স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

স্বলাত ত্যাগকারীর বিধান

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর এবং তারঁ পরিবার পরিজন ও সংগী সাথীদের উপর। অতঃপর ধর্মপ্রান মুসলমান ভাইদের প্রতি এই ছোট লিফলেটখানা পেশ করা হল- যাতে সাঊদী আরবের উচ্চ পরিষদের মাননীয় সভাপতি শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীনের নিকতে এক বেনামাজী পরিবার সম্পর্কে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এবং সে প্রশ্নের উত্তর নিচে দেয়া হল।

প্রশ্নঃ একজন ব্যাক্তি যখন তার পরিবারের লোক-জনকে স্বলাতের নির্দেশ দিল, তখন তাদের কেউই তার নির্দেশ মানল না অর্থাৎ স্বলাত পড়ল না। এমতবস্থায় ঐ ব্যাক্তি তার পরিবারের লোকজনের সাথে কি বসবাস করবে? এবং তাদের সাথে মিলেমিশে থাকবে? না সে নিজে পরিবার ছেড়ে, বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবে?

উত্তরঃ যদি ঐ পরিবারের লোকজন কখোনই স্বলাত না পড়ে তাহলে তার সবাই কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে, ফলে ইসলামের গন্ডি থেকে তার বের হয়ে যাবে। কাজেই এ ব্যাক্তির পক্ষ তার পরিবারের সাথে বসবাস করা জায়েজ হবে না।তবে এ ব্যাক্তির উপর এটাই ওয়াজিব হবে যে, তিনি বারবার তাদেরকে স্বলাত পড়ার, কল্যানের পথে আসার জন্য নির্দেশ দিবেন। যাতে করে আল্লাহ তা’আলা তাদের হিদায়াত করেন।

স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফের (এই বড় পাপের কাজ হতে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)আমিন। যা কুর’আন ও হাদিস এর দলীল দ্বারা প্রমাণিত, তাছাড়া সাহাবায়ে কিরামদের কথা এবং সুস্থ বিবেক দ্বারাও প্রমাণিত।

কুর’আন থেকে দালীলঃ

মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٩:١١]

অর্থঃ অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। (তাওবাঃ ১১)

আয়াতের মর্মাথ হলোঃ ঐ সমস্ত মুশরিকরা যতক্ষন পর্যন্ত উল্লেখিত কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করবে ততক্ষন পর্যন্ত তারা মুসলমানদের ভাই হিসাবে গন্য হবে না। এ ছাড়া স্বলাত পরিত্যাগ করা এটা এত বড় পাপ কাজ- যার ফলে ধর্মীয় বন্ধনে কোন কাজে আসবে না।

হাদিস থেকে দালীলঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, “একজন মু’মিন বান্দা এবং কুফর ও শিরক এর মাঝে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা অর্থাৎ, যারা স্বলাত পড়েন তারা ঈমানদার আর যারা স্বলাত পোরে না তারা কাফির ও মুশরিক।” (মুসলিম)

রসুল (সঃ) আরো বলেছেন, “আমাদের মাঝে ও ঐসব মুনাফিক ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী বস্তু হল স্বলাত। অতএব, যে স্বলাত পরিত্যাগ করল, সে আল্লাহর সাথে কুফুরী করল।” (তিরমীজি, আবু দাউদ, নাসায়ী,ও ইবনে মাজাহ)

 

সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) মুখনিঃসৃত বানী হতে দালীলঃ

আমীরুল মু’মীনিন উমার ফারুক(রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যাক্তি স্বলাত পরিত্যাগ করল, তার জন্য ইসলাম ধর্মে সামান্য পরিমান কোন অংশ বা অধিকার নেই।”

আব্দুল্লাহ বিন শাক্বীক(রাঃ) বলেনঃ “নাবী(সঃ) এর সাহাবীরা একমাত্র স্বলাত পরিত্যাগ করা ছাড়া ইসলামী অন্য কোন কাজ পরিত্যাগ করলে যে মানুষ কাফির হয় এটা তারা জানতান না। ”

সুস্থ বিবেকের দ্বারা দালীলঃ

সুস্থ বিবেক কি এটাই সমর্থন করবে- যে একজন মানুষ যার অন্তরে সরিষা পরিমান ঈমান আছে, আর যিনি স্বলাত এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ব্য সম্পর্কে এবং ঐ স্বলাতের মাধ্যমে যে আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভ করা যায় এ সমস্ত বিষয়ে যিনি অবগত আছেন। এর পরেও যদি তিনি একাধারে স্বলাত পরিত্যাগকারী করেই চলবেন? এটা কোন রকমেই সম্ভব নয়।

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উছাইমীন বলেছেনঃ “ স্বলাত পরিত্যাগকারীর বাক্তি কাফির নয় এ মর্মে যে সমস্ত ভায়েরা যে সমস্ত দালিল পেশ করেন, সে সমস্ত দালিলগুলি আমি খুব চিন্তা-ভাবনা করে ও গবেষনা করে দেখেছি যে ঐ সব দালীলগুলি নিম্ন চারটি অবস্থার সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত”

  • ১. ঐ সমস্ত দালীল হয়ত প্রকৃতপক্ষে বেনামাজী ব্যাক্তি কাফির কি না এ বিষয়ে দালীল নয়।
  • ২. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলিকে এমন গুণের সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে গুণের সাথে ঐ দালিলগুলি স্বলাত পরিত্যাগক করাকে অস্বীকার করে।
  • ৩. অথবা ঐ সমস্ত দালীলগুলি সাধারন এম্ন অবস্থার সাথে শর্ত লাগানো হয়েছে, যে অবস্থার ভিতরে এই স্বলাত পরিত্যাগ করাকে ক্ষমার চোখে দেখা হয়েছে।
  • ৪. অথবা ঐ সমস্ত দালিলগুলি সাধারন বা অনির্দিষ্ট। অতঃপর “স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির”। এ সমস্ত হাদিসের দ্বারা উক্ত দালীলগুলোকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। “স্বালাতের পরিত্যাগকারীর ব্যাক্তি কাফির” অনেকেই এ হাদিসের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, “স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির” অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিয়া’মাতকে আস্বীকার করেছে, কাজেই সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না।

এখানে আমাদের কথা হল- হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয় যে, স্বালাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফির। এছাড়া কুর’আন ও হাদিসের কোথাও এমন কথা বলা নেই যে বেনামাযী ব্যাক্তি মু’মিন বা সে জান্নাতে প্রবেশ করবে অথবা সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তাহলে আমরা কোন দালীলের ভিত্তিতে অন্যান্যদের মত (স্বলাত পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফের নয়য় বরং সে আল্লাহর নি’আমাত অস্বীকারকারী) এই ব্যাখ্যার প্রতি ধাবিত হব। অতএব, উপরে উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা এটা প্রমাণিত হল যে, নিশ্চয়ই স্বলাত পরিত্যাগকারী কাফির তাহলে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির উপর মুরতাদের বিধানসমুহ প্রয়োগ করা যাবে।

স্বালাত পরিত্যাগকারী মুর্তাদের বিধানসমুহঃ

ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির স্তাহে কোন মহিলার বিবাহ ঠিক হবে না, কেননা ঐ ব্যাক্তিকে যাওদি বিবাহ করিয়ে দেয়া হয় আর এওমতবস্থায় সে যদি স্বলাত না পড়ে তাহলে ঐ বিবাহ বাতিল হয়ে যাএব, ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না। কেননা, মুহাজির মহিলাদের সম্পর্কে আল্লহা তা’আলা বলেনঃ

فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ

অর্থঃ যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। (সুরা মুমতাহিনাঃ ১০)

২। একজন মুসলমান ব্যাক্তি তাকে (মুসলিম রমনীর সাথে) বিবাহ করিয়ে দেয়ার পরে যদি সে স্বালাত একেবারেই ছেড়ে দেয়, তাহলে তার বিবাহ ভেঙ্গে যাবে। ফলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না, উপরে বর্নিত আয়াতের বিধান অনুযায়ী।

৩। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি যদি কোন জানোয়ার জবেহ করে, তাহলে ঐ জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া যাবে না। কেননা উহা হারাম। তবে জানোয়ার বেনামাযী মুসলমান জ্জবেহ না করে যদি কোন ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহ করে তাহলে তাদের জবেহকৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া আমাদের জন্য হালাল হবে। (স্বলাত ত্যাগ করার মত এতবড় পাপকাজ হতে আল্লাহ আমাদের হেফাযাত করুন।) কেননা একজন বেনামাযী মুসলমানের জবেহকৃত জানোয়ারের ইয়াহুদী বা খৃষ্টান জবেহকৃত জানোয়ারের এর চেয়েও নিকৃষ্ট।

৪। আর ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির জন্য মক্কা শরীফে এবং মদীনায় নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রবেশ করা বোইধ নয়। কেননা আল্লাহ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। (সুরা তাওবাঃ ২৮)

৫। যদি সে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির কোন নিকটাত্মীয় মারা যায় তাহলে ঐ মৃত ব্যাক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বা মিরাছে তার কোন হক থাকবে না। এমনি ভাবে যদি কোন মুসলিম স্বলাতী ব্যাক্তি একদিকে তার বেনামাযী ছেলেকে অপরদিকে তার স্বলাতী চাচাত ভাইকে রেখে মারা যায়- তাহলে সম্পর্কের দিন থেকে অতি নিকটে হওয়া সত্ত্বেও বেনামাযী হওয়ার কারনে তার ছেলে মিরাছ পাবে না। আর সম্পর্কের দিক দিয়ে দুরবর্তী হওয়া সত্ত্বেও স্বলাতী হওয়ার কারনে তার চাচাতো ভাই তার মিরাছ পাবে। কেননা উসামা(রাঃ) বলেছেন, “রসুল(সঃ) বলেন, ‘কোন মুসলিম কোন কাফিরের পরিত্যাক্ত সম্পদ হতে কোন অংশ পাবে না । এমনিভাবে কোন কাফির ব্যাক্তি কোন মুসলিমের পরিত্যাক্ত সম্পদের থেকে কোন অংশ পাবে না’”

রসুল(সঃ) বলেছেন, “তোমরা মৃত ব্যাক্তির পরিত্যাক্ত সম্পদকে যথাযথভাবে তার প্রাপ্যদেরকে পৌছে দাও। প্রাপ্যদারদের হক পৌছিয়ে দেয়ার পর যা অতিরিক্ত থাকবে তা আছাবা হিসেবে শুধু পুরুষদের জন্য নির্ধারিত।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬। ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করলে তাকে গোছল করানো এবং কাফন পরানো এবং তার জানাযার স্বলাত পড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। এমনিভাবে তাকে মুসলিমদের কবস্থানে কবর দেয়া ঠিক হবে না। বরং ঐ বেনামাযীর লাশকে গোসল না দিয়ে, কাফন না পড়িয়ে তার পরনের কাপড় সহ মাঠে ময়দানের কোন সুবিধামত জাগায় গর্ত করে তাকে মাটি চাপা দিতে হবে। কেননা ইসলামী শরীয়াতে কোন বেনামাযীর জন্য এবং বেনামাযীর লাশের জন্য সম্মান বলতে কিছুই নেই। আর এ জন্যই কোন একজন মুসলিমের সামনে যদি অন্য কোন বেনামাযী ব্যাক্তি মৃত্যুবরন করে তাহলে বেনামাযীর জানাজা স্বলাতের জন্য অন্য কোন মুসলিমদের আহবান জানানো ঐ মুসলিমের জন্য বৈধ হবে না।

৭। কিয়ামাতের দিন ঐ বেনামাযী ব্যাক্তিকে কাফেরদের বড় বড় নেতা যেমন, ফিরাউন, হামান, ক্বারুন এবং উবাই বিন খালফদের সাথে একত্রিত করা হবে। (এই জঘন্য পরিনতি হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি) এছাড়া ঐ বেনামাযী ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ ব্যাক্তির পরিবার-পরিজনদের মধ্য থেকে কারো পক্ষে ঐ বেনামাযী ব্যাক্তির প্রতি রহমতের জন্য এবং তার ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করা হালাল নয়। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ

অর্থঃ নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্নীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা দোযখী। (সুরা তাওবাঃ ১১৩)

প্রিয় পাঠক ভায়েরা! এই স্বলাত পরিত্যাগ করা বিষয়টা বড়ই বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও বড় দুঃখের বিষয় এই যে, বহু মুসলিম ভাইয়েরা এই স্বলাত ত্যাগ করা এত বড় পাপকাজকে তুচ্ছ মনে করে। এ ব্যাপারে তাদের যেন কোন অনুভুতি নেই। আর এ জন্যই তারা যে কন বেনামাযীকে নিজ বাড়িতে দ্বীধাহীন চিত্তে অবস্থান করার সুযোগ দিয়ে থাকে। উল্লেখিত সব কাজ নাজায়েয।

স্বলাত পরিত্যাগকারী পুরুষ বা মহিলা যেই হোকনা কেন- এটাই স্বলাত পরিত্যাগকরার ইসলামী বিধান। কাজেই ওহে স্বলাত পরিত্যাগকারী! অথবা যথাযথভাবে স্বলাত পড়ার ব্যাপারে অলসতাকারী!, তুমি সাবধান হও, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার বাকি জীবনটাকে পুন্যময় কাজের দ্বারা পুর্ন করার চেষ্টা কর। কেননা তুমি জানো না তোমার মৃত্যু ঘন্টা বাজতে, তোমার জীবন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, তোমার মৃত্যু সংঘটিত হতে আর কত বছর বা কত ঘন্টা বাকি আছে? তোমার মৃত্যুর সংবাদ এর সময় কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন, অন্য কারো জানা নেই। অতএব, তুমি সর্বদা নিম্ন লিখিত আল্লাহর বানী স্মরন করঃ

إِنَّهُ مَن يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ [٢٠:٧٤

অর্থঃ নিশ্চয়ই যে তার রবের কাছে অপরাধী হয়ে আসে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে সে মরবে না এবং বাঁচবেও না। (সুরা ত্বহাঃ ৭৪)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেনঃ

.فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَىٰ.وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا.فَأَمَّا مَن طَغَىٰ

অর্থঃ তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে, এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (সুরা নাযি’আতঃ ৩৭-৩৯)

পরিশেষে হে পাঠকমন্ডলী! আল্লাহ আপনাদের প্রত্যেককেই প্রতিটি ভালো কাজ করার পুর্ন তাওফীক দান করুন। এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলা আপনাদের তারঁ বিধান মুতাবিক জ্ঞান অর্জনের, আমল করার এবং আল্লাহর পথে মানুষদের আহবান জানানোর পুর্ন তাওফীক দান করুন এবং সেই সাথে আপনাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে সৌভাগ্যময় ও আনন্দময় করে গড়ে তুলুন। আমিন

সর্ব বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত নাযিল করুন। আমিন।

[ফযীলাতুশ শায়খ, মুহাম্মাদ বিন সালিহ বিন উছাইমীন (রহঃ)[

 

এক বেনামাযী মৃত ছেলের জন্য তার মায়ের ফাতওয়া তলব

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর যে নাবীর পর আর কোন নাবী আসবে না। অতঃপর এক মহিলা তার এক বেনামাযী ছেলের সম্পর্কে তদানিন্তন সাউদী আরবের প্রধান মুফতি শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বায(রহঃ) এর নিকট ফাতওয়া তলব করেন। পরে শাইখ বিন বায ঐ ফাতওয়া সাউদী আরবের “উচ্চ উলামা” পরিষদের নিকট হস্তান্তর করেন। এরপর ১৪/১/১৪১৯ হিজরী সনে (৪১৫) নম্বরে উচ্চ উলামা পরিষদের উক্ত ফাতওয়াকে সাউদী আরবের সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনার স্থায়ী কমিটির নিকট পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর ঐ কমিটি উলত ফাতওয়ার যে সমাধান দিয়েছিল সেটাই নিচে উল্লেখ করা হলঃ

ঐ মহিলার প্রশ্নঃ

১৭ বছর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল, কিন্তু সে দুর্ভাগ্যবশত আজ থেকে ২ মাস পুর্বে হঠাৎ গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়। ছেলেটি স্বলাত পড়ত না এবং রামাদানে সিয়াল পালন করত না। তবে আমার জানা মতে এ দুটি পাপ ছাড়া আর কোন পাপ তার দ্বারা সংঘটিত হয় নাই। এমতবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ থেকে তার রমাদানের সিয়ামগুলো পুর্ন করা, তার মাতা হিসেবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়জ হবে কি?এমনিভাবে ঐ ছেলের পক্ষ থেকে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিনের সিয়াম, সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এসমস্ত লফল সিয়াম যদি রাখা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে? এমনিভাবে আমি যদি তার পক্ষ থেকে যোহর স্বলাতের প্রথম চার রাকা’আত,যোহর স্বলাতের পরে দুই রাক’আত এবং আছর, মাগরিব ও এশা ও ফজর স্বলাতের পুর্বে দুই দুই রাক’আত করে স্বলাত পড়ি তাহলে কি এ সমস্ত সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?

ফাতওয়া কমিটি গবেষনার পর যে জবাব দিয়েছিলঃ
যে বাক্তি কোন সিয়াম না রেখে এবং বেনামাযী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসেবে গন্য করা যাবে না। কেননা যে বঅ্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বলাত ত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসংগে মুহাম্মাদ(সঃ) বলেনঃ

“একজন মু’মিন বান্দা ও কাফির ও মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্য হল স্বলাত পরিত্যাগ করা।” অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা স্বলাত পড়ে আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা স্বলাত পড়ে না। অতএব যারা বেনামাযী অবস্থায় জীবন কাটালো এরপর তারা মৃত্যুর আগে আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা। এধরনের ব্যাক্তিদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু’আ করা জায়েজ হবে না। অতএব ঐ ছেলের মা তার ছেলের জন্য মাগফিরাতের যতই দু’আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবে না। কেননা স্বলাত এমন একটি ইবাদাত যা অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করার কোন প্রমান ইসলামী শরীয়াতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল ভালো কাজের তাওফীকদাতা।

পরিশেষে আমাদের নাবী মুহাম্মাদ(সঃ) এর প্রতি, তার পরিবার-পরিজন্দের প্রতি এবং তার সমস্ত সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ রহমত ও শান্তি বর্ষন করুন। আমিন।

 

পক্ষেঃ

ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষনা স্থায়ী কমিটি

১. সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)

২. সহ-সভাপতিঃ শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ আলুশ-শাইখ

৩. সদস্যঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-গুদাইয়ান

৪. সদস্যঃ বাকারা বিন আব্দুল্লাহ আবু যাইদ

৫. সদস্যঃ সালিহ- বিন ফাওযান আল-ফাওযান

 

নির্ধারিত সময় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ার বিধান

একমাত্র শারয়ী ওযর এবং বিশেষ কোন অসুবিধা ছাড়া দেরী করে স্বলাত পড়া হারাম ও নাজায়েজ। কেননা স্বলাত আদায় করার জন্য আল্লাহ তা’আলা সময় নির্ধারন করে দিয়েছেন, সেহেতু যথা সময়ে স্বলাত আদায় করা ওয়াজিব। অতএব, যদি কেউ কোন ওযর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতা করে স্বলাতের নির্ধারিত সময় চলে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করে তাহলে তার স্বলাত বাতিল হবে ফলে ঐ স্বলাত আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এ প্রসংগে আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

অর্থঃ নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। (সুরা আন-নিসাঃ ১০৩)

অতএব যথা সময়ে স্বলাত আদায় না করার কারনে বান্দার স্বলাত যখন নষ্ট হয়ে যাবে, তখন এর কারনে ঐ স্বলাতী ব্যাক্তি কুফুরী করল এবং সে স্বলাত পরিতাগকারী হিসেবে গন্য হবে। শুধু তাই নয়য়, দেরী করে স্বলাত আদায় করা হারাম এবং এটা নিছক কুফুরী কাজ। আর এ কুফুরী কাজের জন্য আল্লাহ তা’আলা কঠন শাস্তি প্রদানের সতর্কবানী বলে দিয়েছেনঃ

فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ ۖ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا

অর্থঃ (পুর্ববর্তী আয়াত দ্রষ্টব্য) অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। (সুরা মরিয়ামঃ ৫৯)

আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ(রাঃ) সহ আরো অনেকেই উল্লেখিত আয়াতের অর্থ নষ্ট করা শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে এখানে (أَضَاعُوا) এর অর্থ এটা নয় যে তারা স্বলাতকে একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা নির্ধারিত সমইয় হতে দেরী করে স্বলাত পড়ত। যেমন তারা ফজর স্বলাত সুর্য উদয়ের পরে পড়ত, এমনিভাবে তারা আছরের স্বলাত সুর্য ডুবার পরে পড়ত।

আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেন, উমার বিন খাত্তাব(রাঃ) আব্দুর রহমান বিন আওফ(রাঃ) ,মুয়াজ বিন জাবাল(রাঃ) এবং আবু হুরাইরা(রাঃ) সহ আরো অন্যান্য সাহাবী হতে বর্নিত আছে যে,

“নিশ্চয়ই যে ব্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত স্বলাত ছেড়ে দিল, এমতবস্থায় ঐ স্বলাতের নির্ধারিত সময়ের ও পার হয়ে গেল তাহলে ইচ্ছাকৃত এই স্বলাত ত্যাগ করার কারনে ঐ বাক্তি কাফির ও মুরতাদ হয়ে গেল।”

পরিশেষে উক্ত বক্ত্যবের বর্ননাকারী আবু মুহাম্মাদ বিন হাযাম বলেনঃ উপরেউল্লেখিত বিষয়ে প্রখ্যাত চার সাহাবির মধ্যে কেউই উক্ত হাদিসের সম্পর্কে কোন মতানৈক্য করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

স্বলাত দেরী করে পরার ভয়াবহ পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ.فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

অর্থঃ অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর (সুরা মাউ’নঃ ৪-৫)

উল্লেখিত আয়াতঃ তারা নিজেদের মধ্যে স্বলাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে এর অর্থ এ নয়য় যে তারা একেবারেই স্বয়ালত ছেড়ে দিয়েছিল বরং তারা (মুনাফিকরা) স্বলাতের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে স্বলাত আদায় করত। এখানে কেবলমাত্র স্বলাত দেরী করে পোরার জন্য আল্লাহ তা’আলা ঐ সমস্ত মুনাফিকদের “ওয়ায়িল” নামহ জাহান্নাম বা ভয়াবহ শাস্তি প্রদানের ওয়াদা করেছেন।

এ প্রসংগে হাদিসে বর্নিত আছেঃ

রসুল(সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই যে সমস্ত ব্যাক্তিরা ফরজ স্বলাত না পড়ে ঘুমিয়ে পগেল এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুর পর ঐ সমস্ত ব্যাক্তিদের কবরে তাদের মাথাগুলোকে পাথর দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হবে। তাদের মাথাগুলো পাথর দিয়ে চুর্নবিচুর্ণ করে দেওয়ার পর ঐ মাথাগুলো পুর্বে যেরুপ ছিল আবার সেরুপ হয়ে যাবে। কিয়ামাত পর্যন্ত পালাক্রমে তাদের কবরে এইরুপ আযাব হতেই থাকবে, কোন রকমেই তাদের থেকে এ শাস্তি শিথিল করা হবে না। (বুখারী)

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে যথা সময়ে দৈনিক পাচঁ ওয়াক্ত স্বলাত জামা’আতের সাথে আদায় করার পুর্ন তাওফীক দান কর এবং উল্লেখিত ভয়াবহ সকল প্রকার পরকালীন শাস্তি ও আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করিও। আমীন