মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত পর্বঃ ৩

মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত

পর্বঃ ১ ।। পর্বঃ ২ ।। পর্বঃ ৩ ।। পর্বঃ ৪

১৭-জানাযা নামাজ শেষে সম্মিলিতভাবে দুআ-মুনাজাত
আমাদের দেশের অনেক স্থানে দেখা যায়, যখন জানাযা নামাজ শেষ হল, তখন ইমাম সাহেব নামাজে অংশ গ্রহণকারীদের সাথে নিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ-মুনাজাত করেন। জানাযা নামাজ পড়া হল মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন ও তার জন্য মাগফিরাত কামনার জন্য দুআ-প্রার্থনা। জানাযা নামাজে তার জন্য দুআ-মুনাজাত শেষ করে আবার সাথে সাথে দুআ-মুনাজাত করার মধ্যে কি হিকমত থাকতে পারে? উদ্দেশ্য হতে পারে, আল্লাহকে এ কথা জানিয়ে দেয়া যে, হে আল্লাহ ! মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ-মুনাজাত করার যে পদ্ধতি আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়ে গেছেন, তাতে আমরা সন্তষ্ট হতে পারলাম না। তাই আমরা আবার আমাদের পছন্দ মত নিয়মানুসারে আমাদের মত করে দুআ-মুনাজাত করে নিলাম। জানাযা নামাজ শেষে দুআ-মুনাজাত করার অনুমোদন নেই। তবে দাফন শেষে কবরের কাছে দুআ করার অনুমোদন আছে। যেমন হাদীসে এসেছে-

كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا فرغ من دفن الميت وقف عليه، وقال : استغفروا لأخيكم وسلوا له التثبيت، فإنه الآن يسأل. رواه أبو داود
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত ব্যক্তির দাফন শেষ করতেন তখন তার কবরের কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনা কর এবং তার অবিচল থাকার জন্য দুআ কর। কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হবে। আবু দাউদ

১৮-মৃত্যু-দিবস পালন
আমাদের সমাজে যেমন জন্ম-দিবস পালনের রেওয়াজ আছে তেমনি আছে মৃত্যু দিবস পালনের প্রথাও। এ প্রথাটি সম্পূর্ণ বিধর্মীদের। ইসলাম বা মুসলমানদের আচার নয়। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হল, মুসলিমগণ কাফেরদের অনুসরণ করে তাদের এ প্রথা মত আমল করে যাচ্ছে। যদি এটাকে ধর্মীয় আচার মনে করে করা হয় তবে তা বিদআত হিসেবে একটা গুনাহের কাজ বলে পরিগণিত হবে। আর যদি সমাজে প্রচলিত প্রথা হিসেবে করা হয় তবে তা অমুসলিমদের অনুসরণ-অনুকরণের দোষে দুষিত হবে, যা নি:সন্দেহে একটি মারাত্মক অপরাধ ও নিষিদ্ধকর্ম।

▓ ▒ ░ এ পদ্ধতিগুলো কি ইসলাম সম্মত? ░ ▒ ▓

মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব পাঠানোর উদ্দেশ্যে প্রচলিত যে পদ্ধতিগুলো আলোচিত হল সেগুলো কি ইসলামী শরীয়ত অনুমোদিত? না-কি মানুষের আবিষ্কার করা কুসংস্কার বা বিদআত? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর উত্তর দেয়ার পূর্বে কয়েকটি সর্বসম্মত মূলনীতি আলোচনা করা উচিত বলে মনে করি।
এক. ইসলাম বলতে আমরা কুরআন ও সুন্নাহকে বুঝি। কোন বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান তালাশ করে না পেলে সেখানে মুসলিম ধর্মবেত্তাদের ঐক্যমত (ইজমা) অথবা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গবেষণা করে আহরিত বিধান-যাকে কিয়াস বলা হয়- গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া অন্য কিছু ইসলামী আচার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। আবারও বলতে হয়, যদি কোন বিষয় কুরআন ও হাদীসে দিক-নির্দেশনা পাওয়া না যায় তবেই ইজমা বা কিয়াসের প্রশ্ন আসে। অতএব কুরআন অথবা হাদীসের দিক-নির্দেশনা রয়েছে এমন কোন বিষয় ইজমা বা কিয়াসের প্রয়োজন নেই। এরূপ বিষয়ে ইজমা ও কিয়াসের আশ্রয় নিলে তা হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য সমর্থনের উদ্দেশ্যে।
দুই. আমরা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছোনোর জন্য যা কিছু করব তা তার কাছে পৌঁছে দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কোন মানুষ, সমাজ, কোন দল বা শক্তি মৃত ব্যক্তির কাছে সওয়াব পৌঁছে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। তার কোন কল্যাণ করতে পারে না। তাই যিনি সওয়াব পৌঁছে দিবেন তার কাছে ছাওয়াবের জন্য করা সেই কাজটি গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যদি আল্লাহর কাছে কাজটি কবুল বা গ্রহণযোগ্য না হয় তবে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছার প্রশ্নই আসে না।
তিন. আল্লাহর কাছে যে কোন আমল বা নেক কাজ গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য দুটি শর্তের উপসি’তি জরুরি। যদি এ দুটো শর্তের কোন একটি অনুপসি’ত থাকে, তবে আমলটি আল্লাহর কাছে অগ্রাহ্য হবে। আল্লাহর কাছে কবুল না হলে তা মৃতের কোন উপকারে আসবে না। শর্ত দুটো হল : ইখলাস ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশিত পদ্ধতির অনুসরণ।
প্রথম শর্ত ইখলাস ; অর্থাৎ কৃত সৎকর্মটি আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের নিয়তে করতে হবে। আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের নিয়ত ব্যতীত অন্য কোন নিয়তে করা হলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।
দ্বিতীয় শর্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য। কাজটি আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের জন্য করা হল ঠিকই, কিন্ত আল্লাহর রাসূল কর্তৃক কাজটি অনুমোদিত হয়নি, তাহলে এ কাজও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন

من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد. (مسلم ১২/১৬)
অর্থ : যে কেউ এমন আমল করবে যা করতে আমরা (ধর্মীয়ভাবে) নির্দেশ দেইনি তা প্রত্যাখ্যাত। মুলসিম ১২/১৬

যেমন কোন ব্যক্তি নামাজ পড়ল কিন্ত আল্লাহকে সন্তষ্ট করার নিয়তে নয়, অন্য নিয়তে। তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। যদিও সে নামাজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতিতে পড়া হয়। এমনিভাবে, কেউ সূর্যোদয়ের মুহূর্তে আল্লাহকে সন্তষ্ট করার একশ ভাগ নিয়তে নামাজ পড়ল, তবে তা কবুল হবে না। কারণ সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করেনি।
উপরোল্লেখিত আলোচনায় আমরা যে ফলাফল পেলাম তা হল:-

  • (ক) মৃত ব্যক্তির জন্য যা কিছু করা হবে তা আল্লাহকে সন্তষ্ট করার নিয়তে করতে হবে।
  • (খ) মৃত ব্যক্তির জন্য যা কিছু করা হবে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। যদি অনুমোদিত না হয় তবে তা হবে প্রত্যাখ্যাত। তাতে কোন সওয়াবই হবে না। সওয়াব না হলে মৃতের কাছে পৌঁছার কিছু থাকে না।
  • (গ) কুরআন ও হাদীসে মৃত ব্যক্তির কল্যাণে কোন কিছু করার দিক-নির্দেশনা আছে কি-না?

উত্তর : অবশ্যই আছে। যদি থেকেই থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে কোন কিছু গ্রহণযোগ্য হবে না। কোন সমাজ বা ধর্মের প্রথা কখনো এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা যাবে না। সকল মানুষ জানে এবং স্বীকার করবে যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবদ্দশায় তাঁর অনেক প্রিয়জন, আপনজন ইন্তেকাল করেছেন। ইন্তেকাল করেছেন প্রিয়তমা সহধর্মিণী খাদিজা রা., মেয়ে রুকাইয়া রা., ছেলে কাসেম, তাইয়েব, ইবরাহীম। প্রিয়তম চাচা হামযা রা. তাঁর প্রিয় আরো বহু সহচর। কিন্ত তিনি কখনো তাদের কারো জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠান করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকাল হল। তাঁর সাহাবায়ে কেরাম শোকে দিশেহারা হলেন। ব্যথিত ও মর্মাহত হলেন। কিন্ত তারা কি কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইছালে ছাওয়াবের জন্য কোন অনুষ্ঠান করেছেন? সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর যুগে খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর রা. ইন্তেকাল করলেন। উমর রা. উসমান রা. আলী রা. শহীদ হলেন। তারা কি তাদের জন্য এ ধরনের কোন অনুষ্ঠান করেছেন? করেননি কখনো। তাই

কোন রকম দ্বিধা ছাড়া বলা যায় যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবায়ে কেরাম, তাদের পরবর্তীকালের তাবেইন ও ইমামগণ কেউই কারো জন্যে কুলখানী, ফাতেহা পাঠ, চেহলাম, মাটিয়ালভোজ, মীলাদ, খতমে তাহলীল, কুরআন খতম, কাঙ্গালী ভোজ, ওরস, ইছালে ছাওয়াব মাহফিল, উরসে কুল, কবরের কাছে কুরআন পাঠ, মৃত্যু-দিবস পালন, কবরে ও কফিনে ফুল দেয়া, এক মিনিট নীরবতা পালন, জানাযার নামাজের পর মুনাজাত-কোনটিই করেননি।

তিনি বহুবার তার প্রিয়জনদের কবর যিয়ারত করেছেন। কবর যিয়ারত করতে গিয়ে তিনি কি বলেছেন, কি কী দুআ পড়েছেন তা হাদীসের কিতাবে সংরক্ষিত আছে। তিনি তো কখনো কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করেননি। কাউকে করতেও নির্দেশ দেননি। তারপর তার সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন। তারা কারো কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কবরের কাছে কুরআন পাঠ করেছেন এমন কোন প্রমাণ নেই। এগুলো বিদআত। এর মাঝে কিছু কিছু কাফেরদের আচার হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যাত। আবার কোনটি কাফেরদের ধর্মীয় আচার থেকে মুসলমানরা কিছুটা সংশোধিত আকারে চালু করেছে। কাজেই এগুলো কিছুই করা যাবে না। করলে সওয়াব হবে না ; বরং গুনাহ হবে। মৃত ব্যক্তির কাছে কিছুই পৌঁছোবে না। সবই বৃথা যাবে। অনেকে মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ-মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে তার ঘরে একত্রিত হয়ে দুআ-অনুষ্ঠান করে থাকেন। মনে করেন এতে অসুবিধা নেই। আমরা তো মীলাদ পড়ছিনা। কিন্ত ইসলামী শরীয়তে এর বৈধতা কতটুকু তা কি ভেবে দেখেছেন?
হাদীসে এসেছে –

قال جرير بن عبد الله رضي الله عنه : كنا نعد الاجتماع إلى أهل الميت وصنيعة الطعام بعد دفنه من النياحة. (أخرجه الإمام أحمد – ৬৯০৫)
সাহাবী জরীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, মৃত ব্যক্তির দাফন করার পর তার পরিবারের কাছে জমায়েত হওয়া ও খানা-পিনার ব্যবস্থা করাকে আমরা জাহেলী যুগের নিয়াহা হিসেবে গণ্য করতাম। (বর্ণনায় : ইমাম আহমদ)

নিয়াহা হল: মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশে আনুষ্ঠানিক কান্নাকাটির আয়োজন করা। জাহেলী যুগে এ প্রথা চালু ছিল। ইসলাম এটাকে নিষিদ্ধ করেছে।
সাহাবী জরীর রা. এর প্রতিনিধি দল যখন উমর রা. এর কাছে আসল, তখন উমর রা. তাদের প্রশ্ন করলেন:

هل يناح على ميتكم؟ قال : لا، قال: وهل يجتمعون عند الميت،ويجعلون الطعام؟ قال: نعم، قال: ذلك النوح. (المغني لابن قدامة ২/৫৫০)
‘তোমরা কি তোমাদের মৃতদের জন্য নিয়াহা কর? তারা বলল, না। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি মৃত ব্যক্তির কাছে একত্র হয়ে থাকো এবং খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকো? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন: এটাইতো নিয়াহা।

অতএব মৃত ব্যক্তির জন্য এমন কোন অনুষ্ঠান করা ঠিক নয় যা হাদীসে রাসূল দ্বারা প্রমাণিত নয়। এগুলো সবই বেদআতের মধ্যে গণ্য হবে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে সকল প্রকার বিদআত বা নব-আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করা মুসলমানের দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد. (رواه البخاري ২৬৯৭ ومسلم)
অর্থ : যে আমাদের এ ধর্মে এমন কিছুর প্রচলন করবে যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে। বুখারী-মুসলিম

হাদীসে আরো এসেছে
عن جابر رضي الله عنه أن النبى صلى الله عليه وسلم كان يقول في خطبة يوم الجمعة: أما بعد فإن خير الحديث كتاب الله، وخير الهدي هدي محمد صلى الله عليه وسلم، وشر الأمور محدثاتها، وكل بدعة ضلالة. (رواه مسلم ৩/১৫৩)
সাহাবী জাবের রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার খুতবায় বলতেন : আর শুনে রেখ ! সর্বোত্তম কথা হল আল্লাহর কিতাব ও সর্বোত্তম পথ-নির্দেশ হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ-নির্দেশ। ধর্মে নতুন বিষয় প্রচলন করা সর্ব নিকৃষ্ট বিষয়। এবং সব ধরনের বিদআতই পথভ্রষ্টতা।
যারা এ সকল কাজ করেন তাদেরকে যখন আমরা বলি : এগুলো আল্লাহর রাসূল করেননি, তাঁর সাহাবাগণের কেউ করেননি বা করার জন্য বলেননি, তাই এগুলো বিদআত। তারা উত্তরে বলেন : হ্যা, বিদআত ঠিকই, কিন্ত এগুলো বিদআতে হাসানা বা উত্তম বিদআত। তাদের এই উক্তিটিও আসলে একটি বিদআত। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তার সাহাবায়ে কেরামের কেউ বলেননি যে, বিদআতে হাসানা বা উত্তম বিদআত বলে কিছু আছে। বরং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন

كل بدعة ضلالة অর্থ : সকল বিদআতই পথভ্রষ্টতা। (মুসলিম, ইবনে মাজাহ) তাই ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন
من ابتدع فى الإسلام بدعة يراها حسنة فقد زعم أن محمداً صلى الله عليه وسلم خان الرسالة، فإن الله سبحانه وتعالى يقول (اليوم أكملت لكم دينكم) فما لم يكن يومئذ ديناً فلا يكون اليوم ديناً.
অর্থ : যে ব্যক্তি ইসলামের মাঝে কোন বিদআতের প্রচলন করে, আর তাকে হাসানাহ বা ভাল বলে মনে করে, সে যেন প্রকারান-রে এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাতে খিয়ানত করেছেন।

কারণ, আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন : ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করে দিলাম।’ সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যা ধর্মরূপে গণ্য ছিল না, আজও তা ধর্ম বলে গণ্য হতে পারে না।
অনেকে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম মাইকে আযান দেননি ; আমরা মাইকে আযান কেন দেব? এটা কি বিদআত নয়? এটা বিদআত হলে কোন ধরনের বিদআত? এটাইতো বিদআতে হাসানা বা উত্তম বিদআত। এমনি আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যেগুলো বিদআতে হাসানা বলে স্বীকার না করে গত্যন-র নেই।’ আসলে এটা একটা বিভ্রানি-। এ ধরনের বিষয়গুলো বিদআতে হাসানা নয়। এগুলো হল সুন্নতে হাসানা। যে সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :-

من سن فى الإسلام سنة حسنة فله أجرها وأجر من عمل بها بعده من غير أن ينقص من أجورهم شيء، ومن سن في الإسلام سنة سيئة فله وزرها ووزر من عمل بها من بعده من غير أن ينقص من أوزارهم شيء. (رواه مسلم عن جرير بن عبد الله رضي الله عنهما. رقم الحديث ৭/১০২-১০৪)
অর্থ : যে ইসলামে কোন ভাল পদ্ধতি প্রচলন করল, সে তার সওয়াব পাবে এবং সেই পদ্ধতি অনুযায়ী যারা কাজ করবে তাদের সওয়াবও সে পাবে, তাতে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন খারাপ পদ্ধতি প্রবর্তন করবে সে তার পাপ বহন করবে, এবং যারা সেই পদ্ধতি অনুসরণ করবে, তাদের পাপও সে বহন করবে, তাতে তাদের পাপের কোন কমতি হবে না। মুসলিম

বিদআত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য কিছু কথা এখানে বলতে হয়।

প্রথম কথা : বিদআত বা নব আবিষ্কার সকল ক্ষেত্রে নিন্দিত নয়। শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যে যা কিছু নব-আবিষ্কার সেটা হল নিন্দিত ও পরিত্যাজ্য। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিদআতকে নিষিদ্ধ করেছেন। আর শরীয়তের পরিভাষায় এটাকেই বিদআত বলা হয়।

দ্বিতীয় কথা : ধর্মীয় ক্ষেত্র ছাড়া মানব কল্যাণের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নব-আবিষ্কার গ্রহণযোগ্য। এই নব-আবিষ্কারকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি, বরং উৎসাহিত করেছে। তৃতীয় কথা : ধর্মীয় কোন বিধি-বিধান বা আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে কোন কিছুকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বা কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা বিদআতের মধ্যে গণ্য হবে না। যেমন আযান দেয়ার জন্য মাইকের ব্যবহার, সালাত ও রোযার সময় জানতে ঘড়ি, কম্পাস ও ক্যালেন্ডারের ব্যবহার-ইত্যাদি বিদআতের মধ্যে গণ্য হবে না। কারণ, কেউ এগুলোকে ধর্মের অংশ মনে করে না। বা এগুলোর মাধ্যমে ধর্মে কোন নতুন আচর চালু হয়নি। বরং, যা হয়েছে তাহল প্রাচীন আচারের অবকাঠামো ঠিক রেখে তা বাস-বায়নে আধুনিক পদ্ধতির অবলম্বন যা শরীয়তের পরিভাষায় ভাল ও উপকারী পদ্ধতি বা সুন্নাতে হাসানা বলা যায়। বিদআত নয়।

◄ ◄ মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব পাঠানোর উদ্দেশ্যে যা কিছু করা হয় সবগুলো ধর্মীয় আচার মনে করে করা হয়। সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যেই করা হয়। অতএব, বর্ণিত সকল অনুষ্ঠান বিদআত। বিদআতের ক্ষতি অনেক এবং সুদূর প্রসারী। যার বিস্তারিত আলোচনা এ স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। বিদআত ধর্মকে বিকৃত করে। ইসলামে বিদআতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদআতী আচার-অনুষ্ঠান করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত বিলুপ্ত হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তির জন্য ইছালে ছাওয়াবের বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করুন : দেখবেন, এ ক্ষেত্রে বিদআতী নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশিত ও অনুমোদিত পদ্ধতিকে পরিহার করা হচ্ছে। এ সকল অনুষ্ঠানাদি করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ খরচ করা হয়, তার সকল ওয়ারিশদের পক্ষ থেকে যথাযথ অনুমতি না নিয়ে, অন্যায়ভাবে। এতে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। কারো অধিকার ক্ষুণ্ন করে তা দিয়ে ছাওয়াবের কাজ করলে তা কবুল হবে না। যখন কবুল হবে না, তখন তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছার ধারণা করা অবান্তর।