শিয়া ভ্রান্ত আক্বীদাঃ ২ (৯০ পারা কুরআন ও সাহাবা)

বিদ্যমান কুরআন সম্পর্কে রাফেযীদের বিশ্বাস

বিদ্যমান কুরআন, যার হিফাজতের দায়িত্ব নিজে আল্লাহ গ্রহণ করেছেন, সে বিষয়ে রাফেযীরা ভিন্ন মত পোষণ করে। রাফেযীরা বর্তমানে ‘শিয়াহ্‌’ নামে পরিচিত। তারা বলে, আমাদের নিকট বিদ্যমান কুরআন মুহাম্মাদের উপর অবতীর্ণ অবিকল কুরআন নয়। এতে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও কম-বেশী করা হয়েছে।

শিয়াদের অধিকাংশ মুহাদ্দিস বিশ্বাস করে যে, কুরআন শরীফে অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে। নুরী আত্‌-তাবারাসী ‘ফাসলুল খেতাব ফী তাহরীফে কিতাবি রাব্বিল আরবাব’ কিতাবে তা স্বীকার করেছেন। [আল কুলাইনীঃ উসুলূল কাফী-১/২৮৪]

মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলাইনী ‘উসূলুল কাফী’ গ্রন্থে ‘ইমামগণ ব্যতীত পূর্ণ কুরআন কেউ একত্র করেনি’ অনুচ্ছেদে জাবের হতে বর্ণনা করেন, আবু জা‘ফার বলেছেন, যে ব্যক্তি দাবী করে যে, আল্লাহ পূর্ণ কুরআন যেভাবে নাযিল করেছেন, অনুরূপ সে তা একত্র করেছে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্‌ যেভাবে কুরআন নাযিল করেছেন, আলী ইবনে আবী তালেব ও তার পরবর্তী ইমামগণ ছাড়া কেউ তা হুবহু একত্র ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়নি।” [আল কুলাইনীঃ উসুলূল কাফী-১/২৮৫]

জাবের আবু জা‘ফার থেকে বর্ণনা করেন, ‘আউসিয়া তথা ওসীয়তকৃত ব্যক্তি বর্গ ব্যতীত কেউ দাবী করতে পারবে না যে, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সম্পূর্ণ কুরআন তার নিকট রয়েছে।’ [আল কুলাইনীঃ উসুলূল কাফী-১/৬৩৪]

হিশাম ইবনে সালেম হতে প্রমাণিত হয়েছে যে, আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যেই কুরআন জিবরীল মুহাম্মাদের নিকট নিয়ে আসেন, তা সতের হাজার আয়াত বিশিষ্ট।’ [মিরাতুল উকুল বইয়ে তদের শায়খ আল-মাজলেসী]

এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাফেযী তথা শিয়ারা যে কুরআনের দাবী করে, তা বিদ্যমান

কুরআন থেকে অনেক বেশী, যার সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজে আল্লাহ্‌ নিজে গ্রহণ করেছেন। (নাউযুবিলাহ্‌ মিনহুম)

আহমাদ ত্বাবারাসী “আল-ইহ্‌তেজাজ” গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ওমর রা. যায়েদ বিন ছাবেত রা.-কে বলেন, নিশ্চয় আলী রা. যে কুরআন নিয়ে এসেছে তাতে আনছার ও মুহাজিরদের ফাযিহাহ্‌ অর্থাৎ দোষত্রুটি প্রকাশ করা হয়েছে। এর বিপরীতে আমরা এমন এক কুরআন সংকলন করার ইচ্ছা করছি যা থেকে আনছার ও মুহাজিরদের সকল প্রকার ফাযিহাহ্‌ তথা বিষোদগার মোচন করা হবে। তার এ কথার প্রতি যায়েদ রা. সমর্থন জানিয়ে বলেন, আমি যদি আপনার চাহিদা অনুযায়ী কুরআন সংকলন সম্পন্ন করি, আর আলী রা. যদি তা জানতে পারে, তাহলে তিনি কি আপনার সংকলন বাতিল করে দেবেন না? ওমর রা. বললেন, এ থেকে বাঁচার উপায় কি? যায়েদ রা. বলেন, উপায় সম্পর্কে আপনি-ই ভাল জানেন। ওমর রা. বললেন, তাকে হত্যা করে তার থেকে নিরাপদ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। অতঃপর খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের মাধ্যমে তাকে হত্যা চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ওমর রা. যখন খলিফা নিযুক্ত হন তখন আলী রা.-কে বলেন যে, আমাদের নিকট কুরআন পেশ কর, তাহলে আমাদের কাছে যা রয়েছে তাতে কিছু তাহরীফ অর্থাৎ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করব। ওমর রা. বলেন, হে আবুল হাসান! আবু বকর রা. এর কুরআনের ন্যায় যদি আমাদের কাছে কুরআন পেশ করেন, তাহলে আমরা তাতে একমত পোষণ করব। আলী রা. বলেন, হায়! আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, আপনারা যেন কিয়ামত দিবসে না বলেন,

إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ ♦ الأعراف: ١٧٢

অর্থ: “নিশ্চয় আমরা এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম…।” সূরা আরাফ : (১৭২)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা আরো বলেন,

“আপনি আমাদের কাছে আসার পরেও…।” সূরা আরাফ : (১২৯)

নিশ্চয় এ কুরআন আমার সন্তানের মধ্যে থেকে আউসিয়া ও পবিত্র সত্বা ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করতে পারবে না। অতঃপর ওমর রা. বলেন, এটা প্রকাশের নির্দিষ্ট কোন সময় আছে কি? আলী রা. বলেন, হ্যাঁ! যখন আমার সন্তানদের মধ্য হতে কেউ দণ্ডায়মান হবে, তখন তা প্রকাশ করা হবে। অতঃপর মানুষকে তা মানতে বাধ্য করা হবে।

তাকইয়া তথা অপকৌশল ও বাহানার আশ্রয় নিয়ে শিয়াগণ যতই বলুক, ‘কুরআন অপরিবর্তনীয়, তাতে কোন পরিবর্তন হয়নি,’ কিন্তু তাদের বিশ্বাস অনুরূপ নয়, কারণ তাদের বিশ্বস্ত লেখকদের লেখনীই বলে যে, তারা কুরআনের অবিকলতার ব্যাপারে আস্থাশীল নয়, বরং তাদের বিশ্বাস কুরআনে পরিবর্তন হয়েছে, এবং এটাই তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাদের ভয়, এ আকীদা যদি ব্যাপকভাবে প্রকাশ হয়, তাহলে তাদের মুখোশ খসে পড়বে। তাদের কুফরীর বিষয়টি সবার নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে মহান এক বিপ্লবের সূচনা ঘটবে, যা তারা কখনোই পছন্দ করে না। তাদের আরেকটি বিশ্বাস কুরআন দু’টি : একটি প্রকাশ্য অপরটি অপ্রকাশ্য। রাফেযী শিয়ারা আরো বিশ্বাস করে যে, সূরা আলাম-নাশরাহ্‌ থেকে:

ورفعنا لك ذكرك بعلي صهرك

‘এবং তোমার জামাতা আলীর দ্বারা আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।’

আয়াতটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ মন্তব্য নুরী আত্‌-ত্বাবারাসী “ফাসলুল খিতাব ফী তাহরীফে কিতাবে রাব্বিল আরবাব” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, এ সুরাটি মক্কায় নাযিল হয়েছে, যখন আলী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা ছিলেন না, তবুও এ ডাহা মিথ্যাচারের কারণে তারা সামান্য লজ্জা বোধ করে না।

আল্লাহ্‌ বলেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ♦الحجر: ٩

“নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি আর আমরাই তার সংরক্ষক।” (সুরা আল হিজর : ৯)

সাহাবাদের ব্যাপারে রাফেযী শিয়াদের বিশ্বাস

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের গাল-মন্দ করা ও তাদের কাফের বলাই তাদের ধর্মীয় মূলনীতি। যেমন আল-কুলাইনী ‘ফুরু‘ আল-কাফী’ কিতাবে জা‘ফারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তিন ব্যক্তি ব্যতীত সমস্ত মানুষ মুরতাদ ছিল, আমি বললাম, ঐ তিনজন কারা? জবাবে বলেন, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ, আবু যর গিফারী ও সালমান ফারেসী।”

আল-মাজলেসী ‘বেহারুল আনওয়ার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আলী ইবনে হুসাইনের গোলাম বলেন, “আমি একদা একাকি অবস্থায় তার সাথে ছিলাম, অতঃপর আমি তাকে বললাম, নিশ্চয় আপনার প্রতি আমার অধিকার রয়েছে, আপনি কি আমাকে দুই ব্যক্তি তথা আবু বকর ও ওমর সম্পর্কে বলবেন ? তিনি বলেন, তারা দুজনই কাফের এবং যারা তাদেরকে ভালবাসবে তারাও কাফের।”

আবু হামযাহ্‌ আল-সেমালী হতে বর্ণিত যে, আলী ইবনে হুসাইনকে দু’জন অর্থাৎ আবু বকর ও ওমার রা. সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেন, তারা দু’জনই কাফের এবং যারা তাদেরকে ওলী হিসেবে গ্রহণ করবে তারাও কাফের।” [আল-মাজলাসীঃ বেহারুল আনোয়ার-২৯/১৩৭-১৩৮ ]

আল্লাহর বাণী :

وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ♦ النحل: ٩٠

“আর তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহাল : ৯০)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল-কুম্মী বলেন, “ফাহশা অর্থ আবু বকর, মুনাকার অর্থ ওমর এবং বাগী অর্থ উসমান।

আল-মাজলেসী ‘বেহারুল আনওয়ার’ গ্রন্থে বলেন, আবু বকর ও ওমরের কুফরী, তাদেরকে লা‘নত করা ও তাদের থেকে সম্পর্কছিন্ন করার ঘোষণা দেয়া সম্পর্কিত অসংখ্য দলীল রয়েছে, যা উল্লেখ করার জন্য একাধিক ভলিউমের প্রয়োজন। তবে এখানে যা উল্লেখ করলাম সরল পথ খোজকারী জন্য তাই যথেষ্ট।

আল-কুম্মী উক্ত গ্রন্থের অপর স্থানে বলেন, আবু বকর, ওমর, উসমান ও মু‘আবিয়াহ্‌ সকলেই জাহান্নামের জ্বালানী কাষ্ঠ। নাউযুবিল্লাহ মিন যালেক।

‘এহ্‌কাকুল হক’ কিতাবে বর্ণিত, “হে আল্লাহ্‌! মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করো আর কুরাইশের দুই তাগুত ও মূর্তি এবং তাদের দুই কন্যার উপর লা‘নত বর্ষণ করো… ।

তাগুত ও মূর্তি দ্বারা তারা আবু বকর ও ওমর রা. এবং তাদের দুই কন্যা দ্বারা আয়েশা ও হাফছাকে বুঝায়।

আল-মাজলেসী তার ‘আল-আকায়েদ’ পুস্তিকায় উল্লেখ করেন, ইমামিয়াহ্‌ দীনের জন্য যে সব বিষয় জরুরী তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মেয়াদী বিবাহ ও তামাত্তু হজ হালাল জানা এবং তিনজন তথা আবু বকর, ওমর, উসমান ও মু‘আবিয়াহ্‌, ইয়াযিদ ইবনে মু‘আবিয়াহ্‌ এবং যারা আমীরুল মু‘মিনীন আলী রা.-র সাথে লড়াই করে, তাদের থেকে মুক্ত থাকা।

আশুরার দিন তারা একটি কুকুর নিয়ে আসে এবং কুকুরের নামকরণ করে ওমর অতঃপর তারা কুকুরটির উপর লাঠির আঘাত ও কংকর নিক্ষেপ করতে থাকে যতক্ষণ না মরে। কুকুরটি মারা যাওয়ার পর একটি বকরি ছানা নিয়ে আসে এবং তার নাম রাখে আয়েশা অতঃপর ঐ বকরি ছানার লোম উপড়াতে ও জুতা দ্বারা আঘাত করতে থাকে, বকরি ছানাটি না মরা পর্যন্ত এরূপ আঘাত করতেই থাকে।

অনুরূপভাবে ওমর রা.-র শাহাদাত দিবসে তারা আনন্দ অনুষ্ঠান পালন করে এবং তাঁর হত্যাকারীকে ‘বাবা শুজাউদ্দীন’ বা ‘বাবা ধর্মীয় বীর’ নামে খেতাব দেয়। আল্লাহ্‌ তা‘আলা সকল সাহাবা ও উম্মাহাতুল মু‘মিনীনদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

ভেবে দেখ হে মুসলিম জাতি! কত হিংসা ও কত জঘন্য নীতির ধারক দীন ত্যাগকারী এ দলটি! আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল যাদের প্রশংসা করেছেন, যারা নবীদের পর শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদের ইনসাফ ও ফযিলত সম্পর্কে সমগ্র উম্মাহ একমত এবং যাদের সৎ কাজ ও জিহাদের সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস, তাদের ব্যাপারে এ পথভ্রষ্ঠ দলটির অবস্থান একটু ভেবে দেখুন!

রাসূহুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা ভালবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন করা হতে সাবধান থাকবে। কেননা এ সীমা লংঘনই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে।” (মুসনাদ আহমাদ ও ইবনু মাজাহ্‌)

পুর্ববর্তী অধ্যায়ঃ

◄শিয়া ভ্রান্ত আক্বীদাঃ ১ (বাদা ও আল্লাহর সিফাত)

পরবর্তী অধ্যায়ঃ

শিয়া ভ্রান্ত আক্বীদাঃ ৩ (ইয়াহুদি ও বারা ইমাম)