মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত পর্বঃ ৪

মৃত ব্যাক্তির নামে কতিপয় বিদ’আত

পর্বঃ ১ ।। পর্বঃ ২ ।। পর্বঃ ৩ ।। পর্বঃ ৪

ইছালে ছাওয়াবের জন্য কী করা যেতে পারে

কোন মানুষ যখন মৃত্যু বরণ করে, তখন তার আপনজনেরা স্বজন হারানোর ব্যথায় থাকে চরমভাবে ব্যথিত। ভাবতে থাকে যে, আপনজন চিরদিনের জন্য চলে গেলেন ; তার উপকার হয়-এমন কিছু করা যায় কি-না। এ ব্যাপারে আন-রিকতার কোন অভাব থাকে না। সন্ধান করতে থাকে কী করা যায় তার জন্য। কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানের সাথে ভাল সম্পর্ক না থাকার কারণে অনেকেই এক্ষেত্রে সঠিক দিক-নির্দেশনা পায় না, তাই হয়ে পড়ে বিভ্রান-। ফলে, সে কল্যাণকর মনে করে এমন কিছু করে, যা মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। এমন কাজ করে, যা কুরআন বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং, তার কাজগুলো বিদআত ও সুন্নাহ পরিপন্থী হওয়ার কারণে গুনাহ হয়। ভাবতে গিয়ে অবাক না হয়ে পারা যায় না যখন দেখা যায় যে, হাদীসে রাসূলে এ সম্পর্কে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা আছে তা পাশ কাটিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার তথা বিদআতের আশ্রয় নেয়া হয়। এমন কাজ করা হয়, যা কোনভাবেই মৃত ব্যক্তির কল্যাণে আসে না ; এবং এগুলো যে মৃত ব্যক্তির জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনে, তার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই। তাই দেখা যাক এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে কী নির্দেশনা রয়েছে।

  • এক. মৃত ব্যক্তিদের জন্য দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা :

আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ. (الحشر :১০)
‘যারা তাঁদের পরে এসেছে তারা বলে ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের যে সকল ভাই পূর্বে ঈমান গ্রহণ করেছে তাদের ক্ষমা কর।’ [সুরা হাশরঃ ১০]

এ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সকল মুসলিম দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, তাদের মাগফিরাতের জন্য প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। তাই বুঝে আসে মৃত ব্যক্তিদের জন্য মাগফিরাতের দুআ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। যদি এটা তাঁদের জন্য কল্যাণকর না হত, তবে আল্লাহ তা করতে আমাদের উৎসাহিত করতেন না। এমনিভাবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মৃত ব্যক্তিদের জন্য দুআ-প্রার্থনা করার কথা কুরআনের একাধিক আয়াতে উল্লেখ করেছেন। হাদীসে এসেছে-

عن أبي أسيد الساعدي قال سأل رجل من بني سلمة فقال يارسول الله هل بقي من بر أبواي شيء أبرهما بعد موتهما، فقال نعم، الصلاة عليهما والاستغفار لهما وإنفاذ عهدهما بعد موتهما وصلة الرحم التي لا توصل إلا بهما وإكرام صديقهما.رواه أبو داود وابن ماجة
-সাহাবী আবু উসাইদ আস-সায়েদী রা. কর্তৃক বর্ণিত যে, বনু সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রাসূল ! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর এমন কোন কল্যাণমূলক কাজ আছে যা করলে পিতা-মাতার উপকার হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন : হ্যাঁ, আছে। তাহল, তাদের উভয়ের জন্য আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা। উভয়ের মাগফিরাতের জন্য দুআ করা। তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করা। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখা ও তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা। [আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ]

হাদীসে এসেছে-

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا مات الإنسان انقطع عنه عمله إلا من ثلاث: إلا من صدقة جارية أو علم ينتفع به أو ولد صالح يدعو له.رواه مسلم ১৬৩১ والنسائ ৩৫৯১
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন’ তিনটি কাজের ফল সে পেতে থাকে-১. সদকায়ে জারিয়াহ (এমন দান যা থেকে মানুষ অব্যাহতভাবে উপকৃত হয়ে থাকে) ২. মানুষের উপকারে আসে এমন ইলম (বিদ্যা) ৩. সৎ সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে। এ হাদীস দ্বারা বুঝে আসে যে : সন্তান যদি সৎ হয় ও পিতা-মাতার জন্য দুআ করে তবে তার ফল মৃত পিতা-মাতা পেয়ে থাকেন। [মুসলিম, নাসায়ী]

  • দুই. মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সদকাহ করা ও জনকল্যাণ মূলক কাজ করা :

হাদীসে এসেছে-

عن عائشة رضي الله عنها أن رجلا أتى النبى صلى الله عليه وسلم، فقال يا رسول الله إن أمي افتلتت نفسها ولم توص وأظنها لو تكلمت تصدقت أفلها أجر إن تصدقت عنها؟ قال: نعم.رواه البخاري ১৩৮৮ و مسلم ১০০৪
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল যে, আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছেন, কোন কিছু দান করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয় যদি তি কথা বলতে পারতেন তবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিতেন। আমি যদি তার পক্ষে সদকা করি তাহলে তিনি কি তা দিয়ে উপকৃত হবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : হ্যাঁ। [বুখারীঃ ১৬৩১, মুসলিমঃ ৩৫৯১]

হাদীসে এসেছে-

عن سعد بن عبادة رضي الله عنه أنه قال: يا رسول الله إن أم سعد ماتت فأي الصدقة أفضل؟ قال: الماء، فحفر بئرا وقال : لأم سعد. رواه النسائي ৩৫৮৯ وأحمد
সাহাবী সা’দ বিন উবাদাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইনে-কাল করেছেন। কী ধরনের দান-সদকা তার জন্য বেশি উপকারী হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘পানির ব্যবস্থা কর’। অত:পর তিনি (সা’দ) একটা পানির কূপ খনন করে তার মায়ের নামে (জন সাধারণের জন্য) উৎসর্গ করলেন। [নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদ]

হাদীসে আরো এসেছে

عن ابن عباس رضي الله عنهما أن رجلا قال يا رسول الله إن أمه توفيت أفينفعها إن تصدقت عنها، قال نعم، قال فإن لي مخرفا فأشهدك أني قد قد تصدقت به عنها. رواه النسائي ৩৫৯৫
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মৃত্যু বরণ করেছে। যদি আমি তার পক্ষে ছদকাহ (দান) করি তাহলে এতে তার কোন উপকার হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। এরপর লোকটি বলল, আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি আমার একটি ফসলের ক্ষেত তার পক্ষ থেকে সদকাহ করে দিলাম। [নাসায়ীঃ ৩৫৯৫]

  • তিন. কুরবানী করা :-যেমন হাদীসে এসেছে-

 

عن عائشة وأبي هريرة رضي الله عنهما أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا أراد أن يضحي اشترى كبشين عظيمين سمينين أقرنين أملحين موجوئين ( مخصيين)، فذبح أحدهما عن أمته لمن شهد لله بالتوحيد وشهد له بالبلاغ، وذبح آخر عن محمد وعن آل محمد صلى الله عليه وسلم . (رواه ابن ماجة ৩১১৩ وصححه الألباني)
আয়েশা রা. ও আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কুরবানী দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটো দুম্বা ক্রয় করলেন। যা ছিল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিং ওয়ালা, সাদা-কালো বর্ণের এবং খাসি। একটা তিনি তার ঐ সকল উম্মতের জন্য কুরবানী করলেন, যারা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়েছে ও তার রাসূলের রিসালাত পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে, অন্যটি তার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য কুরবানী করেছেন। [ইবনে মাজাহ]

  • চার. মৃতদের পক্ষ থেকে তাদের অনাদায়ি হজ উমরা, রোযা আদায় করা :

বহু সংখ্যক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির অনাদায়ি হজ, উমরা, রোযা-ইত্যাদি আদায় করা হলে তা মৃতের পক্ষ হতে আদায় হয়ে যায়। যেমন তাদের পক্ষ থেকে তাদের পাওনা আদায় করলে তা আদায় হয়ে যায়। উল্লেখিত হাদীসসমূহে মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় সম্পর্কে যে দিক-নির্দেশনা আমরা পেলাম তা হল মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দুআ করা। কুরআন ও হাদীসে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাদের ইছালে ছাওয়াবের জন্য অধিকতর স্থায়ী জনকল্যাণ মূলক কোন কাজ করা। যেমন মানুষের কল্যাণার্থে নলকূপ, খাল-পুকুর খনন, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, মাদরাসা-মসজিদ, পাঠাগার নির্মাণ। দ্বীনি কিতাবাদী-বই-পুস-ক দান, গরিব-দু:খী, অভাবী, সম্বলহীনদের দান-সদকা করা। মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামী প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা হয়-এমন সদকা বা দান। মৃত মাতা-পিতার বন্ধু বান্ধবদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখা। তাদের রেখে যাওয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করা।
আমাদের বিদায়ি আপনজনদের জন্য এমন কিছু করা উচিত যা সত্যিকারার্থে তাদের কল্যাণে আসে। এবং এ ব্যাপারে প্রচলিত সকল প্রকার কুসংস্কার, বিদআত, মনগড়া অনুষ্ঠানাদি পরিহার করে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনায় কাজ করা কাম্য। কেননা, যে সকল কাজ-কর্মে আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে অনুমোদন নেই তা বিদআত হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যাত। তা যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন, তা মৃত ব্যক্তির কোন উপকারে আসে না। বরং, আয়োজনকারীরা গুনাহগার হয়ে থাকেন।

এ সকল হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তার সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়টি বার বার জিজ্ঞাসা করেছেন যে, মৃত আপনজনের জন্য আমরা কি করতে পারি? মৃত মাতা-পিতার জন্য কি করা যেতে পারে? তিনি এর উত্তরে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। কোথাও তো বললেন না মীলাদ পড়াও, কুরআন খতম কর, খতমে তাহলীল আদায় কর, চেহলাম ও কুলখানি কর, ফাতেহা পাঠ কর, কবরে ফুল দাও, ইছালে ছাওয়াব মাহফিল কর, ওরস কর, প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকী পালন কর, তার কবরের কাছে যেয়ে কুরআন পাঠ কর…। রহমাতুল লিল আলামীন দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী করলে চির বিদায় হয়ে যাওয়া মানুষটির উপকার হবে সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই আদর্শ রেখে গেছেন ! আমরা কি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি বুঝে গেছি যে নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করে মৃত ব্যক্তির উপকার সাধনের ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি ?

তিনি তো ছিলেন তার উম্মতের প্রতি সবচেয়ে দয়ার্দ্র। আল্লাহ নিজেই তার সম্পর্কে বলেন :

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (التوبة : ১২৮)
‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। যা তোমাদের বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ [সুরা তাওবাঃ ১২৮]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত মানুষের জন্য সন্দেহাতীতভাবে সীমাহীন কল্যাণকর। আমাদের অনেকে মৃত ব্যক্তির জন্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। ধরুন তাতে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হল। যদি এ টাকা দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিক-নির্দেশনা মত নলকূপ খনন করা যেত তাহলে কম করে হলেও দশটি নলকূপ খনন করে মানুষের স্থায়ী উপকার করা যেত বা এ জাতীয় স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা যেত। যা দিয়ে মানুষ যুগের পর যুগ উপকার লাভ করতে পারত। এমনিভাবে যদি কোন দীনি মাদরাসায় ভবন নির্মাণ করে দেয়া হলে, তাতে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয় দুভাবে। প্রথমত: মাদরাসা ঘরের ব্যবস্থা করার সওয়াব। দ্বিতীয়ত: ইলম চর্চার সওয়াব। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পদে পদে এভাবেই মানুষকে কল্যাণকর পথের দিশা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রনিধানযোগ্য হাদীস হচ্ছে-

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن مما يلحق المؤمن من عمله وحسناته بعد موته علماً علمه ونشره وولدا صالحا تركه ومصحفا ورثه أو مسجدا بناه أو بيتا لابن السبيل بناه أو نهرا أجراه أو صدقة أخرجها من ماله في صحته وحياته من بعد موته. رواه ابن ماجه رقم ২৪৯
আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘মুমিনের ইনে-কালের পর তার যে সকল সৎকর্ম তার কাছে পৌঁছে তা হল, সে জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে যাওয়া যার প্রচার অব্যাহত থাকে, সৎ সন্তান রেখে যাওয়া, কুরআন শরীফ দান করে যাওয়া, মসজিদ নির্মান করে যাওয়া, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মান করে যাওয়া, কোন খাল খনন করে প্রবাহমান করে দেওয়া অথবা এমন কোন দান করে যাওয়া যা দ্বারা মানুষেরা তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর উপকার পেতে থাকে।’ [ইবনে মাজাহ]

এ হাদীস থেকে কয়েকটি বিষয় জানা গেল-

এক. জীবদ্দশায় এমন কিছু ভাল কাজ করা যেতে পারে যার সুফল মৃত্যুর পর পাওয়া যায়।
দুই. মৃত্যুর পর উপকারে আসে এমন কল্যাণকর কাজের কিছু নমুনা দেয়া হয়েছে বর্ণিত হাদীসে। যাকে ছদকায়ে জারিয়া বলা হয়।
তিন. সৎ সন্তান এমন এক সম্পদ মৃত্যুর পরও পিতা-মাতা তার দ্বারা উপকার পেয়ে থাকেন।
চার. হাদীসে বলা হয়েছে সৎ সন্তানের দুআ মৃত্যুর পর পিতা-মাতার কাজে আসে। তাই অসৎ সন্তানের দুআ কাজে আসবে এমনটি এ সকল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় না। সন্তানকে সৎ বানাতে প্রচেষ্টা চালানো এমন একটি মহৎ কাজ যার সুফল মৃত্যুর পরও পিতা-মাতা ভোগ করতে থাকে।
পাঁচ. এমন জ্ঞান যা মানুষের কল্যাণে আসে তা শিক্ষা দেয়া ও শিক্ষার কাজে সহযোগিতা করা একটি ছদকায়ে জারিয়া। দীনি ইলম তো অবশ্যই কল্যাণকর।
ছয়. এ হাদীসে মুমিন ব্যক্তিকে এমন কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে যা মৃত্যু পরবর্তী জীবনে কাজে আসবে। তাই নিজের ইছালে ছাওয়াবের জন্য প্রত্যেকেই নিজ জীবনে কিছু কাজ করে যেতে পারাটা একটা বিশাল অর্জন।

সকল প্রকার নেক আমল কি মৃত ব্যক্তির জন্য নিবেদন করা যায়?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মৃত ব্যক্তির জন্য যে সকল নেক আমল নিবেদনের কথা বর্ণিত হয়েছে বা অনুমোদিত হয়েছে সে সকল আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য পাঠানো যায় এ ব্যাপারে কারো দ্বি-মত নেই। এর বাইরে অন্যান্য সকল নেক আমল যেমন কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ইত্যাদি মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য আদায় করা যাবে কি না এ সম্পর্কে ইমামদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে ।
প্রথম মত: যে সকল নেক আমল মৃত ব্যক্তির জন্য নিবেদন করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুমতি ও অনুমোদন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, শুধু সে সকল আমলই মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য করা যাবে। এ ছাড়া অন্য কোন নেক আমল ইবাদত-বন্দেগী মৃত ব্যক্তির ছাওয়াবের জন্য প্রেরণ করা যাবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. সহ বহু আলেম ও ধর্মবেত্তাগণ এ মত পোষণ করেন।
দ্বিতীয় মত: সকল প্রকার নেক আমল যা হাদীস ও কুরআনে নেক আমল বলে স্বীকৃত তার সকল কিছুই মৃত ব্যক্তির জন্য নিবেদন করা যায়। এ মত পোষণ করেন ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মালেক রহ., ইমাম আহমদ রহ. সহ অনেক ইমাম। তাদের যুক্তি হল : যে ব্যক্তি ইবাদত-বন্দেগী বা কোন নেক আমল করবে তার মালিক সে। সে যাকে ইচ্ছা তার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যে সকল নেক আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তিনি সে সকল সম্পর্কে অনুমতি দিয়েছেন, রোযা, হজ, সদকা ইত্যাদি। তাকে যদি কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হত, তাহলে তিনি অনুমতি দিতেন এবং বলতেন : হ্যাঁ, এগুলো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তোমরা করতে পার। অতএব যে সকল নেক আমল সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে অনুমতি দিয়েছেন শুধু সেগুলো মৃত ব্যক্তির ছাওয়াবের জন্য করা যাবে অন্য কিছু করা যাবে না এ কথা ঠিক নয়।
কোন মতটি অধিকতর বিশুদ্ধ
যে সকল নেক আমল শরীয়ত অনুমোদিত তার সবগুলোই কি মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য নিবেদন করা যাবে? নাকি নির্দিষ্ট কিছু বিষয় এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ? আসলে এ ক্ষেত্রে ইমাম ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ ইমামদের মত অধিকতর বিশুদ্ধ। কয়েকটি কারণে : এক. রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তার উম্মতের প্রতি সবচেয়ে দয়ার্দ্র। জীবিত ও মৃত সকলের প্রতি। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল মৃত ব্যক্তির উপকারের জন্য কি করা যায়। তখন তিনি সব কিছুর কথা বলে দিতে পারতেন। তিনি উম্মতের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। উম্মতকে শিক্ষা দিতে কখনো কোন কার্পণ্য করেননি। এটা সকলের কাছেই সত্য। তাই তিনি প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন সেটুকুই অনুমোদিত। যা বলেননি তা অনুমোদিত নয়। দুই. যদি বলা হয়, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যদি প্রশ্ন করা হত : মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে কি-না? তাহলে তিনি অনুমতি দিয়ে দিতেন। তাই মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য কুরআন তিলাওয়াত জায়েয আছে।’ আমরা যদি এ ধরনের একটি মূলনীতি প্রণয়নের পথ খুলে দেই, তাহলে সকলে তো এ কথাই বলবে যে, এ বিষয়টি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করলে তিনি অনুমোদন দিয়ে দিতেন, যেমন তিনি অনুমোদন দিয়েছেন অমুক অমুক বিষয়ে। তিনি যা অনুমোদন করেননি তা কখনো অনুমোদিত বলে ধরা হবে না। এটা সকলের কাছে যুক্তিসংগত এবং নিরাপদ বলে মনে হবে। দ্বিতীয় মতটি যুক্তি নির্ভর, হাদীস নির্ভর নয়। অতএব, মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের জন্য শুধু ঐ সকল আমলই করা যাবে যেগুলো করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমোদন দিয়েছেন। যে সকল নেক আমল মৃত ব্যক্তির ছাওয়াবের জন্য করার কথা তিনি বলে যাননি তা করা যাবে না। এটা যে বিশুদ্ধ ও সবচেয়ে নিরাপদ ও সতর্ক পথ তা ভিন্নমত পোষণকারীরাও স্বীকার করে থাকেন।