Tag Archives: আমাল

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

তাক্বওয়াঃ (আবু সুমাইয়া মতিউর রহমান)

তাক্বওয়া

আলোচকঃ আবু সুমাইয়া মতিউর রহমান

ডাউনলোড করুন

রমাদান মাসের ৩০ আমল পর্বঃ ১

রমাদান মাসের ৩০ আমল

পর্ব»১ || পর্ব»২ || পর্ব»৩

রমাদান মাস আল্লাহ তা‘আলা এক বিশেষ নিয়ামাত। সাওয়াব অর্জন করার মৌসুম। এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, রহমাত, বরকত ও নাজাতের মাস-রমাদান মাস। আলকুরআনে এসেছে,

﴿ شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ ﴾ [البقرة: ١٨٥]

‘‘রমাদান মাস, যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে’’ [সূরা আলবাকারাহ : ১৮৫]।

রমাদান মাসের ৩০ আমল পর্বঃ ২

রমাদান মাসের ৩০ আমল

পর্ব»১ || পর্ব»২ || পর্ব»৩

[১০] সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়া

রমাদান মাস ছাড়াও সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে বিরাট সাওয়াব এবং মর্যাদা রয়েছে। রমাদানের কারণে আরো বেশি ফজিলত রয়েছে। যেহেতু সাহরী খাওয়ার জন্য উঠতে হয় সেজন্য রমাদান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ »

‘‘ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সালাত’’ [সহীহ মুসলিম : ২৮১২]।

[১১] বেশি বেশি দান-সদাকাহ করা

এ মাসে বেশি বেশি দান-সাদাকাহ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ইয়াতীম, বিধবা ও গরীব মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ও বেশি বেশি দান খয়রাত করা। হিসাব করে এ মাসে যাকাত দেয়া উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে বেশি বেশি দান খয়রাত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ»

‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাদানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত’’ [সহীহ আল-বুখারী : ১৯০২]।

 

[১২] উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা

রমাদান মাস নিজকে গঠনের মাস। এ মাসে এমন প্রশিক্ষণ নিতে হবে যার মাধ্যমে বাকি মাসগুলো এভাবেই পরিচালিত হয়। কাজেই এ সময় আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠনের অনুশীলন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَسْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّى امْرُؤٌ صَائِمٌ»

‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে, সে যেন তখন অশস্নীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে গালাগালি ও মারামারি করতে আসে সে যেন বলে, আমি রোযাদার’’ [সহীহ মুসলিম : ১১৫১]।

[১৩] ই‘তিকাফ করা

ই‘তিকাফ অর্থ অবস্থান করা। অর্থাৎ মানুষদের থেকে পৃথক হয়ে সালাত, সিয়াম, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইসতিগফার ও অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার সান্নিধ্যে একাকী কিছু সময় যাপন করা। এ ইবাদাতের এত মর্যাদা যে, প্রত্যেক রমাদানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের শেষ দশ দিন নিজে এবং তাঁর সাহাবীগণ ই‘তিকাফ করতেন। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

« كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَعْتَكِفُ فِي كُلِّ رَمَضَانَ عَشْرَةَ أَيَّامٍ فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الَّذِي قُبِضَ فِيهِ اعْتَكَفَ عِشْرِينَ يَوْمًا».

‘‘প্রত্যেক রমাযানেই তিনি শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমযানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন বিশ দিন’’ [সহীহ আলবুখারী : ২০৪৪]।

দশ দিন ই‘তেকাফ করা সুন্নাত।

[১৪] দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করা

রমাদান মাস হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াতের সর্বোত্তম মাস। আর মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকাও উত্তম কাজ। এজন্য এ মাসে মানুষকে দ্বীনের পথে নিয়ে আসার জন্য আলোচনা করা, কুরআন ও হাদীসের দারস প্রদান, বই বিতরণ, কুরআন বিতরণ ইত্যাদি কাজ বেশি বেশি করা। আলকুরআনের ঘোষণা :

﴿ وَمَنۡ أَحۡسَنُ قَوۡلٗا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ٣٣ ﴾ [فصلت: ٣٣]

‘‘ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং ঘোষণা করলো, আমি একজন মুসলিম’’ [সূরা হা-মীম সাজদাহ : ৩৩]।

হাদীসে এসেছে,

«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ »

‘‘ভাল কাজের পথ প্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারী অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’ [সুনান আত-তিরমীযি : ২৬৭০]।

[১৫] সামর্থ্য থাকলে উমরা পালন করা

এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হাজ্জ আদায়ের সমান সাওয়াব হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«قَالَ فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً مَعِي».

‘‘রমাদান মাসে উমরা করা আমার সাথে হাজ্জ আদায় করার সমতুল্য’’ [সহীহ আলবুখারী : ১৮৬৩]।

[১৬] লাইলাতুল কদর তালাশ করা

রমাদান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল-কুরআনের ঘোষণা,

﴿ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ ﴾ [القدر: ٣]

‘‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’’ [সূরা কদর : ৪]।

হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ يَقُمْ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

‘‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব পাওয়ার আশায় ইবাদাত করবে তাকে পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে’’ [সহীহ আল-বুখারী : ৩৫]।

এ রাত পাওয়াটা বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। এক হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ».

‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সময়ের তুলনায় রমদানের শেষ দশ দিনে অধিক হারে পরিশ্রম করতেন’’ [সহীহ মুসলিম : ১১৭৫]।

লাইলাতুল কদরের দো‘আ

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আল্লাহর নবী ! যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই তবে কি বলব ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, বলবেঃ

«اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى»

‘‘হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।’’ [সুনান আত-তিরমিযী : ৩৫১৩]

[১৭] বেশি বেশি দো‘আ ও কান্নাকাটি করা

দো‘আ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। এজন্য এ মাসে বেশি বেশি দো‘আ করা ও আল্লাহর নিকট বেশি বেশি কান্নাকাটি করা। হাদীসে এসেছে,

«إِنَّ للهِ تَعَالَى عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلِكَ كُلّ لَيْلَةٍ»

‘‘ইফতারের মূহূর্তে আল্লাহ রাববুল আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমাদানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে’’ [আল জামিউস সাগীর : ৩৯৩৩]।

অন্য হাদীসে এসেছে,

«إِنَّ للهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عُتَقَاء فِيْ كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ وَإِنَّهُ لِكُلِّ مُسْلِمٍ فِيْ كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ دَعْوَة مُسْتَجَابَة»

‘‘রমযানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তা‘আলা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলিমের দো‘আ কবূল করা হয়’’ [সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব : ১০০২]।

[১৮] ইফতার করা

সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা বিরাট ফজিলাতপূর্ণ আমল। কোন বিলম্ব না করা । কেননা হাদীসে এসেছে,

« إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ صَائِمًا فَلْيُفْطِرْ عَلَى التَّمْرِ فَإِنْ لَمْ يَجِدِ التَّمْرَ فَعَلَى الْمَاءِ فَإِنَّ الْمَاءَ طَهُورٌ »

‘‘যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র ’’ [সুনান আবু দাউদ : ২৩৫৭,সহীহ]।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন :

« ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ ».

“পিপাসা নিবারিত হল, শিরা উপশিরা সিক্ত হল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কারও নির্ধারিত হল।” [সুনান আবূ-দাউদ: ২৩৫৯, সহীহ]

অপর বর্ণনায় যে এসেছে

«اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ »

“হে আল্লাহ! তোমার জন্য রোযা রেখেছি, আর তোমারই রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।” [সুনান আবু দাউদ :২৩৫৮] এর সনদ দুর্বল। আমাদের উচিত সহীহ হাদীসের উপর আমল করা।

[১৯] ইফতার করানো

অপরকে ইফতার করানো একটি বিরাট সাওয়াবের কাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা দরকার। কেননা হাদীসে এসেছে,

«مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِمْ ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْء. »

‘‘যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সাওয়াব হতে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না’’ [সুনান ইবন মাজাহ : ১৭৪৬, সহীহ]।

 

পরবর্তী পর্বঃ ৩ » » »

মুসলিমের হক

মুসলিমের হক

আলী হাসান তৈয়ব

ইসলাম আমাদের সুপথ দেখায়

ইসলাম একটি মহান দ্বীন। ইসলাম নির্মাণ করেছে তার অনুসারীদের জন্য সঠিক পথ। এতে রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সুন্দর সমন্বয়। এতে কাউকে ঠকানো হয়নি। সবাইকে দেয়া হয়েছে তার প্রাপ্ত অধিকার। ইসলাম যেসব হক বা অধিকার দিয়েছে, তার অন্যতম হলো, এক মুসলিম ভাইয়ের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক।

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের অর্থ

আমরা জানি, মুসলিমরা আজ স্রোতে ভাসা খড়কুটার মতো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। মুসলিমদের কাতার হয়ে পড়েছে টুকরো টুকরো। তারা হয়ে পড়েছে শতধা বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহর প্রতি সবলের চেয়ে দুর্বল, সম্মানির চেয়ে অসম্মানী ও কাছের চেয়ে দূরের লোকরা বেশি লালায়িত। দৃশ্যত উম্মাহ হয়ে পড়েছে বানর-শূকরের বংশধর পৃথিবীর হীন, তুচ্ছ ও ঘৃণ্যতর জাতির জন্য একটি বৈধ বাসনের মতো। যার ইচ্ছে তা ব্যবহার করতে পারে। যেখানে ইচ্ছে তাকে ফেলে রাখতে পারে। এর প্রধান কারণ, বর্তমান বিশ্ব সম্মান করে শুধু সবলকে। অথচ উম্মাহ হয়ে পড়েছে দুর্বল। কেননা বিভক্তি দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও ধ্বংসের প্রতীক। পক্ষান্তরে শক্তি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও একতার নিদর্শন।

এমন লাঞ্চনাকর ও অপমানজনকভাবে উম্মাহ তখনই বীর্যহীন অবস্থায় আবির্ভূত হয়েছে, যখন তাদের শক্তি ও ঐক্যের উৎস হারিয়ে গেছে। হ্যা, সেটি হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক রচিত আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের বাঁধন বা ‘আল-উখুওয়াহ ফিল্লাহ’। তাওহীদের এই নিরেট, পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত চেতনা ছাড়া বাস্তবে এই ভ্রাতৃত্বের বাঁধনকে পুনর্জীবন দান করা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন এই ভ্রাতৃত্বচেতনা মুসলিমদের প্রথম জামাতকে মেষের রাখাল থেকে সকল জাতি ও সকল দেশের নেতা ও পরিচালকে রূপান্তরিত করেছিল। এ রূপান্তর ও পরিবর্তন তখনই সূচিত হয়েছিল যখন তাঁরা পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া এই ভ্রাতৃত্বকে তাঁদের কর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন। এই উজ্জ্বল, দ্যুতিময় ও দীপান্বিত চিত্র সেদিন ভাস্কর হয়ে ওঠেছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম যেদিন মক্কায় তাওহীদের অনুসারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের উদ্বোধন করেছিলেন। বর্ণ ও গোত্র এবং ভাষা ও ভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে বপণ করেছিলেন এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও একতার বীজ। ভ্রাতৃত্বের এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি কুরাইশ বংশের হামযা, গিফারী বংশের আবূ যর আর পারস্যের সালমান, হাবশার বিলাল ও রোমের হুসাইব রা. প্রমুখকে। একতা ও ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে তাঁরা সবাই যেন অভিন্ন কণ্ঠে আবৃত্তি করছিলেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াত :

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (10)

‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ [সূরা আল-হুজরাত : ১০]

তারা যেন দুলে উঠলেন নিচের এই সুমিষ্ট পঙতির দোলায়-

أبى الإسلام لا أبَ لى سِوَاهُ

إذا افتخروا بقيسٍ أو تميمِ

কবিতাটির মর্মার্থ এমন- ‘যখন তারা কায়েস বা তামীম ইত্যাদি বংশ নিয়ে বড়াই করছিল, ইসলাম তখন বংশ নিয়ে গর্ব ত্যাগ করে বললো, ইসলামই আমার বাপ, ইসলাম ছাড়া আমার কোনো বংশ নেই।’

এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভ্রাতৃত্ব রচনার প্রথম পর্ব। এরপর দ্বিতীয় পর্বে সুদীর্ঘ রক্তাক্ত যুদ্ধ ও বহুকাল ধরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে তিনি ভ্রাতৃত্ব গড়ে দেন মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে! তারপর তৃতীয় পর্বে তিনি ভ্রাতৃত্ব রচনা করেন মদীনার আনসার ও মক্কার মুহাজিরগণের মাঝে। এ ছিল মৈত্রি ও ভালোবাসার এমন উৎসব, পুরো মানবেতিহাসে যার দ্বিতীয় উপমা নেই। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের বন্ধন রচিত হলো। মনের সাথে মনের মিলন হলো। এমন হৃদয়কাড়া দৃশ্যও মঞ্চায়িত হলো বুখারী ও মুসলিমে যার বিবরণ এসেছে এভাবে :

আনাস রা. বলেন,

قَدِمَ عَلَيْنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ وَآخَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَهُ وَبَيْنَ سَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ ، وَكَانَ كَثِيرَ الْمَالِ فَقَالَ سَعْدٌ قَدْ عَلِمَتِ الأَنْصَارُ أَنِّي مِنْ أَكْثَرِهَا مَالاً سَأَقْسِمُ مَالِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ شَطْرَيْنِ وَلِي امْرَأَتَانِ فَانْظُرْ أَعْجَبَهُمَا إِلَيْكَ فَأُطَلِّقُهَا حَتَّى إِذَا حَلَّتْ تَزَوَّجْتَهَا فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ فَلَمْ يَرْجِعْ يَوْمَئِذٍ حَتَّى أَفْضَلَ شَيْئًا مِنْ سَمْنٍ وَأَقِطٍ فَلَمْ يَلْبَثْ إِلاَّ يَسِيرًا حَتَّى جَاءَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَعَلَيْهِ وَضَرٌ مِنْ صُفْرَةٍ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَهْيَمْ قَالَ تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً مِنَ الأَنْصَارِ فَقَالَ مَا سُقْتَ فِيهَا قَالَ وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ ، أَوْ نَوَاةً مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ.

‘আমাদের কাছে আবদুর রহমান বিন আউফ এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ বিন রাবী‘র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে দিলেন। তিনি ছিলেন বিত্তশালী। সা‘দ রা. বললেন, আনসাররা জানে আমি তাদের মধ্যে সবচে বেশি সম্পদশালী। আমি আপনার এবং আমার মাঝে নিজ সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করে নেব। আমার দুইজন স্ত্রী আছে। আপনি দেখেন কাকে আপনার বেশি সুন্দরী মনে হয়। আমি তাকে তালাক দেব। তারপর তার ইদ্দত শেষ হলে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। আবদুর রহমান বললেন, আল্লাহ আপনার সম্পদে বরকত দিন। আপনি আমাকে বাজার কোথায় দেখিয়ে দিন। বাজার থেকে তিনি কেবল তখনই ফিরে এলেন যখন তার কাছে অল্প কিছু মাখন ও পনির অবশিষ্ট রয়ে গেল। ক্ষণকাল বাদেই সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। তাঁর ওপর ছিল ….। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমানের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘(মাহইয়াম) ঘটনা কী?’ আবদুর রহমান বললেন, আমি এক আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি বললেন, ‘তাকে কী দিয়েছো’? বললেন, খেজুরের বিচি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা বলেছেন, স্বর্ণের একটি বিচি। তিনি বললেন, ওলীমা করো, হোক না তা একটি ছাগল দিয়ে।’ [বুখারী : ৩৭৮১]

আজ আমরা সা‘দ বিন রবী‘ রা. -এর যুগের কথা কল্পনা করে আফসোস করি আর বলি, কোথায় সেই সা‘দ বিন রবী‘ রা. যিনি নিজ সম্পদ ও সহধর্মীনিকে দুই ভাগে ভাগ করবেন?!! এর উত্তর হলো, সেদিন আর নেই। সেদিন তো তখনই বিদায় হয়েছে যেদিন আবদুর রহমান রা. বিদায় নিয়েছেন। তেমনি যখন জিজ্ঞেস করা হয় কোন সে ব্যক্তি যিনি সা‘দ রা.-এর মতো বদান্যতা ও মহানুভবতা দেখাবেন? তার জবাবে বলা হবে, কোথায় সেই ব্যক্তি যিনি আবদুর রহমান রা.-এর মতো অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করবেন?!!

আরেকটি সুন্দর ঘটনা : এক ব্যক্তি পূর্বসুরী এক নেককার বান্দার কাছে গিয়ে বললেন, কোথায় তারা –

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً

‘যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে’? [সূরা আল-বাকারা : ২৭৪]

তিনি বললেন, তারা তো তাদের সাথেই অতীত হয়েছেন-

لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا

‘যারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না।’ [ সূরা আল-বাকারা : ২৭৩]

প্রিয় পাঠক, এই হলো পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের কিছু চিত্র। আল্লাহর কসম! এই হাদীসটি যদি সর্বোচ্চ স্তরের একটি শুদ্ধ হাদীস না হতো, তাহলে আমি নির্ঘাত একে একটি কাল্পনিক দৃশ্য বলে আখ্যায়িত করতাম।

হ্যা, এটিই নির্ভেজাল ভ্রাতৃত্ব। এই হলো প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব। কারণ, আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে কেবল আকীদার বাঁধন, ঈমানের বন্ধন ও আল্লাহর ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, যার শিকড় কখনো উপড়ে পড়ে না।

ইসলামী ভ্রাতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া একটি সামগ্রিক নেয়ামত। এটি আল্লাহর এমন এক দান, প্রকৃত মুমিনদের প্রতি যা প্রচুর ধারায় প্রবাহিত হয়। আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব শুভ্র ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের মুমিনদের জন্য শারাবান তহুরা বা পবিত্র পানীয় তুল্য।

মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিম ভাইয়ের হক

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক হলো তাকে ভালোবাসা। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ.

‘তিনটি গুণ যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করবে : (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে গোটা সৃষ্টিজগত অপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া। (২) মানুষকে ভালোবাসলে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা। (৩) কুফরিতে ফিরে যাওয়া তার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় হওয়া।’ [বুখারী : ১৬; মুসলিম : ১৭৫]

এদিকে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِى ظِلِّهِ ، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ اللَّهِ ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فِى خَلاَءٍ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسْجِدِ ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللَّهِ ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ إِلَى نَفْسِهَا قَالَ إِنِّى أَخَافُ اللَّهَ . وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا ، حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا صَنَعَتْ يَمِينُهُ .

‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের নিচে ছায়া দেবেন যেদিন তাঁর ছায়া বৈ অন্য কোনো ছায়া থাকবে না :

১. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ।

২. এমন যুবক যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে।

৩. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।

৪. এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত।

৫. এমন দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে। এ উদ্দেশ্যেই একত্রিত এবং বিচ্ছিন্ন হয়।

৬. এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত বংশীয় রূপসী নারী ব্যভিচারের প্রতি আহ্বান করে; কিন্তু সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।

৭. যে ব্যক্তি এমন গোপনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাতও তা টের পায় না।’ [বুখারী : ৬৮০৬; মুসলিম : ১৭১২]

মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা রা. থেকে আরও একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ.

‘এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য গ্রামে গেল। পথিমধ্যে আল্লাহ তা‘আলা তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, কোথায় চললে তুমি? বললেন, এ গ্রামে আমার এক ভাই আছে, তার সাক্ষাতে চলেছি। তিনি বললেন, তার ওপর কি তোমার কোনো অনুগ্রহ আছে যা তুমি লালন করে চলেছ? তিনি বললেন, না। তবে এতটুকু যে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে এসেছি। আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন যে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন যেমন তুমি তাকে তাঁর জন্য ভালোবাসো।’ [মুসলিম : ৬৭১৪; ইবন হিব্বান, সহীহ : ৫৭২]

মুসলিম ও আবূ দাউদে বর্ণিত অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لاَ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ.

‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যাবৎ না পরিপূর্ণ মুমিন হবে। আর তোমরা পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন জিনিসের কথা বলে দেব না, যা অবলম্বন করলে তোমাদের পরস্পর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (তা হলো) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ [মুসলিম : ২০৩; আবূ দাউদ : ৫১৯৫]

এক মুসলিমের ওপর মুসলিমের এ হকগুলোও রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিচের হাদীসে তুলে ধরেছেন। আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ : إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ، وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ، وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ

‘এক মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো, সেগুলো কী হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, (১) তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে। (২) সে যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে তা রক্ষা করবে। (৩) সে যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে, তুমিও তার শুভ কামনা করবে। (৪) যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে। (৫) যখন সে অসুস্থ হবে, তুমি তাকে দেখতে যাবে। (৬) এবং যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে।’ [ মুসলিম : ৫৭৭৮]

এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার সম্পর্কে মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা। কেননা মুমিন হবে পরিষ্কার মনের অধিকারী। তার অন্তর হবে অনাবিল ও সফেদ। তার হৃদয় হবে কোমল ও দয়ার্দ্র। মুমিন যখন রাতে শয়ন করে তখন সে আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে বলে পৃথিবীর কারও প্রতি তার একবিন্দু হিংসা বা দ্বেষ নেই।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَنَافَسُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا .

‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না এবং একে অন্যের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। বরং একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [মুসলিম : ৬৭০৫; মুসনাদ আহমদ : ৯০৫১]

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, মানুষের অন্তরের ব্যধিসমূহের অন্যতম হলো হিংসা-বিদ্বেষ। (আল্লাহ হেফাজত করুন) অনেকে মানুষকে সুখী দেখে হিংসা করে। তার অন্তরে আগুন জ্বলে। অথচ এই অর্বাচীন লোক ভুলে যায় যে এই রিজিক ও সম্পদ এভাবে আল্লাহই বণ্টন করেছেন। তাই আমাদের কর্তব্য কাউকে সুখ ও প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে থাকলে দেখলে মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা। যে আল্লাহ তাকে এত নেয়ামত ও প্রাচুর্য দিয়েছেন তার কাছে তার জন্য আরও বৃদ্ধির দু‘আ করা। তিনি যেন আমাকেও সম্পদ ও সুখ-প্রাচুর্য দেন সে প্রার্থনা তার কাছেই করা। সেই নেককারদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমাদেরও উচ্চারণ করা উচিত যারা বলতেন :

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (10)

‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ [সূরা আল-হাশর : ১০]

মুসলিমের প্রতি হিংসা না রাখা এবং তাদের জন্য হৃদয়ে ভালোবাসা লালন করা কত বড় আমল তা বুঝতে পারবেন একটি ঘটনা শুনলে। ঘটনাটি আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,

‘আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী ব্যক্তি উপস্থিত হবে।’ তারপর আনসারীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অযুর পানি ঝরছিল। বাম হাতে তার জুতো ধরা। পরদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ বললেন। প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। তৃতীয় দিন এলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একইরকম বললেন। এবারও প্রথম বারের মতো ওই ব্যক্তিই উপস্থিত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বৈঠক ত্যাগ করলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ‘স তার পিছু নিলেন। তাকে তিনি বললেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া করেছি। এক পর্যায়ে কসম করেছি তিনদিন আমি তার কাছে যাব না। তুমি যদি আমাকে এ সময়টুকু তোমার কাছে থাকতে দিতে? তিনি বললেন, ঠিক আছে। আনাস রা. বলেন, আবদুল্লাহ বলতেন, তিনি তার সাথে তিনটি রাত অতিবাহিত করেছেন। তাকে তিনি রাতে নামাজ পড়তে দেখেননি। তবে এতটুকু দেখেছেন যে, রাতে যখন তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হন, তখন তিনি পাশ ফিরে ফজরের নামাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জিকির ও তাকবীরে লিপ্ত থাকেন। আবদুল্লাহ বলেন, তবে আমি তাকে ভালো ছাড়া কারও মন্দ বলতে শুনিনি। অতপর যখন তিন রাত অতিক্রম হলো এবং আমি তার আমলকে সামান্য জ্ঞান করতে লাগলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমার ও আমার পিতার মাঝে কোনো রাগারাগি বা ছাড়াছাড়ির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমার সম্পর্কে তিনদিন বলতে শুনেছি : ‘এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী লোক উপস্থিত হবে।’ আর ঘটনাক্রমে তিনবারই তুমি উপস্থিত হয়েছো। এজন্য আমি তোমার সান্বিধ্যে এসেছিলাম তুমি কী আমল করো তা দেখতে। যাতে আমি তোমাকে অনুসরণ করতে পারি। আমি তো তোমাকে খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না। তাহলে তোমার কোন আমল তোমাকে রাসূলুল্লাহ বর্ণিত মর্যাদায় পৌঁছালো? ওই ব্যক্তি বলল, তুমি যা দেখলে তার বেশি কিছুই নয়। তিনি বলেন, যখন আমি ফিরে আসতে নিলাম, সে আমাকে ডাক দিলো। অতপর সে বললো, তুমি যা দেখলে তা তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। তবে মনে আমি কোনো মুসলিমকে ঠকানোর চিন্তা রাখি না এবং আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তাতে কোনো হিংসা বোধ করি না। আবদুল্লাহ বললেন, ‘এটিই তোমাকে ওই মর্যাদায় পৌঁছিয়েছে। আর এটিই তো আমরা পারি না।’ [মুসনাদ আহমদ : ১২৬৯৭]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাধ্যমত সাহায্য করা। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِى عَوْنِ أَخِيهِ

‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে।’ [মুসলিম : ৭০২৮; তিরমিযী : ১৪২৫]

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো তাকে সাহায্য করা চাই সে যালেম হোক কিংবা মযলুম। আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا ، أَوْ مَظْلُومًا قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ.

‘তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অত্যাচারিতকে সাহায্য করার অর্থ তো বুঝে আসল, তবে অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরবে (তাকে যুলুম থেকে বাধা প্রদান করবে)।’ [বুখারী : ২৪৪৪; বাইহাকী : ১১২৯০] অর্থাৎ তুমি তোমার ভাইকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করবে। যদি সে জালেম হয় তাহলে যুলুম থেকে তার হাত টেনে ধরবে এবং তাকে বাধা দেবে। আর যদি সে মযলুম হয় তাহলে সম্ভব হলে তাকে সাহায্য করবে। যদিও একটি বাক্য দ্বারা হয়। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটি সবচে দুর্বল ঈমান।

এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের আরেকটি হক হলো, তার দোষ গোপন রাখা এবং তার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা। এটি সবচে বড় হক। কারণ সে তো কোনো আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যশীল ফেরেশতা বা তাঁর প্রেরিত রাসূল নয়। সে মানুষ; ভুল তো তার হবেই। অতএব তার কোনো ভুল হলে তা গোপন রাখা উচিত।

আলিমগণ বলেছেন, ‘মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার হলো যারা মানুষের মাঝে তাকওয়া-পরহেযগারি ও নেক আমলের জন্য সুপরিচিত। তিনি যদি কোনো ভুল করেন বা তার কোনো পদস্খলন হয়ে যায়। তাহলে মুমিনদের কর্তব্য হলো তা গোপন রাখা। তার দোষ অপরের কাছে প্রকাশ না করা।

কেননা বিশুদ্ধ হাদীসে মুসনাদে আহমদ ও আবূ দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আবু বারযা আসলামী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِى بَيْتِهِ.

‘হে ওই সকল লোক যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে আর ঈমান তার হৃদয়ে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমের গীবত করবে না এবং তাদের দোষ খোঁজার পেছনে লেগে থাকো না। কেননা যে তাদের দোষ খোঁজায় লিপ্ত হয়, আল্লাহও তার পেছনে দোষ খোঁজেন। আর আল্লাহ যার পেছনে লাগেন তিনি তাকে তার বাড়িতেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।’ [মুসনাদে আহমদ : ১৯৭৯৭; আবূ দাউদ : ৪৮৮২]

আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা প্রকাশ্যে আল্লাহর নাফরমানি করে এবং গুনাহ প্রকাশ করে। তারা স্রষ্টা তথা আল্লাহকেও লজ্জা করে না আবার মানুষকেও লজ্জা করে না। এরা হলো ফাজের ও ফাসেক। এদের কোনো গীবত নেই।

ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বংশীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে বেশি মজবুত

প্রকৃত সম্পর্ক যা বিচ্ছেদে জোড়া লাগায় এবং বিভক্তিকে যুক্ত করে, সেটি হলো, দীনের সম্পর্ক এবং ইসলামের বন্ধন। যে সম্পর্ক ও বন্ধন পুরো ইসলামী সমাজকে একটি দেহের মতো একাত্ম করেছে। তাকে বানিয়েছে একটি প্রাচীরের মতো, যার ইটগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে লেগে থাকে। দেখুন, মানুষের মাঝে এত বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আরশ বহনকারী ও তাঁদের আশপাশের ফেরেশতাদের হৃদয় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলো। ইরশাদ হলো,

الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ (7)

‘যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, ‘হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আযাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন’। [সূরা আল-মুমিন : ৭]

আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে এ মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আরশ বহনকারী ও তার আশপাশের ফেরেশতা এবং পৃথিবীর বনী আদমের যে মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধন গড়ে ওঠেছে, যার কারণে এই পূণ্যময় দুআ ও প্রার্থনা, তা হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। কারণ তিনি ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা তাঁর প্রতি ঈমান রাখে’ (وَيُؤْمِنُونَ بِهِ) অর্থাৎ তাদের বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা ঈমান এনেছেন। আর বনী আদমের জন্য ফেরেশতাদের দু‘আ সম্পর্কে বলেছেন, (وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا) মুমিনদের (যারা ঈমান এনেছে) জন্য তারা ক্ষমা চায়। এখানে তাদের গুণও বলা হয়েছে ঈমান। এ থেকে বুঝা যায় মানুষ ও ফেরেশতাদের মাঝে সম্পর্কের একমাত্র বাঁধন হলো ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। অতএব ঈমানই সবচে মজবুত বন্ধন।

একতা ও ঐক্যের আহ্বান

আমাদের কর্তব্য একে অপরকে সাহায্য করা এবং একে অন্যের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা। আমাদের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মতো আল্লাহ তা‘আলার সব বান্দা ভাই-ভাই হয়ে থাকা। এতেই আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (46)

‘আর তোমরা পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’ [সূরা আল-আনফাল : ৪৬]

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।’ [ সূরা আলে ইমরান : ১০৩]

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا

‘‌তোমরা একে অন্যের সাথে ভাই-ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।’ [ বুখারী : ৬০৬৫; মুসলিম : ৬৬৯৫]

জামা‘আতের ওপর আল্লাহর হাত

আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং জেনে রাখুন জামা‘আত তথা দলের ওপর আল্লাহর হাত। সুতরাং আপনারা আপনাদের দীনী ভাইদের সঙ্গে থাকুন। তারা যেখানেই যান তাদের সঙ্গী হোন। আপনারা সবাই আলাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন এবং বিভক্ত হবেন না। মনে রাখবেন, একতাতেই শক্তি আর বিভক্তিতে দুর্বল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

রমাদান মাসের ৩০ আমল পর্বঃ ৩

রমাদান মাসের ৩০ আমল

পর্ব»১ || পর্ব»২ || পর্ব»৩

[২০] তাওবাহ ও ইস্তেগফার করা

তাওবাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা, গুনাহের কাজ আর না করার সিদ্ধান্ত নেয়া। এ মাস তাওবাহ করার উত্তম সময়। আর তাওবাহ করলে আল্লাহ খুশী হন। আল-কুরআনে এসেছে,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ﴾ [التحريم: ٨]

‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাটি তাওবা; আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত’’ [সূরা আত-তাহরীম : ৮]।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّى أَتُوبُ فِى الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ ».

‘‘হে মানবসকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর, আর আমি দিনে তাঁর নিকট একশত বারের বেশি তাওবাহ করে থাকি’’ [সহীহ মুসলিম : ৭০৩৪]।

তবে তাওবাহ ও ইস্তেগফারের জন্য উত্তম হচ্ছে, মন থেকে সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার পড়া, আর তা হচ্ছে,

«اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُك وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ»

‘‘হে আল্লাহ, তুমি আমার প্রতিপালক, তুমি ছাড়া প্রকৃত এবাদতের যোগ্য কেউ নাই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আর আমি তোমার গোলাম আর আমি সাধ্যমত তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকারের উপর অবিচল রয়েছি। আমার কৃত-কর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমাকে যত নেয়ামত দিয়েছে সেগুলোর স্বীকৃতি প্রদান করছি। যত অপরাধ করেছি সেগুলোও স্বীকার করছি। অত:এব, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ, তুমি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই।’’

ফযিলাত: ‘‘যে কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দিনের বেলা এই দু‘আটি (সাইয়েদুল ইসতিগফার) পাঠ করবে ঐ দিন সন্ধ্যা হওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করলে সে জান্নাতবাসী হবে এবং যে কেউ ইয়াকিনের সাথে রাত্রিতে পাঠ করবে ঐ রাত্রিতে মৃত্যুবরণ করলে সে জান্নাতবাসী হবে।’’ [সহীহ আল-বুখারী : ৬৩০৬]

 

[২১] তাকওয়া অর্জন করা

তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা বান্দাহকে আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় পাপকাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য করে। আর রমাদান মাস তাকওয়া নামক গুণটি অর্জন করার এক বিশেষ মৌসুম। কুরআনে এসেছে,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে করে তোমরা এর মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো’’ [সূরা আলবাকারাহ : ১৮৩]।

﴿ۚ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ ﴾ [الطلاق: ٢]

যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। [সূরা তালাক : ০২]

 

[২২] ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করা

ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করা। এটি একটি বিরাট সাওয়াবের কাজ। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ صَلَّى الغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللَّهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ»

যে ব্যক্তি ফজর জামাআত আদায় করার পর সূর্য উদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করবে, অতঃপর দুই রাকাআত সালাত আদায় করবে, সে পরিপূর্ণ হাজ্জ ও উমারাহ করার প্রতিদান পাবে। [সুনান আত-তিরমিযী : ৫৮৬]।

 

[২৩] ফিতরাহ দেয়া

এ মাসে সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে ফিতরাহ দেয়া আবশ্যক। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ».

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাত আদায়ের পুর্বে ফিতরাহ আদায় করার আদেশ দিলেন। [সহীহ আল-বুখারী :১৫০৩]

 

[২৪] অপরকে খাদ্য খাওয়ানো

রমাদান মাসে লোকদের খাওয়ানো, বিশেষ করে সিয়াম পালনকারী গরীব, অসহায়কে খাদ্য খাওয়ানো বিরাট সাওয়াবের কাজ । কুরআনে এসেছে,

﴿ وَيُطۡعِمُونَ ٱلطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ مِسۡكِينٗا وَيَتِيمٗا وَأَسِيرًا ٨ ﴾ [الانسان: ٨]

অর্থ: তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। [সূরা আদ-দাহর: ৮]

এ বিষয়ে হাদীসে বলা হয়েছে,

«عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ قَالَ:«تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ ، وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ».

‘‘আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, একজন লোক এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলামে উত্তম কাজ কোনটি? তিনি বললেন, অন্যদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম দেয়া’’ [সহীহ আল-বুখারী : ১২]।

অপর বর্ণনায় বর্ণিত আছে যে,

«أَيُّمَا مُؤْمِنٍ أَطْعَمَ مُؤْمِنًا عَلَى جُوعٍ أَطْعَمَهُ اللهُ مِنْ ثِمَارِ الْجَنَّةِ»

‘‘যে কোনো মুমিন কোনো ক্ষুধার্ত মুমিনকে খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। [বাইহাকী, শু‘আবুল ইমান : ৩০৯৮, হাসান]।

[২৫] আত্মীয়তার সম্পর্ক উন্নীত করা

আত্মীয়তার সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর তা রক্ষা করাও একটি ইবাদাত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلۡأَرۡحَامَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١ ﴾ [النساء: ١]

‘‘আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আরও তাকওয়া অবলম্বন কর রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। [সূরা আন-নিসা: ১]

আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«بُلُّوا أَرْحَامَكُمْ وَلَوْ بِالسَّلَامِ»

“সালাম বিমিয়ের মাধ্যমে হলেও আত্নীয়তার সম্পর্ক তরতাজা রাখ।” [সহীহ কুনুযুস সুন্নাহ আন-নবওয়িয়্যাহ : ১৩]।

[২৬] কুরআন মুখস্থ বা হিফয করা

কুরআন হিফয করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নিজেই কুরআন হিফযের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি এ দায়িত্ব মূলত বান্দাদেরকে কুরআন হিফয করানোর মাধ্যমেই সম্পাদন করেন। কুরআনে এসেছে,

﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]

‘‘নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হিফাযতকারী’’ –[সূরা আল-হিজর: ৯]।

যে যত বেশি অংশ হিফয করতে পারবে তা তার জন্য ততই উত্তম। আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِى الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا ».

‘‘কুরআনের ধারক-বাহককে বলা হবে কুরআন পড়ে যাও, আর উপরে উঠতে থাক, ধীর-স্থিরভাবে তারতীলের সাথে পাঠ কর, যেমন দুনিয়াতে তারতীলের সাথে পাঠ করতে। কেননা জান্নাতে তোমার অবস্থান সেখানেই হবে, যেখানে তোমার আয়াত পড়া শেষ হবে” –[সুনান আত-তিরমিযী : ২৯১৪]।

 

[২৭] আল্লাহর যিকর করা

এ মাসে বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করা ও তাসবীহ পাঠ করা। সময় পেলেই

سبحان الله ، الحمدلله ، لا إله إلا الله ، الله أكبر

পড়া। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى مِنَ الْكَلاَمِ أَرْبَعًا : سُبْحَانَ اللهِ ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ ، وَلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ ، فَمَنْ قَالَ : سُبْحَانَ اللهِ ، كُتِبَ لَهُ عِشْرُونَ حَسَنَةً ، وَحُطَّتْ عَنْهُ عِشْرُونَ سَيِّئَةً ، وَمَنْ قَالَ : اللَّهُ أَكْبَرُ فَمِثْلُ ذَلِكَ ، وَمَنْ قَالَ : لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فَمِثْلُ ذَلِكَ ، وَمَنْ قَالَ : الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ مِنْ قِبَلِ نَفْسِهِ كُتِبَ لَهُ ثَلاَثُونَ حَسَنَةً وَحُطَّتْ عَنْهُ ثَلاَثُونَ سَيِّئَةً»

অর্থ: ‘‘আল্লাহ তা’আলা চারটি বাক্যকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করেছেন, তাহলো سبحان الله ، الحمدلله ، لا إله إلا الله ، الله أكبر যে ব্যক্তি سبحان الله পড়বে, তার জন্য দশটি সাওয়াব লেখা হয়, আর বিশটি গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি الله أكبر পড়বে, তার জন্য বিশটি সাওয়াব লেখা হয়, আর বিশটি গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি لا إله إلا الله পড়বে, তার জন্য বিশটি সাওয়াব লেখা হয়, আর বিশটি গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ পড়বে, তার জন্য ত্রিশটি সাওয়াব লেখা হয়, আর ত্রিশটি গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হয়’’। [মুসনাদ আহমাদ : ১১৩৪৫]

[২৮] মিসওয়াক করা

মেসওয়াকের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। হাদীসে এসেছে,

«السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ»

অর্থাৎ মেসওয়াক মুখের জন্য পবিত্রকারী, এবং রবের সন্তুষ্টি আনয়নকারী। [সহীহ ইবন খুযাইমাহ : ১৩৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রেখেও মেসওয়াক করতেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।

[২৯] একজন অপরজনকে কুরআন শুনানো

রমাদান মাসে একজন অপরজনকে কুরআন শুনানো একটি উত্তম আমল। এটিকে দাওর বলা হয়। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

« وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ حَتَّى يَنْسَلِخَ يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْقُرْآنَ »

জিবরাইল আলাইহিস সালাম রমাদানের প্রতি রাতে রমাদানের শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং রাসূল তাকে কুরআন শোনাতেন। [সহীহ আল-বুখারী : ১৯০২]

ইবনে হাজার রাহেমাহুল্লাহ্ বলেন : জিবরাইল প্রতি বছর রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করে এক রমযান হতে অন্য রমযান অবধি যা নাযিল হয়েছে, তা শোনাতেন এবং শুনতেন। যে বছর রাসূলের অন্তর্ধান হয়, সে বছর তিনি দু বার শোনান ও শোনেন[1]

[৩০] কুরআন বুঝা ও আমল করা

কুরআনের এ মাসে কুরআন বুঝা ও আমল করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। কুরআন অনুযায়ী নিজের জীবনকে গড়ে তোলা। এ বিষয়ে কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে,

﴿ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَۗ قَلِيلٗا مَّا تَذَكَّرُونَ ٣ ﴾ [الاعراف: ٣]

‘তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর’ –[সূরা আল-আ‘রাফ : ৩]।

কুরআনের জ্ঞানে পারদর্শী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«كُنَّا نَتَعَلَّمُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشْرَ آيَاتٍ فَمَا نَعْلَمُ الْعَشْرَ الَّتِي بَعْدَهُنَّ حَتَّى نَتَعَلَّمَ مَا أُنْزِلَ فِي هَذِهِ الْعَشْرِ مِنَ الْعَمَلِ»

‘আমরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কুরআনের দশটি আয়াত শিক্ষা গ্রহণ করতাম, এরপর ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা পরবর্তী দশটি আয়াত শিক্ষা করতাম না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা এই দশ আয়াতের ইলম ও আমল শিখতাম’ [শরহে মুশকিলুল আছার : ১৪৫০]।

 

যা করণীয় নয়

রমাদান মাসের ফজিলত হাসিল করার জন্য এমন কিছু কাজ রয়েছে যা থেকে বিরত থাকা দরকার, সেগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :

  1. বিলম্বে ইফতার করা
  2. সাহরী না খাওয়া
  3. শেষের দশ দিন কেনা কাটায় ব্যস্ত থাকা
  4. মিথ্যা বলা ও অন্যান্য পাপ কাজ করা
  5. অপচয় ও অপব্যয় করা
  6. তিলাওয়াতের হক আদায় না করে কুরআন খতম করা
  7. জামা‘আতের সাথে ফরয সালাত আদায়ে অলসতা করা
  8. বেশি বেশি খাওয়া
  9. রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদাত করা
  10. বেশি বেশি ঘুমানো
  11. সংকট তৈরি করা জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধির জন্য
  12. অশ্লীল ছবি, নাটক দেখা
  13. বেহুদা কাজে রাত জাগরণ করা
  14. বিদ‘আত করা
  15. দুনিয়াবী ব্যস্ততায় মগ্ন থাকা

 

প্রিয় পাঠক!

রমাদান মাস পাওয়ার মত সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে! আমরা যদি এ মাসের প্রতিটি আমল সুন্নাহ পদ্ধতিতে করতে পারি তবেই আমাদের রমাদান পাওয়া সার্থক হবে।

কেননা হাদীসে এসেছে,

«وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ أَتَى عَلَيْهِ شَهْرُ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ ، وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ»

‘‘যে ব্যক্তি রমাদান মাস পেলো অথচ তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে ধ্বংস হোক’’ [শারহুস সুন্নাহ : ৬৮৯]।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে রমাদান মাসের ফজিলত হাসিল করার তাওফীক দিন। আমীন!

وصلى الله على نبينا محمد وعلي اله وأصحابه أجمعين – وأخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

 


[1] ফাতহুল বারি, ১/৪২

 

পরবর্তী পর্বঃ ২ » » »

দু্‌’‌আর বিধি বিধান

দু্‌’‌আ

আভিধানিক অর্থে দুআ :

দুআ শব্দের অর্থ আহ্বান, প্রার্থনা। শরীয়তের পরিভাষায় দুআ বলে কল্যাণ ও উপকার লাভের উদ্দেশ্যে এবং ক্ষতি ও অপকার রোধকল্পে মহান আল্লাহকে ডাকা এবং তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা। দুআ শব্দ পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়েছে। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

  • ১- ইবাদত :

মহান আল্লাহ বলেন :—

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِين. (المؤمن : 60 )

তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দিব, যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তারা অচিরে জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্চিত হয়ে।’ (আল-মু‘মিন-৬০)

  • সাহায্য প্রার্থনা :

আল্লাহ বলেন :—

وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ. (البقرة: 23 )

যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সব সাহায্যকারীদেরকে আহবান কর।’ (আল-বাকারা-২৩)

আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া এবং তার নৈকট্য লাভ করা ব্যতীত মানুষের কোন উপায় নেই, আর দুআ হল আল্লাহর নৈকট্যলাভের বিশেষ বাহন ও মাধ্যম। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, প্রত্যাশা ও সাহায্য কামনার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। এ দ্বারা মানুষ তার প্রতিপালকের ইবাদত করে, উদ্দেশ্যে উপনীত হয়, তার সন্তুষ্টি লাভ করে।

দুআর ফযিলত উপকারিতা

দুআতে রয়েছে প্রভূত ফযীলত, মহা পুরুস্কার, শুভ পরিণতি ও অনেক উপকার। নিম্নে তারই কিছু উল্লেখ করা হল।

  • (ক) দু’আ ইবাদত, দুআকারী ব্যক্তি দুআর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং পুরুস্কার প্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন :—

تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ﴿16﴾ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿17﴾ (السجدة:,16-17 )

তাদের পার্শ্ব শয্যা হতে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে (১৭) কেউ জানে না তার জন্য কৃতকর্মের কি কি নয়ন প্রীতিকর প্রতিদান লুকায়িত আছে।’ (সাজদা ১৮)

  • (খ) দু’আতে রয়েছে দুআকারী ব্যক্তির আবেদনের সাড়া, মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ. (المؤمن :60 )

তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দিব।’ (আল-মু‘মিন:৬০)

মহান আল্লাহ বলেন :—

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ. (البقرة: 186)

আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। (১৮৬ আল বাকারা)

  • (গ) দুআতে রয়েছে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও হীনতা-দীনতার প্রকাশ। মহান আল্লাহ বলেন :—

ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴿55﴾ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ ﴿56﴾. (الأعراف:55,56)

তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। (৫৫) পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তাকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী (৫৬) (আ‘রাফ :55,56)

  • (ঘ) দুআ ইহকাল ও পরকালে দুআকারী ব্যক্তি থেকে অনিষ্ট রোধ করে ও পাপ মোচন করে।

দুআ কবুলের শর্তাবলী

মুমিনের প্রত্যাশা মহান আল্লাহ যেন তার দুআ কবুল করেন। এবং তার মনের আশা পূরণ করেন। কিন্তু দুআ কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত আছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হল।

এখলাস :

আমাল কবুল হওয়ার মূল শর্ত এটি, মহান আল্লাহ বলেন :—

هو الحي لا إله إلا هو فادعوه مخلصين له الدين. (:المؤمن)

তিনি চিরঞ্জিব, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব, তাকে ডাক খাটি ইবাদতের মাধ্যমে। (আল-মু‘মিন:৬৬)

সব কিছু বাদ দিয়ে কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদতকে নিরঙ্কুশ করার নাম ইখলাস। সুতরাং, ইবাদত ও দুআ মহান আল্লাহ ব্যতীত কোন কিছুকে উদ্দেশ্যে করা যাবে না। এর বিপরীত কর্মপন্থা যে অবলম্বন করল, সে অবশ্যই শিরক করল। মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ. (المؤمنون : 117)

যে আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যার স্বপক্ষে কোন দলীল তার কাছে নেই, তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে আছে। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। (১১৭ আল মু‘মিন)

  • দুআকারী ব্যক্তির সম্পদ হালাল হওয়া:

কেননা, হারাম সম্পদ হচ্ছে দুআ কবুলের পথে অন্তরায় ও বাধা।

ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসূলূল্লাহ সা. ইরশাদ করেন :—

أيها الناس إن الله طيب، لا يقبل إلا طيباً، وإن الله أمر المؤمنين بما أمر به المسلمين، فقال: (يا أيها الرسل كلوا من الطيبات واعملوا صالحا إني بما تعملون عليم. (المؤمنون :51) وقال: يا أيها الذين آمنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم) (البقرة:173 ) ثم ذكر الرجل يطيل السفر أشعث أغبر، يمد يده إلى السماء، يارب يارب، ومطعمه حرام ومشربه حرام، وغذي بالحرام فأنى يستجاب له.) مسلم -1686(

হে মানুষ সকল ! নিশ্চয় আল্লাহ পুত:পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কবুল করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ রাসূলদের যে আদেশ দিয়েছেন তা মু‘মিনদের জন্যও আদেশরূপে বিবেচ্য। আল্লাহ বলেন :— ‘হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর ; তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত। (আল- মু‘মিনূন-৫১) এবং আল্লাহ আরো বলেন, হে! ঈমানদারগণ ! তোমরা পাক পবিত্র বস্তু সামগ্রী আহার হিসেবে ব্যবহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসেবে দান করেছি।’ (আল-বাকারা- ১৭৩)

অতঃপর উস্কখুস্ক ধূলোময় অবস্থায় দীর্ঘ সফরকারী একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, যে স্বীয় হস্তদ্বয় আকাশের দিকে প্রসারিত করে বলে, হে প্রভু! হে প্রভু ! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা লালিত, তার দুআ কিভাবে কবুল হবে ? (মুসলিম -১৬৮৬)

  • () দুআয় সীমালঙ্ঘন না করা:

দুআর সময় বান্দা বৈধ সীমারেখায় বিচরণ করবে, পাপের কাজ সিদ্ধ করা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, অথবা সামান্য ভুলের শাস্তি স্বরুপ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির ধ্বংসের জন্য দুআ করবে না।

মহান আল্লাহ বলেন:

ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ. (الأعراف:55 )

তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।’ ( আল- আরাফ-৫৫)

 

দুআ কবুলের বাধা সমূহ

উপরের আলোচনায় আমরা দুআ কবুলের শর্ত সম্পর্কে জানতে পেরেছি, নীচে দুআ কবুলের অন্তরায় সমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ কর হল।

  • 1. আল্লাহর সাথে শিরক করা।
  • 2. দুআতে এখলাস না থাকা।
  • 3. অবৈধ কারবার করা, ভেজাল দেয়া।
  • 4. সুদ খাওয়া।
  • 5. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষন করা।
  • 6. ঘুষ নেওয়া।
  • 7. দু’আতে সীমালঙ্ঘন করা।
  • 8. অবৈধ বা বিদ্‌য়ী দুআ করা মৃত বা কবরস্থ ব্যক্তির অসীলা গ্রহণ করে দুআ করা।

উল্লেখিত প্রত্যেকটি বিষয় স্বতন্ত্র ভাবে দুআ কবুলের অন্তরায়। অতএব প্রত্যেক মুসলমানের উপর অবশ্য কর্তব্য হল, সে যেন দুআ কবুলের যে কোন অন্তরায় থেকে নিজেকে দূরে রাখে।

দুআর আদব সমূহ

  • ১-বিনয়-বিনম্রতা ও একাতগ্রতা সাথে দুআ করা।
  • ২-সংকল্প ও আকুতির সাথে দুআ করা, দুআ কবুলে প্রবল আশাবাদী হওয়া। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :—

إذا دعا أحدكم فليعزم المسألة، ولا يقولن: اللهم إن شئت فأعطني، فإنه لا مستكره له.(رواه البخاري – 5863)

অর্থাৎ যখন তোমরা দুআ করবে, তখন প্রার্থিত বিষয়টি লাভের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, এবং বলবে না যে, আল্লাহ ! যদি তুমি চাও আমাকে প্রদান কর, কেননা, আল্লাহকে বাধ্যকারী কেউ নাই।’ (বুখারী-৫৮৬৩)

  • ৩-দুআকারী যেন উত্তম সময় ও স্থান বেছে নেয়, যেমন আ’রফা দিবস, রামাযান মাস. জুমার দিন, কদরের রাত, প্রত্যেক রাতের শেষাংশ, সালাতে সাজদারত অবস্থা, আযান ইকামতের মাধ্যবর্তী সময়, সফরকালীন সময়, সিয়ামের সময় অসহায়ত্বের সময়, হজ্বের সময়, বিশেষভাবে তাওয়াফ সায়ীর সময় এবং জামরাতে পাথর নিক্ষেপের পর। এছাড়া, বিশেষ বিশেষ সময় ও স্থান সমুহে।
  • ৪-পবিত্র অবস্থায় কেবলামূখী হয়ে হাত তুলে দুআ করা ও করার শুরু এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর সালাত ও সালাম পেশ করা।

বৈধ দুআর কতিপয় উদাহরণ:

১-ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের জন্য দুআ করা।

২-সন্তান সঠিক ও সৎ পথে চলার জন্য দুআ করা।

৩-অসুস্থ ব্যক্তির শেফা ও পুরুস্কার প্রাপ্তির দুআ করা।

৪-উপকারী ব্যক্তির জন্য দুআ করা।

৫-মুজাহিদ ও সাধারণ মুসলমানের জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের দুআ করা।

হৃদয়সংলগ্ন কিছু আমল

হৃদয়সংলগ্ন কিছু আমল

  • ১- আল্লাহ তা’আলার উপর ঈমান আনা

আল্লাহকে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থ শুধু আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব স্বীকার করা নয়; বরং অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে অনাদি, অনন্ত, চিরঞ্জীব তা স্বীকার করা। তার সিফাত অর্থাৎ মহৎ গুণাবলি স্বীকার করা এবং তিনি যে এক, অদ্বিতীয়, সর্বশক্তিমান ও দয়াময় এটাও স্বীকার করা এবং তিনি ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নয় একথা বিশ্বাস করা।

  • ২- সবই আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট এর উপর ঈমান রাখা

প্রত্যেক মুসলমানকে এ বিষয়ে অকাট্য বিশ্বাস ও ঈমান রাখতে হবে যে, ভাল-মন্দ ছোট বড় সমস্ত বিষয় ও বস্তুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ নেই।

  • ৩- ফেরেশতা সম্পর্কে ঈমান রাখা

ফেরেশতাগণ নিস্পাপ, তারা আল্লাহর প্রিয় ও ফরমাবরদার বান্দা। কোন কাজেই তারা বিন্দুমাত্র নাফরমানি করেনা এবং তাদের আল্লাহপ্রদত্ব ক্ষমতাও অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা তাদের উপর অনেক জিম্মাদারি অর্পণ করেছেন।

  • ৪- আল্লাহর কিতাব সম্বন্ধে ঈমান রাখা

পবিত্র কুরআন সম্পর্কে এরূপ ঈমান রাখতে হবে যে, এ মহান কিতাবটি কোন মানুষের রচিত নয়; বরং তা আদ্যোপান্ত আল্লাহ তাআলার কালাম বা বাণী। পবিত্র কুরআন অক্ষরে অক্ষরে অকাট্য সত্য। এতদ্ভিন্ন পূর্ববর্তী নবীগণের প্রতি যেসব বড় বা ছোট কিতাব নাযিল হয়েছিল, সবই অক্ষরে অক্ষরে সত্য ও অকাট্য ছিল। অবশ্য পরবর্তী কালে লোকেরা ঐসব কিতাব বিকৃত ও পরিবর্তন করে ফেলেছে। কিন্তু কুরআন শরীফকে শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিতরূপে সংরক্ষণ করার ভার স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই নিয়েছেন। সেই হিসেবে পবিত্র কুরআনকে কেউ বিকৃত করতে পারবে না।

  • ৫- পয়গাম্বরগণ সম্বন্ধে ঈমান রাখা

বিশ্বাস রাখতে হবে যে, নবী বা পয়গাম্বর বহু সংখ্যক ছিলেন। তারা সকলেই নিষ্পাপ ও বেগুণাহ ছিলেন। তারা স্বীয় দায়িত্ব যথাযথ আদায় করে গিয়েছেন। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার আনীত শরীয়তই আমাদের পালনীয়।

  • ৬- আখেরাত সম্বদ্ধে ঈমান রাখা

আখেরাতের উপর ঈমান রাখার অর্থ এই যে, কবরের সাওয়াল-জওয়াব ও ছাওয়াব-আযাব বিশ্বাস করা, হাশরের ময়দানে আদি হতে অন্ত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সকল মানুষ একত্রিত হবে, নেকি ও গুণাহ পরিমাপ করা হবে ইত্যাদির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ কিয়ামত সম্বন্ধে যত কথা কুরআন ও হাদীসে এসেছে, সব বিশ্বাস করা জরুরী।

  • ৭- তাকদীর সম্বন্ধে ঈমান রাখা

তাকদীর সম্বন্ধে কখনো তর্ক-বিতর্ক করবে না, বা মনে সংশয় সন্দেহ স্থান দিবেনা। দুনিয়াতে যা কিছু হয়েছে, হচ্ছে বা হবে সবই মহান আল্লাহর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণাধীন ও হুকুমের তাবেদার। আল্লাহ তাআলার ক্ষমতায়ই সবকিছু হয়। অবশ্য আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও কাজের ইখতিয়ার দিয়েছেন। মানুষ নিজের ইখতিয়ার ও ইচ্ছায় ভাল-মন্দ যা কিছু করবে, আল্লাহ তার প্রতিদান দিবেন।

  • ৮- বেহেশতের উপর ঈমান রাখা

পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে বেহেশতের কথা উল্লেখ আছে। আল্লাহ তাআলা নেককার মুমিন বান্দাদেরকে বেহেশতে তাদের আমলের যথার্থ প্রতিদান ও পুরস্কার দিবেন। তারা ঈমান ও নেক আমলের বদৌলতে চিরকাল বেহেশতের অফুরন্ত নেয়ামত ও শান্তি ভোগ করবেন। বেহেশতের বাস্তবতা সম্পর্কে দৃঢ় ঈমান রাখতে হবে।

  • ৯- দোযখের উপর ঈমান রাখা

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে দোযখের উল্লেখ আছে। আল্লাহ তাআলা কাফির, ফাসেক ও বদকারদেরকে জাহান্নাম তথা দোযখে তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত পরিনাম বা শাস্তি দিবেন। কাফিররা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। আর গুণাহগার ঈমানদাররা জাহান্নামে নির্দিষ্ট মেয়াদের শাস্তি ভোগের পর ঈমানের বদৌলতে জান্নাতে যাবে। দোযখের বাস্তবাতার উপর ঈমান রাখতে হবে।

  • ১০- অন্তরে আল্লাহর মুহাব্বত রাখা

অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি সর্বদা মহব্বত বদ্ধমূল রাখতে হবে। এমনকি দুনিয়ার সবকিছু থেকে আল্লাহ তাআলার মহব্বত বেশি হতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন মজিদে ইরশাদ করেন –

والذين آمنوا أشد حباً لله
যারা মুমিন আল্লাহর প্রতি তাদের মুহাব্বত প্রকট।[সুরা বাকরাঃ ১৬৫]

  • ১১- কারো সাথে মহব্বত-ভালোবাসা ও শত্রুতা পোষণ কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই রাখা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে।

  1. (ক) যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সর্বাধিক মহব্বত করবে।
  2. (খ) কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে মহব্বত করতে হলে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করবে। অন্য কোন উদ্দেশ্যে করবেনা।
  3. (গ) কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে মন্দ জানতে হলে শুধুমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তেই মন্দ জানবে। (মুসনাদে আহমাদ)
  • ১২- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মহব্বত রাখা, তার সুন্নতকে ভালোবাসা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মহব্বত রাখা ঈমানের বিশেষ অংশ। এর অর্থ শুধু মহব্বতের দাবি করা বা নাত-গজল পড়া নয়, বরং এর সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কর্তব্য পালন করতে হবে। যথা:

  1. ১. অন্তর দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভক্তি করতে হবে।
  2. ২. বাহ্যিকভাবে তার আদব বা তাজীম রক্ষা করতে হবে।
  3. ৩. রাসূলের উপর দুরূদ ও সালাম পড়তে হবে।
  4. ৪. রাসূলের সুন্নত তরীকার অনুসরণ করতে হবে।
  • ১৩- ইখলাসের সাথে আমল করা

যে কোন নেক কাজ খালিসভাবে আল্লাহকে রাজি-খুশি করার নিয়্যতে করা ঈমানের দাবি। নিয়্যত খাটি হবে, মুনাফেকি ও রিয়া থাকতে পারবে না। মুমিনের সকল কাজ একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই হতে হবে।

  • ১৪- গুণাহ থেকে তওবা করা

তওবা শুধু গদবাধা কতগুলো শব্দ উচ্চারণের নাম নয়; বরং গুণাহর কারণে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়ে তা থেকে সম্পূর্ণরূপে পরহেজ করা জরুরী। এক আলেম আরবীতে অতি সংক্ষেপে তওবার ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন-

التوبة تحرق الحشا على الخطأ
গুণাহের কারণে মনের ভিতর অনুতাপের আগুন জলাকেই তওবা বলে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন :
الندامة توبة
অনুতাপের নামই তওবা।

 

  • ১৫- অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখা

মুআয রা. থেকে বর্ণিত: ঈমান ওয়ালার দিল কখনও আল্লাহর ভয় ছাড়া থাকেনা, সব সময়ই তা আল্লাহর ভয়ে কম্পমান থাকে। কোন সময়ই সে আল্লাহ থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারেনা।

  • ১৬- আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করা

কুরআন মাজীদে আছে :

إنه لا ييأس من روح الله إلا القوم الكافرون
যারা কাফের তারাই শুধু আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়। সুরা ইউসুফঃ ৮৭

আল্লাহর রহমতের আশা রাখা ঈমানের একটি বিশেষ অংশ।

  • ১৭- লজ্জাশীল হওয়া

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
الحياء شعبة من الإيمان
লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি বড় শাখা। (বুখারী, মুসলিম)

 

  • ১৮- শোকরগুযার হওয়া

শোকর দুই প্রকার।

  • (ক) আল্লাহর শোকর আদায় করা যিনি প্রকৃত দাতা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

واشكروا لي ولا تكفرون
তোমরা আমার শোকর আদায় কর, কুফরি করোনা। সুরা বাকরাঃ ১৫২

 

  • (খ) মানুষের শোকর আদায় করা। অর্থাৎ যাদের হাতের মাধ্যম হয়ে আল্লাহ তাআলার নেয়ামত পাওয়া যায়, তাদের শোকর আদায় করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম বলেন,

من لم يشكر الناس لم يشكر الله
যে ব্যক্তি মানুষের শোকর আদায় করলনা সে আল্লাহ তাআলার শোকর করলনা।

  • ১৯- অঙ্গীকার রক্ষা করা

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يأيها الذين آمنوا أوفوا بالعقود
হে ঈমানদারগণ, তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। (অর্থাৎ কাউকে কোন কথা দিয়ে থাকলে তা রক্ষা কর। )

 

  • ২০- ধৈর্য ধারণ করা

আল্লাহ তাআলা বলেছেন :

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
যারা সবর করে আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে আছেন। সুরা বাকরাঃ ১৫৩

 

  • ২১- নম্রতা অবলম্বন করা

নম্রতা অর্থ নিজেকে সকলের তুলনায় অন্তর থেকে ছোট মনে করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম বলেন:

من تواضع لله رفعه الله
যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (বাইহাকী)

 

  • ২২- স্নেহশীল হওয়া

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি দুর্ভাগা তার থেকেই দয়া ছিনিয়ে নেয়া হয়।

  • ২৩- তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকা

তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকাকে رضى بالقضاء বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর সকল ফয়সালা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। তবে আল্লাহর হুকুমে বিপদ আপদ বা দুঃখ-কষ্ট আসলে অসন্তুষ্ট না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, মনে কষ্ট লাগতে পারবে না, পেরেশানও হবেনা। কষ্টের বিষয়ে কষ্ট লাগাটাইতো স্বাভাবিক। তবে আসল কথা হচ্ছে কষ্ট লাগলেও বুদ্ধির দ্বারা ও জ্ঞানের দ্বারা তার মধ্যে কল্যাণ আছে এবং এটা আল্লাহ তাআলারই হুকুমে হয়েছে মনে করে সেটাকে পছন্দ করা।

  • ২৪- তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা

আল্লাহ তাআলা বলেন:
وعلى الله فليتوكل المؤمنون
আর আল্লাহ তাআলার উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিৎ। সুরা তাওবাঃ ৫১

 

  • ২৫- অহংকার না করা

অহংকার না করা অর্থাৎ অন্যের তুলনায় নিজেকে নিজে ভাল এবং বড় মনে না করা ঈমানের অঙ্গ। তবরানী নামক হাদীসের কিতাবে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, তিনটি জিনিষ মানুষের জন্য সর্বনাশকারী :

(ক) লোভ (খ) নফসানি খাহেশ ও (গ) অহংকার।

 

  • ২৬- চোগলখুরী ও মনোমালিন্য তরক করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: চোগলখুরী ও কিনা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অতএব, কোন মুমিনের অন্তরেই এ গর্হিত খাসলত না থাকা উচিৎ। (তবরানী)

  • ২৭- হিংসা-বিদ্বেষ বর্জন করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
إياكم والحسد، فإن الحسد يأكل الحسنات كما تأكل النار الحطب
খবরদার! তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাক, কেননা অগ্নি যেমন কাঠকে ভস্ম করে ফেলে তদ্রূপ হিংসাও মানুষের নেকিকে ভস্ম করে ফেলে। । (তবরানী)

  • ২৮- ক্রোধ দমন করা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে ক্রোধ দমনকারীর প্রশংসা করেছেন। অনর্থক রাগ করা মারাত্মক গুণাহ। রাগ-ক্রোধ দমনে হাদীসে তাকীদ এসেছে। তবে ইসলামের উপর কোন আঘাত আসলে সেখানে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি প্রদর্শনই ঈমানের দাবি।

  • ২৯- অন্যের অনিষ্ট সাধন ও প্রতারণা না করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করে অর্থাৎ পরের মন্দ চায়, অপরকে ঠকায়, ধোকা দেয় তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। (মুসলিম)

  • ৩০- দুনিয়ার প্রতি অত্যধিক মায়া-মহব্বত ত্যাগ করা

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবাসবে, তার আখেরাতের লোকসান হবে এবং যে আখেরাতকে ভালবাসবে তার দুনিয়ার কিছু ক্ষতি হবে। হে আমার উম্মত! তোমাদের মঙ্গলের জন্যই বলছি, তোমরা অস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে ভালবেসে চিরস্থায়ী আখেরাতকে নষ্ট করে দিওনা। তোমরা সকলে চিরস্থায়ী পরকালকেই শক্তভাবে ধর এবং বেশি করে ভালবাস। (অর্থাৎ দুনিয়ার মহব্বত পরিত্যাগ করে আখেরাতের প্রস্তুতিতে আমলের প্রতি যথাযথ ধাবিত হও। (আহমাদ, বাইহাকী)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে উল্লেখিত সিফাতগুলো অর্জন করার তাওফীক দান করুন।