নবী (সঃ)যেভাবে হজ করেছেন (জাবের রা. এর বর্ননানুযায়ী)- (১)

নবী (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন

(জাবের রা. যেমন বর্ণনা করেছেন)

শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী – রাহেমাহুল্লাহ

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেভাবে হাজ্ব করেছেন* [ রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করার পর মোট চার বার উমরা করেছেন। ১ম বার : ৬ষ্ঠ হিজরীতে যা হুদায়বিয়া নামক স্থানে কুরাইশ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হবার ফলে তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি। এবার তিনি শুধু মাথা মুন্ডন করে হালাল হয়ে যান এবং সেখান থেকেই মদীনায় ফেরত আসেন। ২য় বার : উমরাতুল কাযা ৭ম হিজরীতে। ৩য় বার : জি‘ইররানা থেকে ৮ম হিজরীতে। ৪র্থ বার : বিদায় হজের সময় ১০ম হিজরীতে। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমরার উদ্দেশ্যে হারাম এলাকার বাইরে বের হয়ে উমরা করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই (বিস্তারিত দেখুন : যাদুল মা‘আদ : ২/৯২-৯৫)।]

১- জাবের রা.* [জাবের রা. উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন একজন সাহাবী। হজ সম্পর্কিত সবচে’ বড় হাদীসটির বর্ণনাকারী।] বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় বসবাসকালে দীর্ঘ নয় বছর পর্যন্ত হজ করেননি।*[নাসাঈ, বিশুদ্ধ মতানুযায়ী হিজরী ৯ম অথবা ১০ম সালে হজ ফরয হয়। হজ ফরয হওয়ার পর বিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ করেন। দ্র. ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা‘আদ।]

২- হিজরী দশম বছরে চারিদিকে ঘোষণা দেয়া হল, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ বছর হজ করবেন। [নাসাঈ।]

৩- অসংখ্য লোক মদীনায় এসে জমায়েত হল। ‘বাহনে চড়া অথবা পায়ে হাঁটার সামর্থ রাখে এরকম কোন ব্যক্তি অবশিষ্ট রইল না ‘সবাই এসেছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হওয়ার জন্য। সবার উদ্দেশ্য, রাসূলুল্লাহ (সঃ)এর অনুসরণ করে তাঁর মতই হজের আমল সম্পন্ন করা। [নাসাঈ।]

৪- জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন*[বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুসারে রাসূল সা. এ ভাষণ দিয়েছিলেন মসজিদে নববীতে। সময়টা ছিল মদীনা থেকে হজের সফরে বের হওয়ার পূর্বে।] এবং বললেন,

مُهَلُّ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مِنْ ذِى الْحُلَيْفَةِ وَ [مُهَلُّ أَهْلِ] الطَّرِيقُ الآخَرُ الْجُحْفَةُ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْعِرَاقِ مِنْ ذَاتِ عِرْقٍ وَمُهَلُّ أَهْلِ نَجْدٍ مِنْ قَرْنٍ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْيَمَنِ مِنْ يَلَمْلَمَ.

‘মদীনাবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান হচ্ছে, যুল-হুলাইফা।[মদীনা থেকে ৬ মাইল দূরে অবস্থিত (কামূস); হাফিজ ইব্ন কাছীর রহ.-এর মতে, ‘৩ মাইল দূরে অবস্থিত’ (হিদায়া : ৫/১১৪); ইবনুল কায়্যিম রহ.-এর মতে, এক মাইল বা তার কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত (যাদুল মা‘আদ : ২/১৭৮)।] অন্যপথের (লোকদের ইহরাম বাঁধার স্থান) আল-জুহফা[মক্কা থেকে ৩ মারহালার দূরত্বে অবস্থিত। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, এটি একটি প্রাচীন শহর। এর নাম ছিল মুহাইমা। এটি বর্তমানে পরিত্যক্ত স্থান। যারা পশ্চিম থেকে হজ করতে আসেন এটি তাদের মীকাত। যেমন মিশর ও শামবাসী। আর পশ্চিমের লোকেরা যখন মদীনা হয়ে মক্কা গমন করেন যেমন তারা বর্তমানে করে থাকেন, তখন তারা মদীনাবাসীর মীকাত থেকেই ইহরাম বাঁধবেন। কারণ, তাদের জন্য সবার ঐক্যমতে এটিই মুস্তাহাব (মাজমু‘ রাসাইল কুবরা’ মানাসিকুল হাজ্জ : ২/৩৫৬)।], ইরাকবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান যাতু ইরক[ যাতু ইরক ও মক্কার মধ্যে ৪২ মাইলের দূরত্ব (ফাত্হ)।]। নজদবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান করন এবং ইয়ামানবাসিদের ইহরাম বাঁধার স্থান, ইয়ালামলাম[মক্কা থেকে ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত।]।’[মুসলিম]

৫- ‘তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যিলকদ মাসের পাঁচ দিন অথবা চার দিন অবশিষ্ট থাকতে বের হলেন’।[নাসাঈ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)ও তাঁর সাহাবীরা মাথায় তেল ব্যবহার করে চুল আচড়িয়ে জামা-কাপড় পরে বের হন। তিনি এক্ষেত্রে জাফরান ব্যবহৃত কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড় যেমন পাজামা বা চাদর ইত্যাদি পরতে নিষেধ করেননি। বুখারীতে যেমন ইব্ন আববাস রা. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবন আববাস রা. সূত্রে বর্ণিত হাদীস থেকে মীকাতের আগেই ইহরামের কাপড় পরার অনুমতি বুঝা যায়। অথচ অনেকেই এটাকে অনুমোদিত বলে মনে করেন না। তবে নিয়ত এর ব্যতিক্রম। কারণ, গ্রহণযোগ্য মতানুসারে নিয়ত করতে হবে মীকাত থেকে আর বিমানে ভ্রমণ করলে ইহরামের নিয়ত ছুটে যাবার সম্ভাবনায় মীকাতের কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে।

মনে রাখবেন, নিয়ত কখনো মুখে উচ্চারণ করার বিধান নেই; ইহরামেও না সালাত, সিয়াম প্রভৃতি ইবাদাতেও না। নিয়ত সব সময়ই করবেন কলব বা অন্তরে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা মূলত বিদআত। তবে ইহরামে لبيك اللهم عمرة وحجا পড়েছেন বলে যা সহীহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, তার উত্তরে বলা হয় তিনি শুধু এতটুকুই বলেছেন, এর অতিরিক্ত কিছু বলেননি (শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. ‘আন-নিয়্যাহ’ মজমু‘ রাসাইল কুবরা : ১/২৪৪-২৪৫)]

৬- ‘এবং হাদী তথা কুরবানীর পশু পাঠিয়ে দিলেন’।[ইরওয়াউল গালীল।]

৭- ‘আমরা তাঁর সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে ছিল মহিলা ও শিশু’।[মুসলিম]

৮- যখন আমরা যুল-হুলাইফাতে[যুল-হুলাইফা মসজিদে নববী থেকে ৬ মাইল দূরে অবস্থিত।]পৌঁছলাম। তখন আসমা বিন্ত উমায়েস রা. মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর নামক এক সন্তান প্রসব করলেন।

৯- অতপর তিনি রাসূলুল্লাল্লাহ (সঃ) এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন যে, আমি কী করব?

১০- তিনি বললেন,

اغْتَسِلِى وَاسْتَثْفِرِى بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِى

‘তুমি গোসল কর, রক্তক্ষরণের স্থানে একটি কাপড় বেঁধে নাও এবং ইহরাম বাঁধ।’

১১- এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে সালাত আদায় করলেন ‘এবং চুপচাপ রইলেন’।[নাসাঈ। অর্থাৎ এখানে আর তালবিয়া পড়লেন না। এরপর তালবিয়া পড়া শুরু করেন তাঁর উটনীটি বাইদা নামক স্থানে পৌঁছার পর, যেমনটি সামনে আসছে।]

ইহরাম

১২- ‘অতপর কাসওয়া[এটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উটনীর নাম। এর আরও নাম রয়েছে যেমন : ‘আযবা’ এবং ‘জাদ‘আ’। কারো কারো মতে কাসওয়া তাঁর উটের নাম (নাববী, শারহ)।] নামক উটনীতে সওয়ার হলেন। উটনীটি তাঁকে নিয়ে বাইদা নামক জায়গায় গেলে তিনি ও তাঁর সাথিগণ হজের তালবিয়া পাঠ করলেন’।[ইবন মাজা।]

১৩- জাবের রা. বলেন, আমি আমার দৃষ্টি যতদূর যায় তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর সামনে কেবল আরোহী ও পায়ে হেঁটে[ইমাম নাববী রহ. বলেন, এ থেকে সবাই একমত যে আরোহন করে এবং পায়ে হেঁটে- উভয়ভাবে হজ করা বৈধ। তবে উভয়টির মধ্যে উত্তম কোনটি সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ আলিমের মতে বাহনে করে হজই উত্তম। কারণ, (ক) নবী (সঃ) এমনটি করেছেন (খ) বাহনে করে হজ করা হজের কার্যাদি আদায়ে সহায়ক এবং (গ) এতে খরচও বেশি হয়। তবে দাউদ জাহেরী প্রমুখ হেঁটে হজ করাকে উত্তম বলেছেন। তার মতে এতে বেশি কষ্ট হয় বলে তা উত্তম। তার এ মত সঠিক নয়। এ থেকে বুঝা যায় বিমানে সফর করে হজে যাওয়া জায়িয বরং মুস্তাহাব। তবে কেউ কেউ যে হাদীস বর্ণনা করেন, ‘বাহনে হজকারির প্রতিটি কদমে সত্তরটি নেকি লেখা হয় আর হেঁটে হজকারির প্রতি কদমে সাতশ নেকি লেখা হয়’ এটি সম্পূর্ণ জাল ও বানোয়াট হাদীস। (দেখুন : সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দাঈফা : ৪৯৬-৪৯৭)। ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, এ ব্যাপারটি নির্ভর করবে হজকারির ওপর। কারো কারো জন্য বাহনে হজ উত্তম আবার কারো কারো জন্যে হেঁটে হজ উত্তম। এটিই সঠিক মত।] যাত্রারত মানুষ আর মানুষ। তাঁর ডানে অনুরূপ, তাঁর বামেও অনুরূপ তাঁর পেছনেও অনুরূপ মানুষ আর মানুষ। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মাঝে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ওপর পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। তিনিই তো তার ব্যাখ্যা জানেন। তাই তিনি যে আমল করছিলেন আমরা হুবহু তাই আমল করছিলাম।[জাবির রা.-এর কথার মধ্যে এ কথার প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সাহাবীদের সামনে পবিত্র কুরআন তুলে ধরতেন। একমাত্র তিনিই কুরআনের যথার্থ তাফসির ও ব্যাখ্যা জানতেন। তিনি ছাড়া অন্যরা এমনকি খোদ তাঁর সাহাবীরাও তাঁর ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী ছিলেন।]

১৪- তিনি তাওহীদ সম্বলিত [তাওহীদ ও শিরক বিপরীতমুখী দু’টি বিষয় যা কোনদিন একত্রিত হতে পারে না। এ-দুয়ের একটির উপস্থিতির অর্থ অন্যটির বিদায়। ঠিক রাত-দিন অথবা আগুন-পানির বৈপরিত্বের মতই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَأَتِمُّواْ ٱلۡحَجَّ وَٱلۡعُمۡرَةَ لِلَّهِۚ

‘তোমরা হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করো।’ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে তাওহীদ সবচে’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি তাওহীদকে তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়েছেন। হজে নিম্নবর্ণিত আমলসমূহ সম্পাদনে তাওহীদের প্রতি তাঁর গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, ১. তালবিয়া পাঠ। ২. লোক-দেখানো ও রিয়া থেকে মুক্ত হজ পালনের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ। ৩. তাওয়াফ শেষে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার সময় তাওহীদ সম্বলিত ‘সূরা আল-কাফিরূন’ ও সূরা ইখলাস’ পাঠ। ৪. সাফা ও মারওয়ায় তাওহীদনির্ভর দু‘আ পাঠ। ৫. আরাফার দু‘আ ও যিকরসমূহেও তাওহীদ সম্বলিত বাণী উচ্চারণ ৬. হাদী বা কুরবানীর পশু যবেহের সময় তাকবীর পাঠ। ৬. জামরায় পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবীর পাঠ ইত্যাদি। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য, তাওহীদের হাকীকত সম্পর্কে সচেতন হওয়া। শিরক ও বিদ‘আত থেকে সতর্ক থাকা।

]তালবিয়া পাঠ করেন,

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ، لاَشَرِيكَ لَكَ.

(লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক, লাববাইকা লা শারীকা লাকা লাববাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক)।

‘আমি হাযির, হে আল্লাহ, আমি হাযির। তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাযির। নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা ও নিয়ামত তোমার এবং রাজত্বও, তোমার কোন শরীক নেই।’বুখারী : ৫৯১৫, মুসলিম : ১১৮৪।

১৫- আর মানুষেরাও যেভাবে পারছিল এই তালবিয়া পাঠ করছিল। তারা কিছু বাড়তি বলছিল। যেমন,

لَبَّيْكَ ذَا الْمَعَارِجِ, لَبَّيْكَ ذَا الْفَوَاضِلِ.

(লাববাইকা যাল মাআরিজি, লাববাইকা যাল ফাওয়াযিলি) কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে তা রদ করতে বলেননি।[ইবরাহীম আ. এর তালবিয়া ছিল তাওহীদ সম্বলিত। সর্বপ্রথম আমর ইবন লুহাই খুযাঈ জাহেলী যুগে তালবিয়াতে শিরক যুক্ত করে বলে,

إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ.

‘কিন্তু একজন শরীক যার তুমিই মালিক এবং তার যা কিছু রয়েছে তারও’ (উমদাতুল কারী : ২৪/ ৬৫; আযরাকী, আখবারে মক্কা : ১/২৩২)।

তার অনুসরণে মুশরিকগণ হজ ও উমরার তালবিয়া পাঠে উক্ত শিরক সম্বলিত বাক্য যুক্ত করত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তালবিয়ায় তাওহীদের স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন এবং তা থেকে শিরকযুক্ত বাক্য দূর করে দিলেন (মুসলিম : ১১৮৫)।]

১৬- তবে তিনি বারবার তালবিয়া পাঠ করছিলেন।

১৭- জাবের রা. বলেন, আমরা বলছিলাম, لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ (লাববাইক আল্লাহুম্মা) لَبَّيْكَ ِبالحَجِ (লাববাইকা বিল-হাজ্জ)। আমরা খুব চিৎকার করে তা বলছিলাম। আর আমরা কেবল হজেরই নিয়ত করছিলাম। তখনো আমরা হজের সাথে উমরার কথা জানতাম না।[ইবন মাজা।]

১৮- আর আয়েশা রা. উমরার নিয়ত করে এলেন। ‘সারিফ’[এই জায়গাটি তান‘ঈমের কাছাকাছি বায়তুললাহ থেকে ১০ মাইল দূরে উত্তর দিকে অবস্থিত।] নামক স্থানে এসে তিনি ঋতুবতী হয়ে গেলেন।[মুসলিম]

মক্কায় প্রবেশ ও বায়তুল্লাহর তাওয়াফ

১৯- এমনিভাবে আমরা তাঁর সাথে বায়তুল্লাহ্ এসে পৌঁছলাম। সময়টা ছিল যিলহজের চার তারিখ ভোরবেলা।

২০- নবী (সঃ) মসজিদের দরজার সামনে এলেন। অতপর তিনি তাঁর উট বসালেন। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলেন।

২১- তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন।

২২- এরপর তিনি তাঁর ডান দিকে চললেন।[মুসলিম]

২৩- অতপর তিনি তিন চক্করে রমল[রমল হচ্ছে, ঘন পদক্ষেপে বীরের মত দ্রুত হাঁটা।] করতে করতে হাজরে আসওয়াদের কাছে আসলেন। আর চতুর্থ চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন।

২৪- এরপর মাকামে ইবরাহীম আ.-এ পৌঁছে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন : وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى (ওয়াত্তাখিযূ মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা)। তিনি উচ্চস্বরে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন যাতে লোকেরা শুনতে পায়।[নাসাঈ।]

২৫- এরপর মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও বায়তুল্লাহ্র মাঝখানে রেখে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করলেন।[বায়হাকী, মুসনাদে আহমদ।]

২৬- ‘তিনি এ দু’রাক‘আত সালাতে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাস পড়েছিলেন।’[নাসাঈ, তিরমিযী।]

২৭- এরপর তিনি যমযমের কাছে গিয়ে যমযমের পানি পান করলেন এবং তাঁর নিজের মাথায় ঢাললেন।[আহমদ।]

২৮- এরপর তিনি হাজরে আসওয়াদের নিকট গিয়ে তা স্পর্শ করলেন।

সাফা ও মারওয়ায় অবস্থান

২৯- তারপর সাফা দরজা দিয়ে বের হয়ে সাফা পাহাড়ে গেলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এসে পাঠ করলেন :

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ

‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি’।

অতপর তিনি সাফা দিয়ে শুরু করলেন এবং কাবাঘর দেখা যায় এমন উঁচুতে উঠলেন।

৩০- অতপর তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ববাদ, বড়ত্ব ও প্রশংসার ঘোষণা দিয়ে বললেন,

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْد يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كَلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.

(লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল্ মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু ইউহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু আনজাযা ওয়াদাহু, ওয়া নাছারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ্)।

‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন। আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন।[নাসাঈ, মুসলিম। (খন্দকের যুদ্ধে)] অতপর এর মাঝে তিনি দু‘আ করলেন এবং এরূপ তিনবার পাঠ করলেন।

৩১- এরপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে অগ্রসর হলেন। যখন তিনি বাতনুল-ওয়াদীতে পদার্পন করলেন, তখন তিনি দৌড়াতে লাগলেন। যখন তিনি ‘উপত্যকার অপর প্রান্তে’[মুসনাদে আহমদ।] এসে গেলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন। মারওয়ায় এসে তিনি তাতে আরোহন করলেন এবং বায়তুল্লাহ্র দিকে তাকালেন।[নাসাঈ।]

৩২- অতপর সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন মারওয়া পাহাড়েও তাই করলেন।

চলবে … … …