মুসলিম জাতির অধপতনের কারণ

মুসলিমদের বিপর্যয়ের কারণ

বর্তমান দুনিয়ার দিকে চোখ ঘুরালে আমরা দেখতে পাই, মুসলিমরা আজ সর্বত্র যুলুম, নির্যাতন ও বৈষম্যের স্বীকার। যেখানে সেখানে তারা বিজাতিদের হাতে মার খাচ্ছে, প্রতিনিয়তই যুলুম নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে; কোথাও তারা মাথা গুঁজবার ঠাই পাচ্ছে না। ইয়াহূদী, নাসারা ও মুশরিকরা মুসলিমদের তাদের খেলার পুতুলে পরিণত করছে। যখন যা ইচ্ছা তাদের সাথে তাই করছ, তাদেরকে তাদের আক্রোশের লক্ষ বস্তুতে পরিণত করছে। কোন প্রকার কারণ ছাড়াই, খোঁড়া অজুহাত আবিষ্কার করে পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা করছে, তাদের উপর হামলা চালাচ্ছে, অসহায় নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করছে। তাদের প্রতিশোধের দাবানল থেকে মায়ের কোলের নিষ্পাপ-নিরপরাধ ঘুমন্ত শিশুও রেহাই পাচ্ছে না। ন্যায় অন্যায় ও বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই তাদের উপর চলছে অকথ্য ও অমানবিক নির্যাতন। মুসলিমরা কোথাও মাথা ছাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করলেই, অংকুরেই তাদের ধ্বংস করে দেয়ার পায়তারা করে, মানবতার দুশমন ইয়াহূদী নাসারাসহ ইসলামের শত্রুরা। বর্তমান দুনিয়াতে মুসলিমদের এহেন নাজুক পরিস্থিতি কারণ ও এর প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের জানা থাকা আবশ্যক। আমি আমার এ ক্ষুদ্র নিবন্ধে মুসলিমদের অধঃপতনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করছি।

মুসলিমদের অধঃপতনের কারণ:

  • এক. ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব

মুসলিমদের বড় সমস্যা হল, তাদের অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। ইসলামের কৃষ্টি কালচার, বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। এমনকি অসংখ্য অগণিত মুসলিমের অবস্থা এতই নাজুক, তারা কেবলই নামে মাত্র মুসলিম অথবা মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করছে বলে মুসলিম। ইসলাম কি তারা তা জানে না; ইসলাম ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যও তারা নির্ধারণ করতে পারে না।

একজন মুসলিমের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক প্রয়োজনীয় দিক হল, আক্বীদা বা বিশ্বাস। আমল-আখলাকের ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে, হয়ত তাতে কড়াকড়ি করা নাও হতে পারে; কিন্তু আক্বীদা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ত্রুটি থাকলে, তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না এবং তার যাবতীয় আমল, ও ইবাদত বন্দেগী সবই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এসবের কোন বিনিময় তাকে দেয়া হবে না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, বর্তমানে মুসলিমদের আক্বীদা ও বিশ্বাসেই অসংখ্য ত্রুটি রয়েছে। তারা নামে মাত্র মুসলিমদের কাতারে সামিল। বাস্তবে তাদের অবস্থা খুবই করুণ।

এখানে আরো একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হল, সাধারণ মুসলিম যারা ইসলাম সম্পর্কে পড়া-লেখা করেনি, কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়নি, তাদের ভুল-ত্রুটি থাকাটা যতটা স্বাভাবিক, কিন্তু যারা ইসলাম সম্পর্কে পড়া-লেখা করেছে, যারা সমাজে ইসলামের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে, মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে তালিম দিচ্ছে, ইসলামের ব্যাখ্যা দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের মধ্যে যদি ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস, ইসলামের মূলনীতি ও ঈমানের পরিপন্থী কুফর সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব থাকে তাহলে ইসলাম ও মুসলিমদের অবস্থা যে কত করুণ হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। বর্তমান বাস্তবতার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা সহজেই দেখতে পাই, আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে যারা ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছে তারা নিজেরাই ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ করে আক্বীদার ক্ষেত্রে একেবারেই অজ্ঞ বা ভুল আকীদায় বিশ্বাসী।

ইসলাম মানব জাতির জন্য যে সর্বজন ও চিরন্তন বিধান দিয়েছে, এ সম্পর্কে মুসলিমদের জানা থাকা ও বিশ্বাস করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, একজন মুসলিম তার দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরা, নিত্য-দিনের ইবাদত বন্দেগী ও খুঁটি-নাটি সমস্যা সম্পর্কে ইসলামের সমাধান কি তা জানে না। তাহলে সে কীভাবে যুগের চাহিদা ও মানবজাতির প্রয়োজন অনুযায়ী ইসলামকে মানুষের সামনে তুলে ধরবে? কীভাবে সে বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করবে?

এখানে আরো লক্ষণীয় বিষয় হল, ইসলাম সম্পর্কে জানার ও ইসলামী শরী‘আতের উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। কুরআন সুন্নাহর বাহিরে ইসলাম সম্পর্কে জানার আর কোন মাধ্যম বা অবকাশ নাই। কিন্তু মুসলিমরা এ দুটি বিষয়কে বাদ দিয়ে এক শ্রেণীর নাম-ধারী আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদ যারা তাদের মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পকাহিনীকে ইসলামের নামে চালিয়ে যায়, তাদের থেকে ইসলাম শিখে। তাদের খপ্পরে পড়ে একশ্রেণীর মুসলিম প্রতিনিয়ত ইসলাম বিষয়ে প্রতারিত হচ্ছে। ফলে তারা না জেনে না বুঝে মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং ইসলামের সত্যিকার জ্ঞান লাভ হতে বঞ্চিত হয়।

দুই: বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা

মুসলিমদের নিজেদের বিবাদ, বিশৃঙ্খলা, পরস্পরিক দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্যের কারণে তাদের মধ্যে যে ঐক্য, সংহতি, সংঘবদ্ধতা ও সুসম্পর্ক থাকার প্রয়োজন ছিল, তা বর্তমানে অবশিষ্ট না‌ই; তাদের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে, আত্ম-কলহে তারা জর্জরিত। সামান্য স্বার্থের কারণে তারা বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, প্রত্যেকেই এক এক করে নেতা সেজে বসে এবং নামে-বেনামে অসংখ্য দল ও উপদল গড়ে তুলে। মুসলিমদের অবস্থা এতই করুণ যে, শুধুমাত্র পার্থিব স্বার্থের উপর ভিত্তি করেই তাদের মধ্যে গড়ে উঠে অসংখ্য জামাত, দল ও উপদল। আবার তারাও হীন স্বার্থ, পদ-পদবী ও পার্থিব বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে রাতারাতি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাদের দল ও ঐক্য। সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে বহি:শত্রু মোকাবেলা করার মত কোন যোগ্যতা বর্তমানে তাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। তারা একজন নেতার নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে যে কাজ করবে, সে যোগ্যতা তাদের নাই বললেই চলে। এমনকি যখন কোন জাতীয় দুর্যোগ বা ফিতনা এসে তাদের গলা চেপে ধরে এবং বিপদ আসন্ন হয়ে পড়ে, তখন নিজেদের পারস্পরিক বিবাধ ভুলে গিয়ে একই প্লাটফর্মে এসে জাতীয় দুর্যোগ ও ফিতনা মোকাবেলা করার যে প্রয়োজন, তাও তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না এবং তারা এক জায়গায় একত্র হয়ে সমস্বরে কোন ঘোষণা দিতে পারে না। ফলে তাদের অনৈক্য, দলাদলি, গ্রুপিং ইসলাম বিরোধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। আর তারা তা কাজে লাগিয়ে তাদের মুল লক্ষ্যে -মুসলিমদের ধ্বংস করা- পৌছতে তেমন কোন কাজ করতে হয় না। তাদের অসমাপ্ত কাজ মুসলিমরাই অধিকাংশ করে রাখে। এভাবেই যুগে যুগে মুসলিমরা তাদের নিজেদের ভুলের কারণে দুশমনদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। যতদিন পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করবে ততদিন পর্যন্ত তাদের অবস্থার কোনই উন্নতি হবে না। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে এরশাদ করেন

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ لَمۡ يَكُ مُغَيِّرٗا نِّعۡمَةً أَنۡعَمَهَا عَلَىٰ قَوۡمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنفُسِهِمۡ وَأَنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٞ ٥٣﴾

তা এ জন্য যে, আল্লাহ কোন নিআমতের পরিবর্তনকারী নন, যা তিনি কোন কওমকে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা পরিবর্তন করে তাদের নিজদের মধ্যে যা আছে। আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [আনফাল: ৫৩]

তাদের অনৈক্য, বিবাধ ও ঝগড়া এতই তীব্র যে, এর কারণে তাদের শক্তি সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের দুর্বল হওয়া ও পরাজয় বরণ করার তিনটি কারণ উল্লেখ করেন:

১. মুসলিমদের পারস্পরিক মতানৈক্য ও ঝগড়া বিবাধ।

২. আমীরের নেতৃত্বের উপর বাড়াবাড়ি করা এবং তার নির্দেশ অমান্য করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ صَدَقَكُمُ ٱللَّهُ وَعۡدَهُۥٓ إِذۡ تَحُسُّونَهُم بِإِذۡنِهِۦۖ حَتَّىٰٓ إِذَا فَشِلۡتُمۡ وَتَنَٰزَعۡتُمۡ فِي ٱلۡأَمۡرِ وَعَصَيۡتُم مِّنۢ بَعۡدِ مَآ أَرَىٰكُم مَّا تُحِبُّونَۚ مِنكُم مَّن يُرِيدُ ٱلدُّنۡيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ ٱلۡأٓخِرَةَۚ ثُمَّ صَرَفَكُمۡ عَنۡهُمۡ لِيَبۡتَلِيَكُمۡۖ وَلَقَدۡ عَفَا عَنكُمۡۗ وَٱللَّهُ ذُو فَضۡلٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٥٢﴾

আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তাঁর নির্দেশে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়ে গেলে এবং নির্দেশ সম্পর্কে বিবাদ করলে আর তোমরা অবাধ্য হলে তোমরা যা ভালবাসতে তা তোমাদেরকে দেখানোর পর। তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখিরাত। তারপর আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহশীল। [আল-ইমরান:১৫২]

আয়াত দ্বারা এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়, আমীরের নেতৃত্ব মেনে নেয়ার মত মানসিকতা না থাকলে কখনোই মুসলিমরা সফল হতে পারবে না। আমীরের নেতৃত্ব মেনে নেয়ার কোন বিকল্প নাই। একদিকে আমীর নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে, অন্যদিকে যাকে আমীর নির্বাচন করা হয়, তার আনুগত্যে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় তাদের পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَنَٰزَعُواْ فَتَفۡشَلُواْ وَتَذۡهَبَ رِيحُكُمۡۖ وَٱصۡبِرُوٓاْۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ٤٦﴾

আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। [আনফাল: ৪৬]

কিন্তু আজ মুসলিমদের অবস্থা এতই করুণ, মুসলিমদের প্রতিটি ঘরে ঘরে একজন একজন করে নেতা পাওয়া যায়। তারা নিজেই নিজের নেতৃত্বে কাজ করতে পছন্দ করে। কারো নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা তাদের মধ্যে একেবারেই শূন্য। রাতারাতি তাদের মধ্যে দল উপদল ও নেতা গড়ে উঠে। আবার কিছুদিন অতিবাহিত হতে না হতে তারাও বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং দল ভেঙ্গে যায়; তৈরি হয় আবার নতুন নতুন নেতা। এভাবেই তৈরি হয়েছে অসংখ্য অগণিত দল ও নেতা; নেতার অভাব নেই।

৩. দুনিয়ার ধন সম্পদের প্রতি অধিক লোভ করা। পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি তাদের লোভ-লালসা এতই প্রকট যে, দুনিয়ার সামান্য অর্থ-কড়ি তাদের নিকট ঈমানের তুলনায় অধিক শ্রেয়। ফলে দুনিয়ার সামান্য চাহিদা পূরণের জন্য তারা দ্বীনকে বিক্রি করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

তিন: প্রবৃত্তি পূজা ও আত্মকেন্দ্রিকতা:

মুসলিমদের আরেকটি বড় সমস্যা হল, তারা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। অর্থ-কড়ি, পদমর্যাদা ও ক্ষমতার লোভ তাদের মধ্যে এতই প্রকট, তারা সামান্য অর্থের জন্য ও হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করতে জাতীয় স্বার্থ ও ঐতিহ্যকে বিকিয়ে দিতে বিন্দু পরিমাণও কুণ্ঠাবোধ করে না। এক সময় মুসলিমদের অবস্থা এমন ছিল, সারা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দিয়েও তাদের ঈমানকে খরিদ করা যেত না, আর বর্তমানে তাদের ঈমান ঐতিহ্য এতই সস্তা, অতি সামান্য অর্থ-কড়ি, নগণ্য একটা চাকুরী, কোন রকম একটি পদ বা খেতাব-উপাধি ও নামে মাত্র কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা দেয়ার বিনিময়ে তাদের ঈমান খরিদ করা যায়। তাদের একেবারেই সামান্য অর্থ-কড়ি বা আত্মমর্যাদার লোভ দেখানো হলে, তারা আপন জাতি ও আদর্শের পরিপন্থী যে কোন ধরনের কাজ করতে কোন প্রকার কুণ্ঠাবোধ বা দ্বিধা করে না। অথচ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের যে ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন তাতে এ কথা স্পষ্ট যে উম্মতে মুসলিমার ধ্বংস, তাদের অভাব বা অর্থ-হীনতার কারণে নয় বরং তাদের ধ্বংসের কারণ হল, অর্থ ও পাচুর্য। তারা যখন অর্থের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়বে, তখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে। হাদিসে বর্ণিত,

অর্থ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রা. কে জিযিয়া উসুল করার জন্য বাহরাইন পাঠান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহরাইনের অধিবাসীদের সাথে সুলহ বা মীমাংসামূলক চুক্তি করেছিলেন। আর ‘আলা ইবনুল হাদরামীকে তাদের আমীর নিযুক্ত করেন। আবু উবাইদা বাহরাইনে জিযিয়া উসুল করে, জিজিয়ার মাল নিয়ে মদিনায় ফিরে আসলে আনসারগণ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে ফজরের সালাত আদায় করতে একত্র হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সালাত আদায় করে, সালাম ফিরানোর পর তাদের দিকে ঘুরে বসলেন, তারা সামনের দিকে অগ্রসর হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আমি বুঝতে পারছি যে, তোমরা শুনেছ যে. আবু উবাইদা কিছু মাল নিয়ে ফিরে এসেছে? তারা সবাই বলল, হা, হে আল্লাহর রাসূল! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, তোমরা সু-সংবাদ গ্রহণ কর এবং আশাবাদী হও! অবশ্যই তোমরা খুশি হবে। তবে মনে রাখবে আমি তোমাদের অভাবকে ভয় করি না। বরং আমি ভয় করছি, তোমাদের এমন একটি সময় আসবে দুনিয়ার ধন-সম্পদ তোমাদের অঢেল হবে যেমনটি তোমাদের পূর্বের উম্মতদের ধন-সম্পদ অঢেল ছিল। তারা দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রতি তোমাদের মতই আগ্রহী ছিল। ধন-সম্পদ প্রাচুর্য তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে তোমাদেরও তাদের মত ধ্বংস করে ফেলবে[1]

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে,

أن رسول الله ‏ ‏صلى الله عليه وسلم ‏‏قام على المنبر فقال ‏ ‏إنما ‏ ‏أخشى عليكم من بعدي ما يفتح عليكم من بركات الأرض…

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মিম্বারে দাড়িয়ে বলেন, আমি ভয় করতেছি সে আসমান ও জমিনের বরকত সম্পর্কে! যে বরকতের দরজা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য খুলে দেবে…[2]

عن ثوبان ، قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- :” يوشك الأمم أن تداعى عليكم كما تداعى الأكلة إلى قصعتها”، فقال قائل : ومن قلة نحن يومئذ ؟ قال : “بل أنتم يومئذ كثير، ولكنكم غثاء كغثاء السيل، ولينزعن الله من صدور عدوكم المهابة منكم وليقذفن في قلوبكم الوهن”، فقال قائل : يا رسول الله وما الوهن؟ قال: “حب الدنيا وكراهية الموت “

অপর একটি বর্ণনায় সাওবান রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের উপর এমন একটি সময় আসবে, তোমাদের বিরুদ্ধে লোকদের এমনভাবে ডাকা হবে, যেমনটি খাওয়ার দস্তরখানের দিকে ডাকা লোকদের হয়ে থাকে! এ কথা শোনে একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে রাসূল! সে দিন কি আমাদের মুসলিমদের সংখ্যা কম হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, সেদিন তোমরা সংখ্যায় কম হবে না। বরং তোমরা সেদিন আরো অনেক বেশি হবে। তবে তোমরা বন্যার পানির উপরিভাগে ভাসমান খড়কুটার মত হতে [বাতাস একবার তোমাদের এদিক নিয়ে যাবে আবার অপরদিক নিয়ে যাবে তোমাদের নিজস্ব কোন শক্তি থাকবে না।] আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের দুশমনদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দেবে। আর তোমাদের অন্তরে ওহান ডেলে দেবে। এক লোক দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ওহান জিনিসটি কি? আল্লাহর রাসূল বললেন, দুনিয়ার মুহাব্বাত আর মৃত্যুকে অপছন্দ করা[3]

মানুষের মধ্যে যখন মৃত্যুর ভয় থাকবে, তখন মানুষ দ্বীন ও ঈমানের জন্য ত্যাগ ও কুরবানি দিতে প্রস্তুত থাকবে না। জেল-যুলুম, নির্যাতনের ভয়ে হক্ব ও সত্য কথা বলা এবং বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে সাহস পাবে না। আর থাকবেই বা কি করে তাদের মধ্যে সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব দেয়ার লোক না থাকার কারণে মুসলিমদের বাতিলের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা ও তাদের সংঘবদ্ধ করার মত নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

চার. মুনাফেকী

মুসলিম জাতীর মধ্যে মুনাফেকদের একটি বড় অংশ সব সময় বর্তমান থাকে, তারা নিজেদের মুসলিম নামে প্রকাশ করে কিন্তু কাজ করে ইসলামের বিরুদ্ধে। এদের কারণেই যুগে যুগে ইসলাম ও মুসলমানের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। এ সব সুযোগ সন্ধানী, নামধারী ও তথাকথিত মুসলিমরা সব সময় মুসলিমদের ক্ষতি করা ও তাদের মধ্যে বিবাধ, বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখতে আমরণ চেষ্টা চালায়। মুনাফেকরা সাধারণত ইসলাম ও ইসলামী ঐতিহ্যে বিশ্বাস না করেও মুসলিম সমাজে মুসলিম বেশ-ভূষা নিয়ে বসবাস করে এবং মুসলিমদের সাথে তারা বিবাহ সাদীসহ যাবতীয় কর্মে অংশ গ্রহণ করে। মুসলিমদের যাবতীয় সমস্যা ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত হয়ে তারা তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজে লাগায়। মুনাফেকরাই যুগে যুগে ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। একারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকৃষ্ট শাস্তি দেবেন বলে ঘোষণা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ فِي ٱلدَّرۡكِ ٱلۡأَسۡفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمۡ نَصِيرًا ١٤٥﴾

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও মুনাফেকদের থেকে উম্মতদের অধিক সতর্ক করেন।

فعن عمران بن حصين رضي الله عنهما : (مرفوعًا( إن أخوف ما أخاف عليكم بعدي : منافق عليم اللسان

যেমন ইমরান ইবনে হুছাইন রা. হতে হাদিস বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার পর আমি তোমাদের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হল, মুনাফিক, ভাষাজ্ঞানের অধিকারী[4]

ইমাম বুখারি ইবনে আবি মুলাইকা হতে মারফু হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ত্রিশ জন ছাহাবীকে দেখেছি, তারা সবাই নেফাককে সর্বাধিক ভয় করত[5]

হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইবনে আবি মুলাইকা যাদের পেয়েছেন, তারা হলেন, আয়েশা রা., তার বোন আসমা রা, উম্মে সালমা রা., আর চার আবদুল্লাহ রা. এবং আবু হুরাইরা রা… [ফতহুল বারী: ১/১১১]

আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ جَٰهِدِ ٱلۡكُفَّارَ وَٱلۡمُنَٰفِقِينَ وَٱغۡلُظۡ عَلَيۡهِمۡۚ وَمَأۡوَىٰهُمۡ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ ٧٣ ﴾

অর্থ, হে নবী, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের উপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম; আর তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান। [তাওবা, আয়াত: ৭৩]

পাঁচ: আল্লাহর রাহে জিহাদ ছেড়ে দেয়া

জিহাদ হল, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও মহান শৌর্যবীর্য। জিহাদই হল, দ্বীন প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপকরণ। দুনিয়াতে আল্লাহর শাসন প্রবর্তন করার পথে কিছু পার্থিব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, অসামাজিক রাজনীতি এবং সমগ্র মানব সমাজের পরিবেশ ইত্যাদির প্রত্যেকটিই ইসলামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বাধা অপসারণ করার জন্যে ইসলাম শক্তি প্রয়োগ করে। প্রতিটি মানুষের নিকটই ইসলামের বাণী পৌঁছানো এবং প্রত্যেকের পক্ষে ইসলামী বিধানকে যাচাই করে দেখার প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং এভাবে স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে মানুষের নিকট ইসলামের অমর বাণী পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টিই এ শক্তি প্রয়োগের লক্ষ্য। কৃত্রিম ইলাহদের বন্ধন থেকে উদ্ধার করে মানুষকে স্বাধীনভাবে ভাল-মন্দ যাচাই করার সুযোগদানের জন্য জিহাদ এক অত্যাবশ্যক উপায়।

মুসলিমরা যখন জিহাদ করা ছেড়ে দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও অপমান অপদস্থকে চাপিয়ে দেবে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمْ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلا لا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ.

আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রা. হতে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যখন তোমরা ‘ঈনা[6] নিয়ে বেচা-কেনা কর, গরুর লেজের সাথে লেগে থাক, ক্ষেত খামারের উপর সন্তুষ্টি থাক এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দাও, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর অপমান ও লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবে। যতদিন পর্যন্ত তোমরা তোমাদের দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তা দূর করবে না[7]

একমাত্র যারা মুনাফেক অথবা প্রতিবন্ধী তারা ছাড়া আর কেউ জিহাদ করা হতে বিরত থাকতে পারে না। যেমন কা‘ব ইবন মালেক রা. হতে বর্ণিত, তিনি তাবুকের যুদ্ধ হতে বিরত থাকার পর বলেন,

]فَكُنْتُ إِذَا خَرَجْتُ فِي النَّاسِ بَعْدَ خُرُوجِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطُفْتُ فِيهِمْ أَحْزَنَنِي أَنِّي لَا أَرَى إِلَّا رَجُلًا مَغْمُوصًا عَلَيْهِ النِّفَاقُ ، أَوْ رَجُلًا مِمَّنْ عَذَرَ اللَّهُ مِنْ الضُّعَفَاءِ[ . رواه البخاري ]4066[ ومسلم ]4973[

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে যাওয়ার পর আমি যখন রাস্তায় বের হতাম তখন রাস্তায় একমাত্র মার্কা মারা মুনাফেক অথবা অন্ধ খোঁড়া প্রতিবন্ধী লোক ছাড়া আর কাউকে দেখতাম না। [বুখারি: ৪০৬৬, মুসলিম: ৪৯৭৩]

মোটকথা, মুসলিমরা যখন আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর দুশমনদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে দেবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যি কথাই বলেছেন, কারণ বর্তমানে আমরা মুসলিমদের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখতে পাই তারা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে সীমাহীন খেয়ালি-পনায় লিপ্ত, তারা শুধু খাচ্ছে, হারাম হালাল বেচে চলছে না, আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দিচ্ছে ইত্যাদি। এর ফলাফল কি দাঁড়াচ্ছে!? এর ফলাফল হিসেবে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি!? আমরা দেখতে পাচ্ছি, সারা দুনিয়াতে আজ মুসলিমরা অপমান অপদস্থ। পৃথিবীর আনাচে কানাচে তারা নির্যাতিত তারা দুশমনদের উপর সাহায্য চায়! অথচ তারা জানে না, যতদিন পর্যন্ত তারা তাদের দ্বীনের প্রতি ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত তাদের সাহায্য করা হবে না তাদের থেকে অপমান দূর করা হবে না। যেমনটি পরম সত্যবাদী রাসূল বলেছেন। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : مَنْ لَمْ يَغْزُ ، أَوْ يُجَهِّزْ غَازِيًا ، أَوْ يَخْلُفْ غَازِيًا فِي أَهْلِهِ بِخَيْرٍ ، أَصَابَهُ اللَّهُ بِقَارِعَةٍ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَة .

আবু উমামা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, [যে আল্লাহর পথে জিহাদ করল না অথবা কোন যোদ্ধার সহযোগিতাও করল না অথবা কোন যোদ্ধা পরিবার পরিজনের লোকদের প্রতিনিধিত্বও করল না আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের পূর্বে তাদের কঠিন আকস্মিক আযাবে আক্রান্ত করাবে[8]

জিহাদের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَا لَكُمۡ إِذَا قِيلَ لَكُمُ ٱنفِرُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱثَّاقَلۡتُمۡ إِلَى ٱلۡأَرۡضِۚ أَرَضِيتُم بِٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا مِنَ ٱلۡأٓخِرَةِۚ فَمَا مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا فِي ٱلۡأٓخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ ٣٨ إِلَّا تَنفِرُواْ يُعَذِّبۡكُمۡ عَذَابًا أَلِيمٗا وَيَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَيۡرَكُمۡ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيۡ‍ٔٗاۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٣٩ ﴾

হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হল, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা যমীনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগ-সামগ্রী আখিরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

যদি তোমরা (যুদ্ধে) বের না হও, তিনি তোমাদের বেদনাদায়ক আযাব দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক কওমকে আনয়ন করবেন, আর তোমরা তাঁর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। [সূরা আত-তাওবাহ: ৩৮-৩৯]

আয়াতের ব্যখ্যায় কোন কোন মুফাসসির বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে জিহাদকে ছেড়ে দেয়ার কারণে যে আযাব বিষয়ে ভয় দেখান, তা শুধু আখেরোতের আযাব নয়। বরং তা হল দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানের আযাব। যারা জিহাদ হতে বিরত থাকবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে অপমান, অপদস্থ করবে। আল্লাহ তাদের যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত করবে। আর এ সুযোগটি তাদের দুশমনরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, জিহাদে অংশ গ্রহণ করার কারণে তাদের ধন-সম্পদ ও জীবনের যে ক্ষতি হত, আল্লাহর আযাবের কারণে তারা তার চেয়ে আরো অধিক পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে…।

দুনিয়াতে এমন কোন উম্মত পাওয়া যাবে না, যারা জিহাদ করা ছেড়ে দিয়ে সম্মানের অধিকারী হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করলে যে কষ্ট বা কথিত সম্মান হারা হত, জিহাদ ছেড়ে দেয়ার কারণে তারা আরো বেশি অপমান, অপদস্থ হবে।

যারা দুনিয়ার ধন সম্পদের মোহে পড়ে জিহাদকে ছেড়ে দেয়, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُكُمۡ وَإِخۡوَٰنُكُمۡ وَأَزۡوَٰجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٰلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٞ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡكُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٖ فِي سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ٢٤﴾

বল, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের যে ধরনের কাজে মুসলমাদের বিপর্যয় তা থেকে হেফাযত করুন। আমীন


[1] বুখারী: ৩১৫৮; মুসলিম: ২৯৬১।

[2] বুখারী: ২৮৪২।

[3] আবু দাউদ: ৪২৯৭।

[4] মুসনাদে আহমাদ: ১৪৩।

[5] বুখারী: ১/১৮।

[6] ‘ঈনা’ এক ধরনের বেচাকেনা; যাতে বাকীতে বেশি দামে বিক্রি করে আবার নগদে কম দামে ক্রয় করে নেয়া হয়। এটা নিঃসন্দেহে সূদ, তবে বাহানা করে আদায় করা হয়।

[7] আবু দাউদ: ৩৪৬২।

[8] আবু দাউদ: ২৫০৩।