রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন- পর্বঃ ২

রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪ || পর্বঃ ৫

তৎকালীন সময়ে অগণিত নিষ্পাপ শিশুর বিলাপ আরবের মরুবক্ষে মিশে আছে তার হিসেব কে দেবে ? এ ধরনের কত যে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা তাদের মধ্যে বিরাজমান ছিল তার কোনো হিসেব নেই। কুরআন মাজীদে সে দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল ?

[কুরআন মাজীদে এসেছে,

﴿ وَإِذَا ٱلۡمَوۡءُۥدَةُ سُئِلَتۡ ٨ بِأَيِّ ذَنۢبٖ قُتِلَتۡ ٩ ﴾ [التكوير: ٨، ٩]

আল-কুরআন, সূরা আত্ তাকভীর : ৮-৯।]

বিবাহের সময় তাদের মাতামতের কোনো গুরুত্বই ছিল না। একজন পুরুষ অসংখ্য নারীকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারত।[এ মর্মে হাদীসে এসেছে,

“ইবন উমায়রা আল-আসাদী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার সময় আমার আটজন স্ত্রী ছিল। বিষয়টি আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাদের মধ্য থেকে চারজনকে বেছে নাও।”

(আবু দাউদ, প্রাগুক্ত, কিতাবুত তালাক, বাবু ফি মান আসলামা ওয়া ইনদাহু নিছায়ান আকছারা মিন আরবা আও উখতানে, হাদীস নং- ২২৪১)।]

একই ভাবে তালাকের ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। পুরুষরা যখনই ইচ্ছা করত যতবার ইচ্ছা তালাক দিত এবং ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তালাক প্রত্যাহার করত।[হাদীসে বর্ণিত আছে,

“কোন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর তা প্রত্যাহার করার অধিকারী হতো, যদিও সে তাকে তিন তালাক দিত।” (আবু দাউদ, প্রাগুক্ত, বাবু ফী নাসখিল মুরাজা‘আ বা‘দাত তাতলীকাতিছ ছালাছ, হাদীস নং- ২১৯৫]

স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী নিজ স্বামীর ওয়ারিশদের উত্তরাধিকারী সম্পত্তিতে পরিণত হত। তাদের কাউকে কেউ ইচ্ছা করলে বিবাহ করত আথবা অপরের নিকট বিবাহ দিত অথবা আদৌ বিবাহ না দেওয়ার ব্যাপারেও তাদের ইখতিয়ার ছিল, যাতে স্বামী প্রদত্ত তার সম্পদ অপরের হস্তগত হতে না পারে। [সহীহ বুখারীতে এসেছে, “ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, আল্লাহর বাণী, “হে ঈমানদার লোক সকল! নারীদেরকে জবরদস্তিমূলকভাবে উত্তরাধিকার গণ্য করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা হতে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখ না।” সূরা আন্ নিসা : ১৯

ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ওয়ারিসগণ তার স্ত্রীর উপর কতৃত্বশীল হতো। কেউ ইচ্ছা করলে তাকে বিবাহ করত অথবা অন্যত্র বিবাহ দিত অথবা বিবাহ না দিয়ে আটকিয়ে রাখত। তার পরিবারের লোকজনের তুলনায় তারা হতো তার উপর কর্তৃত্বশীল। এ সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল, প্রাগুক্ত, তাফসীর সূরা আন্ নিসা, বাবু লা ইয়াহিল্লু লাকুম আন তারিছুন নিসাআ কারহান, হাদীস নং- ৪৫৭৯)।]

মৃতের সম্পদে নারীর কোনো উত্তরাধিকারী স্বত্ব স্বীকৃত ছিল না। [হাদিসে এসেছে: একদা ছাবিত ইবন কায়েস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ছাবিত উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাঁর দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কিন্তু ছাবিতের ভাই তার সমস্ত পরিত্যাক্ত সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে মীরাসের আয়াত অবতীর্ণ হয়। (দ্র. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত ফারাইদ, বাবু মা জা‘আ ফী মীরাছিস সুলব হাদীস নং-২৮৯১, ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত, ফারাইদ, বাবু মাজআ ফী মীরাযিল বনাত, হাদীস নং ২০৯২; অবশ্য তিরমিযীতে ছাবিতের স্থলে সা‘দ ইবনুর রবী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উল্লেখ আছে)।]

এমনিভাবে জাহেলী যুগে আরব সমাজে নারী ছিল অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অধিকার বঞ্চিত। মূলতঃ তাদের দীনী অনুভূতি তথা দীনে ইবরাহীমের থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই এ ধরনের ঘৃণ্য ও জঘণ্য কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়েছিল।

এছাড়াও জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান মাজুসিয়াত বা অগ্নিপূজক এবং সাবেয়ী মতবাদের ব্যপক প্রচলন ছিল। দীনের ব্যপারে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা বাড়াবাড়ি করত। ইয়াহূদীরা ‘উযাইর ‘আলাইহিস সালাম ও খ্রিষ্টানরা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করত। তাই তাদের ঈমান আনয়নের দাবী নিরর্থক। তারা পণ্ডিত ও পুরোহিতদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে এবং মরিয়মের পুত্রকেও। ফলে তারাও সমকালীন আরবে অন্যান্যদের ন্যায় শির্কে নিমজ্জিত ছিল। ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা আসার পরও তারা মতবিরোধ করত। তাদের চরিত্র নিরূপণ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন,

﴿وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ لَيۡسَتِ ٱلنَّصَٰرَىٰ عَلَىٰ شَيۡءٖ وَقَالَتِ ٱلنَّصَٰرَىٰ لَيۡسَتِ ٱلۡيَهُودُ عَلَىٰ شَيۡءٖ وَهُمۡ يَتۡلُونَ ٱلۡكِتَٰبَۗ كَذَٰلِكَ قَالَ ٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَ مِثۡلَ قَوۡلِهِمۡۚ فَٱللَّهُ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ فِيمَا كَانُواْ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَ ١١٣ ﴾ [البقرة: ١١٣]

“ইয়াহূদীরা বলে, খ্রিষ্টানরা কোন ভিত্তির উপরেই নয়, আবার খ্রিষ্টানরা বলে ইয়াহূদীরা কোন ভিত্তির উপরেই নয়, অথচ তারা কিতাব পাঠ করে। এমনিভাবে যারা মূর্খ তারাও ওদের মতই উক্তি করে। অতএব, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা দিবেন। যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করেছিল।” [আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা : ১১৩।]

তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের পদাংকের অন্ধ অনুসারী ছিল। যখন তাদের নিকট হেদায়াতের বাণী আসত তখন তারা বলত ইতোপূর্বে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পথ অনুসরণ করে চলেছি, এখনও তাদের অনুসরণ করে যাব। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ أَمۡ ءَاتَيۡنَٰهُمۡ كِتَٰبٗا مِّن قَبۡلِهِۦ فَهُم بِهِۦ مُسۡتَمۡسِكُونَ ٢١ بَلۡ قَالُوٓاْ إِنَّا وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا عَلَىٰٓ أُمَّةٖ وَإِنَّا عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِم مُّهۡتَدُونَ ٢٢ ﴾ [الزخرف: ٢١، ٢٢]

“আমি কি তাদেরকে কুরআনের পূর্বে কোনো কিতাব দিয়েছি? ফলে তারা তা আকড়ে রেখেছে? বরং তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্বপূরুষদেরকে পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে পথপ্রাপ্ত। [আল-কুরআন, সূরা যুখরুফ : ২১-২২।]

মক্কার পৌত্তলিকরা ভাগ্য পরীক্ষার জন্য ‘আযলাম’ [أزلام শব্দটি زلم এর বহুবচন। ‘যালাম’ এমন তীরকে বলা হয়, যে তীরে পালক লাগানো থাকে না।] বা ফাল-এর তীর ব্যবহার করত। এ কাজের জন্য তাদের সাতটি তীর ছিল। তম্মধ্যে একটিতে نعم (হ্যাঁ) অপরটিতে لا(না) এবং অন্যগুলোতে অন্য শব্দ লিখিত ছিল। এ তীরগুলো কাবাগৃহের খাদেমের কাছে থাকত। কেউ নিজ ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে অথবা কোনো কাজ করার পূর্বে তা উপকারী হবে না অপকারী, তা জানতে চাইলে সে কা‘বার খাদেমের কাছে পৌঁছে একশত মুদ্রা উপঢৌকন দিত। অতঃপর খাদেম তীর বের করে আনত, যদি তাতে হ্যাঁ লেখা থাকে তবে কাজটিকে উপকারী মনে করা হত। অন্যথায় তারা বুঝে নিত যে. কাজটি করা ঠিক হবে না।

শুধু এ সকল কুসংস্কারে বিশ্বাস করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং রিসালাত ও আখিরাতকেও তারা অস্বীকার করত। তাদের ধারণা ছিল যে, পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন, কালের প্রবাহেই মৃত্যু হয়। [আল্লাহ বলেন,

﴿ وَقَالُواْ مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنۡيَا نَمُوتُ وَنَحۡيَا وَمَا يُهۡلِكُنَآ إِلَّا ٱلدَّهۡرُۚ وَمَا لَهُم بِذَٰلِكَ مِنۡ عِلۡمٍۖ إِنۡ هُمۡ إِلَّا يَظُنُّونَ ٢٤ ﴾ [الجاثية: ٢٤]আল-কুরআন, সূরা জাসিয়া : ২৪।]

তাছাড়া তাদের আরও বিশ্বাস ছিল যে, কোনো মানব রাসূল হতে পারে না, এ ধারণা তাদেরকে রিসালাতে অবিশ্বাসী করার জন্য প্ররোচিত করত। [আল্লাহ বলেন,

﴿ وَمَا مَنَعَ ٱلنَّاسَ أَن يُؤۡمِنُوٓاْ إِذۡ جَآءَهُمُ ٱلۡهُدَىٰٓ إِلَّآ أَن قَالُوٓاْ أَبَعَثَ ٱللَّهُ بَشَرٗا رَّسُولٗا ٩٤ ﴾ [الاسراء: ٩٤]

আল-কুরআন, সূরা বনী ইসরাঈল : ৯৪।]

৩. হানীফ সম্প্রদায়

আরবরা মুসলিম মিল্লাতের নেতা ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-এর প্রিয়তম স্ত্রী হাজেরা ও তার পুত্র ইসমাঈল ‘আলাইহিস সালাম-এর স্মৃতি বিজড়িত সাফা মারওয়া পর্বতদ্বয়, যমযমকুপ, এবং পবিত্র কা‘বাগৃহ অবস্থিত হওয়ায় এ স্থানের জনগণ পূর্ব হতেই ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত ছিল। তবে দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে নবী ও রাসূলের আগমন না হওয়ায় অধিকাংশের মধ্যে একেশ্বরবাদের পরিবর্তে বহু ইশ্বরের পূজা তথা শির্ক এবং নানা প্রকার কুসংস্কার প্রবেশ করে। সেখানে বসবাসরত ইয়াহূদী [ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম-এর চতুর্থ পুত্র ‘ইয়াহূদা’ এর নামে এ ধর্মের নামকরণ করা হয় ইয়াহূদী। এরা পুরোহিত ও পণ্ডিতগণের ধ্যান-ধারণা ও ঝোঁক প্রবণতা অনুযায়ী আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করতো এবং ধর্মীয় রীতিনীতির কাঠামো তৈরী করতো। তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের নাম ‘তালমূদ’। (মাযহার উদ্দিন সিদ্দিকী, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম, (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খৃ. ১৯৯১), পৃ. ৫২-৫৩ ; সাইয়্যেদ আবুল হাসান আন নদভী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০) সত্যিকার অর্থে মূসা ‘আলাইহিস সালাম ছিলেন তাদের জন্য প্রেরিত রাসূল। তারা ছিল দারুন কুচক্রী ও প্রতারক। তাদের চরিত্র ও নৈতিকতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلۡأَحۡبَارِ وَٱلرُّهۡبَانِ لَيَأۡكُلُونَ أَمۡوَٰلَ ٱلنَّاسِ بِٱلۡبَٰطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِۗ وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤ ﴾ [التوبة: ٣٤]

আল-কুরআন, সূরা আত্ তাওবা : ৩৪ এ ছাড়াও আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেমন : ২:১১৩, ১২০; ৩: ৬; ৫: ২০, ৫৪, ৬৭, ৮৫; ৯ : ৩০। (মুহাম্মদ ইবন আব্দুল করিম ইবন আবু বকর আহমদ আল-শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়াল নিহাল, ১ম খণ্ড, (মিসর : মাকতাবা মুস্তফা আল-বাবী আল হালবী ওয়া আওলাদুহু, খৃ.১৯৯৭), পৃ. ২০৯।], খ্রিষ্টান [খ্রিষ্টানরা নিজেদেরকে ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-এর অনুসারী বলে দাবী করে থাকে। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের জন্য ইঞ্জীল কিতাব অবতীর্ণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা এ কিতাবে বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়াতের বিকৃতি ঘটায়। কুরআন মাজীদে বিভিন্ন জায়গায় তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন: আল-কুরআন, সূরা আস-সফ : ১৪; আল-বাকারা : ৬২।] এবং সাবেয়ীগণ [নক্ষত্র ও ফেরেশ্তাপূজক। এরা নিজেদের পছন্দমত বিভিন্ন ধর্ম থেকে কিছু কিছু গ্রহণ করেছিল। ড.মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮।] ছাড়াও কিছু সংখ্যক লোক এক আল্লাহকে বিশ্বাস করতো।

সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ঘোর তমাসাচ্ছন্ন সমাজে এমন কতিপয় লোকের বসবাস ছিল যাদেরকে জাহেলিয়াতের রুসম-রেওয়াজ, মূর্তিপূজা, শির্ক প্রভৃতির কোন কিছুই ম্পর্শ করতে পারে নি। তারা দীনে ইবরাহীমের উপর অটল ও অবিচল ছিল। কুরআন মাজীদে এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে “নিঃসন্দেহে যারা মুসলিম হয়েছে এবং যারা ইয়াহূদী, নাসারা এবং সাবেঈন (তাদের মধ্য থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রাতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে, তার সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দূঃখিতও হবে না।” [আল্লাহ বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَٱلَّذِينَ هَادُواْ وَٱلنَّصَٰرَىٰ وَٱلصَّٰبِ‍ِٔينَ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا فَلَهُمۡ أَجۡرُهُمۡ عِندَ رَبِّهِمۡ وَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦٢ ﴾ [البقرة: ٦٢]

আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা : ৬২।]

উপরোক্ত আয়াতে কারীমার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দা‘ওয়াতের পূর্বেও আরবে একদল ঈমানদারের অস্তিত্ব বিদ্যামান ছিল। আর তাদেরকেই বলা হয় ‘হানীফ সম্প্রদায়’। [হানীফ অর্থ একনিষ্ঠ। আল-কুরআনে কা‘বা নির্মাতা ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-কে হানীফ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা:১২৪।] তারা বিভিন্ন গোত্রের মধ্য হতে বিভিন্ন মতের অধিকারী ছিল। ফলে তাদের মাঝে কোনো ঐক্য ছিল না। হানীফ সম্প্রদায় আল্লাহর একত্ব সম্বন্ধে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল বটে, কিন্তু তাদের এ ধ্যান-ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে নি। তবে মূর্তিপূজা ও শির্ক নির্মূলে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাদের মধ্যে উমাইয়া ইবন আবি সালত, ইবন আওফ আল-কিনানী, হাশিম ইবন আবদ্ মান্নাফ, ওরাকাহ্‌ ইবন নওফল প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। [মুহাম্মদ ইদ্রীস কানদেহলভী, সীরাতুল মোস্তফা, (দেওবন্দ : ইরশাদ বুক ডিপো, তা.বি.), পৃ. ১৩৯।]

অতএব, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবের পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলা সত্যের দা‘ওয়াত গ্রহণ করার জন্য স্বল্প সংখ্যক হলেও একনিষ্ট তাওহীদপন্থী লোকের অস্তিত্ব সমকালীন আরবে বিদ্যমান রেখেছিলেন। পি.কে হিট্টি বলেন যে, ধর্ম বিষয়ে আরবের সাধারণ অবস্থা একটা পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল বলে মনে হয় এবং একজন সমাজ সংস্কারক ও জাতীয় নেতা আবির্ভাবের জন্য মঞ্চ তৈরী হচ্ছিল।

তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক ও অস্থিতিশীল ছিল। জোর যার মুল্লুক তার এ নীতি সর্বত্রই বিদ্যমান ছিল। সামান্য ও তুচ্ছ বিষয়ে তাদের মাঝে বিরোধ দেখা দিত। প্রতিশোধ প্রবণতা ছিল তাদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তারা অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করতে উদ্যত হত। কোনো হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলে তার প্রতিশোধ অন্যায়ভাবে আরেকটি হত্যাকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে নিত। ফলে ন্যায়-অন্যায় এর মাঝে বিচার-বিশ্লেষনের কোনো তোয়াক্কা করত না। সমাজের মানুষ দাস ও প্রভু এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। শাসকবর্গ অর্থসম্পদ কেবল নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ, আরাম-আয়েশ, ঐশ্বর্য ও বিলাসিতায় ব্যয় করতো। আর জনগণ অনাহারে জীবন-যাপন করত। শাসকরা জনগণের উপর সকল প্রকার জুলুম-অত্যাচার চালিয়ে যেত, জনগণ সেসব মুখ বুঁজে নির্বিচারে সহ্য করতো। কোনো প্রকার অভিযোগ করার তাদের উপায় ছিল না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভবের সময়ে তাদের সমাজিক কাঠামো বিপর্যস্ত ও ধ্বংসের মূখোমুখি ছিল। তারা এক উপদ্বীপে বাস করলেও তাদের মাঝে সামাজিক রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল না। বরং সেটি বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপতি কর্তৃক শাসিত বহুরূপী রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। বিভিন্ন গোত্র ও জাতির মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ সবসময় লেগেই থাকত।

তৎকালীন সময় রোম এবং পারস্য সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের সময় এ দু’ শক্তির মাঝে যুদ্ধ চলছিল। কুরআন মাজীদে তাদের যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরেছে এভাবে,

﴿ الٓمٓ ١ غُلِبَتِ ٱلرُّومُ ٢ فِيٓ أَدۡنَى ٱلۡأَرۡضِ وَهُم مِّنۢ بَعۡدِ غَلَبِهِمۡ سَيَغۡلِبُونَ ٣﴾ [الروم: ١، ٣]

“আলিফ, লাম, মীম। রোমকরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর অতিসত্বর বিজয়ী হবে। [আল-কুরআন, সূরা আর রূম : ১-৩]

বস্তুত আরবরা ছিল অত্যন্ত কলহকারী ও বিশৃংখল জাতি। [আল্লাহ বলেন,

﴿وَكَمۡ أَهۡلَكۡنَا قَبۡلَهُم مِّن قَرۡنٍ هَلۡ تُحِسُّ مِنۡهُم مِّنۡ أَحَدٍ أَوۡ تَسۡمَعُ لَهُمۡ رِكۡزَۢا ٩٨﴾ [مريم: ٩٨]

“আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন।” আল-কুরআন, সূরা মরিয়ম : ৯৮।] খুব ছোট-খাট বিষয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ লেগে যেত এবং পরবর্তীতে তা যুদ্ধে পরিণত হতো। এক উষ্ট্রী হত্যাকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ যুদ্ধ চলছিল। ইতিহাসে এটি ‘হারবূল বাসুস’ নামে সমধিক পরিচিত। [ইবনুল আছির, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯২-২৯৫।] তাদের সামাজিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেনঃ

﴿إِذۡ كُنتُمۡ أَعۡدَآءٗ فَأَلَّفَ بَيۡنَ قُلُوبِكُمۡ فَأَصۡبَحۡتُم بِنِعۡمَتِهِۦٓ إِخۡوَٰنٗا﴾ [ال عمران: ١٠٣]

“তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিলে, অতঃপর আমি তোমাদের অন্তরে বন্ধুত্বের ভাব সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম। ফলে তোমরা পরস্পরে ভাই-ভাই হয়ে গেলে।” [আল-কুরআন, সূরা আলে-ইমরান : ১০৩]

তাদের মাঝে জাহেলী প্রতিশোধ স্পৃহা, ক্রোধ, গোত্রপ্রীতি চরমভাবে বিদ্যমান ছিল।

ইয়াহূদী ধর্মের অনুসারীদের ছিল আকাশ ছোয়া অহংকার। ইয়াহূদী পুরোহিতরা আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে নিজেরাই প্রভু হয়ে বসেছিল। তারা মানুষের উপর নিজেদের ইচ্ছা জোর করে চাপিয়ে দিত। তারা মানুষের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যাণ-ধারণা এবং মুখের কথা নিজেদের মর্জির অধীন করে দিয়েছিল। ধর্ম নষ্ট করে হলেও তারা ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ পেতে চাইত। অপরদিকে খ্রিষ্ট ধর্ম ছিল এক উদ্ভট মূর্তিপূজার ধর্ম। তারা আল্লাহ তা‘আলা এবং মানুষকে বিষ্ময়করভাবে একাকার করে দিয়েছিল। আরবের যে সব লোক এ ধর্মের অনুসারী ছিল, তাদের উপর এ ধর্মের প্রকৃত কোনো প্রভাব ছিল না। কেননা দীনের শিক্ষার সাথে তাদের ব্যক্তি জীবনের কোনো মিল ছিল না। কোনো অবস্থায়ই তারা নিজেদের ভোগ সর্বস্ব জীবন-যাপন পরিত্যাগ করতে রাজি ছিল না। পাপের পথে নিমজ্জিত ছিল তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন।

আরবের অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের জীবনও ছিল পৌত্তলিকদের মতো। কেননা তাদের ধর্মের মধ্যে বিভিন্নতা থাকলেও মনের দিক থেকে তারা ছিল একই রকম। তাদের পারস্পরিক জীবনাচার এবং রুসম-রেওয়াজের ক্ষেত্রও এক ও অভিন্ন ছিল। [ আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১।]