কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাতজাহান্নাম

আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ.

তাহকীক: ড. সাআদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

আলহামদুলিল্লাহ হির রব্বিল আ’লামীন ওয়াস্ব স্বলাতু ওয়াস স্বলামু আ’লা রসুলীহিল আমীন।

জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সংক্ষিপ্ত গবেষণা। এ গবেষণাটি একাধিক কিতাব ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে এখানে একত্র করা হয়েছে এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে। জান্নাত ও জাহান্নাম কাকে বলে, প্রতিটির সংজ্ঞা, গুণাগুণ এবং কিভাবে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে? তার উপায় ও উপকরণগুলো এখানে আলোচনায় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ আমাদের কারোই অজানা নয়। কারণ, প্রতিটি মানুষের গন্তব্য হয় জান্নাত অথবা জাহান্নাম। এ কারণেই জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া অতীব জরুরি। আমরা আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।

এ বিষয়টি আলোচনা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ হল, যে আমলগুলো জান্নাতে নিয়ে যায়, সে সব আমলসমূহের প্রতি মানুষকে উৎসাহ দেয়া এবং যে আমলগুলো জাহান্নাম থেকে বাঁচায় ও মুক্তি দেয়, সে সব আমলসমূহের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্ক করা।

জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচিতি এবং নামসমূহের আলোচনা

  • জান্নাতের পরিচিতি ও জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাত: জান্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ বাগান। এ শব্দ থেকেই জিনান বলা হয়ে থাকে। আর আরবরা খেজুর গাছকেও জান্নাত বলে আখ্যায়িত করত।

[মুহাম্মদ বিন আবু বকর আর রাযি, মুখতারুস সিহাহ পৃ: ৪৮ [দেখুন: আল্লামা ইবন মানজুর, লিসানুল আরব, পৃ: ১৩/৯৯ এবং আল্লামা আছফাহানী, মুফরাদাতুল কুরআন, পৃ: ২০৪।]

মুখতার আল-কামুসে জান্নাত শব্দের অর্থ: জান্নাত অর্থ- খেজুর গাছ, বিভিন্ন ধরনের গাছ বিশিষ্ট বাগান। এর বহুবচন জিনানুন।

[আহমদ তাহের আযযাবী, মুখতারুল কামুস, পৃ: ১১৭।]

পরিভাষায় জান্নাতের সংজ্ঞা: এটি সেই ঘরের একটি ব্যাপক নাম [যে ঘরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার অনুসারীদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন] যাতে রয়েছে অফুরন্ত ও অসংখ্য নেয়ামত, অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি, অন্তহীন খুশি, আনন্দ ও চিরস্থায়ী শান্তি ।

[এ শব্দটি মূলত: নির্গত হয়েছে ‘সতর’ ও ‘তাগতিয়া’ শব্দদ্বয় হতে। এ কারণেই গর্বজাত সন্তানকে জানিন বলা হয়ে থাকে। কারণ, সে মায়ের পেটে অদৃশ্য ও গোপন থাকে। এবং এ কারণেই বাগানকে জান্নাত বলা হয়ে থাকে, কারণ, তার অভ্যন্তর গাছ গাছালী দ্বারা আবৃত বা গোপন থাকে। আর এ শব্দটি শুধু মাত্র যেখানে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের গাছ থাকে সে বাগানের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. এর ‘হাদিয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ’ পৃ: ১১১।]

জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাতের নাম, অর্থ ও শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাতের সিফাতসমূহের বিবেচনায় জান্নাতের নাম একাধিক, কিন্তু জান্নাত একাধিক নয় জান্নাত একটিই। সুতরাং, এ দিকটির বিবেচনায় একাধিক নামের অর্থ অভিন্ন আর জান্নাতের সিফাতসমূহের দিক বিবেচনায় প্রতিটি নামের অর্থ ভিন্ন। অনুরূপভাবে আল্লাহর নাম, আল্লাহর কিতাবের নাম, আল্লাহর রাসূলদের নাম, আখিরাতের নাম ও জাহান্নামের নাম ইত্যাদি। [এগুলো সবই এক, কিন্তু সিফাত একাধিক হওয়ার কারণে এগুলোর নাম একাধিক]

[আল্লামা ইবনুল কাইয়েম, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১১]

  • ১- জান্নাত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٣٢﴾ [النحل: ٣٢]

“জান্নাতে প্রবেশ কর, যে আমল তোমরা করতে তার কারণে”। সূরা আন-নাহাল আয়াত: ৩২

  • ২- দারুস-সালাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَٱللَّهُ يَدۡعُوٓاْ إِلَىٰ دَارِ ٱلسَّلَٰمِ وَيَهۡدِي مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٢٥﴾ [يونس: ٢٥]

“আর আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন সরল পথের দিকে”

সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও এরশাদ করেন,

﴿۞لَهُمۡ دَارُ ٱلسَّلَٰمِ عِندَ رَبِّهِمۡۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ١٢٧ ﴾ [الانعام: ١٢٧]

“তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে শান্তির আবাস এবং তারা যে আমল করত, তার কারণে তিনি তাদের অভিভাবক”।সূরা আন-নাহাল আয়াত: ৩২

[যাবতীয় সকল বিপদ আপদ হতে এটি একটি শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর।] হাদিয়ুল আরহওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ পৃ: ১১৩

  • ৩- দারুল খুলুদ এ বলে নামকরণ করার কারণ হল, জান্নাতীরা কখনোই তা হতে বের হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿عَطَآءً غَيۡرَ مَجۡذُوذٖ ١٠٨﴾ [هود: ١٠٨] ‘অব্যাহত প্রতিদানস্বরুপ’। সূরা হুদ, আয়াত: ১০৮। আল্লাহ আরও বলেন, ﴿ إِنَّ هَٰذَا لَرِزۡقُنَا مَا لَهُۥ مِن نَّفَادٍ ٥٤﴾ [ص: ٥٤] ‘নিশ্চয় এটি আমার দেয়া রিযিক, যা নি:শেষ হওয়ার নয়’। সূরা সাদ, আয়াত: ৫৪। আল্লাহ আরও বলেন,﴿وَمَا هُم مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِينَ ٤٨ ﴾ [الحجر: ٤٨] ‘তবে তারা তা হতে বের হবে না’। সূরা আল-হিজর আয়াত: ৪৮। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَٰمٖۖ ذَٰلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ ٣٤ ﴾ [ق: ٣٤]

“তোমরা তাতে শান্তির সাথে প্রবেশ কর। এটাই স্থায়িত্বের দিন” সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৪

  • ৪- দারুল মুকামাহ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱلَّذِيٓ أَحَلَّنَا دَارَ ٱلۡمُقَامَةِ مِن فَضۡلِهِۦ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٞ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٞ ٣٥ ﴾ [فاطر: ٣٥]

‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোন কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং যেখানে কোন ক্লান্তিও আমাদেরকে স্পর্শ করে না [সূরা ফাতের, আয়াত: ৩৫]

  • ৫- জান্নাতুল মাওয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿عِندَهَا جَنَّةُ ٱلۡمَأۡوَىٰٓ ١٥﴾ [النجم: ١٥]

“যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত” সূরা আন-নজম, আয়াত: ১৫

  • ৬- জান্নাতু আদন। জান্নাতে আদন: অর্থাৎ স্থায়ী ও চিরঞ্জীব জান্নাত। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে, عَدَن المكان যখন তা নিয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এ হল, জান্নাত যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হল, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৪।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿جَنَّٰتِ عَدۡنٍ ٱلَّتِي وَعَدَ ٱلرَّحۡمَٰنُ عِبَادَهُۥ بِٱلۡغَيۡبِۚ إِنَّهُۥ كَانَ وَعۡدُهُۥ مَأۡتِيّٗا ٦١﴾ [مريم: ٦١] .

“তা চিরস্থায়ী জান্নাত, যার ওয়াদা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন গায়েবের সাথে। নিশ্চয় তাঁর ওয়াদা-কৃত বিষয় অবশ্যম্ভাবী” সূরা মারয়াম, আয়াত: ৬১

  • ৭- আল ফিরদাউস: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ كَانَتۡ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ١٠٧﴾ [الكهف: ١٠٧]

“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস” সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৭। [ফিরদাউস: এমন বাগান যাতে রয়েছে সব ধরনের গাছ গাছালি এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তা সবই এক জায়গায় অর্থাৎ ঐ বাগানে পাওয়া যায়, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনে হাজরের ফতহুল বারী ১৩/৬, কামুসুল মুহিত পৃ: ৭২৫। ফিরদাউস: এমন জান্নাত যা সব জান্নাতের বিষয়ে ব্যবহার করা যায় অথবা সর্বত্তোম ও সর্ব উৎকৃষ্ট জান্নাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, এ জান্নাতটি অন্যান্য জান্নাতের তুলনায় এ নামে নাম করণ করা বিষয়ে অধিক উপযুক্ত। [হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ১১৬] আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাত হল, গোলাকার গম্বুজের মত। সর্বোৎকৃষ্ট, প্রশস্ত ও সর্বোত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস। আর এ জান্নাতের ছাদ হল, আল্লাহর আরশ। যেমন, সহীহ হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, « إذا سألتم الله فاسألوه الفردوس؛ فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن، ومنه تفجَّر أنهار الجنة » “তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ। তা হতে জান্নাতের নহর সমূহ প্রবাহিত হয়”। [বুখারি ২৭৯০, ৭৪২৩] হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ৮৪।]

  • ৮- জান্নাতুন নাঈম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلنَّعِيمِ ٨﴾ [لقمان: ٨]

“নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিআমতপূর্ণ জান্নাত;”

  • ৯- আল মাকামুল আমীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١﴾ [الدخان: ٥١] “নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে”, সূরা দুখান, আয়াত: ৫১ [মাকাম শব্দের অর্থ: অবস্থানের জায়গা। আর আল আমীন অর্থ সব ধরনের খারাবী ও বিপদ-আপদ হতে নিরাপদ হওয়া। এটি ঐ জান্নাতকে বলা হয়, যে জান্নাত সব ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৬]]
  • ১০- মাকয়াদু সিদকীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿فِي مَقۡعَدِ صِدۡقٍ عِندَ مَلِيكٖ مُّقۡتَدِرِۢ ٥٥﴾ [القمر: ٥٥]

“যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহা অধিপতির নিকটে” [ সুরা কমারঃ৫৫, মাকয়াদে সিদক: এটি একটি জান্নাতের নাম। এ জান্নাতকে এ নামে নাম করণ করার, এ জান্নাতে যত সুন্দর সুন্দর আসন ও বসার স্থান চাওয়া হয়, সবই পাওয়া যায়। যেমন বলা হয় ‘সত্যিকার মহব্বত’ যখন তার মধ্যে সত্যিকার ও পরিপূর্ণরূপে মহব্বত পাওয়া যায়। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৭]

জাহান্নামের সংজ্ঞা ও নামসমূহ:

অভিধানে نار (নার) শব্দের অর্থ: আগুন যা মানুষ দেখতে পায়, প্রচণ্ড আগুনের তাপ অথবা এমন তাপ যা জ্বালিয়ে দেয়। আল্লাহর বাণীতে উল্লেখিত আগুনকেও نار বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ٱلنَّارُ وَعَدَهَا ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْۖ ٧٢﴾ [الحج: ٧٢]

“সেটা আগুন। যারা কুফরী করে, আল্লাহ তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন”([20]) সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭২

আর نار শব্দের বহু বচন أنْوُرٌ – نيران – أنيار [কামুসুল মুহিত, পৃ: ৬২৮,৬৩০ মু’জামুল ওসিত, ২৯২/২, আল্লামা ইসফাহানী, মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন পৃ: ৮২৮।

আর পরিভাষায় نار শব্দের অর্থ: যারা আল্লাহর নাফরমানি করে তাদের জন্য যে আগুন তৈরি করে রাখা হয়েছে, তাকে نار বা জাহান্নাম বলা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ وَكَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَآ أُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٣٩﴾ [البقرة: ٣٩]

“আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে” সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৩৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ لَعَنَ ٱلۡكَٰفِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمۡ سَعِيرًا ٦٤ ﴾ [الاحزاب: ٦٤] .

“নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে লা‘নত করেছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছেন” সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৪

জাহান্নামের নামসমূহ: [আল্লাহর নিকট আমরা জাহান্নাম হতে আশ্রয় চাই]

  • ১- নার: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ٱلنَّارُ وَعَدَهَا ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْۖ ٧٢﴾ [الحج: ٧٢]

“সেটা আগুন। যারা কুফরী করে, আল্লাহ তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন” সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ৭২

  • ২- জাহান্নাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتۡ مِرۡصَادٗا ٢١ ﴾ [النبا: ٢١]

“নিশ্চয় জাহান্নাম গোপন ফাঁদ” সূরা নাবা আয়াত: ২১, ২২

  • ৩- জাহীম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ وَبُرِّزَتِ ٱلۡجَحِيمُ لِمَن يَرَىٰ ٣٦ ﴾ [النازعات: ٣٦]

“আর জাহান্নামকে প্রকাশ করা হবে তার জন্য যে দেখতে পায়” সূরা আন-নাজেয়াত, আয়াত: ৩৬

  • ৪-সায়ীর: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿فَرِيقٞ فِي ٱلۡجَنَّةِ وَفَرِيقٞ فِي ٱلسَّعِيرِ ٧ ﴾ [الشورى: ٧] “একদল থাকবে জান্নাতে আরেক দল জ্বলন্ত আগুনে” সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৭

  • ৫-সাকার: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سَقَرُ ٢٧ لَا تُبۡقِي وَلَا تَذَرُ ٢٨ ﴾ [المدثر: ٢٧، ٢٨]

“কিসে তোমাকে জানাবে জাহান্নামের আগুন কী? এটা অবশিষ্টও রাখবে না এবং ছেড়েও দেবে না” সূরা আল-মুদ্দাচ্ছের, আয়াত: ২৭, ২৮

  • ৬- হুতামা: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, ﴿
    كَلَّاۖ لَيُنۢبَذَنَّ فِي ٱلۡحُطَمَةِ ٤ ﴾ [الهمزة:
    ٤] “কখনো নয়, অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামা’য়” সূরা আল-হুমাজাহ, আয়াত: ৪
  • ৭- হাবিয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَأَمَّا مَنۡ خَفَّتۡ مَوَٰزِينُهُۥ ٨ فَأُمُّهُۥ هَاوِيَةٞ ٩ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا هِيَهۡ ١٠ نَارٌ حَامِيَةُۢ ١١﴾ [القارعة: ٨، ١١]

“আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আবাস হবে হাবিয়া। আর তোমাকে কিসে জানাবে হাবিয়া কি? প্রজ্বলিত অগ্নি” সূরা আল-কারিয়াহ, আয়াত: ৮-১১
[ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿ ۞أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ بَدَّلُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ كُفۡرٗا وَأَحَلُّواْ قَوۡمَهُمۡ دَارَ ٱلۡبَوَارِ ٢٨ جَهَنَّمَ يَصۡلَوۡنَهَاۖ وَبِئۡسَ ٱلۡقَرَارُ ٢٩ ﴾ [ابراهيم: ٢٨، ٢٩] তুমি কি তাদেরকে দেখ না, যারা আল্লাহর নিআমতকে কুফরী দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং তাদের কওমকে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে দিয়েছে? জাহান্নামে, যাতে তারা দগ্ধ হবে, আর তা কতইনা নিকৃষ্ট অবস্থান! [সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ২৮, ২৯] আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. কুরআনে আজীমের তাফসীরে লিখেন, দারুল বাওয়ার হল জাহান্নাম ৫৩৯/২। ইমাম বগবী রহ. ও স্বীয় তাফসীরে এ কথার দিকে ইশারা করেছেন। ৫৩/৩।]


জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমান আছে কিনা? এবং কোথায় আছে?

  • জান্নাত জাহান্নাম বিদ্যমান থাকার প্রমাণ

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, মিরাজের ঘটনায় তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ হতে বর্ণনা করেন।

«ثم انطلق بي جبريل حتى انتهى بي إلى سدرة المنتهى، فغشيها ألوانٌ لا أدري ما هي، قال: ثم دخلت الجنة، فإذا فيها جنابذ اللؤلؤ، وإذا ترابها المسك »

“তারপর জিবরীল আ. আমাকে নিয়ে চলতে থাকে। সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছলে তাকে কতক রঙ এসে ডেকে ফেলে। আমি বুঝতে পারিনি এটি কি? তিনি বলেন, ‘তারপর আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম’। জান্নাতকে আমি দেখতে পেলাম, মণি-মুক্তার গম্বুজ। আরও দেখতে পেলাম, জান্নাতের মাটি হল, মিসক”।
[এ শব্দটির অর্থ গব্মুজ এটি বহু বচন, এর এক বচন جنبذة। বুখারি নবীদের আলোচনা অধ্যায়ে শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। এ হাদীসটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পক্ষে প্রমাণস্বরূপ। তারা বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে মাখলুক এবং জান্নাত আসমানে। দেখুন: ইমাম মুসলিম, শরহে নববী, পৃ: ৫৭৯/৩]
[মুত্তাফাকুন আলাইহ : বুখারি সালাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: মেরাজের সময় সালাত ফরয হওয়ার পদ্ধতি: হাদিস নং: ৩৪৯ ও নবীদের আলোচনা অধ্যায়, হাদীস নং: ৩৩৪২। মুসলিম কিতাবুল ঈমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসমানের দিকে রাতে নিয়ে যাওয়া বিষয়ে আলোচনা: হাদীস নং: ১৬২]

وعن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لـَمّا خلق الله الجنة والنار أرسل جبرائيل إلى الجنة، فقال: انظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فجاء فنظر إليها، وإلى ما أعد الله لأهلها فيها… ثم قال: اذهب إلى النار فانظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فنظر إليها فإذا هي يركب بعضها بعضاً.. »

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল আলাইহিস সালামকে জান্নাতে পাঠান এবং বলেন, তুমি জান্নাতের দিকে তাকাও এবং দেখ আমি জান্নাতে জান্নাতিদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছি। তারপর সে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতিদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছেন তা দেখেন। তারপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, তুমি এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর, তারপর সে জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ বললেন, দেখ আমি জাহান্নামীদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছি। তারপর সে জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখে জাহান্নামের এক অংশ অপর অংশের উপর দাপাদাপি করছে” [তিরমিযি, জান্নাতের বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ‘জান্নাতকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে পরিশ্রম দ্বারা আর জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে প্রবৃত্তি দ্বারা’ হাদীস নং ২৫৬০। নাসায়ী কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, আল্লাহর ইজ্জতের কসম খাওয়া বিষয়ে আলোচনা: হাদিস নং: ৩৭৭২। আল্লামা আলবানী বিশুদ্ধ তিরমিযিতে হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দেখুন- ২০/৩ সহীহ নাসায়ী ৫/৩]

ইমাম তাহাবী রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর মাখলুক, কখনো তা ধ্বংস হবে না এবং ক্ষয় হবে না। কারণ, আল্লাহ মাখলুককে সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেন। আর জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টির জন্য তিনি মাখলুক হতে অধিবাসী সৃষ্টি করেন। যাদের তিনি জান্নাত দেবেন তা হবে তার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অনুগ্রহ। আর যাদের তিনি জাহান্নামে দেবেন তা হবে তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে ইনসাফ। প্রত্যেকেই তার সুবিধা অনুযায়ী আমল করবে এবং তাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে দিকে ধাবিত হবে। আর ভালো ও মন্দ বান্দার উপর নির্ধারিত [আবু জাফর আত-ত্বাহাবী, আকীদাতু-তহাবী [শুধু ইবারত], পৃ: ১২]

বর্তমানের জান্নাত বিদ্যমান থাকার উপর হাদিস দ্বারা প্রমাণ:

কা’ব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« إنما نسمة المؤمن طائرٌ يعْلُقُ في شجر الجنة، حتى يرجعه الله تبارك وتعالى إلى جسده يوم يبعثه »

“মুমিনের আত্মা জান্নাতে পাখির মত, জান্নাতের গাছের সাথে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত ঝুলতে থাকবে। তারপর যখন কিয়ামতের দিন সমগ্র মানুষকে পুনরায় জীবন দান করা হবে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের রুহকে তাদের দেহে আবার ফেরত দেবেন”

[ইমাম আহমদ স্বীয় মুসনাদে পৃ: ৪৫৫/৩, তাহকীক কৃত সংস্ককরণে পৃ: ৫৭/২৫। আর নাসায়ী জানায়েয অধ্যায়ে, পরিচ্ছেদ: মুমিনদের রুহ বিষয়ে আলোচনা; হাদীস নং ২০৭৩-

« إنما نسمة المؤمن طائر في شجر الجنة حتى يبعثه الله إلى جسده يوم القيامة »

অর্থ, মুমিনের আত্মা জান্নাতের গাছের মধ্যে উড়ন্ত পাখির মত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের রুহকে তাদের দেহে ফেরত দেবেন। ইবনে মাযা, যুহদ অধ্যায়, কবরের আলোচনায় হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে, হাদীস নং: ৪২৭১। বিশুদ্ধ নাসায়ীতে আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন, পৃ: ৪৪৫/২। সিলসিলাতুল আহাদীস-সহীহাহ গ্রন্থে ৭২০/২, ৯৯৫। ইমাম ইবনে কাসীর স্বীয় তাফসীরে أحمد عن الشافعي عن مالك عن ابن شهاب، عن عبد الرحمن بن كعب بن مالك عن أبيه: এ সনদটি উল্লেখ করার পর লিখেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ এবং শক্তিশালী মতন’। ]
[আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. এর হাদিসে শহীদদের আলোচনায় রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« أرواحهم في جوف طير خضر لها قناديل معلقة بالعرش تسرح من الجنة حيث شاءت، ثم تأوي إلى تلك القناديل »

 

“শহীদদের রুহসমূহ হুলুদ পাখির পেটের মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে, আরশের সাথে ঝুলানো প্রজ্জলিত বাতি, তারা তাদের ইচ্ছা মত যেখানে ইচ্ছা সেখানে ভ্রমণ করতে থাকে তারপর তারা আবার ঐ সব বাতির নিকট চলে আসে”। মুসলিম, হাদীস নং: ১৮৮৭। আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. এর হাদীস রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এরশাদ করেন,

 

« إن أحدكم إذا مات عرض عليه مقعده بالغداة والعشي، إن كان من أهل الجنة فمن أهل الجنة، وإن كان من أهل النار فمن أهل النار، يقال: هذا مقعدك حتى يبعثك الله إليه يوم القيامة »

অর্থ, যখন তোমাদের কেউ মারা যায় তখন সকাল বিকাল তার অবস্থান কোথায় হবে তা তুলে ধরা হয়। যদি লোকটি জান্নাতী হয়, তার জান্নাতের অবস্থান তাকে দেখানো হয়, আর যদি লোকটি জাহান্নামী হয়, তবে তাকে জাহান্নামের অবস্থান দেখানো হয়। তাকে বলা হয়, এ তোমার অবস্থান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিন তোমাকে এখানে প্রেরণ করবেন। বুখারি, ১৩৭৯, মুসলিম: ২৮৬৬। আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রহ. বলেন, রুহকে পেশ করা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় না রুহগুলো কবরে বা কবরের আশপাশে। বরং এ কথা প্রমাণিত হয়, কবরের সাথে রুহের সম্পৃক্ততা রয়েছে; তার আসনে রুহকে পেশ করা হয়ে থাকে। কারণ, রুহের অবস্থা ভিন্ন একটি অবস্থা রয়েছে। রূহ কখনো সময় রফিকে আ’লাতে অবস্থান করে, কিন্তু দেহের সাথে সম্পৃক্ত। ফলে যখন কোন ব্যক্তি তাকে সালাম দেয়, সে তার স্বীয় অবস্থান থেকে সালামের উত্তর দেয়। দেখুন- আল্লামা সুয়ুতীর ব্যাখ্যা সুনানে নাসায়ীতে পৃ: ১০৯/৪। ]

জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থান:

  • জান্নাতের অবস্থান: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡأَبۡرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ ١٨ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ ١٩﴾ [المطففين: ١٨، ١٩]

“কখনো নয়, নিশ্চয় নেককার লোকদের আমলনামা থাকবে ইল্লিয়্যীনে । কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী”? সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৮-১৯

আব্দুল্লাহ ইবন‌্ আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ বলেন, ‘ইল্লিয়্যীন’ অর্থ জান্নাত, অথবা সপ্তম আকাশে আরশের নিচে অবস্থিত একটি স্থান তাফসীরে বগবী, ৪৬০/৪, তাফসীরে ইবন কাসীর ৪৮৭/৪

ইমাম ইবন্ কাসীর রহ. আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইল্লিয়্যিন শব্দটি ‘উলু শব্দ হতে নির্গত। যখন কোন বস্তু উপরে অবস্থান করে, তখন তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার মহত্ব বাড়তে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বড়ত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ﴿وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ ١٩﴾ [المطففين: ١٩] “কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী”?[আল্লামা ইবন্ কাসীর, তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ৪৮৭/৪]

ইমাম ইবন্ কাসির রহ. আল্লাহর বাণী- ﴿وَفِي ٱلسَّمَآءِ رِزۡقُكُمۡ وَمَا تُوعَدُونَ ٢٢﴾ [الذاريات: ٢٢] “আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সব কিছু” আয-যারিয়াত, আয়াত: ২এর তাফসীরে বলেন, এখানে তোমাদের রিযিক অর্থ বৃষ্টি আর তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার অর্থ হল, জান্নাত। আল্লামা ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ২৩৬/৪

[ইমাম বুখারির বর্ণিত হাদিসে অতিবাহিত হয়েছে। হাদীস নং ২৭৯০, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, « إذا سألتم الله فاسألوه الفردوس، فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن...»“তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উত্তম জান্নাত উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ...”]

  • জাহান্নামের স্থান:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٖ ٧ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سِجِّينٞ ٨ كِتَٰبٞ مَّرۡقُومٞ ٩ ﴾ [المطففين: ٧، ٩]

“কখনো নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের ‘আমলনামা সিজ্জীনে। কিসে তোমাকে জানাবে ‘সিজ্জীন’ কী? লিখিত কিতাব”। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে কাসীর রহ., ইমাম বগবী রহ. ও ইমাম ইবনে রজব রহ. একাধিক হাদিস উল্লেখ করেন, তাতে তিনি বলেন, সিজ্জীন হল, সপ্ত যমীনের নিচে। অর্থাৎ, যেমনি-ভাবে জান্নাত সাত আসমানের উপরে অনুরূপভাবে জাহান্নাম সপ্ত যমীনের নীচে একটি স্থান দেখুন তাফসীরে বগবী, ৫৪৮/৪, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪৮৬, ৪৮৭/৪। জাহান্নাম থেকে ভয় পদর্শন ইবনে রজবের পৃ: ১-৬২ অনুরূপভাবে ইমাম ইবনুল কাইয়ুমের হাদীয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, পৃ:৮২-৮৪

» « اللهم إنا نسألك الجنة، ونعوذ بك من النار. [“হে আল্লাহ আমরা তোমার নিকট জান্নাত চাই এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাই” [আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থণা আল্লাহ যেন লেখকের দু’আ কবুল করেন। তাকে এবং তার সহকর্মী যিনি তার সাথে মারা যান উভয়কে শহীদদের উচ্চ আসনে আরোহণ করান। কারণ, তিনি সম্মানী তিনি রহমান। আর মহান স্থানে তাদের উভয়কে তাদের মাতা-পিতার সাথে একত্র করেন।

চলবে ……………………

Tags