সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পর্বঃ ৪

সৎ কাজের আদেশঅসৎ কাজের নিষেধ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪

পুর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা পাই যে, আমাদের নাফসএর বিবধিঃ

এ ত্রিবিধ বণ্টনটা হল যেমন কথিত আছে নাফসসমূহ (আত্মা) তিনটি:

  • নাফস আম্মারাহ: যা খারাপ কাজে উদ্ধুদ্ধ করে।
  • লাওয়ামাহ : যা বেশি বেশি ভৎর্সনা করে।
  • মুতমাইন্নাহ: যা ভাল কাজে তৃপ্ত থাকে

তন্মধ্যে প্রথম শ্রেণীর লোক তারা যারা নাফসে আম্মারার অধিকারী, যারা কু-কাজের জন্য বেশি আদেশ দিয়ে থাকে। আর মধ্যম দল তারা, যারা নাফসে মুতমাইন্নার অধিকারী, যাকে সম্বোধন করে (কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষ হতে) বলা হবে-

 

﴿ يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧ ٱرۡجِعِيٓ إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةٗ مَّرۡضِيَّةٗ ٢٨ فَٱدۡخُلِي فِي عِبَٰدِي ٢٩ وَٱدۡخُلِي جَنَّتِي ٣٠ ﴾ [الفجر: ٢٧، ٣٠]

‘‘হে নাফসে মুতমাইন্নাহ (অর্থা- শান্তিময় আত্মা) তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে চল এভাবে যে, তুমি তার প্রতি সন্তুষ্ট্ এবং তিনিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। অনন্তর তুমি আমার বিশিষ্ট বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’’ (সূরা আল ফাজর:২৭-৩০)

আর ঐ সকল লোক হল বেশি ভৎর্সনাকারী আত্মার অধিকারী যারা পাপকাজ করে এবং তজ্জন্য আবার নিজেদের ভৎর্সনাও করে এবং রং-বেরং ধারণ করে। কখনও এরূপ, আবার কখনও বা সেরূপ এবং ভাল কাজসমূহের সাথে খারাপ কাজ মিলিয়ে ফেলে।

আর এজন্যই যখন মানুষ আবু বকর (রা.) ও ঊমার (রা.) এর যুগে ছিল-তাঁরা দু’জন তো এমন ছিলেন যে, তাঁদের আনুগত্য তথা অনুসরণ করার জন্য মুসলিমগণকে আদেশ দেয়া হয়েছিল। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘‘হে লোক সকল! আমার (অব্যবহিত) পরেই যে দু’জন আসবেন- আবু বকর ও উমর- তাদের অনুসরণ করো।’’ (আবু-দাউদ: ৫/১৩: কিতাবুস সুন্নাহ বাবু-ফি লুজুমিস সুন্নাহ; আন-নাসায়ী: ৫-৪৪, হা: নং- ২৬৭৬, কিতাবুল ইলম, বাবু-মাযায়া ফি আল-আখজি বিসসুন্নাহ; ইবনে মাজাহ: ১/১৫, আল-মুকাদ্দিমাহ, বাব-ইত্তিবা-ই- সুন্নাতিল খুলাফা-ইর- রাশিদীন; আল- দারিমী: ১/৪৪, আল-মুকাদ্দিমাহ বাবু ইত্তিবা-ইস সুন্নাহ; ইবনে হাম্মাল: ৪/১২৬-১২৭)

যখন মানুষ রিসালাত (নাবুওয়াতের)-এর অতি নিকটতম যুগে ছিল, ঈমান ও সততার দিক হতে ছিল সুমহান, তখন তাদের নেতৃবর্গও ছিলেন দায়িত্ব পালনে অত্যধিক তৎপর এবং শান্তিময়তার ক্ষেত্রে ছিলেন বেশি স্থির। তখন ফিতনাহ-ফাসাদ ঘটে নি। ঐ সময় তারা মধ্যবর্তী দলের মধ্যে বিবেচিত হতেন।

যখন মানুষ উসমান (রা.)-এর খিলাফাতের শেষ পর্যায়ে ও আলী (রা.) এর খিলাফাতের সময় ছিল তখন তৃতীয় শ্রেণীর লোক সংখ্যা বর্ধিত হয়ে গিয়েছিল, ঐ সময় মানুষের মধ্যে দীন ও ঈমান থাকা সত্ত্বেও আকাঙ্খা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা কতিপয় প্রাদেশিক গভর্ণর ও কিছু সংখ্যক প্রজা সাধারণের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর সেটা ক্রমান্বয়ে (আরও বেড়ে) বেশি হয়ে পড়েছিল।

এভাবেই ফিতনার সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণ, শাসক (গভর্নর) ও প্রজা উভয় পক্ষেরই তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও আনুগত্য অবলম্বন না করা, শাসক ও প্রজা উভয় শ্রেণির মধ্যেই এক প্রকারের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও গুনাহের প্রতি আকর্ষণের সংমিশ্রণ ঘটা, আর উভয় পক্ষই ছিল মনগড়া ব্যাখার আশ্রয়গ্রহণকারী যে সে সৎ কাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে থাকে এবং সে সত্য ও ন্যায়নীতির সাথে আছে বলে দাবী করা। অথচ এরূপ মনগড়া ব্যাখ্যার সাথে এক প্রকারের প্রবৃত্তি অনুসরণের মনোবৃত্তিও রয়েছে। আর এর মধ্যে রয়েছে একটু কিছু সন্দেহ এবং মন যা চায় তারই আকাঙ্খা পোষণ। যদিও দু‘পক্ষের একপক্ষ সত্যের (খিলাফাতের) জন্য অধিকযোগ্য ছিল।

অতএব বিশ্বাসী ব্যক্তির উচিত হল, সে যেন আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তার অন্তরকে ঈমান ও আল্লাহভীতি দ্বারা আবাদ করে, অন্তরকে বক্র না করে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও হিদায়াতের উপর স্থির রাখে এবং সে যেন প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, এ সকল বিষয়ে আল্লাহরই উপর পূর্ণ আস্থা রাখে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

﴿ فَلِذَٰلِكَ فَٱدۡعُۖ وَٱسۡتَقِمۡ كَمَآ أُمِرۡتَۖ وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَهُمۡۖ وَقُلۡ ءَامَنتُ بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ مِن كِتَٰبٖۖ وَأُمِرۡتُ لِأَعۡدِلَ بَيۡنَكُمُۖ ٱللَّهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمۡۖ لَنَآ أَعۡمَٰلُنَا وَلَكُمۡ أَعۡمَٰلُكُمۡۖ لَا حُجَّةَ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُۖ ٱللَّهُ يَجۡمَعُ بَيۡنَنَاۖ وَإِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ ١٥ ﴾ [الشورا: ١٥]

‘‘অতএব আপনি সেদিকেই ডাকতে থাকুন এবং আপনাকে যেরূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে(তাতে) দৃঢ় থাকুন আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, আর বলে দিন আল্লাহ যত কিতাব নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান আনছি আর আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, তোমাদের মধ্যে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠিত রাখি, আল্লাহ আমাদেরও মালিক এবং তোমাদেরও মালিক।’’ (সূরা আশ-শূরা ৪২:১৫)

এটাই হল জাতির অবস্থা ঐ সকল বিষয়ে, যাতে সে বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং কথাবার্তা ও ইবাদাতে মতবিরোধ করেছে। এগুলো এমন সব বিষয়ের আওতাভুক্ত যার ফলে মু’মিনদের উপর বিপদাপদ প্রকট হয়ে আসে। সুতরাং তারা দুটি জিনিসের মুখাপেক্ষী:

নিজেদের থেকে দুনিয়া ও ধর্মীয় ফিতনা, যদ্বারা তাদের অনুরূপ লোকজন (পূর্বেও) পরীক্ষিত হয়েছিল, সেটার কারণ থাকা সত্বেও তা প্রতিহত করা। কেননা তাদের সাথেও রয়েছে নাফসসমূহ ও শয়তান, যেমন রয়েছে অন্যদের সাথেও। … অনেক এমন লোক আছে যে সে অন্যকে করতে না দেখা পর্যন্ত কোনও ভাল কাজ বা খারাপ কাজ করে না, তারপর অপরের দেখাদেখি সেটা করে বসে।

আর এজন্যই কোন ভাল বা মন্দ কাজের সূচনাকারী ( তার) অনুকরণকারীদের সকলের সমান পূর্ণ বা পাপের অধিকারী হবে। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-

«مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً، فَلَهُ أَجْرُهَا، وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً، كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ»

‘‘যে ব্যক্তি কোনও সুন্দর আদর্শের প্রচলণ করবে সে সেটার প্রতিফল (সাওয়াব) তো পাবেই তদুপরি কিয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসরণে আমল করবে তাদের সকলের সম্মিলিত ‘আমলের সাওয়াবও ঐ প্রচলনকারী পাবে(অথচ) ঐ সকল অনুসরণকারীদের সাওয়াবে কোনরূপ ঘাটতি হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোন খারাপ আদর্শের প্রচলন করবে সে সেটার ফলে পাপী তো হবেই তদুপরি কিয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসরণে আমল করবে তাদের সকলের সম্মিলিত পাপরাশির পরিমাণ পাপের দায়ীও সে ব্যক্তি হবে, (অথচ) ঐ সকল অনুসরণকারীদের পাপে এতটুকুও ঘাটতি হবে না। (মুসলিম: কিতাবুল ‘ইলম: ৮/৬১, কিতাবুল যাকাত: ৩/৮৭, আন- নাসায়ী: ৫/৭৮; ইবনে হাম্বল: ৪/৩৫৭-৩৫৯)

যেহেতু তারা মৌলিক বিষয়ে শরীক হয়েছে এ কারণে। আর যেহেতু কোন জিনিসের জন্য সেটার সমতূল্য জিনিসের ব্যাপারে গৃহীত সিদ্ধান্তই প্রযোজ্য। কোন জিনিসের অনুরূপ বস্ত্ত তারই দিকে আকর্ষিত হয়ে থাকে। সুতরাং যখন এ আহবানকারীদ্বয় শক্তিশালী হবে, তখন যদি আরও দু’জন আহবানকারী এসে তাদের সাথে মিলিত হয়ে সংগঠিত হয়, তবে এ অবস্থায় বিষয়টি কেমন দাঁড়াবে?

অসৎকাজের লোকেরা তাদের অনুসারীদের ভালবাসে

আর সেটা হল এই যে, খারাপ কাজের অনেক লোক তাদেরকেই ভালবাসে, যারা তাদের এ অবস্থায় থাকাকে গ্রহণ করে নিয়েছে, আর যারা তাদেরকে গ্রহণ করতে পারে নি তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। এ অবস্থা বাতিল ধর্মগুলোর মধ্যে (দিবালোকের মত) প্রকাশিত। প্রত্যেক জাতির (সম্প্রদায়ের) বন্ধুত্ব তাদের সমমনাদের সাথে, আর যারা তাদের সমমনা নয় তাদের সাথে রয়েছে শত্রুতা। এরূপ অবস্থাই রয়েছে পার্থিব ও প্রবৃত্তির অভ্যাসের বিষয়গুলোতেও। ঐসব অসৎ লোকগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পছন্দ ও প্রবৃত্তির চাহিদায় অংশগ্রহণ করবে। হয়ত: ঐ বিষয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করবে, যেমনটি হয়ে থাকে রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হর্তা-কর্তাগণ ও ডাকাত-ছিনতাইকারী বা অনুরূপপদের বেলায়। অথবা একাত্মতার মাধ্যমে আস্বাদন গ্রহণের নিমিত্তে।

যেমন- মদপানের জন্য জমায়েত হওয়া লোকদের বেলায় প্রযোজ্য আর তারা এটাই পছন্দ করবে যে, তাদের নিকটে যারা উপস্থিত হয়েছে তারা সকলেই যেন মদপান করে। হয়তো তার একাকী শালীনতা তথা ভাল থাকাটি তাদের নিকট ঘৃণার কারণে, সেটা তার হিংসার জন্য, অথবা সে একা ভাল থাকা ব্যক্তি যেন সমাজে তাদের চাইতে উচ্চ স্থান পেতে না পারে সেজন্য এবং তাদেরকে বাদ দিয়ে লোকেরা যে তারই প্রশংসা করবে অথবা ঐ একাকী ভাল থাকা ব্যক্তির যেন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবার মত কোন যুক্তি প্রমাণ আর না থাকে অথবা সে নিজে তাদেরকে কোন শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে এ ভয়ে, অথবা সে ঐ বিষয়টি কারও কাছে তুলে ধরলে সে তাদেরকে শাস্তি দিবে এ ভয়ে, অথবা তারা এ ভাল থাকা লোকটির অনুগ্রহের পাত্র না হয়ে বা তার ভয়ের নীচে তাদের থাকতে না হয় এরূপ অন্যবিধ আরও কারণে তারা সকলেই তাকে এ পথে চলার সাথী করতে চায়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَدَّ كَثِيرٞ مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ لَوۡ يَرُدُّونَكُم مِّنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِكُمۡ كُفَّارًا حَسَدٗا مِّنۡ عِندِ أَنفُسِهِم مِّنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ ٱلۡحَقُّۖ فَٱعۡفُواْ وَٱصۡفَحُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦٓۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ١٠٩ ﴾ [البقرة: ١٠٩]

‘‘কিতাবীদের মধ্য হতে অনেকেই একান্ত মনে চায় তোমাদের ঈমান আনার পর আবার তোমাদেরকে কাফির করে ফেলে, শুধু তাদের অন্তর্নিহিত হিংসার দরুন, তাদের নিকট সত্য উদ্ভাসিত হবার পর।’’ (সূরা আল-বাকারাহ :১০৯)

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন:

﴿ وَدُّواْ لَوۡ تَكۡفُرُونَ كَمَا كَفَرُواْ فَتَكُونُونَ سَوَآءٗۖ ٨٩ ﴾ [النساء: ٨٩]

‘‘তারা এ আশা করে যে, যেমন তারা কাফির তদ্রুপ তোমরাও কাফির হয়ে যাও, যাতে তারা ও তোমরা একরূপ সমান হয়ে যাও।’’ (সূরা আন-নিসা:৮১)

উসমান ইবন আফফান (রা.) বলেছেন:

‘‘ব্যভিচারিণী একান্ত মনে চায়, হায় স্ত্রীলোক সকলেই যদি ব্যভিচার করত!’’

আর এ অংশগ্রহণ কখনও কখনও একই পাপকার্যে হয়, যেমন মদপানে অংশগ্রহণ, মিথ্যা বলা, খারাপ বিশ্বাসে অংশগ্রহণ ইত্যাদি। আবার কখনও বা পছন্দ করে যে, অংশগ্রহণটি যেন খারাপ কাজের কোন এক শ্রেণীতে হয় যেমন- ব্যভিচারী, সে চায় যে, অন্য সকলেও যেন ব্যভিচার করে। আর চোর চায় যে, অন্যরাও যেন চুরিই করে কিন্তু শুধু সে যার সাথে ব্যভিচার করেছে তাকে ছাড়া এবং যা চুরি করেছে তা সব ছাড়া যেন হয়।

আর দ্বিতীয় কারণটি হল: তারা ঐ ব্যক্তিকে যে পাপ কাজে লিপ্ত আছে সে পাপ কাজে শরীক হতে আদেশ করে থাকে, যদি তাদের সাথে শরীক হয় তো ভাল, অন্যথায় তার সাথে শত্রুতা করবে এবং এমন কষ্ট দিবে যে, সেটা শক্তি প্রয়োগের স্তরে পৌঁছায় বা পৌছায়ও না।

অত:পর ঐ সকল লোক তাদের অশ্লীল কাজে অন্যের যোগদান করা পছন্দ করে অথবা তাকে উক্ত খারাপ কাজ করতে আদেশ করে এবং তারা যা করতে চায় তজ্জন্য তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এভাবে (তাকে রাজী বা বাধ্য করার পর ) যখন সে তাদের সাথে শরীক হল বা তাদেরকে সহযোগিতা করল বা তাদের আনুগত্য করল তখনই তারা তাকে ত্রুটিপূর্ণ, খাটো বা নিম্নশ্রেণীর মনে করল ও তাকে হালকা জ্ঞান করল এবং ঐ অংশগ্রহণ করাটাকেই তার বিরুদ্ধে (অন্যান্য ব্যাপারে) প্রমাণ হিসেবে খাড়া করল। পক্ষান্তরে যদি সে তাদের সাথে শরীক না হত তাহলে তারা তার শত্রুতা করত ও তাকে কষ্ট দিত। আর এই তো হল অধিকাংশ ক্ষমতাশীল যালিমদের অবস্থা।

এ যা কিছু অসৎকাজের মধ্যে বিদ্যমান সেটার সমতুল্য অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে সৎকাজে বরং সেটা হতেও প্রবল। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ﴾ [البقرة: ١٦٥]

‘‘আর যারা মু’মিন তাদের ভালবাসা আল্লাহর সঙ্গেই সুদৃঢ় রয়েছে।’’(সূরা আল-বাকারাহ:১৬৫)

কেননা পূণ্য কাজের আহবায়ক স্বভাবতই অধিকতর শক্তিশালী। যেহেতু মানব তাতে আহবায়ক, সে ঈমান ও ইলম, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা এবং আমানত আদায়ের দিকেই আহবান করবে। যদি সে অন্য কাউকেও তারই অনুরূপ করতে পেরে ফেলে, তাহলে সে সেটার জন্য দ্বিতীয় আরও একজন আহবায়ক হয়ে গেল, বিশেষ করে সে যদি তার সমতুল্য হয়ে থাকে। আর যদি প্রতিযোগিতার সাথে হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। আসলে এটাই হল সুন্দর ও প্রশংসিত বিষয়।

মু’মিনদের মধ্য হতে এমন কাউকেও যদি পাওয়া যায় যিনি তার সাথে একাত্ম হবেন এবং উক্ত (ভাল) কাজের শরীকদেরকে পছন্দ করবেন এবং যদি সে সেটা না করে, তাহলে তাকে ঘৃণা করবেন, তিনি তখন তৃতীয় আর একজন আহবায়ক হয়ে যাবেন।

আর যদি তারা তাকে ঐ কাজ করতে আদেশ দেয়, সেটা করতে সহযোগিতা করে, সেটা না করার ফলে তার সাথে তার শত্রুতা করে এবং তাকে শাস্তি দেয় সে তখন তার জন্য চতুর্থ আহবায়ক হবে। তাকে এখন তার শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী এ চার প্রকার আহবায়ক সকলে একত্রিতভাবে অন্যকে সংশোধন করতেও আদেশ দেয়া হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেছেন:

﴿ وَٱلۡعَصۡرِ ١ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَفِي خُسۡرٍ ٢ إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾ [العصر: ١، ٣]

‘‘যুগের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে কিন্তু যারা ঈমান আনে এবং যারা নেক কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের প্রতি উপদেশ দিতে থাকে, এবং একে অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দিতে থাকে’’ (সূরা আল-আসর:১-৩)

ইমাম শাফিঈ (রহ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন-‘‘হায়, যদি সকল মানুষ (শুধু) সূরা আল-আসরের বিষয়বস্তুর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করত তবে সেটাই তাদের মঙ্গল বিধানে যথেষ্ট হত।’’ বিষয়টি আসলে তিনি যেমন বলেছেন তেমনই। কেননা আল্লাহ উক্ত সূরায় সংবাদ দিয়েছেন যে, সমস্ত মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত, শুধু যে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও বিশ্বাসী এবং অন্যের সাথে (সামাজিকভাবে) সত্যের দিকে উপদেশ দানকারী, ধৈর্যের জন্য উপদেশ দানকারী (সে ক্ষতিগ্রস্ত নয়)।

 

সমাপ্ত