নবীজির দুনিয়া বিমুখতা ও ইবাদতে অধ্যবসায়

নবীজির দুনিয়া বিমুখতা ইবাদতে অধ্যবসায়

পার্থিব জগতের উপকরণাদির প্রতি নিরাসক্তি এবং তার তুচ্ছতা, স্বল্পতা, স্থায়িত্বহীনতা ও দ্রুত নশ্বরশীলতা, পরকালের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি এবং তার স্থায়িত্ব ও মর্যাদা সংবলিত অনেক আলোচনা পবিত্র কোরবানের বহু জায়গায় স্থান পেয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন :—

وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى ﴿131﴾ طه

আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জগতের ভোগ বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সে সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না, আপনার পালন কর্তার দেয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। (ত্বাহা: ১৩১)

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ﴿16﴾ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى ﴿17﴾ الأعلى

মহান আল্লাহ আরো বলেন : বস্তুত তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও। অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। (সূরা- আল-আলা: ১৭-১৮)

পার্থিব জীবনকে পরিপূর্ণ বর্জনের নাম যুহ্‌দ নয়, এটা যুহ্‌দের ভুল অর্থ, যুহ্‌দের প্রকৃত অর্থ হল, আল্লাহ বিমুখকারী পার্থিব কার্যক্রম পরিহার করা।

আল্লাহর আনুগত্যে সহায়ক ও তাঁর অধিকার আদায়ে ভূমিকা পালনকারী পার্থিব কার্যক্রম পরিহার করার নাম রাহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যবাদ। এটা ইসলামি শরিয়ত অনুমোদন করে না।

উল্লেখ্য যে, সর্বোত্তম পথ মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথ, তিনি সর্বাপেক্ষা দুনিয়া বিমুখ ছিলেন, যে তাঁকে অনুসরণ করবে প্রকৃতপক্ষে সে দুনিয়া বিমুখ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া বিমুখ হওয়া সত্ত্বেও বিবাহ করেছেন, পরিবারের অধিকার আদায় করেছেন, তার জন্য শীতল পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে, তিনি হালওয়া ও মধু পছন্দ করতেন, সু-স্বাদু খাবার গ্রহণ করতেন, তা পাওয়া না গেলে ধৈর্যধারণ করতেন।

  • যুহ্‌দের নিন্দনীয় অর্থ :

যুহ্‌দ নিয়ে প্রচলিত আছে নানা অর্থ ও ধারণা। যুহ্‌দের রয়েছে ভিন্ন একটি অর্থ যা নিন্দনীয়। একজন খলিফা ফুযাইল বিন ইয়াজকে বললেন, তুমি কত বড় যাহেদ (বিমুখ), জওয়াবে তিনি বললেন :—

أنت أزهد مني، لأني أنا زهدت في الدنيا التي هي أقل من جناح بعوضة، وأنت زهدت في الآخرة التي لا قيمة لها، فأنا زاهد في الفاني، وأنت زاهد في الباقي، ومن زهد في درة أزهد ممن زهد في بعرة،

তুমি আমার চেয়ে বড় যাহেদ (বিমুখ), কেননা আমি দুনিয়া বিমুখ হয়েছি যা মশার ডানার চেয়ে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট, আর তুমি পরকাল বিমুখ হয়েছ যার কোন প্রতি-মূল্য হতে পারে না। আমি ধ্বংসশীল দুনিয়া থেকে বিমুখ আর তুমি চিরস্থায়ী পরকাল থেকে বিমুখ, যার মণি-মুক্তার প্রতি আসক্তি নেই সে কত বড় বিমুখ ঐ ব্যক্তি থেকে যার গোবর ও পশুর মলের প্রতি মোহ নেই। অতএব, হে মুসলিম ভাই, পরকাল বিমুখ হওয়া থেকে সাবধান হয়ে যাও।

  • যুহ্‌দ বা দুনিয়া বিমুখতার স্তর সমূহ:

যুহ্‌দ (বিমুখতা) তিন স্তরে বিন্যস্ত:

  • ১) হারাম থেকে বিমুখতা : এ বিমুখতা অত্যাবশ্যক।
  • ২) অপছন্দনীয় কার্যাদি থেকে বিমুখতা : এরকমের বিমুখতা পছন্দনীয়।
  • ৩) বৈধ কাজে সীমাতিরিক্ত ব্যস্ত হওয়া থেকে বিমুখতা : যেমন অসার কথা, প্রশ্ন ইত্যাদি থেকে বিমুখ হওয়া, এরকম বিমুখতা মানুষের একটি বিশেষ পরিপূরক গুণ।
  • ৪) মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু এবং মহান আল্লাহ থেকে বিমুখকারী সব কিছু থেকে বিমুখ হওয়া, এটাই পূর্ণ বিমুখতা। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুহ্‌দের (দুনিয়া বিমুখতার) কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে দেওয়া হল। পৃথিবীতে মুসলমানের জীবন যাপনের ধরন-পদ্ধতি নির্ণয় করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—

كن في الدنيا كأنك غريب أوعابر سبيل—رواه البخاري:(5937)

দুনিয়াতে তুমি জীবনযাপন কর যেন তুমি প্রবাসী অথবা পথ অতিক্রমকারী (মুসাফির)। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এ হাদিসের মূর্ত প্রতীক।

যুহ্‌দের অর্থ সংবলিত কয়েকটি হাদিস নীচে উল্লেখ করা হল :—

১। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :—

نام رسول الله صلى الله عليه وسلم على حصير، فقام وقد أثر في جنبه، قلنا يا رسول الله، لو اتخذنا لك وطاء، فقال: ما لي وللدنيا، ما أنا في الدنيا إلا راكب استظل تحت شجرة، ثم راح وتركها. رواه الترمذى:(2299)

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাইয়ের উপর ঘুমালেন। অতঃপর ঘুম থেকে উঠলেন, তাঁর দেহের পাশে ছিল চাটাইয়ের ছাপ, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা যদি আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করে দিতাম ! তিনি বললেন: দুনিয়ার ভোগ বিলাসের সাথে আমার কীসের সম্পর্ক, আমি কেবল একজন আরোহী, যে গাছের ছায়াতলে বিশ্রাম নিল, অত:পর তা ত্যাগ করে রওয়ানা দিল।

২। উমর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :—

دخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو مضطجع على حصير، فجلست فأدنى عليه إزاره – وليس عليه غيره – وإذا الحصير قد اثر في جنبه، فنظرت ببصري في خزانة رسول الله صلي الله عليه وسلم، فإذا بقبضة من شعير نحو الصاع، ومثلها قرظا في ناحية الغرفة، وإذا أفيق معلق. قال عمر: فابتدرت عيناي، قال ما يبكيك يا ابن الخطاب قلت يا نبي الله وما لي لا أبكي، وهذا الحصير قد أثر في جنبك، وهذه خزانتك لا أرى فيها إلا ما أرى، وذاك قيصروكسرى في الثمار والأنهار، وأنت رسول الله صلى الله عليه وسلم وصفوته، وهذه خزانتك. فقال صلى الله عليه وسلم : يا ابن الخطاب ألا ترضى أن تكون لنا الآخرة ولهم الدنيا ؟ قلت بلى . رواه مسلم:(2704)

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রবেশ করলাম, তিনি চাটাইয়ের উপর শায়িত ছিলেন, আমি বসলাম, তিনি তাঁর ইযার নিকটে টেনে নিলেন: তাঁর দেহে ইযার ব্যতীত আর কিছু ছিল না। দেহের পাশে ছিল চাটাইয়ের ছাপ, আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর খাবারের পাত্রের দিকে তাকালাম। এক সা (দু কেজি চল্লিশ গ্রাম) পরিমাণ যব দেখতে পেলাম।

উমর (রা:) বললেন : আমার নেত্র-দ্বয় অশ্রু সিক্ত হয়ে গেল, তিনি বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব তুমি কেন কাঁদছ ? আমি বললাম : হে আল্লাহর নবী, আমি কেন কাঁদব না, কারণ আপনার দেহের পাশে চাটাইয়ের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই খাবারের পাত্রে আমি তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছি না-এই তো কায়সার, কিসরা (রোম ও পারস্য সম্রাট) রকমারির ফল মূল, উদ্যান ও লেক বিশিষ্ট বিভিন্ন প্রাসাদে আরামদায়ক জীবন যাপন করছে, আপনি তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সবচেয়ে খাঁটি বান্দা, অথচ এটাই আপনার খাবারের পাত্র ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : হে ইবনুল খাত্তাব, তুমি কি একথায় রাজি হবে না যে, আমাদের জন্য পরকাল এবং তাদের জন্য ইহকাল। আমি বললাম হ্যাঁ।

৩। পার্থিব জীবনে বেশি সুযোগ- সুবিধা গ্রহণ করা নবী আকরাম (সা.) এর লক্ষ্য ছিল না, কেননা তিনি একদিন উপবাস থাকতেন, একদিন খেতেন, এরকম ঘটনা তিনি এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের ক্ষেত্রে বহুবার ঘটেছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :—

خرج رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات يوم أوليلة، فإذا هو بأبي بكر وعمر، فقال: ما أخرجكما من بيوتكما هذه الساعة ؟ قالا : الجوع يا رسول الله، قال: وأنا والذي نفسي بيده لأخرجني الذي أخرجكما، قوموا، فقاموا معه، فأتى رجلا من الأنصار، فإذا هو ليس في بيته، فلما رأته المرأة قالت: مرحبا، وأهلا، فقال لها رسول الله صلى الله عليه وسلم أين فلان ؟ قالت: ذهب يستعذب لنا الماء، إذ جاءه الأنصاري فنظر إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم وصاحبيه، ثم قال: الحمد لله، ماأحد اليوم أكرم أضيافا مني . قال: فانطلق، فجاء بعذق فيه بسر وتمر ورطب فقال: كلوا من هذه، وأخذ المدية، فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم: إياك والحلوب، فذبح لهم فأكلوا من الشاة ومن ذلك العذق، وشربوا. فلما أن شبعوا ورووا قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لأبي بكر وعمر: والذي نفسي بيده لتسألن عن النعيم يوم القيامة، أخرجكم من بيوتكم الجوع، ثم لم ترجعوا حتى أصابكم هذا النعيم —رواه مسلم:(3799)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বা একরাতে বের হলেন: আবু বকর (র.) এবং উমর (র.) এর সাথে দেখা হল। তিনি বললেন, কি কারণে তোমরা এ সময়ে তোমাদের ঘর থেকে বের হলে ? তারা উভয়ে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, ক্ষুধার কারণে। তিনি বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, তোমরা যে কারণে বের হয়েছ আমিও সে কারণে বের হয়েছি। তোমরা দাঁড়াও। তারা রাসূলের সাথে দাঁড়ালেন। তিনি তাদেরকে নিয়ে এক আনসারী ব্যক্তির নিকট আসলেন, তখন সে ঘরে ছিল না। তার স্ত্রী তাঁকে দেখে, বলে উঠল, স্বাগতম, স্বাগতম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন : অমুক কোথায় ? সে বলল, সে আমাদের জন্য মিষ্টি-পানির সন্ধানে বের হয়েছে। পর মুহূর্তে সে এসে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীদ্বয়ের দিকে তাকাল-বলে উঠল: সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্য, আজ মেহমানের দিক দিয়ে সম্মানজনক অবস্থায় আমার ন্যায় কেউ নেই।

বর্ণনাকারী বলেন, সে বের হয়ে গেল, পাকা, কাঁচা ও ভেজা খেজুর সংবলিত কাঁদি নিয়ে আসল, বলল-আপনারা এখান থেকে খান। এ-কথা বলে ছুরি হাতে নিল। এ-অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, দুগ্ধবতী ছাগল জবেহ থেকে সাবধান। তাদের জন্য ছাগল জবেহ দিল, তাঁরা ছাগলের গোশত ও খেজুরের কাঁদি থেকে আহার গ্রহণ করলেন এবং পানি পান করলেন। তৃপ্তি সহকারে পানাহার করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ও উমরকে বললেন : যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, কিয়ামত দিবসে এ-নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ক্ষুধা তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করেছে, এ-নিয়ামত ভোগ করে তোমরা ফিরে যাচ্ছ।

  • ইবাদতে নবীজীর অধ্যবসায়

তিনি ছিলেন গোপনীয় ও প্রকাশ্য সকল প্রকার ইবাদতে অতুলনীয় ও সর্বোচ্চ শিখরে আসীন, সমগ্র মখলুকের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মহা-পুরুষ, সমগ্র ইবাদতকারীদের জন্য অনুপম নমুনা, সজ্জনদের আদর্শ। এ-বিষয়ে অনেক হাদিস রয়েছে। মাত্র দুটি উল্লেখ করা হল :—

(১) মুগীরা বিন শোবা রা: হতে বর্ণিত:

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قام حتى تفطرت قدماه، فقيل له أليس قد غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر ؟ قال: أفلا أكون عبدا شكورا. رواه البخارى:(4459)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলেন, এমনকি তাঁর উভয় পা ফুলে ফেটে গেলে তাঁকে বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল ! আল্লাহ কি আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটি সমূহ মার্জনা করেন নি ? তিনি উত্তরে বললেন আমি কি অধিক শুকরিয়া জ্ঞাপন কারী বান্দা হব না ?

(২) আয়েশা রা. হতে বর্ণিত: তিনি বলেন –

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصوم حتى نقول لا يفطر ويفطر حتى نقول: لا يصوم. رواه البخارى:(1833)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম পালন করতেন এমনকি আমরা বলতাম তিনি সিয়াম পালন ত্যাগ করবেন না। তিনি সিয়াম পালন বাদ দিতেন এমনকি আমরা বলতাম তিনি সিয়াম পালন করবেন না।