মুসলিম সকলের জন্য গুরুত্বপুর্ন দ্বীনি শিক্ষা পর্বঃ ৪

মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্‌স-সমূহ

আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

পঞ্চদশ দর্‌স

প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে ইসলামী চরিত্রে বিভূষিত হওয়া

ইসলামী চরিত্রের  মধ্যে রয়েছে: সততা, বিশ্বস্থতা, নৈতিক ও চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জা, সাহস, দানশীলতা, প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক হারামকৃত বিষয় থেকে দূরে থাকা, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার, সাধ্যমত অভাবগ্রস্থ লোকের সাহায্য করা এবং অন্যান্য সৎচরিত্রাবলী যেগুলোর বৈধতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও সুন্নায় প্রমাণ পাওয়া যায়।

ষষ্ঠদশ দর্‌স

ইসলামী আদব-কায়দায় শিষ্ঠাচার হওয়া। এর মধ্যে রয়েছে। সালম প্রদান, হাসিমুখে সাক্ষাৎ প্রদান, ডাক হাতে পানাহার করা, পানাহারের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আল-হামদুলিল্লাহ বলা, হাঁচি দেয়ার পর ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলা এবং এর উত্তরে অপরজন কর্তৃক ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ (আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন) বলা। মসজিদে বা ঘরে প্র্রবেশ ও বের হওয়ার সময়, সফরকালে, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও ছোট-বড় সকলের সাথে ব্যবহার কালে শরীয়তের আদাবসমূহ পালন করে চলা, নবজাত শিশুর জন্মে অভিনন্দন জানানো, বিবাহ উপলক্ষে বরকতের দু’আ করা এবং বিপদে ও মুত্যূতে সান্তনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করাসহ বস্ত্র পরিধান ও উহা খোলা এবং জুতা ব্যবহারের সময় ইসলামী আদাব-কায়দা মেনে চলা

সপ্তদশ দর্‌স

শিরক ও বিভিন্ন প্রকার পাপ থেকে সতর্ক থাকা এবং অপরকে সতর্ক করা।

তন্মধ্যে সাতটি ধ্বংসকারী পাপ অন্যতম। এগুলো হলো:

১। আল্লাহর সাথে শিরক করা, ২। যাদু করা, ৩। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ পাক নিষিদ্ধ করে রেখেছেন, ৪। এতিমের সম্পদ অবৈধ পন্থায় ভক্ষণ করা, ৫। সুদ গ্রহণ করা, ৬। যুদ্ধের দিন ময়দান থেকে পৃষ্ট প্রদর্শন করে পালয়ন করা এবং ৭। সতী-সাধ্বী মুমিনা সরলমনা নারীদের প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া।

বড় বড় পাপের মধ্যে আরও রয়েছে; যেমন: মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া, রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা, মিথ্যা শপথ গ্রহণ করা, প্রতিবেশীকে যন্ত্রনা দেওয়া, রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মানের উপর জুলুম করা ইত্যাদি যা আল্লাহ পাক অথবা তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

অষ্টাদশ দর্‌স

মৃত ব্যাক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থাপনা ও জানাযার নামাজ পড়া

  • মৃত্যের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া:

প্রথমত: কোন ব্যক্তির মৃত্যু আসন্ন হলে তাকে কালেমা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু” শিক্ষা দাও।”-মুসলিম

এই হাদীসে মৃতদের বলতে ঐ সব মরণাপন্ন লোকদের কথা বলা হয়েছে যাদের উপর মৃত্যুর লক্ষণাদি ষ্পষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

  • দ্বিতীয়ত: কোন মুসলমানের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার চক্ষুদ্বয় মুদিত এবং দাড়ি বেঁধে রাখতে হয়।
  • তৃতীয়ত: মৃত মুসলমানের গোসল করানো ওয়াজিব। তবে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর শহীদের গোসল করানো হয় না, না তাঁর উপর জানাজার নামাজ পড়া হয়; বরং তার পরিহিত বস্ত্রেই তাকে দাফন করা হয়। কেননা, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহুদের যুদ্ধে মৃতদের গোসল করাননি এবং তাদের উপর নামাজও পড়েননি।
  • চতুর্থত: মৃতের গোসল করানোর পদ্ধতি। গোসল করানোর সময় প্রথমে মৃত ব্যক্তিক লজ্জাস্থান আবৃত করে নিবে। তারপর তাকে একটু উঠিয়ে আস্তে আস্তে তার পেটের উপর চাপ দিবে। পরে গোসলদানকারী ব্যক্তি নিজের হাতে একটা নেকড়ে বা অনুরুপ কিছু পেছাইয়া নিবে যাতে মৃতের মলমুত্র থেকে নিজেকে রক্ষা করে নিতে পারে। তারপর মৃত ব্যক্তিকে সে নামাজের অজু করাবে এবং তার মাথা ও দাঁড়ি বরই পাতা বা অনুরূপ কিছুর পানি দিয়ে ধৌত করবে। অত:পর তার দেহের ডান পার্শ্ব, তারপর বাম পার্শ্ব ধৌত করবে। এইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার ধৌত করবে। প্রতিবার হাত দিয়ে পেটের উপর চাপ দিবে। কিছু বের হলে তা ধৌত করে নিবে এবং তুলা বা অনুরূপ কিছু দিয়ে স্থানটি বন্ধ করে রাখবে। এতে যদি বন্ধ না হয় তাহলে পুড়ামাটি অথবা আধুনিক কোন ডাক্তারি পদ্ধতি অনুসারে যেমন প্লষ্টার বা অন্য কিছু দিয়ে বন্ধ করতে হবে এবং পুনরায় অজু করাবে। যদি তিনবারে পরিস্কার না হয় তাহলে পাঁচ থেকে সাতবার ধৌত করাবে। এরপর কাপড় দ্বারা শুকিয়ে নিবে এবং সিজদার অঙ্গ ও অপ্রকাশ্য স্থানসমূহে সুগন্ধি লাগাবে। আর যদি সমস্ত শরীরে সুগন্ধি লাগানো যায় তাহলে আরো ভালো। এই সাথে তার কাফনগুলো ধুপ-ধুনা দিয়ে সুগন্ধি করে নিবে। যদি তার গোফ বা নখ লম্বা থাকে তা কেটে নিবে, তবে চুল বিন্যাস করবেনা। স্ত্রীলোক হলে তার চুল তিনগুচ্ছে বিভক্ত করে পিছনের দিকে ছেড়ে রাখবে।
  • পঞ্চমত: মৃত্যের কাফন:

সাদা বর্ণের তিনখানা কাপড়ে পুরুষের কাফন দেওয়া উত্তম। জামা বা পাগড়ী এ্রর অন্তর্ভূক্ত নয়। এইভাবে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ্রর কাফন দেয়া হয়েছিল। মৃতকে এর ভিতরে পর্যায়ক্রমে রাখা হয়। একটা জামা, একটা ইজার ও একটা লেফাফার দ্বারা কাফন দিলেও চলে। স্ত্রীলোকের কাফন পাঁচ টুকরা কাপড়ে দেওয়া হয়, সেগুলো হলো-চাদর, মুখবরণ, ইজার ও দুই লেফাফা। ছোট বালকের কাফন এক থেকে তিন কাপড়ের মধ্যে দেওয়া যায় এবং ছোট বালিকার কাফন এক জামা ও দুই লেফাফায় দেওয়া হয়। সকলের পক্ষে একখানা কাপড়ই ওয়াজেব যা মৃত্যের সম্পূর্ণ শরীর আবৃত করে রাখতে পারে। তবে মৃত ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় হলে তাকে বরই পাতার সিদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দিতে হয় এবং তাকে তার ইজার ও চাদর অথবা অন্য কাপড়ে কাফন দিলেও চলে। তবে তার মস্তক ও চেহারা আবৃত করা যাবে না বা তার কোন অঙ্গ সুগন্ধি ও লাগানো যাবে না। কেননা, ক্বিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে। এই সম্পর্কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত আছে। আর যদি মুহরিম স্ত্রীলোক হয় তাহলে অন্যান্য স্ত্রীলোকের ন্যায় তার কাফন হবে। তবে তার গায়ে সুগন্ধি লাগানো যাবেনা এবং নেকাব দিয়ে চেহারা বা মোজা দিয়ে তার হস্তদ্বয় কাফনের কাপড় দিয়েই আবৃত করা হবে। ইতিপূর্বে মেয়েলোকের কাফন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

  • যষ্ঠত: মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় যাকে অছিয়ত করে যাবে সেই হবে তার গোসল, দাফন করা ও তার উপর জানাযার নামাজ পড়ার অধিকতর হকদার। তারপর তার পিতা, তারপর তার পিতামহ, তারপর তার বংশে অধিকতর ঘনিষ্ট লোকের হক হবে। এইভাবে স্ত্রীলোক যাকে অছিয়ত করবে সেই হবে উপরোক্ত কাজগুলো সম্পাদনের অধিকতর হকদার। তারপর তার মাতা, তারপর দাদী, তারপর পর্যায়ক্রমে বংশের অধিকতর ঘনিষ্ট মেয়েরা হবে। স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে একে অপরের গোসল দিতে পারে।  আবূ বকর সিদ্দিক রাজিয়াআল্লাহু আনহুকে তাঁর স্ত্রী গোসল দিয়েছিলেন এবং আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহাকে গোসল দিয়েছিলেন।
  • সপ্তমত:

মৃতের উপর নামাজ পড়ার পদ্ধতি: (জানাযার নামাজ) জানাযার নামাজে চার তাকবীর দেওয়া হয়। প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পড়া হয়। এর সাথে যদি ছোট কোন সূরা বা দু এক আয়াত কুরআন শরীফ পড়া হয় তা হলে ভাল। কারণ, এই সম্পর্কে  ইবন আব্বাস (রাজিয়াল্লাহু আনহু) থেকে ছহীহ হাদীস বর্ণিত আছে। এরপর দ্বিতীয় তাকবীর দেওয়া হলে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর সে দরূদ পড়তে হয় যা নামাজে তাশাহুদের (আত্তাহিয়্যাতুর) সাথে পড়া হয়। তারপর তৃতীয় তাকবীর দিয়ে নিম্নলিখিত দু‘আ করা হয়:

«اَللهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا ، وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا، وَغَائِبِنَا، وَصَغِيْرِنَا وَ كَبِيْرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا. اللهُمَّ مَنْ أَحيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ وَمَنْ تَوَفْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإيْمَان- اَللهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْنَ، وَعَافِه وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرْدِ ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنْقَّى الثَّوْبُ الأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسٍِ ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ ، وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ الْجَنًةَ – وَأعِذْهُ مِنَ عَذَابِ الْقَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ] وَأَفْصِحْ لَهُ فِيْ قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيْهِ- اللهُمَّ لا تَحْرِمْنَا أجْرَهُ وَلا تُضِلْنَا بَعْدَه»

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মাগফিরলী হাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদীনা ওয়া গাইবিনাওয়া সাগিরীনা ওয়াকাবিরিনা ওয়া জাকারিনা ওয়া উনছা-না। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফা আহয়্যিহী-আলাল ইসলাম, ওয়ামান তাওয়াফ্‌ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্‌ফাহু আলাল ঈমান। আল্লাহুম্মাগফিরলাহু ওয়ারহামহু, ওয়া আফিহি, ওয়া আ’ফু আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহুওয়াছ্‌ছি’ মুদকালাহু, ওয়া আগছিলহু বিলমা-ঈ ওয়াস্‌ সালজি ওয়াল বারদি। ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতয়া কামা য়ূনাক্কাস্‌ সাওবুল আবইয়াদু মিনাদ্‌দানাছি, ওয়া আবদিলহু দারান কাইরাম্‌ মিন্‌ দারিহী ওয়া আহলান কাইরাম্‌ মিন আহলিহী, ওয়া যাওজান কায়রাম মিন্‌ যাওজিহি, ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা, ওয়া আইজহু মিন আযাবিল ক্বাবরি (ওয়া আযাবিন্নারি), ওয়া আফসিহ লাহু ফি ক্বাবরিহি ওয়া নাওয়ীর লাহু ফিহি, আল্লাহুম্মা লা তুহরিম না ওয়া জরাহু তুজিল্লানা বা’দাহু।”

 অর্থ: “ হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত, ও অনুপস্থিত, ছোট, ও বড়, নর ও নারীদিগকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ ! আমাদের মাঝে যাদের তুমি জীবিত রেখেছো তাদেরকে ইসলামের উপর জীবিত রাখো, আর যাদেরকে মৃত্যু দান করো তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করো। হে আল্লাহ ! তুমি এই মৃত্যুকে ক্ষমা করো, তার উপর রহম করো, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখো, তাকে মার্জনা করো, মার্যাদার সাথে তার আতিথেয়তা করো। তার বাসস্থানটি প্রশস্থ করে দাও, তুমি তাকে ধৌত করে দাও, পানি বরফ ও শিশির দিয়ে, তুমি তাকে গুনাহ হতে এমনভাবে পরিস্কার করো যেমন সাদা কাপড় ধৌত করে ময়ল বিমুক্ত করা হয়। তার এই (দুনিয়ার) বাসস্থানের বদলে উত্তম বাসস্থান প্রদান করো, তার এই পরিবার হতে উত্তম পরিবার দান করো, তার এই স্ত্রী হতে উত্তম স্ত্রী দান কর, তুমি তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাও, আর তাকে কবরের আযাব এবং দোযখের আযাব হতে বাঁচাও। তার কবর প্রশস্ত করে দাও এবং দোযখের আযাব হতে বাঁচাও। তার কবর প্রশস্ত করে দাও এবং তার জন্য ইহা আলোকময় করে দাও। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তার সওয়াব হতে বঞ্চিত করোনা এবং তার মৃত্যূর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করো না।

অত:পর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডান দিকে এক সালামের মাধ্যমে নামাজ শেষ করা হয়।

জানাযার নামাজে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে হাত উঠানো মুস্তাহাব। যদি মৃত ব্যক্তি পুরুষ হয় তাহলে…الخ اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُ এর পরিবর্তে اَللهُمَّ اغْفِرْلَهَا… অর্থাৎ আরবী স্ত্রীলিঙ্গের সর্বনাম যোগ করে পড়তে হয়। আর যদি মৃত্যের সংখ্যা দুই হয় তাহলে اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُمَا ..الخ এবং এর বেশী হলে الخ …. اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُمْ অর্থাৎ সংখ্যা হিসেবে সর্বনাম ব্যবহার করতে হয়।

মৃত যদি শিশু হয় তাহলে উপরোক্ত মাগফিরাতের দু’আর পরিবর্তে এই দোয়া পড়া হবে:

«اللهُمَّ اجْعَلْهُ فَرْطًا وَّذُخْرًا لِوَالِدَيْهِ . وَشَفِيْعًا مُجَابًا . اللهُمَّ ثَقَّلْ بِهِ مَوَازِيْنَهُمَا وَأعْظِمْ بِهِ أجُوْرَهُمَا. وَألْحِقْهُُ بِصَالِحِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَاجْعَلْهُ فِيْ كِفَالَةِ إِبْرَاهِيْمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ . وَقِهِ بِرَحْمَتكَ عَذَابَ الْجَحِيْمِ»

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মাজ্‌ আলহু ফারাতান ওয়া জুখরান লিওয়ালিদাইহি, ওয়া শাফীআন মুাবা। আল্লাহুম্মা ছাক্কিলবিহী মাওয়াযীনাহুমা- ওয়া আ’জিম বিহী উজু-রাহুমা-, ওয়া আলহিকুহু বিসা-লিহিল মু’মিনীন ওয়া আজআলহু ফী কিফা- লাতি ইব্রাহিমা আলাইহিস সলাম, ওয়াক্বিহী বিরাহমাতিকা আযাবাল জাহীম।”

অর্থ: “ হে আল্লাহ ! এই বাচ্ছাকে তার পিতা-মাতার জন্য “ ফারাত” (অগ্রবর্তী নেকী) ও “যুখর” (সযত্বে রক্ষিত সম্পদ) হিসাবে কবুল করো এবং তাকে এমন সুপারিশকারী বানাও যার সুপারিশ কবুল করা হয়। হে আল্লাহ ! এই (বাচ্চার) দ্বারা তার পিতা-মাতার সওয়াবের ওজন আরো ভারী করে দাও এবং এর দ্বারা তাদের নেকী আরো বড় করে দাও। আর একে নেক্‌কার মু’মিনদের অন্তর্ভূক্ত করে দাও এবং ইব্‌রাহীম (আ) এর যিম্মায় রাখো, একে তোমার রহমতের দ্বারা দোযখের আযাব হতে বাঁচাও।”

সুন্নাত হলো ইমাম মৃত পুরুষের মাথা বরাবর দাড়াবে এবং স্ত্রীলোক হলে তার দেহের মধ্যমাংশে বরাবর দাঁড়াবে।

 মৃত্যের সংখ্যা একাধিক হলে পুরুষের মৃতদেহ ইমামের নিকটবর্তী থাকবে এবং স্ত্রীলোকের মৃতদেহ কিবলার নিকটবর্তী থাকবে। তাদের সাথে বালক-বালিকা হলে পুরুষের পর স্ত্রীলোকের আগে বালক স্থান পাবে, তারপর স্ত্রীলোক এবং সর্বশেষে বালিকার স্থান হবে। বালকের মাথা পুরুষের মাথা বরাবর এবং স্ত্রীলোকের মধ্যমাংশ পুরুষের মাথা বরাবর রাখা হবে। এইভাবে বালিকার মাথা স্ত্রীলোকের মাথা বরাবর এবং বালিকার মধ্যমাংশ পুরুষের মাথা বরাবর রাখা হবে। সব মুছাল্লীগণ ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। তবে যদি কোন লোক ইমামের পিছনে দাঁড়াবার স্থান না পায় তাহলে সে ইমামের ডান পার্শ্বে দাঁড়াতে পারে।

  • অষ্টমত: মৃতের দাফন প্রক্রিয়া:

শরীয়ত মতে কবর একজন পরুষের মধ্যভাগ পরিমাণ গভীর এবং কেবলার দিক দিয়ে লহদ (বগলী কবর) আকারে করতে হবে। মৃতকে তার ডান পার্শ্বের উপর সামান্য কাত করে লাহাদে শায়িত করবে। তারপর কাফনের গাঁইট খুলে দিবে, তবে কাপড় খুলবে না, বরং এইভাবেই ছেড়ে দিবে। মৃত ব্যক্তি পুরুষ হোক আর নারী হোক কবরে রাখার পর তার চেহারা উন্মোক্ত করা যাবেনা। এরপর ইট কাড়া করে সেগুলো কাদা দিয়ে জমাট করে রাখবে, যাতে ইটগুলো স্থির থাকে এবং মৃতকে পতিত মাটি থেকে রক্ষা করে।

যদি ইট না পাওয়া যায় তাহলে অন্য কিছূ যেমন, তক্তা, পাথর খণ্ড অথবা কাঠ মৃতের উপর খাড়া করে রাকবে যাতে মাটি থেকে তাকে রক্ষা করে। তারপর এর উপর মাটি ফেলা হবে এবং এই মাটি ফেলার সময়:

«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ»

 (আল্লাহর নামে এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দ্বীনের উপর রাখলাম) বলা মুস্তাহাব। কবর এক বিঘত পরিমাণ উচু করবে এবং এর উপরে সম্ভব হলে ক  ঙ্কর রেকে পানি ছিটিয়ে দিবে।

মৃতের দাফন করতে যারা শরীক হবে তাদের পক্ষে কবরের পার্শ্বে দাড়িয়ে মৃতের জন্য দু’আ করার বৈধতা রয়েছে। এর প্রমাণ, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন দাফন কাজ শেষ করতেন তখন তিনি কবরের পার্শে দাড়াতেন এবং লোকদের বলতেন “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাতে কামনা কর এবং ঈমানের উপর ছাবেত থাকার জন্য দু’আ কর; কেননা, এখনই তার সওয়াল-জওয়াব শুরু হচ্ছে।”

  •  নবমমত: দাফনের পূর্বে যে মৃত্যের উপর নামাজ পড়ে নাই সে দাফনের পর নামাজ পড়তে পারে। কেনন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা করেছেন। তবে এই নামাজ একমাস সময়ের মধ্যে হতে হবে, এর বেশী হলে কবরের উপর নামাজ পড়া বৈধ হবে না। কেনন, দাফনের একমাস পর রাসুল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন মৃতের উপর নামাজ পড়েছেন এমন কোন হাদীস পাওয়া যায় নাই।
  •  দশম: উপস্থিত লোকদের জন্য মৃত্যের পরিবার-পরিজনের পক্ষে খাদ্য প্রস্তুত করা জায়েজ নয়। প্রসিদ্ধ সাহাবী হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা) বলেন: “মৃত্যের পরিবার-পরিজনের নিকট সমবেত হওয়া এবং দাফনের পর খাদ্য প্রস্তুত করাকে আমরা মৃত্যের উপর ‘নিয়াহা’ (বিলাপ) বলে গণ্য করতাম।” (এই হাদীস ইমাম আহমদ উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।) তবে মৃতের পরিবার-পরিজনের জন্য বা তাদের মেহমানদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতে আপত্তি নেই। এভাবে তাদের জন্য মৃত্যের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে খাদ্য সরবাহ করা জায়েজ আছে। এর প্রমাণ, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে যখন হযরত জাফর বিন আবূ তালিব (রাঃ) এর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে তখন তিনি স্বীয় পরিবারবর্গকে বললেন: “জাফর পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে পাঠাও।” আরো বললেন যে, “তাদের উপর এমন মুছিবত নেমে আসছে যা তাদেরকে খাদ্য প্রস্তুত থেকে বিরত করে ফেলেছে।”

মৃত্যের পরিবার-পরিজনের জন্য যে খাদ্য পাঠানো হয় তা খাওয়ার জন্য প্রতিবেশীদের বা অন্যদের আহবান করা বৈধ। এর জন্য কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা আছে বলে আমাদের জানা নেই।

  • একাদশ: কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামী ব্যতীত অপর কোন মৃত্যের উপর তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ জায়েজ নয়। স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামীর উপর চারমাস দশ দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ ওয়াজিব। তবে গর্ভবর্তী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক প্রকাশ ওয়াজিব। তবে গর্ভবর্তী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক পালন করতে হয়। এই সম্পর্কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস আছে।

পুরুষের পক্ষে কোন মৃত্যের উপর সে আত্মীয় হোক আর অনাত্মীয় হোক শোক পালন জায়েজ নয়।

  •  দ্বাদশ: সময়ে সময়ে পুরুষদের পক্ষে কবর জিয়ারত করা সুন্নাত এবং এর উদ্দেশ্য হবে মৃতদের জন্য দু’আ, রহমাত কামনা, মরণ এবং মরনোত্তর অবস্থা স্মরণ করা। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তোমরা কবর জিয়ারত কর, কেননা, উহা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে” (মুসলিম) রাসূলে পাক (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীগণকে শিক্ষা দিয়ে বলতেন যে, তারা যখন কবর জিয়ারতে যাবে তখন যেন বলে:

«اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أهْلَ الدَّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهَ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ، نَسَأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيْةَ، يَرْحَمُ الله الْمُسْتَقْدِمِيْنَ وَالْمُسْتَأَخِرِيْنَ»

উচ্চারণ: “আস্‌সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাদ্‌ দিয়ারি মিনাল মু’মিনীন ওয়াল মুসলিমীন, ওয়া ইন্না ইন্‌শা আল্লাহু বিকুম লাহকুন। নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াহ, ইয়ার হামুল্লাহুল্‌ মুস্‌তাকদিমীনা ওয়াল মুস্‌তাখিরীন।”

 অর্থ: “তোমাদের প্রতি সালাম হোক হে কবরবাসী মু’মিন-মসলমানগণ, ইনশা আল্লাহ আমরাও অবশ্যই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি, আমরা আমাদের এবং তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করিছি। আল্লাহ অগ্রগামী পশ্চাতগামী আমাদের সবার প্রতি দয়া করুন।”

 মেয়ে লোকের পক্ষে কবর জিয়ারত বৈধ নহে। কেনন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর জিয়ারতকারীনী নারীদের অভিশাপ করেছেন। এতদ্ব্যতীত মেয়েদের কবর জিয়ারতে ফেতনা ও অধৈর্য সৃষ্টির ভয় রয়েছে। এইভাবে মেয়েদের পক্ষে কবর পর্যন্ত জানাযার অনুগমন করা বৈধ নহে। কেননা, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে এত্থেকে বারণ করেছেন। তবে মসজিদে বা অন্য কেন স্থানে মৃত্যের উপর জানাযার নামাজ পড়া নারী পুরুষ সকলের জন্য বৈধ।

সাধ্যমত দরস সমূহ সংকলনের কাজ এখানেই সমাপ্ত হলো। আল্লাহ পাক আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাহাবীগনের উপর দরুদ ও সালাম বর্ষন করুন।

 

<পুর্ববর্তী দারসঃ ৩