আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

মহান শিল্পীর সৃষ্টি কত সুন্দর! কোথাও কোনো খুঁত নেই। তার চেয়েও সুন্দর মহান স্রষ্টা যা চোখের দৃষ্টি ও মনের দৃষ্টি উভয় দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে।

এরশাদ হচ্ছে :

الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴿3﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ ﴿4﴾ )سورة الملك : 3-4)

দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না, তোমার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখ কি? আবার দেখ, আবারো। তোমার দৃষ্টি তোমারই দিকে ফিরে আসবে ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে। (সূরা মুলক : ৩,৪)

স্রষ্টার এত সুন্দর নিখুঁত সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। তাই পৃথিবীর সব কিছুর ওপর মানুষকেই কর্তৃত্ব করতে দিয়েছেন তিনি। কত সৌভাগ্য মানুষের । মানুষ এ সত্যকে আনন্দ ও ভোগের মোহে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে না।

মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে চোখ অন্যতম। অন্তঃকরণকে ভেতরে ও বাইরে সঠিক পথ দেখায় চোখের দৃষ্টি। চোখের দৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব যা-ই থাক না কেন এর আধ্যাতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

সাদা-কালো টিভির পর্দায় সব কিছু সাদা-কালো দেখায়। রঙিন টিভির পর্দায় সাদাকে সাদা, কালোকে কালো, লালকে লাল, সবুজকে সবুজই দেখায়। তার চেয়েও মূল্যবান সম্পদ মানুষের দু’টি রঙিন চোখের দৃষ্টি। চোখের রঙিন দৃষ্টিতে দুনিয়ার সব কিছুর প্রকৃত রূপ-রঙ ধরা পড়ে।

এমন মূল্যবান চোখ রাব্বুল আলামীনের শ্রেষ্ঠ উপহার। এ চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমরা কত কী দেখি। সুন্দর-কুৎসিত, ভালো-মন্দ, উত্থান-পতন, নগ্নতা-বর্বরতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নয়ন জুড়ানো দৃশ্যাবলি। আবার এ চোখের দৃষ্টি দিয়েই কুরআন ও কিতাব পড়ি। এ চোখের দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে রাজা-প্রজা এক কাতারে দাঁড়িয়ে স্রষ্টাকে সেজদা করছে, একসাথে কাবা তাওয়াফ করছে, এক সাথে ধর্ম-কর্ম পালন করছে। এ চোখের দৃষ্টিই প্রমাণ করছে শিশুকালে ও বাধ্যক্যে মানুষ কত অসহায়, আবার যৌবনে কত শক্তিমান ও আমিত্বের অহঙ্কারে বেপরোয়া।

মানব সৃষ্টির রহস্যই মানুষকে অবাক করে দেয়। কোটি কোটি মানুষ, অথচ ভিন্ন ভিন্ন দেহের গঠন, কন্ঠস্বর, চেহারা, অন্তঃকরণ, মানুষের চোখ, জিহ্বা, নাক, কান, ত্বক, লিভার, কিডনি, সর্বোপরি মস্তিস্ক ও হার্টের নৈপুণ্য ও কার্যকারিতা সত্যিই কি চিন্তার বিষয় নয় ? আল্লাহ তাআলা বলছেন :

‍إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا ﴿2﴾ (سورة الدهر : 2)

আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্র-বিন্দু হতে তাকে পরীক্ষা করার জন্য। এ জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। (সূরা দাহর : ২)

যখন দেখি সব কিছু বেষ্টন করেও সূর্য ও রশ্মি ভিন্ন, আলাদা সূর্যের অস্তিত্ব। তখন কি চিন্তা না করে পারা যায় আল্লাহর কুরসী সবকিছু বেষ্টন করেও আলাদা রয়েছে তাঁর অস্তিত্ব। একটি ফুলের বাইরের সৌন্দর্য চোখ জুড়ায় বটে, কিন্তু ভিতরের কারুকার্য অবশ্যই জ্ঞানীদের চিন্তাকে অস্থির করে তোলে, মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চোখের দৃষ্টি বিবেক বোধকে নাড়া দেয় যখন দেখি পানি বাস্প হয়ে মেঘে পরিণত হয়, মেঘ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ধরায় নামে এবং নদী হয়ে সাগরে মিলায়। মাটি কত চমৎকারভাবে স্তরে স্তরে পানি ধরে রাখছে। দুর্বা ও গাছপালা গজাচ্ছে। মাটির আঁধারে শস্য কণা অঙ্কুরিত হচ্ছে। বাতাস অক্সিজেন -সমৃদ্ধ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আকাশে সুশোভিত গ্রহ-নক্ষত্র বিরাজ করছে, সূর্য ও চন্দ্র কত সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালন করছে, পৃথিবী নামক দোলনায় পাহাড় ও পর্বতগুলো পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করছে। খুটিঁ ছাড়াই গ্রহ-নক্ষত্র ঝুলছে। ফ্রান্সিস বেকন যথার্থই বলেছেন, যারা মাটি থেকে দুর্বা গজানো কিংবা আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরার মতো স্রষ্টার অলৌকিকত্ব অনুধাবন করতে পারেনা, স্রষ্টা তাদের সৎপথে আনার জন্য অন্য কোনো অলৌকিকত্ব প্রদর্শন করেননা।

মানুষের প্রাণের কি কোনো রূপ আছে? বাতাসের কি কোনো নির্দিষ্ট আকার আছে? মানুষের এত সুন্দর দেহশিল্পে মরণ হানা দেয় কেন? আগুন নিভে কোথায় যায়? পাখিরা বহুদূর পথ অতিক্রম করেও আবার আবাসস্থলে ফিরে আসে কার দিক-নির্দেশনায়? দিবস মিলাচ্ছে রাতে, রাত্রি মিলাচ্ছে দিবসের মধ্যে কার ইঙ্গিতে? এসব বিষয় অবশই চিন্তাশীলদের ভাবিয়ে তোলে। কুরআনে কারীমে আছে :

وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ﴿12﴾ ) سورة النحل :12)

তোমাদের জন্য আল্লাহ অধীনস্থ করেছেন রাত্রি ও দিবসকে, সূর্য ও চন্দ্রকে। নক্ষত্ররাজি তাঁর হুকুমের অধীন, নিশ্চয়ই এতে বহু নিদর্শন রয়েছে যারা জ্ঞানী তাদের জন্য। (সূরা নহল : ১২)

এই পৃথিবীর গাছপালা, জীবজন্তু, পাহাড়-পর্বত সব কিছু স্রষ্টাকে সেজদা করছে। মহান রাহমানুর রাহীমরে তসবি পড়ছে। কোকিল মধুর স্বরে ‍‍‌‌‌আল্লাহু” আল্লাহু” বলে ডাকছে, মৌমাছি গুনগুন করে আল্লাহ পাকের তসবি পড়ছে। কেউ বসে নেই, সবাই ইবাদতে মশগুল, আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত। শুধু আমরা মানুষ অযথা সময় নষ্ট করছি। আল্লাহকে চিনতে ভুল করছি। এরশাদ হচ্ছে :

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ۩﴿18﴾

তুমি কি দেখনা আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা হজ : ১৮)

আসমান ও জমিনের এতসব সৌন্দর্য, অলৌকিকত্ব, মানুষের অন্তঃকরণের রঙিন চোখের পর্দায় অবশ্যই ধরা পড়ার কথা। যদি সে অন্ধ না হয়। মানুষ তার বোধশক্তি, মেধাকে কাজে না লাগালে, এ নিয়ে চিন্তা বা গবেষণা না করলে, মহান শিল্পীর সৃষ্টিকে বাইরের চোখ ও মনের চোখ কোনো চোখেই বড় করে দেখবে না। স্রষ্টার অস্তিত্বের কোটি কোটি প্রমাণ তার কাছে শূন্য বলে বিবেচিত হবে।

চোখের দৃষ্টিকে সঠিকভাবে পরিচালিত না করলে মানুষের কলব ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষ পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে পৌঁছে যায়। অসভ্য, বর্বর, নীতিহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থপর ও বিবেকহীন হয়। বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মানসিক অশান্তিতে ভোগে। বিপদে আপদে পতিত হয়।

মূলতঃ দ্বীন-দুনিয়ার সব কাজের উৎস হলো অন্তঃকরণ। আর চোখের দৃষ্টি হলো অন্তঃকরণের মুখ্য সৈনিক। এ বিষয়ে হজরত আলী রা. বলেছেন : যে ব্যক্তি তার চোখের ওপর জয়ী হতে পারে না তার অন্তঃকরণের কোনো মূল্য নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴿19﴾ (سورة المؤمن : 19)

চোখের অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। (সূরা মুমিন : ১৯)

মানুষের দুনিয়াবি জিন্দেগি স্বপ্নের মত ফুরিয়ে যাবে। তাই দুনিয়ায় থেকেই পরকালের প্রকৃত জীবনের ভাবনা করতে হবে। এরশাদ হচ্ছে :

وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآَخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴿64﴾ (سورة العنكبوت : 64)

এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়, পারলৌকিক জীবন তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। (সূরা আনকাবুত : ৬৪)

যে দয়াময় আলো, বাতাস, আগুন, পানি ও হরেক রকম খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তার সাথে নিমকহারামি না করি। চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখি, মনের দৃষ্টি দিয়ে স্রষ্টাক দেখি। প্রাণ ভরে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আল্লাহ বলেন :

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴿78﴾

আর আল্লাহ তোমাদের বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদিগকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তঃকরণ, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (সূরা নহল : ৭৮)।

দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর পরম নিয়ামত। আসুন দৃষ্টিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্রষ্টার অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্যে প্রবেশ করে স্রষ্টার সৃষ্টিকে মর্মে মর্মে অনুধাবন করি। বাইরের চোখের দৃষ্টিতে আর মনের চোখের দৃষ্টিতে একাকার হয়ে ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি করি এবং আমলে সালেহের হাত প্রসারিত করি। তবেই আল্লাহর খাটিঁ প্রেমিকের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সৎ কাজ হবে ইবাদত।