সবর : কী ও কেন (২)

সবর : কী ও কেন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

সবরের প্রকার
সবর তিন প্রকার। যথা :

  • প্রথম : আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পাদন করতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করা।
  • দ্বিতীয় : আল্লাহ তা’আলার নিষেধ এবং তার বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে অটুট ধৈর্য রাখা। এবং
  • তৃতীয় : তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে ধৈর্য ধরা।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত লুকমান আলাইহিস সালামের বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ (17)

‘হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ [সূরা লুকমান, আয়াত : ১৭]

লুকমান আলাইহিস সালাম যে ‘সৎকাজের আদেশ দাও’ বলেছেন, তার মধ্যে নিজে সৎ কাজ করা এবং অপরকে সৎ কাজের উপদেশ দেয়া— উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অসৎকাজে নিষেধ করার মধ্যেও উভয়টি রয়েছে। এখানে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’ শব্দই আমাদের এমন ধারণা দেয়। তাছাড়া শরীয়তের দৃষ্টিতেও ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’ বাস্তবায়িত হয় না, যতক্ষণ না আগে নিজে তা পালন করা হয়। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন,

إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ (19)الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ (20) وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ (21) وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ (22)

‘বুদ্ধিমানরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে। যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভালো কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম। আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা অটুট রাখে এবং তাদের রবকে ভয় করে, আর মন্দ হিসাবের আশঙ্কা করে। যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না।’

তাই বলে বিপদ কামনা করার বিধান নেই

বিপদে ধৈর্য ধরার ফযীলত অনেক। তাই বলে শরীয়তে বিপদ কামনা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ, মুমিন সচেতন ও বুদ্ধিমান। সে কখনো বিপদ প্রত্যাশা করতে পারে না। তবে বিপদ এসে পড়লে তাতে সে বিচলিতও হয় না; বরং ধৈর্য ধরে। বিপদের সময় দৃঢ়তা ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়। যেমন বুখারী শরীফে আব্দুল্লাহ বিন আবূ আওফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, যুদ্ধের দিনগুলোতে একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষায় থাকলেন। যখন সূর্য ডুবে গেল তখন তিনি তাঁদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন,

أَيُّهَا النَّاسُ لاَ تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَسَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ فَإِذَا لَقِيتُمُوهُمْ فَاصْبِرُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلاَلِ السُّيُوفِ.

‘হে লোকসকল, তোমরা শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখি হবার প্রত্যাশা করো না এবং আল্লাহ তা’আলার কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। তবে যখন তোমরা তাদের মুখোমুখি হও, তখন ধৈর্য ধর এবং সবর করো। আর জেনে রেখো, জান্নাত তরবারির ছায়া তলে।’ [বুখারী : ২৯৬৫; মুসলিম : ৪৬৪০]

ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে শত্রু-সাক্ষাতের প্রত্যাশা করতে বারণ করেছেন। কারণ, সে জানে না সামনে কী ঘটবে আর বিপদে পরিত্রাণইবা পাওয়া যাবে কীভাবে। এ থেকে অপছন্দনীয় বিষয় প্রার্থনা করা এবং অপ্রিয় অবস্থা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিতে চাওয়ার নিষেধাজ্ঞা বুঝা যায়। এ জন্যই পূর্বসূরী নেককার ব্যক্তিগণ আল্লাহ তা’আলার কাছে বিপদাপদ ও পরীক্ষা থেকে মুক্তি প্রার্থনা করেছেন। কেননা সবাই সবসময় ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখাতে পারে না।

আমরা তো সেই সাহাবীর কথা শুনে থাকবো যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত অবস্থায় যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন! এ জন্যই কিন্তু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন,

لأَنْ أُعَافَى فَأَشْكُرَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أُبْتَلَى فَأَصْبِرَ

‘সুস্থ থাকবো আর শুকরিয়া আদায় করবো- এটাই আমার কাছে প্রিয় বিপদে থেকে সবর করার চেয়ে।’ [ তাবরানী, মু’জামুল কাবীর : ১৭৬৬; বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৪১২১]

একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে ছুহাইব বিন সিনান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,

عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ.

‘মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থায়তেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দের উপলক্ষ পায়, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ফলে তা হয় তার জন্য কল্যাণবাহী। আর যখন সে কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন সবর করে এবং ধৈর্যে অটল থাকে। ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।’ [মুসলিম : ৭৬৯২]

বিপদ মুমিনের নিত্যসঙ্গী

আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই পরীক্ষায় ভরা। আল্লাহ তা’আলা যেমন ইরশাদ করেন,

وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ (35)

‌’আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে।’ [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ৩৫]

আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে চান কে ধৈর্যশীল, কে মুজাহিদ আর কে সত্যবাদী। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ (142)

‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেন নি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেন নি ধৈর্যশীলদেরকে।’ [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৪২]

তিনি আরও ইরশাদ করেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ (31)

‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি প্রকাশ করে দেই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদকারী ও ধৈর্যশীল এবং আমি তোমাদের কথা— কাজ পরীক্ষা করে নেব।’ [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত : ৩১]

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

إِنْ يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ (140)

‘যদি তোমাদেরকে কোনো আঘাত স্পর্শ করে থাকে তবে তার অনুরূপ আঘাত উক্ত কওমকেও স্পর্শ করেছে। আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি এবং যাতে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে জেনে নেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদেরকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ যালিমদেরকে ভালোবাসেন না।’ [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৪০]

আল্লাহ তা’আলা আরও সুনির্দষ্ট করে বলেন,

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ (15)

‌’তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান।’ [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত : ১৫]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সাহাবীদের সবর শিক্ষা দিয়েছেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং তাঁর শীষ্য ও সাহাবীদের সবর শিক্ষা দিয়েছেন। এটি বেশি করা হয়েছে মক্কী জীবনে। যেমন খুবাইব বিন আরাত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীসে আমরা এর চিত্র দেখতে পাই। তিনি বলেন,

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কা’বার ছায়ায় বালিশে হেলান দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর কাছে অভিযোগ করলাম, কেন আপনি আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সাহায্য চাইছেন না, আমাদের জন্য তাঁর কাছে দু’আ করছেন না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে (এমন বিপদও এসেছে যে) কাউকে ধরা হতো। তারপর গর্ত খনন করে তাকে সেই গর্তে ফেলা হতো। এরপর করাত এনে তার মাথার ওপর রাখা হতো। অতপর তাকে দুই টুকরো করে লোহার চিরুনী দিয়ে তার শিরা-অস্থিসহ আচড়ানো হতো। তদুপরি তারা তাকে দীন থেকে ফেরাতে পারতো না। আল্লাহর শপথ! (এখন আমাদের পরীক্ষা চলছে) আল্লাহ এ দীনকে পূর্ণতা দেবেন। একদিন এমন আসবে যখন আরোহীরা সানআ থেকে হাযারামাউত পর্যন্ত যাবে। চিতা আর ছাগল নিরাপদে থাকবে। এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করতে হবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছো।’ [ বুখারী : ৩৬১২]

অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের আযাব অচিরেই দূর হয়ে যাবে। সুতরাং অতীতের উম্মতের মতো তোমরাও দীনের বিপদে একটু ধৈর্য ধরো।

সবরের ফযীলত-মর্যাদা

সবরের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর বান্দা মাত্রেই সবর করতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে, বিরত থাকতে তা করা থেকে। আবার কখনো অকস্মাৎ তাকদীরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। নেয়ামত দেয়া হবে, তখন শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন অতিবাহিত হয়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই সবরকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। এজন্যই সবরের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।

  • ক. উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

‘যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন অর্থাৎ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ পড়বে এবং বলবে, হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।’ উম্মে সালামা বলেন, আবূ সালামা মারা গেল। আমি ভাবলাম, আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে হতে পারে? তাঁর ঘরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন। আমি মনে মনে এ কথা ভাবলাম আর আল্লাহ তা’আলা আমাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহকেই স্বামী হিসেবে দান করলেন।’ [ মুসলিম : ২১৬৫]

  • খ. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ.

‘আল্লাহ যার ভালো চান, তাকে বিপদ দেন।’ [বুখারী : ৫৬৪৫; আহমদ, মুসনাদ : ৭২৩৪]

  • গ. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَا مِنْ مُصِيبَةٍ تُصِيبُ الْمُسْلِمَ إِلاَّ كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا عَنْهُ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا.

‘মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিঁধে (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়।)’ [বুখারী : ৫৬৪০; মুসলিম : ৬৭৩০]

  • ঘ. আবূ মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ ، أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا.

‘যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থ্য ও ঘরে থাকতে যেরূপ নেকি কামাই করতো অনুরূপ নেকি লেখা হয়।’ [বুখারী : ২৯৯৬; আহমদ, মুসনাদ : ১৯৬৯৪]

  • ঙ. সুফিয়ান বিন উয়াইনা রহ. নিচের আয়াত :

وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ (24)

‘আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।’ (আস-সাজদাহ : ২৪)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, যেহেতু তারা সকল কৌশলের মূল তথা ধৈর্য অবলম্বন করেছে তাই আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিলাম। [ইবন কাছীর : ৬/৩৭২]

  • চ. উরওয়া ইবন যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধে আহত হবার পর যখন সাহাবীরা তার পা কাটতে উদ্যত হলেন, তারা বললেন,

لو سقيناك شيئا حتى لا تشعر بالوجع قال إنما ابتلاني ليرى صبري أفأعارض أمره بدفع

আমরা কি আপনাকে কিছু খাইয়ে দেবো যাতে আপনি কষ্ট অনুভব না করেন? তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে আমার ধৈর্য দেখার জন্যই এ বিপদে ফেলেছেন। আমি কি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারি?! [ আল-মারযু ওয়াল-কাফফারাত, ১/১৩৯]

  • ছ. উমর বিন আবদুল আজীজ রহ. বলেন,

مَا أَنْعَمَ اللهُ عَلَى عَبْدٍ نِعْمَةً فَانْتَزَعَهَا مِنْهُ فَعَاضَهُ مِنْ ذَلِكَ الصَّبْرَ إِلَّا كَانَ مَا عَاضَهُ خَيْرًا مِمَّا انْتَزَعَ مِنْهُ

‘যাকে আল্লাহ তাআলা কোনো নেয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তার স্থলে তাকে সবর দান করেছেন, তো এই ব্যক্তি থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তার চেয়ে সেটাই উত্তম যা তাকে দান করা হয়েছে।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৯৫৬৫; মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবা : ৩৬২৪২]

  • জ. আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ হলে তাকে দেখতে গিয়ে সাহাবীরা বললেন,

ألا ندعو لك الطبيب، فقال: قد رآني الطبيب، قالوا: فأي شيء قال لك، قال: قال إني فعال لما أريد.

‘আমরা কি আপনার জন্য চিকিৎসক ডেকে আনবো না? তিনি বললেন, চিকিৎসক আমাকে দেখেছেন। তারা বললেন, চিকিৎসক আপনাকে কী বলেছেন? তিনি বললেন, বলেছেন, ‘আমি যা চাই তা-ই করি’। [আহমদ, আয-যুহদ : ২/১০৪]

শেষ কথা

জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আমাদেরকে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে প্রতিবেশির আচরণে। তার দেয়া কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করতে হবে। থাকতে হবে তার কল্যাণে সদা সচেষ্ট। আত্মীয়দের কথা যদি বলেন, তারাও কষ্ট দেবে আপনাকে। এতে সবর করুন আর নেকির প্রত্যাশায় থাকুন। আপনার অধীনস্ত যারা আছে তারাও আপনাকে ত্যক্ত-বিরক্ত করবে। তাদের আচরণেও আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। মনে রাখবেন, পৃথিবীটা কিন্তু আপনার-আমার নিয়ম মাফিক চলবে না। জগতের সবাই নিয়ম রক্ষাও করতে পারবে না। স্বামী হলে স্ত্রীর ব্যবহারে আপনাকে সহিষ্ণুতা ও সবরের স্বাক্ষর রাখতে হবে। তার মন্দ দিকগুলো যখন ফুটে হতে থাকে, তখন আপনি তার ভালো ও প্রশংসনীয় গুণগুলো সামনে আনবেন। একইভাবে আপনি যদি স্ত্রী হন, তবে আপনাকেও ওই সবরের দ্বারস্থ হতে হবে। স্বামীর সব কিছুতেই অভিযোগ আনবে চলবে না। তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। ঘরের বাইরে তিনি যে কষ্ট-যাতনা সহ্য করেন তার দিকে তাকিয়ে আপনি ঘরের ভেতরে তার অপছন্দনীয় জিনিসগুলো সহনীয় হিসেবে গণ্য করুন।

মানুষের আচরণে সবর করতেই হবে। সবাই তার দায়িত্ব সুন্দরভাবে সম্পাদন করতে পারে না। সব মানুষের আখলাক-চরিত্রও একরকম নয়। একেকজনের স্বভাব একেকরকম। অতএব সবরের কোনো বিকল্প নেই। সবর করুন আর এর সুফলের কথা মাথায় রাখুন। কারণ, সবরকারী তার সবরের বদৌলতে প্রভূত কল্যাণ অর্জন করেন। যার সবর নেই, সবখানেই তিনি কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হন। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে সবরের মতো মহৎ গুণের অধিকারী বানান। আমাদেরকে ধৈর্যশীল বান্দা হবার তাওফীক দিন। আমীন।