রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন- পর্বঃ ৪

রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪ || পর্বঃ ৫

খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ

খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বসম্পন্না, প্রখর বুদ্ধিমতী, বোধশক্তিসম্পন্না, আত্মমর্যাদাসম্পন্না ও অতি উচ্চ বংশীয় মহীসয়ী মহিলা। নবীর মহত্ব ও সততার সাথে পরিচিত হওয়া তাঁর জন্য একটা অতিরিক্ত সৌভাগ্য হয়ে দেখা দিল। বলা বাহুল্য, এটা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহের ফল। মায়সারার উক্ত অলৌকিক ঘটনা শুনে খাদীজা এত অভিভূত হলেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিম্নরূপ বার্তা পাঠালেন, “ভাই আপনার গোত্রের মধ্যে আপনার যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, যে আত্মীয়তার বন্ধন এবং সর্বোপরি আপনার বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতার যে সুনাম রয়েছে, তাতে আমি মুগ্ধ ও অভিভুত।” এ বলে খাদীজা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কুরাইশদের মধ্যে তখন খাদীজা ছিলেন ধনে-মানে, মর্যাদায় ও বংশীয় আভিজাত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা। তাঁর গোত্রে এমন কোন পুরুষ ছিল না, যে তাকে সাধ্যে কুলালে বিয়ে করা অভিলাষ পোষণ করতো না। খাদীজার পিতার নাম খুওয়ায়লিদ এবং মাতার নাম ফাতিমা। পিতামাতা উভয়েই পূর্বপুরুষ লুওয়াইতে গিয়ে একই প্রজন্মে মিলিত হয়েছেন।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজার প্রস্তাব চাচাদের কাছে পেশ করলেন। চাচা হামযা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে নিয়ে তৎক্ষণাৎ খাদীজার পিতার কাছে চলে গেলেন। তার সাথে দেখা করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিলেন। নির্ধারিত দিনে বিবাহ অনুষ্ঠানে আবু তালিব বনু হাশিম এবং মুদের বংশের সর্দারগণ খাদীজার গৃহে সমবেত হলেন। আবু তালিব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন। এ খুতবায় তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন তা উল্লেখ্যযোগ্য।

আবু তালিব বলেন, “ইনি মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ। যদিও তিনি ধন-সম্পদে কম, কিন্তু ভদ্র, চরিত্র ও উচ্চ মর্যাদার কারণে যে ব্যক্তিকেই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাখা যাক না কেন, পরিণামে তিনিই হবেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কেননা ধনদৌলত ধ্বংসশীল, ছায়া স্বরূপ এবং ক্ষীয়মান বস্তু। ইনি মুহাম্মদ, যার আত্মীয়তা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন, খাদীজা বিনত খুয়ায়লিদের সাথে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ করতে চাই। তার সমস্ত মোহরে মু‘আজ্জাল (তাৎক্ষণিক আদায়কৃত) মোহরে মুয়াজ্জাল (বিলম্বে পরিশোধযোগ্য) আমার সম্পদ হতে আদায়কৃত এবং আল্লাহর শপথ, এরপর তাঁর মান-সম্মান ও প্রভাব অনেক গুণ বেড়ে যাবে।”

ইবন হিশাম বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী খাদিজাকে মোহরানা স্বরূপ ২০টি তরুণ উট প্রদান করেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স ছিল ২৫ বছর। আর খাদীজার বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। খাদীজাই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রথম স্ত্রী এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিবাহ করেন নি।

খাদীজার গর্ভে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাসিম, তাহির, তায়্যিব, যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা-এই কজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। একমাত্র ইব্রাহীম ছাড়া তাঁর সকল সন্তানই খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। কাসিমের নাম অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম, তায়্যিব, তাহির জাহিলিয়ার যুগেই মারা যান। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং সবাই ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সঙ্গে হিজরত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন কাসিম। তারপর ক্রমান্বয়ে তায়্যিব, তাহির, কন্যা রুকাইয়া, যয়নব, উম্মে কুলসুম ও সর্বশেষে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর এক সন্তান ছিলেন ইব্রাহীম। ইনি মারিয়্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মিসরের খ্রিষ্টান শাসক মুকাওকিস মারিয়্যাকে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন।

কাবা গৃহ সংস্কার ও হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কিত বিবাদ মীমাংসা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করেন, তখন কুরাইশগণ কাবা গৃহের পুনঃনির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কারণ ছিল এই যে, কাবা গৃহের স্থানটি চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিল মাত্র। দেয়ালের উপর কোনো ছাদ ছিল না। এই অবস্থায় কিছু সংখ্যক চোর এর মধ্যে প্রবেশ করে রক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদ এবং অলংকারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাইলের আমল হতেই এই ঘরের উচ্চতা ছিল ৯ হাত।

গৃহটি বহু পূর্বে নির্মিত হওয়ার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যে কোন মুহূর্তে তা ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তা ছাড়া সেই বছরের প্লাবনে দেওয়ালের চরম অবনতি ঘটে এবং যে কোন মুহূর্তে তা ধসে পড়ার আশংকা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। এমনিভাবে এক নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ হলেন কাবা গৃহের স্থান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তা পুনঃনির্মাণের জন্য। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৬১; সিয়ারু আ‘লাম আন নুবালা; ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৩-৬৪।]

কাবাগৃহ নির্মাণে অংশগ্রহণকে সবাই নিজকে সৌভাগ্যবান এবং এটাকে নেক কাজ মনে করতেন। কুরাইশ গোত্র নিজেদের উপর ফায়সালা করে রেখেছিল যে, এর নির্মাণ কাজে তারা সিংহভাগ অংশ পাবে। তাই এ নির্মাণ কাজ সমস্ত গোত্রের মধ্যে বন্টন করার ব্যবস্থাপনা করতে হলো, যাতে কোন বিবাদ সৃষ্টি না হয়।

কাবা নির্মাণ বণ্টনের কাজ ক্রমান্বয়ে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌছালো। কিন্তু তার স্থাপনের ব্যাপারে মতানৈক্য শুরু হলো। প্রত্যেক গোত্র এবং প্রত্যেকেরই কামনা ছিল যে, তারাই এ পূণ্য অর্জন করবে। ফলে ঘটনাটি এতদূর পর্যন্ত পৌছে গেল যে, তারা মারামারি, কাটাকাটির জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে লাগলো। জাতির কোন কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি প্রস্তাব করলেন যে, পরামর্শ করে কোন সন্ধির পথ বের করা হোক। এ উদ্দেশ্যে সবাই মসজিদে একত্রিত হলেন।

পরামর্শ সভায় সিদ্ধান্ত হলো যে, যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম মসজিদের এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন তিনিই এ ব্যাপারে মীমাংসা করবেন এবং তাঁর নির্দেশকে কুদরতী নির্দেশ বলে মেনে নিতে হবে। মহান আল্লাহর কুদরতে সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। [সীরাতু খাতিমিল আম্বিয়া, পৃ. ২৩; প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৪।] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠল:

ইনিই আল আমীন। আমরা সবাই তাঁর উপর সন্তুষ্ট। ইনিই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের নিকটবর্তী হন, তখন ব্যাপারটি সবিস্তারে তাঁর নিকট পেশ করা হল। তখন তিনি একখানা চাদর চাইলেন। চাদর দেওয়া হলে মেঝের উপর তা বিছিয়ে দিয়ে স্বহস্তে কৃষ্ণ প্রস্তরটি তার উপর স্থাপন করলেন এবং বিবাদমান গোত্রপতিদেরকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনারা সকলে একসাথে মিলে চারদটি ধরুন এবং কৃষ্ণ প্রস্তরটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চলুন। অতঃপর স্বহস্তে তিনি কৃষ্ণ প্রস্তরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। এ মীমাংসা সবাই খুশীমনে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজ সরল সুশৃঙ্খল এবং সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিরপেক্ষতা এবং তীক্ষ্ণ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে সকলেই স্তম্ভিত হল এবং আসন্ন সমরাশংকা তিরোহিত হল। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৬২; সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২য় খণ্ড, (ঢাকা: ই.ফা.বা ১৯৮২/ ১৪০২), পৃ. ২৯৩।]

হেরাগুহায় ইবাদাত ও নবুয়ত লাভ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হতে নিভৃতে চিন্তা ইবাদাতের জন্য মক্কা হতে তিন মাইল দূরে হেরা নামক পর্বত গুহায় যেতে আরম্ভ করলেন। কয়েকদিনের খাদ্য-পানীয় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তা শেষ হলে বাড়িতে এসে আবার কয়েকদিনের জন্য খাদ্য পানীয় নিয়ে চলে যেতেন। খাদীজা পরম যত্ন সহকারে আহার্য প্রস্তুত করে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্জনাসক্তি ও নির্জনতায় ছিল প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার ব্যবস্থাপনার একটি অংশ। কিছুদিন যাবত তিনি একটি স্বর্গীয় আলোক দেখতে এবং একটি অশ্রুপূর্ণ শব্দ তরঙ্গ শুনতে পেলেন। তখন থেকে তিনি স্বপ্নযোগে যা দেখতেন তাই সত্যে পরিণত হতে লাগল। অবশেষে তাঁর বয়স যখন চল্লিশ বছর তখন একদিন প্রকাশ্যে মহান আল্লাহ তাঁকে প্রকাশ্যে ও বাহ্যিক নবুয়তের পরম মর্যাদায় ভূষিত করলেন।

তখন ছিল রমযান মাস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রেখে রাত্রিতে হেরা গুহায় সারারাত জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। এমনিভাবে রমযানের ২১ হতে ২৯ তারিখের কোনো এক বিজোড় রজনীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন তখন মহান আল্লাহর দূত জিবরাঈল ‘আলাইহিস সালাম তাঁর নিকট আগমন করেন। এ ঘটনাটি হাদীসের মাধ্যমে বর্ণনা করলেও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথমে যে ওহী রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসত তা হল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্ন। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের আলোর মতই স্পষ্ট হতো। এরপর তাঁর নিকট নির্জন জীবন যাপন ভাল লাগলো। তাই তিনি একাধারে কয়েকদিন পর্যন্ত নিজ পরিবারের নিকট না গিয়ে হেরা গুহায় নির্জন পরিবেশে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতে লাগলেন। আর এ উদ্দেশ্যে তিনি কিছু খাবার সাথে নিয়ে যেতেন। পরে তিনি বিবি খাদীজার নিকট ফিরে এসে আবার ঐরূপ কয়েকদিনের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। এভাবে হেরা গুহায় থাকাকালে তাঁর নিকট সত্য ওহী এলো। জিবরাঈল ফেরেশতা সেখানে এসে তাঁকে বললেন, পড়ুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ফেরেশতা তখন আমাকে ধরে এত জোরে আলিঙ্গন করলেন যে, এতে আমি চরম কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর ফেরেশতা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। তখন তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার আমাকে ধরে খুব জোরে আলিঙ্গন করলেন। তাতে আমার অত্যন্ত কষ্ট বোধ হলো। এরপর আমাকে তিনি ছেড়ে দিয়ে পড়তে বললেন। আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ফেরেশতা তৃতীয়বার ধরে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করায় আমার ভীষণ কষ্ট হলো। এবার তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ

﴿ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ مِنۡ عَلَقٍ ٢ ٱقۡرَأۡ وَرَبُّكَ ٱلۡأَكۡرَمُ ٣ ٱلَّذِي عَلَّمَ بِٱلۡقَلَمِ ٤ عَلَّمَ ٱلۡإِنسَٰنَ مَا لَمۡ يَعۡلَمۡ ٥﴾ [العلق: ١، ٥]

“আপনার রবের নামে পড়ুন, যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট রক্ত থেকে যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর আপনার রব সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন তা যা সে জানত না।” {সুরা আ’লাক্ব}

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতগুলোকে আয়ত্ব করে বাড়ি ফিরলেন। তাঁর হৃদয় তখন ভয়ে কাঁপছিল। তিনি খাদীজার নিকট এসে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। তিনি তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। পরে তাঁর ভয় চলে গেলে তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, আমি আমার জীবন সম্পর্কে আশংকা বোধ করছি। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- না, ভয় নেই। আল্লাহর কসম, তিনি কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ আপনি নিজ আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন ও দুঃখীদের খেদমত করেন, বঞ্চিত ও অভাবীগণকে উপার্জনক্ষম করেন, মেহমানদারী করেন এবং সত্য পথের বিপদগ্রস্তদেরকে সাহায্য করেন। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা ইবন নওফেল ইবন আসাদ ইবন আবদুল উযযার নিকট চলে গেলেন। ওরাকা জাহিলী যুগে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষায় কিতাব লিখতেন। তাই আল্লাহর ইচ্ছা ও তাওফীক অনুযায়ী তিনি ইঞ্জিলের অনেকাংশে ইবরানী ভাষায় রূপান্তরিত করেন। তিনি বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সব কথা শুনতে বললেন। ওরাকা শুনতে চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব ঘটনা শোনালেন। ওরাকা তাঁকে বললেন, এ সেই রহস্যময় জিবরাঈল ফেরেশতা যাঁকে মুসা আলাইহসি সালামের নিকট আল্লাহ নাযিল করেন। হায়, আমি যদি তোমার নবুয়তের সময় বলবান যুবক থাকতাম ! হায় আমি যদি সে সময় জীবিত থাকতাম ! যখন তোমার জাতি তোমাকে দেশ থেকে বের করে দিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা কি সত্যিই আমাকে বের করে দিবে? ওরাকা বললেন, হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছ, তদ্রুপ কোন ব্যক্তি কিছু নিয়ে আসলে তার সাথে অতীতেও শত্রুতাই করা হয়েছে। আমি তোমার যুগে বেঁচে থাকলে তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করব। তারপর কিছুদিন পরেই ওরাকা মারা যান। [মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারী; সহীহুল বুখারী, ১ম খণ্ড, (করাচী: নূর মহাম্মদ কারখাসাহ ১৯৩৮/১৪১০), পৃ. ১০৪-১০৫।]

মক্কায় ইসলাম প্রচারঃ

প্রথমত যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ওহী নাযিল হয়, তখন প্রকাশ্যভাবে দীন প্রচারের জন্য তিনি আদিষ্ট হন নি, বরং এতে শুধু রাসূলর ব্যক্তিগত আমলের জন্য আহকাম ছিল। এ সময় কিছু দিনের জন্য ওহী বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মর্মান্তিক বেদনা বোধ করতে লাগলেন। কাফিররা তাকে বিদ্রুপ ও তিরষ্কার করতে লাগল। আবূ লাহাব বলে বেড়াতে লাগল, “মুহাম্মদের আল্লাহ মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করেছে।” আবূ লাহাবের স্ত্রী তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগল, দেখছি, তোমার শয়তান তোমাকে পরিত্যাগ করেছে। এ জঘন্য বিদ্রুপে আহত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজার নিকট গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। তখন সূরা আদ-দোহা নাযিল হয়। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকটি বৈষয়িক নিয়ামতের কথা উল্লেখ আছে। শেষ আয়াতে আছে; “আর তোমার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা তুমি বর্ণনা কর।” রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়ত রূপ যে নিয়ামত আল্লাহর তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তিনি গোপনে গোপনে তা প্রচার করতে লাগলেন। [আব্দুল খালেক, সাইয়েদুল মুরসালীন, ১ম খণ্ড (ঢাকা, ই.ফা.বা ৪র্থ সংস্করণ, ১৯৯০/১৪১০), পৃ. ১০৪-১০৫।]

অল্পদিনের মধ্যে খাদীজা, আবু বকর, আলী, যায়েদ ইবন হারিসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নবুয়তের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর সত্যবাদিতা, সাধুতা সম্পর্কে খুব ভালো জানতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে রিসালতের খবর জানালেন, তখন তিনি সাথে সাথেই তাঁর দাওয়াত সত্য বলে বিশ্বাস করলেন এবং কালেমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর গোত্রের মধ্যে সবার নিকট সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। সব ব্যাপারে লোকেরা তাঁর উপর বিশ্বাস করতেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ঐ সমস্ত লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন, যাদের মধ্যে কিছু কল্যাণ ও মঙ্গলের চি‎হ্ন লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং ওসমান গণী, আব্দুর রহমান ইবন ‘আউফ, সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, যুবাইর ইবনুল ‘আওয়াম এবং তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম তাঁর দাওয়াত কবুল করলেন। তিনি সবাইকে রাসূলের খিদমতে নিয়ে গেলেন এবং সেখানে তাঁরা সকলেই মুসলিম হয়ে গেলেন।

এরপর আবু ‘ওবায়দা, ‘উবাদাহ ইবনুল হারিস, ইবন যায়েদ, আবু সালামা, খালিদ ইবন সাঈদ, উসমান ইবন মায‘উন এবং তার দুধভাই কুদামা ও উবায়দুল্লাহ, আরকাম ইবন আরকাম ইসলাম গ্রহণ করেন। এদের সবাই কুরাইশ গোত্রের ছিলেন। কুরাইশ ব্যতীত সুহাইব রুমী, আম্মার, আবু যার গিফারী, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম ইসলাম গ্রহণ করলেন।

এ সময় পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত গোপন ছিল। ইবাদত ও শরীয়তের আমলসমূহ গোপনে কথা হতো। এমনকি পিতা পুত্র হতে এবং পুত্র পিতা হতে লুকিয়ে নামায পড়ত। যখন মুসলিমদের সংখ্যা ত্রিশোর্ধ হয়ে গেল তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের জন্য একটি প্রশস্ত ঘর তৈরী করলেন, যেখানে সবাই একত্রিত হতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালিম দিতেন।

এ পদ্ধতিতে ইসলামের দাওয়াত তিন বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। এ সময় কুরাইশদের এক বিশেষ জামা‘আত ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর আরো অন্যান্য লোক ইসলাম গ্রহণ শুরু করল। এ খবর মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণের মাঝে বিভিন্ন জায়গায় তা আলোচনা হতে থাকে। তাই এখন প্রকাশ্যভাবে সত্যের দাওয়াত পৌঁছানোর সময় এসে গেছে। [সীরাতু খাতিমিল আম্বিয়া, পৃ. ২৪-২৫।]