Tag Archives: আল্লাহর সৃষ্টি

কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর কিছু সৃষ্টি নিদর্শন

কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর কিছু সৃষ্টি নিদর্শন

আলী হাসান তৈয়ব

আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আর তা হলো মহাবৈশ্বয়িক কিছু নিদর্শন, যা আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব ও একত্ববাদের জাজ্জ্বল্য প্রমাণ বহন করে। আকাশ ও পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, লতাগুল্মসহ মহাবিশ্বের সব কিছুই আল্লাহ তা`আলার একত্ববাদের ঘোষক এবং একমাত্র তিনিই যে ইবাদত-বন্দেগী, দু‘আ-প্রার্থনা, চূড়ান্ত ভক্তি, ভয় ও ভালোবাসার পাত্র তার অকপট সাক্ষী। মহাবিশ্বের নানা বিষয়, ঘটনা ও অনুঘটনা অনুসান্ধানী দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখলে বিষয়টি অত্যুজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠে। এবার আসুন তাহলে, এ বিষয়ক কয়েকটি আয়াত অধ্যয়নে মনোনিবেশ করি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

أَوَلَمْ يَنْظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْ عَسَى أَنْ يَكُونَ قَدِ اقْتَرَبَ أَجَلُهُمْ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ.

তারা কি দৃষ্টিপাত করেনি আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্বে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি? আর (এর প্রতি যে) হয়তো তাদের নির্দিষ্ট সময় নিকটে এসে গিয়েছে? সুতরাং তারা এরপর আর কোন্ কথার প্রতি ঈমান আনবে?’।[1]

আল্লাহ তা‘আলা আরও ইরশাদ করেন:

أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوجٍ. وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ

‘তারা কি তাদের উপরে আসমানের দিকে তাকায় না, কিভাবে আমি তা বানিয়েছি এবং তা সুশোভিত করেছি? আর তাতে কোনো ফাটল নেই। আর আমি যমীনকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক প্রকারের সুদৃশ্য উদ্ভিদ উদ্গত করেছি আল্লাহ অভিমুখী প্রতিটি বান্দার জন্য জ্ঞান ও উপদেশ হিসেবে’।[2]আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন :

أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ. وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ. وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ. وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ.

‘তবে কি তারা উটের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কীভাবে তা ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়েছে? আর পর্বতমালার দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর যমীনের দিকে, কীভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে?’।[3]

আল্লাহ তা‘আলার কতিপয় নিদর্শন

আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আসমান ও যমীনের সৃষ্টি। সুতরাং যে ব্যক্তি আসমানের দিকে তাকাবে, আসমানের নিপুণ সৃষ্টি, আসমানের অপার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য এবং এর অনুমেয় উচ্চতা ও বিশালতার প্রতি লক্ষ্য করবে, সে তার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার অসীম শক্তি ও ক্ষমতাই দেখতে পাবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا. رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا

‘তোমাদেরকে সৃষ্টি করা অধিক কঠিন, না আসমান সৃষ্টি? তিনি তা বানিয়েছেন। তিনি তার ছাদকে উচ্চ করেছেন এবং তাকে সুসম্পন্ন করেছেন’।[4]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন :

وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ

‘আর আমি হাতসমূহ দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি সম্প্রসারণকারী’।[5]

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَكَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ

‘অতঃপর তুমি দৃষ্টি ফিরাও একের পর এক, সেই দৃষ্টি অবনমিত ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে’।[6]

আর যে যমীন তথা ভূপৃষ্ঠের দিকে তাকাবে, সে দেখতে পাবে কীভাবে আল্লাহ তা`আলা একে সুগম করেছেন, এর মধ্যে আমাদের জন্য রাস্তা বানিয়েছেন, এর উপরিভাগে দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এতে বরকত দিয়েছেন, এতে সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন এবং বান্দাদের জন্য এসব আহরণ করা সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ

‘আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন’।[7]

বান্দারা যাতে রিযক অন্বেষণ করতে পারে তাই আল্লাহ তা‘আলা যমীনকে সমতল বানিয়েছেন। বান্দারা যমীনে চাষাবাদ করে, যমীন থেকে পানি বের করে তা পান করে তৃপ্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা যমীনকে স্থির করেছেন, তাঁর নির্দেশ ছাড়া তা নড়ে না বা কম্পিত হয় না। আল্লাহ তা‘আলা, তাই ইরশাদ করেন :

وَفِي الْأَرْضِ آَيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ

‘সুনিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য যমীনে অনেক নিদর্শন রয়েছে’।[8]

আল্লাহ তা‘আলার আরেক নিদর্শন তাঁর গড়া আসমান-যমীনের অসংখ্য জীব। আসমানে অসংখ্য অগণিত ফেরেশতা রয়েছেন, যার সঠিক সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলাই জানেন। যমীনে আল্লাহ তা‘আলা যে কত জাতের ও কত প্রজাতির জীব সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া তা কেউ জানে না। আর এগুলোর সংখ্যা যে কত তাও কল্পনার অতীত। এসব জীব আবার নানা প্রজাতির, নানা রঙের এবং নানা ধরনের। এর মধ্যে কিছু আছে যা আমাদের জন্য উপকারী। এর দ্বারা আল্লাহর নিয়ামতের পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায়। আবার কিছু আছে মানুষের জন্য ক্ষতিকর, এর দ্বারা মানুষের নিজের জীবনের মূল্য এবং আল্লাহর সৃষ্টির সামনে তার দুর্বলতার অনুভূতি হাসিল হয়। এসব সৃষ্টির প্রত্যেকেই কিন্তু আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন :

تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا.

‘সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রসংশায় তাসবীহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবীহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ’[9]

পৃথিবীতে আমাদের দেখা না-দেখা এবং জানা –নাজানা যত প্রাণী আছে সকল প্রাণীর রিযকও আল্লাহ তা‘আলা দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

‘আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল। সব কিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে’[10]

আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনের মধ্যে আরও আছে দিন-রাতের সৃষ্টি। রাতকে আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত সৃষ্টি করেছেন আমাদের প্রশান্তি লাভের জন্য। আমরা এতে নিদ্রা যাই এবং সারাদিনের ক্লান্তি দূর করি। আর দিনকে সৃষ্টি করেছেন জীবিকা অর্জনের জন্য। এ সময় মানুষ আপন জীবিকা অর্জনে ব্যস্ত থাকে। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

فَالِقُ الْإِصْبَاحِ وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ

‘(তিনি) প্রভাত উদ্ভাসিতকারী। তিনি বানিয়েছেন রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক। এটা সর্বজ্ঞ পরাক্রমশালীর নির্ধারণ’।[11]

আমাদের ভেবে দেখা উচিত আল্লাহ তা‘আলা যদি রাতের পর দিন না আনেন, তাহলে আমরা কি জীবিকা সংগ্রহ করতে পারব? যদি এমন হয় তাহলে পৃথিবীর কোনো সরকার, কোনো পরাশক্তি, আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের মহাক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট কিংবা জাতি সংঘের মহাসচিবও কি পারবে আমাদের জন্য দিন এনে দিতে? দেখুন আল্লাহ তা`আলা কত সুন্দর করে আমাদের কে সেকথা বুঝিয়ে দিচ্ছেন :

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ.

‘বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ রাতকে তোমাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোনো ইলাহ আছে কি যে তোমাদের আলো এনে দেবে? তবুও কি তোমরা শুনবে না?’।[12]

এই মহাবিশ্ব, এই মহা বিশ্বের সব কিছু একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সৃষ্টি করেছেন। তার কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। তাই একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত।

কোনো কিছুই নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি

প্রিয় পাঠক, চিন্তা করে দেখুন, এসব সৃষ্টির কোনোটাই কিন্তু নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি। একমাত্র আল্লাহ তা`আলাই সব সৃষ্টির স্রষ্টা। ইরশাদ হয়েছে :

أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ . أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَل لَا يُوقِنُونَ.

‘তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারাই স্রষ্টা? তারা কি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না’। [13]

আমাদের যদি বলা হয়, একটি বিশাল অট্টালিকা বা একটি রাজপ্রাসাদ নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে আমরা নিশ্চয় এটা বিশ্বাস করব না। যদি কেউ বলে, দেখ, এই দালানটি হঠাৎ নিজের থেকে তৈরি হয়ে গেল। তবে আমরা তাকে পাগল বলবেন। তাহলে বলুন, এ বিশ্ব চরাচর, এই যে সুউচ্চ আকাশ আর সুবিস্তৃত যমীন, এই ঊর্ধ্বজগত আর নিম্নজগত কীভাবে একজন স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হতে পারে? কোনো বানানেওয়ালা ছাড়া আকস্মিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে? নিশ্চয় এসবের একজন স্রষ্টা আছেন। একজন অসীম ক্ষমতাবান নিয়ন্ত্রক আছেন। হ্যা, তিনিই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলা।

ডারউইনের থিওরি একটি ভ্রান্ত মতবাদ

বর্তমান যুগে তথাকথিত কিছু শিক্ষিত লোক ডারউইনের বিবর্তনবাদ থিওরিতে বিশ্বাস করে। মানুষ নাকি প্রথমে বানর ছিল। তারপর ক্রমবিবর্তনের ধারায় সেখান থেকে তারা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি চরম মিথ্যাচার ও বাস্তবতার ওপর মিথ্যার প্রলেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিবর্তনবাদ এমন একটি মতবাদ, যা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ কিছুই এ চিন্তার সত্যায়ন করে না। এমন বাতুলতাপূর্ণ চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে কেউ ঈমানহারা হবেন না। এ মতবাদকে খণ্ডন করে বিজ্ঞানী ও আলেমগণ অনেক বই লিখেছেন। সেগুলো পড়লেই আমরা বুঝতে পারব বিষয়টি কতটা অসার ও হাস্যকর। আল্লাহর যেসব নিয়ামতের জন্য আমাদের শুকরিয়া করা উচিত, তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো, এসব সৃষ্টিকে আমাদের অনুগত করে দেয়া। তিনি হাজার হাজার মাখলূকাত আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলোকে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন। তাই আমাদের অবশ্যই আল্লাহ তা`আলার শুকরিয়া জানানো উচিত। অতএব আমাদের উচিত আল্লাহ তা`আলাকে ভয় করা। তিনি আমাদের হিদায়েত দিয়েছেন, আমরা যা জানতাম না তা শিখিয়েছেন, আমাদের দুনিয়া-আখিরাতে যা কল্যাণকর তার জ্ঞান ও শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন। আর যা আমরা অনুধাবন করতে সক্ষম নই, যাতে আমাদের মঙ্গল নেই, তা আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন। তাই আমাদের উচিত আল্লাহ তা`আলার শুকরিয়া আদায় করা। তাঁর নির্দশ মতো জীবন যাপন করা। তিনি আমাদের জানিয়েছেন কীভাবে এই বিশ্বজাহান সৃষ্টি হয়েছে। এ জ্ঞান তিনি দিয়েছেন তাঁর নবী-রাসূলদের মাধ্যমে। সুতরাং আসমান-যমীনের সৃষ্টি সংক্রান্ত যে কথাই আমরা শুনি না কেন, যাচাই করে দেখতে হবে তা নবী-রাসূলদের কথার সঙ্গে মেলে কি না। যদি মেলে, তাহলে তা গ্রহণ করা যাবে; যদি না মেলে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর যদি এ সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের বক্তব্য না জানা যায়, তাহলে যতদিন বিষয়টি সত্য না মিথ্যা তা নিশ্চিত হব, ততদিন এ ব্যাপারে নীরব থাকাই হবে প্রজ্ঞা ও সুবুদ্ধির পরিচায়ক। আল্লাহ তা`আলা আমাদের জানিয়েছে যে, তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মাঝখানের সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির কাজ শুরু করে দুই দিনে তিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন, তার ওপর পেরেক স্বরূপ পাহাড়-পর্বত স্থাপন করেছেন। এরপর আর দুই দিনে তাতে খাদ্য সন্নিবেশিত করেছেন। এই হলো চারদিন। অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন। এটি তখন ছিল ধোঁয়ার মত। তারপর তিনি দুই দিনে সাত আসমান সৃষ্টি করেন। এই মোট ছয় দিনে আল্লাহ তা`আলা আসমান-যমীন সৃষ্টি করেন। আল্লাহ তা`আলা বলেন :

إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ.

‘নিশ্চয় তোমাদের রব আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে উঠেছেন। তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। আর (সৃষ্টি করেছেন) সূর্য, চাঁদ ও তারকারাজি, যা তাঁর নির্দেশে নিয়োজিত। জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব’[14]

অন্যত্র আল্লাহ তা`আলা বলেন :

إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ.

‘নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’[15]

আসমান-যমীনের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এ দুয়ের মধ্যস্থিত সবকিছুই আল্লাহ তা`আলা সৃষ্টি করেছেন। যমীন থেকে পানি ও চারণভূমি বের করেছেন এবং তাতে এমনভাবে খাদ্য লুকিয়ে রেখেছেন, যা সব যুগের এবং সব স্থানের উপযোগী। যাতে খাদ্যগুলো প্রত্যেক যুগে নানা রকমের হয়, সব সময় খাদ্য কোথাও না কোথাও থাকে এবং এই খাদ্যের প্রয়োজনে মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে। একইভাবে তিনি আসমানে চাঁদ, সূর্য ও তারকারাজি স্থাপন করে তাকে সুসজ্জিত করেছেন। এর দ্বারা মানুষ সমুদ্রে ও স্থলে পথ খুঁজে পায়। আল্লাহ তা`আলা বলেন :

أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا . وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا. وَاللَّهُ أَنْبَتَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ نَبَاتًا.

‘তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, কীভাবে আল্লাহ স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন? আর এগুলোর মধ্যে চাঁদ সৃষ্টি করেছেন আলো এবং সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন প্রদীপরূপে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে উদগত করেছেন মাটি থেকে’[16]

শেষ কথা

আমরা যেন কিছুতেই এ কথা ভুলে না যাই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা`আলা এসব সৃষ্টিকে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে আমরা একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করি; অন্য কাউকে তাঁর ইবাদতে শরীক না করি। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে’[17]

তাই আমাদের সবার কর্তব্য, আল্লাহ তা`আলার নির্দেশ মতো তাঁর ইবাদত করা এবং এসব নিয়ামতের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা। আল্লাহ তা`আলা ইরশাদ করেন :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

‘হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত কর’[18]

তিনি আরও ইরশাদ করেন :

فَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا وَاشْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

‘অতএব আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল উত্তম রিযক দিয়েছেন, তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করে থাক’।[19]

অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন :

إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقًا فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ.

‘তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর পূজা করছ এবং মিথ্যা বানাচ্ছ। নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা কর তারা তোমাদের জন্য রিযক-এর মালিক নয়। তাই আল্লাহর কাছে রিযক তালাশ কর, তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’।[20]

আল্লাহ তা`আলা আমাদের সবাইকে তাঁর নিয়ামত সম্পর্কে জানার এবং বেশি বেশি তাঁর শুকরিয়া আদায় করার এবং ইবাদত করবার তাওফীক দান করুন। আমীন।


[1]. সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত : ১৮৫।
[2]. সূরা কাফ, আয়াত : ৬-৮।
[3]. সূরা আল গাশিয়া, আয়াত : ১৭-২০।
[4]. সূরা আন-নাযিয়াত, আয়াত : ২৭-২৮।
[5]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ৪৭।
[6]. সূরা মুলক, আয়াত : ৪।
[7]. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত : ১০।
[8]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ২০।
[9]. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪।
[10]. সূরা হূদ, আয়াত : ৬।
[11]. সূরা আনআম, আয়াত : ৯৬।
[12]. সূরা আল-কাসাস, আয়াত : ৭১।
[13]. সূরা আত-তূর, আয়াত : ৩৫-৩৬।
[14]. সূরা আ‘রাফ, আয়াত : ৫৪।
[15]. সূরা ইউনুস, আয়াত : ৩।
[16]. সূরা নূহ, আয়াত : ১৫-১৭।
[17]. সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ৫৬।
[18]. সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৭২।
[19]. সূরা আন-নাহাল, আয়াত : ১১৪।
[20]. সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ১৭।

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান (পর্বঃ ১ – ৭)

মহান আল্লাহর তাওহীদ ও আধুনিক বিজ্ঞান

মুহাম্মদ উসমান গনি

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

কুরআন মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে মানুষের জন্য হিদায়েত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার একমাত্র সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ। এটি এমন একটি কিতাব যাতে আছে জীবনকে সুন্দর সহজ ভাবে সৎ পথে পরিচলার দিক-নির্দেশনাসহ জাতিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও পরকালীন জীবনের বিস্তারিত নর্ণনা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করার উপায়। যেহেতু এটি একটি হিদায়েতের কিতাব কাজেই শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্বরুপ বলা যায় সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, পর্দাথ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিজ্ঞান যে ষিয়েই পারদর্শী হোন না কেন উক্ত সর্ব বিষয়েই পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত রয়েছে বলে মানুষ হিদায়েত পেতে পারে। এব্যাপারে ২/১টি উদাহরণ তুলে ধরছি যাতে সবার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়। সূরা কাহাফে আসহাবে কাহাফদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ . سورة الكهف : 18ِ

“তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে। [সুরা কাহফঃ ১৮]

এই সূরা, এমনকি কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অধ্যায়ন করলে দীর্ঘ দিন ঘুমন্ত লোককে ডান দিকে ও বাম দিকে পরিবর্তন করানোর কথাটি বলার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হবে না। এতে না আছে পূর্বের বা পরের আয়াতের মিল, না আছে কোন প্রশ্নের উত্তর, আর না আছে কোন হিদায়েতের কথা। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হবে এই কথাটি বলাই ছিল নিসপ্রয়োজন। কিন্তু না, তা কখনোই না। মহাজ্ঞানী আল্লাহ কি বিনা কারণে কুরআনের মত অহী গ্রন্থে এসব উল্লেখ করেছেন? আমি ডাক্তার হিসাবে এই আয়াতের অর্থ প্রথম পড়ার পর মনে হয়েছে সারা জীবন ও যদি সিজদায় পড়ে থাকি তাহলেও মানর জাতির জন্য এই শিক্ষার বিনিময় আদায় করা অসম্ভব। আমি নিজের অজান্তেই আল হামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ পড়ে কতক্ষণ যে নিশ্চুপ হয়েছিলাম তা মনে নেই। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। মানুষের দীর্ঘ দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা আবস্থায় যদি পার্শ্ব পরিবর্তন করানো না হয় তাহলে শরীরের নীচের অংশে ঘা হয়ে পচন ধরে। এক ভালো করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এমনকি রোগী রোগমুক্ত হয়েও এ মারা যায়। কাজেই ডাক্তারের কাছে অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তন করানোটা কত যে মূল্যবান তা বুঝতেই পারেন। সে ই কারণে আমরা অজ্ঞান রোগীর জন্য নেই ঘন ঘন পার্শ্ব পরিবর্তন করার. ভাবতে কেমন লাগে যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিস্কারের অনেক আগেই অজ্ঞান রোগীকে পার্শ্ব পরিবর্তনের নির্দেশ দিচ্ছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা । এই ব্যাপারটি আপনারা কিভাবে নিবেন তা আপনাদের বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম। আর একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-কাসাসে ঘোষণা দেনঃ

إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فيه. سورة القصص: 72

অর্থ: আল্লাহ যদি দিবসকে কেয়ামত পর্যনত স্থায়ী রাখেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্য আছে কি যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম? [সুরা কাসসঃ ৭২]

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে লাটিমের মত (লাটিম যেমন নিজের অক্ষের উপর ঘুরে, আবার দৌড়ায়ও) ঘুরে বলেই দিন, রাত্রি ও ঋতুর পরিবর্তন হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সূর্যের দিকে আজীবন একই দিকে মুখ করে ঘুরত তাহলে একদিক হতো চিরদিনের জন্য শুধু গরম আর গরম , আর অন্যদিক হতো অন্ধকার (রাত্রি) এবং ঠান্ডা আর ঠান্ডা। অথবা পৃথিবীর যে দিকে সূর্য আছে তার অপর দিকে যদি আরও একটি সূর্য থাকত তাহলে পৃথিবী যেভাবেই ঘুরত না কেন, সব সময়েই পৃথিবীর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ থাকত আলোকিত এবং গরম আর গরম। এই উভয় অবস্থাতেই পৃথিবীতে কোন জীব জন্তুর বসবাস করা সম্ভব হত না , যেমন চাঁদে কোন দিনই মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব হবে না । কারণ একেতো ওখানে বাতাস নেই, অধিকন্তু সব সময়েই একদিক পৃথিবীর দিকে মুখ করে ঘুরে বলে চাঁদের এক পৃষ্টের তাপমাত্রা ১১৭’, আর অন্য পৃষ্ঠের তাপমাত্রা (-) ১৩৬’। অতএব এক পৃষ্ঠে অতি গরম, আর অন্য পৃষ্ঠে অতি ঠান্ডা বিধায় মানুষের বসবানের অনুপযোগী। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, নভোচারীরা কি করে চাঁদে ঘুরে এলো? নভোচারীরা যে পোশাক পরিধান করে চাঁদে ভ্রমন করেছিলেন তা চাঁদের আবহাওয়ায় ক্ষতি করতে পারে না। এই ধরণের পোশাক পরে মানুষ কিছু দিন থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ দিন থাকতে পারবে না। এরই মধ্যে অক্সিজেন, খাওয়া দাওয়া, টয়লেট, সব কিছুর সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। আর বর্তমানে এর মূল্য ১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫৭ কোটি টাকা)। চাঁদে বসে এই পোশাক পরিবর্তন ও করতে পারবে না। পরিবর্তন করতে গেলেই সে মারা যাবে।

আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ। এই গ্রহের মত অরেক গ্রহ আছে যেখানে কোন রাত্রি নেই। এমনি একটি উদাহরণ হলো যার দুটি সূর্য এবং অষঢ়যধ মবহরঃরপ যার সূর্যের সংখ্যা ৩টি। অতএব পৃথিবী যদি উপরোক্ত অবস্থায় পতিত হতো তাহলে আমাদের অবস্থা কি হতো, একটু ভেবে দেখবেন কি?

 

এই আলোচ্য বইটিতে বিভিন্ন অধ্যায় এ সৃষ্টির বিভিন্ন দিক ও তার মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদের উদাহরনগুলো সুন্দর ভাবে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়কে নিচে LINK করে দেয়া হলঃ

  • আল্লাহর সাথে শরীক করা,
  • মানুষ সৃষ্টির কারণ এবং
  • ইবাদাতের অর্থ কি?

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর

মহান শিল্পীর সৃষ্টি কত সুন্দর! কোথাও কোনো খুঁত নেই। তার চেয়েও সুন্দর মহান স্রষ্টা যা চোখের দৃষ্টি ও মনের দৃষ্টি উভয় দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে।

এরশাদ হচ্ছে :

الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴿3﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ ﴿4﴾ )سورة الملك : 3-4)

দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না, তোমার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখ কি? আবার দেখ, আবারো। তোমার দৃষ্টি তোমারই দিকে ফিরে আসবে ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে। (সূরা মুলক : ৩,৪)

স্রষ্টার এত সুন্দর নিখুঁত সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। তাই পৃথিবীর সব কিছুর ওপর মানুষকেই কর্তৃত্ব করতে দিয়েছেন তিনি। কত সৌভাগ্য মানুষের । মানুষ এ সত্যকে আনন্দ ও ভোগের মোহে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে না।

মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে চোখ অন্যতম। অন্তঃকরণকে ভেতরে ও বাইরে সঠিক পথ দেখায় চোখের দৃষ্টি। চোখের দৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব যা-ই থাক না কেন এর আধ্যাতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

সাদা-কালো টিভির পর্দায় সব কিছু সাদা-কালো দেখায়। রঙিন টিভির পর্দায় সাদাকে সাদা, কালোকে কালো, লালকে লাল, সবুজকে সবুজই দেখায়। তার চেয়েও মূল্যবান সম্পদ মানুষের দু’টি রঙিন চোখের দৃষ্টি। চোখের রঙিন দৃষ্টিতে দুনিয়ার সব কিছুর প্রকৃত রূপ-রঙ ধরা পড়ে।

এমন মূল্যবান চোখ রাব্বুল আলামীনের শ্রেষ্ঠ উপহার। এ চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমরা কত কী দেখি। সুন্দর-কুৎসিত, ভালো-মন্দ, উত্থান-পতন, নগ্নতা-বর্বরতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নয়ন জুড়ানো দৃশ্যাবলি। আবার এ চোখের দৃষ্টি দিয়েই কুরআন ও কিতাব পড়ি। এ চোখের দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে রাজা-প্রজা এক কাতারে দাঁড়িয়ে স্রষ্টাকে সেজদা করছে, একসাথে কাবা তাওয়াফ করছে, এক সাথে ধর্ম-কর্ম পালন করছে। এ চোখের দৃষ্টিই প্রমাণ করছে শিশুকালে ও বাধ্যক্যে মানুষ কত অসহায়, আবার যৌবনে কত শক্তিমান ও আমিত্বের অহঙ্কারে বেপরোয়া।

মানব সৃষ্টির রহস্যই মানুষকে অবাক করে দেয়। কোটি কোটি মানুষ, অথচ ভিন্ন ভিন্ন দেহের গঠন, কন্ঠস্বর, চেহারা, অন্তঃকরণ, মানুষের চোখ, জিহ্বা, নাক, কান, ত্বক, লিভার, কিডনি, সর্বোপরি মস্তিস্ক ও হার্টের নৈপুণ্য ও কার্যকারিতা সত্যিই কি চিন্তার বিষয় নয় ? আল্লাহ তাআলা বলছেন :

‍إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا ﴿2﴾ (سورة الدهر : 2)

আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্র-বিন্দু হতে তাকে পরীক্ষা করার জন্য। এ জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। (সূরা দাহর : ২)

যখন দেখি সব কিছু বেষ্টন করেও সূর্য ও রশ্মি ভিন্ন, আলাদা সূর্যের অস্তিত্ব। তখন কি চিন্তা না করে পারা যায় আল্লাহর কুরসী সবকিছু বেষ্টন করেও আলাদা রয়েছে তাঁর অস্তিত্ব। একটি ফুলের বাইরের সৌন্দর্য চোখ জুড়ায় বটে, কিন্তু ভিতরের কারুকার্য অবশ্যই জ্ঞানীদের চিন্তাকে অস্থির করে তোলে, মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চোখের দৃষ্টি বিবেক বোধকে নাড়া দেয় যখন দেখি পানি বাস্প হয়ে মেঘে পরিণত হয়, মেঘ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ধরায় নামে এবং নদী হয়ে সাগরে মিলায়। মাটি কত চমৎকারভাবে স্তরে স্তরে পানি ধরে রাখছে। দুর্বা ও গাছপালা গজাচ্ছে। মাটির আঁধারে শস্য কণা অঙ্কুরিত হচ্ছে। বাতাস অক্সিজেন -সমৃদ্ধ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আকাশে সুশোভিত গ্রহ-নক্ষত্র বিরাজ করছে, সূর্য ও চন্দ্র কত সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালন করছে, পৃথিবী নামক দোলনায় পাহাড় ও পর্বতগুলো পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করছে। খুটিঁ ছাড়াই গ্রহ-নক্ষত্র ঝুলছে। ফ্রান্সিস বেকন যথার্থই বলেছেন, যারা মাটি থেকে দুর্বা গজানো কিংবা আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরার মতো স্রষ্টার অলৌকিকত্ব অনুধাবন করতে পারেনা, স্রষ্টা তাদের সৎপথে আনার জন্য অন্য কোনো অলৌকিকত্ব প্রদর্শন করেননা।

মানুষের প্রাণের কি কোনো রূপ আছে? বাতাসের কি কোনো নির্দিষ্ট আকার আছে? মানুষের এত সুন্দর দেহশিল্পে মরণ হানা দেয় কেন? আগুন নিভে কোথায় যায়? পাখিরা বহুদূর পথ অতিক্রম করেও আবার আবাসস্থলে ফিরে আসে কার দিক-নির্দেশনায়? দিবস মিলাচ্ছে রাতে, রাত্রি মিলাচ্ছে দিবসের মধ্যে কার ইঙ্গিতে? এসব বিষয় অবশই চিন্তাশীলদের ভাবিয়ে তোলে। কুরআনে কারীমে আছে :

وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ﴿12﴾ ) سورة النحل :12)

তোমাদের জন্য আল্লাহ অধীনস্থ করেছেন রাত্রি ও দিবসকে, সূর্য ও চন্দ্রকে। নক্ষত্ররাজি তাঁর হুকুমের অধীন, নিশ্চয়ই এতে বহু নিদর্শন রয়েছে যারা জ্ঞানী তাদের জন্য। (সূরা নহল : ১২)

এই পৃথিবীর গাছপালা, জীবজন্তু, পাহাড়-পর্বত সব কিছু স্রষ্টাকে সেজদা করছে। মহান রাহমানুর রাহীমরে তসবি পড়ছে। কোকিল মধুর স্বরে ‍‍‌‌‌আল্লাহু” আল্লাহু” বলে ডাকছে, মৌমাছি গুনগুন করে আল্লাহ পাকের তসবি পড়ছে। কেউ বসে নেই, সবাই ইবাদতে মশগুল, আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত। শুধু আমরা মানুষ অযথা সময় নষ্ট করছি। আল্লাহকে চিনতে ভুল করছি। এরশাদ হচ্ছে :

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ۩﴿18﴾

তুমি কি দেখনা আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা হজ : ১৮)

আসমান ও জমিনের এতসব সৌন্দর্য, অলৌকিকত্ব, মানুষের অন্তঃকরণের রঙিন চোখের পর্দায় অবশ্যই ধরা পড়ার কথা। যদি সে অন্ধ না হয়। মানুষ তার বোধশক্তি, মেধাকে কাজে না লাগালে, এ নিয়ে চিন্তা বা গবেষণা না করলে, মহান শিল্পীর সৃষ্টিকে বাইরের চোখ ও মনের চোখ কোনো চোখেই বড় করে দেখবে না। স্রষ্টার অস্তিত্বের কোটি কোটি প্রমাণ তার কাছে শূন্য বলে বিবেচিত হবে।

চোখের দৃষ্টিকে সঠিকভাবে পরিচালিত না করলে মানুষের কলব ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষ পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে পৌঁছে যায়। অসভ্য, বর্বর, নীতিহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থপর ও বিবেকহীন হয়। বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মানসিক অশান্তিতে ভোগে। বিপদে আপদে পতিত হয়।

মূলতঃ দ্বীন-দুনিয়ার সব কাজের উৎস হলো অন্তঃকরণ। আর চোখের দৃষ্টি হলো অন্তঃকরণের মুখ্য সৈনিক। এ বিষয়ে হজরত আলী রা. বলেছেন : যে ব্যক্তি তার চোখের ওপর জয়ী হতে পারে না তার অন্তঃকরণের কোনো মূল্য নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴿19﴾ (سورة المؤمن : 19)

চোখের অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। (সূরা মুমিন : ১৯)

মানুষের দুনিয়াবি জিন্দেগি স্বপ্নের মত ফুরিয়ে যাবে। তাই দুনিয়ায় থেকেই পরকালের প্রকৃত জীবনের ভাবনা করতে হবে। এরশাদ হচ্ছে :

وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآَخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴿64﴾ (سورة العنكبوت : 64)

এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়, পারলৌকিক জীবন তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। (সূরা আনকাবুত : ৬৪)

যে দয়াময় আলো, বাতাস, আগুন, পানি ও হরেক রকম খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তার সাথে নিমকহারামি না করি। চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখি, মনের দৃষ্টি দিয়ে স্রষ্টাক দেখি। প্রাণ ভরে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আল্লাহ বলেন :

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴿78﴾

আর আল্লাহ তোমাদের বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদিগকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তঃকরণ, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (সূরা নহল : ৭৮)।

দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর পরম নিয়ামত। আসুন দৃষ্টিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্রষ্টার অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্যে প্রবেশ করে স্রষ্টার সৃষ্টিকে মর্মে মর্মে অনুধাবন করি। বাইরের চোখের দৃষ্টিতে আর মনের চোখের দৃষ্টিতে একাকার হয়ে ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি করি এবং আমলে সালেহের হাত প্রসারিত করি। তবেই আল্লাহর খাটিঁ প্রেমিকের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সৎ কাজ হবে ইবাদত।