আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ-১

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩

লেখক: ড. মোঃ আবদুল কাদের |||| সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানব জাতির কল্যাণের আঁধার। মানুষের সঠিক পথের দিশা দিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ হলো আল-কুরআন। এটি সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতির আবর্তে মানুষের কল্যাণ সাধনের নিমিত্তে গাইড বুক হিসেবে নাযিল হয়েছে। এতে মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের সমস্যা ও তার সমাধানের বর্ণনা বিবৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
কিতাব (কুরআনে) কোন কিছুই আমি বাদ দেইনি।’’

সূরা আল-আন‘আম: ৩৮। অন্যত্র আরো ষ্পষ্ট করে বলা হয়েছে:

وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ

‘‘ আমি আত্মসম্পর্ণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ পথ নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম। (সূরা আন-নাহল: ৮৯)।

মানুষ আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে এক অনন্য ও অসাধারণ সৃষ্টি। বুদ্ধিবৃত্তিক ও জীবকে দেয়া হয়েছে ভাল ও মন্দের মাঝে পার্থক্য সুচিত করার এক অসুপম ক্ষমতা। মানুষই একমাত্র সৃষ্টিজীব যাদের রয়েছে বিবেক ও বোধশক্তি। এ বিবেকই তাদের চালিকাশক্তি এবং আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণের অনুসন্ধানী। ফলে মানুষকে তিনি আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীবরূপে ঘোষণা দিয়েছেন। সূরা বনী ইসরাইল:৭০
এ পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, তার সবই মানুষের কল্যাণের জন্য। মহান আল্লাহ আপন কৃপায় সেসব সৃষ্টিজীবকে মানুষের অনুগত ও বশ্য করে দিয়েছেন। যদিও তারা আকার-আকৃতিতে, শক্তি ও দেহাবয়বের দিক থেকে মানুষের চেয়ে অনেক বড়। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন:

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ
‘‘তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে তৎসমূদয়কে।’’ সুরা আল-হাজ্ব: ৬৫

মানুষের সৃষ্টি মূলে যে মহান আল্লাহর একক ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র, সেই মহান আল্লাহ দু’ধরনের উপাদান দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

আব্দুর রহমান আননাহলাভী, উসূলুত তারিবিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আসালিবুহা, দামেশক, দারুল ফিকর, ১৯৭৯ খ্রী. পৃ. ৩০

  • প্রথমত: মাটি থেকে, অত:পর তাতে রূহ প্রবেশ করিয়েছেন যেমন: হযরত (আ.) এর সৃষ্টি। কুরআনে এসেছে:

 

الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِنْ طِينٍ – ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ مَاءٍ مَهِينٍ
‘‘যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন উত্তমরূপে এবং কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অত:পর তিনি তার বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে। পরে তিনি তাকে করেছেন সুঠাম এবং তাতে ফুঁকিয়ে দিয়েছেন তাঁর রূহ হতে এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্ত:করণ, তোমরা অতি সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’’ সূরা আস-সাজদা: ৭-৮

অন্যত্র সরাসরি পৃথিবীতে মানব আদম(আ.) এর সৃষ্টি সম্পর্কে তিনি বলেন:

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ – فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ
‘‘স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেস্তাদেরকে বললেন, আমি গন্ধযুক্ত কর্দমের শুস্ক ঠনঠনা মৃত্তিকা হতে মানুষ সৃষ্টি করেছি, যখন আমি তাকে সুমাঠ করব এবং তাতে আমার পক্ষ হতে রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হইও।’’ সূরা আল-হিজর: ২৮-২৯

 

  • দ্বিতীয়ত: বীর্ষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ – ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ – ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে, অত:পর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি ‘আলাক-এ, অত:পর ‘আলাককে পরিণত করি পিন্ডে এবং পিন্ডকে পরিণত করি অস্থি-পাঞ্জরে অত:পর অস্থি পাঞ্জরকে ঢেকে দেই গোশত দ্বারা; অবশেষে তাতে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান।’’ সূরা আল-মু‘মিনুন:১২-১৪

অন্যত্র সৃষ্টি সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে:

يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ذَلِكُمُ اللهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ
‘‘তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃ-গর্ভের ত্রিবিধ অন্ধকারে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আললাহ; তোমাদের প্রতিপালক; সর্বময় কর্তৃত্ব তারই; তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তবে তোমরা মৃখ ফিরিয়ে কোথায় চলছ?’’ সূরা আয-যুমার: ৬

মূলত: মানুষকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর তা থেকে তার সঙ্গীর সৃষ্টি হয়েছে। অত:পর তাদের উভয়ের মাধ্যমে অসংখ্য নারী-পুরুষের বিস্তৃতি লাভ করেছে। মহান আল্লাহ সূরা নিসার শুরুতে ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে:

يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
‘‘হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তা হতে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন। যিনি তাদের দুইজন হতে বহু নব-নারী ছড়িয়ে দেন।’’ সূরা আন-নিসা: ১

মানুষ সৃষ্টি করে মহনা আল্লাহ ক্লান্ত হননি বরং তাদের দিয়েছেন ভাল ও মন্দের মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতা, মুক্ত ও স্বাধীনভাবে জমীনে বিচরণের অধিকার, চিন্তার স্বাধীনতা প্রভৃতি। তিনি বলেন:

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا – فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا – قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا – وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
‘‘শপথ মানুষের এবং তার, যিনি তাকে সুঠাম করিয়েছেন, অত:পর তাকে তার অসৎকর্ম এবং অসৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে-ই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।’’ সূরা আশ-শামস: ৭-১০

প্রকৃতপক্ষে মানুষের শ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার মূলে যে বৈশিষ্ট্যটি খুবই গুরুত্বের দাবীদার তা হলো জ্ঞান। তিনি মানুষকে জ্ঞানের ভান্ডার দান করেছেন, শুধু তাই নয়, এ জ্ঞানের দ্বারাই মানুষ ফিরিশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এ মর্মে তিনি ইশরাদ করেন:

اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ- الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
‘‘পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’’ সুরা আল-আলাক: ৩-৫

সূরা আল-বাকারাতে এসেছে:

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاء إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ – قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমূদয় ফিরিশতাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বলল ‘আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তাছাড়া আমাদেরতো কোন জ্ঞান নেই।’’ সূর বাকারা: ৯-১০

এতদ্ব্যতীত জ্ঞানের যেসব উপদান রয়েছে, তা সবই তিনি স্বীয় অনুগ্রহে মানুষকে দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন:

وَجَعَلَ لَكُمْ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
‘‘তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’’ সূরা আন-নাহল: ৭৮

কুরআনের অন্যত্র এসেছে:

أَلَمْ نَجْعَلْ لَهُ عَيْنَيْنِ – وَلِسَانًا وَشَفَتَيْنِ
‘‘আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করি নাই দুই চক্ষু? আর জিহবা ও দুই ওষ্ঠ? সূরা আল-বালাদ: ৮-৯

এছাড়াও তিনি মানুষকে বয়ান বা কথা বলা শিখিয়েছেন। সূরা আর-রহমানে এসেছে:

الرَّحْمَنُ – عَلَّمَ الْقُرْآنَ- خَلَقَ الْإِنسَانَ- عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
‘‘দয়াময় আল্লাহ তিনিই শিক্ষা দিয়েছে কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নি‘আমত দ্বারা মানুষকে ভুষিত করা হয়েছে তা হলো যুগে যুগে প্রেরিত আসমানী গ্রন্থসমূহ। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থের ধারণ করা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا
‘‘আমি তো আসমান, যমীন ও পবর্তমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল; সে তো অতিশয় জালিম, অতিশয় অজ্ঞ।’’ সূরা আল-আহযাব: ৭২

এসকল নি‘আমতের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন, তাঁর বিধি-বিধানের আনুগত্য করা, তাঁকে সিজদা করা প্রভৃতি। এসব অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে স্বয়ং রাসূল (সা) সিজদায় অবনত হয়েছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে, তিনি বলেন:

مجد وجهى للذي خلقه وصوره وشق يحعه وبصره تبارك الله أحسن الخالقين
‘‘আমার চেহারা সিজদা করেছে ঐ সত্তার জন্য যিনি তা সৃষ্টি করেছেন, অবয়ব দিয়েছেন এবং দিয়েছেন তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি। আল্লাহ অতীব বরকতময়, সবচেয়ে উত্তম স্রষ্টা।’’ মুসলিম ইব্ন হাজ্জাক, সহীত মুসলিম, হাদীস নং: ৭৭১।

কিন্তু মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহ এসব অনুগ্রহের স্বীকৃতি দিতে চায় না এবং চেষ্টাও করে না। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّ الْإِنسَانَ لَكَفُورٌ ‘‘মানুষ তো অতিমাত্রায় অকৃতজ্ঞ।’’ সূরা আল-হাজ্ব: ৬৬
আল-কুরআন নানা ধরনের দীনি বিষয়ের বর্ণনার সাথে সাথে মানুষের বিভিন্ন প্রকারের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকেও সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান চিত্র তুলে ধরেছে। যা সর্ব যুগের সর্বকালের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। মানুষের এ স্বরূপগুলো স্থায়ী। কোন জাতি বা কোন গোত্রই এ সকল বৈশিষ্ট্যের বাইরে নয়।
পবিত্র কুরআনে যেসব মানুষের প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি নিন্দাও করা হয়েছে। তাকে একদিকে যেমন আসমান, জমিন ও ফিরিশতার চাইতেও মহীয়ান-গরীয়ান করা হয়েছে, অপরদিকে তেমনি তাকে চতুষ্পদ জন্তু, শয়তানের চেয়েও হীন ও নিকৃষ্টতর প্রাণীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। ফিরিশতার উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে এরাই, অথাপি এরা এত দুর্বল যে, নিকৃষ্টতম অবস্থানেও নেমে যেতে পারে। তাই কুরআনে তাদেরকে অত্যন্ত স্বৈরাচারী ও মুর্খরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنْ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمْ الْغَافِلُونَ
‘‘আমি তো বহু জ্বিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তদের কর্ণ আছে তা দ্বারা তারা শ্রবণ করে না, তারা পশুর ন্যায় বরং তারা অধিক বিভ্রান্ত, তারাই গাফিল।’’ সুরা আল-আ‘রাফ: ১৭৯

কুরআনের অন্যত্র আরো বলা হয়েছে:

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيم – ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ – إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ
‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে, অত:পর আমি তাদেরকে হীনতাগ্রস্থদের হীনতমে পরিণত করি। কিন্তু তাদেরকে নয় যারা মু’মিন ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।’’ সুরা আত-তীন: ৪-৬

অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেখে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের স্বরূপ নির্ণয়ে পবিত্র কুরআন দু’ধরণের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছে। যেমন-

১. ভাল বৈশিষ্ট্য, ২. মন্দ বৈশিষ্ট্য।

এগুলোকে আমরা দুভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি।

  • এক. ইতিবাচক দিক( যা কল্যাণকর ও অজর্নীয়),
  • দুই. নেতিবাচক দিক (যা অকল্যাণকর ও বর্জনীয়)

১. ইতিবাচক দিক:

  • এক. মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফা

খলিফা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো প্রতিনিধি, উত্তরাধিকারী। মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে মানুষকে স্বীয় খলিফা মনোনীত করেছেন। যে তারা দুনিয়ার তাঁর দীন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। এ মর্মে সৃষ্টির প্রারম্ভেই তিনি ফেরেশতাদের করে ঘোষণা দিয়েছেন:

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ
‘‘স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদের বললেন, ‘‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতেছি; তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটানে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্ততিগান ও পবিত্রতা ঘোষনা করি। তিনি বললেন, আমি জানি যা তোমরা জান না।’’ সূরা আল-বাকারা: ৩০

তিনি (আল্লাহ) শুধু খলিফা হিসেবেই সৃষ্টি করেননি; বরং তাদেরকে পরীক্ষার জন্য একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ
‘‘তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কতজকে কতকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’’ সুরা আন’আম: ১৬৫

এছাড়াও খলিফা হিসেবে একজন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিধৃত করতে গিয়ে তিনি তাঁর মনোনীত বান্দা দাউদ (আ.) কে লক্ষ্য করে বলেন: ‘‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল খুশির অনুসরণ করিও না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। সূরা ছোয়াদ: ২৬।
এখানে প্রতিনিধি হিসেবে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি তার দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা মহান আল্লাহকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রমাণিত করতে হলে তাঁর আইনকেই শুধু মানুষের মাঝে পরিচালিত করতে হবে অন্যথায় তা হবে ব্যক্তি পুজা বা প্রবৃত্তির অনুসরণ। আর দাউদ (আ.) এ ধরনেরই একজন শাসক ছিলেন।

  • দুই. সর্বশ্রেষ্ঠ নি‘আমত জ্ঞানের অধিকারী

মানুষ বোধশক্তি সম্পন্ন প্রাণী। মহান আল্লাহ মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যার সাহায্যে ভাল ও মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ প্রভৃতির মাঝে পার্থক্য সুচিত করা যায়। এ জ্ঞান দ্বারাই মানুষ ফিরিশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করেছে। অতএব জ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষ সকল প্রাণীর সেরা। পবিত্র কুরআনে এসেছে:

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاء إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ- قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ- قَالَ يَاآدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ
‘‘আর তিনি আদম কে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন তারপর ফিরিশতাদের সামনে সেগুলো প্রকাশ করলেন এবং বললেন ‘এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, ’ যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বলল, আপনি মহান পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান নেই। বস্ত্তত আপনি জ্ঞানমত ও প্রজ্ঞাময়। তিনি বললেন ‘‘হে আদম! তাদেরকে এসকল নাম বলে দাও’। সে তাদেরকে এ সবের নাম বলে দিল।’’ সূরা আল-বাকারা: ৩১-৩৩

জ্ঞানে মাধ্যমেই মানুষ প্রভৃত কল্যাণের অধিকারী হয়েছে। এজন্যই পবিত্র কুরআনে বারবার জ্ঞান আহরণে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বলা হয়েছে-মহান আল্লাহ বলেন:

وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا
যাকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তার প্রভৃত কল্যাণ সাধিত হয়েছে। সূরা আল-বাকারা: ২৬৯

তিনি আরো বলেন:

وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمْ بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَى أَجَلٌ مُسَمًّى ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
‘‘বল অন্ধ ও চক্ষুম্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না?’’ সূরা আল-আন’আম: ৬০।

  • তিন. মানুষ মুক্ত ও স্বাধীন

মানুষ সাধারণত স্বাধীন চেতা ও মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় চলা-ফেরা করতে পছন্দ করে। কিসে কল্যাণ এবং কিসে তাদের অকল্যাণ তা জ্ঞাত হবার পরও তা গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থাশীল হওয়া পয়গম্বরী মিশন পরিচালনার প্রয়োজনীয় গুণাবলীতে মানব জীবন বিমন্ডিত। তারা দায়িত্বশীল জীব। উদ্যোগ ও কঠোর শ্রমের মাধ্যমে জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য মানুষের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। সমৃদ্ধি বা বিপর্যয় যে কোন একটিকে বেছে নেয়ায় তার রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। হয় সে সঠিক পথে চলে সমৃদ্ধির পানে বাড়াবে অথবা অকৃজ্ঞ হয়ে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন:

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا- إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا
‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে, তাকে পরীক্ষা করার জন্য এজন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে। সুরা আল-ইনসান: ২-৩।

  • চার. মহত্ত্ব ও মর্যাদার বিভুষিত

জন্মগতভাবেই মহত্ব ও মর্যাদার গুণাবলীতে মানুষ বিভুষিত। বাস্তবেই আল্লাহ অপরাপর অসংখ্য প্রাণীর উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সে তার আসল সত্ত্বাকে তখনই আবিস্কার করতে পারে, যখন সে তার মহত্ত্ব ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারবে এবং নিজকে সকল নীচতা, দাসত্ত্ব, অধীনতা ও ভোগ লালসার ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে স্থাপন করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنْ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
‘‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমূদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর মানুষদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’’ সুরা বনী ইসরাইল: ৭০

 

  • পাঁচ: নৈতিক চেতনাবোধ সম্পন্ন

মানুষের নৈতিক চেতনা আছে। তারা প্রকৃতিগতভাবেই ভালো আর মন্দ বুঝে নিতে পারে। কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। মানুষের সত্তার মাঝেই এ সুপ্ত নৈতিক চেতনা লুকিয়ে আছে। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا- فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
‘‘শপথ মানুষের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। তাকে(মানুষকে) তার অসৎকর্ম ও তার সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সুরা আশশামস: ৭-৮

  • ছয়. আল্লাহর স্মরণে মানসিক প্রশান্তি লাভ

আল্লাহ স্মরণ ব্যতীত মানুষের হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে না। মানুষের আকাঙ্খা, চাহিদা সীমাহীন। তথাপি কোন কিছুর আধিক্য তাদের মধ্যে একঘেয়েমীর সৃষ্টি করে। আধিক্য লাভে তারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে থাকে। বিপরীত দিকে মহান আল্লাহর চিরন্তন সত্তার সাথে মিলনের পথে তারা যত এগিয়ে যায়, তাদের ব্যগ্রতা আরো বেড়ে যায়। মহান আল্লাহর স্মরণ মানুষকে এসব ক্ষেত্রে একমাত্র প্রশান্তির পায়রা হয়ে আবর্তিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন:

الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশাস্ত হয়; জেনে রেখ আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।’’ সূরা আর-রাদ: ২৮।

অতএব, মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এবং মানুষের প্রশান্তির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহর যিকির।

  • সাত: আল্লাহর ইবাদত পালনকারী

আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন করার নিমিত্তে। এটাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন:

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِي
আমার ইবাদতের জন্যই আমি সৃষ্টি করেছি মানুষ এবং জ্বীনকে। সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬

কিন্তু মানুষ যদি আল্লাহর ইবাদত না করে এবং তাঁর সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা না করে তাহলে তারা নিজেদের চিনতে পারবে না। আল্লাহর ব্যাপারে গাফেল হলে তারা নিজেদেরও ভুলে যাবে। এ পরিস্থিতিতে তারা বুঝতে পারবে না তাদের নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে; তাদের সৃষ্টি ও অস্তিত্বের পেছনে কি উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে তাও ভুলে যাবে। এ বিষয়ে সর্তক করে দিয়ে ধমকের সুরে মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمْ الْفَاسِقُونَ
‘‘আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে; ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাই তো পাপাচারী।’’ সূরা আল-হাশর: ১৯

  • আট. পরকালীন সফলতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান

মানুষ বস্ত জাগতিক প্রেরণা বা উদ্দেশ্য নিয়েই বাঁচে না। অর্থাৎ বস্তগত চাহিদা বা প্রয়োজনই মানুষের সকল কর্মের পেছনে একমাত্র প্রেরণা নয় বরং তারা মহত্তর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আশা-আকাঙ্খা পুরণের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। আর তা হলো পরকালীন সফলতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান। অতএব, কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে তাদের সামনে আর কোন লক্ষ্যই থাকে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনুল কারীমে ঘোষিত হয়েছে মহাবাণী:

يَاأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ – ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً – فَادْخُلِي فِي عِبَادِي- وَادْخُلِي جَنَّتِي
‘‘হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে আস সন্তুষ্ট ও সন্তোষ ভাজন হয়ে। আমার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হও আর আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’’ সূরা আল-ফাজর: ২৭-৩০

চলবে………