আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ-২

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩

লেখক: ড. মোঃ আবদুল কাদের |||| সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

  • নয়: মজবুত ঈমান:

ঈমান মানে বিশ্বাস, প্রত্যয়, ধর্মীয় বিশ্বাস অন্তরের বিশ্বাস । এক কথায় বলতে গেলে ঈমান হচ্ছে: স্বীকৃতি প্রদান। পরিভাষায়: ইসলামের মূল বিষয়গুলো মনে প্রাণে বিম্বাস করে মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী আমল করার নাম ঈমান।

মানুষের মধ্যে এমন কতক মানুষ আছে যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল, ফিরিশতা, আসমানী গ্রন্থাবলী ও সদৃশ্য বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখে। কোন অত্যাচারী শাসকের রক্ষচক্ষু ও তাদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না। এমন ঈমানের এক জীবন্ত মডেল হিসাবে বিশ্বের বুকে সমাদৃত রয়েছেন, মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা)। রাসূল (সা) এর প্রতি তাঁর এম বেশী অগাধ আস্থা ছিল যে, মিরাজের ঘটনার বিবরণ শুনামাত্রই তিনি তা বিশ্বাস করে ফেলেন। পবিত্র কুরআন মানুষকে দুভাবে ভাগ করেছে।

১. ঈমানদার ২. যারা ঈমান আনেনি এমন। তবে যারা ঈমান আনে তাদের অধিকাংশই মজবুত ঈমানের অধিকারী হওয়া বাঞ্চনীয়। অন্যথায় তারা বিশেষ বিশেষণে বিশেষিত হতে বাধ্য। তাইতো এরশাদ হয়েছে:

যারা বরে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ; অত:পর অবিচলিত থাতে তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফিরিশতা এবং বলে তোমার ভীত হইও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও।’’ সূরা হা-মীম আস-সাজদা: ৩০।

এ ধরনের ঈমানের অধিকারী যারা তারাই সফলকাম ও বিজয়ী হবে। তাদের জন্যেই মহান আল্লাহ পরকালে মহাপুরুস্কারের ঘোষনা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمْ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

‘‘তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখিত হইও না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মু’মিন হও।’’ সূরা আল-ইমরান: ১৩৯

  • দশ. দরিদ্র অথচ অল্পে তুষ্ট

সমাজে দু’ শ্রেণীর মানুষ বাস করে। এক. ধনী, দুই. দরিদ্র। ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য দুরীকরণার্থে ইসলামে যাকাতের বিধান রয়েছে যা ধনীদের সম্পদ থেকে উত্তোলণ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করতে হয়। কেননা ইসলাম সুসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে যাকাতের বিধান রাখা হয়েছে যেন সম্পদ এক শ্রেণীর হাতে আবদ্ধ না হয়ে পড়ে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ

‘‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই সম্পদ আবর্তন না করে।’ সুরা আল-হাশর: ৭

এতদসত্ত্বেও এমন কতিপয় মানুষ রয়েছে যারা অভাবগ্রস্থ হওয়া সত্বেও সন্তুষ্ট চিত্তে জীবন যাপন করে। তথাপিও মানুষের কাছে হাত পারে না এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা বানায় না। পবিত্র কুরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:

لِلفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمْ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا

‘দান সাদকা তো ঐসব গরীব লোকদের জন্য, যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘুরাফিরা করতে পারে না, অথচ লোকেরা হাত না পাতার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে; তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের নিকট কাকুতি মিনতি করে ভিক্ষা করে ভিক্ষা চায় না। মূলত: অল্পে তুষ্টতাই শান্তির নিয়ামক। সূরা আল-বাকারা: ২৭৩

রাসূল (স.) বলেন:

الغنى غنى النفس

‘‘অন্তরের প্রাচুর্যতাই প্রকৃত প্রাচুর্য।’’ সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১০৫১

  • এগার. তাকওয়া সম্পন্ন

তাকওয়া আরবী শব্দ। অর্থ হলো আল্লাহর ভয়, পরহেযগারি, দ্বীনদারী, ধার্মিকতা। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদেরকেই মুত্তাকী বলা হয়। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কেবল মুত্তাকীদের জন্যই পথ প্রদর্শক। কুরআনের বিভিন্নস্থানে মানুষকে লক্ষ্য করে পরিপূর্ণ তাকওয়াবান হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেরূপ ভয় কর এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’’ সূর আল-ইমরান: ১০২

এ তাকওয়ার গুণে গুনান্বিত করার জন্য মানুষের উচিত, অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করা এবং সকল কাজ তাঁর দেয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা। এ সব লোকদের প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آياتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

‘মু’মিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে।’’ সুরা আল-আরফাল:২

প্রকৃত পক্ষে মহান আল্লাহর নিদের্শিত পন্থায় যারা জীবন অতিবাহিত করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় ও কাজ সমূহ থেকে নিজেকে বাচয়ে রাখে তারাই মুত্তাকী। এ সব লোকদের জন্যই মহান আল্লাহ চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন।

  • বার. বিনয়ী ও ভদ্র

বিনয় ও নম্রতা মানুষের অন্যতম চারিত্রিক ভূষণ। বিনয় মানুষকে উচ্চ আসনে সমাসীন করতে এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে সহায়তা করে। বিনীয়কে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمْ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

‘‘রামযানের’ বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা শান্তি কামনা করে (তর্কে অবতীর্ণ হয় না)।’’ সূরা আল-ফুরকান: ৬৩

শুধু তাই নয়, একজন বিদগ্ধ পন্ডিত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা লুকমানও তার পুত্রকে একই আদেশ দিয়েছেন: ‘‘(প্রিয় বৎস) পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না।’’

  • তের. দানশীল ও উদার

এ দুটি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর মানুষ হচ্ছে তার ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মাত্র। অতএব, সম্পদকে পুঞ্জিভুত করে না রেখে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া কতক মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহবায়ে কেরাম এক্ষেত্রে অনুকরণীয় আদর্শ। দানের ক্ষেত্রে তাঁরা আমাদের জন্য কিয়ামত অবধি মডেল হয়ে থাকবে। দানশীল লোকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا، إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا

‘‘আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্থ, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে এবং বলে, কেবল আললাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে কোন প্রতিদান চাই না। কৃতজ্ঞতাও নয়।’ সূরা আল-ইনসান: ৮-৯।

  • চৌদ্দ. ধৈর্যশীল

ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। ধৈর্যশীলকে মহান আল্লাহ ভালবাসেন। মানুষ এ পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের বাধা-বিপত্তি ও কষ্টের সম্মুখীন হয় যা দ্বারা মূলত: তাদের পরীক্ষা করা হয়। আর তা হলো ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ধ্বংস, জীবন ও সম্মানহানি প্রভৃতি। এক্ষেত্রে ধৈর্যশীলগণ খুব সহজেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সক্ষম হন। মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنْ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرْ الصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

‘‘আমি তোমাদের কিছু ভয়; ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে। যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’’ সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৬

  • পনের. অপরকে অগ্রাধিকার দান

মানুষের স্বভাব হলো অন্যের উপর নিজের প্রাধান্য বিস্তার করা। তথাপিও আল্লাহর একান্ত অনুগত কতক বান্দা রয়েছে; যারা নিজেদের আমিত্বকে ভুলে গিয়ে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দানে মহত্বের পরিচয় দিয়ে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন এ দৃষ্টান্তের মূর্ত প্রতীক। বিশেষত: আনসারগণ সকল সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে এক্ষেত্রে নিজেদের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُفْلِحُونَ

‘‘মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এ নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদের ভালবাসা এবং মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্খা পোষণ করে না। আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও। যাদেরকে অন্তরের কার্পন্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম।’’ আল-হাশর: ৯

  • ষোল, ক্রোধ দমনকারী

ক্রোধ মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে দেয়। ক্রোর্ধের বশবর্তী হয়ে মানুষের পরস্পরের প্রতি ঘৃণাবোধ জন্ম নেয়। এমনকি অন্যায় পথে পা বাড়াতেও এ ক্রোধ মানুষকে সাহায্য করে। অতএব, ক্রোধ হলো বিভ্রান্তিকর একটি মানবিক দুর্বলতার নাম। মুমিনগণ এ ক্রোধকে দমন করে স্বীয় কাজে সিদ্ধহস্ত হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে তাদের এ গুণটির উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘তারা নিজেদের ক্রোধকে সবরণ করে। এ মনের অধিকারী ব্যক্তিগণই হলেন সৎকর্মপরায়ণ।

  • সতের. ক্ষমাশীল

ক্ষমা অন্যতম একটি মানবিক গুণাবলী। যা মানুষকে বড় মনের অধিকারী বানাতে সাহায্য করে এবং ক্রোধ সংবরণে সহায়তা করে। ক্রোধের সাথে ক্ষমা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। ক্রোধের সাথেই ক্ষমাশীলতার উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

أُوْلَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ

‘‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন।’’ সূরা আল-ইমরান: ১৩৬

এসব গুণাবলীর অধিকারী যেসব মানুষ রয়েছে, মুলত: তাদের জন্যেই মহান আল্লাহ স্বীয় গুণে গুণান্বিত হয়ে ক্ষমা ও চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন। উপরোল্লিখিত আয়াতের পূর্বোক্ত আয়াতে সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে:

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

‘‘তোমরা ধাবমান হও তোমদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়। যা প্রস্ত্তত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।’ সূরা আল-ইমরান: ১৩৩

২. নেতিবাচক দিক:

মানুষের স্বভাবের এমন কতিপয় দিক রয়েছে যে এগুলোর প্রভাবে মানুষ নিজ নিজ গুণাবলী ও মর্যাদা বিচ্যুৎ হয়ে অন্য নামে আখ্যায়িত হয় সেগুলোই তার নেতিবাচক দিক। এক কথায় বলতে গেলে, যেসব মৌলিক ও অসৎগুণাবলীর সংমিশ্রণ রয়েছে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে যা বর্জন করা একজন মানুষ হিসেবে সকলের কর্তব্য সেগুলো হলো:

  • এক. স্বার্থপরতা

মানুষ বড় Selfish বা স্বার্থপর। কোথাও বা কোন কাজে তার স্বার্থ ও সুযোগ সুবিধা জড়িয়ে না থাকলে সে কাজ সিদ্ধ করে না। এজন্যেই পবিত্র কুরআনে তাকে অসংখ্যবার জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যেন সে তা অর্জনের আশায় দুনিয়ায় বৈধ পথে চলাচল করে। মানুষ বিপদ আসলে সর্বদা আল্লাহকে ডাকে, আর বিপদ কেটে গেলে তাঁকে উপেক্ষা করে চলে। এ চরিত্র বর্ণনায় কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَنْ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرٍّ مَسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

‘‘আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে বসে অথবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে, অত:পর আমি যখন তার দুঃখ-দৈন্য, দুরীভূত করি, সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুঃখ-দৈন্য, স্পর্শ করেছিল তার জন্য সে আমাকে ডাকেনি।’’ সূরা ইউনুস: ১২

কুরআনে আরো এসেছে:

إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا، إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا، وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا

‘‘মানুষতো সৃজিত হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্তরূপে, যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ।’’ সূরা আল-মা‘আরিজ: ১৯-২১

  • দুই. অহংকারী

মানুষের জীবনের যাত্রা দুর্বলতা ও অসামর্থের তথা মাটি ও শুক্র জাতীয় দুটি দুর্বল ও অক্ষম উপাদান দিয়ে শুরু হলেও মানুষ অহংকারী স্বভাবের হয়ে থাকে। দুনিয়ার হিসেব অনুযায়ী বড় ধরনের কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হলে তখন সে স্বেচ্চাচারী রূপ নিয়ে অহংকারবশত তাঁর অতীতকে ভুলে যেতে চেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনে তাদের চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে:

وَلَئِنْ أَذَقْنَا الْإِنسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَاهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَئُوسٌ كَفُورٌ، وَلَئِنْ أَذَقْنَاهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّئَاتُ عَنِّي إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ

‘‘যদি আমি মানুষকে আমার নিকট হতে অনুগ্রত আস্বাদন করাই ও পরে তার নিকট হতে তা প্রত্যাহার করি তখন সে অবশ্যই হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হবে। আর যদি দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর আমি তাকে সুখ-সম্পদ আস্বাদন করাই তখন সে অবশ্যই বলবে, আমার বিপদ আপদ কেটে গেছে, আর সে তো হয় প্রফুল্ল ও অহংকারী।’’ সূর হুদা: ৯-১০

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأَى بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوسًا

‘‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে লয় ও দূরে সরে যায় এবং তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে।’’ সুরা বনী ইসরাইল: ৮৩

  • তিন. ঠুনকো বিশ্বাসী

মানুষের মধ্যে এমন এক ধরনের মানুষ আছে, যাদের বিশ্বাস খুবই ঠুনকো। যারা তাদের বিশ্বাসের উপর দৃঢ় থাকতে পারে না। এরা ততক্ষণ ঈমানের পথে থাকে যতক্ষণ নিরাপদ ও নির্ঝামেলায় তা থেকে ফায়দা লাভ করা যায়। আর যদি কোনোরূপ পরীক্ষা বা কাঠিন্য আরোপ করা হয়, সাথে সাথে তারা ঈমান ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ

‘‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার সাথে। তার মঙ্গল তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্থ হয় দুনিয়াতে ও আখিরাতে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।’’ সূরা আল-হাজ্জ: ১১

ইবন আববাস রা. আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপটে বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: এক ব্যক্তি মদিনায় বাস করত। যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করত এবং তার পশুটি কোন বাচ্চা প্রসব করতে তাহলে সে বলত, দীন ইসলাম বড় চমৎকার। আর যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান না জন্মাত এবং তার পশুটিরও বাচ্চা না হত তাহলে সে বলত দীন ইসলাম খারাপ ও অপয়া। ইমাম বুখারী, সহীহ বুখারী, কিতাবুত্তাফসীর, হাদীস নং ৪৩৮১।

কুরআনের অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে:

وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللهِ وَلَئِنْ جَاءَ نَصْرٌ مِنْ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ

‘‘মানুষের মধ্যে কতক লোক বলে, আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি, কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নিগৃহীত হয়, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে এবং তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। বিশ্ববাসীর অন্ত:করণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন?’’ সুরা আল-আনকাবুত: ১০

চলবে……………