগুলো পরে করবো। এভাবে সে নেক কাজ টলাতে থাকে। যৌবন কখন শেষ হয়ে যায় তা টেরই পায় না। দুর্বল হয়ে পরে। ফলে ইবাদত ও নেক কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর করতে পারে না। কারণ এখন তার দেহে শক্তি নেই। স্বাস্থ্য ভালো নেই। অবসরের সংকট ও কাজের ব্যস্ততা এতো বেশি যে, এসবের জন্য সময়ই বের করতে পারে না। এর একমাত্র কারণ হলো, মানুষ মৃত্যু থেকে উদাসীন। মৃত্যুর কথা স্মরণ করে না।

শায়খ বাহলুল রহ. -এর শিক্ষামূলক ঘটনা

বাদশা হারুনুর রশীদের আমলে ‘বাহলুল’ নামক বড় এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহওয়ালা এ ব্যাক্তির সাথে বাদশা হাস্য-কৌতুক করতেন। পাগল হলেও জ্ঞানী সুলভ কথা বলতেন। বাদশা তার প্রহরীকে বলে রেখেছিলেন, এ ব্যক্তিটি আমার সাক্ষাতে যখনই আসতে চায়, তখনই তাকে আসতে দিও। সুতরাং যখন খুশি তিনি রাজ দরবারে হাজির হতেন।

একদিন তিনি দরবারে প্রবেশ করে বাদশা হারুনুর রশীদের হাতে একটি ছড়ি দেখতে পেলেন। হারুনুর রশীদ কৌতুক করে বললেন, ‘বাহলুল সাহেব তোমার কাছে একটা অনুরোধ রাখব’। বাহলুল বললেন, কী অনুরোধ? হারুনুর রশীদ তাকে ছড়িটি দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমাকে আমানত স্বরূপ দিচ্ছি’। পৃথিবীর বুকে তোমার চেয়ে বড় কোনো বেকুব যদি খুঁজে পাও তাকে আমার পক্ষ থেকে এটি উপহার দেবে।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ বলে ছড়িটি বাহলুল নিজের কাছে রেখে দিল। আসলে বাদশা ঠাট্টা করে বাহলুলকে এটাই বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তোমার চেয়ে বড় নির্বোধ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। যা হোক তখনকার মতো বাহলুল ছড়ি নিয়ে দরবার থেকে চলে গেল।

কয়েক বছর পরের ঘটনা। একদিন বাহলুল জানতে পারল, হারুনুর রশিদ খুব অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তাঁর চিকিৎসা চলছে, কিন্তু কোনো ফল দিচ্ছে না। বাহলুল বাদশার শুশ্রুষার জন্য তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমিরুল মুমিনীন কেমন আছেন?’ বাদশা বললেন, ‘অবস্থা আর কি, সামনে সুদূর সফর উপস্থিত’।

– বাহলুল জিজ্ঞেস করল, ‘কোথাকার সফর?’

– আখেরাতের সফর! এখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি।

– কতদিন পর ফিরে আসবেন?

– আরে ভাই! এটাতো আখেরাতের সফর। এ সফরে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না।

– আচ্ছা আপনি তো এ সফর থেকে আর ফিরবেন না, তাই সফরে আরাম ও সুবিধার জন্য কী কী ব্যবস্থা করেছেন?

– তুমি দেখি আবার নির্বোধের মত কথাবার্তা বলতে শুরু করেছ। আখেরাতের সফরে কেউ সঙ্গে যেতে পারে নাকি? এ সফরে বডিগার্ড, সৈন্য-লশকর কেউ সাথে যেতে পারে না। সঙ্গীহীন একাকী যেতে হয়। এ এক মহা সফর।

– এত দীর্ঘ সফর! সেখান থেকে আর ফিরবেন না, তবুও সৈন্য-সামন্ত কিছু পাঠালেন না? অথচ ইতোপূর্বে সব সফরেই এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনার জন্য আগে থেকেই আসবাব-পত্র ও সৈন্য-সামন্ত প্রেরণ করতেন। এ সফরে কেন পাঠালেন না?

– এটা এমন সফর যে, এতে সৈন্য পাঠানো যায় না।

– জাঁহাপনা! বহুদিন হলো আপনার একটি আমানত আমার কাছে রয়ে গেছে। সেটি একটি ছড়ি। আমার চেয়ে বড় কোনো নির্বোধ পেলে এটা তাকে উপহার দিতে বলেছিলেন। আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু আপনার চেয়ে বড় নির্বোধ আর কাউকে পেলাম না। কারণ, আমি দেখেছি আপনি কোনো সংক্ষিপ্ত সফরে গেলেও মাস খানেক পূর্ব থেকেই তার প্রস্তুতি চলত। পানাহারের আসবাব, তাবু, সৈন্য, বডিগার্ড ইত্যাদি আগে থেকেই পাঠানো হতো। আর এখন এতো দীর্ঘ সফর, যেখান থেকে ফেরার সম্ভাবনাও নেই, অথচ এর জন্য কোনো প্রস্তুতি নেই। আপনার চেয়ে বড় বোকা জগতে আর কে আছে? অতএব আপনার আমানত আপনাকেই ফেরৎ দিচ্ছি। এসব শুনে বাদশা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং বিলাপ করে বলতে লাগলেন, বাহলুল! তুমি সঠিক বলেছো। আজীবন তোমাকে বোকা ভেবেছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো তুমি বুদ্ধিমান। তুমি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলেছ। বাস্তবেই আমি সারা জীবন বৃথা কাটিয়েছি। আখেরাতের কোনো প্রস্তুতি নেই নি।

প্রকৃত জ্ঞানী কে?

বাহলুল যা বলেছেন, তা একটি হাদীসের মর্মকথা। শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ».

‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নেক কাজ করেছে। আর অক্ষম সেই যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির পেছনে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল প্রত্যাশা করে।’[2]

হাদীসে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো, কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগে দুনিয়ায় নিজেই নিজের হিসেব নেয়া তথা মুহাসাবা করা।

উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘প্রকৃত জ্ঞানী’র পরিচয় দিয়েছেন। অথচ যে ব্যক্তি পৃথিবীতে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারে, টাকা থেকে টাকা কামাই করতে পারে, দুনিয়াকে বোকা বানিয়ে দিতে পটু, তাকেই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানি মনে করা হয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসে বলেছেন, প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফস তথা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রবৃত্তির সকল চাহিদার পেছনে না চলে নফসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুগামী বানায়, মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এর ব্যতিক্রম হলে সে নির্বোধ-বোকা। কারণ সে সারাটা জীবন অর্থহীন কাজে ব্যয় করল কিন্তু চিরকাল যেখানে থাকতে হবে তার জন্য কোনো পাথেয় সংগ্রহ করল না।

আমরা সবাই বোকা

হারুনুর রশীদকে বাহলুল যা বলেছেন, গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য বলে মনে হবে। পৃথিবীতে বসবাসের জন্য সবাই চিন্তা করে, সে কোথায় বাড়ি বানাবে? কেমন গৃহ নির্মাণ করবে? সুখ ও বিলাসিতার কী কী উপকরণ সংগ্রহ করবে? কোথাও ভ্রমণে গেলে ‘সিট পায় কি না’ এই ভয়ে আগেই টিকিট বুকিং করে, প্রস্তুতি শুরু করে। যেখানে যাচ্ছে সেখানে সংবাদ পাঠায়। হোটেলে বুকিং করায়। মাত্র তিন দিনের সফরেও এসব প্রস্তুতি নেয়া হয়।

অথচ যেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে, যে জীবনের শুরু আছে শেষ নেই, তার কোনো চিন্তাই করে না যে, সেখানে কেমন ঘর নির্মাণ করবে? সেখানকার জন্য কিভাবে বুকিং করবে?

উপরোক্ত হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়। অন্যথায় সে হলো বেকুব। চাই সে যতবড় বিত্তশালী বা পুঁজিপতিই হোক না কেন। আর আখেরাতের প্রস্তুতির পথ এটিই যে, ‘মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর ধ্যান করবে’। এ কথা চিন্তা করবে যে, ‘একদিন আমাকে মরতে হবে’।

মৃত্যু এবং আখেরাতের মুহাসাবা বা কল্পনা করার পদ্ধতি

সারাদিনের মধ্যে একটি নির্জন-নিভৃত সময় বের করে এভাবে কল্পনা করা, ‘আমার অন্তিম মুহূর্ত এসে গেছে, জান কবজ করার জন্য ফেরেশতারা উপস্থিত হয়েছেন, আমার জান বের করেছে, আত্মীয়-স্বজন গোসল ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থায় লেগে গেছে, কাফন পরিয়ে নিয়ে গেছে, জানাযার নামায পড়ে কবরে রেখেছে, অতঃপর কবর বন্ধ করে দিয়েছে, ওপর থেকে মাটি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেছে, অন্ধকার কবরে এখন আমি একা, শুধুই একা। অতঃপর ফেরেশতাগণ এসে প্রশ্নোত্তর শুরু করেছে।’

এরপর আখেরাত কল্পনা করা যে, ‘আমাকে কবর থেকে পুনরায় উঠানো হয়েছে, হাশরের মাঠ কায়েম হয়েছে, সব মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছে, সেখানে প্রচণ্ড গরম লাগছে, দরদর করে ঘাম বয়ে পড়ছে, সূর্য একেবারে নিকটে এসেছে, সবাই দুশ্চিন্তা ও টেনশনে ভুগছে, তখন তারা নবীগণের কাছে গিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার আবেদন করছে।’

এভাবে হিসাব-কিতাব, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদির কল্পনা করা। রোজ ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত, মাসনূন দু‘আ এবং যিকির-আযকার শেষ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করা, এ সময় অবশ্যই আসবে। জানা নেই কখন আসবে। হতে পারে এখনই আসবে, আজই আসবে। এসব কল্পনা করে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আমি দুনিয়াবী কাজ-কর্মের জন্য বের হচ্ছি। আমার দ্বারা যেন এমন কোনো কাজ সংঘটিত না হয়, যা আমার আখেরাতকে বরবাদ ও ধ্বংস করে দেয়।’

প্রতিদিন এভাবে ধ্যান করতে থাকা। একবার যদি মৃত্যুর চিন্তা অন্তরে বসে যায়, তাহলে আত্মশুদ্ধির দিকে মনযোগ যাবে এবং আখেরাতের চিন্তা মাথায় আসবে ইনশাআল্লাহ।

আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ.

আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. একজন বড় মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর জীবনকালে এক ব্যক্তি মনে মনে ভাবলো, আমি বিভিন্ন আলেম, মুহাদ্দিস, ফকীহদের কাছে প্রশ্ন করব যে, যদি জানতে পারেন ‘আগামীকাল আপনার মৃত্যু হবে’। জীবনের শুধুমাত্র একদিন বাকি আছে। তবে আপনারা কীভাবে সে দিনটি কাটাবেন? প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তাঁরা যেসব ভালো ভালো কাজের কথা বলবেন, তা সে নিজেও করবে। অতঃপর তাঁদেরকে প্রশ্ন করে বিভিন্ন আমলের কথা জানতে পারলেন।

এক পর্যায়ে যখন শায়খ আবদুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. এর কাছে গিয়ে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বললেন, প্রতিদিন যে কাজ করি সেদিনও তাই করব। কারণ, আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের কর্মসূচী ও কাজের রুটিন এ ধারণাকে সামনে রেখে বানিয়ে নিয়েছি যে, ‘হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ দিন’। ‘হতে পারে আজই আমার মরণ এসে পড়বে’। এই সূচিতে পরিবর্তন বা সংযোজন করার মত কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিন যা করি জীবনের শেষ দিনও তাই করব।

এটাই হলো “মূ-তূ ক্ববলা আন তা মূ-তূ”বা ‘মরার আগেই মরো’র বাস্তব নমুনা। এসব মহা মনীষী মৃত্যুর চিন্তা ও আখেরাতের খেয়াল দ্বারা নিজের জীবন এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছিলেন যে, সর্বক্ষণ মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। মৃত্যু যখনই আসতে চায় আসুক।

প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা

উবাদা ইবন ছামিত রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ » . قَالَتْ عَائِشَةُ أَوْ بَعْضُ أَزْوَاجِهِ إِنَّا لَنَكْرَهُ الْمَوْتَ . قَالَ « لَيْسَ ذَاكَ ، وَلَكِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ الْمَوْتُ بُشِّرَ بِرِضْوَانِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، فَأَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا حُضِرَ بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَعُقُوبَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَكْرَهَ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ »

‘যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, আল্লাহর মিলন প্রত্যাশী হয়, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপ্রিয় ভাবে, আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।’ এ কথা শুনে আয়েশা কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রী বললেন, আমরা তো মৃত্যু অপ্রিয়ই জ্ঞান করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা নয় ; বরং ব্যাপার হলো, যখন মু’মিনের সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হয়। তখন তার কাছে কোনো জিনিসই এর চেয়ে প্রিয় মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাত পছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে কাফের ব্যক্তির সামনে যখন মৃত্যু উপস্থিত, তখন তাকে আল্লাহর শাস্তি ও আযাবের দুঃসংবাদ শোনানো হয়, এমতাবস্থায় তার কাছে এর চেয়ে অপ্রিয় আর কিছু মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।[3]

সুতরাং এমন সৌভাগ্যবান প্রকৃত মু’মিন মাত্রেই সর্বদা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকেন। অর্থাৎ, আগামীকাল আপন প্রিয়জন তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের সাথে সাক্ষাত হবে। এই মৃত্যু চিন্তার প্রভাবেই মানুষের জীবন সুন্নত ও শরীয়তের রাজপথে উঠে আসে এবং তাকে সর্বক্ষণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখে।

যা হোক প্রতিদিন কিছু সময় বের করে মৃত্যুর কল্পনা করতে হবে। ভাবতে হবে ‘মৃত্যু আসছে, আমি কি প্রস্তুত হয়েছি?’

আজই নিজের হিসাব কষে নিতে হবে

আলোচ্য বাণীর দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে, কিয়ামত দিবসে হিসাব গ্রহণের আগেই তুমি তোমার হিসাব নাও। আখেরাতে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨ ﴾ [الزلزلة: ٧، ٨]

‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালোকাজ করলে তা সে দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে’। {সূরা আয-যিলযাল, আয়াত : ৭-৮}

অর্থাৎ, তোমরা যে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করেছ তা সামনে আসবে, আর যে মন্দ কাজ করেছ তাও সামনে উপস্থিত পাবে। ‘কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগেই নিজের হিসাব নেয়া শুরু করো’ প্রত্যহ রাতে মনকে জিজ্ঞেস করো, আজ সারাটা দিন এমন কী কী কাজ করেছি, যে ব্যাপারে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হলে আমি উত্তর দিতে পারব না। এভাবে প্রতিদিন করতে থাক।


[1]. বুখারী : ৬৪১২; তিরমিযী : ২৩০৪।

[2]. তিরমিযী : ২৪৫৯; তাবরানী, মু‘জামুল কাবীর : ৬৯৯৫; মুসতাদরাক আলাস-সাহীহ : ৭৬৩৯; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটিকে হাসান সহীহ, তবে বুখারী ও মুসলিম এটি সংকলন করেন নি। তালখীস নামক গ্রন্থে ইমাম যাহবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[3]. বুখারী : ৬৫০৭; মুসলিম : ৪৮৪৪।