রাফেযী(শিয়া)দের আবির্ভাব ও দলীয় নামকরনঃ ১

রাফেযী শিয়া সম্প্রদায়ের আবির্ভাব

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইহুদী বাহিক্যভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, আহলে বায়আত তথা রাসূলের পরিবারের প্রতি মহব্বত ও আলী (রাঃ)-র প্রতি ভালবাসার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয় এবং আলী রা.-কে খেলাফতের প্রথম ওসি দাবি করে। এক পর্যায়ে ইলাহ্‌-এর স্থানে অধিষ্ঠিত করে। সেখান থেকেই রাফেযী সমপ্রদায়ের উৎপত্তি। এসব কথার সত্যতার প্রমাণ খোদ শিয়াদের কিতাবই। আল-কুম্মী তার “আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক” গ্রন্থে বলেন, “আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সাবা আলী রা.-কে ইমামতের প্রথম হকদার দাবি করে, আবু বকর, ওমর ও উসমানসহ সকল সাহাবা সম্পর্কে মিথ্যাচার ও বিষোদগারে লিপ্ত হয়।”

অনুরূপ মন্তব্য করেছেন “ফিরাকুশ শিয়া” নওবাখতী ও “রিজালুল কিশ্‌শী” গ্রন্থে কিশ্‌শী।

আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সাবা সম্পর্কে একই মন্তব্য করেছেন বর্তমান যুগের শিয়া মুহাম্মাদ আলী আল-মু‘আলেম “আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সাবা আল হাক্বীক্বাতুল মাজহুলাহ্‌” গ্রন্থে। তারা সকলে রাফেযী মতের এক একজন বড় পণ্ডিত। আল-বাগদাদী বলেন, “সাবায়ীরা হচ্ছে আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সাবার অনুসারী। এ আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে সাবা-ই আলী রা.-র ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে তাকে নবী দাবি করেছে। পরবর্তীতে তাকে আল্লাহ পর্যন্ত দাবি করেছে।” বাগদাদী আরো বলেন, “ইবনে সাওদা অর্থাৎ ইবনে সাবা আসলে ইয়াহুদী ছিল, কুফাবাসীর নিকট নেতৃত্ব ও সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে নিজেকে সে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করে। তাওরাতের সূত্র ‘প্রত্যেক নবীর একজন ওসী থাকে’ হিসেবে আলী রা.-কে সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ্‌ওয়া সাল্লামের ওসী আখ্যা দেয় এবং কুফাবাসীর নিকট তা প্রকাশ করে।

সাহরাস্তানী ইবনে সাবা সম্পর্কে বলেন, সেই সর্ব প্রথম আলী রা.-র ইমামতের দাবী তুলে। সাবায়ী সমপ্রদায় সম্পর্কে বলেন, এরা প্রথম প্রথম ‘গায়বাত’ ও ‘রাজাআত’ মতবাদ পেশ করে। পরবর্তীতে তাদের অনুসারী শিয়ারা এ মতবাদের উত্তরাধিকারী হয়। আলী রা.-র ইমামত ও খেলাফত এবং তার ওসী হওয়ার অভিমত ইবনে সাবারই মীরাস। এরপর তার অনুসারী অর্থাৎ শিয়া সমপ্রদায় অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়। এভাবে আলী রা.-র ওসী ও ইমামত বরং ইলাহ হওয়ার দাবি নিয়ে ইহুদী ইবনে সাবার অনুসারী শিয়াদের উৎপত্তি হয়।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا النساء: ٥٩

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।” (সূরা আন নিসা : ৫৯)

শিয়া থেকে রাফেযী নামকরণ

শিয়া বিদ্যান শায়খ মাজলেসী “বেহারুল আনওয়ার” কিতাবে উল্লেখ করেন। অধ্যায়: ‘রাফেযার ফযিলত ও নামকরণের সাধুবাদ’ অতঃপর সুলাইমান আল-আ‘মাশ থেকে উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ্‌ জা‘ফার ইবনে মুহাম্মাদের নিকট প্রবেশ করে বলি, আপনার জন্য আমাকে উৎসর্গ করেছি, মানুষেরা আমাদেরকে রাওয়াফেয (রাফেযী এর বহুবচন) বলে, রাওয়াফেয মানে কি? তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! তারা এ নামকরণ করেনি, বরং আল্লাহ্‌ মুসা আ. ও ঈসা আ.-র ভাষায় তাওরাত ও ইনজিলে তোমাদের এ নামকরণ করেছেন।

আরো বলা হয় যে, যায়েদ আলী ইবনে হুসাইনের নিকট এসে বলে, আমাদেরকে আবু বকর ও ওমর থেকে মুক্ত করুন, যেন আমরা আপনার সাথে থাকতে পারি। তিনি বলেন, তারা দুজন তো আমার দাদার সঙ্গী আমি তাদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করি। তখন তারা বলে, إذا نرفضك অর্থাৎ তাহলে আমরা আপনাকে বর্জন করব। অতঃপর সেখান থেকেই তাদের নামকরণ হয় রাফেযাহ্‌ বা রাফেযী। যারা তার হাতে বায়‘আত করে ও যায়দীয়া মত পোষণ করে, সাধারণত তাদেরকেই এ নামে অবিহিত করা হয়।

আরো বলা হয় যে, আবু বকর ও ওমরের ইমামাত আস্বীকার করার জন্য তাদেরকে রাফেযী বলা হয়।

আরো বলা হয় যে, তারা যেহেতু দীন ত্যাগ করেছে, তাই তাদেরকে রাফেযা বলা হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাস বলেন, “আমার সুন্নাত ও আমার হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত পালন করা তোমার অবশ্য কর্তব্য, এই সুন্নাতকে তোমরা হাতে-দাঁতে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে। আর সাবধান! ইসলামী শরীয়তে তোমরা নতুন কিছু আবিস্কার করবে না, কেননা প্রত্যেক নব আবিস্কৃারই হচ্ছে বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই হচ্ছে ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ্‌)

রাফেযীদের নানা দল উপদল

“দায়েরাতুল মা‘আরেফ” কিতাবে বর্ণিত আছে যে, “প্রসিদ্ধ তেহাত্তর দলের চাইতেও শিয়াদের দল উপদলের সংখ্যা আরো বেশী।”[দায়েরাতুল মা’আরেফঃ ৪/৬৪] প্রসিদ্ধ রাফেযী মীর বাকের আল দাম্মামের [তিনি হলেন মুহাম্মাদ বাকের মুহাম্মাদ আল ইস্তেরাবাদী, ১০৪১ সালে মৃত্যু হয়। তার জীবনী- আব্বাস আল কুম্মিঃ ‘আল কুলা ওয়াল] বরাতে বলা হয়েছে, হাদীসে বর্ণিত তেহাত্তর দলের সবাই শিয়া, তাদের মধ্যে মুক্তি প্রাপ্ত দল শুধু ইমামিয়াহ্‌ (ইমামিয়াহ্‌ শিয়াদের একটি উপদল)। মুকরেযী বলেন, তাদের দলের সংখ্যা তিনশোর মত।

শাহ্‌রস্তানী বলেন, “রাফেযীরা পাঁচ দলে বিভক্ত:

(১) আল কিসানিয়াহ্‌

(২) আল যায়দিয়াহ্‌

(৩) আল ইমামিয়াহ্‌

(৪) আল গালিয়াহ্‌

(৫) আল ইসমাঈলিয়াহ্‌।”

বাগদাদী বলেন, “আলী রা. এর পরবর্তী যুগে রাফেযীরা চার ভাগে বিভক্ত হয়:

(১) যায়দিয়াহ্‌

(২) ইমামিয়াহ্‌

(৩) কিসানিয়াহ্‌

(৪) গুলাত।

তিনি আরো বলেন যে, যায়দিয়াহ্‌ রাফেযী ফিরকাভুক্ত নয়।

পরবর্তী অধ্যায়ঃ

শিয়া ভ্রান্ত আক্বীদাঃ ১ (বাদা ও আল্লাহর সিফাত)