রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন- শেষ পর্ব

রাসূল (সঃ) এর সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩ || পর্বঃ ৪ || পর্বঃ ৫

প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত:

তিন বছর পর বিপুল পরিমাণে নারী পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল এবং জনগণের মধ্যে এটা আলোচিত হতে লাগলো। তখন প্রকাশ্যে দাওয়াত পৌঁছে দিবার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন:

﴿ فَٱصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٩٤ ﴾ [الحجر: ٩٤]

“হে নবী! আপনি প্রকাশ্যে প্রচার করতে থাকুন, যা আপনাকে আদেশ করা হয়েছে এবং মুশরিকদেরকে আদৌ পরওয়া করবেন না।” [আল-কুরআন, সূরাতুল হিজর, আয়াত ৯৪।]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে তা পালন করলেন এবং মক্কায় সাফা নামক পাহাড়ে চড়ে কুরাইশ গোত্রের নাম ধরে আওয়াজ দিলেন। যখন সমস্ত গোত্রের লোকেরা একত্রিত হল, তখন তিনি সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করলেন, যদি তোমাদের এ সংবাদ দেই যে, শত্রুসৈন্য তোমাদেরকে আক্রমণের জন্য আসছে এবং তোমাদের উপর লুটতরাজ করবে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? এটা শুনে সবাই বলল, নিশ্চয়ই আমরা আপনার সংবাদ সত্য বলে বিশ্বাস করব। কেননা আজ পর্যন্ত আমরা আপনাকে মিথ্যা কথা বলতে দেখিনি।

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, আমি তোমাদেরকে খবর দিচ্ছি যে, যদি তোমরা তোমাদের বাতিল আকীদা না ছাড়, তাহলে মহান আল্লাহর কঠিন শাস্তি তোমাদের উপর নেমে আসবে। তিনি আরো বললেন, আমার যতটুকু জানা আছে, তাতে দুনিয়াতে কোন মানুষ স্বীয় গোত্রের জন্য এ উপহারের চেয়ে উত্তম কোন উপহার নিয়ে আসেনি, যা আমি তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাদেরকে এর দিকে আহ্বান করি। আল্লাহর শপথ, যদি আমি সমস্ত দুনিয়ার মানুষের নিকট মিথ্যা বলতাম, তবুও তোমাদের সামনে মিথ্যা বলতাম না। যদি সমস্ত লোককে ধোঁকা দিতাম কিন্তু তোমাদেরকে ধোঁকা দিতাম না। ঐ পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি এক এবং যার কোনো সমকক্ষ ও অংশীদার নেই। আমি তোমাদের নিকট বিশেষ করে সমস্ত দুনিয়াবাসীর জন্য আল্লাহর পয়গম্বর ও রাসূল। [সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, পৃ. ২৪-২৫]

কুরাইশদের অত্যাচার:

যখন ইসলাম ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে লাগল তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গতিসম্পন্ন সাহাবীগণের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তাঁদের নিজ নিজ বংশ ও গোষ্ঠী। কুরাইশদের আক্রোশ সকল দিকে প্রতিহত হয়ে নিঃস্ব মুসলিমদের উপর পতিত হলো। সহায়-সম্বলহীন, আশ্রয়হারা এ সকল দরিদ্র মুসলিম কেউ ছিলেন দরিদ্র মুসাফির, কেউ ছিলেন খরিদা গোলাম, আবার কেউ প্রতিপত্তিহীন বংশের লোক, জনসমাজে যাদের প্রতিষ্ঠাই ছিল না। এদের উপর কুরাইশরা যে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। সেই দুর্দিনে দরিদ্র মুসলিমদের পক্ষে ছিল জীবন মরণ সমস্যা। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৯৮] নিম্নে দু-একটি উদাহরণ উল্লেখ করা হল:

প্রথমেই বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কথা উল্লেখ্য। তিনি ছিলেন একজন হাবশী গোলাম। তাঁর মনিব উমাইয়া ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে তাঁর উপর নানারূপ অত্যাচার শুরু করল এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলল। বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুতেই রাযী হলেন না। তাই অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেল। অবশেষে তাঁর হাত-পা বেঁধে মধ্যা‎‎হ্নে সূর্যের প্রখর তাপদগ্ধ বালুকার উপর চিৎ করে শুইয়ে রাখত এবং পাশ্ব পরিবর্তন রোধ করতে পারে এ জন্য বুকের উপর ভারী পাথর রেখে দিত। এ মুহূর্তেও তিনি বলতেন আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। এ করুণ অবস্থা দেখে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করে নেন।

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিলালের ন্যায় একজন ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে কুরাইশরা তাঁকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর শুইয়ে দিত এবং তাঁর বুকের উপর পা দিয়ে চেপে রাখত। শেষ পর্যন্ত জীবনে বেঁচে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু চিরদিনের মত তাঁর পৃষ্ঠে ধবল কুষ্ঠের ন্যায় সাদা দাগ পড়ে গিয়েছিল।

অনুরূপভাবে ওসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তখন কুরাইশগণ একেবারে হিংস্র পশুর ন্যায় ক্ষেপে গেল। ওসমানের পিতৃব্যের সাথে যোগ দিয়ে তারা ওসমানকে হাত-পা বেঁধে প্রত্যহ নির্মমভাবে প্রহার করত। ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর নামে তা সহ্য করে যেতেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরত:

কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে গেল। নতুন মুসলিমদের কাবায় কুরআন পাঠ এমনকি গৃহেও উচ্চ স্বরে কুরআন পাঠ করা ছিল অসম্ভব। এমনকি নামাজের মধ্যেও মুসলিম বিভিন্ন ভাবে নির্যাতিত হতেন। দৈহিক অত্যাচার হতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বাদ পড়েন নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের ক্রমবর্ধমান অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সাহাবীগণকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করলেন। [সাইয়েদুল মুরসালীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৯৮।]

নবুয়তের পঞ্চম বর্ষের রজব মাসে সাহাবীগণের প্রথম দলটি মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। উক্ত দলে ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলা ছিলেন। ওসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদের দলপতি। তাঁর সাথে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা রুকাইয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের সম্পর্কে বলেন, ইবরাহীম ও লুত ‘আলাইহিস সালাম-এর পর এরাই হচ্ছেন প্রথম পরিবার, যাঁরা আল্লাহর রাহে হিজরত করেন।

মুসলিমগণ আবিসিনিয়ায় পৌঁছালে বাদশাহ নাজ্জাশী তাদেরকে নিজ রাজ্যে শান্তিতে বসবাস করে ধর্মকর্ম পালনের সুবন্দোবস্ত করে দিলেন। মুহাজিরগণ প্রায় তিন মাস কাল শান্তি ও নিরাপদে বাস করে মক্কায় ফিরে আসলেন।

মুসলিমগণ ক্রমবৃদ্ধিতে কুরাইশরা তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল।এ অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় আবিসিনিয়ায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। এবার জা‘ফর ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ এবং ১২ জন মহিলার এক বিরাট দল হিজরতে অংশগ্রহণ করলেন। তাঁদের সাথে আবু মূসা আশআরীও তাঁর গোষ্ঠীর লোকজনসহ ইয়েমেনের মুসলিমগণও যোগ দিয়েছিলেন। একেই আবিসিনিয়ার দ্বিতীয় হিজরত বলা হয়। এবারেও নাজ্জাশী মুসলিমদেরকে শান্তিতে বাস করার সুবন্দোবস্ত করে দেন। মুহাজিরগণ সেখানে শান্তি ও নিরাপদে তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে লাগলেন। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৯৪-৯৫; নুরুল ইয়াকীন, পৃ. ৬১]

আবু তালিব ও খাদীজার মৃত্যু:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর অত্যাচার, বার্ধক্য, দুশ্চিন্তা, অনিয়ম ইত্যাদি কারণে আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ক্রমে ক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়ে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর মৃত্যু হয় গিরি সংকটে অন্তরীণাবস্থা শেষ হওয়ার ৬ মাস পর নবুয়্যতের ১০ বর্ষের রজব মাসে। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১১৫]

আবু তালিবের মৃত্যুর দুমাস পর (মতান্তরে তিন মাস পর) উম্মুল মু’মিনীন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহাও মৃত্যুমুখে পতিত হন। নবুয়্যতের দশম বছরে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন অতিবাহিত করছিলেন জীবনের ৫০তম বছর।

যাবতীয় বিপদ-আপদ ও অত্যাচারের প্রতিরোধে অগ্রণী ছিলেন রাসূলর চাচা আবু তালিব, আর খাদীজা ছিলেন দুর্দিন ও বিপদের পরম বন্ধু। তাঁদের মৃত্যুতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মর্মাহত হন। এমনিভাবে অবিরাম একের পর এক বিপদের সম্মুখীন হওয়ার কারণে সে বছরটির নাম রাখা হয় “আমুল হাযান” অর্থাৎ দুঃখ কষ্টের বছর। ইতিহাসে সে বছরটি এ নামেই প্রসিদ্ধ।

রাসূলের তায়েফ গমন:

নবুয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ গমন করেছিলেন। তায়েফ মক্কা থেকে আনুমানিক আট মাইল দূরে অবস্থিত। যাতাযাতের এ পথ অতিক্রম করেছিলেন তিনি পদব্রজে। সঙ্গে ছিল তাঁর ক্রীতদাস যায়েদ ইবন হারেস। পথিমধ্যে তিনি যে গোত্রের সাক্ষাৎ পান তাদেরকে তিনি ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু তাঁর আহবানে কেউই সাড়া দিল না। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১২৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফে দশদিন অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু সকলেই বলল, তুমি আমাদের রাজ্য থেকে বের হয়ে যাও। ফলে ভগ্ন হৃদয়ে নানা কষ্ট নিয়ে প্রতাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রত্যাবর্তনের পথে অসংখ্য ছেলেকে তাঁকে অপমানিত করার জন্য লেলিয়ে দেওয়া হল। ইতোমধ্যে পথের দুপাশে ভিড় জমে গেল। তারা হাত তালি, অশ্লীল কথাবার্তা বলে তাঁকে গালমন্দ দিতে ও পাথর ছুঁড়ে আঘাত করতে থাকল। আঘাতের ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ের গোড়ালিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে পাদুকাদ্বয় রক্ষাক্ত হয়ে গেল। [প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫] তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে আসার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর বাল্যবন্ধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুরোধে তাঁর কুমারী কন্যা আয়েশাকেও এ সময় বিবাহ করেন। [মুহাম্মদ আবদুল লতিফ, সীরাতে সাইয়্যিদিল মুরসালীন (ঢাকা: সাউদিয়া কুতুবখানা, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৬), পৃ. ৬৭]

ইসরা ও মিরাজ:

হিজরতের পূর্বে মহান আল্লাহ ইসরা ও মি‘রাজের মাধ্যমে তাঁর নবীকে সম্মানিত করেন। ইসরা হলো একই রাত্রিতে বায়তুল মাকদাসে গমন করা এবং সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করা। অতঃপর মি‘রাজ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উর্ধ্ব জগতে আরোহণ করা।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বার হাতিমে শুয়েছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল ‘আলাইহিস সালাম তাঁকে জাগিয়ে বুরাক নাম বাহনের মাধ্যমে বায়তুল মাকদাসে নিয়ে যান এবং সেখানে তিনি সমস্ত নবীর ইমাম হয়ে সালাত পড়েন। [হামেদ মাহমুদ লিমুদ, মুনতাকান নুকুল (মাক্বাতুল মুকাররামাহ: রাবেতা আ’লাম আল ইসলামী, তা. বি), পৃ. ২১৮] অতঃপর একটি সিঁড়ির মাধ্যমে তিনি বায়তুল মাকদাস থেকে আসমানের দিকে উপরে উঠেন। প্রতিটি আসমানের দরজায় গেলে প্রহরারত ফেরেশতা তাঁকে সম্বর্ধনা জানায়। প্রতিটি আসমানেই তিনি আগের নবীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৩৮] অতঃপর সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন। সেখানে বায়তুল মা‘মুরের কাছে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-কে দেখতে পান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পান। সে সময় মহান আল্লাহ তাঁর উম্মতের উপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন। পরে তা হ্রাস করে মহান আল্লাহ ৫ ওয়াক্তে পরিণত করেছেন। [মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্‌হাব, মুখতাসারু সীরাতুল রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল মামলাকাতুল আরাবীয়া; আল-জামেয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১৯৫৬/১৩৭৫, পৃ. ৪৫] অতঃপর কুরাইশদের মাঝে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তারা ঠাট্টা ও উপহাসের সাথে সেটাতে মিথ্যারোপ করল। কিন্তু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেটাকে নির্দ্বিধায় সত্য বলে বিশ্বাস করেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

আকাবার শপথ:

তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্ব যাত্রীদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন। এ সময় মদীনার আউস ও খাযরাজ বংশদ্বয় তাদের মধ্যকার দ্ব্ন্দ্ব নিরসনের জন্য রাসূলর মত একজন যোগ্য নেতার খোঁজ করছিল। ৬ জন খাজরাযীয় ৬২০ খৃ. মক্কায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা প্রতিজ্ঞা করে যে, এক আল্লাহর ইবাদত ছাড়া তারা আর মুর্তি পূজার ধারেও যাবেন না কিংবা অন্যায়ভাবে মানুষকে হত্যা করবে না। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৪৩] কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে তাঁরা ছিলেন ৭ জন। তাঁরা হলেন মু‘আয ইবনুল হারেস, যাকওয়ান ইবন আবদিল কাইস, উবাদা ইবন সামিত, ইয়াযিদ ইবন সা‘লাবা, আব্বাস ইবন উবাদা, আবুল হাইসাম ও উ‘আইম ইবন সা‘য়েদাহ। ইতিহাসে এটাই আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত [মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ, পৃ. ১৪৮]

পরের বছর হজ্ব মৌসুমে ইয়াসরিব থেকে ১০ জন খাযরাজ এবং দুজন আউস গোত্রের লোক মক্কায় এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল যে, মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত তারা ইসলামের অনুসারী থাকবে এবং এর জন্য জানপ্রাণে যুদ্ধ করবে। আর এটিই আকাবার দ্বিতীয় শপথ নামে পরিচিত। [আত তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭০]

এ দলের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুস‘আব ইবন উমাইরকে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে সবাইকে দীন ইসলাম শিক্ষা দেন এবং তাঁর হাতে বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করল। মওসুম শেষে তিনি রাসূলের কাছে তাদের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে ফিরে এলেন।

পরের বছরে হজ্বের মৌসুমে ২ জন মহিলাসহ ৭৫ জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবার তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইয়াসরিব যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন এবং তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁদের দেশে ইসলাম প্রচারে যাবতীয় সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেন। ইতোমধ্যে ইয়াসরিবে প্রেরিত মুস‘আব ইবন উমাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ইসলাম প্রচারের শুভ সংবাদ তাদের মাধ্যমে জেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশী হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাঁদের দেশে যাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেললেন। এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় বসে রইলেন। এটাই ইসলামের ইতিহাসে আকাবার দ্বিতীয় শপথ নামে পরিচিত। [মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, পৃ. ১৪৮-১৫০; নুরুল ইয়াকীন, পৃ. ৭৬-৭৭]

মদীনায় হিজরত:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করবেন এ সংবাদ মক্কায় প্রকাশ পেলে মক্কাবাসী তাঁর উপর নানাবিধ অত্যাচার শুরু করল। এমনকি তারা তাঁকে হত্যার প্ররোচনাতেও নেচে উঠল। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যার পাপময়, ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো তখন জিবরাঈল ‘আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহর তরফ থেকে ষড়যন্ত্রের কথা জানালেন। তিনি বললেন, আপনার প্রভু আপনাকে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেছেন।

আপনি এ যাবত যে শয্যায় শয়ন করেছেন আজ রাত্রে সে শয্যায় শয়ন করবেন না। এ কথার মাধ্যমে হিজরত করার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হল।

হিজরত সংক্রান্ত ওহী নাযিল হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক দুপুরে আবু বকরের ঘরে তশরীফ নিয়ে আসলেন। উদ্দেশ্য ছিল হিজরতের সময় ও পন্থা প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা। আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আমরা আব্বার বাড়িতে ঠিক দুপুরে বসেছিলাম। জনৈক ব্যক্তি এসে সংবাদ দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা ঢেকে আগমণ করেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি এ সময় কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার জন্য এসেছেন?

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিতরে আসার অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হলো এবং তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হিজরত করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। অতঃপর হিজরতের সময় সূচী নির্ধারণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং রাতের আগমণের জন্য প্রতীক্ষায় রইলেন। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৬০]

এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরতের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন তখন পাপিষ্ঠরা তাঁকে মারার জন্য দারুন নদওয়াতে বৈঠক আহ্বান করল। এ সময় ইবলিশ নাজদের এক শায়খের রূপ ধরে সেখানে আগমন করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মারার জন্য পরামর্শ দিয়ে উৎসাহিত করল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ وَإِذۡ يَمۡكُرُ بِكَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لِيُثۡبِتُوكَ أَوۡ يَقۡتُلُوكَ أَوۡ يُخۡرِجُوكَۚ وَيَمۡكُرُونَ وَيَمۡكُرُ ٱللَّهُۖ وَٱللَّهُ خَيۡرُ ٱلۡمَٰكِرِينَ ٣٠ ﴾ [الانفال: ٣٠]

“আর ঐ সময়কে স্মরণ কর যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এ জন্য যে, তোমাকে বন্দী করবে অথবা হত্যা করবে অথবা বিতাড়িত করবে। আর তারা নিজেদের তদ্বির করছিল এবং আল্লাহ আপন তদ্বির করছিলেন, আর আল্লাহ হচ্ছেন উত্তম তদ্বিরকারী। [সূরা আল আনফাল, আয়াত ৩০]

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওনা হলেন। এদিকে কাফিররা তাঁকে ধরার জন্য পিছে ধাওয়া করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে সওর গুহায় আশ্রয় নিলেন। এদিকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আমের ইবন ফুহায়রা পর্বতের ময়দানে ছাগল চরাতো এবং যখন রাত্রির এক অংশ চলে যেত তখন সে ছাগল নিয়ে গারে সওরের নিকট যেত এবং আত্মগোপনকারী নবী ও তাঁর সাথীকে দুধ পান করাতো। পরপর তিন রাতই সে এরূপ করল। অধিকন্তু আব্দুল্লাহ ইবন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পদচি‎হ্নগুলো মিশিয়ে যেতো। [মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, পৃ. ১৫৫]

এদিকে কাফিররা তাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে গুহার মুখে এসে উপস্থিত হলো। এ সময় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তারা সংখ্যায় অনেক, আমরা মাত্র দুজন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমরা তিনজন। আমাদের সাথে আল্লাহও আছেন [এ সাথে থাকার অর্থ, আল্লাহর সামনে থাকা, তাঁর হেফাযতে থাকা। এর অর্থ কখনই নয় যে, আল্লাহ কারও গায়ের সাথে লেগে আছে, বা সৃষ্টির ভিতরে আছেন। কারণ আল্লাহ আরশের উপর আছেন]। অবশেষে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীকে না পেয়ে প্রত্যাবর্তন করল। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৬৬]

এরপর গুহা থেকে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মদীনার দিকে হাঁটা শুরু করলেন। প্রথম কুবায় পৌঁছলেন, তারপর পথিমধ্যে জুম‘আর নামায শেষে তাঁরা মদীনায় প্রবেশ করলেন। ঐ দিন থেকেই মদীনাবাসী ইয়াসরিব নাম পরিবর্তন করে মদীনাতুন্নবী নামে অভিহিত করেন । এ দিনটি ছিল ৬২২ খৃষ্টাব্দের ২৩শে সেপ্টেম্বর। এ দিবসের মাধ্যমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মক্কার জীবনের অবসান ঘটল এবং শুরু হল মদীনার জীবন।

****************************************************************************