Tag Archives: আক্বীদা

সহীহ আক্বীদা এর মাস’আলার বই

কুর’আন ও সহীহ সুন্নাহভিত্তিক (ঈমান) আক্বীদা

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি জ্বীন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদাতের জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় রসূল (সঃ) এর উপর যাকে পাঠানো হয়েছে সমস্ত দুনিয়ার উপর রহমত স্বরুপ। সুরা আলাক্বে আল্লাহ বলেন “পড় তোমার রবের নামে” তাই প্রত্যেক মুসলিমের উপর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ফরজ। আর সর্বপ্রথম জানতে হবে আল্লাহ সম্পর্কে, স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে।কেননা মহান আল্লাহ বলেনঃ

কিছু মানুষ জ্ঞান-প্রমাণ ও স্পষ্ট কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে [সুরা হাজ্জঃ ৮]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস- [১]

সঠিক আক্বীদা ও তার পরপন্থী বিশ্বাস

শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন বায

পর্ব- ১ || পর্ব- ২ || পর্ব- ৩

[প্রথম নীতি]

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের প্রথম কথা হলো এই বিশ্বাসই স্থাপন করা যে, তিনিই ইবাদতের একমাত্র যোগ্য, সত্যিকার মা‘বুদ, অন্য কেউ নয়। কেননা, একমাত্র তিনিই বান্দাহদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী এবং তাদের জীবিকার ব্যবস্থাপক। তিনি তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে প্রতিফলদানে ও অবাধ্যজনকে শাস্তি প্রদানে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর এই ইবাদতের জন্যেই আল্লাহ্‌ তা‘আলা জ্বিন ও ইন্‌সানকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ ٥٧ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ﴾ [الذاريات:56-57]

“আমি জ্বিন ও ইনসানকে কেবল আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন রিজিক চাইনা, এটাও চাইনা যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিজেইতো রিজিকদাতা, মহান শক্তিধর ও প্রবল পরাক্রান্ত”। (সূরা যারিয়াত: ৫৬,৫৭)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ٢٢﴾ [البقرة: 21-22]

“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রভূ প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকলকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। তিনিই সেই প্রভূ যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ, আকাশকে ছাদ স্বরূপ তৈরী করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে এর সাহায্যে নানা প্রকার ফল-শষ্য উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অতএব, তোমরা এসব কথা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করোনা”। (সূরা বাকার : ২১,২২)

এ সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এবং এর প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে এর পরিপন্থী বিষয় থেকে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) এর ইবাদত থেকে দুরে থাক”। (সূরা নাহল-৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ﴾ [الأنبياء:25]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) আর কোন মা‘বুদ নেই। অতএব, তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর”। (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿كِتَٰبٌ أُحۡكِمَتۡ ءَايَٰتُهُۥ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِن لَّدُنۡ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ١ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ وَبَشِيرٞ﴾ [هود:1-2]

“ইহা এমন একটি কিতাব যার আয়াতসমূহ এক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্তার নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না কর। অনন্তর, আমি তাঁরই পক্ষ হতে তোমদের প্রতি একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা”। (সূরা হূদ : ১.২)

উল্লেখিত ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো: যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের তরেই নিবেদিত করা। প্রার্থনা, ভয়, আশা, নামায, রোজা, জবেহ, মানত ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবদত তাঁরই প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় ও পূর্ণ বশ্যতা সহকারে সম্পাদন করা। কুরআন শরীফের অধিকাংশ আয়াত এই মহান মৌলিক নীতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

﴿ِ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ﴾ [الزمر:2-3]

“অতএব তুমি এক আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর, দ্বীনকে একমাত্র তাঁরই জন্যে খালেছ কর। সাবধান, খালেছ দ্বীনতো একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য”। (সূরা যুমার: ২, ৩)

আল্লাহ্‌ পাক বলেন:

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ﴾ [الإسراء:23]

“তোমার প্রতিপালক এই বিধান করে দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কারো নয়”। (সূরা ইসরা: ২৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

﴿فَٱدۡعُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ﴾ [غافر:14]

“অতএব, তোমরা আল্লাহকেই ডাক, নিজেদের দ্বীনকে কেবল তাঁরই জন্যে খালেছ ভাবে নির্দিষ্ট কর, কাফেরদের কাছে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন”। (সূরা গাফের: ১৪)

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘বান্দার উপর আল্লাহ্‌র অধিকার হলো তারা যেন কেবল তাঁরই ইবাদত করে এবং এতে অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার না করে’।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো-ঐ সমস্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থপন করা, যা আল্লাহ্‌ পাক তাঁর বান্দাগণের উপর ওয়াজিব ও ফরজ করেছেন। যথা: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ:

  • (১) সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র রাসূল ।
  • (২) নামাজ প্রতিষ্ঠা করা
  • (৩) যাকাত দেয়া
  • (৪) রমজানের রোজা পালন
  • (৫) বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছার সামর্থ থাকলে হজ্জব্রত পালন করা ইত্যাদি সহ অন্যান্য ফরজগুলি, যা নিয়ে পবিত্র শরীয়তের আগমন ঘটেছে।

উপরোক্ত স্তম্ভ বা রুকনগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান করুন হলো এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহুর রাসূল। এটিই হলো কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’এর প্রকৃত মর্মার্থ। কেননা, এর যথার্থ অর্থ হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তাঁকে ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয়, সে মানব সন্তান হোক আর ফেরেশতা, জ্বিন বা অন্য এই যাই হোক সবই বাতেল। সত্যিকার মা‘বুদ হলেন কেবল সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহপাক বলেন:

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ﴾ [الحج:62]

“তা এই জন্যে যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য এবং তাঁকে বাদ দিয়ে ওরা যারা ইবাদত করছে তা নিঃসন্দেহে বাতেল”। (সূরা হজ্জ: ৬২)

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এই যথার্থ মৌলিক বিষয়ের উদ্দেশ্যেই জ্বিন ও ইন্‌সান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে পাঠক; বিষয়টি ভাল করে ভেবে দেখুন এবং এ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠবে, অধিকাংশ মুসলিম উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার মধ্যে নিপতিত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্যেরও ইবাদত করছে এবং তাঁর প্রাপ্য ও খালেছ অধিকার অন্যের তরে নিবেদিত করে চলছে।

এ বিশ্বাসও আল্লাহ্‌ পাকের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনিই সর্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা, তাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক এবং আল্লাহ্‌ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্বীয় জ্ঞান ও কুদরতের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দুনিয়া-আখেরাতের মালিক ও সমগ্র জগৎবাসীর প্রতিপালক। তিনিই আপন বান্দাহগণের যাবতীয় সংশোধন, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যানের প্রতি আহবান জানানোর উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। ঐ সমস্ত ব্যাপারে পবিত্র আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই। তিনি আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر:62]

“ আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সর্ব বিষয়ের যিম্মাদার”। (সূরা যুমার-৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [الأعراف:54]

“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভূ হলেন আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠলেন হলেন। তিনি রাতকে দিনের অনুসরণ করে চলে। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সবই তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি আর হুকুম প্রদানের মালিক তিনিই। চির মঙ্গলময় মহান আল্লাহ তিনিই সর্বজগতের প্রভূ”। (সূরা আল-আ’রাফ-৫৪)

আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো, কুরআন শরীফে উদ্ধৃত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত আল্লাহর সর্ব সৃন্দর নামসমূহ ও তাঁর সর্বোন্নত গুণরাজির উপর কোন প্রকার বিকৃতি, অস্বীকৃতি, ধরন, গঠন বা সাদৃশ্য আরোপ না করে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [الشورى:11]

“কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। (সূরা শূরা-১১)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿فَلَا تَضۡرِبُواْ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡثَالَۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾ [النحل:74]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র কোন সদৃশ্য স্থির করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ই জানেন, তোমরা জান না”। (সূরা নাহল : ৭৪)

এই হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা বা বিশ্বাস। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী রহিমাহুল্লাহ্‌ তাঁর ‘আল-মাকালাত আন আসহাবিল হাদীস অ আহলিস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই আকীদার কথাই উদ্ধৃত করেছেন। এভাবে ইল্‌ম ও ঈমানের বিজ্ঞজনেরাও বর্ণনা করে গেছেন। ঈমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন: ইমাম যুহরী ও মাকহুলকে আল্লাহ্‌র গুণরাজি সম্পর্কিত আয়াতগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা বলেন: এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবেই মেনে নাও। ওয়ালীদ বিন মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন ইমাম মালেক, আওযায়ী, লাইছ বিন সা‘দ ও সুফইয়ান ছাওরীকে আল্লাহর গুণরাজি সম্বন্ধে বর্ণিত হাদিসসমূহ জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা সকলেই উত্তরে বলেন: ‘এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবে মেনে নাও’। ইমাম আওযায়ী বলেন: বহুল সংখ্যায় তাবেয়ীগণের জীবদ্দশায় আমরা বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ পাক তাঁর আরশের উপর বিরাজমান রয়েছেন এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত তাঁর সব গুণাবলীর উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি।

ইমাম মালেকের উস্তাদ রাবীআ বিন আবু আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহকে (আল্লাহ তাঁরই আরশের উপর উঠা) সম্পর্কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর আরশের উপর উঠা অজানা ব্যাপার নয়; তবে এর বাস্তব ধরণ আমাদের বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে রিসালাত, আর রাসূলের দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে এর ঘোষণা করা এবং আমাদের কর্তব্য হলো এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ কে [الاستواء] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন: উপরে উঠা আমাদের জ্ঞাত আছে তবে এর বাস্তবধরণ অজ্ঞাত, এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা বিদ‘আত। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে ঐ একই অর্থে হাদীস বর্ণিত আছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ‘ত আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ঐসব গুণাবলী সাদৃশ্যহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তিনি স্বীয় কোরআন শরীফে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহীহ হাদীসসমূহে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ হওয়া থেকে এমনভাবে পবিত্র রাখেন যার মধ্যে তা‘তীল বা গুণমুক্ত হওয়ার কোন লেশ থাকেনা। ফলে তারা পরস্পর বিরোধী আস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকেন।

বস্তুত: আল্লাহ পাকের বিধানই হলো, যেন মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরিত সত্যকে আঁকড়ে তাঁর সমুদয় সামর্থ সে পথে ব্যয় করে এবং নিষ্ঠার সাথে এর অম্বেষায় থাকে, তবেই তাকে আল্লাহ সত্যের পথে চলার তৌফিক দান করেন এবং তার বক্তব্যকে বিজয়ী করে দেন। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿بَلۡ نَقۡذِفُ بِٱلۡحَقِّ عَلَى ٱلۡبَٰطِلِ فَيَدۡمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٞۚ وَلَكُمُ ٱلۡوَيۡلُ مِمَّا تَصِفُونَ﴾ [الأنبياء:18]

“বরং আমিতো বাতেলের উপর সত্যের আঘাত হেনে থাকি, ফলে তা অসত্যকে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষনাৎই বাতেল বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া : ১৮)

আল্লাহ তা‘আলা আরেকটি আয়াতে বলেন:

﴿وَلَا يَأۡتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ وَأَحۡسَنَ تَفۡسِيرًا﴾ [الفرقان: 33]

“আর যখনই তারা তোমার সম্মুখে কোন নুতন কথা নিয়ে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি এর জবাব তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি এবং অতি উত্তমভাবে মূল কথা ব্যক্ত করে দিয়েছি”। (সূরা ফুরকান: ৩৩)

হাফেয ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ পাকের বাণী:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ﴾ [الأعراف:54]

“বস্তুত তোমাদের প্রভু সেই আল্লাহ যিনি আকাশ মন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনের মধ্যে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠেন”। (সূরা আরাফ: ৫৪)

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অতি সুন্দর কথা বলেছেন যা অত্যন্ত উপকারী বিধায় এখানে প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেন, এ প্র্রসঙ্গে লোকদের বক্তব্য অনেক, এর বিস্তারিত বর্ণনার স্থান এখানে নয়। আমরা এ ব্যাপারে ঐ পথই গ্রহণ করবো, যে পথে চলেছেন পূর্বেকার সুযোগ্য মনীষী ইমাম মালেক, আওযায়ী, ছাওরী, লাইছ বিন সা‘দ, শাফেয়ী, আহমদ বিন রাহওয়া সহ তৎকালীন ও পরবর্তী মুসলিমদের ইমামগণ। আর তা হলো: আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেয়া, এর কোন ধরণ, সাদৃশ্য বা গুণ বিমুক্তি নির্ণয় ব্যতিরেকেই। সাদৃশ্য পন্থিদের মস্তিষ্কে প্রথম লগ্নেই আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে যে কল্পনার উদয় ঘটে তা আল্লাহপাক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদুরিত। কেননা কোন ব্যাপারেই কোন সৃষ্টি আল্লাহর সদৃশ হতে পারে না। তাঁর সমতুল্য কোন বস্তু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তদ্রুপই, যেরূপ শ্রদ্ধেয় ইমামগণ বলে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারীর উস্তাদ নায়ীম বিন হাম্মাদ আল খুজায়ী অন্যতম। তিনি বলেছেন: যে লোক আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কোন ব্যাপারে সদৃশ মনে করে সে কাফের এবং যে আল্লাহুর সব গুণরাজি অস্বীকার করে যা দ্বারা তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন, সেও কাফের। কেননা আল্লাহকে স্বয়ং তিনি বা তাঁর রাসূল যেসব গুণরাজির দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোন সাদৃশ্য নেই।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে কুরআন শরীফের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত গুণরাজি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যা, আল্লাহর মহত্বের সাথে মানানসই হয় এবং তাঁকে যাবতীয় অপূর্ণতা, খুঁত বা ক্রটি-বিচ্যুতি থেকে পাক-পবিত্র রাখে সে ব্যক্তিই হেদায়াতের পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলে।

চলবে……

সহীহ আক্বীদা [২]

আকীদা তাহাবী

সংকলক : ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, ফকীহ, আল্লামা আবু জাফর ওয়াররাক আততাহাবী র. মিসরে অবস্থান কালে বলেছিলেন:

ফুকাহায়ে মিল্লাত আবূ হানীফা আন-নুমান বিন সাবেত আল কুফী, আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারী এবং আবু আব্দুল্লাহ বিন আল হাসান আশ শায়বানী রাহিমাহুমুল্লাহদের অনুসৃত নীতি অনুসারে এটা হল সাহাবা ও পরবর্তী জামা’আত সলফে সলেহীনদের ‘আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস। এবং তারা ধর্মের নীতিসমূহের প্রতি যে ‘আক্বীদাহ পোষণ করতেন এবং সে সব নীতি অনুসারে তারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের মনোনীত ধর্ম ইসলাম অনুসরণ করতেন তার বিবরণ।

মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে আমি বলছি :

  • ৪৯। আরশ এবং কুরসী সত্য।
  • ৫০। আল্লাহ তাআলা আরশ ও অন্যান্য বস্তু হতে অমুখাপেক্ষী।
  • ৫১। তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সব কিছুরই উর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাঁকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে অক্ষম।
  • ৫২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীল বা বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কথোপকথন করেছেন। এর পতি আমরা বিশ্বাস রাখি, উহার সত্যতা স্বীকার করি এবং তার উপর একান্ত আনুগত্য প্রকাশ করে থাকি।
  • ৫৩। আল্লাহর ফেরেশ্‌তাগন এবং নবীগণের প্রতি ঈমান রাখি এবং রাসূলগণের প্রতি প্রেরিত কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করি এবং সাক্ষ্য প্রদান করি যে, তারা প্রকাশ্য সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
  • ৫৪। আমাদের ক্বিবলাকে (বায়তুল্লাহ) যারা ক্বিবলা বলে স্বীকার করে আমরা তাদেরকে মুসলিম ও মু’মিন বলে আখ্যায়িত করি যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নবী কর্তৃক প্রবর্তিত শরীয়তকে স্বীকার করে এবং তিনি যা কিছু বলেছেন তাকে সত্য বলে গ্রহণ করে।
  • ৫৫। আমরা আল্লাহর সত্ত্বা (জাত) সম্পর্কে অন্যায় গবেষণায় প্রবৃত্ত হই না এবং তাঁর দ্বীন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হই না।
  • ৫৬। কুরআন সম্পর্কে আমরা কোন তর্কে লিপ্ত হই না এবং সাক্ষ্য প্রদান করি যে, কুরআন বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালক পরওয়ারদিগারের কালাম। এটা জিবরীল আমীনের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর উহা নবীকূল শিরোমণি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিক্ষা দেয়া হয়। ইহা আল্লাহ তাআলার কালাম, কোন সৃষ্টির কালাম এর সমতুল্য নয়। আর আমরা একে মাখলুক বলি না এবং আমরা মুসলিম মিল্লাতের বিরুদ্ধাচরণ করি না।
  • ৫৭। কোন গুনাহর কারণে কোন আহলে ক্বিবলাকে (মুসলিমকে) কাফির বলে অভিহিত করি না যতক্ষণ না সে উক্ত গুনাহকে হালাল (জায়েয) মনে করে।
  • ৫৮। আমরা আশা করি যে, সৎকর্মশীল মু’মিনগণকে আল্লাহপাক ক্ষমা করবেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আমরা তাদের সর্ম্পকে নিশ্চিত নই, আর তাদের জান্নাতে প্রবেশেরও ঘোষণা দান করি না এবং তাদের গুনাহসমূহের জন্য আল্লাহর নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং আমরা তাদের জন্য আশংকা বোধ করব, কিন্তু নিরাশ হব না।
  • ৬০। নিশ্চিন্ততা ও নৈরাশ্যবোধ একজন মুসলিমকে মিল্লাতে ইসলামিয়া থেকে বের করে দেয়। অথচ আহলে ক্বিবলার জন্য সত্য পথ এতদুভয়ের মধ্যে নিহিত।
  • ৬১। আল্লাহ রাব্বুল ইয্‌যত যে সব বস্তুকে ঈমানের অংগ করেছেন সে সব বস্তুকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কোন বান্দাই ঈমানের বৃত্ত হতে বের হয় না।
  • ৬২। শরীআত এবং উহার ব্যাখ্যা- যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে সঠিকভাবে প্রাপ্ত, তার সবগুলো সত্য।
  • ৬৪। ঈমান এক। ঈমানদার ব্যক্তিরা প্রকৃত প্রস্তাবে সবাই সমান, তবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য হয়ে থাকে আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কৃ-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ এবং উত্তম বস্তুকে আকড়ে ধরার মাধ্যমে।
  • ৬৫। সব মু’মিন দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অলী এবং তাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে তাঁর অধিক অনুগত এবং কুরআনের বেশী অনুসারী।
  • ৬৬। ঈমান হচ্ছেঃ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্‌তা, তাঁর গ্রন্থ (আল-কুরআন), তাঁর রাসূল, ক্বেয়ামাহ দিবস, তাক্বদীরের ভাল মন্দ, মিষ্টি ও তিক্ত, সবই আল্লাহর তরফ থেকে- এই সবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
  • ৬৭। আমরা উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করি, আমরা রাসূলদের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাঁরা যে সকল বিধি-বিধান নিয়ে এসেছিলেন তা সবই সত্য বলে স্বীকার করি।
  • ৬৮। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মাতের মধ্যে যারা কবীরাহ গুনাহ করবে তারা জাহান্নামে যাবে বটে, কিন্তু চিরস্থায়ী হবে না- যদি তারা একত্ববাদী হযে মৃত্যু বরণ করে, আর তাওবা নাও করে, কিন্তু ঈমানদার হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করে এবং তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও বিচারের উপর নির্ভরশীল হয়। তবে যদি তিনি চান তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং নিজ গুণে তাদের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করবেন। যেমন, আল্লাহ বারী তা’আলা তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেনঃ“শিরক ব্যতীত অন্যান্য সব অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪- ৪৮ আয়াত)
    আর যদি তিনি চান, তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবেন এবং তা হবে তার ন্যায় বিচার। অতঃপর আল্লাহপাক তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর অনুমতিপ্রাপ্ত সুপারিশকারীদের সুপারিশের ফলে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।এর কারণ হল এই যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের অস্বীকারকারীদের ন্যায় করেননি, যারা তাঁর হিদায়েতের পথ হতে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা তো তাঁর বন্ধুত্ব লাভে বঞ্চিত হয়েছে। হে ইসলাম ও মুসলিমদের অভিভাবক মহান আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখ যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা তোমার সাথে মিলিত হই।
  • ৬৯। প্রত্যেক সৎ ও পাপী মুসলিমের পিছনে নামাজ আদায় করা এবং প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জন্য জানাযার নামাজ আদায় করা জায়েয বলে আমরা মনে করি।
  • ৭০। আমরা কাউকে জান্নাতী ও জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করব না এবং কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফরী ও শিরকের অথবা নিফাকের সাক্ষ্য প্রদান করব না, যতক্ষণ না এগুলির কোন একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেই।
  • ৭১। আমীর ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না, যদিও তারা অত্যাচার করে। আমরা তাদের অভিশাপ দিব না এবং আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিব না। তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সাপেক্ষে ফরয, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যচরণের আদেশ দেয়। আমরা তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দু’আ করব।
  • ৭৩। আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসরণ করব। আমরা জামাআত হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং জামাআতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকব।
  • ৭৪। আমরা ন্যায় পরায়ন ও আমানতদার ব্যক্তিদেরকে ভালবাসব এবং অন্যায়কারী ও আমানতের খেয়ানতকারীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করব।
  • ৭৫। যে সব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট সে সব বিষয়ে আমরা বলবঃ “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অধিক জানেন।
  • ৭৬। সফরে ও গৃহে হাদীছের নিয়মানুসারে আমরা মোজার উপরে মাসেহ করা জায়েয মনে করি।
  • ৭৭। মুসলিম শাসক ভাল হউক কিংবা মন্দ হউক- তার অনুগামী হয়ে জিহাদ করা এবং হজ করা কেয়ামাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ দু’টি জিনিসকে কেউ বাতিল বা ব্যাহত করতে পারবে না।
  • ৭৮। আমরা কিরামান-কাতিবীন ফেরেশ্‌তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আমাদের পর্যবেক্ষক নির্বাচিত করেছেন।
  • ৭৯। আমরা মালাকুল মাউতের (মৃত্যুর ফেরেশ্‌তার) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি। তাকে বিশ্বের রূহসমূহ কবয্‌ করার দায়িত্ব অর্পণ রা হয়েছে।
  • ৮০। আমরা শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য কবরের আযাবের প্রতি বিশ্বাস রাখি এবং এও বিশ্বাস করি যে, কবরের মুনকার ও নাকীর (দুই ফেরেশ্‌তা) মৃত ব্যক্তির রব, দ্বীন, ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ছাহাবায়ে কেরামদের নিকট হতে বহু হাদীছ ও উক্তি বর্ণিত হয়েছে।
  • ৮১। কবর জান্নাতের বাগিচা সমূহের অন্যতম অথবা ইহা জাহান্নামের গহ্বর সমূহের অন্যতম।
  • ৮২। আমরা পুনরুত্থান, কেয়ামাত দিবস আমলের প্রতিফল, হিসাব নিকাশ আমলনামা পাঠ, সওয়াব (প্রতিদান) শাস্তি, পুলসিরাত এবং মীযান এসবই সত্য বলে বিশ্বাস করি।
  • ৮৩। জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব হতে সৃষ্ট হয়ে আছে। এ দু’টি কোন দিন লয় প্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয় প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তা হবে তার ন্যায় বিচার। আর প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।
  • ৮৪। ভাল ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
  • ৮৫। “সামর্থ”- যে কোন কর্মের জন্য অপরিহার্য। উহা দু’ধরণের- (১) তাওফীক, (যা আল্লাহ পাকের অন্যতম গুণ)। এর দ্বারা মাখলুককে ভুষিত করা যায় না। এ ধরণের সামর্থ বান্দার কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট (কর্ম বাস্তবায়িত করার জন্য অপরিহার্য)। (২) যে “সামর্থ” কর্মের পূর্বেই প্রয়োজন যেমন সুস্থতা, সচ্ছলতা, ক্ষমতা, অঙ্গ প্রতঙ্গের নিরাপত্তা, আর এরই সাথে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“তিনি কাউকে তার ক্ষমতার উর্ধ্বে দায়িত্ব দেন না। (সূরা বাকারা ২-২৮৬ আয়াত)।
  • ৮৬। বান্দাদের যাবতীয় কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি এবং উহা বান্দাদের উপার্জন।
  • ৮৭। আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের উপর তাদের সামর্থের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন না। বরং তারা যতটুকু দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে ততটুকু বোঝাই তিনি চাপিয়ে থাকেন। এটাই হলঃ “আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন সৎ কর্ম হতে বিরত থাকার ক্ষমতা কারও নেই।” এর ব্যাখ্যা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া কারো কোন প্রকার নড়া-চড়া এবং আল্লাহর অবাধ্যচরণ হতে বিরত থাকার ক্ষমতা নেই। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তাআলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য বরণ করার এবং তার উপরে দৃঢ় থাকার সাধ্য কারও নেই।
  • ৮৮। পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান, তাঁর ফায়সালা এবং তাঁর বিধান অনুসারেই হয়ে থাকে। তাঁর ইচ্ছা সমস্ত ইচ্ছার উপরে। তাঁর ফায়সালা সমস্ত কৌশলের ঊর্ধ্বে। যা ইচ্ছা তিনি তাই করেন। তিনি কখনও অত্যাচার করেন না। তিনি সর্ব প্রকার কলুষ ও কালিমা হতে পবিত্র এবং সব রকমের দোষ ত্রুটি হতে বিমুক্ত। তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। পক্ষান্তরে, অন্য সবই নিজের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আম্বীয়া ২১ : ২৩ আয়াত)
  • ৮৯। জীবিত ব্যক্তিদের দুআ এবং দান খয়রাত দ্বারা মৃত বক্তিরা উপকৃত হয়ে থাকে।
  • ৯০। আল্লাহ বারী তাআলা দুআ কবুল করেন এবং বান্দাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন।
  • ৯১। আল্লাহ তাআলা সব কিছুরই মালিক এবং তাঁর মালিক কেউ নয়। মুহুর্তের জন্যও কারো পক্ষে আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি মুহুর্তের জন্য আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হতে চাবে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং লাঞ্ছিত হবে।
  • ৯২। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ক্রুদ্ধ এবং রুষ্ট হন, তবে তা মাখলুকের ন্যায় নয়।
  • ৯৩। আমরা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদেরকে ভালবাসি, তবে তাদের ভালবাসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করি না এবং তাদের কাউকেও তিরস্কার করি না। তাদের সাথে যারা বিদ্বেষ পোষণ করে অথবা যারা তাদেরকে অসম্মানজনক ভাবে স্মরণ করে আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি। আমরা তাদেরকে শুধু কল্যাণের সাথেই স্মরণ করি। তাদের সঙ্গে মহব্বত রাখা দ্বীন ও ঈমান এবং এহসানের অংশ। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, কুফরী, মুনাফিকী এবং সীমা লংঘন করার পর্যায়ভূক্ত।
  • ৯৪। আমরা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর সর্বপ্রথম আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহুর খেলাফতবে স্বীকৃতি দেই। অতঃপর পর্যায়ে ক্রমে উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) উসমান (রাঃ) ও আলীকে (রাঃ) খলীফা বলে স্বীকার করি। তাঁরাই ছিলেন সুপথগামী খলীফা ও হিদায়েত-প্রাপ্ত নেতা।
  • ৯৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দশজন সাহাবার নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পর্কে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, আমরা তাদের জান্নাতে প্রবেশের স্বাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ, এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দান করেছেন এবং তাঁর উক্তি সত্য।তাঁরা হলেনঃ

    • (১) আবু বকর (রাঃ)
    • (২) উমর (রাঃ)
    • (৩) উসমান (রাঃ)
    • (৪) আলী (রাঃ)
    • (৫) তালহা (রাঃ)
    • (৬) যুবাইর (রাঃ)
    • (৭) সা’দ (রাঃ)
    • (৮) সা’ঈদ (রাঃ)
    • (৯) আউফ (রাঃ) এবং
    • (১০) আমীনুল উম্মাহ (জাতির বিশ্বাসভাজন) আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)

     

  • ৯৬। যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবা ও তাঁর পুতঃপবিত্র সহধর্মিনী ও বংশধরগণ সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করে সে মুনাফিকী হতে নিস্কৃতি পায়।
  • ৯৭। সালাফে ছালেহীন (পূর্ববর্তী নেককার বান্দাগণ) ও তাঁদের পদাংক অনুসারী সৎ কর্মশীল ব্যক্তিগণ এবং ফক্বীহ ও চিন্তাবিদগণকে আমরা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি, আর যারা এদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে তারা সঠিক পথের পথিক নয়।
  • ৯৮। আমরা কোন অলীকে কোন নবীর উপরে প্রাধান্য দেই না বরং আমরা বলি, যে কোন একজন রাসূল সমস্ত আওলীয়াকুল হতে শ্রেষ্ঠ।
  • ৯৯। আওলীয়াদের কারামত সম্পর্কে যে খবরাখবর আমাদের নিকট পৌঁছেছে এবং যা বিশ্বস্ত বর্ণনার মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি।
  • ১০০। আমরা কেয়ামাতের নিম্নলিখিত নিদর্শনাবলীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিঃ দাজ্জালের আবির্ভাব, আসমান হতে ঈসা আ. এর অবতরণ, পশ্চিম গগনে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরয নামক প্রাণীর নিজ স্থান হতে আবির্ভাব।
  • ১০১। আমরা কোন ভবিষ্যৎ বক্তা অথবা কোন জ্যোতিষীকে সত্য বলে মনে করি না এবং ঐ বক্তিকেও সত্য বলে মনে করি না, যে আল্লাহর কিতাব, নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ ও উম্মতের এজমার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখে।
  • ১০২। আমরা (মুসলিম জাতির) ঐক্যকে সত্য ও সঠিক বলে মনে করি এবং তা হতে বিচ্ছিন্নতাকে বক্রতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করি।
  • ১০৩। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে আল্লাহর দ্বীন এক এবং অভিন্ন। তা হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” (সুরা ইমরান, ৩ – ১৯ আয়াত)।

অন্যত্র তিনি আরও বলেন-

“এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়েদা,আয়াত : ৩ )

  • ১০৪। ইসলাম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম। এতে বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতা, তাশবীহ ও তা’তীল জবর ও ক্বদরের স্থান নেই। ইহা নিশ্চিন্ততা ও নৈরাশ্যের মধ্যবর্তী একটি পথ।
  • ১০৫। এগুলিই হচ্ছে আমাদের দ্বীন এবং আমাদের আক্বীদাহ বা মৌলিক ধর্ম বিশ্বাস। যা প্রকাশ্যে এবং অন্তরে উহা ধারণ করি। যারা উল্লিখিত বিষয় বস্তুর বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনই সম্পর্ক নেই।

সর্বশেষ বারগাহে এলাহীতে আমাদের আরযঃ তিনি যেন আমাদেরকে ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক প্রদান করেন এবং আমাদের জীবনাবসান ঈমানের সাথে করেন এবং আমাদেরকে রক্ষা করেন বিভিন্ন প্রবৃত্তি পরায়ণতা ও মতামতসমূহ হতে এবং মুশাববিহা, মু’তাযিলা, জাহমিয়া, জাবরিয়া, ক্বাদরিয়া প্রভৃতি বাতিল মাযহাবসমূহের মধ্যে যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং যারা ভ্রষ্টতার উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য শপথ গ্রহণ করে, আমরা তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করছি। তারা আমাদের মতে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত। পরিশেষে আল্লাহর নিকটেই যাবতীয় ভ্রান্তি হতে নিরাপত্তা এবং সৎপথে চলার তাওফীক কামনা করছি।


সহীহ আক্বীদা [১]

আকীদা তাহাবী

সংকলক : ইমাম আবু জাফর তাহাবী রহ.

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ, ফকীহ, আল্লামা আবু জাফর ওয়াররাক আততাহাবী র. মিসরে অবস্থান কালে বলেছিলেন:

ফুকাহায়ে মিল্লাত আবূ হানীফা আন-নুমান বিন সাবেত আল কুফী, আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইবরাহীম আল আনসারী এবং আবু আব্দুল্লাহ বিন আল হাসান আশ শায়বানী রাহিমাহুমুল্লাহদের অনুসৃত নীতি অনুসারে এটা হল সাহাবা ও পরবর্তী জামা’আত সলফে সলেহীনদের ‘আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস। এবং তারা ধর্মের নীতিসমূহের প্রতি যে ‘আক্বীদাহ পোষণ করতেন এবং সে সব নীতি অনুসারে তারা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের মনোনীত ধর্ম ইসলাম অনুসরণ করতেন তার বিবরণ।

মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে আমি বলছি :

  • ১। নিশ্চয়ই আল্লাহ এক, যাঁর কোন শরীক (অংশীদার) নেই।
  • ২। তাঁর মত কিছুই নেই। (কেউ তাঁর সমতুল্য নয়)।
  • ৩। কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।
  • ৪। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
  • ৫। তিনি অনাদি, যার কোন আদি নেই। তিনি অনন্ত, যার কোন অন্ত নেই।
  • ৬। তাঁর ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই।
  • ৭। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুই সংঘটিত হয় না।
  • ৮। কল্পনা তাঁর ধারে কাছে পৌঁছে না এবং ইন্দ্রিয় জ্ঞান তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না।
  • ৯। সৃষ্ট বস্তু তাঁর সদৃশ্য হতে পারে না।
  • ১০। তিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই এবং তিনি চির জাগ্রত, যাঁর নিদ্রার দরকার নেই।
  • ১১। তিনি এমন সৃষ্টিকর্তা যার সৃষ্টিতে কোন সাহায্যের মুখাপেক্ষী হন না এবং তিনি অক্লান্ত রিযক দাতা।
  • ১২। তিনি নির্ভয়ে প্রাণ সংহারকারী এবং নির্বিবাদে পুনরুত্থানকারী।
  • ১৩। সৃষ্টির বহু পূর্বেই তিনি তাঁর অনাদি গুণাবলীসহ বিদ্যমান ছিলেন, আর সৃষ্টির কারণে তাঁর নতুন কোন গুণের সংযোজন ঘটেনি এবং তিনি তাঁর গুণাবলীসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনি তিনি স্বীয় গুণাবলীসহ অনন্ত থাকবেন।
  • ১৪। সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “খালেক” (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি। অথবা বিশ্ব জাহান সৃষ্টির কারণে তাঁর গুণবাচক নাম “বারী” (উদ্ভাবক) হয়নি।
  • ১৫। প্রতিপাল্যের অবিদ্যমানতায়ও তিনি ছিলেন ‘রব’ বা প্রতিপালক, আর মাখলুক সৃষ্টির পূর্বেও তিনি ছিলেন ‘খালেক’ বা সৃষ্টিকর্তা।
  • ১৬। মৃতকে জীবন দান করার ফলে তাঁকে ‘জীবনদানকারী’ বলা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কোন বস্তুকে জীবন দান করার পূর্বেও তিনি এই নামের (জীবন দানকারী) অধিকারী ছিলেন। অনুরূপভাবে তিনি সৃজন ছাড়াই সৃষ্টি কর্তার নামের অধিকারী ছিলেন।
  • ১৭। এটা এই জন্য যে, তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর অনুগ্রহ ভিখারী; সব কিছুই তাঁর জন্য সহজ তিনি কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। “তাঁর মত কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
  • ১৮। তিনি স্বীয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন।
  • ১৯। এবং তাদের (সৃষ্ট বস্তুর) জন্য সব কিছুরই পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।
  • ২০। এবং তাদের জন্য মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করেছেন।
  • ২১। সৃষ্ট জীবের সৃষ্টির পূর্বে কোন কিছুই তাঁর অজ্ঞাত ছিল না। জীব জগতের সৃষ্টির পূর্বেই তাদের সৃষ্টির পরবর্তীকালের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন।
  • ২২। এবং তিনি তাদের স্বীয় আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর অবাধ্যচরণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
  • ২৩। সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এবং একমাত্র তাঁরই ইচ্ছা কার্যকর হয়, এবং (আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া) বান্দার কোন ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। অতএব তিনি বান্দাদের জন্য যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না।
  • ২৪। আল্লাহপাক যাকে ইচ্ছা হিদায়েত, আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ, পক্ষান্তরে যে পথভ্রষ্ট হতে চায়, তাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে অপমানিত ও বিপদগ্রস্ত করেন। এটা তাঁর ন্যায় বিচার।
  • ২৫। সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে থাকে তাঁর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে এবং সুবিচারের মাধ্যমে।
  • ২৬। তিনি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমকক্ষ হওয়ার উর্ধ্বে।
  • ২৭। তাঁর মীমাংসার কোন পরিবর্তন নেই। কেউই তাঁর নির্দেশ বাতিল করার নেই এবং তাঁর নির্দেশকে পরাভূত করারও কেউ নেই।
  • ২৮। উপরে উল্লিখিত সব কিছুর প্রতিই আমরা ঈমান এনেছি এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করছি যে, এর প্রতিটি বিষয় আল্লাহর তরফ হতে সমাগত।
  • ২৯। নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নির্বাচিত বান্দা, মনোনীত নবী এবং প্রিয় রাসূল।
  • ৩০। তিনি নবীগণের সর্বশেষ, মুত্তাক্বীনদের ইমাম, রাসূলগণের নেতা এবং বিশ্বের মহান প্রতিপালকের হাবীব (বন্ধু)।
  • ৩১। তাঁর পরবর্তী যুগে নবুওয়াতের যে সব দাবী উত্থাপিত হয়েছে, তার সবগুলিই ভ্রান্ত ও প্রবৃত্তি পরায়ণতার শিকার।
  • ৩২। তিনি সত্য, হিদায়েত এবং নূর সহকারে সকল জিন ও সমস্ত মাখলুকের প্রতি প্রেরিত।
  • ৩৩। নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর কালাম, ইহা আল্লাহর নিকট হতে উৎসারিত হয়েছে, তবে সাধারণ কথা বার্তার পদ্ধতিতে নয়। এই কালামকে তিনি তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি অহী হিসাবে নাযিল করেছেন এবং বিশ্বাসীগণ তাঁকে এ ব্যাপারে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এবং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করেছেন যে, উহা সত্যিই আল্লাহর কালাম। উহা মাখলুকের কালামের ন্যায় সৃষ্ট বস্তু নয়। অতএব, যে ব্যক্তি একথা শুনেও তাকে মানুষের কালাম বলে ধারণা করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ বারী তাআলা তার নিন্দাবাদ করেছেন, তিরস্কার করেছেন এবং তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “শীঘ্রই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সূরা মুদদাচ্ছির, ৭৪- ২৬আয়াত) আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন ঐ ব্যক্তির জন্য যে বলবেঃ “এটাতো মানুষের কথা বৈ আর কিছুই নয়”। (সূরা মাদ্দাচ্ছির ৭৪ -২৫ আয়াত) অতএব, আমরা অবহিত হলাম এবং বিশ্বাস স্থাপন করলাম যে, ইহা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তারই কালাম এবং সৃষ্ট জীবের কালামের সাথে এর কোন তুলনা হয় না।
  • ৩৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানবীয় কোন গুণ আরোপ করে, সে কাফের। অতএব, (ক) যে ব্যক্তি এতে অন্তঃদৃষ্টি প্রদান করবে সে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে। ফলে (আল্লাহ সম্পর্কে) কাফেরদের মত নিরর্থক কথা বলা হতে বিরত থাকবে এবং (খ) সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর গুণাবলীতে মানুষের মত নন।
  • ৩৫। আল্লাহর সাথে সাক্ষাত জান্নাতীদের জন্য সত্য। তার পদ্ধতি আমাদের অজানা। এ ব্যাপারে কুরআন ঘোষণা করেছেঃ “সেদিন কতকগুলো মুখমন্ডল উজ্জল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সুরা কিয়ামা: ৭৫- ২২ আয়াত) । এর ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন এবং এ সম্পর্কে যা কিছু সহীহ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে তা অবিকৃত অবস্থায় গৃহীত হবে। অতএব, এতে আমরা আমাদের বিবেক বুদ্ধি অনুসারে কোন প্রকার অসঙ্গত তাৎপর্যের অনুপ্রবেশ ঘটাব না, অথবা স্বীয় প্রবৃত্তির প্ররোচনায় কোন সংশয় সৃষ্টিকারীর সংশয়কে প্রশয় দেব না। কারণ, ধর্মীয় ব্যাপারে একমাত্র সেই ব্যক্তিই পদস্খলন হতে নিরাপদ থাকতে পারে যে আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে (ভুল ধারণাকারীর বিভ্রান্তি হতে) নিরাপদ থাকে এবং যে ব্যক্তি সংশয়যুক্ত ব্যাপার সমূহকে সর্বজ্ঞানের অধিকারী আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়।
  • ৩৬। আত্ম-সমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার ছাড়া কারও পা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকতে পাবে না। আর যে ব্যক্তি এমন বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের পিছনে লেগে থাকবে যা তার জ্ঞানের নাগালের বাইরে এবং যার বিবেক আত্মা- সমর্পণে সন্তুষ্ট হবে না সে নির্ভেজাল তাওহীদ, নির্দোষ মারেফাত ও বিশুদ্ধ ঈমান হতে বঞ্চিত থাকবে। অতএব, সে কুফরী ও ঈমান সত্য ও মিথ্যা, স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি অনিশ্চয়তার বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকবে। সে না সত্যবাদী মু’মিন হবে, আর না অস্বীকারকারীরা মিথ্যাবাদী হবে।
  • ৩৭। যে ব্যক্তি জান্নাতীদের আল্লাহর সাক্ষাত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে, স্বীয় জ্ঞান অনুসারে সেই সাক্ষাতের ভুল ব্যাখ্যা দিবে, সে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রকৃত তাৎপর্য্য হচ্ছে- সে সম্পর্কে কোনরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার অপচেষ্টা না করা এবং উহাকে অবিকৃত ভাবে গ্রহণ করা। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের অনুসৃত নীতি। যে ব্যক্তি নফী অস্বীকৃতি এবং তাশবীহ (সাদৃশ্য) হতে আত্মরক্ষা করবে না তার নিশ্চিত পদস্খলন ঘটবে এবং সে সঠিকভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণায় ব্যর্থ হবে। কারণ, আমাদের মহান প্রতিপালক একক ও নজীরবিহীন হওয়ার গুণে ¸গুন্বানিত মাখলুকের মধ্যে কেউ তাঁর গুণে ভূষিত নয়।
  • ৩৮। আল্লাহপাক সীমা পরিধি থেকে মুক্ত। তিনি অঙ্গ-প্রতঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুখাপেক্ষীহীন। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না।
  • ৩৯। মি’রাজ সত্য, মুহাম্মদকে নৈশকালে ভ্রমণ করান হয়েছিল, তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে উর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো উর্ধ্বে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন। তার অন্তর যা দেখেছিল তা মিথ্যা নয়। আল্লাহপাক তাঁর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রহমত বর্ষন করুন।
  • ৪০। হাউয-এ কাওসার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানিত করেছেন এবং যা তাঁর উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে তাঁকে দান করেছেন। এ বিষয়টি সত্য।
  • ৪১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত, যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন তা সত্য ।
  • ৪২। “মীসাক” (অঙ্গীকার), যা আল্লাহ তাআলা আদম এবং তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তা সত্য।
  • ৪৩। অনাদিকাল হতে আল্লাহপাক সার্বিকভাবে জানেন যে, কত লোক জান্নাতে যাবে আর কত লোক জাহান্নামে যাবে। এতে ব্যতিক্রম হবে না। এদের সংখ্যা কমও হবে না, বেশীও হবে না।
  • ৪৪। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত এবং যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ সাধ্য। শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগ্য সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় হতভাগ্য বলে নির্ধারিত হয়েছে।
  • ৪৫। “তাকদীর” সম্পর্কে আসল কথা এই যে, এটা বান্দা সম্পর্কে আল্লাহর একটি রহস্য। এ রহস্য তাঁর নিকটবর্তী কোন ফেরেশ্‌তাও জানেন না অথবা তাঁর কোন প্রেরিত নবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে তথ্য আবিস্কার করতে যাওয়া অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ধৃষ্টতার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমা লংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা ‘তাকদীর’ সম্পর্কিত জ্ঞান সৃষ্ট বস্তু হতে গোপন রেখেছেন এবং এর উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা (তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে) জিজ্ঞাসিত হবে”। (সুরা আম্বীয়া ২১- ২৩ আয়াত) অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে “তিনি কেন এ কাজ করলেন?” সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হল।
  • ৪৬। আল্লাহর নূরে জ্যোতিদীপ্ত অলী আওলিয়াগনও উক্ত বিষয় (অর্থাৎ তক্বদীরকে অনুরূপভাবে মেনে নেয়ায়) থেকে মুক্ত নন। এতদ্বারা জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞা বিভূষিত ব্যক্তিদের মর্যাদাই প্রতিষ্ঠিত হয়। (এ প্রসঙ্গে) উল্লেখ্য যে, জ্ঞান দু’প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট অবিদ্যমান। বিদ্যমানকে অস্বীকারকরাও যেমন কুফরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফরী। বিদ্যমান জ্ঞানের সাধনা করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের আন্বেষান করা হতে বিরত থাকাই সুদৃঢ় ঈমানের পরিচয়।
  • ৪৭। লাওহে মাহফুয এবং তাতে যা কিছু লিখিত হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি। আমরা আরও বিশ্বাস করি কলমের প্রতি। যা হবে বলে আল্লাহ লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা হবেই। সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তার কিছু রোধ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। যা প্রলয় দিবস পর্যন্ত ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে এবং কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার ভাগ্যে লিখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না এবং যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা হবেই হবে।
  • ৪৮। বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলি সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত রয়েছেন। অতএব, তিনি তাকে তাদের জন্য অকাট্য ও অবিচল ভাগ্য হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। এটাকে কেউ বানচাল করতে পারবে না, অথবা এর বিরোধিতাও করতে পারবে না, একে কেউ অপসারিত অথবা পরিবর্তিতও করতে পারবে না। আসমান ও যমীনের কোন মাখলুক একে সংকুচিত কিংবা বর্ধিত করতে পারবে না। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তাআলার ওয়াহদানিয়াত ও রবুবিয়ত সম্পর্কে স্বিকৃতী দান। যেমন আল্লাহ বারী তাআলা তাঁর গ্রন্থে ঘোষণা করেছেনঃ “তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫- ৩ আয়াত)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেনঃ

“আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত।” (সূরা আহযাব ৩৮ আয়াত)।

অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগগ্রস্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হবে।

ঈমান এর পরিচয়

ঈমান এর পরিচয়

ঈমানের অর্থঃ

ঈমান শব্দটি ‘আমন’ ধাতু থেকে নির্গত। ‘আমন’ এর মূল অর্থ হচ্ছে, আত্মার প্রশান্তি ও নির্ভীকতা লাভ। এই ‘আমন’ ধাতুই ক্রিয়ারুপ হচ্ছে ঈমান যার তাৎপর্য হচ্ছে, মনের ভিতর কোন  কথা প্রত্যয় ও সততার সাথে এমনভাবে দৃঢ়মূল করে নেয়া যেন তার প্রতিকূল কোন জিনিসের পথ খুঁজে পাওয়া ও প্রবেশ করার কোন প্রকার আশংকাই না থাকে। ঈমানের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আন্তরিক বিশ্বাস। রাসুল (সাঃ) আল্লাহর নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, উহার বিশদ বিষয়গুলোকে বিশদভাবে এবং সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলোকে সংক্ষিপ্তভাবে আন্তরিক বিশ্বাস করার নাম ঈমান। ইসলামের পরিভাষায় ঈমান হল : আত্মার স্বীকৃতি বা সত্যায়ন, মৌখিক স্বীকৃতি এবং আত্মা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়।

 ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের অর্থঃ

ওমর (রা.) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আমাদের সামনে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁর পোশাক ছিল ধবধবে সাদা আর চুল ছিল কুচকুচে কালো। দূর হতে ভ্রমণ করে আসার কোন লক্ষণও তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না, অথচ তিনি আমাদের পরিচিতও ছিলেন না। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটবর্তী হলেন, তাঁর হাঁটুতে হাঁটু লাগালেন এবং তাঁর দু‘হাতের তালু নিজের উরুর উপর রেখে বসলেন। তারপর বললেনঃ হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।

উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ ইসলাম হচ্ছে এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানে সিয়াম পালন করা এবং সামর্থ থাকলে আল্লাহর ঘরের হজ করা। উত্তর শুনে তিনি বললেনঃ সত্য বলেছেন। আমরা অবাক হয়ে গেলাম-প্রশ্নও তিনি করছেন, আবার তিনিই উত্তরকে সত্য বলে মানছেন।

তিনি আবার বললেনঃ এখন আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুনউত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ উহা হচ্ছে আল্লাহপাকের উপর, তাঁর ফেরেশ্তাদের (মালাইকাদের) উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, তাঁর রাসূলদের উপর এবং আখিরাতের উপর এবং তকদীরের ভাল মন্দের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা উত্তর শুনে উনি বললেনঃ সত্য বলেছেন। তারপর আবার প্রশ্ন করলেনঃ এখন আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ  এমনভাবে আল্লাহ তাআলার ইবাদত কর যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তাঁকে নাও দেখ, তিনিতো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। তারপর তিনি বললেনঃ আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে বলুন। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ প্রশ্নকারী হতে জবাব দানকারী এ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত নয়। তারপর তিনি বললেনঃ তবে আমাকে তার আলামত বা নিদর্শন সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে। এরপর আগন্তুক চলে গেলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ  হে উমার ! তুমি কি জান প্রশ্নকারী কে? উত্তরে বললামঃ  আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। তিনি বললেনঃ  ইনি ছিলেন জিব্রাইল। তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। (বর্ণনায় মুসলিম)

ঈমান সম্পর্কিত কতিপয় আয়াতঃ

ঈমান সম্পর্কে  মহান আল্লাহ বলেন-

 

فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا ۖ وَّإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ ۖ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿١٣٧

অর্থঃ অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। (সূরা বাকারাঃ ১৩৭)

وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَىٰ أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ ۖ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ ﴿٨٣

অর্থঃ আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতি পালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।  (সূরা আল মায়িদাহঃ ৮৩)

فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا ﴿١٧٥

অর্থঃ অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।  (সূরা আন নিসাঃ ১৭৫)

وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ أُولَـٰئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ ۗ وَكَانَ اللَّـهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴿١٥٢

অর্থঃ আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং তাঁদের কারও প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদেরকে প্রাপ্য সওয়াব দান করা হবে। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। (সূরা আন নিসাঃ ১৫২)  

 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّـهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّـهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴿١٣٦

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তাঁর রসূলও তাঁর কিতাবের উপর, যা তিনি নাযিল করেছেন স্বীয় রসূলের উপর এবং সেসমস্ত কিতাবের উপর, যেগুলো নাযিল করা হয়েছিল ইতিপূর্বে। যে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, তাঁর কিতাব সমূহের উপর এবং রসূলগণের উপর ও কিয়ামতদিনের উপর বিশ্বাস করবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে। (সূরা আন নিসাঃ ১৩৬) 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। (সূরা আন নিসাঃ ৫৯)

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۖ لَّهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا ﴿٥٧

অর্থঃ আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, অবশ্য আমি প্রবিষ্ট করাব তাদেরকে জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহর সমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্ত্রীগণ। তাদেরকে আমি প্রবিষ্ট করব ঘন ছায়া নীড়ে। (সূরা আন নিসাঃ ৫৭) 

وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ ۗ وَمَن يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا ﴿٣٨﴾ وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ بِهِمْ عَلِيمًا ﴿٣٩

অর্থঃ আর সে সমস্ত লোক যারা ব্যয় করে স্বীয় ধন-সম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশে এবং যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, ঈমান আনে না কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হল নিকৃষ্টতর সাথী। আর কিই বা ক্ষতি হত তাদের যদি তারা ঈমান আনত আল্লাহর উপর কেয়ামত দিবসের উপর এবং যদি ব্যয় করত আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে! অথচ আল্লাহ, তাদের ব্যাপারে যথার্থভাবেই অবগত। (সূরা আন নিসাঃ ৩৮-৩৯) 

وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللَّـهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّـهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّـهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۗ أُولَـٰئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ ۗ إِنَّ اللَّـهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ ﴿١٩٩

অর্থঃ আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লার আয়াতসমুহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন। (সূরা আল ইমরানঃ ১৯৯) 

 

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ ۗ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُم ۚ مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿١١٠

অর্থঃ তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।  (সূরা আল ইমরানঃ ১১০)

ঈমানের শাখাসমূহঃ

ঈমানের ৭৭ টির বেশি শাখা রয়েছে। সর্বোত্তম শাখা এ স্বীকৃতি প্রদান করা যে আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। আর ঈমানের নিম্নতম শাখা হলো কষ্টদায়ক বস্তু পথ হতে অপসারণ করা এবং লাজুকতা ঈমানের অংশ। (বুখারী ও মুসলিম)

ঈমানের রুকন বা ভিত্তিসমুহঃ

যে সকল ভিত্তির উপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত তার সংখ্যা মোট ছয়টি বলে রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন :

  • ১. আল্লাহর উপর বিশ্বাস।
  • ২. তার ফেরেস্তাদের উপর বিশ্বাস।
  • ৩. তার কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস।
  • ৪. তার প্রেরিত নবী রাসুলদের উপর বিশ্বাস।
  • ৫. পরকালের উপর বিশ্বাস।
  • ৬. নিয়তির ভালোমন্দ আল্লাহর হাতে এ কথায় বিশ্বাস। (বুখারী ও মুসলিম)

ঈমানেরভিত্তিসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ

  • ১। আল্লাহপাকেরউপরঈমানআনাঃ

এতে অন্তর্ভুক্তআছে তাঁর অস্তিত্বে ও একত্ববাদে বিশ্বাস করা। তাঁর গুণাবলীতে বিশ্বাস করা এবং বিশ্বাস করা সকল প্রকার ইবাদত তাঁরই প্রাপ্য। এছাড়া তার অবস্থান, তার আকার ও অঙ্গ প্রত্যংগ সম্পর্কে সঠীক ধারনা রাখা।

  • ২। তাঁরফেরেশ্তাদের (মালাইকাদের) উপরঈমানআনাঃ

তারা হচ্ছেন নূরের তৈরী। তাদেও সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহপাকের হুকুমসমূহকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য। তাদের সংখ্যা কেবল আল্লাহ তা’আলাই জানেন। তাঁরা অতীব শক্তিশালী ও নিষ্পাপ।

  • ৩। তাঁরকিতাবসমূহেরউপরঈমানআনাঃ

উহাদের মধ্যে আছে তাওরাত, ইন্জিল, যাবুর, কোরআন।তন্মধ্যে কোরআন সর্বোত্তম। এছাড়াও অনেক সহীফাও রয়েছে।

  • ৪। তাঁররাসূলদেরউপরঈমানআনাঃ

তাঁদের মধ্যে প্রথম হচ্ছেন নূহ (আঃ) এবং সর্বশেষ হচ্ছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।কুর’আনের বর্নিত রয়েছে ২৫ জন নাবীর নাম এছাড়াও অসংখ্য নাবীরাও ছিলেন।

  • ৫। আখিরাতেরউপরঈমানআনাঃ

এটা মুলত শুরু হয় একজন মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। একটি সাধারন চিত্র উল্লেখ্য করা হলঃ ১. কবর ২. প্রথম শিঙ্গায় ফু ৩. কিয়ামাত ৪. দ্বিতীয় শিঙ্গায় ফু ৫. পুনুরুত্থান ৬. হাশার ৭. শাফা’আত ৮. হিসাব নিকাশ ৯. আমালনামা প্রদান ১০. মীজান ১১. হাওজে কাওছার ১২. মু’মিনদের পরীক্ষা ১৩. পুলসিরাত ১৪.জাহান্নাম ১৫. জাহান্নাম এ যাওয়া ১৬. (কানতারা) ব্রিজ ১৭. জান্নাতে স্থায়ী বাস

  • ৬। তকদীরবাভগ্যেরভালমন্দেরউপরঈমানআনাঃ

তার মধ্যে আছে আসবাব বা উপকরণ ব্যবহার করা, আর ভাগ্যের ভাল, মন্দ যাই ঘটুক না কেন তাতে রাজী থাকা, কারণ উহা আল্লাহ হতে প্রদত্ত।    (বর্ণনায় মুসলিম)

 ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাসের উপর কুরআন-হাদীসের দলীল

ভালো কাজে ঈমান বৃদ্ধি পায়, আর মন্দ কাজে ঈমান হ্রাস পায়। ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাসের স্বপক্ষে কোরআন ও হাদীসের বহু প্রমাণ রয়েছে।

আল্লাহ তা’আলার বাণী :


إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّـهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ﴿٢

অর্থঃ যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ার দেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে। ( সূরা আনফালঃ ২)
وَيَزِيدُ اللَّـهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى ۗ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ مَّرَدًّا ﴿٧٦
অর্থঃ যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের পথপ্রাপ্তি বৃদ্ধি করেন এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তোমার পালনকর্তার কাছে সওয়াবের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রতিদান হিসেবেও শ্রেষ্ট। (সূরা মারিয়ামঃ ৭৬)

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ ۗ وَلِلَّـهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿٤
অর্থঃ তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আল-ফাত্হঃ ৪)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন :

وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَـٰذِهِ إِيمَانًا ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ ﴿١٢٤﴾ وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَىٰ رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ ﴿١٢٥

অর্থঃ আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করলো? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে।  বস্তুতঃ যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরো কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফের অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করলো। ( সূরা আত-ত্ওবাঃ ১২৪-১২৫)

সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বলা যায় যে, সৎ কর্ম মানুষের ঈমানকে বৃদ্ধি করে আর মন্দ কর্ম মানুষের ঈমানকে হ্রাস করে।

 ঈমান না আনার ভয়ংকর অবস্থাঃ

ঈমান না থাকলে মানুষের কোন আমাল কবুল হয় না। একজন মানুষ সারাজীবন ভাল আমাল (আমলে সলেহ) করে গেল পৃথীবির সবাই তার উপর সন্তুষ্ট তার জন্য দু’আও করে কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তার ঈমান নেই বা সে ঈমানী বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয় না এ ক্ষেত্রে আখিরাতে তার জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ

وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ ۗ وَمَن يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا ﴿٣٨﴾ وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ آمَنُوا بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقَهُمُ اللَّـهُ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ بِهِمْ عَلِيمًا ﴿٣٩﴾

অর্থঃ আর সে সমস্ত লোক যারা ব্যয় করে স্বীয় ধন-সম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশে এবং যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, ঈমান আনে না কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হল নিকৃষ্টতর সাথী। আর কিই বা ক্ষতি হত তাদের যদি তারা ঈমান আনত আল্লাহর উপর কেয়ামত দিবসের উপর এবং যদি ব্যয় করত আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে! অথচ আল্লাহ, তাদের ব্যাপারে যথার্থভাবেই অবগত। (সূরা আন নিসাঃ ৩৮-৩৯) 

উপসংহারঃ

সর্বশেষে যা জানা জরূরী, আল্লাহর রসুল(সঃ) বলেছেন “সে ততক্ষন পর্যন্ত পুর্ন মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষন পর্যন্ত সে আমাকে তার নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালো না বাসবে।”

সুতরাং, আমার আপনার অন্তরকে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে “আসলেই কি আমরা সাহাবাদের মত ঈমান আনতে পেরেছি??”

আল্লাহ আমাদের ঈমান নবায়ন ও সঠিক পদ্ধতিতে ঈমান আনার তাওফীক দিন (আমীন)