সহীহ আক্বীদা [১]

আকীদা তাহাবী

সংকলক : ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, ফকীহ, আল্লামা আবু জাফর ওয়াররাক আততাহাবী র. মিসরে অবস্থান কালে বলেছিলেন:

ফুকাহায়ে মিল্লাত আবূ হানীফা আন-নুমান বিন সাবেত আল কুফী, আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারী এবং আবু আব্দুল্লাহ বিন আল হাসান আশ শায়বানী রাহিমাহুমুল্লাহদের অনুসৃত নীতি অনুসারে এটা হল সাহাবা ও পরবর্তী জামা’আত সলফে সলেহীনদের ‘আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস। এবং তারা ধর্মের নীতিসমূহের প্রতি যে ‘আক্বীদাহ পোষণ করতেন এবং সে সব নীতি অনুসারে তারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের মনোনীত ধর্ম ইসলাম অনুসরণ করতেন তার বিবরণ।

মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে আমি বলছি :

  • ১। নিশ্চয়ই আল্লাহ এক, যাঁর কোন শরীক (অংশীদার) নেই।
  • ২। তাঁর মত কিছুই নেই। (কেউ তাঁর সমতুল্য নয়)।
  • ৩। কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।
  • ৪। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
  • ৫। তিনি অনাদি, যার কোন আদি নেই। তিনি অনন্ত, যার কোন অন্ত নেই।
  • ৬। তাঁর ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই।
  • ৭। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুই সংঘটিত হয় না।
  • ৮। কল্পনা তাঁর ধারে কাছে পৌঁছে না এবং ইন্দ্রিয় জ্ঞান তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না।
  • ৯। সৃষ্ট বস্তু তাঁর সদৃশ্য হতে পারে না।
  • ১০। তিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই এবং তিনি চির জাগ্রত, যাঁর নিদ্রার দরকার নেই।
  • ১১। তিনি এমন সৃষ্টিকর্তা যার সৃষ্টিতে কোন সাহায্যের মুখাপেক্ষী হন না এবং তিনি অক্লান্ত রিযক দাতা।
  • ১২। তিনি নির্ভয়ে প্রাণ সংহারকারী এবং নির্বিবাদে পুনরুত্থানকারী।
  • ১৩। সৃষ্টির বহু পূর্বেই তিনি তাঁর অনাদি গুণাবলীসহ বিদ্যমান ছিলেন, আর সৃষ্টির কারণে তাঁর নতুন কোন গুণের সংযোজন ঘটেনি এবং তিনি তাঁর গুণাবলীসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনি তিনি স্বীয় গুণাবলীসহ অনন্ত থাকবেন।
  • ১৪। সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “খালেক” (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি। অথবা বিশ্ব জাহান সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “বারী” (উদ্ভাবক) হয়নি।
  • ১৫। প্রতিপাল্যের অবিদ্যমানতায়ও তিনি ছিলেন ‘রব’ বা প্রতিপালক, আর মাখলুক সৃষ্টির পূর্বেও তিনি ছিলেন ‘খালেক’ বা সৃষ্টিকর্তা।
  • ১৬। মৃতকে জীবন দান করার ফলে তাঁকে ‘জীবনদানকারী’ বলা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কোন বস্তুকে জীবন দান করার পূর্বেও তিনি এই নামের (জীবন দানকারী) অধিকারী ছিলেন। অনুরূপভাবে তিনি সৃজন ছাড়াই সৃষ্টি কর্তার নামের অধিকারী ছিলেন।
  • ১৭। এটা এই জন্য যে, তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর অনুগ্রহ ভিখারী; সব কিছুই তাঁর জন্য সহজ তিনি কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। “তাঁর মত কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
  • ১৮। তিনি স্বীয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন।
  • ১৯। এবং তাদের (সৃষ্ট বস্তুর) জন্য সব কিছুরই পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।
  • ২০। এবং তাদের জন্য মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করেছেন।
  • ২১। সৃষ্ট জীবের সৃষ্টির পূর্বে কোন কিছুই তাঁর অজ্ঞাত ছিল না। জীব জগতের সৃষ্টির পূর্বেই তাদের সৃষ্টির পরবর্তীকালের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন।
  • ২২। এবং তিনি তাদের স্বীয় আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর অবাধ্যচরণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
  • ২৩। সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এবং একমাত্র তাঁরই ইচ্ছা কার্যকর হয়, এবং (আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া) বান্দার কোন ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। অতএব তিনি বান্দাদের জন্য যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না।
  • ২৪। আল্লাহপাক যাকে ইচ্ছা হিদায়েত, আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ, পক্ষান্তরে যে পথভ্রষ্ট হতে চায়, তাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে অপমানিত ও বিপদগ্রস্ত করেন। এটা তাঁর ন্যায় বিচার।
  • ২৫। সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে থাকে তাঁর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে এবং সুবিচারের মাধ্যমে।
  • ২৬। তিনি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমকক্ষ হওয়ার উর্ধ্বে।
  • ২৭। তাঁর মীমাংসার কোন পরিবর্তন নেই। কেউই তাঁর নির্দেশ বাতিল করার নেই এবং তাঁর নির্দেশকে পরাভূত করারও কেউ নেই।
  • ২৮। উপরে উল্লিখিত সব কিছুর প্রতিই আমরা ঈমান এনেছি এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করছি যে, এর প্রতিটি বিষয় আল্লাহর তরফ হতে সমাগত।
  • ২৯। নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নির্বাচিত বান্দা, মনোনীত নবী এবং প্রিয় রাসূল।
  • ৩০। তিনি নবীগণের সর্বশেষ, মুত্তাক্বীনদের ইমাম, রাসূলগণের নেতা এবং বিশ্বের মহান প্রতিপালকের হাবীব (বন্ধু)।
  • ৩১। তাঁর পরবর্তী যুগে নবুওয়াতের যে সব দাবী উত্থাপিত হয়েছে, তার সবগুলিই ভ্রান্ত ও প্রবৃত্তি পরায়ণতার শিকার।
  • ৩২। তিনি সত্য, হিদায়েত এবং নূর সহকারে সকল জিন ও সমস্ত মাখলুকের প্রতি প্রেরিত।
  • ৩৩। নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর কালাম, ইহা আল্লাহর নিকট হতে উৎসারিত হয়েছে, তবে সাধারণ কথা বার্তার পদ্ধতিতে নয়। এই কালামকে তিনি তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি অহী হিসাবে নাযিল করেছেন এবং বিশ্বাসীগণ তাঁকে এ ব্যাপারে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এবং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন যে, উহা সত্যিই আল্লাহর কালাম। উহা মাখলুকের কালামের ন্যায় সৃষ্ট বস্তু নয়। অতএব, যে ব্যক্তি একথা শুনেও তাকে মানুষের কালাম বলে ধারণা করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ বারী তাআলা তার নিন্দাবাদ করেছেন, তিরস্কার করেছেন এবং তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “শীঘ্রই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সূরা মুদদাচ্ছির, ৭৪- ২৬আয়াত) আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন ঐ ব্যক্তির জন্য যে বলবেঃ “এটাতো মানুষের কথা বৈ আর কিছুই নয়”। (সূরা মাদ্দাচ্ছির ৭৪ -২৫ আয়াত) অতএব, আমরা অবহিত হলাম এবং বিশ্বাস স্থাপন করলাম যে, ইহা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তারই কালাম এবং সৃষ্ট জীবের কালামের সাথে এর কোন তুলনা হয় না।
  • ৩৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানবীয় কোন গুণ আরোপ করে, সে কাফের। অতএব, (ক) যে ব্যক্তি এতে অন্তঃদৃষ্টি প্রদান করবে সে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে। ফলে (আল্লাহ সম্পর্কে) কাফেরদের মত নিরর্থক কথা বলা হতে বিরত থাকবে এবং (খ) সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর গুণাবলীতে মানুষের মত নন।
  • ৩৫। আল্লাহর সাথে সাক্ষাত জান্নাতীদের জন্য সত্য। তার পদ্ধতি আমাদের অজানা। এ ব্যাপারে কুরআন ঘোষণা করেছেঃ “সেদিন কতকগুলো মুখমন্ডল উজ্জল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সুরা কিয়ামা: ৭৫- ২২ আয়াত) । এর ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন এবং এ সম্পর্কে যা কিছু সহীহ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে তা অবিকৃত অবস্থায় গৃহীত হবে। অতএব, এতে আমরা আমাদের বিবেক বুদ্ধি অনুসারে কোন প্রকার অসঙ্গত তাৎপর্যের অনুপ্রবেশ ঘটাব না, অথবা স্বীয় প্রবৃত্তির প্ররোচনায় কোন সংশয় সৃষ্টিকারীর সংশয়কে প্রশয় দেব না। কারণ, ধর্মীয় ব্যাপারে একমাত্র সেই ব্যক্তিই পদস্খলন হতে নিরাপদ থাকতে পারে যে আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে (ভুল ধারণাকারীর বিভ্রান্তি হতে) নিরাপদ থাকে এবং যে ব্যক্তি সংশয়যুক্ত ব্যাপার সমূহকে সর্বজ্ঞানের অধিকারী আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়।
  • ৩৬। আত্ম-সমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার ছাড়া কারও পা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকতে পাবে না। আর যে ব্যক্তি এমন বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের পিছনে লেগে থাকবে যা তার জ্ঞানের নাগালের বাইরে এবং যার বিবেক আত্মা- সমর্পণে সন্তুষ্ট হবে না সে নির্ভেজাল তাওহীদ, নির্দোষ মারেফাত ও বিশুদ্ধ ঈমান হতে বঞ্চিত থাকবে। অতএব, সে কুফরী ও ঈমান সত্য ও মিথ্যা, স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি অনিশ্চয়তার বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকবে। সে না সত্যবাদী মু’মিন হবে, আর না অস্বীকারকারীরা মিথ্যাবাদী হবে।
  • ৩৭। যে ব্যক্তি জান্নাতীদের আল্লাহর সাক্ষাত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে, স্বীয় জ্ঞান অনুসারে সেই সাক্ষাতের ভুল ব্যাখ্যা দিবে, সে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রকৃত তাৎপর্য্য হচ্ছে- সে সম্পর্কে কোনরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার অপচেষ্টা না করা এবং উহাকে অবিকৃত ভাবে গ্রহণ করা। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের অনুসৃত নীতি। যে ব্যক্তি নফী অস্বীকৃতি এবং তাশবীহ (সাদৃশ্য) হতে আত্মরক্ষা করবে না তার নিশ্চিত পদস্খলন ঘটবে এবং সে সঠিকভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণায় ব্যর্থ হবে। কারণ, আমাদের মহান প্রতিপালক একক ও নজীরবিহীন হওয়ার গুণে ¸গুন্বানিত মাখলুকের মধ্যে কেউ তাঁর গুণে ভূষিত নয়।
  • ৩৮। আল্লাহপাক সীমা পরিধি থেকে মুক্ত। তিনি অঙ্গ-প্রতঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুখাপেক্ষীহীন। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না।
  • ৩৯। মি’রাজ সত্য, মুহাম্মদকে নৈশকালে ভ্রমণ করান হয়েছিল, তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে উর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো উর্ধ্বে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন। তার অন্তর যা দেখেছিল তা মিথ্যা নয়। আল্লাহপাক তাঁর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রহমত বর্ষন করুন।
  • ৪০। হাউয-এ কাওসার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানিত করেছেন এবং যা তাঁর উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে তাঁকে দান করেছেন। এ বিষয়টি সত্য।
  • ৪১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত, যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন তা সত্য ।
  • ৪২। “মীসাক” (অঙ্গীকার), যা আল্লাহ তাআলা আদম এবং তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তা সত্য।
  • ৪৩। অনাদিকাল হতে আল্লাহপাক সার্বিকভাবে জানেন যে, কত লোক জান্নাতে যাবে আর কত লোক জাহান্নামে যাবে। এতে ব্যতিক্রম হবে না। এদের সংখ্যা কমও হবে না, বেশীও হবে না।
  • ৪৪। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত এবং যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ সাধ্য। শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগ্য সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় হতভাগ্য বলে নির্ধারিত হয়েছে।
  • ৪৫। “তাকদীর” সম্পর্কে আসল কথা এই যে, এটা বান্দা সম্পর্কে আল্লাহর একটি রহস্য। এ রহস্য তাঁর নিকটবর্তী কোন ফেরেশ্‌তাও জানেন না অথবা তাঁর কোন প্রেরিত নবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে তথ্য আবিস্কার করতে যাওয়া অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ধৃষ্টতার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমা লংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা ‘তাকদীর’ সম্পর্কিত জ্ঞান সৃষ্ট বস্তু হতে গোপন রেখেছেন এবং এর উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা (তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে) জিজ্ঞাসিত হবে”। (সুরা আম্বীয়া ২১- ২৩ আয়াত) অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে “তিনি কেন এ কাজ করলেন?” সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হল।
  • ৪৬। আল্লাহর নূরে জ্যোতিদীপ্ত অলী আওলিয়াগনও উক্ত বিষয় (অর্থাৎ তক্বদীরকে অনুরূপভাবে মেনে নেয়ায়) থেকে মুক্ত নন। এতদ্বারা জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞা বিভূষিত ব্যক্তিদের মর্যাদাই প্রতিষ্ঠিত হয়। (এ প্রসঙ্গে) উল্লেখ্য যে, জ্ঞান দু’প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট অবিদ্যমান। বিদ্যমানকে অস্বীকারকরাও যেমন কুফরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফরী। বিদ্যমান জ্ঞানের সাধনা করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের আন্বেষান করা হতে বিরত থাকাই সুদৃঢ় ঈমানের পরিচয়।
  • ৪৭। লাওহে মাহফুয এবং তাতে যা কিছু লিখিত হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি। আমরা আরও বিশ্বাস করি কলমের প্রতি। যা হবে বলে আল্লাহ লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা হবেই। সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তার কিছু রোধ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। যা প্রলয় দিবস পর্যন্ত ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে এবং কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার ভাগ্যে লিখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না এবং যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা হবেই হবে।
  • ৪৮। বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলি সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত রয়েছেন। অতএব, তিনি তাকে তাদের জন্য অকাট্য ও অবিচল ভাগ্য হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। এটাকে কেউ বানচাল করতে পারবে না, অথবা এর বিরোধিতাও করতে পারবে না, একে কেউ অপসারিত অথবা পরিবর্তিতও করতে পারবে না। আসমান ও যমীনের কোন মাখলুক একে সংকুচিত কিংবা বর্ধিত করতে পারবে না। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তাআলার ওয়াহদানিয়াত ও রবুবিয়ত সম্পর্কে স্বিকৃতী দান। যেমন আল্লাহ বারী তাআলা তাঁর গ্রন্থে ঘোষণা করেছেনঃ “তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫- ৩ আয়াত)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেনঃ

“আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত।” (সূরা আহযাব ৩৮ আয়াত)।

অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগগ্রস্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হবে।