কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম – (৩)

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাতজাহান্নাম

আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ.

তাহকীক: ড. সাআদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ ৩

জান্নাতের পথ ও জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ

  • প্রথম আলোচনা: জান্নাতের প্রবেশের কারণ
  1. ১- আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣﴾ [النساء: ١٣]

“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা” সূরা আন- নিসা, আয়াত: ১৩

  1. ২-উপকারী ইলমের অনুসন্ধান করা।[কুরআন ও সুন্নাহের ইলম]
  1. ৩- ঈমান ও আমলে সালেহ [নেক আমলসমূহ]
  • নেক আমলসমূহ:

ক- ইসলাম ও ঈমানের রুকন সমূহকে পরিপূর্ণরূপে আদায় করা।

খ- সুন্দর চরিত্র, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, ফকীর মিছকীনদের জন্য ব্যয় করা, মেহমানের মেহমানদারি করা ইত্যাদি।

  • জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমসমূহ:

মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা

– আল্লাহর যিকির করা

-দয়া করা

-সালামের প্রসার

-দুর্বল অসহায় ও গরীব লোকদের প্রতি দয়া করা, দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে সহযোগিতা করা। [জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ নিম্নরূপ: আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা, কথা ও কাজে সত্যবাদী হওয়া. আমানতের হেফাযত করা, ওয়াদ পূর্ণ করা, প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করা, ইয়াতীমের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, একজন মুসলিম ভাইয়ের বিপদে সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্ত লোকের সাহায্য করা, একজন মুসলিমের দোষ গোপন করা, তাকে সাহায্য করা, একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদাত করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য মহব্বত রাখা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর রহমতের আশা করা, আল্লাহর নিকট তাওবা করা, আল্লাহর আদেশের উপর ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, আল্লাহর কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহকে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা, কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তাকে তুমি দেবে আর যে তোমার প্রতি অবিচার করে তুমি তাকে ক্ষমা করবে, যাবতীয় কর্মে ইনসাফ করা, আল্লাহর মাখলুকের প্রতি ইনসাফ করা, মানুষকে খানা খাওয়ানো, সালামের প্রসার করা, গভীর রাতে সালাত আদায় করা আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কিতাব, মুসলিমদের ইমাম ও সাধারণ মুসলিমদের হিতাকাংখী হওয়া ইত্যাদি। এ সব আমল ও এ ধরনের যে সব আমল আছে যে গুলো দ্বারা একজন বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। আর এটিই হল, মহান সফলতা ও বড় পাওনা। দেখুন মাজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ। [৪২২-৪২৩/১০]]

জান্নাতে প্রবেশ করা আল্লাহর দয়ায় হয়ে থাকে আমলের মাধ্যমে নয়।

প্রমাণ: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

«قاربوا وسدِّدوا، واعلموا أنه لن ينجو أحد منكم بعمله » قالوا: يا رسول الله، ولا أنت؟ قال: « ولا أنا إلاّ أن يتغمّدني الله برحمة منه وفضل »

“তোমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর এবং আমলসমূহকে সুন্দর কর, আর মনে রাখবে তোমাদের কেউ তার আমল দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে না। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, আপনিও কি নাজাত পাবেন না হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল বললেন, না আমিও না, তবে যদি আল্লাহ তাঁর রহমত ও দয়া দ্বারা আমাবে ঢেকে ফেলে তাহলে আমি নাজাত পাব [মুসলিম মুনাফেকদের গুণাগুণ বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ : কেউ তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং আল্লাহর রহমতের দ্বারা প্রবেশ করবে। হাদিস নং ২৮১৬।]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,

« سدِّدوا، وقاربوا، وأبشروا؛ فإنه لا يُدخِل أحداً الجنة عملُهُ » قالوا: ولا أنت يا رسول الله؟ قال: « ولا أنا، إلاّ أن يتغمدني الله بمغفرة ورحمة » وفي لفظ: « واعلموا أن أحبّ العمل إلى الله أدومه وإن قلّ »

“তোমরা তোমাদের আমলসমূহকে সংশোধন কর, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর এবং তোমরা সু-সংবাদ গ্রহণ কর। কারণ, কাউকে তার আমল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর আপনিও কি আপনার আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন না। উত্তরে তিনি বলেন, আমিও না, তবে যদি আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা আমার অনুকুলে থাকে। অপর শব্দে বর্ণিত, তোমরা মনে রাখবে, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হল যা স্থায়ী হয়, যদিও তা কম” মুত্তাফাকুন আলাইহ : বুখারি রিকাক অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: আমলে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা ও আমল সবসময় করা, হাদিস নং ৬৪৬৪, ৪৬৬৭ এবং মুসলিম মুনাফেকদের গুণাগুণ বর্ণনা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ কেউ তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং আল্লাহর রহমতের দ্বারা প্রবেশ করবে, হাদিস নং ২৮১৮।

ইমাম নববী রহ. বলেন, উল্লেখিত হাদিস সমূহের বাহ্যিক অর্থ হক পন্থীদের জন্য প্রমাণ। কারণ তারা বলেন, কোন ব্যক্তি সাওয়াব বা জান্নাত তার আমল দ্বারা লাভ করতে পারবে না। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর বাণী:

﴿ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٣٢﴾ [النحل: ٣٢]

“তোমরা তোমাদের আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ কর” সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩২।

﴿وَتِلۡكَ ٱلۡجَنَّةُ ٱلَّتِيٓ أُورِثۡتُمُوهَا بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٧٢﴾ [الزخرف: ٧٢]

“আর এটিই জান্নাত, তোমাদের নিজেদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে” সূরা যুখরফ, আয়াত: ৭২

এবং এ ধরনের আরও যত আয়াত আছে, যাতে প্রমাণিত হয়, মানুষ তাদের আমলের মাধ্যমেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, এগুলো উল্লেখিত হাদিসসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং আয়াতের অর্থ হল, জান্নাতে প্রবেশ করা আমলের দ্বারা হবে, কিন্তু আমল করার তাওফিক, হিদায়েত, আমলে এখলাস ও আমল কবুল করা আল্লাহর রহমত ও দয়ার কারণেই হয়ে থাকে। সুতরাং এ কথা বলা বাহুল্য যে শুধু আমল দ্বারা কোন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর এটিই হল, হাদিসের মর্মার্থ। মোট কথা, একজন লোক জান্নাতে আমলের করার মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তা হল, আল্লাহর রহমত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম ১৬৬/১৭

জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জাহান্নামের প্রবেশের কারণ

  • জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণগুলো:

জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার কারণ অসংখ্য ও অগণিত। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন। সামগ্রিক কারণ হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَٰلِدٗا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٞ مُّهِينٞ ١٤﴾ [النساء: ١٤]

“আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আযাব” সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪

জাহান্নামে প্রবেশের আরও কারণ:

  • ১- আল্লাহর সাথে শরিক করা।
  • ২- নবী ও রাসূলদের অস্বীকার করা।
  • ৩- কুফরী করা।
  • ৪- হিংসা করা।
  • ৫- যুলম ও অত্যাচার করা।
  • ৬- আমানতের খিয়ানত করা
  • ৭- আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা।
  • ৮- কার্পণ্য করা।
  • ৯- মুনাফেকি করা।
  • ১০- আল্লাহর আযাব হতে নির্ভীক হওয়া।
  • ১১- আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া।
  • ১২- কুরআন ও হাদিসে যে সব কবীরাগুনাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে সব কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া

[এ ছাড়াও জাহান্নামে প্রবেশের আরও অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন, অশ্লীল কাজ ও অপকর্ম করা, প্রকাশ্যে বা গোপনে অশ্লীল ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া, খিয়ানত করা, জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা, অহংকার করা, নেয়ামতের নাশুকরী করা, আল্লাহর সীমালংঘন করা, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা অমান্য করা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে মাখলুককে ভয় করা, খালেককে বাদ দিয়ে মাখলুক থেকে আশা করা, খালেকের উপর ভরসা না করে মাখলুকের উপর ভরসা করা, কুরআন ও সুন্নাহের বিরোধিতা করা, আল্লাহর নাফরমানি করে মাখলুকের আনুগত্য করা, সাতটি ধ্বংসাত্বক বিষয় থেকে বিরত না থাকা, ঘুষ দেয়া, গীবত করা, চোগলখোরি করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মদ্যপান করা, বড়াই করা, অহংকার করা, চুরি করা, মিথ্যা কসম খাওয়া, নারীরা পুরুষের সাথে এবং পুরুষরা নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা, দান করে খোটা দেয়া, মিথ্যা কসম দ্বারা মাল বিক্রি করা, গণক ও জ্যোতিষকে বিশ্বাস করা, প্রাণীর ছবি বানানো, কবরে সেজদা করা, মৃত ব্যক্তির উপর আওয়াজ করে কান্না করা, পুরুষদের জন্য কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করা, পুরুষদের রেশমি কাপড় ও অলংকার পরিধান করা, প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া, ওয়াদা খেলাফ করা, এছাড়াও আরও অন্যন্য আমলসমূহ। দেখুন: মাজমুয়ায়ে ফতওয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এর। ৪২৩-৪২৪/১০, ইমাম যাহবী রহ. এর কবীরা গুনাহ এবং ইবনে নুহাসের তাম্বীহুল গাফেলীন। ]

কিভাবে আমরা আমাদের নিজেদের ও আমাদের পরিবার-পরিজনদের জাহান্নাম থেকে বাঁচাবো?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦﴾ [التحريم: ٦]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর; যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকুল, যারা আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়” সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬

আল্লামা সা’দী রহ. বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈমানের মত নেয়ামত দিয়ে অনুগ্রহ করেছে, তোমরা ঈমানের আবশ্যকীয় বিষয় ও শর্তসমূহ পূরণ কর। আর তোমরা তোমাদের নিজেদের এবং পরিবার-পরিজনদের ভয়াবহ জাহান্নাম যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার আগুন থেকে বাঁচাও। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا] “তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচা”। আর তোমাদের আত্মরক্ষার উপায় হল, আল্লাহর আদেশকে নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক করা, তার আদেশ পালনে দায়িত্বশীল হওয়া এবং তার নিষিদ্ধ বিষয় হতে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব কর্মে অসন্তুষ্ট হন বা আযাব দেন, সে সব কর্ম থেকে তাওবা করা। আর পরিবার পরিজন, সন্তান সন্ততিকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর উপায় হল, তাদের উত্তম শিক্ষা দেয়া, শাসন করা, তাদেরকে আল্লাহর আদেশ নিষেধ মানার উপর বাধ্য করা। একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছে তা না করবে। আর স্ত্রী সন্তান একজন মানুষের অভিভাবকত্বে ও পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামকে এত ভয়াবহ করে মানুষের নিকট তুলে ধরেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর আদেশের প্রতি উদাসীন না হয় [তাফসীরে সা’দী পৃ: ৮৭৪]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ هَلۡ أَدُلُّكُمۡ عَلَىٰ تِجَٰرَةٖ تُنجِيكُم مِّنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ ١٠ ﴾ [الصف: ١٠]

“হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে” [সূরা আস-সফ, আয়াত: ১০]

তারপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উল্লেখ করেন:

1 –تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ

“তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে”

2 – وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ

“এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে”।

সুতরাং, মনে রাখতে হবে, এ দুটি হল, আল্লাহর অনুমতিক্রমে জান্নাতে প্রবেশের এবং জাহান্নাম হতে মুক্তির কারণ। আমরা আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর নিকট জান্নাত চাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি লেখকের দু’আটি কবুল কর এবং তাকে তুমি জান্নাত দান কর এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি দাও।

আল্লামা সা’দী রহ. আয়াত দু’টির তাফসীরে বলেন, এটি পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য মহৎ ব্যবসা, মহান উদ্দেশ্য ও উন্নত চাহিদা লাভের প্রতি অসিয়ত, পথ দেখানো এবং দিক নির্দেশনা, যার দ্বারা কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং মহা নেয়ামতের সফলতা অর্জন করা যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে বুঝা যায় বিষয়টি এমন যার প্রতি প্রতিটি বিচক্ষণ লোক বলতেই আগ্রহ করবে এবং প্রতিটি জ্ঞানী লোক তার দিক মাথা উঁচু করে দেখবে। সুতরাং, বিষয়টি এমন- যেমন বলা হল, এ ব্যবসাটি কি যার এত মূল্য? তখন বলল, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আর এ কথা আমরা সবাই জানি পরিপূর্ণ ঈমান হল আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সব বিষয়ে অটল বিশ্বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার প্রতি অটল বিশ্বাস করা। এ বিশ্বাসের অপরিহার্য দাবী হল শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলসমূহের অন্যতম মূল্যবান আমল হল, আল্লাহর রাহে জিহাদ করা, এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ] অর্থাৎ তোমরা তোমাদের জান মাল দিয়ে ইসলামের দুশমনদের প্রতিহত করা, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয় করা এবং আল্লাহর কালিমাকে আল্লাহর যমীনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তোমরা তোমাদের সম্পদ হতে যা তোমাদের জন্য সহজ হয় তা ব্যয় করবে। কিন্তু এ কাজটি যদিও তোমার জন্য অপছন্দনীয় হয় এবং তোমার জন্য কষ্টকর হয় কিন্তু মনে রাখবে এটি তোমার জন্য উত্তম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, [خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ] এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে [তাফসীরে সা’দী পৃ: ৮৬০]

জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণসমূহ:

আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী আমল করা এবং আল্লাহ যে সব কর্মে নারাজ হন তা হতে দূরে থাকা: যখন কোন ব্যক্তি তার প্রভুর আনুগত্য করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা করতে নিষেধ করেছেন, তা হতে বিরত থাকে তাহলে সে আসবাব সমূহের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করল। তাওফিক ও কবুল আল্লাহর হাতে। আল্লাহর নিকট আমরা তার ফযল ও অনুগ্রহ কামনা করি। জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণগুলো আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে আহলে ইলমরা এ বিষয়ে যে সব কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন তা দেখুন। সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর উপর এবং তার সমগ্র সাহাবীদের উপর [জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় কারণ, জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহ দ্বারা আমল করা এবং জাহান্নামে প্রবেশের কারণসমূহ হতে দূরে থাকা। জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণগুলোর আলোচনা আল-ইবন আব্দুর রহমান করছেন যা পূর্বের দুটি পরিচ্ছেদ অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহর নিকট কামনা করি আল্লাহ যেন আমাদের এ গবেষণাটিকে কবুল করেন এবং গবেষণা দ্বারা আল্লাহ গবেষকের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস ও শহীদদের উচ্চ মর্যাদা দান করেন। কারণ, আল্লাহ তা’আলা সম্মানী, তিনি দয়ালু করুণাময়। তিনি তার ইহসান, করম, ফযল ও দয়া দ্বারা আমাদের দয়া করেন। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদের উপর তার পরিবার পরিজন ও সমগ্র সাহাবীদের উপর । ]


পরিশিষ্ট

সমস্ত প্রশংসা কেবলই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই জন্য পূর্বের ও পরবর্তীর যাবতীয় প্রশংসা। আল্লাহর অপার অনুগ্রহে জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ে গবেষণাটি শেষ করছি। এ গবেষণায় রয়েছে জান্নাত ও জাহান্নামের সংজ্ঞা, নামসমূহ, জান্নাতের নেয়ামতসমূহ ও জাহান্নামের আযাব এবং যে সব উপকরণগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে মানুষকে নিয়ে যায় তার বর্ণনা।

এ গবেষণামুলক রিসালাটির উল্লেখযোগ্য দিক হল, এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে জান্নাত ও জাহান্নামের সংজ্ঞা জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনার উপর কিছু প্রমাণাদি একত্র করা হয়েছে, যাতে একজন পাঠক খুব দ্রুত তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে এবং জান্নাতের লাভ করতে আগ্রহী হয় এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে।

আর অসিয়ত ও উপদেশ হল:

প্রথমত: আল্লাহকে ভয় করার প্রতি অসিয়ত যাতে একজন বান্দা জান্নাত লাভে সক্ষম হয় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায়।

দ্বিতীয়ত: জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ে আরো বিস্তারিত লেখার জন্য উপদেশ দেই। যাতে যারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায় তাদের জন্য সহজ হয় এবং যারা সত্যিকার ইলমকে বাড়াতে চায় তাদের জন্য পাথেয় হয়।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين، والصلاة [والسلام] على نبينا محمد [وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين.