সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ২

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

দীন হলো কল্যাণ কামনা

সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা দান দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মূলত: দীন হলো পরস্পরের কল্যাণ কামনা। আর এটি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ব্যতীত অসম্ভব। কারণ সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করলে পরস্পর কল্যাণের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারে। আবার অসৎ কাজে বাধা দিলে ক্ষতি থেকে বিরত রাখা সহজ হয়। অতএব এটি দীনের অন্যতম মূলনীতি। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

«الدين النصيحة.قلنا لمن قال للله ولرسوله ولأئمة المسلمين وعامتهم».

দীন হলো মানুষের কল্যাণ কামনা। আমরা বললাম এটা কাদের জন্য? রাসূল বললেন, এটা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সকল মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণের জন্য।”

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ দীনের সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করে। মহান আল্লাহ যাবতীয় হালাল ও বৈধ বস্তুকে সৎকাজের নামান্তর এবং অবৈধ জিনিসকে অসৎ কাজ হিসেবে বারণ করার অধীন করেছেন। পূর্ববর্তী নবীগণ তাদের উম্মতের উপর কতক বৈধ জিনিসকে অবৈধ ঘোষণা করতেন। কুরআনে এসেছে-

﴿ فَبِظُلۡمٖ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ طَيِّبَٰتٍ أُحِلَّتۡ لَهُمۡ ﴾ [النساء: ١٦٠]

‘‘অতএব ইয়াহূদীদের যুলুমের কারণে তাদের উপর এমন কিছু জিনিস হারাম করে দিয়েছি যা তাদের জন্য হালাল ছিল।’’[1]

অথচ তাদের উপর এসব হারাম ছিল না। পবিত্র কুরআনে আরেকটি আয়াত এর সাক্ষ্য বহন করছে। আল্লাহ বলেন,

﴿ ۞كُلُّ ٱلطَّعَامِ كَانَ حِلّٗا لِّبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسۡرَٰٓءِيلُ عَلَىٰ نَفۡسِهِۦ ﴾ [ال عمران: ٩٣]

‘‘প্রত্যেকটি খাদ্য দ্রব্যই ইসরাইল বংশীয়দের জন্য হালাল ছিল, শুধু ঐ জিনিসটি ব্যতীত, যা ইসরাইল (ইয়াকুব) স্বয়ং নিজের উপর অবৈধ করে নিয়েছিল।”[2]

কোনো খারাপ জিনিস অবৈধ করা অসৎ কাজ হতে নিষেধ করারই অন্তর্গত। যেমনিভাবে পবিত্র জিনিসটা বৈধ করাও সৎ কাজে আদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। কেননা, উত্তম জিনিসকে অবৈধ করা, আল্লাহ যা করতে নিষেধ করেছেন তারই অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে সকল সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলের উন্নত চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধন করেছেন। আল্লাহ রাববুল আলামীন ইরশাদ করেন-

﴿ ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٣]

‘‘আমি আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামত সম্পন্ন করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন ইসলামকে একমাত্র দীন বা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।”[3]

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা অপরিহার্য

জাতিকে সৎকাজে আদেশ দান এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করা ওয়াজিব-ই- কিফাইয়াহ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ‘ইরশাদ করেছেন:

﴿ وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤ ﴾ [ال عمران: ١٠٤]

‘‘তোমাদের মধ্য হতে এমন একটি জাতি হওয়া উচিত যারা সকল ভাল তথা উত্তম বিষয়ের দিকে আহবান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে, আসলে তারাই হচ্ছে সফলকাম সম্প্রদায়।’’ (সূরা-আলে ইমরান:১০৪)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যখন, তাদের দ্বারা সৎকাজের আদেশ সংঘটিত হবে বলে সংবাদ দিয়েছেন, তখন প্রাপ্তবয়স্ক লোকগণের নিকট ঐ আদেশ ও নিষেধ যেন পৌঁছে এ ব্যবস্থা করতে হবে। অত:পর যদি তারা গাফলতি করে, তবে তারা এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

অনুরূপভাবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা নির্দিষ্ট করে প্রত্যেকের উপর বর্তাবে না; বরং পবিত্র কুরআনের প্রমাণ অনুসারে সেটা ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ।

জিহাদও ঠিক অনুরূপভাবে ওয়াজিব-ই-কিফায়াহ। অতএব সেটার দায়িত্বশীল যখন সেটা সম্পাদনে ব্রতী হবেন না, তখন সকল সামর্থ্য ব্যক্তিগণ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব পালন না করার দোষে সমভাবে দোষী হবেন। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবেই বুঝা গেল যে, প্রতিটি মানুষের উপরই তার শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব বর্তাবে। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে বলেছেন:

«من رأى منكم منكرا فليغره بيده فإن لم يستطع فبلسانه فإن لم يستطع فبقلبه وذلك أضعف الإيمان»

‘‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ একটি অসৎকাজ (হতে) দেখবে, সে যেন তাকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। তবে যদি সে ঐরূপ করতে অক্ষম হয়, তাহলে কথা দ্বারা যেন তাকে প্রতিহত করে, যদি এরপরও করতে অক্ষম হয়, তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তাকে ঘৃণা করে। আর সেটা হবে সবচাইতে দুর্বল ঈমান।’’(বুখারী: কিতাবুল ‘ইলম; মুসলিম: কিতাবুল ঈমান; আবু দাউদ; বা-বুল আমরি ওয়ান্নাহই; ইবনে মাযাহ: কিতাবুল ফিতান, বাবুল আমরি বিল মা’রূফি ওয়ান্নাহই আনিল মুনকার; আত-তিরমিযী: কিতাবুল রাইয়্যাত, আল-নাসায়ী: কিতাবুল ঈমান; আল-দারিমী: কিতাবুর রূইয়্যা; ইবনে হাম্বাল ২/৪)

যদি বিষয়টি ঐ রকমই হয়, তাহলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা, একটি বৃহত্তর সৎকাজ; যার জন্য আমরা আদিষ্ট হয়েছি। তার জন্যই বলা হয়েছে- তোমার আদেশ যেন সৎকাজের জন্য হয় এবং অসৎকাজে তোমার নিষেধ করাও যেন সৎ হয়।

যখন এটা সর্বোত্তম ওয়াজিব এবং পছন্দনীয় কাজ, সুতরাং এ ওয়াজিবসমূহ (অপরিহার্য) ও মুস্তাহাবগুলোর সুফল তাদের (প্রয়োগের কারণে) অপকারের চাইতে বেশী ভারি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু এটা সহকারেই রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছে এবং আসমানী গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা কখনও ফাসাদ বা অনাসৃষ্টি পছন্দ করেন না। উপরন্ত আল্লাহ যার আদেশ করবেন, তা উত্তমই হবে। আল্লাহ তা‘আলা সৎকাজ ও সৎকর্মীদের প্রশংসা করে বলেছেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ ٨٢ ﴾ [البقرة: ٨٢]

“আর যাঁরা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে।’’(সূরা আল বাকারা:৮২)

আবার ফাসাদ ও ফাসাদকারীদের কুৎসা করেছেন একাধিক স্থানে। অতএব যেখানে আদেশ ও নিষেধের উপকার হতে সেটার অপকারই মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে সেটা, আল্লাহ যে সকল বিষয়ে আদেশ করেছেন তার অন্তর্ভুক্ত হয় না। আর যদি ঐ রকম হয়ে যায়, তবে যেন ওয়াজিবই ছাড়া হয়ে গেল; আর নিষিদ্ধ কাজই করা হল। এরূপ ক্ষেত্রে মু’মিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর বান্দাহদের ব্যাপারে আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করা, তাদেরকে হিদায়াত করা তার দায়িত্ব নয়। এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার কথারই অর্থ বহন করে:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ عَلَيۡكُمۡ أَنفُسَكُمۡۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهۡتَدَيۡتُمۡۚ ﴾ [المائ‍دة: ١٠٥]

‘‘হে মু’মিনগণ! তোমরা যদি সৎপথের যাত্রী হয়েই থাক, তাহলে যারা পথ ভুলে গিয়েছে তারা তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না’’- (সূরা আল-মায়িদাহ: ১০৫)।

দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সৎপথের সন্ধানকারী পূর্ণতা লাভ করে থাকে। সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি যদি তার করণীয় কাজ কথা সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে থাকে, যেমন- অন্যান্য ওয়াজিব কাজগুলো আদায় করে থাকে, তবে পথভ্রষ্ট লোকদের পথভ্রাষ্টতা তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

অসৎকাজ হতে নিষেধ করা কখনও শক্তি দ্বারা হতে পারে, আবার কখনও বা রসনার দ্বারা, আবার কখনও শুধু অন্তরের ঘৃণা দ্বারাই হয়ে থাকে। অন্তর দ্বারা সেটা করা সর্বাবস্থায়ই ওয়াজিব হবে। যেহেতু সেটা করতে কোনই ক্ষতি নেই। যে ব্যক্তি এতটুকু ঘৃণাও পোষণ করে না সে আসলে মু’মিনই নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী হতে এরূপই বুঝা যায়। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: وذلك أضعف الإيمان ‘‘আর সেটা হল সবচাইতে দুর্বল ঈমান।’’

সৎকাজে আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার ক্ষেত্রে শর্তাবলী

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ বলেন,

  1. তার কাজ সুষ্ঠু হবে না যদি না সেটা পরিমিত শিক্ষা ও তীক্ষ্মজ্ঞানভিত্তিক হয়।

যেমন- উমার ইবন আবদুল আযীয (রহ.) বলেছেন-

‘যে ব্যক্তি বিনা বিদ্যায় আল্লাহর ইবাদত করে, সে যতটুকু ভাল করে, তার চাইতে খারাপই বেশি করে।’’

যেমন- মু‘আয ইবন জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসে আছে:

‘‘কাজ করার আগে প্রয়োজন জ্ঞান; কাজের স্থান হল বিদ্যার্জনের পর।’’ এটা তো একেবারেই স্পষ্ট। কেননা ইচ্ছা করা ও কর্ম সম্পাদন করা যদি জ্ঞানের আলোকেই না হয়, তাহলে সেটাই মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা, সর্বোপরি প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং সৎ ও অসৎকাজ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা ও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার মত উপযুক্ত শিক্ষা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন এবং যাকে কোন বিষয়ে আদেশ করা হবে বা কোন কাজ হতে নিষেধ করা হবে, তার অবস্থা সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।

  • উত্তমভাবে আদেশ বা নিষেধ করা। যেমন, সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সরলপথ অনুযায়ী হয়। আসলে সিরাতাল মুস্তাকীম হল-উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে অতি দ্রুত পৌঁছাবার মত সংক্ষিপ্ত তথা নিকটতম পথ।
  • সুনম্র ব্যবহার ঐ কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‘‘যে বিষয়েই নম্রতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই সুশোভিত করেছে, আবার যে বিষয়েই খানিকটা কঠোরতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই অশোভিত করেছে- দৃষ্টিকটু করে ফেলেছে’’- (মুসলিম: হা: নং- ২৫৯৪)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন-

নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়াশীল, প্রত্যেকটি বিষয়েই নম্র ব্যবহার তিনি পছন্দ করেন, নম্রতাপূর্ণ ব্যবহারের ফলে তিনি যা দান করেন কঠোরতার কারণে তা দেন না।’’

(বুখারী: ১২/২৮০, ফাতহুল বারী আলা শারহিল বুখারী, কিতাবুল ইসতিহাবাহ; মুসলিম: কিতাবুসসিয়ার, ৮/২২; আবু দাউদ, কিতাবুল আমওয়াল, ৫/১৫৫; আত-তিরমিযী: ৫/৬০, হা: নং-১৭০১; ইবনে মাজাহ: ২/১২১৬, কিতাবুল আদব-বাবুন ফিররিফক; আল-দারিমী: ২/৩২৩; ইববে হাম্বল: ১/১১২)

  1. আদেশ দানকারী বা নিষেধকারীকে অবশ্যই কষ্টে সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হতে হবে। কেননা, এ কথা সত্য যে, তার উপর বিপদ আসবেই। এমন সময় যদি সে ধৈর্য ধারণই না করে, সহ্যই না করে, তাহলে সে যা ভাল করতে পারত তার চাইতে নষ্টই করে বসবে বেশি। যেমন- লুকমান হাকীম তদীয় তনয়কে উপদেশ দানকালে বলেছিলেন:

﴿ وَأۡمُرۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱنۡهَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَآ أَصَابَكَۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ١٧ ﴾ [لقمان: ١٧]

‘‘এবং (হে বৎস)! সৎকাজ আদেশ দান কর এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ কর, (এ কাজ করতে যেয়ে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হবে তাতে ধৈর্য অবলম্বন কর, নি:সন্দেহে সেটা একটি মহৎ কাজ।’’ (সূরা লুকমান:১৭)

এজন্যই আল্লাহ তা‘আলার রাসূলগণ, অথচ তাঁরা সৎকাজে আদেশ দানকারী ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারীদের নেতা, তাদেরকেও ধৈর্য অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। যেমন- তিনি সর্বশেষ রাসূল (স.) কে বলেছেন। আসলে সেটা (ধৈর্য) রিসালাতের দায়িত্ব তাবলীগের সাথেই জড়িত। কেননা সর্বপ্রথম যখন তাঁকে (সা) রাসূল হিসেবে গণ্য করা হল, তখনই সূরা ‘ইকরা’ নাযিল হবার পর (যার মাধ্যমে তাঁকে নাবী বলে সংবাদ দেয়া হয়েছে) আল্লাহ তাঁকে আদরভরে সম্বোধন করে বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ ١ قُمۡ فَأَنذِرۡ ٢ وَرَبَّكَ فَكَبِّرۡ ٣ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ ٤ وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ ٥ وَلَا تَمۡنُن تَسۡتَكۡثِرُ ٦ وَلِرَبِّكَ فَٱصۡبِرۡ ٧ ﴾ [المدثر: ١، ٧]

‘‘হে চাদর আচ্ছাদনকারী! উঠুন এবং ভয় প্রদর্শন করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন, আপনার বেশভূষা পবিত্র করুন, অপবিত্রতা (মূর্তি) পরিত্যাগ করুন, আর কাউকেও এ উদ্দেশে দান করবেন না যে, অতিরিক্ত বিনিময় প্রত্যাশা করেন এবং আপনার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির উদ্দেশেই ধৈর্য অবলম্বন করুন।’’ (সুরা আল-মুদ্দাসসির:১-৭)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে সৃষ্টি জগতে প্রেরণের এ আয়াতগুলো ভীতি প্রদর্শনমূলক বিষয় দ্বারাই শুরু তথা সূচনা করেছেন এবং ধৈর্য ধারনের আদেশ দানের মাধ্যমে শেষ করেছেন। মুলত শাস্তির ভয় প্রদর্শনই হল সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা।

অতএব জানা হয়ে গেল যে, ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব, তথা অপরিহার্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ لِحُكۡمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعۡيُنِنَاۖ ٤٨ ﴾ [الطور: ٤٨]

‘‘এবং আপনার প্রতিপালকের এ ব্যবস্থার উপর (ফায়সালার অপেক্ষায়) ধৈর্য অবলম্বন করুন, নিঃসন্দেহে আপনি আমাদেরই দৃষ্টিতে আছেন।’’(সূরা আত-তুর:৪৮)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা অন্যত্র আরও বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَٱهۡجُرۡهُمۡ هَجۡرٗا جَمِيلٗا ١٠ ﴾ [المزمل: ١٠]

‘‘তাদের কথায় (বিচলিত না হয়ে বরং) ধৈর্য অবলম্বন করুন এবং তাদেরকে নির্দ্বিধায় পরিত্যাগ করুন।’’ (সূরা আল-মুযযাম্মিল:১০)

অন্য আয়াতে এ প্রসঙ্গে আল্লা তা‘আলা আরও বলেছেন:

﴿ فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ ٣٥ ﴾ [الاحقاف: ٣٥]

‘‘দৃঢ় সংকল্পচিত্ত রাসূলগণের মতই আপনিও ধৈর্য ধারণ করুন।’’ (সূরা- আল-আহকাফ:৩৫)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আরও বলেছেন:

﴿ فَٱصۡبِرۡ لِحُكۡمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ ٱلۡحُوتِ ٤٨ ﴾ [القلم: ٤٨]

‘‘আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করুন এবং (খবরদার) মাছের কাহিনীর সে লোক (ইউনুস) আলাইহিস সালাম এর মতো অধৈর্য হবেন না।’’ ( সূরা আল-কালাম:৪৮)

ধৈর্য সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র আরও বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ وَمَا صَبۡرُكَ إِلَّا بِٱللَّهِۚ ١٢٧ ﴾ [النحل: ١٢٧]

ধৈর্য অবলম্ব করতে থাকুন, আসলে আপনার ধৈর্য ধারণ তো একমাত্র আল্লাহরই জন্য ছাড়া নয়।’’ (সূরা আন-নাহল:১২৭)

আবার আর এক স্থানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱصۡبِرۡ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١١٥ ﴾ [هود: ١١٥]

‘‘আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, কেননা আল্লাহ তা‘আলা নিষ্ঠাবানদের কর্মফল বিলীন অর্থাৎ- নষ্ট করেন না।’’ (সূরা হূদ:১১৫)

সুতরাং শিক্ষা, নম্রতা ও ধৈর্য-এ তিনটি বিষয় ছাড়া কোন ক্রমেই চলবে না। আদেশ করা বা নিষেধ করার পূর্বেই জ্ঞানের দরকার এবং সে সঙ্গে নম্রতা, আর এটার পরেই প্রয়োজন ধৈর্যের। যদিও এ ত্রিবিধ বিষয়গুলোই সর্বাবস্থাতেই একই সঙ্গে পাওয়া যেতে হবে।

যেমন- সালফে সালিহীনদের কোনো একজনের উক্তি বর্ণনাকারী পরস্পরায় কাজী আবূ ইয়ালা ‘‘আল-মু‘তামাদ’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

لايأمرهم با لمعروف ولا ينهى عن المنكر إلا من كان فقيها فيما يأمرهم به فقيها فيما ينهى عنه رفيقا فيما يأمربه رفيقا فيما ينهى عنه حليما فيما يأمربه حليمافيما ينهى عنه.

‘‘যিনি সৎকাজে আদেশ করবেন ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করবেন, তিনি যদি ঐ বিষয়ে সুবিজ্ঞ আলিম তথা ফকীহ না হন, তাহলে তিনি তা করতে পারেন না। অনুরূপ তিনি যে বিষয়ে আদেশ দিবেন, সে বিষয়ে নম্র হবেন এবং যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও নম্র হবেন এবং যে বিষয়ে আদেশ দিবেন সে বিষয়ে তাকে সহিষ্ণু হতে হবে, আবার যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও তাকে সহিষ্ণু হতে হবে।’’ তা না হলে তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে পারবেন না। সে যেন এটাও জেনে রাখে যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার কতগুলো পদ্ধতি তথা নীতি আছে, যার জটিলতা অনেকের উপরই এনে ফেলে। তখন সে ধারণা করে যে, ঐ সকল জটিলতার কারণে সেটা হতে বাদ পড়ে যাবে। ফলে সে এ কাজই ছেড়ে দেয়। সেটা এমন বিষয়সমূহের অন্তর্গত যে, এ পদ্ধতিগুলো না পাওয়া গেলে তার মূল বিষয়টিকে (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ) ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কেননা অবশ্য করণীয় কাজটি না করাও পাপ। আবার আল্লাহ তা‘আলা যা করতে নিষেধ করেছেন সেটা করাও পাপ।

সুতরাং এক পাপ হতে অন্য পাপে জড়িয়ে পড়ার উদাহরণ হল, একটি বাতিল দীন হতে সরে অন্য আর একটি বাতিল দীন গ্রহণ করা। এমন হওয়াও সম্ভব যে, প্রথমটির চাইতে দ্বিতীয়টি বেশী মাত্রায় খারাপ, আবার এটার মাত্রা একটু কমও হতে পারে। হয়তো বা দু’টি দীনই খারাপ হিসেবে সমান। সৎকাজে আদেশদানকারী ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারী যাদের মধ্যে ত্রুটি পাওয়া যাবে, অর্থাৎ ভালরূপে দায়িত্ব পালন করতে পারে নি অথবা তাতে সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদের কাউকে পাবে যে, এই জনের দোষ সাংঘাতিক বড়, ঐ জনের পাপ সাংঘাতিক ধরনের বড়, আবার হয়তো বা উভয়েই পাপে বরাবর বা একই শ্রেণীভুক্ত।


[1] সূরা আন নিসা: ১৬০।

[2]সূরা আলে ইমরান: ৯৩।

[3]সুরা আল মায়িদাহ:৩।