নবী (সঃ)যেভাবে হজ করেছেন (জাবের রা. এর বর্ননানুযায়ী)- (৩)

নবী (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন

(জাবের রা. যেমন বর্ণনা করেছেন)

শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী – রাহেমাহুল্লাহ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

দুই ওয়াক্ত সালাত একসাথে আদায় ও আরাফায় অবস্থান

৫৬- ‘এরপর বিলাল রা. একবার আযান দিলেন।’[দারেমী]

৫৭- অতপর ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (সবাইকে নিয়ে) যোহরের সালাত আদায় করলেন। বিলাল রা. পুনরায় ইকামত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসরের সালাতও আদায় করলেন।

৫৮- তিনি উভয় সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি।

৫৯- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ‘কাসওয়া নামক উটনীর’[ইবন মাজা] পিঠে আরোহন করলেন। এভাবে তিনি উকূফের স্থানে এলেন। তাঁর উটনী কসওয়ার পেট পাথরের[এ পাথরটি জাবালে রহমতের নিচে বিছানো। জাবালে রহমত অবস্থিত আরাফার মাঝামাঝি স্থানে। ইমাম নাববী রহ. বলেন, এটিই উকূফের মুস্তাহাব স্থান। অনেকে মনে করেন জাবালে রহমতে না ওঠলে উকূফ পূর্ণ হবে না- এটি সঠিক নয়] দিকে ফিরিয়ে রাখলেন। যারা পায়ে হেঁটে তাঁর সাথে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের সকলকে তাঁর সামনে রাখলেন এবং কিবলামুখী হলেন।[অন্য হাদীসে এসেছে, তিনি উকূফ করেছেন, উভয় হাত তুলে দু‘আ করেছেন। হাজ্জাতুন-নবী : ৭৩ পৃষ্ঠা]

৬০- সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই উকূফ করলেন। এমনিভাবে (পশ্চিম আকাশের) হলুদ আভা ফিকে হয়ে গেল এমনকি লালিমাও দূর হয়ে গেল[সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর প্রস্থান মুশরিকদের আচারের সাথে ভিন্নতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ছিল। কেননা মুশরিকরা সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমাদের আদর্শ তাদের থেকে ভিন্ন]

৬১- আর তিনি বললেন,

قَدْ وَقَفْتُ هَهُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ

‘আমি এখানে উকূফ করলাম; কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকূফের স্থান।’[আবূ দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ]

৬২- এরপর তিনি উসামা ইব্‌ন যায়েদ রা. কে তাঁর উটনীর পেছনে বসালেন।

আরাফা থেকে প্রস্থান

৬৮- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হলেন। ‘আর তিনি ছিলেন শান্ত-সুস্থির।’[আবূ দাউদ, নাসাঈ] তিনি কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরলেন, এমনকি উষ্ট্রীর মাথা তাঁর হাওদার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আর তিনি তাঁর ডান হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন,

أَيُّهَا النَّاسُ السَّكِينَةَ السَّكِينَةَ

‘হে লোকসকল! শান্ত হও শান্ত হও, ধীর-স্থিরভাবে এগিয়ে চল’।

৬৭- যখনই তিনি কোন বালুর টিলায় পৌঁছছিলেন, তখনই তা অতিক্রম করার সুবিধার্থে উষ্ট্রীর রশি ঢিলা করে দিচ্ছিলেন। এমনিভাবে তাতে উঠে তা অতিক্রম করছিলেন।

মুযদালিফায় একসাথে দুই সালাত আদায় এবং সেখানে রাত্রি যাপন

৬৮- এভাবে তিনি মুযদালিফায় এলেন। অতপর এক আযান ও দুই ইকামতসহ মাগরিব ও ইশার সালাত একসাথে আদায় করলেন এবং এ দুই সালাতের মাঝখানে তিনি কোন তাসবীহ বা নফল সালাত আদায় করলেন না।

৬৯- এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুয়ে পড়লেন। এভাবেই সুবহে সাদেক উদিত হল। ফজরের সময় সুস্পষ্ট হওয়ার পর (আওয়াল ওয়াক্তে) আযান ও ইকামতের পর ফজরের সালাত আদায় করলেন।

মাশআরে হারাম তথা মুযদালিফায় অবস্থান

৭০- অতপর তিনি কাসওয়ায় আরোহন করে মাশ‘আরে হারামে এলেন।[মাশআরে হারাম দ্বারা উদ্দেশ্য ‘কুযাহ’ নামক স্থান। এটি মুযদালিফার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়। সকল সীরাতবিদ ও মুফাসসিরের মতে, সমগ্র মুযদালিফাকেই মাশআরে হারাম বলে। ইমাম নাববী রহ.] অতপর তিনি তাতে আরোহন করলেন।’[আবূ দাউদ]

৭১- এরপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেন। ‘অতপর আল্লাহর প্রশংসা করলেন।’[আবূ দাউদ] তাঁর মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন। পূর্ব আকাশ পূর্ণ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে উকূফ করলেন।

৭২- ‘তিনি বললেন,

قَدْ وَقَفْتُ هَهُنَا وَالْمُزْدَلِفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ

‘আমি এখানে উকূফ করেছি; তবে মুযদালিফার পুরোটাই উকূফের স্থান।’[ নাসাঈ]

জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা

৭৩- অতপর তিনি সূর্য উঠার পূর্বেই ‘মুযদালিফা’[বাইহাকী] থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হলেন।[সূর্যোদয়ের পূর্বে মুযদালিফা থেকে প্রস্থান মুশরিকদের নিয়মের বিপরীত করার লক্ষ্যেই ছিল, কেননা মুশরিকরা মুযদালিফা ত্যাগ করতো সূর্যোদয়ের পর। রাসূল (সঃ) বলেছেন, ‘আমাদের আদর্শ ওদের থেকে ভিন্ন।’] ‘আর তিনি ছিলেন শান্ত ও সুস্থির।’[আবূ দাউদ]

৭৪- তিনি ফযল ইবন আববাস রা কে নিজের উটনীর পেছনে বসালেন।[এ হাদীস এবং পূর্বে বর্ণিত ৫৬ নং হাদীস থেকে বুঝা যায় বাহনের পেছনে কাউকে নিতে কোনো অসুবিধা নেই] আর তিনি ছিলেন সুন্দর চুল ও উজ্জ্বল ফর্সা চেহারার অধিকারী।

৭৫- রাসুলূল্লাহ (সঃ) যখন মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। তখন তাঁর কাছ দিয়ে কতিপয় মহিলা চলতে লাগল, আর ফযল তাদের দিকে তাকাতেন লাগলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ফযলের চেহারায় রাখলেন। তখন ফযল তার চেহারা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত অন্য দিক থেকে সরিয়ে ফযলের চেহারার ওপর আবার রেখে যেদিকে তিনি তাকাচ্ছিলেন সেদিক থেকে তার চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন।

৭৬- অবশেষে তিনি মুহাস্সার উপত্যকার মধ্যস্থলে[এই স্থানে আবরাহার হস্তি বাহিনীকে আল্লাহ তা‘আলা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ইবনুল-কায়্যিম রহ. বলেন, মুহাস্সার মিনা ও মুযদালিফার মাঝখানে অবস্থিত। এটা মিনা বা মুযদালিফার অন্তর্ভুক্ত নয়] পৌঁছলে উটের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন,

[দারেমী] عَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ ‘তোমরা শান্ত ও সুস্থিরভাবে চল।’

বড় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ

৭৭- ‘তারপর তিনি মাঝপথ ধরে চলতে লাগলেন[ ইমাম নাববী রহ. বলেন, এ থেকে জানা গেল, আরাফা থেকে ফেরার সময় এ পথে আসা অর্থাৎ এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং আরেক পথ দিয়ে ফেরা সুন্নত], যা বড় জামরার কাছ দিয়ে বের হয়ে গেছে।’[নাসাঈ, আবূ দাউদ] অবশেষে তিনি গাছের সন্নিকটে অবস্থিত জামরায় এসে পৌঁছলেন।

৭৮- অতপর ‘সূর্য পূর্ণ আলোকিত হওয়ার পর’[মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, আবূ দাউদ] তিনি বড় জামরাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন।

৭৯- প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। প্রত্যেকটি কঙ্কর ছিল বুটের ন্যায়।[ইমাম নাববী রহ. বলেন, পাথরগুলো ছিল শিমের বিচির মতো। সুতরাং এরচেয়ে বড় বা ছোট না হওয়া সুন্নত। তবে এরচেয়ে ছোট বা বড় হলেও তা জায়িজ হবে]

৮০- তিনি তাঁর বাহনে আরোহন অবস্থায় উপত্যকার মধ্যভাগ থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন ‘আর তিনি’[নাসাঈ] বলছিলেন,’

لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ فَإِنِّى لاَ أَدْرِى لَعَلِّى لاَ أَحُجُّ بَعْدَ حَجَّتِى هَذِهِ

‘তোমরা তোমাদের হজের বিধি-বিধান শিখে নাও। কারণ আমি জানি না, হয়ত আমি এই হজের পরে আর হজ করতে পারব না।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ]

৮১- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ‘তাশরীকের সব দিনেই’[মুসনাদে আহমদ] ‘সূর্য হেলে যাওয়ার পরে’[মুসলিম] কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন[যিলহজ মাসের ১১-১২-১৩ তারিখের দিনগুলোকে আইয়্যামে তাশরীক বলা হয়]

৮২- ‘তিনি আকাবা তথা বড় জামরাতে কঙ্কর নিক্ষেপকালে সুরাকা তাঁর সাথে সাক্ষাত করলেন। অতপর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা কি খাস করে আমাদের জন্য ? তিনি বললেন,

[বুখারী , মুসলিম] لاََ بَلْ لأَبَدٍ ‘বরং সবসময়ের জন্য।

পশু যবেহ ও মাথা মুন্ডন

৮৩- অতপর তিনি পশু যবেহের স্থানে গেলেন। তারপর নিজ হাতে তেষট্টিটি ‘উট’[ইবন মাজা] যবেহ করলেন।

৮৪- অতপর আলী রা. কে অবশিষ্টগুলো যবেহ করার দায়িত্ব দিলেন তিনি তাকে নিজের হাদীতে শরীক রাখলেন।

৮৫- এরপর প্রত্যেক যবেহকৃত উট থেকে এক টুকরো করে নিয়ে রান্না করতে নির্দেশ দিলেন। তখন টুকরোগুলো এক পাতিলে রেখে রান্না করা হল। অতপর দুজনে তার শুরবা পান করলেন।[এ থেকে জানা গেল, নফল বা ওয়াজিব কুরবানীর গোশত কুরবানীকারী নিজে খেতে করতে পারবেন]

৮৬- এক বর্ণনায় রয়েছে, ‘জাবের রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) নিজের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে একটি গাভি যবেহ করেন।’[মুসলিম]

৮৭- অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তিনি সাত জনের পক্ষ থেকে একটি উট যবেহ করেন। আর সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গাভি যবেহ করেন।’[মুসলিম] ‘অতপর আমরা সাতজন উটে শরীক হলাম। এক লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলল, আপনি কি মনে করেন, গাভিতেও শরীক হওয়া যাবে? তখন তিনি বললেন,

مَا هِىَ إِلاَّ مِنَ الْبُدْنِ

গাভিতো উটের (বিধানের) অন্তর্ভুক্ত।’[বুখারী ফিত-তারীখ]

৮৮- ‘জাবের রা. বলেন, আমরা মিনায় তিনদিন উটের গোশত খেয়ে তারপর খাওয়া থেকে বিরত রইলাম। অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে অনুমতি দিয়ে বললেন,

كُلُوا وَتَزَوَّدُوا

‘তোমরা খাও এবং পাথেয় হিসেবে রেখে দাও[মুশরিকরা তাদের যবেহকৃত হাদীর গোশত ভক্ষণ করত না। তারা নিজদের জন্য তা হারাম মনে করত। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা খাওয়ার নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে জাহেলী যুগের কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটান]।’[মুসনাদে আহমদ] ‘জাবের রা. বলেন, অতপর আমরা খেলাম এবং জমা করে রাখলাম।’[বুখারী, মুসনাদে আহমদ] ‘এভাবে সেগুলো নিয়ে আমরা মদীনায় পৌঁছলাম।’[মুসনাদে আহমদ]

১০ যিলহজের আমলে ধারাবাহিকতা রক্ষা না হলে কোন অসুবিধা নেই

৮৯- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পশু যবেহ করলেন, ‘অতপর মাথা মুন্ডন করলেন।’[মুসনাদে আহমদ]

৯০- ‘কুরবানীর দিন মিনায়’[ইব্ন মাজা] মানুষের (প্রশ্নোত্তরের) জন্য বসলেন। ‘সে দিনের’আমলগুলোতে ‘আগে পরে হয়েছে’[ইব্ন মাজা]এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,

لاََ حَرَجَ لاَ حَرَجَ

‘কোন সমস্যা নেই, কোন সমস্যা নেই’।[অর্থাৎ তোমার যে আমলগুলো বাকি আছে তা আদায় করে নাও। আর যেগুলো করেছো- তাতে যা আগে-পিছে হয়েছে তাতে কোনো অসুবিধে নেই]

৯১- এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯২- অন্য একজন এসে বলল, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি, তিনি বললেন,

وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯৩- তারপর ‘আরেক জন এসে বলল, আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তাওয়াফ করেছি, তিনি বললেন,

[দারেমী, ইব্ন মাজা] وَلاَ حَرَج ‘কোনো সমস্যা নেই।’

৯৪- ‘অন্য এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি পশু যবেহের আগে তাওয়াফ করেছি। তিনি বললেন,

[তাহাবী] ِاذْبَحْ وَلاَ حَرَج ‘যবেহ কর, কোনো সমস্যা নেই।

৯৫- তারপর অন্য আরেক ব্যক্তি এসে বলল, ‘আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি বললেন,

ارْمِ ، وَلاَ حَرَجَ

‘নিক্ষেপ কর। কোন সমস্যা নেই।’ [মুসনাদে আহমদ]

৯৬- ‘অতপর আল্লাহর নবী (সঃ) বললেন,

قَدْ نَحَرْتُ هَهُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ

‘আমি এখানে যবেহ করলাম, আরা মিনা পুরোটাই যবেহের স্থান।’[মুসনাদে আহমদ]

৯৭- ‘মক্কার প্রতিটি অলিগলি চলার পথ এবং যবেহের স্থান।’[আবূ দাউদ]

৯৮- ‘অতএব, তোমরা তোমাদের অবস্থানস্থলে থেকে পশু যবেহ কর।’[মুসলিম]

ইয়াউমুন-নহর তথা ১০ তারিখের ভাষণ

৯৯ – জাবের রা. বলেন, ‘কুরবানীর দিন আমাদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন,

  • أَيُّ يَوْمٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : يَوْمُنَا هَذَا

‘সম্মানের দিক থেকে কোন্ দিনটি সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই দিনটি।

  • قَالَ : أَيُّ شَهْرٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : شَهْرُنَا هَذَا

‘তিনি বললেন, কোন্ মাসটি সম্মানের দিক থেকে সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই মাসটি।

  • قَالَ : أَيُّ بَلَدٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً ؟ فَقَالُوْا : بَلَدُنَا هَذَا

‘তিনি বললেন, কোন্ শহরটি সম্মানের দিক থেকে সবচে’ বড় ? তাঁরা বললেন, আমাদের এই শহরটি।’

  • قَالَ : فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَاٌم كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا

‘তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ আজকের এই দিন, এই শহর, এই মাসের ন্যায় সম্মানিত।’

  • هَلْ بَلَّغْتُ ؟ قَالُوْا : نَعَمْ . قَالَ : اَللَّهُمَّ اشْهَدْ .

‘আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’[মুসনাদে আহমদ]

তাওয়াফে ইফাযা তথা বায়তুল্লাহ্‌র ফরয তাওয়াফ আদায়

১০০- ‘অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাহনে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ গেলেন এবং (বায়তুল্লাহ্র ফরয) তাওয়াফ করলেন। সাহাবীগণও তাওয়াফ করলেন।’

১০১- ‘রাসূলের সাথে যারা কিরান হজ করেছিলেন তাঁরা সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করেননি।’[আবূ দাউদ, তাহাবী]

১০২- অতপর তিনি মক্কায় যোহরের সালাত আদায় করলেন।

১০৩- তারপর আবদুল মুত্তালিব বংশের কাছে এলেন, ‘তারা’[দারমী] যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেন,

انْزِعُوا بَنِى عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَوْلاَ أَنْ يَغْلِبَكُمُ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ

‘হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! বালতি ভর্তি করে পানি তুলে তা (হাজীদেরকে) পান করাও। তোমাদের কাছ থেকে পানি পান করানোর দায়িত্ব কেড়ে নেয়ার ভয় না থাকলে আমিও নিজ হাতে তোমাদের সাথে বালতি ভরে পানি তুলে তা পান করাতাম।’

১০৪- অতপর তারা তাঁকে বালতি ভরে পানি দিলেন, আর তিনি তা পান করলেন।

হজের পর আয়েশা রা. এর উমরা পালন

১০৫- জাবের রা. বলেন, ‘আয়েশা রা. ঋতুবতী হলেন। তখন বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ ছাড়া তিনি হজের আর সব আমল সম্পন্ন করলেন।’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ]

১০৬- তিনি বলেন, ‘যখন তিনি পবিত্র হলেন, তখন কা‘বার তাওয়াফ করলেন এবং সাফা-মারওয়ায় সা‘ঈ করলেন।’

১০৭- অতপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

قَدْ حَلَلْتِ مِنْ حَجِّكِ وَعُمْرَتِكِ جَمِيعًا

‘তুমি তোমার হজ ও উমরা উভয়টি থেকে হালাল হয়ে গিয়েছ।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ]

১০৮- আয়েশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ‘আপনারা সবাই হজ ও উমরা করে যাবেন আর আমি কি শুধু হজ করে যাব?’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ। অন্য হাদীসে রয়েছে, লোকেরা দুই ইবাদাতের নেকী নিয়ে ফিরবে আর আমি কি এক কাজের নেকী নিয়ে ফিরবো?] তিনি বললেন,

إِنَّ لَكِ مِثْلَ مَا لَهُمْ

‘তোমারও তাদের মতই হজ ও উমরা হয়ে গিয়েছে।’[মুসনাদে আহমদ]

১০৯- আয়েশা রা. বললেন, ‘আমি মনে কষ্ট পাচ্ছি, কেননা, আমি তো শুধু হজের পরে বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করেছি।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমদ]

১১০- জাবের রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) নরম স্বভাবের লোক ছিলেন। যখন আয়েশা. কিছু কামনা করতেন, তিনি সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন।’[মুসলিম]

১১১- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন,

فَاذْهَبْ بِهَا يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ فَأَعْمِرْهَا مِنَ التَّنْعِيمِ

‘হে আবদুর রহমান! তুমি তাকে নিয়ে যাও এবং তাকে তানঈম থেকে উমরা করাও।[ইবন আববাস রা. বলেন ‘আল্লাহর শপথ! মুশরিকদের প্রথা বাতিল করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়েশা রা. কে যিলহজ মাসে উমরা করিয়েছেন। কুরাইশ গোত্র ও তাদের অনুসারীরা বলতো, ‘যখন উটের লোম গজিয়ে বেশি হবে, পৃষ্ঠদেশ সুস্থ হবে এবং সফর মাস প্রবেশ করবে তখনই উমরাকারির উমরা সহীহ হবে’। তারা যিলহজ ও মুহররম শেষ হওয়ার পূর্বে উমরা হারাম মনে করত’ (আবূ দাউদ : ১৯৮৭)।]

১১২- অতপর, ‘আয়েশা রা. হজের পরে উমরা করলেন।’[ বুখারী, মুসনাদে আহমদ] ‘তারপর ফিরে এলেন।’[মুসনাদে আহমদ] ‘আর এটা ছিল হাসবার রাতে[ সেটি হচ্ছে আইয়ামে তাশরীকের পরের রাত্রি। অর্থাৎ ১৪ তারিখের রাত। এটাকে মুহাস্সাবের রাতও বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণ ১৪ তারিখের রাত এ স্থানে যাপন করেছিলেন। যেসব জায়গায় পূর্বে শিরক বা কুফরী কর্ম অথবা আল্লাহর শত্রুতা প্রকাশ করা হত সেসব জায়গায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেছেন। এই মর্মে তিনি মিনায় বলেন, ‘আমরা আগামীকাল বনূ কিনানার খায়ফে (অর্থাৎ মুহাস্সাব তথা হাসবা নামক স্থানে) যেতে চাচ্ছি, যেখানে তারা কুফরীকর্মের ওপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল, আর তা ছিল এই যে, কুরাইশ ও বনূ কিনানা, বনূ হাশিম ও বনূ আবদুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে এই মর্মে শপথ করেছিল যে, তাদের সাথে তারা বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করবে না, বেচাকেনা করবে না, যতক্ষণ না তারা নবীকে তাদের কাছে সোপর্দ করে (বুখারী : ১৫৯০)। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, ‘এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর অভ্যাস যে, তিনি কুফরের নিদর্শনের স্থানসমূহে তাওহীদের নিদর্শন প্রকাশ করতেন (যাদুল মা‘আদ)।]।’[মুসলিম]

১১৩- জাবের রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজে নিজের বাহনে আরোহন করে বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করলেন এবং নিজের বাঁকা লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন, যাতে লোকজন তাঁকে দেখতে পায় এবং তিনি ওপরে থেকে তাদের তত্ত্বাবধান করতে পারেন। আর যাতে তারা তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করতে পারে। কেননা লোকজন তাঁকে ঘিরে রেখেছিল।’[মুসলিম, আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ]

১১৪- জাবের রা. বলেন, ‘এক মহিলা তার একটি বাচ্চা তাঁর সামনে উঁচু করে ধরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এর কি হজ হবে? তিনি বললেন,

نَعَمْ وَلَكِ أَجْرٌ

‘হ্যাঁ, আর তোমার জন্য রয়েছে পুরস্কার।’[তিরমিযী, ইবন মাজা। বাচ্চাটিকে বহন করা এবং তাকে মুহরিমরা যেসব কাজ থেকে বিরত থাকে সেসব কাজ থেকে বিরত রাখার বিনিময়ে এই নেকী (নাববী রহ.)।]