Tag Archives: দারস

মুসলিমের পাথেয়ঃ রমাদানের আলোচনা

মুসলিমের পাথেয়

আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

 

সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের রবের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মাদ(সাঃ) এবং তার পরিবার ও সমস্থ সাহাবা কেরামের প্রতি। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা আবশ্যক। কিন্তু আল্লাহর বান্দা হিসেবে (মুসলিম)

মুসলিম সকলের জন্য গুরুত্বপুর্ন দ্বীনি শিক্ষা পর্বঃ ২

মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্‌স-সমূহ

আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

চতুর্থ দর্‌স

ইহসানের মূল ভিত্তি, আর তাহলো: তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি আল্লাহপাককে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তাহলে তোমার এ বিশ্বাস নিয়ে ইবাদত করা যে তিনি তোমাকে দেখছেন।

পঞ্চম দরস

সূরা ফাতেহা এবং সূরা যাল্‌যালাহ থেকে সূরা ‘নাস’ পর্যন্ত ছোট ছোট সূরাসমূহের যতটা সম্ভব অধ্যয়ন, বিশুদ্ধ পঠন ও মুখস্থকরণ এবং এর মধ্যে যেসব বিষয়ের অনুধাবন অপরিহার্য সেগুলোর ব্যাখ্যা জানা।

ষষ্ঠ দরস

নামাজের শর্তাবলী, আর সেগুলো হলো নয়টি। যথা:

(১) ইসলাম (২) বুদ্ধিমত্তা (৩) ভাল-মন্দ পার্থক্যের জ্ঞান (৪) নাপাকি দুর করা (৫) অজু করা। (৬) সতরে আওরাত অর্থাৎ লজ্জাস্থানসহ শরীরের নির্ধারিত অংশ আবৃত রাখা (৭) নামাজের সময় উপস্থিত হওয়া (৮) কেবলামুখী হওয়া এবং (৯) নিয়ত করা।

সপ্তম দরস

 নামাজের রুকুন চৌদ্দটি; যথা:

(১) সমর্থ হলে দণ্ডায়মান হওয়া, (২) ইহরামের তাকবীর, (৩) সূরা ফাতেহা পড়া, (৪) রুকুতে যাওয়া, (৫) রুকু হতে উঠে সোজা দণ্ডায়মান হওয়া, (৬) সপ্তাঙ্গের উপর ভর করে সিজদা করা, (৭) সিজদা থেকে উঠা, (৮) উভয় সিজদার মধ্যে বসা, (৯) নামাজের সকল কর্ম সম্পাদনে স্হিরতা অবলম্বন করা, (১০) সকল রুকুন ধারাবাহিকভাবে তরতীবের সাথে সম্পাদন করা, (১১) শেষ বৈঠকে তাশাহুদ পড়া, (১২) তাশাহ্‌হুদ পড়া কালে বসা, (১৩) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরুদ পড়া (১৪) ডানে ওবামে দুই সালাম প্রদান।

অষ্টম দর্‌স

নামাজের ওয়াজিবসমূহ; এগুলোর সংখ্যা আট। যথা:

(১) ইহ্‌রামের তাকবীর ব্যতীত অন্যান্য তাকবীরগুলো

(২) ইমাম এবং একা নামাজীর পক্ষে سَمِعَ للهُ لِمَنْ حَمِدَه বলা।

(৩) সকলের পক্ষে رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْد বলা

(৪) রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمِ বলা

(৫) সিজদায় سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأعْلى বলা।

(৬) উভয় সিজদার মধ্যে رَبِّ اغْفِرْ لِيْ বলা

(৭) প্রথম তাশাহ্‌হুদ পড়া

(৮) প্রথম তাশাহ্‌হুদ পড়ার জন্য বসা।

নবম দর্‌স

তাশাহ্‌হুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু এর বর্ণনা নামাজি নিম্নরূপ বলবে,

«اَلتَّحِيَّاتُ للهِ وَالصّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، اَلسّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ، اَلسّلاَمُ عَلَيْنَا وعَلَى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِيْنَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ»

উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়্যিবাতু, আস্‌সালামু আলাইকা আইয়্যূহান্নবিইয়ূ ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আস্‌সালামু আলাইনা ওয়া আলা-ইবা-দিল্লাহিস সালেহীন। আশ্‌হাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশ্‌হাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।

অর্থ: “যাবতীয় ইবাদত ও অর্চনা মৌখিক, শারীরিক ও আর্থিক সমস্তই আল্লাহর জন্য, হে নবী আপনার উপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক। আমাদের উপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাগনের উপরও শান্তি অবতীর্ণ হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন মা‘বুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

অত:পর নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরুদ ও বরকতের দু‘আ পড়তে গিয়ে বলবে:

«اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْراهِيْمَ وَ عَلَى آلِِ إبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيدُ مَّجِيْدً. اللهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إبْرَاهِيْمَ وَ عَلَى آلِ إبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدُ مَّجِيْد».

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আ-লী মুহাম্মদিন কামা ছাল্লাইকা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা-আ-লী ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিইয়ূ ওয়া আলা আলী মুহাম্মদিন কামা বা-রাকতাআলা ইবরাহীমা ওয়া আলা-আ-লী ইবরাহীম ইন্নাকা হামীদুম্‌ মাজীদ।

অর্থ: “হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর বংশধরগণের উপর রহমত নাযিল করো, যেমনটি করেছিলে ইব্‌রাহীম (আ) ও তাঁর রংশধরগণের উপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয় এবং বরকত নাযিল কর মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর তাঁর বংশধরগণের উপর, যেমনটি নাজিল করেছিলে ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর বংশধরগণের উপর, নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানিত।”

অত:পর নামাজি শেষ তাশাহ্‌হুদের পর আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে জাহান্নামের আজাব ও কবরের আজাব থেকে, জীবন-মৃত্যূর ফেতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে। তারপর আপন পছন্দমত আল্লাহর কাছে দু’আ করবে, বিশেষ করে নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত দু‘আ গুলো ব্যবহার করা সবোর্রত্তম। তন্মধ্যে একটি হল নিম্নরূপ:

«اَللهُمَّ أعِنِيْ عَلَى ذِكْركَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِِ عِبَادَتِكَ»

«اللهُمَّ إِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمًا كَثِيْرًا وَّلا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلا أنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِيْ إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ»

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা আ-ইনী আলা-জিক্‌রিকা ওয়া শুক্‌রিকা ওয়া হুস্‌নি ইবাদাতিক। আল্লাহুম্মা ইন্নী জালাম্‌তু নাফসী জুলমান কাসীরাউ” ওয়ালা ইয়াগফিরুজ্‌জুনু-বা ইল্লা আন্‌তা ফাগফিরলী মাগফিরাতাম্‌ মিন ইন্‌দিকা ওয়ার হামনী ইন্নাকা আন্‌তাল গাফুরুর রাহীম।

অর্থ: হে আল্লাহ ! আমাকে তোমার জিকির, শুকরিয়া আদায় ও ভালভাবে তোমারই ইবাদত করার তাওফীক দাও। আর, হে আল্লাহ ! আমি আমার নিজের উপর অনেক বেশী যুলুম করেছি, আর তুমি ছাড়া গুনাহসমূহ মাফ করতে পারেনা, সুতরাং তুমি তোমার নিজ গুনে আমাকে মার্জনা করে দাও এবং আমার প্রতি রহম করো, তুমিতো মার্জনাকারী অতি দয়ালু”।

 

 

<পুর্ববর্তী দারসঃ ১               পরবর্তী দারসঃ ৩>

মুসলিম সকলের জন্য গুরুত্বপুর্ন দ্বীনি শিক্ষা পর্বঃ ১

মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্‌স-সমূহ

আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

بسم الله الرحمن الرحيم

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

এ লিখায় ইসলাম সম্পর্কে সর্বসাধারণের পক্ষে যে সব বিষয় অবগত হওয়া একান্ত অপরিহার্য ফরজ সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো। পুস্তিকাটি “মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দারসসমূহ” শিরোনামে অভিহিত করে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা জানাই তিনি যেন এর দ্বারা মুসলিম ভাইদের উপকৃত করেন এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করে নেন। নিশ্চয় তিনি মহান দাতা অতি মেহেরবান।

প্রথম দরস

ইসলামের পাঁচ ভিত্তির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। তম্মধ্যে প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো:

شهادة أن لا إ له إلا الله وأنّ محمد رسول الله

একথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।”

لا اله إلا الله এর শর্তাবলীর বর্ণনাসহ শাহাদাত বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করা। ‘লা-ইলাহা’ দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয়, তাদের সবাইকে অস্বীকার করা এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ দ্বারা যাবতীয় এবাদত একমাত্র আল্লাহুর জন্য প্রতিষ্ঠিত করা, এতে তাঁর কোন শরীক নেই।

“লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ” এর শর্তাবলী হলো:

১. ইলম (জ্ঞান) : যা অজ্ঞতার পরিপন্থী,

২.ইয়াক্বীন (স্থির বিশ্বাস) যা সন্দেহের পরিপন্থী,

৩. ইখলাছ (নিষ্ঠা) যা শিরকের পরিপন্থী,

৪. সততা যা মিথ্যার পরিপন্থী,

৫. মাহাব্বাত (ভালবাসা) যা বিদ্বেষের পরিপন্থী,

৬. আনুগত্য যা অবাধ্যতা বা বর্জনের পরিপন্থী,

৭. কবুল (গ্রহণ) যা প্রত্যাখ্যানের পরিপন্থী এবং

৮. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় তার প্রতি কুফরী বা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা।

এই শর্তগুলো নিম্নোক্ত আরবী কবিতার দুটি পংক্তির মধ্যে একত্রে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে:

علم يقين وإخلاص وصدقك مع محبـة وانقيـاد والقبـول لها

وزيد ثامنها الكفران منك بما سوى الإله من الأشياء قد أُلها

[অর্থ: এই কালেমা সম্পর্কে জ্ঞান, এর প্রতি স্থির বিশ্বাস, নিষ্ঠা, সততা, ভালবাসা, আনুগত্য ও এর মর্মার্থ গ্রহণ করা:এই সাথে আট নম্বরে যা যোগ করা হয়, তাহলো: আল্লাহ ব্যতীত যারা অনেক মানুষের কাছে উপাস্য হয়ে আছে তাদের প্রতি তোমার কুফরী অর্থাৎ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা।]

এই সাথে محمد رسول الله (“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল”) এই শাহাদাত বাক্যের অর্থ বিশ্লেষণ করা এই বাক্যের দাবি হলো: রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সব বার্তা বাহন করে নিয়ে এসেছেন সে বিষয়ে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, তিনি যেসব কাজের নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন বা যা থেকে বারণ করেছেন তা পরিহার করে চলা। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সব বিষয় প্রবর্তন করেছেন কেবল সেগুলোর মাধ্যমেই যাবতীয় ইবাদত সম্পাদন করা।

এরপর শিক্ষার্থর সম্মুখে ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অপর বিষয়গুলোর বিশদ বিবরণ তোলে ধরা: সেগুলো হলো: ২.নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, ৩. যাকাত প্রদান, ৪. রমজানের রোজা পালন, এবং ৫. সামর্থবান লোকের পক্ষে বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জব্রত পালন করা।

দ্বিতীয় দর্‌স

আরকানে ঈমান অর্থাৎ ঈমানের মৌলিক ছয়টি বিষয়।

সেগুলো হলো:

  • ১- বিশ্বাস স্থাপন করা আল্লাহর তা‘আলার উপর,
  • ২- তাঁর ফেরেশতাগণ,
  • ৩- তাঁর অবতীর্ণ কিতাবসমূহ,
  • ৪- তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ ও
  • ৫- আখেরাতের দিনের উপর এবং
  • ৬- বিশ্বাস স্থাপন করা ভাগ্যের উপর, যার ভালমন্দ সবকিছু আল্লাহ পাক হতেই নির্ধারিত হয়ে আছে।

তৃতীয় দর্‌স

তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদ) তিন প্রকার । যথা:

  • (১) তাওহীদের রবুবিয়্যাহ (আল্লাহর প্রভূত্বে তাওহীদ)
  • (২)তাওহীদে উলুহীয়্যাহ (আল্লাহর ইবাদতে তাওহীদ)
  • (৩) তাওহীদে আসমা ও ছিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে তাওহীদ)

১- প্রভূত্বে তাওহীদ : এর অর্থ এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ পাকই সবকিছুর স্রষ্টা এবং সবকিছুর নিয়ন্ত্রনকারী তিনি, এতে তাঁর কোন শরীক নেই।

২- ইবাদতে তাওহীদ : এর অর্থ এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে আল্লাহ পাকই সত্যিকার মা‘বুদ, এতে তাঁর কোন শরীক নেই। এটাই কালেমা ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহর মর্মার্থ। কেননা, এর প্রকৃত অর্থ হলো: আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার আর কোন মা‘বুদ নেই। সবপ্রকার ইবাদত যেমন, নামায, রোজা ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে নিবেদিত করা অপরিহার্য। কোন প্রকার ইবাদত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদিত করা বৈধ নয়।

৩- নাম ও গুণাবলীতে তাওহীদ : এর অর্থ এই যে, কুরআন করীমে এবং বিশুদ্ধ হাদীসে আল্লাহ পাকের যেসব নাম ও গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। এগুলোকে আল্লাহ পাকের শানের উপযোগী পর্যায়ে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাতে কোন অপব্যখ্যা, নিষ্ক্রিয়তা, উপমা অথবা বিশেষ কোন ধরণ বা সাদৃশ্যপনার লেশ না থাকে। যেমন, আল্লাহ পাক বলেন:

﴿ قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١ ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ٢ لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ٣ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤ ﴾ [الإخلاص:1-4]

অর্থ : (হে রাসূল) “ বল তিনিই আল্লাহ এক, আল্লাহ অমু-খাপেক্ষী, তিনি কারো জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি, আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাছ)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿ لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى:11]

অর্থ: “তার মত কেউ নেই, তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা শূরা:11)

কোন কোন আলেম তাওহীদকে দুই প্রকারে বিভক্ত করেছেন এবং নাম ও গুণাবলীর তাওহীদকে প্রভূত্বে তাওহীদের অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেন। এতে কোন বাঁধা নেই, কেননা, উভয় ধরনের প্রকার বিন্যাশের উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট।

আর শিরক হলো তিন প্রকার যথা : (১) বড় শির্‌ক (২) ছোট শির্‌ক এবং (৩) সুক্ষ্ন বা গুপ্ত শির্‌ক।

  • বড় শির্‌ক:

বড় শিরকের ফলে মানুষের আমল নষ্ট হয়ে যায় এবং তাকে জাহান্নামে চিরকাল থাকতে হয়। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿ وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٨٨﴾ [الأنعام:88]

অর্থ: “এবং তারা যদি আল্লাহর সাথে শিরক করে তাহলে তাদের সব কার্যক্রম নিষ্ফল হয়ে যায়।” (সুরা আল-আন‘আম:৮৮)

আল্লাহ পাক আরো বলেন:

﴿مَا كَانَ لِلۡمُشۡرِكِينَ أَن يَعۡمُرُواْ مَسَٰجِدَ ٱللَّهِ شَٰهِدِينَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِم بِٱلۡكُفۡرِۚ أُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ وَفِي ٱلنَّارِ هُمۡ خَٰلِدُونَ ١٧ ﴾ [التوبة:17]

(১) অর্থ: “মুশরিকদের জন্য আল্লাহর ঘর মসজিদ সংস্থানের কোনই প্রয়োজন নেই। অথচ নিজেরা কুফুরীর সাক্ষ্য দিচ্ছে। ঐ সমস্ত লোকদের কৃতকর্ম সমূহ ধ্বংস করে দেয়া হবে এবং তারা চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। (সূরা আত-তাওবাহ: ১৭)

এই প্রকার শিরকের উপর কারো মৃত্যূ হলে তাকে কখনও ক্ষমা করা হবেনা এবং জান্নাত তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। আল্লাহ পাক বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ﴾ [النساء:48]

(২) অর্থ : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা‘আলা শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না। ইহা ছাড়া যা ইচ্ছা ক্ষমা দিতে পারেন। (সূরা আন-নিসা: ৪৮)

আল্লাহ পাক আরও বলেন:

﴿ إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢ ﴾ [المائدة:72]

 

(৩) অর্থ: নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, তার জন্য বেহেশত হারাম হয়ে যায় এবং তার অবস্থান হয় জাহান্নামে। অবশ্যই অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা আল-মায়িদাহ: ৭২)

এই প্রকার শিরকের আওতায় পড়ে মৃত লোক ও প্রতিমাসে ডেকে দু‘আ করা তাদের আশ্রয় প্রার্থনা করা, তাদের উদ্দেশ্যে মান্নত ও জবাই করা ইত্যাদি।

  • ছোট শিরক:

ছোট শিরক বলতে, এমন কর্ম বুঝায় যাকে কুরআন বা হাদীসে শিরক বলে নামকরণ হয়েছে, তবে তা বড় শিরকের আওতায় পড়ে না। যেমন কোন কোন কাজে রিয়া বা কপঠতার আশ্র্রয় গ্রহণ, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করা, আল্লাহ এবং অমুক যা চাইছেন তা হয়েছে” বলা ইত্যাদি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

« أخوف ما أخاف عليكم الشرك الأصغر »

“তোমাদের উপর যে বিষয়টির সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হলো ছোট শিরক” এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সেটা হলো রিয়া অর্থাৎ কপঠতা। এই হাদীস ইমাম আহমদ, তাবারানী ও বায়হাকী মাহমূদ বিন লবীদ আনছারী (রা) থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন। আর তাবারানী কতিপয় বিশুদ্ধ সনদে মাহমুদ বিন লবীদ থেকে, তিনি রাফে‘ বিন খুদাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন। অপর এক হাদীসে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

« من حلف بشيء دون الله فقد أشرك »

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করবে তার এই কাজ শিরক বলে গণ্য হবে।” ইমাম আহমদ বিশুদ্ধ সনদে উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন আবূ দাউদ ও তিরমিজী আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত এক হাদীসে আছে যে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

 

« من حلف بغير الله فقد كفر أو أشرك »

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করলো সে আল্লাহর সাথে কুফুরী বা শিরক করলো”। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন:

«لا تقولوا ما شاء الله وشاء فلان ولكن قولوا ما شاء الله ثم شاء فلان»

“তোমরা এ কথা বল না যে আল্লাহ এবং অমুক যা চাইছেন তা-ই হয়েছে, বরং এভাবে বল ‘আল্লাহ যা চাইছেন এবং পরে অমুক যা চাইছেন তা-ই হয়েছে।”

এই হাদীস আবূ দাউদ বিশুদ্ধ সনদে হুজায়ফা বিন ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

এই প্রকার শিরক অর্থাৎ ছোট শিরকের কারনে বান্দাহ ধর্মত্যাগী হয়না বা ইসলাম থেকে সে বের হয়ে যায় না এবং জাহান্নামে সে চিরস্থায়ীও থাকবে না, বরং ইহা অপরিহার্য্য পূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী এক পাপ বিশেষ।

  • তৃতীয় প্রকার শিরক অর্থাৎ সুক্ষ্ন শিরক : এর প্রমাণ নবী করিম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিম্নোক্ত হাদীস। তিনি বলেন:

«ألا أخبركم بما هو أخوف عليكم عندي من المسيح الدجّال؟» قالوا : بلى يا رسول الله، قال: «الشرك الخفي، يقوم الرجل فيصلي فيزين صلاته لما يرى من نظر الرجل إليه»

হে সাহাবীগণ, আমি কি তোমাদের সেই বিষয়ের খবর দিব না যা আমার দৃষ্টিতে তোমাদের পক্ষে মসীহ দাজ্জাল থেকেও ভয়ঙ্কর? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, বলুন হে আল্লাহর রাসূল, তখন তিনি বললেন, সেটা হলো সুক্ষ্ন (গুপ্ত) শিরক, কোন কোন ব্যক্তি নামাজে দাড়িয়ে নিজের নামাজ সুন্দর করার চেষ্টা করে এই ভেবে যে অপর লোক তারঁ প্রতি তাকাচ্ছে।” ইমাম আহমদ তাঁর মাসনদে এই হাদীস আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

যাবতীয় শিরক মাত্র দুই প্রকারেও বিভক্ত করা যেতে পারে: ছোট শিরক এবং বড় শিরক।

সুক্ষ্ন বা গুপ্ত শিরক ছোট এবং বড় উভয় প্রকার হতে পারে।

কখনও ইহা বড় শিরকের পর্যায়ে পড়ে: যেমন মুনাফিকদের শিরক যা বড় শিরক হিসেবে পরিগণিত। তারা নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাস গোপন রেখে প্রাণের ভয়ে কপঠতা বা রিয়ার প্রশ্রয়ে ইসলামের ভান করে চলে।

এই ভাবে সুক্ষ্ন শিরক ছোট শিরকের পর্যায়েও পড়তে পারে: যেমন, ‘রিয়া’ বা ‘কপঠতা’ যার উল্লেখ মাহমুদ বিন লবীদ আনছারী ও আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ে রয়েছে। আল্লাহই আমাদের তাওফীক দানকারী।

পরবর্তী পর্বঃ ২ –>

কিতাব আত তাওহীদের দারস – পর্বঃ ১

কিতাব আত-তাওহীদ

 

ডাউনলোড করুন অধ্যায়-১ [তাওহীদ সমস্ত ইবাদাতের মূল] এর উপর বিস্তারিত আলোচনা- আবূ সুমাইয়া মতিউর রহমান

কিতাব আত-তাওহীদ দারস- [১]-[তাওহীদ সমস্ত ইবাদাতের মূল]

আলহামদুলিল্লাহির রব্বিল আ’আলামীন ওয়াস সলাতু ওয়াস্ব সলামু আ’লা রসুলিহীল আমীন। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’আলার জন্য আর সলাত ও সালাম বর্ষিত্ হোক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর। তাওহীদ মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বিষয়। পৃথীবির সকল নাবী-রসূল এই তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। আর তার ধারাবাহিকতায় সাহাবারা, তাবেয়ী ও ইমামগন তাদের সাধ্যমত তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী হয়েছেন। মানুষের মাঝে তাওহীদ এর বিষয়টা ভালোভাবে প্রবেশ করানোর জন্য নানা কিতাব লিখা হয়েছে। তাওহীদপন্থী আলেম উলামাগন- ইসলামে এই কিতাবুত তাওহীদ এর মত আর কোন গ্রন্থ রচিত হয় নি। এটি একটি সহজ ভাষায় দাওয়াতী প্রচারের বই। কারন শায়খ মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আত-তামীমি (রহঃ) তার রচিত এই কিতাবে তাওহীদের মূল প্রমান, অর্থ ও ফযিলাত বর্ননা করেছেন। তাওহীদের বিপরীতে শিরকের ও আলোচনা করে তার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। তাই আপনি যেখানেই থাকুন না কেন এই কিতাবটি পড়া, মুখস্ত করা ও অনুধাবন করা অতন্ত্য জরুরী।

এ কিতাবের দারস এর মূল উদ্দেশ্য হলঃ

  • ১. মহান আল্লাহকে জানা
  • ২. তার সাথে শিরক না করা
  • ৩. তাওহীদের মুলনীতি গুলো অনুধাবন করা
  • ৪. শিরকের ছিদ্রপথ গুলো বন্ধ করা
  • ৫. মুশ্রিকদের সাথে আচরন ও তাদের প্রতি দাওয়াতের মুলনীতি জানা
  • ৬. জাহেল সমাজে তাওহীদের গুরুত্ব ও এর আসল রুপরেখা তুলে ধরা
  • ৭. শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জানা ও মানা।

মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

শুধুমাত্র আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। [সুরা যারিয়াতঃ ৫৬]

আল্লাহর এ বানীর মর্ম হলঃ আমি জীন ও মানুষকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি শুধুমাত্র একটি কারনে কএরছি আর তা হল- আমার ইবাদাত করার জন্য। ইবাদাত হল সেই জিনিষ যা আদেশ তা পালন করলে আল্লাহ খুশি হন আর যা নিষেধ তা না পালন করলে আল্লাহ খুশি হন। জীবনের প্রত্যেকটি হালাল কাজ আল্লাহর জন্য করাই ইবাদাত। এ আয়াতে তাওহীদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা আছে { إِلَّا لِيَعْبُدُونِ } এর মাঝে। এর অর্থে বলা হচ্ছেঃ আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করব আর তাঁর ইবাদাতে কাউকে শরীক করব না। কেননা আমাদের প্রত্যেক নাবী ও রসূলগন তাওহীদের উদেশ্যেই এই দুনিয়াতে এসেছেন। “ইবাদাত” এর শাব্দিক অর্থ হল: বিনয়-নম্রতা ” কিন্তু এর সাথে যদি ভালোবাসা ও ভয়ের সাথে আনুগত্য যুক্ত হয় তাহলে সেটা হল শারীয় ইবাদাত’। অর্থাৎ আমাদের ইবাদাত আল্লাহর জন্য আর ইবাদাত হলঃ

ভালোবাসা, আশা ও ভয়ভীতির সাথে যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ মেনে চলাই ইবাদাত

মহান আল্লাহ আবার বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। [সুরা নাহলঃ ৩৬]

এ আয়াতে ইবাদাত ও তাওহীদের ব্যাখ্যা আছে। আর এখানে বলা হচ্ছে প্রত্যেক রসুল দুটি বানী নিয়ে দুনিয়াতে এসেছেনঃ

  • ১. তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর।
  • ২. তাগুত থেকে দূরে থাকো।

[اعْبُدُوا اللَّهَ] অংশে রয়েছে তাওহীদের কথা আর [وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ] – অংশে রয়েছে শিরকের সাথে অস্বীকার করার কথা। বান্দা তার ইবাদাত ও আনুগত্য এর সীমা অতিক্রম করে যার নিকট নিজেকে সপে দেয় তাকেই তাগুন বলে।

অন্য জাগায় আল্লাহ বলেনঃ

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। [সুরা ইসরাঃ ২৩]

এখানে [وَقَضَىٰ رَبُّكَ] এর অর্থ হল আদেশ করা বা উপদেশ দেয়া। আর [أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ]—এর অর্থ হলঃ “ইবাদাতকে শুধুমাত্র আল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর কারো মধ্যে নয়।” অর্থাৎ যদি সিজদাহ করি তাহলে একমাত্র আল্লাহর জন্য, যদি কুরবানী দেই তাও শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। অর্থাৎ জীবনের প্রত্যেক হালাল কাজে তার সন্তুষ্টি থাকতে হবে। এখানে কোন [পীর, হুজুর, কেবলা, ইমাম বা দরবেশ- কে শরীক করা যাবে না]। আর বাস্তবে এটাই হলঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর – মুল কথা।

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ ۖ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا

(হে মুহাম্মাদ!)আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পড়ে শুনাই, যেগুলো তোমাদের রব তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। আর সেটা হল, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না। [সুরা আন’আমেরঃ ১৫১]

অর্থাৎ আল্লাহ তারঁ রসুলকে দিয়ে আমাদের কে সর্বপ্রথম এই শিক্ষা দিচ্ছেন যে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপা হল “শিরক” আর তাই এথেকে আমাদের বিরত থাকতে বলেছেন।

আর এর আরো একটি আয়াতের মর্মাথ হলঃ

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا

আর ইবাদাত কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। [সুরা নিসাঃ ৩৬]

এ আয়াতে শিরকে আসগার(ছোট শিরক), শিরকে আকবার(বড় শিরক) ও শিরকে খাফী(গোপন শিরক) সব কিছু নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ঘোষনা করা হয়েছে। এছাড়াঃ “কোন মালায়িকা, নাবী রসুল, নেককার বান্দা, দুনিয়াবী বস্তু, জ্বীন এর সাথে আল্লাহর শরীক করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ

ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

“যে ব্যাক্তি মুহাম্মাদ (সঃ) এর মোহরাংকিত উপদেশ দেখতে চায় সে যেন মহান আল্লাহর এ বানী পাঠ করেঃ

‘[সুরা আন’আমের ১৫১-১৫৩ পর্যন্তঃ (হে মুহাম্মাদ!)আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পড়ে শুনাই, যেগুলো তোমাদের রব তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। আর সেটা হল, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না………………… নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না…’ ”

এ আয়াতে আল্লাহর তরফ থেকে দশটি উপদেশ আছে আর তা নিম্ন রুপঃ

  • ১. আল্লাহর সাথে শরীক না করা
  • ২. পিতা মাতার সাথে সদ্বাচারন করা
  • ৩. নিজ সন্তানকে দারিদ্রের কারনে হত্যা না করা
  • ৪. প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে নির্লজ্জতার কাছে না যাওয়া
  • ৫. যাকে হত্যা করা হারাম তাকে হত্যা না করা
  • ৬. এতীমের ধনসম্পদ মেরে না খাওয়া
  • ৭. ওজন ও মাপ সঠিক দেয়া
  • ৮. ন্যায় বিচার করা কোন পক্ষপাত্বিত্ব না করা
  • ৯. আল্লাহর তরফ থেকে উপদেশ গ্রহন করা
  • ১০. তাকওয়া অর্জন করা

আর সর্ব প্রথম যে আদেশ আছে তা হল “শিরক না করা”।

মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

“আমি গাধার পিঠে মহানবী (সঃ) এর পেছনে বসে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন- ‘হে মুয়াজ! বান্দার উপর আল্লাহর হক কি? এবং আল্লহর উপর বান্দার হাক্ব কি জানো?’ আমি বললাম- ‘আল্লাহ ও তারঁ রসূল (সঃ) ই ভালো জানেন।’ তখন মুহাম্মাদ (সঃ) বললেন- ‘বান্দার উপর আল্লাহর হক এই যে বান্দা শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করবে এবং তারঁ সাথে কাউকে শরীক করবে না।। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক্ব এই যে, যে ব্যাক্তি আল্লাহর সাথে কোন শরীক সাবস্ত্য না করে তাকে শাস্তি না দেয়া।।’ আমি বললাম- ‘হে রসুলুল্লাহ (সঃ) আমি কি মানুষকে এই সুসংবাদ দিয়ে দেব না??’ তিনি বললেন- ‘তাদের এ সুসংবাদ দিও না তাহলে তারা আমল বিমুখ হয়ে পড়বে।’” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

 

এথেকে বোঝা যায় তাওহীদ মেনে চলা আল্লাহর জন্য একটি ওয়াজিব হাক্ব। বান্ন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ওয়াজিব এটা।

আমরা এই অধ্যায় থেকে আরো কিছু জিনিষ জানতে পারি তা হ্লঃ

  • ১. জ্বীন ও মানুষ সৃষ্টির রহস্য
  • ২. ইবাদাতই হল- তাওহীদ। কারন এর মাঝে বিরোধ হয়।
  • ৩. যে ব্যাক্তি তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করল না সে কোন ইবাদাতই করল না।
  • ৪. নাবী-রসুলদের পাঠানোর রহস্য
  • ৫. প্রত্যেক আন্তির নিকট নাবী-রসুল পাঠানো হয়েছে
  • ৬. সকল নাবীর দ্বীন- এক ও জীবন ব্যাবস্থাও এক [ইসলাম]
  • ৭. তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদাত হবে না।
  • ৮. আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদাত করা হয় সেটাই তাগুত
  • ৯. সুরা আন’আমে দশটি উপদেশ
  • ১০. সুরা ইসরায় আরো আঠারোটি বিষয় আল্লাহ বলেছেন।
  • ১১. আল্লাহর ও বান্দার মাঝে হক এর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারনা রাখা
  • ১২. অধিকাংশই সাহাবীরা (রঃ) এবিষয়টি [মুয়াজ বিন জাবাল (রঃ) এর হাদিসটি] জানতেন না
  • ১৩. কল্যানের স্বার্থে এলেম গোপন রাখা
  • ১৪. মুসলমানদের আনন্দের সংবাদ দেয়া মুস্তাহাব
  • ১৫. আল্লাহর দয়ার সীমার কথা ভেবে আমল বিমুখ হওয়ার আশংকা

 

ইনশাহ আল্লাহ! আমরা আগামী দারস-এ আরো তাওহীদের বিষয়গুলো জানব। আল্লাহ আমাদের এই দারস কবুল করুন এবং এর মাধ্যমে আমাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করে তাওহীদের পথে চলার জন্য সহজ করে দিন আমীন।