ঈমান এর পরিচয়

ঈমান এর পরিচয়

ঈমানের অর্থঃ

ঈমান শব্দটি ‘আমন’ ধাতু থেকে নির্গত। ‘আমন’ এর মূল অর্থ হচ্ছে, আত্মার প্রশান্তি ও নির্ভীকতা লাভ। এই ‘আমন’ ধাতুই ক্রিয়ারুপ হচ্ছে ঈমান যার তাৎপর্য হচ্ছে, মনের ভিতর কোন  কথা প্রত্যয় ও সততার সাথে এমনভাবে দৃঢ়মূল করে নেয়া যেন তার প্রতিকূল কোন জিনিসের পথ খুঁজে পাওয়া ও প্রবেশ করার কোন প্রকার আশংকাই না থাকে। ঈমানের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আন্তরিক বিশ্বাস। রাসুল (সাঃ) আল্লাহর নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, উহার বিশদ বিষয়গুলোকে বিশদভাবে এবং সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলোকে সংক্ষিপ্তভাবে আন্তরিক বিশ্বাস করার নাম ঈমান। ইসলামের পরিভাষায় ঈমান হল : আত্মার স্বীকৃতি বা সত্যায়ন, মৌখিক স্বীকৃতি এবং আত্মা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়।

 ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের অর্থঃ

ওমর (রা.) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আমাদের সামনে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁর পোশাক ছিল ধবধবে সাদা আর চুল ছিল কুচকুচে কালো। দূর হতে ভ্রমণ করে আসার কোন লক্ষণও তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না, অথচ তিনি আমাদের পরিচিতও ছিলেন না। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটবর্তী হলেন, তাঁর হাঁটুতে হাঁটু লাগালেন এবং তাঁর দু‘হাতের তালু নিজের উরুর উপর রেখে বসলেন। তারপর বললেনঃ হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।

উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ ইসলাম হচ্ছে এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানে সিয়াম পালন করা এবং সামর্থ থাকলে আল্লাহর ঘরের হজ করা। উত্তর শুনে তিনি বললেনঃ সত্য বলেছেন। আমরা অবাক হয়ে গেলাম-প্রশ্নও তিনি করছেন, আবার তিনিই উত্তরকে সত্য বলে মানছেন।

তিনি আবার বললেনঃ এখন আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুনউত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ উহা হচ্ছে আল্লাহপাকের উপর, তাঁর ফেরেশ্তাদের (মালাইকাদের) উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, তাঁর রাসূলদের উপর এবং আখিরাতের উপর এবং তকদীরের ভাল মন্দের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা উত্তর শুনে উনি বললেনঃ সত্য বলেছেন। তারপর আবার প্রশ্ন করলেনঃ এখন আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ  এমনভাবে আল্লাহ তাআলার ইবাদত কর যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তাঁকে নাও দেখ, তিনিতো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। তারপর তিনি বললেনঃ আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে বলুন। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ প্রশ্নকারী হতে জবাব দানকারী এ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত নয়। তারপর তিনি বললেনঃ তবে আমাকে তার আলামত বা নিদর্শন সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে। এরপর আগন্তুক চলে গেলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ  হে উমার ! তুমি কি জান প্রশ্নকারী কে? উত্তরে বললামঃ  আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। তিনি বললেনঃ  ইনি ছিলেন জিব্রাইল। তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। (বর্ণনায় মুসলিম)

ঈমান সম্পর্কিত কতিপয় আয়াতঃ

ঈমান সম্পর্কে  মহান আল্লাহ বলেন-

 

فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا ۖ وَّإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ ۖ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿١٣٧

অর্থঃ অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। (সূরা বাকারাঃ ১৩৭)

وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَىٰ أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ ۖ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ ﴿٨٣

অর্থঃ আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতি পালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।  (সূরা আল মায়িদাহঃ ৮৩)

فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا ﴿١٧٥

অর্থঃ অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।  (সূরা আন নিসাঃ ১৭৫)

وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ أُولَـٰئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ ۗ وَكَانَ اللَّـهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴿١٥٢

অর্থঃ আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং তাঁদের কারও প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদেরকে প্রাপ্য সওয়াব দান করা হবে। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। (সূরা আন নিসাঃ ১৫২)  

 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّـهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّـهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴿١٣٦

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তাঁর রসূলও তাঁর কিতাবের উপর, যা তিনি নাযিল করেছেন স্বীয় রসূলের উপর এবং সেসমস্ত কিতাবের উপর, যেগুলো নাযিল করা হয়েছিল ইতিপূর্বে। যে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, তাঁর কিতাব সমূহের উপর এবং রসূলগণের উপর ও কিয়ামতদিনের উপর বিশ্বাস করবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে। (সূরা আন নিসাঃ ১৩৬) 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। (সূরা আন নিসাঃ ৫৯)

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۖ لَّهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا ﴿٥٧

অর্থঃ আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, অবশ্য আমি প্রবিষ্ট করাব তাদেরকে জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহর সমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্ত্রীগণ। তাদেরকে আমি প্রবিষ্ট করব ঘন ছায়া নীড়ে। (সূরা আন নিসাঃ ৫৭) 

وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ ۗ وَمَن يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا ﴿٣٨﴾ وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ بِهِمْ عَلِيمًا ﴿٣٩

অর্থঃ আর সে সমস্ত লোক যারা ব্যয় করে স্বীয় ধন-সম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশে এবং যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, ঈমান আনে না কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হল নিকৃষ্টতর সাথী। আর কিই বা ক্ষতি হত তাদের যদি তারা ঈমান আনত আল্লাহর উপর কেয়ামত দিবসের উপর এবং যদি ব্যয় করত আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে! অথচ আল্লাহ, তাদের ব্যাপারে যথার্থভাবেই অবগত। (সূরা আন নিসাঃ ৩৮-৩৯) 

وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللَّـهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّـهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّـهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۗ أُولَـٰئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ ۗ إِنَّ اللَّـهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ ﴿١٩٩

অর্থঃ আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লার আয়াতসমুহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন। (সূরা আল ইমরানঃ ১৯৯) 

 

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ ۗ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُم ۚ مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿١١٠

অর্থঃ তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।  (সূরা আল ইমরানঃ ১১০)

ঈমানের শাখাসমূহঃ

ঈমানের ৭৭ টির বেশি শাখা রয়েছে। সর্বোত্তম শাখা এ স্বীকৃতি প্রদান করা যে আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। আর ঈমানের নিম্নতম শাখা হলো কষ্টদায়ক বস্তু পথ হতে অপসারণ করা এবং লাজুকতা ঈমানের অংশ। (বুখারী ও মুসলিম)

ঈমানের রুকন বা ভিত্তিসমুহঃ

যে সকল ভিত্তির উপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত তার সংখ্যা মোট ছয়টি বলে রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন :

  • ১. আল্লাহর উপর বিশ্বাস।
  • ২. তার ফেরেস্তাদের উপর বিশ্বাস।
  • ৩. তার কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস।
  • ৪. তার প্রেরিত নবী রাসুলদের উপর বিশ্বাস।
  • ৫. পরকালের উপর বিশ্বাস।
  • ৬. নিয়তির ভালোমন্দ আল্লাহর হাতে এ কথায় বিশ্বাস। (বুখারী ও মুসলিম)

ঈমানেরভিত্তিসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ

  • ১। আল্লাহপাকেরউপরঈমানআনাঃ

এতে অন্তর্ভুক্তআছে তাঁর অস্তিত্বে ও একত্ববাদে বিশ্বাস করা। তাঁর গুণাবলীতে বিশ্বাস করা এবং বিশ্বাস করা সকল প্রকার ইবাদত তাঁরই প্রাপ্য। এছাড়া তার অবস্থান, তার আকার ও অঙ্গ প্রত্যংগ সম্পর্কে সঠীক ধারনা রাখা।

  • ২। তাঁরফেরেশ্তাদের (মালাইকাদের) উপরঈমানআনাঃ

তারা হচ্ছেন নূরের তৈরী। তাদেও সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহপাকের হুকুমসমূহকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য। তাদের সংখ্যা কেবল আল্লাহ তা’আলাই জানেন। তাঁরা অতীব শক্তিশালী ও নিষ্পাপ।

  • ৩। তাঁরকিতাবসমূহেরউপরঈমানআনাঃ

উহাদের মধ্যে আছে তাওরাত, ইন্জিল, যাবুর, কোরআন।তন্মধ্যে কোরআন সর্বোত্তম। এছাড়াও অনেক সহীফাও রয়েছে।

  • ৪। তাঁররাসূলদেরউপরঈমানআনাঃ

তাঁদের মধ্যে প্রথম হচ্ছেন নূহ (আঃ) এবং সর্বশেষ হচ্ছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।কুর’আনের বর্নিত রয়েছে ২৫ জন নাবীর নাম এছাড়াও অসংখ্য নাবীরাও ছিলেন।

  • ৫। আখিরাতেরউপরঈমানআনাঃ

এটা মুলত শুরু হয় একজন মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। একটি সাধারন চিত্র উল্লেখ্য করা হলঃ ১. কবর ২. প্রথম শিঙ্গায় ফু ৩. কিয়ামাত ৪. দ্বিতীয় শিঙ্গায় ফু ৫. পুনুরুত্থান ৬. হাশার ৭. শাফা’আত ৮. হিসাব নিকাশ ৯. আমালনামা প্রদান ১০. মীজান ১১. হাওজে কাওছার ১২. মু’মিনদের পরীক্ষা ১৩. পুলসিরাত ১৪.জাহান্নাম ১৫. জাহান্নাম এ যাওয়া ১৬. (কানতারা) ব্রিজ ১৭. জান্নাতে স্থায়ী বাস

  • ৬। তকদীরবাভগ্যেরভালমন্দেরউপরঈমানআনাঃ

তার মধ্যে আছে আসবাব বা উপকরণ ব্যবহার করা, আর ভাগ্যের ভাল, মন্দ যাই ঘটুক না কেন তাতে রাজী থাকা, কারণ উহা আল্লাহ হতে প্রদত্ত।    (বর্ণনায় মুসলিম)

 ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাসের উপর কুরআন-হাদীসের দলীল

ভালো কাজে ঈমান বৃদ্ধি পায়, আর মন্দ কাজে ঈমান হ্রাস পায়। ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাসের স্বপক্ষে কোরআন ও হাদীসের বহু প্রমাণ রয়েছে।

আল্লাহ তা’আলার বাণী :


إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّـهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ﴿٢

অর্থঃ যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ার দেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে। ( সূরা আনফালঃ ২)
وَيَزِيدُ اللَّـهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى ۗ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ مَّرَدًّا ﴿٧٦
অর্থঃ যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের পথপ্রাপ্তি বৃদ্ধি করেন এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তোমার পালনকর্তার কাছে সওয়াবের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রতিদান হিসেবেও শ্রেষ্ট। (সূরা মারিয়ামঃ ৭৬)

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ ۗ وَلِلَّـهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿٤
অর্থঃ তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আল-ফাত্হঃ ৪)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন :

وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَـٰذِهِ إِيمَانًا ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ ﴿١٢٤﴾ وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَىٰ رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ ﴿١٢٥

অর্থঃ আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করলো? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে।  বস্তুতঃ যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরো কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফের অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করলো। ( সূরা আত-ত্ওবাঃ ১২৪-১২৫)

সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বলা যায় যে, সৎ কর্ম মানুষের ঈমানকে বৃদ্ধি করে আর মন্দ কর্ম মানুষের ঈমানকে হ্রাস করে।

 ঈমান না আনার ভয়ংকর অবস্থাঃ

ঈমান না থাকলে মানুষের কোন আমাল কবুল হয় না। একজন মানুষ সারাজীবন ভাল আমাল (আমলে সলেহ) করে গেল পৃথীবির সবাই তার উপর সন্তুষ্ট তার জন্য দু’আও করে কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তার ঈমান নেই বা সে ঈমানী বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয় না এ ক্ষেত্রে আখিরাতে তার জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ

وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ ۗ وَمَن يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا ﴿٣٨﴾ وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ بِهِمْ عَلِيمًا ﴿٣٩﴾

অর্থঃ আর সে সমস্ত লোক যারা ব্যয় করে স্বীয় ধন-সম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশে এবং যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, ঈমান আনে না কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হল নিকৃষ্টতর সাথী। আর কিই বা ক্ষতি হত তাদের যদি তারা ঈমান আনত আল্লাহর উপর কেয়ামত দিবসের উপর এবং যদি ব্যয় করত আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে! অথচ আল্লাহ, তাদের ব্যাপারে যথার্থভাবেই অবগত। (সূরা আন নিসাঃ ৩৮-৩৯) 

উপসংহারঃ

সর্বশেষে যা জানা জরূরী, আল্লাহর রসুল(সঃ) বলেছেন “সে ততক্ষন পর্যন্ত পুর্ন মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষন পর্যন্ত সে আমাকে তার নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালো না বাসবে।”

সুতরাং, আমার আপনার অন্তরকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে “আসলেই কি আমরা সাহাবাদের মত ঈমান আনতে পেরেছি??”

আল্লাহ আমাদের ঈমান নবায়ন ও সঠিক পদ্ধতিতে ঈমান আনার তাওফীক দিন (আমীন)