মুসলিম সকলের জন্য গুরুত্বপুর্ন দ্বীনি শিক্ষা পর্বঃ ৩

মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্‌স-সমূহ

আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

দশম দর্‌স

নামাজের সুন্নতসমূহ। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:

(১) নামাজের শুরুতে প্রারম্ভিক দো‘আ বা তাস্‌বীহ পড়া;

যেমন : (ক)

«سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكْ»

 অর্থ : হে আল্লাহ ! তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমরা প্রশংসার সাথে। তোমরা নাম বরকতময়, তোমার মর্যাদা অতি সুউচ্চে এবং তুমি ছাড়া ইবাদতের সত্যিকার কোন উপাস্য নেই।

অথবা (খ)

«اَللهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِيْ وَبَيْن خَطَايَايَ، كَمَا بَاعَدْتَ الْمُشْرِقِ وَ الْمَغْرِبِ، اللهُمَّ نَفنِىْ مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقِّىْ اَلثَّوْبِ الأبْيَضُ مِنَ الدّنَسِ، اللهُمَّ اَغسِلْنِيْ مِنْ خَطَايَايَ بَالثَّلجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَد»

 অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমার এবং আমার পাপরাশির মধ্যে এমন দুরত্ব সৃষ্টি করে দাও যেমন তুমি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি করেছো। হে আল্লাহ ! তুমি আমাকে আমার পাপসমূহ থেকে এমন ভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে দাও, যেভাবে সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। হে আল্লাহ্, তুমি আমাকে আমার পাপসমূহ থেকে পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা ধৌত করে দাও।”

এগুলো ব্যতীত হাদীছে ছাবেত যে কোন প্রারম্ভিক দু‘আ পড়লেও চলবে। }

(২) দাড়ানো অবস্থায় ডান হাতের তালু বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর ধারণ করা।

(৩) অঙ্গুলিসমুহ সংযুক্ত ও সরল রেখে উভয় হাত উভয় কাঁধ বা কান বরাবর উত্তোলন করা এবং তা প্রথম তাকবীর বলার সময়, রুকুতে যাওয়ার এবং রুকু থেকে উঠার সময় এবং প্রথম তাশাহ্‌হুদ শেষে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময়।

(৪) রুকু এবং সিজদায় একাধিকবার তাসবীহ পড়া।

(৫) উভয় সিজদার মধ্যে বসে একাধিকবার মাগফিরাতের দু‘আ পড়া।

 (৬) রুকু অবস্থায় পিঠ বরাবর মাথা রাখা।

 (৭) সিজদাবস্থায় বাহুদ্বয় বক্ষের উভয় পার্শ্ব হতে এবং পেট উরুদ্বয় হতে ব্যবধানে রাখা।

(৮) সিজদার সময় বাহুদ্বয় যমীন থেকে উপরে উঠায়ে রাখা।

(৯) প্রথম তাশাহ্‌হুদ পড়ার সময় ও সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে বাম পা বিছিয়ে উহার উপর বসা এবং ডান পা খাড়া করে রাখা।

(১০) শেষ তাশাহ্‌হুদে ‘তাওয়াররুক’ করে বসা। এর পদ্ধতি হলো, পাছার উপর বসে বাম পা ডান পার নীচে রেখে ডান পা খাড়া করে রাখা।

(১১) প্রথম ও দ্বিতীয় তাশাহুদে বসার শুরু থেকে তাশাহ্‌হুদ পড়ার শেষ পর্যন্ত শাহাদাত অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা এবং দু‘আর সময় নাড়াচড়া করা।

(১২) প্রথম তাশাহ্‌হুদের সময় মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবার-পরিজন এবং ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর দরুদ ও বরকতের দু‘আ করা।

(১৩) শেষ তাশাহ্‌হুদে দু‘আ করা।

(১৪) ফজর, জুমআ’, উভয় ঈদ ও ইস্তেসক্বার নামাজে এবং মাগরিব ও এশার নামাজের প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চঃস্বরে ক্বিরাত পড়া।

(১৫) জোহর ও আছরের নামাজে, মাগরিবের তৃতীয় রাকআ‘তে এবং ইশার শেষ দুই রাকআ‘তে চুপে চুপে ক্বিরাত পাড়া।

(১৬) সূরা ফাতেহার অতিরিক্ত কুরআন পড়া।

এই সাথে হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য সুন্নাতগুলোর প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে; যেমন : ইমাম, মুকতাদী ও একা নামাজীর পক্ষে রুকু থেকে উঠার পর (রাব্বানা ওয়ালাকাল হাম্‌দ) বলার সাথে অতিরিক্ত যা পড়া হয় তা ও সুন্নাত। এইভাবে রুকুতে অঙ্গুলিগুলো ফাঁক করে উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখা সুন্নাত।

একাদশ দর্‌স

নামাজ বাতেল করে এমন বিষয় আটটি; যথা:

(১) জেনে-শুনে ইচ্ছাকৃত কথা বলা। না জানার কারণে বা ভূলে কথা বললে তাতে নামাজ বাতেল হয় না,(২) হাসি, (৩) খাওয়া, (৪) পান করা, (৫) লজ্জাস্থানসহ নামাজে অবশ্যই আবৃত রাখতে হয় শরীরের এমন অংশ উন্মুক্ত হওয়া, (৬) কিবলার দিক হতে অন্যদিকে বেশী ফিরে যাওয়া, (৭) নামাজের মধ্যে পর পর অহেতুক কর্ম বেশী করা, (৮) অজু নষ্ট হওয়া।

 

দ্বাদশ দর্‌স

 অজুর শর্ত মোট দশটি; যথা:

১- ইসলাম, ২-বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া, ৩-ভাল-মন্দ পার্থক্যের জ্ঞান, ৪- নিয়ত, ৫-এই নিয়ত অজু শেষ না হওয়া পর্যন্ত বজায় রাখা, ৬-অজু ওয়াজিব করে এমন কাজ বন্ধ করা, ৭-অজুর পূর্বে ইস্তেনজা অথবা ইস্তেজমার করা, ৮-পানির পবিত্রতা ও উহা ব্যবহারের বৈধতা, ৯-শরীরের চামড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছার প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ১০- সর্বদা যার অজুবঙ্গ হয় তার পক্ষে নামাজের সময় উপস্তিত হওয়া।

ত্রয়োদশ দর্‌স

অজুর ফরজসমূহ; এগুলো মোট ছয়টি; যথা:

১. মুখ মন্ডল ধৌঁত করা; নাকে পানি দিয়ে ঝাড়া ও কুলি করা এর অন্তর্ভূক্ত

২. কনুই পযর্ন্ত উভয় হাত ধৌত কর,

৩. সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা, কান ও উহার অন্তর্ভুক্ত,

৪. অজুর কার্যাবলী পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা ও

৬. এগুলো পরপর সম্পাদন করা।

উল্লেখ থাকে যে মুখমণ্ডল, উভয় হাত ও পা তিনবার করে ধৌত করা মুস্তাহাব। এইভাবে কুল্লি করা ও নামে পানি দিয়ে ঝাড়া তিনবার মুস্তাহাব। ফরজ মাত্র একবারই। তবে, মাথামাসেহ একাধিকবার করা মুস্তাহাব নয়। এই ব্যাপারে কতিপয় ছহীহ হাদীস বর্ণিত আছে।

চতুর্থতম দর্‌স

অজু ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ: আর তা হলো মোট ছয়টিা; যথা:

১. মুত্রনালী ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া,

২. দেহ থেকে স্পষ্ট অপবিত্র কোন পদার্থ নির্গত হওয়া,

৩. নিদ্রা বা অন্য কোন কারণে জ্ঞান হারা হওয়া,

৪. কোন আবরণ ব্যতীত সম্মুখ বা পিছনের দিক থেকে হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করা,

৫. উটের মাংস ভক্ষণ করা এবং

৬. ইসলাম পরিত্যাগ করা। আল্লাহ পাক আমাদের ও অন্যান্য সব মুসলমানদের এথেকে পানাহ দান করুন।

বিঃদ্রঃ মুর্দার গোসল দেওয়ার ব্যাপারে সঠিক মত হলো যে এতে অজু ভঙ্গ হয় না। অধিকাংশ আলেমগণের এই অভিমত। কারণ, অজু ভঙ্গের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই। তবে যদি গোসল দাতার হাত কোন আবরণ ব্যতিরেকে মুর্দার লজ্জাস্থানস্থান স্পর্শ করে তাহলে তার উপর অজু ওয়াজেব হয়ে যাবে। কোন আবরণ ব্যতিরেকে মুর্দার লজ্জাস্থানে যাতে হাত স্পর্শ না করে তৎপ্রতি গোসল দাতার অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।

এইরূপ স্ত্রীলোক স্পর্শে কোন ভাবেই অজু ভঙ্গ হয়না, তা কামভাব সহকারে হউক বা বিনা কামভাবে হউক। আলেমগণের সঠিক অভিমত এটাই। কোন কিছু বের না হলে অজু নষ্ট হয় না। এর প্রমাণ নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কোন কোন স্ত্রীকে চুমু খাওয়ার পর নামাজ পড়েছেন, অথচ পুনরায় অজু করেননি। উল্লেখযোগ্য যে, সূরা নিসা ও সূরা মায়েদার দুই আয়াতে যে স্পর্শের কথা বলা হয়েছে অথবা তোমরা স্ত্রীলোক স্পর্শ করা-তা সহবাসের অর্থে বলা হয়েছে। আলেমগণের সঠিক অভিমত তাই। ইবন আব্বাস সহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ধর্মীয় একদল আলেমেরও এই অভিমত। আল্লাহ পাকই আমাদের তাওফীক দাতা।

 

<পুর্ববর্তী দারসঃ ২               পরবর্তী দারসঃ ৪>