মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত পর্বঃ ২

মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত

পর্বঃ ১ ।। পর্বঃ ২ ।। পর্বঃ ৩ ।। পর্বঃ ৪

৮-কুরআন খতম বা কুরআনখানি

মৃত ব্যক্তির প্রতি সওয়াব পাঠানোর জন্য কুরআন খতম বা কুরআন খতমের অনুষ্ঠান করা হয়। মৃতের জন্য কুরআন খতমের এ রেওয়াজ এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, দীন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বহু সংখ্যক মুসলমান মনে করেন : কুরআন নাযিল হয়েছে মৃত ব্যক্তিদের জন্য মুক্তি ও ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। ছাত্র জীবনে আমাকে আমার এক প্রতিবেশী উ”চ-শিক্ষিত ভদ্রলোক তার পিতার মৃত্যু দিবসে কুরআন খতমের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দাওয়াত দিলেন। আমি যেতে অস্বীকার করলাম। তিনি মন্তব্য করলেন, মৃতের জন্য কুরআন খতমে অংশ নিবে না তাহলে কুরআন হেফজ করেছ কেন? মৃতের জন্য কুরআন পাঠ না করলে কুরআন আর কি কাজে আসবে?
এলাকার এক বাড়িতে প্রায় প্রতিদিন গান ও মিউজিকের আওয়াজ শুনতে পেতাম। অবিরাম গানের আওয়াজে তার অনেক প্রতিবেশী বিরক্ত হতেন। একদিন দেখা গেল গান ও মিউজিকের বদলে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ আসছে। কৌতূহলী লোকজন কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখল তাদের এক নিকট আত্মীয় ইন্তেকাল করেছে। সে কারণে তারা কুরআন তিলাওয়াতের ক্যাসেট চালাচ্ছে। এ ধরনের মুসলমানদের ধারণা যতসব গান-বাজনা আছে তা জীবিতদের জন্য। আর কুরআন হল মৃতদের জন্য। অথচ আল্লাহ বলেন-

إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآَنٌ مُبِينٌ ﴿৬৯﴾ لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقَّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ ﴿৭০﴾ (يـس)
এতো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন ; যাতে সে সতর্ক করতে পারে জীবিতদেরকে এবং যাতে কাফেরদের বির”দ্ধে শাসি-র কথা সত্য হতে পারে। (সূরা ইয়াসীন : ৬৯-৭০)

কুরআন খতমের যত অনুষ্ঠান হয়, তার পঁচানব্বই ভাগই মৃত ব্যক্তির জন্য উৎসর্গিত। বাকিগুলো ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নতি, বিদেশ যাত্রায় সাফল্য, চাকুরি লাভ, পরীক্ষায় পাস, মামলা-মকদ্দমায় খালাস, দোকান, বাড়িঘর, লঞ্চ-জাহাজ, বাস-ট্রাকের উদ্বোধন-ইত্যাদি উদ্দেশ্যে করা হয়। মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য কুরআন খতম করে বিনিময় গ্রহণ জায়েয কি-না, এ নিয়ে বিতর্ক দেখা যায় আলেম-উলামাদের মাঝে। মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করলে তার বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয-এ রকম ঐক্যমতের খবরও শোনা যায় সংশ্লিষ্ট মহলে। আর পারিশ্রমিক দিয়ে কুরআন খতমের ব্যবস্থা সর্বত্রই দেখা যায়। অথচ বিষয়টি কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে কতটুকু সহীহ তা ভাবতে চায় না অনেকেই।
হানাফী ফিকাহর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফাতাওয়া শামিয়াতে বলা হয়েছে : “মৃত ব্যক্তিদের জন্য কুরআন পাঠ করার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা মাকরূহ এবং খতমে কুরআনের জন্য সাধু সজ্জন ও কারীদের সমবেত করা নিষিদ্ধ।”
শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী ‘মাদারিজুন নবুয়াহ’ গ্রন্থে লিখেছেন: “রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র যুগে মৃতের জন্য জানাযা নামাযের সময় ব্যতীত অন্য সময়ে সমবেত হওয়া ও কুরআন তিলাওয়াত করা বা খতম করার রীতি ছিল না- কবরের কাছেও নয়, অন্য স্থানেও নয়- এসব কাজ বিদআত ও মাকরূহ।”
৯-কাঙ্গালীভোজ
মৃত ব্যক্তিদের জন্য যে সকল অনুষ্ঠান করা হয় তার একটি হল কাঙ্গালীভোজ। এর অর্থ সকলের জানা। মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনায় দরিদ্র অসহায় লোকদের জন্য খাবারের আয়োজন করা। এটা সামাজিকভাবে প্রচলিত হলেও কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অনুমোদিত। যদি এর আয়োজনকারীরা সত্যিকারার্থে ছাওয়াবের জন্য করে থাকে, অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকে এবং অবৈধ টাকা বা জোর-জবরদস্তি করে আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়ে না হয় এবং যাদের খাবার দেয়া হবে, তাদের কোন কষ্ট না দেয়া হয়, তবে, সন্দেহ নেই, এটা খুবই ভাল ও ছাওয়াবের কাজ। এটা একটা ছদকাহ। আল্লাহ ও তার রাসূল মানুষকে খাদ্য দানে উৎসাহিত করেছেন এবং এর জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।
১০-ওরস
ওরস বা উরস আরবী শব্দ। মূল অর্থ, বিবাহের জন্য কনেকে বরের গৃহে নিয়ে যাওয়া। বিবাহ ও বিবাহ উপলক্ষ্যে খানা-পিনাকে উরস বলা যায়। নব-বধূ বরণ বা নব-বর বরণ। পরিভাষায় মাজার বা কবর-কেন্দ্রিক মেলাকে ওরস বলা হয়। যারা কবর-কেন্দ্রিক ব্যবসা ও ইবাদত-বন্দেগী করে, ওরস তাদের জন্য একটা লাভ জনক বাণিজ্য। যারা ওরস করে তারা কবরবাসীদের জন্য ছাওয়াবের জন্য করে। আরো উদ্দেশ্য হল, কবর বা মাজারে শায়িতদের থেকে ফয়েজ ও বরকত লাভের বিশ্বাস। যারা এ সব মাজার ও কবরে আসেন, তাদের সকলের উদ্দেশ্য ইছালে ছাওয়াব নয় ; অনেকে নানা মকসুদ নিয়ে আসেন যা মাজারের নামে প্রসিদ্ধি পেয়েছে। ওরসে কী কী বিষয় থাকবে এর নির্দিষ্ট ধরাবাধা নিয়ম নেই। তবে, সাধারণত যা থাকে তা হল-গান-বাজনা, কবরে সেজদা, মারফতি গান ও বয়ান, তাবার”ক বিতরণ, মীলাদ-ইত্যাদি। কারা ওরস করতে পারবে কারা পারবে না-এরও কোন নীতিমালা নেই। ব্যবসা বাণিজ্য এমনকি জন-সেবা করতে হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয় ; কিন্তু এ ব্যবসার জন্য কোন অনুমতি লাগে না। যার ই”ছা যেখানে খুশি আয়োজন করতে পারে। তবে কবর বা মাজার হল এর জন্য উর্বর স্থান।
১১-ইছালে ছাওয়াব মাহফিল
আমাদের দেশের অনেক স্থানে ইছালে ছাওয়াব-মাহফিলের আয়োজন করতে দেখা যায়। আয়োজনকারীদের উদ্দেশ্য হল, আম্বিয়া, আউলিয়া, পীর-দরবেশসহ সকল মৃত মুসলমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা, তাদের জন্য দুআ করা। এ মাহফিলে জীবিত-মৃত আউলিয়া-বুজুর্গ, পীর-দরবেশ ও তাদের খাদেম ভক্তদের কেরামত বয়ান করা হয়। ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে মানুষকে আয়োজক দরবারের দিকে আকৃষ্ট করা হয়। আল্লাহর কাছে এ দরবার ছাড়া আর কোন প্রিয় দরবার যে নেই এটা জোর-জবরদস্তি করে বুঝানো হয় সাধারণ মানুষকে। মীলাদ পড়া হয়। দরবারে অবসি’ত মাদরাসা, মসজিদ ও খানকাহর জন্য চাঁদা তোলা হয়। সর্বশেষে, আখেরি মুনাজাত ও তাবার”কের ব্যবস্থা থাকে।
১২-উরসে-কুল
উরসে-কুল শব্দের অর্থ সকলের জন্য ওরস। দেশের কোন কোন সূফী সমপ্রদায় এ পদ্ধতিতে মৃতদের জন্য ইছালে ছাওয়াব পালন করে থাকেন। কয়েকজন লোক একত্রিত হয়ে গোলাকার হয়ে বসে সূরা ফাতেহা, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাছ ও তাদের দলীয় বিশেষ একটি দর”দ পাঠ করে মুনাজাতের মাধ্যমে সওয়াব বখশে দেন সকল নবী, অলি ও মুসলমানদের জন্য। সাধারণত দৈনিক এশার নামাজের পর তারা এ অনুষ্ঠান করেন। কেহ করেন সপ্তাহে একদিন। এছাড়া, কেন্দ্রীয় আকারে এ অনুষ্ঠান করা হয়। এ দলের অনুসারীদের কেন্দ্র হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এ দলের লোক ব্যতীত অন্য কাউকে এ পদ্ধতিতে ইছালে ছাওয়াব পালন করতে দেখা যায় না। দলটির স্লোগান হল-বিনা পয়সায় দিন-দুনিয়ার শান্তি।
১৩-কবরে ও কফিনে ফুল দেয়া বা পুষ্পস্তবক অর্পণ
বহু মানুষকে দেখা যায়, নিজের প্রিয়জন বা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের কবরে ও কফিনে ফুল দেন। কবরে অর্পণ করেন পুষ্পস-বক। এমনকি, তাদের প্রতিকৃতিতেও ফুল দিয়ে থাকেন। তবে, তারা সকলে মৃত ব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে বা সওয়াব পাঠানোর নিয়তে করেন কি-না, অথবা মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসর অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে করে থাকেন, তা অবশ্য জিজ্ঞাস্য। তবে আমার ধারণা, তাদের অধিকাংশই পাশ্চাত্যের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তির অনুকরণে মৃত ব্যীক্তর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে এমনটি করেন। যদি এটা মৃত ব্যক্তির আত্মার কাছে সওয়াব পাঠানোর জন্য করা হয়, তবে এক কথা ; আর যদি সওয়াব পাঠানোর নিয়ত না করে শুধু প্রথা-পালনের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে ভিন্ন কথা। প্রথমটি বিদআত আর দ্বিতীয়টি কুফুরি। কর্তা কাফের হয়ে যাবে কিনা তাতে সন্দেহ থাকলেও তার কাজটা যে কুফুরি, তাতে সন্দেহ মাত্র নেই। আমি শুনেছি, এক আলেমকে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল : এটা ইসলামী শরীয়তে জায়েয কি না? তিনি উত্তরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে খেজুরের ডাল স্থাপন করেছেন। তার কাছে তখন যদি ফুল থাকত তাহলে তিনি কি ফুল দিতেন না? তখন খেজুর ডাল পাওয়া সহজ ছিল। অন্য কিছু হাতের কাছে সচরাচর পাওয়া যায়নি, তাই তিনি খেজুরের ডাল দিয়েছেন। অতএব, শুধু খেজুরের ডাল নয়, যে কোন পুষ্প কবরে অর্পণ করা সুন্নত হবে। আসলে এটা একটা বিভ্রানি-। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দুটো কবরে খেজুর ডাল স্থাপন করেছেন সে সম্পর্কে তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে জ্ঞাত করা হয়েছিল যে, কবর দুটোর বাসিন্দাদের শাস্তি হচ্ছে।
হাদীসটি নিম্নরূপ:

عن ابن عباس رضي الله عنهما قال: مر النبي صلى الله عليه وسلم بقبرين، فقال : إنهما ليعذبان، وما يعذبان في كبير، أما أحدهما فكان لا يستبرئ من البول، وأما الآخر فكان يمشي بالنميمة، ثم أخذ جريدة رطبة فشقها نصفين، فغرز في كل قبر واحدة. قالوا يا رسول الله! لم فعلت هذا؟ قال: لعله يخفف عنهما ما لم ييبسا. رواه البخاري ২১৬ ومسلم ২৯২
ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে বলেন : ‘এ কবরবাসী দুজনকে শাসি- দেয়া হ”েছ। কিন্থ এদেরকে কোন বড় অপরাধের কারণে শাসি- দেয়া হচ্ছে না, বরং এদের একজন চোগলখুরী করে বেড়াত, আর অপরজন প্রসাবের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করত না। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর গাছের একখানা কাঁচা ডাল আনিয়ে তা দু টুকরা করে প্রত্যেক কবরের উপর একটি করে গেড়ে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এরূপ করেছেন কেন? তিনি বলেন, খুব সম্ভব ডাল দু’টি না শুকানো পর্যন্ত তাদের আযাব হাল্কা করে দেয়া হবে।’

অর্থাৎ, তিনি শাস্তি লাঘবের জন্য খেজুর ডাল স্থাপন করেছেন। তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে এ দু লোকের শাসি- হচ্ছে। তাই তিনি এ দুটো কবর ব্যতীত অন্য কোন কবরে কিছু স্থাপন করেছেন-এমন প্রমাণ নেই। জীবনে বহু প্রিয়জনের কবর যিয়ারত করেছেন তিনি, কোথাও খেজুরের ডাল বা পুষ্প অর্পণ করেননি। অতএব, এ বিষয়টি শুধু এ দু কবরের জন্যই করার নির্দেশ ছিল। এটা যদি সাধারণ নির্দেশ হত, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কোন কবরেও খেজুরের ডাল বা এ জাতীয় কোন কিছু স্থাপন করতেন। তারপর সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন এবং ইমামগণ অতিবাহিত হয়েছেন কেহই এটা করেননি। সকল ইমামগণ একমত যে, এ বিষয়টি শুধু রাসূলুল্লাহর একান্ত বৈশিষ্ট্য ছিল। অন্য কারো জন্য নয়।
বুখারীর এক বর্ণনায় এসেছে যে সাহাবী বুরাইদা ইবনুল হাসীব আল-আসলামী অসীয়ত করেছিলেন যে, তার ইনে-কালের পর তার কবরের উপর যেন দু’টি খেজুর ডাল স্থাপন করা হয়। তিনি এটা করেছেন রাসুলের আমল দ্বারা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে। এ কাজ দ্বারা সকলের জন্য কবরে পুস্প দেয়া সুন্নাত প্রমাণিত হয় না। এটা ছিল ব্যক্তিগত ব্যাপার।
১৪-এক মিনিট নীরবতা পালন
মৃত ব্যক্তির জন্য এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করতে দেখা যায় অভিজাত ও উচ্চ মহলে। বড় ধরনের কোন অনুষ্ঠানে, যেখানে সমাজের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন, সেখানে যদি কোন মৃত ব্যক্তির সম্মান প্রদর্শনের জন্য কিছু করা হয়, তবে তাহল দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন। কখনো কখনো এক মিনিট নীরবতা পালন করার পর মুনাজাত করা হয়। কেন যে মৃত ব্যক্তিদের সম্মানে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয় তা প্রশ্নের ব্যাপার। যখন নীরবতা পালন করা হয় তখন আবার মুনাজাতের প্রয়োজন কি? এর উত্তর কয়েকটি হতে পারে : এক. যারা এমন করেন তারা জানেন যে, এক মিনিট নীরবতা পালনে মৃত ব্যক্তির কোন উপকার হয়নি। তাই একটু মুনাজাত করা হল, যদি আল্লাহ কবুল করেন। দুই. তারা চান যে, মৃত ব্যক্তির জন্য মুনাজাত করি। কিন্থ তারা যাদের কাছে দায়বদ্ধ, যাদের তল্পিবাহক তারা এটা পছন্দ করবে না, তাই তাদের পছন্দের দিকে তাকিয়ে এমন করেন। কেননা, পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টানগণ তাদের মৃতদের সম্মানে নীরবতা পালনের এমন সংস্কৃতি চর্চা করে। তিন. এমনও হতে পারে যে, আমাদের নেতা-নেত্রীরা এক মিনিট নীরবতা পালন করে তাদের পশ্চিমা গুর”দের এ মেসেজ দিতে চান যে, দেখ, আমরা মুসলিমরা কত উদার যে আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে সাথে তোমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানও পালন করি। আর তোমরা এমন সংকীর্ণমনা যে, শুধু নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন কর। তাই আমরা তোমাদের অনুগত বান্দা হলেও উদারতায় তোমাদের চেয়ে এগিয়ে। চার. এমনও হতে পারে, আমাদের নেতা-নেত্রীরা মনে করেন, যদি এক মিনিট নীরবতা পালন না করে শুধু মুনাজাত করি তবে লোকে বলবে যে, সে মুসলিম। আর আমাকে কেউ মুসলিম বলবে, এটা তো একটা লজ্জার ব্যাপার ! এ ছাড়া নীরবতা পালনের আরো কোন কারণ থাকলে থাকতেও পারে।
১৫-মৃত ব্যক্তির জায়নামাজ ও পোশাক দান করা
মৃত ব্যক্তির কল্যাণ, তার জন্য সওয়াব পাঠানোর উদ্দেশ্যে যে সকল কাজ করা হয়, তার একটি হল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া পোশাক, জায়নামাজ-ইত্যাদি ব্যবহৃত জিনিস-পত্র কোন ইমাম বা পীর সাহেব, অথবা আলেমকে দান করা হয়। নিয়ত করা হয় যে, যাকে দান করা হয়েছে সে যতদিন ব্যবহার করবে ততদিন মৃত ব্যক্তি এর সওয়াব পাবে। উদ্দেশ্যটা ভাল, কিন্থ সমস্যা ভিন্ন জায়গায় ; তাহল, লোকটি যখন ইন্তেকাল করল তখন থেকে তার ছোট বড় সকল সম্পদের মালিক তার উত্তরাধিকারীগণ। সম্পদ তাদের মধ্যে বণ্টন করার পূর্ব-পর্যন্ত এগুলো কাউকে দান করা যাবে না-তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এগুলো হল : এক. মৃত ব্যক্তি যদি জীবদ্দশায় অসীয়ত করে যান যে, আমার অমুক বস’টি অমুককে দান করে দেবে, তবে অসীয়তের যাবতীয় নিয়ম মান্য করে দান করা যেতে পারে। দুই. ইনে-কালের পর তার সকল ওয়ারিশগণ যদি সন্থষ্টচিত্তে কোন বস’ কাউকে দান করার সিদ্ধানে- একমত হন, তবে তাতে দোষ নেই। কিন্থ আমাদের সমাজে যা দেখা যায়, তাহল : মৃত ব্যক্তির আপনজনের মধ্যে কোন ব্যক্তি-যেমন তার স্ত্রী অথবা বড় ছেলে মৃত ব্যক্তির জিনিসপত্র দান করেন। যদি বলা হয়, এতে সকলের সম্মতির থাকা দরকার, তখন বলা হয়, সে কি অসম্মত হবে? সে সম্মতি দেবে, অমত করবে না। এ ধরনের কাজ ইসলামী শরীয়ত অনুমোদন করে না।
১৬-লাশ ও কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত
অনেককে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করেন। মৃতের লাশের কাছেও কুরআন পাঠ করতে দেখা যায়। কেউ সূরা ইয়াসীন পড়েন, কেউ পড়েন সূরা তাকাসুর। কেউ সূরা ফাতেহা পড়েন। আবার কেউ তিন বার সূরা ইখলাস পড়ে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য পাঠিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে বহু বার কবর যিয়ারত করেছেন। তিনি কখনো কোন কবরের কাছে গিয়ে সূরা ফাতেহা, কুরআন থেকে কোন সূরা বা কোন আয়াত পাঠ করেননি। কুরআনের ফযীলত তার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সকলের চেয়ে বেশি অবগত ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে ইমামদের তিনটি মত পাওয়া যায়। এক. না-জায়েয ও বিদআত। ইমাম আবু হানিফা রহ. ইমাম মালেক রহ. ও ইমাম আহমদ রহ. এ মত পোষণ করতেন। দুই. জায়েয: ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান এ মত পোষণ করতেন। তিন. শুধু দাফনকালে কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত জায়েয। ইমাম শাফিয়ী রহ. এ মত পোষণ করেন এবং ইমাম আহমদ থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
ইমাম নববী রহ. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু ব্যক্তির কবরে খেজুর ডাল গেড়ে দিয়েছিলেন এ জন্য যে খেজুর ডাল যতক্ষন তাজা থাকবেততক্ষণ জিকির করবে ফলে কবরে আযাব হবে না। যদি খেজুর ডালের জিকিরের কারণে কবর আযাব বন্ধ হয় তাহলে
কুরআন তিলাওয়াত করলে কবরের আযাব বন্ধ হবে না কেন? তাই কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। কিন্তু তার এ মত অনুমান নির্ভর মাত্র। এর সমর্থনে অনুমান ছাড়া অন্য কোন প্রমাণ নেই। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি অধিক যত্নবান ছিলেন। তবে এ দু কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করেননি। মুজতাহিদ ইমামদের মতামত যা-ই হোক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তার সাহাবাদের থেকে যা অনুমোদিত নয়, তা শরীয়ত সম্মত বলে স্বীকৃতি পাবে না কখনো। ইমামদের মতামত হল ব্যক্তিগত ইজতিহাদ। এ ইজতিহাদে ভুল করলেও তারা সওয়াব পাবেন আল্লাহর কাছে। কোন কবরের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর সাহাবাদের কেউ কুরআন থেকে কোন কিছুই পাঠ করেননি-না সূরা ফাতেহা না সূরা ইখলাস বা সূরা তাকাসুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারতকালে কবরবাসীকে সালাম দিয়েছেন, ও তাদের জন্য দুআ করেছেন। বহু হাদীসে কীভাবে তিনি সালাম দিয়েছেন ও দুআ করেছেন-তার বর্ণনা এসেছে। যেমন তিনি কবর যিয়ারতকালে বলতেন‏‏ –

السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وإنا إن شاء الله بكم لاحقون، نسأل الله لنا ولكم العافية. (رواه مسلم ৯৭৩)‏
হে মুমিন মুসলিম কবরবাসী ! তোমাদের উপর শানি- বর্ষিত হোক। আল্লাহর ই”ছায় আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হব। আল্লাহর কাছে আমাদের ও তোমাদের জন্য সুখ ও শানি- প্রার্থনা করছি।