সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [৩]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের অন্তুর্ভুক্ত কয়েকটি বিষয়

আল্লাহর পথে প্রীতি-ভালবাসা, বিদ্বেষ, বন্ধুত্ব এবং শক্রতা পোষণ করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্ন্তগত। সূতরাং মু‘মিন ব্যক্তি অপর মু’মিনদের ভালবাসবে এবং তাদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবে। পক্ষান্তরে, সে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে এবং তাদের সাথে বৈরীতা বজায় রাখবে। মুসলিম উম্মাহর মু’মিনদের শীর্ষস্থানে রয়েছেন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। তাই, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তাদের প্রতি সম্প্রীতি ও গভীর ভালবাসা পোষণ করে।। আর একথাও বিশ্বাস করে যে, এরাই নবীকুলের পর সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«خَيْرُ النّاس قَرْنِي ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ»

“সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী আমরা যুগের লোকেরা, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তারপর এদের পরবর্তীগণ’। (অত্র হাদীসের বিশুদ্ধতার উপর বুখারী ও মুসলিম একমত)

তারা আরো বিশ্বাস করেন যে, এই সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আবু বকর সিদ্দীক হলেন সর্বোত্তম, তারপর উমর ফারুক, তারপর উসমান জুন্‌নুরাইন, তারপর আলী মুরতাজা (তাদরে সবার উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক)। তাঁদের পর হলেন বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত অপর সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তারপর আরো বাকী সব সাহাবীগণের স্থান (আল্লহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন)। আহলেসুন্নাত ওয়াল জামায়াত সাহাবীদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ-বিসংবাদ সম্পর্কে কোনরূপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা মনে করেন যে, সাহাবীগণ ঐ সব ব্যাপারে মুজতাহিদ ছিলেন। যাদের ইজতেহাদ সঠিক ছিল তাঁরা এক গুণ সাওয়াবের অধিকারী। তাঁরা রাসূলুল্লার প্রতি, বিশ্বাসী তাঁর বংশধরদের ভারবাসেন এবং তাঁদের প্রতি ভক্তি প্রদর্শণ করেন। তাঁরা মুমিনগণের মাতৃকুল রাসূলুল্লাহর সহধর্মিনীদের ভক্তি করেন এবং তাঁদের সকলের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন।

এভাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা নিজেদেরকে রাফেজীদের নীতি থেকে মুক্ত রাখেন। রাফেজীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগনের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে এবং তাঁদের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শণ করে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত স্থানের আরো উপরে মর্যাদা প্রাদন করে।

আহলে সুন্নাত ওয়ার জামা‘আত ঐ সব ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের নীতি থেকেও নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন, যারা কোন কোন কোথাও কাজের দ্বারা আহলে বাইতকে যন্ত্রণা প্রদান করে। আমি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা উল্লেখ করেছি,সেসব সেই বিশুদ্ধ আকীদা বা ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত যা দিয়ে আল্লাহ ত‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। এটিই নাজাত প্রাপ্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ধর্মবিশ্বাস, যাদের সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:

«لاَ تَزَالْ طَائِفَةُ مِنْ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ مَنْصُوْرةَ لاَ يَضُرُّهُمْ مِنْ خَذَلَّهُمْ حَتَّى يَأتِيْ أَمْرُ اللهِ سُبْحَانَهُ»

“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকবে। কারো অপমান, অত্যাচার তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা, যতক্ষণ না আল্লাহ পাকের নির্দেশ (কিয়ামত) সমুপস্থিত হবে’।

তিনি আরো বলেন:

«إفْتَرَتِ الْيَهُوْدَُ عَلَى إحْدِى وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً وَ افْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى إِثْنَتَيْنَ فِرْقَةً, وَسَتَفْرِقُ هَذِهِ لأُمَّةُ عَلَى ثَلاَثَ وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً , كُلُّهَا فِيْ النَّارِ إلاَّ وَاحِدَةً »

‘ইয়াহুদী সম্প্রদায় একাত্তর দলে বিভক্ত হলো এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বাহাত্তর দলে বিভক্ত হলো, আর আমার এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। তম্মধ্যে একটি বাদে সবক’টি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন সাহাবীগন বলে উঠলেন: হে আল্লাহর রাসূল, সে দলটি কেমন হবে? উত্তরে তিনি বললেন:

« منْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَ أَصْحَابِيْ »

‘যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের অনুসৃত নীতির উপর চলবে’।

এই নীতিই সেই আকীদা বা ধর্ম বিশ্বাসের নামন্তর যার উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা এবং তারা পরিপন্থী বিষয় হতে সতর্ক থাকা সকলের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য। আর যারা এই আকীদা হতে পথভ্রষ্ট এবং এর বিপরীত পথে পরিচালিত, তারা কয়েক প্রকারে বিভক্ত। যথা; মূর্তিপুজক, প্রতিমাপুজক, ফেরেশতা, আউলিয়া, জ্বিন, বৃক্ষ, প্রস্তর ইত্যাদির ইবাদতকারীগণ। এসব লোক আল্লাহর রাসূলদের আহ্‌বানে সাড়া না দিয়ে তাঁদের বিরোধিতা ও শক্রতা করেছে। যেমনটা করেছে কুরাইশ ও বিভিন্ন আরব গোত্র আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে। তারা তাদের মা‘বুদদের কাছে স্বীয় অভাব পূরণের, রোগমুক্তি ও শক্রর উপর বিজয় লাভের জন্য প্রার্থণা জানাতো এবং এই মা‘বুদদেরই উদ্দেশ্যে জবাই ও মানত নিবেদন করতো। ফলে, যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তাদেরকে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে খলেছভাবে ইবাদত করার আহ্‌বান জানালেন, তখনই তারা এই আহ্‌বানকে অস্বাভাবিক মনে করে এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগলো এবং বলতে লাগলো:

﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ﴾ [ص: 5]

“সে কি বহু মা‘বুদদের পরিবর্তে মাত্র এক মা‘বুদ বানিয়ে নিল? এতো এক নিশ্চিত অদ্ভূত ব্যাপার”। (সূরা ছাদ: ৫)

অনন্তর, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ডাকতে থাকেন এবং শিরক থেকে ভীতি প্রদর্শণ ও তাদের কাছে স্বীয় আহবানের হাকীকত বিশ্লেষণে আত্ননিয়োগ করেন। যার ফলে আল্লাহপাক প্রথম দিকে তাদের কিছুসংখ্যক লোককে হেদায়াত দান করেন এবং পরে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে পবেশ করে। এইভাবে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবাণ অনুসারী তাবেইনদের ধারাবহিক প্রচার ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর আল্লাহুর দ্বীন অন্যান্য সমুদয় ভ্রান্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী বেশে আত্মপ্রকাশ করলো।

  • পরবর্তী কালের মুশরিক সম্প্রদায়

সময়ের ব্যবধানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং অধিকাংশ লোক অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হলো। সংখ্যাগুরু জনগণ আম্বিয়া-আওলিয়াগণের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং বিপদ-আপদে তাদের নিকট প্রার্থণাসহ অন্যান্য শিরকের মাধ্যমে ইসলাম পূর্ব অন্ধকার যুগে ফিরে গেল। তারা কালেমা ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু’র প্রকৃত অর্থ এতটুকু অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল, যতটুকু আরবের কাফেররা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আল্লাহ সকলকে সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। অজ্ঞতার সয়লাবে তথা নবুওয়াতের যুগ হতে দুরত্বের ফলে বর্তমান কাল পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে উক্ত শিরক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান কালে মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা হুবহু পূর্ববর্তী মুশরিকদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। তারা বলতো:

﴿هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ﴾ [يونس: 18]

“তারা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশকারী”। (সূরা ইউনুস-১৮)

তাদের একথাও ছিল;

﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ﴾ [الزمر:3]

“আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহ তা‘আলা এ ভ্রান্তির অপনোদন করে স্পষ্ট বলে দিলেন যে, আল্লাহ ভিন্ন কারো ইবাদত করা সে যে কেউ হোক না কেন আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফরী করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ …﴾

“তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপরকারও করতে পারে না। তদুপরি তারা বলে যে, এগুলি আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী”।

আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন:

﴿… قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾ [يونس: 18]

“(হে রাসূল) তাদেরকে বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? তিনি পুত-পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি বহু উর্ধ্বে”। (সূরা ইউনুস: ১৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি ভিন্ন কোন ওলী, পয়গাম্বর বা অন্য কারো ইবাদত করা মহাশিরক, যদিওবা শিরককারীরা এর অন্য নাম দিয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ …﴾

“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে: “আমরাতো এগুলির ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”। (সূরা যুমার-৩)

আল্লাহপাক তাদের উত্তরে বলেন:

﴿… إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾ [الزمر: 3]

“তারা যে বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে এর ফায়সালা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না যে জঘন্য মিথ্যুক, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী”। (সূরা যুমার : ৩)

উপরোক্তবাণীর মাধ্যমে আল্লাহপাক একথাটি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন যে, দু‘আ, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ আল্লাহপাকের সাথে কুফরী করা এবং তাদের মা‘বুদগণ তাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে, এ কথাটি তাদের একটি জঘন্যতম মিথ্যা বৈ কছিুই নয়।

  • সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের পরিপন্থী কতিপয় মতবাদ

বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী ও আল্লাহর রাসূলগণ (তাঁদের উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক) কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী একটি মতবাদ হলো বর্তমান কালে নাস্তিকতা ও কুফরীর ধ্বজ্জাবাহী মার্কস-লেলিন প্রমুখ পন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ। তারা একে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম বা অন্য যে, নাস্তিকদের মূলমন্ত্র হলো, ‘মা‘বুদ বা উপাস্য বলতে কেউ নেই এবং এই পার্থিব জীবন এবটি বস্তুগত ব্যাপার মাত্র’। পরকাল, বেহেশ্‌ত, দোযখ এবং সমস্ত ধর্মের প্রতি অস্বীকৃতি তাদের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বই-পুস্তক পর্যালোচনা করলে একথা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করা যায়। নিঃসন্দেহে এটা সমস্ত ঐশী ধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এক মতবাদ, যা দুনিয়া ও আখেরাতে এর অনুসারীদের এক চরম অশুভ পরিণতির দিকে পরিচালিত করছে।

  • সত্যের পরিপন্থী আরেকটি মতবাদ হলো:

কোন কোন বাতেনী ও সূফী সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, তথাকথিত আওলীয়ারা এ সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহর সাথে শরীক থাকে। তারা তাদেরকে কুতুব (পীর-দরবেশ), আওতাদ (নির্ভরযোগ্য খুঁটিস্বরূপ), গাওস (ফরিয়াদ শ্রবণকারী) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। তারাই স্বীয় মা‘বুদদের জন্যে এসব নাম উদ্ভাবন করেছে। আল্লাহর প্রভূত্বে এটি একটি জঘণ্যতম শিরক। ইহা ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের শিরক থেকেও জঘণ্য। কেননা, আরবের কাফেরগণ আল্লাহর প্রভূত্বে শিরক করেনি, তাদের শিরক ছিল ইবাদতে এবং তাও ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দের অবস্থায়। দুর্যোগ অবস্থায় তারা ইবাদত আল্লাহর জন্যেই খালেছ করে নিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ﴾ [العنكبوت:65]

“যখন তারা জলযানে আরোহন করে তখন বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ কে ডাকে। তারপর যখন আল্লাহ তাদেরকে স্থলে ভিড়ায়ে উদ্ধার করেন, তখন তারা শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়”। (সূরা আনকাবুত ৬৫)

প্রভূত্বের প্রশ্নে তারা স্বীকার করতো যে, ইহা একমাত্র আল্লাহরই অধিকার। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ﴾ [الزخرف:87]

“আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ”। (সূরা যুখ্‌রুখ: ৮৭)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ [يونس:31]

“বল, আকাশ ও পৃথিবী হতে কে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কার কর্তৃত্বাধীন এবং কে জীবিতকে মৃত হতে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত হতে নির্গত করে? আর কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, ‘ আল্লাহ’। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবেনা”? (সূরা ইউনুস: ৩১)

  • পরবতীর্কালের মুশরিকরা আরো দুটি বিষয়ে অগ্রগামী রয়েছে:
  • [এক] তাদের কেউ কেউ আল্লাহ্‌র প্রভূত্বে শিরক করে।
  • [দুই] সুর্দিনে উভয় অবস্থায়ও তারা শিরক করে। একথা কেবল ঐসব লোকেরাই ভাল করে জানতে পারবে যারা তাদের সাথে মিশে স্বচক্ষে তাদের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ লাভ করবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঐসব ক্রিয়া কলাপ অবলোকন করবে যা মিশরস্থ হুসাইন, বাদাভী গংদের কবরে, ইডেনস্থ ইঁদরূসের কবরে, ইয়েমেনে আল হাদীর কবরে, সিরিয়ায় ইবনে আরাবীর কবরে, ইরাকে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর কবরসহ বিভিন্ন প্রসিদ্ধ সমাধি ক্ষেত্রের আশেপাশে দৈনন্দিন ঘটে চলছে।

সাধারণ লোকেরা মৃতের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করছে এবং সেখানে আল্লাহ পাকের বহু অধিকার খর্ব করছে। কিন্তু অতি অল্প লোকই তাদের এসব অপকীর্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রকৃত তাওহীদের বাণী তাদের কাছে উপস্থাপিত করার সাহাস করছে। অথচ এই তাওহীদের বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যেই আল্লাহপাক তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে (তাদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) প্রেরণ করেছেন। আর আমাদেরকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে:

﴿إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ﴾ [البقرة:156]

“আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই পানে আমরা প্রত্যাবর্তনকারী”। (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৬)

আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ঐসব লোককে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদের মধ্যে সৎপথে আহবানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। আর, মুসলিম শাসকবৃন্দ ও উলাময়ে কেরামকে শিরকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এর যাবতীয় উপকরণ নির্মুল সাধনের তৌফিক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, অতি সন্নিকটে।

আল্লাহপাকের নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী আরও কয়েকটি আকীদা হলো জাহ্‌মিয়্যাহ, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুসারী বিদআ‘তপন্থীদের মতবাদসমূহ। এরা মহামহিম আল্লাহপাকের প্রকৃত গুনাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁকে সম্পূর্ণ ও নিখুত গুনাবলী থেকে বিমুক্ত বলে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে, তারা আল্লাহকে অস্তিত্বহীনতা, জড়তা ও অসম্ভাব্য গুণে বিশেষিত করার প্রয়াস পায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাক তাদের এসব অপবাদ হতে বহু উর্ধ্বে।

এতদ্ব্যতীত, যারা আল্লাহপাকের কেন কোন গুণ প্রতিষ্ঠিত করে এবং অপর কোন কোন গুণ অস্বীকার করে তারাও উপরোক্ত ভ্রান্ত মতবাদিদের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ স্বরূপ আশাআ’রী পন্থীদের নাম উল্লেখ করা য়ায়। কেননা, কিছুসংখ্যক গুণের স্বীকৃতির মধ্যেই তাদরে পক্ষে ঐসব গুণাবলীর অনুরূপ অর্থ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে. যেগুলো তারা সরাসরি উপেক্ষা করত: তারা প্রমানাদির অপব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে তারা শ্রুত ও প্রমাণ্য উভয় প্রকার দলীলগুলোর বিরোধিতা এবং পরস্পর বিরোধী বিশ্বাসাসের ঘুর্ণিপাকে নিপতিত হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত আল্লাহ্‌র ঐসব পবিত্র নাম ও নিখুঁত গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত করে যেগুলি নিজের জন্য তিনি স্বয়ং বা তাঁর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁরা আল্লাহপাককে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে এমনভাবে পুত পবিত্র রাখেন যাতে তা‘তীল বা গুণ বিমুক্তির কোন লেশ থাকে না। এভাবে তারা এ সম্পর্কে সমুদয় প্রমাণাদির উপর আমল করতে সক্ষম হয় এবং কোনরূপ বিকৃতি বা তা‘লীল না করে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাস থেকে নিরাপদ থাকে। এই বিশ্বাসই দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের একমাত্র পূর্ববর্তী মুসলিম উম্মত ও তাদের ইমামবর্গ।

একথা অতীব সত্য যে, পরবর্তী লোকগণ কেবল সে পথেই পরিশুদ্ধ হতে পারে, যে পথে তাদের পুর্ববর্তীরা পরিশুদ্ধ হয়ে গেছেন। আর সে পথটি হলো: ‘কুরআন ও সুন্নাতের সঠিক অনুসরণ এবং এতদুভয়ের পরিপন্থী বিষয়সমূহ বর্জন করে চলা।’

আল্লাহই আমাদের তৌফিকদাতা, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং পরমোত্তম প্রভূ। তিনি ব্যতীত কারো কোন শক্তি সামর্থ নেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাহ ও রাসূল মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীদের উপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।