রসুল (সঃ) এর সাহাবাগনের মর্যাদা পর্বঃ ১

ছাহাব: ন্যায়নিষ্ঠতা ও সুমহান মর্যাদা

পর্বঃ ১  ।।  পর্বঃ ২

হেদায়াতের নক্ষত্র, তাকওয়ার পূর্ণচন্দ্র, দীপ্তিমান তারকা, সুদীপ্ত পূর্ণিমা; রাতের দরবেশ, দিনের অশ্বারোহী; যারা আপন আঁখি যুগলকে সজ্জিত করেছেন মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূরের সুরমায়; ইসলাম নিয়ে যারা ছুটে গেছেন পূর্বে ও পশ্চিমে, যার বদৌলতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে ভূভাগের প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি প্রান্তে। তাঁরা ছিলেন আনসার, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করেছেন নুসরাত ও সাহায্য। তাঁরা ছিলেন মুহাজির, যারা কেবলই আল্লাহর জন্য করেছেন হিজরত, বিসর্জন দিয়েছেন নিজেদের দেশ ও সহায়-সম্পদ।

তাঁদের মর্যাদার সবিস্তার বিবরণ দেবার সাধ্যি নেই কোনো ভাষার। তাঁদের পূর্ণ শ্রেষ্ঠত্ব ও আদর্শের আদ্যোপান্ত আলোচনার ক্ষমতা নেই কোনো কলমের। তাঁরা হলেন কবির কথায়,

عَهْدِي بِهِمْ تَسْتَنِيرُ الأَرْضُ إِنْ نَزَلُوا

فِيهَا وَتَجْتَمِعُ الدُّنيَا إِذَا اجْتَمَعُوا

وَيَضْحَكُ الدَّهْرُ مِنْهُمْ عَنْ غَطَارِفَةٍ

كَأَنَّ أَيَّامَهُمْ مِنْ أُنْسِهَا جُمَعُ

‘তাঁদেরকে তো আমি দেখেছি এমন যে, তাঁরা মর্ত্যে নেমে আসলে তা আলোকিত হয়ে যায়; আর তাঁরা সমবেত হলে গোটা জাহানই সমবেত হয়।

তাঁদের বদান্যতা ও আতিথ্যে যুগ হয় অভিভূত, তাঁদের দিনগুলো ভালোবাসা-সম্প্রীতিতে যেন জুমু‘আর দিন!’ [আব্দুস সালাম হারুন, মাজমু‘আতুল মা‘আনী : ১/৫৫৬]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর তাঁরাই বহন করেছেন ইসলামের ঝাণ্ডা। ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আল্লাহ তাঁদের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমকে সম্মানিত করেছেন। এ কারণেই আমরা বিচারের দিন পর্যন্ত তাঁদের নিকট ঋণী। কবি বলেন,

فَمَا العِزُّ لِلْإِسْلاَمِ إِلاَّ بِظِلِّهِمْ

وَمَا الْمَجْدُ إِلاَّ مَا بَنَوْه فَشَيَّدُوا

‘ইসলামের সম্মান তো তাঁদের ছায়াতেই; আর মর্যাদা তো তাই, যা তাঁরা নির্মাণ করে সুদৃঢ় করেছেন!’

উপক্রমনিকা :

বুখারী রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থে ছাহাবীর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে : ‘মুসলিমদের মধ্যে যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভ করেছেন অথবা তাঁকে দেখেছেন তিনিই ছাহাবী।’ অর্থাৎ ছাহাবী হলেন, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমানসহ দেখেছেন এবং ইসলাম নিয়েই মারা গেছেন।

‘ছাহাবী’র সংজ্ঞায় এ ব্যাপকতা মূলত ছোহবত বা সাহচর্যের মর্যাদা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদার মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য করে। কেননা নবুওতের নূর দর্শন মুমিনের অন্তরে একটি সংক্রামক শক্তি সঞ্চার করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতে মৃত্যু অবধি এ নূরের প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয় দর্শকের ইবাদত-বন্দেগীতে এবং তার জীবনযাপন প্রণালীতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণীতে আমরা এর সাক্ষ্য পাই। আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

طُوبَى لِمَنْ رَآنِي وَآمَنَ بِي ، وَطُوبَى لِمَنْ آمَنَ بِي وَلَمْ يَرَنِي سَبْعَ مِرَارٍ.

‘সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য যে আমাকে দেখেছে এবং আমার প্রতি ঈমান এনেছে। আর সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য যে আমার প্রতি ঈমান এনেছে অথচ আমাকে দেখেনি।’ এ কথা তিনি সাতবার বললেন। [মুসনাদ আহমাদ : ২২৪৮৯]

এ সংজ্ঞা মতে ছাহাবীরা ছোহবত বা সাহচর্যের সৌভাগ্য এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দর্শনের মর্যাদায় অভিষিক্ত। আর তা এ কারণে যে, নেককারদের ছোহবতেরই যেখানে এক বিরাট প্রভাব বিদ্যমান, সেখানে সকল নেককারের সরদার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোহবতের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য। অতএব যখন কোনো মুসলিম তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হয়, হোক তা ক্ষণিকের জন্যে, তার আত্মা ঈমানের দৃঢ়তায় টইটুম্বুর হয়ে যায়। কারণ, সে ইসলামে দীক্ষিত হবার মাধ্যমে স্বীয় আত্মাকে ‘গ্রহণ’ তথা কবুলের জন্য প্রস্তুতই রেখেছিল। ফলে যখন সে ওই মহান নূরের মুখোমুখী হয়, তখন তার কায়া ও আত্মায় এর প্রভাব ভাস্কর হয়ে ওঠে।’ [তাকিউদ্দীন সুবুকী, কিতাবুল ইবহাজ ফী শারহিল মিনহাজ : ১/১২]

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে অনেক স্থানে এ ছাহাবীদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ مُّحَمَّدٞ رَّسُولُ ٱللَّهِۚ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ أَشِدَّآءُ عَلَى ٱلۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيۡنَهُمۡۖ تَرَىٰهُمۡ رُكَّعٗا سُجَّدٗا يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗاۖ سِيمَاهُمۡ فِي وُجُوهِهِم مِّنۡ أَثَرِ ٱلسُّجُودِۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِۚ وَمَثَلُهُمۡ فِي ٱلۡإِنجِيلِ كَزَرۡعٍ أَخۡرَجَ شَطۡ‍َٔهُۥ فَ‍َٔازَرَهُۥ فَٱسۡتَغۡلَظَ فَٱسۡتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِۦ يُعۡجِبُ ٱلزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلۡكُفَّارَۗ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِنۡهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمَۢا ٢٩ ﴾ [الفتح: ٢٩]

‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকূকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চি‎হ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।’ {সূরা আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯}

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿ وَٱلَّذِينَ جَآءُو مِنۢ بَعۡدِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ ١٠ ﴾ [الحشر: ١٠]

‘যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে : ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ {সূরা আল-হাশর, আয়াত : ১০}

এ ছাড়া আরও অনেক আয়াতে ছাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ছাহাবীদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মর্যাদা ও মর্তবার কথা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা থেকেই মানুষ তাঁদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পারে যে, ইবাদত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীতে কেউ যতই উচ্চতায় পৌঁছুক না কেন ছাহাবীগণ যে স্তরে পৌঁছেছিলেন তার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। নিচের হাদীসই সে কথা বলছে। ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ فَيَغْزُو فِئَامٌ مِنَ النَّاسِ فَيَقُولُونَ فِيكُمْ مَنْ صَاحَبَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَيَقُولُونَ نَعَمْ فَيُفْتَحُ لَهُمْ ثُمَّ يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ فَيَغْزُو فِئَامٌ مِنَ النَّاسِ فَيُقَالُ هَلْ فِيكُمْ مَنْ صَاحَبَ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَيَقُولُونَ نَعَمْ فَيُفْتَحُ لَهُمْ ثُمَّ يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ فَيَغْزُو فِئَامٌ مِنَ النَّاسِ فَيُقَالُ هَلْ فِيكُمْ مَنْ صَاحَبَ مَنْ صَاحَبَ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَيَقُولُونَ نَعَمْ فَيُفْتَحُ لَهُمْ».

‘লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভ করেছেন? সবাই বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে। অতপর লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গলাভকারী কারও ছোহবত পেয়েছেন? সবাই বলবে, জী হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে। অতপর লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভকারীর সোহবতপ্রাপ্ত কারও সাহচর্য পেয়েছেন? সবাই বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে।’ [বুখারী : ৩৬৪৯; মুসনাদ আহমদ : ২৩০১০]

আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« النُّجُومُ أَمَنَةٌ لِلسَّمَاءِ فَإِذَا ذَهَبَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ وَأَنَا أَمَنَةٌ لأَصْحَابِى فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِى مَا يُوعَدُونَ وَأَصْحَابِى أَمَنَةٌ لأُمَّتِى فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِى أَتَى أُمَّتِى مَا يُوعَدُونَ ».

‘নক্ষত্ররাজি হলো আসমানের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ, তাই যখন তারকারাজি ধ্বংস হয়ে যাবে, আসমানের জন্য যা প্রতিশ্রুত ছিল তা এসে যাবে। একইভাবে আমি আমার ছাহাবীদের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। অতএব আমি যখন চলে যাব তখন আমার ছাহাবীদের ওপর তা আসবে যা তাদের ওয়াদা করা হয়েছিল। আর আমার ছাহাবীরা আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। যখন আমার ছাহাবীরা চলে যাবে তখন আমার উম্মতের ওপর তা আসবে যা তাদের ওয়াদা করা হয়েছিল।’ [মুসলিম : ৬৬২৯; মুসনাদ আহমদ : ১৯৫৬৬]

জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إن الله اختار أصحابي على العالمين سوى النبيين والمرسلين ، واختار لي من أصحابي أربعة – يعني : أبا بكر وعمر وعثمان وعليا – رحمهم الله – فجعلهم أصحابي . وقال : في أصحابي كلهم خير ، واختار أمتي على الأمم…».

‘আমার ছাহাবীদেরকে আল্লাহ নবী-রাসূলদের পর সারা জাহানের ওপর নির্বাচিত করেছেন। আর আমার ছাহাবীদের মধ্যে আমার জন্য চারজনকে নির্বাচিত করেছেন : আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। তিনি আরও বলেছেন, আমার ছাহাবীদের সবার কাছেই রয়েছে কল্যাণ। আর [আল্লাহ তা‘আলা] আমার উম্মতকে সকল উম্মতের মধ্য থেকে নির্বাচিত করেছেন।’[1] [মুসনাদ বাযযার : ২৭৬৩]

ছাহাবীদের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে ইমাম আহমদ রহ. একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থই রচনা করেছেন। যাতে তিনি ছাহাবীদের ফযীলত সংক্রান্ত অনেকগুলো হাদীস সংকলন করেছেন। সেখান থেকে আমরা কয়েকটি হাদীস তুলে ধরছি। আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« اللَّهَ اللَّهَ فِى أَصْحَابِى اللَّهَ اللَّهَ فِى أَصْحَابِى لاَ تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا بَعْدِى فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّى أَحَبَّهُمْ وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِى أَبْغَضَهُمْ وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذَانِى وَمَنْ آذَانِى فَقَدْ آذَى اللَّهَ وَمَنْ آذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ ».

‘আমার ছাহাবীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আল্লাহকে ভয় কর। আমার পরবর্তীকালে তোমরা তাঁদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত করো না। কারণ, যে তাদের ভালোবাসবে সে আমার মুহাব্বতেই তাদের ভালোবাসবে। আর যে তাঁদের অপছন্দ করবে সে আমাকে অপছন্দ করার ফলেই তাদের অপছন্দ করবে। আর যে তাঁদের কষ্ট দেবে সে আমাকেই কষ্ট দেবে। আর যে আমাকে কষ্ট দেবে সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দেবে অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।’ [তিরমিযী : ৪২৩৬; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭২৫৬][2]

আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَوَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ ».

‘তোমরা আমার ছাহাবীদের গালমন্দ করো না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। যদি তোমাদের কেউ উহুদ পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবে তা তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেকরও সমকক্ষ হতে পারবে না।’ [বুখারী : ৩৬৭৩; মুসলিম : ৬৬৫১]

আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلا عَدْلا».

‘যে ব্যক্তি আমার ছাহাবীকে গাল দেবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা সকল মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তার নফল বা ফরয কিছুই কবুল করবেন না।’ [তাবরানী : ২১০৮]

আতা ইবন আবী রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ حَفِظَنِي فِي أَصْحَابِي كُنْتُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَافِظًا ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ».

‘যে আমার ছাহাবীদের ব্যাপারে আমাকে সুরক্ষা দেবে কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সুরক্ষাকারী হব। আর ‘যে আমার ছাহাবীকে গাল দেবে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ [আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযাইলুস ছাহাবা : ১৭৩৩][3]

আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً ، خَيْرٌ مِنْ عَمَلِ أَحَدِكُمْ عُمُرَهُ.

‘তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীদের গালাগাল করো না। কেননা তাদের এক মুহূর্তের (ইবাদতের) মর্যাদা তোমাদের প্রত্যেকের জীবনের আমলের চেয়ে বেশি।’ [ইবন মাজা : ১৬২; আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযাইলুস ছাহাবা : ১৫]

এ ব্যাপারে ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহর একটি মূল্যবান বাক্য রয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমাদের কাউকে যদি যুগ-যুগান্তর ব্যাপ্ত সুদীর্ঘ হায়াত প্রদান করা হয় আর সে তাতে অব্যাহতভাবে ইবাদত করে যায়, তবুও তা ওই ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারবে না যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক সেকেন্ড বা তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য দেখেছেন।’ [ইবন হাযম, আল-ফাছলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ৩৩/২]

উপরের উদ্ধৃতিগুলো থেকে আমরা জানলাম যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাহাবীদের প্রশংসা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ কর্তৃক তাঁদের স্তুতি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁদের ভূয়সী প্রশংসাই প্রমাণ করে যে তাঁরা হলেন ন্যায়নিষ্ঠ। সর্বোপরি আপন নবীর সঙ্গী ও তাঁর সহযোগী হিসেবে আল্লাহ যাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁদের তো আর কোনো ন্যায়নিষ্ঠতা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। এর চেয়ে বড় আর কোনো সনদ হতে পারে না। এর চেয়ে পূর্ণতার আর কোনো দলীল হতে পারে না। [ইবন আবদিল বার, আল-ইস্তি‘আব ফী মা‘রিতিল আসহাব : ১/১]


[1] হাদীসটির সনদ দুর্বল।

[2] হাদীসটির সনদ দুর্বল।

[3] হাদীসটির সনদ মুরসাল।