সিয়াম/রোজা এর পরিচয়

সিয়াম /রোজা

শাব্দিক ও শারীয় অর্থঃ

সাউম (আরবিصومস্বাউম্), এর শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা কিন্তু ইসলামে সিয়াম অর্থঃ সূর্য ওঠা থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত পানাহার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকে ও বিরত থাকার নাম রোযা। প্রতিটি সবল মুসলমানের জন্য রমজান মাসের প্রতিদিন রোজা রাখা ফরজ।
সিয়ামের বহুল প্রচলিত শব্দ হল রোজা (ফারসিروزہরুজ়ে) যদিওএটা সিয়ামের কোন সমার্থক শব্দ না।
প্রাথমিক সিয়ামের প্রচলনঃ

يَاأَيُّهَاالَّذِينَآمَنُواكُتِبَعَلَيْكُمُالصِّيَامُكَمَاكُتِبَعَلَىالَّذِينَمِنقَبْلِكُمْلَعَلَّكُمْتَتَّقُونَ

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। (সুরা বাকরাঃ ১৮৩)

হাদিসে এসেছেঃ
“নাবী কারীম(সঃ) যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে এলেন তখন দেখলেন , ইহুদীরা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন এটা কি এমন দিন যে তোমরা এদিনে সিয়াম পালন করছ? ইহুদীরা বলল , “ এ এক মহান দিন । এদিনে আল্লাহ মূসা(আঃ) ও তার কওমকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন এবং ফিরাউন ও তার কওমকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। এ কথা শুনে মহানবী (সাঃ) বললেন, “ মূসার স্মৃতি পালন করার ব্যপারে তোমাদের চাইতে আমরা অধিক হকদার”। সুতরাং তিনি ঐ দিনে সিয়াম পালন করলেন এবং পালন করতে আদেশ দিলেন।

পদ্ধতিঃ

পদ্ধতিগত দিক থেকে মুস্লিম অ অন্যান্য আহলে কিতাবদের (ইহুদী- খ্রিস্টান) মধ্যে পার্থক্য এই যে , তাঁরা (মুসলিম ব্যতীত) সাহরী খায় না এবং ইফতারী দেরি করে খায়। (মুসলিম ১০৯৬,আবু- দাউদ,হাকেম,ইবনে হিব্বান)

সিয়াম এর পর্যায় ক্রমিক স্তরঃ

রাসুল(সাঃ) প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি করে সিয়াম পালন করতেন এবং তাকে অনুসরন করতেন সাহাবীগণও । এরপর আশুরার দিনে সিয়াম পালন করা হত(হিজরতে পর)। তারপর সিয়াম পালনের বিধান সম্পর্কিত কুর আনের আয়াত অবতীর্ণ হল।কিন্তু শুরুতে তখনও সিয়াম পূর্ণ আকারে ফরয ছিল না। এ সম্পর্কিত আল্লহর নির্দেশঃ

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ [٢:١٨٤]

অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। (সুরা বাকারাঃ১৮৪)

চূড়ান্ত ভাবে হিজ রীর ২ সনে শা’বান মাসের ২য় তারিখ সোম বারে প্রত্যেক সামর্থ্য বান ভার প্রাপ্ত মুসলিমের পক্ষে পূর্ণ রমজান মাসের সিয়াম ফরয করা হল।

সিয়ামের ফজিলতসমূহ :

এক. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের সাথে সিয়ামের সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। এমনিভাবে তিনি সকল ইবাদত-বন্দেগি থেকে সিয়ামকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন তিনি এক হাদিসে কুদসিতে বলেন :—

كل عمل ابن آدم لـه إلا الصيام، فإنه لي وأنا أجزى به. رواه مسلم

“মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।“(মুসলিম)

এ হাদিস দ্বারা আমরা অনুধাবন করতে পারি নেক আমলের মাঝে সিয়াম পালনের গুরুত্ব আল্লাহর কাছে কত বেশি। তাই সাহাবি আবু হুরায়রা রা. যখন বলেছিলেন –

يا رسول الله مرني بعمل، قال عليك بالصوم فإنه لا عدل لـه. رواه النسائي

“হে রাসূলুল্লাহ ! আমাকে অতি উত্তম কোন নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তুমি সিয়াম পালন করবে। মনে রেখ এর সমমর্যাদার কোন আমল নেই”। (নাসায়ি)

সিয়ামের এত মর্যাদার কারণ কী তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভাল জানেন। তবে, আমরা যা দেখি তা হল, সিয়াম এমন একটি আমল যাতে লোক দেখানো ভাব থাকে না। বান্দা ও আল্লাহ তাআলার মধ্যকার একটি অতি গোপন বিষয়। সালাত হজ, জাকাতসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি কে করল তা দেখা যায়। পরিত্যাগ করলেও বুঝা যায়। কিন্তু সিয়াম পালনে লোক দেখানো বা শোনানোর ভাবনা থাকে না। ফলে সিয়ামের মধ্যে এখলাস বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা নির্ভেজাল ও বেশি থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন :—

يدع شهوته وطعامه من أجلي

সিয়াম পালনকারী আমার জন্যই পানাহার ও যৌনতা পরিহার করে। তাই সিয়াম পালনকারী আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কিছুর আশা করে না।

দুই. সিয়াম আদায়কারী বিনা হিসাবে প্রতিদান লাভ করে থাকেন। কিন্তু অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি ও সৎ কর্মের প্রতিদান বিনা হিসাবে দেয়া হয় না। বরং প্রত্যেকটি নেক আমলের পরিবর্তে আমলকারীকে দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত প্রতিদান দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالـها إلى سبع مئة ضعف. قال الله عز وجل: ( إلا الصوم فإنه لي وأنا أجزى به . . .

“মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-কিন্তু সিয়ামের বিষয়টা ভিন্ন। কেননা সিয়াম শুধু আমার জন্য আমিই তার প্রতিদান দেব”। (বর্ণনায় : মুসলিম)

সারা জাহানের সর্বশক্তিমান প্রতিপালক আল্লাহ নিজেই যখন এর পুরস্কার দেবেন তখন কি পরিমাণে দেবেন ? ইমাম আওজায়ী র. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ যে সিয়াম আদায় কারীকে প্রতিদান দেবেন তা মাপা হবে না, ওজন করা হবে না।

তিন. সিয়াম ঢাল ও কুপ্রবৃত্তি থেকে সুরক্ষা:

সিয়াম পালনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কু-প্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :—

يا معشر الشباب! من استطاع منكم الباءة فليتزوج، فإنه أغض للبصر، وأحصن للفرج، ومن لم يستطع فعليه بالصوم، فإنه له وجاء. متفق عليه

“হে যুবকেরা ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা দেয়। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ এটা তার রক্ষা কবচ”। (বর্ণনায় : বোখারি ও মুসলিম)

এমনিভাবে সিয়াম সকল অশ্লীলতা ও অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

والصيام جنة، فإذا كان يوم صوم أحدكم فلا يرفث يومئذ ولا يصخب، فإن سابه أحد أو قاتله فليقل إني امرأ صائم. رواه مسلم

সিয়াম হল ঢাল। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। যদি তার সাথে কেউ ঝগড়া বিবাদ কিংবা মারামারিতে লিপ্ত হতে চায় তবে তাকে বলে দেবে আমি সিয়াম পালনকারী। বর্ণনায় : মুসলিম

সিয়াম পালনকারী যেমনি নিজের অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তেমনি সকল অশ্লীল আচরণ, ঝগড়া-বিবাদ, অনর্থক কথা ও কাজ থেকে নিজের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে হেফাজত করবে।

চার. সিয়াম জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল।

যেমন হাদিসে এসেছে –

الصيام جنة، وحصن حصين من النار. رواه أحمد

সিয়াম হল ঢাল ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মজবুত দুর্গ। (আহমদ)

বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে –

من صام يوما في سبيل الله باعد الله وجهه عن النار سبعين خريفا. رواه مسلم

“যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তার থেকে জাহান্নামকে এক খরিফ (সত্তুর বছরের) দুরত্বে সরিয়ে দেবেন।“(বর্ণনায়: মুসলিম)

উলামায়ে কেরাম বলেছেন, আল্লাহর পথে সিয়াম পালনের অর্থ হল : শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সিয়াম পালন করা। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বহু সিয়াম পালনকারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। যেমন হাদিসে এসেছে –

إن لله تعالى عند كل فطر عتقاء من النار، وذلك كل ليلة. رواه أحمد

ইফতারের সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আর এটা রমজানের প্রতি রাতে। (আহমাদ)

পাঁচ. সিয়াম হল জান্নাত লাভের পথ। হাদিসে এসেছে –

عن أبي هريرة رضي الله عنه أنه قال: يا رسول الله مرني بأمر ينفعني الله به، قال: عليك بالصوم فإنه لا مثل له. رواه النسائي

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি লাভবান হতে পারি। তিনি বললেন : তুমি সিয়াম পালন করবে। কেননা, এর সমকক্ষ কোন কাজ নেই।( নাসায়ি)

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের জন্য সিয়ামের সাথে কোন আমলের তুলনা হয় না। সিয়াম পালনকারীদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহের আরেকটি দৃষ্টান্ত হল তিনি সিয়াম পালনকারীদের জন্য জান্নাতে একটি দরজা নির্দিষ্ট করে দেন। যে দরজা দিয়ে সিয়াম পালনকারীরা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

إن في الجنة بابا يقال له الريان، يدخل منه الصائمون يوم القيامة لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال: أين الصائمون ؟ فيقومون لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا أغلق، فلم يدخل منه أحد. متفق عليه

জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রইয়ান। কেয়ামতের দিন সিয়াম পালনকারীরাই শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায় ? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। যখন তারা প্রবেশ করবে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (বোখারি ও মুসলিম)

ছয়. সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :—

যার হাতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন সে সত্তার শপথ, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার কাছে মেশকের ঘ্রাণ হতেও প্রিয়। (বোখারি ও মুসলিম)

মুখের গন্ধ বলতে পেট খালি থাকার কারণে যে গন্ধ আসে সেটাকে বুঝায়। দাঁত অপরিষ্কার থাকার কারণে যে গন্ধ সেটা নয়।

সাত. সিয়াম ইহকাল ও পরকালের সাফল্যের মাধ্যম। যেমন হাদিসে এসেছে –

সিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ : একটি হল ইফতারের সময় অন্যটি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বোখারি ও মুসলিম)

ইফতারের সময় আনন্দ হল এ কারণে যে সিয়াম পূর্ণ করতে পারল ও খাবার-দাবারের অনুমতি পাওয়া গেল। এটা বাস্তব সম্মত আনন্দের বিষয় যা আমাদের সকলের বুঝে আসে ও অনুভব করি। অপরদিকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের যে আনন্দ তা অনুভব করতে আমরা এখন না পারলেও কেয়ামতের দিন পারা যাবে। যখন সকল মানুষ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহমুখী থাকবে।

আট. সিয়াম কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। হাদিসে এসেছে –

আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : সিয়াম ও কোরআন কেয়ামতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে প্রতিপালক ! আমি দিনের বেলা তাকে পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। কোরআন বলবে হে প্রতিপালক ! আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। তিনি বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে। (আহমদ)

নয়. সিয়াম হল গুনাহ মাফ ও গুনাহের কাফফারা। সিয়াম হল অনেকগুলো নেক আমলের সমষ্টি। আর নেক আমল পাপকে মুছে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ (سورة هود:114)

“সৎকর্ম অবশ্যই পাপসমূহ মিটিয়ে দেয়”।( সূরা হুদ : ১১৪)

বহু হাদিস রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, নেক আমলকে বিভিন্ন ছোট খাট পাপ সমূহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ নেক আমলের কারণে গুনাহ সমূহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। যেমন হাদিসে এসেছে –

“মানুষ যখন পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী ও ধন-সম্পদের কারণে গুনাহ করে ফেলে তখন সালাত, সিয়াম, সদকা সে গুনাহগুলোকে মিটিয়ে দেয়”।( বোখারি ও মুসলিম)

আর রমজান তো গুনাহ মাফ ও মিটিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি সুযোগ দিয়েছে। হাদিসে এসেছে –

যে রমজান মাসে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে সিয়াম পালন করবে তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। ( বোখারি ও মুসলিম)

ইহতিসাবের অর্থ হল আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়া যাবে এ দৃঢ় বিশ্বাস রেখে নিষ্ঠার সাথে সন্তুষ্টচিত্তে আদায় করা।
হাদিসে আরো এসেছে –

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এর মধ্যবর্তী সময় ও এক জুমআ থেকে অপর জুমআও এক রমজান থেকে অপর রমজানের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে সে সকল পাপ হয়ে যায় তার কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হিসেবে সালাতকে গ্রহণ করা হয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। সিয়াম ছোট পাপগুলোকে মিটিয়ে দেয় আর তাওবা করলে কবিরা গুনাহ মাফ করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :—

إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا( النساء :31)

তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর তা হতে বিরত থাকলে তোমাদের লঘুতর পাপগুলো ক্ষমা করে দেব। এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। সূরা নিসা : ৩১

এ আয়াত ও হাদিস দুটো দ্বারা প্রমাণিত হল আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ক্ষমার ওয়াদা করা হয়েছে তা তিনটি শর্ত সাপেক্ষে।

প্রথম : রমজানের সিয়াম পালন করতে হবে ঈমানের সাথে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এবং সিয়াম যে একটি ফরজ ইবাদত এর প্রতি বিশ্বাস। সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ যে সকল পুরস্কার দেবেন তার প্রতি বিশ্বাস রাখা।
দ্বিতীয় : সিয়াম পালন করতে হবে ইহতিসাবের সাথে। ইহতিসাব অর্থ হল আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব ও পুরস্কারের আশা করা, তাকে সন্তুষ্ট করতেই সিয়াম পালন করা আর সিয়ামকে বোঝা মনে না করা।
তৃতীয় : কবিরা গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। কবিরা গুনাহ ঐ সকল পাপকে বলা হয় যেগুলোর ব্যাপারে ইহকালীন শাস্তির বিধান দেয়া হয়েছে, পরকালে শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, অথবা আল্লাহর ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে লানত (অভিসম্পাত) বা ক্রোধের ঘোষণা রয়েছে। যেমন, শিরক করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ আত্মসাত করা, ব্যভিচার করা, জাদু-টোনা, অন্যায় হত্যা, মাতা-পিতার সাথে দুর্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ, মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা মামলা, মাদক সেবন, ধোঁকাবাজি, মিথ্যা শপথ, অপবাদ দেয়া, গিবত বা পরদোষচর্চা, চোগলখোরি, সত্য গোপন করা -ইত্যাদি।

কোন ধরনের সিয়াম এ সকল ফজিলত অর্জন করতে পারে :—
যে সকল ফজিলত ও সওয়াবের কথা এতক্ষণ আলোচনা করা হল তা শুধু ঐ ব্যক্তি লাভ করবে যে নিম্নোক্ত শর্তাবলি পালন করে সিয়াম আদায় করবে।
(১) সিয়াম একমাত্র আল্লাহর জন্য আদায় করতে হবে। মানুষকে দেখানো বা শোনানো অথবা মানুষের প্রশংসা অর্জন কিংবা স্বাস্থ্যের উন্নতির নিয়তে সিয়াম আদায় করবে না।
(২) সিয়াম আদায়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূলের সুন্নত অনুসরণ করতে হবে। সেহরি, ইফতার, তারাবীহসহ সকল বিষয় রাসূলের সুন্নত অনুযায়ী আদায় করতে হবে।
(৩) শুধু খাওয়া-দাওয়া ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকলে যথেষ্ট হবে না। মিথ্যা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা, ধোঁকাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ সহ সকল প্রকার অবৈধ কাজ হতে বিরত থাকতে হবে। মুখ যেমন খাবার থেকে বিরত থাকে, তেমনিভাবে চোখ বিরত থাকবে অন্যায় দৃষ্টি থেকে, কান বিরত থাকবে অনর্থক কথা ও গান-বাজনা শোনা থেকে, বা বিরত থাকব অন্যায়-অসৎ পথে চলা থেকে।

সিয়াম পালনে মহান উদ্দেশ্য এটাই যে, সিয়াম পালনকারী শরিয়তের দৃষ্টিতে সকল প্রকার অন্যায় ও গর্হিত আচার-আচরণ থেকে নিজেকে হেফাজত করবে। অতএব সিয়াম হল সকল ভাল বিষয় অর্জন ও অন্যায়-গর্হিত কাজ ও কথা বর্জন অনুশীলনের একটি শিক্ষালয়।

তাইতো দেখা যায় রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

من لم يدع قول الزور والعمل به والجهل فليس لله حاجة أن يدع طعامه وشرابه. رواه البخاري

“যে মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই”। (বোখারি)

তিনি আরো বলেছেন :—

رب صائم حظه من صيامه الجوع والعطش، ورب قائم حظه من قيامه السهر. رواه أحمد

“অনেক সিয়াম পালনকারী আছে যারা তাদের সিয়াম থেকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা অর্জন করে। আবার অনেক সালাত আদায়কারী আছে যারা তাদের সালাত থেকে শুধু রাত-জাগা লাভ করে থাকে”। (এ ছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রতিদান লাভ করে না) (আহমদ)

ইমাম যাহাবী (র) বলেন , “মুমিনদের নিকটে একথা স্থির সিদ্ধান্ত যে, ব্যক্তি কোন রোগ ও ওজর না থাকা সত্বেও রমজানের সিয়াম ত্যাগ করে সে একজন ব্যভিচারী ও মদ্যপায়ী থেকেও নিকৃষ্ট।বরং মুসলিমরা তার ইসলামে সন্দেহ পোষণ করে এবং ধারনা করে যে একজন নাস্তিক অ নৈতিক শৈথ্যিল্যপূর্ণ মানুষ।

আবু উমামাহ (রাঃ) কতৃক বর্ণীত, তিনি বলেন, “আমি শুনেছি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন যে, “একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকত দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন ,আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন”। আমি বললাম “ এ পাহাড়ে চড়তে আমি অক্ষম। তাঁরা বললেন , “ আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দিব। সুতরাং আমি চড়ে গেলাম।অবশেষে যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পোঁছালাম তখন বেশ কিছু চিৎকার ধ্বনি শুনতে পেলাম । আমি জিজ্ঞাসা করলাম এ চিৎকার ধ্বনি কাদের? তাঁরা বললেন ,” একজন জাহান্নাম বাসীদের চিৎকার ধ্বনি । পুনরায় তাঁরা মামকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একজন লোক , তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে,তাদের কর্ণ গুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কর্ণ থেকে রক্ত ও ঝরছে।নবী (সাঃ) বললেন,আমি বললাম , “ ওরা কারা? তাঁরা বললেন, ওরা হল তারা; যারা সময় হয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত।” [সহীহ ইবনে হিব্বান, ইবনে খুজাইমা]

সিয়াম পালন করার পর ও যদি তাদের এই অবস্থা হয় তাহলে যারা পূর্ণ দিন ও পূর্ণ মাস সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকে তাদের অবস্থা যে কত করুনও কত সঙ্গিন হবে তা সহজেই অনুমেয়।

উপসংহারঃ

পরিশেষে রাসুল (সাঃ) এর আর একটি হাদিস উপস্থাপনের মাধমে সিয়াম কী তা স্পষ্ট করতে চাই। নবী (সাঃ) বলেন, “ কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম নয় , বরং অসাড়তা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত নাম ই হল (আসল) সিয়াম।

সাধারন ভাবে বলতে গেলে এভাবে বলা যায় যে সিয়াম পালনকারী অচিরেই সুফল প্রত্যক্ষ করবে।অপর পক্ষে যারা সিয়াম ভঙ্গকারী তাঁরা আল্লাহর পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বঞ্চিত হবে আর তার বদলতে পাবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ আমাদের বিশুদ্ধ সিয়াম পালনে তাওফীক দান করুন (আমীন)