রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন- পর্বঃ ১

রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪ || পর্বঃ ৫

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ দা‘ঈ বা আহ্বানকারী। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সত্য দীন সহকারে মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের পথ নির্দেশক হিসেবে সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শক রূপে পাঠিয়েছেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে নয় বরং জন্মলগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক। বাল্যকাল থেকেই তিনি সে আদর্শ প্রচার-প্রসারের জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাকে প্রস্তুত করতে থাকেন। চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় তিনি ছিলেন এক অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী আদর্শবান বালক। আল্লাহ প্রথম থেকেই তাঁকে মহান দা‘ওয়াতের জন্য উত্তম চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষন দিয়েছেন। অতএব, তাঁর দা‘ওয়াত ছিল হিকমত ও কৌশলপূর্ণ।

ক. সমকালীন আরবের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা

ইসলাম আল্লাহ তা‘আলার নিকট একমাত্র মনোনীত জীবন ব্যবস্থা। এটি এক আল্লাহর একত্ববাদ ও সার্বিক বিষয়ে তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। যুগে যুগে প্রেরিত সকল নবী-রাসূল এ দীনের পতাকাবাহী ছিলেন।[সকল নবী-রাসূলের ধর্ম ছিল আল-ইসলাম। তাঁরা সবাই এ জীবনাদর্শের অনুসারী ছিলেন এবং স্ব স্বজাতিকে এ আদর্শের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। নূহ ‘আলাইহিস সালাম ইবরাহিম ‘আলাইহিস সালাম ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম, ইউসূফ ‘আলাইহিস সালাম, সুলায়মান ‘আলাইহিস সালাম ও মূসা ‘আলাইহিস সালাম সহ সকলের বক্তব্যে এটি পরিদৃষ্ট হয়। আল-কুরআন, সূরা ইউনুস : ৭২; সূরা আল-বাকারা : ১২৮, ১৩২; ইউসূফ : ১০১ ; আন্ নমল : ৩০-৩১, ইউনুছ: ৮৪।] অতএব, আল্লাহ তা‘আলার নিকট একমাত্র ও গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হলো ইসলাম। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ وَمَا ٱخۡتَلَفَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ ٱلۡعِلۡمُ بَغۡيَۢا بَيۡنَهُمۡۗ وَمَن يَكۡفُرۡ بِ‍َٔايَٰتِ ٱللَّهِ فَإِنَّ ٱللَّهَ سَرِيعُ ٱلۡحِسَابِ ١٩ ﴾ [ال عمران: ١٩]

“নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহ্‌র নিকট একমাত্র দ্বীন। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা কেবলমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত তাদের নিকট জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য ঘটিয়েছিল। আর কেউ আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহে কুফরী করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥ ﴾ [ال عمران: ٨٥]

“আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন গ্রহণ করবে তা কখনো আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য হবে না। আর আখেরাতের জীবনে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ন্তভুক্ত হবে।[2]

কিন্তু এ দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূলগণের সময়ে বিকৃত, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। ফলে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে বিভিন্ন রকমের জাহেলী কুসংস্কারে এটি ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। এসময়ে বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। পূর্ববতী নবী-রাসূলগণের অনুসারীদের মধ্য হতে বিকৃত, পরিবর্ধিত ও পরিবর্তিত ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক প্রভৃতি জাতি ও গোষ্টীর সূচনা হয়। এ গুলো বিশেষত: আরব, রোম, পারস্য, হিন্দুস্থান ও চীনদেশে বিস্তৃতি লাভ করেছিল[3] এ ধরনের অধঃপতনের অন্যতম কারণ ছিল ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-এর পৃথিবী থেকে উত্থিত হয়ে যাওয়ার পর হতে ৫৭০ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো নবী-রাসূলের আবির্ভাব না হওয়া।[4] ঐতিহাসিকগণ সে সময়কে আইয়্যামে জাহেলিয়্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন।[5] আইয়্যাম অর্থ যুগ, দিন বা সময়। আর জাহেলিয়্যা অর্থ মূর্খতা, অজ্ঞতা ও সভ্যতা বিবর্জিত। রূপক অর্থে কুসংস্কার, বর্বরতা, ধর্মহীনতা।[6] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব কিংবা হিজরতের পূর্বে এক শতাব্দী আরব অধিবাসীদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ওহী সমর্থিত ছিল না বিধায় ঐ সময়টাকে আইয়ামে জাহেলিয়্যাহ বলা হয়।[7]

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবের সময় তৎকালীন আরব ধর্মীয় দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ ও নিকৃষ্ট অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। এসময় তাদের ধর্ম বিশ্বাসে শির্ক, মুর্তিপূজা, গ্রহ-নক্ষত্র, দেব-দেবী, পাহাড়-পর্বত, পশু-পক্ষী, পাথর, ইত্যাদির উপাসনা বিরাজমান ছিল। এভাবে মানুষ এক আল্লাহর স্থলে বহু প্রভূর উপাসনার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সমকালীন আরবের ধর্মীয় অবস্থাকে নিম্নোক্ত কয়েকটি ভাগে বিশ্লেষণ করা যায়,

১. শির্কের প্রচলন

শির্ক-এর শাব্দিক অর্থ অংশীদার স্থাপন করা, ঈমান কিংবা ইবাদতে অংশীদার করা, বহুইশ্বরবাদ।[8] যারা আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্যকে শরীক করে, শির্ক স্থাপন করে, তাদের মুশরিক বলা হয়। এটা তাওহীদের বিপরীত। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করত না; বরং তাঁর ইবাদতের সাথে অন্যকে অংশীদার সাব্যস্ত করত। এমর্মে কুরআন মাজীদে এসেছে:

﴿ وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ فَأَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٦١ ﴾ [العنكبوت: ٦١]

“যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন কে নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ, তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।[9]

এছাড়াও তারা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ তা‘আলাই আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যমীনকে জীবিত করেন, এবং মৃতকে জীবিত করেন, তদুপরি তারা শরিক স্থাপন হতে বিরত থাকত না।[10] শুধু তাই নয়, তারা আল্লাহর রুবুবিয়তেও বিশ্বাস পোষণ করত কিন্তু সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শক্তির উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন উপাস্যের ধারণা করত, যেগুলোকে তাদের উপকারী, ক্ষতিসাধনকারী, অস্তিত্বদানকারী ও ধ্বংসকারী বলে মনে করত।[11] এগুলোর ইবাদতে তাঁরা নিয়োজিত হত এ প্রত্যাশায় যে, এগুলো আল্লাহর নৈকট্য লাভে ও সুপারিশকারী হবে। কুরআন মাজীদে তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে এসেছে,

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ٣ ﴾ [الزمر: ٣]

“যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এজন্যই করি, যে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে।[12]

আরবের মুশরিকরা ফেরেশ্তাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যায়িত করত। “জ্যোতিষীর”[জ্যোতিষী সেসব লোককে বলা হতো, যারা নক্ষত্রের গতি সম্পর্কে গবেষণা করতো এবং হিসাব-নিকাশ করে বিশ্বের ভবিষ্যত ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করতো। (মোল্লা আলী ক্বারী, মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, ২য় খণ্ড, (লক্ষ্ণৌ : তা.বি), পৃ. ৩)।] কথার উপর ছিল তাদের পূর্ণ আস্থা।[14] জ্যোতিষীরা কিছু জিন হাসিল করে তাদের মাধ্যমে বহু কল্পিত, মিথ্যা ভবিষ্যতদ্বাণী করে জনসাধারণ হতে বহু অর্থ উপার্জন করত। মূলত এটা ছিল তাদের উপার্জনের মাধ্যম। মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকা পয়সা লুট করাই ছিল তাদের পেশা।[15]

২. মূর্তিপূজা

আরবের মুশরিকদের বিভিন্ন গোত্র বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করত। তারা গাছ, পাথর ও মাটি দিয়ে বিভিন্ন মানুষ বা প্রাণীর ছবি তৈরী করত। মূর্তির সাথে তাদের এক ধরনের ভালবাসা জন্মে গিয়েছিল। বনু খুজা‘আ গোত্রের সরদার ‘আমর ইবন লুহাই [আমর ইবন লুহাই বনু খুজা‘আ গোত্রের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ছোটবেলা থেকে এ লোকটি ধর্মীয় পূণ্যময় পরিবেশে প্রতিপালিত হয়েছিল। ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল অসামান্য। সাধারণ মানুষ তাকে ভালবাসার চোখে দেখতো এবং নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে করে তার অনুসরণ করতো। এক পর্যায়ে এ লোকটি সিরিয়া সফর করে। সেখানে যে মূর্তিপূজা করা হচ্ছে সে মনে করলো এটাও বুঝি আসলেই ভাল কাজ। যেহেতু সিরিয়ায় অনেক নবী আবির্ভূত হয়েছেন এবং আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে। কাজেই সিরিয়ার জনগণ যা করছে সেটা নিশ্চয় ভালো কাজ এবং পূণ্যের কাজ। এরূপ চিন্তা করে সিরিয়া থেকে ফেরার পথে সে ‘হুবাল’ নামের এক মূর্তি নিয়ে এসে সেই মূর্তি কা‘বাঘরের ভেতর স্থাপন করলো। এরপর সে মক্কাবাসীদের মূর্তিপূজার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে শির্ক করার আহবান জানালো। মক্কার লোকেরা ব্যাপকভাবে তার ডাকে সাড়া দেয়। মক্কার জনগণকে মূর্তিপূজা করতে দেখে আরবের বিভিন্ন এলাকার লোকজন তাদের অনুসরণ করলো। কেননা, কা‘বাঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের বৃহত্তর আরবের লোকেরা ধর্মগুরু মনে করতো। (শায়খ মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব, মুখতাছারুস সীরাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ২)।] নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম আরবদের মধ্যে মূর্তির প্রচলন করেছিলেন[16] অবশ্য তার পূর্বেই নূহ ‘আলাইহিস সালাম-এর সময়ে সর্বপ্রথম মূর্তিপূজার সূচনা হয়।[17] তাদের দেবতাদের মধ্যে ‘লাত’ ‘মানাত’ ও ‘উয্যা’ ছিল প্রসিদ্ধ ও প্রধান মূর্তি। এছাড়াও তারা ‘ইসাফ’ ও ‘নায়েলা’ নামক মূর্তিরও উপাসনা করত।[ইসাফ’ ছিল কা‘বাঘর সংলগ্ন। আর ‘নায়েলা’ ছিল যমযমের কাছে। কুরায়শরা কা‘বা সংলগ্ন মূর্তিটাকেও অপর মূর্তির কাছে সরিয়ে দেয়। এটা ছিল সে জায়গা যেখানে আরবরা কুরবানী করত। (সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, নবীয়ে রহমত, অনু: আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, (ঢাকা ও চট্টগ্রাম : মজলিস নাশরাত-ই-ইসলাম, ১৯৯৭ খৃ), পৃ. ১১১।] এসব মূর্তির অনুসরণে স্বল্প সময়ের মধ্যে হেজাজের সর্বত্র শির্কের আধিক্য এবং মূর্তি স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। প্রত্যেক গোত্র পর্যায়ক্রমে মক্কার ঘরে ঘরে মূর্তি স্থাপন করে। পবিত্র কা‘বা গৃহেই ৩৬০ টি দেবতার মূর্তি ছিল। ৩৬০ দিনে হয় এক বছর। তারা প্রত্যেক দিনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট মা‘বুদের পূজা করত।[19] মক্কার অলিতে-গলিতে মূর্তি ফেরী করে বিক্রি করা হত। দেহাতী লোকেরা এটা পছন্দ করত, খরিদ করত এবং এর দ্বারা আপন ঘরের সৌন্দর্য্য বর্ধন করত।[20] এছাড়াও পৌত্তলিকরা বিভিন্নভাবে উল্লেখিত মূর্তির উপাসনা করত। যেমন,

ক. তারা মূর্তির সামনে নিবেদিত চিত্তে বসে থাকত এবং তাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করত। তাদেরকে জোরে জোরে ডাকত এবং প্রয়োজনপূরণ, মুশকিল আসান বা সমস্যার সমাধানের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করত।

খ. মূর্তিগুলোর উদ্দেশ্যে হজ্ব ও তওয়াফ করতো। তাদের সামনে অনুনয় বিনয় এবং সিজদায় উপনীত হতো।

গ. মূর্তির নামে নযর-নেওয়ায ও কুরবানী করত। এমর্মে কুরআনে এসেছে, “তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে সেসব জন্তু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নিয়ে যবাই করা হয়েছে হয়।”[21]

ঘ. মূর্তির সন্তুষ্টি লাভের জন্য পানাহারের জিনিস, উৎপাদিত ফসল এবং চতুষ্পদ জন্তুর একাংশ মূর্তির জন্য তারা পৃথক করে রাখতো। পাশাপাশি আল্লাহর জন্যেও একটা অংশ রাখতো। পরে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে আল্লাহর জন্য রাখা অংশ মূর্তির কাছে পেশ করতো। কিন্তু মূর্তির জন্য রাখা অংশ কোন অবস্থায়ই আল্লাহর কাছে পেশ করতো না।[22]

এছাড়াও তারা বিভিন্ন মূর্তির নামে পশু মানত করতো। সর্বপ্রথম মূর্তির নামে পশু ছেড়েছিল, ‘আমর ইবন লুহাই[23] তারা এসব আচার অনুষ্ঠান এজন্যে পালন করতো যে, এগুলো তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সক্ষম করে দেবে এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে।[24] তাদের এ আকীদা বিশ্বাসের বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “ওরা আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করে তা তাদের ক্ষতিও করে না, উপকারও করে না। ওরা বলে এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশকারী।[25] তারা বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মূর্তির ধারণা পোষণ করে পূজা করত। যখন কোনো সফরের ইচ্ছা করত, তখন তারা বাহনে আরোহন করার সময় মূর্তি স্পর্শ করত। সফরে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে এটা ছিল তাদের শেষ কাজ এবং ফিরে এসেও ঘরে প্রবেশের পূর্বে এটা ছিল তাদের সর্বপ্রথম কাজ।

নৈতিক ও চারিত্রিক দিক থেকে তাদের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। তাদের মাঝে জুয়া খেলা ও মদপানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বিলাসিতা, ইন্দ্রিয়পূজা, ও নাচগানের আসর জমাত অধিক হারে এবং এতে মদপানের ছড়াছড়ি চলত। বহু রকমের অশ্লীলতা, জুলুম-নির্যাতন, অপরের অধিকার হরণ, বে-ইনসাফী ও অবৈধ উপার্জনকে তাদের সমাজে খারাপ চোখে দেখা হত না।[26]

মক্কার মূল ও প্রাচীন বাসিন্দা জা‘ফর ইবন আবি তালিব আবিসিনিয়া অধিপতি নাজ্জাসীর সামনে তৎকালীন আরব সমাজের ও জাহিলী কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “রাজন! আমরা ছিলাম জাহিলিয়াতের ঘোর তমাসায় নিমজ্জিত একটি জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত জীব ভক্ষন করতাম, সর্বপ্রকার নির্লজ্জ কাজ করতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করতাম এবং শক্তিশালী ও সবল লোকেরা দুর্বলকে শোষন করতাম।[27]

উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনায় তাদের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। কা‘বাঘর তাওয়াফের সময় পুরুষেরা উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করতো এবং মহিলারা সব পোষাক খুলে ফেলে ছোট জামা পরিধান করে তাওয়াফ করতো। তাওয়াফের সময় তারা অশ্লিল কবিতা আবৃত্তি করতো। কবিতাটির অনুবাদ নিম্নরূপ:

“লজ্জাস্থানের কিছুটা বা সবটুকু খুলে যাবে আজ।

যেটুকু যাবে দেখা ভাবব না অবৈধ কাজ।[28]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবকালে সমগ্র পৃথিবীতে নারী জাতির অবস্থা ছিল অতি শোচনীয় ও মর্মান্তিক। আরব সমাজেও নারীর অবস্থা এর ব্যতিক্রম ছিল না। নারী তার দেহের রক্ত দিয়ে মানব বংশধারা অব্যাহত রাখলেও তার সেই অবদানের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। সে পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলের দ্বারা নির্যাতিতা হত। যুদ্ধবন্দী হলে হাটে-বাজারে দাসীরূপে বিক্রয় হত, চতুস্পদ জন্তুর ন্যায়। আরব সমাজে কন্যা সন্তানের জন্মই ছিল এক অশুভ লক্ষণ, সম্মান হানিকর ও আভিজাত্যে কুঠারাঘাততুল্য। তাই কন্যার জন্ম গ্রহণের সাথে সাথে তার জন্মদাতা লজ্জা ও অপমানে মুখ লুকিয়ে বেড়াত এবং হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে তাকে জীবন্ত মাটি চাপা দিতেও কুন্ঠাবোধ করত না। কুরআন মাজীদে এ চিত্র খুব সুন্দর ভাবে বিধৃত হয়েছে:

﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدّٗا وَهُوَ كَظِيمٞ ٥٨ يَتَوَٰرَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡمِ مِن سُوٓءِ مَا بُشِّرَ بِهِۦٓۚ أَيُمۡسِكُهُۥ عَلَىٰ هُونٍ أَمۡ يَدُسُّهُۥ فِي ٱلتُّرَابِۗ أَلَا سَآءَ مَا يَحۡكُمُونَ ٥٩﴾ [النحل: ٥٨، ٥٩]

“যখন তাদের কাউকেও কন্যার সুসংবাদ প্রদান করা হয়, তখন তাদের মুখমণ্ডল মলীন হয়ে যায় এবং হৃদয় দগ্ধ হতে থাকে। যে বস্ত্তর সুসংবাদ তাকে দেয়া হয়েছিল তার লজ্জায় সে নিজেকে কওম থেকে লুকিয়ে চলে এবং মনে মনে চিন্তা করে যে, ওকে কি অপমানের সাথে গ্রহণ করবে না কি তাকে মাটির মধ্যে পুতে রাখবে?[29]

দালীল সমুহঃ


[2] আল-কুরআন, সূরা আলে-ইমরান : ১৯।

[3] ড. আব্দুর রহমান আনওয়ারী, মানহাজুদ দা‘ওয়াহ ওয়াদ দু‘আত ফিল কুরআনিল কারীম, (অপ্রকাশিত পি-এইচ.ডি. থিসিস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, ১৯৯৮), পৃ. ৮৭৬।

[4] তাহের সূরাটী, প্রাগুক্ত, ৫১৫।

[5] ড. ওসমান গনী, মহানবী, (কলিকাতা: মল্লিক ব্রাদার্স, ১৯৯৬), পৃ. ১০৯ ; মুহাম্মদ আকরাম খাঁ, মোস্তফা চরিত, (কলিকাতা : রনি এন্টারপ্রাইজ, ১৯৮৭ খৃ.), পৃ. ১৪৯ ; ড. মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল, মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন চরিত, অনু: মাওলানা আব্দুল আউয়াল, (ঢাকা : ইসলামিক ফাইন্ডেশন, ১৯৯৮ খৃ.), পৃ. ৮১ ; P.K Hitti, History of the Arabs, (London : Macmillan Education Ltd, 1986), p. 3 .

[6] ড. ইবরাহীম মাদকুর, আল-মু’জামুল ওসীত, (দেওবন্দ : ইউপি, তা.বি) পৃ. ১৪৪ ; মনির আল-বা’লাবাক্কি, আল-মাওরিদ, (বৈরুত: দারুল ইলম্ লিল মালাঈন, ১৯৭৬ খৃ.), পৃ. ২৪৮ ; Thomas Patrick, Dictionary of Islam , (India: Cosmo Publication, 1986), opcit, p. 224.; আল-কুরআনে জাহেলিয়্যাহ শব্দটি চারবার ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ৩:১৫৪ ; ৫:৫০ ; ৩৩: ৩৩ ; ৪৮: ২৬

[7] P.K Hitti, History of the Arabs, (London : Macmillan Education Ltd, 1986), p.87 .

[8] ড. মুহাম্মদ ফজলূর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩১।

[9] আল-কুরআন, সূরা আনকাবূত : ৬১।

[10] কুরআন মাজীদে বর্ণিত হয়েছে,

﴿ وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّن نَّزَّلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَحۡيَا بِهِ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِ مَوۡتِهَا لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۚ قُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡقِلُونَ ٦٣ ﴾ [العنكبوت: ٦٣]

কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ ٦٥﴾ [العنكبوت: ٦٥]

অন্যত্র আরও বলা হয়েছে

﴿ قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٣١ ﴾ [يونس: ٣١]

আল-কুরআন, সূরা আনকাবূত : ৬৩ ও ৬৫; সূরা ইউনুস : ৩১।

[11] আবুল হাসান আলী আন্ নদভী, সিরাতুন নববীয়্যাহ, (লখনৌ: মাজমা‘ ইসলামী ‘ইলমী, তা.বি), পৃ. ৩০।

[12] আল-কুরআন, সূরা আয্-যুমার : ৩।

[14] তাহের সূরাটী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১৩।

[16] সর্বপ্রথম ‘কাওমে নূহ’ মূর্তিপূজার প্রচলন করেছিল। তারা ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়া‘উক ও নসর নামক মূর্তির পূজা করত। এ মর্মে কুরআনে এসেছে

﴿ وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا ٢٣ ﴾ [نوح: ٢٣]

“তারা বলল, তোমরা ছাড়বে না তোমাদের উপাস্যদের এবং তোমরা ওয়াদ্দ, সূওয়া, ইয়াগুছ, ইয়া‘উক ও নসরের উপাসনা পরিত্যাগ করবে না।” আল-কুরআন, সূরা নূহ : ২৩।

ওয়াদ ছিল ‘কালব’ গোত্রের দেবতা, ‘সুওয়া’ ‘হুযাইল’ গোত্রের, ‘ইয়াগুছ’ ‘মায্যাহ’ গোত্রের, ‘ইয়া‘উক’ ইয়ামেনের ‘হামদান’ গোত্রের এবং ‘নাসর’ ইয়ামেন অঞ্চলের ‘হিমইয়ার’ গোত্রের দেবতা ছিল। (ড. জামীল আব্দুল্লাহ আল-মিসরী, তারিখুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ ফি যামানির রাসূল ওয়াল খোলাফায়ির রাশেদীন, (মদীনা মুনওয়ারা : মাকতাবাতুদ দার, ১৯৮৭ খৃ.), পৃ. ৩১।

[17] এ মর্মে কুরআন মাজীদে এসেছে

[﴿ أَفَرَءَيۡتُمُ ٱللَّٰتَ وَٱلۡعُزَّىٰ ١٩ وَمَنَوٰةَ ٱلثَّالِثَةَ ٱلۡأُخۡرَىٰٓ ٢٠ ﴾ [النجم: ١٩، ٢٠ “তোমরা কি ভেবে দেখছো ‘লাত’ ও ‘উয্যা’ সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত’ সম্পর্কে ?” আল-কুরআন, সূরা আন্ নাজম : ১৯-২০।

লাত: চারকোণ বিশিষ্ট একটি পাথরের মূর্তি, যার চতুষ্পার্শে আরবরা তাওয়াফ করতো। এটি তায়েফে স্থাপন করা হয়েছিল। (আল্লামা ছফিউর রহমান মুবারকপূরী, আর রাহীকুল মাখতুম, অনু: খাদিজা আক্তার রেজায়ী, (ঢাকা: আল-কোরআন একাডেমী লন্ডন, বাংলাদেশ সেন্টার, ৯ম সংস্করণ, ২০০৩), পৃ. ৫১)।

মানাত : কালো পাথরে নির্মিত মূর্তি, যা লোহিত সাগরের উপকূলে কোদাইদ এলাকার মুসাল্লাল নামক জায়গায় স্থাপন করা হয়েছিল। (প্রাগুক্ত)

উয্যা: উয্যা ছিল ‘আরাফাতের নিকটবর্তী ‘নাখলা’ নামক স্থানের মূর্তি। কুরাইশদের নিকট এ মূর্তিটি সর্বাধিক সম্মানিত ছিল।

[19] তাহের সূরাটী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১৫।

[20] সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১।

[21] আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদা : ৩।

[22] আল্লাহ বলেন,

﴿ وَجَعَلُواْ لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ ٱلۡحَرۡثِ وَٱلۡأَنۡعَٰمِ نَصِيبٗا فَقَالُواْ هَٰذَا لِلَّهِ بِزَعۡمِهِمۡ وَهَٰذَا لِشُرَكَآئِنَاۖ فَمَا كَانَ لِشُرَكَآئِهِمۡ فَلَا يَصِلُ إِلَى ٱللَّهِۖ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَىٰ شُرَكَآئِهِمۡۗ سَآءَ مَا يَحۡكُمُونَ ١٣٦ ﴾ [الانعام: ١٣٦]

“আল্লাহ যেসব শষ্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে তারা আল্লাহর জন্যে একাংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা মতে বলে, এটা আল্লাহর জন্যে এবং এটা আমাদের দেবতাদের জন্যে। যা তাদের দেবতাদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। কিন্তু যা আল্লাহর অংশ তা তাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছায়। তারা যা মীমাংসা করে তা বড়ই নিকৃষ্ট।” আল-কুরআন, সূরা আল-আন‘আম : ১৩৬।

[23] ইমাম বুখারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯৯।

[24] আল-কুরআন, সূরা ইউনুস : ১৮।

[25] ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১ম খণ্ড, (ঢাকা: ই.ফা.বা. ১৯৯৪ ইং), পৃ. ৬৫।

[26] সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১০।

[27] ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩৬।

[28] আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপূরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬।

[29] আল-কুরআন, সূরা আন্ নাহল: ৫৮-৫৯।