তাকওয়া

তাকওয়া

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র, কেবলমাত্র, শুধুমাত্র মহান সুবাহানাহুয়াতাআলার জন্য যিনি সমগ্র বিশ্বজাহানের রব । সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসুল মুহাম্মদ (সা:) এর উপর ।

তাকওয়ার অর্থ:

তাকওয়া আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ : বিরত থাকা, আত্মরা, বেঁচে থাকা, বর্জন করা, পরিহার করা ইত্যাদি।
তাকওয়া বলতে “পরকালে তিরস্কার ও শাস্তির কারন হবে এমন সকল কর্ম থেকে নিজেকে বিরত থাকার নামই তাকওয়া। হযরত আলী (রা) বলেন, তাকওয়া হলো অল্পে তুষ্ট থাকা, কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী চলা এবং সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা।
মোট কথা তাকওয়া হচ্ছে একটি সচেতনতা যা বান্দাহকে প্রতিমুহূর্তে কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ তা স্পষ্ট করে উদ্ভাসিত করে দিবেতাকয়া শব্দের অর্থ হল আল্লাহ ভীতি বা সংযমশীলতা ।

আবদুল্লাহ্‌ বিন মাসঊদ (রা:) বলেন, তাকওয়া হচ্ছে:
আল্লাহ্‌র আনুগত্য করা- নাফরমানি না করা, তাঁকে স্মরণ করা- ভুলে না যাওয়া, তাঁর কৃতজ্ঞতা করা- কুফরী না করা।

•  সাহ্‌ল বিন আবদুল্লাহ্‌ বলেন,
বিশুদ্ধ তাকওয়া হল- ছোট-বড় সব ধরণের গুনাহের কাজ পরিত্যাগ করা।

ওমর বিন আবদুল আযীয বলেন:

দিনে ছিয়াম আদায় এবং রাতে নফল ছালাত আদায়ই আল্লাহ্‌র ভয় নয়; বরং প্রকৃত আল্লাহ্‌র ভয় হচ্ছে, আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা ফরয করেছেন তা বাস্তবায়ন করা। কেউ যদি এর অতিরিক্ত কিছু করতে পারে তবে সোনায় সোহাগা। প্রকাশ্যে পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নাম তাকওয়া নয়; বরং গোপন-প্রকাশ্য সবধরনের পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নামই আসল তাকওয়া। যেমন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“তুমি যেখানেই থাকনা কেন আল্লাহকে ভয় কর।”            [তিরমিযী]

তাকওয়ার ফলাফল:

আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন ধরনের সুসংবাদ দিয়েছেন। নির্ধারণ করেছেন তাকওয়ার জন্য সুন্দর ফলাফল এবং সম্মান জনক পরিণতি। তম্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:

১) দুনিয়া এবং আখেরাতে আনন্দের সুসংবাদ: আল্লাহ্‌ বলেন-

“যারা ঈমান এনেছে এবং তাওক্বওয়া অর্জন করেছে তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ দুনিয়া এবং আখেরাতে।”

(সূরা ইউনুস- ৬৩-৬৪)

২) সাহায্য ও সহযোগিতার সুসংবাদ: আল্লাহ্‌ বলেন,-

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তাদের সাথে থাকেন, যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে এবং যারা সৎকর্ম করে।”
(সূরা নাহাল- ১২৮)

৩) জ্ঞানার্জনের সুযোগ লাভ: আল্লাহ্‌ বলেনঃ

“এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে জ্ঞান দান করবেন।”
(সূরা বাক্বারা ২৮২)

৪) সত্যের পথ পাওয়া এবং হক্ব ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারা: আল্লাহ্‌ বলেন,

“তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করে; তবে তিনি তোমাদেরকে (হক ও বাতিলের মাঝে) পার্থক্য করার তাওফীক দিবেন।”               (সূরা আনফাল- ২৯)

৫) গুনাহ মাফ এবং বিরাট প্রতিদানের সুসংবাদ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে ভয় করে, তিনি তার পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং বিরাট প্রতিদানে ভূষিত করবেন।”
(সূরা ত্বালাক- ৫)

তিনি আরও বলেন,

“আর তোমরা যদি নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, তবে তো আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল দয়াময়।”                         (সূরা নিসা- ১২৯)

৬) প্রত্যেক বিষয়ে সহজতা লাভ: আল্লাহ্‌ এই বিষয়টিআয়াতে ব্যাখ্যা করে বলেন –

“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার প্রতিটি বিষয়কে সহজ করে দিবেন।”              (সূরা ত্বালাক -১)

৭) দুশ্চিন্তা ও বিপদ থেকে মুক্তি লাভ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবেন।”         (সূরা ত্বালাক- ২)

৮) কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়া জীবিকা লাভ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবেন। এবং এমনভাবে রিজীক দান করবেন, যা সে ভাবতেও পারে নি।”               (সূরা ত্বালাক- ২-৩)

৯) আযাব এবং শাস্তি থেকে মুক্তি: আল্লাহ্‌ বলেনঃ

“যারা তাকওয়া অর্জন করবে, তাদেরকে আমি মুক্তি দিব।”                (সূরা মারইয়াম- ৭২)

১০) সম্মানিত হওয়ার সনদ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্‌র নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে বেশী ভয় করে।”

(সূরা হুজুরাত- ১৩)

রাসূল (সঃ) কে প্রশ্ন করা হল, মানুষের মাঝে কে সবচাইতে বেশী সম্মানিত? তিনি বললেন, তাদের মাঝে আল্লাহকে যে বেশী ভয় করে…।”                           (বুখারী ও মুসলিম)
১১) ভালবাসার সুসংবাদ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পরহেযগারদের ভালবাসেন।”                 (সূরা তওবা- ৪)

১২) প্রতিদান পাওয়া এবং আমল বিনষ্ট না হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে ভয় করবে এবং ধৈর্য অবলম্বন করবে; নি:সন্দেহে আল্লাহ্‌ সৎকর্ম শীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করবেন না।”                  (সূরা ইউসুফ- ৯০)

১৩) আমল কবুল হওয়া এবং তা প্রত্যাখ্যান না হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“আল্লাহ্‌ তো তাক্বওয়াবানদের থেকেই কবুল করেন।”                (সূরা মায়েদা ২৭)

১৪) সফলকাম হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“তোমরা আল্লাহ কে ভয় কর, তবে তোমরা সফলকাম হবে।”              (সূরা বাক্বারা- ১৮৯)

১৫) জান্নাত লাভে কামিয়াবী: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা জান্নাত এবং ঝর্ণাধারার মধ্যে থাকবে।”           (সূরা যারিয়াত- ১৫)

রাসূল (সঃ) কে প্রশ্ন করা হল, সর্বাধিক কোন জিনিস মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেন, “আল্লাহ্‌ ভীতি এবং সচ্চরিত্র।”               (তিরমিযী)
১৬) নিরাপত্তা এবং সুউচ্চ মর্যাদা: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় মুত্তাক্বীগণ সুউচ্চ নিরাপদ স্থানে থাকবে।”  (সূরা দুখান- ৫১)

১৭) সৃষ্টিকুলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“এবং যারা তাকওয়া অর্জন করেছে তারা কিয়ামত দিবসে তাদের (কাফেরদের) উপরে অবস্থান করবে।”
(সূরা বাক্বারা- ২১২)

১৮) কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাত ও দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করা: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ভীরুগণ জান্নাত এবং নহরের মধ্যে থাকবে। সত্য ও সন্তোষটির আবাস স্থলে পরাক্রমশালী বাদশাহ‌র দরবারে।”                 (সূরা ক্বামার ৫৪/৫৫)

১৯) অন্তর বিশুদ্ধ হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“সেদিন (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ্‌ ভীরুগণ ব্যতীত (দুনিয়ার) বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে।”
(সূরা যুখরুফ- ৬৭)

২০) দ্রুত সতর্ক হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় যারা তাকওয়া অর্জন করেছে- যখন তাদের উপর শয়তানের আগমন ঘটে ততক্ষণাৎ তারা (সতর্ক হয়ে আল্লাহ্‌কে) স্মরণ করে, তারপর তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়।”           (সূরা আ’রাফ- ২০১)

২১) সুমহান প্রতিদান: আল্লাহ্‌ বলেন,

“তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে এবং তাকওয়া অর্জন করে, তাদের জন্য রয়েছে সুমহান প্রতিদান।”
(সূরা আল ইমরান- ১৭২)

২২) চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণা করা: আল্লাহ্‌ বলেন,

“নিশ্চয় রাত-দিনের পরিবর্তন এবং আসমান ও জমিনের মধ্যে আল্লাহ্‌ যা সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন জাতির জন্য যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে।” (সূরা ইউনুস- ৬)

২৩) জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ: আল্লাহ্‌ বলেন,

“এবং অচিরেই জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবে আল্লাহ্‌ ভীরুগণ।”              (সূরা লাইল- ১৭)

২৪) অফুরান্ত কল্যাণ লাভে ধন্য হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর; কেননা সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ পাথেয় হল তাকওয়া বা আল্লাহ্‌ ভীতি।”
(সূরা বাক্বারা- ১৯৭)

২৫) পরিণতি সুন্দর হওয়া: আল্লাহ্‌ বলেন,

“অতএব তুমি ধৈর্য অবলম্বন কর, নিশ্চয় শেষ পরিণতি মুত্তাকীদের জন্য।”              (সূরা হূদ- ৪৯)

২৬) আল্লাহ্‌র বন্ধুত্ব লাভ: আল্লাহ্‌ َ বলেন,

“আর আল্লাহ্‌ মুত্তাকীদের বন্ধু।”             (সূরা জাছিয়া- ১৯)

রমযান মাসঃ

রমযান মাস হল সর্বশ্রেষ্ঠ মাস । রমযান মাসের শ্রেষ্ঠত্ব কোরআনের জন্য কারন এ মাসে কোরআন নাযিল হয়েছে । কোরআন সর্বপ্রথম লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ হ্য় । অতপর আল্লাহতাআলা সেখান থেকে বায়তুল ইযযাতে সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমযানের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত্রি শবে কদরে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ করেন । কোরআন প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবাহানাহুয়া তাআলা বলেনঃ

“যদি আমি এই কোরআন পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম তাহলে তুমি দেখতে যে, ওটা আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে । আমি এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে ।”                 

[সূরা-হাশর,আয়াত-২১]

 

রমযান হল কুরআন নাযিলের মাস । আর মাত্র কয়েকদিন পর অসংখ্য নিয়ামত ও সুসংবাদের বার্তা নিয়ে আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে পবিত্র ও বরকতময় মাস রমজান । রমজানের আগমনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনন্দিত হয়ে সাহাবীদেরকে বলতেন,

“তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমজান এসেছে, যার সিয়াম আল্লাহ তোমাদের উপর ফরয করেছেন।        (সুনান নাসায়ী: ২০৭৯)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘‘রমযান মাস- যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’’       (আল-বাকারা : ১৮৫)

সিয়াম যেমন এ মাসে, কুরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসেই। ইতিপূর্বেকার তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিলসহ যাবতীয় সকল আসমানী কিতাব এ মাহে রমযানেই নাযিল হয়েছিল ।        (সহীহ আল জামে)
কুরা’আনুল কারীম মানবজীবনের পরিপূর্ণ সংবিধান । পারিবারিক সামাজিক রাজনৈতিক সহ সকল প্রকার কল্যানের নীতি এতে বিদ্যমান । দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়ের দিক নির্দেশনা রয়েছে এ কিতাবে । এ গ্রন্থ বিশ্বাসীদের জন্য পথ প্রদর্শক । কোরআন মাজীদ এমন একটি গ্রন্থ যাতে কোন বাতিলের সংমিশ্রণ নেই । এই অপরিবর্তনীয় অবস্থায় কোরআন কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকবে ।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের বাড়িতে সবচাইতে অবহেলিত যে জিনিসটি তা হল কোরআন । কোরআন আমাদের জীবন বিধান অথচ আমরা কখনও জানারও চেষ্টা করছি না কোরআনে কি রয়েছে । আমাদের প্রতিটি কাজের শুরু এবং শেষ হওয়া উচিত ছিল কোরআনের বিধান অনুযায়ী কিন্তু আমরা যে ভুলতেই বসেছি কোরআন নামের কিছু আছে আমাদের বাসায় আছে । কোরআনকে না জানা, না মানা কোরআনকে অবহেলা করাই হল মানবজাতির সমস্ত প্রকার দুঃখ-দুর্দশা, গ্লানি, অশান্তি, বিপর্যয় এর একমাত্র কারন । রমযান মাস কোরআন নাযিলের মাস সেই সাথে তাকওয়া অর্জনের মাস ।
রমযানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে একজন মুসলিম তাকওয়া অর্জন করতে পারে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবাহানাহুয়াতাআলা বলেনঃ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারীতা অর্জন করতে পার।”                  (সূরা বাকারা: ১৮৩)

কারণ এ মাসে মানুষ সিয়াম পালন করে, সারাদিন কোন প্রকার গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় না । রাতের বেলা নফল সলাত পড়ে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে । ফলে একজন মানুষ তাকওয়া অর্জনের মূলধারা বা পথ খুজে পায় । মানুষ সারাদিন সিয়াম পালন করে না খেয়ে থাকে । তার সামনে অনেক খাবার ও পানীয় থাকে, সে ইচ্ছে করলে তা নির্জনে খেতে পারে, কিন্তু সে তা খায় না । এর মূল কারণ, সে মহান আল্লাহকে ভয় করে । আর এই ভয়টাই তাকে পরবর্তীতে সকল অন্যায়, দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। তাই আল্লাহ সিয়াম পালনকারীর প্রতিদান স্বরূপ তাঁর নবী(সাঃ) এর মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন : সিয়াম আমার জন্য আর এর বিনিময় আমিই দিব, আমি নিজেই এর প্রতিদান হয়ে যাবো । অপরদিকে রমযান মাস রহমতের মাস, এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ থাকে, জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় । শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়, যাতে সে মানুষকে কুকর্মে প্ররোচিত করতে না পারে । আল্লাহ অসংখ্য জাহান্নামীকে এ মাসের উসিলায় মাফ করে দেন। একটি নফল এবাদতের সওয়াব একটি ফরজ এবাদতের সমতুল্য করে দেন । একটি ফরজ এবাদতের সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি করে দেন। এভাবে পবিত্র রমযান মাস পুরোটাই একটি নেয়ামত ও রবকত পূর্ণ মাস । যদি কোন ব্যক্তি চায় অন্যান্য সময়ে ভালো কাজ করবে, তার উচিত এ মাসে পূর্ণরূপে এবাদতে মশগুল হওয়া । কারণ এর দ্বারাই সে পরবর্তী সময় নিজেকে একজন মুত্তাকী বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। তাই রমযান মাস মানুষকে তাকওয়ার শিক্ষা দিয়ে থাকে । তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত পবিত্র মাহে রমযানকে যথাযথভাবে এবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা । এবাদত এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা, রমযানের মাসে আল কুরআন নাযিল হয়েছে তাই আমাদের উচিত এ মাসে খুব বেশি বেশি কুরানুল কারীম অধ্যয়ন করা, নফল এবাদত বেশি বেশি করা, সকল পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা, হাত, মুখ , চোখ, ও অন্যান্য অঙ্গপত্যঙ্গ দ্বারা যেন কোনো প্রকার গুনাহ সংঘটিত না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা । কেননা রসূল (সা.) বলেছেন- অনেক সিয়ামপালনকারী আছে যাদের সিয়াম উপবাস ছাড়া কিছুই হয় না । কতিপয় লোক আছে যারা রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে তাদের এ সলাত রাত জাগ্রত ছাড়া কোন উপকারে আসে না । এর কারণ হচ্ছে যারা সিয়ামও পালন করে আর অন্যান্য পাপ কর্ম ছাড়তে পারে না তাদের এ সিয়াম ঐ ব্যক্তির কোনো উপকার করতে পারে না । মানুষের পাশাবিক শক্তি নিয়ন্ত্রিত হয়ে নৈতিক ও চারিত্রিক শক্তিতে পরিশুদ্ধতা আসে; সিয়াম মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে; শারীরিক সুস্থতা ও আত্মিক পরিতৃপ্তি অর্জিত হয়; সিয়াম পালনকারীর দ্বারা বান্দা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা লাভের সুযোগ পায়; মানুষের মনে আল্লাহতাআলার মাহাত্ম্য ও বড়ত্বের ধারণা জাগ্রত হয়; গরিব দুঃখী ও অভাবী মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ সৃষ্টি হয়; বান্দা এক মাসের সিয়াম সাধানায় বাকি এগারো মাসের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়; রোযার চূড়ান্ত লক্ষ্য তাকওয়ার মত মহৎ গুণ অর্জিত হয়; সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পায়; সিয়ামের দ্বারা পরিমিত খাদ্যাভাস ও জীবনধারায় নিয়মানুবর্তিতা ফিরে আসে; সিয়ামের দ্বারা মানুষের মধ্যে মালাইকাদের চরিত্র সৃষ্টি করে; মানুষের মধ্যে বিনয় নম্রতা সদ্ব্যবহারের মত নৈতিক গুণাবলী অর্জিত হয়; সিয়ামের দ্বারা মানুষ দানশীল ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ হয়; ইবাদত-বন্দেগীতে গতিশীল হয়ে মানুষ কুরআন ও হাদিসচর্চায় মনোনিবেশ করে। এ ছাড়াও সিয়ামের বহু উপকারিতা রয়েছে।

একজন তাকওয়া অর্জনকারী মানুষকে বলা হয় মুত্তাকী । একজন মুত্তাকীর গুণাবলীঃ

  • —-ফরজ কাজসমূহ আদায় করা । যেমন সলাত, সিয়াম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি।
  • —-হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা ।
  • —-মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা ।
  • —-মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করা ।
  • —-মনের অজান্তে পাপ কাজ ঘটে থাকলে তা লাঘবে দ্রুত তওবা করা ।
  • —-অন্যায় কাজের পুনরাবৃত্তি না করা।
  • —-রসূল (স) সুন্নাতসমূহ সম্মানের সহিত আদায়ে সচেষ্ট থাকা ।
  • —-আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ খরচ করার আগ্রহ থাকা ।
  • —-আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা সৃষ্টি করা ।
  • —-অঙ্গীকার আদায়ে বদ্ধপরিকর হওয়া।
  • —-সকল কাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।
  • —-কথার মাধ্যমে অপরকে কষ্ট দেয়া থেকে রসনাকে সংযত করা।
  • —-আত্ম-সমালোচনা করা।
  • —-ক্রোধকে দমন করা।
  • —-অপরাধীকে মা্ফ করার গুণ অর্জন করা।

 

তাকওয়াহীন সমাজের পরিণতিঃ

পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি থেকে মুক্ত থাকতে পুলিশ চৌকিদার রাখা হয়। দোকান পাট সংরণ রাখতে সার্কিট ক্যামেরা, স্যাটেলাইট ও উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ সকল অন্যায়ের জন্য কোট-কাচারি, জেল, উকিল, জজ ইত্যাদি নিযুক্ত করা হয়। আর এ সকল তখন প্রয়োজন হবে না যখন প্রতিটি মানুষ একটি বিষয় বা একটি চরিত্র অর্জন করতে সম হবে তা হচ্ছে তাকওয়া । বর্তমান যুগে মারামারি, হানা-হানি, চুরি-ডাকাতি, গুণ্ডামী, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সুদ-ঘুষ, কেলেঙ্কারী, করফাঁকি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, কর্মে ফাঁকি এ সকল বিষয় অহরহ চলছে। আর যার প্রতিরোধ সরকার হরেক রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও এর কোন সমাধান করতে পারছে না, কিংবা পারবে বলে আশা করা যায় না। তবে আল্লাহ প্রদত্ত একটি পদক্ষেপেই পৃথিবীর যাবতীয় দুর্নীতি ও কুকর্ম বিলুপ্ত করতে সম তা হচ্ছে-মানুষকে তাকওয়াবান করে তোলা । যদি কোন মানুষের মাঝে আল্লাহভীতি থাকে তাহলে সে কোন প্রকার অশ্লীল বা দুর্নীতি কাজে জড়িত হতে পারে না । মূলত এটাই তাকওয়া । আর যখনই কোন দুর্নীতিমূলক কর্ম সামনে আসবে তখন তার মন বাধা প্রদান করবে যে, আমাকে কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহ এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে তখন আমি কি উত্তর দিব? এ ধরনের আল্লাহভীতি সকল মানুষের অর্জন করা একান্ত অপরিহার্য বিষয় । তাই সিয়াম পালন করতে হবে হক আদায়সহ। অর্থাৎ সকল অপকর্ম পরিত্যাগ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে যেন এর ফলাফল বিদ্যমান থাকে তার সার্বিকব্যবস্থা করতে হবে । এভাবে যদি সিয়াম এর হক আদায় করে সিয়াম পালন করা হয় তাহলে ঐ ব্যক্তি তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হবে। আর তাকওয়া একবার যদি কারো মাঝে এসেই যায় তবে সে তার ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে সফলতা অর্জন করতে পারবে । তাকওয়া অর্জন করতে বেশি বেশি এবাদত করা দরকার । আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে পবিত্র মাহে রমযানের মূল শিক্ষা তাকওয়া অর্জনের তাওফিক দান করুন।

………………………আমীন ইয়া রব্বুল আলামীন ।