মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনাঃ মৃত্যুর পুর্বেই মরো

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনা : প্রয়োজন ও পদ্ধতি

পর্বঃ ১ । । পর্বঃ ২

সাতসকালে মনের সঙ্গে অঙ্গীকার

এখানে একটি পদ্ধতি দেয়া হল, সেটি হলো প্রতিদিন কয়েকটি কাজ করবে। প্রথম কাজ হলো, ‘সকালে ঘুম থেকে জেগে নফসের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার নেবে যে, আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো গুনাহ করব না। আমার দায়িত্বে যত ফরয, ওয়াজিব এবং সুন্নাত আছে সব ঠিকমত আদায় করব। আমার ওপর আল্লাহর যত হক আছে, বান্দার হক আছে সব পুরোপুরি আদায় করব। হে নফস! মনে রেখ, ভুলক্রমে অঙ্গীকারের বিপরীত কোনো কাজ করলে তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।’ এই হলো প্রথম কাজ এর নাম দিয়েছেন তিনি ‘মুশারাতা’ বা ‘আত্ম অঙ্গীকার’।

উপরের কথার সাথে একটু সংযোগ করে বলা যায়, এই ‘আত্ম অঙ্গীকারের’ পর আল্লাহর কাছে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আজ আমি গুনাহ করব না বলে অঙ্গীকার করেছি। আমি সব ফরজ, ওয়াজিব আদায় করব। শরীয়ত অনুযায়ী চলবো। হুকুল্লাহ এবং হুকুকুল ইবাদ সঠিকভাবে আদায় করবো। কিন্তু ইয়া মাবুদ, আপনার তাওফীক ছাড়া এই প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেহেতু আমি পণ করেছি, তাই আপনি আমাকে তাওফীক দিন। আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা থেকে রক্ষা করুন। পুরোপুরিভাবে এ প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

পুরো দিন নিজের আমলের ‘মনযোগ’

এ দু‘আ করে জীবিকার জন্য বেরিয়ে যাও। চাকরি করলে চাকরিতে, ব্যবসা করলে ব্যবসায়, দোকান করলে দোকানে চলে যাও। সেখানে গিয়ে এই কাজ করো যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে একটু ভেবে দেখ, এই কাজটি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কি-না। এই শব্দ যা উচ্চারণ করছি তা প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী কি-না। যদি প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী মনে হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করো। এটাকে তিনি বলেছেন ‘মনযোগ’। এটাই হলো দ্বিতীয় কাজ।

শোয়ার আগে মুহাসাবা

তৃতীয় কাজটি করতে হবে শোয়ার আগে, আর তা হলো ‘মুহাসাবা’ অর্থাৎ নফসকে বলবে, তুমি সারাদিন গুনাহ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। প্রতিটি কাজ শরিয়তমত করবে। হুকুকুল্লাহ তথা আল্লাহর হক ও হুকুকুল ইবাদ তথা বান্দার হক ঠিক মত আদায় করবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। এখন বলো কোন কাজ তুমি প্রতিজ্ঞামত করেছ, আর কোন কাজ প্রতিজ্ঞামত কর নি? এভাবে সারাদিনের সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করবে। সকালে যখন বাড়ি ত্যাগ করলে তখন অমুক লোককে কি বলেছ? চাকরি ক্ষেত্রে গিয়ে নিজ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছ? ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করেছ? হালালভাবে না হারাম পদ্ধতিতে? যত লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের হক কিভাবে আদায় করেছ? বিবি, বাচ্চার হক কিভাবে আদায় করেছ? এভাবে যাবতীয় কাজের হিসাব নেয়াকে ‘মুহাসাবা’ বলা হয়।

অতঃপর শুকরিয়া আদায় কর

এই ‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই হয় যে, ‘সকালের প্রতিজ্ঞায় তুমি সফল’ তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। বলো, হে আল্লাহ! তোমার অশেষ শুকরিয়া যে, তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দিয়েছ। (আল্লহুম্মা লাকাল হামদু ওয়া লাকাশ শুকুর) শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা‘আলা তা বৃদ্ধি করে দেন। তাই আগামী দিনেও প্রতিজ্ঞায় অটল থাকার তাওফীক দেবেন।

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

﴿ وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧ ﴾ [ابراهيم: ٧]

‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৭}

অতএব প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে ভবিষ্যতে নেয়ামত বৃদ্ধি করা হবে এবং অতিরিক্ত নেকীও অর্জন হবে।

অন্যথায় তাওবা কর

‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই দাঁড়ায় যে, অমুক স্থানে প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী কাজ করেছো, অমুক সময় প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছো, পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছো এবং স্বীয় কৃত প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারো নি, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাওবা করো, বলো, ‘হে আল্লাহ! আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায়, প্রবৃত্তির তাড়নায় প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারিনি। হে মাবুদ! আমি তোমার কাছে তাওবা করছি এবং ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি আমার তাওবা কবুল করে আমার পাপ মাফ করে দাও। ভবিষ্যতে আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করো।

নফসকে শাস্তি প্রদান কর

তাওবার সাথে সাথে নফসকে একটু শাস্তিও দাও। নফসকে বলো, তুমি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কাজ করেছ, সুতরাং শাস্তি স্বরূপ তোমাকে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করতে হবে। এ শাস্তিটা প্রভাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সময়ই নির্ধারণ করো। সুতরাং রাতে নফসকে বলবে, তুমি নিজের সুখ-শান্তির জন্য, সামান্য আনন্দ উপভোগের জন্য আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে লিপ্ত করেছ। অতএব এখন তোমাকে সাজা ভোগ করতে হবে। তোমার শাস্তি হলো, এখন শোয়ার আগে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করো। তারপর বিছানায় যাও। এর আগে বিছানায় যাওয়া নিষেধ।

শাস্তি হওয়া চাই পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ

আমার সম্মানিত উস্তাদ বলতেন, এমন শাস্তি নির্ধারণ করো যা হবে ভারসাম্যপূর্ণ, সঙ্গতিপূর্ণ ও পরিমিত। এতো বড় ধরনের শাস্তি দিও না যে, নফস বিগড়ে যায়। আবার এতো ছোট ও হালকা শাস্তি দিও না যে, তাতে নফসের কোনো কষ্টই না হয়।

হিন্দুস্তানে স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে নিয়ম করলেন, প্রত্যেক ছাত্রকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। যারা সালাতে অনুপস্থিত থাকবে তাদের জরিমানা দিতে হবে। এক ওয়াক্ত সালাতের জরিমানা সম্ভবত এক আনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফল দাঁড়ালো উল্টা। যেসব ছাত্রের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল, তারা এক মাসের সব সালাতের জরিমানা অগ্রিম জমা দিয়ে বলতো, এই হলো এক মাসের সমুদয় সালাতের জরিমানা। সুতরাং একমাস সালাত আদায় থেকে ছুটি।

তিনি রহ. বলতেন, এত অল্প ও মামুলি অর্থদণ্ড হওয়া সমীচীন নয়, যা একেবারেই জমা দিতে পারে। আবার এত বেশি হওয়াও ঠিক নয় যে, মানুষ তা থেকে পলায়ন করে। বরং মধ্যম ধরনের ও ভারসাম্যপূর্ণ শাস্তি নির্ধারণ করা উচিৎ। উদাহরণ স্বরূপ যেমন আট রাকাত নফল সালাত শাস্তি নির্ধারণ করা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাজা।

একটু সাহস করতে হবে

মোটকথা, আত্মশুদ্ধি করতে হলে হাত-পা নাড়াতে হবে, একটু একটু হিম্মৎ করতে হবে, কমবেশি কষ্ট সহ্য করতে হবে এবং এর জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও দুরন্ত ইচ্ছা করতে হবে। শুধু ঘরে বসে বসে নফসের তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি হতে পারে না। তাই শাস্তি নির্ধারণ করে নাও যে, নফস ভুল পথে গেলে আট রাকাত নফল সালাত তাকে অবশ্যই পড়তে হবে। নফস যখন বুঝতে পারবে যে, আট রাকাত নফল পড়ার নতুন আপদ খাড়া হয়েছে, তখন সে ভয়ে গুনাহ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। নিজের নফস এভাবে আস্তে আস্তে সঠিক পথে উঠে আসবে। ভবিষ্যতে আর তোমাকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে না ইনশাল্লাহ।

করতে হবে শুধু চারটি কাজ

উপদেশের সার সংক্ষেপ হলো, ‘মাত্র চারটি কাজ করো’।

এক. সকালে মোশারাতা বা আত্ম অঙ্গীকার।

দুই. সব কাজের সময় মুরাকাবা।

তিন. রাতে শোয়ার আগে মুহাসাবা।

চার. নফস প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে মো‘য়াকাবা বা শাস্তি প্রদান।

ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে

একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, শুধু দু’চারদিন এ আমল করে এ কথা ভাবা উচিৎ নয় যে, ব্যাস আমি পূর্ণতায় পৌঁছে গেছি, আমি বুযুর্গ হয়ে গেছি। বরং ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে। কখনো তুমি নফসের ওপর বিজয়ী হবে আবার কখনো শয়তান বিজয়ী হবে। কিন্তু এতে ঘাবড়ালে চলবে না। আমল ছেড়ে দেয়া যাবে না। কারণ, এতে আল্লাহর কোনো রহস্য ও হেকমত লুকায়িত থাকতে পারে। ইনশাআল্লাহ এভাবে জয়-পরাজয় ও উন্নতি-অবনতির পথ ধরে একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

এ আমল করে প্রথম দিনই যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাও, তবে ‘আমি অনেক বড় কিছু বনে গেছি’- এ ধরনের আত্মতুষ্টি বা হামবড়া ভাব তোমাকে বিভ্রান্ত করবে। সুতরাং এ আমলে কখনো সফলতা আবার কখনো ব্যর্থতার দেখা মিলবে। যেদিন সফলতা আসবে, সেদিন শুকরিয়া আদায় করবে। যেদিন ব্যর্থতা আসবে, সেদিন তওবা-ইস্তেগফার করবে। নিজের নফসের ওপর শাস্তি জারি করবে এবং নিজের খারাপ আমলের ব্যাপারে অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করবে। ‘এ অনুতাপ মানুষকে নিম্ন থেকে অনেক উচ্চে পৌঁছিয়ে দেয়’।

অনুশোচনা ও তওবা দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি পায়

মানুষ যদি আপন কৃতকর্মের প্রতি খাঁটি মনে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার এত বেশি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যার কল্পনাই সে করতে পারে না।

শায়খ আবদুল হাই রহ. বলতেন, যখন কোনো বান্দা পাপ করে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তা‘আলা সেই বান্দাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি যে ভুল করে পাপাচারে লিপ্ত হয়েছ, যা তোমাকে আমার সাত্তার (দোষ গোপনকারী) গাফ্ফার (ক্ষমাশীল) ও রহমান (দয়াশীল) গুণের আশ্রয়প্রার্থী বানিয়েছে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলবাহী বনে গেল।

হাদীসে এসেছে, ঈদের দিনে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের কাছে স্বীয় ইজ্জত ও জালাল তথা মর্যাদা ও মাহত্মের শপথ করে বলেন, আজ এসব লোকেরা সমবেত হয়ে কর্তব্য পালন করছে। আমাকে ডাকছে, ক্ষমা প্রার্থনা করছে এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তুর আবেদন জানাচ্ছে। আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, আমি তাদের দু‘আ কবুল করব। তাদের গুনাহসমুহকে নেকী দ্বারা বদলে দেব।

যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, (দীর্ঘ হাদীসের শেষের দিকে গিয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ বলেন,

« فَإِنِّي أُشْهِدُكُمْ يَا مَلَائِكَتِي أَنِّي قَدْ جَعَلْتُ ثَوَابَهُمْ مِنْ صِيَامِهِمْ شَهْرَ رَمَضَانَ وَقِيَامَهُ رِضَائِي وَمَغْفِرَتِي، وَيَقُولُ: يَا عِبَادِي، سَلُونِي فَوَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا تَسْأَلُونِي الْيَوْمَ شَيْئًا فِي جَمْعِكُمْ لِآخِرَتِكُمْ إِلَّا أَعْطَيْتُكُمْ، وَلَا لِدُنْيَاكُمْ إِلَّا نَظَرْتُ لَكُمْ فَوَعِزَّتِي لَأَسْتُرَنَّ عَلَيْكُمْ عَثَرَاتِكُمْ مَا رَاقَبْتُمُونِي، فوَعِزَّتِي لَا أَخْزِيكُمْ وَلَا أَفْضَحُكُمْ بَيْنَ يَدَيْ أَصْحَابِ الْحُدُودِ، انْصَرِفُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ أَرْضَيْتُمُونِي وَرَضِيتُ عَنْكُمْ، فَتَفَرَحُ الْمَلَائِكَةُ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِمَا يُعْطِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَذِهِ الْأُمَّةَ إِذَا أَفْطَرُوا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ » .

‘হে আমার ফেরেশতারা, আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের রমযান মাসের সিয়াম সাধনা এবং কিয়ামুল লাইল বা সালাতে রাত্রি জাগরণের বিনিময়ে প্রতিদান এই দিলাম যে তাদের পাপসমূহ মার্জনা করে দিলাম আর আমি তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। তারপর তিনি বলেন, হে আমার বান্দা, আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, তোমাদের এই আখিরাতের সমাবেশে আমার কাছে যা-ই চাইবে আমি তা দিয়ে দেব। আর তোমাদের দুনিয়ার যার কথাই বলবে আমি তার প্রতি দৃষ্টি দেব। আমার ইজ্জতের কছম, আমি অবশ্যই তোমাদের ওই অপরাধগুলো ক্ষমা করব যা আমার পর্যবেক্ষণে তোমরা করেছিলে। আমার ইজ্জতের কছম, আমি তোমাদেরকে শাস্তিপ্রাপ্তদের সামনে লজ্জিত করব না, অপমানিত করব না। তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে (ঘরে) প্রত্যাবর্তন কর। তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছ; আমিও তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। তখন এই উম্মতের রমযানের সিয়াম সাধনা সমাপ্তিতে আল্লাহ জাল্লা শানুহূর প্রতিদান দেখে ফেরেশতুকূল আনন্দিত হবেন এবং তাঁরা সুসংবাদ পেয়ে আহ্লাদিত হবেন।[1]

এখন প্রশ্ন জাগে, এসব গুনাহ নেকী দ্বারা কিভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে? উত্তর হলো, মানুষ ভুল করে যখন কোনো পাপকাজ করে এবং সে অনুতাপ ও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, আল্লাহকে কাতরভাবে ডেকে বলে, ‘হে মাবুদ, অজ্ঞাতে অবহেলায় এ অন্যায় করে ফেলেছি। দয়া করে মাফ করেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা শুধু মাফই করেন না, বরং এর বদৌলতে তার মর্যাদাও বৃদ্ধি করে দেন। এভাবে এ গুনাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়ে যায় এবং তার জন্য সুফল হিসেবে আবির্ভূত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٧٠ ﴾ [الفرقان: ٦٩]

‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। {সূরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৬৯}

গুনাহ আমার কী ক্ষতি করবে?

ভারতের উত্তর প্রদেশে নাজমুল হাসান নামক একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সবসময় নেককার আলেমদের সোহবতে থাকতেন। তিনি একজন বড় মাপের আবেদও ছিলেন। তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁর একটি পংক্তি আমার ভালো লাগে এবং বারবার মনে পড়ে। যার অর্থ হলো-

অনুতাপ প্রকাশের পেয়ে গেছি ধন,

পাপ আর করবে কি অহিত সাধন।

অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু আমাদেরকে অনুতাপ অনুশোচনা ও রোনাজারি দান করেছেন, আর আমরা দু‘আও করছি, ‘হে আল্লাহ! আমার এ অপরাধ ক্ষমা করে দিন’ তাই এ গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না।

গুনাহ আল্লাহ তা‘আলারই সৃষ্টি। আর হিকমত ছাড়া কোনো কিছুই তিনি সৃষ্টি করেন না। গুনাহ তৈরির হিকমত হলো- গুনাহ করার পর তাওবা করলে, অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করলে এবং ভবিষ্যতে না করার প্রতিজ্ঞা করলে এ তাওবার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যা কল্পনায়ও ছিলো না।

আজীবন লড়াই চলবে

সুতরাং রাতে ‘মুহাসাবা’ করার সময় যখন জানতে পারবে গুনাহ সংঘটিত হয়েছে, তখন তাওবা ও ইস্তেগফার করবে। আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, হতাশ হবে না। কারণ, জীবনটা এক ধরনের লড়াইয়ের নাম। মৃত্যু পর্যন্ত নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আর লড়াইয়ের অমোঘ নিয়ম হলো, কখনো তুমি জিতবে, কখনো প্রতিপক্ষ জিতবে। তাই শয়তান তোমাকে পরাজিত করলে সাহস হারিয়ে বসে পড়ো না বরং পুনরায় সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে শয়তানের সাথে লড়াই করো। ‘সাহস না হারিয়ে পুনরায় মোকাবেলার জন্য দাঁড়ালে শেষ বিজয় আমাদেরই হবে’ -এ ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ تِلۡكَ ٱلدَّارُ ٱلۡأٓخِرَةُ نَجۡعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوّٗا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فَسَادٗاۚ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ٨٣ ﴾ [القصص: ٨٣]

‘এই হচ্ছে আখিরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা যমীনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য’। {সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৮৩}

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱللَّهِ وَٱصۡبِرُوٓاْۖ إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦۖ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ١٢٨ ﴾ [الاعراف: ١٢٨]

‘মূসা তার কওমকে বলল, ‘আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।’ {সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ১২৮}

অগ্রসর হও, আল্লাহ স্বাগতম জানাবেন

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩ ﴾ [العنكبوت: ٦٩]

‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন’। {সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৯}

‘যারা আমার পথে জিহাদ করে’ অর্থাৎ নফস ও শয়তানের সাথে তোমরা এভাবে লড়াই করবে যে, শয়তান তোমাদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে, আর তোমরা তার মোকাবেলা করছ এবং মরণপণ প্রচেষ্টায় ভ্রান্ত পথ থেকে বেঁচে চলছ, তবে আমার প্রতিশ্রুতি রইল যে, অবশ্যই অবশ্যই আমি প্রচেষ্টাকারী ও লড়াইকারীদের নিজের রাস্তার সন্ধান দেব।

আয়াতটি বুঝাতে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, শিশু যখন হাঁটা শুরু করে, বাবা-মা তখন তাকে চলতে ও হাঁটতে শেখায়। একটু দূরে দাঁড় করে দিয়ে বলে ‘এদিকে এসো’। বাচ্চা যদি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সামনে পা না বাড়ায়, তাহলে বাবা-মাও দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে কোলে নেয় না। কিন্তু বাচ্চা এক পা ফেলে অপর পা ফেলতে পড়ে যেতে লাগলে বাবা-মা পড়ে যাওয়ার আগেই তাকে ধরে ফেলে এবং পরম স্নেহে কোলে নেয়। কারণ বাচ্চা তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে।

এমনিভাবে মানুষ আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করলে, তার পথে পা বাড়ালে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন না, এগিয়ে এসে তাকে ধরবেন না, এমনটি হতেই পারে না। বরং এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াদা দিচ্ছেন, তোমরা চলতে শুরু করলে আমি এগিয়ে গিয়ে তোমাদের হাত ধরব। সরাসরি তোমাদের সাহায্য করব। অতএব সাহসিকতার সাথে নফস ও শয়তানের মোকাবেলা করো। তাঁর দরবারে হতাশার স্থান নেই। অন্যায় হলেও নিরাশ হয়ো না, চেষ্টা অব্যাহত রাখ। ইনশাআল্লাহ একদিন সফল হবেই।

সারকথা হলো, তুমি তোমার কাজ করো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাজ অবশ্যই করবেন। মনে রেখ, তোমার কাজে ত্রুটি হতে পারে কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতির কোনো সম্ভাবনা নেই। তুমি পা বাড়ালে তিনি পথ খুলে দেবেন। এ দিকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে, মরার আগে মরো আর হিসাবের আগেই হিসাব করো।

আল্লাহর সামনে কী জবাব দেবে?

একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, মুহাসাবার একটি পদ্ধতি হলো, তুমি কল্পনা করো ‘এখন তুমি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছো, তোমার হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে, আমলনামা পেশ করা হচ্ছে, তোমার আমলনামায় যেসব অপকর্ম ছিল সকলের সামনে তা উন্মোচিত হচ্ছে এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রশ্ন করছেন- এ অপকর্ম তুমি কেন করেছ?’

এর উত্তরে তখন কি বলবে? আজ কোনো মৌলবী সাহেব যখন তোমাকে বলে, অমুক কাজ করো না, দৃষ্টির হেফাজত করো, সুদ-ঘুষ থেকে বেঁচে চলো, মিথ্যা বলো না, গীবত করো না, টিভি দেখো না, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানাদিতে পর্দাহীনতা থেকে বেঁচে চলো। উত্তরে তোমরা তাদেরকে বলে থাক, আমরা কি করব, যুগটাই খারাপ। পৃথিবী উন্নতি ও সভ্যতার শিখরে পৌঁছে গেছে। মানুষ চাঁদে গেছে। আমরা কি তাদের থেকে পিছিয়ে থাকব? দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে পড়ব? বর্তমান সমাজে চলতে গেলে এসব না করে উপায় নেই।

এ উত্তর মৌলবীদের দিতে পারো। কিন্তু কিয়ামতের ভয়ংকর দিবসে মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর সামনে এ অজুহাত দেখাতে পারবে কি? বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলো, এ জবাব যদি সেখানে না চলে এখানে কিভাবে চলবে?

আল্লাহর কাছে সাহস ও প্রত্যয় প্রার্থনা করো

তোমরা যদি আল্লাহর কাছে এ উত্তর দাও যে, ‘হে আল্লাহ! সমাজ ও পরিবেশের কারণে অপারগ হয়ে আমি গুনাহ করতে বাধ্য হয়েছি’। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, ‘অপারগ তুমি ছিলে না আমি ছিলাম?’ তোমরা উত্তর দেবে, ‘ওহে মাবুদ! আমিই অপারগ ছিলাম’। আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন, ‘তবে তুমি তোমার অপারগতা দূর করার প্রার্থনা করোনি কেন? আমি কি তা দূর করতে সক্ষম ছিলাম না? আমার নিকট দু‘আ করতে, হে আল্লাহ! আমি অপারগ, আপনি আমার অপারগতা দূর করে দিন, নয়তো আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে শাস্তি দেবেন না।

বলুন! আল্লাহ তা‘আলার এ পাল্টা প্রশ্নের কোনো উত্তর আছে কি? না থাকলে একটি কাজ করুন, আর তা হলো, নিজেদেরকে যে কাজ করতে অপারগ দেখছেন, চাই বাস্তব সম্মত অপারগতা হোক আর সামাজিক অপারগতাই হোক এ ব্যাপারে প্রতি দিন দু‘আ করুন, ‘হে আল্লাহ! আমার সামনে এই অপারগতা। আমি এ থেকে বাঁচার সাহস পাচ্ছি না। আপনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ অপারগতা ও সাহসহীনতা দূর করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সাহস ও হিম্মৎ দান করুন। আমীন।

আল্লাহর দানের ভাণ্ডারে কোনো অভাব নেই

মোটকথা, আল্লাহর কাছে চাও, প্রার্থনা কর। অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত, আল্লাহর কাছে চাইলে তাকে অবশ্যই দেবেন। না চাইলে দেবেন কী? রোগের ব্যথায় কাতরতা না থাকলে, গুনাহ থেকে বাঁচার আকুলতা না থাকলে তাকে চিকিৎসা দেবে কে? প্রার্থনাকারীকে দেয়ার জন্য আল্লাহর ভাণ্ডার সদা উন্মুক্ত।

সকাল-সন্ধ্যা যে চারটি আমলের কথা বলা হলো, এর ওপর আমল করলে আলোচ্য বাণী তথা ‘মরার আগেই মরো, হিসেবের আগেই নিজের হিসাব করো’ অনুযায়ী আমলকারী হিসেবে গণ্য হওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দান করুন, ক্ষমা করুন এবং এসব কথার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


[1]. বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান : ৩৪২১; দিমইয়াতী, আত-মুতজিরুর-রাবেহ : ১৩৩। ইবনুল মুনযিরী রহ. বলেন, হাদীসটি ইবন হিব্বান সংকলন করেছেন কিতাবুছ-ছাওয়াব অধ্যায়ে, তেমনি বাইহাকী হাদীসটি সংকলন করেছেন ফাযাইলুল আওকাত অধ্যায়ে। হাদীসের সনদে এমন কেউ নেই যার ‘যঈফ’ হবার ব্যাপারে সবাই একমত। [আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব : ২/৬১]